Home সমাপ্তির ওপাড়ে সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩২ (২)

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩২ (২)

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩২ (২)
জাবিন ফোরকান

“আরওয়া, আপনি এমন একজন মানুষ যিনি নিজের অর্জন শো অফ করতে পছন্দ করেন। অন্যকে নিজের তুলনায় নীচ দেখতে আপনার ভালো লাগে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো যে আপনার আছে সেটা আপনি নিজেই জানেন না।”
সামনে দন্ডায়মান জায়দানের কথা শুনে চমকে উঠলো আরওয়া। ভীষণ অপমানে তার মুখশ্রী লালচে হয়ে উঠল। এইটুকুন হয়ে গেলো চেহারা। ভ্রু কুঁচকে সে ক্রোধ চেপে উচ্চারণ করল,
“কি বললেন আপনি?”
জায়দান প্রতিবারের মতো ভীষণ শান্ত। যেন সুস্থির সাগরজল।
“রাগ করবেন না। তবে আমার পর্যবেক্ষণ ভুল হতে পারেনা। আপনি চাইলে আমি আপনাকে প্রমাণ দিতে পারি।”
“প্রমাণ? কিসের প্রমাণ? দিন দেখি!”
জায়দান ফরমাল প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে খানিক সময় নিয়ে নিজের ভাবনাদের মেলালো বুঝি। অতঃপর বলতে শুরু করলো,
“সাবিনকে আপনি আগে থেকেই চিনতেন। আমার বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর সময়ে আপনার পরিবারকে সবকিছু বিস্তারিত জানানো হয়েছিল, সাবিনের নাম সহ। তাছাড়া আপনার ফোনে আমার এবং সাবিনের বিয়ের রিসিপশনে তোলা পারিবারিক একটি ছবি আছে, যেটা খুব সম্ভবত আপনার মায়ের ফোনে ছিল, সেখান থেকে আপনি নিয়েছেন।”

ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো আরওয়া। ঠিক নিজের হাতে ধরা ফোনটা চেপে ধরলো সে অজান্তেই। এই লোক কখন এসব দেখলো, জানলো? কিভাবে বের করলো? অবশ্য, সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট, হ্যাকিংয়ে যার স্পেশালিটি, তার জন্য কঠিন কিছু না। দাঁতে দাঁত পিষে আরওয়া বলে উঠল,
“আপনি আমার ফোন হ্যাক করেছেন?”
উত্তর করলোনা জায়দান। বাদামী নয়নজোড়া সুস্থির চেয়ে রইলো চশমার লেন্সের অন্তরাল থেকে। আরওয়ার প্রশ্ন উপেক্ষা করে নিজের বক্তব্য জারি রাখলো সে।
“সাবিনের পিৎজা স্টেশন নিয়ে ঝামেলার সময়ে আপনি এমনি এমনি ওকে মেসেজ করেননি। বিশুদ্ধ মানবিকতা ছিল না কিছুই। আপনি নিজে থেকেই ওকে বাজিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন। অথচ আপনার মন আপনাকে এমন যুক্তি দিলো, যে আপনি সবটাই মানবিকতার খাতিরে করছেন।”
অন্তরের ভেতর কেমন যেন খচখচ করে উঠলো। আরওয়া কেঁপে উঠলো সামান্য। এই লোক কি বলছে এসব? কেন বলছে? জায়দান তার নিকট আরো এক পা অগ্রসর হলো।
“সেদিন আপনি ইচ্ছাকৃতভাবেই সাবিনের সামনে আমাকে নিজের উড বি ফিয়ন্সে বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। মিসিরের সঙ্গে ডাবল ডেটের ব্যাপারটাও আপনার পরিকল্পনা ছিল। ল্যাটে অ্যান্ড লাভ ক্যাফেটা আপনার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর। সেখানে মিসিরকে দেখামাত্র আপনাকে জানিয়েছিল সে। নাহলে আমাদের গন্তব্য সেদিন ছিল গুলশানের একটি রেস্টুরেন্ট। সেখানে মাঝপথে আপনি ড্রাইভারকে বললেন, সে যেন কাছের ল্যাটে অ্যান্ড লাভে যায়। সময় বাঁচবে।”

ভীষণ বিস্ময়ে আরওয়ার ঠোঁটজোড়া ফাঁক হয়ে রইল। অনেক কিছুই তার বলতে ইচ্ছা করছে। প্রতিবাদের ভীষণ তাড়া অনুভব করছে। কিন্তু লোকটার যুক্তিতর্ক খন্ডন করতে পারছেনা তার মস্তিষ্ক। কারণ, জায়দান ভুল কিছু বলছেনা!
“আপনি আমাকে মিসির আর সাবিনকে একসাথে দেখাতে চেয়েছেন। অন্যদিকে সাবিনকে আমাকে এবং আপনাকে একসাথে দেখাতে চেয়েছেন। অনেকাংশে সফলও হয়েছেন। আপনার হাতে তখন স্রেফ কাকতালীয়, এমন যুক্তি ছিল। অন্তরকে বুঝিয়েছেন, সবকিছুই ভাগ্যের লিখন। এমনটাই হওয়ার ছিল।”
একটু থামলো জায়দান। তার কন্ঠস্বর ক্রমেই গম্ভীর এবং তেজী হয়ে উঠল।
“আর আজ, আপনি সকল সীমা পরিসীমা ছাড়িয়ে গিয়েছেন, আরওয়া। আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে আমাদের বাগদানের অনুষ্ঠানে সাবিনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আপনি ওকে দেখাতে চেয়েছিলেন, যে এক কালে যেটা ওর ছিল, সেটা আজ আপনার হয়ে যাচ্ছে। আপনি ওর কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে আপনি সর্বেসর্বা, ওর চাইতে অনেক গুণে ভাগ্যবতী। কিন্তু আপনার অন্তর আপনাকে বুঝিয়েছে আপনি স্রেফ সাবিনের ব্যবসায় সাহায্য করছেন। তার কাছে অর্ডার দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো এক প্রকার মানবিকতা। উদার মনোভাবের প্রকাশক। আপনার মন আপনাকে বুঝিয়েছে যে আপনি ভালো চান, কিন্তু সেটা কোনো না কোনোভাবে উল্টো হয়ে যায়। অথচ আপনার মন চেপে রাখে এক ভয়াল বাস্তব, যেটা সম্পর্কে আপনি না বুঝতে চান, না জানতে চান! আপনার মতন মানুষকে অনেক স্থানে স্যাডিস্ট বলে সম্বোধন করা হয়, যারা অন্যের দুর্দশায় সুপ্ত আনন্দলাভ করে। অথচ নিজের অন্তরের কাছে তারা সাধু।”

“চুপ করুন আপনি!”
চেঁচিয়ে উঠল আরওয়া। ধড়মড় করে উঠে বসলো বিছানায়। ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গিয়েছে তার সমস্ত শরীর। কম্বল পেঁচিয়ে ধরেছে সমস্ত শরীর। হাঁপাতে হাঁপাতে আশেপাশে তাকালো সে। নিজের বেডরুমে আবিষ্কার করলো সে নিজেকে। অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষ, শুধুমাত্র নাইটস্ট্যান্ডে হলদেটে ল্যাম্পশেড জ্বলছে।
এতক্ষণ যাবৎ দুঃস্বপ্ন দেখছিল সে!
উঁহু, ঠিক দুঃস্বপ্ন নয়। বরং বাগদানের দিন তাকে একান্তে ডেকে নিয়ে জায়দান ঠিক যা যা বলেছিল, তাই দুঃস্বপ্ন হয়ে ধরা দিয়েছিল চোখের পাতায়। নিজের মাথা চেপে ধরলো আরওয়া। কিছুতেই নিজেকে সুস্থির করতে পারেনি সে। বারংবার সে একটা কথাই ভেবে চলেছে। আসলেই কি সে এমন?

নাইটস্ট্যান্ডের ড্রয়ার থেকে টিস্যু বের করে কপালের ঘাম মুছতে গিয়েই নিজের অনামিকায় জ্বলজ্বল করা একটি সোনার আংটি নজরে এলো আরওয়ার। সেদিন জায়দান চলে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু জেসমিন নিজের হাতের আংটি খুলে আরওয়াকে পরিয়ে দিয়ে জানিয়ে গিয়েছেন, ছেলের বউ তিনি আরওয়াকেই বানাবেন। নিজের আঙুলে আংটিটা হঠাৎ করেই বেশ ভারী ঠেকলো আরওয়ার। কেমন যেন বোধ করলো সে। জায়দান নামক মানুষটাকে কি সে এতটাই পছন্দ করে ফেলেছে যে তাকে লাভ করার আশায় এতটা বেহায়া হতেও কুণ্ঠাবোধ হয়নি?
পায়ে পায়ে বিছানা থেকে নেমে এলো আরওয়া। মাথাটা ঠান্ডা করা দরকার। সঙ্গে দরকার ফ্রীজের ঠান্ডা পানি। দুই তলায় নিজের রুম থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো সে। হলঘর সমস্তটাই অন্ধকার। শুধু নিচতলায় বাবা মায়ের বেডরুমের করিডোর থেকে আলোর আভা ভেসে আসছে। ঘড়ির দিকে চোখ গেলো তার। রাত প্রায় আড়াইটা বেজে এসেছে। বাবা মা এখনো ঘুমায়নি?
ধীরপায়ে, নিঃশব্দে এগোলো সে বেডরুমের দিকে। করিডোর বেয়ে রুমের পানে এগোতেই মৃদু কণ্ঠস্বরের আওয়াজ গেলো কানে। রুশমি উদ্বিগ্ন গলায় স্বামীকে বলছেন,
“কি হবে আমাদের মেয়েটার? আমার আর কিছুই বোধে আসছেনা। আরেফিনদের বড় ছেলেটা এমন করে হঠাৎ বেঁকে বসলো কি কারণে? যত প্রাণের বান্ধবীই হোক না কেন জেসমিন আমার, লোকের মাঝে আমাদের একটা সম্মান আছে তো, নাকি? মেয়ের বাগদানের কাহিনী, এখন বিয়ের নেই কোনো ঠিক ঠিকানা, মুখ দেখাবো কি করে সমাজে?”

“তো কি চাও? সম্বন্ধ ভেঙে ফেলতে? আমি তো এক পায়ে খাড়া আছি। কিন্তু তুমিই তো হাজার সেধে আমাকে রাজী করিয়েছিলে।”
বাবার কন্ঠ শুনতে শুনতে চাপানো দরজায় কান পাতলো আরওয়া। রুশমি বলে উঠলেন,
“আমি কি আর সাঁধ করে মেয়েকে ডিভোর্সীর কাছে দিতে চেয়েছি? তোমার চিন্তা আর সহ্য হচ্ছিল না বিধায়।”
“বিধায় মেয়েটাকে ব্যবহার করার কথা ভাবলে। মানলাম, বিয়েটা হলে জাফর আরেফিন আমার লসের ব্যবসাটা নতুন করে দাঁড় করাতে সাহায্য করবে। কিন্তু আমাদের মেয়েটা সুখে থাকবে ওই ভাঙা সংসারে? দেখলে না, কেমন যেন সকলে? মা ছেলের মিল মহব্বত নেই।”
“জেসমিনের সমস্যাটা তো তোমাকে বলেছিই। আরওয়াকে ওর খুব পছন্দ। বিয়ে কোনরকমে একবার হয়ে গেলে ওই আমার মেয়েটাকে রাজরানী করে রাখবে। পছন্দের জিনিসের মূল্যটাই অন্যরকম। ছোট ছেলেটা তো আরওয়ার ছোট, নাহলে ওর সঙ্গেই বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতাম। আছে তো শুধু বড়জনই এখন। একটু রয়েশয়ে মানিয়ে নিতে হবে, এই যা।”

সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে গেলো আরওয়া। মনে হলো, তার অন্তরটা বুঝি কেউ খামচে ধরেছে। আবছায়া আলো আঁধারিতে অনামিকায় জ্বলন্ত সোনার আংটি তার কাছে ঠেকলো শেকলতুল্য। নিজের কানে শোনা বাক্যগুলো হজম করতে বেগ পোহালো হৃদয়। এমনটাও সম্ভব?
দাঁড়িয়ে থাকতে পারলোনা আরওয়া আর। নিঃশব্দে উল্টো ঘুরে ছুটে চলে এলো। পানির তেষ্টা, ঠান্ডা বাতাসের আকাঙ্ক্ষা রইলো ভোলা। সিঁড়ি বেয়ে উঠে নিজের রুমে এসে বিছানায় আছড়ে পড়ল সে। কম্বলে মুড়িয়ে ফেললো নিজেকে। নিস্তব্ধপুরীতে শুধুমাত্র তার হৃদস্পন্দন এবং ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটার টিকটিক আওয়াজ শোনা গেলো।
কতক্ষন পেরিয়েছে আরওয়া জানেনা। যখন কম্বল তুলে সে তাকালো, তখন ল্যাম্পশেডের হলদেটে আলোয় তার গালে চিকচিক করছে কয়েক ফোঁটা অশ্রুকণা। নিজের ফোনটা বাগড়ে ধরলো সে। দ্রুত নাম্বারটা ডায়াল করল অবশেষে।
দীর্ঘক্ষণ রিং হওয়ার পর শেষমেষ রিসিভ হলো। অপর পাশ থেকে ভেসে এলো নিদ্রা জড়ানো গভীর এক কন্ঠস্বর,
“হ্যালো? মিসির ইকবাল বলছি।”
“তোমার সাথে একটুখানি কথা বলতে পারি, মিসির?”
রীতিমত ফিসফিস করে উচ্চারণ করলো আরওয়া।

কতগুলো দিন যে পেরিয়েছে, হিসাব নেই আমার। জীবনচক্রে ব্যস্ত হয়ে নিজের ব্যক্তিগত দুঃখগুলো ভুলে থাকার চেষ্টায় আমার দিন কেটে যায়। হাতে রয়েছে বৃহৎ এক কর্মযজ্ঞ, যার প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছি আমি কিছুদিন আগেই।
ক্যাফের কাজ শেষ হয়েছে একটু দ্রুতই আজ। শীত পেরিয়ে ধীরে ধীরে বসন্তের আগমন ঘটেছে প্রকৃতিতে। সঙ্গে জেঁকে বসতে শুরু করেছে উষ্ণতা। তবে হালকা শীত এবং হালকা উষ্ণতার মিশ্রণের সময়টা অপূর্ব। গাছে গাছে নতুন ফুল পাতা, পাখিদের কিচির মিচির। এক অনন্য দৃশ্য। প্রকৃতি রুক্ষতা ঝেড়ে সেজে উঠতে শুরু করেছে আপন রঙে।
ক্যাফের শাটার নামিয়ে পার্ট টাইম ছেলেগুলোকে বিদায় জানানোর পর বাসার পথে এগোলাম আমি। হাতঘড়িতে সময় দেখলাম। রাত বেশ গাঢ়ই হয়েছে। নিজের ফোনটা আনমনে ধরে এগোতে এগোতে ঘাঁটতে লাগলাম। আজ কেন যেন দ্রুত বাসায় ফিরতে ইচ্ছা হচ্ছে না। রাস্তায় হেঁটে পরে নাহয় যাওয়া যাবে। ফোনের রেকর্ডিং অপশনে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফাইলটা চালু করলাম। সঙ্গে সঙ্গে ভেসে এলো ভয়ার্ত এবং শঙ্কিত কন্ঠস্বরটি,

“ হুসেইন স্যার…হুসেইন স্যার মা*রা যাননি, ওনাকে খু*ন করা হয়েছে!”
রেকর্ডিংটা আমি যতবার শুনেছি, ততবার সমস্ত শরীরের র*ক্ত গরম হয়ে উঠেছে আমার। চিত্ত জ্বালানো আগুন যাকে বলে। ভয়ংকর এক বাসনা ঘিরে ধরেছে সমস্ত অন্তরকে। কাঁপুনি উঠে গেল শরীরে আমার। ইচ্ছা হলো আছাড় দিয়ে ফোনটাই ভাঙি আমি। কিন্তু নিজেকে দমিয়ে রাখলাম ঠিক কতটুকু শক্তি প্রয়োগ করে, তা দ্বিতীয় কেউ কোনোদিন বুঝবেনা।
ফোনটা জোর করে লক করে ফেললাম যেন কন্ঠস্বরটি আবারো শুনতে না হয় আমার। ঠিক তখনি লক স্ক্রীন ওয়ালপেপারটা ভেসে উঠলো। পুনরায় থমকে গেলো আমার হৃদয়।
সুদীর্ঘ পুরুষ অবয়ব। টেবিলের পাশে বসা, সামনে ল্যাপটপ। ঢোলা টি শার্ট পরনে, চোখে রিমলেস চশমা। বাদামী দৃষ্টিজোড়া নিবদ্ধ ল্যাপটপের স্ক্রীনে। এক পাশে স্তূপ করে রাখা স্টুডেন্টদের টেস্ট শিট। এক হাত কি বোর্ডে, অপর হাতে মার্কারপেন। মনোযোগী সে, বিলীন আপন জগতে।

স্থবিরতা ছেয়ে গেলো আমার মাঝে। চিত্ত কাঁপলো। তীব্র অভিমানে বুক ভেসে গেলো। চোখে জমলো অশ্রু। কেন রেখেছি তাকে ফোনের ওয়ালপেপারে? এতটা যন্ত্রণা, এত কষ্ট দেয়ার পরেও কেন তাকে নিত্য দেখতে চায় এই হায়াহীন অন্তর? কতবার যে বদলাতে চেয়েছি, পারিনি। ফোনটা হাতে নিলেই দেখতে পাই, শত সংগ্রামের মাঝেও এক পলকের শান্তি মেলে তাকে দেখে। এই শান্তির সঙ্গে যাতনা আসে বিনামূল্যে।
একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুকচিরে। ফোনটা নিজের জিন্সের পকেটে ঢুকিয়ে ফেললাম। মাথা ঝাঁকালাম।
“গেট আ গ্রিপ অন ইওরসেল্ফ, সাবিন!”
নিজেকে নিজে শাসন করলাম। এখন আমার কেই বা আছে যে সামলাবে এই ভাঙাচোরা আমিটাকে?
এগোলাম সামনে। ফাঁকা হয়ে আসছে রাস্তা ক্রমশ। একেবারেই নির্জন। ভালোই লাগে আমার এই নির্জনতা, এই বিষণ্নতা। নতুন প্রকৃতির অমানিশা অনুভব করতে করতে যখন আমি এগোচ্ছি, তখন হঠাৎ করেই বিপরীত প্রান্ত থেকে এগিয়ে আসতে দেখলাম একটি মাইক্রোবাস। বিশেষ অবাক হলাম না। সড়ক তো গাড়ি চলাচলের জন্যই।
ফুটপাথে উঠে গেলাম আমি। স্ট্রীট লাইটের নিয়ন আলো বাদে আর কোনো আলোর উৎস নেই। চাঁদও আবৃত ঘন মেঘের অন্তরালে। মাইক্রোবাসটা থেমে গেলো আমার খানিক পিছনেই। যথারীতি, আগ্রহ প্রকাশের কোনো কারণ নেই আমার। সম্মিলিত পদশব্দ, এরপরই নিজের কাঁধে শক্তপোক্ত হাতের উপস্থিতি টের পেলাম। জমে গেলাম কিছু সময়ের জন্য, পরক্ষণেই তড়িৎ খেলে গেলো বুঝি সমস্ত শরীরে।

“হোয়াট দ্যা হেক!”
খেঁকিয়ে উঠতেই সমস্ত পরিকল্পনা বুঝে ফেললাম। আমার নাকের কাছে ধেয়ে এলো একটি রুমাল। সহসাই নুয়ে পড়লাম, ঘুরে গিয়ে শক্ত সামর্থ্য এক পুরুষের দূর্বলতম অঙ্গে লাথি হাঁকিয়ে দিলাম। ককিয়ে উঠল সে, রুমাল পরে গেলো মাটিতে।
“বাস্টার্ড!”
একজন দুজন নয়। চার চারজন পুরুষ দন্ডায়মান আমার সুমুখে! প্রত্যেকের পরনেই কালো পোশাক এবং মুখ ঢাকা মাস্কের আড়ালে। কলিজাটা বুঝি লাফিয়ে উঠল। অথচ নিজেকে শংকিত দেখালাম না। দূর্বলতা প্রদর্শনেই সব শেষ, আমি জানি।
“একটা মাইয়া মানুষ তুলতে পারিস না! গর্ধব!”
একজন চাপা কন্ঠে বলে উঠল। অতঃপর এগিয়ে এলো আমার দিকে। আমার নজর দ্রুত পড়লো এদিক সেদিক। ফোনটা পকেট থেকে বের করার চেষ্টা করে লাভ নেই। এর আগেই ধরে ফেলবে। উল্টো ঘুরে দৌঁড় দিতে চাইলাম। কিন্তু আঁকড়ে ধরে ফেললো সে আমার খোঁপা বাঁধা চুল। খোঁপা খুলে ঘন লম্বা চুল বেরিয়ে আসতেই সেটা মুঠো পাকিয়ে ফেললো। ব্যথায় শিরশির করে উঠলাম আমি। হাতড়ে ফুটপাথ থেকে ছোট্ট একটা ইটের টুকরো তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিলাম তীব্র আক্রোশে। একেবারে বুকে গিয়ে লাগলো তার। ব্যথার শব্দ তুলে সরে গেলো সে মুহূর্তেই। ছাড়া পেয়েই তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলাম,

“হেল্প! হেল্প! সামবাডি! হেল্প মি!”
তীক্ষ্ণ গলায় বেশিক্ষণ অবশ্য চিৎকার করতে পারলাম না, দুজন একসঙ্গে আমাকে চেপে ধরে ফেলল। অন্য একজন ততক্ষণে আরেকটি রুমাল তৈরী করে ফেলেছে। চেপে ধরলো সে সেটা আমার মুখ বরাবর। ধস্তাধস্তি করতে লাগলাম। এত সহজে ছেড়ে দেবো নাকি আমি? আমার নখের আঁচড় কেটে গেলো তাদের ত্বক। ঘুষি, লাথি এবং ঝটকায় বারংবার আঘাত হানলাম শক্ত পোক্ত শরীরজুড়ে। তবে লোকগুলো অভিজ্ঞ, সন্দেহ নেই। তীব্র ঝটকা দিয়ে একজনের চোখ বরাবর ঢুকিয়ে দিলাম নিজের আঙ্গুল।
“আহহহহ!”
পুরুষালী কণ্ঠের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ। চোখ চেপে ধরে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো সে। র*ক্ত দেখলাম তার আঙুলের ফাঁকে স্পষ্ট।
“খা*নকি মা*গী!”

বেশ বিদঘুটে ভাষায় গালি দিয়ে আরেকজন চেপে ধরলো আমাকে। কিছু একটা দিয়ে আ*ঘাত হানলো আমার মাথা বরাবর। চোখের সামনে পৃথিবীটা ঘুরে উঠলো। টলে উঠলাম, ভারসাম্যহীন হয়ে গেলো শরীর। দৃষ্টিশক্তি হয়ে পড়ল ঝাপসা। পুনরায় রুমাল চাপলো সে আমার মুখে।
দূর্বল হয়ে যাচ্ছি ক্রমশ। শ্বাস না নিয়েও থাকতে পারছিনা। ফুসফুস ছটফট করছে অক্সিজেনের জন্য।
“তোদের আমি নিজ হাতে খু*ন করব!”
কোনমতে শুধু আপনমনে দাঁতে দাঁত পিষে বিড়বিড় করতেই সক্ষম হলাম। আতঙ্ক, মারামারি, এবং ধস্তাধস্তির কারণে আমার শরীর নিস্তেজ হয়ে যেতে লাগলো। রুমাল চেপে ধরায় ক্লোরোফর্মের প্রভাব ছেয়ে গেলো দেহে। বরফ করে দিলো আমার চিত্তকে। দূর্বল হয়ে যেতে লাগলাম। অথচ, অদ্ভুত হলেও সত্য যে আমার খুব বেশি আফসোস হলোনা। কারণ এই স্যাভেজ সাবিন একেবারে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় হেরে যায়নি।
চেতনা সম্পূর্ণ লোপ পেলনা আমার। অথচ শরীর একেবারেই অকার্যকর হয়ে গেলো। শিথীল হয়ে পড়তেই মোটামুটি সুস্থ দুজন টেনেটুনে আমাকে মাইক্রোবাসের ভেতরে তুললো। তাদের গমগমে কন্ঠস্বর কানে এলো আমার,

“বাপরে বাপ! মাইয়া মানুষ এত্ত ডেঞ্জারাস হয়? শালী সকালে দশটা ডিম খায় মনে হয়!”
“ডনের চোখটা গেছে রে, মনা তো সোনায় ঘা পাইছে! খাড়াইতে পারতেসে না।”
“ব্যাডা ওঠ তাড়াতাড়ি গাড়িতে। হাসপাতালে নামাই দিমুনে!”
চোখের সামনে একটা পর্দা নেমে এসেছে আমার। এলিয়ে পরে থাকলাম ব্যাকসিটে। অনুভব করলাম, শক্ত করে আমার হাত পা দড়ি দিয়ে বাঁধছে এরা। ঠিক তখনি ভয়ানক এক চিৎকার ভেসে এলো, পুরুষালী, তেজস্বী।
“এই! এইইইই! কি করছিস শালা মান্দারের বাচ্চারা!”
আবছায়া দৃষ্টিতে গাড়ির বাইরে একটা সুদীর্ঘ অবয়বকে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখলাম জন্তুর মতন। ওটুকুই আমার শেষ দর্শন হলো। অতঃপর ধপ করেই নিভে গেলো দৃষ্টিপ্রদীপ।

ছুটছে মীরা। ভীষণ জোরে ছুটছে। জীবনে এতটা জোরে সে এর আগে কোনোদিনও দৌঁড়ায়নি। বুকে হাঁপ ধরে গিয়েছে। তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করছে অভ্যন্তর। যেন তার ভেতরে কেউ আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে! চুল খুলে এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। ঘামে সিক্ত হয়েছে সমস্ত অবয়ব। পরনের সালোয়ার কামিজের ওড়না বাতাসে দুলছে, সামান্য একটুখানি আটকে আছে কাঁধের সাথে। কোনো খেয়াল নেই তার।
ছুটতে ছুটতে সে বিল্ডিংয়ের ভেতর এলিভেটরে ঢুকলো। একবারের বদলে পঞ্চাশবার বোধ হয় চাপলো বোতাম। এলিভেটর পৌঁছাতে পৌঁছাতে বারকয়েক অজ্ঞান হয়ে পড়েই যেতে নিলো বুঝি। তবুও সামলালো নিজেকে। দরজা খুলতেই লাফিয়ে বেরিয়ে ছুটে গিয়ে একটানা চাপতে লাগলো কলিংবেল। মুখটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে তার। সমস্ত চেহারা ফ্যাকাশে।
কিছু সেকেন্ডের মাঝেই দরজা খুলে গেলো। ভেতর থেকে উঁকি দিলো একটি চিন্তিত মুখ। মীরাকে দেখে এক হাতে নিজের পরনের স্লিপিং রোবে চশমা মুছে বাদামী চোখে পড়ে নিলো সে। ভ্রু কুঁচকে তাকালো রমণীর পানে।
“মীরা? এত রাতে? তুমি এখানে?”
“ভাইয়া!”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩২

ভাঙা গলায় হাহাকার করে উঠল মীরা। এতক্ষণে চোখে জমে থাকা অশ্রুগুলো অবাধে ঝরঝর করে ঝরতে লাগলো। ভেতরে ঢুকলোও না সে, ওভাবেই শশব্যস্ত হয়ে এলোমেলো কন্ঠে জানালো,
“জায়দান ভাইয়া! ওরা…ওরা সাবিনকে কি*ডন্যাপ করে নিয়েছে!”
হতভম্ব জায়দান। নিজের সদা সচল, সদা শান্ত মস্তিষ্ককে সহসাই অচল হয়ে যেতে অনুভব করল সে। মীরা আগে পিছে না ভেবে তার বাহু আঁকড়ে ধরে ভয়ানক আরেক তথ্য যুক্ত করলো,
“আয়দানকেও!”

সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here