সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩২
জাবিন ফোরকান
“তোমরা দুই ভাই মিলে কি ইচ্ছাকৃতভাবে আমাকে ফলো করছো?”
প্রশ্নটি নির্দিষ্ট কারো উদ্দেশ্যে করিনি আমি। তবে দুজনকেই খানিক অস্বস্তিবোধ করতে দেখলাম স্পষ্টত। আয়দান কিভাবে আমাকে খুঁজে পেলো তার চাইতেও বড় প্রশ্ন এখন জায়দান এখানে কেন এলো? আমি এতটাই ঠুনকো যে, যে কেউ আমাকে অনায়াসে খুঁজে বের করে ফেলতে পারে? এই খোঁজের কারণটাই বা কি?
পিছনে ঘুরে জায়দানকে দেখলাম। সে বরাবরের মতনই নির্বিকার চাহনিতে অদূরে দন্ডায়মান ছোট ভাইকে দেখছে। শুধুমাত্র মোজা পরিধানে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে। তার কেডস জোড়া এখন আমার পায়ে। কেমন যেন অনুভূত হলো। দয়ার মতন! তবে আমি প্রতিক্রিয়া করতে পারলাম না। এর পূর্বেই আয়দানের দুর্বোধ্য এক বাক্য ভেসে এলো।
“আমি দুঃখিত।”
জায়দানের ভ্রু জোড়া বিস্ময়ে উঁচু হতে দেখলাম। চট করে ফিরে দেখলাম আমিও। মাথা নিচু করে ছ ফুটি দানব নিজের পায়ের দিকে চেয়ে আছে। সুদর্শন চেহারাখানি কেমন যেন মলিন। এতক্ষণে খেয়াল করলাম, চোখের নিচে তার হালকা কালির রেখা। রাত বিরাতে ঘুমায় না নাকি?
“কিসের জন্য দুঃখিত আপনি, মিস্টার আয়দান আরেফিন?”
আমি প্রতিক্রিয়া করার আগেই জায়দানের তরফ থেকে প্রশ্ন উচ্চারিত হলো। খানিকটা হকচকিয়ে গেলাম। ছোট ভাইকে হঠাৎ এত সম্মানসূচক, দূরত্ববোধক সম্বোধনের অর্থ উদঘাটন করতে পারলাম না। আয়দান বেশ অস্বস্তি নিয়েই শেষমেষ বলল,
“আমি আমার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত। আমার অমনটা করা উচিৎ হয়নি।”
কন্ঠস্বর মোটামুটি স্বাভাবিক শোনালেও কথাগুলো উচ্চারণ করতে আয়দানকে ঠিক কতখানি জোর প্রদান করতে হচ্ছে তা তার মুখচ্ছবি দেখেই স্পষ্ট বুঝতে পারছি। ভীষণ বিনোদিত হলাম আমি। হাসি পেয়ে গেলো রীতিমত। বুকে দুবাহু বেঁধে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকালাম ছোট আরেফিনের পানে।
“লজ্জিত? লজ্জা নামক ভূষণ তোর আছে এটাই তো বিশ্বের নবম আশ্চর্য্য!”
ক্রোধান্বিত হলো আয়দান। দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললো। তবে বরাবরের মতন আমার উপর পাল্টা চিৎকার করলোনা। বড় করে দম নিয়ে নিজের বুকে জ্বলা ক্রোধাগ্নি শান্ত করতে চাইলো।
“দেখ সাবিন, মানুষ যখন ভুল করে ক্ষমা চায় তখন তাকে একটু শোনার চেষ্টা করতে হয়। আর আমি তোর কাছে একটুও অনুতপ্ত নই। আমি শুধু এটাই স্বীকার করতে চাইছি যে মীরার সঙ্গে যা করেছি তা উচিৎ হয়নি। তোর শাস্তি ওই মেয়েটার প্রাপ্য ছিলোনা। আর…”
খানিক বিরতি দিয়ে আড়চোখে জায়দানকে দেখলো আয়দান।
“আমি ভাইয়ার সঙ্গেও ঠিক করিনি। ওকে কষ্ট দেয়া ঠিক হয়নি আমার।”
“ভুল? ক্ষমা?”
সমস্ত শরীর বুঝি জ্বলে গেলো আমার। ইচ্ছা হলো ঝাঁপিয়ে পড়ি ছেলেটার উপর। ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলি তার শরীরটা। আগে হলে তাই করতাম, দ্বিতীয়বার চিন্তা করার প্রশ্ন উঠত না। কিন্ত সাবিন যে একটু হলেও বদলেছে! সে ইদানিং কিছু করার আগে এক দন্ড ভাবনা চিন্তার চেষ্টা করে।
শরীরকে নিয়ন্ত্রন করলেও কণ্ঠকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলাম না। কর্কশ কন্ঠে গর্জে উঠলাম,
“একটা মেয়ের ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলাকে তুই ভুল বলিস? তিন তিনটা মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিয়ে ক্ষমা চাস? শালা, খু*ন করে লা*শকে বলিস সরি?”
আয়দানের মাথা নিচু হয়ে এলেও কণ্ঠের তেজ কমলো না।
“আমি কিছু নিয়ে ছিনিমিনি খেলিনি, ওকে? মীরাকে আমি….”
থেমে গেলো আয়দান সহসা। দৃষ্টি লুকিয়ে শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করলো। সরু চোখে তাকে দেখে গেলাম আমি। জায়দান সেই একই ভঙ্গিতে আমার পিছনে দাঁড়িয়ে নির্লিপ্ত। আয়দান খানিকটা সময় নিলো, বেশ ইতস্তত করলো। শেষমেষ চুলে হাত চালিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত কন্ঠে জানালো,
“আমি সেদিন মীরাকে কিছুই করিনি।”
সেদিন রাতে:-
বিছানায় এলিয়ে পড়ে আছে মীরা। চেতনা হারিয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। সমস্ত শরীর স্থবির হয়ে আছে। আয়দান শ্বাস টেনে রমণীর লাস্যময়ী শরীর পর্যবেক্ষণ করলো। একেবারে কাদামাটির মতন নরম, কোমল। যাকে এখন ইচ্ছামতন আকৃতি দেয়া সম্ভব। পরিকল্পনা এমনটাই। এই ননির পুতুলের সঙ্গে এখন আয়দান যেমন ইচ্ছা তেমন করতে পারে। সুপ্ত সকল চাহিদা, সকল বাসনা পূরণ করে নিতে মরিয়া সমগ্র অস্তিত্ব।
জীবনে নারীসঙ্গ আয়দান বহু উপভোগ করেছে। বিশেষ করে, বিদেশে যাওয়ার পর পাশ্চাত্য জীবনাচরণে একেবারে মিলেমিশে যায় সে। কোনো বারণ ছিল না, বাঁধা ছিল না পরিবারের। পশ্চিমাদের নিকট এসব ছিল একদমই স্বাভাবিক, নিত্য দিনের কর্ম। আয়দানের নিকটও সবকিছুই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে কিছু মাসের মধ্যেই। আপন দেশের সংস্কৃতি, শিক্ষা, ধর্ম কর্ম, অনুশাসন তাকে ঢাকার আধুনিক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল কলেজে কোনোদিন শিক্ষা দেয়া হয়নি। পরিবারের বারণ তো ছিলই না। ছোটবেলা থেকে সে যেটাকে সঠিক মনে করেছে, মায়ের কাছে সেটিই সঠিক হয়ে উঠেছে। বাবা মাঝেমধ্যে বাঁধ সাঁধলেও ছেলে বিপদে পড়লে তাকে টেনে তুলতে ভুল করতেন না। বড় ভাই? সে তো মায়ের শাসনে কথা বলতেই পারেনা। তাকে আয়দান গোণায় ধরেনি কোনোদিন।
কিন্তু আজ, হঠাৎ করে মীরার অবচেতন অবয়ব দেখে আয়দানের অন্তর কাঁপলো। যতই অভিজ্ঞতা থাকুক না কেন, এর পূর্বে কোনোদিন মেয়েগুলোর কনসেন্ট ছাড়া সে অভিসারে এগোয়নি। অবুঝ নয় সে। মীরার সঙ্গে যা করতে যাচ্ছে তার সংজ্ঞা কি হতে পারে সমস্তই জ্ঞানে আছে। কিন্তু আয়দান এটা বুঝতে পারছেনা তার বেপরোয়া মনের এতটা পরোয়া কেন হচ্ছে হঠাৎ করে? সে তো একটা নতুন অভিজ্ঞতা গড়তে চেয়েছিল! সাবিনকে ভাঙতে চেয়েছিল! নিজের বড় ভাইকে উচিৎ শিক্ষা দিতে চেয়েছিল!
কিন্তু মীরা নামক মেয়েটার কি দোষ? শুধু তাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে ভালোবেসেছে বলে?
মাথা ঝাঁকালো আয়দান জোরে জোরে। এসব কি ভাবছে সে? এমন অবান্তর চিন্তা ভাবনা কবে থেকে করতে শিখলো তার মস্তিষ্ক? জোরপূর্বক অন্তরকে সামলিয়ে পুনরায় কাজে মনোযোগ দিলো। মীরাকে পুনরায় দেখলো। বস্ত্র খানিক পূর্বে আয়দানের জোরাজুরিতে এলোমেলো হয়ে গেছে। আলুথালু অবয়ব দেখে তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হওয়ার কথা। অথচ আয়দান বুকের ভেতর চিনচিনে এক ব্যথা ছাড়া কিছুই অনুভব করলোনা। কি আশ্চর্য! সে কবে থেকে মেয়ে মানুষ দেখে লোভ বোধ করেনা? এর পরিবর্তে এই নিগূঢ় টানটা কিসের?
প্রথমবারের মতন চোখের লাজ অনুভব করলো আয়দান। দৃষ্টি সরিয়ে নিলো মীরার উপর থেকে। ইচ্ছা হলো কম্বল টেনে মেয়েটিকে মুড়িয়ে ফেলতে।
আয়দান আরেফিন আজ প্রথমবার এক রমণীর সম্মুখে নিজেকে তুচ্ছপ্রায় অনুভব করলো।
অথচ হৃদয়ের ব্যথা এখনো সুতীব্র। সাবিন নামক মেয়েটা তার গোটা পরিবারকে ভুগিয়েছে। এত পরিমাণে যে আজও মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি কেউই। একদম পরিপাটি পরিবারটা একটা মেয়েমানুষ এসে তছনছ করে দিয়ে গিয়েছে। উপরন্তু আয়দানকে হেনস্তা করেছে। দগদগে ঘা হয়ে রয়েছে প্রত্যেক অপমান।
হঠাৎ করে মীরার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো আয়দান। যা হওয়ার দেখা যাবে! আগে উদ্দেশ্য পূরণ করে নিক সে! অথচ মেয়েটিকে ছুঁয়ে দেয়া সম্ভব হলোনা। তার উদরে স্পর্শ ঠেকতেই হাত কেঁপে উঠলো ভীষণভাবে। কানে ভেসে উঠলো তার মধুর কন্ঠস্বর,
॥ জায়দান? ভালোবাসি। আমি তোমাকে বিশ্বাস করব না তো কে করবে, শুনি?॥
॥ আমি না কোনোদিন পরিবার পাইনি জায়দান। আমার একটা ছোট্ট সুখী পরিবারের স্বপ্ন। তুমি আমার এতিম সূচকের দুঃখ ঘোচাবে, ঘোচাবে না?॥
“ফাক!”
অস্ফুট স্বরে খেঁকিয়ে উঠলো আয়দান। জন্তুর মতন। ঝটকা দিয়ে সরে গেলো মীরার কাছ থেকে দূরে। ডান হাতটা তার এত জোরে জোরে কাঁপছে যে অপর হাত দিয়ে সেটাকে চেপে ধরতে হলো। বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে মেঝেতে পায়চারি করতে লাগলো সে। সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে। না না না, সম্ভব না! কি করা উচিত? কোথায় যাওয়া উচিত? কিভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আনা উচিত?
আয়দান জানেনা।
ঠিক কত সময় পেরোলো ছোট আরেফিন পুত্রের বোধ হলোনা। সে জানে, একদম ভোর ভোর জায়দান এই ফ্ল্যাটে পৌঁছে যাবে। গতকালই ফোনে মিসিরকে বলছিল, আজ ভার্সিটি যাওয়ার পথে আগে নিজের ফ্ল্যাটে আসবে একবার। সেই অনুযায়ীই তো সকল পরিকল্পনা করেছে সে! বৃথা যেতে দেয়া যায়?
আয়দান শেষমেষ থামলো। নিজেকে বহু কষ্টে নিয়ন্ত্রণে আনলো। অতঃপর চতুর মস্তিষ্ক সজাগ হলো। সকল প্রস্তুতি নিয়ে ফেললো সে নাটকের স্টেজ সাজানোর। সাথে নিয়ে আসা সিলভার প্যাকেটগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়িয়ে রাখলো মেঝেতে। আশেপাশের সবকিছু এলোমেলো করে ফেললো। বিছানার উপর শুয়ে থাকা রমণীকে আরো খানিক তৈরি করলো। আঙুল চালিয়ে চুল উস্কখুস্ক করলো, পোশাকের বাঁধন খুলে খুলে ঢিলে ঢালা করে রাখলো। বুকে তখন দামামা বাজছে তার। হাত এবং শরীর উভয়ে কম্পমান। শেষমেষ নিজের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে সে ফিরে এলো। চোখ মেলে দেখলো সবটা। রমণীর নিষ্পাপ মুখপানে দৃষ্টি পড়তেই ভেতরটা কেমন চুপসে এলো। আর তাকানোর সাহস হলোনা আয়দানের। ভোরের আলো ফোঁটার আগেই ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেলো।
বর্তমান।
বিস্ময়ে হা করে আয়দানকে দেখছি আমি এই মুহূর্তে। মীরার যে কিছু হয়নি, সেটা মেডিক্যাল টেস্টের রিপোর্টে প্রমাণিত হয়েছে। তবে এই ছেলে এভাবে নিজ মুখে কোনোদিন নিশ্চয়তা দেবে, সেটা এক বিস্ময়কর ব্যাপারই বটে। আমার পিছনে জায়দানও খানিক নড়েচড়ে উঠলো। চোখের চশমা ঠিকঠাক করে সরু দৃষ্টিতে দেখলো কনিষ্ঠকে। আয়দান নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। চোখেমুখে অদ্ভুতুড়ে শঙ্কা এবং ইতস্ততবোধ।
আমি এতটাই হতবাক যে সহস্র চাওয়া সত্ত্বেও শব্দ মিলিয়ে বাক্য গঠন করে উঠতে পারছিনা। তবে আমার পিছনে দাঁড়ানো মানুষটা চুপ থাকলো না। ভেসে এলো তার ভারিক্কি কন্ঠস্বর।
“তো? আপনার কি মনে হয়? আপনার ক্ষমা প্রাপ্য? নারীর সম্ভ্রমকে এতটাই ঠুনকো মনে হয় আপনার কাছে যে অনুশোচনা যথেষ্ট? নারী মায়ের জাত। বাবা শব্দের আগে মা মা মা, তিনবার মায়ের স্থান। আর আপনি মনে করছেন, হঠাৎ করে আপনি শুকনো বিরস মুখে উপলব্ধির কথা বললেই আপনার কৃতকর্ম মুছে যাবে?”
শিউরে উঠলাম আমি এবং আয়দান উভয়ে। আমি শিহরিত হলাম জায়দানের কণ্ঠস্বরের তেজস্বী আগ্রাসনে, আয়দান হলো নিজের প্রতি ঘৃণা এবং অন্তরের যাতনায়। এক পা অগ্রসর হয়ে আমার পাশাপাশি দাঁড়ালো জায়দান। অনমনীয় দৃষ্টি তার বাদামী চোখজোড়ায়।
“আপনি হয়ত মীরাকে কিছুই করেননি, কিন্তু করার চিন্তা করেছিলেন। তাছাড়া আপনি একেবারেই কিছু করেননি সেটা কিন্তু নয়। ওকে যথেষ্ট পরিমাণ হ্যারাসমেন্টে ফেলেছেন। মেয়েটা সারাজীবনের একটা ট্রমা লাভ করেছে। তার এই ট্রমা কি আপনার অনুতপ্তবোধে ঘুচে যাবে? আমি একটা ব্যাপার কিছুতেই বুঝে উঠতে পারিনা। একজন নারীকে ভোগানোর জন্য আপনার মতন পুরুষদের কেন শুরুতেই তার সম্ভ্রমের চিন্তাটা মাথায় আসে? কেন লজ্জিত করেন আমার মতন আরো হাজার হাজার পুরুষকে মা জাতির সামনে?”
আয়দান শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করল। মলিন দৃষ্টি তুলে ভাইকে দেখল। অতঃপর অপ্রাসঙ্গিক একটি কথা বলে বসলো,
“তুমি আমাকে আপনি আপনি করে সম্বোধন কেন করছো, ভাইয়া? কেমন পর পর লাগছে নিজেকে।”
“আপনি তো আমার পরই। আপন ছিলেন কবে?”
জবাব দিতে সময় নিলোনা জায়দান। ভ্রু কুঁচকে তাকালাম আমি উভয়ের দিকে। নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে জায়দান এবং আয়দানের মাঝে। তবে এই মুহূর্তে আমি সেই বিষয়ে আগ্রহবোধ করছিনা। আমার আগ্রহ করার অধিকারটুকুও প্রাক্তন যেহেতু হরণ করে নিয়েছে তবে সবটা সেভাবেই থাকুক। জায়দানের কাছ থেকে নমনীয়তার লক্ষণ না পেয়ে আমার দিকে ঘুরল আয়দান।
“সাবিন। শত্রুতা তোর সাথে আমার ছিল আর ভবিষ্যতে তেমনটাই থাকবে। আমি জানি কতটুকু গুরুতর কাজ আমি করেছি। আর তোর সাথে এই মুহূর্তে আমি ঠিক ঝগড়াও করতে চাইছিনা। তুই শুধু আমাকে বল কোথায় গেলে মীরাকে পাওয়া যাবে। আমি সরাসরি ওর কাছেই ক্ষমা চাইবো। যদি ও আমায় কোনোদিন ক্ষমা নাও করে, তবে তাই সই। আমি সেটা আমার শাস্তি হিসাবে মেনে নেবো। প্লীজ?”
প্রথমবারের মতন আয়দান মানুষটার মাঝে সত্যতার ছাপ দেখলাম। আগের সেই কুটিল মনোভাবটা নেই। গলার স্বরও যথেষ্ট নরম এবং সংকোচে পূর্ণ। সবসময় হয়ত তেজের বিনিময়ে তেজ দেখানো যায়না। চাইলে আমি আয়দানকে এই মুহূর্তে জঘণ্য কিছু কথা বলতে পারি। তাকে তার নীচ অবস্থানটা চিনিয়ে দিতে পারি। তবে ইচ্ছা হলোনা। নিজেকে টেনে নামিয়ে নিতে কুণ্ঠাবোধ হলো। একটি দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে আমি বলে উঠলাম,
“মীরা কোথায় আমি জানিনা।”
সত্যিটাই স্বীকার করলাম। আয়দানের চোখের ক্ষীণ আশার আলোটুকু বুঝি দপ করেই নিভে গেল।
“জানলেও বলতাম না। একটা মেয়েকে যখন নিজের কাছ থেকেই পালিয়ে বেড়ানোর মতন পর্যায়ে টেনে নামিয়ে এনেছিস, তখন নিজেই তার খোঁজ করার মতন কষ্টটুকু ভোগ কর। তবে আমার কথা শুনে রাখ, যদিও বা মীরার নাগাল তুই পেয়ে যাস, আমার বান্ধবীটা তোকে কোনোদিন ক্ষমা করবেনা। আমরা মেয়েরা হয়ত নিজের খু*নি*কেও ক্ষমা করে দিতে পারি, কিন্তু ইজ্জতের উপর নজর দেয়া জানোয়ারকে নয়!”
আয়দানের মুখটা দেখার ইচ্ছাটুকুও সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেল সহসাই। উল্টো ঘুরতেই চোখে এলো জায়দান। বুকের ভেতর খামচে ধরলো অনুভূতিসকল।
“এবং তুমি….”
পায়ে গলিয়ে দেয়া কেডসজোড়া ঝাঁকিয়ে ভীষণ অবহেলায় ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেললাম ফুটপাথের উপর।
“নারী মায়ের জাত ভাষণ দিয়ে পরনারীর আদর জাস্ট হিপোক্রেসি!”
জায়দান নির্বিকার চেয়ে রইলো। ঘটলোনা অভিব্যক্তির কোনো পরিবর্তন। দাঁড়ালাম না আমি। খালি পায়েই এগোলাম। অন্য সময় হলে সড়কের ধার ধরে এভাবে জুতো বিহীন পায়ে হেঁটে যাওয়া আমার জন্য লজ্জাজনক ব্যাপার হলেও আজ বিশেষ কিছু অনুভব হলনা। দুই ভাইকে অতিক্রম করে আমি এগিয়ে চললাম। অদূরেই একটি লোকাল টেম্পো এসে দাঁড়িয়েছে। চিন্তা ভাবনা না করেই সেটায় চেপে বসলাম। যখন টেম্পো দূরে চলে যাচ্ছে, তখন আবছায়া চোখে দেখলাম ফুটপাথে নিজের বাইকের পাশে তখনো দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে আমার পথপানে চেয়ে আছে জায়দান।
বড় সন্তানবিহীন আরেফিন বাড়ি নিস্তব্ধ। এমনটা নয় যে আগেও তেমন একটা প্রাণ ছিল বাড়িতে। পূর্বেও গাঢ় নৈঃশব্দ্য ছেয়ে থাকতো চারিপাশ। তবে এই নিস্তব্ধতায় পার্থক্য আছে। সব থেকেও যেন কোথায় কিছু নেই এমন একটা অনুভূতি। জায়দানের বাইক রাখার গ্যারেজ আজকাল ফাঁকা পরে থাকে। অফিস রুমের স্টাডিতে বইগুলোর উপর জমেছে ধূলোর স্তর। বেডরুম যেমনটা সাজিয়ে গুছিয়ে রেখে গিয়েছিল, আজও তেমনটাই আছে। মিসির এসেছিল একবার, জায়দানের কিছু অতি দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে যেতে। কথা রেখেছে জায়দান। সপ্তাহ খানেক পেরিয়ে গেলেও আরেফিন বাড়ির ছায়াও মাড়ায়নি সে।
এই অনুপস্থিতিতে অবশ্য বেশ শান্তিই অনুভব করছেন জেসমিন। বড় জনের রোবটের মতন মুখটা ছাড়াই ছোট ছেলেকে তোল্লাই করে সময় কেটে যাচ্ছে তার। তবে ছোটটারও ইদানিং কি যেন হয়ে গিয়েছে। হাসিখুশি, চটপটে, দুষ্টু ছেলেটা তার আজকাল কেমন উদাস উদাস থাকে। তাকে আগে ঘরে পাওয়াটাই ছিল মুশকিল। বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে নাইট আউটে থাকতো সপ্তাহের পাঁচদিন। বাসায় যেটুকু সময় থাকতো, তাও মাতিয়ে রাখত। তবে এখন যেন হাওয়া বদল হয়েছে। বড়জন চলে গিয়ে যেন ছোট জনের সুখ শান্তি কেড়ে নিয়েছে। জানালার ধারে বসে বসে সারাদিন কি যেন ভাবে আয়দান। হঠাৎ হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে নিজের ল্যাম্বরগিনি নিয়ে উধাও হয়ে যায় শহরের সড়কে। অথচ সে বন্ধুদের সাথে যায়না সেসব জেসমিন টের পান বাড়ির ল্যান্ড লাইনে বন্ধুরা কল করলে। আয়দান নাকি বন্ধুদের আড্ডাখানাও এড়িয়ে চলছে আজকাল। তবে ছেলে যায়টা কোথায়? ছোট জনের হঠাৎ করে এমন পরিবর্তনে বেশ চিন্তিত জেসমিন।
আজ দুপুরের আগেই বাড়িতে ফিরেছেন জাফর। হাতে একগাদা অতি জরুরী ফাইল। হনহন করে তিনি এগোলেন ভেতরে। সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন দুই তলায়। বড় ছেলের বেডরুমের দরজা খোলাই। তাই সেটি কাঁধের ধাক্কায় খুলে ভেতরে পা রেখেই শশব্যস্ত কন্ঠে বলে উঠলেন,
“জায়দান? ফাইন্যান্সের হিসাবটা দেখো, কিছুতেই মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।”
“ভাইয়া বাড়িতে নেই, ভুলে গিয়েছ?”
বড় জনের বদলে ছোট ছেলের উপস্থিতি জাফরকে খানিকটা অবাক করলো। বিছানার এক কোণায় চুপচাপ বসে আছে আয়দান। উদাস দৃষ্টিতে দেখছে পিতাকে। জাফর ভ্রু কুঁচকে জিভ দাঁতে ঠেকিয়ে খানিক বিরক্তির শব্দ তুললেন। ফাইলপত্র কফি টেবিলের উপর রেখে দিয়ে হাতঘড়ি দেখলেন দ্রুত।
“এখনো ভার্সিটি থেকে ফেরেনি?”
আয়দান স্থির চেয়ে দেখলো জন্মদাতাকে। পরক্ষণে গম্ভীর কণ্ঠে জানালো,
“আব্বু। ভাইয়া আর আমাদের সাথে থাকেনা।”
দৃশ্যমানভাবে সামান্য কেঁপে উঠলেন জাফর। উপলব্ধির শিহরণ খেলে গেলো তার শরীরজুড়ে। বড় ছেলে তার ঘরছাড়া! বিষয়টা যেন তেন বিষয়ের মতন যেমন করে মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, তেমন মহা দুশ্চিন্তা হয়ে ফিরে এলো তার মন – মস্তিষ্কে।
জায়দান নেই! তবে জায়দানের কাজগুলো কে করবে?
ছোট ছেলের দিকে চোখ ফেললেন জাফর। কিন্তু ওই বেপরোয়া মুখটা দেখেই ভরসা নামক সবকিছু উবে গেলো তার অভ্যন্তর থেকে। অসম্ভব!
“মহা মুশকিলে পড়া গেলো তো!”
আপনমনে বিড়বিড় করে জাফর স্যুটের পকেট থেকে ফোন বের করলেন। তৎক্ষণাৎ ডায়াল করলেন জায়দানের নম্বরে।
—আপনার ডায়ালকৃত নম্বরটি এই মুহূর্তে ব্যস্ত আছে।
যান্ত্রিক মেয়েলী কন্ঠস্বরটি বলে উঠতেই ফোন কেটে গেলো। ভীষণ রকমের বিরক্তি অনুভব করলেন জাফর। অসহায় দৃষ্টিতে ফাইলগুলোর দিকে তাকালেন। এগুলোর হিসাব আজ রাতের মধ্যেই মিলিয়ে ফেলা জরুরী। আর সেই কাজ যে একমাত্র তার জিনিয়াস তকমা পাওয়া বড় ছেলের দ্বারাই সম্ভব তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কত শত ইমার্জেন্সীতে, প্রোজেক্টে, কোম্পানির কাজে জায়দান নীরবে তার পাশে ছিল বলেই দ্রুত সফলতা পাওয়া গিয়েছে সেটা আজ তার অনুপস্থিতিতে টের পেলেন জাফর। এদিকে আজ রাতে বিশাল এক ডিলের মিটিং ছিল। জায়দান থাকবে মনে করে অজান্তেই পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলেছিলেন জাফর।
কেমন যেন অসুস্থবোধ করলেন আরেফিন কর্তা। ধপ করে বিছানায় আয়দানের পাশে বসে পড়লেন। পিতৃহৃদয় হঠাৎ করেই হাহাকার করে উঠল। আজ কতটা দিন তার বড় ছেলেটা বাসায় নেই? অথচ তার প্রয়োজনীয়তা টের পাওয়া যাচ্ছে শুধু কাজের সময়ই? এতদিন হুশ হয়নি, কারণ এতদিন দরকার পড়েনি। আদও কি জায়দান এই বাড়ির ছেলে ছিল নাকি স্রেফ কাজের লোক?
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩১
“ভাইয়াকে মিস করছ?”
আয়দানের প্রাণহীন কণ্ঠের অতর্কিত প্রশ্নে চমকে গেলেন জাফর। ইচ্ছা হলো দ্রুত গলায় ‘না’ উত্তর করতে। তবে শব্দটা কিছুতেই কন্ঠ বেয়ে উচ্চারিত হলোনা। যেন মন মস্তিষ্কের সঙ্গে বিরোধিতায় নেমেছে। মস্তিষ্কের নির্দেশ শুনতে নারাজ সে। চায় শুধু অনুভব করতে সত্যটা। আয়দান মলিন হাসলো। পিতার একটি হাতের উপর নিজের হাত রেখে মৃদু আঁচে বলল,
“ব্যাপার না। আমিও ওকে মিস করছি।”
