সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৬
জাবিন ফোরকান
ধবধবে সাদা বিছানা। সামনের দেয়ালে আধখোলা জানালা বেয়ে ধেয়ে আসা শীতল বাতাস ভেতরটাকে ঠান্ডা করছে। আবার সূর্যের স্নিগ্ধ তাপ ভরিয়ে দিচ্ছে উষ্ণতায়। পা ঝুলিয়ে বসে আমি চেয়ে আছি অদূরে। জানালার বাইরে দিয়ে দূরবর্তী এক বহুতল ভবনের ছাদ চোখে পড়ছে। তাতে একজোড়া কপোত কপোতী। হাতে হাত রেখে আকাশপানে কি যেন দেখছে। বহু দূর থেকে তাদের ঝাপসা অবয়ব আমার মনের পর্দায় এক অসাধারণ চিত্র ফুটিয়ে তুললো।
মৃদু পদধ্বনি শুনলাম। ফিরে তাকানোর প্রয়োজন নেই। আমি জানি কে এসেছে।
“তোর জন্য দুধ এনেছি।”
বিছানার পাশের ছোট টেবিলখানার উপরে দুধের গ্লাসটা রেখে দিলো মীরা। আমি হেলদোল দেখালাম না কোনো। তখনো চেয়ে আছি দূরের সেই ছাদের যুগলের পানে। আমার অন্যমনস্ক অবয়ব বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো মীরা। মুখজুড়ে কাটাছেঁড়া, কপালের পাশে ব্যান্ডেজ, ফিনফিনে শরীরে জড়ানো হাসপাতালের নীলচে ম্যাক্সি। ঢোলা জামাটি বাতাসের সঙ্গে এদিক সেদিক দুলছে।
মীরা আমার ঠিক পাশেই বসে পড়ল। কাঁধে রাখলো এক আস্থাভাজন হাত। অথচ, ওই হাতের স্পর্শে আমি চিরচেনা সেই বান্ধবীকে আর অনুভব করতে পারলাম না। কি হয়েছে আমার? হঠাৎ করেই সবকিছু এমন ফাঁপা কেন লাগছে?
“সাবিন। কোথাও খারাপ লাগছে, ব্যথা হচ্ছে?”
প্রশ্নটা শুনতেই এক তাচ্ছিল্যের হাসি খেলে গেলো আমার ঠোঁটে।
“পুরো অস্তিত্বেই তো ব্যথা, কোনটার কথা বলব?”
মীরাকে ভীষণ মর্মাহত মনে হলো। হাত বাড়িয়ে আমার কাঁধে জড়িয়ে নিজের মাঝে আগলে নিলো সে বরাবরের মতন। আমি না তাকে বাঁধা দিলাম, না কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালাম। মীরার হরিণী চোখজোড়ায় অশ্রু টলটল করছে তা না তাকিয়েও স্পষ্ট টের পেলাম।
“আমাকে মাফ করে দে, সাবিন! জীবনে আমি এক অমোঘ প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলাম, যাই হয়ে যাক না কেন আমি কখনো আমার সাবিনের পাশ ছেড়ে কোত্থাও যাবো না। কিন্তু দেখ না, আমি নিজের কাছেই নিজের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে বসে আছি! আমি আমার অবিচ্ছেদ্য অংশটাকে একাকীত্বের যন্ত্রণায় জর্জরিত করে হারিয়ে গিয়েছি স্বার্থপরের মতন। নিজের প্রয়োজনে। আমি নিজের কথা ভেবেছি, কিন্তু আরেকটা আমির কথা ভাবিনি!”
মনটা পুড়লো ভীষণ। ইচ্ছা হলো মেয়েটাকে পাল্টা জড়িয়ে ধরি। কেঁদে উঠে বলি যে তার অভাব আমায় কতটা কষ্ট দিয়েছে। তার ফিরে আসায় আমি কতটা খুশি হয়েছি। অথচ পারলাম না। আমি যেন আগের সাবিনটা আর নেই। অস্বাভাবিক পরিবর্তন টের পাই নিজের মধ্যে। কেমন যেন একটা বোবা কষ্ট। কারো উপরেই রাগ দেখাতে ইচ্ছা হয়না। না ইচ্ছা হয় তাদের আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে।
আমাকে নিশ্চুপ দেখে মীরা কষ্ট পেলো। বুঝলাম, তবুও কিছু বললাম না। কি বলবো? আমি তাকে মাফ করে দিয়েছি? মিথ্যা বলবো? আমার কি অভিমান হয়নি? আমি জানি আমি সঠিক ছিলাম না, কিন্তু এই অন্তরে প্রিয় মানুষটার জন্য যে সকল চাহিদা ছিল সেসব উপেক্ষা সম্ভব?
“আমি আর কখনো তোকে ছেড়ে যাব না। তুই আমাকে তাড়িয়ে দিলেও আমি জোর করে তোর মনের মধ্যে থেকে যাব।”
হঠাৎ করেই সামান্য হেসে উঠে বলল মীরা। এবার আমি সত্যিই অবাক হলাম। মুখ তুলে বিস্মিত নয়নে দেখলাম প্রাণের বান্ধবীকে। যার সাথে আমার বয়সের ফারাক ব্যাপক, অথচ সে আমার বছর কয়েকের ছোট হয়েও আমায় আগলে রাখে বড় বোনের মতন। আমার মুখ দেখে মীরার মোলায়েম হাসিখানি বিস্তৃত হলো। এবার মনে হলো, সে সত্যিই আমার পুরোনো মীরা!
আমার মুখটা নিজের হাতের আজলায় তুলে নিয়ে গভীর দৃষ্টিপাত করলো মীরা।
“তুই একটা ইম্পারফেক্ট মানুষ সাবিন। তোর মাঝে অনেক ভুল। জগতের অর্ধেক মানুষের তোকে সহ্য হয়না। আর বাকি অর্ধেকের তোর প্রতি কোনো ইন্টারেস্ট নেই। অথচ এই ইম্পারফেকশনগুলোই তোকে কেমন যেন ‘মানুষ’ করে তোলে! মানুষ তো এমনি হওয়া উচিৎ বল? ফিল্টারবিহীন। অথচ জগতে আমরা মানুষ বলে চিনি একটা মেকী খোলসের আবরণে নিজেদের লুকিয়ে রাখা সত্তাদের। তাদের দেহের ভেতর জানটা ঠিকই আছে, কিন্তু সেই জানের ভেতর কোনো প্রাণ নেই। প্রাণ আছে তোর মতন ইম্পারফেক্ট মানুষগুলোর ভেতর। যারা ভুল করে, সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে মানিয়েও নেয়। এজন্যই কবি বলেছেন,
ভুল যদি করো তুমি শেষ হলে গো সই
আর ভুল যদি না করো তোমায় মানুষ কেমনে কই?”
“কোন কবি বলেছেন এমন আহাম্মকি কথা?”
আমার প্রশ্নে খিলখিল করে হাসলো মীরা। বহুদিন বাদে তার প্রাণবন্ত হাসি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলো আমার।
“কবি মীরান্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়।”
পারলাম না। মীরা নামক শান্তির নীড় আমায় বিমর্ষ থাকতে দিলোনা। হেসে ফেললাম।
“তুই আর বদলাবি না, মীরা।”
“কেন? তুই কি চাচ্ছিস আমি বদলে যাই? সেটা অসম্ভব না। সে আমি বদলে যাই কিংবা না যাই, তোকে ছেড়ে যে যাবনা সেটা নিশ্চিত থাক। তোর বাসায় কাজের বুয়া রেখে দিস, বা বাসার ছাদে পেত্নী বানিয়ে ঝুলিয়ে দিস, ইদার ওয়ে, আম নেভার গোয়িং টু লিভ মাই লাইফলাইন, সাবিন, ইউ আর মাই লাইফলাইন!”
মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে হাজার অভিমান, হাজার আর্তনাদ, হাজার একাকীত্ব বুঝি ঝরঝর করে ভেঙে পড়ল। সাবিন তো এমনি। উপরে শক্ত বানোয়াট খোলস, ভেতরে তুলতুলে নরম মন। এই নরম মন নিজের প্রিয় মানুষগুলোর সামান্য হাসিতেই গলে যেতে বাধ্য। মীরাকে জড়িয়ে ধরলাম আমি। বহুদিন বাদে প্রাণ ভরে তার দীঘল চুলের সুবাসটুকু গ্রহণ করলাম। মীরার চুলে কেমন যেন বোন বোন গন্ধ।
কিছুক্ষণ বাদে আমার দুধ এবং ওষুধ খাওয়া নিশ্চিত করে মীরা বিদায় নিলো ক্ষণিকের জন্য। বিদায় বলতে সে দুই ঘণ্টার জন্য বাসায় গিয়েছে, গোসল করে, রেঁধে আমার জন্য নিয়ে হাসপাতালে ফিরে আসবে। সে চলে যেতেই একাকীত্ব আমায় ঘিরে ধরলো। অথচ আগের সেই ফাঁপা ব্যথাটা কিছুটা লাঘব হয়েছে।
শুয়ে শুয়ে ভাবলাম, কি হয়ে গিয়েছে আমার জীবনটায়। যখন নিজের ড্যাডের সম্পত্তির বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা শুরু করেছিলাম, তখনি জানতাম কত বড় চক্রে জড়িয়ে যাচ্ছি। অথচ, ওই পরিবারটা আমার আপন চাচার। হয়ত নিজের র*ক্তে*র উপর অবচেতন কোনো টান ছিল বিধায় এতটাও ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে ভাবতে পারিনি যে সম্পদের মোহে মানুষ ঠিক কতখানি অন্ধ হয়ে যায়!
সেদিনের পর আহানের কি হয়েছে আমি জানিনা। তবে পুলিশ পরবর্তীতে কোনো ম*রদেহের খোঁজ পায়নি। পুষ্পা আর পাটকাঠি দুজনকেও আহত অবস্থায় উদ্ধার করা গিয়েছিল। আ*গুন সারা এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। হতাহত হয়নি তবে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। টানা দুইদিন খবরের চ্যানেলে বিষয়টা ব্রেকিং নিউজ ছিলো। এই বেয়াদব সাবিন মনে মনে একটা সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছে। যখন আমার ড্যাডের সকল সম্পত্তি উদ্ধার করা সম্ভব হবে, তখন ঐ আ*গুনে যাদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাদের পুনরায় ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার চেষ্টা আমি করব। বাকিটা করুণাময় আল্লাহর ইচ্ছা।
ভাবতে ভাবতে বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আধ ঘুমের মাঝে নিজের কপালে অত্যন্ত আদরের মোলায়েম স্পর্শ আমার সমস্ত অন্তরকে বুঝি আরামদায়ক শীতলতায় ছেয়ে দিলো। মিটমিট করে চোখ মেলে তাকালাম।
অবশেষে দেখলাম ওই মানুষটাকে। বাদামী সমুদ্রজোড়াকে।
বিছানার এক কোণায় চুপটি করে বসে আমার দিকে চেয়ে আছে জায়দান। প্রফেসরের সদা নির্লিপ্ত এবং প্রশান্ত সত্তায় চির ধরেছে। একটা কালো শার্ট এবং কালো প্যান্ট পরনে। চশমার আড়ালে থাকা চোখগুলোর নিচে অবহেলার কালির ছোঁয়া। চুলগুলো উস্কখুস্ক, আঁচড় পড়েনি বহুদিন বুঝি। কেমন যেন এক বিদ্ধস্ত অবয়ব। মলিন অস্তিত্ব।
একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম আমি। কেমন অনুভব করব বুঝতে পারলাম না। সবটা দুঃস্বপ্নের ন্যায় ঠেকছে আমার কাছে। কানে আজও গুঞ্জরিত হয়ে চলেছে সেই জ্বালাময়ী আওয়াজ,
—লাভ ইউ! আই লাভ ইউ সো ড্যাম, মাই ফাকিং সোল!
মানুষটা আমাকে পছন্দ করেনা, ভালোবাসে না মেনে নেয়া যতটা কষ্টদায়ক ছিল, সে আমাকে আদতেই ভালোবাসে মেনে নেয়া তার চাইতেও যন্ত্রণাদায়ক! কি অদ্ভূত!
“কেমন লাগছে? কোথাও কষ্ট হচ্ছে?”
কণ্ঠটি শিহরণ খেলিয়ে দিল আমার অভ্যন্তরে। এই কন্ঠে কোনো নির্বিকারতা নেই। আছে প্রগাঢ় আবেগ, বিস্তর চাহিদা। অনুভূতিহীন লোকটার কন্ঠ ঝরে আবেগ গড়াচ্ছে সে নিজেও হয়ত সেটি বুঝতে অপারগ। চোখ তুলে তাকালাম তার নয়নমাঝে।
“আমার অন্তর সয়ে গেছে, আর কষ্ট গায়ে লাগেনা।”
জায়দানের মলিন চেহারায় বিষাদের ছায়া পড়ল। ঝুঁকে এলো সে খানিকটা, দ্বিধান্বিত আঙুল ছুঁয়ে দিলো আমার কপালে। আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে জড়িয়ে নিলো গুচ্ছ গুচ্ছ চুল।
“তোমার মনে কি একটুও মায়া দয়া নেই? এতটা বেপরোয়া কিভাবে হয় একটা মেয়ে? যদি সত্যিই তোমার কিছু হয়ে যেতো?”
পরিহাসের শুষ্ক হাসি হাসলাম।
“তবে খুব ভালো হত। পৃথিবীর বুক থেকে একটা বেয়াদব মেয়ে কমে যেতো। তোমার মতন সুশীলরা শান্তি পেতো।”
প্রাক্তনের পাথরের মতন চেহারা বেদনায় কুঁচকে এলো বুঝি। নাকি আমি কল্পনা করছি? অন্যথায় তার চেহারা সর্বদা নির্লিপ্ত থাকারই কথা, তাইনা?
“তুমি ইচ্ছাকৃতভাবে আমাকে আঘাত করতে চাইছ, তাইনা সাবিন?”
সরাসরি ওই বাদামী সমুদ্রে নিজের দৃষ্টি মেলালাম।
“আঘাত? তাও তোমাকে? পাথরে মাথা খুঁটে লাভ কি? ওই বোকামির স্তর আমি বহু আগেই পেরিয়ে এসেছি।”
জায়দানকে এক মুহুর্ত দ্বিধাগ্রস্থ মনে হলো। পরক্ষণে সে চোখ বুঁজে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমার কাছ থেকে সরে শিরদাঁড়া টানটান করে সোজা হয়ে বসলো।
“তোমার বিশ্রাম প্রয়োজন। ঘুমাও। আমি পরে আসবো।”
বিছানা ছেড়ে লোকটা উঠতেই তীব্র অভিমানে খানিক কর্কশ গলায় বলে উঠলাম,
“হ্যাঁ, যাও যাও পালাও! তুমি তো তাই করে বেরিয়েছ আজীবন!”
আমার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে দরজার দিকে এগোলো সে। এমন নির্লিপ্ত ভঙ্গির পুনঃপ্রদর্শনে আমি ভীষণ মর্মাহত হলাম। মনে হলো, বুকের ভেতর ভাঙাচোরা টুকরোগুলো আবার নতুন করে ভাঙতে শুরু করেছে। দরজার হ্যান্ডেলে হাত রাখলো জায়দান, এক্ষুণি বেরিয়ে যাবে। আমি অন্তিম মুহূর্তে কর্কশ গলায় বললাম,
“পরে আর আসার দরকার নেই। ওই দরজা দিয়ে যেমন করে বেরিয়ে যাচ্ছ, তেমন করে আমার জীবন থেকেও দূর হও। তোমায় আর আমি আমার চোখের সামনে দেখতে চাইনা। আই হেইট ইউ, জায়দান আরেফিন!”
থেমে গেলো সমস্ত অস্তিত্ব। দরজার হ্যান্ডেলে চেপে বসলো হাতের আঙুল। সময় বুঝি থমকে গেলো। প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা এবং ভগ্ন হৃদয়ের আর্তনাদ। বিছানায় শুয়ে পড়লাম আবারো। পাতলা কম্বলখানি টেনে ঢেকে ফেললাম নিজেকে।
যায়না! জায়দান আরেফিনকে নিয়ে আমার আর কিচ্ছু যায় আসেনা! তাইনা? তাইনা রে বেহায়া মন?
“কতদিন~ ভেবেছি শুধু দেখবো যে তোমায়
ক্লান্তহীন তুমি ছিলে আমার কল্পনায়~”
সুরহীন এক বেসামাল কন্ঠস্বর। ধ্বনিত হলো মৃদঙ্গের ন্যায়। যেমন করে আগ্নেয়গিরি অগ্নুৎপাতে ছাই ছড়িয়ে দেয় চারিপাশে, তেমন করেই বুঝি ওই অমিত নিয়ন্ত্রণহীন কন্ঠ আপন মহিমা ছড়িয়ে দিলো সমস্ত কক্ষে। জমে গেলাম আমি। মনে হলো আমার শরীর কাটা দিয়ে উঠেছে!
ঝট করে কম্বল সরিয়ে মাথা তুলে তাকালাম। জায়দান আর দরজার কাছে নেই। ওই দীর্ঘ অবয়বখানি জানালার ধারে। বহু দূরের ছাদের সেই কপোত কপোতী যুগল এখনো আছে। প্রফেসরের দৃষ্টি সেই দিকেই নিবদ্ধ। ঠোঁটজোড়া তার নড়ে উঠলো মন্ত্র পাঠের ন্যায়।
“~না লেখা চিঠিগুলো মন পাহারায়
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়
আমি শুধু চেয়েছি তোমায়~”
আমার হৃদয়ের ভেতর বুঝি বারংবার তড়িৎ খেলে গেলো। অসহ্য রকমের যাতনা। তার সঙ্গে অতুলনীয় এক ভালোলাগা। সুর নেই, তাল নেই, লয় নেই। ওই কন্ঠে আছে শুধু দরদ! পৃথিবী নাড়িয়ে দেয়ার মতন দরদ!
জায়দান ঠিক কতক্ষন গানটা গেয়েছে আমি বলতে পারবোনা। ডুবে গিয়েছিলাম আমি একটা ঘোরের মাঝে। আমার সম্বিৎ ফিরল যখন সে মৃদু গলায় গভীর স্বরে কথা বলতে শুরু করলো।
“অনুভূতি শব্দটা আমার চিরকালের শত্রু। পাতার পর পাতা অংক মিলিয়েও অনুভূতির হিসাব মেলাতে পারিনা। ঘৃণা করি আমি এই শব্দটাকে। অথচ, কখন যে আমার শত্রু আমায় ঘায়েল করে ফেললো টেরটুকুও পেলাম না।”
তখনো ওই একইভাবে জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে জায়দান। আমি বিছানায় বসে শুধু তার পিঠের দিকটা দেখতে পাচ্ছি। সুউচ্চ, প্রশস্ত কাঁধ। জানালা থেকে আসা হিমেল হাওয়ার ঝাঁপটায় তিরতির করে কাঁপছে তার উষ্কখুষ্ক চুল।
“চাওয়া পাওয়া কাকে বলে, আমি জানিনা সাবিন। কোনোদিন কিছু চাইতে শিখিনি, না শিখেছি পাওয়ার অনুভূতি। তবুও এই ছোট্ট অন্তর নামক পাখিটা খুব করে এক সোনার হরিণ পেতে চাইতো। সেই সোনার হরিণের নাম, মায়ের ভালোবাসা।”
স্পষ্ট এক দীর্ঘ হতাশার প্রশ্বাস টানতে শুনলাম জায়দানকে। তার কাঁধজোড়া উঁচু হয়ে আবারো শিথীল হয়ে পড়লো পরাজিত ভঙ্গিতে।
“হরিণ যে সোনার হয়না, এটা উপলব্ধি হতে আমার জীবনের ৩২ টা বছর পার হয়ে গিয়েছে। হাতে আছে কতদিন, আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ জানেনা। জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমি সত্যিই খেই হারিয়ে ফেলেছি। কখনো নিজের জন্য না বাঁচা এই জীবনটায় আমি বাকি পথটুকু কিভাবে বাঁচবো আমায় বলে দিতে পারো দুঃসাহসী মেয়ে?”
অবশেষে ঘুরে দাঁড়ালো জায়দান। বাইরে থেকে আসা সূর্যরশ্মি প্রতিফলিত হলো তার সর্বাঙ্গে। খানিক দেবদূতের মতন দেখালো তাকে। ভঙ্গুর, অসহায়, ছন্নছাড়া, আশ্রয়হীন। নিজের নির্বিকার, কঠোর, পাথর চিত্তের অধিকারী প্রাক্তন স্বামীকে কোনোদিন এমন এক রূপে দেখতে পাবো, তা আমার কোনো অবাধ্য কল্পনায়ও কোনোদিন ছিলোনা। এই রূপে এতই অসহায়ত্ব, যে ইচ্ছা হলো দুহাত বাড়িয়ে নিজের কোলে আগলে নেই আর বলি, তার সঙ্গে আমি আছি।
অভিমানটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। মুখ ফুলিয়ে চোখ সরিয়ে বলে উঠলাম,
“আরওয়াকে বিয়ে করে নাও।”
স্নিগ্ধ হাসলো জায়দান। অথচ ওই দূর্লভ হাসিতে নেই কোনো আনন্দ। শুধুই খাঁ খাঁ মরুভূমির শুষ্কতা।
“কিন্তু আমি যে বেয়াদব মেয়েটাকে মনটা লিখে দিয়েছি? আমার মন জমিতে অনুভূতির ফসল ফলানোর অধিকার যে শুধু তারই।”
ঠোঁট কাঁপলো আমার। অধর ফুলিয়ে বললাম,
“আগে কোনোদিন তো বলোনি! হঠাৎ এত কিসের আকাঙ্ক্ষা?”
“এখন তো বলছি। ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা। জীবনে প্রথমবারের মতন নিজের জন্য বাঁচার আকাঙ্ক্ষা।”
“আত্মমর্যাদা বলে আমার কিছু নেই মনে করো বুঝি তুমি?”
“আত্মমর্যাদা ভালোবাসার চাইতে বড় হয়ে থাকলে, আমার সত্যিই আবেগ অনুভূতির প্রতি বিশ্বাস উঠে যাবে।”
পায়ে পায়ে বিছানার কাছে এগিয়ে এলো জায়দান। আমি তখনো নিজের কোলের দিকে চেয়ে বসে আছি। ওই বাদামী নয়নে দৃষ্টি পড়ামাত্র আমি দূর্বল হয়ে যাব, বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
আমাকে খানিকটা সময় নীরবে পর্যবেক্ষণ করলো প্রাক্তন। আদুরে আওয়াজে বললো,
“খুব বেশি ভেঙে দিয়েছি বুঝি?”
“হুম।”
“মাফ করে নতুন সূচনা করা যায়না?”
“না। যায়না।”
“কেনো যায়না?”
“অনুভূতিহীনকে বিশ্বাস করা সম্ভব না। অনুভূতিতে ভর্তি অন্তর যে কোনো একদিন খালি হয়ে যাবেনা তার নিশ্চয়তা কোথায়?”
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। অতঃপর জায়দানের গভীর কন্ঠ ভেসে এলো,
“কেউ একজন আমাকে একদিন বলেছিল, আমার মতন পারফেক্ট মানুষেরা কেন তার মতন ইম্পারফেক্ট মানুষদের ভালোবাসে না। অথচ আজ সে আমার অপারগতাকে ভয় পেয়ে দূরে সরে যেতে দ্বিতীয়বার ভাবছেনা।”
হাত বাড়িয়ে আমার চিবুকখানি আলতো করে ধরে মুখ তুলল জায়দান। বাধ্য হয়ে তাকালাম আমি। বাদামী সমুদ্রে জ্বলজ্বলে জহরতজোড়া বুঝি অলিখিত কোনো উপাখ্যানের ধারক। সামান্য ঠোঁট কাঁপলো জায়দানের, অস্ফুট স্বরে শুধালো,
সমাপ্তির ওপাড়ে পর্ব ৩৫
“তোমার মতন আনফিল্টার্ড মানুষেরা আমার মতন ফিল্টার্ড মানুষদের ভালোবাসে না কেন, সাবিন?”
ঝুঁকে এলো সে। ঠোঁটের মাঝে পরিতাপ ঝুলিয়ে আমার কপালে নিজ কপাল ছুঁইয়ে ফিসফিস করলো,
“আমি তোমার হাজারটা ভুল ভুলে যেতে চাইলাম, অথচ তুমি আমার একটা ভুল ভুলতে চাইলেনা। তুমি আমার ফিরিয়ে দেয়াটা দেখলে, অথচ আমার বিরহটা দেখলেনা।”
একটি ঢোক গিললো জায়দান, সদা নির্লিপ্ত কন্ঠ তার কেঁপে উঠলো চাপা আর্তনাদে,
“তুমি শুধু আমার ভালোবাসাটা দাবী করলে, আমার ভালো থাকাটা আর দাবী করলেনা।”
