উন্মাদনা পর্ব ৫
কায়নাত খান কবিতা
— “ওরে, তোর পছন্দ?”
মাঠের নিস্তব্ধ বাতাস যেন মুহূর্তেই ভারী হয়ে ওঠে।
আনন্দী স্থির থাকার চেষ্টা চালিয়ে যায়। তার দৃষ্টি মাটির দিকে নত, কণ্ঠ স্তব্ধ।মনের ভেতর হাজারো শব্দ ঘুরপাক খেলেও ঠোঁট অবরুদ্ধ।কোনোটিই বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পায় না।
হঠাৎই বজ্রাঘাতের মতো গর্জে ওঠে অভী, চেঁচিয়ে বলে,
— “বান্দীর বাচ্চা, কথা কো—জলদি!”
তৎক্ষনাৎ আনন্দী এপাশ ওপাশ করে নিজের মাথা নড়ায়, নাহ,এই ছেলেটিকে তার পছন্দ নয়।
কিন্তু এই ‘না’ যেন শান্তির বার্তা নয়, বরং অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বয়ে আনে।
এক নিমেষে অভী এগিয়ে আসে। তার আঙুলের নির্মম চাপ আনন্দীর গালকে যেন পাথরের মতো চেপে ধরে। আনন্দীর চোখে চোখ রেখে নড়া নজরে তাকে গিলে খেতে থাকে অভী।যেন আনন্দী তার হাতের পুতুল।কোনো মানুষ নয়। স্রেফ একটি জড়বস্তু। কর্কশ গলায় বলে,
— “তাইলে ওই তোরে চিঠি দিলো কেমনে?”
— “আমি…”
— “চুপ!”
খুব জোড়ে ধমকিয়ে ওঠে আনন্দীকে অভী। যেন তার বলা প্রতিটি কথায় রয়েছে ছলচাতুরী। কোনো সত্যি নেই সেই কথায়! অভী আবার ও আনন্দীকে ঝাঁকিয়ে কর্কশ গলায় বলে,
— “আমার পিঠ পিছনে টাংকি মারোস?”
এরপর আর কোনো সংযম থাকে না। আনন্দীকে ছেড়ে দিয়ে একটি হকিস্টিক নিয়ে তেরে যায় অভী।হকিস্টিকের প্রতিটি আঘাত যেন শুধু শরীরে নয়, বরং এক মানবিক সীমানার উপর আঘাত হানে।
মাঠের নীরবতা ভেঙে যায় আঘাতের কর্কশ শব্দে,
আর ছেলেটির আর্তচিৎকারে।আনন্দী দাঁড়িয়ে থাকে। এই মর্মান্তিক দৃশ্যের একমাত্র সাক্ষী সে, অথচ সম্পূর্ণ অসহায়।তার চোখের পাতা কাঁপে, বুকের ভেতর শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে,কিন্তু সে প্রতিবাদ করতে পারে না।
ভয়এক অদৃশ্য শিকল হয়ে তাকে আটকে রাখেছে।ঠিক তখনই দূর হতে ভেসে আসে পুলিশের গাড়ির সাইরেন,এক টুকরো সম্ভাব্য পরিত্রাণের সংকেত। আনন্দী মনে মনে দোয়া -কামাল পড়তে থাকে। যেন এবার সে পরিত্রাণ পায় অভীর থেকে। পুলিশ স্বচক্ষে দেখলে মামলা নেবেই। অভীর হাত থেকে রেহায় পাবে আনন্দী। কিন্তু সেটা আর হলো কই?
অভী থেমে যায়।তার দৃষ্টি দ্রুত চারপাশে ছুটে বেড়ায়।পরিস্থিতি বুঝে নিতে তার এক মুহূর্তই যথেষ্ট।
— “চল।”
কোনো প্রশ্নের অবকাশ না রেখে সে আনন্দীর হাত ধরে টেনে হাঁটতে থাকে , বাইকে তুলে নেয় তাকে,আর মুহূর্তেই স্থান ত্যাগ করে।কারণ সময় এখন অনুকূল নয়।ক্ষমতার খেলায় কখন কোথায় পা ফেলতে হয়, তা সে ভালো করেই জানে।
শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে তারা এসে থামে এক নির্জন প্রান্তরে।
চারপাশে জনমানবহীনতা,আকাশ যেন নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।কাক, পঙ্খি ও রয়েছে কি-না সন্দেহ।
বাইক দাঁড় করিয়ে নেমেই অভীর হাতের চড় এসে পড়ে আনন্দীর গালে।
সে দুলে ওঠে,পৃথিবী যেন এক মুহূর্তের জন্য ঘুরে ওঠে তার চারপাশে।
— “তোর বয়স কত হইছে রে?এই বয়সে প্রেম-পিরিতি করোস?”
আনন্দীর শরীর কাঁপে, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
— “আমি চিনি না ওকে…”
— “আবার মিথ্যা?”
অভীর চোখে জ্বলে ওঠে ক্রোধের উন্মত্ত শিখা, আনন্দী যায় বলুক না কেন, সেটা বরাবরই অভীর জন্য মিথ্যা।
— “বান্দীর বাচ্চা!”
দ্বিতীয় চড়টি প্রথমটির চেয়েও ভয়ংকর। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আনন্দী।মাথা গিয়ে লাগে শক্ত ইটে।
আর সঙ্গে সঙ্গে রক্তের উষ্ণ স্রোত কপাল বেয়ে নেমে আসে।হঠাৎ এভাবে বাড়ি খাওয়ার ফলে নিজের কষ্ট ধরে রাখতে পারে না আনন্দী। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। তার কান্না আর্তনাদ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে,এক নিঃসহায় প্রাণের আর্তি।কিন্তু সেই আর্তনাদেও বিরক্ত হয় অভী।
— “এই বান্দীরে কেউ বাড়ি দিয়া আয় তো…”
তার কণ্ঠে বিতৃষ্ণা, যেন আনন্দীর কান্নাটুকু ও অভিনয়, কোনো কষ্ট নেই তাতে!
— “ফেঁচফেঁচানি আর মজা লাগে না…”
‘শেখ_বাড়ি’
রক্তমাখা ব্যান্ডেজে মোড়ানো কপাল, কাঁপতে থাকা শরীর নিয়ে আনন্দী ফিরে আসে নিজের বাড়িতে।
দরজায় পা রাখতেই,মেয়ের মাথার ব্যান্ডেজ, রক্তের দাগ, ভাঙা অবস্থা দেখে স্তব্ধ হয়ে যায় তার বাবা।আকরাম শেখ কাজ থেকে ফিরেছেন কিছু ক্ষণ হবে। আনন্দীর দেরি হওয়া দেখে তিনি কিছু একটা ধারণা করেন।তার উপরে অভী যেন গলার কাটা হয়ে বিধে রয়েছে তাদের। তড়িঘড়ি করে আনন্দীর কাছে চলে যান আকরাম শেখ।
__কপাল ফাটল কী করে?”
আনন্দীর মুখ থেকে কোনো কথা বের হয় না।বরং সে থরথর করে কাঁপতে থাকে। মেয়ের এমন অবস্থা দেখে তাকে সোফাতে বসায় আকরাম শেখ। তারপর কপাল ভালো ভাবে দেখতে থাকে।
__“কে করেছে এটা?”
আনন্দী চুপ করে থাকতে চেয়ে ও পারে নাহ।তার বাবাকে এমন ভাবে ফাঁসানো হয়েছে সে চুপচাপ সব সহ্য করলে ও।আজ মুখ ফসকে বলে দেয় সব তার বাবাকে।
__অভী”
আকরাম শেখের চোখে ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে ,যেন তিনি এই নামটিই শুনতে চাচ্ছিলেন।এক মুহূর্ত দেরি না করে তিনি মেয়েকে নিয়ে থানায় চলে যায় ! জিডি করা হয়।সেই মুহূর্তেআনন্দী একটুখানি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।
তাদের জানানো হয় অভী গ্রেফতার হয়েছে।
তার বুকের ভেতর জমে থাকা ভয় একটু নরম হয়।মনে হয় এবার মুক্তি মিলবে।
‘সন্ধ্যা_বেলা’
সন্ধ্যার আলো তখন ধীরে ধীরে গাঢ় অন্ধকারে বিলীন হতে থাকে । আকাশে একরাশ নীরবতা নেমে এসেছে, যেন প্রকৃতি নিজেও কোনো অঘটনের পূর্বাভাস টের পাচ্ছে।
ঠিক সেই সময়, আনন্দীদের বাড়ির সামনে হঠাৎ করেই থামে কয়েকটি বাইক।তার শব্দে ভেঙে যায় চারপাশের স্থিরতা।
দরজায় কোনো কড়া না,বরং এক বিকট শব্দে তা ধাক্কা মেরে খুলে ফেলে অভী।তার প্রবেশ যেন ঝড়ের মতো,চোখে আগুন, মুখে বিকৃত ক্রোধ, শরীরভঙ্গিতে উন্মত্ততা।আনন্দী তখন ডাইনিং রুমে বসে পড়ছিল। সাথে তার মা। বাবা উপরের ঘরে। অভী এসে সোজা আনন্দীর সামনে দাড়ায় ।
— “কোথায় তোর বাবা?”
তার গর্জন যেন পুরো ঘর কাঁপিয়ে তোলে।
আনন্দী চমকে ওঠে। তার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে ভয়ে।
আতঙ্কে সে দরজার পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে
একটি পাথরের মূর্তির মতো।ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে তার বাবা।
চোখে দৃঢ়তা, কিন্তু সেই দৃঢ়তার আড়ালে লুকিয়ে আছে উদ্বেগ।
— “তুমি এখা…?”
কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই অভী হঠাৎ পাশের টেবিলটা উল্টে দেয়।কাঁচের শোপিস ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে মেঝেতে।
— “আমার নামে মামলা ? এখন ঠেলা সামলা”
সে একের পর এক জিনিসপত্র ছুঁড়ে ফেলতে থাকে অভী।চেয়ার, টেবিল, আলমারি—প্রতিটি আঘাতে যেন ঘরের ভেতরের শান্তি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।
দেয়ালে টাঙানো ছবি এক নিমেষে মাটিতে পড়ে ভেঙে যায়।
সেই ছবির ফ্রেমে বন্দী হাসিগুলোও যেন টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
আনন্দীর মা ছুটে এসে থামানোর চেষ্টা করেন,
— “কী করছো এসব?”
কিন্তু অভীর উন্মত্ততা তখন আর কোনো কথা শোনার অবস্থায় নেই।
উন্মাদনা পর্ব ৪
— “চুপ! কেউ একটা শব্দ করবি না!”
তার চিৎকারে ঘরের বাতাস জমে যায়।আনন্দী কাঁপতে কাঁপতে দেয়ালের সাথে সেঁটে দাঁড়িয়ে থাকে।
তার চোখে জল, কিন্তু সে কাঁদতেও ভয় পায়,কারণ এই মানুষটার সামনে কান্নাও কখনো কখনো অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়।
অভী এগিয়ে আসে আনন্দীর দিকে,
— “ তোর জীবন আমি তেজপাতা বানাবো মেয়ে। একটু একটু করে যন্ত্রণা দিয়ে মারবো তোকে, তুই মরার জন্য ছটফট করবি, কিন্তু পারবি না। ভয়ংকর মৃত্যু হবে তোর আনন্দী…”
