উন্মাদনা পর্ব ২
কায়নাত খান কবিতা
__২৪ ঘন্টা ওর উপরে নজর রাখবি। কই যায়, কী খায়
every single details আমার চাই… না-হলে…”
শেষ কথাটা অভী বলে না। বলার প্রয়োজনও নেই। তার চোখের দৃষ্টিই যথেষ্ট তার অবাধ্য হওয়ার ফল বোঝাতে।পুরান ঢাকার গড ফাদারের হাত যার মাথার উপরে রয়েছে, তার কথার বিপরীতে এমনিতে ও কে-ই বা যাবে? জানের মায়া তো সবারই থাকে। তার ওপরে অভী। যাকে দাদা সাহেব চাঁদ নাম উপাধি দিয়েছে। যাকে তিনি নিজের সন্তানের মতো দেখে, তার কথার অমান্য কে হবে?
তাই বেশি কথা অভীকে বলতে হয় না। তার আগেই সবাই বুঝে যায়। কিন্তু আনন্দীর বিষয়টি এখন ও ধোয়াশার মতো সকলের কাছে!
আনন্দী—এই নামটাই যেন অভীর ভিতরে অদ্ভুত এক ঝড় তোলে। যে মেয়েটাকে সে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে, তাকেই আবার এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়ালও হতে দেয় না। যেন ঘৃণা আর আসক্তির মাঝখানে কোথাও আটকে আছে অভী। উন্মাদ হয়ে গেছে সে। হয়তো ঘৃণায়, নয়তো অন্য কিছুতে।
কিন্তু ২৫ বছর বয়সী অভীর এই উন্মাদনা ১৭ বছর বয়সী আনন্দীর জীবটা বিষাদময় করে দিয়েছে।
বর্তমান এইচএসসি পরীক্ষার্থী আনন্দী। জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টায় তার হাতে থাকার কথা ছিল বই, স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। কিন্তু তার গলায় কাঁটার মতো আটকে আছে এক নাম—অভী। ডা. অভী ফারসি। এখন অবশ্য সে ডাক্তার কম বখাটে, উশৃংখল চাঁদ ভাই হিসেবেই পরিচিত সকলের কাছে।
আনন্দীর জীবনে অভী নামক ঝড় আসে যখন সে ক্লাস টেনে পড়ত। তখন থেকে প্রতিটা দিন, প্রতিটা রাত
ভয়ের মধ্যে কাটে আনন্দীর। অবশ্য সবই তার কৃতকর্মের ফল। না-হলে হবু ডা. অভী ফারসি এখন পুরান ঢাকার গড ফাদারের ছায়ায় আসলো কী করে ? আনন্দীর জীবনটাই যেন অভীর খাঁচায় বন্দী। আনন্দী জানে একদিন তাকে মর’তে হবে। অভী চেষ্টা ও করেছে কয়েকবার। কিন্তু হয়তো শেষ মুহুর্তে দয়া হয়েছিলো তার। তাই আর মারেনি তাকে।
গ্যারাজ থেকে অভীর কাছে থ্রেট শুনে সারা রাস্তা চুপচাপ হয়ে বাড়ি যেতে থাকে আনন্দী।যদি ও এটা প্রথমবার নয়। হিসাব করলে হাজার বার হবে। তবু ও সে বার বার পরাজিত হয় নিজের আবেগের কাছে।
বাড়ি এসে কারো সাথে কথা না বলে সোজা নিজের রুমে ঢুকে দরজা হালকা বন্ধ করে দেয় আনন্দী। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই নিজেকে একজন দূর্বল মেয়ে ছাড়া কিছুই মনে হয় না তার।
বোর্ড পরীক্ষার চাপ একদিকে, আর অভীর অমানুষিক অত্যাচার অন্যদিকে—সব মিলিয়ে তার জীবনটা যেন ধীরে ধীরে নরকে পরিণত হচ্ছে।
ঠিক তখনই মাথায় কারও হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে ওঠে সে।মুখ তুলে তাকাতেই দেখে তার মা-কে।
মা-কে দেখার সাথে সাথে নিজের মুখের এক্সপ্রেশন পরিবর্তন করে ফেলে আনন্দী। আর যায় হোক এতো ঝামেলার মাঝে পরিবারকে আর বাড়তি ঝামেলা দেওয়া যাবে না।
আনন্দীর মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন,
__পড়াশোনার চাপ কী একটু বেশিই মা?”
মায়ের কথা শুনে হালকা ঘাড় নাড়ে আনন্দী। তারপর করুনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
__আমরা এখান থেকে কবে যাবো মা?”
আনন্দীর চোখ চিকচিক করতে দেখে আয়না শেখ বলেন,
__অভী কী তোকে আবার ও ভয় দেখিয়েছে?”
__শুধু ভয় নয় মা। ওই বখাটে টা থ্রেট ও দিয়েছে। চলো না মা আমরা থানায় যায়?”
আনন্দীর কথা শুনে মায়ের মুখটা শক্ত হয়ে যায়, কিন্তু চোখে ভেসে ওঠে অসহায়তা। তিনি জানেন, রাগ করে লাভ নেই কারণ যার বিরুদ্ধে রাগ, তার হাত অনেক লম্বা। পুশিল কেস থেকে শুরু করে কত কিছু করা হয়েছে। কিন্তু দিন শেষে এক ঘন্টার বেশি ও অভী জেলে থাকেনি। ছাড়া পেয়েই দ্বিগুন অত্যাচার করতো আনন্দী এবং তাদের উপরে।
মেয়ের এমন অবস্থা প্রায় প্রতিনিয়তই দেখেন মিসেস আয়না শেখ। চুপ করে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে, ক্লান্ত গলায় বলেন,
__যাওয়ার তো কম চেষ্টা করলাম না আন্দু… কিন্তু পারলাম কই? তোর বাবাকে এমনভাবে ফাঁসিয়ে রেখেছে—সে না পারছে নিঃশ্বাস নিতে, আর না পারছে ফেলতে…”
কথাগুলো যেন ছুরির মতো বিঁধে যায় আনন্দীর বুকে।সে স্তব্ধ হয়ে যায়। নিজের করা একটুখানি ভুল—আজ পুরো পরিবারকে এমন এক অন্ধকারে ফেলে দিয়েছে, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই।
__বাবা কোথায় মা?”
__ফ্যাক্টরিতে। তুই ফ্রেশ হয়ে আয়… আমি আসছি।”
__হুম…”
মিসেস আয়না শেখ চলে যেতেই ঘরটা আবার নিঃশব্দ হয়ে যায়। পুরান ঢাকার গড ফাদার । এক কালের হবু ডাক্তার। তার যত রাগ, ঘৃণা আনন্দীকে জুড়ে। পুরো জীবনটাই যেন বিষাদময়।
‘দুই_দিন_পর’
সেদিনের পর টানা দু’দিন আনন্দী ঘর থেকে বের হয়নি। পর্দা টানা রুম, বিছানার পাশে বই খোলা—কিন্তু পড়ায় মন বসে না। মাঝে মাঝে জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকায়, মনে হয় কেউ না কেউ তাকে দেখছে।কিন্তু বরাবরই রাস্তা ফাঁকা। তবু ও মনের ভয় কমে না।অভীর ভয় জেঁকে বসেছে তার মন জুড়ে।
পুরান ঢাকার একটু বাইরে—অভীর বাড়ি
একটা নির্জন এলাকা। চারপাশে অল্প কিছু বাড়ি, তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো এক দোতলা বাড়ি। দেওয়ালের রং উঠে যাওয়া , বারান্দার গ্রিলগুলোতে মরিচা পড়া। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় বহুদিন পরিত্যক্ত।কিন্তু ভেতরে চলছে অন্য এক জগত।
নিচতলায় থাকে অভীর লোকজন—কেউ কার্ড খেলে, কেউ মোবাইলে ব্যস্ত থাকে, কেউ অস্ত্র পরিষ্কার করে, তো কেউ বা মাঝে মাঝে গান গাইতে থাকে। আর দোতলায় থাকে অভী—একাই।তার রুমগুলো বড়, ফাঁকা আর ঠান্ডা। দেয়ালে তেমন কোনো সাজসজ্জা নেই—শুধু ঘর সাজানোর জন্য আধুনিক কিছু বস্তু আর কোণায় কিছু ফাইলের স্তূপ। যেন এই বাড়িটাও তার মালিকের মতো—নিঃসঙ্গ, কিন্তু ভেতরে ভয়ংকর।
বিকেল বেলা চুপচাপ বিছানায় আধশোয়া হয়ে থাকে অভী। হাতে মোবাইল, চোখ বন্ধ। মাঝে মাঝে চোখে খুলে কিছু একটা দেখতে থাকে সে।
ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়। অভীর খাস চামচা শফিক বাইরে দাড়িয়ে তাকে ডাকে।
— ভাই…”
অভী চোখ না খুলেই বলে,
— “কি?”
— আনন্দী ভাবি!’
,__হুম?’
__সরি, সরি! আপনার জাত শত্রু বান্ধবীদের সাথে দিয়া বাড়ি গেছে। লগে পোলা ও আছে কয়ডা।”
এক মুহূর্তেই তঅভীর চোখ খুলে যায়।সে হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে কয়েকটা ছবি—কাশফুলের মাঝে দাঁড়িয়ে আনন্দী,পাতলা মেরুন শাড়ি পরে, হালকা হাসছে। প্রতিটা ছবি জুম করে দেখতে থাকে অভী। আনন্দীর বেশ কিছু প্রাইভেট পার্ট ভিজ্যিবেল। যেগুলো জুম করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে অভী।
ছবিগুলো দেখতে দেখতে অভীর চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। ড্রয়ার থেকে রিভলবার নিয়ে লোড করতে করতে বলে, ‘ গাড়ি বাইর কর। একটু কাশফুল দেখে আসি!’
দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে সে। তার লোকজন কেউ কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পায় না শুধু পথ ছেড়ে দেয়। এবং অভীর পিছু পিছু যেতে থাকে।
বাইরে তখন বিকেলের আলো নরম হয়ে এসেছে। নির্জন রাস্তার পাশে তার গাড়িটা দাঁড়িয়ে।ড্রাইভারের সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দেয় অভী।গাড়ি ধীরে ধীরে এগোতে থাকে—আর তার চোখে তখন শুধু একটাই ছবি ভাসছে—কাশফুলের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক মেয়ের হাসি।
আর সেই হাসিটাই তাকে পাগলের মতো টেনে নিয়ে যাচ্ছে দিয়া বাড়ির দিকে।
‘দিয়া_বাড়ি’
সাদা কাশফুলে ভরা বিস্তীর্ণ মাঠ, হালকা বাতাসে দুলছে তারা। মনে হচ্ছে কেউ যেন নিঃশব্দে হাজারটা সাদা চিঠি লিখে রেখে গেছে প্রকৃতির বুকে। আকাশটা নীল, অস্বাভাবিক শান্ত। এই শান্তির মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে আনন্দী—একটা মেরুন শাড়িতে মোড়ানো, চুলগুলো খোলা, বাতাসে উড়ছে এলোমেলোভাবে।
তার পাশে বন্ধুরা হাসছে, গল্প করছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে। আনন্দীও মাঝে মাঝে হাসছে কিন্তু সেই হাসিতে প্রাণ নেই। ঠোঁটের কোণে হাসি থাকলেও চোখদুটো বারবার চারপাশে তাকাচ্ছে। যেন অজানা কোনো ভয় তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
বন্ধুদের একজন তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় কাশফুলের ভেতরে।
— এইদিকে আয় না, ছবি তুলবো!”
আনন্দী জোর করে হাসে। কাশফুলের মাঝে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্য গভীর শ্বাস নেয় সে। মনে হয়, এই জায়গাটাই হয়তো তার জন্য একটু মুক্তির স্বাদ নিয়ে এসেছে… এমন একটা জায়গা, যেখানে অভী নেই, ভয় নেই, শ্বাসরুদ্ধ করা সেই অন্ধকার নেই।
কিন্তু আনন্দীর সুখ গুলো যেন তার মতোই মন মরা। বেশি ক্ষণ স্থায়ী হয়না। আনন্দীর থেকে একটু দূরে একটা কালো গাড়ি থামে। হুট করে গাড়ি থামাট শব্দ কানে ভেসে আসতেই আনন্দীর বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে। তার শরীর যেন আগেই চিনে নেয় সেই উপস্থিতি। ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকায় সে।
গাড়ির দরজা খুলে নামে অভী।সাদা কাশফুলের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা কালো ছায়ার মতো লাগে তাকে। তার চোখদুটো স্থির—শীতল, হিসেবি। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক বাঁকা হাসি। হাতে গুটানো শার্টের হাতা, আর সেই শক্ত চোয়াল—সব মিলিয়ে সে যেন ঝড়ের আগের নীরবতা।
বন্ধুরা প্রথমে কিছু বুঝতে পারে না। তারা এখনো হাসছে, ছবি তুলছে। কিন্তু আনন্দীর পায়ের নিচের মাটি যেন সরে যায়।অভী ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকে তাদের দিকে। প্রতিটা পদক্ষেপে কাশফুলগুলো দুলে উঠে, যেন তার আগমনের খবর ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। অভী এসে একদম আনন্দীর সামনে দাড়ায়।
— বাহ কাশফুল দেখতে আসছোস? আমার গ্যারাজে না যাইয়া?”
বন্ধুরা চুপ হয়ে যায়। কেউ কেউ একে অপরের দিকে তাকায়। পরিস্থিতির অস্বাভাবিকতা বুঝতে সময় লাগে না।অভীর চোখ কিন্তু শুধু একজনের উপরই স্থির
আনন্দী।
— আবার শাড়ি ও পড়ছেস?”
একটু এগিয়ে একদম কাছাকাছি দাড়ায় আনন্দী অভী।
পা থেকে মাথা অব্দি পরথ করতে থাকে আনন্দীকে।
আনন্দীর গলা শুকিয়ে আসে। শব্দ বের হয় না হাতদুটো কাঁপতে থাকে হালকা করে।চারপাশের সুন্দর দৃশ্যটা মুহূর্তেই বদলে যায়। কাশফুলের সাদা রং আর শান্ত বাতাস—সবকিছু এখন ভয়ংকর নীরবতায় ঢেকে গেছে।
অভী আরও কাছে আসে। এতটাই কাছে যে আনন্দী তার নিঃশ্বাস অনুভব করতে পারে।
— দুই দিনের মধ্যে তোর শরীরে এমন কোন পরিবর্তন আসছে যার জন্য বেডা মানুষের সাথে ঘেঁষাঘেষি করতে হয়তাছে? কাছে আয় একটু দেখি তো কোন পরিবর্তন হইছে!”
অভী আনন্দীর হাত ধরে টানতে টানতে তাকে গাড়ির কাছে নিয়ে যেতে থাকে । আনন্দী শত চেষ্টা করে ও নিজের হাত ছাড়াতে পারে না।
উন্মাদনা পর্ব ১
__বখাটে আমার হাত ছাড়! ”
মাঝপথে থেমে যায় অভী।তারপর পকেট থেকে আবার ও ফোন বের করে কিছু একটা দেখায় তাকে। তারপর আপনা আপনিই ঠান্ডা হয়ে যায় আনন্দী। অভী আবার ও খুব জোড়ে হাত ধরে টান দিয়ে নিয়ে যেতে থাকে আনন্দীকে।
__তোর শরীরে কোন পরিবর্তন হইছে এটাই একটু দেখতে হইবো আমার।’
