Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ১

সাঁঝের মায়া পর্ব ১

সাঁঝের মায়া পর্ব ১
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

-ইশান ভাই আপনি আমাকে কখনো ভালোবাসেননি তাইনা?
– আমার জীবনে রুষা ছাড়া আর কোনো মেয়ে নেই,সরি তিতির।
– তাহলে আমাদের বিয়েটা…
-বাধ্য হয়ে।
-এ জীবন আপনার নামে করে দিলাম।আর আপনি এতো সহজে বলে দিলেন ভালোবাসা নেই?কিচ্ছু নেই?
-ডিভোর্স চাই আমার তিতির।মুক্তি দে আমাকে।আমি রুষা কে ছাড়া অন্য কাউকে বউ হিসেবে মানতে পারবো না।
-বিয়ের প্রথম রাতে বলছেন ডিভোর্স চান!এতোটা স্বার্থপর কিভাবে হতে পারলেন।আমার জীবনটা কেনো নষ্ট করলেন?বিয়ের আগে একবার বলতে পারতেন অন্য কাউকে ভালোবাসেন।তাহলে আপনি আমি আজ এখানে থাকতাম না।
-ক্ষমা করিস আমাকে।আমি তোকে কখনো ভালোবাসতে পারবো না।
-বেশ!আপনাকে ভালোবেসে যখন কলঙ্কই লেগে গেলো,তবে সেই কলঙ্কই মঞ্জুর। ভালোবাসা ভালো থাকুক!দেবো আপনাকে মুক্তি।

-মা?
-বাবা আমার!কাল আসছিস তো তুই?
-হ্যা মা আমি কাল আসছি বাড়িতে।মা.?
-বল বাবা।
-তোমাকে আমার কিছু কথা বলার আছে।
-কি বলবি বাবা বল।
-আমি যদি বলি আমি একজন কে ভালোবাসি,?
-বিয়েটা কবে করতে চাস সেটা বল বাবা।এটার থেকে খুশির কথা আমার জীবনে আর হয়না,তুই শুধু বল…
-মা,মেয়েটা খুব ভালো জানোতো,খুব মিষ্টি, তোমার খুব পছন্দ হবে,ইনফ্যাক্ট সবার পছন্দ হবে দেখো।
-আমি কিচ্ছু জানতে চাইনা বাবা।তুই যাকে ভালোবাসিস,সেখানে আমার কোনো বাধা নেই,থাকবে না কখনো।তুই বৌমা কে যেদিন নিয়ে আসতে চাস নিয়ে আয়।
-মা আমি কালকে ওকে নিয়ে আসবো?
-আয় বাবা আয়।আমি সবাইকে জানাচ্ছি,সব ব্যবস্থা করবো…
-লাভ ইউ মা…

চন্দ্রকাননে আজকে খুশির ধুম পরে গেছে যেনো।বাড়ির বাচ্চাকাচ্চা থেকে শুরু করে বয়যেষ্ঠ সবাই হৈ চৈ দৌড়ের ওপর যেনো!বাড়ির বড় ছেলে বাড়ি আসছে। নতুন চাকরিতে জয়েনের পর ৩ বছর বাসায় একবারের জন্যও আসতে পারেনি। মা, চাচিরা চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করেছে তাদের বাপটার ফিরে আসার…সেই বাপ তাদের ফিরছে,সাথে নাকি আবার হবু বউ নিয়ে।এ বাড়িতে আজকে ঈদ লাগবে না তো কবে লাগবে?

বাড়ির নাম চন্দ্রকানন।
আরশেদ দেওয়ান সেই ১৯৩০ এ বাড়িটা করেন।গ্রাম থেকে এসে ছোটখাটো বিজনেস শুরু করে।অল্প সময়ের মধ্যে দারুন উন্নতি করেন।ধীরে ধীরে তাদের টেক্সটটাইল কোম্পানী বর্তমানে পুরো শহরের টপ কোম্পানির একটি।তিনি গত হয়েছেন আজ ১৭ বছর হলো।তার সহধর্মিণী চন্দ্রা দেওয়ান এখনো বেচে আছে।বয়স ৮৬…তার নামের সাথে মিল রেখেই বাড়ির টার নাম চন্দ্রকানন।আরশেদ সাহেব এর তিন ছেলে,এক মেয়ে।তার বড় ছেলে রাইসুল দেওয়ান,মেজো ছেলে রাসেদ দেওয়ান আর ছোট ছেলে রাহিয়ান দেওয়ান।
আরশাদ দেওয়ানের একমাত্র মেয়ে তনয়া দেওয়ান।আজ থেকে বছর ১৮ আগে রোড অ্যাক্সিডেন্টে স্বামীসমেত মারা যান…একমাত্র আদরের মেয়ের আর জামাই এর মৃত্যুর পর বৃদ্ধ শোক সামলাতে পারেননি।পরের বছরই হার্ট অ্যাটাকে মারা যান তিনি…
সেই থেকে পারিবারিক ব্যবসা আরশেদ সাহেবের দু ছেলে সামলাচ্ছে। রাইসুল দেওয়ান এর দু সন্তান। রাইসুল দেওয়ান বড় ছেলে ইশান আরশাদ। এ বাড়ির সবার নয়নের মণি,বিশেষত মা, চাচিদের।সেই আজকে মূলত তার হবু বউ সমেত বাড়িতে আসবে।সবাই তার আসার আনন্দে আয়োজন এ ব্যাস্ত…
রাইসুল দেওয়ান এর কন্যা নিশিতা সবে ভার্সিটি থেকে ফিরে এতো আয়োজন এ অবাক হয়ে গেলো…
মেজো চাচি রিক্তা দেওয়ান কে দেখে জিজ্ঞেস করলো

-মেজো মা!কি হচ্ছে বলোতো?
-ও মা। জানিস না।
-কি জানবো
-তোর ভাবি আসছে।
-ভাবি কে!
রিক্তা দেওয়ান বুঝতে পারে এ মেয়ে কিছুই জানেনা।বড় জা সুমি দেওয়ান কে দেখে ডেকে বলে…
-আপা,নিশি কে জানাও নি?
সুমি দেওয়ান কুশনের কাপড় নিয়ে সিড়ি দিয়ে নামছিলেন।না তাকিয়েই জবাব দিলেন।
-ইশান তো অনেক রাতে জানিয়েছে,সকালে নিশি তো ভোরে বেরিয়ে গেছে,ওকে জানানোর সময় পাইনি।
নিশি স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে আছে।বিষয়টা বুঝতে পেরে খুশিতে কথা বলতে পারছে না!
-মাআআ ভাইয়া বউ নিয়ে আসছে?
– হ্যা রে।তোর হবু ভাবি নাকি পরীর মতো সুন্দর মাশাআল্লাহ ..
-নূরিরা জানে মা?
মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে জবাব দেয়।

-সবাই জানে তুই বাদে।ওরা দেখ ওপরে সব গোছগাছ করছে…
নিশি আর এক সেকেন্ড অপেক্ষা করে না।দৌড়াতে দৌড়াতে ওপরে উঠে নূরির নাম ধরে ডাকতে ডাকতে।
নূরি এ বাড়ির মেজো কর্তার বড় মেয়ে।নিশির থেকে বছর দুইয়ের ছোট।অনার্স ফইনাল ইয়ারে পড়াশোনা করে।দু বোন বন্ধুই বলা যায়…ওপরে বাড়ির সব বাচ্চা রা এসে ভিড় জমিয়েছে নূরির ঘরে।নূরির জমজ ভাই নয়ন,তাদের ছোট চাচার দু মেয়ে, ছেলে সাবই।তারা তাদের ভাবিকে কিভাবে আমন্ত্রণ জানাবে সেই প্ল্যানে ব্যাস্ত।
নিশিকে দেখেই সবাই চিৎকার করে জানাতে লাগলো। নিশি একপ্রকার উঠে এসে জড়িয়ে ধরে বসলো নূরিকে…
-অবশেষে বাড়িতে একটা বিয়ে হবে। বল নূরি!তাও আবার ভাইয়ার।বিশ্বাস করতে পারছিনা…
নূরিও সাথে সাথে লাফিয়ে উঠলো

-বিশ্বাস কর আপু বড় মা বলার পর থেকেই আমি তোর আসার অপেক্ষায় ছিলাম…
-ইশশশ তিতির টা পরীক্ষা, ও মিস করবে সবটা…
বাড়ির ছেলেমেয়েদের উচ্চকন্ঠের উচ্ছাস ওপর থেকে ভেসে আসছে।বাড়ির গিন্নি রা শুনলে পেলো সেই উচ্ছাস।সত্যিই তো।এ বাড়িতে বহু বছর কোনো উৎসব সেভাবে পালন করা হয়না…
-বড় আপা মা কখন ফিরছেন বলোতো?তার আদরের বড় নাতি, নাতবউ নিয়ে আসবে।অথচ তারই হদিস নেই।
ছোট জা এর কথায় সাথে সাথে উঠে গিয়ে ফোন লাগালো কাউকে।মিনিট খানেক পর ফিরে এসে খবর দিলেন মেজো কর্তা রাসেদ দেওয়ান আনতে গেছেন তাদের মা কে।মিনিট দশেক লাগবে বাড়িতে ঢুকতে।চন্দ্রা দেওয়ান মাসে একবার তাদের অনাথ আশ্রম,বৃদ্ধাশ্রম গুলোতে সময় কাটাতে কয়েকদিন এর জন্য যান…সেখান থেকেই আসার কথা আজকে।
মিনিট দশেক বাদে গাড়ির শব্দে গিন্নিরা এগিয়ে গেলো রাস্তায়।শাশুড়ী কে ধরে নিয়ে এসে বসালেন ড্রয়িং রুমে।
-মা নাতি তো নাতবউ নিয়ে আসছে।
ছেলের বউদের উচ্ছাসে বোধহয় একটু বিরক্তই হলো বৃদ্ধা।কিছু বললেন না।একা লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাড়ালেন।
-আমার ঘরে গরম পানি দিয়ে যাও বড় বউ।আর আমি একটু শুবো।কেউ ডাকবে না এখন
শাশুড়ী এতে গম্ভীর রুপ তারা দেখে অভ্যস্ত নন কখনো।কি হয়েছে বুঝতে পারলেন না কেউ।।

-বাবা আলো জোলে চালাও। ওই গালিটাকে পিছোনে ফেববা্…
আড়াই বছরের মেয়ের আধো আধো কন্ঠে বেশ খুশি হন হেলাল সাহেব।মেয়েটা মাশাল্লাহ পরী তার।আল্লাহ তাকে একটা পরী দিয়েছে।পাশে সহধর্মিণী হাসিমুখে তার পরীটাকে কোলে করে বসে আছে।
-বাবা জোলে বললাম তো…
মেয়েটা তার চিৎকার করে আবদার করে।ঠোট উল্টায় অভিমানে বাবা কেনো তার সামনের গাড়িটা কে হারাতে পারছে না।হেলাল সাহেব তবুও জোরে চালান না।বরং গাড়ি কিনারা ঘেষে চালাতে থাকেন।
হঠাৎ….

-হেলাল সামনেএএএ…
স্ত্রীর কথা শেষ হয়না।বলার প্রয়োজন ও ছিলো না।হেলাল সাহেব নিজেও দেখেছেন। স্ব বেগে একটা ট্রাক ধেয়ে আসছে তাদের দিকে।গাড়ির চালক নিশ্চিত নেশা করেছে।হেলাল সাহেব নিজের গাড়ির সরিয়ে আনতে পারে না।বিকট আওয়াজে ধমকে যায় আশপাশ…
হেলাল সাহেবের চোখ বুঝে আসছে।সামনে এক হাত দূরে নিথর হয়ে পরে আছে তার প্রানের সহধর্মিণী, ছুঁতে পারছেন হাতখানা।কোনো শব্দ করছেন না কেনো!
তার পরীটা?পরীটা কোথায়?আলতো হাতে মিনমিন করে ডাকে।
-ত…ত…তনয়া…
বাকি আর কিছু বলতে পারেন না তিনি।চোখ বোঝেন হেলাল সাহেব।

-বাবা…আ…
বিছানায় চমকে উঠে বসলো তিতির।ঘেমে নেয়ে একাকার মেয়েটা।উঠে বাসতেই আশপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারলো হোস্টেল রুমে আছে সে।আবার সেই দুঃস্বপ্নে ঘুম ভাঙ্গলো তার।চোখ মুখ মুছলো,বুঝলো ঘুমের মধ্যেও কাঁদছিলো।
বিছানা ছেড়ে উঠে চোখেমুখে পানি দিয়ে আয়নার সমানে দাড়ায়।চোখমুখ ফুলে আছে।এই বিশ বছরের জীবনে এই একই স্বপ্ন সে বহু বার দেখেছে।সামনে খুব তীব্র আলো,সেখানে হারিয়ে যাচ্ছে তার বাবা মা…প্রতিবারই এই বাবা বলে চিৎকার করতে করতে ঘুম ভাঙ্গে তার।
তিতির এর চোখে পানি টলমল করতে থাকে।বাবা মার চেহারা তার মনে পরেনা,ছবি দেখে যতটুকু মনে গেঁথেছে আরকি…
চোখ মুছে পড়ার টেবিল এ বসে।বাড়ির জন্য মন খারাপ করছে,বাড়িতে নাকি কিসের অনুষ্ঠান।মামারা,মামনী রা,ভাই বোন সবাই ফোনের ওপর ফোন।সেও তো যেতে চায়,কিন্তু পরীক্ষা টা এমন সময়ে!কিছুতেই বাড়ি যেতে পারছে না সে।

বই খুলে পড়ায় মন দেওয়ার চেষ্টা করে,নাহ বসছে না।বই বন্ধ করে হোস্টেলের ছাঁদে চলে আসে। আজ মনটা দারুণ খারাপ থাকবে সারাটাদিন। মিনুটাও বাসায় গেছে ছুটিতে।ও থাকলে তাও এতো খারাপ লাগতেই দিতো না।
আলতো হাতে চুলগুলে খোঁপা করে নেয়,রেলিং এ হেলান দিয়ে দাড়ায়।ঠান্ডা বাতাস বইছে,কোমড় ছোঁয়া সিল্কি চুল খুলে পিঠ ছড়িয়ে যায়…এক হাতে কানে গুজে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
মেয়েটা কি জানে তাকে আজ কতটা সিন্ধ লাগছে?সে কি জানে তার ওই এলোচুল গুলো যখন দমকা বাতাসে ওই চোখমুখ ছেয়ে যায় তখন একটু দূরেই একটা মানুষ এর ওই চুল গুলো কে কি পরিমাণ হিংসে করে।
সে যখন চুলগুলো আলতো হাতে কানে গুজে দেয় ওই পাশের মানুষ টার কি নিদারুণ ইচ্ছে করে মেয়েটাকে ছুঁয়ে দিতে।এইযে সে নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে নয়তো কেঁদেকেটে ছাদে এসেছে।
ফর্শা সাদা ফুলোফুলো চোখমুখ নিয়ে গাল ফুলিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে,অথচ আরেকটা মানুষ এর হৃদয় থমকে গেছে।

এইতো মেয়েটার নাকের পাটা ফুলোচ্ছে,ঠোট তিরতির করে কাপছে, কেঁদে ফেলতে চাচ্ছে প্রায়।
মানুষ টার তো ইচ্ছে করছে আলতো হাতে চোখটা মুছিয়ে বুকের মধ্যে বন্দি করতে মেয়েটাকে…
তিতির পিছন পাশ ফেরার আগেই মানুষ টা আড়াল হয়…
তিতির ওড়নাটা ভালোভাবে গায়ে জড়িয়ে নেমে আসে ছাদ থেকে…

সাঁঝের মায়া পর্ব ২