সাঁঝের মায়া পর্ব ২৯ (২)
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
ইফতার পার্টির খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হয়েছে বেশ আগে।ঘড়ির কাটা রাত আটটা ছুঁই ছুঁই করছে প্রায়।তিতির, তমা দুজনেই একপ্রকার ছটফট করছে এখান থেকে যাওয়ার জন্য। তবে যেতে পারছে না।আটকে আছে দুজন।তমা এখানকার সেরা শিক্ষার্থী ছিলো।তিতির এই এলাকায় পড়াশোনা না করলেও দেওয়ান বাড়ির মেয়ে আর নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য গ্রামময় খ্যাতি তার।শিক্ষক রা নানা ধরনের আলাপ চালাচ্ছে তাদের সাথে। সে পর্ব শেষ হতেই হাফ ছাড়ারও সময় পেলো না।তমার পুরাতন বন্ধু বান্ধব এসে ঘিরে ধরলো তাদের।বলাবাহুল্য সবার আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দু তে তিতির।তমার মুখে তারা তিতিরের প্রচুর গল্প শুনতো,শিক্ষক দের মুখেও।সবাই একসময় মুখিয়ে থাকতো মেয়েটাকে দেখতে।গুনের সাথে সাথে রুপের প্রশংসাও অহরহ শুনতো।অবশ্য শুধু তিতির নয়।দেওয়ান বাড়ির সব ছেলেমেয়েরই রুপ -গুনে ভদ্রতার চর্চা পুরো এলাকায় সবসময়ই।
তিতির ছটফট করে তাকাচ্ছে তমার দিকে।বাড়িতে বারবার বলে এসেছে আটটার মধ্যে ফিরবে।যদিও বাড়িতে এখনই মামারা বা ঈশান কেউ ফিরবে না তবুও অশান্তি লাগছে তার।
দূর থেকে বুকে আড়াআড়ি হাত গুজে নিষ্পলক তিতিরকে দেখছেন একজন।মুগ্ধতায় বিস্মিত হচ্ছে তিনি।চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেছেন।তাহমিদ কায়েশ।কলেজের নতুন প্রফেসর তিনি।বাংলার টিচার হিসেবে এসেছেন।সবে মাসখানেক হলো জয়েন করছে সে।এবছরই বিসিএস এ টিকে পোস্টিং হয়েছে এখানে।
পাশে কারোর গলার শব্দে দৃষ্টি সরালেন তিনি।মিস রুবি এসে দাড়িয়েছেন পাশে।মিস রুবিও এখানকার বাংলার চিটার।একই ডিপার্টমেন্ট। বয়সে খানিকটা বড়ই হবে।তাহমিদ কে যথেষ্ট স্নেহ করেন তিনি।রোমান্টিক দিক থেকে কি না বোঝা যায়না।তবে ইমোশনাল দিক থেকে তো অবশ্যই।মিস রুবির কেউ একজন ক্যান্সারে মারা গিয়েছে তিন বছর আগে।সেই মৃত ব্যাক্তির চেহারার সাথে নাকি দারুণ মিল তাহমিদ এর।যাই হোক।তাহমিদ এর দৃষ্টি অনুসরন করতেই মৃদু হাসলেন তিনি।নিচু গলায় বললেন,
____”কাকে দেখছেন?”
তাহমিদ কায়েশ চাইলেই এড়িয়ে যেতে পারতেন বিষয়টা।গেলেন না।দৃষ্টি মিস রুবির দিকে ফিরিয়ে বললেন,
____”মেয়েটা আপনাদের স্টুডেন্ট ছিলো?”
____”তিতিরের কথা বলছেন তো?”
____”নাম জানা নেই।”
মিস রুবি হাসলেন খানিকটা।বুকের ভিতররা হু হু করে উঠলো।তবে সাথে সাথেই জবাবও দিলেন।
____”আপনি যার দিকে তাকিয়ে তার নাম তিতির।ভালো নাম জানা নেই।এখানকার স্টুডেন্ট ছিলো না।ইন ফ্যাক্ট এ এলাকাতেই ওর পড়াশোনা নয়।এটা ওর মামা বাড়ির এলাকা।ও পড়াশোনা করতো ওর বাবার বাড়ির এলাকাতে। দিনাজপুরএ।বোর্ড স্ট্যান্ট করা স্টুডেন্ট। দেওয়ান দের চেনেন তো নাকি?”
মাথা ঝাকায় তাহমিদ।দেওয়ান দের এলাকায় কে না চেনে।মিস রুবি হাসলেন,
____”ওই দেওয়ান বাড়ির মেয়ে।মামা বাড়ি যদিও এটা।তবে এখানেই ওর বড় হওয়া।”
তাহমিদ অমায়িক হাসলো রুবির দিকে তাকিয়ে।গলা খাদে নামিয়ে বললো,
____”আপনি কিন্তু জিনিয়াস।এলাকার সবার খবর থাকে আপনার কাছে।”
মিস রুবি মাথা নাড়লেন।বিজ্ঞের মতে বললো,
____”সবার নয়।অবশ্যই যাদের রাখার মতো।ওইযে তিতিরের পাশে মেয়েটাকে দেখছেন।সেও দেওয়ান বাড়ির।তিতিরের কাজিন।ও আমাদের স্টুডেন্ট। একই রকম জিনিয়াস।তাছাড়া ভালো স্টুডেন্ট দের সুনাম শিক্ষক দের কাছে থাকেই।”
তাহমিদ নিঃশব্দ হাসে।তাকায় আবার তিতিরের দিকে।আয়োজন খোলা মাঠে করা হয়েছে।আশেপাশে প্রচুর লাইটিং করা।আকাশে জ্যোৎস্নার মেলা বসেছে আজকে।এমন খোলা আকাশের নিচে রাত্রির বেলা মেয়েটাকে অন্য জগতের মেয়ে বলে মনে হচ্ছে।
মিস রুবি খানিকটা ঘেষে আসলো।বাঁকা গলায় বললো,
____”মেয়েটাকে নিয়ে কিছু ভাবছেন নাকি?”
তাহমিদ ঘাড় চুলকালো মাতা ঝুকিয়ে।লাজুক হেসে বললো,
____”ভাবার মতো মেয়ে নয়কি?”
মিস রুবির মনটা খচখচ করে ওঠে।তবে হাস্যজ্জল গলায় বলে,
____”আপনিও পাত্র হিসেবে লেটার মার্ক।ট্রাই করে দেখবেন।বয়সও কম হলো না ঊনত্রিশ চলছে।?”
তাহমিদের সুদর্শন মুখখানা হাসি হাসি। দৃষ্টি তিতিরের দিকে।তিতির গল্প গুজবে ব্যাস্ত বেশ কয়েকজনের সাথে। তাহমিদ মিস রুবি কে ইশারা করে সেখান থেকে খানিক দূরে গিয়ে দাড়াতে।দুজন এসে দাড়ায় একটু নিরব জায়গায়।ওদিকে ছেলেমেয়েদের প্রচুর শব্দ আসছিলো।নিজের শার্ট টা টেনে সোজা করলেন।মাথায় হাত চালাতে চালতে বললেন,
____”চাকরি টা আবার থাকবে তো?”
রুবি হেসে ফেলে তাহমিদ এর কথা ভঙ্গিতে।
___”আলবাত থাকবে।দাড়ান ডাকি ওদের দু বোনকে।”
তাহমিদ ব্যাস্ত হয়।দু হাত তুলে নিষেধ করে ডাকতে।রুবি শুনলো না।ব্যাস্ত গলায় বললো,
____”নরমাল কনভারসেশন। ওয়েট।”
অদূরে দণ্ডায়মান এক ছাত্রী কে দিয়ে ডাক দেওয়া হলো তিতির, তমাকে। ম্যাডামের ডাকে প্রায় সাথে সাথেই তিতিরের হাত ধরে ছুটে এলো তমা।সালাম জানালো দুজনেই।মিস রুবি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন তাহমিদ কায়েশ কে।ওরা দুজনও একই বিনয়ের সাথে সালাম দিলো।
____”তুমি তো তিতির না?”
____”জ্বী মিস।”
____”তোমাদের ভাই বোনদের পড়াশোনার ট্যালেন্টের বর্ণান আমরা সবসময় দেই নতুন স্টুডেন্ট দের।”
____”থ্যাংক ইউ মিস।”
____”আছো তো কয়েকদিন এখানে?”
____”আ.. হ্যা।ঈদের পর সাতদিন সর্বোচ্চ। “
মিস রুবি আড়চোখে তাকালো একবার তাহমিদ এর দিকে।তাহমিদ কিছু বললো না।
____”আছো তো কিছুক্ষণ নাকি?”
তমা মাথা নাড়লো।বিনয়ের সাথে বললো,
____”এখনি বের হবো।এর বেশি দেরি হলে বাসায় রাগারাগি করবে।”
মিস রুবি ব্যাস্ত হলেন।
____”বেশ তো।যাও।তাহমিদ সাহেব এগিয়ে দিয়ে আসুক।”
____”না না মিস।আমরা যেতে পারবো।দশ মিনিটই তো।”
তাহমিদ এগিয়ে এলো খানিকটা।ভদ্র গলায় বললো,
____”ইট’স ওকে।চলো।অন্তত রিকশায় তুলে দিয়ে আসি।”
তমা, তিতির মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো।দুজনের মনের কথা পড়ে ফেললো বোধহয় দুজনেই।শতশত স্টুডেন্ট আজকে এখানে।সবাইকে কি তাহমিদ স্যার রিকশায় তুলে দিয়ে আসবেন।তবে আলাপ আলোচনা বাড়িতে গিয়ে করার জন্য তুলে রেখে রুবির থেকে বিদায় নিয়ে হাটা ধরলো তিনজন। তাহমিদ পাশাপাশি হাঁটছে তিতিরের।আড়চোখে খেয়াল করছে মলিন মুখখানা।খুব আদুরে মুখ।একবার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো মন খারাপের কারণ।করা হলো না।শিক্ষক বেশে থেকে শিক্ষার্থীর সাথে রোমান্টিসিজম করা নিশ্চয় ভালো দেখায় না।যা হবার পরেই হবে ক্ষন।
কলেজ ক্যাম্পাস থেকে বেড়িয়ে এসে দাড়ালো ফাঁকা রাস্তায়।একটা রিকশাও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।তিতির,তমা দুজনেই হাশফাশ করলো।তমা মিহি গলায় বললো,
____”,স্যার এ সময়ে রিকশা পাওয়া যায়না।আমরা চলে যেতে পারবো।”
তাহমিদ এর মুখ চিন্তিত লাগলো।তিতিরদের বাড়ির রাস্তা এই মূহুর্তে অস্বাভাবিক নিরব।বাকি শিক্ষার্থীরা আরও পরে যাবে।সুতরাং সেই ফাঁকা রাস্তায় দুটো মেয়েকে একা পাঠাতে মন সায় দিলো না তার।স্বাভাবিক গলায় বললো,
____”চলো এগিয়ে দিয়ে আসি খানিকটা।”
তিতির জলদি নিষেধ করে বসলো,
____”স্যার সত্যি আমরা চলে যেতে পারবো।আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।”
____”কষ্ট নয়।বরং যেতে পারলে ভালোই লাগবে।”
____”জ্বী!”
____”স্যার বলার দরকার নেই।আপাতত কলেজ আওয়ার নয়,তার মধ্যে তোমার টিচারও ছিলাম না।সুতরাং…
তিতির বা তমা দুজনেই তাহমিদ কায়েশের গলার সুরে খানিক টা ইতস্তত বোধ করছে।তিতিরের প্রতি লোকটা যে আলাদা একটু কেয়ার দেখচ্ছে তা দৃষ্টি তেই বোঝা যাচ্ছে।তবে তমা প্রতিবাদ করে উঠলো একপ্রকার,
____”তবুও স্যার তো স্যারই হয়।ক্লাস করি বা না করি।তাছাড়া কত বড় আপনি”
____”কেমন একটা বয়স্ক লাগছে না! আমার কিন্তু বয়স টা অতোও নয়, যতটা ভাবছো।”
চুপসে এলো দুজনেরই মুখ।তমা আড়চোখে তাকালো তিতিরের দিকে।ইতস্তত করে রাস্তার দিকে দু পা হাঁটা ধরতেই চোখে পরলো খানিক দূরে স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকা একটি গাড়ির দিকে।কালো, বিধায় চোখে পরতে বেশ সময় লাগলো।আরও কয়েকপা এগোতেই শীরদাড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেলো দুজনের।একে অপরের হাত আকড়ে ধরলো।আচমকা দাড়িয়ে পরা,আর তমার হাত ওভাবে আকড়ে ধরায় তাহমিদ বোধহয় একটু ভয় ই পেলো।তিতির ব্যাথা পেলো কিনা, সেই চিন্তায় মরিয়া হয়ে খুব কাছে চলে এলো। উত্তেজিত গলায়।বললো,
____”ঠিক আছো তুমি?লেগেছে কোথাও?”
তিতির ছিটকে সরে দাড়ালো।কয়েকফুট দূরেই গাড়িটা বন্ধ অবস্থায় দাড় করানো।ঈশানের গাড়ি এটা।ভিতরে ঈশানের মুখটাও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।অগ্নি ঝড়ছে সে মুখখানা থেকে।অন্ধকারের মধ্যেও অগ্নি দৃষ্টি চোখ এড়ালো না তমা বা তিতিরের।তাহমিদ এরই মধ্যে ভ্রু কুচকে আছে,ভাবছে তিতিরের আচমকা এতো অস্থিরতার কারণ।বারবার ব্যাস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করতে ব্যাস্ত।আশ্চর্যজনক ভাবে ঈশান গাড়ি থেকে নামছে না,পর্যবেক্ষণে ব্যাস্ত বোধহয়।তাহমিদ অতি উত্তেজনায় তিতিরের গা ষেষে দাড়ানো।এতক্ষণ দুজনের দৃষ্টি অনুসরন করে সামনে চোখ গেলো সে বেচারার।কিছু দূরেই গাড়িতে বসারত ঈশানকে চোখে পরলো।কপালে ভাজ পরলো তাহমিদ এর।তার মনেপ্রাণে চিন্তা হলো ঈশান সম্ভবত বিরক্ত করে তিতিদের।সে ভয়েই মেয়েদুটো এমন চুপসে আছে।এতবার জিজ্ঞেস করেও তমা বা তিতিরের ভয়ার্ত মুখ থেকে যখন কিছু উচ্চারন করাতে পারলো না, তখন সে বিশ্বাস চূড়ান্ত হলো যেনো।আর দ্বিতীয় বার তিতির দের কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করলো না।হন্তদন্ত পায়ে এগিয়ে গেলো ঈশানের গাড়ির দিলে।তমা,তিতির আৎকে উঠে থামানোর চেষ্টা করেও সম্ভব হলো না।ততক্ষণে তাহমিদ পৌছে গিয়েছে ঈশানের কাছটায়।রাগে জর্জরিত হয়ে ধমকে উঠলো ঈশানকে,
____”রাস্তাঘাটে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা একটা ট্রেন্ড এ পরিনত করে ফেলা হয়েছে তাইনা।মেয়ে দেখলে হুশ থাকেনা।”
ঈশান কে বলা তাহমিদ এর এই কথায় মাথায় বাজ পরলো তিতিরের।আকাশ থেকে সটানে বজ্রপাত পরলো যেনো তার আর তমার মাথায়।চোয়াল ঝুলে পরেছে দুজনের।বাঘের খাঁচায় ঢুকে বেড়াল বাঘকে বলছে আমাকে মাসি ডাকবি শালা!বিষয়টা এমন দেখাচ্ছে।
ঈশান এখন চুপ।তার নিরবতা বোধহয় আরও রাগান্বিত করে ফেললো তাহমিদ কে।সে এক ঝটকায় গাড়ির দরজা খুলে ফেললো।তিতির,তমা দৌড়ে এগোতে উদ্ব্যত হতেই আঙুলের ইশারায় থেমে যেতে আদেশ করলো ঈশান।
ঈশানের মুখের দিকে তাকিয়ে একপা এগোনোর সাহস করলো না দুজনের কেউ।রুহ কাঁপছে দুজনের।আজ একটা খুনোখুনি না হলে হয়।তিতির মুখ এগোয় তমার দিকে।অসম্ভব ভয়ার্ত গলায় ফিসফিস করে বলে উঠলো,
____”বেচারা কে হিরো হতে কে বললো বলতো।”
তমার মুখ আরও ভয়ে শুকনো।নিজেও একই গলায় বললো,
____”নয়া নয়া প্রেমে পরলে শেয়াল নিজেকে বনের রাজাই ভাবে।বেচারা কঠিন ভাবে প্রেমে পরে গেছে তোর।তাই হিরো হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলো না।”
____”বাজে বকিস না।প্রেমে পরার সুযোগ পেলো কোথায়! “
____”লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট গাধা।তাহমিদ সাহেবের একই কাহিনি ঘটেছে।বেচারা আর মানুষ পায়নি।একেবারে বিবাহিত মেয়ের পিছনে পরে তারই স্বামী কে ইভটিজিং এর জন্য গালিগালাজ করছে!তাও আবার সে কে!ঈশান আরশাদ দেওয়ান। বেচারার আয়ু কম।আফসোস করে কি লাভ।আহারে।কতই বা বয়স বেচারার…অকালে…আল্লাহ মাফ করুক।”
এই সময়ে তমার হেয়ালি,আর পাগলের প্রলাপে বিরক্ত হলো তিতির।ধমকে উঠলো চাপা গলায়,
____”তোর শুধু ফালতু কথা।অকালে মানে কি!নেগেটিভ কথা।”
তমার পেট ফেটে হাসি পেলো।খ্যাকখ্যাক করে হাসতে ইচ্ছে হলো।
____”আমি ফালতু বলি!তোর আন্দাজ আছে লোকটা কি করলো এই মূহুর্তে! আর মানুষ পেলো না!বড় ভাইয়া ওকে এখন আস্ত রাখবে!”
তিতিরও অবশ্য একই কথা ভাবছে।লোকটা আর এলোমেলো কিছু বলে সবটা বেশি জটিল করার আগেই থামানো দরকার।তিতির দ্রুত পায়ে একপ্রকার ছুটে এসে দাড়ালো তাহমিদ এর পাশে।উত্তেজিত গলায় বললো,
____”ইট’স ওকে।আপনি যা ভাবছেন তা নয়।উনি আমার…
তিতির থমকায়,উনি আমার স্বামী কথাটা গলায় আটকে আসলো তার।বলতে গিয়েও থামলো।তাহমিদ প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকালো তিতিরের দিকে,ঈশান নিজের বাঁকা চোখে তাকিয়ে তিতিরের জবাব শোনার অপেক্ষায়।তিতিরকে কিছু বলতে না দেখে পুনরায় খেপে কিছু বলার আগেই তমা দৌড়ে এলো।
____”উনি আমার বড় ভাই স্যার।ঈশান আরশাদ দেওয়ান”
তাহমিদ চমকে গেলেন।অপ্রস্তুত হলেন ভিষণ রকমের।তবে পরক্ষণেই সামলে নিয়ে বিনয়ে ভেঙে পরলেও একেবারে।
____”আমাকে ক্ষমা করবেন।আমি আসলে…
ঈশান গাড়ি থেকে নেমে দাড়ালো।মুখ নির্বিকার
ভাবলেশহীন গলাতেই বললো,
____”আই ডোন্ট মাইন্ড অ্যাট অল।আফটার অল আপনি জানতেন না।এতে রাতে দুটো মেয়ের পথ আটকে হুট করে কেউ দাড়ালে যেকোনো সচেতন, সুচরিত্র পুরুষ এমনই বিহেভ করতো।”
তমা, তিতির হা হয়ে গেলো।কানে সঠিক শুনলো কি না বোঝা গেলো না।ঈশানকে তারা কোন রুপে দেখবে সেটা ভাবতে ব্যাস্ত,আর ঈশান কি না এতো বিনয়ের অবতার!ভাবতেই গায়ে কাটা দিয়ে উঠছে।
তাহমিদ প্রচন্ড খুশি হলেন,তবে মনে মনে ভেবে পেলেন না খুশিটা আদৌ হওয়া উচিত কিনা।মেয়েটাকে তার পছন্দ, তবে মেয়ের ভাইয়ের সাথে প্রথম সাক্ষাৎ মোটেই সুখকর হলো না।তবে সেসব আপাতত তুললেন না তিনি।হালকা হেসে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন কিছু মনে না করার জন্য। বেশ কয়েকবার ঘটা করে ক্ষমটমা চাইলেন ভদ্রলোক। তিতির,তমার থেকে বিদায় নিয়ে স্থান ত্যাগ করলেন তিনি।এবার ভয় পাওয়ার পালা দুজনের।আশ্চর্যজনক ভাবে ঈশান কিচ্ছু বললো না।আলগোছে গিয়ে বসলো ড্রাইভিং সিটে।তিতির, তমা দুজনেই উঠে বসলো।যথারীতি তিতির পিছনেই বসলো তমার সাথে। ঈশান গম্ভীর মুখে পরখ করলো সবই।গম্ভীর গলাতে আদেশ ছুড়লো,
____”তমা সামনে আয়।আমি নিশ্চয় ড্রাইভার নই?”
তমাকে ডাকায় সে নিজে ভীষন কাচুমাচু করছে।মিয়া বিবির ঝামেলায় বারবার ফেঁসে যায় সে বেচারি।তিতিরকে দু ঠ্যালা দিলো উঠে যাওয়ার।তিতিরের মধ্যে তার আগ্রহ দেখতে পাওয়া গেলো না।
_____”তমাআআ?”
লম্বা করে ডাকটা কানে আসার সাথে সাথেই চাপা গলায় ধমকে উঠলো তিতিরকে,
____”যাচ্ছিস না কেনো।আমাকে দিয়ে তোকে ডাকছে গাধা।”
তিতির অগত্যা উঠতে উদ্ব্যত হতেই আরেকদফা ধমকের স্বর পাওয়া গেলো,
_____”তমা, তোকে বলেছি আসতে।না এসে প্রক্সি পাঠাচ্ছিস! “
তিতির থমকে গেলো,মুখটা কালো হয়ে এলো।তমার নিজেও অপ্রস্তুত হলো।মহা সমস্যা এদের নিয়ে।তবে আর ঈশানকে ক্ষেপানোর সাহস হলো না তাদের।আজ যা রেগে আছে তা বাড়ি গিয়ে ঝারবে কি না কে জানে!
গাড়ি এসে মিনিট বারো পর থামলো দেওয়ান বাড়ির গেটের সামনে।পাশের গেট দিয়ে তমা নিজের বাড়িতে ঢুকলো।একদম সদর দরজা খুলে বাসার ভিতরে না ঢোকা পর্যন্ত তাকিয়ে রইলো ঈশান।ভিতরে যেতেই গাড়ি ঘোরালো।চেঁচিয়ে উঠলো তিতির,
____”আরেও ওদিক কেথায় যাচ্ছেন?”
ঈশানের মধ্যে উত্তর দেওয়ার লক্ষন পাওয়া গেলো না।গাড়ি আঁকাবাকা গ্রামিন রাস্তার মধ্যে দিয়ে অনবরত চলছে।ছমছমে পরিবেশ গাড়ির ভিতর থেকেও।কারণ গ্রামের মধ্যে রাত আটটা -নয়টাই বেশ রাত।।রাস্তাঘাটে সচরাচর মানুষ দেখতে পাওয়া যায়না।জমিতে ধান লাগানো হয়েছে,সুতরাং শেয়াল বাবাজীবন রাও লুকানের জায়গা নে পেয়ে রাস্তায় ঘুরঘুর করে আরকি।
তিতির পিছনে একা বসা।ঈশান একদম শব্দহীন গাড়ি চালাচ্ছে। তিতিরের হাজার একটা প্রশ্নের মোটেই জবাব দিচ্ছে না,দেবে বলেও মনে হচ্ছে না।গাড়ির ভিতরের লাইট অফ করতেই বাইরের অন্ধকার ভেদ করে হালকা স্পষ্ট হলো বাইরের প্রকৃতি। আকাশে আজ ইয়া বড় চাদ!তাঁরায় ঝলমল আকাশ।গাড়িতে আলো জ্বলায় এতক্ষণ বুঝতে পারা যাচ্ছিলো না।এমন দৃশ্য দারুণ উপভোগ করে তিতির।তবে এখন করতে পারছে না।সামনে না বসে মস্ত ভুল হয়েছে।গাড়ি থামাতে বলবে!সামনে বসবে গিয়ে!
____”গাড়ি একটু থামাবেন।আমি একটু সামনে যাবো।”
ঈশান থামালো না।একই গতিতে চলছে তারা।তিতির আতঙ্কে একপ্রকার। বাইরে ওইতো শেয়াল ছুটছে।তিতির চলন্ত গাড়িতেই আচমকা সামনে এসে পরলো।ঈশান চমকেই গেলো।এমন আশা করেনি সে।গাড়ির গতি দ্রুত কমালো। তিতির সামনের সিটে বসে হাফ ছেড়ে বাচলো যেনো।ঈশান আড়চোখে দেখলো একবার।তিতির সরাসরিই তাকালো ঈশানের দিকে।বুকে আড়াআড়ি হাত ভাজ করে বললো,
____”কোথায় যাচ্ছি এখন বলুন।আমি বাড়ি যাবো।”
কথাটা বলে শেষ করতে না করতেই কড়া ব্রেক কষলো ঈশান।দরজার লক খুলে দিয়ে নির্বিকার সামনে বসে রইলো।তিতির হতভম্ব হয়।ব্যাগ্র গলায় জিজ্ঞেস করে,
_____”থামালেন কেনো!”
_____”আউট।”
চমকে উঠলো তিতির।ফটাফট এদিকসেদিক তাকালো বাইরে।ভয়ংকর অবস্থা। সামনে বটতলা,বন্ধ চায়ের দোকানটা!এখানে তাকে নামতে বলা হচ্ছে মানে!
____”এখানে নামবো কেনো! “
____”বাড়ি যাবি বললি।”
____”এটা বাড়ি আমার?”
____”তাহলে যেখানে যাচ্ছি কাজ শেষ করে ফিরবো নিশ্চয়। “
____”সেই জায়গাটার নাম বলতে…
____”আর একটা কথা বললে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো।”
অপমানে লাল হলো তিতির।নেহাৎ এই অবস্থায় আছে জন্য। না হলে কখনো সহ্য করতো না সে।তবে মুখে আর কিছু বললো না।চোখমুখ কুচকে বসে রইলো।নিজেদের গ্রামের আঁকাবাকা বাক গুলো নিমিষে পেরিয়ে গাড়ি এসে উঠলো মেইন রোডে।মেইন রোডে বেশ গাড়ি,একেরপর এক দুরপাল্লার বাস,ট্রাক চলতে ব্যাস্ত।ঘড়িতে সময় সাড়ে নয়টা এখন।গ্রাম ছাড়া সব জায়গাতেই এ সবে সন্ধ্যাে।প্রচন্ড গতিতে গাড়ি চলছে।তিতিরের হাত পা কাঁপছে। কেমন আবেদনময়ী গলায় আর্তনাদ করে উঠলো,
____”আস্তে ।এত জোরে কেনো!”
ঈশানের কপালে বিস্তর ভাজ পরলো।মুখে বিরক্ত সূচক শব্দ করে বসলো।একই ভাবে তাকালোও তিতিরের দিকে।তিতির সামনে দৃষ্টি রেখে কোলের ওপর দু হাত মুঠো করে কাঁপা কাঁপি তে ব্যাস্ত।ঈশানের মধ্যে গাড়ির গতি কমানোর কোনো আগ্রহ না-পেয়ে আবার একই গলায় আর্তনাদ করে বসলো সে।
____”ইশশশ আস্তে বললাম তো।”
ঈশানের মেজাজ এবার সত্যি খেই হারালো।ধমকে উঠলো,
____”আহ,উহ্,ইশশশ, আস্তে,জোরে এসব কি শব্দ!সাথে অশ্লীল এর মতো টান তো আছেই।কথার ধরনে মনে হচ্ছে গাড়ি তে না।দুজন বিছানায় আছি।”
ঈশানের এহেন ঠোঁটকাথা কথায় শরীর শিওড়ে উঠলো তিতিরের।লজ্জায় লাল হয়ে এলো মূহুর্তের মধ্যে তার ফর্শা মুখখানা।মুখে লাগাম না থাকলে আরেকজনের যে লজ্জায় পরতে হয় তা তো একফোঁটা বোঝে না এ লোক।ভয়ে এমন কন্ঠ এসে গেছে। তিতির গলার স্বর স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বললো,
____”আমি মোটেই অন্য ভাবে কিছু বলিনি।স্লো করুন! “
____”স্লো আমার দ্বারা এখন হবে না।মুড এ আছি।”
____”হ্যা!”
____”গাড়ি দ্রুত চালানোর মুডের কথা বলেছি।”
কাচুমাচু মুখটা ঘুরিয়ে ফেললো গ্লাসের দিকে।অসভ্য লোকের অসভ্য কথাবার্তা।কথা ধরনেই আর পরের উত্তর টা দেওয়ার অবস্থা থাকে না।তবে আর বলতে হলো না।মুখে নিষেধ করলেও ধীরে ধীরে গাড়ির গতি কমে এলো বেশ খানিকটা।হাফ ছাড়লো তিতির।ভয় কমে এসেছে এখন অনেকটা।মেইন রাস্তা ধরে এগোচ্ছে গাড়ি।এ রাস্তায় আগে যাওয়া হয়নি তার।তাদের বাড়ির সে রাস্তা থেকে শহরের দিকে গিয়েছে মেইনরোড,এটা তার উল্টো রাস্তা।বাড়িঘর চোখে পরছে না খুব একটা।তবে বাস,ট্রাক বহাল তবিয়াতে চলছে। দুজনেই চুপ করে আছে,তিতির জানে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই।ঈশানও বলার প্রয়োজন বোধ করছে না।
বেশ সময় নিয়ে গাড়ি বাক নিলো অন্য দিকে।এ রাস্তাটা মেইনরোড থেকে পশ্চিমে গিয়েছে। বেশ সরু একটা রাস্তা।ওই একটা প্রাইভেট কার চলার মতো প্রস্যস্ত। আশেপাশে জঙ্গল। তার ভিতর দিয়ে রাস্তা।তাদের এলাকায় এমন গাছপালায় পরিবেশ প্রচুর। এই যেমন এটা সম্ভবত পুরোটাই কোনো জঙ্গল।গা ছমছম করে একপ্রকার।এই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এতো রাতে ঈশানের কি কাজ থাকতে পারে হিসেবে মেলে না তার।তাকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে আসলেই হতো।
____”এ..এদিকে নিয়ে যাচ্ছেন কেনো! “
____”রাস্তা এদিকে। তো এদিক দিয়ে যাবো না! “
____”সেটাই তো কথা।এত রাতে এদিকে রাস্তা হবে কেনো!”
____”দিন রাতের সাথে রাস্তা তার গতিপথ পাল্টায় জানা ছিলো না তো আমার।
____”সেটা কখন বললাম।এরকম রাত্রির বেলায় কত বিপদ আপদ হয়।দুজন একা একা এদিকটায় কেনো যাচ্ছি!”
ঈশান জবাব দেয় না।সে থাকতে বিপদ!হাস্যকর কথা বলে একেকটা মেয়েটা।মাথা এমনিতেই জ্বলে আছে।তার মধ্যে এতো অবান্তর বকবক পোষাচ্ছে না তার।সুতরাং জবাব না দিয়ে গতি বাড়িয়ে দিলো।কাঙ্খিত গন্তব্যে গাড়ি এসে পৌছাতেই হা হয়ে গেলো তিতির।এ যেনো এক মিনি সমুদ্র। পিছনে জঙ্গল,বোঝার উপায় নেই তার আড়ালে এমন সুন্দর পরিবেশ।সমুদ্র নয় মোটেই,বিশাল একটা নদী এটা।পানি যেমন আছে তেমনই মাঝে মাঝে আবার চর পরে গেছে।এপাশে ওপাশে বিস্তর বালুচর দেখা যাচ্ছে।চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে বালুকনা।পানিতে পরেছে চাঁদের আলোর প্রতিচ্ছবি।
মুগ্ধ হয়ে থমকে যাওয়ার মতে সৌন্দর্য। তিতির অতি উচ্ছাসে সিট বেল্ট খুলে নামতে যাবে তার আগেই নিজেকে শূন্যে আবিষ্কার করলো।ঝড়ের গতিতে কি একটা হয়ে গেলো।খিচে বন্ধ করা চোখমুখ খুলতেই নিজেকে পেলো ঈশানের কোলে।হতভম্ব হয়ে গেলো বেচারি।এক হাত পিঠে অন্য হাত হাটুর নিচে দিয়ে খানিকটা নিজের শরীরের সাথে মিশিয়ে আনলো ঈশান তিতিরকে। শীর্ন,মেদহীন শরীরখানা লেপটে আছে ঈশানের শক্তপোক্ত জিমকরা পেশিবহুল অঙ্গের সাথে। মূহুর্তের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হলো তিতিরের।ঈশানের দিকে তাকাতেই আত্মা কেঁপে উঠলো তার।ভয়ংকর সে দৃষ্টি। ক্রোধ উপচে পরছে সেখান থেকে।সরে যেতে নড়াচড়া করলো।ঈশানের হাতের বাধনে এক চুল সম্ভব হলো না নড়া।ঈশান স্থির চোখে তিতিরের ছটফট দেখতে ব্যাস্ত।মেয়েটা হাপাচ্ছে।বিরক্ত হলো সে।কোলে তুলে নিয়ে এলো সে,বসে আছে তারই কোলে।হাঁপানো উচিত তো তার।কষ্ট তো সে করলো।উল্টো মেয়েটা হাপাচ্ছে।আজব কারসাজি।
____”হাঁপাচ্ছিস কেনো!কিছু করেছি?”
কথাটাতে হাঁপানো কমলো না মোটেও।বরং বাড়লো।খেয়াল করলো ঈশানের ডান হাত তার পিঠে নড়াচড়া করছে।অন্য হাত তার উরুর ওপর দিয়ে তাকে ধরে রাখা।
____”নামাবেন কিনা বলুন।না হলে বসতে দিন।চলুন বাড়ি যাই।”
____”নামানোর জন্য তো তুলিনি।”
____”এটা বসে থাকার জায়গা?অসহ্য লাগছে আমার।যেতে দিন।”
____”,বসে থাকার জায়গা না।আরও অনেক কিছু করার জায়গা।বসে থাকতে বোরিং লাগলে সেসব ট্রাই করা যেতে পারে।ডু ইউ ওয়ান্ট দ্যাট?”
আতঙ্কে শরীর হীম হয়ে আসে মেয়েটার।ঠোঁট কামড়ে নিজের রক্তিম মুখ লুকাতে ব্যাস্ত সে।হঠাৎ শোনা গেলো ঈশানের ভারি গলা,
____”লুক অ্যাট মি।”
তিতির ধীরেসুস্থে তাকালো।তিরতির করে কাঁপছে চোখের পাপড়ি। ভীষন অপ্রস্তুত অবস্থায় বসা সে।সেদিনের মতো।
____”বেরিয়েছিলি কেনো?”
____”বের হতে পারিনা?”
____”আমি নিষেধ করিনি গাড়ি ছাড়া, একাএকা বের হতে?”
____”তমা তো ছিলোই।”
____”কিছু ঘটলে তুই বা তমা আটকাতে পারবি?”
তিতির ভ্রু কুচকে জিজ্ঞাসাসূচক দৃষ্টি দেয়।
____”কি ঘটবে!আমাদের এলাকা।আগে তো এত রেস্ট্রিকশন নিয়ে চলাফেরা করিনি।আজও প্রয়োজন দেখছি না।”
তিতিরের কাঠখোট্টা জবাবে মেজাজ দ্বিগুণ খারাপ হয় তার।তবে রাগতে চায়না সে।রেগে মাথা নষ্ট করে মেয়ে মানুষের গায়ে আঘাত তোলার মতো ভুল তার দ্বারা আর এ জীবনে দ্বিতীয় বার হবে না।করতে চায়না সে।সেদিন তিতিরকে আঘাত করে মানসিক ভাবে বিধস্ত একপ্রকার সে।
____”নিষেধ করার কারণ নিশ্চয় আছে?”
____”সেটা যদি আপনি করেন তাহলে নেই।কারণ ছাড়াই বেশি কাজ করেন আপনি।”
____”সাহস দিন কে দিন বাড়ছে?”
তিতির বাঁকা হাসে।তাচ্ছিল্যের গলায় বলে,
____”কে আপনি!”
রাগে জ্বলে ওঠে ঈশানের মাথা।পিঠের ওপর রাখা হাত উঠে আসে উন্মুক্ত ঘাড়ে।মাথার চুলগুলো বেশ খানিকটা উচুতে খোঁপা করে রাখা।ঘাড়ে শক্ত চাপ পরতেই মুখ কুচকে ফেলে সে ব্যাথায়।চোখ বুজেও নিজের মুখের অস্তিত্ব অনুভব করে ঈশানের খুব কাছে।দুজনের গরম নিঃশ্বাস আছড়ে পরছে একে অপরের ওপর।জোরে জোরে শ্বাস নেয় তিতির।না চাইতেও ঈশানের নজর যায় বিস্তর ওঠানামা করা সুডৌল বক্ষজোড়ার ওপর।নিজের ওপর হতাশ হয়ে মাথায় এলিয়ে দেয় সিটে।চোখবুজে শ্বাস টানে।দু হাতে তিতিরের পাতলা কোমড় ধরে একই ভাবে বসিয়ে দেয় পাশের সিটে।মেয়েটা তার জন্য ধ্বংসের অস্ত্র। ভয়াবহ ব্যাপার স্যাপার।তিতির নিজেকে আবার সিটে অনুভব করতেই হাফ ছাড়লো।কঠোর গলায় বললো,
____”সময় অসময় আমাকে ছোঁবেন না।আগেও হাজার বার নিষেধ করেছি।”
ঈশান নিজের সিট বেল্ট খুলে বেশ ঘুরে বসলো তিতিরের দিকে।গম্ভীর গলায় বললো,
____”কে ছুলে ভাল্লাগে। রাহাত?”
গা ঘিনঘিন করে উঠলো ঈশানের কথার ধরনে।চোখে ভেসে উঠলো সেদিন রাহাতের তাকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য। ওইছবি যতবার তার চোখে ভাসে খুব করে একটা অসভ্য ইচ্ছে করে।ওই ছোঁয়া সে ভুলতে চায়।শরীর থেকে মুছতে চায়। সেটাও আবার ঈশানের ছোঁয়ায়। স্বামী-স্ত্রী নামক পবিত্র বন্ধনের নিচে তলিয়ে ফেলতে মন চায় পরপুরুষ এর অযাচিত স্পর্শ। তিতির দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
____”আপনি কথাটা বলে কি পরিমাণ ছোট করেন আমাকে সেটা বোঝেন.”
ঈশান শব্দ করে হাসে।বিদ্রূপ করে যেনো সে হাসি তাকে।
____”ছোট করি তোকে!সে বোধ আছে তোর?”
____”নেই বুঝি!”
____”থাকলে না তো সেদিন রাহাত এর সাথে আমার নিষেধ সত্ত্বেও দেখা করতে যেতিস,না তো আজকে রাত্রি বেলা বের হতিস।রাস্তায় ওই অচেনা এক লোকের সাথে মাখামাখি করতিস আর না তো নয়নের এতো কাছাকাছি চলতিস…”
তিতির স্তব্ধ হয়।মাথা ব্ল্যাংক লাগে তার।সামান্য কথা থেকে কতজনের কথা শোনালো!সে রাস্তায় তাহমিদ এর সাথে মাখামাখি করছিলো!আর নয়ন!নয়ন ভাই এর কথা এখানে কোত্থেকে আসলো!বোঝার আগেই খেয়াল করলো ঈশান নেমে গেলো গাড়ি থেকে।এগিয়ে গিয়ে দাড়ালো নদীর একদম কিনারে,বালুর ওপর।।তিতির বসে রইলো বেশ সময়।অসহ্যকর মূহুর্ত কাটে এই লোকটার সাথে।সারাদিন এর মুড এক চুটকিতে নষ্ট করতে এ লোক সেরা।
তিতির হাত বাড়িয়ে বেশ কয়েকবার হর্ন দিলো গাড়ির। বাড়ি যাবে সে।ঈশানের এহেন কথাবার্তায় এই জায়গার সৌন্দর্য তার আর সৌন্দর্য লাগছে না।বিষ লাগছে।
ঈশান আসলো না।অন্ধকারে ধোয়া উঠতে দেখা গেলো।চোখমুখ কুচকে ফেললো তিতির।সিগারেট ধরিয়েছে ঈশান!অসহ্যকর লাগে তার সিগারেট। তিতির হয়তো আশা করছিলো হাতের সিগারেট শেষ হলে ফিরবে ঈশান।সেটা হলো না।দ্বিতীয় সিগারেট ঠোঁটে চাপলো আবার।তিতির এবার ধৈর্য হারায়।নেমে আসে গাড়ি থেকে।মাটির দেখা নেই এখানে।জঙ্গল টা পার হয়ে পিছনের এদিকে আসলে বালি আর বালি।ভীষন মন ভালো করা পরিবেশ। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাড়ালো ঈশানের পাশে।ঈশান গভীর মনোযোগ এ পানির দিকে তাকিয়ে সিগারেট টানতে ব্যাস্ত।তিতির কড়া চোখে তাকিয়ে রইলো এতো ভালোবেসে টানা সিগারেট এর দিকে।ঈশানের ঠোঁট জোড়া এর আগে বেশ গোলাপিই লক্ষ করেছিলো সে।ইদানীং বেশ কালচে লাগে।সিগারেট এ পুড়ে পুড়ে ব্রাউন লাগে।কাশি দিয়ে শব্দ করলো খানিকটা।
____”আমি বাড়ি যাবো।”
____”দেরি হবে।”
____”বাড়িতে চিন্তা করবে।”
____”করুক।”
____”আমি বাড়ি য়াবো।চলুন।”
____ “আমি তোর কে?”
আচমকা এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিলো ঈশান।তিতির উত্তর দিতে পারেনা সাথে সাথে। ঈশান তাকায় তার দিকে।এক হাত পকেটে গুজে সোজাসোজি দাড়ায় তিতিরের সামনে।একদম ঘেষে প্রায়।সিগারেট টানছেই।ধোয়া এসে লাগছে তিতিরের মুখে।কেশে উঠছে সে।ঈশান গমগমে গলায় দ্বিতীয় বার প্রশ্ন টা করলো,
____”আমি তোর কে? “
কি বলবে তিতির।সামান্য প্রশ্নেই বুক ছটফট করে উঠলো কেনো তার!মিহি গলায় বললো,
____”কে?”
____”,তোকে প্রশ্ন টা করেছি। “
তিতির তোতলায়।মাথা নিচু করে ফেলে।পিছিয়ে যায় কয়েকপা।
____”,সিগারেট টা ফেলুন।”
____”জবাব দে আগে।”
তিতির মাথা তোলে।আগ্রহ কন্ঠে বলে,
____”তাহলে ছেড়ে দেবেন সিগারেট? “
ঈশানের ভ্রু জোরার মাঝে সরু ভাজ পরে।আয়েশি ভঙ্গিতে সিগারেট এ টান দিয়ে বলে,
____”এখানে সিগারেট ছাড়ার কথা আসে কোত্থেকে”
____”আসে।”
ঈশান হাতের ছোট্ট অংশটুকু ছুড়ে ফেলে।পকেট থেকে সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটা বের করে ধরায়।
____”ফেলবেন না?”
তিতিরের গম্ভীর গলার ধমক সুরে ঈশান মনে মনে হাসে।পরখ করে মেয়েটাকে।আজ হালকা ডাস্টি গ্রিন একটা জামা পড়া।ওড়না টা আজ গলায় নয়,বরং শরীরে ছড়ানোই।ঠোটে ডার্ক লিপ্সটিক,চোখে কাজল আছে বোধহয়।টানা টানা ডাগর চোখজোড়ায় দৃষ্টি রেখে ডুবে যাওয়া যায় গভীর অতলে।বুকটা ধকধক করে ওঠে।অবাধ্য শরীর,মন ওই ঠোটজোড়ার ওপর এখন নিজের অধিকার ফলাতে আশকারা দিচ্ছে তাকে।তা সে করবেনা।
সিগারেট নিজের মতো টান দেয়।তিতিরের থেকে সরে অন্য দিকে ঘুরে দাড়ায়।মুখে বলে,
____”আমার এখন এটা লাগবে।”
____”আগে দুটো খেলেন।এটা তৃতীয়। “
____”খেয়ালও করেছিস!”
____”ফেলুন।”
____”তার বদলে কি দিবি।”
তিতির চোখ গোল গোল চায়।সিগারেট ফেলতে বলছে তার ভালোর জন্য। সেটা ফেলতে তাকে কিছু দিতে হবে।কেনো আবার!
____”কি দেবো!আপনার ভালোর জন্যই বললাম।”
ঈশান মৃদু হাসে।
____”আমার ভালো তোকে ভাবতে হবে না।”
____”সিগারেট খান কবে থেকে।”
____”উমমমম্ বছর আটেক।”
তিতির হিসেব কষে ফেললো তখন ঈশানের বয়স বিশ-একুশ ছিলো।
____”কি মজা এতে?”
____”,বললে বুঝবি! টেস্ট কর।”
নাকমুক কুচকে ফেলে তিতির।গম্ভীর গলায় বলে,
____”ছেড়ে দেবেনা না?”
____”একেবারে? “
____”হু।”
____”সম্ভব না।”
____”কেনো!অভ্যাস ছাড়া যায়না।”
____”চাইলেই যায়।”
____”যায়না।কোনো কিছু আমরা তখন ছাড়ি যখন তার রিপ্লেসমেন্ট থাকে।”
তিতির বিরক্ত হয়।ভালো জন্য বলা হলো কথাটা।সিগারেট এর রিপ্লেসমেন্ট কি হয় আবার।খারাপ ছাড়তে এতো বাহানা থাকবে কেনো।
____সিগারেট এর রিপ্লেসমেন্ট কি?গাঁজা, ইয়াবা,হিরোইন,কোকেন?”
ঈশান নিজের দৃষ্টি তাক করে ফেলে তিতিরের পাতলা,রক্তলাল অধরোষ্ঠের দিকে।পকেট থেকে হাত বের করে আচমকা বৃদ্ধাঙ্গুলি চেপে ধরে তিতিরের নিচের ঠোঁটে।গভীর চাপে স্লাইড করে।তিতির আচমকা ঘটে যাওয়া ঈশানের কাজে ছন্নছাড়া হয়েছে।চেপে ধরেছে নিজের আনারকলির দু পাশ।
ঈশান ফিসফিস করে উঠলো,
____”যেদিন এই ঠোঁটের ছোয়ায় নতুন নেশা ধরাবি।সেদিন থেকে এই বাজে নেশা ছেড়ে দেবো, কথা দিলাম।তবে শর্ত আছে।আমার অল্প তে পোষায় না।যতক্ষণ না তৃষ্ণা মিটবে,বুকের জ্বালা মিটবে,শরীর ঠান্ডা হবো ততক্ষণ লাগবে আমার এই ওষ্ঠজোড়া থেকে নিঙরে পরা মধু।রাজি?”
বুকের বা পাশের অংশটা বের হয়ে বালুতে গড়াগড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা তিতিরের।ঈশান আরেকটান দিলো সিগারেটে।ধোয়া ছাড়লো তিতিরের মুখের ওপরই।
____”এখন দিলে এখন থেকে ছাড়তে রাজি।”
তিতির শক্তহাতে সরিয়ে দিলো ঈশানের হাত।হাত দিয়ে মুখের সামনের ধোয়া সরালো।কাশছে রীতিমতো।
____”আপনার ঠোঁটে সিগারেটই মানাবে তাহলে।”
ঈশান হাসে সামান্য। আকাশের দিকে ধোয়া ছেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
____”তা ঠিক।আমার জন্য এই নেশাই ঠিক।নারী শরীরের ওসব পোষাবে না।স্বাস্থ্যহানী বেশি করবে বরঞ্চ। ঠোঁটের ছোঁয়া ফেলে আরও অনেককিছুরই ছোঁয়া পেতে মন চাইবে।সেটা মানে সর্বনাশ ডাকা।”
তিতির লজ্জারুন মুখটা ঘুরিয়ে রাখে। নদীতে আকাশের চাঁদের দারুণ এক প্রতিচ্ছবি ভাসছে।বেশ শীতল বাতাস আশেপাশে। মস্তিষ্ক ঠান্ডা হওয়া। আবহাওয়া।নিঃশব্দে দাড়িয়ে দুজন।ঈশানকে বড্ড উদাশ লাগলো। সেই সাথে তিতির ভাবতে ব্যাস্ত আকে তাকে না বকার কারণ!বিশ্বাসই হচ্ছে না তার।খানিকপরে চতুর্থ বারের মতো সিগারেট ধরাতেই তিতির রেগে গেলো।
____”আমার সমস্যা হচ্ছে তো।”
ঈশান বেশ খানিকটা সরে দাড়ালো।কিছু বললো না।ধোয়া এদিকে আসছে না।বাতাসের গতির সাথে উল্টো দিকে ভেসে যাচ্ছে।তিতিরের চোখেমুখে মোটেই লাগছে না।তবুও তার রাগ হচ্ছে।
____”শ্বাস নিতে পারছি না।ফেলুন।”
ঈশান স্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে।স্বাভাবিক গলায় বললো,
____”গাড়িতে গিয়ে বোস।আমি শেষ করে আসছি।তোকে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আসি।”
বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আসি ামনে কি! ঈশান বাড়ি যাবে না?সময় কত এখন!হাতের ঘড়িতে তাকালো।দেখা গেলো না সময়।ঈশানের ফোন ক্রমাগত ভাইব্রেট হচ্ছে। কেউ কল করছে হয়তো।ঈশান তুলছে না।খুব সম্ভবত বাড়ি থেকে।নাও হতে পারে।
____”গিয়ে।বসতে বললাম তো গাড়িতে।আসছি আমি।”
তিতির কথা বাড়ায় না।তপ্ত মেজাজ নিয়ে গাড়িতে এসে বসে।সামনে রাখা নিজের ফোন চেক করে।বাড়ি থেকে অসংখ্য কল,মেসেজ বোনদের,বড় মামানীর।তিতির কল ব্যাক করে প্রথমে শাশুড়ী কেই।
____”মামনী?”
ওপাশ থেকে শোনা যায় ভয়ার্থ কন্ঠ।
____”,ঠিক আছিস মা?”
____”কি হবে আমার?”
____তমা বললো ঈশান রেগে আছে।কোথায় তোরা?কিছু বলেছে?এতক্ষণ কল ধরছিস না কেনো তোরা?”
তিতির বাড়ির সবার চিন্তার কারণ বোঝে।একই ভয় তো সেও পাচ্ছিলো।তবে ঈশানের মধ্যে সেসব নিয়ে তো কিছু বলতে শোনা গেলো না,আবার রাগও বোঝা যাচ্ছে না।
____”,আমরা ঠিক আছি মামনী।তোমার ছেলে আমাকে একটু ঘুরতে নিয়ে এসেছে।রাগারাগি করেনি।”
তিতির খুলে বললো সবটা।রাহেলা দেওয়ান কি যে খুশি হলো ছেলে,ছেলের বউয়ের এমন মিল কল্পনা করে।হাসতে হাসতে ফোন রাখলেন।ইচ্ছে মতো ঘোরাঘুরি করেই ফিরতে বললেন।
তিতির ফোন রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।ঈশানের মধ্যে গাড়িতে আসার কোনো তাড়া নেই।একেরপর এক সিগারেট এ টান দিতে ব্যাস্ত!একটা মানুষ একটানা এভাবে সিগারেট কিভাবে খায় জানা নেই তার।ফুসফুস ঝাঝরা হতে আর বেশি দেরি নেই।হাতের সিগারেট টা শেষ করে ঈশান এসে বসলো গাড়িতে।কেমন অস্থির লাগছে মানুষ টাকে।মাথা খানিক এলিয়ে দিয়ে রাখলো সিটে।তিতির আড়চোখে দেখছেস সবই।জিজ্ঞেস করবে কি হয়েছে!নাহ থাক।কি দরকার।স্থির হয়ে বসে থাকে সে।ঈশান চোখ খুলে ড্রাইভিং শুরু করে।গাড়ি ঘুরিয়ে পাকা রাস্তায় তোলে।তিতির সাতপাঁচ ভেবে পায়না সিগারেট টানতে এই রাজ্যে আসার কি দরকার ছিলো।আসলোই যখন,তাকে আনা হলো কেনো!
গাড়ি কিছুক্ষণ এর মধ্যেই আবারও মেইন রোডে উঠলো।সময় দেখলো তিতির।পোনে এগারোটা বাজে।বেশ রাত।গাড়ির পরিমাণ ও কেমেছে বেশ।
____”আমার থেকে মুক্তি চাস তুই হু?”
এই লোক কখন যে কোনকথা বলে তার হদিশ পায়না তিতির।এই যেমন এখন এই প্রশ্নের আশা সে করেনি।এখন কোন পরিপ্রেক্ষিতে ঈশানের এ প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হলো জানা নেই তার।তবে জবাবও দিলো,
____”আমার ওপর চাপিয়ে দেবেন না সবটা।আপনি চান।আমি বাস্তবায়ন করবো সেটা।”
ঈশান গাড়ির গতি কমায়,বেশ ধীরেসুস্থে চলছে গাড়ি।সময় বাড়ানোর জন্য এই সামান্য চেষ্টা। তিতির সেটা ধরতে পারলো না হয়তো।ঈশানের হাত শক্ত করে চেপে ধরলো স্টেয়ারিং।
____”এসব মাথা থেকে ঝেরে ফেল।”
____”আজ ঝারতে বলবেন,কাল আমাকে চড় থাপ্পড় দিয়ে অন্য মেয়েকে কাছে টেনে বোঝাবেন দূরে যেতে।মগের মুল্লুক? “
____”কোন মেয়েকে তোর সমানে কাছে টেনেছি আমি?”
____”সামনে নাকি পিছনে সে খবর আমি জানবো কি করে।আপনার মুখেই শোনা।”
তপ্ত শ্বাস ফেলে ঈশান।গম্ভীর গলায় বলে,
____”যদি বলি এ জীবনে বেচে থাকতে আমার থেকে মুক্তি নেই তোর।”
তিতির বাকা হাসে।
____”মৃত্যুতে তো আছে?তাহলেই হবে।”
ঈশানের মুখ কঠিন হয়ে এলো।ধমকের গলায় ডেকে উঠলো,
____”তিতিইইর…”
তিতির সে ধমকে গা করলো না।একই কন্ঠে বললো,
____”বিচ্ছেদটা জরুরি।যেকোনো একটায় হলেই তো হলো তাইনা?”
ঈশান আচমকা কর্কশ শব্দে ব্রেক কষলো গাড়িটা।শো শো করে বড় বড় গাড়ি পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে তাদেরকে। ঈশান চিৎকার করে উঠলো একপ্রকার,
____”এক কাজ কর।খুন করে ফেল আমায়।”
তিতির আবারও বাঁকা হাসে।যেনো ঈশান বেশ মজার কথা বলেছে তাকে।ফিচেল গলায় বলে,
____”ওটা তো আমার বলা উচিত।”
ঈশান রাগান্বিত মুখে তাকিয়ে এখনো।
____”চিন্তা নেই।মৃত্যুই যদি আমাদের বিচ্ছেদ এর একমাত্র পথ ও হয়। আমি সে পথেও হাটবো।”
____”আমাকে এতোটা অপছন্দ করিস?যেকোনো মূল্যে বিচ্ছেদ টা জরুরি?হুম?”
তিতিরের না চাইতেও ছলছল করে উঠলো চোখজোড়া। ঈশানের কন্ঠে সে রাগের হদিশ পেলো না।কেমন একটা অভিমান পেলো।তার মন খুব করে চাইলো ঈশান একটা বার তাকে বুকে টেনে নিয়ে অন্যসব যুক্তি পাশে রেখে একটাবার বলুক।”তিতির ভালোবাসি তোকে।তাই বিচ্ছেদ টা চাইনা।”
এটা বললেই আর কোনো যুক্তির প্রয়োজন হবে না তার।না কোনো তৃতীয় পক্ষ কে তাদের মাঝে আসতে দেবে।তবে ঈশান তা কখনো বলবে না।তাকে তো ঈশান আদৌ ভালোইবাসেনা।
____”কি হলো?এত অপছন্দ করিস?”
তিতির মাথা নিচু করে ফেললো।কান্না লুকাতে চাওয়ার প্রচেষ্টা। নিচু গলাতে বললো,
____”ভুল ভাবছেন দেওয়ান সাহেব। সম্পূর্ণ ভুল।অপছন্দ নয়।বরং বিষয়টা উল্টো।একদম উল্টো।আপনাকে খুশি করতে এই বিচ্ছেদ টা দেবো আমি।এটাই আমার কাছে আপনার প্রথম চাওয়া ছিলো।সে চাওয়া পূরন না করে জোরজবরদস্তি বিয়ে টিকিয়ে আপনার সাথে বাঁচতে চাওয়ার মতো যন্ত্রণা আমি আপনাকে দিতে চাইনা।এখন মনে হচ্ছে অনেককিছু হয়তো।পরিবার, সমাজ,হাবিজাবি। হয়তো আপনার মহান মন আমার সম্মান এর কথাও ভাবছে।তাই এমন বলছেন।তবুও…আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ তাহলে তার জন্য। তবে ভালোবাসায় অভ্যস্ত আমি।ভালোবাসা ছাড়া কাগজ-কলমের চুক্তির জন্য আমি কারোর সাথে সারাটাজীবন কাটিয়ে দিতে পারবনা।আমাকেই ক্ষমা করবেন।”
ঈশান থ মেরে শোনে কথা গুলো।যুক্তিশতভাগ সঠিক।নিজেকে অসহায় লাগছে কেনো তার। হুম!কারণ কি।নিজের অবচেতন মন তিতির কে কিছু একটা বলার জন্য ছটফরট করছে।কি বলতে চাইছে।মুখে প্রকাশ হচ্ছে না কেনো তার।তার ভিতরে যা চলছে তা সত্যি! কিভাবে হয়!তাদের বিয়ে সবে এক মাস।তার আগে হাতগোনা কয়েকটা দিন দেখেছে মেয়েটাকে।এরই মধ্যে ভালোবাসা হয়!সে ভালোবাসে তিতিরকে ! নাহ তা কি করে সম্ভব। আগে তাহলে কাউকে ভালোবাসতে পারেনি কেনো!রুষাকে পারেনি কেনো!অন্য মেয়েদের! কি সমস্যা ছিলো।এখন এমন অনূভুতির কারণ কি।এটাকে কি ভালোবাসা বলে?সে বুঝতে পারছে না কেনো!
তিতির চুপ করে থাকে।মনে মনে হয়তো এক আকাশ সমান আশা করলো ঈশানের মুখ ফুটে একটাবার ভালোবাসি বলার।ঈশান তা করলো না।গাড়ি চালু করলো।একটা শব্দও আর উচ্চারণ করলো না কেউ।
তিতিরের কান্না পাচ্ছে। ভীষন কান্না পাচ্ছে। ঈশানকে আকড়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে। এই বিশ-বাইশটা দিন কত কষ্টে ঈশানের থেকে আড়ালে থেকেছে সে।একমাত্র সেই জানে।কতবার ভেবেছে ঈশান তাকে ভালোবাসে,একবার হলেও সেদিনের করা আঘাতের জন্য অনুতপ্ত হবে।জোর খাটিয়ে না। একবার ভালোবাসি বলে কাছে আসবে তার।ঈশান আসেনি।ফিরেও তাকায় নি।একবার ভালোবাসি বললে এ দুনিয়ার সব যুক্তি ফেলে ঈশানের কাছে নিজেকে সমর্পণ এ রাজি সে।নিজ ইচ্ছায় ধরা দিতে প্রস্তুত স্বামী নামক বৈধ পুরুষের কাছে,তার ভালোবাসার পুরুষের কাছে।তার পর মরণও কবুল।কিন্তু নাহ,সেটা তো হওয়ারই না।তিতির চোখ বোজে।কান্না গিলে ফেলার নিদারুণ চেষ্টা।
ঈশান দ্রুত গতিতে ড্রাইভ করতে ব্যাস্ত।বাড়ির রাস্তা লোকেশন এ দেখাচ্ছে আর আধঘন্টা।চোখ জ্বালা করছে তার।শরীর কাঁপছে! কি আশ্চর্য। ঈশান আরশাদ দেওয়ান এর শরীর কাপে মানে!নার্ভাস সে! সে কি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে দিন কে দিন।নিজের অনূভুতি বুঝতে না পারার জন্য! মনের ভিতরে তার আসল অনূভুতি বাইরের কঠিন দুনিয়ায় ওই বাচ্চা,আবেগী মেয়েটাকে জানাতে না পারার জন্য এ অসুস্থত কি!কেনো বুঝতে পারছে না সে।এটা ভালোবাসা!সত্যি ভালোবাসা!কাপুরষ মনে হচ্ছে নিজেকে।সে ভালোবাসতে জানে!আগে কেনো টের পায়নি।গাড়ির ওপরের লুকিং গ্লাস হালকা ঘুরিয়ে দিলো তিতিরের দিকে।তিতির চোখ বন্ধ করা।বারবার নিজের দৃষ্টি আটকাচ্ছে মেয়েটার চাঁদবদন লাল হওয়া মুখটার দিকে।
_____”শারিরীক চাহিদা ভালোবাসা নয়,গোটা একজীবনে কোনো নারীর প্রতি এই বাজে অনূভুতি নিয়ে তাকাই নি আমি।তোর কাছে এলে গোটা দুনিয়া ভুলে সেসব মাথায় হানা দেয় কেনো বলতে পারিস?হুম?লুকিয়ে লুকিয়ে তোকে দেখি কেনো? জবাব আছে তোর কাছে।বিয়েটা তো জোর জবরদস্তি তে হলো,তাহলে কেনো মনে হচ্ছে গোটা একটা জীবন আমার তোর সাথে বাধা পরেছে,যে বাধন ছুটে গেলে আমিও বিলীন হয়ে যাবো?তোকে আঘাত করার অনুতাপে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছি।তোকে ভালোবাসি কি না তোর এই প্রশ্নের জবাব দিতে না পারার আক্ষেপে বুকের বা পাশটা ঝলসে যাচ্ছে।এ কেমন দহন আমার বল তো তিতির।এটা কি ভালোবাসা?কি নাম দেব এই দহন অনূভতির?এ প্রশ্নের জবাব কে দেবে আমাকে হুম?মুক্তি কোথায় এ যন্ত্রণা থেকে আমার?আমি ছন্নছাড়া পুরুষ তিতির,তোর দুনিয়া আর আমার দুনিয়া সম্পূর্ণ আলাদা।তুই ফুল আমি আগুন।আমাদের মিলন সম্ভব কি?কিন্তু আমার তোকে চাই,কাছে চাই।নিজের সাথে মিশিয়ে ফেলতে চাই।আমার মাঝে তোর অস্তিত্ব বিলীন দেখতে চাই আমি।এটা ভালোবাসা কি?আমার জানা নেই!ঈশান আরশাদ কাউকে ভালোবাসতে পারে কি!এ প্রশ্ন টা নিজেকে কখনো করতেই শিখিনি।আজকাল খুব করতে মন চায়।তবে তোর সাথে করা জোরজবরদস্তির, আঘাতের অনুতাপে আমি আয়নায় নিজের সাথে দৃষ্টি মেলাতে পারি না।আয়নায় আমার প্রতিচ্ছবি যদি সত্যি জবাব দেয়! আমিযে ভয় পাচ্ছি যদি সেটাই বলে…তখন!তখন তো তোকে সহ পুড়ে যাবো আমি!তোর সুন্দর জীবনটা পুড়ে ছারখার হবে।ঘৃনা কঠিন জিনিস।অনায়াসে ভালোবাসাকে পায়ে পিষে ঘৃনার জোরে মানুষ বেচে থাকে।কিন্তু ভালোবাসা আরও কঠিন।এটায় শুধু ধ্বংশ।আমি তোকে ভালোবাসি না বলে ছুলে তুই ঠিক আমার ওপর ঘৃনা নিয়ে দূরে গিয়ে বাচতে পারবি,কিন্তু.. কিন্তু ভালোবাসি বলে ছুলে,কাছে টানলে।তারপর…তারপর যদি কখনো আমাদের সত্যিই আলাদা হতে হয়।তখন!তখন তুই বাঁচতে পারবি না আমাকে ছাড়া। এ ভয়টাই পাই আমি।কঠোর ভাবে ভয় পাই।আমি চাইনা আমার অনূভুতি জানতে,সেটা জেনে তোকে জানাতে।চাইনা…”
মনের মনে কথাগুলো অনবরত আওড়াচ্ছে ঈশান।বাড়ির সামনে চলে এসেছে তারা।গাড়ি থামতেই চোখ মেললো তিতির।মেয়েটা ঘুমায় নি।ফোন,পার্স হাতে গাড়ি থেকে নেমে সরে দাড়ালো।ঈশানের গাড়ি ভিতরে ঢুকবে সেই আশায়।তবে ঈশান গাড়ি ঘুরিয়ে আবার রাস্তার দিকেই করলো।
তিতির ভ্রু কুচকে এগিয়ে এসে নিচু হয়ে।বললো,
____”বাড়ি আসবেন না?”
ঈশান তাকালো না তিতিরের দিকে।গম্ভীর গলায় বললো,
____”ঢাকা যাচ্ছি,কবে ফিরবো বলতে পারছি না।”
গাড়ি চলতে শুরু করতেই দ্রুত পায়ে আবার গাড়ির সাথে তাল মেলালো তিতির।
____”বাড়ির সবাই টেনশন করবে তো।হঠাৎ.. .”
____” জানিয়ে দেবো।আর জীবনে যাকিছু হয় হঠাৎ ই হয়। দ্রুত ভিতরে যা।আংকেল গেট আটকে দিন।”
দারোয়ান খানিক দূরেই দাড়ানো।মাথা নাড়লো।তিতির এর দিকে ভুলেও তাকালো না ঈশান।ধুলো উড়িয়ে চোখের আড়াল হলো।তিতির স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইলো
ঈশানের আজকে ঢাকা যাওয়ার কথা ছিলো বুঝি!কই সে তো জানতো না।জানবেই বা কি করে। সেদিন এর পর তো কথাই হয়নি।আর না তো ঈশানকে নিয়ে সে কাউকে জিজ্ঞেস করেছে।
____”আম্মাজান ঘরে যান।গেট আটকায় দেই।”
তিতির ধীর পায়ে গেটের ভিতরে আসে।বুকটা হু হু করছে।ফাঁকা ফাঁকা লাগছে তার।আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।যে তাকে ভালোবাসে না তার জন্য বুকটা পোড়ে!মানে হয় কোনো।
গাড়ির গতি হাই স্পিডে উঠে গেলো চোখের পলকে।অশান্তি লাগছে তার।হাতটা অবশ লাগছে।নিজেকে অসহায় লাগলো তার।বোকা, কাপুরুষরাই নিজের অনূভুতি বোঝেনা,বুঝলেও প্রকাশে অপরাগ…চোখের সমানে ভাসছে তিতিরের পুতুলের মতো মুখখানা।ছলছলে চোখ,ভেজা ঠোটজোড়া।স্টিয়ারিং এ জোরে আঘাত করলো সে।শব্দ করে গান ধরলো,
সাঁঝের মায়া পর্ব ২৯
একা রাত বাকা চাঁদ,
লাগেনা ভালো রে আর,
নেই রোধ নাই রং
জানি নেই কিছুই করার,
পড়ছে মনে মুখের আদোল
ভাঙ্গে বুক ভাংছে পাহাড়,
মন মাঝি রে.. বল না কোথায়
মন মাঝি রে.. আয় ফিরে আয়
আয় ফিরে আয়, আয় ফিরে আয়
আয় ফিরে আয়।
