সাঁঝের মায়া পর্ব ৫২
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
আকাশে নানা রঙের আলোকছটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কখন রক্তিম, কখনো বা হলুদ আভা দিচ্ছে। সাঁঝবেলা এখন! বিকেল পার হয়ে গিয়েছে, সাঁঝের শুরু এখনই। মাগরিবের আজান পরেনি । মিনিট পাঁচেক পরে সম্ভবত দেবে আজান। অনাথ আশ্রমের ছেলেমেয়েদের হাতমুখ ধুয়ে ঘরে ওঠার তাগাদা দিচ্ছেন তাদের দেখা শোনার জন্য বরাদ্দকৃত মহিলারা। এদিকটায় বৃদ্ধাশ্রমের পৌঢ়াদের আড্ডা চলছেই। বাগানের দিকটা তাদের পদচারণায় মুখর। বিকেল থেকে হাটাহাটি করেন তারা। নিচতলায় বারান্দায় বসে বাগানের মালিদের একের পর এক কাজের বায়না দিয়ে যাচ্ছেন চন্দ্রা দেওয়ান। এটা সেটা বুঝিয়ে দিচ্ছেন বারংবার।
ঈশানদের আগামীকাল ফিরে যাওয়ার কথা। এ নিয়ে তার মনটা ভীষন খারাপ হয়ে আছে। ছেলে মেয়ে দুটো এসে এখানে দু দন্ড বসলো কখন! আজ তো গোটা দিন তার পুতুলটা জ্বর বাঁধিয়ে বসে আছে। তবে কিচ্ছু করার নেই। ঈশানের ফিরতেই হবে।ওদিক থেকে রাইসুল দেওয়ান ও জোর তাগাদা দিচ্ছেন ছেলেকে দ্রুত ফিরতে। অগত্যা, কেনো উপায়ন্তর না পেয়ে যাওয়ার অনুমতি দিতে হয়েছে বৃদ্ধাকে। সে বাড়ি ফিরবে আরও দিন বারো পরে। এদিককার ভবনের কাজ একদম শেষের দিকেই।
তিতিরের জ্বর এবেলা কমেছে। সে এসে বসেছে তার পাশেই। টুকিটাক আলাপ হচ্ছে এদিককার আশ্রম নিয়েই। ঈশান বেরিয়েছে খানিক আগে। কি এক দরকারি ফাইলপত্র জরুরি ভাবে ফটোকপির প্রয়োজন। ঘুম থেকে ওঠার পর ঈশানের দেখা পায়নি মেয়েটা। জ্বর কমলেও, একদম ছাড়েনি। ব্যাথায় জর্জরিত গোটা শরীর। চিনচিন করে ওঠে প্রতিটি অংশ। দাড়িয়ে থাকতে কষ্ট হয় বেশ। তলপেট খিঁচে, পা জোড়া অবশ হয়ে আসে। চন্দ্রা দেওয়ান দেখে নাতনিকে। একদিনের জ্বরেই বেশ শুকনো লাগছে মেয়েটাকে। নাতনির দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলেন,
—’সবসময় কি ইচ্ছেদের প্রশ্রয় দিতে হয় নানু? ‘
—’কি হয়েছে? কিসের কথা বলছো?’
—’কাল রাতে এলোমেলো ঝড়,বৃষ্টি। অসময়ের এই বৃষ্টিতে মাঝরাতে ভেজে কেউ? এই-যে জ্বর এসে ঘোরাঘুরি টা মাটি করে দিলো। সুস্থ থাকলে দিব্যি ঘুরতে যেতে পারতে।’
প্রকাশ করতে না চাইলেও ফর্শা গালে এসে ভির জমায় রক্তিম রঙ। ফুলো ফুলো গালদুটো টকটক করছে যেনো। বৃদ্ধা শান্ত গলায় বলেন,
—’এখন কি ভালো লাগছে খানিকটা? নিচে এলে যে! দাদুভাই ফিরে যদি দেখে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমেছো৷ রেগে যাবে কিন্তু। ‘
তিতির মাথা রাখে বৃদ্ধার হাঁটুর ওপর। মিহি কন্ঠে জবাব দেয়,
—’সে তো পারেই রাগতে৷ আর কি পারে! রাগুক।’
—’অভিমান হয়েছে বুঝি! কি করেছে আমার নাতিটা? সারাদিন সিওরে বসে বসে যত্ন করে গেলো। আর বেলা শেষে তার ওপরই অভিমান করা হচ্ছে?’
—’জ্বর বাঁধার কারণ যেহেতু সে, সেবাও তারই করা উচিত। ‘
তিতিরের মিনমিন করে বলা কথাটুকু সম্ভবত কর্ণগোচর হলো না পৌঢ়ার।
—’কিছু বললে নানু?’
তৎক্ষনাৎ মাথা নাড়লো না সূচক বোঝালো তিতির। কিছু বলেনি সে।
—’কালকেই চলে যাবে?’
—’তোমার নাতি তো তাই বললো।’
—’আমার নাতি টা ভালোবাসা দেয় তো পুত্তুল? হ্যা? কোনোকিছুর কমতি রাখে না তো?’
চন্দ্রা দেওয়ান নাতির মাথা হাত রেখে ভীষন নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন কথাগুলো।
—’দেয় নানুআপু। সব দেয়। কোনো কমতি নেই।’
—’সত্যি তো?’
—’মিথ্যা বলবো আমি তোমায়?’
দীর্ঘশ্বাস ফেললো বৃদ্ধা৷ নাতনির চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললো,
—’ এ বাড়ির ছেলেদের তো আমি চিনি নানু। একটা সময় তো এটাও মনে হয়েছে, হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে তোমাদের বিয়ে টা দিয়ে দিলাম কি-না। দাদুভাই শেষ পর্যন্ত কতটুকু কি দায়িত্ব পালন করবে! ওর জেদ কে আমি ভয় পাই। তোমার শশুরের সাথে চাকরিবাকরি নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয়ে প্রায় দুই বছর ঘরের ছেলে ঘরে ফেরেনি। কালেভদ্রে আমার সাথে আর তোমার শাশুড়ির সাথে যোগাযোগ করতো। আর কারোর সাথে না। সেই ছেলেকে জোর করে, তোমার সাথে বিয়ে দিলাম। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো তোমাকে ভালো না বেসে ঈশান থাকতে পারবে না। কিন্তু, তারপরও। ওর জেদ কে ভয় পাই আমি। অত্যাধিক রাগ ছেলেটার। রেগে গেলে কি করে,কি বলে টের পায়না। তাই জিজ্ঞেস করছি। এমন তো নয় –যে আমার মন রক্ষার্থে তোমরা এমন স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক দেখিয়ে বেরাচ্ছো। আমাকে খুশি করতে?’
তিতির মাথা তুললো। মৃদু হাসলো তার কথায়। মিহি গলা বললো,
—’ সে-রকম কিচ্ছু না। তোমার নাতির যেমন জেদ,রাগ। তেমনই সে এককথারও মানুষ। যখন বলেছে আমাকে ভালো রাখার দায়িত্ব ওর, ও সেটা ঠিক পালন করবে। সাচ্ছন্দ্যে করবে। ভালো রাখবে আমাকে।’
—’ সুখ সাচ্ছন্দ্যের সংঙ্গা একেকজনের কাছে একেক রকম নানু৷ স্বামী সোহাগ আলাদা জিনিস। পয়সার সুখ দেওয়ার জন্য ওর হাতে তোমাকে তুলে দেইনি আমি। তাহলে তো আমি আমাদের থেকেও আমির লোকের ছেলের কাছে তোমাকে পাঠাতাম। তোমার চাচারও কম ছিলো না। তার ছেলের কাছেও দিতে পারতাম। কিন্তু আমি বড় দাদুভাইয়ের কাছে তোমাকে দিয়েছি ভালোবাসার লোভে। তুমি আমাদের চোখের সমানে থাকবে। তোমার নানাভাই,তোমার মায়ের স্বপ্নও পূরন হবে এই বিয়েটা হলে। সাথে আমাদের সবার ভালোবাসার ওপর দিয়ে আমার দাদুভাই ভালোবাসা দেবে তোমাকে। সেটা আমরা চোখের সমানে দেখবো শেষ অবধি। এই লোভ হয়েছিলো আমার, নানু। তোমাকে নিশ্চয় আরও খুলে বলতে হবে না –আমি কোন ভালোবাসার কথা বলছি?’
তিতিরের চোখজোড়া আচমকা চিকচিক করে ওঠে। চোখের কোণে পানি জমে খানিকটা। চশমার আড়াল থেকে বৃদ্ধার দৃষ্টিগোচর হলো সেটা৷ আঙুলে চিবুক তুলে আহ্লাদী কন্ঠে বললো,
—’স্বামী সোহাগ দেয়? হ্যা? দেয় সেই সোহাগ যেটায় নারীত্ব পরিপূর্ণ হয়? মন থেকে কাছে টানে? নাকি…’
চোখের কার্নিশ গড়িয়ে পরলো কয়েকফোটা নোনাজল। চোখেমুখে প্রাপ্তির রেশ। প্রাপ্তির কান্না বুঝি এটা! তিতির কান্না গিলে আধো গলায় বললো,
—’তোমার নাতি আমাকে খুব ভালোবাসে, নানু। ও মুখে বলে না। আর দশটা স্বামীর মতো,পুরুষের মতো ও মুখে কিচ্ছু বলে না। কিন্তু পৃথিবীর সব সুখ আমার পায়ের কাছে এনে দিতে প্রস্তুত। ভালোবাসা কোনটা–সেটা টের পাওয়া যায়। কোনো পুরুষ কি মনোভাবে একটা নারীকে স্পর্শ করতে পারে, একজন নারী হয়ে আমি সেটা টের পাই নানু। তোমার নাতি মুখে ‘ভালোবাসি’ না বললেও প্রতি পদক্ষেপে আজকাল আমাকে অনূভব করায়, কতটা ভালোবাসে সে আমাকে। শুরুর ঈশান আর আজকের ঈশানের মধ্যে কোনো মিল নেই নানু৷ তুমি ভুল মানুষের হাতো তুলে দাওনি আমাকে। তোমার নাতির স্পর্শে ভালোবাসা থাকে, চিরাচরিত পুরুষের মতো শুধু চাহিদা নয়। পৃথিবীর সব আবেগ,ভালোবাসা এক করে সে আমাকে ছুঁয়েছে, নানু। আমার নারীত্ব পূর্ণ করেছে। ভালোবাসে সে আমায়৷ এতে কোনো ভুল নেই। এ জীবনে তার মুখে ‘ভালোবাসি’ শব্দটা না শুনেও আমি একবুক আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারবো সে আমার, আমাকেই চায়। ‘
হু হু করো কেঁদে ফেললেন বৃদ্ধা। তার দায়িত্ব ফুরালো বুঝি! ফুরালোই তো। ঈশান তিতিরের বিয়ে দিয়ে বুকের ওপর পাথর চাপা দিয়ে থাকতেন তিনি। নাতনির জীবনটা নিজ হাতে ধ্বংস করলেন কি-না সে-সব ভেবে ভেবে পাগল হতেন। ঈশান মুখে বললেও, সে নিজে মনে মনে ভরসা করতে পারতেন না। হয়তো দায়িত্ব নেবে, হয়তো নয়। ঈশান যখন বলেছে তিতিরের দায়িত্ব সে শেষ অব্দিই নেবে। কিন্তু স্বামীর আদর,সোহাগ! সে-সব মন থেকে দেবে তো মেয়েটাকে! আজ নিশ্চিন্ত হলেন বুঝি। তিতিরের মুখ দেখে পড়ে ফেললেন অনেক কিছুই।
গভীর রাত এখন৷ বেঘোরে ঘুমাচ্ছে তিতির। ঈশানও শুয়েছে খানিক আগেই। রাত কত বাজে! সম্ভবত দু’টোর কাছাকাছি। ওদিকে সে যখন ফেরে তখন প্রায় সাড়ে দশটা বাজে৷ এসে তিতিরকে জাগা পায়নি। বলাবাহুল্য আজ সারাদিন তিতিরের সাথে একটা কথাও বলা হয়নি। জ্বরের ঘোরে দু’একটা যা বলেছে আরকি। তারপর মেয়েটা ঘুমিয়ে গেলে কিছু কাজে তাকে বের হতে হয়। ফিরতে ফিরতে রাত। ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়েও পরেছে এরইমধ্যে ! রেগেটেগে ঘুমিয়েছে নাকি! জ্বর নেই তেমন। হালকা গরম। তবে শরীর যে দূর্বল তা ঘুমের গভীরতা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ঈশানের খিদে নেই। বউয়ের হাতে খেতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। উহু, সেটাও না। বউটাকেই কাছে পেতে মন চাচ্ছিলো। তা সে ননীর পুতুল তো একদিনের স্বামীর আদরেই কুপোকাত। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঈশান। গোটা জীবন পরে আছে। কবে তাকে সহ্য করতে শিখবে মেয়েটা!
ঈশান লম্বা একটা কোল্ড শাওয়ার নিয়ে উদাম শরীরে ঢুকে গেলো কমফোর্টের নিচে৷ এসির পাওয়ার কমিয়ে দিলো খানিকটা৷ আলগোছে তিতিরকে টেনে নিলো নিজের কাছে৷ মেয়েটা একটুও নড়াচড়া করলো না। ঈশান কোমড়ে হাত চেপে টেনে নিয়ে এলো নিজের দিকে। ফিসফিস করে বললো,
—’একটু অপেক্ষা করতে পারতি না? আদর পাওয়া হয়ে গেছে, এখন খালি পালাই পালাই? হুম? আমার আর সেটা চলবে না। ফার্স্ট টাইম বলে ছাড় দিলাম এবার৷ এরপর আর সেটা হচ্ছে না। রোজ সহ্য করতে হবে আমাকে,আমার মতো করেই। নিজেই চেয়ে নিবি। তখন আমিও আর দুনিয়াদারির এতো কথা ভাবতে পারবো না কিন্তু। আমার আদর কঠিনই হবে। আর কঠিনে অভ্যস্ত হতে হবে তোকে।’
ঘুমন্ত তিতিরকে একটা জলজ্যান্ত পুতুলই লাগছে। ফুলো ফুলো গাল মেয়েটার৷ ঈশান নিজের সাথে মিশিয়ে নেওয়ায় বাঁ গালটা তার উদাম বুকে লেপটে আছে৷ সামান্য ফাঁক হয়ে আছে গোলাপি অধরজোড়া। ঈশান নিজের ঠোঁটের ভাজে নিয়ে নিলো মেয়েটাট ওষ্ঠপুট। বাঁ হাতটা মেয়েটার গ্রীবাদেশ আঁকড়ে গভীর চুম্বনে মগ্ন হলো। তিতির ঘুমায়নি। ঈশানের অপেক্ষাতেই ছিলো। লোকটা যতক্ষণ শাওয়ার নিলে ততক্ষণ অপেক্ষা করেছে। আচমকা এরকম এসে কাছে টানবে তা কে জানতো।
ঈশান খেয়াল করে ঘুমের ঘোরেও হাসফাঁস করে উঠছে মেয়েটা৷ ছাড়া পেতে নড়াচড়া করছে৷ ঈশান ছেড়ে দিলো। হাস্কিস্বরে বললো,
—তোর সুস্থ হওয়া অবধি যদি অপেক্ষা করতে না পারি! আজ তোর এই ঘুমের ফায়দা নেই যদি আমি। খুব কি অন্যায় হবে হুম? ‘
তিতিরের শরীর জমে আসে যেনো। লোকটা কি এখন আবার… চোখ মেলবে কি! ঈশানকে বুঝতে দেবে —যে সে আদতেে জেগেই? সাতপাঁচ ভাবাভাবির মাঝে কয়েক সেকেন্ডের ব্যাবধানে ঘটে গেলো কিছু একটা৷ তিতিরের রক্তমাংসের শরীরে স্পর্শ পেলো অন্য একটা দেহের। ঈশানের ঠোঁট ছুঁয়েছে তিতিরের তুলতুলে উদর৷ ঠোটের স্পর্শের অগ্রগতি হচ্ছে পেট থেকে বক্ষজোড়ার ভাজের দিকে। ঢিলেঢালা কুর্তিটা এখনো শরীরেই জড়িয়ে আছে। খোলা হয়নি সেটা৷ কিন্তু ঈশানের মাথা তার জামার ভিতরে। কেমন ঘনঘন শ্বাস টানছে। প্রান ভরে টেনে নিচ্ছে তিতিরের শরীরের মেয়েলি মিষ্টি ঘ্রান। কতক্ষণ পর!
দু হাতে চাদর খামচে ধরলো মেয়েটা। মনে মনে শহ সহস্র গালি দিলো ঈশানকে। তবে তিতিরের ধারনা মোতাবেক কিছুই হলো না। মিনিটখানেকের মধ্যে নিঃশ্বাস ভারি হয়ে এলো ঈশানের। হতভম্ব হলো মেয়েটা৷ সে তো ঠোঁট কামড়ে পরে ছিলো মরার মতোন। ঈশান ঘুমিয়ে গিয়েছে। সারাদিন পর শান্তির ঘুম। ঈশানের অতি প্রিয় জায়গা এটা। এইখানে মুখ গুঁজে পৃথিবীর সব শান্তি মেলে যেনো।
রাত বেশি হয়নি৷ ঘুমে কাতর দুজনেই। তিতিরের একহাত ঈশানের চুলে অন্য হাত পিঠ আঁকড়ে আছে। বলাবাহুল্য তিতিরের অসভ্য পুরুষ, ঘুমের ঘোরে আরও একটু শান্তি খুঁজতে তিতিরের শরীরে জড়িয়ে থাকা জামাটা অনেক আগেই খুলে ফেলেছে। তিতির টের টুকু অবধি পায়নি। ঈশানও অবশ্য সজ্ঞানে করেনি কাজটা৷ নিজের শীতল গাত্রে তিতিরের উষ্ণ শরীরের স্পর্শে বেশ আয়েশেই ঘুমিয়ে আছে বেচারা।
তবে সে শান্তির ঘুম স্থায়ী হলো না বেশিসময়। ভাইব্রেট করে উঠলো সেলফোনটা । নড়েচড়ে উঠলো দু’জনেই। বিরক্তসূচক শব্দ করে তিতিরের সুডৌল বুকের ভাজে নাকমুখ ঘষলো ঈশান। ঘুম ভাঙলো না বেচারার। তবে চোখ মেললো তিতির। কপালে সরু ভাজ ফেলে হাত বাড়িয়ে খুঁজলো ফোনটা৷ কার ফোন বাজে এতো রাতে? খানিকটা দূরেই রাখা ফোনটা। উঁচু হয়ে হাতে নেবে ফোনটা সে উপায় রাখেনি লোকটা। দু’হাতে সাপের মতো পেচিয়ে রেখেছে তিতিরকে। এতক্ষণ কিছু একটা বোধদয় হলো মেয়েটার। গায়ের কমফোর্টার ঈশানের নড়াচড়ায় খানিকটা সরে যেতেই চোখে পরলো নিজের খোলামেলা শরীরটা। বক্ষ বিভাজনটা শুধু মাত্র ছোট্ট একটু কাপড়ে আবৃত। তাছাড়া সর্বাঙ্গে ঈশানের উদান শরীর লেপটে আছে। তিতিরের পায়ের তলায় সুড়সুড়ি দিলো যেনো কেউ। তলপেট চিনচিন করে উঠলো। শ্বাস ফেললো জোরে জোরে।
—’উমমম। ডোন্ট মুভ। নড়াচড়া করলে ফিল করতে কষ্ট হয়। সারাদিন পর ঘুম, ঘুমাতে দে।’
পাথরের মতো স্থির হয়ে গেলো তিতির। মেয়েটার নড়াচড়া বন্ধ হতেই সন্তুষ্ট দেখালো ঘুমন্ত মুখটা। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে পুনরায় ডুব দিলো বুকের ভাজে।
রমনীর নাজুক দেহখান কম্পিত হচ্ছে। বুকটা ধরফর করছে। ঈশানের চুলের আঙুল গুঁজে ফিসফিসিয়ে বললো,
—’ কি আছে এই শরীরে, হু? কি শান্তি পান এই শরীরের ঘ্রান টেনে? বালিশ ছেড়ে এই বুকের ভাজে মুখ গুঁজে? নিজে তো দিব্যি ঘুমে। পাগল করছেন আমাকে!’
দ্বিতীয় বারের মতো ফোন শব্দ করতেই ঈশানকে জড়িয়ে খানিক কাত হয়ে ফোনটা হাতে নিলো তিতির। সাইলেন্ট করলো সর্বপ্রথম। তার নয়, ঈশানের ফোন বাজছে। আননোন নাম্বার। এতো রাতে কোনো জরুরি কল কি! ঈশানকে ডেকে তুলবে কি-না বোধগম্য হলো না তিতিরের। তবে সে থমকালো খানিকটা। নেটওয়ার্ক সচল হয়েছে সবেই। ফোন স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করে ভেসে উঠলো একটা নাম। ট্রু কলারের হিসেব অনুযায়ী নামটা অনাকাঙ্ক্ষিত তিতিরের কাছে। ‘রুষমিতা ‘…
তিতির ফোনটা ধরার সাহস করে না। কাঁপা হাতে ফোনটা রাখে ঈশানের পাশ ঘেষে। সাইলেন্ট ছাড়িয়ে। প্রায় সাথে সাথেই এইবেলায় শব্দ করে বেজে উঠলো ফোন।
—’উফফফ, শান্তিতে একটু ঘুমাতেও দেবেনা নাকি!’
দু হাতে ভর দিয়ে তিতিরের বুক থেকে মুখ তুললো ঈশান। তিতির ঘুমেই। এই ধারনাই হলো তার। হাত বাড়িয়ে ফোনের দিকে তাকালো। অচেনা নাম্বার। নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে গিয়েছে। দেখা যাচ্ছে না কোনো নাম। বিরক্ত হয় ঈশান। নিজেকে ধীরেসুস্থে সরিয়ে আনে তিতিরের ওপর থেকে। মেয়েটার কামুক দেহ ঝটপট ঢেকে ফেলে চাদরে। মাথা ঘুরায় তার ওদিকে তাকালে। ফোনটা কানে ঠেকাতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো পুরুষালি কন্ঠ স্বর।
—’ঈশান আরশাদ দেওয়ান। ‘
—’বলছি।’
—’আশ্রমের গেটে আসতে হয় যে একটু। আপনাদের দারোয়ান গেট খুলছে না।’
বিছানায় উঠে বসলো ঈশান। কোমড়ের ট্রাউজার টা বিপদজনক ভাবে নিচে নেমে আছে। সেদিকে একনজর দিয়ে বিরক্ত কন্ঠে বললো,
—’কে আপনি? ‘
—’একজন শুভাকাঙ্ক্ষী। ঝটপট একটু নেমে আসুন স্যার। রুষমিতা মির্জার নামের শীগ্রই এরেস্ট ওয়ারেন্ট বের করার পায়তারা করা হচ্ছে। আমি চাই কাগজপত্র গুলো আগে আপনার কাছেই দেই। পুলিশে বিশ্বাস নেই আমার।’
ঈশান শান্ত মস্তিষ্কে শোনে কথাগুলো। রুষার বিরুদ্ধে প্রমান! এখানে তাকে দিতে! কে আসতে পারে। গভীর মন দিয়ে নাম্বার টা চেনার চেষ্টা করলো ছেলেটা। অচেনা থেকে চেনা মনে হলো না। ওপাশের মানুষটা ফিসফিস করে বললো,
—’ রেহনুমা ম্যাডামকে দিনাজপুর পাঠাবেন না স্যার। শিকারি জাল ফেলে রেখেছে। শিকারি কে বশে আনতে চান কি? সময় নষ্ট না করে দয়া করে নিচে আসুন।’
আবার তিতির? এখানে তিতিরকে টেনে এনেছে? ঈশান শব্দহীন নেমে আসে বিছানা থেকে। এসি বন্ধ করে সুন্দরমতো ঢেকে দেয় তিতিরকে। চেয়ারের ওপর থেকে শার্টখানা গায়ে জড়িয়ে পকেটে পুরে নেয় ‘ পয়েন্ট থ্রি টু ক্যালিবারের ‘ পিস্তল খানা।
নিঃশব্দে বের হয়ে গেলো ঈশান। বুকে চাদরখানা আকড়ে তড়িৎ উঠে বসলো তিতির। এখন অবধি তলপেটে চাপ লাগলে মাথায় চক্কর কাটে তার। দূর্বল পায়ে নেমে মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিলো জামাটা।
সেটা পরে এসে দাড়ালো বেলকনিতে। এখান থেকে ওদিককার প্রায় আধামাইল অবধি চোখ যায়। আলো আধারির খেলায় দ্রুত পায়ে গেট খুলে বাইরে যেতে দেখলো ঈশানকে। পাশের চেয়ারটায় ধীরেসুস্থে বসলো মেয়েটা। আর দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। লম্বা, উঁচু গেটের ওপাশ ঘেঁষে কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে সেটা চেখে পরবে না। ভুল দেখেনি সে। রুষাই ছিলো তখন ফোনে। ঈশান ওই মেয়েটার সাথে দেখা করতে বেরিয়ে গেলো! তাকে না জানিয়ে? না চাইতেও চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো মেয়েটার। ওড়নার অংশ দিয়ে মুছে ফেললো চোখ৷ বিরবির করে বললো,
—’ আমি রাহাত ভাইয়ের সাথে দেখা করেছিলাম বলে কি কাহিনিই না করলেন! কতভাবে কথার আঘাত করেছেন শুরু থেকে। অথচ! আমি কত কি-ই না মেনে নিয়েছি। আপনার এককথায় সব বিশ্বাস করেছি। তারপরও! তারপরও ওই মেয়ের সাথে এতো রাতে দেখা করতে চলে গেলেন! সারারাত আমার শরীরে শান্তি খুঁজে, আমার ঘুমের সুযোগে না বলে বেরিয়ে গেলেন! আমার কষ্ট হয়না? হচ্ছে না কষ্ট? ‘
গোটা আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ ঝলমল করছে। সুউচ্চ প্রাচিরের এপাশে আসতেই কয়েকহাত দূরের একটা সফেদ কার চোখে পরলো ঈশানের। দু হাত গোঁজা পকেটে। ডান হাতের তলায় ছয় ছয়টা বুলেট লোডেড পিস্তল। তবে গাড়ি খুলে কোনো পুরুষমানুষ নেমে এলো না। উঁচু হিলখানা শব্দ করে আছড়ে পরলো পিচ ঢালাই রাস্তায়। গাড়ি থেকে মাথা বের করে যে নারীটি দাড়ালো, তার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে এখানে আসেনি ঈশান। সুদর্শন মুখটা কালো হয়ে এলে, চোয়াল শক্ত হলো। ফোন কলটা কোনো স্ক্যাম এটার আন্দাজ আগেই করেছিলো। তবে রুষা হতে পারে এসবের পিছনে সেটা মাথায় ছিলো না। বড্ড বিরক্ত হলো ঈশান। হিলের খটখট শব্দ করে ক্রমশ দুরত্ব ঘোচালো মেয়েটা৷ ঈশানের কাছে ঘেঁষে দাঁড়ানোর আগেই ঈশান পিছিয়ে দাঁড়ালো দু কদম। গম্ভীর গলায় বললো,
—’কি ধরনের জোক ছিলো এটা? ‘
রুষার মুখে বিজয়ের হাসি খেলা করে গেলো। অমায়িক হেসে জবাব দিলো,
—’কতদিন পর দেখা বলোতো? দুই মাস একুশ দিন পর। কত সেকেন্ড, মিনিট,ঘন্টা পেরিয়ে গিয়েছে জানো? আই মিসড্ ইউ আ লট।’
ঈশানের গুরুগম্ভীর মুখটা নমনীয় হলো না এক কিঞ্চিৎ পরিমানও।
—’রুষমিতা মির্জা! নাকি ইয়াজ মির্জার তুরুপের তাস? কোন নামে ডাকলে খুশি হবেন?’
হাসি এক ঝটকায় কোথাও একটা হারিয়ে গেলো রুষার। ইয়াজের সাথে তার সম্পর্কের কথা ঈশান জানে! মেয়েটা ব্যাস্ত হয় ঈশানের কথার জবাব দিতে। ঈশান হাত এগিয়ে থামিয়ে দেয় তাকে। শান্ত স্বরে বলে,
—’ ছলনা তো রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মাঝরাতে অন্যের হাসবেন্ড কে মিথ্যা বলে ঘরের বাইরে বের করছেন!’
—’ওটা একা তুমিই পারো?’
—’আমার আর তোমার মধ্যে আকাশ পাতাল তফাত রুষমিতা মির্জা। ভুলে যেয়ো না।’
আজকের ঈশান আর আর তার ভালোবাসার ঈশানের মধ্যে এক আসমান সমান তফাত। ঈশান কখনো তাকে তুমি ডাকতো? উহু, ডাকতো না। আজই প্রথম। আগে হলে খুব খুশি হতো কি সে? হতো। আজ হতে পারছে না। তার বহু কারণ। ঈশানের সফেদ চেক শার্টের ওপরের দু’দুটো বোতাম আলগা। ঝিরিঝিরি বাতাসে বুকের ওপর থেকে সরে যাচ্ছে শার্টের অংশ। ফর্শা, লোমহীন বুকে,কন্ঠদেশে, কাধে অসংখ্যা নখের আচর, কালসিটে পরে যাওয়ার চিহ্ন। দাগগুলো কিসের! লাভবাইট! ঈশান আর ওই মেয়েটার বিবাহিত জীবনের সুখস্মৃতি! যা ঈশান গোটা শরীরে এঁকে ঘুরে বেড়াচ্ছে! বুঝতে সময় লাগলো না তার। আচমকা ঝড়ের বেগে ঈশানের কাছে এসে চিৎকার করে বললো,
—’ ভালো বাসো তুমি ওই মেয়েকে? ঈশান? বাসো ভালো?’
রুষার অগ্নিদৃষ্টি পরখ করলো ঈশান। তার অনাবৃত বুকের দিকে দৃষ্টি কি? হ্যা তাই। আচমকা এই প্রশ্নের কারণও টের পেলো সে। মাথা ঝুকিয়ে হাত দিয়ে ছুয়ে দিলো বুকের ওপরের আঁচড় গুলোতে। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
—’ ওই মেয়ে কাকে বলছো? মিসেস ঈশান আরশাদ বলো। বিয়ে করা বউ ও আমার।’
রুষার চোখের দৃষ্টিতে বোধহয় সামনের মানুষ ভষ্ম হতে বাধ্য। জ্বলজ্বল করছে চোখজোড়া।
—’এতগুলো বছরেও আমাকে কেনো ভালোবাসতে পারোনি? আমি কোন দিক থেকে কম ছিলাম। জোর করে পরিবার ওই মেয়েকে তোমার গলায় ঝুলিয়ে দিলো, আর তুমি? তুমি দু মাসেই ওর জন্য উন্মাদ? ‘
ঈশান বাঁকা হাসে।
—’ কেনো, কি, কিভাবে… তার কৈফিয়ত আমি তোমাকে দেবো না।’
রুষার থেকে বারংবার দুরত্ব বাড়াচ্ছে ঈশান। মুখটা বড্ড নির্বিকার। রুষা ঈশানের দিকে আঙুল তুলে তপ্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
—’ ওই মেয়ের সাথে সংসারের ভাগ্য হবে না তোমার।
অভিশাপ দিলাম আমি। ধ্বংস হবে সব। ধ্বংস কে করবে জানো? ওই মেয়েটাই। তোমার তিতির, তোমার বিয়ে করা সো কলড্ বউ। ওই মেয়েই ছেড়ে চলে যাবে তোমাকে। হিসেব মিলিয়ে নিয়ো।’
শব্দ করে হেসে ফেললো ঈশান। ফিচেল কন্ঠে বললো,
—’দেখা যাক…’
ঈশানের হাসি বোধহয় কাটা ঘায়ে নুনের ছোঁয়া দিচ্ছে রুষার।
—’হাসবে না। এতো কনফিডেন্ট ভালো না। বাজে ভাবে হেরে যাবে তুমি ওই মেয়ের জন্য। খুব বাজে ভাবে।’
—’ওর জন্য শুধু হারতে কেনো,মরতেও রাজি।’
—’তবে জেনে রেখো, সেদিন দূরে নেই। তোমাদের বিচ্ছেদ, একে অপরের ধ্বংস। সব…’
—’ফিরে যাও। ভদ্রমহিলার মতো আমার পিছু না ছাড়লে যে কাজ আর কয়দিন পর করতে চাই, সেটা
আজ, এক্ষুনি করতে হবে। গেট লস্ট। ‘
অপমানে মুখ কালো হয়ে এলো রুষার। কি বলতে এসেছিলো,কি উদ্দেশ্যে এসেছিলো সব গুলিয়ে গেলো। শুরুতে এতদিন পর দেখা হওয়ার আবেগে,আর শেষে অপমানে রক্তিম হয়েছে মুখজোড়া।
ঈশান ফিরে যেতে উদ্ব্যত হতেই শোনা গেলো রুষার কন্ঠস্বর
—’ তিতির তোমার হতে পারে না ঈশান। আর না তো তুমি ওর। কবুল পরে, এক বিছানায় শুলেই ভাগ্য শেষ অবধি তোমাদের সাধ দিয়ে যাবে, সেটা ভাবা ভুল।’
ঈশান দাড়ায়না। চলতে চলতেই জবাব দেয়,
—’ ইহজগৎ এ সাধ না দিলো,পরজনমে দিলেই হবে। ‘
ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকে মুখরিত চারিপাশ। সাথে কুনো ব্যাঙের বিরক্তিকর আওয়াজ তো আছেই। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তিতির। বাইরে থেকে শীতল বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে চোখমুখ। খোলা চুল,ওড়না সমান তালে দুলছে। ঈশান নিঃশব্দে দরজা খুলেই থমকালো। দীর্ঘশ্বাস ফেললো। দরজা আটকে পিছনে এসে দাড়ালো মেয়েটার। পরিচিত ঘ্রানটা নাকে এসেছে অনেক আগেই। মানুষ টার অস্তিত্ব বুঝতে দেরি হওয়ার কথা নয়। তিতির শান্ত গলায় বলে,
—’ এতো রাতে কোথায় গিয়েছিলেন? ‘
ঈশানও শান্ত স্বরেই জবাব দিলো।
—’কাজে।’
—’ রাত দু’টো বাজে তখন। যখন বের হলেন। কাজ দেখান আমাকে? বাড়ির বাইরে কি কাজ এই অসময়ে?’
ঈশান থমকায়। মেয়েটা কি জেগে ছিলো যখন সে বের হয়ে যায়? নাকি আন্দাজে বলছে! সম্ভবত টের পেয়েছিলো।
—’ছিলো কিছু।’
—’ আপনি আমার থেকে কিচ্ছু লুকান না সত্যি? ‘
—’যা জানানোর সব জানাই।’
—’যদি বলি কিচ্ছু জানি না আমি আপনার। ‘
—’তোর মনের ধারনা সেটা। ‘
—’অথচ আপনিই বলেছিলেন এমন কিছু আছে যা সময় মতো জানাবেন।’
—’সময় না হলে কিভাবে জানাবো। এখন জানানো দরকারি নয়।’
—’আমার কাছে দরকারি।’
ঈশান গম্ভীর কন্ঠে বলে,
—’মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে কিসব উঠছে এখন?’
তিতির ফিরে দাড়ালো। মুখোমুখি হলো ঈশানের। ঈশান তাকে প্রায় ছুঁয়েই দাড়িয়ে। তিতির ঠান্ডা সুরে আউরালো,
—’ আমি আজ আপনাকে জোর করবো। জবাব চাই আমার। কিছু লুকাচ্ছেন আপনি। স্ত্রী হিসেবে আপনার সবকিছু জানার অধিকার আমার আছে। নেই?’
বাধ্য ছেলের মতো ওপর নিচ মাথা ঝাকায় ঈশান্। হাতের উল্টোপিঠ ছোঁয়ায় মেয়েটার কপালে। বেশ গরম কপাল। ঈশান নরম কন্ঠে বলে,
—’আছে। জানাবোও। তোকে না জানিয়ে কোথায় যাবো আমি? হ্যা? সব তুই। আপাতত ঘুমা আজকের মতো। জ্বর তো কমেনি এখনো।’
কপাল থেকে ঈশানের হাতটা আলগোছে সরিয়ে দিলো তিতির। ছলছল করে উঠলো মেয়েটার কাজলকালো আখিজোড়া।
—’আপনাকে স্বামীর অধিকার দিয়ে নিজের সবটা বিলিয়ে দিলাম। সেই আদরের যন্ত্রণা এখনো গোটা শরীরে। আমি আপনাকে সব অধিকার বুঝিয়ে দিতে পারলে… আপনি পারছেন না কেনো? আমি কিচ্ছু লুকাই? আমার নাড়ি নক্ষত্র আজ আপনার জানা্। আমার জীবন,শরীর,মন কোথাও এমন আর কিচ্ছু নেই যা আপনার দৃষ্টির বাইরে। সব উজার করে দিয়েছি। খোলাখাতা আমি আপনার কাছে। আপনার বেলায় নিয়ম আলাদা কেনো? স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু বিছানায়?’
সমতল ললাট কুঁচকে এলো সঙ্গে সঙ্গে। রেগে গেলো বোধহয় ছেলেটা৷ গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’ অযথা সিনক্রিয়েট করছিস। আমাকে চিনিস নি এখনো? একটু সময় দিতে পারছিস না?’
তিতিরের গাল গড়িয়ে দু’ফোটা চোখের পানি মেঝেতে ঠাই নিলো গিয়ে। ধক করে উঠলো ঈশানের বুক। ব্যাস্ত হাত ছোঁয়াতে গেলো কান্না মুছতে। তিতির হুড়মুড়িয়ে পিছুতে গিয়ে ঠেকলো দেয়ালে। নাক টেনে কান্না আটকে বললো,
—’ আপনি রুষার সাথে দেখা করতে গেছিলেন। রুষা কে নিয়ে কিছু বলাও কি সিনক্রিয়েটের মধ্যে পরবে?’
স্তম্ভিত হয় ঈশান। কিছু বলতে ঠোঁট জোড়া ফাঁকা হয়। তিতির বাঁকা হাসে।
—’কি? বলা যাবে না?’
ঈশানের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে আসে টেবিলের দিকে। খাবারগুলো রাখা এখানেই। ঈশান খায়নি গতরাতে! তিতির ভাবলেশহীন কন্ঠে বললো,
—’ খাবার টেবিলে রাখা ছিলো, খেয়ে ঘুমাতে যাননি কেনো? খেয়ে নেবেন।’
—’তিতির?’
—’আমার জ্বরটা বারছে মনে হচ্ছে। খেয়ে নিন। ঘুম দরকার আমার।’
ঈশান এগিয়ে গিয়ে বাহু ধরে ফেরাতে চাইলো নিজের দিকে। ততক্ষণে সরে গিয়েছে তিতির। বাহু থেকে ঈশানের শক্ত স্পর্শ সমান জোর দেখিয়ে সরিয়ে দিলো। দৃঢ় কন্ঠে বললো,
সাঁঝের মায়া পর্ব ৫১
—’ আমি রাহাত ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম, সে ছুঁয়েছিলো আমার হাত। তাতেই আপনি কি সিনক্রিয়েট করেছিলেন৷ মনে পরে? আমার পরে। অথচ আপনারা এক রুমে গিয়েছিলেন আমাদের বিয়ের দিন, কি কারণে জানাননি এখনো , তারপরও যখন নিজের মুখে বলেছেন ওকে ছুঁয়ে দেখেননি গভীরভাবে। আমি সঙ্গে সঙ্গে মেনে নিয়েছি। বিশ্বাস করেছি। সারারাত আমার নগ্ন শরীর আগলে পরে থেকে মাঝরাত্রীরে পুরানো প্রেমিকার সাথে নিঃশব্দে দেখা করতে চলে গেলেন। এটা নিয়ে প্রশ্ন করায় বিষয়টা সিনক্রিয়েট? মানতে পারলাম না আমি। ক্ষমা করবেন। ‘
