Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৮

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৮

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৮
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

—’ ছুঁয়েছে ও তোকে? হুম? কোথাও ছুঁয়েছে কি? দেখি? ব্যাথা দিয়েছে কোথাও? ‘
ঈশান ব্যাস্ত ভাবে দেখে যাচ্ছে তিতিরকে। চোখেমুখে রাজ্যের অস্থিরতা। তার এই উতলা রুপ কেউ বোধহয় দেখে অভ্যস্থ নয়। হাঁ হয়ে আছে একপ্রকারে। পুতুলের মতো একটা বাচ্চা বাচ্চা মুখের মেয়ে, বয়স আনুমানিক কত তা ঠাহর করা যায়না। লম্বায় ঈশানের বুক অবধি। শাড়ি পরে আছে। চমৎকার সবদিক দিয়েই। চোখ ধাঁধানো রুপ যাকে বলে। উপস্থিত সকলেই এতক্ষণও তিতিরকে সেভাবে খেয়াল না করলেও, এখন চোখ সরাচ্ছে না। পারছেই না। মেয়েটাকে দু হাতে খাঁমচে ঈশানের উন্মাদনায় স্তব্ধ সকলে।
নিজের দু বাহুতে চেপে রাখা ঈশানের দু’হাতে হাত রাখলো তিতির। ছেলেটার চোখে চোখ রেখে নিজেও ব্যাস্ত হলো ঈশানকে শান্ত করতে।

—’ শান্ত হতে বললাম তো। কিচ্ছু হয়নি আমার। ছুঁতে পারেনি। একফোঁটাও ছোঁয়নি। এই শাড়ির আঁচল ছুঁয়েছে। এটায় আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে দেবেন বাড়ি গিয়ে। চলবে? আমাকে ছোঁয়নি। ‘
ঈশানের দু-হাত ততক্ষণে আকড়ে ধরেছে মেয়েটার তনু দেহ। গোছানো খোলা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে ছুঁয়ে আছে কোমড় অবধি। ঈশান মেয়েটার মাথায় হাত বুলালো বার কয়েক। বিরবির করে বললো কিছু। উপস্থিত বাকিদের কানে গেলো না সে-সব।
—’ব্যাটা নির্ঘাত গিরগিটি। ও ওর বউকে ভালোবাসে? এভাবে ভালোবাসে? এতটা ভালোবাসে? একফোঁটাও টের পেতে দেয়নি! মুখে ঢং মারাতো কি পরিমান। ভাবা যায়? ‘
নিয়াজের নিজ মনে বলা কথাগুলো কর্ণগোচর হলো সবারই। বলাবাহুল্য নিশিও অবাক হয়েছে। ভাইয়ের এতটা পাগলামি দেখার সৌভাগ্য তাদের কারোরই হয়নি। একবাড়িতে থেকেও চোখে পরেনি কখনো। অনিমার চোখে পানি! কান্না৷ পাচ্ছে তার। ছেলেটার কারোর প্রতি এতোটা ভালোবাসা! কল্পনারও অতীত ছিলো তাদের। সংসারী মন এলো তবে।
ঈশান খানিকটা ঝুঁকে শাড়ি ঠিক করে দিলো তিতিরের। মেয়েটা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার আশেপাশে একগাদা কাঁচের টুকরো ছড়িয়ে আছে। ঈশান অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে খুঁজে গেলো ফাহিমকে। চোখে পরলো না ছেলেটাকে। আর এখানে দাড়িয়ে থাকার রুচি আর হচ্ছে না তার। আচমকা আরও একটা কাহিনি ঘটিয়ে ফেললো। বিনাবাক্যে তিতিরকে তুলে নিলো পাঁজা কোলে। নিশির দিকে তাকিয়ে ইশারা করলো সাথে চলার। বাকিদেরও বলতে হলো না। নিয়াজ, নাঈম, অনিমা,রিতুও সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এলো।

ঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে ছিলো রাহাত। স্তব্ধতা নেমে এসেছে তার অস্তিত্ব ছুঁড়ে। পলক ফেলতে ভুলে গিয়েছে। আজকে নিজ চোখে তিতিরকে কেউ স্পর্শ করলো,আর সে সেটা অপারগ হয়ে দেখে গেলো। আগে হলে এই সাহস সে দিতো কি কাউকে! অসম্ভব। দিনাজপুরে তিতিরের পিছনে টু শব্দ করা ছেলেটাকেও ছেড়ে দেয়নি সে। বেধড়ক পিটিয়েছে কত জনকে! হিসেব আছে কোনো। কতজনের হসপিটালের বিল মিটিয়েছে! হাসি পেলো রাহাতের। ঈশান তিতিরের কপালে চুমু খেলো না? খেলো তো। এ অধিকার খোদা তাকে দিলো না কেনো? খোদার কাছে প্রশ্ন টা রাহাত নিঃশব্দেই করলো। জবাব এলো না, আসবে না। তার ভালোবাসার নারীকে অন্য পুরুষ গভীরে স্পর্শ করলো। ভালোবাসায় চিড় ধরলো কি তার? ধরলো না তো। একবিন্দুও ধরলো না। মস্তিষ্ক জ্বলছে রাহাতের। শরীর কাঁপছে। শান্ত করা দরকার। ওই নারী ছাড়া আর কে-ই বা শান্ত করতে পারে!
রাহাতের মুখাবয়ব আচমকা কঠিন হয়ে এলো। ঈশানের প্রতি একরায় ক্রোশ খেলা করে গেলো। যন্ত্রণাময় হাসলো ছেলেটা।

মফস্বলের দিকে যেকোনো খবরাখবর হাওয়ার গতিতে ছড়িয়ে পরতে খুব একটা সময় লাগে না। একজন থেকে অন্য জনে যেকোনো কথা, খুব জলদিই জেনে যায় সবাই। শমশেরনগর থেকে মাইল ছয়েক দূরে এক নদীর কিনারা ঘেষে একটা মেয়ের লাশ পাওয়া গিয়েছে, রাত এগারোটার দিকে। হৈ চৈ কান্ড যাকে বলে। গ্রামের পর গ্রাম, সকলে দেখতে যাচ্ছে সে-সব। রাইসুল দেওয়ান কপাল চেপে বসে আছে বসার ঘরে। এলাকার কিছু গন্যমান্য লোকজনও আছে। ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটায় ঘুরছে। তবে এলাকার পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে না সে-সব। মানুষের আলাপ আলোচনার শোরগোল রাস্তার মোড়ে মোড়ে। কোনো ঘরের আলোই এখনো নেভেনি সম্ভবত। আতঙ্কে রাত পারি দিতে হবে এখন।
গায়ের শাড়িটা এখনো খোলেনি তিতির। বাইরে থেকে এসে নিশি, নূূূরিদের সাথে গল্প করছিলো। ঘন্টা কখন পেরিয়ে গিয়েছে টেরই পায়নি। ঠিক তখনই বাইরে থেকে শোরগোলের শব্দে নিচে নেমে এসেছিলো তারা। আর তক্ষুনি কানে এলো এরকম একটা বিশ্রী ঘটনার কথা। এমনিতেই আগের কেসগুলোর সমাধানই হয়নি। এ নিয়ে চিন্তার অন্ত নেই কারোরই। তার মধ্যে একের পর এক!

ঈশান, তিতিরদের বাড়িতে পৌছে দিয়ে বেরিয়েছে । বলে গিয়েছে সাজিদের সাথে দেখা করতে গিয়েছে। তখন রাতও বেশি হয়নি, সুতরাং আটকায়নি কেউ। এখনো ফেরেনি ছেলেটা। এরমধ্যে দু-দুবার নাঈম ফোন দিয়ে সুধিয়েছে ঈশানের খবর। তিতির কোনো আপডেটই জানাতে পারেনি তাকে।
ওপর থেকে ক্রমাগত শুনতে পাওয়া যাচ্ছে কারোর ফোনের শব্দ। তিতিররা সবাই মা, চাচিদের সাথে বসা। চাপা গলায় মার্ডার টার আলোচনা হচ্ছে। বাড়ির দু’দুটো মেয়ে এতো রাত অবধি বাড়ির বাইরে ছিলো, এ নিয়েও হা হুতাশ করছে গিন্নিরা। ফোনের শব্দে সে-ই আসর ছেড়ে উঠতে হলো তিতিরকে। ঈশান ফোন করেছে কি! এই ধারনায় শাড়ির কুঁচি ধরে একপ্রকার ছুটে ওপরে এলো তিতির। ঈশান নয়! সাজিদ! সুশ্রী মুখের আদল পরিবর্তন হলো খানিকটা। চিন্তিত মুখে ফোনটা তুললো তিতির। ওপাশ থেকে শুনতে পাওয়া গেলো সাজিদের শীতল কন্ঠ।

—’ তিতির?’
—’ভাইয়া…বলুন।’
—’ঈশান ফিরেছে? ‘
—’এখনো না। আপনার কাছ থেকে বেরিয়েছে কখন?’
সাজিদ থমকে থাকে। খানিক আগেই লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। নিয়ে যাওয়া হয়েছে পোস্টমর্টেমের জন্য। সাজিদ যাবে থানার দিকে, নিজের জিপে বসে আছে। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’আমার সাথে দেখা করার কথা ছিলো বুঝি?’
—’আপনিই তো ফোন করেছিলেন তখন। আপনি গেট টুগেদারে এলেন না। তাইতো আপনার সাথে আড্ডা দিতে বের হলো একটু।’
সাজিদ দম নিলো খানিকক্ষণ। তিতিরের কথার প্রতিত্তোর করলো না তৎক্ষনাৎ।
—’হ্যা। ও ফিরলে আমার সাথে একটু কথা বলতে বলবে। কেমন?’
—’ঠিক আছে তা বলবো। আর কিছু বলতে হবে?’
—’হবে। ওর শার্টের একটা বোতাম আমার কাছে রয়ে গিয়েছে। সেটা নিয়ে যায় যেনো। ‘
—’জ্বী। বলবো।’

ফোন কেটে স্থির হয়ে বসে রইলো তিতির, ঈশানের নাম্বারে ডায়াল করলো বার কয়েক। ফোন বন্ধ। নিচ থেকে ভীষন চেচাঁমেচির আওয়াজ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। সালিশি বৈঠকে উচ্চস্বরে কথা হচ্ছে আরকি। দীর্ঘশ্বাস ফেললো তিতির। কি এক অবস্থা। সাজিদ ভাইকে তো জিজ্ঞেস করা হলো না, কেস টা নিয়ে কিছু। অবশ্য এমন অবস্থায় কি-ই বা জিজ্ঞেস করবে। নিশ্চয় ভীষন চাপে আছে মানুষটা। এই যেমন তার মামারা আছে। এলাকার মাথা হলে এই এক সমস্যা, যেকোনো ভালোমন্দের দায়ও নিতেই হবে। এই এলাকা, পাশের দুই এলাকায় পরপর তিন তিনটে মেয়ের এই অবস্থা হলো। অথচ পুলিশ বা কেউ কিছুই করতে পারছে না!

—’ আবার দেখা হয়ে গেলো!’
নূরি মুচকি হাসলো। ভ্রু জোড়া তুলে শুধালো,
—’ কবে এসেছো?’
—’আজকেই।’
—’ফিরবে কবে।’
—’এখন।’
—’ আসার কারণ?’
—’তুমি জানো সেটা।’
—’ কাজ হয়েছে? ‘
—’নাহ।’
—’তিতিরের দেখা পাওনি আজকে?’
—’না, মুখটার দর্শন আজ বড্ড দরকার ছিলো, সাথে একটএ স্পর্শও। কোনোটাই পাইনি।’
—’আফসোস।’
—’বড্ড বেশি। নিচে নামো, চুমু খেতে ইচ্ছে হচ্ছে।’
—’যখন সম্পর্ক ছিলো তখনই নিজ ইচ্ছা ধরা দেইনি, এখন দেবো?’
—’দেবে না বলছো?’
—’হুম।’
—’ তোমার বোনটাকে নিচে নিয়ে আসা যায়না?’
—’যায়না।’
—’ জলদিই যাবে। আসি কেমন? ‘

ঘরের মধ্যে ব্যাস্ত পায়চারি করছে তমা। মনটা অস্থির হচ্ছে ও বাড়ি যাওয়ার জন্য। কিন্তু যেতেও পারছে না। সেদিনের পর আর যাওয়া হয়নি ওই বাড়িতে। এর মধ্যে তিতির এসেছে দু’দিন। সে যায়নি। নয়নের সামনেও পরেনি। আজকের ঘটনায় অস্থিরতা এতো বেশি যে না গিয়ে থাকা যাচ্ছে না। সে একা বাড়িতে। মা, বাবা, ভাই সবাই দেওয়ান বাড়িতে গিয়েছে। দেওয়ান বাড়ির বাগানে, সদর দরজায় অসংখ্যা মানুষের ছড়াছড়ি। এ-সব রেখে নিজ ঘরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা যায়! বেলকনি থেকে ও বাড়ির জনসমাগম দেখে পা টা ছুটে যেতে চাইছে।

তার ঘরের বেলকনিতে দাঁড়ালে দেওয়ান বাড়ির সামনের দিক, পিছনের দিক এবং বাঁ পাশটা বেশ ভালো করে দেখা যায়। আজ যেহেতু এখনো আলো নেভেনি, সুতরাং দিনের মতোই স্পষ্ট বাড়ির সামনের দিকটা। যদিও পিছনের দিকটা বরাবরের মতোই অন্ধকার হয়ে আছে। তমার হাতে আইসক্রিম এর একটা বাটি। বেলকনিতে রকিং চেয়ারে দুলতে দুলতে খাচ্ছে সেটা। আইসক্রিম টা আজ বাবা এনেছে আসার সময়। স্টবেরি ফ্লেভার। আইসক্রিমটা তিতিরের ভীষন পছন্দের। মেয়েটাকে ছাড়া একা একা খেতেও অশান্তি লাগছে। যাবে কি, যাবেনা এই দোনোমনার মধ্যেই চোখে পরলো কিছু একটা। ওদিকটায়, দেওয়ান বাড়ির পিছনের গেটের দিকে! এদিক কার আবছা অন্ধকারের মধ্যে চোখে পরছে একটা লম্বা মতো মানুষকে। আধো অন্ধকারের বুঝতে পাওয়া যাচ্ছে সেটা কোনো পুরুষ মানুষ। গেটটা খোলা কি! বোঝা যাচ্ছে না। তমা উঠে গিয়ে চট করে নিভিয়ে দিলো নিজের বেলকনির আলোটুকু। সামান্য ভিতরের দিকে এসে দাড়ালো। আজকে ও বাড়ি ভর্তি মানুষ। এলাকার মানুষ এসেছে দরবার করতে। কিন্তু ওই লোকটার দাঁড়িয়ে থাকা যথেষ্ট অস্বাভাবিক লাগছে। এতোদূর থেকে বোঝা যাচ্ছে মানুষ টা নড়ছে না। দৃষ্টি কোনদিকে! দেওয়ান বাড়ির দোতলার দিকে সম্ভবত। যদিও অন্য দিকেও হতো পারে। তবে মাথা পিছন দিকে হেলানো খানিকটা। তমা ঠায় দাঁড়িয়ে রয় আরও মিনিট পাঁচেক। পুরুষ মানুষটি নড়াচড়া করে উঠলো এতক্ষণে। তবে বাড়ির দিকে আসলো না। ছোট্ট গেটটা ডিঙিয়ে বের হতে উদ্ব্যত হতেই শিরদাঁড়া সোজা হলো তমার। ওখানে আলো পরেছে। সম্ভবত দোতলার কারোর ঘরের আলো। সেই রশ্মিতে চোখে পরলো মানুষটার মুখটা। ভুল দেখলো কি এত দূর বলে? নাহ্ যথেষ্ট পরিষ্কার দেখতে পাওয়া গেলো মুখটা। হাতের বাটিটা রেখে বেলকনির রেলিঙ ঘেঁষে এসে দাড়ালো মেয়েটা। ততক্ষণে ওদিকার মানুষটা নেমে গিয়েছে। আড়াল হয়েছে বাউন্ডারির ওপাশে। থমকে তাকিয়ে রইলো তমা। লোকটা! সে যা ভাবলো সেই? নাকি অন্য কেউ। অস্বাভাবিক মোটেই নয়, ঠিক ওই জায়গাটায় এর আগে কোনো একদিন …শিউরে উঠলো তমা। আজকে ঈশান জানলে কেলেঙ্কারি ঘটবে।

চোখটা লেগে এসেছিলো তিতিরের। ঈশানের রকিং চেয়ারটায় দুলতে দুলতে কখন ঘুমিয়ে গিয়েছে টেরই পায়নি সে। আচমকা পেটের ওপর সুড়সুড়ির চকিত চোখ মেললো সে। সোজা হয়ে বসতে চাইলেও বসতে পারলো না। দু’হাতে পেটের দিকটা পেঁচিয়ে আছে কেউ। কেউ আর কে! পরিচিত স্পর্শের মানুষটাও তারই। তিতির ঈশানের এলোমেলো চুলে আঙুল গলিয়ে দিলো। নরম কন্ঠে ডেকে উঠলো,
—’কখন এসেছেন? ‘
—’একটু আগে।’
তিতির ঈশানকে সোজা করতে চায়, নিজেও সোজা হয়ে বসতে চায়। ছেলেটা বাধন দৃঢ় করে আরও খানিকটা। শাড়ির আঁচল একহাতে সামান্য সরিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ায় রমনীর তুলতুলে উদরে। চোখ খিঁচে বন্ধ হয়ে আসে মেয়েটার।
—’ফ্রেশ হয়েছেন?’
—’উহু।’
অস্পষ্ট কথাটা বলেই মুখ তুললো ঈশান। ছেলেটার চোখজোড়া অস্বাভাবিক রক্তিম দেখাচ্ছে। মুখের অবস্থাও নাজুক। কেমন এলোমেলো অবস্থা। কেমন হা করে শ্বাস নিতে নিতে বললো,
—’তিতির, আমার প্রচন্ড খারাপ লাগছে। প্রচন্ড। ‘
ঈশানের কথাগুলো কেমন জড়িয়ে আসছে। খারাপ লাগছে মানে! দু’হাতে ঈশানের বাহু চেপে উঠে দাঁড়ালো মেয়েটা। টালমাটাল পায়ে ঈশানও উঠলো। সামলাতে না পেরে কয়েকপা পিছিয়ে ধাপ করে বসে পরলো বিছানায়। তিতির কপালে হাত ছোঁয়ালো। ব্যাস্ত কন্ঠে শুধালো,

—’কোথায় খারাপ লাগছে? এমন দেখাচ্ছে কেনো আপনাকে? ‘
ঈশানের মলিন মুখাবয়ব আরও খানিকটা মলিন দেখায়। ছেলেটার হাতজোড়া কাঁপছে। কম্পিত হাতজোড়া চেপে ধরলো স্ত্রীর ধনুকের ন্যায় বাঁকানো কোমড়। টেনে এনে দুরত্ব ঘোচালো। রমনীর নাভির ওপর শব্দ করে চুমু খেলো। পায়ের আঙুলগুলো মেঝে খামচে ধরতে চাইলো তিতিরের। দু হাত খামচে ধরলো ঈশানের কাঁধের শার্টের অংশটুকুন। কোনোমতে জড়িয়ে আসা কন্ঠে বললো,
—’কি করছেন!’
—’ডিপ্রেসড লাগছে। তোকে কাছে লাগবে। আসবি না? হু? আদর দেবো। বুকটা জ্বালা করছে, শরীরটা জ্বলে যাচ্ছে। আগুন জ্বলছে দাও দাও করে। নেভা আগুন, প্লিজ। শরীরটা তোকে চাইছে। মস্তিষ্ক শূন্য লাগছে।’
ঈশানের কথাগুলো এতো দ্রুত বললো, বলার ধরনে আশ্চর্যই হলো মেয়েটা। এমন জড়ানো কথা, এলোমেলো ভঙ্গিতে আগে কখনো বোধহয় বলতে শোননি ঈশানকে। তিতিরের মাথায় খেলে গেলো কিছু একটা। ঈশানের গাল স্পর্শ করে মাথাটা নিজের দিকে তুলে ঝুঁকে এলো খানিকটা। স্বামীর ঠোঁটের কাছে এসে ঘ্রান নিলো। নাক কুঁচকে এলো। আশ্চর্য মুখে বললো,

—’ কিছু খেয়েছেন আপনি? এভাবে কথা বলছেন কেনো?’
ছেলেটার মুখটা বরফ শীতল। তবে চোখজেড়ায় রাজ্যের আকুতি। তিতিরের দিকে অনিমেষ তাকিয়ে আধো কন্ঠে বলে উঠলো,
—’কি-ভাবে?’
—’কিছু খেয়েছেন আপনি? কিসের স্মেল? ড্রিংকস্ করেছেন?’
বাধ্য ছেলের মতো ওপর নিচে মাথা নাড়লো ঈশান। তার গাল চেপে ধরে রাখা তিতিরের নরম হাতের হাত ছুঁয়িয়ে শীতল কন্ঠে জবাব দিলো,
—’ একটু করেছি। আর তাতে একটু মাতাল হয়েছি। এখন আর একটু হবো। বুকে নে আমাকে।’
তিতির নড়েচড়ে ওঠে। যেখানে সামান্য সিগারেটও তার কথায় ছেড়ে দিয়েছে, সেখানে সোজা ড্রিংস্ করে এসে হাজির হয়েছে মানুষটা! কিন্তু তিতির রাগ করতে পারছে না। এতো হতাশ মুখাবয়ব এর আগে ঈশানের কখনো দেখেছি কি! তিতির স্বামীর দু গাল আলতো চেপে আদুরে কন্ঠে বললো,
—’কোথায় পেলেন এসব? কোথায় গিয়েছিলেন আপনি?’
—’কোত্থাও না। কোত্থাও যাইনি।’
—’তাহলে? মদ খেলেন কেনো? আমাকে না আপনি কথা দিয়েছিলেন। সিগারেটও খাবেন না। সেখানে এসব ছাইপাঁশ গিলে এসেছেন?’
সত্যিই তো! ঈশান অপরাধির মতো করে তাকালো স্ত্রীর দিকে। জিব দিয়ে ঠোঁট ভেজালো।

—’তুই কি শাস্তি দিবি আমাকে? ‘
—’কিসের?’
—’মদ খেয়েছি বলে? কাছে আসতে দিবি না আজ রাতে? হ্যা?’
তিতির স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে। লোকটাকে বোঝার চেষ্টা করলো যেনো। শান্ত সুরে বললো,
—’যদি বলি হ্যা তাই। তাহলে?’
ঈশান নিজের ঢুলতে থাকা মাথাটা ঠেকালো তিতিরের বুকে। সেখানে মুখ ডুবিয়ে অস্পষ্ট বললো,
—’উহু, সেটা বললে হবে না। আজ কাছে আসতে না দিলে ঘুমের ওষুধ খায়িয়ে দে। জেগে থাকলে তোকে না পেলে ছটফট করবো আজ। মাইন্ড ডাইভার্ট দরকার। ‘
—’কি হয়েছে সেটা বলবেন তো। এতো আপসেট কেনো?’
—’আদর করতে দে। ‘
তিতির সেদিকে খেয়াল না দিয়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করে বসে।
—’ কোথায় গিয়েছিলেন সেটা বলুন। বাড়িতে এতো মানুষজন ছিলো এতরাত অবধি। একটু আগে গিয়েছে সবাই। কি হয়েছে খবর পেয়েছেন? এলাকায় আবার একটা মার্ডার হলো। কত কাহিনি হচ্ছে জানেন?’
শিথিল হলো ঈশানের শরীর। একবার যে ঝাঁকি দিয়ে উঠলো পুরুষটা, সেটা টের পেলো সে। ঈশানের হাত বিচরন করে যাচ্ছে তার গোটা পিঠে। পিনগুলো খুলে ফেলতে চাচ্ছে মানুষটা। তিতিরের কথার উত্তর দিলো বেশ সময় পর।

—’ হোক, সে-সব সকালে দেখবো। এখন কাছে আয় তো। মরে যাচ্ছি, আদর করবো।’
—’ সাজিদ ভাইয়া আপনাকে খুঁজছিলো কেনো? আপনি যে বললেন তার সাথেই দেখা করতে গিয়েছেন? তাহলে? আপনার কোন শার্টের বোতাম তার কাছে? কি সব বলছিলো। বুঝলাম না কিছু।’
—’বুঝতে হবে না। আমাকে বুঝে নে আজ রাতের মতো।’
তিতির এ যাত্রায় ঈশানের বাধন ছেড়ে সরতে মরিয়া হলো। কোমড় থেকে শাড়ির অংশটুকু আলগা হয়ে গিয়েছে প্রায়। ঈশানের এলোমেলো হাত সে-সব খুলে ফেলতে চাচ্ছে। তিতির কন্ঠস্বর খানিকটা দৃঢ় করে বললো,
—’আজ না।’
—’কেনো?’
—’আমি আজ প্রস্তুত নই।’
—’পিরিয়ড?’
—’নাহ…’
ঈশান হাফ ছাড়লো যেনো। একটানে কোমড় থেকে শাড়ি আলগা করতে গিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
—’আমি প্রস্তুত করে নেবো।’
মুখে উফ শব্দ করে উঠলো তিতির। ঈশানের দাঁত বসেছে তার বক্ষজোড়ার ওপরের অংশে। শরীর কেঁপে উঠলো একমুহূর্তের জন্য। শিহরন বয়ে গেলো শিরদাঁড়া বেয়ে।

—’আ-আমার কিছু কথা আছে।’
—’সকালে শুনবো।’
ঈশান দু হাতে আলতো করে বিছানায় শুয়িয়ে দিয়েছে মেয়েটাকে। বুকের ওপর থেকে শাড়ি সরে ঠায় নিয়েছে বিছানায় । তিতির এই বলিষ্ঠ শরীরের নিচে চাপা পরলো বলে।
—’আপনি আমাদের বিয়ের ব্যাবস্থা করতে বলুন।’
ভ্রু জোড়ায় ভাজ পরলো ছেলেটার। আশ্চর্য মুখে বললো,
—’বিয়ে ছাড়া আমি তোর কাছে আসি?’
—’সবাইকে জানিয়ে আয়োজন করতে বলুন। তার আগে না।’
ঈশান নির্বিকার মুখে ঠোঁট ছোঁয়ালো বুকের ওপরিভাগে। জোকের মতো আটকে রইলো যেনো। তিতিরের শরীর অবশ হয়ে আসছে, মুখে না বললেও শরীর সায় দিচ্ছে পুরোদমে।
ঈশানের দাঁতের দংশনে জ্বলে যাচ্ছে সর্বাঙ্গ। দু হাত খামচে ধরে আছে ছেলেটার মাথার চুলগুলো। কামড়ের স্থানে ভেজা চুমু আঁকলো ঈশান। তিতিরকে ছেড়ে গা এলিয়ে দিলো নরম বিছানায়। দু হাত ছড়িয়ে শ্বাস নিচ্ছে হাঁ করে। শার্টের বোতাম গুলো আধখোলা। সেখান দিয়ে উঁকি দিচ্ছে পেশল বুকটা। ঘামে চিকচিক করছে। শাড়ির আঁচল বুক জড়িয়ে এসি চালু করলো তিতির। কিছু বলবে তার আগেই ঈশান বলে উঠলো,
—’ জাস্ট আজ রাতটাই আদর করার সময়। মানা করিস না। কাছে আসতে দে একটু। বুকে নে, তিতির।’
আজ রাত টাই সময় মানে! বাঁ হাতে ভর রেখে ঈশানের দিকে ফিরলো মেয়েটা। হাত বাড়িয়ে কপালের ছোট ছোট চুলগুলো একপাশে সরিয়ে দিতে দিতে চিন্তিত মুখে বললো,

—’ কি হয়েছে আপনার? কি নিয়ে এতো ডিপ্রেসড? আজ রাতটাই সময় মানে টা কি? কাল…কাল কোথাও যাবেন কি? হ্যা? কি হয়েছে?’
ঈশান হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলো রমনীর রক্তিম হয়ে যাওয়া সুশ্রী মুখটা। তার ওইটুকু স্পর্শতেই লজ্জাবতী লতার মতো লতিয়ে গিয়েছে। রাঙিয়ে উঠেছে একেবারে! আলতো হাতে ফুলো গালটায় আঙুল স্লাইড করতে করতে বললো,
—’ কার গন্তব্য, কোথায়, কখন সমাপ্তি ঘটেছে কে জানে! কাল তো বেঁচে না-ও থাকতে পারি। কেউ কি কালকের কথা দিতে পারে? না-কি দেওয়া উচিত। এ জীবন বড্ড আনপ্রেডিক্টেবল, তিতির। সবথেকে আশ্চর্য এটাই। কাল কি ঘটবে আমরা বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পারি না। তাহলে!
—’আপনার কথাগুলো আমার আজকে স্বাভাবিক লাগছে না। ভালোও লাগছে না। এমন ধরনের কথাবার্তা বলবেন না দয়া করে। ‘
হেসে ফেললো ঈশান। তিতিরের গ্রীবাদেশ আঁকড়ে নিজের দিকে টেনে নিয়ে এলো। পাতলা ভেজা ঠোঁটটায় ঠোঁট ছোঁয়ালো। এক সেকেন্ডের জন্য সে স্পর্শ। ফিসফিস করে বলে উঠলো,
—’ Nobody’s promise tomorrow..
So am love you every night like a last night
Like a last night…’

তিতিরের চিন্তিত মুখটা আচমকাই রঙহীন হলো। আছড়ে পরলো ঈশানের বলিষ্ঠ বুকে। ঘাম,পারফিউম সব মিলিয়ে পুরুষালি গন্ধটায় নিজেকেই মাতাল লাগলো বোধহয় তিতিরের। একহাতে শার্টের আরও দুটো বোতাম খুলে ফেললো নিজেই। শ্বাস টানলো জোরে জোরে। ঈশানের কাঁধে মুখ ডুবিয়ে আদুরে কন্ঠে বললো,
—’আমাকে দুর্বল করার সব পন্থা রপ্ত করা আছে না? এমন কাজ করবেন–যাতে আমি ধরা দিতে মরিয়া হয়ে যাই। আমিই নিজের মধ্যে না থাকি?’
বুকের ওপর পরে থাকা বিড়াল ছানাটিকে শক্ত করে চেপে ধরলো ঈশান। কোমড় চেপে নিজের দিকে নিয়ে এলো খানিকটা। পিঠের ওপর থেকে খোলা চুলগুলো সরাতে সরাতে হাত দিলো ব্লাউজের বোতামে। হাস্কিস্বরে বললো,
—’এখন? কাছে চাইছিস আমাকে?’
তিতির নাক ঘষলো স্বামীর কন্ঠদেশে। একটা শব্দও করলো না মেয়েটা। রমনীর নিরব সায় সম্ভবত বুঝতে পারলো ঈশান। মুচকি হাসলো। হাস্কিস্বরে বললো,
—’মুখে বল। কি করবো আমি।’
লজ্জায় আড়ষ্ট হয় মেয়েটা। যতবার কাছে আসবে ততবার কি তাকে মুখে সায় দিতে হবে! নিঃশব্দ সায় কি টের পায়না লোকটা! ঘড়ির টিকটিক শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। সঙ্গে দুই মানব মানবীর ঘন নিঃশ্বাস। ঈশানের বুকে ঠায় পরে আছে তিতিরের নরমকোমল শরীর। বিন্দুমাত্র নড়াচড়া করছে না, পারছে না। শরীর অবশ লাগছে। ঈশান ফিসফিসিয়ে বললো,

—’ ভুলে নেশা যখন একটু করেই ফেলেছি। আর একটু করি? পুরোটাই মাতাল হই। কেমন? শাড়িটা খুলে ফেলিই? এইযে আমার ওপর পরে আছিস, কিন্তু এভাবে জড়িয়ে ধরে তোর কিছুই ফিল করতে পারছি না। খুলি?’
ঈশানের ব্যাগ্র স্পর্শ কাতর করে ফেললো মেয়েটাকে। এক ঝটকায় নিজেকে টের পেলো একটা বলিষ্ঠ শরীরের নিচে। দেহের বস্ত্রগুলো সরে গেলো একপলকে। বাঁধা দেওয়ার সময়টা অবধি পেলো না মেয়েটা। মুখ খুলে কিছু বলবে সেটার সুযোগও দেওয়া হলো না। ছটফট করে উঠলো তনুদেহ। মুষড়িয়ে উঠলো ঈশানের বেসামাল হাতে স্পর্শে। গুঙিয়ে উঠলো সেই ধ্বংসাত্মক ছোঁয়ায়।
ঈশান শব্দ করে চুমু খেলো রমনীর বুকের নরম সত্তায়। হাস্কিস্বরে বলে উঠলো,
—’ আজ পুরোটা জেন্টাল থাকবো। তুই থামতে বললেই থেমে যাবো। তোর এই প্রিয় শাড়ির কসম।’
শাড়ির কসম! এরকম কসম কে কাটে! তিতিরের মুখের ভাব বোধহয় বোধগম্য হলো ঈশানের। গম্ভীর কন্ঠে জানালো,
—’ শাড়িটার এমনিও তো ভবিষ্যৎ নেই। ওই ছেলেটা ছুঁয়েছে না? পুড়িয়েই তো দেবো।’
তিতির হতভম্ব হলো যেনো! ছেলেটা যে নিজের কথা রাখতে পারবে না–সেটা সে নিজেও জানে। বেছে বেছে অবাস্তব একটা কসম কাটলো। কোন লেভেলের অসভ্য হলে এমন কথা বলতে পারে একটা মানুষ!

সাজিদের জিপ যখন দেওয়ান বাড়ির সামনে এসে থামলো তখন রাত একটা বেজে আঠারো মিনিট। ডেট স্পট থেকে থানায় গিয়েছিলো। এখন বাড়ি ফিরবে, এই পথেই ফিরতে হতো। ঈশানের সাথে এই মূহুর্তে দেখা না করলেই নয়।
জিপ থেকে নেমে বাড়ির বন্ধ দরজাটার দিকে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে। আজকেও! আজকেও এমন একটা ঘটনা ঘটলো, আর একই সময় ঈশান বাড়িতে নেই? মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে আসতে চায় এক মূহুর্তের জন্য। দুইয়ে দুইয়ে খুব সহজেই চার হয়ে যায়। অথচ এই সহজ হিসেব টুকুর ফল মেলাতে ইচ্ছে হচ্ছে না সাজিদের। গনিতে কাচা হয়নি কেনো ছোটবেলায়? রাগ হচ্ছে তার। কল্পনাও করতে পারছে না সে। আজকে গেট টুগেদারে না যাওয়ার সবথেকে বড় কারণ ঈশান! ছেলেটার মুখোমুখি কি করে হতো সে?
সাতপাঁচ ভেবে আরও খানিকটা সময় নষ্ট করলো সাজিদ। ঈশান সামনে আসলে সে নিজে কি বলবে, কি ভাবে ফেস করবে সে-সবই যেনো বুঝতে পারছে না।
নিস্তব্ধতায় ঘেরা চারিপাশ। প্রকৃতি আজ থ মেরে আছে যেনো। বাইরে গাছের একটা পাতাও নড়ছে না। গুমোট পরিবেশ। বেশ গরমও পরেছে। ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস হতে পারে। ঈশান তিতিরের ঘরে ঘড়ির কাটার সাথে সাথে আরও দু’টো শব্দ ভেসে আসছে। এসির শোঁ শোঁ শব্দ,সঙ্গে দু’জন মানব মানবীর ঘন ঘন নিঃশ্বাস। ঈশান নিজের বেসামাল আদরে উন্মাদ করছে তিতিরকে। ছেলেটার একহাত নিজের মুঠোয় বন্দি করেছে মেয়েটাট হাত জোড়া। মাথার ওপরে চেপে দরে আছে, অন্য হাতের বিচরন মেয়েটার নাজুক অঙ্গে। পুরুষালি শক্তপোক্ত পা জোড়া পেচিয়ে রাখা তিতিরের নগ্ন পা। মেয়েটা নড়াচড়াও করতে পারছে না। এক মূহুর্তের জন্য হাঁ করে শ্বাস নেওয়ার জন্য ছটফট করছে। শরীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে, ঈশানের গভীর আদর অনূভব করতে কাতরাচ্ছে মেয়েটা। ঈশান হাতে ভর রেখে উঁচু হলো সামান্য। মেয়েটার শরীর সম্পূর্ণ অনাবৃত। মেয়েটার দুচোখে রাজ্যের আকুতি। ঈশানকে কি পরিমাণ চাইছে, সেটা এক লহমায় বলে দেওয়া যাবে। ঈশান শব্দ করে চুমু আঁকলো তিতিরের ঘর্মাক্ত কপালে। কোনোমতে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,

—’ এতক্ষন কেনো তোকে গভীরে আদর করিনি বলতো? তোর চোখে এই আকুতিটুকু দেখতে চাচ্ছিলাম আমি। আমাকে ভেঙেচুরে চাইবি, এটা অনূভব করতে চাচ্ছিলাম। এখন চাচ্ছিস। তোর মন পড়তে পারছি আমি।’
তিতির ছটফট করে ওঠে। লজ্জায়, আবেশে কুঁকড়ে ওঠে একপ্রকার। ঈশানের হাত, তিতিরের কোমড় চেপে ধরে কিছু একটা করতে যাবে তার আগেই মাথার কাছের ফোনটা বেজে উঠলো। এমন বিশেষ মূহুর্তে ফোন! অসহ্য লাগলো ঈশানের। তারই ভুল! বারবার তাদের সুন্দর মূহুর্তগুলো এর আগেও এমন ফোন কলের জন্য নষ্ট হয়েছে। আজও তাই। হাঁপাতে হাঁপাতেই মাথা উচিয়ে নামটা দেখলো। উত্তেজনায় ভাটা পরলো কি?
ঈশান থেমে গেলো খানিকটা। হাতের বিচরন স্থির হলো। অন্য হাতে ধরে রাখা মেয়েটার কোমল হাতের বাঁধনও আলগা করলো। ঘামে ভেজা শরীরটা ছেড়ে দিলো তিতিরের নগ্ন বুকের ভাজে। সে নিজেও গায়ে কিছু পরে নেই। অবহেলায় কোমড়ে জড়িয়ে আছে শুধু প্যান্টখানা। তিতিরের হৃদপিণ্ডের ছোটাছুটি কানে এসে বাজলো ঈশানের। মুখ তুলে তাকালোও একটাবার। অতপর সরে এলো মেয়েটার ওপর থেকে। পাশে গা এলিয়ে দিয়ে ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেললো উদভ্রান্তের মতো। তিতির হত-বিহবল হয়ে গেলো কিছু সময়ের জন্য। খানিকটা ঘোর কাটতেই লজ্জায় হাত পা থরথরিয়ে কেঁপে উঠলো। ঘাড় বাঁকিয়ে ঈশান দেখলো মেয়েটাকে। তিরতির করে কাঁপতে থাকা চোখের পাপড়ি গুলোতে চুমু খেতে ইচ্ছে হলো। সেটা করলো না সে। সময় কম তার! পাশথেকে শাড়িটা টেনে নিয়ে ঢেকে দিলো তিতিরের চোখ ধাধানো অঙ্গ। হাত বাড়িয়ে সেই তনুদেহ নিজের বাহু বন্ধনে আবদ্ধ করে ধীর কন্ঠে বললো,

—’শ্বাস নে। ইট’স ওকে। কিছু করিনি। টেক ব্রেথ…’
তিতির কাঁপছে তখনো। শরীর শিথিল হচ্ছে। এমন একটা মূহুর্ত ঈশান কেনো নষ্ট করলো মাথায় এলো না তার। লাজুক মুখটা ঈশানের বুকে লুকিয়েই তপ্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে বসলো,
—’যখন ইচ্ছে কাছে আসবেন, যখন ইচ্ছে সরিয়ে দেবেন। এগুলো কোত্থেকে রপ্ত করেছেন? এত সুন্দর, আকাঙ্খিত মূহুর্তটা এলোমেলো করে দিলেন কেনো?’
ঈশান জবাব দিতে পারে না। মেয়েটাকে আরও খানিকটা আগলে নিতে চায়। তবে তিতির অপমানিত বোধ করেছে বেশ করে। এই বাঁধনে সে থাকবে কেনো! ঈশানের বাধন থেকে মুক্ত হয়ে উঠে বসে, পিছন ফিরেও আর তাকায় না। কোনোমতে শাড়িটা আগলে বাথরুমে চলে যায়।
দীর্ঘশ্বাস ফেললো ঈশান। ঝটপট শার্টটা গায়ে জড়িয়ে কলব্যাক করলো সাজিদ কে। ঘর ছেড়ে এসে দাড়ালো করিডরে।

ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে এতক্ষণে। তবে শীতল অনূভূত হচ্ছে না। এমনিতেই ঘেমে-নেয়ে একাকার। তার মধ্যে এসি ছেড়ে, এই মৃদু বাতাস গায়ে লাগার কথা নয়। লাগছেও না। এমনিতেই ডিস্টার্ব ছিলো সারাটাদিন। এমন মূহুর্ত টা নষ্ট করার অপরাধে আরও বিরক্ত বোধ হচ্ছে। মেয়েটাকে একপ্রকার অসম্মানই করলো সে। নিজেই কাছে টেনে, শেষ অবধি…চোখমুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট ঈশানের। সাজিদের ওপর নয় মোটেই। এই ঝামেলা থেকে বাঁচার উপায়ই ছিলো তিতির। এক তিতির ছাড়া আর কিচ্ছুতে সে শান্তি খুঁজে পেতো না। কিন্তু..। কিন্তু ঠিক সেই সময় সাজিদের ফোনকল যেনো মনে করিয়ে দিলো সবকিছু। অজানা অপরাধবোধ থেকে তিতিরকে কাছে টানতে পারলো না…ওপাশ থেকে রিসিভ হলো ফোনটা। সাজিদ আর দাঁড়িয়ে নেই ঈশানের বাড়ির সামনে। জিপ টা দেওয়ান বাড়ির সীমনা ছেড়েছে বেশ খানিকটা আগেই। ঈশানের ফোন পেয়ে মাঝরাস্তায় থামাতে হলো জিপটা। ফোনটা রিসিভ করলো। নিঃশব্দতায় কেটে গেলো কয়েক সেকেন্ড। অতঃপর কথা সর্বপ্রথম সাজদই বললো,

—’বিরক্ত করলাম অসময়ে? ‘
ঈশান মৃদু হাসলো এপাশ থেকে। শীতল কন্ঠে জবাব দিলো,
—’কাইন্ড অফ।’
—’ তিতির পাশে?’
—’আপতত না।’
—’ বাড়ি ফিরেছিস কখন?’
—’ঘন্টাখানেক আগে।’
ঈশান উত্তর দিয়ে দু সেকেন্ড থামলো। পুনরায় নিজেই বললো,
—’গেট টুগেদারে আসলি না কেনো?’
জিপের সিটে মাথা এলিয়ে দিলো সাজিদ। তাদের পুলিশের প্রেডিকশন অনুযায়ি অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও, সে একজন ক্রিমিনালের সাথে কথা বলছে। অথচ সে রুড হতে পারছে না। চিৎকার করে একটা শব্দও বলতে পারছে না। আর না তো ওই রিলেটেড কোনো শব্দ উচ্চারন করতে পারছে! সাজিদ ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
—’ বিজি ছিলাম একটু। যেতাম না হলে।’
—’বাড়ি ফিরেছিস?’
—’রাস্তায়।’
—’গাড়ির শব্দ কোথায়?’
—’গাড়ি থামিয়ে কথা বলছি।’

দু’জনার মধ্যে সম্ভবত আরও কিছু সময় নিরবতা চললো। ঈশান চাচ্ছে সাজিদই বলুক যা বলার। ছেলেটার অনেক কিছু জিজ্ঞেস করার আছে তাকে–এটা সে খুব ভালো করেই জানে। সাজিদ শুকনো ঢোক গিলে বন্ধুকে প্রশ্ন ছুড়লো,
—’ আনজির সরকারের মেয়ে খুন হয়েছে। শুনেছিস?’
থমকালো ঈশান। তৎক্ষনাৎ জবাব দিলো না।
—’হু।’
—’যদি প্রশ্ন করি ওই সময়টায় তুই কোথায় ছিলি। কোনো অ্যালিবাই আছে তোর?’
ঈশান হাসলো এপাশ থেকে। প্রথমে নিঃশব্দে। তারপর উচ্চস্বরেই হেসে ফেললো। শার্টের বেতামগুলো লাগানো হয়নি। ঝিরঝির বাতাসে বুকের ওপর থেকে দু’পাশে উঠছে শার্টটা। পেটের কাছেট ছয় খন্ডের কারুকার্য এখনো ঘামে ভেজা। কপাল থেকে ঘর্মাক্ত চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করতে করতে বরফ শীতল কন্ঠে বললো,
—’ সন্দেহ করছিস? ঈশান আরশাদ দেওয়ান কে? ‘
—‘জবাব দে।’
—‘নেই।’
চোখ বুজে ফেললো সাজিদ। সে খুব করে চাচ্ছিলো ঈশান জোর গলায় কোনো প্রমান দিক। ছেলেটা যে খুনের আশেপাশে ছিলো না এটা প্রমান। কারণ ঈশানের ফোন লোকেশনও অন্য কথাই বলছিলো। হতাশ হলো সাজিদ। সে যা চাইলো তা হলো না। ঈশান পুনরায় বললো,
—’ তোর পরিকল্পনা কি? আমি বলে বাকি কথা বলতে এতো দ্বিধা করছিস? করিস না। পুলিশ তুই। চালাক হ, সাহসী হ। আবেগে গা ভাসানো তোর সাথে যায়না।’

—’ কেনো বললি কথাগুলো?’
—’তুই কি ভেবে আমাকে ফোন করেছিস, সেটার উত্তর এটা। ধরে নে।’
—’ আমি তো তোর সাথে এর আগেও মাঝরাতে কল দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিয়েছি। আজ প্রথম কি?’
মুচকি হেসে দিলো ঈশান। ডান কান থেকে বাঁ কানে ফোন ধরে গম্ভীর কন্ঠে আউরালো,
—’ তুই আবেগে চলতে পারিস। আমি চলি না। তোর ট্রান্সফার হবে শিগ্রই।’
—’তোর পথে বাঁধা দিচ্ছি বলে?’
—’ঠিক তাই।’
—’তারমানে…’ থমকে থাকে সাজিদের কন্ঠস্বর।
ঈশান ভারি আওয়াজে বললো,
—’আমাকে এরেস্ট করতে পারবি না তুই। চেষ্টা করে নিজের কপাল পোড়ানোর মানেই হয়না কিন্তু। ‘
—’তুই কি করছিস বল তো আজকাল? হিসেব মেলাতে পারছি না।’
—’চেষ্টাও করিস না। আমাকে কাল এ শহরে পাবি না। সুতরাং আমি যেই হই, আমার পরিবার কে দেখে রাখবি। দায়িত্ব দিয়ে গেলাম। ওরা জানবে না কিছু। ‘
সাজিদ সোজা হয়ে বসে। ব্যাস্ত কন্ঠে শুধায়,
—’ডোন্ট সে এগুলো তোর করা। আমি বিশ্বাস করি না।’
—’সাবধানে থাকবি। কার কখন কি হয়ে যায় কে বলতে পারে!’
সাজিদ কে হতভম্ব রেখেই ফোন কাটলো ঈশান। আজকে মুখের সেই চিরচেনা হাসিটা ফুটলো না। বুকের বাঁ পাশের ভোঁতা অনূভুতি আজকে সরানো গেলো না কিছুতেই।
বাথরুমের ছিটকিনি খোলার শব্দ পাওয়া গেলো। তিতির একেবারে শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে। ঈশানকে ঘরে না দেখেও খুঁজলো না। ভেজা চুলগুলো তোয়ালেতে পেঁচানো। দ্রুত হাতে বিছানা করে ফেললো। হেয়ার ড্রায়ারে ভেজা চুলগুলো শুঁকিয়ে দরজার লক খুলবে তার আগেই হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে এলো ঈশান। ব্যাস্ত কন্ঠে শুধালো,

—’কোথায় যাচ্ছিস?’
তিতির জবাব দেয় না। পায়ের তালুতে ভর দিয়ে ওপরের লকটা খুলতে পায়তারা করে যাচ্ছে। ঈশান এগিয়ে আসে, মেয়েটার পিঠের সাথে লেপটে দারায়। বড্ড ক্লান্ত লাগছে নিজেকে। তিতিরের কাঁধে নিজের ক্লান্ত মাথাটা এলিয়ে মলিন কন্ঠে বলে,
—’যাস না। সরি। খুব সরি আজকের জন্য। আমি নিজেই এলোমেলো হয়ে আছি। ওইসময়…’
—’ফোনটা কার ছিলো?’
তিতির না ঘুরেই প্রশ্ন টা ছুড়ে দিলো। ঈশান মিহি কন্ঠে বললো,
—’সাজিদ।’
—’ কি হয়েছে আপনি বলছেন না। বা চাচ্ছেন না আমাকে জানাতে। সেটা কেনো?’
—’তোকে চিন্তা দিতে চাইনা।’
—’ এরকম চিন্তা কম হয় বলে মনে করেন?’
—’হয় না। জানি। কিন্তু… ‘
—’ দূরে সরে গেলেন কেনো? ওরকম একটা মূহুর্ত নষ্ট করার মানুষ আপনি নন। কি সমস্যা? ‘
ঈশান এক হাতে মেয়েটার কোমড় আগলে সরিয়ে আনলো দরজার সামনে থেকে। বিছানায় বসে তিতিরকে বসালো নিজের উরুর ওপর। শীতল অথচ কেমন একটা মলিন সুরে বললো,

—’ আজকের মার্ডার টা…’
ভ্রু কুচকে এলো তিতিরের।
—’মার্ডার টা?’
—’মার্ডারটা…’
থমকায় ঈশান। কি ভাবলো কে জানে। গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
—’ওটা নিয়ে কথা হচ্ছিলো সাজিদের সাথে। ওরকম একটা বিষয়। বুঝতেই পারছিস। ও-ই সময় তাই আরকি…’
তিতিরও শান্ত হলো। আরও একটা মেয়ে এভাবে ভিকটিম হয়ে গেলো। কান্না পায় মনে হলেই। আর কত এরকম! কে করছে এসব! ঈশানের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো,
—’ খু*নীকে ধরা যাচ্ছে না কেনো? এরকম করে কত মেয়ের সর্বনাশ হবে? আজ ওরা কাল আমি বা…’
ঈশান আচমকা বুকে চেপে ধরলো মেয়েটাকে। বুকের বাঁ পাশটায় কেউ যেনো ছুরির পলা গেঁথেছে। একমুহূর্তের জন্য শ্বাস নিতে ভুলে গেলো ছেলেটা। ব্যাগ্র সুরে বললো,
—’না না। কি বলছিস। তা হবে না। কখনো হবে না। আ..আমি হতে দেবো না।’
তিতির নিশ্চুপ পরে থাকে ঈশানের বলিষ্ঠ বুকের ওপর। ছেলেটার বুকের বাঁ পাশটা যেনো বিদ্রোহ করছে। সেখানটায় হাত ছুয়িয়ে দিলো।ঈশান সে হাত খপ করে নিজের হাতের মুঠোয় নিলো। টেনে এনে চুমু খেলো হাতের তালুতে। বিরবির করে বললো,
—’ এগুলো বলতে নেই। কেনো বলছিস? ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিস নাকি? করিস না। মরে যাবো কিন্তু। ‘
তিতিরের চোখ ভিজে উঠলো মানুষটার সরল সহজ স্বীকারোক্তিতে। অন্য হাতে ঈশানের হাতটা আঁকড়ে ধরে কান্না আটকে বললো,

—’ কোথায় যাবো? কেনো যাবো? কে আছে আমার আর? কেউ নেই তো। এই যে হাতটা ধরেছি। আর ছাড়ার উপায় নেই। আপনার ক্ষেত্রেও তাই কিন্তু। বলে দিলাম আমি। যাই হয়ে যাক। হাত ছাড়বেন না। কেমন? পৃথিবীর সমাপ্তিও যদি ঘটে। সজ্ঞানে থাকা অবধিও হাত ছাড়বেন না।
একবার হাত ছাড়লে, এ জন্মের মতো বিচ্ছেদ!’

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৭

তিতিরকে নিজের সাথে মিশিয়ে, মেয়েটার কপালে কপাল ঠেকালো ঈশান। হু হু করা বুকটা শান্ত হচ্ছে না। আজকের এই ঝড়ের জন্য দায়ি সে। সম্পূর্ণ সে। সে দায় সে কি করে এড়িয়ে যাবে। সেই ঝড়ের কবলে তার বউ তার বোনেরা! কল্পনায়ও শিউরে উঠলো ঈশান। দুজনের তপ্ত শ্বাস-প্রশ্বাস আছড়ে পরছে একে অপরের ওপর। ঈশান একহাতে মেয়েটার কটিদেশ। আর একহাতে তিতিরের গাল স্পর্শ করিশে বললো,
—’ একটাই জন্ম তিতির। তোর বিচ্ছেদ সইবে না। তার বদলে আমার মৃত্যু কবুল… ‘

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here