Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ৩৪

সায়রে গর্জন পর্ব ৩৪

সায়রে গর্জন পর্ব ৩৪
নীতি জাহিদ

সাদা ঘোড়ার পিঠে চড়লো হাম্মাদ। ভেবেছিলো এই ঘোড়া ভাগ্নিকে তার জন্মদিনে এখানে ডেকে এনে পুনরায় হস্তান্তর করবে। বাংলাদেশের মত জায়গায় জিপসী ভেনার ঘোড়ার সাদা ব্রিড খুবই বিরল। আমিরাকে মুরাদ দিয়েছিলো জন্মদিনে, রক্ষণাবেক্ষণে ঘোড়ার উপর প্রভাব পড়তে পারে বলে সরিয়ে রেখেছিলো হামিদ মজুমদার। এই ঘোড়ার প্রতি নজর ছিলো অনেকের৷ সুযোগ বুঝেই সরিয়ে ফেলেছিলো নাতনীর বড় হওয়া অবধি ঘোড়া হেফাজতে রাখার জন্য, একশ বছরের পুরোনো একটি আস্তাবলে। সেই আস্তাবলের মালিক ছিলো হামিদ মজুমদারের এক বন্ধু। এতদিন অনাদরে কেউ বুঝতেই পারেনি এই ঘোড়ার দাম ত্রিশ পেরিয়ে পঞ্চাশ লাখে ঠেকেছে। এক একটা জিপসী ভেনারের মূল্য প্রায় পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লক্ষ ইউ এস ডলার৷ হাম্মাদ আস্তাবল থেকে জিপসীকে উদ্ধার করে নিজের জিম্মায় রেখেছে। ভাগ্নীকে হস্তান্তর করার সময় এসে গিয়েছে। নির্দেশ এসেছে ঘোড়াকে সাজিয়ে রাখার।

টেবিলে সাজানো সব বরষার খাবার। বৃষ্টিতে খিচুড়ি, জলপাই চাটনী,বেগুন ভাজা, তিতা করলা ঝুরঝুরে ভাজা আর গরুর মাংস ভুনা। দু হাতে মাখিয়ে শেহজা খাচ্ছে। দিয়া একটু করে খাচ্ছে আর মেয়েকেও খাবার গুছিয়ে দিচ্ছে। এর মাঝে শেফালী বললো,
– ভাবীজান কি শুরু করলেন, আপনি সরেন আমি ওরে খাওয়ায় দি। এভাবে খেলে পেট ভরবে?
দিয়া খানিকটা হেসে বলে,
– ভরবে আপা, আপনি শুধু দেখে যান। খাওয়া শেখার দরকার আছে। এত আহ্লাদে রেখে পরে বাবা মা কাছে না থাকলে আমার মত প্যাচ প্যাচ করে কাঁদবে।
সুলতানা কবির মেয়েকে ইশারায় শান্ত হতে বললেন। শিফাকে খাইয়ে দিচ্ছে রায়হান সাহেব। আজ শুক্রবার হওয়াতে দেরি করে উঠেছে। ঘুম ঘুম চোখে বাবার গলা জড়িয়ে বায়না ধরেছে খাইয়ে দিন। আদরের ছোট মেয়ের বায়না রাখতেই নিজেও খাচ্ছে মেয়েকেও খাইয়ে দিচ্ছে। গত দুমাস শাহাদের সাথে কারো কোনো যোগাযোগ হয়নি। প্রথম মাসের পর ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী আরো একমাস থাকতে হচ্ছে। থেরাপির মধ্যে থাকাতে ডাক্তার বারণ করেছে কথা বলতে,প্রেশার নিতে। মাঝে মাঝে হামজা দূর থেকে ভিডিও কলে দেখিয়েছে। শিফা খাবার চাবাতে চাবাতে বলে,

– আব্বু আপনার কোনো অদ্ভুত গুন নেই যা আমরা পেয়েছি? দেখুন না শেহজা কি সুন্দর ভাইজানের মত তিতা করলা চাবাচ্ছে। আমার ও তো তিতা লাগে ওর কি লাগছে না?
রায়হান সাহেব হেসে বলেন,
– আমার সব গুলো সন্তানই আমার দোষ গুলো পেয়েছে। তোমাদের খারাপ দিক গুলো আমার,ভালো দিক গুলো তোমাদের মায়ের। যেমন ধরো তোমার বড় ভাইজানের রগচটা স্বভাবটা আমার পেয়েছে। আমি এক কালে এমন ছিলাম। শাহীনের ভাঙচুর করার স্বভাবটা আমার, শেফালীর মতো মিথ্যা আমি ও বলতাম তবে এত বেশি না। আর তোমার মতো বাবা মায়ের কাছে আহ্লাদ করতাম।
শেফালী মাথা নত করে রেখেছে। ওর স্বভাবটা সবচেয়ে খারাপ। বাবা যে কথাটা ওকেই হিট মেরে বলেছে সেটা বুঝতে পেরেছে। রায়হান সাহেব পুনরায় কথা প্রসঙ্গে বদলে সরাসরি বললো,
– শেফালী তোমার ভাইজান আসার সময় হয়েছে। নিজেকে তার সামনে এবার ঠিক ভাবে উপস্থাপন করবে। আমাকে আর লজ্জ্বিত করবেনা, ঠিক আছে?
– ঠিক আছে আব্বু।
আড্ডা গল্পে মেতে উঠেছে সুলতানা মঞ্জিল।

ইতিমধ্যে রক্তের জন্য হাহাকার লেগে গিয়েছে হাসপাতালে। কোথাও মনির রক্তের ব্লাড সেম্পল মিলছেনা। মিলছেনা বললে ভুল হবে এবি পজিটিভ ব্লাডের ডোনার পাওয়া যাচ্ছেনা। কেউ দিতেই চাইছেনা। কমন একটা রক্তের গ্রুপের ডোনার পাওয়া যাচ্ছেনা ভাবলেই মনে হয় এটাই কি শাস্তি এই মেয়ের? বংশে কারো নেই এই রক্ত। সকলের অজানা আজকের এই খবর। এই খবর লিক হলে অনেক বড় বিপদের আশঙ্কায় আছে শাহীন। শেষমেষ ফোন দিয়ে চাচা-চাচীকে জানানো হলো মনির এক্সিডেন্টের কথা। কিছুক্ষন পর ছুটে এসেছেন উনারা। হাসপাতালের করিডরে সকলে বসে আছে। শেষশেষ ডোনার পেয়েছে তাহি। অদ্ভুতভাবে ডোনার হচ্ছে রোদসী, রাশেদের বোন।
নিচে ক্যান্টিনে এসে শাহীন একটানা বকে যাচ্ছে ইয়াজ এবং তানভীরকে। মনির এই অবস্থা কি করে হলো সেটা ভেবেই আতঙ্কে আছে সকলে। দুজনেরই মাথা নত। পাভেল ক্যান্টিনে ছুটে এসেছে। শাহীন পাভেলকে দেখে মুখ খুলবে এর আগেই পাভেল বললো,

– যত যা বলার ইচ্ছা পরে বলবি আপাতত প্লেন ল্যান্ড করবে দুঘন্টার মধ্যে। রেডি হ। রাস্তায় প্ল্যান করিস কি উত্তর দিবি।
শাহীন মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লো। ইয়াজ পাশের টেবিল থেকে গ্লাস তুলে ঢক ঢক করে সবটুকু পানি গলদঃকরন করে নিলো। তানভীর পাভেলের হাত ধরে বলে,
– ও পাভেল ভাই এবার কি করবো? ইচ্ছে করে তো করিনি।
পাভেল দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
– তোর এখানে কি? যা হেড কোয়ার্টারে। তোর কাজ শেষ। বাকিটা আমি দেখছি।
তানভীর বেরিয়ে গেলো এক ছুটে। ইয়াজের অসহায় দৃষ্টি বলে দিচ্ছে, আমার ও সাহায্য চাই ভাই। পাভেলের অগ্নি চাহনী ইয়াজের দিকে ফিরে শাহীনকে পর্যবেক্ষন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। শাহীনের কাঁধে হাত রেখে বললো,

– ভেঙ্গে পরিস না, এতেই আল্লাহ মঙ্গল রেখেছেন।
– কি উত্তর দিব আমি।
– যা সত্যি তাই। এখন উঠ সময় নষ্ট করিস না। অলরেডি লোকজন ভীড় করবে। অফিসারদের কাছে নিউজ চলে গিয়েছে। আমি সবাইকে পাঠিয়ে দিয়েছি।
তাহির সাথে দেখা করে সবাইকে রেখে বেরিয়ে পড়ে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। গাড়িতে এমন মুখ করে থাকতে দেখে পাভেল শাহীনকে ধমকে বললো,
– চেহারা ঠিক কর, আগাম কিছু টের পেলে দেখবি থোবড়া বদলায় রাখবে৷
তুহিন গাড়ি চালাতে চালাতে বললো,
– ভাই আমি কিন্তু কিছু জানিনা। আপনাদের আগে পিছে আমি ছিলাম না, আমারে ফাঁসাইবেন না।
পাভেল দিলো এক বজ্রধমক। কেঁপে উঠলো গাড়িতে বসা সকলে,

– এই নেমক***ম বিপদে পড়লে ভাইগা যাইতে চাস? মিশনে তুই ছিলিনা? ওদের যখন ভুল হয়েছে তার মানে ভুলটা সবার। এই দায়ভার ও সবার। আলাদা করোস কেনো নিজেকে। পরের বার আমি তোকে আর উদ্ধার করবোনা কিছু থেকে।
তুহিনের মুখটা চুপসে গেলো। আমতা আমতা করে ক্ষীন স্বরে বলল,
– স্যরি, অন্য কেউ হলে তো সমস্যা ছিলোনা।কিন্তু ওই মনি কুটনীর ব্যাপার আসলেই আমার কেন জানি রাগ লাগে ভাই, আমি শিউর সবার লগে আমারে আমসত্ত্ব বানাবে।
– বানালে হবি।
বাধ্য বাচ্চার মত উত্তর দিলো,
– আইচ্ছা।

তাহি ফার্মাসি থেকে ঔষধ নিচ্ছে। মনিকার বাবা, মা দুজনই কাঁদছে। কিছুক্ষন আগে ডাক্তার জানিয়েছে অপারেশন করতে হবে। লিমন ও এসেছে তার মাকে নিয়ে। লিমনের মা রত্না বসেছে মনির মা মোমেনার পাশে। কেনো যেন মোমেনা কখনোই রত্মাকে পছন্দ করেনি। মেয়ের উপর দিয়ে ঝড় যাচ্ছে এরপর ও তার ঔদ্ধত্য কমে নি। রত্না বললো,
– ভাবী আমাদের মনি ঠিক হয়ে যাবে চিন্তা করবেন না।
– আমার মেয়ের উপর কুনজর লেগেছে মানুষের। ওর ভালো কারো সহ্য হয়না। অলক্ষ্মী গুলো সারাদিন আশেপাশে ঘুরলে মেয়ের ভালো হবে কি করে! কই গো এতক্ষন হলো তোমার ভাই ভাবী তো এলো না।
রত্নাকে পাত্তা না দিয়ে রেদোয়ান সাহেবকে বললো এই কথা। লিমন আর তাহি সামনেই ছিলো। মেয়ের উপর কুনজর লেগেছে কথাটা যে স্পষ্ট তাহি আর রত্নাকে বলেছে উপস্তিত সকলের বোধগম্য হয়েছে। লিমন মাকে ধরে বললো,
– আম্মু তোমার শরীর ভালোনা,এত করে বললাম এসোনা। এখন চলো। জেঠু, জেঠিমা আর মনি আপা ভালো আছে। ডাক্তার তাহি অনেকক্ষন এখানে ছিলেন।উনারা নিজেদের সামলে নিবে। আপনি যান রেস্ট নেন অথবা অন্য প্যাশেন্টের কাছে যান। উনাদের একটু একা থাকতে দিন।
তাহি লিমনের ইঙ্গিত বুঝে সরে গেলো জায়গা থেকে। সারাজীবন তাহিকে কথা শুনিয়েছে এই মহিলা। অথচ সকাল থেকে তাহি দৌঁড়ঝাপ দিয়ে রক্ত জোগাড় করেছে। তাহি সরে যেতেই আবার ছ্যান ছ্যান করে উঠলো মোমেনা,

– কত্ত বড় বেয়াদপ। আজ আমার মেয়েটা সুস্থ থাকতো, তাহলে বুঝিয়ে দিতাম বেয়াদপটাকে।
– আগে আপনার মেয়ে সুস্থ হোক জেঠী…
লিমন মাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে এই কথা বললো। রেদোয়ান সাহেব দেখছে ভাতিজাকে। কত বড় হয়েছে,কথার পিঠে কথাও আজ শুনাতে পারে এই ছেলে।ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো, সে চিন্তিত। অনেকক্ষন হয়েছে বড় ভাইকে কল করেছে, শেফালি কি এই খবর ভাইয়াকে এখনো দেয় নি! হয়তো দিয়েছে রাস্তায় তারা। লিমন মাকে নিয়ে বেরিয়ে আসার সময় মোমেনাকে উদ্দেশ্য করে বললো,

– জেঠিমা গেলাম, প্রয়োজন হলে জানাবেন। যদিও মনি আপার জন্য কাউকে প্রয়োজন নেই।দেখবেন একটু পর উঠে নিজের অপারেশন নিজেই করে ফেলবে।
– লিমন…
মায়ের ধমকে চুপ তো হলোই না উল্টা মাকে জোর করে বের করে নিয়ে আসলো। সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে রত্না প্রশ্ন করলো,
– কিরে লিমন ভাবী,ভাইজান আসলোনা যে?
– না আসাই ভালো। বড় আম্মুর শরীরের অবস্থা জানোনা, আর বড় আব্বু ও তো এসব ধকল নিতে পারেনা। জেঠীকে দেখছো কেমন ছ্যাৎ ছ্যাৎ করছে। এছাড়া একটা নিউজ আছে আম্মু?
– কি?
লিমন হেসে বলে,
– না কিছুনা, তুমি কি যাবে ওই বাসায়? বড় আম্মু বেশ কিছুদিন বলছিলো তোমাকে নিতে।
– গেলে যদি ছোট ভাবী পরে কথা শুনায়?
– বাদ দাও তো। চলো।
আসল কথা চেপে গেলো লিমন। তাহিকে মেসেজ দিলো। যদিও জানে মেয়েটা যাবেনা এখন। এখানে তার অতীব গুরুত্বপূর্ণ কা/ল/না/গি/নী রোগীর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবে। রওয়ানা দিলো সুলতানা মঞ্জিলের উদ্দেশ্যে।

পাভেলের ফোনে মেসেজ। ভাইব্রেশনের জন্য ফোন হাতে নিলো। মেসেজ দেখে মেজাজ আরো বিগড়ে গেলো। মনে মনে নিজেকে অশ্রাব্য গালি দিলো এই ভেবে যে কেনো নাম্বারটা ব্লক করলোনা। পাশে শাহীন বসে আছে। এবার ফোন বেজে উঠলো। কেটে দিতেই পুনরায় বেজে উঠলো। শাহীন বিরক্ত হয়ে বললো,
– ফোন ধর নাহয় বন্ধ কর।
ফোন সাইলেন্ট করে মেসেজ দিলো,
– দোহাই লাগে শিফা, আমাকে শূলে চড়াবে জানতে পারলে। আর মেসেজ দিও না।
ও পাশ থেকে মেসেজ এসেছে,
– দিব না আগে বলেন ভালোবাসি।
– বাসিনা।
মেসেজ দিয়েই ফোন পকেটে ঢুকিয়ে ফেললো।

গাড়িটা কোনো রকম পার্ক করে ছুট লাগিয়েছে চারজন। সোজা হয়ে ভদ্র ভাবে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আশপাশে অফিশিয়াল লোকজন এসেছে,অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী ও আছে। শাহাদের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়েছিলো। নিজে রাজনীতির সাথে জড়িত না থাকলে ও রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হওয়াতে অনেক নেতাকর্মীদের বেশ পছন্দের পাত্র শাহাদ। সকলে সালাম দিচ্ছে। পুলিশ দিয়ে ঘেরাও আজ এয়ারপোর্ট। আবহাওয়া আজ ঠান্ডা। চারদিকে হৈহৈ রৈরৈ রব। সকলের মুখে উপচে পড়া উত্তেজনাকর হাসি। প্লেন ল্যান্ড করেছে সেই আওয়াজ কানে স্পষ্ট। পাভেল এবং শাহীন একজন অন্যজনের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে, ইয়াজ- তুহিন একে অন্যের কাঁধে হাত দিয়ে রেখেছে। এইতো ভাইজান হাসি মুখে এগিয়ে আসছে পুলিশ অফিসার,নিরাপত্তা কর্মীদের সাথে। পরনে একটা অফ হোয়াইট গ্যাভাডিং, গায়ে কালো হুডি, চোখে রিমলেস গ্লাস, মাথায় হুডির ক্যাপ, পায়ে ক্যাজুয়াল ক্যাটস। ঠোঁটের কোণে হাসি। এইরূপে শাহাদকে এর আগে খুব কম মানুষ দেখেছে। হয়তো অসুস্থতার খাতিরে নিজেকে স্বাভাবিক সুস্থ রাখতে আজ খুব সাধারণ পোশাকে সেজেছে। প্রেসের লোকজন ছবি তুলতে ব্যস্ত। কথা বলতে চাইছে কিন্তু সুযোগ পাচ্ছেনা। আশপাশ থেকে লাগাতার প্রশ্ন আসছে,

– স্যার আপনার শরীর কেমন?
– স্যার আপনি কাউকে না জানিয়ে যাওয়ার পেছনে কি কোনো কারণ আছে?
– আপনার রোগটা কি ছিলো?
আরো অনেক প্রশ্ন। একেবারে সামনে এসে দাঁড়াতে ইয়াজ- তুহিন ছুট লাগালো। ঝাঁপিয়ে পড়লো শাহাদের বুকে। দুহাতে স্নেহের অনুজদের জড়িয়ে ধরলো। ওদের ছেড়ে আরেকটু এগিয়ে আসতেই শাহীন আর পাভেলকে দেখতে পেলো একে অন্যের হাত জড়িয়ে দাঁড়িয়ে। দু হাত মেলে দিতেই দুই দিক থেকে বুকে আঁছড়ে পড়লো দুজন। এ যেন অগ্রজ-অনুজদের মিলনমেলা। পাভেল-শাহীনের চোখে পানি। এয়ারপোর্টের অবস্থা আরো গুরুতর হচ্ছে।পুলিশের সহায়তায় বেরিয়ে আসলো। নিজের রেঞ্জ রোভারটাকে স্বচক্ষে দেখতে পেয়ে হাসি ফুটলো। গাড়িতে চেপে বসলো প্রত্যেকে। হামজাকে বাড়িতে নামিয়ে দিলো। ইয়াজ এবং তুহিন মাঝপথে নেমে পড়লো পার্টি অফিসের বাহানা দিয়ে। আসল উদ্দেশ্য হাসপাতাল।

রায়হান সাহেব দুশ্চিন্তায় ছটফটিয়ে উঠলেন। শেফালীকে ধমক দিলেন। চাচা ফোন দিয়েছে সেটা কেনো জানায় নি। মনি যে হাসপাতালে এই কথা তিন/চার ঘন্টা পর জানতে পারছে ব্যাপারটা দুঃখজনক। শাহীন বা পাভেল কেউই ফোন তুলছে না। লিমন ও একনাগাড়ে বকা খেয়ে যাচ্ছে। শিফা বললো,
– আব্বু একটু পর যান। ছোট ভাইয়া একটু ঝামেলায় আছে। মেসেজ দিয়েছে রাস্তায়, বাসার দিকে আসছে।
লিভিং রুমে বাড়ির প্রতিটি মানুষ চিন্তিত। অকস্মাৎ শিফা শেফালীর কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
– আপু ইচ্ছে করে আব্বুকে জানাও নাই তাই না?
শেফালী বকা খেয়ে ও বেহায়ার মত মুচকি মুচকি হাসছে। শিফাকে বলল,
– হ্যাঁ, ডাইনীটার সাথে একদম ভালো হয়েছে। আমার জীবন তেজপাতা করেছে। ওকে দেখতে কেনো যাবে আব্বু আম্মু? আল্লাহ সেদিন ভাইজানকে ভাবীজানের উসিলায় রক্ষা করছে। নাহলে কেলেঙ্কারি হয়ে যেত?

– সে তো আব্বুর বকাই খেলে?
– সারাজীবন খারাপ কাজের জন্য বকা খেয়েছি, আজকে একটা মারাত্মক প্রশংসনীয় কাজ করেছি।আমার আত্মা শান্তি পেয়েছে। এখন চুপ থাক।
পাশ থেকে লিমন তাল দিলো,
– শুনো কি হয়েছে? মেয়েটা হাসপাতালে এরপর ও জেঠীমার দেমাগ কমেনা ডাক্তার তাহিকে কতগুলা কথা শুনালো।
শেফালী ভ্রু কুচকে বলে,
– ডাক্তার তাহি মানে? তাহি আপা?
– হ্যাঁ
– আপা কি তোর চেয়ে ছোট? নাম ধরে কেনো ডাকছিস? বল যে তাহি আপা?
– এমা ছিঃ ছিঃ আপন বোন নাকি…
সুলতানা কবির ধমকে উঠলেন,
– একদম চুপ,অন্যায় করাটা করেছে আবার ফিসফিস করছে তিন মাথা মিলে। ইচ্ছে করছে থা/প/ড়ে মুখ চপা বদলে দিই।
তিনজনই চুপ। দিয়া বললো,
– আম্মু আমি ভেতরে যাবো আপনার নাতনীকে নিয়ে।
সকলে স্পষ্ট বুঝলো দিয়া মনিকে নিয়ে কোনো আলোচনায় থাকতে চাইছেনা।

ঠিক তখনই বাড়ির গেট থেকে গাড়ির আওয়াজ এলো। দিয়া রুমে চলে গেলো। শিফা উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলো,
– এইতো ভাইয়া আসছে?
লিমন ছুটে বেরিয়ে যাবে তখনই রায়হান সাহেব ধমক দিলো,
– এমন করছো কেনো দুজন জীবনে শাহীনকে দেখোনি?
উত্তেজনা, কৌতুহল দমিয়ে রাখা যে কি কষ্ট হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। আবার দুজন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে একে অন্যের মুখ দেখে। কলিং বেল বাজতেই আফিয়া খালা দরজা খুলে দিলো। দরজার সামনে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে রইলো তব্দা খেয়ে। সুলতানা কবির বললো,
– আফিয়া তোমার আবার কি হইছে? কে আসছে?
আফিয়া খালা হু হা করে কেঁদে কেটে বলে উঠলো,
– ও আম্মা আমি কারে দেখতাছি?
সবাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে সামনে এগিয়ে এলো। ধীর পায়ে ঠোঁটের কোণে এক পেশে হাসি রেখে লিভিং রুমে এসে দাঁড়ালো। পেছনে পাভেল এবং শাহীন। সুলতানা কবির ছেলেকে দেখে কেঁপে উঠলো। মুখে উচ্চারণ করলো,

– আল্লাহ…
রায়হান সাহেবের চক্ষু ছানাবড়া। সেই মুগ্ধ হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে দুহাতে বাবা মাকে জড়িয়ে ধরলেন। রায়হান সাহেব ছেলের কপালে স্নেহের চুমু খেলেন। সুলতানা কবির গুনগুন করে কাঁদছে,
– আমার আব্বা… আমার মানিক। আল্লাহ তোমার কাছে লাখ কোটি শুকরিয়া। আমার বাবু আমার চোখের সামনে। আমার আর চাওয়ার নাই।
রায়হান সাহেব একটু সরে এসে ইশারা দিলেন, মাকে যেন সামলায়। শাহাদ মাকে এবার দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো,
– আম্মা, এমন করে কাঁদলে বাবু কষ্ট পাবে তো। এবার থামেন। মুখটা দেখান। আমি কতদিন দেখিনা আমার বেহেশতের মুখ।
সুলতানা কবির ছেলের বুক থেকে মুখ তুলে দুহাতে ছেলের গালে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে থাকলো। পেছন থেকে শাহীন টিপ্পনী কা/টছে,

– ইশ! ভাইজান আপনি তো সবার আদর নিয়ে যাচ্ছেন। আমরা তো কোনো দিন ও এত আদর পেলাম না।
সুলতানা কবির তেঁতে উঠে শাহীনকে ধমকে বলে,
– হ্যাঁ তোমরা তো বাতাসে বড় হইছো। এত হিংসা কেনো। আমার বাবুটা কতগুলা মাস পর আমার কাছে আসছে।
মাকে ছেড়ে সামনে তাকালে দেখে ছোট ছোট তিনভাই বোন তাকিয়ে আছে ছলছল চোখে। হাত মেলে দিতেই তিনজন ঝাঁপিয়ে পড়লো। শেফালী, শিফা আর লিমন শক্ত করে ভাইজানকে ধরে রেখেছে। কাঁদছে সবাই। এতদিনের দুশ্চিন্তা সরেছে মাথা থেকে। ঠোঁট বিস্তৃত হাসি। রত্নাকে দেখে সালাম দিলো শাহাদ। কাছে এসে রত্না মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,

– আব্বা সুস্থ থাক। আমি আল্লাহর কাছে বলেছি আমার হায়াৎটুকু ও যেন আমার বড় ছেলেটাকে দেয়।
ভাইবোনদের ছেড়ে মাতৃসমতুল্য চাচীকে ধরে বললো,
– চাচীআম্মু এমন কথা যেন না শুনি, আজকের শাহাদ আপনাদের অবদান। চাচাজান চলে যাবার পর আপনি আমার দায়িত্ব। আর লিমন কখনোই আমার কাছে আমার চাচাতোভাই ছিলোনা। ও বরাবরই আমার সন্তানতুল্য। রজত,লিমন,শিফা, শেফালী,কাব্য,নিশাদ,নিশি প্রত্যেকে আমার প্রাণ। ফুফিও রাস্তায় কাঁদছিলো ফোনে। আপনাদের মুখে হাসি ফোটাতে মহান রব আমাকে আবার নতুন জীবন দিয়েছেন অথচ এখনো সকলের চোখে পানি। মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
দুহাতে চোখ মুছে রত্না বললো,
– আর কাঁদবোনা বাবা, এবার শুধু হাসবো।
এর মাঝে আফিয়া খালা দিয়াকে ডেকে নিয়ে আসছে। মেয়েকে কোলে নিয়ে ছুটে এসেছে দিয়া। প্রিয় মানুষটাকে এভাবে দেখে বিস্মিত দিয়া। শাহাদ তখনো দেখেনি প্রিয়তমা স্ত্রীকে। শেহজা বাবাকে দেখে সজোরে চিৎকার দিয়ে উঠলো,

– বাবা, বাবা কোলে
শাহাদ মেয়ের গলা শুনে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে তার রানী আর রাজকন্যা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে। ঘোমটার নিচে বুঝা যাচ্ছে চুল খোলা। পরনে একটা হলুদ রঙা গাউন। এতেই যেন অগোছালো মেয়ের সৌন্দর্য্য আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। আপন মানুষকে কাছে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে। চোখে মুখে আনন্দ প্রকাশ পাচ্ছে। বাকিরাও আশ্চর্য ছোট্ট শেহজার কথা শুনে। এই মেয়ে কোলে বলা শিখলো কখন? শাহাদের মনে হলো কত শত বছর এই প্রানটাকে দেখেনি। কত ভালোবাসায়, আদরে বাবাকে বলছে কোলে নিতে। এ যেন উত্তপ্ত ধরনীর বুকে এক পশলা শান্তির বৃষ্টি, শ্রাবনের ধারা ঝরছে টুপুরটুপুর ঝংকারে, শুভদৃষ্টি হলো সকলের প্রিয় যুগলের, প্রেয়সীর চোখে আনন্দ অশ্রু আর প্রিয়তম স্বামীর ঠোঁটে অনাবিল হাসি।

সায়রে গর্জন পর্ব ৩৩

গুটি পায়ে এগিয়ে এসে মেয়েকে কোলে তুলে নিলো। শেহজার গালে চুমু দিতেই মেয়েটা কি বুঝলো কে জানে! বাবার গালে, মুখে, নাকে নিজ থেকে ঠোঁট লাগিয়ে আপ্পা দিচ্ছে। ভিজিয়ে দিয়েছে বাবার মুখ আদরে আদরে। শাহাদ হাসছে, তার সাথে খিলখিল করে হাসছে ছোট্ট শেহজা। গত কয়েকমাস এই মেয়েটাকে কেউ হাসতে দেখেনি এভাবে। অথচ আজ ওর হাসিই থামছেনা। শাহাদ দ্বিধা, লজ্জ্বা, বিভেদ সব ভুলে আরেক হাতে বুকে জড়িয়ে ধরলো প্রিয় সহধর্মিণীকে। আছড়ে পড়লো স্বামীর বুকে। অর্ধাঙ্গীর মাথার অগ্রভাগে ওষ্ঠ ছোঁয়ালো। শব্দহীন আজ সুলতানা মঞ্জিলের লিভিং রুম। হাস্যজ্বল প্রতিটি মুখ। সুখ ফিরেছে তাদের। প্রাণ ফিরেছে রায়হান সাহেবের পরিবারের। স্রষ্টা ফিরিয়ে দিয়েছেন তাদের মোনাজাতে রাখা প্রিয় মানুষটাকে। একেই কি বলে সর্বসুখ?
সহধর্মিণীর কানের গোড়ার চুলে সকলের অগোচরে হালকা ফুঁ দিলো। শরীর জুড়ে শীতল হাওয়া শিহরিত। কানে আলতো ভাবে ঠোঁট স্পর্শ করে ফিসফিস স্বরে বললো,
– শুভ জন্মদিন শাহাদের রানী। আজ থেকে শাহাদ পুরোপুরি আপনার।

সায়রে গর্জন পর্ব ৩৫