Home সায়রে গর্জন সায়রে গর্জন পর্ব ৪

সায়রে গর্জন পর্ব ৪

সায়রে গর্জন পর্ব ৪
নীতি জাহিদ

আলো আমার, আলো ওগো, আলো ভুবন-ভরা।
আলো নয়ন-ধোওয়া আমার, আলো হৃদয়-হরা নাচে আলো নাচে ও ভাই, আমার প্রাণের কাছে– বাজে আলো বাজে ও ভাই হৃদয়বীণার মাঝে–
জাগে আকাশ, ছোটে বাতাস, হাসে সকল ধরা॥
আলোর স্রোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি।
আলোর ঢেউয়ে উঠল নেচে মল্লিকা মালতী।
মেঘে মেঘে সোনা, ও ভাই, যায় না মানিক গোনা–
পাতায় পাতায় হাসি, ও ভাই, পুলক রাশি রাশি–
সুরনদীর কূল ডুবেছে সুধা-নিঝর-ঝরা॥

রাতগুলো কাটে গভীর নিঃসঙ্গতায়। কখন ফুরাবে এই বিষাদের দিন গুলি। কখনো সরাসরি নিষেধ করা হয়নি এই মেয়েকে, এভাবে রাতে বারান্দায় গান না করার জন্য। শুধু কি শাহাদের কানেই বাজে নাকি বাকিরা শুণেও চুপচাপ থাকে! প্রতি রাতেই কি গাইতো এই মেয়ে নাকি শাহাদ আসার পরই গাইলো! বারান্দা থেকে সোজা রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিয়ে মেয়ের পাশে এসে শুয়ে পড়ে। গানের প্রতিটি শব্দ কানে বাজে। শাহাদ উঠে গেলো বিছানা ছেড়ে। মেয়ের গায়ের আশপাশের বালিশ সরিয়ে মেয়েকে কোলে নিয়ে দোলনায় শুইয়ে উঠে দাঁড়ায়। সোজা পা ফেলে সুইমিং এর উদ্দেশ্যে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

নিচে পুলের সামনে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় গান ভেসে আসা বারান্দার পানে। বরাবরের মতো হাতে একটা বই, পরনে নীল রঙা সুতি শাড়ি, দেয়ালে হেলান দিয়ে আকাশ পানে চেয়ে গাইছে আরাধ্য গান। এত আয়োজন নিয়ে বসতে হয় কেনো গান গাইতে! এই মেয়ের প্রতিটি কাজে আভিজাত্যের ছোঁয়া। অথচ নিষিদ্ধ হালাল এই মেয়ে। হারাম নিষিদ্ধ হলেও নিষিদ্ধ হালাল বড্ড অপরিচিত শব্দ৷ চোখ ধাঁধানো রুপে মাঝে মাঝে হেরে যায় শাহাদের ভেতরের পৌরষত্ব। শত হোক পুরুষ মানুষ। আকর্ষণ থাকবেই। কাবু করাটাই তো শিংহের পরিচয়। দু চোখ বুজে লাফ দেয় পুলের পানিতে। ধপাস করে উঠে পানি। আচমকা এমন শব্দে থেমে যায় গান। দোতলা থেকে পানির উৎসের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় মানুষটা সুইমিংপুলে অস্বাভাবিকভাবে সাঁতরাচ্ছে। এ যেন আত্ন-সংযত করার অগ্নি পরীক্ষা। বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে রমনী। ঢোক গিলে আঁৎকে উঠে ছুটে যায় নিজের কামরায়। বুক কাঁপছে। তবে কি এবার গানেও নিষেধাজ্ঞা জারি করবে! এত রাতে নিরবে নিভৃতে গাওয়া গানও কর্ণগোচর হলোনা। এবার গানের স্বাধীনতার পায়েও বুঝি বাঁধলো বেড়ি!

কাক ডাকা ভোরে ঘুম ভেঙে গিয়েছে শেহজার।উঠেই কাঁদছে। ঘড়ির দিকে তাকাতে দেখে পাঁচটা চল্লিশ। ফজরের নামাজ মিস হয়ে গেলো। শাহাদ উঠে মেয়েকে কোলে নিলো। ঘুম ঘুম চোখে বুঝতে পারছেনা মেয়ে কাঁদছে কেনো। আচমকা দরজায় নক করার আওয়াজ পেয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখে সুলতানা কবির। মাকে দেখে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। মাকে বলে উঠলো,
– আম্মু শেহজা কাঁদছে কেনো? আমি বুঝতে পারছিনা।
সুলতানা কবির খাটে বসে নাতনীর ডায়াপার চেঞ্জ করতে করতে বললো,

– বাবা হওয়া সহজ, মা হওয়া সহজ নয়। বাবারা সন্তানের সরাসরি দায়িত্ব পালন করে কিছু সময়ের জন্য, অথচ মায়েরা করে সারাদিন। শেহজার মায়ের বয়স টাও খুব কম। ভুল মানুষই করে। আমি জানিনা কি এমন ভুল করেছে মেয়েটা যার দরুন এত বড় শাস্তি দিচ্ছ। জানো বাবু,আমার যখন বিয়ে হয় তখন আমার বয়স ছিলো তেইশ আর তোমার বাবার পঁয়ত্রিশ। উনি আমাকে নিজ হাতে সামলে নিয়েছিলো। তুমি হওয়ার পর শরীর একেবারে ভেঙে গিয়েছিলো।কত রাত আমার সাথে না ঘুমিয়ে কাটিয়েছে তোমার বাবা। আমি সেই ঋণ কখনোই শোধ করতে পারবোনা। সাধারণত বাচ্চারা দুই তিন বছর জালাবে। এই সময়টা মায়েদের অনেক কষ্টে সামলাতে হয়।মাথার উপর একটা বটবৃক্ষ লাগে। আমার যেমন তোমার বাবা ছিলো।

তুমি কি কারো বটবৃক্ষ হতে পেরেছো বাবু! তোমার বয়স আটত্রিশ বছর। আর দিয়ার মাত্র বাইশ। তোমার বিয়ে যদি ওর বয়সে হতো তোমার ঠিক বড় একটা মেয়ে থাকতো। আজ শেহজার গালে চড়ের দাগ দেখে তুমি বাড়ি মাথায় তুললে।মেয়ের কষ্ট সহ্য হলোনা তোমার। তবে দিয়া কি কোনো বাবার মেয়ে নয়? বাবা নেই বলে ওকে কষ্ট সহ্য করতে হবে! মাঝে মাঝে মনে হয় তোমার বিদেশ যাওয়াটা বাহানা। দিয়ার থেকে নিজেকে আড়াল করতেই এমন কাজ করো। গত দু বছরে একবার জিজ্ঞেস করেছো মেয়েটা ভালো আছে কিনা!খাওয়া দাওয়া করে কিনা। ওর প্রেগন্যান্সির সময় তোমাকে ওর বড্ড প্রয়োজন ছিলো। অথচ পায়নি। তুমি বুঝতেও পারছোনা ছোট্ট মেয়েটার হেসে খেলে পার করার বয়সে ওর কোলে জীবন্ত একটা বাচ্চা।

সংসার কি বুঝে উঠার আগেই মা,স্ত্রী,ছেলের বউ হয়ে গিয়েছে। মেয়েটাকে একটু বুঝে নিও। আমি শেহজাকে নিয়ে যাচ্ছি। ফিডিং করাতে হবে। এত বড় বেডরুমের প্রয়োজন নেই তোমার যদি সেখানে রাজ করার মত রানী না থাকে। তোমার কি কখনোই মনে হয় নি রুমটা খালি?
মা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে চলে গেলো। নিরবতা পালন করে রইলো। এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই তার কাছে। নিজেকে সবকিছু থেকে আড়াল করেই আজ এই অবস্থানে এসেছে। গন্তব্য সন্নিকটে। আবেগে বিগলিত হয়ে লাভ নেই। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ভোর ছয়টা। এখন আর ঘুম হবে না। উঠে ফ্রেশ হওয়ার উদ্দেশ্যে ওয়াশরুমে গিয়ে ওযূ করে আসে। সালাত আদায় করে জগিং স্যুট পরে বের হলো। প্রকৃতি যদি অশান্ত মনকে শান্ত করতে পারে! যদি পাড় ভাঙা নদীর একটি গতিপথ হতো! একেবারে বিলীন হবে নতুবা নতুন জায়গা নতুন পলিমাটি জেগে উঠবে৷ আগের মত সেই নদী আর থাকবেনা।

প্রাতঃকালীন ব্যায়াম সেরে রুমের পাশে নিজের ব্যক্তিগত জিমে গিয়ে কয়েকটা পুষ আপ দিলো এবং ট্রেডমিলে কিছুক্ষণ এক্সারসাইজ করলো। রুমে এসে নিজেকে ফরমাল লুকে পুনরায় সাজিয়ে নিলো। ডাইনিং এ সবাই খেতে বসেছে। শাহাদ আজ সবজি মুখে দিয়েই মুখ কুঁচকে গিলে নিলো। শরবত মুখে দিতেই চিনির পরিমান অনেক বেশি, ডিম মুখে দিতেই কুসুম একেবারে কাঁচা রেখে দিয়েছে সিদ্ধ হয়নি।
শাহাদ চুপচাপ বসে আছে কিছুই বলছে না। শেফালী মুখে দিতেই বলো,
– আজকের খাবার এমন অদ্ভুত কেনো? মহারানী কি তরকারি রাঁধতে ও ভুলে গেলো।
শিফা রেগেই উত্তর করলো,

– আব্বু স্যরি মাফ করবেন, জোরে কথা বলার জন্য৷ বড় ভাবীর জ্বর একশ তিনের উপরে। বেচারী সকাল থেকে বমি করছে। আম্মু,আমি অনেক কষ্টে মাথায় পানি দিয়েছে। চোখ অবধি মেলতে পারছেনা। তুমি এত অকৃতজ্ঞ কেনো আপা! ভাবীর সাথে সব সময় এমন করো। আজাইরা বসে অন্ন ধ্বংস না করে মাঝে মাঝে তো রান্নাঘরে যেতে পারো।
শেফালী চেতে উঠে বললো,
– যতবড় মুখ নয় ততবড় কথা,আমার বাপের অন্ন আমি ধ্বংস করছি তোর কি? তুই ইদানীং বেশি ভাবী ভাবী করছিস না।
শাহাদ চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলো। শেফালী আর শিফা দুজনের দিকে তাকিয়ে হুংকার ছেড়ে বললো,
– এটিই প্রথম এবং এটিই শেষ। পরবর্তীতে আমি খাবার টেবিলে যদি এভাবে ঝগড়া করতে দেখেছি এই বাড়িতে ডাইনিং টেবিলের এক্সিসটেন্সই রাখবোনা।
সকাল বেলা ধমক খেয়ে প্রতিটি প্রানী নিরব।রায়হান সাহেব খুব খুশি হলেন। শেফালী বড্ড বাড় বেড়েছে। উনি সন্তানদের বকা দেয়া পছন্দ করেন না তাই নিজেকে সংযত রাখেন। এর মাঝে গুটি গুটি পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো দিয়া। সুলতানা কবির উঠে গিয়ে ধরতে ধরতে বললো,

– আজ উঠতে গেলে কেনো মা, আমি তোমার রুমে নাস্তা নিয়ে আসতাম।
দূর্বল গলায় ধীর স্বরে বললো,
– আমি ঠিক আছি আম্মু, সবার নাস্তা শেষ? আমাকে একটু আগে জাগাতেন। আমি তো কিছু বানাতেও পারলাম না।
শাহাদ একবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখলো। এক রাতেই এত পরিবর্তন। চোখ মুখ সব ফুলে গিয়েছে। শরীরে প্রাণের সঞ্চার নেই বললেই চলে। কিসের জন্য এমন করছে। জ্বর হয়েছে ডাক্তার দেখাবে তা না করে ঘরে বসে আছে কেনো! দিয়া লক্ষ্য করলো টেবিলের খাবার গুলো কেমন যেন এলোমেলো হয়ে আছে। একটু এগিয়ে আসে। দেখতে পেলো কেউ কিছুই খায়নি। আজ ছুটা কাজের বুয়া আর আফিয়া খালা মিলে রেঁধেছে।
শাশুড়ীর দিকে তাকিয়ে বললো,

– আম্মু,আব্বু আপনাদের তো ঔষধ আছে। আপনারা বসুন। দশ মিনিটের মধ্যে আমি বানিয়ে নিয়ে আসছি।
রায়হান সাহেব বললেন,
– ব্যস্ত হয়ো না তো মা, তুমি খেয়ে নাও। সুলতানা দিয়াকে কিছু বানিয়ে ঔষধ খাইয়ে দাও। ওর জ্বর কমেছে কিনা দেখো না কমলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও।
সুলতানা গায়ে হাত দিয়ে দেখলো গায়ে এখনো জ্বর। শাহাদ মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আম্মু আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিব নিয়ে যাবেন ডাক্তার কাছে।
কথা শেষ করেই বেরিয়ে গেলো শাহাদ। গাড়ি পাঠাবে বললো! দিয়া কি ঠিক শুনলো! নিজের গাড়িটা কারো জন্য প্রযোজ্য নয়। মেরুন রঙা ছাদ খোলা গাড়িটাতে বসা সুলতানা এবং রায়হান সাহেব ছাড়া এই বাড়ির কোনো প্রাণীর নসিব হয়নি। আজ মানুষটা দিয়ার জন্য গাড়ি পাঠাবে বলল! এই কেয়ার টুকু টান ছিলো নাকি দয়া?

বিকেলে ডাক্তার দেখিয়ে এসেছে। ডাক্তার জানিয়েছে ভাইরাল ফিভার। ঠান্ডা লাগানোর ফলে এসব হয়েছে। শেহজাকে ও মেডিসিন দিয়েছে। মায়ের অসুস্থতা মেয়ের উপর প্রভাব ফেলবে এটাই স্বাভাবিক। বাড়িতে অনুষ্ঠান। রায়হান সাহেবের ছোট বোন আসছে নেদারল্যান্ড থেকে। তিনি ছেলেকে বিয়ে করাতে চান বাংলাদেশে। মেয়েও দেখেছেন। মেয়ের পরিবার বাংলাদেশে থাকে। বিয়ে আগামী সপ্তাহে।রায়হান সাহেব চাচ্ছেন বোনের ছেলের বিয়ে এই বাসা থেকেই দিতে। বোনের এই কূল,সেই কূলের মধ্যে অভিভাবক এখন রায়হান সাহেবই আছেন। শাহাদ গিয়েছে রিসিভ করে নিয়ে আসতে। কলিং বেল বেজে উঠলো। শিফা গিয়ে দরজা খুলে দিলো। ফুফু মঞ্জিলা, উনার ছেলে নিশাদ এবং মেয়ে নিশি এসেছে। রুমে ঢুকতেই সবাই অভ্যর্থনা জানালো। পেছনে শাহাদ ও আছে। সোফায় বসে সকলে কুশল বিনিময় করছে। মঞ্জিলা দিয়ার খোঁজ করে বললো,

– ভাবী বড় বৌ কই? বিয়ের সময় ও তো আমি আসতে পারলাম না।
– শিফা তোর বড় ভাবীকে ডেকে আন। আসলে মঞ্জিলা, বউয়ের জ্বর। অসুস্থ মেয়েটা।
– ওমা হঠাৎ,বাড়িতে অনুষ্ঠান। ওর কত দায়িত্ব। বংশের বড় বউ।
– ঠান্ডা লাগছে, ভাইরাল ফিভার। ঠিক হয়ে যাবে চিন্তা করোনা।
সবার কথার মাঝেই দিয়া, শিফা রুমে প্রবেশ করলো। দিয়ার কোলে ছোট্ট শেহজা। বাবাকে দেখে অস্থির হয়ে পড়েছে। এতক্ষন ফোনে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিলো। অনেক গুলো মেইল এসেছে। সেগুলোই চেক করছিলো। ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিতেই শেহজা বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো। শাহাদ গাঢ় করে মেয়ের দু গালে চুমু খেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো। মঞ্জিলা অবাক হয়ে দেখছে। দিয়াকে দেখে বলেই ফেললো,

– ওমা বউ তো আমাদের শিফা থেকেও ছোট।
শিফা হেসে বলে,
– একদম সেরকম লাগছেনা? আসলে ভাবী আমার বড়।
নিশাদ কেমন অদ্ভুত ভাবে দেখছে। দিয়া সেই চাহনীতে কিছুটা বিচলিত হলো। শাহাদ এর মাঝেই বলে উঠলো,
– আম্মু শেহজাকে ডাক্তার কি বলেছে?
– শেহজার মেডিসিন দিয়েছে। টেস্ট দিয়েছে কিছু। দু একদিনের মধ্যেই করাতে বলেছে। ওর আসল মেডিসিন হলো ওর মা। মা সুস্থ থাকলে ইনশাআল্লাহ মেয়ে ও সুস্থ থাকবে।
সারাক্ষন দুষ্টুমি করবে কিন্তু বাবাকে পেলে এই মেয়ে দুষ্টুমি কি সেটাই ভুলে যায়। এই যে এত সুন্দর করে চুপটি মে/রে বাবার কোলে বসে আছে। মাঝে মাঝে খিলখিল করে হেসে উঠে বাবার দুষ্টুমিতে। শাহাদ মেয়েকে কাতকুতু দেয় আর মেয়ে হাসে। শাহাদ উঠে দাঁড়ায়।মেয়েকে কোলে নিয়ে রুমে যাবে। গায়ের পোশাক বদলে নিতে হবে। সারাদিন অনেক দৌঁড়ঝাপ করেছে গোসল করে চেঞ্জ করা প্রয়োজন। ফুফু এবং কাজিনদের উদ্দেশ্যে বললো,

– তোমরা বসো আমি ফ্রেশ হতে যাচ্ছি।
নিশি বললো,
– ভাইজান, বাবুকে দিয়ে যান।
– পরে নিও এখন আমার আর প্রিন্সেস এর পারসোনাল টাইম।
শাহাদ চলে গেলো নিজের রুমে। দিয়া সোফায় বসে কথা বলছে ফুফুদের সাথে। শিফা,শেফালী,নিশি এবং নিশাদ নিজেদের মধ্যে দুষ্টুমি করছিলো। কথার মাঝে নিশাদ দিয়াকে বললো,
– ভাবীজান আপনার রুপের রহস্য কি বলুন তো! বিয়ের পর আমার বউটাকে টিপস দিবেন।
উপস্থিত সকলে হেসে উঠলো। দিয়া বিব্রত বোধ করে কিঞ্চিৎ হাসলো। শিফা নিশাদকে বলে,

– ভাইয়া, ভাবীজান আর ডেকোনা। বড় ভাইজান শুনলে রাগ করবে। ভাবীমা ডাকো।
– বড় ভাইজান কি ডাকার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে?
শেফালী মুখ ভেঙচি দিয়ে বলে,
– আর বলিস না, গতবার আজমাত ওরে ভাবীজান বলাতে ভাইজান সবার সামনে ধমক দিছে।
শিফা একটু রেগে বললো,
– আজমাত ভাইয়ার ও দোষ ছিলো। ভাবীর সাথে ফ্লার্ট করছিলো ভাইজানের সামনে। ভাইজান এসব পছন্দ করে না এটা তো ও জানতো।
নিশাদ মলিন মুখ করে বলে,

– বেচারা আজমাত। বেক্কল তো বুঝে সারে নাই যে সামনে সাক্ষাৎ যম বসে ছিলো।ওর কপাল ভালো ভাইজান ওরে আছাড় দেয় নাই।
হঠাৎ শিফা আর নিশি হো হো করে হেসে উঠলো। নিশাদ হাসির কারণ জিজ্ঞেস করলে বলে,
– তোমাকে বড় ভাইজান এইচ এস সি পরীক্ষার টেস্টে ম্যাথে ফেল করার অপরাধে একটা আঁছাড় দিয়েছিলো না।মনে আছে!
পুনরায় পুরো ড্রইং রুমে হাসির ছটা। মঞ্জিলা বলে উঠলো,
– ভাবী আমার সেই কথা মনে পড়লেই মুখটা ভয়ে শুকিয়ে যায়। কিভাবে শাহাদ নিশাদকে আঁছাড় মা*রছিলো।
দিয়া ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। নিশাদ লজ্জা পেয়ে বলে,
– এসব বাদ দাও তো! ভাবীমা সামনে। লজ্জা দিও না।
দিয়া অবাক হয়নি। এটাতেই অভ্যস্ত।এ বাড়ির সব ছেলেরা দিয়াকে ভাবী মা ডাকে। শাহাদের কড়া নির্দেশ। কথা বলার সময়ও সবাই চোখ নামিয়ে কথা বলে। দিয়া উঠে যায় জায়গা থেকে। সারাদিন শুয়ে বসে কাটিয়েছে। একটু কফি খাওয়া দরকার।বাড়ির সকলের জন্য নাস্তাও বানাবে। রান্না ঘরে যেতেই কানে এলো শেফালীর গলা নিশিকে বলছে,
– এই মেয়ে থেকে সাবধান। ভাইজান ঘরে জায়গা দেয় না।

ছাদে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে শিফা। ভীষণ মন খারাপ। বড় ভাইজান কখনোই তাকে বকা দেয়না।অথচ আজ ধমক দিলো। গাছের ফুলগুলো কেমন নেতিয়ে পড়েছে।এই সময়টাতে ছাদে কেউ আসেনা। গোধূলি বেলায় সঙ্গহীন থাকতে বেশ পছন্দ এই মেয়ের।প্রিয় মানুষটার রুম দেখা যায় সরাসরি। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি। পরক্ষনে সকালের বকার কথা পুনরায় মনে উঠায় মন খারাপ করে গোলাপ গাছে পানি দিতে শুরু করে।
– আমার ছোট্ট গোলাপটা নেতিয়ে যাক,
তবু ঝরে না পড়ুক,
আমার বাগানের গোলাপটাতে সহস্র কাঁটা থাকুক
ছিড়ে নেয়ার আগে যেন হাতে ফুটুক,
আমার লাল গোলাপটা আরো রঙ্গিন হোক।

কন্ঠ শুনে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে বড় ভাইজান দাঁড়িয়ে আছে। শিফা ছলছল চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নামিয়ে ফেললো। ভাইজান তো কখনো এই সময় ছাদে আসে না। কথা গুলো তাকেই বলেছে তা স্পষ্ট। শাহাদ এগিয়ে এসে বোনের মাথায় হাত রেখে বলে,
– আমার গোলাপটার কি ভাইজানের উপর বড্ড অভিমান হয়েছে?
শিফা দুপাশে মাথা নাড়ে। গলা ধরে আসছে। কথা বললেই কেঁদে দিবে। শাহাদ বোনকে পাশের সিমেন্টের টুলে বসিয়ে বললো,

– এত দূর্বল হলে তো হবে না ফুল। তোমাকে আমি মেয়ের মতো করে বড় করেছি। আমি আঘাত দিব ভাবলে কি করে! তোমার জন্মের সময় সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়া মানুষটা আমি ছিলাম। আমার শাসনে যদি আমার ফুল কষ্ট পেয়ে ঝরে যেতে চায়,আমি ব্যর্থ।
অকস্মাৎ হাউমাউ করে কেঁদে দিলো শিফা। শিফা শাহাদের যতখানি আদর পেয়েছে তার সিকিভাগ ও শেফালী পায়নি। শেফালী সবসময় ছিলো ভিন্ন রকম। শিফার জন্মের পর সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে শেফালী। কোল থেকে ফেলে দিয়েছে,বালিশ চাপা দিয়েছে৷ ওর ধারণায় ছিলো শিফা ওর প্রতিদ্বন্দ্বী। শাহাদ,শাহীন বরাবরই আগলে নিয়েছে শিফাকে। আজো দিয়াকে রক্ষা করতে গিয়ে শিফা বকা খেয়ে বসলো এই কথা শাহাদের কর্ণোগোচর হয়নি। এই ছোট্ট বোনটার কাছে শাহাদ কৃতজ্ঞ। তার মেয়ে এবং মেয়ের মাকে সবসময় শিফা আগলে রেখেছে শেফালী থেকে। বোনের চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,

– নিজেকে সাইদা রোজা শিফা হিসেবে গড়ে তোলো, নিজের চারপাশটায় বেষ্টনী গেঁথে দাও। যেন কেউ ছুঁতে এলে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে ফিরে যায়। সেখানে শাহাদ ইমরোজ ও যদি ঘায়েল হয় তাতেও যেন তোমার সফলতায় বাঁধা না আসে।
শিফা নাক টেনে ক্রন্দনরত গলায় বলে,
– আপনি আমার আইডল ভাইজান। আমি নিজেকে গড়ে তুলব কিন্তু আমাকে বেষ্টনী দেয়ার দায়িত্ব আপনার। আপনার দোয়া ছাড়া আমার চলবেনা।

সায়রে গর্জন পর্ব ৩

শাহাদ হাসে। সেই সাথে শিফাও হাসে। ভাইবোনের এই দৃশ্য আড়াল থেকে দুজন দেখে। একজন মন থেকে দোয়া দেয়,তার অন্তরাত্মা কাঁপে কিভাবে এই পাহাড়সম লোক থেকে তার বোনের হাত চাইবে। অপরজনের চোখে ক্রোধের আগুন। তার আগুনে জ্বালিয়ে দিবে ভাইবোনের এই ভালোবাসা। ধূলিসাৎ করবে সব। যেমনটা করেছিলো বছর দুয়েক আগে!!

সায়রে গর্জন পর্ব ৫