সায়রে গর্জন পর্ব ৫৯
নীতি জাহিদ
বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে দশটা। বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে আছে মেরুন রঙা রেঞ্জ রোভার। গেট খুলে গিয়েছে। সবাই দাঁড়িয়ে অপেক্ষারত। পা ফেলে গাড়ি থেকে নামতেই শাহীন ছুটে এলো। ঝাঁপিয়ে পড়লো ভাইয়ের বুকে। কিছুক্ষন ভাইকে ধরে ছিলো। শাহাদ পিঠ চাপড়ে বললো,
– অভিনন্দন মেজর। আমি খুব খুশি হয়েছি।
নওরিন কাছে এসে শাহাদকে পা ছুঁয়ে সালাম করতে চাইলো। সালাম করতে না দিয়ে মাথায় হাত রেখে বললো,
– পা ছুঁবে না। আমার দোয়া সবসময় তোমার জন্য।
দিয়াকে জড়িয়ে ধরতেই দিয়া আনন্দে বলে উঠলো,
– আমি যে কি খুশী আপু, আমি বড় মা হব। সারা রাস্তা শেহজার বাবাকে এই একটাই কথা বলেছি।
নওরীন লজ্জা পাচ্ছে। সবাই তাকে মাথায় তুলে রাখছে। কোথাকার নওরীন আজ কোথায়, স্বামী শ্বশুরঘর সব নিয়ে বেশ সুখে শান্তিতে আছে।
বাবা- মাকে জড়িয়ে ধরে সকলের সাথে কুশল বিনিময় করছে শাহাদ-দিয়া দম্পতি। দিয়া শাশুড়ীর বুকে। এদিকে শেহজা ফুফি, চাচীদের কোলে ছুটেছে। সুলতানা মঞ্জিলের লিভিং এরিয়া আজ আবার প্রাণোচ্ছল। সকলের আড্ডার মাঝে শাহাদ শিফাকে কাছে ডাকলো। ডেকে পাশে বসিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
– কি হয়েছে বাচ্চা? মন খারাপ কেনো? অসুস্থ?
– না ভাইজান।
শাহাদ সবার দিকে তাকাতেই সুলতানা কবির বলে উঠলো,
– বাদ দাও তো বাবু, ওর নাখরা উঠাতে উঠাতে বাড়ির সবাই বিরক্ত। যাও বৌমা ফ্রেশ হয়ে নাও। অনেকটা জার্নি হয়েছে।
শাহাদ মাকে উপেক্ষা করে বোনকে বুকে টেনে আদরে স্নেহে প্রশ্ন করলো,
– বল তো বাচ্চা, কি হয়েছে? আমার ফুলটার মন খারাপ কেনো? ভাবীজান তো অনেক জিনিস এনেছে।
শিফা হালকা হেসে বললো,
– তাহলে যাই ওগুলো দেখে আসি। আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন ভাইজান।
ছুটে গেলো দিয়ার পিছু পিছু। শাহাদের কেনো যেনো ব্যাপারটা ভালো ঠেকলো না। ঠোঁটের কোণে মেকি হাসি ঝুলিয়ে ঘরের কিছু মানুষকে পর্যবেক্ষন করে উঠে নিজ কামরায় চলে গেলো।
শেহজাকে ফ্রেশ করে দেয়ার পর থেকে ছুটে বেড়াচ্ছে সবার কোলে। দিয়া সুতি শাড়ি পরে গোসল করে বের হলো। রুমে এসে দেখলো শাহাদ নেই। নিজেও বেরিয়ে এলো। অনেক দিন পর বাড়ির সবাইকে পেয়ে ভীষণ খুশি।
তাহি এসেছে। তাহিকে দেখে জড়িয়ে ধরলো। ভাবীজানকে পেয়ে খুশিতে উচ্ছ্বসিত। গেটের সামনে তাহিকে ড্রপ করে লিমন গিয়েছে কি যেন কাজে। এর মাঝে ড্রইং রুমে বসেছে আড্ডা। গল্প আড্ডা কোলাহলে আজ ভরপুর সুলতানা মঞ্জিল। তাহি লিমনকে ফোন দিতেই প্রথমবার রিসিভ হলোনা। পরের বার রিসিভ হতেই ও পাশ থেকে এমন কিছু শুনলো যা অপ্রত্যাশিত ছিলো। চিৎকার দিয়ে হেলে পড়লো তাহি, ছুটে এলো বাড়ির সকলে। শাহীন তাহির হাত থেকে পড়ে যাওয়া ফোন হাতে নিতেই দেখলো এখনো লাইনে আছে। কানে দিতেই ঘটনার আকস্মিকতায় স্তব্ধ। শাহাদ ছাদ থেকে নেমে বাড়ির এমন পরিবেশ দেখে হতবাক। প্রশ্ন করলো,
– কি হয়েছে মেজর?
শাহীন ছলছল চোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
– ভাইজান লিমনের স্পট ডেথ হয়েছে।
– মাথা ঠিক আছে তোমার? কি বলছো এসব।
– পুলিশ জানালো। ওর লাশ আর ফোন দুটোই পুলিশের হেফাজতে।
সবার কথা ছেড়ে তাহিকে জড়িয়ে ধরলো শাহাদ। চেঁচিয়ে বললো,
– আগে নিশ্চিত হও। স্পট ডেথ! এটা কি মুখের কথা যে বললাম আর সবাই মেনে নিলো! যাও কি হয়েছে দেখো। তাহি দেখি ছুটকি, ভাইজানকে দেখ। কিচ্ছু হয়নি…
ভাইয়ের বুকে থেকে দুটো লাইন বললো,
– লিমনও চলে গেলো ভাইজান। কেনো কেউ আমার থাকেনা।
বোনকে চেপে ধরে শাহাদ চেঁচাচ্ছে সবার সাথে। কান্নার রোল পড়ে গিয়েছে কামরায়। এদিকে রায়হান সাহেব রুম থেকে ছুটে এসেছে, সুলতানা কবির কাঁদছে। শোক যেন লিভিং রুমটাকে ঘিরে ফেলেছে। শাহীন বের হবে তখনই দরজায় কলিং বেল বেজে উঠলো। শিফা দরজা খুলতেই জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলো,
– ভূত…
ছুটে এসে বলে,
– লিমন ভাইয়ার ভূত।
সবাই সুস্থ সবল লিমনকে দেখে হতবিহ্বল। লিমন বাড়ির এই অবস্থা দেখে চমকে বললো,
– কি হয়েছে? বড় আম্মু কাঁদছেন কেনো? ডাক্তার তাহি আপনার কি হয়েছে?
তাহি যেন হুঁশ ফিরে পেলো। সব ফেলে ভাইজানের কাছ থেকে সরে ঝাঁপিয়ে পড়লো লিমনের বুকে। এদিকে বেচারা লজ্জায় লাল হয়ে গেলো। শাহাদ গম্ভীর মুখে শাহীনের দিকে তাকালো। সুলতানা কবির এগিয়ে যেতেই আরেক হাতে লিমন বড় আম্মুকে বুকে টেনে নিলো। চিন্তিত মুখে বললো,
– ইয়া আল্লাহ কি এমন হয়েছে, এত ভালোবাসা কেনো আমার জন্য?
শিফা বলে উঠলো,
– তুমি না ম/রে গেছো? উঠে আসছো কি করে?
আঁৎকে উঠলো লিমন। শব্দ করেই বললো,
– ইন্না-লিল্লাহ। আল্লাহ আল্লাহ রহম করো। কি বলিস শিফা।
শাহীন ধমকে বলে,
– হা*** জাদা তোর ফোন কই?
– আরেহ বইলো না। মিষ্টি কিনতে গেলাম। পাশে ফোন রেখে টাকা দিচ্ছিলাম দোকানদারকে। এক চোর এসে ফোন নিয়ে দিলো দৌড়। ওই শালার পেছনে ছুটেও পেলাম না। দেখো হাত কে*টে গিয়েছে উষ্ঠা খেয়ে পড়ে। পরে আর খুঁজে না পেয়ে এদিকে চলে এলাম। মিষ্টি রাখলাম টেবিলের উপর। ফোনটাই গেলো আমার। পুরান ফোন আমার, এত আফসোস নাই।
রায়হান সাহেব খেঁকিয়ে উঠলেন,
– তুই আছোস মিষ্টি নিয়ে, এদিকে তোর বড় মা, বউ,বোনরা সব শোক করছে।
শেফালী সকলের সামনে হঠাৎ হেসে উঠলো,
– ও তাহলে ফোন চোর ম/রছে তুই না?
ধমকে উঠলো শাহাদ,
– যেই মা*রা যাক, হাসির কিছু দেখছিনা। চোরের জায়গায় লিমন থাকাটাও অস্বাভাবিক কিছু ছিলোনা। দোয়া করো যে ও সুস্থ আছে। ফোনের উপর দিয়ে গিয়েছে। জান বেঁচেছে আলহামদুলিল্লাহ। লিমন ফ্রেশ হয়ে নাও।
শাহাদ উঠে নিজ কামরায় যাওয়ার আগে তাহি এবং লিমন দুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
– এভাবে থেকো দুজন। ভালো লাগছে তোমাদের দেখে।
শাহাদ ভেতরে ঢুকতে শাহীন পিঠের উপর কিল দিয়ে বললো,
– কি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিলো আল্লাহ। কলিজায় পানি ছিলোনা।
লিমন সোফায় বসে তাহির দিকে তাকালো। মেয়েটার চোখে এখনো পানির দাগ। তবে কি তার বউ তার জন্য কাঁদলো? সম্পর্কটা ধীরে ধীরে শক্ত পোক্ত হচ্ছে তবে।
সুলতানা কবির তাহিকে বললো,
– লিমনকে রুমে নিয়ে যা। হাতটা ড্রেসিং করে দেয়। আমি খাবার পাঠাচ্ছি।
– বেরিয়ে পড়ো।
আদেশের স্বর ফোনের ও পাশ থেকে কানে বাজতেই যার যার কাজে বেরিয়ে পড়লো। সেই প্রতিক্ষিত প্রভাত। আগামীকাল উন্মোচন হবে নতুন দ্বার।
#সায়রে_গর্জন পুনরায় উঠবে। খুলেছে পুরোনো সব মুখোশ। আজ রাতের আঁধারে সুসজ্জিত হবে পুরোনো প্রাঙ্গন। সম্মুখে ফিরবে প্রাণোদিত ব্যক্তি সকল গোপনীয়তা ভেঙে।
ঘড়িতে এলার্ম বেজে উঠছে বার বার। শেহজা উঠে কাঁদছে। মেয়েকে বুকে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে পাশ ফিরে দেখে মানুষটা নেই। চোখ কচলে নেমে পড়লো খাট থেকে। ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেলো। ঘড়িতে পাঁচটা। বুঝতে পারলো সালাত আদায়ের জন্য উঠেছে। দিয়া খানিকটা হেসে নিজেও ওযূ করে আসলো। এসে দেখে দুটো জায়নামাজ বিছানো। স্বামীর পেছনে সালাত আদায় করলো।
শাহাদকে শুধালো,
– চা বানিয়ে দিবো?
– আমি নিয়ে আসছি। তুমি বসো। দেখে মনে হচ্ছে জেট ল্যাগ লেগেছে তোমার। রেস্ট নাও।
– তা একটু আছে। চলুন আমিও যাবো কিচেনে।
কিচেনে যেতেই শাহাদ চায়ের পানি বসাতে বসাতে বললো,
– তোমাকে গ্যালাপাগোস বলেছিলাম না সারপ্রাইজ আছে?
– জ্বি বলেছিলেন।
– দেয়ার সময় এসেছে।
দিয়ার মুখে হাত। চোখে মুখে উচ্ছ্বাস নিয়ে বললো,
– সত্যি।
– হ্যাঁ সত্যি। আরেকটা কথা।
– কি?
– ভাবছি সবার কাছ থেকে কিছুদিনের জন্য দূরে সরে যাব। আমার কাজ হয়ে গেছে। রাশেদের কেইসের সমাধান হয়েছে।
– কি বলছেন এসব। আমাদের একা ফেলে দূরে যেয়ে কি কিরবেন?
হাসছে শাহাদ। কথা বলতে বলতে পানি ফুটে গিয়েছে। দুটো টি ব্যাগ বের করে চুবিয়ে দিয়ে দিয়ার দিকে এক কাপ বাড়িয়ে বললো,
– দিন রাত লটকন আর স্ট্রবেরি খাব।
মুখ ঘুরিয়ে দিয়া হাসিটাকে আড়াল করে পুনরায় বললো,
– আগে তো এমন ছিলেন না শেহজার বাবা
– কমান্ডার ডাকলে না যে?
– আমি তো চাই, আপনিই তো কেমন যেন করেন। বলেন না ডাকতে।
– তা ঠিক একজন লে. কমান্ডারকে কমান্ডার ডাকা ঘোরতর অন্যায়।
– এর চেয়ে শেহজার বাবাই ভালো।
– চাইলে ফারাহর স্বামী ও ডাকতে পারো অথবা অন্যদের মত এ্যাই শুনছেন, ওগো একটু এদিকে আসুন। সাউন্ডস ইন্টারেস্টিং রাইট?
– আপনি এসব কথা কোথায় পান বলুন তো?
ততক্ষনে দুজনের চা খাওয়া শেষ। কাপ দুটো ধুয়ে বললো,
– আমি যে কি জিনিস এখনো আপনি বুঝলেন না শাহাদপ্রিয়া?
তীক্ষ্ণ চোখে দিয়া বুঝার চেষ্টা করছে। দুজনের মাঝে নিবিড় কথোপকথন,
– কাল বলেছিলাম আমার প্রাপ্য চেয়ে নিব। আজ সময় এসেছে।
– কি প্রাপ্য?
– সন্ধ্যা হোক। তখন চাইবো।
– আমি তো ভাবলাম আপনি আবার টিপিকেল স্বামীদের মতো শেহজার ভাই চাইবেন।
শাহাদ হো হো করে হেসে বললো,
– ওটা চাইতে হবে কেনো, আল্লাহ দিলেই আসবে। সেখানে তো আমার কন্ট্রিবিউশান ও থাকবে তাই না।
– কিভাবে যে এত বেফাঁস কথা বলেন? আহা! কেউ দেখবে, কি করছেন?
– তাতে কি? হালাল,বৈধ বউ কোলে নিয়েছি। কাউকে পরোয়া করি নাকি? অন্যের বউ তো নি নাই।
– না ঠিক আছে, আপনার ভাষ্যমতে এই বাড়িতে আপনার কিছু সন্তানতুল্য ভাই বোন থাকে। ওরা যদি দেখে?
শাহাদ মুচকি হাসি দিয়ে বললো,
– এখন কেউ উঠবেনা। আরো কিছুক্ষন পর উঠবে। তোমার দেবররা উঠলে ও উঠতে পারে।
দিয়া চমকে গিয়ে প্রশ্ন করলো,
– মানে, কোন দেবর?
– মেজর আর বিচ্ছু।
– ছিঃ। কি বলেন এগুলো? আপনি না বড়।
– মজা করলাম।
রুমে ঢুকে দরজা আটকানোর জোর শব্দ। শাহীন একপাশ থেকে বেরিয়ে এলো, অপর পাশ থেকে লিমন। দুজন, দুজনকে দেখে লাফিয়ে উঠেছে। শাহীন লিমনকে ধমকে বললো,
– এ্যাই তুই এখানে কি করিস?
লিমন নাক মুখ কুঁচকে বলে,
– তুমি কি করো?
– ক্ষুধা লেগেছে তোর ভাবীর। ভাবলাম নুডুলস করে দি? তুই কেনো এসেছিস?
– তোমার বোনের মাথা ব্যাথা করছে। ভেবেছিলাম এক কাপ কড়া চা করে দিব। রাতে কেঁদেছে অনেক।
শাহীনের ফোনে মেসেজ আসতেই তাকিয়ে দেখে ভাইজান। শাহীন ভুলবশত মেসেজ জোরেই পড়লো,
– মেকানিক ডেকে এনে আজই গিজার লাগাবে দুই রুমে। গর্দভ।
লিমন শাহীনের দিকে তাকিয়ে বলে,
– আজব বেইজ্জতি। ভাইজানের চোখ দুটোতে সব ধরা পড়তে হবে কেনো?
শাহীন মুখটা পেঁচার মতো করে বললো,
– আমাদের কাজ গুলো ও তো সেরকম। এই সময়টাতে না বের হলেও তো পারতাম। ভাইজানের জায়গায় এখন আব্বু আম্মু বের হলে কি হতো?
– কি হতো, যা সত্যি তাই বলতাম।
– সাধে ভাইজান তোকে বেক্কল ডাকে না। হতচ্ছাড়া।
– ভাইজান যে ভাবীমাকে কোলে নিলো?
– আরেহ বোকা, আমাদের দুজনকে আড়াল করতেই কোলে নিয়েছে। যেন ভাবীমা আমাদের না দেখে। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ উলটা টি শার্ট পরেছিস।
লিমন মুখ চেপে হেসে বলে,
– আমি নাহয় বেক্কল তুমি কি? গায়ে ভুলে ভাবীর ওড়না পেচিয়ে এসেছো টাওলের জায়গায় মনে হয়।
লিমন তখনও হাসছে। হেসে কুটি কুটি হয়ে বললো,
– ভাইয়া স্যরি যেমনটা ভাবছো,অমন কিছুই না। উলটা টি শার্ট পরেছি এটা সত্যি। রাতে অস্থির লাগাতে খুলে ঘুমিয়েছিলাম। এলার্মের শব্দে উঠে দেখি বিবিজান আমার মাথার পাশে বসেই ঘুমিয়েছে। জাগালাম পরে বললো মাথা ধরেছে। তাই তড়িঘড়ি করে উলটা টি শার্ট পরে এলাম। কিন্তু তোমার ব্যাপারটা বুঝলাম না।
– আমার কোনো ব্যাপার নাই। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিরার ওড়নায় মুখ মুছি। ওটাই গলায় ঝুলিয়ে চলে এসেছি। আমি কি আর জানতাম এমন সিচুয়েশনে পড়বো। ছিঃ ছিঃ ভাইজান কি ভাবলো।
লিমন ফোস করে দম ফেলে বললো,
– কি আর ভাববে, তোমার টা গায়ে মাখেনি আমার ক্ষেত্রে তো বোধ হয় ভেবেই নিয়েছে নেক্সট বড় আব্বা ডাকতে আরেকজনকে নিয়ে আসবো।
শাহীন হেসে বললো,
– মন্দ বলিস নি।
– তোমার বোনকে বলে দেখো। আমাকে ঝাটা সাতটা নিয়ে দৌঁড়াবে।
– বেশরম ঘুমাতে যা। কিভাবে বউয়ের বড় ভাইয়ের সাথে কথা বলছিস?
বকতে বকতে শাহীন চলে গেলো, এদিকে লিমন মুখ বেকিয়ে বললো,
– সব তো নিজেই বললো আর দোষ আমার। যত দোষ, সব লিমন ঘোষের।
চা নিয়ে রুমে ঢুকেই দেখে তাহির মাথায় ঘোমটা। সালাত আদায় করেছে হয়তো। গায়ের টি শার্ট খুলে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে বললো,
– যা হয়নি ভাইজান তাই ভেবে বসে আছে।
দোয়া পড়ে লিমনের গায়ে ফুঁ দিয়ে ঘোমটা খুলে বললো,
– কি হয়নি আর ভাইজান এলো কি করে? গেলেন তো চা বানাতে।
– সে অনেক কাহিনী বাদ দিন। চা টা খেয়ে নিন। বারান্দায় চলুন গল্প করবো।
সকাল দশটা। শাহাদের স্টাডি রুমে ব্যস্ত সমাবেশ আজ। বাড়িভর্তি মেহমান। শাহাদ আসার পর থেকে বাড়িতে অতিথিদের হিড়িক পড়েছে। তবে এক্ষেত্রে শাহাদ সকলকে ফোন দিয়ে জানিয়েছে আসতে। স্টাডি রুমে এই মুহুর্তে লিমন, ইয়াজ,তানভীর,নোমান, পাভেল এবং শাহীন আছে। তুহিন, হামজা এবং লাবিব বাইরে। প্রস্তুতি চলছে গোপনীয় কিছুর। লিভিং রুম দিয়ে স্টাডি রুমে প্রবেশের দরজা আজ খোলা। বেডরুমের দরজা বন্ধ আছে। রায়হান সাহেবের রুম থেকে বের হয়ে শাহাদ সরাসরি স্টাডি রুমে ঢুকে সিক্স স্পাইডারের মুখোমুখি বসলো। রুম থেকে পাভেল ব্যতীত সবাইকে বের হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বললো,
– পরবর্তী নির্দেশের পূর্বে যেন কেউ এখানে পা না রাখে।
সকলে বেরিয়ে পড়তেই পাভেলের দিকে বাণ ছুঁড়লো,
– বয়সে আমি নিজেই অনেক বড় ফারাহ্ থেকে। বয়স আমার জন্য কোনো ব্যাপার না। প্রশ্ন হচ্ছে আমার বোন কয়বার অপমানিত হয়েছে তোমার কাছে মি. পাভেল?
ধুকপুক শুরু হয়েছে বুকের মাঝে। যা হওয়ার ভয় ছিলো তাই হলো। নিশ্চিত ঘরের কোণায় ক্যামেরা লাগানো নতুবা এই খবর যায় কি করে সুদূর গ্যালাপাগোস। শাহীন নিজেই তো ঘাবড়ে আছে। মাথা আনত পাভেলের। পরে মনে হলো বস প্রশ্ন করেছে। চুপ থাকাটা অপমান। হালকা মাথা তুলে বললো,
– বস, একটি বার ও অপমান করিনি। বকা দিয়েছি, দূরে থাকতে বলেছি। দুদিন আগে কথা শুনেনি দেখে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চ/ড় মে/রেছি। আপনি বললে মাফ চাইবো।
শাহাদ ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলিয়ে বলে,
– ও আচ্ছা, তা চড় মা/রার অধিকার কে দিয়েছে?
– স্যরি বস। আমি মাফ চেয়ে নিবো।
তখনই শিফা ডুকলো স্টাডি রুমে। শাহাদের সামনে এসে দাঁড়াতেই পাভেল দাঁড়িয়ে পড়লো। মাথা নোয়ানো। শিফার দিকে না তাকিয়েই বললো,
– শিফা স্যরি, সেদিনের চ*ড়ের জন্য।
শাহাদ গম্ভীরস্বরে বললো,
– পাভেল শিফাকে জানাও নি তোমার জন্য পাত্রী রেডি।
– মা নে বস…
আমতা আমতা করছে পাভেল।
– আচ্ছা সমস্যা নেই, আমি জানিয়ে দিচ্ছি। শিফা তোমার পাভেল ভাইয়ার বিয়ে আগামী মাসে। আশা করি এমন কিছু করবেনা যাতে বাড়ির মান সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়।
ভাইয়ের সামনে ফুঁফিয়ে কেঁদে দিলো ছোট্ট শিফা। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাভেল। নির্বুদ্ধিতা যেন এই মুহুর্তে ঘিরে ধরেছে। কি দরকার ছিলো মেয়েটাকে জানানোর! শাহাদের ফোন আসাতে উঠে খানিকটা দূরে গিয়ে রিসিভ করলো। পাভেল শিফার দিকে তাকাতেই দেখে মেয়েটা কেঁদে যাচ্ছে। ক্ষীণ স্বরে বললো,
– শিফা এটাই তোমার জন্য ভালো হবে। কেঁদোনা।
শিফার চোখের দিকে সরাসরি তাকালো, লাল লাল চোখ গুলো যেন ভস্ম করে দিচ্ছে পাভেলকে। কিছুটা পাভেলের দিকে এগিয়ে এসে বললো,
– আপনার বিয়ের দিন সবচেয়ে বেশি খুশি পাবেন আমাকে, সবচেয়ে বেশি আনন্দ করবো সেদিন আমি। আমি যখন দুকদম এগিয়ে ছিলাম, আপনি কি পারতেন না এক কদম আগাতে? আপনি বরং তিন কদম পিছিয়েছেন। অভিনন্দন পাভেল ভাই। আমি খুব খুশি।
বেরিয়ে গেলো শিফা। শাহাদ নিজের জায়গায় এসে বসলো। পাভেলকে বসার অনুমতি দিয়ে বাকিদের আসতে বললো। প্রায় ঘন্টা খানেক মিটিং করলো সাথে বাকিদের জানিয়ে দিলো পাভেলের বিয়ের কথা। থমথমে একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছে স্টাডি রুমে। ওদের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলো। শাহাদ বের হওয়ার পর পর পাভেল দু হাতে মুখ ঢাকলো। নিস্তব্ধতা ঘেরা কামরা। প্রায় দশ মিনিট, কেউ পাভেলের নিরবতা ভাঙেনি। আজ মনে হলো ওকে একটু একা ছাড়া প্রয়োজন। তানভীর, ইয়াজ ঘটনা পুরোপুরি না জানলে বাকিদের সাথে নিরবতা পালন করছে। শাহীন পাভেলের কাঁধে হাত রেখে বললো,
– আল্লাহ যা করে ভালোর জন্য করে।
নোমান টিস্যু এগিয়ে দিলো। মুখ থেকে হাত সরাতেই বাকিরা লক্ষ্য করলো ভেজা গাল, ভেজা চোখ। দুটো বাক্য বেহায়ার মতো সবার সামনে বলে ফেললো,
– শাহীন আমি কি করে শিফার জায়গায় অন্য মেয়েকে মেনে নিবো। ভাবতেই ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে। অন্যদিকে এই সাহসটুকু নেই যে ভাইজানকে বলব শিফাকে দিয়ে দিন।
মুখে শব্দ না করে কাঁদছে পাভেল। পুনরায় বললো,
– আমার অনুভূতির এক পারসেন্ট ও আমি শিফাকে আজ অবধি দেখাই নি। এতদিন আমলে নি নাই। আজ মনে হচ্ছে আমি ওকে ছাড়া শ্বাস নিতে পারবোনা।
সবাই উঠে এসে জড়িয়ে ধরলো। নোমান বুঝিয়ে বললো,
– ভুলে যা এসব। আজকের দিনটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটু ভুল হলেই মারাত্মক বিপদ। বসকে গন্তব্যে পৌঁছানো আমাদের দায়িত্ব।
দুহাতে চোখ মুছে বললো,
– আচ্ছা। শাহীন আমি চিলেকোঠায় যাচ্ছি। বসের চোখ ফাঁকি দিয়ে শেষবারের মতো শিফাকে পাঠা। ভালো করে মাফ চেয়ে নিব।
– যা করছেন মোটেও ভালো হচ্ছে না শেহজার বাবা?
সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট পরনে। শার্টের হাতা গুটিয়ে নিজেকে পরিপাটি করে সাজিয়ে ডানহিল আইকনের পারফিউম বডিতে স্প্রে করলো। দিয়াকে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে চট করে পাতলা অধরে অধর ছুঁয়ে বললো,
– এসব নিয়ে আপনি না ভাবলেও চলবে বেগম শাহাদ।
মুখটা মলিন করস অন্যদিকে তাকিয়ে খাটের কোণায় বসে বিড়বিড় করে বললো,
– ভালোবাসায় এই লোকটার কি এলার্জি বুঝিনা। সব জায়গায় ঘাপলা পাকাবে। রহস্য করা যেন স্বভাব।
– কিছু বললে তুমি?
– না কি বলবো, কিছু না। যাচ্ছেন কোথায়?
– কাজ আছে বাইরে। আমি এখন বের হলে রাতে ফিরবো একেবারে। সন্ধ্যায় গাড়ি আসলে তৈরি হয়ে চলে যেও। একটা ইনভাইটেশন আছে।
– আমি একা?
– না, তুমি, আব্বু,আম্মু এবং মেজর।
– যেতে ইচ্ছে করছে না।
– আজ তোমার একটা স্বপ্ন পূর্ণ হবে শাহাদপ্রিয়া। যা শাহাদ ইমরোজ কখনোই করতো না আজ তা করবে।
কাছে এসে স্ত্রীর কপালে ওষ্ঠ ছুঁয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। রেখে গেলো অজানা কৌতুহল। কি হতে যাচ্ছে??
পায়ের উপর পা তুলে একহাতে কফি অন্য হাতে জলন্ত সিগারেট। কাপের কফিটুকু ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চেনা পরিচিত হাসিটা দিয়ে বলল,
– মিস. এলিন আমি কিন্তু একান্তই আমার সহধর্মিণীর। যে কাজ বিগত এক বছর ধরে করে যাচ্ছেন সেটা বন্ধ করার জন্য বহুবার বলেছি। কাজটা করতে গিয়ে নিজের বাবাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করলেন। স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আপনি, আপনাকে এসব মানায় না। শাহাদ ইমরোজ একান্তই তার ব্যক্তিগত নারীর। প্রথম বার কেউ ভুল করলে তাকে মাফ করে দিই। দ্বিতীয় বার বুঝিয়ে বলি কৌশলে। তৃতীয়বার শাস্তি দিই। গতরাতে আমার স্ত্রীকে মেসেজে আজকের যা ঘটবে সেসব ঘটনা বলার একেবারেই অনুচিৎ হয়েছে। আমার পেছনে যে স্পাই লাগিয়েছেন, সেই স্পাই কিন্তু আমার আন্ডারে থাকা নেভি অফিসার।
মাথা নত এলিনের। সে চেয়েছিলো বাবার পাওয়ার কাজে লাগিয়ে শাহাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে। যদি দিয়ার মনে শাহাদ সম্পর্কে বিষ ঢুকিয়ে দেয়া যায় তবে তাদের মাঝে ভুল বুঝাবুঝি হতে পারে। এলিনের রাস্তা স্বচ্ছ হবে। গতরাতে দিয়ার ফোনে অপরিচিত নাম্বার থেকে কিছু ডকুমেন্টস এবং ভিডিও পাঠানো হয়েছে। প্রতিটি ছবিতে শাহাদ তার কিছু মেইল এবং ফিমেল এক্স-কলিগদের সাথে আলোচনায় বসেছিলো। দিয়া তখন ওয়াশরুমে। দু দু বার কল এসেছে। শাহাদ দিয়াকে কয়েকবার ডাকার পর দিয়া জানালো কার মেসেজ যেন দেখে। সেই মেসেজের আদ্যোপান্ত পড়ে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে গেলো।
সায়রে গর্জন পর্ব ৫৮
– এনিওয়ে এলিন থ্যাংকস ফর দ্য ট্রিট। এন্ড আ’ম এক্সট্রিমলি স্যরি। আজ আপনি বাসায় ফিরতে পারছেন না, আগামীকাল যেতে পারবেন। আপনি আমার সারপ্রাইজ নষ্ট করে দেয়ার পায়তারা করছেন। আমি তা কিছুতেই মেনে নেব না মিস। আজকের জন্য শাহাদের আতিথেয়তা গ্রহন করুন।
বেরিয়ে এলো রেস্টুরেন্ট থেকে। শাহাদের ইশারায় কিছু মুখোশ পরা মানুষ এলিনকে নিয়ে গেলো। মুহুর্তে কি থেকে কি হয়ে গেলো সকলের অজানা। কি হবে আজ!
