সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৮
Raiha Zubair Ripti
সিকান্দারের বুকের ভেতরটা কেমন অকারণে এক অজানা অস্পর্শ অস্থিরতায় ধুকপুক করছে। সারা শরীরে ছোট ছোট লালচে দাগ ফুটে উঠেছে। ঘাড়, বুক, কাঁধ এমনকি বাহুতেও। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলো পূনরায় নিজের শরীর টা।
তার এমনিতেই গরম আর ঘামে এলার্জি আছে। সারাদিন বাইরে ছিলো। নিজেকে সেটা বলেই বুঝ দিতে চাইল সে। কিন্তু অস্বস্তিটা কেমন যেন স্বাভাবিক লাগছিলো না।
ঠিক তখনই মসজিদ থেকে আছরের আজান ভেসে এলো- “আল্লাহু আকবার… আল্লাহু আকবার…” আজানের শব্দ শুনে কিছুটা শান্ত হলো সিকান্দার। ধীরে ধীরে শার্ট টা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে কলপাড়ে এসে ওযু করলো। নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে যাওয়ার আগে মুনতাহাকে ডেকে স্মরণ করে দিলো নামাজ পড়ার জন্য। মুনতাহা ওজু করে রুমে চলে যায়। সিকান্দার মসজিদে এসে নামাজ শেষ পড়লো। কিছুক্ষণ বসে রইলো মসজিদের বারান্দায়। বুকের ভেতরের অস্থিরতা পুরো কাটলো না। বাড়ি চলে আসলো। মুনতাহা মামি বোনদের সাথে আছে। সিকান্দার ডাকলো না। এমনিতেও ও বাড়িতে মেয়েটা একা একা থাকে। এখানে সবার সাথে মিশে গেছে কি সুন্দর ভাবে।
সিকান্দার ঘরে ফিরে টেবিলের ওপর রাখা জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢাললো । তারপর গ্লাসটা দু’হাতের মাঝে ধরে নিচু স্বরে পড়তে লাগলো-
“আল্লাযিনা আমানু ওয়া তাতমা’ইন্নু কুলুবুহুম বি-যিকরিল্লাহ। আলা বি-যিকরিল্লাহি তাতমা’ইন্নুল কুলুব।”
[ অর্থ -“যারা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের হৃদয় প্রশান্ত হয়। জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়সমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” ]
মানুষ সাধারণত মন খারাপ, ভয়, অস্থিরতা বা কষ্টের সময় এই আয়াত পড়ে শান্তি অনুভব করার জন্য। সিকান্দার কয়েকবার আয়াতটা পড়ে পানির ওপর আস্তে ফুঁ দিলো। তারপর ধীরে ধীরে পুরো পানিটা খেয়ে ফেললো। ঠান্ডা পানি গলা বেয়ে নামতেই বুকের ভেতরে সামান্য প্রশান্তি অনুভব করলো সে।
তবুও শরীরের অস্বস্তিটা পুরো যাচ্ছিলো না। শেষমেশ টাওয়াল কাঁধে নিয়ে কলপাড়ের দিকে হাঁটলো সিকান্দার। সন্ধ্যা নামার আগের নিস্তব্ধ আলো চারপাশে ছড়িয়ে আছে। দূরে কোথাও পাখির ডাক ভেসে আসছে। মুনতাহা রান্না ঘর থেকে দেখলো তাকে কলপাড়ের দিকে যেতে। কিন্তু মামিরা সাথে থাকায় আর উঠে গেলো না।
সিকান্দার কলপাড়ে এসে আবারও কয়েকবার সেই আয়াতটা পড়লো । তারপর বালতি ভরা পানিতে ফুঁ দিয়ে মাথা থেকে ধীরে ধীরে পানি ঢালতে লাগলো শরীরে। ঠান্ডা পানি গা বেয়ে নামলো। ভালো লাগছে। সেজন্য একটু সময় নিয়ে গোসল করলো। চোখ বন্ধ করে আল্লাহ কে বলতে লাগলো-
“ ইয়া আল্লাহ। আমার এই অস্বস্তিটা দূর করে দিন। ”
গোসল শেষে শরীর মুছে ভেজা জামাকাপড় বদলে রুমে এসে বসলো। মুনতাহাও তার পেছন পেছন রুমে আসলো। সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল-
“ আবার গোসল করলেন যে? কোনো সমস্যা? ”
কথাটা শেষ হতেই তার চোখ গিয়ে আটকালো সিকান্দারের বুকে। দুটো বোতাম খোলা। লাল লাল দাগ দেখতে পেয়ে হাত বাড়িয়ে শার্ট টেনে সরিয়ে দিয়ে বলল-
“ এমন লাল লাল দাগ হয়েছে কেনো? এলার্জি উঠেছে নাকি? ”
সিকান্দার দাগ গুলোর দিকে তাকিয়ে বলল-
“ এলার্জিই হবে হয়তো। ”
“ ডক্টরের কাছে যাবেন না? ঔষধ নিয়ে আসুন দেখিয়ে। ”
“ শান্ত হোন। জ্বালাপোড়া বা চুলকানো, ব্যাথা কোনোটাই হচ্ছে না। শুধু একটু ভারী ভারী লাগছে দেহটা। ঢাকা ফিরে দেখাবো। আমি পরিচিত কোনো ডক্টর ছাড়া অন্য কোনো ডক্টরের কাছ থেকে চিকিৎসা নেই না। ”
“ কবে না কবে ঢাকা ফিরবেন,সেটার জন্য ডক্টর দেখাবেন না? ”
“ এলার্জির ঔষধ আছে। এনেছিলাম সাথে। আমি জানি এখানে অনেক গরম ধুলোবালি। এলার্জি হতে পারে। ঔষধ খেয়ে নিব। ”
বেলা গড়াতেই মাগরিবের আগ দিয়ে দেখা গেল হোসেন আলী খুঁটা হাতে করে গরু-ছাগল খেদিয়ে আনছে বাড়ির দিকে। গ্রামের সকল পশুপাখিরা মাঠ থেকে ফিরে আসছে সারি ধরে। কারও কাঁধে বাঁশের ঝুড়ি, কেউ আবার মাথায় শুকনো ঘাসের বোঝা নিয়ে হাঁটছে। কেউ সারাদিন ক্ষেতে কাজ করে ময়লা শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরছে। দূর আকাশে উড়তে থাকা পাখিরাও তাদের নীড়ে ফিরছে। পুরো গ্রামটা এখন ধীরে ধীরে গুটিয়ে আসতে লাগলো।
আকাশের রঙটাও বদলে গেছে। নীল থেকে কমলা, তারপর ধীরে ধীরে ধূসর একটা চাদর নামছে পুরো গ্রামের ওপর।
সিকান্দার তখন রুমের ভেতর বসে ছিলো। জানালা দিয়ে দেখছে সব টা। পাশেই বসা মুনতাহা। শরীরটা এখন কিছুটা হালকা লাগলেও অস্থিরতা পুরোটা যায়নি। বাইরে থেকে ভেসে আসছে গরুর ডাক, হাঁস মুরগীর শব্দ, আর মানুষের ছোট ছোট ডাকে ডাকে জমে উঠা সন্ধ্যার ব্যস্ততা।
বাইরে তখন হোসেন আলী গরুর বাঁধছে গোয়ালঘরে। ছাগলটা বারবার লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করছে, আর সে বিরক্ত গলায় বকছে-
“ শান্ত হ, হারামজাদা! সারাদিন মাঠে খেয়ে এখন আবার নাচ!”
পাখিরা শেষবারের মতো ডেকে উঠলো আজকের জন্য। তারপর একে একে নীরব হয়ে গেল চারপাশ। আকাশের শেষ আলোটুকুও যেন গলে পড়ছে গ্রামের শেষ সীমান্তে।
সিকান্দার ধীরে উঠে দাঁড়ালো। মাগরীবের নামাজ টা আদায় করে মামাদের পাশে গিয়ে বসলো। রেখা মামি চা দিয়ে গেলেন। এখানে তো আর ওসব দামি কফি পাওয়া যায় না। সিকান্দারের এখন কফি খাওয়া হচ্ছে না। চিনি দিয়ে লাল চা তো কখনো দুধ চা খেতে হচ্ছে মামাদের সাথে। তার মামারা রাজনৈতিক আলাপ করছেন। সিকান্দার চুপচাপ শুনছে। মাঝেমধ্যে তার মামারা জিজ্ঞেস করছে সিকান্দার শুধু সেটার জবাব দিচ্ছে। কথা বলার ছেলে হুমায়ুন আলী এবার বললেন-
“ আমাদের গ্রামের চেয়ারম্যান টা খুবই পাঁজি বুঝলে ভাগ্নে? নির্বাচনের আগে কি মধুর মধুর কথা,কত প্রতিশ্রুতি। কিন্তু যেই জিতে গেলো এখন ভুলেও এদিকে পা দেয় না। একটু বৃষ্টি নামলেই রাস্তা ডুবে যায়। আমাদের যাতায়াতের কষ্ট হয়। কিন্তু চেয়ারম্যানের এতে কোনো হেলদোল নেই। ”
সিকান্দার চায়ের কাপে শেষ চুমুক বসিয়ে বলল-
“ তাকে বলেন নি আপনাদের সমস্যার কথা? তাকে চেয়ারম্যান বানানোই তো হয়েছে তার এলাকা তার গ্রামের মানুষদের যেন কোনো অসুবিধা না হয়,তারা যেন কোনো সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়,তার গ্রামের যেন উন্নয়ন হয় সেজন্য। ”
“ অনেক বার বলা হয়েছে। কানে নেয় না। বলে এমপি কে জানাবো। এমপি সংসদে গিয়ে তুলে ধরবে। আদোও ব্যাটা এমপিকে বলছে কি না জানি না। এক কাজ করবো। আমরা গ্রামের কয়েক বাড়ি মিলে টাকা দিয়ে রাস্তা টা ঠিক করে নিব। ”
সিকান্দার হুমায়ুন আলীর কাছ থেকে এই এলাকার চেয়ারম্যান আর এমপির নম্বর নিলেন। কথা বলে দেখবে সে। যদিও সিকান্দারের কথা বলা টা সাজে না। কারন সে এই এলাকায় থাকে না। তারপরও কথা বলে দেখা উচিৎ। তাদের মনোভাব বোঝা উচিৎ।
রাতের নামাজ আর খাবার খেয়ে যখন সবাই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিবে তখন সিকান্দার রুমে এসে মুনতাহা কে রেডি হতে বললো। মুনতাহা জিজ্ঞেস করলো – রেডি হবে কেনো? কোথায় যাবে তারা?
সিকান্দার জবাবে বলল-
“ আগে রেডি হোন। আমার সাথে গেলেই দেখতে পারবেন। ”
মুনতাহা বোরকা পড়ে রেডি হলো। সিকান্দার তাকে নিয়ে বের হবার আগে বড় মামি কে ডেকে বলল তারা একটু বের হচ্ছে। ফিরে আসবে ১১ টার আগে।
সিকান্দার মুনতাহা কে নিয়ে তার গাড়িতে উঠে বসলো। তারপর গাড়িটা আলী বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা যমুনার পাড়ে আসলো।
মুনতাহা বলেছিল তার খুব সমুদ্র দেখতে ইচ্ছে করছে। এখানে তো সমুদ্র নেই,কিন্তু বিস্তার বড় নদী আছে। রূপালী চাঁদের আলোয় সেই নদীর পানি ঝিলমিল করছে। থেকে থেকে ঢেউ তুলছে।
মুনতাহা গাড়ি থেকে নেমে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলো। হালকা বাতাস এসে তার বোরকার কাপড়টা একটু নড়িয়ে দিলো। নদীর পাড়েই একটা মসজিদ আছে সাদা রঙের। এখানকার মূল আকর্ষণে থাকে ঐ মসজিদ টা।
কি সুন্দর তাই না? নদীর কিনারা ঘেঁষে আছে মসজিদ টা। সিকান্দার মুনতাহার পাশে এসে দাঁড়ালো।
“ আপনি সমুদ্র দেখতে চেয়েছিলেন মন। কিন্তু এখানে কোনো সমুদ্র নেই। আছে কেবল এই বিস্তার একটি নদী। আর এই নদীটা খুব চেষ্টা করবে আপনাকে সমুদ্রে মতো একটা ফিল দিতে।
মুনতাহা তার দিকে তাকাল। চাঁদের আলোয় সিকান্দারের মুখটা অর্ধেক ছায়ায় ঢাকা, অর্ধেক আলোয় ভেজা।
“ নদীটা অনেক সুন্দর। সমুদ্রের থেকেও কম নয়। তাকে সমুদ্রের মতো হতে হবে না। সে নদী,নদী হয়েই ধরা দিক আমায়। আমি তার নিজস্ব সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে চাই। ”
সিকান্দার মুনতাহার হাত ধরে এগিয়ে যেতে লাগলো। এদিকটা পুরো ফাঁকা। ঢেউয়ের কারনে পানি নদী থেকে কিছুটা পাড়ে এসে আঁচড়ে পড়ছে। মুনতাহার খুব ইচ্ছে করছে খালি পায়ে হাঁটতে। কিন্তু সে তো বুট জুতা পড়ে এসেছে। সিকান্দার হয়তো মুনতাহাকে বারবার নিচের দিকে তাকাতে দেখে বুঝলো। সেজন্য হয়তো লোকটা আকস্মিক হাঁটু গেঁড়ে বসে নিজ থেকেই মুনতাহার পায়ের জুতাটা খুলে দিতে দিতে বলল-
“ কোনো কিছু করার ইচ্ছে জাগলে সেটাকে কখনো মনের ভেতর চাপিয়ে রাখবেন না মন। সাথে সাথে পূরণ করে ফেলবেন। ছোট্ট একটা জীবন,আমি চাই না আপনার কোনো ইচ্ছে অপূর্ণ রাখতে। ”
কথাটা বলেই সিকান্দার তার নিজের জুতা জোড়াও খুলে প্যান্টের নিচে থেকে কিছুটা ভাজ করে গুটিয়ে নিলো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে দুজনেরই জুতা জোড়া বা হাতে নিয়ে ডান হাত দিয়ে মুনতাহার বা হাত ধরে হাঁটতে লাগলো। দু’জনেরই পা ভিজে যাচ্ছে যমুনার পানিতে। বালিতে বসে যাচ্ছে তাদের পায়ের ছাপ। ঠান্ডা শীতল বাতাস ছুঁয়ে দিচ্ছে তাদের সর্বাঙ্গ। মুনতাহা বাহু চেপে ধরলো সিকান্দারের।
এই মুহুর্ত টা এখানেই থেমে যাক। এত সুন্দর কেনো জীবন? মুনতাহা কখনো ভাবে নি জীবন এতটাও সুন্দর মনোমুগ্ধকর হয়!
সূরা আদ-দুহা এর ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
“ ওয়ালাল আ-খিরাতু খাইরুল্লাকা মিনাল ঊলা। ”
এর অর্থ হলো- নিশ্চয়ই তোমার বর্তমান তোমার অতীতের চেয়ে বেশি সুন্দর। ” ইয়েস, দিস ইজ অ্যা ইউনিভার্সাল ট্রুথ। যদিও এখানে আল্লাহ তায়ালা ইহকাল আর পরকাল কে বুঝিয়েছেন। কিন্তু মুনতাহার জীবন টা কিছুরা এই অর্থ বহন করে। তার জীবন টা অতীতের চেয়েও বেশি সুন্দর। ভবিষ্যৎ ও এমনই সুন্দর হবে। কারন রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন- জীবন সঙ্গী এমন মানুষকেই বানাও, যে তোমাকে দুনিয়া থেকে ভালোবাসতে বাসতে জান্নাত পর্যন্ত নিয়ে যাবে।
মুনতাহা ঠিক তেমন জীবনসঙ্গীই তো পেয়েছে জীবনে। এ জীবন নিয়ে কি মুনতাহার আর কোনো আফসোস আছে? নাহ্ নেই। তার আর কোনো আফসোস দুঃখ নেই এই জীবনটা কে নিয়ে। মুনতাহা যার যোগ্য নয় তাকেও পেয়ে বসে আছে। সে কৃতজ্ঞ মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে।
কিছুটা দূরে নদীর পাড়ে সারি সারি নৌকা বাঁধা। কিছু নৌকার ভেতর বাতি জ্বলছে, কিছু আবার অন্ধকারে দুলছে পানির সাথে। মাঝিদের কেউ কেউ তীরের কাছেই বসে বিড়ি ধরিয়েছে, কেউ চুপচাপ নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো তারা রাতে মাছ ধরে।
মুনতাহার খুব ইচ্ছে করলো নৌকায় উঠে একটু ঘুরতে। বারবার তাকালো নৌকার দিকে। আকস্মিক সিকান্দার মুনতাহার হাত ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে যেতে লাগলো নৌকা গুলোর কাছে। একটা নৌকার সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে বলল-
“ আপনাদের নৌকা নিয়ে কি একটু ঘোরা যাবে? এই ধরুন ২০-২৫ মিনিট। যত চার্জ ধরবেন আমি তাতেই রাজি। ”
মাঝি গুলো তাকালো সিকান্দারের দিকে। সবাই সিকান্দারের বাপ চাচার বয়সী। একজন পানের পিচকিরি ফেলে বলল-
“ এত রাইতে ঘুরবা ক্যান? আর কারে লইয়া ঘুরবা তুমি? ”
“ আমার স্ত্রী কে নিয়ে। তার খুব ইচ্ছে হচ্ছে নৌকায় উঠে ঘুরবার। এখন আপনারা একটু সাহায্য করলে আমি আমার স্ত্রীর এই ইচ্ছেটা পূরণ করতে পারি। ”
“ মেলা ভালোবাসো নাকি বউরে? ”
“ বউ হয়। আর বউ কে কি ভালো না বেসে থাকা যায়? ”
“ নতুন নতুন বিয়া মনে হয়? বছর কয়েকটা যাক না। পুলাপান নাই তাই না? পুলাপান হোক। তারপর দেইখো মাথায় একটা চুলও থাকবো না আমাগোর মতো। ”
সিকান্দার হাসলো সে কথা শুনে।
“ দোয়া করুন। মাথার চুল উঠে টাকলা হয়ে যাক,কোনো সমস্যা নেই। তারপরও যেন আমরা এক সাথে থাকতে পারি। ”
“ আইচ্ছা আইচ্ছা দোয়া করলাম। এক হাজার টাকা দিতে হইবো। দিবা? ”
সিকান্দার পকেট থেকে মানিব্যাগ টা বের করে সেখান থেকে এক হাজার টাকা দুটো নোট বের করে দিলো। মাঝি টাকা নিয়ে বলল-
“ চাইলাম এক হাজার টাকা। দিলা দুই হাজার! ”
“ বকশিস। আপনাদের এখানে যে ছোট্ট ছেলেটা আছে,ও কি নৌকা বাইতে পারে? ”
“ হ পারে। ”
“ ও কে দিয়ে পাঠিয়ে দিন নৌকা টা। ”
মাঝিরা বুঝলো পুলাডার বউ মনে হয় পর্দা করে। দূর থেকে তো দেখা যাচ্ছে বোরকা পড়া মুখ ঢাকা। মাঝি তার ১৫ বছরের ছোট ছেলেটাকে পাঠালো।
সিকান্দার মুনতাহার কাছে আসতেই জিজ্ঞেস করলো-
“ ওখানে কেনো গিয়েছিলেন? ”
সিকান্দার তার হাতটা ধরে বলল-
“ আপনাকে নিয়ে নৌকায় ঘুরবো বলে। ”
মুনতাহার চোখ মুখ খুশিতে জ্বলে উঠলো।
“ সত্যি! ”
“ হুমম। ”
নৌকাটা আসতেই তারা উঠে পড়লো। গিয়ে বসলো শেষ প্রান্তে। মাঝখানে ছই। অন্ধকারপ সামনে থেকে তাদের দেখা যাচ্ছে না ছই এর কারনে। ছোট্ট ছেলেটা নৌকা বাইতে শুরু করলো। সেই সাথে নৌকাটা একটু দুলে উঠলো। মুনতাহা ভারসাম্য রাখতে গিয়ে সিকান্দারের হাত চেপে ধরলো। বেশ অনেকটা সময় তারা ঘুরলো। ঘুরা শেষে পাড়ে এসে নামার পর সিকান্দার সেই ছোট্ট ছেলেটাকেও কিছু টাকা দিলো। তারপর নদীর পাড় দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফেরার সময় মুনতাহা সিকান্দারের বাহু চেপে ধরে গুনগুন করে গাইলো খালি গলায় –
~ আমি শুনেছি সেদিন তুমি সাগরের ঢেউয়ে চেপে
নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে এসেছো।
আমি শুনেছি সেদিন তুমি নোনাবালি তীর ধরে
বহুদূর বহুদূর হেঁটে এসেছো।
আমি কখনও যাইনি জলে, কখনও ভাসিনি নীলে
কখনও রাখিনি চোখ ডানা মেলা গাংচিলে
আবার যেদিন তুমি সমুদ্র স্নানে যাবে
আমাকেও সাথে নিও, নেবে তো আমায়
বলো নেবে তো আমায়?
সিকান্দার এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে।
“ নিয়ে যাব আপনাকে নীল সমুদ্র দেখাতে ইনশাআল্লাহ। ”
তাদের বাড়ি ফিরতে ফিরতে ১১ টার কাছাকাছি বেজে যায়। ঘুমাতে ঘুমাতে সাড়ে ১১ টা বাজে। তার মামারা দু’জন জেগে ছিলো বাহিরে। তারা ফেরার পরই ঘুমাতে গিয়েছে।
ভোরের ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে বাহিরে একটু হাঁটাহাঁটি করার জন্য বের হতেই সেলিম মির্জা ফোন করেন। খুব ইমার্জেন্সি ভাবে তাকে আজকেই ঢাকা ব্যাক করতে বলে। সিকান্দার কারন জানতে চাইলো। কোনো সমস্যা কি না। সেলিম মির্জা বললেন – ফোনে বলা যাবে না এতকিছু। তুমি তাড়াতাড়ি আজই ঢাকা ফিরো। বিষয়টা খুবই ইমার্জেন্সি। দেরি করবে না একদম। তোমার ছুটির চক্করে আমার অফিস পথে বসলে কিন্তু খবর আছে তোমার।
সিকান্দার মুনতাহা কে কথাটা বলতেই মুনতাহার মনটা ভাড় হয়ে যায়। তারা আসলোই গত পরশু রাতে। আর আজই নাকি চলে যেতে হবে! তার তো ভালো লাগছে ভীষণ এখানে। আর তাছাড়া তার তো ভার্সিটিও বন্ধ।
সিকান্দার বউয়ের মন ভার করা দেখে বুঝে গেলো মেয়েটা থাকতে চাইছে আরো কিছু দিন। কিন্তু সিকান্দার থাকবে কি করে তাকে ছাড়া?
“ আপনি থাকতে চাইছেন আরো কিছু দিন? ”
মুনতাহা সাথে সাথে উপর নিচ মাথা ঝাকালো।
“ কতদিন? ”
“ খুব বেশি দিন না। এই ধরুন এক সপ্তাহ। ”
সিকান্দার কেশে উঠলো সে কথা শুনে। এক সপ্তাহ! মুনতাহা পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো। সিকান্দার পানিটা খেয়ে বলল-
“ আচ্ছা বেশ থাকুন তবে। আমি তাহলে এক সপ্তাহ পর এসে নিয়ে যাব কেমন? ”
মুনতাহা খুশি হলো। আচ্ছা বললো। অথচ সিকান্দারের মুখটা দেখার মতো ছিলো না একদমই। শুকিয়ে গিয়েছিল তার আচ্ছা শোনার পরই। সারাটা দিন তার ওভাবেই কাটলো। কতবার করে সময় কে থমকে যেতে বললো। কিন্তু সময় কি আর কারো কথা শুনে? সিকান্দারের কথাও শুনে নি। বউয়ের খুশি মুখটা কালো করার কোনো ইচ্ছে তার নেই। নিয়ে গেলে মেয়েটা আবার বন্দী হয়ে যাবে ঘরে। সিকান্দার রাতে এশার নামাজ পরে রেডি হয়ে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে ছিলো মুনতাহা কে। কপালে হাতে অনেক গুলো চুমু খেলো। বারবার বললো – সাবধানে থাকতে। ঠিকমতো খাবার খেতে, নামাজ পড়তে। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে। মুনতাহা সবেতেই আচ্ছা আচ্ছা করলো। সিকান্দার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় দুই মামার হাত ধরে বললো-
“ আমার জীবনের একমাত্র মূল্যবান সম্পদ টা আমি আপনাদের কাছে রেখে যাচ্ছি মামা। আমার অবর্তমানে তার একটু খেয়াল রাখবেন আপনারা। মামিদের বলবেন তার যত্ন নিতে। ফজরের সময় নামাজের জন্য ডেকে দিতে। না ডেকে দিলে মুনতাহার ঘুম ভাঙে না খুব সহজে। বোনদের বলবেন মুনতাহার সাথে সাথে থাকতে। আমি জলদি কাজ শেষ করে তাকে নিতে আসবো। দয়া করে ততদিন, শুধু ততদিন একটু খেয়াল রাখবেন আমার অতি মূল্যবান সম্পদটির। ”
হোসেন আলি সিকান্দার কে আস্বস্ত করে বলল-
“ তুমি নিশ্চিন্তে যাও ভাগ্নে। মুনতাহার কোনো অযত্ন হবে না। ”
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৭
সিকান্দার উপরে উপরে স্বস্তির ভাব দেখালেও তার ভেতরটা অস্বস্তিতে আছে এখনো। সে থাকবে কি করে এই এক সপ্তাহ সেটা ভেবেই গলা শুকিয়ে আসছে। শেষবার জানালার সামনে দাঁড়ানো মুনতাহার দিকে তাকালো অসহায় চোখে। তারপর গাড়িতে উঠে চলে গেলো। সিকান্দারের গাড়িটা চলে যেতেই মুনতাহার কান্না পেলো খুব। চোখ দুটো থেকে আচমকাই টপটপ করে পানি ঝরতে শুরু করলো। বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো, তীব্র এক ব্যথা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো পুরো শরীরজুড়ে।
