সীমান্তরেখা পর্ব ৪০
ঝিলিক মল্লিক
মেজবাহ’র মুখে নিজের কুরবানির কথা শুনে আকসা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে চটপট দরজা খুললো৷ মেজবাহ দরজার থামে মুষ্টিবদ্ধ হাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। দরজা খুলতে দেরি ওর ভেতরে ঢুকতে দেরি হলো না। আকসা পাশে সরে দাঁড়াতেই হাট করে মেলানো দরজার সিটকানি টেনে দিলো। নব ঘুরিয়ে দিলো একইসাথে। ঘুরে আকসার দিকে তাকালে ও দুই কদম পিছিয়ে গেল। মেজবাহ সামনের দিকে এগিয়ে মুখ উচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “পেছাচ্ছো কেন? হু?”
জবাবের অপেক্ষায় রইলো না ও। প্রশ্নটা করেই হাত বাড়িয়ে আকসার বাহু ধরে ওকে কাছে টেনে নিয়ে আসলো। এতে করে ও জোরপূর্বক আরো বেশি পিছিয়ে গেল। বিছানার কাছাকাছি যেয়ে সেখানে মিশে যেতেই মেজবাহ এগিয়ে যায়। মুখোমুখি দাঁড়ায়, ওর চোখে চোখ রাখে।
আচনক মেজবাহ আকসাকে কোলের ওপরে বসিয়ে মুখ টেনে জিজ্ঞাসা করলো, “খাওনি কেন?”
“খেতে ইচ্ছা করছে না, তাই।”
“আর ইউ ম্যাড? একটা মানুষ সারাদিন না খেয়ে কীভাবে থাকে?! আমার বাসায় এসব করা যাবে না৷ এবাড়ির কোনো বউ সারাদিন না খেয়ে থেকেছে— এমন রেকর্ড আজ পর্যন্ত কোনোদিন তৈরি হয়নি। তাহলে তুমি কেন তৈরি করবে?”
আকসা কোনো জবাব দিলো না। মেজবাহ ওর কোমরটা নরমভাবে আরেকটু চাপ প্রয়োগ করে কাছে টেনে আনে। নিজের পেটানো শরীরের সাথে একদম মিশিয়ে নেয়। আকসা স্বাভাবিক। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। পূর্ণ দৃষ্টি মেলে চেয়ে আছে মেজবাহ’র মুখের দিকে। লোকটার শেভ করা মুখমন্ডল দক্ষ নজরে পর্যবেক্ষণ করছে। মেজবাহ উৎকন্ঠা নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “কী খেতে ইচ্ছা করছে তোমার? জাস্ট বলো একবার। ওই খাবারের ঘাটতি তোমার ঘরে হতে দেবো না।”
আকসা কাটকাট জবাব দিলো — “কিছুই খাব না।”
মেজবাহ এবার কিছুটা কঠোর হলো। কোমরের হাত গাঢ় এবং দৃঢ় হলো। ভারী গলায় পুনরায় প্রশ্ন করলো, “কী খাবে?”
“আপনাকে খাব।”
অসঙ্গতিপূর্ণ, অশ্লীল কথাটা বলে সঙ্গে সঙ্গে নাক-মুখ কুঁচকে এক হাতে মুখ চেপে ধরে হতবিহ্বল হয়ে বসে রইলো আকসা। এটা কি বলে ফেললো! তবে তার চাইতেও অবাক করা বিষয়, প্রথমবারের মতো মেজবাহকে আশ্চর্য হতে দেখলো। মেজবাহ গম্ভীর মুখ করে সরু দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওর দিকে। বোধহয় কিছু বোঝার চেষ্টা করছে। কোমরের পেছন হতে হাতটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠে পিঠে গিয়ে ঠেকলো। সামনে থেকে ওকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে মেজবাহ শুনতে পায়নি যেন— এমনভাবে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলো, “কী খাবে? হু?”
“আপনাকে।”
যতটুকু যা লজ্জা-শরম বেঁচে ছিল, তা-ও ভেঙে একই জবাব দিলো আকসা। মেজবাহ ঠোঁট চেপে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ওর চোখের দিকে। তারপর বললো, “আমাকে পরে খাবে। আগে খাবার খাও।”
মেজবাহ পকেট হাতড়ে ফোন বের করলো। কল করে ওর মামনিকে বললো, “মামনি, রুমে এক প্লেট পোলাও-মাংস দিয়ে পাঠাও তো। তোমার বৌমার জন্য। ডাল কোনটা রান্না করেছো? মসুর? নাহ, ওটা দিও না৷ তোমার বৌমার মসুর ডালে এলার্জি। খেলে রাতে আর ঘুমাতে পারবে না৷”
মেজবাহ’র কল দেওয়ার মিনিট দশেকের মধ্যে ওদের রুমের দরজায় টোকা পরলো। রিমুকে দিয়ে খাবার পাঠিয়েছেন ইশা বেগম। আকসাকে কোল থেকে নামিয়ে উঠে গিয়ে দরজা খুলে রিমুর হাত থেকে খাবার নিয়ে পুনরায় দরজা আঁটকে এসে বিছানায় বসলো মেজবাহ। প্লেটটা একপাশে রেখে হাত ধুয়ে আকসাকে বললো, “আসো এদিকে।”
আকসা ওর পাশ ঘেঁষেই বসে ছিল। আরেকটু সামনে এগিয়ে বসলো। মেজবাহ মাথা নেড়ে বললো, “উহু, এখানে নয়।”
আকসা ঠিক বুঝতে পারলো না৷ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেজবাহ’র মুখের দিকে। ওর কথার অর্থ বোঝার চেষ্টা করতে ব্যস্ত-সব্যস্ত হলো। এরইমধ্যে মেজবাহ বলে উঠলো, “কোলে এসে বসো৷ যেভাবে বসেছিলে মাত্র।”
“হু?!”
আকসা খানিক চমকালো। কোলে যেয়ে বসতে হবে! আবারও! লোকটা কি কোলে বসিয়ে খাওয়াবে নাকি! আকসা প্রশ্নোত্তর খোঁজারও সময় পেল না। ইতিমধ্যেই মেজবাহ নিজ দায়িত্বে সিদ্ধহস্তে ওকে টেনে নিয়ে কোলের ওপরে বসিয়ে দিয়েছে৷ ছোট বাচ্চাদের মতো মেজবাহ’র গলা দুই হাতে জড়িয়ে ধরে গুটিসুটি মেরে বাচ্চাদের মতো বসে রইলো আকসা। প্লেটটা ঊরুর ওপরে রেখে পোলাওর লোকমা মেখে আকসাকে খাইয়ে দিতে লাগলো মেজবাহ। লোকটা এত বড় বড় লোকমা দেয়! আকসার ছোট মুখে জায়গা করে নিতে পারে না লোকমাগুলো। অতিরিক্ত হয়ে যায়। গোরুকে মানুষ যেভাবে ঘাস খাওয়ায়, জাবর কাটে; আকসাকেও যেন ঠিক একইভাবে খাওয়াচ্ছে মেজবাহ। খাসির মাংসের বড় বড় টুকরোগুলো আস্ত-সুদ্ধ ওর মুখে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আকসা এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে বললো, “আপনি কি আমাকে গোরু পেয়েছেন মেজবাহ?”
“গোরু কেন ভাববো?”
মেজবাহ স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা প্রশ্নটা করে। আকসা ওর গলাটা আরো শক্তপোক্তভাবে জড়িয়ে ধরে বলে, “গোরুকে যেভাবে ঘাস খাওয়ায়, সেভাবে ঠেসে ঠেসে আপনি আমাকে পোলাও-মাংস আর ডিম খাওয়াচ্ছেন। এরপর কি কুরবানি দেওয়ার ধান্ধা গোরুকে যেমন ঘাস খাইয়ে তারপর কুরবানি দেওয়া হয়, সেভাবে আমাকেও পোলাও-মাংস খাইয়ে…”
“উহুঁ। তোমাকে কুরবানি দিবো না৷ তোমাকে তো আদর করবো।”
‘আদর’ শব্দটা শুনতেই আকসার কান ঝাঁঝা করে ওঠে। এটা এই লোকটার জাতীয় শব্দ। ঠোঁটকাটা বিশ্রী কথাবার্তা। আকসার মুখের দুই পাশ গরম হয়ে যায়। মুখ নুইয়ে ফেলে। মেজবাহ’র এক হাত ওর কোমরে বিচরণ করছিল। সেটা এক জায়গায় দৃঢ়-স্থির করে ওর নত মুখের কাছে মুখ এগিয়ে ফিসফিস করে বললো, “আদর নিবে না?”
আকসা কোনো জবাব দিলো না৷ খাওয়া প্রায় শেষ। আর খাবে না ও। ওই প্লেটেই হাত ধুয়ে সেটা সরিয়ে কেবিনেটের ওপরে রাখে মেজবাহ। এখন রুমের বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা নেই৷ বের হলে তখন প্লেট রান্নাঘরে রেখে আসবে৷ আপাতত থাকুক এখানে। পাশ থেকে হাত বাড়িয়ে তোয়ালে টেনে হাত মুছে নিলো ও। এরপর আকসার দিকে নজর দিলো। আকসা বসে বসে লোকটার কার্যকলাপ দেখছে। আচনক আকসাকে ওভাবে কোলে তুলে নিয়েই উঠে দাঁড়ালো মেজবাহ। শূন্যে ভেসে আছে বুঝতেই আকসার হাতের বাঁধন পাকাপোক্ত হলো।
“ওজন কি বাড়েনি তোমার?”
“কেন?”
আকসা মেজবাহ’র গলা জাপ্টে জড়িয়ে ধরে উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে প্রশ্নটা করে। মেজবাহ কপালে ভাঁজ ফেলে একইরকম প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলে, “আগের মতোই মনে হচ্ছে একটা বালিশ কোলে তুলেছি। ফিল-ই পাচ্ছি না!”
“ফিল?”
“হ্যাঁ। ফিল নিতে চাচ্ছি। কীভাবে নেওয়া যায় বলো তো?”
আকসা ভেবে পেল না, কি জবাব দেবে মেজবাহকে। আচনক মেজবাহ ওকে সোজাভাবে কোলের আরো ওপরে তুলে ঘাড়ে মুখ গুঁজে বললো, “এভাবে ফিল নিতে হয় বুঝলে!”
আকসা অস্বস্তিতে কাদা হলো। কুঁকড়ে গিয়ে মরা গলায় বললো, “এসব ঠিক না মেজবাহ৷ নামান আমাকে।”
মেজবাহ ফিচেল হাসলো। ঠোঁট কামড়ে তাকালো আকসার দিকে। চাপা স্বরে বলে, “ভুল বলছো? এই ভুল তো এর আগেও বহুবার করেছি। ভুল করেছি বলেই তুমি বাচ্চার মা আর আমি বাবা হচ্ছি৷ তাহলে এমন ভুল করতে ক্ষতি কোথায়?”
প্রশ্ন করে জবাবের অপেক্ষা করে না ও। আচনক মুখ এগিয়ে নিজের পুরু ঠোঁট এগিয়ে নেয় আকসার ঠোঁটের দিকে। না, চুমু খায় না। ধারালো দাঁত দ্বারা আলতোভাবে কামড়ে ধরে আকসার নরম ঠোঁটের নিচের পেল্লব। মেজবাহ’র পৌরুষ ঠোঁটের কোণে একটা তিল৷ অদ্ভুত সুন্দর লাগে। দুর্লভ বস্তু। এমন ঠোঁটের কোণে তিল আগে কখনো কোনো ছেলেমানুষের দেখেনি আকসা। মেজবাহ’র-ই প্রথম দেখেছে। আর যতবার মেজবাহ কাছে আসে, যতবার ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকায়; ততবার ওই তিল নজরে পরে আকসার। একধ্যানে তাকিয়ে থাকে৷ মেজবাহ’র দারুণ বিশেষত্ব এটা। তবে ওর শরীরে এমন বিশেষ কী আছে? কিছুই নেই। মনে মনে এ নিয়ে চরম আফসোস হচ্ছিল আকসার৷ হঠাৎ মেজবাহ’র ভারী কন্ঠস্বর।
সীমান্তরেখা পর্ব ৩৯
“তোমার ঘাড়ের তিলটা সবসময় চুল অথবা ওড়না দিয়ে ঢেকে রাখবে। ওটা দেখার, ওটাকে ছোঁয়ার, ওই তিলে কিস করার অধিকার শুধু আমার। চাইনা, ওটা দেখে কারো সামান্য কামুকতাও জাগুক। তোমার সবকিছুর প্রতি কামুক হবো শুধুমাত্র আমি। আর কেউ নয়। গট ইট?”
