সে আমার বন্দিনী পর্ব ২৮
তানিয়া হুসাইন
ভীরের ফিরে আসার কথা ছিল আগেই।
কিন্তু মাফিয়াদের জীবন কি আর সময় মেনে চলে।
তাদের জীবন যেনো অনিশ্চয়তার সাগরে প্রতিটা ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঁচা।
এখনো সে সিনালোয়াতেই আছে।
কার্গোতে কোটি টাকার ড্রা*গ, কো*কেন লোডিং চলছে,
শুধু নিরাপত্তা নয়, শত্রুদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পুরো চালান ঠিকভাবে পৌঁছানো এখন তার প্রথম দায়িত্ব।
কিন্তু,
তার মন!সে এখানে থাকলেও বন্দি হয়ে আছে অন্য কোথাও
তার প্রাসাদের এক নির্জন ঘরে, একটা মেয়ের নিঃশ্বাসে, চোখে, নিরবতায়।
তার মনটা বড্ড ছটফট করছিলো ইশায়ার ছোয়া পাওয়াত জন্য।
চার দেওয়ালের মাঝে আটকে থাকা সেই চোখজোড়া যেনো এখন তার সমস্ত সিদ্ধান্তের ছায়া হয়ে উঠেছে।
একের পর এক মিটিং, গুলি, ডিল সব কিছুর মাঝেও চোখ চলে যায় একটা স্ক্রিনে।
সিসিটিভি ফুটেজ।
তার ঘরের একমাত্র ব্যস্ত স্ক্রিনটা সবসময়ই চালু থাকে।
ইশায়ার প্রতিটা নড়াচড়া, চলাফেরা, নিশ্বাসের ওঠানামাও তার চোখ এড়িয়ে যায় না।
এখনও যেমন সে দাঁড়িয়ে আছে জানালার ধারে।
একদম নিঃশব্দ।
আকাশের দিকে তাকিয়ে।
___ভীর বেশিরভাগ সময়-ই ইশায়াকে এই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।
কেন জানি আজকে তার মনটা একটু সদয় হলো মেয়েটার জন্য।
__ভীরের আঙুল চলে যায় মোবাইলের স্ক্রিনে।
মারিয়া এলেনাকে ফোন করে,
___ইশায়াকে নিয়ে বাইরে নিয়ে যাও।
গার্ডেনে, খোলা হাওয়ায়।
ভীরের কণ্ঠে ধাতব স্নেহ,
রুক্ষ অথচ গভীর।
___ইশায়া বিছানায় এসে বসে,
এমন সময়
হঠাৎ করেই দরজায় টোকা পড়ে।
মারিয়া এলেনা ভেতরে ঢুকে নিচু স্বরে বলে,
ম্যাম, বস আপনাকে বাইরে আসতে বলেছেন।
___ইশায়ার গলা শুকিয়ে আসে ভয়ে।
শ*য়তানটা কি চলে এসেছে।
কিন্তু আসলে ও তাকে তো বাইরে যেতে বলার কথা না।
চার মাস হয়ে গেছে এই ঘরে।
এক পা বাইরে রাখা হয়নি।
এখন হঠাৎ
এই পরিবর্তন?
নাকি তাকে পাচার করে দিবে,
বুকের মধ্যে কেমন একটা চাপ অনুভব করে ইশায়া,
সত্যিই কি তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
___মারিয়া এলেনা তার কাঁধে হাত রাখে,
তাকে আস্বস্ত করে বলেন,
চিন্তা করবেন না ম্যাম, কিছু হবে না।
শুধু বাইরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বস।
__ইশায়া কিছু বলে না।
সে সবসময়ের মতোই চুপচাপ।
দুইজন মহিলা গার্ডের পাহারায়, মারিয়া এলেনার সঙ্গে ধীরে ধীরে ইশায়া বাইরে পা রাখে।
প্রাসাদের ভেতরকার শীতল ছায়া পেরিয়ে যখন সে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে, তখন হাওয়ার গন্ধটাই আলাদা লাগে।
পাথরের পর পাথর, একসময় পা রাখে সবুজ ঘাসে।
ভেতরে আলাদা একটা প্রশান্তির হাওয়া বয়ে যায়।
চোখ চিক চিক করে ওঠে তার।
চাতক পাখির মতো এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখে,
প্রায় চার মাস পর সে বেরিয়েছে,খোলা আকাশ দেখছে গাছপালা দেখছে।
কাছ থেকে এসব কিছুর ঘ্রান নিতে পারছে।
নতুন এক জগৎ।
চারদিকে বিশাল বিশাল গাছ, ছায়া ঘেরা রাস্তা, নানান ফুলের ঘ্রাণ, কলকল করে বয়ে চলা ঝর্ণা, আর এক কোণায় বিশাল এক সুইমিং পুল।
আকাশটা যেনো হঠাৎ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।
ইশায়া থমকে দাঁড়ায়।
তার বুক কাপে।
হা করে শ্বাস নেয় সে,লম্বা শ্বাস টানে।
সেই নিঃশ্বাস যেনো বুকের সমস্ত জমে থাকা কান্না ছুঁয়ে বেরিয়ে যায়।
হাত বাড়িয়ে গাছের পাতা ছোঁয়।
পাখিদের ডাক,
দৃষ্টিতে শান্তির ঝলক।
চোখের কোনে জল,একধরনের তৃপ্তি, একধরনের বেঁচে থাকার উপলব্ধি।
ইশায়া ঘাসের উপর বসে পরে।
আকাশের দিকে তাকায়।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডরা অবাক।
এই মেয়েটা এতক্ষণ পাথরের মতো ছিল এখন যেনো প্রথমবার জীবিত কোনো কিছুকে ছুঁয়ে নিজের অস্তিত্ব অনুভব করছে।
___ভীর তখন তার হাইটেক স্ক্রিনে তাকিয়ে,
বাড়ির বাইরের ফুটেজ,
ফুটেজে চোখ আটকে আছে তার।
ইশায়া হাত বাড়িয়ে পাতা ছুঁচ্ছে।
তাকে হাসতে দেখা যাচ্ছে না ঠিক,
কিন্তু তার চোখে শান্তির এক গভীর ছায়া।
ইশায়ার উচ্ছ্বসিত মুখ যেনো তাকে আলাদাই একটা শান্তি দেয়।
বাড়ির বাইরে হাজারো গার্ড দাঁড়িয়ে পাহারায়।
কিন্তু তাদের কারোর-ই চোখ উপরে তোলার সাহস নেই,
ভীরের নির্দেশ যে একবারও চোখ তুলে তাকাবে ওর দিকে,তার চোখ মুহূর্তে-ই উপড়ে ফেলা হবে।
___নিকোর মেসেজ আসার পর মুহূর্তেই বদলে যায় ভীরের চোখের ভাষা
___ভীর দ্রুত নির্দেশ দেয়,
মারিয়া এলেনা, ওকে রুমে নিয়ে যাও, এখনই।
____মারিয়া এলেনা এগিয়ে আসে। তার মুখটা কেমন যেন কঠিন হয়ে থাকে ভীরের নির্দেশের ভারে।
সে নরম গলায় ইশায়াকে জানায়,
ম্যাম, বস বলেছেন আপনাকে রুমে ফিরতে হবে।
___সেই মুহূর্তে ইশায়ার মুখে নামে এক গভীর অন্ধকার।
তার চোখ জুড়ে কুয়াশা।
তবুও সে চুপ।
একটাও প্রশ্ন করেনা, একটা অনুরোধ ও নয়।
শুধু নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়।একবার ঘুরে দেখে সবকিছু।
তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে ফিরে যায় সেই ঘরের চার দেওয়ালে, যেটা তার কাছে একটা খাঁচা,
বন্দি পাখির নিষ্প্রাণ ঠিকানা।
ভীর তখন তার কাজে পাড়ি জমায়।
তাদের জীবন তো এমনই,
একটা পা আবেগে, আরেকটা রক্তে-ডুবে থাকা বাস্তবতায়।
ড্রাগ, কো*কেন, কোটি টাকার খেলা।
অবশেষে কাজটা সম্পন্ন হয়।
শত্রুদের চোখ এড়িয়ে, মা*ল পার হয় সীমান্ত পেরিয়ে।
মুনাফা হয় কল্পনার চেয়েও বেশি কোটি কোটি টাকা।
দক্ষিণের বন্দর থেকে মা*ল ছাড়িয়ে উত্তর সীমান্তে পৌঁছাতে সাতটা রুট কভার করতে হয়েছে,
প্রতিটাতে ছিল ভয়, বিপদ, রক্ত।
কিন্তু ভীর আলভারেয
এই নামটাই যথেষ্ট।
শত্রুদের বুক কাঁপে এই একটা নামে।
ডিল শেষ হতেই গার্ডদের সবাইকে স্পষ্ট নির্দেশ দেয় ভীর
____We’re heading back. Prepare the chopper. Now.
রেডিও কমিউনিকেশন ঝলসে ওঠে গার্ডদের কানে।
দুই মিনিটের মধ্যে পুরা এলাকা চকচকে কালো রেঞ্জ রোভার ও বাইক দিয়ে ঘিরে ফেলে মাফিয়ার সদস্যরা।
ভীর হেঁটে আসে তার চিরচেনা আভিজাত্যে।
অফ হোয়াইট শার্টের হাতা গুটানো, চোখে সানগ্লাস,
আর সিগারেটের ধোঁয়ার আড়ালে তার ঠোঁটে ঠান্ডা একরোখা হাসি।
চতুর্দিকে গার্ডদের কড়া নিরাপত্তা,
মার্কিন মেক্সিকান ডিলাররা দূর থেকে ঝুঁকে শ্রদ্ধা জানায়।
হেলিকপ্টারে ওঠার আগে সে পেছনে একবার তাকায়,
তার বিজয়ের রাজ্য, টাকা, ক্ষমতা, রক্তের রাজনীতি
সবই পিছনে ফেলে আসছে,
হেলিকপ্টারের প্রপেলারের গর্জন আকাশ কাঁপিয়ে তোলে।
ধুলো, পাতা, আর শুকনো ঘাস উড়ে যায় চারদিকে।
গার্ডরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে
মাফিয়া সাম্রাজ্যের রাজা তার প্রাসাদে ফিরে যাচ্ছে।
তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে যাচ্ছে।বিছানার এক কোণে বসে আছে ইশায়া।
বিকেলের দিকে শাওয়ার নিয়েছে যার দরুন ঘন চুলগুলো এখনো সামান্য ভেজা।
পরনে তার কালো ঢিলেঢালা প্লাজো আর একটা সাদা ওভারসাইজ টি-শার্ট।
ভেজা চুল কোমর ছুঁয়ে আরও নিচে গড়িয়ে পড়েছে।
ভালো করে তাকালে মনে হয়, যেন চুল নয়, নরম কুয়াশার ঝর্ণা বয়ে যাচ্ছে তার পিঠ বেয়ে।
___এই মেয়েটাকে দেখলেই ভীরের মনে হয়,
কেনো এতো সাদামাটা হয়েও এতো অপরূপ।
সৌন্দর্যের যেন নিরব, নিঃশব্দ বিদ্রোহ এই মেয়েটার চোখে-মুখে.।
তার ফর্সা মুখ জুড়ে ঠোঁটের পাশের ছোট্ট কুচকুচে কালো তিলটা সবথেকে আকর্ষণীয় সবার আগে এই জায়গায় নজর যায়।
অন্যরকম দাগ ফেলে ।
ইশায়া তখন পাজল সল্ভ করছিল,
নিঃসঙ্গতার সঙ্গে লড়াই করার একটা চেষ্টা মাত্র।
কারো সঙ্গে কোনো কথা বলে না সে।
না হাউজগার্ড, না নার্স, এমনকি মারিয়া এলেনার সাথেও।
একটা স্থবির নীরবতায় তার ঘর ভরা।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ২৭
___হঠাৎ করে ধারাম করে দরজা খোলার শব্দ হয়।
ভয়ের একটা তরঙ্গ বয়ে যায় পুরো ঘরে।
ইশায়া গা ছমছমে শব্দে আঁতকে ওঠে।
তার চোখ যায় দরজার দিকে
আর ঠিক তখনই সে দেখে ভীরকে।
মুহূর্তেই তার মুখের রঙ বদলে যায়।
চোখের পাতা থেমে যায় কাঁপতে কাঁপতে।
গলা শুকিয়ে আসে আতঙ্কে।
তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে।
ভীর দাঁড়িয়ে যায় দরজায়।
তার চোখ জুড়ে ঝড়, গভীর কিছু, একরোখা অধিকারবোধ।
