Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৩৯

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৩৯

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৩৯
তানিয়া হুসাইন

রাত তখন অনেক গভীর, আকাশ কালো মেঘে ঢাকা।
___রাত অনেক হয়ে গেছে,আর দীর্ঘক্ষণ জার্নির কারণে ইশায়া ক্লান্ত ছিলো অনেক। তার শরীর পুরোপুরি বিশ্রামে নিমগ্ন। শোয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে গভীর ঘুমে ডুবে যায়।
___অন্যদিকে, ভীরের প্রাইভেট জেট এসে থামে বাড়ির ল্যান্ডিং প্যাডে। একে একে তার বিশ্বস্ত সদস্যরা নেমে আসে, প্রত্যেকের পদক্ষেপে ভীরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
ভীর যখন বাড়ির গেটে প্রবেশ করে, তখন সেখানকার সেবক ও গার্ডরা স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে সম্মানের ভঙ্গিতে মাথা ন্যুয়ে সালাম করে। তাদের প্রত্যেকের মুখে মিশে থাকে ভীরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং গভীর আনুগত্য।তাদের দিকে একবার তাকালেই বুঝতে পারা যায়, সে কতটা সম্মানিত এবং কত বড় প্রভাবশালী ব্যক্তি।

___ভীর দ্রুত পায়ে হেঁটে তার ব্যক্তিগত কক্ষে প্রবেশ করে।
তার হৃদয় এখন ছটফট করছে, তার জীবনের একমাত্র আলোর ঝিলিক।
যাকে দেখার জন্য সে ব্যাকুল হয়ে আছে,
ভীর দরজা খুলে চারপাশে নজর ঘোরায় তার শান্তির প্রতীককে দেখার জন্য।
কিন্তু চোখে পড়ে, ইশায়া গভীর ঘুমে নিমগ্ন।
যা দেখে মুহূর্তে-ই ভীরের রাগ উঠে যায়। তার মনে জ্বলে ওঠে তীব্র তিক্ততা, কারণ এই মেয়ের জন্যই তার খাওয়া-দাওয়া ঘুম থেকে শুরু করে কাজে ও মন বসাতে পারছে না। অথচ সে ঘুমিয়ে পড়েছে তার জন্য অপেক্ষা না করে।
তার জন্য এই সামান্য সময়টুকু সে অপেক্ষা করতে পারল না এটাই ছিলো ভীরের রাগের কারণ।
ভীর রাগে রুমে ঢুকে ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দেয়।
দরজার গায়ে ধাক্কা খেয়ে দেয়ালজুড়ে প্রতিধ্বনি হয়, তার ভেতরের অশান্তি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
ভীর গিয়ে ডিভানে বসে পড়ে।
পায়ের ওপর পা তুলে বসে থাকে হাতে রি*ভলবার, চোখে আগুন, চোয়ালে ক্ষিপ্রতা। মাথার ভিতরে যেন এক যুদ্ধ চলছে,অথচ বাইরের চেহারা নিষ্ঠুর নিস্তব্ধ।

দরজার গর্জনে ইশায়ার ঘুম ভেঙে যায়।
সে চোখ খুলে ধীরে উঠে বসে।
রুমের আলো খুব কম শুধু কোণার ছোট্ট টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে, যার নরম আলো ঘরের আধার ছিঁড়ে একটু উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়েছে।
তবু, সেই ক্ষীণ আলোয়ও সে স্পষ্ট দেখতে পায় ভীর ঠিক তার সামনে বসে আছে।
গা ছমছম করে ওঠে ইশায়ার,শরীরটা ঠান্ডা হয়ে আসে, যেন কোনো ঝড় এসে তার শিরা-উপশিরা ধরে হিমশীতলতা ছড়িয়ে দিয়েছে।
এই মানুষটা তার পাশে থাকলেই, তার ভেতরে একটা অদ্ভুত দোটানার জন্ম নেয়।
ভয়, দ্বিধা, সবকিছু যেন মিলে মিশে এক দুর্বোধ্য অনুভূতির সৃষ্টি করে।
ভীর তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
তার চোখে ছিল না ভালোবাসা, ছিল না কোমলতা।
ছিল কেবল চেপে রাখা আগুন যেটা যে কোনো মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

— বাড়িতে তুই সারাক্ষণ হয় বই নিয়ে, না হয় বিড়াল নিয়ে পড়ে থাকিস,
এই সময়ে ঘুমোতে তো তোকে আমি দেখি না।
আমি যখন তোর আশেপাশে থাকি, তখনই বুঝি তোর সব সমস্যা বেড়ে যায়, তাই না?
ইশায়া চুপ।
কোনো জবাব নেই তার মুখে।
সে চুপচাপ বসে আছে, নিচু চোখে।
ভীর এবার চিৎকার করে বলে,
— Why the f**k are you just sitting there? Get over here Now.
তার কণ্ঠের রক্তমাখা গর্জনে ইশায়ার হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়।
ভীতসন্ত্রস্তভাবে সে উঠে দাঁড়ায়, কাপা কাপা পায়ে ভীরের দিকে এগিয়ে যায়।
প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তাকে টেনে নিচ্ছে এক অজানা অতলে।
ইশায়া তার সামনে এসে দাঁড়াতেই,
ভীর আচমকা দুহাতে ইশায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে, নিজের বুকের সাথে তাকে শক্ত করে টেনে নেয়।
তারপর গলায় মুখ গুঁজে লম্বা একটা নিঃশ্বাস নেয়, গভীরভাবে টেনে নিচ্ছে সেই মেয়েলি সৌরভ।
ইশায়ার শরীর থেকে ছড়ানো সেই মিষ্টি গন্ধ যেন তার নাকে ঢুকে মস্তিষ্কে ঢেউ তোলে।
ভীর ফিসফিসিয়ে বলে,আমার থেকে যতোই দূরে যেতে চাস না কেনো তোর সেই আশা কোনদিনো পূরন হবে না।
আমার শরীরে প্রান থাকতে তুই…

তুই আমার থেকে দূরে যেতে পারবি না।
তাই এসব অহেতুক জেদ ছাড়।
সেটা তোর জন্য-ই ভালো।
মেনে নাও সব কিছু,রানী হয়ে থাকবে।
এই পুরো রাজ্য তোমার পায়ের নিচে থাকবে।
নাহয় সারাজীবন বন্দীত্ব কে বরণ করে নিতে হবে।
কথা বলতে বলতেই ভীর এক ঝটকায় ইশায়াকে নিজের উরুতে বসিয়ে নেয়, দুহাতে গাল ধরে চুমু খায়,ইশায়ার ফোলা ফোলা গাল গুলোতে ঠোঁট বুলায়,
একটা দীর্ঘ, তৃষ্ণার্ত চুমু যার ভেতরে ছিল পাগলামো, মালিকানা আর অতল ভালোবাসা।
ভীর হাস্কি স্বরে বলে,
তুমি পাগল করে দিচ্ছো আমাকে দিনকে দিন,
পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি।
ভীরের কণ্ঠে হালকা কাঁপুনি, চোখে বিষণ্ণতা মেশানো কামনা।
ইশায়ার গলায় মুখ গুঁজে সে পরম আবেশে, ইশায়ার হাত চলে যায় ভীরের চুলে।
ভীরের হাতের ছোয়া বেশামাল, ওকে না পেলে সে যেন নিঃশ্বাস নিতে পারে না,নিজের সাথে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ভীর তাকে।
ইশায়ার দম বন্ধ হয়ে আসছে,ভীর তাকে এতো শক্ত করে ধরেছে সে ব্যাথা পাচ্ছে।
ভীর তো পারলে তাকে নিজের ভেতর ঢুকিয়ে নেয় এমন অবস্থা
এই নরম মুহূর্তের মাঝে হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ে কেউ।
মুহূর্তে ভীরের মুড ভেঙে যায়।

— বস, আপনাদের খাবার রেডি।
বাইর থেকে গার্ডের সম্মানিত কণ্ঠ ভেসে আসে।
ভীর চোখ তুলে তাকায় ইশায়ার মুখে।
তারপর ধীরগতিতে মাথা নিচু করে ঠোঁটে শব্দ করে একটা চুমু খায়, তারপর হাতের বাধন খুলে দিয়ে মুক্ত করে ইশায়াকে।
— ফ্রেশ হয়ে নিচে চল।
বলে উঠে দাঁড়ায় ভীর
ভীর ফ্রেশ হয়ে আসে,
পরে একসাথে ইশায়াকে নিয়ে নিচে নেমে আসে ডাইনিং রুমে।
তার পাশে হাঁটতে থাকা ইশায়া চারদিক দেখতে থাকে। এই বিলাসবহুল দুনিয়ার কোথাও তাকে মানায় না, সে তো সাধারণ একটা মানুষ।

ডাইনিং টেবিলে ইতোমধ্যে বসে আছে নিকো আর ডিয়েগো।
নিকো চুপচাপ তাকিয়ে আছে ইশায়ার দিকে।
তার চোখে সন্দেহ, এই মেয়েকে দেখলেই তার সাফার কথা মনে হয়।
ওই মেয়ের তেজ কথার ধাঁচ এখনো তার মনে আছে স্পষ্ট।
ওই মেয়ের বোন হয়ে এ এতো শান্ত কিভাবে হতে পারে।
আবার শান্ত কোথায় ওইদিন তাকে কিভাবে অ্যাটাক করলো।
এই মেয়ের এতো কমোল এতো শান্ত ভাবটা কেনো জানি নিকোর কাছে রহস্যময় লাগে।
ভীর তার জন্য বরাদ্দকৃত সামনের চেয়ারটায় গিয়ে বসে।
তার ঠিক পাশে ইশায়া।
গার্ডরা এসে একে একে খাবার পরিবেশন শুরু করে।
ডাইনিং টেবিল জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ঐতিহ্যবাহী কিছু খাবার।
ভুট্টার পাতায় মোড়ানো মাংস ও মশলা ভরা স্টিমড কেক।
টর্টিয়া রোল,চিলি রেইলেনো, আরো অনেক কিছু। সাথে ছিল ফ্রাইড রাইস,স্টেক, আর লাল সস দিয়ে রান্না করা পলো রোস্তিসাডো।

____ইশায়ার জন্য আলাদাভাবে বাঙালি খাবার রান্না করা হয়,
সাদা ভাত, চিকেন কারি,ডাল আর হালকা ঘি এ ভাজা সবজি।আর বড় মাছ ভাজা
শেষে একপ্লেটে সেমাইয়ের কাস্টার্ড ডেজার্ট।
__ইশায়া মিষ্টি পছন্দ করে এজন্যই এই ব্যবস্থা করা।
ভীর তার ছোট থেকে ছোট জিনিস নজরে রাখে।
সবকিছু তার পছন্দ অনুযায়ী করে।
ভীর নীরবভাবে খাচ্ছে, আর সামনে বসে আছে নিকো ও ডিয়েগো। কাজের লোকেরা একে একে খাবার পরিবেশন করে দিচ্ছে।

___খাবারের ঘ্রাণে চারপাশ ভরে উঠেছে, কিন্তু ইশায়ার মনে হচ্ছে, তার গলা দিয়ে কিছুই নামবে না। সবার সামনে সে অস্বস্তি বোধ করছে, তার মন ভীষণ অস্থির।
ডিয়েগো আর নিকো খাওয়া শুরু করেছে। তারা চিলি রেইলেনো কেটে নিয়ে খাচ্ছে। টেবিলের গ্লাসে ঝকঝকে জল আর আঙ্গুরের রস রাখা।
ভীর আরচোখে ইশায়ার দিকে তাকায়, দেখে খাবারের প্লেট যেভাবে ছিল সেভাবেই রয়েছে, এক চামচও সে মুখে তোলেনি।
ভীর তার নিজের প্লেট থেকে বারবাকোয়া কেটে তুলে ওর মুখের সামনে ধরে। তার ঠোঁটের কোণে হালকা একটা দৃঢ়তা।

___কিন্তু ইশায়ার কোন নড়চর দেখা গেলো না।
সে চুপচাপ বসে আছে,
___কি হলো?
গম্ভীর কণ্ঠে বলে ভীর।
ইশায়া এদিক ওদিক তাকায়। তার চোখে ভয়, স্নায়ুর চাপ স্পষ্ট,কিছু না বলে ধীরে ধীরে মুখ খুলে খাবারটা মুখে তুলে নেয়।
ভীর তার দিকে তাকিয়ে কখনো নিজে খাচ্ছে, আবার পরের চামচটা তার মুখে তুলে দিচ্ছে। কেমন এক অদ্ভুত টান, আর অধিকার মিশে আছে ভীরের প্রত্যেকটা কাজকর্মে।
নিকো একবার তাকায় ইশায়ার দিকে, তারপর যেন ভীরের সম্মুখীন হতে না চেয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। ডিয়েগো খাওয়ায় ব্যস্ত,সে একবারো চোখ উপরে তুলেনি।
খাওয়া শেষ করে তারা দুজন টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। নিকো দাঁড়িয়ে ভীরের দিকে ফিরে বলে,
— কালকের মিটিংয়ের জন্য একটা জরুরি ডিসকাশন আছে। প্ল্যান নিয়ে বসতে হবে। মিটিং রুমে এসো।
ভীর কিছু বলে না, শুধু এক ঝলক তাকায়। নিকো ও ডিয়েগো ধীরে ধীরে মিটিং রুমের দিকে চলে যায়।
ইশায়া আইসক্রিম খাচ্ছিল। ভীর তার দিকে টিস্যু বাড়িয়ে মুখ মুছে দেয় গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
— রুমে একটা শাড়ি রাখা আছে,ওটা পড়বে।
তারপর পেছন ফিরে চলে যেরে নেয়, কিন্তু কয়েক কদম যাওয়ার পর পিছু ফিরে বলে,
—অপেক্ষা করবে আমার জন্য। আমি যত দেরিতেই আসি না কেন ঘুমোবে না,
বলে চলে যায়।
ইশায়ার হাতের চামচ থেমে যায়। বুকের ভেতরটা যেন ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে,উঠে দাঁড়ায় সে।

ভীর, নিকো, ডিয়েগো এবং তাদের বাকি বিশ্বস্ত গার্ডরা বসেছে মিটিং রুমে। তাদের সামনে ছড়িয়ে আছে কিছু ছবি আর নোট। আলো কমানো রুমে মুখগুলো আরও গম্ভীর, চোখে আতঙ্কের ছায়া।
ডিয়েগো গলা নামিয়ে বলে,
— আমাদের যত দ্রুত সম্ভব মিগুয়েলকে শেষ করতে হবে। সে শুধু পালিয়ে নেই, এখন সে বড় বড় লোকের সাথে জোট করেছে, আমাদের বিরুদ্ধে ভীর।
নিকো সাথে সাথে বলে ওঠে,
— এখন পাঁচজন গ্যাংস্টারের সাথে হাত মিলিয়েছে। ওরা ভয়ংকর, আর আমাদের জন্য সরাসরি হুমকি। এদের শক্তি দিন দিন বেড়ে চলেছে, সেটা আমাদের জন্য ভালো না।
ভীর চোয়াল শক্ত করে চুপচাপ শুনছে, তার চোখ লাল হয়ে উঠছে।
তারা মিগুয়েলকে খুঁজে বের করার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে কিন্তু বারবার সে হাত ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছে ।

প্রাসাদের অন্যপ্রান্তে, রান্নাঘরের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ছদ্মবেশে ঘোরাফেরা করছে মিগুয়েলের এক গুপ্তচর।
সে প্রাসাদের ভিতরকার খবর মেগুয়েলের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। তার চেহারায় নির্লিপ্ত ভঙ্গি, কিন্ত তার চোখ ঘোলাটে আর শীতল।
সবার থেকে একটু দূরত্বে গিয়ে সে মিগুয়েলকে ফোন দিয়ে ইশায়ার বিষয় টা জানায়।
ভীরের করা সব কাজকর্ম, ওই মেয়েটার প্রতি তার দুর্বলতা সবকিছুই জানায়
___এই কথাগুলো মিগুয়েলের কানে যাওয়া মাত্রই, তার ঠোঁটের কোণে ভয়ঙ্কর এক কুটিল হাসি খেলে যায়।
তার পাশে থাকা তাদের একজন জিজ্ঞেস করে,
— কি হয়েছে?
মিগুয়েল ঠান্ডা গলায় চোখেমুখে বিজয়ী অভিব্যক্তি নিয়ে বলে,
— It’s time to change the game.

____এরপর মিগুয়েল আর তার সাথে পার্টনার ও গার্ডরা সবাই মিলে একটা প্ল্যান করে।
___তোমার কি মনে হয় কাজে দিবে এসব।
মিগুয়েল বাঁকা হেসে বলে,
রাজভীর আলভারেয আন্দাজ ও করতে পারবে না কি হতে চলেছে সামনে।
কাওকে শেষ করতে হলে আগে তার দুর্বলতা খুঁজে বের করতে হয়।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৩৮

আর একবার যদি সেটা বের করা যায়,
তাহলে তোমার অর্ধেক কাজ এমনিতেই হয়ে যাবে।
আরে দুর্বলতাকে শেষ করতে পারলে আমাদের অর্ধেক জিৎ নিশ্চিত।
এখন শুধু কালকের অপেক্ষা বলেই হাসতে থাকে মিগুয়েল।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৪০