স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৩
সানজিদা আক্তার মুন্নী
তৃষ্ণার শরীরে এখনো আগুনের আঁচ। রাতের কড়া ওষুধে জ্বর কিছুটা স্তিমিত হলেও, ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই তা ফের দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে শিরায় শিরায়। এই তীব্র দহন নিয়েই সে রান্নাঘরে সকালের নাশতা তৈরিতে ব্যস্ত। সময়মতো খাবার টেবিলে না পৌঁছালে জিতা তাকে জ্যান্ত কবর দেবে, এই ভয়টা জ্বরের চেয়েও বেশি কাঁপাচ্ছে তাকে। ঘড়ির কাঁটা সকাল আটটা ছুঁইছুঁই। বাড়িতে কোনো কাজের লোক নেই, তাই আজ এই সংসারের সমস্ত ভার তৃষ্ণার একার কাঁধে। প্রচণ্ড মাথাব্যথায় মনে হচ্ছে স্নায়ুগুলো ছিঁড়ে যাবে। জ্বরের ঘোরে ঘোলাটে হয়ে আসা চোখ বেয়ে টুপটুপ করে ঝরে পড়ছে পানি। তবু সে যন্ত্রের মতো রুটির খামির মথে চলেছে।
এমন সময় ঝড়ের বেগে রান্নাঘরে এসে ঢোকে ওয়াসেম। রাগে ফুঁসছে সে। ঘুম থেকে উঠে নিজের ঘরে তৃষ্ণাকে না দেখেই সে আঁচ করতে পেরেছে এই অসুস্থ মেয়েটা কোথায় থাকতে পারে। এসেই পেছন থেকে তৃষ্ণার রুগ্ন বাহুটা শক্ত করে চেপে ধরে নিজের দিকে ঘোরায় সে। গায়ে হাত ঠেকতেই ছ্যাঁক করে ওঠে ওয়াসেমের তালু জ্বরের উত্তাপ গতকালের চেয়ে একবিন্দুও কমেনি। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে তার। তৃষ্ণার মুখটা একহাতে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত ঘষে সে হিসহিস করে ওঠে, “কুত্তার বাচ্চা, তোকে না বলেছিলাম জ্বর না কমলে কোনো কাজে হাত দিবি না! মরতে চাস তুই? তুই মরবি আর আমাকে ফাঁসাবি? লোকে বলবে, আমি তোকে অমানুষের মতো কাজ করিয়ে মেরে ফেলেছি!”
তৃষ্ণার ক্লান্ত দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে পানি। ওয়াসেম কেবল নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতেই এতসব বলছে, অথচ একটিবারের জন্যও তৃষ্ণার কষ্টের কথা ভাবল না! এই ভাঙাচোরা শরীরেও তাকে এভাবে শারীরিক ও মানসিক আঘাত করছে লোকটা। তৃষ্ণার গালের ওপর উষ্ণ অশ্রুর স্পর্শে হঠাৎ করেই থমকে যায় ওয়াসেম। অজান্তেই হাতের বাঁধন আলগা হয়ে আসে তার। তৃষ্ণা তার ঘোলাটে, ক্লান্ত চোখ তুলে ওয়াসেমের দিকে তাকায়। অত্যন্ত অসহায়, করুণ গলায় সে বলে ওঠে, “আমার শরীরটা একদম ভালো নেই। আমাকে আর মারবেন না, আমি আর কখনো আপনার অবাধ্য হব না।”
কথাগুলো শুনে অদ্ভুত এক অস্বস্তি এসে দলা পাকায় ওয়াসেমের গলায়। কেন যেন বুকের ভেতরটা বড্ড মুচড়ে ওঠে তার। একটি দীর্ঘশ্বাস গোপন করে সে তৃষ্ণার হাত ধরে টেনে এনে পাশের চেয়ারটায় বসিয়ে দেয়। তারপর নিজের দুর্বলতা ঢাকতে আগের মতোই কাঠখোট্টা গলায় নির্দেশ দেয়, “তুই শুধু বল কী কী করতে হবে, আমি করছি।”
তৃষ্ণা রীতিমতো বিস্মিত। গত রাত থেকেই ওয়াসেমের আচরণের এই আকস্মিক পালাবদল তাকে ভাবাচ্ছে। নিজের বিস্ময়টুকু সযত্নে আড়াল করে নিচু স্বরে সে বলে, “আমিই করে দিচ্ছি। আপনি পারবেন না, উল্টে এক কাজকে তিন কাজ করে বসবেন।”
ওয়াসেম ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে, “চুল সব ছিঁড়ে নেব! বেশি বাড়াবাড়ি করিস না। আমি করব বলেছি, তুই শুধু বল কী করতে হবে!”
অগত্যা কথা না বাড়িয়ে তৃষ্ণা বলে, “আমি সবজিটা রান্না করে ফেলেছি, রুটিও বেলা আছে। আপনি শুধু সেঁকে নিন। ওই ডান দিকে তাওয়া রাখা আছে।”
তৃষ্ণার কথামতো তাওয়া এনে গ্যাসের চুলার ওপর বসায় ওয়াসেম। তারপর চরম আনাড়ির মতো একে একে রুটিগুলো সেঁকতে শুরু করে। আগুনের আঁচে কোনোটা পুড়ে একেবারে কয়লা হয়ে যায়, তো কোনোটা থেকে যায় অর্ধেক কাঁচা। এভাবেই যুদ্ধ করে আটটা রুটি সেঁকা শেষ করে সে। একটা প্লেটে সেই রুটি আর সবজি নিয়ে আরেকটি চেয়ার টেনে তৃষ্ণার ঠিক সামনে এসে বসে ওয়াসেম। গম্ভীর গলায় বলে, “আমি খাইয়ে দিচ্ছি, চুপচাপ গিলবি।”
তৃষ্ণা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়ে। ওয়াসেম একটা রুটি ছিঁড়ে ওর মুখে পুরে দেয়। এক লোকমা চিবোতেই তৃষ্ণা বুঝতে পারে, রুটির ভেতরটা পুরো কাঁচা। এই অখাদ্য গেলা অসম্ভব। কিন্তু সে কথা প্রকাশ না করে সে শান্ত গলায় বলে, “আমার না বমি পাচ্ছে। জ্বরে মুখে কোনো স্বাদ পাচ্ছি না, আমি আর খাব না।”
ওয়াসেম এ শুনে নিজের মুখে দু-টুকরো পুরে দেয়। কিন্তু নিজের হাতের এই অখাদ্য বেশিক্ষণ মুখে রাখা তার পক্ষেও সম্ভব হয় না। উঠে গিয়ে প্লেটটা সশব্দে জায়গায় রেখে বিরক্তির সুরে বলে, “ধুর! কীসব রুটি এসব! আমি বাইরে গিয়ে খেয়ে নেব।”
এ কথা শুনে তৃষ্ণা একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে টলটলে পায়ে উঠে দাঁড়ায়। প্লেট থেকে তিনটি অর্ধকাঁচা রুটি নিয়ে তাওয়ায় খুব সাবধানে, নিখুঁতভাবে সেঁকে নেয় সে। তারপর নতুন করে প্লেটে রুটি আর সবজি সাজিয়ে ওয়াসেমের হাতে তুলে দিয়ে বলে, “বাইরে খেতে হবে না, নিন, খেয়ে নিন।”
ওয়াসেম আর কোনো কথা না বাড়িয়ে খেতে শুরু করে। নিজের বোকামির পর এখন কথা বাড়ালে যে উল্টে লজ্জায় পড়তে হবে, সেটা সে বেশ বোঝে। তবে রুটি চিবোতে চিবোতেই নিজের ভেতরের অস্বস্তি আর দুর্বলতা ঢাকতে তৃষ্ণাকে কথার বাণে বিদ্ধ করতে ছাড়ে না সে, “তুই আবার ভেবে বসিস না যে তোকে আমি আপন করে নেব। তোর মতো মেয়ে এ বাড়ির কাজের লোক হয়েই থাকতে পারে, বউ নয়।”
নিষ্ঠুর কথাগুলো শুনে তৃষ্ণার ফ্যাকাশে ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক চিলতে ম্লান, বেদনাহত হাসি। শান্ত, নির্বিকার স্বরে সে জবাব দেয়, “আমার মতো এতিমের আবার স্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা আছে নাকি? বেঁচে আছি এটাই যথেষ্ট।”
সময়টা এখন জোহরের পর।
খাওয়ার ঘরের মেঝেতে পাটি বিছিয়ে তৌসিরকে খাবার দিচ্ছে নাজহা। সকালে কিছুই পেটে পড়েনি তৌসিরের, তাই এখন খেতে এসেছে সে। নাজহা ওর পাতে ভাত বেড়ে দিয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কী দিয়ে দিব?”
তৌসির কোনো প্রত্যুত্তর না করে এক তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে নাজহার দিকে তাকিয়ে থাকে। গোসল শেষে ভেজা খোলা চুলে কী মারাত্মকই না লাগছে তাকে! তার ওপর পরেছে কালো আর লালের মিশেলে একটা থ্রিপিস, এতে আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে সে। তৌসির একদৃষ্টে তৃপ্ত হয়ে তাকে দেখতে থাকে। তৌসিরের এমন ঘোর লাগা চাহনি দেখে নাজহা কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করে, “কী হলো, এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
তৌসির নাজহার দিকে সেই একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “তোমারে দেখি।”
এ কথা শুনে নাজহা বিরক্তি দেখিয়ে বলে, “খাবারটা খেয়ে নিন, কী দিয়ে দিব বলুন।”
তৌসির সে কথার তোয়াক্কা না করে উল্টো বলে, “এদিকে আসো, আমি একটা কথা কানে কানে কই?”
নাজহা সন্দিহান হয়ে ভ্রু কুঁচকায়। তারপর কী বলে শোনার জন্য ধীরে ধীরে তৌসিরের দিকে নিজের মুখ এগিয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু না, তৌসির তাকে কিছু বলার বদলে টুপ করে তার গালে একটা চুমু এঁকে দেয়। তৌসিরের ঠোঁটের ছোঁয়া পেতেই নাজহা ছিটকে দূরে সরে যায়। হালকা রাগ নিয়ে বলে, “আপনি লুইচ্চামি করবেন না খাবার খাবেন, কোনটা করবেন?”
নাজহার কথায় তৌসির হো হো করে হেসে ওঠে বলে, “তোমার সাউয়ায় ছুইবার আগেই এমনে তড়কে উঠো ক্যান? তরকারি কী কী আছে?”
নাজহা বিরক্তি চেপেই তরকারির নাম বলে, “আলু দিয়ে মাংস আর মাংসের বুনা। কৈ মাছের বোনা, যেগুল সকালে ধরে এনেছেন।”
তৌসির কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, “এক মাংস এক মাংস, দূর সাউয়া! কৈয়ের তরকারি দাও তাহলে।”
নাজহা মাথা নাড়িয়ে পাশেই রাখা পাতিল থেকে তৌসিরের প্লেটে দুটো কৈ মাছ তুলে দেয়। কিন্তু তৌসির মাছ দুটো দেখে অতি সাবধানে সেগুলো আবারও পাতিলে রেখে দিতে দিতে বলে, “আমি জুল দিয়েই খাব, মাছ আর খাইতে হবে না। দুইটা বাচলে অন্য কেউ খাইতে পারব।”
এমন কথায় নাজহা রাগে ফুঁসে ওঠে। এত কিপটামি মানা যাচ্ছে না, একদমই মানা গেল না। সে রাগে গর্জে উঠে বলে, “আপনি এত কিপ্টামি করেন কেন? খাওয়ার সময় তো অন্তত না করুন, ছিঃ ছিঃ।”
এক লোকমা ভাত মুখে নিতে নিতে তৌসির নাজহার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় আর বলে, “এত ছিঃ ছিঃ মারাইস না লো ছিনাল, বাজারে মাছের যেই দাম মাছের জোল দিয়েই খাওয়া ভালো।”
নাজহা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, “তাই বলে একটা মাছও খাবেন না? একটা খান।”
তৌসির ভাত মাখাতে মাখাতে একরোখা গলায় বলে, “না না খাইমু না, তরকারি এমনিতেই কম দেখতাছি আমি জুল দিয়েই খামু।”
এ কথা বলতে বলতেই ওর বুকপকেটে থাকা ভাঙা ফোনটা বেজে ওঠে। বাঁ হাত দিয়ে ফোনটা বের করে দেখে রুদ্র কল করেছে। ফোন ধরে কানে তুলে সে বলে, “হ্যাঁ ক, কিতা হইছে?”
ওপাশ থেকে রুদ্র কিছুটা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, “ভাই, আজমলের লোকজন তো আইছে মাল ফিরত নিতে। টাকা দেয় নাই, জোর করে, কী করমু?”
তৌসির তিক্ত গলায় বলে, “এসেছে তো কী হইছে? সাউয়া ছিঁড়িয়া কাউয়ারে খাওয়াইয়া দে বাইনচুদের নাতিগো।”
রুদ্র শঙ্কার সুরে বলে, “ওরা তো মানুষ বেশি ভাই।”
তৌসির এ কথা শুনে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করে, “কয়জন?”
“বিশজন এর উপ্রে।”
তৌসির নির্লিপ্ত গলায় বলে, “খেয়ে নে সাত-আটটারে। বাকিগুলোরে আমি আইসা খামু, আমি ভাতটা খাইয়া আই দাঁড়া।”
রুদ্র তাগিদ দিয়ে বলে, “আমি খাইতেছি না, তুমি আমাগো দক্ষিণগায়ের গোডাউনে আসো।”
“আইতেছি,”
এ কথা বলে তৌসির ফোন রেখে দ্রুত খাবারটা শেষ করতে থাকে। নাজহা চুপচাপ বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর মলিন গলায় বুক কাঁপানো ভয় নিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আপনি ওখানে যাবেন?”
তৌসির ওর ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে ইশারা করে সম্মতি জানিয়ে বলে, “হুম।”
“আপনাকে যদি ওরা কিছু করে নেয়?”
তৌসির তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে, “আমার বাল ছিড়া এত সোজা না, চিন্তা করিও না আমার কিচ্ছু হবে না।”
এ কথা বলে তৌসির খাওয়া শেষ করে। হাত ধুয়ে পানি খেয়ে বেরিয়ে আসে খাবারের ঘর থেকে, নাজহাও তার পিছু পিছু উঠে আসে। ঘরের বাইরে এসে তৌসির নাজহার দিকে ঘোরে। তারপর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নাজহার ওড়নায় নিজের হাত-মুখ মুছতে মুছতে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ভরসা দিয়ে বলে, “আমায় নিয়া টেনশন নিও না, গেলাম।”
নাজহা দুদিকে আলতো করে মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়, “যান।”
নাজহার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তৌসির সোজা চলে যায় বিবিজানের ঘরে। তাকে সবটা জানিয়ে দু’হাতে দুটো ধারালো কুড়াল তুলে নেয় সে। তারপর পরনের লুঙ্গির কোঁচটা শক্ত করে কোমরে গুঁজে সোজা বেরিয়ে পড়ে দক্ষিণের গোডাউনের উদ্দেশ্যে।
কিছুক্ষণ হাঁটার পরই গোডাউনে এসে সেই লোকগুলোর সামনে গিয়ে পৌঁছায় তৌসির। নিজের হাতের কুড়াল দুটো রুদ্রের দিকে এগিয়ে দিয়ে সে ধীরপায়ে লোকগুলোর দিকে এগোয়। ওপাশ থেকেও কথা বলার জন্য একজন সামনে এগিয়ে আসে, তার নাম মাজহার।
মাজহারের একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তৌসির গর্জে ওঠে, “এই খা***কির পোলা! তোরা টাকা ছাড়া মাল নিতে আইছোস কোন সাহসে?”
মাজহারও সমান তেজে চিল্লিয়ে ওঠে, “মাল আমাগো! টাকা ক্যান দিমু?”
তৌসির এবার তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। ওর কথায় ঝরে পড়ে তীব্র শ্লেষ, “ওরে আমার বিশ্ব মাদা**চুত রে! তগো মাল তো তগোই, কিন্তু উদ্ধার তো করছি আমরা! তোদের বাপের সাথে কী ডিল হইছিল? মাল ফেরত আনলে টাকা দিয়ে নিবি। কিন্তু কই? টাকা কই?”
মাজহার জেদ ধরে বলে, “আমরা টাকা দিমু না, মাল
কথা শেষ হওয়ার আগেই তৌসিরের মাথার রগগুলো রাগে দপদপ করে ফুলে ওঠে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “মাল তোর সা**য়া দিয়া ভইরা দিমু! চুপচাপ চইল্লা যা এখান থেকে!”
মাজহারও নাছোড়বান্দা, “যামু না! কী করবি কর।”
এটা শুনে তৌসির যেন কিছুটা মজা পায়। সে বাঁকা হেসে বলে, “কী করমু? দিতাম মাইর, কিন্তু তুই তো নিতে পারবি না!”
মাজহার বুক চিতিয়ে বলে, “দে মাইর! আজ হয় লাশ হমু, নয় মাল নিয়া যামু।”
মাজহারের কথা শুনে তৌসির এবার শব্দ করেই হাসতে থাকে। হাসতে হাসতেই ভয়ংকর এক গলায় বলে ওঠে, “এমন মাইর দিমু, মাইর খাইয়া পড়লে আর সোজা হইয়া দাঁড়াইতে পারবি না!”
এ বলে তৌসিরের দিকে হাত বাড়িয়ে গলার আওয়াজ চড়িয়ে বলে,
“রুদ্র, কুড়ালখানা দে!”
রুদ্রর হাত থেকে ভারী কুড়ালটা মুঠোয় আসতেই তৌসিরের চোখের মণি যেন নরকের আগুনে জ্বলে ওঠে। কোনো বাক্যব্যয় নেই, কোনো প্রস্তুতি নেই। চোখের পলকে কুড়ালটা বাতাসে এক ভয়ংকর হিসহিস শব্দ তুলে প্রবল বেগে নেমে আসে মাজহারের ঘাড়ে। খচাং! হাড় আর মাংস আলাদা হওয়ার বীভৎস শব্দে চারপাশ মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। এক কোপেই ধড় থেকে ছিটকে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে মাজহারের চোখ-খোলা মুন্ডুটা। ফিনকি দিয়ে ওঠা তাজা রক্তে লাল হয়ে যায় মাটি। পরমুহূর্তেই মুন্ডুহীন ধড়টার বুকে এক সজোরে লাথি চালিয়ে লাশটা ধুলোয় ছুঁড়ে ফেলে তৌসির। তৌসির মুহুর্তেই খেয়ে দেয় মাজহার কে। তারপর শুরু হয় এক আর বিশের এক রক্তক্ষয়ী, অসম লড়াই। তৌসির একা, কিন্তু তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে মৃত্যুর নিখুঁত শিল্প।
চারপাশ ঘিরে থাকা সশস্ত্র শত্রুদের মাঝখানে সে এখন মূর্তিমান প্রলয়। চোখের পলকেই তার হাতের ধারালো কুড়ালটা সাক্ষাৎ মৃত্যুর মতো ধেয়ে যায়, প্রথম আক্রমণকারীর বুকের পাঁজরের হাড় চূর্ণ করে সোজা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। লোকটার আর্তনাদ গলার কাছেই রক্তে বুদবুদ তুলে আটকে যায়। সেই গোঙাতে থাকা শরীরটিকে পা দিয়ে সজোরে লাথি মেরে দূরে ঠেলে দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে ঘুরে দাঁড়ায় তৌসির। ভারী কুড়াল শূন্যে এক ভয়ঙ্কর অর্ধবৃত্ত রচনা করে, আর সেই মারণ আঘাতেই আরেকজনের কপাল দু’ফাঁক হয়ে মগজ ছিটকে পড়ে ধুলোয়।
তৌসিরের প্রতিটি পেশি আজ রক্তের নেশায় উন্মত্ত। লৌহকঠিন হাতের এক প্রবল আঘাতে একজন শূন্যে কয়েক হাত উড়ে গিয়ে সজোরে আছড়ে পড়ে, মেরুদণ্ড ভাঙার মটমট শব্দ শোনা যায় স্পষ্ট। চকচকে ফলার এক নির্মম ও দ্রুতগামী কোপে শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় আরেকজনের হাত বাতাসে ছিটকে ওঠে উষ্ণ রক্তের লাল ফোয়ারা, ভিজিয়ে দেয় তৌসিরের মুখ। কোনো ভ্রুক্ষেপ ছাড়াই সে একহাতে একজনকে শূন্যে তুলে আছড়ে ফেলে পাথুরে মাটিতে। এরপর অবলীলায় মাটিতে পড়ে থাকা এক শত্রুর বুকের ওপর পা দিয়ে পিষ্ট করে, পাঁজরের হাড়ের ভেতর আটকে থাকা কুড়ালটা এক হ্যাঁচকায় টেনে বের করে আনে সে।
কখনো কুঠারের ফলা দিয়ে একজনের পায়ের রগ কেটে তাকে ধরাশায়ী করে, তো পরক্ষণেই ছুটে আসা আক্রমণকারীদের আঘাত রুখে দিয়ে তাদের বুকেই পাল্টা কোপ বসায়। তার হাতের অস্ত্রের মুহুর্মুহু আঘাতে চারপাশের শত্রুরা যেন কসাইখানার মাংসের মতো ছিন্নভিন্ন হতে থাকে। চারদিকে এখন শুধুই মৃত্যুযন্ত্রণার গগনবিদারী আর্তনাদ, ওড়া ধুলোর মেঘ আর মাটিতে লুটিয়ে পড়া একের পর এক বীভৎস, ক্ষতবিক্ষত লাশ। বাতাসে ভাসছে কাঁচা রক্ত আর মৃত্যুর বমি-আনা কালচে গন্ধ। সে একা বীরদর্পে এগিয়ে চলে; তার অস্ত্রের প্রতিটি নির্মম ওঠানামায় ধুলোমাখা লাল প্রান্তরে লেখা হতে থাকে কেবলই শত্রুর মৃত্যু আর পতনের পৈশাচিক গল্প।
একনাগাড়ে সবাইকে উপরে পাঠিয়ে অবশেষে শান্ত হয় প্রলয় প্রান্তর। তৌসির হাঁপাতে হাঁপাতে ক্লান্ত হয়ে দাঁড়ায় লাশের স্তূপের মাঝখানে। তার বাঁ হাতে শক্ত করে ধরা কুড়াল বেয়ে টপটপ করে ঝরছে ঘন রক্ত। নাক-মুখ, কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জমাট বাঁধা রক্তের দাগ। পরনের সাদা লুঙ্গি আর কালো শার্টটা এখন আর চেনার উপায় নেই, তাজা রক্তে ভিজে একেবারে জুবজুব করছে, ভারী হয়ে লেপ্টে আছে শরীরের সাথে। সাক্ষাৎ এক রক্তস্নাত শয়তানের মতো দাঁড়িয়ে থাকে তৌসির।
শিকদার বাড়িত — সময় এখন সন্ধ্যা ছয় টা।
ইকরাদের বিয়েতে এসে মায়া যে শিকদার বাড়িতে ঘাঁটি গেড়েছে, সে যাওয়ার আর কোনো নামই নিচ্ছে না। এতদিন ধরে তার এই পড়ে থাকার স্বভাব এমনিতেই নাজহার বিরক্তির কারণ। তার ওপর তো যুক্ত আছে মায়ার আদিখ্যেতা।
তৌসির মারামারি করতে গিয়ে শরীরে সামান্য আঘাত নিয়ে বাড়ি ফেরে। মারামারি করতে গেলে দু-চার ঘা খেতে হবে এটাই স্বাভাবিক। নাজহা বিষয়টাকে সেভাবেই দেখে। কিন্তু তৌসির বাড়ি ফেরার পর থেকে মায়ার যে নাটক শুরু হয়, তা দেখে নাজহার গা জ্বলতে থাকে। কারি বা সব সহ্য হবে? এই ‘ক্ষতে ওষুধ লাগিয়ে দাও’, ‘ওটা খাইয়ে দাও’ মায়ার এই গদগদ আচরণ নাজহার সহ্যসীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
সন্ধ্যার পর নাজহা নিচে রান্নাঘরে আসে নিজের জন্য এক কাপ চা বানাতে। ঠিক তখনই মায়া সেখানে এসে হাজির হয়। তৌসির তখন বসার ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে, আর মায়া তার জন্য স্যুপ তৈরি করছে। নাজহার পাশে দাঁড়িয়েই মায়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুনগুন করে কথা শোনাতে শুরু করে, “তৌসির ভাইয়ের খেয়াল তো রাখো না! এটা করো না, ওটা করো না।
নাজহা নিজের নিজের রাগটাকে যথাসম্ভব চেপে রেখে মায়ার দিকে তাকিয়ে একদম ঠান্ডা গলায় বলে, “তুমি স্যুপ রাখো, আমি দিব। জামাই আমার, তোমার না।”
কথাটা শুনে মায়া দপ করে জ্বলে ওঠে। রেগে গিয়ে পালটা জবাব দিয়ে বসে, “তোমার জামাই তো কী হয়েছে? সে আমার মামাতো ভাইও।”
রান্নাঘরে এখন বিবিজানও উপস্থিত। মায়ার এই নির্লজ্জ উত্তর শুনে রাগে নাজহার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করে। এতদিন ধরে সে এই মেয়ের নাটক দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছে। শুধু তৌসির মায়াকে পাত্তা দেয় না বলেই সে চুপ করে আছে। কিন্তু আর কত? সবকিছুরই একটা সীমা আছে! হঠাৎ করেই নাজহা রান্নাঘর ফাটানো এক চিৎকার দিয়ে ওঠে, “তৌসির! এদিকে আসুন!”
নাজহার এমন ডাক দিতে দেরি হয় সেটা শুনে তৌসিরের আসতে দেরি হয় না। সে মনে মনে ভাবে হয়তো বিবিজানের সাথে নাজহার কোনো বড়সড় দাঙ্গা বেধে গেছে। তাই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে সে। তৌসির রান্নাঘরে এসে দাঁড়াতেই নাজহা রক্তচক্ষু নিয়ে তার দিকে তাকায়। দাঁত চেপে, হিসহিস করা গলায় সে এমন একটা কথা বলে বসে যা শুনে উপস্থিত সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। ও বলে ওঠে
“আমাকে বিয়ে না করে এই ব্যাশা মাগিটাকে করলেন না কেন? যে মাইনষের জামাই নিয়ে টানাটানি করে!”
এত বড় এবং জঘন্য একটা গালি শুনে রান্নাঘরে থাকা সবাই জমে বরফ হয়ে যায়। নাজহার মতো শান্ত আর ভদ্র একটা মেয়ের মুখে এমন ভাষা! হতবাক হয়ে সবাই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকেন। তৌসির দ্রুত পা চালিয়ে নাজহার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য ফিসফিস করে বলে, “কী হইছে? এসব কইতাছো ক্যান?”
তৌসিরের দিকে এক নজর তাকিয়ে নাজহা এবার মায়ার দিকে নিজের জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে, “কি হবে? যেদিন থেকে এই বাড়িতে এসেছে, সেদিন থেকে আপনার সাথে খালি এক চিপকাচিপকি! আমি বউ হয়েও এত চিপকাচিপকি করি না, ও যতটা করে! ওর যখন এতই উত্তেজনা, তাইলে ওরেই হাঙ্গা করতেন! আমায় করলেন কেন? আমার জামাইয়ের চিন্তা আমি করুম, ও কেন এত বাড়াবাড়ি করে? দুই টানে ওরে ফারতে আমার একটুও সময় লাগব না বলে দিলাম!”
এত অপমান হজম করতে না পেরে মায়াও রাগে তড়তড়িয়ে ওঠে, “তোর মতো বেয়াদব না আমি! আমি তো শুধু একটু যত্ন নিচ্ছিলাম। আর তুই তো তৌসির ভাইর সুখ-দুঃখ বুঝস না!”
মায়ার মুখে এই কথা শোনার পর নাজহার ভেতরের বারুদ চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেয়। সে একেবারে ফেটে পড়ে চিৎকার করে ওঠে, “হ্যাঁ! আমি তো বুঝি না! তাইলে আয়, তুই হাঙ্গা ব আমার জামাইর কাছে! আমি চলে যাই, তুই সংসার কর! আয় হাঙ্গা ব তুই! ব্যাস**সা, ছিনাল কোথাকার! নির্লজ্জ, বেহায়া, নটি কোথাকার! আমার জামাইর আশপাশে যদি আর দেখছি, তাইলে তোরে সাউয়া ফারমু আমি! এতদিন ধরে খালি ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলিনি, নয়তো তোর ফাইড়া শুকাইয়া দিতাম! জানোয়ারনি কোথাকার!”
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪২
পুরো রান্নাঘর নিস্তব্ধ। তৌসির স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নাজহার মুখের এই অগ্নুৎপাত আর ভাষা দেখে তার নিজের মুখ দিয়ে টুঁ শব্দটিও বের হচ্ছে না। সে কিছুই বলছে না, শুধু মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে। আজ ওর কালনাগিনী চ্যাতছে, এবং চ্যাতার মতোই চ্যাতছে!

Najha dekhi towsir ar female Version hoiya gelo
Next part plz apu
onk shundor hoyse apu