Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৯

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৯

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৯
সানজিদা আক্তার মুন্নী

চারপাশে পবিত্র ঈদের উৎসবমুখর রেশ। দুপুরের প্রখর রোদের তেজ কিছুটা কমে এলেও শিকদার বাড়ির অন্দরমহলে উত্তেজনা এখন চুড়ান্তে। দীর্ঘ এক মাসের লম্বা সফর শেষে তৌসির আজই ইন্ডিয়া থেকে ফিরেছে। ভাইদের সাথে একান্ত কিছু সময় কাটানো আর বেশ কিছু ব্যবসায়িক ঝামেলার চক্করে ওরা ওখানেই আটকে পড়েছিল। তিন ভাই মিলে পুরো গুজরাট, মুম্বাই থেকে শুরু করে দিল্লির অলিগলি চষে বেড়িয়েছে। নিজেদের জীবনের অন্যতম সেরা আর বাঁধনহারা একটা অধ্যায় কাটিয়ে আজ তারা নিজ ঘরে ফিরছে।

এদিকে নাজহার মনের ভেতর চলছে আস্ত এক কালবৈশাখী ঝড়। বিবিজান নিজে গিয়ে রমজানের ঠিক আগের দিন ওকে বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছেন। বিয়ের পর প্রথম রমজান, মেয়ে কি আর বাপের বাড়ি পড়ে থাকলে মানায়? কিন্তু নাজহার ভেতরের অভিমানী সত্তাটা রীতিমতো ফুঁসছে। তৌসিরের ওপর এক পাহাড় সমান রাগ জমে আছে তার। যাওয়ার সময় সাত দিনের কথা বলে গিয়ে লোকটা অবলীলায় মাসের ওপর সময় কাটিয়ে দিল! বিগত দশ দিন ধরে ওর সাথে তৌসিরের ঠিকঠাক কোনো কথাই হয়নি। আর গত দু’দিন তো যোগাযোগ একেবারেই বিচ্ছিন্ন। অভিমানের পারদ চড়তে চড়তে এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নাজহা মনে মনে কঠিন এক প্রাচীর তুলে বসে আছে তৌসির এলেও সে নিজে থেকে একটা কথাও বলবে না, লোকটার অস্তিত্বই সে এড়িয়ে চলবে। যোহরের ঠিক পরপরই তৌসিরদের গাড়ি এসে বাড়ির পোর্টিকে থামে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত কিন্তু চোখেমুখে এক প্রশান্তি নিয়ে তৌসিররা বাড়ির ভেতরে পা রাখতেই নিমিষে পুরো বাড়িটা এক আনন্দঘন হইহট্টগোলে ফেটে পড়ে। তৌসিরকে ড্রয়িংরুমে দেখামাত্রই বাড়ির ছোট দলের সবাই ছোঁ মেরে ঘিরে ধরে ওকে। সবার একটাই দাবি সালামি। সফরের ক্লান্তিতে তৌসিরের চুলগুলো উস্কোখুস্কো অবস্থা সে স্বভাবসুলভ গম্ভীর মুখে পকেট থেকে মাত্র একটা দশ টাকার নোট বের করে ওদের দিকে বাড়িয়ে দেয়। নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে, পঁচিশ-পঞ্চাশ পয়সা করে সবাই নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। অথচ মজার ব্যাপার হলো, ছোটরা এই সামান্য দশ টাকার নোটটাকেই অতি আদরে লুফে নেয়। বছরে এই একটা দিনই তাদের রাশভারী তৌসির ভাই নিজ হাতে ওদের টাকা দেয়, তাই এই নামমাত্র সালামিটাই ওদের কাছে এক অমূল্য স্মারক।

এমনকি এই হট্টগোলের মাঝে নাযেম চাচা আর মিনহাজ মামাও মজা করে তৌসিরের কাছে সালামির দাবি করে বসেন। তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন, তৌসির কানাকড়িও দেবে না, তবু এই খুনসুটিটুকু তাদের ঈদের এক অলিখিত নিয়ম। তৌসির পকেট থেকে দুটো চকচকে এক টাকার কয়েন বের করে দুজনের হাতে ধরিয়ে দেয়। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলে, “নে, লজ্জা তো নাই! ভাতিজার কাছে সালামি চাস? যা, দিলাম!”
চারপাশের এই কোলাহলের মাঝেই বিবিজান ধীর পায়ে তৌসিরের দিকে এগিয়ে আসেন। ওর কাঁধে আলতো করে হাত রেখে একরাশ স্নেহমাখা কণ্ঠে বলেন, “যা, আগে গোসল-টোসল সেরে আয়। অনেক কথা বাকি আছে।”
তৌসির একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বুকের ভেতর জমে থাকা একটা চাপা শূন্যতা এই দীর্ঘশ্বাসের সাথে বেরিয়ে আসে। পরিশ্রান্ত স্বরে ও বলে, “হ্যাঁ, আমারও অনেক কাম বাকি। কিন্তু আমার বউ কই?”
বিবিজান ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলেন, “তুই ঘরে যা, আমি পাঠাচ্ছি ওকে।”
“আচ্ছা।”

বলে তৌসির নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। সে চোখের আড়াল হতেই বিবিজানের মুখের সেই হাসিখুশি রূপটা নিমিষে উধাও হয়ে যায়। তৌসিরের যাওয়ার পথের দিকে এক তীক্ষ্ণ, বিষাক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন তিনি। চোখের তারায় ফুটে ওঠে এক ভয়ংকর শীতল আক্রোশ মনে মনে দাঁতে দাঁত চেপে আওড়ান, “তোর শেষ ঠিকানা এই শিকদার বাড়িতেই তোকে এটা আবারো মনে করাতে হবে, জানোয়ারের বাচ্চা!”
ক্ষণিকের সেই হিংস্র রূপটা সযতনে একটা অদৃশ্য মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে ফেলে বিবিজান নিজেকে সামলে নেন। ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ান তিনি।

রান্নাঘরের ভেতরটা এখন অন্যরকম এক উষ্ণতায় ভরপুর। চুলার আঁচে নাজহার ফরসা মুখটা হালকা লালচে হয়ে আছে, সে একমনে রুটি সেঁকছে। আর তার চারপাশে ইকরা ও সিমরানকে নিয়ে চলছে আড্ডার জমজমাট আসর। একটু আগেই সেখানে একপ্রস্থ মিঠা সিঠা নাটক হয়ে গেছে। নাজহা প্রায় জোরজুলুম করে ইকরার কাছ থেকে সালামি আদায় করেছে। ইকরা তো কিছুতেই টাকা হাতছাড়া করবে না, শেষমেশ সিমরান আর নাজহা মিলে ইকরার পায়ে পড়ে সালামি আদায় করে তবেই ছেড়েছে। তবে নাজহার হাতে টাকা আসতে না আসতেই সিমরান আবার নাজহার পা ছুঁয়ে সালাম করে সেই টাকার একটা বড় অংশ নিজের পকেটে পুরে নিয়েছে। এই দুই ননদের সাথে নাজহা এখন একদম নিজের আপন বোনের মতোই মিশে গেছে। সম্পর্কের সব জড়তা কেটে গেছে। এমনকি মায়ার সাথেও সম্পর্কের জমে থাকা বরফ গলেছে তার। নিজের অতীত আচরণের জন্য নাজহা নিজ থেকেই মায়ার কাছে ‘সরি’ বলেছে। কারণ নাজহা খুব ভালো করেই বোঝে, মন থেকে একবার কাউকে ভালোবেসে ফেললে তাকে মুছে ফেলাটা অতটাও সহজ হয় না, মনের গভীরে কোথাও না কোথাও সে ঠিকই থেকে যায়।

এবার আসা যাক নাজহার সালামির বিশাল অঙ্কের হিসেবে। নিজের বাপ-চাচা আর বড় ভাইদের কাছ থেকে এবার সে প্রায় ছয় লক্ষ ষাট হাজার টাকার মতো এক অকল্পনীয় অঙ্কের সালামি পেয়েছে! এত টাকা কেন? এর পেছনের কারণটাও বেশ চমকপ্রদ। ওর চাচা, ফুফু আর প্রবাসী কাজিনরা যদি অল্প করেও পাঠায়, তবুও একেকজনের কাছ থেকে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার অনায়াসে চলে আসে। আর বাড়ির ভেতরের সদস্যরাই দেন তিন-চার হাজার করে। তালুকদাররা এমনিতে যথেষ্ট খানদানি আর বিত্তশালী পরিবার, তার ওপর তাদের বংশের জনসংখ্যা হয়তো চীনা জনগোষ্ঠীকেও হার মানায়! তাই এত বিশাল অঙ্কের টাকা ওঠাটা তাদের কাছে ডালভাত। শ্বশুরবাড়ি থেকেও সে প্রায় বিশ হাজারের মতো পেয়েছে। তবে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ নাজহা নিজের কাছে জমিয়ে রাখেনি। নিজের বাড়ির ভাগ্নে-ভাগ্নি, ভাই-বোনদের দুহাত ভরে বিলিয়েছে সে। এত বিলিয়েও চার লক্ষ টাকা অবশিষ্ট ছিল তার কাছে। সেখান থেকে পুরো এক লক্ষ টাকার কড়কড়ে নোট সে শ্বশুরবাড়ির দেবর, ননদ আর ভাইপোদের মাঝে অবলীলায় ভাগ করে দিয়েছে। বড় ভাবি বলে কথা, হাত তো একটু বড় করতেই হয়! যদিও তৌসির যদি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারে যে তার বউ এক লাখ টাকা শুধু সালামি হিসেবেই বিলিয়ে দিয়েছে, তবে নির্ঘাত ওর হার্ট ফেইল হওয়ার উপক্রম হবে!

সব মিলিয়ে নাজহার কাছে এখন তিন লক্ষ ষাট হাজার টাকা পড়ে আছে। এতগুলো টাকা নিয়ে সে ঠিক কী করবে, তা ভেবে ভেবে সে নিজেই এখন কূলকিনারা পাচ্ছে না। ওর ভাবনার মাঝেই বিবিজান এসে তাগাদা দেন, “নাজহা, ঘরে যা। অনেক তো গল্প মারসলি, তৌসির তোর জন্য অপেক্ষা করতাছে।”
কথাটা কানে আসামাত্র নাজহার বুকের ভেতরটা এক লহমায় ছ্যাঁত করে ওঠে। এতদিন ধরে সযত্নে জমিয়ে রাখা একরাশ গাঢ় অভিমান বিদ্যুৎবেগে শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গিয়ে সারা শরীরকে কেমন অবশ করে দেয়। কোনোমতে মাথা নেড়ে অত্যন্ত ধীর পায়ে, অনেকটা যন্ত্রচালিতের মতো সে নিজের ঘরের দিকে এগোয়।
গায়ে জড়ানো ভারী পোশাকটায় আজ বড্ড দমবন্ধ করা গরম লাগছে তার। তাকে বিবিজানের বেশ দামি আর ভারী কাজের একটা থ্রি পিস দিয়েছেন ঈদ উপলক্ষে ইকরা একটা দিয়েছে, তৌসিরের বাবাও দিয়েছেন একটা। বাবার বাড়ি থেকেও শিকদার বাড়ির সবার জন্যই বিদেশ থেকে আনা প্রচুর কাপড় এসেছে। আর নাজহার জন্য তো দুটো লাগেজ ভর্তি অগুনতি উপহার এসেছে। নিজের পরিবারের চোখে সে সবসময়ই আদরের রাজকন্যা এই বিপুল প্রাচুর্য আর ভালোবাসা তার জন্য সবসময়ই বরাদ্দ।

পায়ে পায়ে ঘরের দরজার সামনে এসে থমকে দাঁড়ায় নাজহা। বুকের ভেতরটা এমন অবাধ্যের মতো দুরুদুরু করছে কেন? কীসের এত স্পন্দন? সে নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। কাঠের ভারী পাল্লাটা ঠেলে যে ভেতরে ঢুকবে, সেই সামান্য সাহসটুকুও যেন আজ সে সঞ্চয় করতে পারছে না, হাত দুটো অকারণেই থরথর করে কাঁপছে।
অবশেষে ধুকপুক বুকে দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই তার দৃষ্টি স্থির হয়ে যায়। ঘরের ঠিক মাঝখানে, চেনা ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে তৌসির! দীর্ঘদিন পর নিজের ‘সবুজ বাঘিনী’কে এভাবে অপ্রত্যাশিত সাজে সামনে দেখে তৌসিরের বুকের খাঁচা থেকে জানপাখিটা ফুরুৎ করে উড়ে যায়। মনের গহিনে একঝাঁক রঙিন প্রজাপতি আর ঘাসফড়িং একসাথে ডানা মেলতে শুরু করেছে ওর। নাজহার পরনে আজ একটা নিরেট কালো জর্জেটের থ্রিপিস। এই মেয়েটা যে কেন এত কালো রঙের পোশাক পরে! কালোর আবরণে ঘেরা তার এই রূপ তৌসিরের জন্য বেশ যন্ত্রণার। সে মুগ্ধ। সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে আপাদমস্তক দেখে নেয় নাজহাকে, তারপর দু-কদম এগিয়ে আসে নাজহার দিকে। ঠোঁটের কোণে চিরচেনা বাঁকা হাসিটা ঝুলিয়ে, খানিকটা রসিকতার সুরেই সালাম দেয়, “আসসালামু আলাইকুম মহারাণী! কেমন আছেন?”

নাজহা সরাসরি তৌসিরের চোখের দিকে তাকায় না। দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ রেখে, নির্বিকার আর শীতল কণ্ঠে উত্তর দেয়, “ওয়ালাইকুমুস সালাম। আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।”
এরপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সে চোখ তুলে তৌসিরের দিকে তাকায়। তার চোখের এই শান্ত দৃষ্টির আড়ালে যে কী পরিমাণ তোলপাড় চলছে, তা যাতে তৌসির কোনোভাবেই টের না পায় তাই তাকায় তাকিয়ে যান্ত্রিক গলায় সে জিজ্ঞেস করে, “বিবিজান বললেন আপনি ডেকেছেন। আমি কাজে ছিলাম, আপনার কি কোনো প্রয়োজন?”
তৌসিরের ঠোঁটের ফিকে হাসিটা এবার মিলিয়ে যায় এ কথা শুনে। সে নাজহার অভিমানী রূপটা খুব ভালো করেই চেনে। আরেকটু এগিয়ে সে একেবারে নাজহার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। সরাসরি ওর চোখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “নাটক করিস না! রেগে আছিস, রাগ ঝাড়। ইন্ডিয়াতে তো আর হাঙ্গা করতে যাই নাই, কাজে গেছিলাম আর আটকে পড়ছিলাম।”

নাজহা তৌসিরের এই কথায় বিন্দুমাত্র রাগ বা উত্তেজনা দেখায় না। বরং শান্ত, অবিচলিত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কণ্ঠস্বর আগের মতোই রেখে বলে, “আসার পরই শুরু করে দিলেন?”
তৌসির এবার আর দূরত্ব রাখে না। দু-হাত বাড়িয়ে নাজহার গাল দুটো আলতো করে ছুঁয়ে দেয়। স্পর্শের সেই পরিচিত উষ্ণতায় নাজহার ভেতরটা কেঁপে উঠলেও সে বাইরে নিজেকে শক্ত রাখে। তৌসির আক্ষেপের সুরে বলে, “আমি কী শুরু করলাম? না, আমি তো করি নাই কিছু! আমি তো রোমান্সের একটা দারুণ মুডে ছিলাম, কিন্তু তুই তো এমন সাউয়ার সাউয়ার কথাবার্তা বলে আমার পুরো মুডটাই খেয়ে দিলি! তুই বলিস কেন যে কোনো প্রয়োজন আছে কি না? আমার প্রয়োজন হবে মানে? এতদিন পর ফিরে আসছি, তোকে আমার দেখার ইচ্ছে হতে পারে না?”
নাজহা তৌসিরের হাত দুটো নিজের গাল থেকে সরাতে সরাতে নির্লিপ্ত গলায় বলে, “সরুন। আমার এসব ফালতু আদিখ্যেতার কোনো প্রয়োজন নেই। দেখা তো হয়েছে, এবার ছাড়ুন। আমার কাজ আছে।”
তৌসির নাছোড়বান্দা, জেদি গলায় বলে ওঠে, “না, দেখা শেষ হয়নি।”
“তাহলে দেখুন। দেখে শেষ করুন, আমার ভালো লাগছে না।”

কথাটা একপ্রকার ছুড়ে দিয়েই নাজহা তৌসিরের কাছ থেকে নিজেকে সজোরে ছাড়িয়ে নেয়। আর বিন্দুমাত্র অপেক্ষা না করে, কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বাতাসে শুধু রেখে যায় তার শাড়ির খসখস শব্দ আর চেনা সুবাস।
তৌসির হতভম্ব হয়ে খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। কী হলো এটা? নাজহা রাগবে, অভিমান করবেসেটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এ কেমন রাগ? এমন প্রত্যাখ্যান তো সে আশা করেনি! ও কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গোসলের জন্য গামছাটা হাতে তুলে নেয়। ঠোঁটের কোণে এবার একটা মৃদু হাসি ফুটে ওঠে তার। মনে মনে ভাবে এই মেয়ে এখন কাজের বাহানা দেখিয়ে পালাচ্ছে বটে, কিন্তু রাতে তো ঠিকই ধরা পড়বে হাতের মুঠোয়। তখন দেখবে কোথায় পালায়!

অন্যদিকে, দ্রুতপায়ে হেঁটে যাওয়া নাজহার এই আকস্মিক পলায়নের কারণ সে নিজেই খুব ভালো করে জানে। সে বুঝতে পেরেছিল, আর কিছুক্ষণ ওই ঘরে, তৌসির এর সামনে দাঁড়ালেই তার ভেতরের বরফ গলতে শুরু করত। তৌসির তার জমানো সব রাগ পানি করে দিত মুহূর্তেই। ছলে-বলে, নিজের সেই চেনা মায়ায় ঠিক ভুলিয়ে নিত সমস্ত অভিমান। কিন্তু নাজহা এখন কিছুতেই গলতে চায় না, নিজের অভিমানটাকে সে আরও কিছুক্ষণ লালন করতে চায়। তাই নিজেকে, নিজের দুর্বলতাকে বাঁচাতে এই পলায়ন ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না।
রাত ন’টার বিষণ্ণ প্রহর। শিকদার কুঠিরের এই স্যাঁতস্যাঁতে, দমবন্ধ করা একটা গোপন ঘরে জীনের ছাৃৃৃ্য়াগুলো মনে হচ্ছে প্রদীপের আলোয় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কালোজাদুর হরেক রকমের উপাচার শুকনো হাড়গোড়, সিঁদুরে মাখানো মাটির পুতুল, ধূপের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন তামার পাত্র আর অদ্ভুত সব নকশা আঁকা পুরনো পার্চমেন্ট। বাতাসে ভাসছে কর্পূর, আগর আর পুরনো রক্তের এক বমি-আনা মিশ্র গন্ধ। সেই ঘরের ঠিক মাঝখানে, টিমটিমে আলো-আঁধারিতে বিবিজানের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে তৌসির। তার দু’চোখে রাজ্যের ক্লান্তি আর করুণ আকুতি। বিবিজানের প্রাণহীন দুই হাত নিজের কম্পিত মুঠোর ভেতর শক্ত করে চেপে ধরে সে। গলার স্বর আটকে আসে তার, তবু মরিয়া হয়ে বলে ওঠে, “ব… ব… বিবিজান! তুমি এমন ক্যান করতাছো? দিয়া দাও না দলিলটা! আমি কথা দিতাছি তোমারে, যা বলবা তাই করমু। মামির কাছ থাইকা তো দলিলটা তোমার কাছেই রাখা ছিল, তাই না?”

আজ বিকেলবেলা বৃদ্ধাশ্রমে থাকা মামির কাছ থেকেই সে জেনে এসেছে এই সর্বনাশীর কথা। তামিল ভাষায় লেখা সেই মহামূল্যবান দলিলটিকে নিছকই অপ্রয়োজনীয় কাগজ ভেবে মামি নিজের অজান্তেই তুলে দিয়েছিলেন এই বিবিজানের হাতে। গত আধঘণ্টা ধরে তৌসির একটানা মিনতি করে যাচ্ছে, কিন্তু বিবিজানের মুখে কোনো কথা নেই। অবশেষে কুঠিরের এই নৈঃশব্দ্য ভাঙে। তৌসিরের চোখের দিকে স্থির, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিবিজান উচ্চারণ করেন, “দিব। তবে শর্ত আছে।”
তৌসিরের উৎকণ্ঠিত, শুষ্ক কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে, “কী শর্ত?”
বিবিজানের কণ্ঠস্বর এবার আরও ধীর গলায় বলেন, “সারাজীবন তোকে তৌসির শিকদার হয়েই বাঁচতে হবে। আমি মরে গেলে এই শিকদার সাম্রাজ্যের সমস্ত দায়দায়িত্ব তোর একার কাঁধে তুলে নিতে হবে, একেবারে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। শুধু আমার এই জীন সাধনার ভার বাদে। পারবি নিতে এই জোয়াল?”
কথাগুলো শুনে যেন বাজ পড়ে তৌসিরের মাথায়। স্তব্ধ হয়ে যায় সে। এত বড় এক অন্ধকার সাম্রাজ্য, এতসব পাপ আর রক্তমাখা দায়ভার কী করে সামলাবে সে একা? তৌসিরকে নিশ্চুপ দেখে হঠাৎ খাদের মতো গভীর গলায় হো হো করে হেসে ওঠেন বিবিজান। তাচ্ছিল্যের সুরে বলেন, “জানতাম, পারবি না! তোর ধাতে সইবে না। তাই দলিলের চিন্তাও চিরতরে বাদ দে।”

কিন্তু তৌসির ছটফটিয়ে ওঠে। অথৈ জলে খড়কুটো আঁকড়ে ধরা মানুষের মতো মরিয়া হয়ে বলে, “আমি পারব! তুমি যা বলবা, যেমনে বলবা সব পারব। শুধু কও, তুমি দলিলখানা দিবা?”
তৌসিরের এই সর্বস্বান্ত রূপ দেখে বিবিজানের কুঁচকানো ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক পৈশাচিক, রহস্যময় হাসি। তিনি তৌসিরের দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরে তাকে এক ঝটকায় টেনে দাঁড় করান। হিসহিস করে বলেন, “তুই যদি নিজের ভাইদের থেকে সব হিসেব চিরতরে চুকিয়ে দিয়ে এখানে আজীবনের জন্য থেকে যাস, তবেই আমি তোকে দলিলটা দিয়ে দিব। আমার সোজা কথা তুই আমার নাতি হয়ে ঠিক যেভাবে আছিস, ওভাবেই থাকবি। এই শিকদারি সব সামলাবি। তালুকদারের ঝিয়ের লগে সংসার করবি, তিন-চারটে সন্তান নিবি। পোলা হলে একেবারে এই তৌসির শিকদারের মতোই গড়বি তাকে। হবে? রাজি আছিস?”
তৌসির বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে, কোনো অদৃশ্য সুতোর টানে যন্ত্রের মতো স্বরে বলে, “রাজি।”
বিবিজান চোখের ইশারায় কিছু একটা বোঝাতেই তৌসির নিজের ডান হাত বাড়িয়ে দেয়। কোথা থেকে একটা ধারালো রুপোলি ছোরা বের করে তৌসিরের হাতের তালু সামান্য চিরে দেন বিবিজান। ফিনকি দিয়ে ওঠা দু’ফোঁটা তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ে। রক্তমাখা আঙুলটা চেটে নিয়ে বিবিজান সতর্ক করার সুরে বলেন, “মনে থাকে যেন। নয়তো।

বিবিজান বাক্য শেষ করার আগেই তৌসিরের শূন্য, প্রাণহীন দৃষ্টি দেয়ালের দিকে নিবদ্ধ হয়। মোহগ্রস্তের মতো সে বলে ওঠে, “নয়তো আমার ধ্বংস নিশ্চিত।”
এ কথা শুনে পরম তৃপ্তিতে হাসেন বিবিজান। তৌসিরের কাঁধে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন, “এ জন্যই তো তোকে আমি এত ভরসা করি! আমি চাইলে এসব আমার অন্য পোলাদেরও দিতে পারতাম। কিন্তু আমি জানি, তুই-ই সবচেয়ে যোগ্য। এই শিকদার সাম্রাজ্যের পুরো ঠিকানা আমার পর তুই একাই সামলাতে পারবি। যা, এবার বাড়ি যা। বউয়ের লগে সময় কাটা। মাসখানেক তুই ছিলি না, মাইয়াটা শুধু ছটফট করতাছিল।”

একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে আসে তৌসিরের। ঠোঁটে এক ফিকে, করুণ হাসির রেখা টেনে ঘর থেকে পা বাড়ায় সে। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, নিজের হাতে আজ সে নিজেরই মৃত্যুপরোয়ানায় সই করে দিয়ে এল। শরীরটা তার বেঁচে রইল ঠিকই, কিন্তু আত্মাটা আজীবনের জন্য নিলাম হয়ে গেল এই অন্ধকারের কাছে। অনুভূতিহীন এক জড়পদার্থের মতো, এক জ্যান্ত লাশ হয়ে সে পা টেনে টেনে সামনের দিকে এগোতে থাকে। বিবিজানের কাছ থেকে জোর করে আনা অসম্ভব যেকোনো কিছু। কারণ উনি মানুষ নয় উনি একজন রাক্ষস বটে। তৌসির দরজার ওপাশে অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেই প্রকোষ্ঠের উন্মাদিনীর মতো অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন বিবিজান। শুধু তিনি একা নন, চারপাশের গা ছমছমে অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য জীনরা তাদের মালকিনের সাথে গলা মিলিয়ে বিকট, অমানবিক শব্দে খেঁকিয়ে হেসে ওঠে। এই অশুভ হাসির শব্দে কেঁপে কেঁপে ওঠে পুরো শিকদার কুঠির।

রাত দশটা। শহরের কোলাহল ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসছে, কিন্তু তৌসিরের ভেতরের ঝড়টা সবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ব্যালকনির আধো-অন্ধকারে সোফায় এলিয়ে আছে সে। সামনের কাঁচের টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিয়ারের বোতলগুলো রাতের আবছা আলোয় কেমন বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেটের জ্বলন্ত লাল বিন্দুটা থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে মিশে যাচ্ছে রাতের বাতাসে। নির্ঘুম রাতের ক্লান্তিতে তার চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল হয়ে আছে। জীবন তার সাথে এই মুহূর্তে যে নির্মম পাশাখেলা খেলছে, তা সে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না। এতদিন তার জীবন চলছিল এক নিজস্ব ছন্দে, আর এখন হঠাৎ করেই সে আটকা পড়েছে এক অচেনা গোলকধাঁধায়। এক পাপের সাম্রাজ্যের অনামা শিকল এখন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে তাকে। নিজের প্রিয় জন্মভূমিতে ফেরার পথটা চিরতরে রুদ্ধ হয়ে গেছে। বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে ডুকরে কেঁদে উঠতে চাইছে তৌসির, চিৎকার করে আকাশ-বাতাস চিরে নিজের অসহায়ত্ব জানান দিতে চাইছে, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোচ্ছে না। সবকিছুর মূলে ওই একটা দলিল! সেই মহামূল্যবান দলিলটা বড্ড জরুরি ওটা নেই তো তাদের অস্তিত্বই শূন্য। তাই তো বাধ্য হয়ে, নিয়তির কাছে হার মেনে সব মেনে নিয়েছে সে। এছাড়া আর কী-ই বা করার আছে তার?

ঘোরলাগা দৃষ্টিতে তৌসির নতুন একটা বিয়ারের বোতলের দিকে হাত বাড়াতেই হঠাৎ একঝলক শীতল হাওয়ার মতো ব্যালকনিতে উপস্থিত হয় নাজহা। ছোঁ মেরে তৌসিরের হাত থেকে বোতলটা নিজের হাতে তুলে নেয় সে। তৌসিরের ঠিক পাশেই সোফায় ধপ করে বসে পড়ে। বোতলের ছিপি খুলতে খুলতে ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে খিলখিল করে বলে ওঠে, “আপনি একা খাচ্ছেন কেন? দিন, আমিও খাই! আপনাকে চিয়ার্স করি। আপনি বরং আরেকটা নিন।”
কথাগুলো বলেই নাজহা যখন সত্যি সত্যিই বোতলটা নিজের ঠোঁটে ছোঁয়াতে যাবে, তৌসির থাবা দিয়ে তার হাত থেকে সেটা কেড়ে নেয়। একটা রুক্ষ, রাগান্বিত গর্জনে ফেটে পড়ে বলে, “এই মাদাচোদের নাতিন! মরবি নাকি? বাপের বংশে কখনো খেয়েছিস এই জিনিস? এখন আসছিস পণ্ডিতি করতে!”

গালমন্দ শুনেও নাজহা বিন্দুমাত্র রাগে না। বরং একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সে। খুব শান্ত, গভীর চোখে তৌসিরের বিপর্যস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে বলে, “খাইনি, তাই তো টেস্ট করে দেখতে চাইছিলাম। তা আপনি এমন বাংলা সিনেমার নায়কদের মতো কাহিনি করছেন কেন? কী হয়েছে আপনার? এত গিলছেন কেন?”
তৌসির কিছুটা অবাক হয়। তাকে এমন করতে দেখার পরও নাজহা যে এমন স্বাভাবিক আছে, তা তাকে ক্ষণিকের জন্য ভাবায়। হাতের সিগারেটে কষে আরেকটা টান দিয়ে একরাশ ধোঁয়া শূন্যে ছেড়ে দেয় সে। তারপর উদাস গলায় বলে, “তুই বুঝবি না এসব। আর আমি বেশি গিলি নাই, এই তো মাত্র এক-আধ বোতল গিলছি।”
কথাটা শুনে ব্যালকনিতে মুহূর্তের জন্য এক ভারী নৈঃশব্দ্য নেমে আসে। নাজহা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে থাকে। নিস্তব্ধতা ভেঙে একসময় বড়ই মোলায়েম, অনুশোচনায় ভেজা স্বরে ডাক দেয় সে, “তৌসির আমি না, আপনাকে কিছু বলতে চাই।”

তৌসিরের ঠোঁটের কোণে একটা ফিকে, বেদনার্ত হাসি ফুটে ওঠে, “কী?”
নাজহা একটু নড়েচড়ে বসে। আজ সে পণ করেছে, সব সত্যি তৌসিরকে জানিয়ে দেবে। আর কোনো লুকোচুরি, কোনো মিথ্যা সে বইতে পারছে না। সত্যিটা বলার পর যা হওয়ার হবে। বুকের ভেতর সমস্ত সাহস সঞ্চয় করে তৌসিরের রক্তবর্ণ চোখের দিকে সরাসরি তাকায় সে। কাঁপা শক্ত স্বরে বলে ওঠে, “এটাই যে আমি আপনাকে আবারও ঠকিয়েছি। আমি আপনার সাথে তালহা ভাই…………..”
নাজহা কথাটা শেষ করতে পারে না। তার আগেই তৌসির হো হো করে হেসে ওঠে। সেই হাসির শব্দে মিশে থাকে বুকফাটা অবজ্ঞা, শূন্যতা আর তীব্র বিষাদ। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে ওঠে, “তুমি তালহারে বাঁচানোর জন্যই আমার লগে এমন নাটক চুদাইছো, তা আমি জানি। তোমার নোবেলপ্রাপ্ত গাদ্দার বাপ-চাচারা এসব করছে যাতে আমার ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু মেইন কথা কী জানস? তুই নাটক করতে করতে সত্যি সত্যি আমার লগে মিলায়া গেছত, যেটা তুই নিজেও জানস না!”
কথাগুলো যেন সজোরে চাবুক কষায় নাজহার সত্তায়। সে পাথর হয়ে যায়। কী বলবে, কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে কিছুই বুঝতে পারে না। তৌসির সব জানে? সব জেনেও সে তাকে এতদিন কিছুই করল না? স্তব্ধতা গ্রাস করে তাকে। বুকের ভেতরটা অপরাধবোধ আর এক অদ্ভুত হাহাকারে দুমড়ে-মুচড়ে ওঠে। কাঁপা কাঁপা গলায়, অস্ফুট স্বরে সে জিজ্ঞেস করে, “আপনি আপনি সব জেনেও কেন আমাকে কিছু বললেন না? আপনি কি আমাকে খুব ঘৃণা করেন, তৌসির?”

তৌসিরের হাতে থাকা সিগারেটের নীলচে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়ছে সেই ধোঁয়ার আস্তরণ ভেদ করে তৌসির একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে নাজহার দিকে। নাজহার ওই কালচে সবুজ, মারাত্মক মোহনীয় দুটি চোখের দিকে তৌসিরের দৃষ্টি কোনো এক অদম্য তৃষ্ণায় আটকে আছে। কিছুক্ষন নাজহার দিকে তাকিয়ে থেকে ও শুধোয়,
“তোরে ঘৃণা করার ক্ষমতা আমার নাই। তোর সব দোষ মাফ, কারণ একটাই তুই আমার বউ।”
কথাগুলো শুনে থমকে যায় নাজহা। অবিশ্বাস্য এক ঘোরে তার পা দুটো মেঝের সাথে আটকে যেতে চায়, সে তৌসিরের দিকে কিছুটা এগিয়ে আসে। তার শরীর থরথর করে কাঁপছে, হাতের আঙুলগুলো ভয়ে আর অনুশোচনায় জড়সড় হয়ে গেছে। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা আছড়ে পড়ছে পাঁজরের হাড়ের ওপর ধুকপুক, ধুকপুক করে! কত জঘন্যভাবেই না সে ঠকিয়েছে তৌসিরকে, কত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করেছে! আর সেই ভয়ংকর মানুষটাই কি না এত সহজে তার সব অপরাধ ক্ষমা করে দিচ্ছে? নাজহা তৌসিরের চোখে চোখ রেখে কম্পিত গলায় জিজ্ঞেস করে,
“সত্যিই আপনি আমায় মাফ করবেন? সত্যি বলছেন?”

তৌসিরের চোখেমুখে এখন নির্লিপ্ততা। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, যা বুকের গভীরের কোনো চাপা আগুন থেকে বেরিয়ে আসে। দৃষ্টিটা নাজহার মুখ থেকে একচুলও না সরিয়ে সে বলে,
“তাছাড়া তো আর কিছু করার নাই আমার। তোকে শাস্তি দিতে গেলে তো আমি নিজেই মরে যাব। তার চেয়ে বরং তোর সব দোষ মাফ।”
এই নিরাসক্ত কথাগুলোর পর নাজহার আত্মনিয়ন্ত্রণের শেষ সুতোটুকুও ছিঁড়ে যায়। সে আর কোনো কথা বলতে পারে না। তীব্র এক অপরাধবোধ আর অজানা আবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে তৌসিরের বুকে, আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তার গলা। তৌসিরের চওড়া গ্রীবায় মুখ গুঁজে হু হু করে কেঁদে ওঠে সে। চোখের পানিতে ভিজিয়ে দেয় তৌসিরের শার্ট। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ভাঙা গলায় সে বলতে থাকে,

“আমাকে মাফ করে দিন, তৌসির! আমার মতো একজন গাদ্দারকে হয়তো মাফ করা উচিত নয়, কিন্তু আমি সত্যিই আপনার সাথে থাকতে চাই। আগে সবসময় চাইতাম তালহা ভাইয়ের সাথে থাকতে, কিন্তু এখন আপনার সাথেই থাকতে চাই। তার মানে এই নয় যে আমি উনাকে ভালোবাসি না। আমি তালহা ভাইকে ভালোবাসি, এখনও বাসি, প্রচণ্ড ভালোবাসি। কিন্তু আমি শুধু চাই উনি নিজের মতো ভালো থাকুক। আর আমি আমি চাই আপনার সাথে একটা সাধারণ সংসার গড়তে। আমি এখানেই থেকে যেতে চাই। আমি জানি, এসব জানার পর আপনি আমাকে তালাক দিয়ে দেবেন, তারপরও বলছি আমি সত্যিই আপনার সাথে থাকতে চাই। আপনি আপনি আমার আসক্তি হয়ে গেছেন!”

কথাগুলো বলতে বলতেই নাজহা কান্নায় ভেঙে পড়ে, তার কাঁধ দুটো কান্নার তোড়ে ওঠা-নামা করতে থাকে। তৌসির কোনো তাড়াহুড়ো করে না। হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা ছাইদানিতে গুঁজে রেখে সে নাজহার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। তার আঙুলগুলো নাজহার চুলের ভাঁজে ভাঁজে খেলা করে। সে অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলে,
“কে বলল তোকে যে আমি তালাক দেব? আমি কি তোকে বলেছি এমন কিছু?”
কথাটা শুনে নাজহা আরেক দফা ধাক্কা খায়। কান্নায় ভেজা চোখ জোড়া তুলে সে তৌসিরের বুক থেকে নিজেকে সামান্য সরিয়ে নেয়। বিস্ময় আর অবিশ্বাসে ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তৌসিরের অবিচলিত মুখের দিকে। অবিশ্বাস্য স্বরে সে বলে,
“এসব জানার পরও আপনি আমায় নিজের সাথে রাখবেন? যদি যদি আমি আবারও আপনার বিশ্বাস নষ্ট করি?”
তৌসির মৃদু হাসে। সেই হাসিতে কোনো রাগ নেই, বরং আছে প্রশ্রয়। সে নিজের দুই হাত বাড়িয়ে সযত্নে নাজহার গালের উপর গড়িয়ে পড়া নোনা পানিটুকু মুছে দিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে,
“করলে করবি। বললাম না, তুই আমার বউ, আর তোর জন্য সব দোষ মাফ।”
নাজহা শুধুই স্তব্ধ হয়ে তৌসিরের দিকে তাকিয়ে থাকে। মানুষটা বড্ড অদ্ভুত, বড্ড রহস্যময়! এত বড় পাপ করার পরও সে কী ভীষণ শান্ত আচরণ করছে! এই প্রশান্তির আড়ালে কি কোনো ভয়ংকর ঝড় লুকিয়ে আছে? আচ্ছা, তৌসির কি সত্যিই ওকে মন থেকে মাফ করল, নাকি এর আড়ালে অন্য কোনো নির্মম শাস্তি অপেক্ষা করছে ওর জন্য? এমন হাজারো প্রশ্ন যখন নাজহার মাথায় পাগলের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে, ঠিক তখনই তৌসির একদম তার মুখের কাছে এগিয়ে আসে। দুজনের নিঃশ্বাস প্রায় এক হয়ে মিশে যায়। তৌসির খুব নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলে,

“এসব জেনেও কেন কিছু করলাম না, জানিস?”
ভয়ে নাজহার রক্ত হিম হয়ে আসে। ও আটকে যাওয়া গলায়, কাঁপতে কাঁপতে বলে,
“কে ক কেন?”
তৌসিরের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে রহস্যময় হাসি। সে নাজহার আরও কাছে এসে বলে,
“কারণ এবার তুই আমার সাথে বেইমানি করিসনি। তুই তালহাকে বিপদে ফেলেছিস ঠিকই, কিন্তু তাও আমার কোনো খবর ওদের দিসনি। তুই আমার কোনো ক্ষতি করিসনি। তার মানে হলো তুই সত্যিই আমার সাথে থাকতে চাস।”
নাজহাও।মাথা ঝাঁকায়,, “হ্যাঁ, সত্যি চাই।”

কথাটা শুনে তৌসিরের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক চিলতে হাসি। সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করে না, নিজের উষ্ণ ঠোঁট জোড়া অতি আবেশে ডুবিয়ে দেয় নাজহার নরম ঠোঁটে। নাজহাও এই ক্ষণটির জন্যই অধীর হয়ে ছিল, সেও নিজেকে ভাসিয়ে দেয় তৌসিরের আবেগের স্রোতে। দুজনের ঠোঁটের এই মেলবন্ধনে মনে হচ্ছে তাদের কাছে তাদের পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেমে গেছে। তৌসিরের পাগলপারা আবেগ কিছুটা শান্ত করতে নাজহা তার কোমল আঙুলগুলো গলিয়ে দেয় তৌসিরের মাথার পেছনের চুলে, আলতো করে বিলি কাটতে থাকে। তৌসির ওর বলিষ্ঠ দুই হাতে নাজহার সরু কোমর আষ্টেপৃষ্ঠে নিজের কাছে টেনে নেয়। কিছুক্ষণ পর তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে ওকে ছেড়ে দেয়, তারপর আচমকাই নাজহাকে শূন্যে ভাসিয়ে নিজের কোলে তুলে নেয়। ঘোর লাগা মাদকতাময় কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে, “ঘরে চল।”

হঠাৎ এই শূন্যে ভাসার অনুভূতিতে নাজহা খিলখিল করে হেসে ওঠে, শক্ত করে খামচে ধরে তৌসিরের শার্টের কলার। ওর এই ঝর্ণাধারার মতো রিনরিনে হাসি দেখে তৌসিরের বুকেও প্রেমের বান ডাকে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, “এমনি করেই হাসবি একদম কাঁদবি না।”
দীর্ঘ এক প্রহর পেরিয়ে যায়।
এখন নাজহার কান্নার চোটে তৌসিরের দিশেহারা দশা! ওর এমন আকুল হয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে যে তৌসির কোনোভাবেই তাকে শান্ত করতে পারছে না বউকে আদর করতে গিয়ে নিজেই বাদর হয়ে যাইতেছে। তৌসির বারবার আদরে ওর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা পানি মুছে দিচ্ছে বুকের মাঝে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে অনুনয় করে বলছে, “আর কাঁদিস না আমার কৈতরি, একটুখানি ধৈর্য ধর।”
কিন্তু নাজহা শুনেই না এসব। ঠিক এমন বিহ্বল মুহূর্তেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয় ওপাশ থেকে ভেসে আসে তৌসিরের মেঝো চাচির চিন্তিত কণ্ঠস্বর, “কী হইছে বড় আব্বা? নাজহা অমন করে ডুকরে কাঁদছে ক্যান? জিনে-টিনে ধরলো নাকি!”

সচরাচর নাজহাকে এমন শব্দ করে কাঁদতে কেউ শোনেনি। আর এখন সে যেভাবে সুর করে কাঁদছে, শুনলে মনে হবে কেউ বোধহয় তাকে বেদম পেঠাচ্ছে। বাড়িতে যেহেতু জিনের উপদ্রব আছে, তাই মেঝো চাচির ধারণা, নাজহার ওপর হয়তো কোনো অশরীরী আছর করেছে।
চাচির কথা কানে যেতেই নাজহা তড়িঘড়ি করে নিজের কান্নার শব্দ গিলে ফেলে, শক্ত করে দুই হাতে মুখ চেপে ধরে। তৌসির পড়ে যায় মহাবিপাকে! এখন সে কী জবাব দেবে ভেবে পায় না। তবে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে গলা চড়িয়ে তৌসির বলে ওঠে, “চাচী আম্মা, ও স্বপ্নে দেখছে ওর বাপ-চাচা সব কয়টা মইরা গেছে! তাই ঘুমের ঘোরেই এমন কান্নাকাটি করতেছে।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৮

ওপাশ থেকে মেঝো চাচি আশ্বস্ত হয়ে বলেন, “ওহ! তাইলে একটু তেল পড়া লাগাইয়া দাও, আর দোয়া পড়ে ফুঁ দাও শরীরে।”
তৌসির তো হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, তড়িঘড়ি করে বলে, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, দিতাছি।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৫০

7 COMMENTS

Comments are closed.