হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৪১
তামান্না ইসলাম শিমলা
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে মাহিম আর তেহরাব, শক্ত কাঠ কাঠ মুখ নিয়ে সে গম্ভীর দুষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাহিমের দিকে।
মাহিমেরর অধরে মৃদু হাসি,
“নতুন কি নাটক করতে চাইছিস?”
তেহরাবের প্রশ্নে মাহিম দীর্ঘশ্বাস ফেলল, মৃদু হেসে জবাব দিল,
“নাটক না, পাপের ফল। আমি মন থেকে অনুশোচনায় দগ্ধ, আমি চাই তনয়ার কাছে মাফ চাইতে।”
তেহরাব চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস নিল, চোখ খুলে তাকাল মাহিমের দিকে,
“এ জনমে না, তনয়াকে তুই দেখতেও পারবি না, ক্ষমা তো অনেক দূরের বিষয়।”
মাহিম বোধহয় কিছু বলতে চাইল, তবে সেই সুযোগ না দিয়ে তেহরাব বেরিয়ে আসলো৷ বাইরে আসতেই পুলিশেরে সাথর ইউসুফকে কথা বলতে দেখে সেদিকে এগিয়ে আসলো। তেহরাবকে দেখ ইউসুফ কথা থামিয়ে কার দিকে তাকাল,
“তুই কখন আসলি?”
“অনেকক্ষণ, এসব কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না।”
ইউসুফ তেহরাবের কাঁধে হাত রাখে,
“চিন্তা করিস না, সব ঠিক ঠাক হবে এবার।”
তেহরাব কিছু বলল না, তার এখনো কেমন একটা লাগছে। মাহিম কি সত্যি অপরাধবোধ অনুভব করছে?
“তেহরাব খিদে পেয়েছে ভাই, চল খেতে যাব।”
ফাহিম দৌড়ে এসে তেহরাবের হাত ধরে টানতে টানতে বাইকের কাছে নিয়ে আসলো। তেহরাব পকেট থেকে ফোনটা বের করল, তনয়ার মিসড কল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইকে উঠে বসলো, ফাহিমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তুই একাই যা, আমি শশুড় বাড়ি যাব।”
ফাহিমকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তেহরাব ছুটল, এক অদ্ভুত অনুভুতি হচ্ছে তার। আনন্দও লাগছে সাথে কিছুটা দ্বিধাও!
“আপনি জানলেন কি করে তানহা আপনাকে ভালোবাসে?”
শিহাব খাবার মুখে দেয়, খাবারের দিকে তাকিয়েই বলে,
“ মামি বলেছে।”
তনয়া চমকায়, মামি মানে তার মা? তার মা জানত? কি করে? তানহা তো তার মাকে কিছু বলেনি! তাহলে?
“তোমার বিষয়টা যেভাবে জেনেছে সেভাবেই তানহার বিষয়টাও জেনেছে, মানে ডাইরি পড়ে।”
তনয়া কিছু বলে না, চলে আসে রুম থেকে।
শফিক, তানিয়া সবাই অপেক্ষা করছে তেহরাবের। তবে শিহাবের এখুনি বেরিয়ে যেতে হবে বলে সে একাই খেতে বসেছে, তনয়া নিজের রুমে চলে আসে। একটু ঘুমিয়ে ছিল তাতেও শান্তি নেই, তানিয়া এসে ডেকে তুলেছে।
রুমে এসে দেখে তানহা চুপ করে বসে আছে বিছানায়, একা একাই হাসছে।
তনয়া স্মিত হাসে, চেয়ারে বসে টেবিল থেকে একটি বই হাতে তুলে নেয়। পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলে,
“এবার খুশি?”
তনয়ার আওয়াজ পেয়ে এক লাফে বিছানা থেকে নেমে তনয়াকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে,
“খুশি মানে? মহা খুশি, শিহাইব্বা অবশেষে আমার হবে, হু।”
তনয়া কিছুই বলে না, শুধু মুচকি হাসে। বিকেলে হয়তো তার ফুপিরা আসবে। রাফা প্রত্যয় ও তানহা শিহাবের বিয়েটা একই দিনেই হবে, সেবার তো আটকে গিয়েছিল।
তানহা নখ কামড়াতে কামড়াতে চলে যায়, তনয়া ফোনটা হাতে নিয়ে আবারো তেহরাবকে কল করে। তবে দুবার রিং হতেই শব্দ শুনতে পায় দরজার কাছ থেকে। তাকিয়ে দেখে তেহরাব দাঁড়িয়ে আছে, তনয়া ফোন রেখে উঠে দাঁড়াল। চিন্তিত সুরে বলল,
“না বলে কোথায় গিয়েছিলেন? ফোনও ধরছিলেন না, এমন কে……
আর কিছু বলার আগেই তেহরাব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তনয়াকে, তনয়া হকচকিয়ে যায়। কি হলো হঠাৎ? তেহরাবকে খুশি খুশি লাগছে, তনয়ার গালে গলায় একের পর এক চুমু খেয়ে যাচ্ছে তেহরাব। তনয়া হেসে ফেলে, এই পাগল লোকটার উপর রেগে থাকাও দায়।
তনয়াও আলতো হাতে জড়িয়ে ধরল,
“এত খুশি কেন? হুহ?”
তেহরাব ছাড়ে না তনয়াকে, উল্টো সেভাবেই বলে,
“বলব না!”
“কেন কেন? নতুন মানুষ পেয়েছেন বুঝি?”
তেহরাব হাসল, গলা থেকে মুখ সড়িয়ে আঁকড়ে ধরল তনয়ার অধর। আলতো করে দুবার চুমু খেয়ে কপালে কপাল ঠেকাল,
“তুই তেহরাবের নতুন পুরাতন সব, আর কেউ আসে নি, আসবেও না। সুযোগটাও নেই।”
তনয়া চোখ নামিয়ে নিল, আজ তাদের বিয়ের কত গুলো মাস কেটে গেছে। অথচ এখনো তেহরাব কাছে আসলে তনয়া জমে যায়, আটকে যায় কথা। শ্বাস নিল তনয়া, চোখ জোড়া বন্ধে রেখেই বলল,
“হাত মুখ ধুয়ে খেতে চলুন, আব্বু আম্মু অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। “
“আর তুই?”
তনয়া জবাব দেয় না, আলতো করে ধাক্কা মেরে সড়িয়ে দেয়।
“ইশ চলুন তো, আমার খিদে পেয়েছে। “
তেহরাব নিজের চুলে আঙুল ডোবাল,
“চল বাড়ি চলে যাই!”
তনয়া বিরক্ত হলো, মুখ কুঁচকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
“আপনিই যান, আমি যাব না।”
তেহরাব৷ কপাল কুঁচকাল, এই মেয়ে কিনা তাকে মানা করছে?
“তুই যাবি না, তোর ঘাড় যাবে।”
তেহরাবের গম্ভীর গলা পেয়ে তনয়া একপলক পেছনে তাকায়, মুখ ভেঙিয়ে আবার পা বাড়ায় যাওয়ার পথে।
তেহরাব নিজেও বিরক্তি নিয়ে নিজেকেই বলতে লাগল,
“শশুড় বাড়ি থাকা মানে বউয়ের সাথর দুরত্ব, আর বুয়ের সাথে দুরত্ব বাড়লে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবে। আমি নিজের জন্য ভাবি নাকি? আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবে তাই তো চলে যেতে চাইছি!”
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসছে তনয়া, শেষ পর্যন্ত তেহরাব তাকে নিয়েই যাচ্ছে। শফিক আর তানিয়া কিছুতেই মেয়েকে যেতে দিতে চাচ্ছে না, কিন্তু তেহরাব! সে তো নাছোড় বান্দা, সে যাবে মানে যাবে, আর সাথে তনয়াকেও নিয়ে যাবে।।
“এতদিন পর আসলো মেয়েটা, দুটোদিন অন্তত থাকুক।”
তানিয়ার কথায় তেহরাব গাল ভরে হাসল,
“আরে মা সামনে সপ্তাহেই তো তানহার বিয়ে, তখন তো আসতেই হবে। তখন এসে থেকে যাবে, আজ আসি।”
তানিয়া আর কি বলবে, বলার সুযোগ কি রেখেছে তেহরাব?৷ তেহরাব তো সরাসরিই বলে দিয়েছে যে সে তনয়াকে ছাড়া থাকতে পারে না, তাই ওকে নিয়ে যাবে। আর এই বাড়িতেও সে থাকতে পারবে না, কারন কালকে সকালে তাকে ঢাকা যেতে হবে।
অগত্যা শফিক তানিয়া নিশ্চুপ, এই ছেলে যে তার মেয়েকে রেখে যাবে না তা ভালো মতোই বোঝা হয়ে গিয়েছে।
তেহরাব বেরিয়ে আসলো গেটের বাইরে, বাইকে উঠে বসল।
তনয়া মুখ ভাড় করে এগিয়ে আসলো, সে দিকে পাত্তা দিল না তেহরাব। উল্টো তাড়া দিয়ে বলল,
“জলদি কর, নাহয় যেতে যেতে রাত হবে।”
তনয়া বিদায় নিয়ে বাইকে উঠে বসল, তেহরাবও বাইক স্টার্ট দিল।
“,ধরে বস, পরে যাবি তো।”
তেহরাবের কণ্ঠস্বর শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল তনয়া,
“কথা বলবেন না আপনি, একদম না।”
তেহরাব হতবাক হয়ে লুকিং গ্লাসে তনয়ার দিকে তাকাল,
“আমি আবার কি করলাম?”
“, কি করলেন মানে? একটা দিনও আপনি থাকতে দিলেন না, এমন কেন আপনি?”
তেহরাব বাঁকা হাসে,
“ আচ্ছা তুই কি চাস তোর দশটা না পাঁচটা না একমাত্র স্বামী সারারাত না ঘুমিয়ে কাটাক? ছিহ তনয়া ছিহ, এইতোর ভালোবাসা?”
তনয়া দাঁত কিড়মিড় করে তেহরাবের গলায় খামচে ধরে,
“একদম কথা বলবেন না বলে দিচ্ছি, আপনি খুব খারাপ। অনেক অনেক বেশি খারাপ।”
তেহরাব ব্যথায় মৃদু চিৎকার করে উঠে,
“আহহ, ইশ লাগছে তো। ছাড়, বাইক চালাচ্ছি তো।”
ছেড়ে দেয় তনয়া, তারযে প্রচুর রাগ হচ্ছে। এই লোকটা এমন কেন? একটা দিন থাকলে কি এমন ক্ষতি হতো? তেহরাব ঠোঁট কামড়ে হাসছে,
“স্বামী মকে কষ্ট দিলে পাপ হবে মেয়ে, এতটুকুও জানিস না?”
তনয়া গাল ফোলাল,
“আমি কই আপনাকে কষ্ট দিলাম? আপনি নিজেই তো আমাকে কষ্ট দিচ্ছেন, একটা দিন বাড়িতে থাকতে দিচ্ছেন না।”
তেহরাব অসহায় ভাব নিয়ে বলে,
“এইযে তুই আমাকে ছাড়া একাই থাকতে চাচ্ছিস, একটা রাত আমাকে ছেড়ে ঘুমাতে চাচ্ছিস, এটা চেয়েই তো দুঃখ দিচ্ছিস।”
তনয়া ভ্রু কুঁচকায়,
‘মানে?”
“মানে হচ্ছে, তোর জন্য ঘুম হারাম!”
তনয়া বুঝল না তেহরাবের কথার মানে, নিজেই ভাবতে লাগল তবে তারপরেও বুঝল না।
অতঃপর ঠোঁট উল্টে জিজ্ঞেস করল,
“ঘুম হারাম মানে? বুঝিনি।”
তেহরাব আড়ালে দুষ্টু হাসল, ঘাড় এদিকে ওদিক নাড়িয়ে বলল,
“বাড়ি চল বুঝিয়ে দিচ্ছি, এখন শক্ত করে ধর। স্পিড বাড়াব!”
তনয়া কথা মতো শক্ত করে জড়িয়ে ধরল তেহরাবকে, বলল,
“ আজকে আমি আপনার সাথে ঘুমাব না, আপনি একাই ঘুমাবেন।”
তেহরাব এবারও বাঁকা হেসে বলল,
“এমনিতেও আমরা রাতে ঘুমায় কবে? দুজনেই তো জেগেই থাকি।”
তনয়া চোখ মুখ কুঁচকে নেয়, এই বজ্জাত লোকটাকে নিয়ে সে কি করবে? না পেরে কামড় বসাল তেহরাবের কাঁধে,
“আরেহ বা*ল করছিসটা কি, এক্সিডেন্ট করে ফেলব তো।”
“আপনি যদি আরেকটা বাজে কথা বলেন তো দেখবেন…….
পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে তেহরাব নিজেই বলল,
“ছিহ, এই রাস্তাঘাটে কি দেখাদেখির কথা বলছিস? আগে বাড়ি তো যাই, একটু সবুর কর।”
তনয়ার এবার কান্নায় এসে পরছে, এই ছেলের সাথে সে কথায় বলবে না। অসভ্য একটা!
“এবার বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে।”
তেহরাব শব্দ করে হেসে উঠে, তনয়া তেহরাবের পিঠে কপাল ঠেকিয়ে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে, অপেক্ষা করতে থাকে বাড়ি যাওয়ার জন্য।
“কিরে চলে আসছিস কেন? তোকে না কদিন থেকর আসতে বলেছিলাম?”
তাসলিমার প্রশ্ন শুনে নিজের জমে থাকা অভিমান আরো গাঢ় হলো তনয়ার, রুটি বানাতে বানাতে বলল,
“আপনার ছেলেই তো থাকতে দিল না, সব সময় এমন করে উনি।”
তাসলিমা এগিয়ে আসল তনয়ার কাছে, তার ছেলে যে আরেক পাগল। কিইবা বলবে?
“থাক রাগ করিস না, শুনলাম তোর বোনের বিয়ে? পিচ্চি মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে?”
তনয়া তাকায় তাসলিমার দিকে,
“তেমন কিছু না মা, তানহা নিজেও রাজি। মূলত ও নিজেই বিয়ে করতে চাইছে, শিহাব ভাইও ইতালি চলে যাবে তাই তিনি চাইছের তানহাকেও নিয়ে যেতে।”
তাসলিমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, এখনকার কিছু ছেলেপেলে খুব বিয়ে পাগলা, যাইহোক তারা সুখে থাকুক এই চাওয়া। ইউসুফের জন্য রুটি বানানো শেষ তনয়ার, ভাজাও শেষ তাসলিমার।
“তনয়া ফ্রিজে কেকে আছে দেখ, নিয়ে যা তেহরাবকে দে। সাথে তুইও খা, আর রাতের খাবার খেয়ে নিস। আমি তোর বাবার খাবার নিয়ে ঘরে চলে যাই, আমারও ওষুধ খেতে হবে।”
“আমি আর রাতে খাব না, ইনাকে বলবনি।”
তাসলিমা ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর স্বরে বলল,
“চুপচাপ খেয়ে নিবি দুজনেই, আমি গেলাম।”
তাসলিমা খাবার নিয়ে চলে গেল নিজের ধরে, তনয়া ফ্রিজ থেকে কেক নিয়ে নিজের রুমে চলে আসলো।
রুমে তেহরাব নেই৷ গেল কোথায়?
ওয়াশরুমে চেক করল, না সেখানেও নেই। তনয়র কপাল ভাজ পরল, দ্রুত ব্যলকনিতে চলে আসলো। না এখানেও তো নেই, তাহলে গেল কোথায়?
কেকটা টেবিলে রেখে দ্রুত পা বাড়াল ছাদের উদ্দেশ্যে, যা ভেবেছিল তাই। তেহরাব ছাদেই আছে, কানো ফোন গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে সামনের দিকে তাকিয়ে। তনয়া ডাকতে নিবে এমন সময় শুনতে পেল তেহরাবের কন্ঠে বলা কিছু কথা,
“আরেহ সোনা রাগ করেনা, তোমার তেহু তো এতদিন সময় পাইনি তোমার সাথে দেখা করতে। আমি কালকেই আসব সোনা, রাগ করে না।”
থেমে যায় তনয়া, মাথা ঘুরছে তার। কি শুনল সে? ঠিক শুনল? দেয়ালে হাত রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল, এক পা এক পা পেছতে লাগল সিঁড়ি। কানে শুধু বাজছে তেহরাবের বলা কথা গুলো, তেহরাব কাকে সোনা বলল? কাকে রাগ করতে মানা করল? তাহলে কি সবসময়ের মতো এবারও তনয়া ঠকে গেল?
হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৪০
তনয়া আর দাঁড়াল না, দৌড়ে চলে আসলো নিজের রুমে।। মাথতা ঘুরছে তার, সব কিছুই কেমন কেমন লাগছে, গতকাল একদফা ভুল বুঝাবুঝি এখন আবার? নাহহ সে নিশ্চয় ভুল ভাবছে, জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করল তনয়া। নিজেকে নিজেই বলল,
“ধ্যাত তনয়া তুইও না, বেশি ভাবছিস। উনি শুধু তোর, তোকে ছাড়া কাউকে উনি ভালোবাসতেই পারেন না। তুই ভুল বুঝছিস, বিশ্বাস রাখতে হবে তো!”
