Home হাওয়াই মিঠাই হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৫২

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৫২

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৫২
তামান্না ইসলাম শিমলা

একটি মেয়ের কাছে সবচেয়ে কঠিনতম সময় হচ্ছে প্রেগন্যান্সির সময়। আর এই আট মাসের পুরো জার্নিটা সহজ করেছে তেহরাব। নাওয়াখাওয়া ভুলে সারাদিন তনয়ার প্রতি ছিল তার মনোযোগ। তাসলিমাও নিজের মেয়ের মতো আগলে রেখেছে। ভুলেও একটি কাজ করতে দেয়নি সে। তনয়া সুখী! সে প্রচুর পরিমাণে সুখী।
আটমাসের ভারি পেট নিয়ে চলাফেরা করাও মুশকিল হয়ে পরেছে তনয়ার। তার উপর দুজন বাচ্চা, খুব অস্থিরতা পোহাতে হচ্ছে তনয়াকে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হচ্ছে প্রথম দিকে তনয়া যেমন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল এখন তার বিপরীত।

গোলগাল পেট, চোখ মুখ ভরা, একদম গোলুমলু যাকে বলে। তেহরাবের সাথে দাঁড়ালে এখন মনে তারা স্বামী স্ত্রী। এতদিনতো তনয়ার এইটুকু শরীর তেহরাবের সামনে দেখায় যায়নি। তবে সব কিছুর মাঝে একটি বিষয় তনয়াকে ভাবায়। বিষয়টি হচ্ছে তেহরাব। তেহরাব সারাদিন তার খেয়াল রাখলেও রাতে তাকে পাওয়া যায় না। গতমাসে সিলেট থেকে ফেরার পর থেকেই তেহরাবের এই পরিবর্তন। তনয়ার তো অভ্যাস হয়ে গিয়েছে তেহরাবকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর। তবে এই একমাসে একটা দিনও তেহরাব তনয়ার কাছে থাকেনি। বরং তনয়াকে ঘুমাতে বলে তেহরাব ল্যাপটপ নিয়ে বসে পরে। এ নিয়ে তনয়া অবশ্য প্রশ্ন করেছিল তবে তেমন জবাব পায়নি। তেহরাব সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি বলা চলে।

বড্ড অস্থির লাগছে তনয়ার। এসির পাওয়ারটা বাড়িয়ে পেটে হাত রাখল। বাচ্চা দুটো মহা পাজি, সারাদিন লাথি মেরে জ্বালাতন করে তনয়াকে। মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে সব। ঘড়ির দিকে তাকাল তনয়া,রাত দশটা। আজ তেহরাবের আসার নামই নেই। ফোনটা হাতে নিয়ে ভাবলো কল করবে তবে তার আগেই উপস্থিত হয় তেহরাব। তেহরাবকে দেখেই বড় বড় চোখ করে দাঁড়িয়ে যায় তনয়া। বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলে পরেছে তার।
তেহরাব সেদিকে পাত্তা না দিয়ে নিজের পরনে থাকা র*ক্তেভেজা সাদা শার্টটা খুলতে লাগল।
“কি হয়েছে আপনার? র র*ক্ত কেন?”
তেহরাব শার্টটা মেঝেতে ফেলে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসল। তনয়া দুপা এগিয়ে গিয়ে আবারো জিজ্ঞেস করল,
“কি হল বলুন। কি হয়েছে?”
তেহরাব শব্দ করে হেসে উঠল,
“আরে কিছুই হয়নি। এটা আমার র*ক্ত না, এটা তোর মায়ের রেড কালার হাম্বার র*ক্ত।”
বিস্ময়ে তনয়ার ঝুলন্ত চোয়াল আরো ঝুলে পরল,

“এ্যাঁ?”
“হ্যাঁ।”
তনয়া হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তেহরাব উঠে দাঁড়াল। ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বলল,
“কালকে আমাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে সবাইকে দাওয়াত। তোর মাকে ধন্যবাদ এত সুন্দর গরু পালার জন্য, অবশ্য সে নিজেও একটা গরু।”
তনয়া ভ্রু কুঁচকাল, এ কেমন কথা? তেহরাব কি তার মাকে অপমান করল? ওয়েট, গরু! গরু মানে? রেড কালার হাম্বা….. টনক নড়ে তনয়ার। চেঁচিয়ে বলে,
“এই এই কি করেছেন আপনি? আম্মুর গরু চুরি করেছেন?”
তেহরাব শয়তানি হাসি হাসল,
“হ্যাঁ।”

বলেই ওয়াশরুমে চলে গেল তেহরাব। তনয়া ধাপ করে বসে পরল বিছানায়। এই লোকটা ভালো হবে কবে?
মিনিট দশেক বাদে তেহরাব ফ্রেশ হয়ে বাইরে আসলো। তনয়া এখনো নিজের বিস্ময় কাটাতে পারেনি। তেহরাব মিটমিট করে হেসে তনয়ার পাশে বসল,
“ভালোই গোস্ত হয়েছে। অনায়াসে চারশো মানুষের খাওয়া হয়ে যাবে।”
তেহরাবের মুখে এমন কথা শুনে অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকায় তনয়া। দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
“আপনি এখনো বাচ্চা? কদিন পর দু দুটো বাচ্চার বাবা হতে চলেছেন, আর আপনি কি করে বেরাচ্ছেন এসব?”
হঠাৎ গম্ভীর হল তেহরাবের মুখশ্রী। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তনয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“শুকরিয়া কর যে তেহরাব বড়দের মতো কিছু করছে না। নাহয় তোর মা এতদিনে আমার কাছে বাজে ভাবে অপমানিত হতো।”
তনয়া চমকায়! নিজের মায়ের সম্পর্কে এমন কথা তার মোটেও পছন্দ হচ্ছে না। কিঞ্চিৎ রাগী ভাব নিয়ে বলল,
“কি বলছেন এসব?”

তেহরাব তনয়ার কোমরে হাত রেখে তনয়ার দিকে এগিয়ে যায়। সদ্য গোসল করে আসা তেহরাবের শীতল স্পর্শে কেঁপে উঠে তনয়া। তেহরাব তনয়ার কানের পাতায় ঠোঁট ছোঁয়ায়। ফিসফিস করে বলে,
“সবটাই জানি আমি তনয়া। লুকিয়ে লাভ কি বল? তেহরাবের থেকে ভালোভাবে এই তনয়াকে তুই নিজেও জানিস না, বুঝিস না।”
তনয়া থমকে যায়। কিছু বলে না, উল্টো তেহরাবই বলে,
“আচ্ছা ওই মহিলার সমস্যা কোথায় তনয়া? মায়েরা এমন হয়?”
তনয়ার কান্না পাচ্ছে। দম বন্ধ লাগছে তার।
“দয়া করুন। এসব বলবেন না।”
তেহরাব তাচ্ছিল্যে হাসে,

“কালকে বাবা আসবে তোকে নিতে, নিয়ম অনুযায়ী মেয়েদের প্রথম সন্তার বাপের বাড়িতেই হয়। তবে আমি তোকে ওই বাড়িতে যেতে দিচ্ছি না, একদময়মই না।”.
তনয়া করুণ চোখে তাকায় তেহরাবের দিকে। তেহরাব তনয়ার গালে হাত রেখে চুমু খায় অধরে,
“যাদের কাছে আমার তনয়ার গুরুত্ব নেই, আমার কাছেও তাদের বিন্দু মাত্র গুরুত্ব নেই। “
তনয়া তেহরাবের মুখে হাত রাখে,
“এভাবে বলবেন না। মা হয় আমার।”
তেহরাব আবারো হাসে,

“মা? কেমন মা? এই এতগুলো দিনে একবারও এসেছে দেখতে? উল্টো তোর পড়াশোনা থেকে শুরু করে প্রতিটি বিষয়ে নাক গলিয়েছে উনি।”
তনয়ার এবার কান্না পাচ্ছে। তেহরাবকে ধাক্কা দিয়ে সড়িয়ে দিয়ে বলল,
“উফ চুপ করুন। আম্মু এমনিতেও কোথাও যাওয়া আসা করেনা। আর….
“ কোনো কিছুই শুনতে চাই না। তুই ওই বাড়ি যাচ্ছিস না। কারো দরকার পরলে সে নিজেই এসে দেখে যাবে, এটাই আমার শেষ কথা।”
তেহরাবের কঠিন শক্ত গলায় বলা কথাগুলো শুনে মুহুর্তেই চোখ ভিজে আসলো তনয়ার। তেহরাব নিজের রাগটা সামলে তনয়াকে জড়িয়ে ধরল,
“যেতে হবে না জান।কি হবে গিয়ে? এই তেহরাব থাকতে কেন তুই বাকিদের কথা ভাববি? যেখানে তুই অবহেলা ছাড়া কিছু পাচ্ছিস না।”
তনয়া ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলল,

“বাবাতো আছে, আব্বু অনেক ভালোবাসে আমাকে। কষ্ট পাবে তো আব্বু।”
তেহরাব হাত বুলিয়ে দেয় তনয়ার চুলে,
“কষ্ট পাবে না। তাকে আমি আগেই বলেছি এই মুহুর্তে তোর কোথাও না যাওয়াটাই ভালো। তবুও তিনি আসবেন, তবে তুই নিজেই না করবি। প্রথমত যেখানে অবহেলা ছাড়া কিছু নেই সেখানে আমার তনয়া যাবে না, আর দ্বিতীয়ত তোকে ও আমাদেে বাচ্চাদের নিয়ে আমি কোনো রিস্ক নিতে চাই না। আমার পৃথিবী, আমার জীবনের মূল্যবার ব্যক্তিটি অবহেলা পাবে আর সেটাও তেহরাবের মেনে নিতে হবে?”
তনয়া জবাব দেয় না। জবাব নেয় তার কাছে। মনে মনে সেও সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় সেও যাবে না। গিয়ে কি হবে? শুনেছে নাতি নাতনির জন্য নানিরা কত কাঁথা সেলাই করে, কত আয়োজন। কই? সে তো দেখেনি।দেখেছে তবে সেটা তাসলিমার কাছে, কত আগ্রহ, কত কি। যখন যেটা প্রয়োজন বলার আগেই হাজির। ইরাও ঠিক তেমন, সে ফুপি হবে এই খবর শোনার পর থেকেই মহা খুশি সে। প্রতি সপ্তাহে একবার করে দেখা করে যায়। তার বাবাও প্রতি মাসে দু একবার করে এসেছে, দেখে গেছে তাকে।
অথচ তার মা এতগুলো দিনে একটি দিনও আসেনি। হয়তো সময় পায়নি! তাচ্ছিল্যে হাসে তনয়া,মনে মনে বলে,
“দেখে নিও আম্মু, আমিও মা হচ্ছি। তবে আমার বাচ্চারা কখনো অবহেলা পাবে না, কখনো না। তনয়া সেরা মা হবে, দেখে নিও।”

রাত বারোটা।
দুজনের কারো চোখেই ঘুম নেই। বারান্দায় বসে আছে দুজনে, বাইরে ঠান্ডা বাতাস। তনয়া তেহরাবের দিকে তাকাল,
“একটা কথা বলি?”
“না!”
তেহরাবের সরাসরি প্রত্যাখ্যান পেয়ে মুখ ভেঙাল তনয়া। তেহরাব ভ্রু নাড়িয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে। তনয়া দ্বিতীয় দফায় মুখ ভেঙাল,তেহরাব তনয়ার টমেটোর মতো গালটা টেনে দিয়ে বলল।
“ইশ দিন তিন একদম পাকা টমেটো হয়ে যাচ্ছিস। দেখলেই কামড়ে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে।”
তনয়া তেহরাবের বুকে হালকা ধাক্কা মারে,
“ আপনার মাথা। এখন তো আমার সাথে থাকতেও আপনার ভালো লাগে না, আপনি কি ভেবেছেন আমি কিছুই জানি না?”
তেহরাবের কপালে ভাজ পরল,
“কি জানিস শুনি?”
তনয়া অভিমান নিয়ে বলে,
“আমি ঘুমিয়ে গেলে আপনি রুম থেকেই চলে যান। এই বলেন তনয়াকে ছাড়া থাকতে পারেন না আবার তনয়াকে একা রেখে কোথায় চলে যান?”
তেহরাব মাথা চুলকায়। মিটমিট করে হাসছে সে যা স্পষ্টই বুঝতে পারছে তনয়া।
“এই আপনি হাসছেন কেন?”
তেহরাব তনয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে হিসহিসিয়ে বলে,

“কি বলতো, তেহরাব তনয়ার কাছে থাকলে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে না। তাই আরকি….. তুই চাইলে……
“ইশ চুপ! অসভ্য একটা।”
তনয়ার চেঁচিয়ে উঠল,তেহরাব শব্দ করে হেসে উঠল।
হাসতে হাসতেই বলল,
“কেন কি হল? এখন শুনতে পারছিস না কেন?”
তনয়া দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“ভালো হোন, ভালো হতে পয়সা লাগে না।”
তেহরাব মাথা দুলাল,
“ঠিক। ভালো হতে পয়সা লাগে না, তেহরাবের ভালো হতে তনয়াকে লাগে। ভাবতে পারছিস আজ কতদিন হয় তেহরাব তোর কাছে আসে না? ছয় মাস!”
তনয়া জমে যায়। কারন তেহরাবের হাত তনয়ার পেটে। তনয়া আঁড়চোখে তেহরাবের দিকে তাকায়৷ তেহরাব বাঁকা হেসে বলে,

“আমার আন্ডাবাচ্চা গুলোর জন্য তুই বেঁচে গেছিস।তবে একবার শুধু ভাব এই আন্ডা বাচ্চা গুলো পৃথিবীতে আসার পর কি হবে।”
তনয়া ভ্রু কুঁচকে নিল,
“কি হবে?”
তেহরাব তনয়ার গালে নিজের নাক ঘষতে ঘষতে বলে,
“এতগুলো দিনের জমিয়ে রাখা ভালোবাসা একদিনেই উজাড় করে দিব। আমি আবার কারো পাওনা বাকি রাখি না, জানিস তো?”
তনয়া একটু গুটিয়ে বসল, এই লোকটাকে বিন্দু পরিমাণ ভরসা নেই। লোকটা বেপরোয়া। একবার কাছে আসলে সব কিছু হুশ হারিয়ে ফেলে,সেসব ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে তনয়ার।
“ এখুনি বলে রাখছি জান, একটা দিনও রেহাই নেই তোর। তেহরাব এখন যে যন্ত্রণায় দেন পার করছে সেই একই যন্ত্রণায় তোর রাত পার করতে হবে।”
হঠাৎ তনয়ার কি হল কে জানে, কিছু না বলেই তেহরাবের অধরে অধর ছোঁয়াল। শক্ত করে কামড়ে ধরল তেহরাবের ঠোঁট। তেহরাবের হাসি পেল প্রচন্ড তনয়ার কাজে। তেহরা একহাতে তনয়ার চুল মুঠোতে পেঁচিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল। তনয়া ছেড়ে দিল তেহরাবকে, তেহরাব ক্রুর হেসে তনয়ার নাকের সাথে নাক ঘষলো। হাস্কি স্বরে বলল,

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৫১

“এই বাইটের পাওনাটাও সুধে আসলে ফিরিয়ে দিব।সময় আমারো আসবে, তখন দেখব কি করে বাঁচিস।”
তনয়া ঠোঁট উল্টায়, তেহরাব তনয়া গালে, ঠোঁটে, কপালে, নাকে ছোট করে চুমু খায়।
“আপনি আমাকে নিয়ে ভাবেনি না। বারবার কষ্ট দেন।”
তেহরাব ঠোঁট কামড়ে হাসল,
“কিছু সময় কষ্ট দেওয়াটাই হচ্ছে আসল ভালোবাসা।”
তনয়া গাল ফুলিয়েই তাকিয়ে থাকে তেহরাবের দিকে। তেহরাব তনয়ার গালে স্লাইড করতে করতে বলে,
“Yeein isqe bara teekha,
Mujhe teekha acchah lagee!”

হাওয়াই মিঠাই পর্ব ৫৩