Home হৃদয় রাঙানো প্রেম হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৫

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৫

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৫
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

ঘরময় নিকোটিনের ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে ফেলেছে কৃশান। মাত্র খাবার শেষ করে রুমে এসে এমন অবস্থা দেখে হকচকিত হলো হুমায়রা। জবান দিয়ে শব্দ বের হওয়ার আগেই খুক খুক করে কেশে উঠলো। উড়না দিয়ে নাক চেপে এগিয়ে এলো স্বামীর দিকে। বলল,
“ এসব কী করছেন আপনি! ”
“ সিগারেট খাচ্ছি চোখে দেখিস না? ”
আশেপাশে লক্ষ্য করলো হুমায়রা। দেখলো এই অব্দি ছয়টা সিগারেট খেয়ে শেষ করে ফেলেছে কৃশান। সে অনুনয় করে বলল,

“ দয়া করে এবার বন্ধ করুন। আর কতো খাবেন? ”
ভ্রূ বাঁকিয়ে এলো কৃশানের। কেউ তার ব্যাপারে মাথা ঘামাবে সেটা মোটেও পছন্দ নয় তার। আর মেয়ে হলে তো হলোই! রাগী গলায় উত্তর করলো,
“ আমার যতো ইচ্ছে ততো খাবো। তুই বলার কে? তোকে না বলেছি আমার ব্যাপারে নাক না গলাতে? ”
“ সিগারেটের ধোঁয়া এলে ঘুমাতে পারবো না আমি। ”
“ সেটা তোর ব্যাপার। এখন যা সামনে থেকে নয়তো মার খাবি বলে দিলাম! ”
আর কিছু বলার সাহস পেলো মেয়েটা। ব্যার্থ পায়ে হাঁটা ধরলো বিছানার উদ্দেশ্যে। শুয়ে পড়লো এক কোণায়। তবে ঘুম আসলো না কিছুতেই। পুরোটা সময় কাশতে কাশতেই পেরোলো। কাঁথা দিয়ে মুখ ঢাকার পরেও সিগারেটের গন্ধে ভিতর সুদ্ধ গুলিয়ে যাচ্ছে। অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল দিলো না কৃশান। আজ নেশা করতে পারে নি সে। তাই এখন সিগারেট টেনেই সময় পার করতে হবে তার।

কোরআন তেলাওয়াতের মিষ্টি স্বরে মুখরিত হয়ে উঠেছে নামাজঘর। মির্জা বাড়ির সকল নারীরা ফজরের নামাজ শেষ করে একত্রে কোরআন তেলাওয়াত করছে। তাদের সবার অমায়িক গলার স্বর যেন পবিত্রতা ছড়িয়ে দিচ্ছে বাড়ির প্রতিটি কানায় কানায়। সবার শেষে কোরআন পাঠ শেষ করে জায়নামাজ ছেড়ে উঠলো হুমায়রা। সারারাত ঠিকমতো ঘুম না হওয়ায় মাথাটা এতক্ষন ব্যাথা করলেও এখন অনেকটা শান্তি লাগছে। নির্ধারিত স্থানে কোরআন শরীফ রেখে রান্নাঘরে শাশুড়িদের নিকট এলো সে। সেখানে এসে দেখলো ইকরা গতকাল রাতের সব কান্ড কারখানা মা- চাচিদের খুশিমনে বলে যাচ্ছে। তার কথায় সকলের মুখে যেন আশার আলো ফুটেছে। অথচ তারা জানেই না তাদের ছেলে গতকাল বাইরে থেকে নেশা করে না আসায় পুরো রাত ধরে সিগারেট ফুঁকেছে। সেই কথা আর তাদের নিকট বলতে গেলো না হুমায়রা। সে এসে তাদের কাজে সবকিছু এগিয়ে দিতে লাগলো। সকালের নাস্তা বানানোর পুরোটা সময় কৃশানকে নিয়েই আলোচনা করে গেছেন দুই জা। আর সেসব আলোচনা পাশ থেকে শুধু নীরব শ্রোতার মতো শুনে গেছে হুমায়রা। এর মাঝেই ইয়াসমিন বেগমের ফোনে কল করলো হুমায়রার মামি রেখা বেগম। দুই বেয়াইন এর সাথেই বেশ বিনয় দেখিয়ে কথা বললেন তিনি। এরপর হুমায়রার সাথে কথা বলতে চাইলে তার দিকে ফোন বাড়িয়ে দিলেন ইয়াসমিন বেগম। বললেন,

“ নাও। ”
শাশুড়ির কথায় বিস্ময়ে হতবিহ্বল হয়ে গেলো হুমায়রার। মাদ্রাসায় থাকতে বছরেও যিনি তার সাথে কথা বলেনি, সে কিনা আজ তিন দিনের ব্যবধানে তার সাথে কথা বলতে চাইছে? নিজের সবটুকু বিস্ময় ভাব মনের ভিতরেই চাপা রেখে ফোন হাতে নিলো মেয়েটা। সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ কেমন আছেন মামনি? ”
” আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো, তোমার কী খবর আম্মু? ”
এতো আদুরে গলায় হুমায়রার হৃদয় ছেয়ে গেলো ভালো লাগায়। বুক ভরা ভালোলাগা নিয়ে উত্তর করলো,
“ জ্বি আলহামদুলিল্লাহ ভালো। বাড়ির সবাই কেমন আছে? ”
“ ভালো, জামাইয়ের কী খবর? তাকে কল দিলাম ধরলো না যে? তাই তোমার শাশুড়ির নাম্বারে দিলাম। ”
” আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো, উনি ঘুমাচ্ছে তাই হয়তো শুনতে পাননি। ”

“ ওহ, তো ঐ বাড়ির সবাই কেমন? বিয়ের আগে তো ভালোই শুনলাম। ”
“ আলহামদুলিল্লাহ সবায়ই অনেক ভালো। ”
“ জামাই বাবা কেমন? ”
“ জ্বি, উনিও অনেক ভালো। তুমি চিন্তা করো না। প্রত্যেকেই আমাকে অনেক ভালোবাসে। ”
“ কিছুদিন পর থেকে তো রোজা শুরু। জামাইকে নিয়ে এসে বেড়িয়ে যাও? ”
“ না এখন যাবো না। একেবারে ঈদের পর যদি যাওয়া হয়। ”
“ আচ্ছা ঠিক আছে। ”
“ আচ্ছা ভালো থাকবেন, আল্লাহ হাফেজ। ”
সালাম দিয়ে এখানেই কথার সমাপ্তি টানলো হুমায়রা। অতঃপর কথা শেষ হতেই আবারও রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিতে যাবে তখনি ওপাশের রুম থেকে কৃশানের চিৎকারের শব্দ ভেসে আসলো,
“ হুমায়রা! ”
উচ্চ আওয়াজে খানেক ভরকে গেলো মেয়েটা। তৎক্ষনাৎ দ্রুতপায়ে শাশুড়ির মোবাইল ফিরত দিয়ে পা চালালো রুমের উদ্দেশ্যে।

পুরো রুম তন্ন তন্ন করে নিজের সিগারেটের প্যাকেট খুঁজছে কৃশান। কিছুক্ষণ আগের গুছানো রুমখানা এখন পরিনত হয়েছে আস্ত একটা ডাস্টবিনে। রুমে ঢুকে সেই দৃশ্যে চোখ আকাশে উঠে গেলো হুমায়রার। মুখ খুলে কিছু বলতে নিবে এর আগেই একটা শক্তপোক্ত হাত দানবের মতো তার গলা চেপে ধরলো। ঘটনার আক্মিকতায় বিস্ময়ে হতবিহ্বল মেয়েটা। কৃশানের হাতের চাপে নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। রুহ আটকে আসছে গলায়। সেদিকে কোনো খেয়াল নেই ছেলেটার। সে রক্ত চক্ষু তাক করে কটমট করতে করতে বলল,
“ তোকে বলেছিলাম না আমার ব্যাপারে নাক না গলাতে। কোন সাহসে আমার সিগারেট এর প্যাকেট ফেললি তুই? ”
চোখ মুখ লাল হয়ে আসছে মেয়েটার। এই বুঝি স্বামীর হাতে মৃত্যু হলো তার। নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টায় হাত দিয়ে সরাতে চাইলো কৃশানের হাতটা। তবে ঐ শক্ত হাতের সাথে পেরে উঠলো না। এর মাঝেই আবারও ভেসে আসলো সেই কঠোর ব্যক্তির স্বর,

“ কথা বলছিস না কেন? বল কোন সাহসে আমার জিনিসে হাত দিলি? ”
কথা কী করে বলবে মেয়েটা! চোখ গুলো খুলে রাখতেই তো বেগ পোহাতে হচ্ছে তার। অবস্থা বেগতিক দেখে এবার ছুঁড়ে ফেলার মতো তাকে ছেড়ে দিলো কৃশান। ছাড়া পেয়ে দেয়ালের সাথে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিলো হুমায়রা। গলা ধরে খুক খুক করে কাশতে লাগলো। সাথে বুক ভরে শ্বাস টানার চেষ্টা চালালো। গাল বেয়ে ঝর্নার মতো অশ্রু গড়াতে লাগলো। সেদিকে এক পল তাকালো সামনের যন্ত্র মানব। পরপর আবারও তেড়ে এলো মেয়েটার দিকে। তা দেখে ভয়ে নিজেকে বিড়ালছানার মতো গুটিয়ে নিলো হুমায়রা। তখনি গুটি গুটি পায়ে সেখানে ছুটে আসলো মিঠু। হুমায়রার শরীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তাকালো নিজের মাহাজনের পানে। যেন বাঁচাতে চাইছে মেয়েটাকে। নিজের প্রিয় জিনিসটিকে সামনে দেখতেই দমে গেলো কৃশান। এক পল মিঠুর দিক তাকিয়ে হুমায়রার ক্রন্দনরত লালিত মুখপানে চাইলো। হাঁটু গেড়ে বসে শাসিয়ে বলল,

“ এরপর যদি আর কখনো আমার জিনিসে হাত দিস, তাহলে এই দুনিয়াতে সেদিনই তোর শেষদিন হবে। ”
বলেই ধুপধাপ পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। তার প্রস্থান হতেই হাঁটুতে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠলো হুমায়রা। সকালে রুম ঝাড়ু দেওয়ার সময় ফ্লোরে একসাথে তিনটা সিগারেটের প্যাকেট পেয়েছিলো সে। পরপর দুটো প্যাকেট খালি হওয়ায় অপরটা আর ধরে দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি। সবগুলো একসাথে করে ফেলে এসেছিলো বাড়ির পিছনে ময়লা ফেলার নির্ধারিত জায়গায়। হয়তো ঐ প্যাকেট টাতেই সিগারেট রয়ে গেছিলো। যার দরুণ এমন ভয়ানক শাস্তি জুটলো তার কপালে। কথাটা ভাবতেই কান্নার গতি আরও বাড়লো। চার দেয়ালের ভিতরে সেই কান্নার একমাত্র সাক্ষী রইলো মিঠু। কান্নার পুরোটা সময় ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে হুমায়রার কোলে উঠার চেষ্টা চালিয়ে গেলো সে। তবে এবেলায় তাকে কোলে তুললো না হুমায়রা।

যোহরের নামায আদায় শেষে মিঠুকে নিয়ে বারান্দায় বসলো হুমায়রা। সারাদিন সবার সাথে বেশ স্বাভাবিক ভাবেই কেটেছে তার। সকালে ঘটে যাওয়া ঘটনার কিছুই কারও কানে পৌঁছায় নি। তার হাসিমুখ দেখে বুঝা মুশকিল যে, এতো জঘন্য একটা ঘটনার মুখোমুখি হয়েছে সে। এখনও গলার মসৃণ ত্বকে কৃশানের পাঁচ আঙুলের দাগ বসে আছে। তবে হিজাবের আড়ালে থাকা সেই দাগ কারও চোখে পড়ার সাধ্য নেই। মিঠুর মায়াবী চেহারার পানে তাকিয়ে মনে পড়লো ছোটবেলা মায়ের বলা একটা কথা। সে মিঠুর তুলতুলে শরীরে হাত বুলিয়ে নিজের মতো বলতে লাগলো,

“ জানো মিঠু, ছোটোবেলা মা বলতো আমার চেহারায় নাকি খুব মায়া। যে কেউ দেখলেই নাকি ভালোবাসতে ইচ্ছে করবে। অথচ দেখো, মা যাওয়ার পর এই সুবিশাল পৃথিবীতে এক সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ ভালোবাসলো না আমায়! মাঝে মাঝে তো মনে হয়, মা হয়তো উল্টো টা বুঝিয়েছিল। এইযে যেখানেই যাই আমাকে কেউ সহ্য করতে পারে না। আগে মামা- মামির চোখের বিষ ছিলাম এখন নিজের স্বামীর। যার কাছে ভালোবাসা পাওয়ার আশা বুকে জমিয়ে পুরো কিশোর বয়সটা কাটালাম! ভেবেছিলাম, এক জীবনে তার কাছে এসেই হয়তো একটা নিরাপদ আশ্রয় মিলবে আমার। অথচ সেও সহ্য করতে পারে না আমায়।কিন্তু জানো এতকিছুর পরেও আশা দমে না আমার। হয়তো কোনো একদিন সৃষ্টিকর্তা “কুন ফায়াকুন” বলে দিবেন। আর তোমার মাহাজন আমায় ভালোবাসবেন। ততদিন পর্যন্ত আমি যেন ধৈর্য্য ধারণ করতে পারি এইটুকুই চাওয়া। সৃষ্টিকর্তা যতই কঠিন পথ দেক না কেন তার রহমত যেন আমার উপর থেকে সরিয়ে না নেন। আর সব ধৈর্য্যের ফল যেন তোমার মাহাজনের হেদায়াতই হয়। কেননা যতই কষ্ট হোক, আমি এক পুরুষকে নিয়েই ইহকাল ও পরকাল অব্দি যেতে চাই। দ্বিতীয় কারও আগমন আমার জীবনে না হোক- এক জনের মাঝেই আমার সকল সুখ, দুঃখের সমাপ্তি মিলুক। ”

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৪

হুমায়রার অশ্রুকনা টুপ টুপ করে মিঠুর শরীরে পড়ছে। অথচ কোনো নড়চড় নেই প্রানীটির মাঝে। তার লাল রঙ্গা চক্ষু দ্বয় নিবদ্ধ হয়ে রইলো সামনে থাকা রমনীর পানে। যার কথাগুলো বুঝে না আসা সত্বেও নিজের সুদীর্ঘ কর্ণের সবটুকু মনযোগ তার পানেই সপে রাখলো সে।

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৬