হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৪
তোয়া নিধী দোয়েল
বিরক্ত মুখে মোহনার সাথে বিশাল বারান্দায় হাঁটছে তুর্কি। ওর কোনো ইচ্ছাই নেই নিচে যাওয়ার। সবার সাথে মেশার। শুধু মাত্র আদনানের হাত থেকে রেহাই পেতে ও বের হয়েছে। তবে ওর মাথায় এখন একটা কথা ঘুরছে; যে মেয়েটা ওর পাশে সে কেনো তখন ওই রকম ব্যবহার করলো!
তুর্কির মাথায় ঘোমটা টানানো। সে ঘোমটার ফাঁকে ফাঁকে আশে পাশে দৃষ্টি বুলাচ্ছে। ওর কাছে মনে হচ্ছে এটা মুক্তিযুদ্ধার আমলের বাড়ি। আশে পাশে সব কিছু কেমন পুরনো আমলের। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় হুট করে সামনে হাজির হয় রেজুয়ান। রেজুয়ানকে দেখে চমকে উঠে তুর্কি। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। ও যেনো বিশ্বাস করতে পারছে না সামনে থাকা লোকটাকে। রেজুয়ান তুর্কিকে দেখে লম্বা করে দাঁত বের করে হাসে। এর পর মোহনার উদ্দেশ্যে বলে,
-এই বেঙ্গির ছাও, তোরে জাহিদ মাস্টার খুঁজছে।
মোহনা ভ্রু কুঁচকে বলে,
-তুই…তুই আবার আমার মায়ের নাম ভেঙ্গালি মা…….মা….
-ম্যা….ম্যা…..।
-দাঁড়া তুই। মা….মা….
মা মা করতে করতে মোহনা সিঁড়ি থেকে নামে। রেজুয়ান ওর চুলের বিনুনি টেনে ধরে বলে,
-শালার পোলাপান। দুই দিন পর বিয়ে দিলে পাঁচ-দশটা বাচ্চার মা হয়ে যাবি। আর এখনো মা মা করা ছাড়লি না।
-আ আ আ আ…গাঞ্জুট্টির বাচ্চা ছাড়।
-তোর বেঙ্গির ছাও। আমার বাপে কি গাঞ্জা খাই, তুই যে আমারে গাঞ্জুট্টির বাচ্চা বললি?
-তোর বাপে খাবে কেন? তুই খাছ। ছাড় বলছি গাঞ্জুট্টি।
-তুই আমারে দেখছস, কোন দিন গাঞ্জা খাইতে? এই নিশ্যা জিনিস আমি খাইনা। মাঝে মাঝে বেশি প্যানিক উঠলে একটা ব্ল্যাক খাই। তাই বলে তুই আমারে গাঞ্জুটি বলবি! তোরে তো আজ….।
মোহনা রেজুয়ানের হাতে ঘুষি দিয়ে দৌড়ে নিচে নেমে যায়। রেজুয়ান হাত নাড়িয়ে বিড়বিড় করে
-তোর বেঙ্গির ছাও, তোরে আজ পাইলে হইছে।
এর পর ঘাড় ঘুরিয়ে ভক্তির সাথে সালাম দেয় তুর্কিকে।
-আসসালামু-আলাইকুম ভাবিইইইইইইই……..।
তুর্কি কিঞ্চিৎ রাগ নিয়ে রেজুয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে।
রেজুয়ান তাড়া দিয়ে বলে,
-আরে তাড়াতাড়ি সালামের উত্তর নিন। তা না হলে একটা ভালো কাজের ছওয়াব শয়তানে নিয়ে যাবে।
তুর্কি দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
-আপনি এখানে কী করছেন?
রেজুয়ান দুই হাত বুকে হাত ভাঁজ করে বলে,
-আর মাত্র ৮ সেকেন্ড সময় বাকি আছে?
তুর্কি চোখ ছোট ছোট করে বলে,
-মানে!
-শয়তানে ছওয়াব টা নেওয়ার!
তুর্কি অন্য দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
-ওলাইকুমুস-সালাম।
রেজুয়ান চোখ বন্ধ করে বলে,
-মাশা-আল্লাহ্! মাশা-আল্লাহ্! মেয়ে তো নয় যেনো আগুনেরি গোলা। আমার ভাইয়ের জন্য তাহলে ঠিক মেয়েটাই এনেছি।
-আপনি এখানে কী করছেন? আর আমার যে বিয়ে হয়ে গেছে অন্য একটা লোকের সাথে সেটা জানেন?
-উঁহু! অন্য লোকের সাথে কই? আমার আপন ভাইয়ের সাথে হয়েছে। আমি নিজেই তো এই বিয়ের ঘটকালি করেছি।
তুর্কি চোখ ছোট করে করে বলে,
-মানে? আর আপনি জানতেন সব?
রেজুয়ান উপরে নিচে মাথা নেড়ে লম্বা করে হাসে।
-যতই…
-ভাবি তোমাকে না বললাম দাঁড়াতে। আর তুমি একা একাই নিচে যাচ্ছো?
উপর থেকে মোহনার কণ্ঠ পেয়ে চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায় তুর্কি। মোহনা মাত্র নিচে গেলো। তাহলে এই মেয়ে উপরে গেলো কখন! ও ভয়ে সিঁড়ি থেকে নামতে যায়। রেজুয়ান বাধা দিয়ে বলে,
-আরে ভাবিজান… ভয় পাচ্ছেন কেনো? ও হচ্ছে ছকিনার মা। আর যে টা একটু আগে নিচে গেলো ও হচ্ছে ভেব্লি। আর এই দুইজন বেঙ্গির ছাও।
তুর্কি অবাক হয়ে রেজুয়ানের দিকে তাকায়।
-বেঙ্গি কে? আর ওরা যমজ?
-হুম। আমার মেঝো চাচার বউ-র নাম বেঙ্গি। আর আমার মেঝো চাচা একটু বেশি স্ট্রোং তো, তাই এক ঢিলে দুই পাখি মেরে দিয়েছে। বার বার চাচিকে কষ্ট দিতে মন চাচ্ছিলো না। একটু বেশি ভালোবাসে কিনা….
তুর্কি রেজুয়ানের কথায় খুক খুক করে কেশে উঠে। পেছন থেকে মোহনার যমজ বোন সূচনা বলে,
-ফাজিল চুপ। তোর মুখে লাগাম কি কখনো হবে না?
সূচনা রেজুয়ানকে কিছু বলতে না দিয়ে, ফোন হাতে দিয়ে বলে,
-এই-টা ছোট চাচুকে দিয়ে আয়। অনেক্ষণ ধরে চাচ্ছে।
রেজুয়ান উল্টো সূচনার হাতে ফোন দিয়ে বলে,
-জাহিদ গাঞ্জুট্টির, সাথে আমি মাত্র ঝগড়া করে আসছি। এখন আমারে পাইলে জুতা দিয়ে পিটাবে। তুই যা চুপ চাপ। আর তোর কাজ করতে মন চাইনা তাইনা? খালি সাজতে মন চাই? সাইজা সাইজা ‘আমি রুপনগরের রাজকন্যা রুপের যাদু এনেছি’ এই গানে টিক-টক করতে মন চায়?
সূচনা রেগে রেজুয়ানকে কিছু বলতে গেলে নিচ থেকে মুজাহিদের কণ্ঠ স্বর শোনা যায়।
– ও সূচনা। কই গেলি মা? তাড়াতাড়ি আই।
-ও যে গাঞ্জা বাবায় চিল্লাচ্ছে। যা তাড়াতাড়ি।
-তুই দাঁড়া চাচ্চু কে তুই বাজে কথা বললি না, আমি গিয়ে বলতেছি।
-হো। যা বল। তোমার এক সাথে প্যান পড়া সখা, তোমারে বাজে কথা বলছে। বুঝছস।
-ফাজিল দাঁড়া তুই।
সূচনা রেজুয়ানকে ভেঙিয়ে চলে যায়। রেজুয়ান তুর্কির দিকে তাকিয়ে বলে,
-তোওঅঅঅ ভাবি। আমি কিন্তু, আপনার দেবর। মানে আপনার অর্ধাঙ্গর কনিষ্ঠ ভ্রাতা। ছোট পিচ্চি কুট্টি ভাই। সরি কুট্টি না।
সো আমাদের মাঝে আগে যে সম্পর্ক ছিলো সেটা ভুলে যান। সম্পর্ক তো না। মানে যে কথাটা হয়েছিলো আর-কি! এখন থেকে, না কাল থেকে আমি আপনার দেবর হয়েছি। আপনি আমাকে দেবরজান বলে ডাকতে পারেন। ওকে!
তুর্কি অবাক চোখে তাকিয়ে আছে রেজুয়ানের দিকে। ওর বিশ্বাস হচ্ছে না। যার সাথে ওর বিয়ে ঠিক হয়েছিলো সে ওর দেবর। আবার সে কিনা নিজ ইচ্ছায় নি
হৃদয়ের সঙ্গোপনে পর্ব ৩
-টাটা ভাবিজান। বাই বাই। আমার অনেক কাজ পরে আছে। আমার গার্লফ্রেন্ডের আবার রাগ ভাঙাতে হবে। গাল ফোলা পাঙ্গাস মাছ কিনা। পান থেকে চুন খসলেই মুখের জবান বন্ধ হয়ে যায়।
রেজুয়ান তুর্কির পাশ কাটিয়ে চলে যায়। তুর্কির মাথায় জিলাপির প্যাঁচ লেগে যায়। তুর্কি ঘোমটার নিচ দিয়ে মাথা চুলকায়। এ কি হচ্ছে!
