হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬ (২)
সাবা খান
মেঘলা বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ঢেকে দিচ্ছে পাকিস্তানের লাহোর শহরের এক অভিজাত প্রান্তকে। সেই প্রান্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে “দূরানী হাউস”। এ যেন শুধু এক বাড়ি না, যেন একটা সাম্রাজ্য।উঁচু সাদা মার্বেলের দেয়াল, বিশাল লোহার গেট, যার উপর খোদাই করা রাজকীয় নকশা। গেটের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র প্রহরীরা। ভিতরে ঢুকলেই চোখে পড়তো সুবিশাল বাগান। সারি সারি বিদেশি ফুল, মাঝখানে ফোয়ারা, ডান পাশে আছে ঘোড়ার আস্তাবল, বাম পাশে সুইমিং পুল, আর ঠিক সামনে তিনতলা প্রাসাদসম মূল ভবন।
এই বাড়ির মালিক হাজি শাহজেব আলম দূরানী। পাকিস্তানের ব্যবসায়িক জগতে এক অপ্রতিরোধ্য নাম। তার কোম্পানি ” দূরানী গ্লোবাল হোল্ডিং’স” তেল, ফার্মাসিউটিক্যাল, আমদানি রপ্তানি সবখানেই তার আধিপত্য সর্বসেরা। কিন্তু এত ক্ষমতা, এত সম্পদ থাকার পরও তার জীবনে ছিল এক শূন্যতা। আর সেই শূন্যতা হলো সন্তানহীনতা। প্রথম স্ত্রীকে তিনি বহু বছর পর ডিভোর্স দিয়েছিলেন শুধু এই এক কারণেই। তারপর বিয়ে করে অল্প বয়সী, প্রাণবন্ত, ছোট ঘরের এক মেয়ে উমেরাকে।
সে ছিল সম্পূর্ণ শাহজেবের বিপরীত এক মানুষ। মুক্ত, উড়নচণ্ডী, স্বপ্নবাজ, কিন্তু পরিবারের চাপে, সমাজের চাপে, সে বিয়ে করে ফেলে তার থেকে বাবার বয়সী শাহজেব দূরানীকে। বিয়ের পর উমেরা কখনোই মন থেকে তাকে মেনে নিতে পারেনি। বিয়ের পর উমেরার চঞ্চলতা হারিয়ে যায়। সে সবসময় চুপচাপ থাকতো, নিজের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে রাখত। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলেনি কখনো। সময় কেটে যায় এভাবে আর তারপর বিয়ের দুই বছরের মাথায় দূরানী হাউসে জন্ম নেয় এক কন্যা শিশু,
“সোফিয়া দূরানী”
সেদিন পুরো প্রাসাদ আলোয় ভরে উঠেছিল। শাহজেব দূরানী প্রথমবার নিজের মেয়েকে কোলে নিয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন। তার জীবনের এত বছরের চাওয়া পাওয়া আজ পূর্ণ হয়েছে। সে নিজের মেয়েকে বুকে জড়িয়ে আদুরে ডেকে ওঠে,
–“আমার মেয়ে…”
–“আমার রাজকুমারী…”
সেই দিন থেকে সোফিয়া হয়ে ওঠে তার বাবার পৃথিবী। যা কিছু ভালো সবকিছুই তার জন্য নিয়ে আসতো শাহজেব। সবচেয়ে দামি খেলনা, সবচেয়ে ভালো স্কুল, সবচেয়ে নিরাপদ পরিবেশ সবকিছু ছিল সোফিয়ার জীবনে। শুধুমাত্র একটা জিনিস ছাড়া, তা হলো মায়ের ভালোবাসা।
সোফিয়া বাবা শাহজেব ব্যবসায়িক কাজে বছরের অর্ধেকের বেশি বাড়িতে থাকতেন না। ছোট সোফিয়া তখন এক ফোঁটা ভালোবাসার জন্য মায়ের সংস্পর্শে যেতো কিন্তু বিপরীতে উমেরা কখনো তার দিকে ফিরেও তাকায়নি। সোফিয়াকে সার্ভেন্টদের নির্দেশনা রেখে সবসময় উদাস হয়ে বসে থাকতো। রাতে সোফিয়া তার মায়ের কাছে ঘুমাতে গেলে উমেরা কখনো তাকে কাছে টেনে নেয়নি। সে অন্য কক্ষে চলে যেত নিঃশব্দে। ছোট সোফিয়ার বুকটা তখন মায়ের ভালোবাসার জন্য হাহাকার করে ওঠতো। না সে কাউকে বলতে পারতো আর না সহ্য করতে পারতো।
তবে উমেরা কখনো তাকে কষ্ট দেয়নি, কিন্তু কখনো আগলে রাখেওনি। ছোট্ট সোফিয়া মাঝে মাঝে বাবার কাছে জিজ্ঞেস করত,
–“পাপা, মাম্মাম আমাকে ভালোবাসে না?”
শাহজেব মেয়ের কষ্ট বুঝেও তা লুকানোর জন্য হেসে বলতেন,
–“ভালোবাসে তো মা… শুধু দেখাতে পারে না”
ছোট্ট সোফিয়ার তখন এত কিছু বুঝতো না সে সরল মনে তার বাবার কথা বিশ্বাস করত। তার দশ বছর পর্যন্ত সবকিছু ঠিক ছিল। একটা স্বপ্নের মতো জীবন কাটিয়েছে সে।
কিন্তু হঠাৎ একদিন আমাবস্যার ন্যায় শাহজেবের “দূরানী গ্লোবালে যোগ দেয় এক নতুন বিদেশি ডাক্তার। তার আসল নাম ছিল লরেন্স স্টিফেন। কিন্তু সে নিজের নামের পরিবর্তে ছদ্মনাম ব্যবহার করে কোম্পানি তে আসে। তখন যোগাযোগ বা ইন্টারনেট ব্যবস্থা তেমন উন্নত না থাকার কারণে ইউরোপ থেকে আগত লরেন্সের অতীত বা তার ব্যাপারে কেউই কিছু জানত না। আর সেই সুযোগ টা কাজে লাগিয়ে লরেন্স সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে ড. আরিফ রহমান নামে। একজন গবেষক হিসেবে পরিচয় দেয়। মেধাবী, ভদ্র, বিনয়ী হিসেবে অল্প সময়ে সে সবার মধ্যে নিজেকে আলাদা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে যায়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে এখনো তার গবেষণা
“ম্যানবিস্ট ড্রাগস”
কে সফল করতে উঠে পড়ে লেগেছে। এর জন্য দরকার ছিল অগাধ টাকার। আর সে জন্য টার্গেট করেছিল,
“শাহজেব দূরানীকে”
কিছুদিনের মধ্যেই সে হয়ে ওঠে তার প্রিয়ভাজন। বুদ্ধি, কথাবার্তা, ভদ্রতা সব দিয়ে সে ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয় শাহজেবের মনে, সাথে উমেরার কাছেও। শাহজেব লরেন্স কে এতটা বিশ্বাস করেছে যে তাকে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে গেছে। তারউপর নিজের ব্যবসার অনেক দায়িত্ব নিজহাতে তুলে দিয়েছে শাহজেব। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে লরেন্স তার বাড়িতে গিয়ে ধীরে ধীরে উমেরাকে ম্যানিপুলেট করতে শুরু করে। সে তাকে বুঝতে শেখায়, তার না বলা কথা গুলো শোনে, সহানুভূতি দেখায়। আর বিপরীতে উমেরা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে তার প্রতি। লরেন্স তাকে নিজের জালে আটকে ফেলে। সবকিছু লরেন্সের প্ল্যান মোতাবেক চলতে শুরু করে। একদিন সে সিদ্ধান্ত নেয়, শাহজেব দূরানীকে সরিয়ে দিতে হবে। তার সেই প্ল্যান মতে, একরাতে লরেন্স শাহজেবের স্টাডি রুমে যায়।
সেদিন রাতটা ছিল অস্বাভাবিক নীরব। বাইরে জোরে হাওয়া বইছে, সাথে তুমুল ঝড়, বৃষ্টি পড়ছিল। সেই ঝড়ের রাগে একটা তীব্র শব্দে ছোট্ট সোফিয়া ঘুম ভেঙে যায়। তার কানে এখনো আসছে সেই চিৎকার গুলো। সে ধীরে ধীরে উঠে নির্জন করিডোর পেরিয়ে এগিয়ে যায় তার বাবার স্টাডি রুমের দিকে। দরজাটা একটু ফাঁক করা ছিল। আর সেই ফাঁকর গলিয়ে ভিতরে তাকাতেই তার পৃথিবী থেমে যায়। নজরে তার বাবা মাটিতে পড়ে আছেন,
রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে ড. আরিফ রহমান। তার হাতে শক্ত করে ধরে রাখা ছুরি। সে নির্মমভাবে, পাগলের মতো একের পর এক আঘাত করছে। সাথে দন্ত খিঁচিয়ে বলে,
–“তুই আমার কাজে বাধা দিচ্ছিলি, এত বড় সাহস। এসব কিছু আমার”
শাহজেবের নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে। তিনি বহু কসরতে আওড়াতে চেষ্টা করেন,
–“সো…ফি…”
কিন্তু শব্দটা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটা আঘাত আসে ঠিক তার কণ্ঠনালি বরাবর। তারপর সব শেষ। সোফিয়া এখনো দাঁড়িয়ে আছে স্থির হয়ে। তার চোখ বড় হয়ে আছে, কিন্তু সে চাওয়া সত্ত্বেও চিৎকার করতে পারছে না।
লরেন্স তো তখনই খেয়াল করেনি সোফিয়াকে। সে নিজের মতো কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে সোফিয়া একদম হতবিহ্বল তখন তার কি হয়েছিল সে নিজেও জানে না। তার ভেতরের আত্মাটা চিৎকার করছে। কিন্তু গলা দিয়ে একটা স্বরও বের হচ্ছে না। পাগুলো যেন মেঝেতে আটকে গেছে। সেগুলো নড়াচড়া করছে না। হাতে যেন বিন্দুমাত্র শক্তি খুঁজে পাচ্ছে না প্রতিরোধ করার। তার সামনে লরেন্স তার প্রাণপ্রিয় পাপা, যে তার সম্পূর্ণ জীবনে একমাত্র সত্যিকার অর্থে ভালোবেসেছে তাকে একটা ছুরি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলছে।
কাটা টুকরো গুলোর থেকে লরেন্স একটা স্লাইস নিয়ে একদম বিফের মত কেটে টেবিলের উপরে থাকা বড় রাজকীয় ক্যান্ডেলের আগুনে একটু হিট লাগিয়ে মুখে পুরে নিল। তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, সে এটা কে তৃপ্তি সহকারে চিবিয়ে খাচ্ছে। হ্যাঁ, ইউরোপে থাকতে লরেন্সের এটা অভ্যাস ছিল। কিন্তু এখানে এসে ভালো মানুষ সাজার চক্করে সেটাকে বহু কষ্টে সংবরণ করেছিল। কিন্তু এখন এতদিন পর সেই সাধ যেন অমৃত লাগছে তার কাছে। সে ধীরে ধীরে সেটাকে গিলে সামনে তাকাতেই নজরে আসে সোফিয়া। যার চোখ দিয়ে ঝর্ণার ন্যায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু না চিৎকার করছে, আর কিছু করছে। লরেন্সের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা তীক্ষ্ণ হাসি ফুটে ওঠে। সে শুরুতেই সোফিয়াকে দেখেছিল। দেখবে না কেন? সেই তো সোফিয়াকে এখানে ডেকে এনেছে ইচ্ছা করে। যেন তার চোখের সামনে তার বাবাকে মারতে পারে। সে সোফিয়াকে প্যারালাইটিক ড্রাগ দিয়েছে যার কারণে সোফিয়ার শরীর যেন অবশ হয়ে গেছে, চোখের সামনে সব দেখছে, ভিতরে চিৎকার করছে কিন্তু বাইরে সে একদম পাথরের মতো স্থির।
লরেন্স ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে সোফিয়ার দিকে। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলিয়ে বলে,
–“ওহ, ছোট্ট রাজকুমারী সব দেখে ফেলেছে”
সে নিচু হয়ে আসে তার সমানে,
–“চিৎকার করবে? করো”
লরেন্স একটু আগে যেই ছুরি দিয়ে মেরেছে সেটাকে জিহবা দিয়ে চেটে সোফিয়ার দিকে ঝুঁকে হিসহিসিয়ে উঠে,
–“জাস্ট রিমেম্বার, আমার নেক্সট বিফ, তোমার মা হবে’
ভয়ে সোফিয়ার শরীর কাঁপছে। বহুক্ষণ পর সে ফিসফিস করে,
–“মা… মা…”
তার ফিসফিসানি শুনে লরেন্স হেসে ওঠে। তার দিকে শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঠোঁট বাকিয়ে আওড়ায়,
–“তোমার মা?
ও এখন আমার কথা শুনবে, তুমিও শুনবে’
সে সোফিয়ার চিবুক চেপে ধরে উপরে তুলে,
–“আজ থেকে…তুমি আমার প্রজেক্ট, তোমাকে আমি এমন কিছু বানাবো, যা এই পৃথিবী কোনোদিন দেখেনি”
সোফিয়ার চোখ দিয়ে তখনো অনর্গল অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। আর সেই রাত থেকেই তার অনুভূতি রা মরতে শুরু করে।
তার কয়েকদিন পর দূরানী হাউসে নতুন খবর ছড়ায়। শাহজেব দূরানী মারা গেছেন একটা দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনায়। তার মৃত্যুর পর দূরানী হাউসে যেন শোকের ছায়া নেমে আসার কথা ছিল, কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই শোক যেন কখনো পূর্ণতা পেল না। প্রাসাদের ভেতরে অতিথিদের আনাগোনা ছিল, দোয়া মাহফিল হচ্ছিল, সবকিছু নিয়মমাফিকই চলছিল। কিন্তু উমেরা দূরানীর চোখে কোনো জল ছিল না। স্বামীর মৃত্যুতে যেখানে ভেঙে পড়ার কথা ছিল সেখানে না কান্না, না ভাঙন শুধু এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। যেন তার জীবনের এক অধ্যায় শেষ হয়েছে, আর সে নতুন কোনো কিছুর অপেক্ষায় আছে।
চারপাশের মানুষ জনের চোখও সেটা এড়ায়নি। তার এমন আচরণে কেউ কেউ ফিসফিসও করেছিল,
–“বেগম সাহেবা এত ঠান্ডা কেন?”
–“স্বামীর জন্য এক ফোঁটা চোখের জলও নেই?”
কিন্তু তার সামনে বলাট সাহস কারো হয়নি, কারণ একটাই ‘অগাধ ক্ষমতা, সম্পত্তি, ধন সম্পদ’। যার কারণে লোকজনের মধ্যে একরকম ভয় কাজ করত। আর সেই ভয়ের মাঝেই লরেন্স স্টিফেন অর্থাৎ তথাকথিত ড. আরিফ রহমান নিজের পরবর্তী চালটা চাললো। শাহজেবের মৃত্যুর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সে উমেরাকে বিয়ে করে ফেলে। সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যে, কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ।
আর এদিকে উমেরা যে এতদিন একা ছিল, ভালোবাসাহীন ছিল, হঠাৎ করে পায় এক ‘আদর্শ স্বামী’। লরেন্স তার সামনে এমন এক রূপ ধারণ করেছিল, যা সে সারাজীবন কল্পনা করে এসেছে। লরেন্সের কথা বলার ধরন, তার নরম কণ্ঠ, মনোযোগী আচরণ, চোখে গভীর ভালোবাসার অভিনয় সবকিছু উমেরার ভেতরে জমে থাকা শূন্যতাকে ভরিয়ে দিচ্ছিল।
সে ধীরে ধীরে ডুবে গেল এই মিথ্যা ভালোবাসার গভীর সাগরে। আর অন্যদিকে ছোট্ট সোফিয়া। সে সব জেনে বুঝে কাউকে কিছুই বলতে পারছে না শুধুমাত্র তার মায়ের জন্য।
এরপর কেটে যায় এক মাস। উমেরার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় ছিল এটা। লরেন্স যেন বদলে গিয়েছিল। সে উমেরার প্রতি এতটাই যত্নশীল, এতটাই ভালোবাসাময় আচরণ করছিল যে উমেরা সম্পূর্ণভাবে তার প্রেমে পড়ে যায়। সে মনে মনে ভাবতো,
–“এই তো সেই মানুষ… যাকে আমি সবসময় চেয়েছিলাম, যে আমাকে বুঝবে ভালোবাসবে”
তার চোখে আবার স্বপ্ন ফিরতে শুরু করে। তার চঞ্চলতা ফের ফিরে আসে। আর ঠিক তখনই লরেন্স তার আসল খেলা খেললো। সে উমেরা কে বুঝায়, শাহজেবের ব্যবসা আরও উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাবে যার জন্য সে এগুলো মালিক হলে ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। কিন্তু বিপরীতে উমেরা তাকে সীমাহীন বিশ্বাস করার কারণে একবার বলাতেই সব তার নামে লিখে দেয় বিনা সন্দেহে।
কিন্তু সেই দিন সন্ধ্যাতেই দূরানী হাউসের প্রধান গেটের সামনে এসে থামে কয়েকটা কালো গাড়ি। একটার পর একটা দরজা খুলে নামে অপরিচিত কিছু মানুষ। সামনের গাড়ি থেকে নামে একজন নারী, যার ইউরোপীয় চেহারা, ঠোঁটে তীক্ষ্ণ হাসি,
“এলেনা ফ্রাঞ্চেস্কা।
তার পাশে একটা কিশোরী মেয়ে, ফ্লোজা স্টিফেন। আর পরের গাড়ি গুলো থেকে নামে পর পর লরেন্সের ছেলেরা, হেনরি, আলেকজান্ডার, ভিক্টর, ড্যানিয়েল। সবার চোখে লরেন্সের মতো একই রকম অন্ধকার। তারা সবাই একসাথে হেঁটে ঢুকে পড়ে দূরানী হাউসে।
উমেরা সেদিন হাতে চায়ের কাপ নিয়ে সিঁড়ির উপরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে তাদের দেখে প্রথমে বুঝতে পারেনি। তারপর যখন লরেন্স এগিয়ে গিয়ে সেই মহিলার হাত ধরে হালকা হাসি দিয়ে বলে,
–“ওয়েলকাম হোম, বেবস, ডার্লিং আই মিস’ড ইউ টু মাচ”
তার বাক্যটা শুনার সাথে সাথেই উমেরার হাত থেকে কাপটা পড়ে ভেঙে যায়। তার মাথা ঘুরতে থাকে। কাঁপা কাঁপা স্বরে আওড়া,
–“এ… এসব কি আরিফ?”
লরেন্স ধীরে ধীরে তার দিকে তাকায়। তার চোখে আর সেই নরম ভাবটা নেই। তার জায়গায় ফিরে এসেছে ঠান্ডা, নিষ্ঠুর এক দৃষ্টি। সে এলেনার দিকে ইশারা করে বলে,
–“ওহ… আমি বলতে ভুলে গেছি, এটা আমার স্ত্রী। আর ওরা… আমার সন্তানরা”
উমেরা পেছনে হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ায়। তার চোখ বড় হয়ে যায়। তার পুরো পৃথিবী যেন ঘুরে ওঠে। সে অবিশ্বাসের সুরে বলে,
–“না… না এটা মিথ্যে। তুমি… তুমি আমাকে ভালোবাসো।
তার জবাবে লরেন্সের ঠোঁটে ফুটে ওঠে নির্মম হাসি। সে তাচ্ছিল্য ভরা কণ্ঠে শুধালো,
–“ভালোবাসা! তুমি সত্যিই এসব বিশ্বাস করো?”
তার বাক্যগুলো উমেরার ভেতরের সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দেয়। সে মাটিতে বসে পড়ে। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সে ফিসফিস করে,
–“আমি… আমি সব দিয়েছি তোমাকে, সব। বিশ্বাসঘাতক…..”
তাকপ থামিয়ে লরেন্স তার সামনে দাঁড়িয়ে নিচু হয়ে বলে,
–“হ্যাঁ… তুমি দিয়েছো, ঠিক এজন্যই তুমি এখন অপ্রয়োজনীয়”
উমেরার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে। সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে বলে,
–“তুমি… আমার সাথে এমন করলে?”
–“এটা তো শুধু শুরু। এখন তুমি দেখবে আসল পৃথিবী কাকে বলে”
সেদিন থেকেই উমেরার স্বপ্নগুলো একে একে ভেঙে পড়ে। সাথে তার ভালোবাসা, তার বিশ্বাস, তার অস্তিত্ব সবকিছু মিলিয়ে যায়। আর সেই দিন থেকেই দূরানী হাউসে শুরু হয় লরেন্সের আসল রাজত্ব। লরেন্স এবার আর কোনো মুখোশ রাখল না। এক এক করেম
শাহজেব দূরানীর সব ব্যবসা, সব কোম্পানি, সব সম্পত্তি তার নিয়ন্ত্রণে চলে গেল।
আর এইসব কিছুর মাঝখানে উমেরা এক কোণে পড়ে রইল অপ্রয়োজনীয় বস্তুর মতো। অন্যদিকে সোফিয়ার জীবনটা যেন হঠাৎ করেই থেমে গেছে। একটা দশ বছরের মেয়ে যে কিছুদিন আগেও ছিল এক রাজকুমারী , আজ সে বন্দি। হ্যাঁ, লরেন্স তার এবং তাকে সম্পূর্ণ বন্দী করে ফেলেছে। আর তার সৌন্দর্য
যেটা একসময় ছিল আশীর্বাদের মতো এখন সেটাই হয়ে উঠল তার অভিশাপ। হেনরি, আলেকজান্ডার, ভিক্টর, ড্যানিয়েল তাদের সবার চোখে ছিল এক ধরনের বিকৃত লালসা। তারা প্রথম দিন থেকেই সোফিয়াকে লোভাতুর দৃষ্টিতে দেখা শুরু করে।
তারা তাদের সেই লালসা মিটাতে একদিন রাতে তারা সবাই মিলে সোফিয়ার কক্ষে যায়। সোফিয়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা ঝাপিয়ে পড়ে তার উপর। সোফিয়ার ছোট্ট শরীরটা কাঁপছিল। সে বারবার নিজের জড়িয়ে আসা কণ্ঠে বলতে থাকে,
–“প্লিজ… আমাকে ছেড়ে দেন। আমি কিছু করিনি”
কিন্তু বিপরীতে মানুষ রূপী জানোয়ারদের মুখে ছিল শুধু বিকৃত হাসি। তারা তার মুখ চেপে ধরে বলে,
–“চুপ…চিৎকার করলে কেউ আসবে না”
ঘরটা যেন ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ করে দিচ্ছিল তাকে। হাজার চেষ্টা করেও না সে তাদের রোধ করতে পেরেছে আর না নিজেকে বাঁচাতে পেরেছে। শেষ পর্যন্ত তার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে যায়। শব্দগুলো মিলিয়ে যায়। তার মনে হচ্ছিল, এর চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়। তার ছোট্ট শরীরটা আর নিতে পারছিল না শুধু নাকের ডগায় একটা শেষ নিঃশ্বাসের অপেক্ষা। তবুও তাদের বিকৃত উন্মাদনা থামেনি। ঐদিনই সোফিয়া পরপারে পাড়ি জমাতো কিন্তু শেষ মুহূর্তে দরজা খুলে ঢুকে পড়ে লরেন্স। সে সোফিয়া কে দেখেই গর্জে উঠে,
–“স্টপ, হেনরি”
সবাই লরেন্সের কথায় থেমে যায়। সে একপলক বস্ত্রহীন সোফিয়ার দিকে তাকায় যে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে বিছানায়। ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে একটা ঠান্ডা হাসি ফুটে ওঠে। সে ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বলে,
–“ওকে এখন মেরে ফেললে আমাদেরই ক্ষতি,
ও আমার প্রজেক্ট। যা খুশি করো, কিন্তু বাঁচিয়ে রাখো”
সেদিনের পর থেকে সোফিয়ার জীবন আর কখনো আগের মতো হয়নি। তার জন্য প্রতিটা রাত মানেই ভয়, অসহায় যন্ত্রণা আর চিৎকার। কিন্তু ধীরে ধীরে তার চিৎকার গুলো থেমে যায়, চোখের জল শুকিয়ে যায়। ভিতরে ভিতরে সে মরে যেতে শুরু করে। এই সময়েই লরেন্স আবার মন দেয় তার গবেষণায়। কিন্তু তার অমানবিক প্রকল্প সফলতার জন্য দরকার ছিল একজন দক্ষ সহযোগীর। ঠিক তখনই তার দেখা হয় মারহাবের সাথে, একজন নীল চোখের আফগানি যুবক। বয়স উনিশ বা কুড়ির ঘরে হবে হয়তো, চোখে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির ঝিলিক। অবিশ্বাস্য মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও সে সুযোগহীন। কিন্তু লরেন্স প্রথম দেখাতেই বুঝে যায় এই ছেলেটা তার কাজে লাগবে। সে মারহাব কে লোভ দেখায় আর সেও বড় অংকের টাকার প্রলোভন, আর স্বীকৃতির লোভে লরেন্সের সাথে হাত মিলাশ।
এরপর শুরু হয়, এক ভয়ংকর অধ্যায়। দূরানী হাউসের ভেতরে তৈরি হয় গোপন ল্যাব। আর সেই ল্যাবে সোফিয়ার উপর শুরু হয় এক্সপেরিমেন্ট। তার শরীরে ঢুকানো হতো অজানা কেমিক্যাল। যেগুলো তার শিরায় শিরায় বয়ে যেত, আর আগুনের মতো জ্বালা হতো। প্রথম ডোজের দিন লরেন্স, মারহাব অপেক্ষা করছিল ফলাফলের। ড্রাগসটা তার শরীরে ঢুকানো হয় তারপর কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা নেমে আসে কক্ষে। অতঃপর সোফিয়ার সারা শরীর কেঁপে উঠে। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে, চোখ বড় হয়ে যায়।
সে চিৎকার করতে চাইছে, কিন্তু কণ্ঠ ফুঁড়িয়ে কোন চিৎকার বের হলো না। তার শরীরের ভেতরে যেন কিছু বদলে যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে তার শিরাগুলো ফুলে উঠে, তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। আর হঠাৎ সব থেমে গেল। সে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইল। লরেন্স এগিয়ে এসে তার পালস চেক করে। তারপর তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে সেই ভয়ংকর হাসি,
–“ইটস… ওয়ার্কিং…”
ঐদিন তার থেকে বেশি খুশি মনে হয় আর কেউ হয়নি। কেননা তার এক্সপেরিমেন্ট প্রথম বারের মতো সফল হয়। এরপর রোজ নতুন নতুন ডোজ দিয়ে পরীক্ষা করা হতো। কখনো সোফিয়ার শরীর এসব সহ্য করত, কখনো ভেঙে পড়ত, কখনো আত্মা চিৎকার করে উঠতো। কিন্তু বদ্ধ ল্যাবে কেউ-ই তার আর্তনাদ গুলো শুনতো না। আর এই সবকিছুর মাঝে সোফিয়ার ভেতরের মানুষটা ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছিল। যত দিন গড়িয়ে যায় তত তার কান্না থেমে যায়, তার ভয় গুলো হারিয়ে যায়, তার অনুভূতি শূন্য হয়ে যায়। শুধু মাঝে মাঝে একটা ছোট্ট মেয়ে ভেতরে কোথাও চিৎকার করতো,
–“পাপা, আমাকে নিয়ে যাও”
কিন্তু সেই চিৎকার কেউ শুনত না।
লরেন্স সেখানেই থেমে থাকেনি। তার লক্ষ্য ছিল আরও গভীর, একটা মানুষের ভেতর থেকে মানুষটাকেই মুছে ফেলা। এজন্য ছোট্ট সোফিয়াকে একটি লোহার চেয়ারে বেঁধে রাখা হতো। তার সামনে এমন সব দৃশ্য তৈরি করা হতো, যেগুলো কোনো শিশুর চোখে পড়ার কথা নয়, যেগুলো দেখার জন্য মানুষ তৈরি হয়নি। লরেন্স সোফিয়ার চোখের সামনেই তার মাকে নানারকম ভাবে অত্যাচার করতো। সোফিয়া এগুলো দেখে চিৎকার করতে চাইত কিন্তু তার গলা যেন তার সাথেই বেইমানী করে বসে। একটা শব্দও বের হতো না কণ্ঠ থেকে।
তার চোখের সামনে তার পৃথিবী ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল, আর সে বসে থাকতো একটা পাথরের মতো। উমেরা দূরানী মেয়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে মিনতি করতেন,
–“ফিয়া… বাঁচাও আমাকে”
কিন্তু তার মেয়ের চোখে তখন আর কোনো ভাষা ছিল না, ছিল শুধু শূন্যতা। লরেন্স দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখত, তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে সেই ভয়ংকর সন্তুষ্টির হাসি।আর কক্ষের এক কোণে বসে এলেনা ফ্রাঞ্চেস্কা সেই সব দৃশ্য ফুটিয়ে তুলত তার ক্যানভাসে। মানুষের যন্ত্রণা, ভাঙন, আর্তনাদ, এসবই ছিল তার শিল্প। দিনের পর দিন সে আঁকত একটা বিকৃত পৃথিবীর ছবি। উমেরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, তিনি নিজের হাতে নিজের জীবনটাই নরকে ঠেলে দিয়েছেন। একদিন তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সোফিয়া আর আগের সেই শিশু নেই। তার চোখে কোনো ভয় নেই, কোনো কান্না নেই, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
রাত নামলে দূরানী হাউস আরও ভয়ংকর হয়ে উঠত। অন্ধকার করিডোরে প্রতিধ্বনিত হতো পায়ের শব্দ, বন্ধ দরজার ওপারে জমে উঠত নিঃশব্দ আতঙ্ক। কিন্তু সোফিয়া সবকিছু সহ্য করে নিতো, বিনা প্রতিবাদ, বিনা প্রতিরোধে। কারণ তার ভেতরে আর কিছু অবশিষ্ট ছিল না যা ভেঙে দেওয়া যায়। লরেন্স তার পরীক্ষাকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেল, ডোজ বাড়তে লাগল। নতুন নতুন কেমিক্যাল, নতুন পদ্ধতিতে সোফিয়া কে পরীক্ষা করা হতো। কখনো তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকারে রাখা হতো, কখনো তীব্র আলোয় চোখ খুলে থাকতে বাধ্য করা হতো, কখনো তীব্র শব্দে মানুষের আর্তনাদ শোনানো হতো। ধীরে ধীরে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন হতে শুরু করে সোফিয়ার ভিতর। তার চোখে ভয়ের জায়গায় এল স্থিরতা। সে এখন আর ব্যথাকে আর ব্যথা হিসেবে নিচ্ছে না বরং তাকে নিজের অংশ করে নিচ্ছে। লরেন্স তখন বুঝল, সে সফল হচ্ছে। একটা মানুষকে ভেঙে নতুন কিছু তৈরি করার পথে সে এগিয়ে যাচ্ছে।
দিনগুলো যেন ধীরে ধীরে গড়িয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই দিনগুলোর ভেতরে আলো ছিল না, ছিল শুধু জমাট বাঁধা অন্ধকার। লরেন্স এক অদৃশ্য কারাগারে বন্দি করে ফেলে উমেরা আর সোফিয়াকে। বাইরে যাওয়া নিষেধ, কারো সাথে কথা বলা নিষেধ, জানালার ধারে দাঁড়ানো পর্যন্ত নিষেধ। বিশাল প্রাসাদটা যেন ধীরে ধীরে মা মেয়ের জন্য একটা জীবন্ত কবরস্থানে পরিণত হয়ে ওঠে। আর লরেন্স আগের সব সার্ভেন্ট দের তার আর উমেরার বিয়ের দিন কাজ থেকে বের করে দেয়। তাই প্রসাদের ভিতরে কী হচ্ছিল সেই সম্পর্কে বাইরের মানুষ রু শব্দটি জানতো না।
একদিন হঠাৎ করেই উমেরা জানতে পারে—তার মেয়ের এই পরিবর্তনের পেছনে আছে একটা অভিশপ্ত ড্রাগ, “ম্যানবিস্ট’। এটা জানার সাথে সাথে তার মনে হচ্ছিল তার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারে
সে নিজেই নিজের মেয়েকে নরকে ঠেলে দিয়েছে। রাতের পর রাত উমেরা সেজদায় পড়ে কাঁদে তার মেয়ের জন্য। কিন্তু বিপরীতে কোনো উত্তর আসে না, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সোফিয়া আর আগের সেই মেয়ে নেই। তার চোখে আর কোনো অনুভূতি নেই, কোনো মায়া নেই, কোনো ভয় নেই বরং
মানুষের কান্না, আর্তনাদ ও গুলোই যেন তাকে শান্তি দেয়। কারো কষ্টে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে অদ্ভুত এক তৃপ্তির হাসি। উমেরা প্রতিদিন একটু একটু করে বুঝতে পারে তার মেয়ে আর তার নেই, সে এখন লরেন্সের তৈরি একটা জীবন্ত দানব হয়ে গেছে।
কিন্তু সবকিছু এক নতুন মোড় নেয়, যখন সোফিয়ার বয়স আঠারোতে পা দেয়। লরেন্স অনেক আগেই থেকেই এই দিনটার অপেক্ষায় ছিল। কেননা সোফিয়ার বাবা তার সম্পত্তির অর্ধেক লিখে গিয়েছিলেন উমেরার নামে, আর অর্ধেক সোফিয়ার নামে। আর আঠারো পূর্ণ হলেই সবকিছু পুরোপুরি সোফিয়ার হাতে চলে আসবে। লরেন্স জানত এখন সরাসরি কিছু করলে কোম্পানির বোর্ড মেম্বার দের সন্দেহ হবে। তাই সে বেছে নিল, একটা নোংরা, শয়তানি খেলা।
এক রাতে উমেরা নিজের কক্ষে শুয়ে ছিল। তার শরীরে এমন কোনো জায়গা বাদ নেই যেখানে আঘাতের দাগ নেই। লরেন্সের দেওয়া বেল্টের প্রতিটি আঘাতে তার চামড়া ফেটে গিয়েছে এবং তার প্রতিটি চিৎকারে লরেন্সের ঠোঁটের কোণে পৈশাচিক হাসি ফুটে ওঠেছে।
সে তার ক্লান্ত শরীরটাকে নিয়ে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করে। ঠিক তখনই কেউ তার দরজায় কড়া নাড়ে। উমেরা ধীরে ধীরে উঠে দরজা খুলতেই সামনে নজরে আসে দাঁড়িয়ে থাকা সোফিয়া। এক মুহূর্তের জন্য তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। এতদিন পর তার মেয়েটা তার দরজায় এসেছে। উমেরা আর নিজেকে সামলাতে না পেরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে,
–“ফিয়া… মা তুই… তুই এসেছিস…?”
তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। সে মনে মনে ভাবে, যদি আজ শাহজেব বেঁচে থাকতো, যদি সে সেই ভুলটা না করতো তাহলে তার মেয়েটা এমন হতো না। তার বুকটা হুহু করে ওঠে অনুশোচনায়। হঠাৎ সে তড়িঘড়ি করে দরজা বন্ধ করে দিয়ে মেয়ের গালে হাত রেখে আওড়ায়,
–“ফিয়া, ওরা এসে পড়বে। তুই পালা, জানালা দিয়ে পালা। প্লিজ মা… তুই এখান থেকে চলে যা… আমি তোকে আর হারাতে চাই না”
সে প্রায় পাগলের মতো বলতে থাকে,
–‘দেখ… আমি তোকে কিছু বলবো না… তুই শুধু চলে যা। নতুন করে বাঁচ… মা… প্লিজ…”
কিন্তু বিপরীতে সোফিয়া নড়ে না। সে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। হঠাৎ সোফিয়ার ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। ধীরে ধীরে সে নিজের পেছন থেকে একটা ছুরি বের করে। উমেরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছ্যাঁক করে ছুরিটা গিয়ে ঢুকে তার পেটের ভেতর। তৎক্ষনাৎ উমেরা থেমে যায়। তার চোখ বড় হয়ে যায়, শ্বাস আটকে আসে। সে ধীরে ধীরে নিচে তাকাতেই নজরে আসে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসছে তার পেট থেকে। সে মুখ তুলে তাকায় নিজের মেয়ের দিকে আর দেখে সোফিয়া তার পেট থেকে বেড়িয়ে আসা রক্তের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আছে এক অদ্ভুত মোহময় দৃষ্টিতে। যেন সে রক্ত দেখছে না, সে দেখছে কোনো বিকৃত সৌন্দর্য। তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে তৃপ্তির হাসি। তারপর আবার একটার পর একটা আঘাত হানে উমেরার শরীরে। উমেরার শরীর কেঁপে ওঠে, তার কণ্ঠ থেকে বের হয় ভাঙা শব্দ,
–“ফি…য়া…পালা…ম..”
কিন্তু বিপরীতে রমণী না শুনছে আর না থামছে। প্রতিটা আঘাতে তার মুখে বাড়তে থাকে পৈশাচিক আনন্দ। এভাবেই সে নিজের জীবনের প্রথম খুনটা করে নিজের মাকে দিয়ে। দরজা খুলে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে লরেন্স। সে সবটা দেখেছে, তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে সন্তুষ্টির হাসি। সে হাতে থাকা ড্রাগের সিরিঞ্জটা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে ফিসফিস করে,
–“পারফেক্ট”
তারপর সিসিটিভির ফুটেজ নিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায়।
এক ঘণ্টা পর ড্রাগসের প্রভাব কাটতেই সোফিয়া হঠাৎ যেন বাস্তবে ফিরে আসে। তার চোখে আবার অনুভূতি রা ফিরে আসে। সে চারপাশে তাকায় তারপর মাটিতে পড়ে থাকা রক্তাক্ত দেহটার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় আর সাথে তার হাতের ছুরিটাতেও। সবটা বুঝে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। কণ্ঠ থেকে বের হয়,
–“না… না… না”
ধীরে ধীরে এলোমেলো কদমে সে পেছাতে থাকে। তার মাথা ঘুরছে। ফিসফিস করে আওড়ায়,
–‘আমি… আমি এটা করিনি”
হঠাৎ সে ছুটে গিয়ে মাটিতে বসে পড়ে। মায়ের দেহটা কোলে তুলে নিয়ে বলতে থাকে,
–“মা… উঠো… প্লিজ উঠো, আমি মজা করছিলাম। দেখো… আমি এখানে আছি। মা কথা বলো, প্লিজ আমার সাথে কথা বলো”
বিপরীতে কোন সাড়া শব্দ এলো না। সোফিয়া হাহাকার করে ওঠে,
–“মা তুমি কখনো আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরো নি। আমাকে বুকে না জড়িয়ে আমাকে একা ফেলে কোথায় গেলে মা। প্লিজ এদের সাথে থাকতে আমার ভীষণ ভয় করে। চল না, মা আমরা পালিয়ে যাই। মা আমাকে একবার জড়িয়ে ধরো। একবার ডাকো ফিয়া। চোখ খুলো না মা, একবার তাকাও আমার দিকে, দেখো আমি কাঁদছি”
সোফিয়া তার মায়ের গালে হাত রেখে পাগলের মতো বলতে শুরু করে,
–“কিছু হয়নি তোমার, এই দেখো আমি তোমার রক্ত মুছে দিচ্ছি। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি একটু বসো, আমি ডাক্তার ডাকি তুমি ঠিক হয়ে যাবে, তাই না মা?”
নাহ, তার মা কোন প্রতুত্তর করছে না। এবার সোফিয়ার বুকটা হু হু করে ওঠে,
–“মা তুমি আমার সাথে কথা বলছো না কেন? আমি কি এতটাই খারাপ মেয়ে হয়ে গেছি? তুমি কি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে?
আমার খুব ভয় লাগছে মা, চারপাশটা অন্ধকার লাগছে। তুমি উঠে বসো, আমাকে একবার জড়িয়ে ধরো”
সে তার মাকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে অঝোরে,
–“মা… তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি জানি না আমি কি করেছি, আমি নিজেই নিজেকে চিনতে পারছি না। কি হচ্ছে এগুলো আমার সাথে। মা…প্লিজ, প্লিজ আমাকে এভাবে শাস্তি দিও না। আমাকে নিয়ে যাও তোমার সাথে। আমি একা আর বাঁচতে চাই না”
সোফিয়া ফ্লোরে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তার অশ্রুটা থামার নামই নিচ্ছে না। সে তো কখনো মায়ের ভালোবাসা পায়নি। মায়ের ভালোবাসা কেমন তাও তার অজানা। তাহলে কি তার এই জীবনে আর মায়ের ভালোবাসা পাওয়া হবে না?
কথাটা মনের পাতায় উঠতেই সোফিয়া নিজের মায়ের ক্ষতবিক্ষত শরীরটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করতে থাকে। বদ্ধ কামরায় তার চিৎকারগুলো তার কানেই প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে কিন্তু কোন সাহায্যের হাত আসে না। কিছুক্ষণ পর দুজন সার্ভেন্ট এলেনার ক্যানভাস, রং, তুলি নিয়ে আসে। এলেনা এক পলক সোফিয়ার দিকে তাকিয়ে কটু দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তৎক্ষণাৎ তা ফিরিয়ে সম্মুখে তাকিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে রং তুলির অসাধারণ ছোঁয়ায় তার ক্যানভাসে ফুটে ওঠে সোফিয়ার তার মাকে মারার দৃশ্যটা। এদিকে সোফিয়ার কোন দিকে খেয়াল নাই। সে এখনো কাছে একমনে ভাবছে, লরেন্সের দূর্ব্যবহারের পর উমেরা তার মেয়ের কাছে আসলেও সোফিয়ার মনের মধ্যে বসে থাকা রাগটা মাকে ক্ষমা করতে পারেনি। তাই তার মায়ের কাছে যাওয়া হয় ওঠেনি কখনো। আর এখন সে কখনো যেতেও পারবে না। কাঁদতে থাকা সোফিয়ার কানে ভেসে এলো নিজ থেকে আসা উচ্চ স্বরে মিউজিকের শব্দ, মানে লরেন্সের ছেলেরা আবার নারী আর মদ নিয়ে মেতে উঠেছে
পরদিন সেই ফুটেজ পৌঁছে যায় পুলিশের কাছে। আর কিছুক্ষণের পরেঔ সোফিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। সে তখনো চিৎকার করে কাঁদছে,
–“আমি আমার মাকে মারিনি, মা দেখো, এরা তোমার ফিয়া কে নিয়ে যাচ্ছে”
কেউ তার কথা বিশ্বাস করল না। তাকে হাতকড়া বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় থানায়।
সোফিয়াকে আনা হলো একটা অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে কক্ষে। প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় জেরা। লোহার চেয়ারে হাত পা বেঁধে বসিয়ে রাখা হয় তাকে। সামনে কয়েকজন অফিসার তাকে জিজ্ঞেস করতে থাকে,
–“সত্যি বলো, কেন খুন করলে তোমার মাকে?”
–“কেউ তো এমনি এমনি মাকে মারে না।
তুমি পাগল নাকি?”
কিন্তু বিপরীতে সোফিয়ার তরফ থেকে কোন প্রতুত্তর আসে না। সোফিয়া শুধু তাকিয়ে থাকে। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে একটা অদ্ভুত হাসি। প্রথমে তারা ভাবে, এটা হয়তো ভয় লুকানোর চেষ্টা। তাই তারা সত্যি টা বের করার জন্য শুরু করে অত্যাচার। ইলেকট্রিক শক মেশিনের তার সারা শরীরে লাগানো হয়। সুইচ অন হতেই তার শরীর কেঁপে ওঠে, পেশীগুলো শক্ত হয়ে যায়, শিরা উপশিরায় বিদ্যুৎ যেন আগুন হয়ে দৌড়াতে থাকে। কিন্তু সোফিয়া কাঁদে না, আর না কিছু বলছে।
একদিন, দুইদিন পুরো এক সপ্তাহ ধরে একই ঘটনা। মারধর, শক, জেরা কোন কিছুতেই সোফিয়া কিছুই বললো না। অবশেষে জেল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়, এই মেয়ে স্বাভাবিক না। এক সপ্তাহ পর তাকে পাঠানো হয় “মেন্টাল এসাইলামে”
সোফিয়ার দেখা হয় অদ্ভুত সব রোগীর সাথে।
আর সেই জায়গায় এসে যেন সত্যিকারের নরক শুরু হয় সোফিয়ার জন্য। কেননা এখানে নেই সেই ‘ম্যানবিস্ট ড্রাগস’। যে ড্রাগস তার এক প্রকার নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেটা তার শিরায় শিরায় বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ে তাকে অন্য এক অস্তিত্বে পরিণত করেছিল। সেটা হঠাৎ করেই বন্ধ হতেই শুরু হয় পাগলামি। কখনো তার চোখ লাল হয়ে ওঠে, শ্বাস ভারী হয়ে যায়। কখনো সে নিজের মাথায় হাত দিয়ে দেয়ালে আঘাত করতে থাকে। কখনো সে অন্য রোগীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তার চুল টেনে ধরে, ঠেলে ফেলে দিয়ে চিৎকার করে ওঠে,
–“চুপ কর, সব চুপ কর, তোদের শব্দ আমার মাথার ভিতর বাজছে”
কখনো কখনো তো সে নিজের হাত কামড়ে রক্ত বের করে ফেলে। কখনো বা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে, কখনো অন্য রোগীর গলা চেপে ধরে। এই অবস্থায় তাকে বেঁধে ফেলা হয়। লোহার শিকল দিয়ে বেডের সাথে হাত পা টেনে বেঁধে রাখা হয়, যেন সে আর নড়তে না পারে। কিন্তু যখন সেই ড্রাগ নেওয়ার সময়টা পেরিয়ে যায় তখন সে চিৎকার করে বলতে থাকতো,
–“মা…মা… আমাকে নিয়ে যাও।
আমি এখানে থাকবো না, আমি বাড়ি যাবো’
–“পাপা, তুমি কোথায়? ওরা তোমার রাজকন্যা কে পাগল বলছে। আমি পাগল না, আমি পাগল না, শুনছেন আপনারা?
আমাকে খুলে দিন, প্লিজ খুলে দিন, আমি পালাবো না। আমি শুধু মায়ের কাছে যাবো’
কিন্তু কেউ শুনতো না তার আহাজারি গুলো আর না কেউ এগিয়ে আসতো সাহায্যের জন্য। বরং চারপাশ থেকে মানুষ জন উল্টো তাকে বলতো,
–“খুনি, নিজের মাকে মেরেছে। পাগল মেয়ে”
সোফিয়া কাঁদতে কাঁদতে মাথা নাড়িয়ে বলতে থাকে,
–“না… না… আমি করিনি, আমি আমার মাকে মারিনি”
কেউ বিশ্বাস করল না তার কথা, দিনের পর দিন সে শিকলবন্দি হয়ে পড়ে থালতো। তারপর একদিন সে চুপ হয়ে যায়। কোনো কথা নেই, কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, শুধু মলিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো সারাদিন। ডক্টররা ভাবে হয়তো সে একটু স্বাভাবিক হয়েছে। তাই একদিন তার শিকল খুলে দেওয়া হয়।
একদিন, এক নার্স তাকে খাবার দিতে এসে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে,
–“যেই হাতে মাকে খুন করেছিস সেই হাতে মুখে খাবার তুলতে লজ্জা করে না”
এদিকে ‘খুনি’ শব্দটাই যথেষ্ট ছিল সোফিয়ার শান্ত মস্তিষ্ক কে বিগড়ে দিতে। সাথে সাথে সোফিয়ার চোখ বদলে যায়। পাশের টেবিল থেকে একটা কিচেন নাইফ তুলে নিয়ে কেউ কিছু বুঝে ওঠার। সে পরপর আঘাত হানতে থাকে কোন কিছু না ভেবে। রক্ত ছিটকে পড়ে চারদিকে। নার্সটা আর্তনাদ করে ওঠে আর সোফিয়া দন্ত পাটি পিষে চিৎকার করে,
–“আমি খুনি না, শুনছিস, আমি খুনি না। আমি আমার মাকে মারিনি”
বিষয় টা আকষ্মিক হওয়াতে সবাই এক মুহূর্তে থেমে যায় পর মুহূর্তেই কয়েকজন মিলে তাকে ধরে ফেলে। জোর করে টেনে সরিয়ে দেয়। সোফিয়া তখনো চিৎকার করছে,
–“আমি পাগল না, আমি পাগল না”
কিন্তু সেদিনও কেউ তার কথা বিশ্বাস করেনি।
আবারও তাকে শিকল বন্দী করা হয়। এবার একদম আলাদা অন্ধকার নিঃশব্দ কক্ষে। এবার আর কেউ আসে না তার কাছে। শুধু দিনে একবার একটা শুকনো রুটি দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। দিন যত গড়াতে থাকে সোফিয়া তত শান্ত হতে থাকে।
হঠাৎ করেই একদিন মেন্টাল অ্যাসাইলামে আসে একটি ইন্টারন্যাশনাল সাইকিয়াট্রিস্ট টিম। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নামী মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত এই টিম মূলত এসেছিল একটি বিশেষ প্রজেক্টের জন্য। একটি বিরল মানসিক অবস্থার রোগীদের উপর গবেষণার জন্য। যেখানে ‘ট্রমা ইনডিউসড সাইকোপ্যাথি’, ‘ড্রাগস ডিপেন্ডেন্ট ডিসঅর্ডার’ এবং ‘ইমোশনাল সিনড্রোম’ নিয়ে কাজ করা হচ্ছিল। আর সেই তালিকার শীর্ষে ছিল
“সোফিয়া জাওয়ান”
একজন মেয়ে, যে নিজের মাকে খুন করেছে বলে অভিযুক্ত, কিন্তু জেরা করলে কাঁদে না,শুধু হাসে। যে অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করেও ভেঙে পড়ে না, আবার কখনো হঠাৎ পাগলের মতো চিৎকার করে ওঠে। এই বিরোধাভাসই তাকে করে তুলেছিল গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু।
টিমের সদস্যরা একে একে ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু তাদের মধ্যেই একজন যাকে একবার দেখলেই আলাদা করে চোখে পড়ে সে হলো,
“ইকবাল জাওয়ান”
বয়স ত্রিশের কাছাকাছি, তার গায়ের রং কিছুটা শ্যামবর্ণের ছিল কিন্তু তার কৃষ্ণ কালো মনির এতটাই গভীর যে, কেউ যদি একবার সেই চোখে তাকায় মনে হবে সে ডুবে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে এক অজানা গহ্বরে। ঠোঁটের কোণে সবসময় লেগে থাকতো একটুখানি সংযত হাসি। তার হাতের ফাইলের ওপর লেখা ছিল,
-“Case: Sofia Durani”
ইকবাল জাওয়ান ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায় সেই নির্জন কক্ষের দিকে।
এদিকে সেই অন্ধকার কক্ষে দেয়ালের কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে সোফিয়া। চোখ দুটো ফাঁকা, চুল এলোমেলো। সে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে আওড়ায়,
–“মা…তুমি কোথায়?
তুমি একবার এসে বলো না, সব ঠিক হয়ে যাবে…আমি খুব একা হয়ে গেছি। তারা সবাই বলে আমি খুনি, তুমি বলো না মা, আমি আমি তোমার মেয়ে, আমি খুনি না”
ধীরে ধীরে তার চোখের পানি শুকিয়ে আসে। তার বুকের ভেতরের হাহাকার গুলো ধীরে ধীরে অন্য কিছুতে রূপ নিতে শুরু করে। সে দরজার দিকে তাকিয়ে রোজ বলতো,
–“লরেন্স…যেদিন আমি এই দরজার বাইরে যাবো। সেদিন… শেষ দিন হবে তোর”
সে দিনের পর থেকে সে অপেক্ষা করতে থাকে দরজা খোলার। আর আজ সেই দরজাটা সত্যিই খুলে যায়। তা দেখে সোফিয়ার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু সে যখন চোখ তুলে তাকায় তখনই তার দৃষ্টি আটকে যায় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানবে, তার কৃষ্ণ কালো গহ্বরে। চারপাশের শব্দ যেন থেমে যায়। সোফিয়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ইকবাল ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে, তার সামনে এসে বসে পড়ে। সে একটু ঝুঁকে, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দেয়,
–“হ্যালো, আম ইকবাল জাওয়ান, এন্ড ইউ…আই থিঙ্ক সোফিয়া?”
বিপরীতে সোফিয়ার তরফ থেকে কোন শব্দ আসে না। শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে। ইকবাল ধীরে ধীরে নিজের হাতটা গুটিয়ে নিয়ে ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলে,
–“আউট সাইড, আই হিয়ার’ড সামথিং, ইউ কিল’ড ইয়োর মাদার, এম আই রাইট”
‘খুন’ শব্দটা শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই সোফিয়া যেন বিদ্যুৎ খেয়ে ওঠে। সে তাৎক্ষণিক বাস্তবে ফিরে হঠাৎ মাথা নাড়তে শুরু করে,
–“না… না… আমি খুন করিনি, আমি কাউকে খুন করিনি। আমি খুনি না, আমি আমার মাকে মারিনি। ওরা মিথ্যে বলছে, ওরা মিথ্যে বলছে”
সে একনাগারে বলতে থাকে,
–“আমি আমার মাকে…”
হঠাৎ একটা খসখসে পুরুষালী হাত তার তুলতুলে নরম গালে এসে থামে।সাথে সাথে সোফিয়া থেমে যায়। ইকবাল ধীরে বলে,
–“রিল্যাক্স”
সে একটু থেমে তারপর সোফিয়ার বাদামী চোখজোড়ায় চোখ রেখে বলে,
–“আই টাস্ট ইউ, তুমি কাউকে খুন করো নি”
এক মুহূর্তে সবকিছু থেমে যায় সোফিয়ার চোখ যেন বিস্ফোরিত হয়ে গেল। এতদিন এত মানুষকে, এত চিৎকার করে বলেছে সে কিন্তু কেউ তার কথা বিশ্বাস করেনি। আর আজ একজন তার একটা কথায় সব বিশ্বাস করে নিল?
পর মুহূর্তে কিছু একটা ভেবে তার চোখে আবার সন্দেহ জাগে। সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বলতে থাকে,
–“না, না, না, ওরা আবার আমাকে বেঁধে ফেলবে, সবাই মিথ্যা বলছে”
তার কথায় ইকবাল কোন প্রতিক্রিয়া না করে শুধু হালকা হেসে বলে,
–“ফ্রম টুডে, আম ইয়োর ডক্টর। এক মাস তুমি আমার ট্রিটমেন্টের আন্ডারে থাকবে। আমি আশা করি, এই এক মাসে তুমি আবার পৃথিবীর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে”
সে একটু ঝুঁকে সোফিয়ার কানের কাছে খুব আস্তে ফিসফিস করে,
–“আর আমি এটাও বিশ্বাস করি, তুমি খুনি নও”
সোফিয়া চমকে তাকিয়ে থাকে। ইকবাল উঠে দাঁড়ায়। তার ঠোঁটে ফুটে ওঠে একটা রহস্যময় হাসি। সে কিছু না বলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে যায়। দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু
সোফিয়ার বুকে বুকের ভেতরটা অনেক দিন পর একটু হালকা লাগে। আর প্রথমবারের মতো তার চোখে ভয়ের সাথে সাথে একটা নতুন অনুভূতি জন্ম নেয় তা হলো বিশ্বাস।
সে দিনের পর থেকে মেন্টাল অ্যাসাইলামের সেই বন্ধ দরজার ভেতর শুরু হয় এক অদ্ভুত গল্প৷ একটা ভাঙা মেয়ের আর এক মানবের, যে তাকে আবার মানুষ হতে শেখাতে চায়। প্রথম দিন থেকেই ইকবাল নিয়মিত আসতে শুরু করে। সে চেয়ার টেনে সোফিয়ার সামনে বসিয়ে তার চিকিৎসা শুরু করে। ইকবাল তার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে,
–“তোমার নাম?”
সোফিয়া কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফিসফিস করে,
–“সোফিয়া”
–“ফুল নাম?”
–“সোফিয়া দূরানী”
–“তুমি জানো, তোমার বিরুদ্ধে কি অভিযোগ?”
সোফিয়া সাথে সাথে মাথা নাড়িয়ে বলতে থাকে,
–“আমি… আমি খুন করিনি, আমি আমার মাকে মারিনি”
ইকবাল তার কথা কেটে খুব শান্তভাবে বলে,
–“আমি তো বলছি, আমি তোমাকে বিশ্বাস করি, তুমি কাউকে খুন করোনি”
বিপরীতে সোফিয়া থেমে যায়। সে অবিশ্বাসের সুরে বলে,
–“সত্যি…?”
–“হুম”
আর সেই মুহূর্তে প্রথমবারের মতো সোফিয়ার ভেতরের ভাঙা দেয়ালে একটা ছোট ফাটল ধরে।
দিন গড়াতে থাকে প্রতিদিন একই সময়ে ইকবাল আসে। কখনো তাকে প্রশ্ন করে, কখনো তাকে সান্ত্বনা দেয় আবার কখনো বলে,
–“ভয় পাবে না, আমি আছি”
এই “আমি আছি” দুইটা শব্দই যেন সোফিয়ার জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে ওঠে। এইভাবে কেটে যায় প্রায় বিশ দিন। এই বিশ দিনে তাদের মধ্যে জন্ম নেয় অদ্ভুত এক সম্পর্ক। ডাক্তার আর রোগীর সীমা পেরিয়ে আরো গভীরে। এরিমধ্য একদিন সোফিয়া খেতে চাইছিল না। ট্রে সামনে রেখে বসে আছে, কিন্তু কিছুই ছুঁচ্ছে না। ইকবাল এসে চুপচাপ তার পাশে বসে জিজ্ঞেস করে,
–“খাচ্ছো না কেন?”
–“খিদে নেই…”
ইকবাল নিজে হাতে খাবার তুলে তার মুখের সামনে ধরে অনুরোধের সুরে বলে,
–“না খেলে অসুখ করবে, এক চামচ নাও”
সোফিয়া কিছুক্ষণ অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকে। তার বাবার মৃত্যুর পর আজ পর্যন্ত কেউ তার মুখে খাবার তুলে দেয়নি। তার বাবার কাছে সময়ের স্বল্পতার জন্য মাঝে মাঝে তাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিত। আর ছোট্ট সোফিয়া সেটা তৃপ্তি ভরে খেত। আর না হয় সব সময় একগাদা খাবার রাজকীয় টেবিলে চড়ে থাকতো আর সোফিয়া একটা চেয়ারে চুপচাপ বসে একা একটু করে খেত। সে অনেক সময় তার মায়ের কাছে যেত তাকে খাইয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তখনকার দুরন্তপনা উমেরা মেয়েকে অগ্রাহ্য করত না। তারপর লরেন্স আসার পর থেকে তাদের দুই মা মেয়েকে নির্দিষ্ট খাবার দিত। আর লরেন্স তো তাকে বেশিরভাগ সময় খালি পেটে রাখতো এক্সপেরিমেন্টের জন্য। কিন্তু আজ এতগুলো দিন পর কেউ তার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। এই যেন অবিশ্বাস্য এক কর্মকাণ্ড। সোফিয়ার চোখের কোণ চিকচিক করে ওঠে। তারপর ধীরে ধীরে সে মুখ খুলে। সেদিন অনেকদিন পর সে কারো হাত থেকে তৃপ্তি ভরে খায়।
তারপর এক রাতে সোফিয়া হঠাৎ চিৎকার করে উঠে। কেননা আজ বহুদিন পর সে আবার হেনরি আলেকজান্ডারের সাথে থাকা সেই ভয়ংকর রাতগুলোর স্বপ্ন দেখেছে। গার্ডরা তার চিৎকার শুনে ছুটে আসে, কিন্তু তাদের আগেই পাগলের মতো ছুটে আসে ইকবাল। সে এসে সোফিয়াকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে। সাথে সাথে সোফিয়া শান্ত হয়ে যায়। ইকবাল কিছু না বলে শুধু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
তার কিছুদিন পর একদিন সোফিয়া দেয়ালে আঁকিবুঁকি করছিল। ইকবাল এসে সেগুলো মনোযোগ সহকারে দেখে জিজ্ঞেস করে,
–“কি আঁকছো?”
সোফিয়া সেদিকে তাকিয়েই বলে,
–“মা…”
ইকবালের নজরে আসে ছোট্ট একটা মুখ, কাঁপা হাতে আঁকা। ইকবাল কিছুক্ষণ চুপ করে দেখে। তারপর উচ্ছ্বাস ভরা কণ্ঠে বলে,
–“খুব সুন্দর হয়েছে”
সোফিয়া অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়। খুশিতে গদগদ হয়ে বলে,
–“সত্যি?”
–“হুম সত্যিই, ঠিক তোমার মতো সুন্দর হয়েছে”
–“আমি সুন্দর”
ইকবাল আরেকটু এগিয়ে এসে তার চোখে চোখ গেঁথে ঘোর লাগা কণ্ঠে শুধালো,
–“হুম, পৃথিবীর সব সৌন্দর্য সৃষ্টিকর্তা এখানে ঢেলে দিয়েছে”
সোফিয়া একদম আশা করেনি তার এমন জবাব। তাই সে লজ্জা বতীর ন্যায় মিইয়ে যায়। ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে একটা লাজুক হাসি ফুটে ওঠে। আর বিপরীতে ইকবালের ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে।
ইকবাল রোজ সকালে তাকে নিয়ম করে বাইরে ছোট্ট গার্ডেনে নিয়ে যায়। প্রথম দিন সোফিয়া নাক মুখ কুঁচকে ফেলে। কেননা আজ অনেকদিন পর সে রোদ দেখতে পেয়েছে। অষ্টাদশী বহুদিন পর খোলা আকাশ দেখে আনন্দে মেতে উঠে। আর ইকবাল তাকিয়ে থাকে তার দিকে ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে। যেন সে চোখ সরাতে পারছে না।
এছাড়া ইকবাল একদিন তার জন্য বই নিয়ে আসে। সোফিয়া বই দেখেই চমকে উঠে। ইকবাল শান্ত স্বরে বলে,
–“পড়তে পারো?”
বিপরীতে রমণী মাথা নেড়ে বলে,
–“ভুলে গেছি…”
–“আমি শিখিয়ে দেবো”
সেদিন থেকে ইকবাল তাকে পড়াশোনা শেখাতে শুরু করে। একটা একটা শব্দ, একটা একটা লাইন ধরে ধরে তাকে শিখায়। কখনো
তাদের আঙুল ছুঁয়ে যায় একে অপরের সাথে।
তবে আরেক দিন ঘটে এক ভীতিকর ঘটনা। একদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সোফিয়া সেই বৃষ্টি দেখছিল একমনে। সে বৃষ্টিতে এতটাই মগ্ন ছিল যে কখন ইকবাল এসে তার পাশে দাঁড়ায় সে টেরই পায়নি। সোফিয়া তার দিকে তাকাতেই একটু সরে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ দুজনে নিঃশব্দে বৃষ্টি দেখে। প্রথম নীরবতা কেটে ইকবাল সোফিয়ার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে,
–“ভিজতে চাও?”
সোফিয়া তাৎক্ষণিক অবাক চোখে তাকিয়ে দুদিকে মাথা নেড়ে না বোঝায়। বিপরীতে কোন উত্তর এলো না বরং প্রথমবারের মতো ইকবাল সোফিয়ার হাতটা শক্ত করে মুঠো চেপে ধরে বলে,
–“চলো,
–“না, না, আমি যাব না। কি করছেন?
বৃষ্টি আমার ভালো লাগে না”
ইকবাল সোফিয়ার নিষেধাজ্ঞা কানেই তুলল না। সে তাকে টেনে নিয়ে গেল বাহিরে খোলা গার্ডেনে। যদিও প্রথমে সোফিয়া ভিজতে চাইনি তারপরও ইকবালের জোরাজুরিতে পরে তার জীবনে প্রথমবারের মতো সে মন ভরে বৃষ্টি উপভোগ করে। যার কারণে পরদিনে সোফিয়া জ্বর বাধিয়ে ফেলে। সে কি কঠিন জ্বর?
এজন্যই সোফিয়ার বাবা তাকে কখনো বৃষ্টিতে ভিজতে দিত না। এই জ্বর সেরে উঠতে দুই দিন লেগে যায়। কিন্তু এই দুইদিনে ইকবাল রাত দিন এক করে তার সেবায় লেগে পড়ে। কোন নার্স না, সে নিজ হাতে সোফিয়ার সেবা শুরু করে। সারাটা জীবন ভালোবাসার অভুক্ত থাকা সোফিয়া যেন এ কদিনে আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে ইকবালের প্রতি। সোফিয়া তার দিকে তাকিয়ে কিছুটা মনমরা হয়ে বলে,
–“আপনি চলে গেলে, আমার অনেক খারাপ লাগবে”
বাক্যটা উগড়ে দিয়েই সোফিয়া মুখ ফিরিয়ে নিল। জিহবা কেটে নিজের লজ্জা লুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, ইস কী বলতে কী বলে ফেলেছে। ইকবাল সবটা বুঝে ঠোঁটে হাসি টেনে বলে,
–“তাহলে আমি যাবো না”
সোফিয়া তড়িৎ গতিতে তার দিকে তাকিয়ে কিছু না বলে মুখ লুকিয়ে ফেলে।
এই বিশ দিনে সোফিয়ার জমাট বাঁধা হৃদয় ধীরে ধীরে গলতে থাকে ইকবাল জাওয়ানের প্রতি। আর ইকবাল, সে শুধু সোফিয়ার জন্য তার ডাক্তার থাকে না। বরং হয়ে ওঠে তার একটা আশ্রয়, একটা বিশ্বাস, একটা অনুভূতি।
একদিন সোফিয়া চুপচাপ বসে আছে ইকবালের কেবিনে। ইকবাল তাকে দ্বিতীয় দিনই সেই অন্ধকার রুম থেকে বের করে নিয়ে এসেছে। ইকবাল অন্য রোগীদের দেখতে গেছে। ইকবাল ফিরে এসে তার কেবিনে সোফিয়া কে দেখে একদম অবাক হয় না। কেননা এটা সোফিয়ার রোজকার কাজ। একটু সময় ফেলেই তার কেবিনে ছুটে আসা। কিন্তু আজ সোফিয়া একটা অদ্ভুত আবদার করে বসে ইকবালের কাছে,
–“ডক্টর…”
ইকবাল তার জন্য মেডিসিন নিতে নিতে ছোট করে উত্তর করে,
–“হুম?”
–“একটা আবদার করবো?”
–“কি?”
–“আমাকে… একবার বাইরে নিয়ে যাবেন?”
ইকবাল ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
–“কেন?”
–“আমি… মায়ের কবরটা দেখতে চাই”
এক মুহূর্তে নীরবতা নেমে আসে কক্ষে। ইকবাল কিছুক্ষণ পর বলে,
–“এটা সম্ভব না…”
সোফিয়া মাথা নিচু করে মুখ ফুলিয়ে বলে,
–“না হয় আমি মেডিসিন খাব না’
ইকবাল একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে রাজী হয়ে যায়,
–“ঠিক আছে…”
সোফিয়া মাথা তুলে তাকিয়ে বলে,
–“সত্যি?”
ইকবাল তার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
–“শুধু একবার…”
সেদিন গভীর রাতেই ইকবাল গার্ডদের এড়িয়ে
চাবি নিয়ে ধীরে দরজা খুলে। অনেকদিন পর সোফিয়া বাইরে পা রাখে। মুক্ত বাতাসে সে চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস টেনে নেয়। ইকবাল তার দিকে তাকিয়ে বলে,
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬
–“চলো…”
এই বলে সে হাত বাড়িয়ে সোফিয়ার অনুমতি ছাড়াই তার হাত ধরে ফেলে। বিপরীতে রমণীও তাকে আর আটকায় না। দুজন নিঃশব্দে অন্ধকার রাতের ভেতর দিয়ে অজানার দিকে পা বাড়ায়।
