হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৪
সাবা খান
ভোরের আলো ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ আশ্রমটাকে ছুঁয়ে দিচ্ছে। রাতের সেই গভীর অন্ধকার আর নীরবতা যেন সরে গিয়ে জায়গা করে দিচ্ছে এক অদ্ভুত শান্তিকে। দূরের গাছগুলোর পাতায় জমে থাকা শিশিরে সূর্যের আলো পড়ে ঝিকমিক করছে। কোথাও একটা পাখি ডেকে উঠল, তারপর আরেকটা ধীরে ধীরে যেন জীবন আবার ফিরে আসছে এই নীরব জায়গাটায়।
আশ্রমের উপরের তলার ঘরটাও আলোর ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিছানার এক পাশে নিঃশব্দে শুয়ে আছে ইবেলিনা। তার চোখ খোলা, কিন্তু দৃষ্টি স্থির পাশে থাকা মানবের উপর। ঘুমন্ত জ্যাককে কেমন নিষ্পাপ বাচ্চা মনে হচ্ছে তার কাছে। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল যেন বহুদিনের তৃষ্ণা মিটাচ্ছে। অন্যদিকে জ্যাক, সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন যেন বহু দিন পর শান্তিতে ঘুমাচ্ছে, তার শ্বাস প্রশ্বাস ভারী, কিন্তু শান্ত।
ইবেলিনা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
এই মানুষটা যে তাকে বন্দি করেছে, আবার নিজের মতো করে আগলেও রেখেছে। যে তার জীবনের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে, আবার অদ্ভুতভাবে তার জীবনটাই হয়ে গেছে। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সে ধীরে ধীরে উঠে বসে। তারপর খুব আস্তে করে বিছানা থেকে নেমে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বাইরে সকালের আলো। কিন্তু তার ভেতরে এখনো সেই রাতের ছায়া।
কিছুক্ষণ পর পেছনে নড়াচড়ার শব্দ হয়, জ্যাক নিজের ঘুম জড়ানো চোখ গুলো আধো আধো খুলে চারপাশে তাকায়। তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে থামে ইবেলিনার ওপর। আবেশী স্বরে ডাকে,
-“মোরনি জান…”
ইবেলিনা এখনো স্থির, সে পিছন ফিরে তাকাল না। জ্যাক আবার বলে,
-“এত সকালে কেন উঠেছো?”
বিপরীতে কোনো উত্তর আসে না। কিছুক্ষণ নীরবতায় কেটে যায়। তারপর জ্যাক বিছানা থেকে নেমে ওয়াশেরে চলে যায়। কিয়ৎকাল পর বেড়িয়ে ধীরে ধীরে রেডি হতে শুরু করে। জ্যাক শার্ট পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাই হাতে নেয়। কিন্তু বাঁধতে গিয়ে থেমে যায়।
তার চোখ আয়নার মধ্যে দেখা যাওয়া ইবেলিনার প্রতিবিম্বের দিকে,
-“এদিকে আসো”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইবেলিনা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। তার মুখ থমথমে। কোনো অভিব্যক্তি নেই। সে জ্যাকের সামনে দাঁড়িয়ে তার হাত থেকে টাইটা নিয়ে নেয়। নীরবে টাইটা গলায় পরিয়ে ঠিক করতে থাকে। জ্যাক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
-“কি হয়েছে?”
কোনো উত্তর নেই। রমণী এক মনে টাই ঠিক করতে থাকে। জ্যাকের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। সে রমণীর তুলতুলে চিবুক চেপে ধরে শক্ত কণ্ঠে বলে,
-“লিনা…আমার অবহেলা একদম পছন্দ না”
ইবেলিনা হাত না থামিয়ে খুব শান্ত গলায় বলে,
-“আমি আর এভাবে থাকতে চাই না”
জ্যাকের চোখ এক ঝলকে পরিবর্তন হয়ে গেল,
-“মানে?”
ইবেলিনা ধীরে ধীরে মাথা তোলে ধূসর চোখজোড়ায় দৃষ্টি স্থির করে বলে,
-“আমি বন্দি থাকতে চাই না,
আমি এই চার দেয়ালের বাইরে যেতে চাই। আমি মানুষের মাঝে যেতে চাই। আমি বাঁচতে চাই নিজের মতো করে। ছয় বছর… ছয় বছর আমি এখানে আছি। আমি জানি না পৃথিবী কেমন বদলে গেছে। আমি জানি না আমার জন্য বাইরে কিছু আছে কিনা, কিন্তু আমি দেখতে চাই”
জ্যাক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তার চোখ ইবেলিনার চোখে স্থির। কোনো রাগ নেই, কোনো বিস্ময় নেই শুধু গভীর, অদ্ভুত নীরবতা। তারপর খুব ধীরে সে বলে,
-“হুম…”
ইবেলিনা তার দিকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করেছে, কিসের ভিত্তিতে জ্যাক হুম বলেছে।
জ্যাক অন্য হাত বাড়িয়ে তার চিবুক আলতো করে তুলে ধরে। তার চোখে তাকিয় থাকে কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায়। তারপর নিচে নেমে প্রেয়সীর অধর স্পর্শ করে বলে,
-“রেডি থাকো”
এইটুকুই বলেই সে কোটটা পরে নেয়। তারপর আর একবারও পেছনে না তাকিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে পড়ে। ইবেলিনা স্থির দাঁড়িয়ে আছে, তারপর কিছু একটা ভেবে দৌড়ে ব্যালকনিতে চলে যায়।
ইবেলিনা স্থির দাঁড়িয়ে থাকে ব্যালকনিতে। ভোরের কোমল আলো এখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে আশ্রমজুড়ে। তার দৃষ্টি নিচের উঠোনে। জ্যাক সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই হঠাৎ করেই কোথা থেকে যেন কয়েকটা ছোট ছোট বাচ্চা দৌড়ে এসে তাকে ঘিরে ধরে। কেউ তার হাত ধরে টানছে, কেউ হাসতে হাসতে কিছু বলছে, কেউ আবার শুধু তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে এক ধরনের নির্ভরতায়।
দৃশ্যটা এতটাই অপ্রত্যাশিত, এতটাই অদ্ভুত যে ইবেলিনা কিছুক্ষণ নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে যায়। এই মানুষটাই কি সেই জ্যাক? যে মানুষের চোখে সে শুধু নির্মমতা, নিয়ন্ত্রণ আর অদ্ভুত এক অন্ধকার দেখেছে। সেই মানুষটা এখন নিচে দাঁড়িয়ে এক শিশুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আরেকজনকে কোলে তুলে নিয়ে কিছু বলছে। তার ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটা হাসি। ইবেলিনার বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে ওঠে। সে ধীরে ধীরে ব্যালকনির রেলিংয়ে হাত রাখে। মনে মনে ভাবে,
“জ্যাক হয়তো সারা পৃথিবীর কাছে একরকম, কিন্তু এই ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর কাছে সে একদম অন্য মানুষ”
তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। একটা নরম, অচেনা অনুভূতি বয়ে যায় তার ভেতর দিয়ে। তার হাতটা অজান্তেই ধীরে ধীরে নিজের উদরের ওপর চলে যায়। মনের ভিতর কিছু এলোমেলো ভাবনারা উঁকি দেয়,
যদি তাদের একটা বাচ্চা থাকতো?
একটা ছোট্ট প্রাণ তাদের দুজনের। তাহলে কি জ্যাক এমনই করে হাসতো? এভাবেই কোলে তুলে নিত? এভাবেই মাথায় হাত বুলিয়ে দিত?
নাকি সেই বাচ্চাটাও তার মতোই এই আশ্রমের দেয়ালের ভেতরে বন্দি হয়ে বড় হতো?
রমণীর ভ্রু কুঁচকে আসে। ভাবনাগুলো এলোমেলো হয়ে যায়। কিন্তু তবুও কোথাও একটা অদ্ভুত আকাঙ্ক্ষা মাথা তোলে দাঁড়ায়। সে চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্য কল্পনা করে, ছোট্ট একটা হাত, জ্যাকের আঙুল আঁকড়ে ধরে আছে।
হঠাৎই গাড়ির ইঞ্জিনের কর্কশ শব্দ সেই কল্পনাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ইবেলিনা তড়িৎ গতিতে চোখ খুলে তাকায়, নজরে আসে জ্যাক গাড়িতে উঠে বসেছে। এক মুহূর্তের জন্যও সে উপরে তাকায় না। গাড়িটা ধীরে ধীরে গেট পেরিয়ে বেরিয়ে যেতে শুরু করে।
ইবেলিনা স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। তার দৃষ্টি গাড়িটার ওপর আটকানো। যতক্ষণ দেখা যায় সে তাকিয়েই থাকে। গাড়িটা তার দৃষ্টিগোছর হতেই তার চোখের কার্নিশ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা জল। সে টেরই পায় না প্রথমে। তারপর ধীরে ধীরে হাত তুলে মুছে নিল। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। ভেতরে ঢুকে দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে দেয়। ঘরটা আগের মতোই নিঃশব্দ, স্থির, বন্দি। ইবেলিনা একবার চারদিকে তাকায়। তারপর ধীরে ধীরে বিছানার দিকে এগিয়ে এসে বসে পড়ে। দুটো হাত নিজের কোলে রেখে ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সামনে। মনে মনে গুনতে শুরু করে,
আর কতদিন?
আর কত রাত?
আর কত অপেক্ষা?
জ্যাক আবার কবে আসবে?
কবে সে তাকে রোজ দেখতে পারবে?
এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর তার অজানা কিন্তু তবুও সে অপেক্ষা করে। কারণ এই অপেক্ষাটুকুই এখন তার জীবনের একমাত্র চলমান সত্য।
আজ সকাল থেকেই ভীর নিবাসে চলছে হট্টগোল। ঠিক নিবাসের ভিতরে না, বাহিরে। সানাদের ডানপাশের যে প্রতিবেশী থাকে, তিনিও বাঙালি। পুরো লিনহুয়া ভ্যালিতে মাত্র তিন কি চারটা ফ্যামিলি হচ্ছে বাঙালি। কিন্তু সানাদের পাশে থাকা ভদ্রলোক ‘সালার হোসেন’ প্রচুর কৃপণ। এক কথায় সানার থেকেও বেশি। উনার বাড়ি চারপাশে ফলের বাগান অসংখ্য, কিন্তু একটাও কাউকে কোনদিনও দিবেনা। সেজন্য আজ সাত সকালে মিশন চালিয়েছে সেখানে সানা, ঈশানী ও এসপি। এসপি ও ঈশানী পাহারা দিবে দুদিক থেকে, আর সানা মাঝখান থেকে কাজ সারবে। কিন্তু সমস্যা বাধে যখন ভদ্রলোক হঠাৎ করে তল্লাশি চালান। সানা পিছনে থাকাতে সে এক দৌড়ে দেওয়াল টপকে চলে আসে, কিন্তু এসপি সামনে থাকাতে লক্ষ্যই করেনি উনাকে। সে ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশ থেকে সামনে তাকাতে চমকে ওঠে, কেমন র*ক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে সালার হোসেন। এসপি পিছনে তাকাতেই দেখে দুই রমণীর চিহ্নটুকু নেই। মানে তাকে ফাঁসিয়ে পালিয়েছে এরা। ব্যাস, তারপর থেকে শুরু হয়ে গেল ভদ্রলোক। নিজের দাঁত পিষে বাক্য ছুঁড়ে,
-“তোমার মত লাফাঙ্গা ছেলে, আবারো আমার বাগানে চুরি করতে এসেছ? কদিন পর বাচ্চার বাপ হবে, কিন্তু এখনো নিজের অভ্যাস ত্যাগ করতে পারোনি?”
সামনে থাকা এসপি তড়িঘড়ি করে প্রত্যুত্তর করে,
-“বিশ্বাস করেন, সালার বস্তা মানে সালার আংকেল, আপনার আপেল গাছে যে দশটা আপেল ধরেছে, আমি এটা একদমই জানি না”
-“আচ্ছা, ঠাকুর ঘরে কে? আমি তো কলা খাইনি! তুমি জানলে কিভাবে আমার গাছে দশটা আপেল আছে?”
বাক্যটুকু শ্রবণ হতে এসপি দাঁত দিয়ে জিভ কাটে, ইস! কি বলতে কি বলে ফেলেছে। তিনি কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে উত্তরের আশায়, শুধু পারছেন না এসপিকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। এসপি মিনমিন করে বলে,
-“ইয়ে… মানে আমি প্রতিবেশীর হক আদায় করছি। এগুলো যাতে অন্য কেউ চুরি করতে না পারে, তাই আমি গুনে রেখেছিলাম, আর কি, বেশি কিছু না”
-“তাই নাকি, তাহলে ওখান থেকে পাঁচটা গেল কই? তোমার মত লাফাঙ্গা ছাড়া আর কে নিতে পারে”
বিপরীতে এসপি ‘শ’খানেক গালি দিল ওই কটকটিকে, আর হাজার খানেক গা*লি দিল এই ভদ্রলোককে। সে বিডি থেকে এসে ভেবেছে, যাক কাটাপ্পা মামার হাত থেকে বেঁচেছে। কিন্তু উপরওয়ালা তার জন্য এখানে আরেকটা রেখে দিয়েছে। তার বুঝে আসে না,
কেন তার জীবনের শান্তি নেই?
এদিকে ভীর নিবাসের দরজায় দাঁড়িয়ে দূর থেকে সবটাই অস্পষ্টভাবে দেখছে সানা। সে হাতে থাকা দুইটা আপেলের দিকে তাকিয়ে বলে,
-“কিরে, আমি তো দুইটা চুরি করেছি! উনি পাঁচটা বলছেন কেন? বাকি তিনটার দায়ভার আমি কেন নিব?”
-“কেননা আমি বাকি তিনটা নিয়ে এসেছি”
সানার কারো কণ্ঠস্বর কানে আসতে পিছনে ফিরে তাকায়। নজরে আসে হাতে তিনটা লাল লাল আপেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ঈশানীকে। সানা মুখে হাসি টেনে তাকে বাহবা দিয়ে বলে,
-“বাহ, কালনাগিনী, বাহ!
দেশ কা নাম রশান কর,
এবার চায়না লুট কর।
এন্ড কনগ্র্যাচুলেশন, আজকে আপনি সম্পূর্ণ অ্যাক্টরস থেকে চোর হয়েছেন। তার জন্য আপনাকে আমার থেকে একটা ভাঙানো নোবেল”
ঈশানীর তরফ থেকে কোনরকম প্রতুত্তর আসার আগে পিছন থেকে আসে বাচ্চা কণ্ঠস্বর,
-“মম… আন্না, তোমরা কি চুরি করেছো?”
দুই রমণী চমকে পিছনে ফিরে তাকায়। দৃষ্টি আটকে যায় আরভিতে, যে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। দুজনে তড়িঘড়ি করে আপেলগুলো পিছনে লুকিয়ে নিল। সানা সাথে সাথে বলে,
-“আ..আমি না, তোমার আন্না করেছে এসব কুকাজ”
-“ডাইনি, তুই আমার……”
-“চুপ কর….”
সানা তাকে ধমকে থামিয়ে গিয়ে ছেলের গালে হাত রেখে নরম স্বরে শুধায়,
-“তুমি এসবে কান দিও না সোনা, না হয় তোমার আব্বা কোনদিন জানতে পারলে, তোমার আম্মাকে উপরে পাঠাবে”
সে আর কিছু বলার আগেই বাহির থেকে আসে এসপির গলা ফাটানো গর্জন,
-“কটকটি..কালনাগিনী… দাঁড়া”
তার এমন হুংকারে ঈশানীর হাত থেকে কবেই আপেল নিচে পড়ে গেছে, সে দরজার দিকে তাকিয়ে বলে,
-“মারে ডালা, মারে ডালা”
-“আবে ধুর এবার পালা”
ঈশানী সামনে তাকাতেই নজরে আসে সানা নিজের বাক্যখানা বলে আরভির হাতে নিজের আপেল দুটো ধরিয়ে দিয়ে কবে পালিয়ে গেছে। ঈশানী নিজেও ছুট লাগায় তার উল্টোদিকে, কেননা এসপি যে পরিমাণ রেগে আছে, না জানি কি হয়? এদিকে এসপি ধুপধাপ কদম ফেলে ভিতরে প্রবেশ করেই দেখে আরভির হাতে দুইটা আপেল, নিচে আরও তিনটা পড়ে আছে। সে থমকে দুই মিনিট তাকে পর্যবেক্ষণ করে, তারপর ঝুঁকে প্রশ্ন করে,
-“তোমার মম আর আন্না কোথায়?”
ছোট আরভি দুদিকে মাথা নাড়িয়ে ইশারা করে দেখায় কোথায় আছে। এসপি বুঝে তার হাত থেকে একটা আপেল নিয়ে তাতে বসিয়ে দিল এক কামড়। তারপর সারা নিবাস কাঁপিয়ে ডেকে ওঠে,
-“কটকটির বাচ্চা…”
সানা কোথা থেকে চিৎকার করে বলে,
-“বাচ্চা তোর সামনে”
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে যাচ্ছে সূর্যের আলো এখনও তীব্র, কিন্তু তাতে একটা নরম ঝিম ধরা ভাব এসে গেছে। চায়নার অন্যতম বিখ্যাত শহর সাংহাই শহরটা এই সময় অন্যরকম লাগে। সকালের তাড়াহুড়ো পেরিয়ে এখন শহরটা একটু ধীর, একটু স্থির।
উঁচু উঁচু বিল্ডিংগুলোর কাঁচে সূর্যের আলো পড়ে ঝলসে উঠছে। রাস্তার উপর গাড়ির সারি কিন্তু কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, সবকিছু যেন হিসেব করে চলছে।
এই ব্যস্ত শহরের এক কোণে সবকিছু থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেই বিশাল ভিলা,
“ডার্ক লোটাস ভিলা”
উঁচু দেয়াল ঘেরা, বাইরে সশস্ত্র গার্ড। গেটের সামনে কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা সবকিছুতেই একটা কড়া নিরাপত্তার ছাপ। গেটের ভেতরে ঢুকলেই লম্বা ড্রাইভওয়ে, দুই পাশে গাছের সারি, দুপুরের আলোয় তাদের ছায়া মাটিতে লম্বা হয়ে পড়েছে। ছোট ছোট ফোয়ারা থেকে পানি ঝরে পড়ছে, নীরবতার মধ্যে শুধু সেই পানির শব্দই শোনা যায়।
ভিলাটা নিজেই একটা আলাদা জগৎ, সাদা মার্বেল, বড় বড় কাঁচের দেয়াল, আধুনিক ডিজাইন। বাইরের আলো সরাসরি ভেতরে ঢুকে পুরো জায়গাটাকে উজ্জ্বল করে রেখেছে। ভিতরে বিশাল লিভিং এরিয়া, নরম আলো আর সূর্যের আলো মিশে একটা হালকা সোনালি পরিবেশ তৈরি করেছে। সেই লিভিং রুমের সোফার মাঝে বসে আছে আরজে। কালো শার্ট, হালকা খোলা বোতাম, ঘাড় সমান সিল্কি চুলগুলো একটু এলোমেলো হয়ে আছে, এতে যেন তাকে আরও মোহনীয় লাগছে। তার বাদামি চোখ দুটো স্থির, ভয়ংকরভাবে স্থির। হাতে একটা ওয়াইনের গ্লাস কিন্তু সে সেটাতে চুমুক দিচ্ছে না, শুধু ধরে আছে। মনে হচ্ছে, সে চারপাশে নেই।
তার চিন্তা অনেক দূরে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে আছে।
হঠাৎ দরজা খুলে ভিতরে ঢোকে কাইলিন। সে দ্রুত এগিয়ে এসে বলে,
-“বস…”
আরজের তরফ থেকে কোনো প্রত্যুত্তর আসে না। কাইলিন ফের বলে,
-“এখানকার সিকিউরিটি পুরো সেট করা হয়েছে। পুরো ভিলাটা এখন আমাদের কন্ট্রোলে। বাইরে, ভিতরে সব জায়গায় লোক বসানো হয়েছে”
সে একটু থেমে আবারও বলে,
-“লোকাল কানেকশনগুলোও অ্যাক্টিভ করা হয়েছে। শহরের মধ্যেও কোনো অস্বাভাবিক মুভমেন্ট হলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে জানতে পারব”
আরজে ধীরে গ্লাসটা টেবিলে রেখে দেয়।তারপর খুব আস্তে বলে,
-“লিনহুয়া ভ্যালি”
-“জি বস, ওখানে আমরা লোক পাঠিয়েছি।
গ্রামটা এখান থেকে অনেক দূরে, একেবারে রিমোট এরিয়া। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, ওখানে কোনো ডিরেক্ট ফ্লাইট যায় না। গাড়িতে করেই যেতে হয় আর রাস্তার কারণে একটু সময় লাগবে ব……”
তার জিহবা খসে বাকি বাক্য টুকু বের হওয়ার আগেই সে থেমে যায়। কারণ তার দৃষ্টি আটকায় আরজের তীক্ষ্ণ চোখে। আরজে নিজের দন্ত চেপে আওড়ায়,
-“সময়?”
কাইলিন বাকিটা গিলে বলে,
-“বস, আমি বলতে চাচ্ছিলাম…..”
-“আমি কি সময় চেয়েছি? আমি তোমাকে কী বলেছিলাম? যত দ্রুত সম্ভব ইনফরমেশন,
তাহলে এখনো কেন আমার কাছে কিছু নেই?”
আরজে ধীরে উঠে তার সামনে এগিয়ে চোয়াল শক্ত করে বলে,
-“আমি এখানে ঘুরতে আসিনি, আমি এখানে একটাই জিনিসের জন্য এসেছি ‘সানা’
ও যদি ওই গ্রামে থাকে, আমি জানতে চাই এখনই। না থাকলে, কোথায় গেছে, কার সাথে গেছে, কেন গেছে, সব”
কাইলিন দ্রুত মাথা নাড়িয়ে বলে,
-“জি বস… আমি এখনই আপডেট নিচ্ছি”
সে ফোন বের করে দ্রুত সরে যায়। আরজে ধীরে ঘুরে কাঁচের দেয়ালের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। হঠাৎ তার ঠোঁটের কোণে হালকা, অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে ওঠে,
-“তুমি যদি ওখানে থাকো, তাহলে আর পালানোর জায়গা নেই, ওয়াইফি…”
কাইলিন ঘুরে দরজার দিকে কয়েক পা এগোয় তারপর হঠাৎ থেমে যায়। মনে হয় কিছু বলার আছে, কিন্তু দ্বিধা করছে। আরজে পেছন না ফিরেই সেখান থেকে বলে,
-“যা বলার বলো”
-“বস… আরেকটা বিষয় ছিল”
আরজের তরফ থেকে কোন শব্দ আসে না। কাইলিন বলতে থাকে,
-“কাল রাত থেকে এখানে, ‘সাংহাই ফ্যাশন উইক’
শুরু হচ্ছে। সাতদিনের ইভেন্ট, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ডিজাইনার, ইন্টারন্যাশনাল আর্টিস্ট, মডেল সবাই আসবে। বড় বড় সেলিব্রেটি, ব্র্যান্ড, স্পন্সর সবাই উপস্থিত থাকবে।
আর… আপনাকে স্পেশালি ইনভাইট করা হয়েছে।
সে একটু থেমে ধীরে বলে,
-“প্রথম দিনের জন্য হলেও যেতে বলেছে”
আরজে ঘুরে তাকায়, তার চোখে বিরক্তি স্পষ্ট,
-“আমি এখানে শো করতে আসিনি। ক্যানসেল করে দাও”
কাইলিন যেন আগে থেকেই এই উত্তরটা আশা করছিল। সে ফের বলে,
-“বস… এটা শুধু ফ্যাশন শো না”
আরজে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কাইলিন এবার কণ্ঠ নিচু করে আওড়ায়,
-“এই ধরনের ইভেন্টে শুধু ডিজাইনার না আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কও অ্যাক্টিভ থাকে। ইন্টারন্যাশনাল ডিলার, কানেকশন, অনেক কিছুই এখানে মুভ করে। যাদের আমরা খুঁজছি তাদের সাথে কানেকশন পাওয়ার সম্ভাবনাও আছে। এই সাতদিনে এমন কিছু লোক এখানে থাকবে যাদের খুঁজে পাওয়া সাধারণত অসম্ভব। কিন্তু তারা নিজেরাই এখানে আসে। আপনি গেলে… হয়তো কিছু ক্লু পাওয়া যেতে পারে। একটা সোর্স থেকে জানতে পেরেছি মিসেস দিলরুবা খানমও আসতে পারে”
কাইলিন এক নিশ্বাসে সম্পূর্ণ বাক্য খানা উগড়ে দিয়ে তাকায় আরজের দিকে উত্তরের আশায়। কিছুক্ষণের নীরবতা কেটে আরজে ধীরে বলে,
-“ওকে, শুধু একদিন যাব”
তার ঠোঁটের কোণে হালকা, রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে,
-“দেখি… কে কে লুকিয়ে আছে আলোয়”
-“জি বস”
ভিলার ভেতরে আবারও অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। সোফায় চোখ বন্ধ করে বসে আছে আরজে। এই সময় দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে জ্যাক। সে ভেতরে প্রবেশ করে একবার চারদিকে তাকায়, তারপর তার চোখ গিয়ে স্থির হয় আরজের উপর। আজ প্রথম বারের মতো সে কিছু বলতে গিয়েও কোথায় একটা আটকাচ্ছে,
-“বস…”
বিপরীতে কোনো সাড়া নেই। আরজে ঠিক আগের মতোই চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। জ্যাক একটু এগিয়ে আসে। এবার কণ্ঠটা একটু শক্ত করে,
-“বস, আমি ইন্ডিয়া থেকে সরাসরি এলাম।
ওখানের কাজগুলো সেট করে এসেছি, সব ক্লিয়ার”
তবুও বিপরীত প্রান্তের মানব থেকে কোনো প্রত্যুত্তত্তর নেই। জ্যাক দাঁত চেপে ধরে, বুঝতে পারে, এইভাবে ঘুরিয়ে কথা বলে লাভ নেই। শেষ পর্যন্ত সে সরাসরি বলে ফেলে,
-“বস… আমার বউ সবার সামনে আসতে চাইছে”
এক মুহূর্তে চট করে আরজের চোখ খুলে যায়। সেই দৃষ্টি সোজা গিয়ে জ্যাকের উপর পড়ে। আরজের কণ্ঠস্বর থেকে বের হয় তাচ্ছিল্যে ভরা বাক্য,
-“এদিকে আমার বউ ইঁদুরের গর্ত থেকে বেরোচ্ছে না…আর তোমার বউ সামনে আসতে চাইছে?”
জ্যাকের কপালে ভাঁজ পড়ে, আরজে এবার তাকায় কাইলিনে দিকে,
-“কাই, তোমার বউয়ের কি খবর?”
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কাইলিন থমকে যায়। সে ঠিক তখনই বের হতে যাচ্ছিল, কিন্তু কথাটা শুনে থেমে যায়। তার মুখে একদম অবাক ভাব। সে একটু ইতস্তত করে বলে,
-“বস… আমার এখনো বিয়ে হয়নি”
-“বিয়ে করতে চাও?”
কাইলিন এক সেকেন্ডও নেয় না সঙ্গে সঙ্গে মাথা দুদিকে নাড়াতে থাকে দ্রুত,
-“না বস, একদম না”
তারপর নিজের মনে বিড়বিড় করে,
-“আমি শান্তিতে বাঁচতে চাই, আপনাদের দুজন কে দেখে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে”
আরজের ঠোঁটের কোণে আবারও হালকা হাসি ফুটে ওঠে,
-“গুড, আর জ্যাক, আমার বউ বাইরে না আসা পর্যন্ত, তোমার বউও ভিতরেই থাকবে। বুঝতে পেরেছ?”
জ্যাক এবার চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর নিচু গলায় বলে,
-“বস… আমি ওকে কথা দিয়ে….”
আরজে সাথে সাথে কেটে বলে,
-“অফ ডিসকাশন”
আরজে আর কাউকে কিছু বলতে না দিয়ে সিঁড়ির দিকে চলে যায়। তার পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় উপরে। নিচে জ্যাক নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলে,
-“এই লোকটার সাথে ডিল করা দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে”
কাইলিন পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার জীবনে প্রথম বারের মতো জ্যাকের অবস্থা দেখে পেট ফেটে হাসি আসছে। সে কোনমতে ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে কিছু বলার আগেই জ্যাক রুক্ষ স্বরে আওড়ায়,
-“একদম কাটা গায়ে নুনের ছিটা দিতে আসবে না”
কাইলিন এবার কোনোমতে গম্ভীর থাকার চেষ্টা করে। জ্যাক বিরক্ত হয়ে ‘শিট’ বলে বেরিয়ে যায়।
একটু নীরবতা, তারপর কাইলিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে হেসে দিল জোরে। হাসতে হাসতে বলে,
-“একজনের বউ গায়েব…
আরেকজনের বউ বের হতে চাইছে…
আর আমি… আমি এখনো সিঙ্গেল! লাইফ ইজ গুড… কোন প্যারা নাই”
তড়িঘড়ি করে মুখ চেপে আবারও নিজের হাসি আটকে ফেলে, কেননা আরজে বা জ্যাক দেখতে পারলে তার খবর করে ফেলবে। আর যদি জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয়, তাহলে তো সারাজীবনের মতো হাসি বন্ধ হয়ে যাবে
চায়নার লিনহুয়া ভ্যালির কাছাকাছি ছোট্ট আধুনিক জনবসতির মধ্যে একটা দুইতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত,
“ভেলোরা অ্যাটেলিয়ার”
নামটা শুনতে বড়সড় কিছু মনে হলেও, বাস্তবে এটা একটা ছোটখাটো অফিস। তবে এই ছোট জায়গাটার মধ্যেই লুকিয়ে আছে অনেক স্বপ্ন, অনেক পরিশ্রম, আর কিছু মানুষের চুপচাপ লড়াই। ভিতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে, একপাশে সানার ডিজাইনিং টেবিল, রঙিন কাপড়, স্কেচবুক, পেন্সিল, থ্রেড, পিন সবকিছু এলোমেলো, কিন্তু তার কাছে সবকিছুর নির্দিষ্ট জায়গা আছে। এই টেবিল টা ঈশানী বা এসপি ঠিক করলেই ঠিক হয় না হলে এভাবেই থাকবে।
অন্যপাশে ঈশানীর কর্নার, কয়েকটা লাইট, ক্যামেরা, মেকআপ কিট ছোটখাটো অ্যাড শুটের জন্য যথেষ্ট। আর সামনে একটা ডেস্ক, যেখানে বসে থাকে এসপি। ফাইল, ডকুমেন্ট, কল সবকিছু সে সামলায়। কারণ সে এই অফিসের বসের সেক্রেটারি।
আজ অফিসের পরিবেশটা একটু আলাদা। সবাইকে হঠাৎ করে মিটিং রুমে ডাকা হয়েছে। মিটিং রুম বলতে, একটা মাঝারি সাইজের টেবিল, চারপাশে কিছু চেয়ার, দেয়ালে কয়েকটা পুরনো ফ্যাশন পোস্টার। সবাই এসে বসে আছে, মুখগুলো থমথমে, কারো চোখে কৌতূহল, কারো মধ্যে টেনশন। কেউ জানে না হঠাৎ এই মিটিং কেন।
এই সিরিয়াস পরিবেশের মাঝেও সানা আর এসপি চুপচাপ বসে নেই। টেবিলের নিচে নিচে দুষ্টামি চালু। এসপি আস্তে করে সানার দিকে একটা কাগজ ঠেলে দেয় তাতে লিখা,
-“জানিস, বসের মাথার চুল গুলো সব নকল”
সানা সেটা পড়ে হাসি চেপে রাখে। সে নিচে লিখে ফেরত দেয়,
-“চায়না মাল আর কত ভালো হবে, বল?”
এদিকে ঈশানী পুরো সিরিয়াস। সে দুজনের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে,
-“তোরা একটু চুপ থাকবি?”
সানাও তার মতো করে জবাব দেয়,
-“তুই জন্ম থেকেই এমন নাকি পরে হইছিস?”
ঈশানী চোখ বড় করে তাকায়, সানা এবার আর হাসি ধরে রাখতে পারে না। ঠিক তখনই দরজা খুলে তাদের বস ‘মিস্টার শিংহুয়ান” ঢুকে পড়েন। মুহূর্তেই সবাই সোজা হয়ে বসে যায়। পরিবেশটা আবার গম্ভীর হয়ে যায়। বস টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকান।
তারপর ধীরে ধীরে চাইনিজ ভাষায় বলেন,
-“ওয়া জিনথিয়েন বা দা জিয়া জিয়া জিয়াও লাই, শি ইয়ৌ ইউয়ান ইন দে”
(আজকে তোমাদের সবাইকে একটা কারণে ডেকেছি)
এসপি ও ঈশানী চাইনিজ ভাষা আয়ত্ত করতে পারলেও সানা এখনো হালকা হালকা বুঝে আর বলতে তো মোটেও পারে না। তিনি ফের বলেন,
-“একটা খুব ভালো খবর আছে।কাল থেকে শুরু হচ্ছে সাংহাই ফ্যাশন উইক”
কথাটা শুনেই রুমে হালকা গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। কারণ সবাই জানে, এটা কত বড় প্ল্যাটফর্ম। শিংহুয়ান আবার বলেন,
-“আর এই বছরের জন্য স্পন্সররা আমাদের কোম্পানি থেকে একজনের ডিজাইন সিলেক্ট করেছে”
এক মুহূর্তে পুরো রুম নিস্তব্ধ। সবাই তাকিয়ে আছে চাতক পাখির ন্যায়। কার নাম বলবেন
এই অপেক্ষা। সানার বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হয়। সে কাল রাতের ডিজাইন গুলো দিয়েছিল। বস হালকা হেসে বলেন,
-“সুনেহনা খানম”
মুহুর্তে এসপি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে শুরু করে। ‘সুনেহনা খানম’ এটা সানার ছদ্ম নাম, এখানে আসার পর মিসেস দিলরুবা খানম তার পরিচয় ওনার মেয়ের নাম জড়িয়ে ঢেকে দিয়েছেন।
সানা প্রথমে স্থির, তারপর ধীরে ধীরে তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। চোখে অবিশ্বাস আর আনন্দ। রুমে সবাই করতালি দেয়। কেউ কেউ এসে তাকে অভিনন্দন জানায়। ঈশানী এসে তাকে জড়িয়ে ধরে,
-“দেখছিস! আমার সাথে থাকলে ভাগ্য খুলেই যায়”
মিস্টার শিংহুয়ান আবার বলেন,
-“এইটা শুধু তোমার না, আমাদের ভেলোরার জন্য একটা বড় অর্জন। আর সুনেহনা তোমাকে সাত দিনের জন্য সেখানে যেতে হবে। লাইভ শোকেস হবে তোমার ডিজাইন”
সানার চোখ বড় হয়ে যায়,
-“আমি নিজেও থাকব”
-“হুম, আর এসপি তো আমার সাথেই থাকবে”
এই সময় ঈশানী হঠাৎ বলে ওঠে,
-“বস, আমিও যাবো”
সবাই তার দিকে তাকায়। মিস্টার শিংহুয়ান গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে কিছু বলার আগেই ঈশানী বলে ওঠে,
-“আমি গেলে কোম্পানিরই সুবিধা। মডেলিং, প্রেজেন্টেশন সবকিছুতে সাহায্য করতে পারব”
একটু নীরবতা শেষে বস হেসে বলেন,
-“ঠিক আছে, তুমিও যাবে, আর আজকে এই খুশিতে পুরো অফিসকে আমি ট্রিট দিচ্ছি”
মুহূর্তেই রুমে উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে। শিংহুয়ান বেরুনোর আগে তাদের তিনজনের দিকে তাকিয়ে বলে,
-“আর তোমরা তিনজন, কাল সকালেই রেডি থাকবে। কারণ শহরে যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে। দশটায় পার্টি শুরু হবে”
তিনজনই মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝায়। একে একে সবাই বেড়িয়ে পড়ে।
সবাই চলে যাওয়ার পেছনেই তিন মাথা একসাথে চলে আসে। সানা দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে কিছু একটা ভেবে বলে,
-“ইয়ার, আমি না ক্যামেরার সামনে যাব না।
পাশ থেকে ঈশানী বিস্মিত গলায় প্রশ্ন ছুড়ে,
-“কেন?”
-“আরে, এটা ইন্টারন্যাশনাল, যদি মার্কানের লোক দেখে ফেলে, তাহলে সমস্যা হয়ে যাবে”
ঈশানী উচ্ছ্বাস ভরা কণ্ঠে শুধায়,
-“আচ্ছা, তাহলে আমি এক দিনের জন্য মিস সুনেহনা খানম হয়ে যাব”
এসপি সাফ সাফ তার মুখের উপর শক্ত কণ্ঠে নিষেধ করে দিল,
-“ওটা পেস্ট্রির, আপনি কেন নিবেন, মিসেস নাগিন?”
ব্যাস, শুরু হয়ে গেল দুজনের কথা কাটাকাটি। সানা দাঁত চেপে দুজনকে দুদিকে সরিয়ে বলে,
-“আবে ইয়ার, চুপ কর তোরা দুজন। কথা ক্যামেরার সামনে বা পিছনে না। কথা হলো, আমরা সবাই পার্টিতে যাচ্ছি। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, বস ট্রিট দিচ্ছে, মানে…..”
তিনজন একে অপরের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে একসাথে চিৎকার করে বলে,
-“মানে কব্জি ডুবিয়ে খাওয়া…..”
এই বলে তিনজনই একসাথে বাহিরে চলে যায়। ঈশানী বিডিতে থাকতে কত ডায়েট, কত কিছু ফলো করতো। কিন্তু এখানে এদের সাথে থাকার পর ডায়েট তার থেকে দশ হাত দূরে চলে গিয়েছে। ঈশানী যেতে যেতে সানাকে বলে,
-“ডাইনি শোন, আমরা কিন্তু দুজনে অফ শোল্ডার গাউন পরবো”
-“না, আমি ওসব ছোটখাটো পোশাক পরব না”
-“আরে ওটা লং গাউন, শুধুমাত্র অফ শোল্ডার”
-“নাহ”
হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৩
-“আরে প্লিজ না, একদিনই তো। শুধু কালকে। তুই কালোটা, আমি লালটা। কালকে পার্টির প্রথম দিন, সবাই থাকবে। শুধু কালকে, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ”
সানা শেষমেষ বাধ্য হয়ে রাজি হয়ে যায়।
-“এখন চল মিশন টু বসকে লুটা কমপ্লিট করে আসি”
-“আরে আমি না, ভীষণ এক্সাইটেড বহুদিন পর কালকে পার্টি পার্টি ইয়াহ”
