৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৪
রুপান্জলি
রাত ৩ টা ৪৮ মিনিট
,,, হসপিটালের বেডে শুয়ে উসখুস করছে রাত্রি পাশে মাম্মা শুয়ে আছে। খুবি সিরিয়াস বিষয়,, ওয়াসরুমে যেতেই হবে। এতোক্ষণ সবকিছু ঠিক ঠাক থাকলেও এই মুহুর্তে যাওয়াটা খুবি প্রয়োজনীয় যাকে বলে ইমারজেন্সি । কিন্তু তার তো এক পায়ে বেন্ডেজ করা,, ঠিক হতে সপ্তাহ খানিকের ব্যাপার এদিকে মাম্মা গতকাল সারা রাত, সারাদিন, আজকের মধ্যরাত পর্যন্ত সজাগ থাকার পর একটুখানি চোখ বুঝেছে। এখনি ডেকে দিলে ঘুমটা নষ্ট হয়ে যাবে না? নাহ!! মাম্মার ঘুম নষ্ট করা যাবে না। অগত্যা কষ্ট করে উঠে বসলো,, এক পায়ে বেন্ডেজ তো কি হয়েছে? অন্য পা তো ঠিক আছে,, ঐ এক পায়েই লাফিয়ে লাফিয়ে যেতে পারবে। আগে তো স্কুলের মাঠে কতই একা একা এক্কা দোক্কা খেলেছে। এখনো নাহয় সেভাবেই ওয়াসরুমে চলে যাবে। যেমন ভাবলো তেমন মোতাবেক নিচে এক পা ফেলে শরীরের ভার ছাড়তেই মাথা ঘুরে উঠলো ধাম করে পরে গেলো নিচে, কাটা পায়ে চরম ব্যাথা পেলো মেয়েটা, তবে চিৎকার করলো না। পাছে যদি মাম্মা উঠে যায়? তৎক্ষনাৎ এক প্রকার হন্তদন্ত হয়ে রুমে এলো কেউ। ওর পাশাপাশি বসে বিচলিত কন্ঠে সুধালো — কি হয়েছে রাত? ব্যাথা পেয়েছিস? ইসস!! নামতে গেলি কেনো? অনেক ব্যাথা করছে? দেখি, পা সোজা কর।
,,,ড্রিম লাইটের আলোয় পল্লবের চিন্তিত মুখশ্রী দেখতেই রাত্রি মৃদু আর্তনাদ করে কান্না জুড়ে দিলো। নাক টানতে টানতে মাথা ঝাকালো, মানে ব্যাথা করছে। পল্লব রাত্রির বেন্ডেজ করা পা টা সোজা করে বেন্ডেজের উপর হাত বুলাতে লাগলো। এতে কিছুটা আরাম বোধ করলো রাত্রি,, ঠেলে ঠুলে কান্নাটাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলো। আমাদের জীবনে এমন কিছু মানুষ থাকে যাদের সঙ্গ পেলে আমরা বাচ্চা হয়ে উঠি,, নিজেকে হারিয়ে ফেলি,, নিজেকে শক্ত দেখানোর কোনো তারা থাকেনা,, রাত্রির জীবনে পল্লব এমনি একজন। এই ছেলের কাছে রাত্রি কখনো কঠোর হতে পারেনা। অভিনয় করেও ধরা পড়ে যায়। কতোবার অরুনের সাথে ঝগড়া করার পর কান্নাকাটি করে এসে ভালো থাকার অভিনয় করেছে তার ইয়োত্তা নেই। তবে সেসব আর কেউ ধরতে না পারলেও পল্লব ঠিকি বুঝে যেতো। উল্টা পাল্টা কথা বলে মন ও ভালো করে দিতো। সেই সাথে ওর ছোট খাটো ইচ্ছা, কোন খাবার পছন্দ, কি করতে ভালোবাসে সবটা খেয়াল রাখে। যদিও ভাব ধরে এমন যেনো ওকে আর ওর ন্যাকামি গুলোকে সহ্যই করতে পারেনা অথচ তাকে বন্ধু মহলে সবচেয়ে বেশি প্রশ্রয় পল্লব ই দেয়। এবারেও তাই হলো,, পল্লব হালকা ধমকের স্বরে বললো — এই ন্যাকা, একদম ফ্যঁচ ফ্যাঁচ করে কাঁদবি না। একা একা নামতে চেয়েছিস কেনো? আমাকে ডাকতে পারতি নয়তো একটা কল করতি,, খবিস মেয়ে, চাপকে গাল ফাটাতে ইচ্ছা করছে।
,,, রাত্রি ঠোঁট উল্টে ভাবলো, কি বলবে? ওয়াসরুম পেয়েছে তাই নেমেছি? ইসস!! না, পরে যদি এটা নিয়ে খাঁপায়? না না, এটা বলাই যাবেনা। তাহলে কি বলবে,, হাত মুখ ধুতে নেমেছি? কিন্তু এতো রাতে কে হাত মুখ ধোয়? এটা একটু বেশি বেশি হয়ে যাবেনা? তাহলে কি বলা যায়? কি বলা যায়? রাত্রি অসহায় হয়ে ভাবতে লাগলো পল্লবকে কি বলবে,, ততক্ষনাত অতর্কিত ভাবে ওকে কোলে তুলে নিলো পল্লব। রাত্রি অবাক হয়ে বললো– এই, কোলে নিলি কেনো?
,,, পল্লব ঠোঁটে চাপা হাসি ফুটিয়ে বললো– ভাব কম নাও মামা , তোমার যে কি দরকার আমি সেটা বুঝতে পেরেছি।
,,, রাত্রি খেয়াল করলো পল্লব ওকে ওয়াসরুমের দিকে নিয়ে যাচ্ছে,, লজ্জা পেলো ব্যাচারি পরপর অবাক ও হলো। এই ছেলে বুঝলো কি করে? তার যে ওয়াসরুমে যেতে হবে? প্রশ্নটা দমিয়ে রাখলো না রাত্রি, সোজা সাপ্টা প্রশ্ন করলো — তর কি কোনো সুপার পাওয়্যার আছে? নয়তো তুই সবসময় আমার মনের কথা বুঝে যাস কি করে?
,,, পল্লব একবার রাত্রির পানে তাকালো পরপর সামনের দিকে নজর স্থির করে বললো — ওসব পাওয়ার টাওয়ার লাগেনা। তিন বছর, চার মাস, ১৩ দিন ৯ ঘন্টা ( প্রায়) যাবত তর ন্যাকামি দেখে যাচ্ছি। কখন কোন মুখভঙ্গি দ্বারা কি প্রকাশ করিস বুঝতে পারা কি খুব কঠিন?
,,, রাত্রি মুখ বাকালো,, যেনো পল্লবের কথাটা ধরার প্রয়োজন ই মনে করছেনা। পল্লব ও ঘাটালো না,, ওকে ওয়াসরুমের ভিতরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে দাত কেরিয়ে বললো — সাবধানে বসিস। দেখিস আবার কমাট ভেঙে ফেলিস না।যেই মোটা হয়েছিস,, তকে কোলে নিয়ে আমার তো হাত ই ভেঙে যাচ্ছিলো৷
,,, রাত্রি তেতে উঠে বললো — সর হারামজাদা!! থাঁপরে গাল লাল করে দিবো।
,,, পল্লব যেতে গিয়েও আবার রাত্রির কাছে ফিরে গিয়ে, ওর মাথায় চটকনা মেরে বললো — আমার দাদু নিজে পছন্দ করে,, সারে তিন লাখ টাকা কাবিন দিয়ে,, আমার আম্মুকে আব্বুর বউ বানিয়ে আমাদের বাড়িতে এনেছে। আর তুই আমাকে হারামজাদা ডাকিস? ডাকার হলে হালালজাদা ডাকবি। গাধি একটা।
বলতে বলতে বাহিরে গিয়ে ওয়াসরুমেট দরজা টেনে চাপিয়ে দিয়ে হাতল ধরে রেখে বললো — ডাকিস, বাহিরে আছি।
,,, এইযে পল্লব দরজার হাতল ধরে বাহিরে দাড়িয়ে আছে রাতের একটু ও ভয় হলো না। একবারও মনে হলো না যে পল্লব যদি ভিতরে চলে আসে? যদি ভুল কিছু করে? কিংবা সুযোগ নেয়। ওহুম এরকম ভাবনা কোনোদিনি আসার নয়,, কারন ওদের বন্ধুত্বটা একটু আলাদা। এখানে প্রতিটি মানুষ একে অপরের ভরসার জায়গা। এইযে পল্লব রাতকে কোলে নিলো,, এতে একটু ও ভয়কায়নি রাত, কারণ তারা বরাবরই একে অপরকে আগলে রাখে। সেই সাথে কারোর মনেই কোনো পাপ নেই,, যদি কিছু থেকে থাকে সেটা হচ্ছে একে অপরের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা আর বিশ্বাস । তবে পল্লবের বলা শেষ কথাটাতে রাত্রির মনটা ঝপ করেই খারাপ হয়ে গেলো। সে এই গালিটা আর কখনোই মুখে আনবে না। যেখানে তার নিজেরি জন্মের ঠিক নেই সেখানে অন্যকে অবৈধ বলার অধিকার পায় কোথা থেকে? এতোদিন তো এই শব্দটার আসল মিনিং জানতো না ও,, তাই বলতে পেরেছে। আজ পল্লবের মাধ্যমে জানলো না? আর কখনো এই ভাষাটা ইউজ করবে না। মুখেও আনবে না। রাত্রির কেনো যেনো কান্না পাচ্ছে। তার অসুস্থতার সময় কি হয়েছে,, না হয়েছে,, কিছুই জানেনা সে। অরুন কি সত্যিটা জেনে গিয়েছে? জানলেও পরবর্তীতে সম্পর্কটা কিভাবে আগাবে? অর্পনারাই বা অরুনেরর বাবা মাকে কিভাবে রাজি করাবে? কি পরিচয় দিবে? তারা কি রাত্রি মাম্মার চরিত্র নিয়ে কাটা ছেড়া করবে না? সত্যি ই কি সসম্মানে অরুনের বউ হতে পারবে সে? জানা নেই,, কোনো উত্তর কিংবা ভরসা খুজে পাচ্ছেন মেয়েটা।
,,,,, সূর্যের নরম আলোয় চোখ পিটপিট করে তাকালো অর্পনা,, চোখ মেলে দ্বীপের খোচা খোচা দাড়িতে নজর পরতেই আবারও চোখ বুঝে নিলো। পরোক্ষনেই মনে হলো সে বিছানায় নেই বরং কারোর কোলের উপর শুয়ে আছে। তৎক্ষনাৎ চোখ মেলো তাকালো। নিজেকে সম্পূর্ণ একটা অচেনা জায়গায় আবিষ্কার করতেই ধরফরিয়ে উঠলো,, চারদিকে কেমন বড়ো বড়ো চেনা অচেনা গাছ। সকাল হওয়া সত্তেও পরিবেশ নির্জন, থমতমে, বড্ড ভয়ানক ঠেকলো তার কাছে। দূর থেকে শুকনো পাতার মরমর শব্দ আসছে যেনো এখোনি ছুটে গেলো কেউ। সাথে বিভিন্ন জাতের পশু পাখির ডাক ভেসে আসছে। না চাইতেও ভয় পেলো অর্পনা। চারদিকে সতর্ক চোখ বুলিয়ে দ্বীপের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো — এ,,এটা কোথায়? আমরা এখানে কি করছি?
,,, দ্বীপ অর্পনাকে কোল থেকে সরিয়ে উঠে দাড়ালো,, সাথে সাথে অর্পনাও দাড়ালো। ভয়ে তার কলি*জা ঢিপ ঢিপ করছে। জায়গাটা দেখে দীর্ঘ জঙ্গল মনে হচ্ছে। এর আগে কখনো এরকম জঙ্গল কিংবা ভয়ংকর জায়গায় আসা হয়নি তার। তাই সহসাই চোখে মুখে ভয় ফুটে উঠলো। দ্বীপ অর্পনার প্রশ্নে রয়ে সয়ে উত্তর করলো — এটা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট,, আর স্থানটা ফরেস্টের কোনো জোনের আয়ত্তে পরে মনে যেই জায়গাটাতে অনুমতি ব্যাতিত কারোর প্রবেশ নিষিদ্ধ, এটাই সেই জায়গা।
,,, দ্বীপ কথাটা নির্লিপ্ত ভাবে বললেও অর্পনা সেটা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারলো না। তারা সুন্দর বনের কোন জোনে আছে জানতে পেরে তার মনের ভয় তর তর করে বাড়লো। এটা সুন্দর বন? কোথায় সুন্দর? কি দেখে এর নাম সুন্দর রাখা হলো? এর নাম তো ভয়ঙ্কর বন হওয়ার কথা ছিলো। ততক্ষনাৎ দূর থেকে কারোর চিৎকারের শব্দ শুনা গেলো,, সাথে কয়েকটা পশুর সংমিশ্রণ ধ্বনি। পশুগুলো নিশ্চয়ই খুব হিংস্র?অর্পনার পশুতে খুব ভয়। সে মানুষকে একদমি ভয় পায়না কারণ তাদের সাথে শক্তিতে না পারলেও বুদ্ধিতে পেরে উঠবে কিন্তু পশুর বেলায় তো তা হওয়ার নয়। পশুর তো ব্রেইন ই থাকেনা। আবার অর্পনার অতটাও শক্তি নেই যে পশুর সাথে লড়াই করতে পারবে। অর্পনার গভীর ভাবনার মাঝে দ্বীপ কোতুহলি কন্ঠে সুধালো — ভয় পাচ্ছো?
,,, ভয়? হুম!! ভয় তো অর্পনা পাচ্ছেই কিন্তু তা প্রকাশ করা যাবে না। প্রকাশ করলে দ্বীপ তাকে দূর্বল ভাববে না? এটা তো হতে দেওয়া যায়না। অগত্যা অর্পনা শিরদাঁড়া সোজা করে আত্মবিশ্বাসি কন্ঠে বললো — একদমি না, এখানে ভয় পাওয়ার কি হলো?
দ্বীপ একপেশে হাসলো,, চুলে বেক ব্রাশ করে বললো– আচ্ছা সোনা, তুমি এখানে অপেক্ষা করো আমি একটু আসছি।
,,, বলতে বলতে সামনের দিকে হাটা দিলো। দ্বীপের কথায় আত্মা ছলকে উঠলো মেয়েটার। দ্রুত পায়ে দ্বীপের পিছন পিছন হাটতে হাটতে আচমকা ওর হাত ধরে ফেললো। দ্বীপ অন্যদিকে তাকিয়ে সুক্ষ হাসলো পরপর অর্পনার দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বললো — কি হয়েছে? তোমায় না বললাম একটু অপেক্ষা করতে?
,,, ভয় সংশয় দূরে ঠেলে ফুসে উঠলো অর্পনা — আপনি আমাকে একা ফেলে কোথায় যাচ্ছেন? আর,, আর আমরা এখানে কিভাবে পৌছালাম? কখন পৌছালাম? আমরা তো ঢাকায় ছিলাম,, ঢাকা থেকে সাতক্ষীরার দূরত্ব অনেকটা। এখানে তো বাইকে আসা পসিবল না। মাঝে সাগর পেরোতে হয়। সত্যি বলুন,, আপনি আমার ঘুমের সুযোগ নিয়েছেন? এখানে এনে কি করতে চাচ্ছেন? কি চাইছেন দ্বীপ? সহসা বলুন নয়তো এখোনি,,, আল্লাহ গো!!
,,, অর্পনার কথার মাঝেই দূর থেকে বাঘের গর্জন ধেয়ে এলো, খেই হাড়িয়ে দ্বীপকে ঝাপটে ধরলো অর্পনা। চোখ মুখ খিচে দ্বীপের বুকে ঢুকে যাওয়ার প্রয়াশ চালালো। খামচে ধরলো পিছনের শার্ট। দ্বীপ ঠোঁট কামরে হেসে বললো — কি হয়েছে? ভয় পাচ্ছো?
,,, অর্পনা দ্বীপের বুকে বুকে মুখ গুজে রেখেই মাথা নাড়ালো মানে ভয় পাচ্ছেনা। দ্বীপ চোখ মুখ শক্ত করে পিছন থেকে অর্পনার হাত ছাড়াতে চেয়ে বললো — তাহলে সরো,, আর আমার পিছন পিছন আসো।
,,, অর্পনা ছাড়লো না,, আরও শক্ত হয়ে মিশে রইলো দ্বীপের বুকে। ইগু ঝেড়ে সরল স্বীকারুক্তি দিলো — ভয় পাচ্ছি,, আমায় ছেড়ে যাবেন না।
,,, দ্বীপের ঠোটে তখনো চাপা হাসি,, সে ঠোট কামরে শুধালো — আচ্ছা যাবো না, কিন্তু বিনিময়ে কি পাবো?
,,,, কি চাই আপনার? ( ভয়ার্ত কন্ঠে)
,,, দ্বীপ অর্পনার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো — আমি যেখানে যেখানে বলবো সেখানে সেখানে চুমু খাবে। তাহলেই সাথে করে নিয়ে যাবো,, একদম সাথে,, কোলে করে নিয়ে যাবো।
,,, অর্পনা মাথা ঝাকালো মানে সে চুমি খাবেনা। সহসা দ্বীপ ওকে আবারো ছেড়ে দিতে চাইলে অর্পনা আবার মাথা ঝাকিয়ে বললো — ওকে ওকে,, আপনি যা বলবেন তাই।
,,, দ্বীপ অর্পনার কোমর জড়িয়ে ওকে উপরে তুলে নিলো,, সহসা দুজন দুজনার মুখোমুখি হয়ে গেলো। অর্পনার চোখে ভয়, সংকোচ, কাতরতা দ্বীপের চোখে মাদকতা। সে মাদকিয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে গাল এগিয়ে দিলো। অর্পনা থমথমে মুখ করে এগিয়ে গিয়ে বাম গালে চুমু খেলো। দ্বীপ ডান গালে দিতে বললে অর্পনা সেখানেও চুমু খেলো। পরপর নাক, কপাল, দু চোখের পাতা, ঠোঁট, থুতনি, কন্ঠনালী সব জায়গায় চুমু খেলো। সব শেষ করে গাড়ো নিশ্বাস ফেলে বললো — শেষ!! এবার বাড়ি চলুন।
,,, দ্বীপ নাকোচ করে বললো — এটুকুতে হবেনা। সবজায়গায় আরও তিনবার করে চুমু খাও নয়তো এখানেই রেখে যাবো। এখানে কিন্তু বাঘ আছে,, বাঘ তো চিনোই, তাইনা?
,,, অর্পনা মুখটা অসহায় করে বললো — ইট্স চিটিং দ্বীপ!!
,,,যত সময় বাড়াবে ততোই সংখ্যা বাড়বে। নাউ চয়েজ ইজ ইয়্যুর্স।
,,, কথায় আছেনা? হাতি যখন কাদায় পরে চামচিকেতেও লাত্থি মারে? অর্পনার হয়েছে সেই দশা। ব্যাচারি আবারও মুখটা থমথমে করে চক্রাক্রমে তিনবার দ্বীপের পুরো মুখশ্রীতে চুমু খেলো। অর্পনার অবস্থা দেখে মনে মনে ভিষণ হাসলো দ্বীপ। আগে যদি জানতো জঙ্গলে এলে তার ঘারত্যাড়া বউ এতোটা বাধ্য, ভদ্র হয়ে যাবে তাহলে দিনে একবার হলেও হেলিকপ্টারে চড়ে এখানে চলে আসতো। বউয়ের থেকে মন মতো আদর ভালোবাসা আদায় করে আবার ফিরে যেতো। মনে মনে হাসলেও বাহিরে তার প্রতিফলন পরলো না। দ্বীপ গম্ভীর মুখ করে অর্পনার দু গালে, চোখে মুখে চুমু খেয়ে বললো– গলা জড়িয়ে ধরো।
,,, অর্পনা বাধ্য মেয়ের মতো জড়িয়ে ধরলো,, সাথে সাথে ওকে কোলে তুলে নিলো দ্বীপ,, হাঁটা ধরলো সামনের দিকে। যত কদম বাড়াচ্ছে ততোই জঙ্গলটা ভয়ানক লাগছে। দ্বীপ হাঁটতে হাঁটতে একটা বিশাল গাছের দিকে ইশারা করে বললো — লুক, ভেলোরা!! ওটা সুন্দরী গাছ। এই গাছের জন্যই বনের নাম সুন্দর বন রাখা হয়েছে।
,,, অর্পনা দেখলো গাছটা। একটু ও সুন্দর লাগলো না তবে চুপচাপ দেখে গেলো। দ্বীপ আরও কয়েকটা গাছ দেখালো গেওয়া, গরান, কেওড়া, পাসুর, বাইন, ধানি ঘাস, গোলপাতা আরও কতো গাছের নাম যে বললো তার ইয়ত্তা নেই। অর্পনা দেখলো সব, ধীরে ধীরে ভালো লাগতে শুরু করলো। অর্পনার মনে পরলো সেই দিনগুলোর কথা যখন সে দ্বীপকে গাছ, পাখি, ফুল, রাস্তা, পরিবার নিয়ে বানিয়ে বানিয়ে অনেক কথা বলতো,, দ্বীপ ও মনোযোগ দিয়ে শুনতো সেসব। তবে সেসব এখন অতিত। দ্বীপ এখন আর তার মনোযোগি ছাত্র নেই,, দ্বীপ পাল্টে গিয়েছে,, আগের জোহান মির্জা হয়ে গিয়েছে। অর্পনার ভাবনার মাঝেই ডাকলো দ্বীপ — ভেলোরা!!
,,, হু? বলুন।
,,, অর্পনা সারা দিতেই দ্বীপ বললো — তাকাও আমার দিকে জান,, চোখের দিকে তাকাও।( অর্পনা তাকালো) গভীর মনোযোগ দাও,, আমার চোখটা কি রকম? ধূসর? ব্যাক্ষা করোতো,, সাদা পর্দার মাঝখানে ধূসর রঙা আইরিস। তার মাঝে কালো মনি। কর্নিয়াটা ফ্যাকাসে। বুঝতে পারছো? বিষয়টা কিন্তু বড্ড গভির,,পর্যবেক্ষণ করো,, মনোযোগ দাও। ফোকাস মাই আইস বেইব। ফোকাস!!
,,,, অর্পনা সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে দ্বীপের চোখের দিকে তাকালো,, ধীরে ধীরে বাহ্যিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো সে। চোখ দুটো পিটপিট করছে যেনো এখোনি ঘুমিয়ে যাবে। হুট করেই কানের লতিতে হালকা ব্যাথা পেলো,, ব্যাথাটা আছতে লাগলেও অর্পনার মাথা ঘুড়ছে, দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসছে, ধীরে ধীরে চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেলো। দ্বীপ আরেকটু শক্ত করে আগলে নিলো ওকে। হাটা দিলো নিজ গন্তব্যে!!
,,,, কারোর গোঙানির শব্দে চোখ মেলে তাকালো অর্পনা। মাথাটা ব্যাথা করছে, চারপাশ ঝাপসা ঝাপসা লাগছে। অর্পনা মাথায় কয়েকটা চাপর মেরে নিজেকে ঠিক করার প্রয়াস চালালো। উড়নার কনা দিয়ে চোখ মুখ ডলে সামনে তাকাতেই বুকের ভিতরটা ছলকে উঠলো। তার থেকে ১২-১৫ হাত দূরে পাঁচ জনকে বেধে রাখা হয়েছে, তাদের নিচের সান র*ক্তে ঝপঝপা হয়ে রয়েছে,, অনেকটা র*ক্ত শুকিয়ে চট বেধে আছে। মাথা নিচু করে রাখার দরুন কয়েকজনের মুখ থেকে টপ টপ করে র*ক্ত পরছে। লোকগুলোর অবস্থা দেখে শিউরে উঠলো অর্পনা,, তৎক্ষনাৎ লোকগুলোর চেহারায় মনোযোগ পরতেই আতঙ্কে থরথর করে কাপতে লাগলো। মানস্পটে ভেষে উঠলো কিছু নির্মম দৃশ্য যখন ভুক্তভোগী ছিল “১৮”বছরের এক কিশোরী আর ভোগ কারি ছিলো সামনের তিনজন। নিজেদের মনের কূলসতা আর গায়ের জোরে ভেঙে চুড়ে দিয়েছিলো এক সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া নিশ্পাপ কিশোরীকে। অর্পনার শরীরের আঘাত গুলো যেনো তরতাজা হয়ে উঠলো। অনুভব করলো এই তিনজন লোকের এগিয়ে আসা, শ*রীর স্পর্শ করা, শাড়ি টেনে নেওয়া,, বু*ক বরাবর লা*থি,, বু*কে পা দিয়ে চে*পে ধরা,, দুটো হাত পায়ের তলায় পিষে দেওয়া,, কা*মরে আঁ*চড়ে ওর নারী সত্তাকে কূ*লসিত করা,, অযাচিত প্রতিটি ছোয়া ভেসে উটলো গভীর ভাবে। অর্পনার মনে হলো সে আরও একবার ম*লেস্ট হচ্ছে। আরও একবার মরে যাচ্ছে সে,, আর মারছে এই তিনজন মিলে। দুহাতে চোখ মুখ চেপে ধরে চিৎকার করে উঠলো অর্পনা,, স্থান, কাল পরখ না করেই যেদিক পারলো ছুটে গেলো। কিছুপথ ছুটতেই দেওয়ালের সাথে বারি খেলো। অর্পনার মনে হলো সে আর পালাতে পারবে না, আবার ধরা পরে যাবে এই জানোয়ারদের হাতে৷ অর্পনা অবুজের মতো দেয়ালে ধাক্কাতে ধাক্কাতে তার একমাত্র ভরসা, তার বিশ্বস্ত বন্ধু, তার বাডি, তার পাপ্পাকে ডাকতে লাগলো। কিন্তু পাপ্পা শারা দিচ্ছেনা, হেল্প করতে এগিয়ে আসছেনা। অর্পনা ডুকরে উঠলো ,, বাচ্চাদের মতো পাপ্পা পাপ্পা করতে লাগলো। পাপ্পাকে ডাকতে ডাকতে হুট করেই ঠোঁট ফুরে দুটো শব্দ বেড়িয়ে এলো — দ্বীপ!! হেল্প মি,দ্বীপ!!
,,,, সহসা কানে বাজলো একটা গভীর স্বর — ভেলোরা!!
,,, পরিচিত ডাক, পরিচিত কন্ঠ শুনে শান্ত হয়ে ঘুরে তাকালো অর্পনা, রুমে কেউ নেই,, পুরো রুমে টিমটিমে লাল বাতি জ্বলছে তাতে অস্পষ্ট সেই পাঁচজন। অর্পনা পাগলের মতো মাথা ঘষতে ঘষতে এদিক ওদিক তাকালো,, বের হওয়ার জন্য একটা রাস্তা খুজলো। কিন্তু রাস্তা নেই,, খুজেই পাচ্ছেনা। অর্পনার মনে হচ্ছে সে মারা গিয়েছে আর তাকে কেউ কবরের ভিতর রেখো গিয়েছে। তার নিজেকে পাগল মনে হলো,, কোথায় এলো সে? সকাল থেকে কি হচ্ছে তার সাথে? দ্বীপ কোথায়? উনি কি ভুলে গিয়েছে তাকে? জঙ্গলে ছেড়ে গিয়েছে? উনি কি এতোটাই নিষ্ঠুর? অর্পনা আবারও বেরুনোর জায়গা খুজতে লাগলো,, খুজতে খুজতে ঘরের এক কোনায় একটা দরজা দেখতে পেলো কিন্তু দরজার অপর পাশে ঘুটঘুটে অন্দকার। অর্পনা বুঝলো না সে কোথায় আছে তবে দেওয়াল থেকে কেমন পোড়া পোড়া গন্ধ আসছে। অর্পনার নিজেকে খুব হেল্পলেস অসহায় মনে হছে। ও আবারও একবুক আশা নিয়ে ভাঙা কন্ঠে আওড়ালো — দ্বীপ!! কোথায় আপনি? সামনে আসুন না। আমার ভয় করছে তো,, ভয় পাচ্ছি আমি,,, দ্বীপ!!
,,, ততক্ষণাৎ আবার ভেসে এলো সেই চিরোচারিত গম্ভীর স্বর — লিটল পিয়াসা!! কাম,, আমি এখানে সোনা।
,,,এবারের কন্ঠটা খেয়াল করলো অর্পনা,, শব্দটা দরজার অপরপ্রান্ত থেকে এসেছে। আর ভাবলো না মেয়েটা, চোখ বুঝে দৌড়ে গেলো সেদিকে। তৎক্ষণাৎ ধাক্কা লাগলো কারোর সাথে, পরিচিত পুরুষ আর সেই পুরুষালি শরীরের ঘ্রান অর্পনাকে বুঝিয়ে দিলো এটা তার আরও একটা ভরসার জায়গা, তার আপন পুরুষ। সহসা দুহাতে ঝাপটে ধরলো দ্বীপকে, বুকের ভিতর ঢুকে যাওয়ার প্রয়াস চালাতে চালাতে বললো — দ্বীপ!! আপনি? আপনি এটা? দ্বীপ!! এই!!
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৩
,,,দ্বীপ শক্ত হয়ে দাড়িয়ে থেকেই শক্ত কন্ঠে আওড়ালো — হুম!! আ’ম ইউর হাসবেন্ড।
,,,ডুকরে উঠলো অর্পনা, দ্বীপের বুকে নাক মুখ ঘষতে ঘষতে বললো — ও,ও,ওখানে ওরা,, ওদের, ওদের,,
,,,, বলতে বলতে জ্ঞান হাড়িয়ে ঢলে পরলো,, মাথাটা হেলে পরতে গিয়েও দ্বীপের প্রসস্থ বাহুতে আটকে গেলো। ওকে ধরলো না দ্বীপ , একটুখানি বিচলিত ও হলো না। ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রইলো লাল আলোয় আলোকিত হয়ে থাকা রুমটার দিকে, যেখান থেকে ক্ষনে ক্ষনে গোঙানির স্বর ভেসে আসছে। মাথার উপর থেকে ধেয়ে আসছে ভয়াঙ্কর পশুর গর্জন ,, গর্জনের ধরন বলে দিচ্ছে এটা কোনো হিংস্র বাঘের ভয়ানক হুমকি। নিজের স্থান দখল করার আহ্বান,, শিকারকে শতর্ক করার হুশিয়ার।
