Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৮

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৮

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৮
রুপান্জলি

একটার পর একটা গান ফায়ার ,, সেট আপ করতে গিয়ে পদচারণের ধুপধাপ শব্দ,, দৌড়ানোর ফলে তীব্র নিশ্বাসের জোয়ার। ক্ষনে ক্ষনে বিস্ফোরণ হচ্ছে আবার কখনো বিপদ সংকেত বাজছে। এতো এতো শব্দের ভীরে অতিষ্ঠ মির্জা বাড়ির বসার রুম। অর্পনা নির্বিঘ্নে বসার রুমের সোফায় শুয়ে পা দুটো সোফার হেডবোর্ডে তুলে পায়ের আঙুল নাচাতে নাচাতে ফ্রী ফায়ার খেলছে। ওপাশে আছে পল্লব , অরুন আর ইরা ,, রাত্রিটা কিছুক্ষণ আগে গ্রেনেট হামলায় মারা গিয়েছে। এখন চারজন মিলে ওরা ধুরা খুনোখুনিতে মেতেছে। রাত্রি বার বার কান্নার ইমোজি দিয়ে বুঝাচ্ছে,, “” আমি এই মৃত্যু মানি না। চল আবার নতুন করে শুরু করি “” কিন্তু ওরা কেউ পাত্তা দিচ্ছেনা। আজ নির্বাচন, তাই ভার্সিটি অফ। অর্পনা আগে ভাগেই জানিয়ে দিয়েছে তারা কেউ ভোট দিতে যাবেনা।

এমনিতেও যেতোনা,, আসলে ইরা তো সিলেটের ভোটার,, এখন তারা চারজন ভোট দিবে আর ইরা এমনি দাড়িয়ে থাকবে,, হতেই পারেনা। তারা মরন ব্যাতিত যা যা করবে সব একসাথেই করবে। একসাথে করতে না পারলে করবেইনা। নির্বাচন হওয়ায় বাড়িতে ভিষন ব্যাস্ততা,, মির্জা বাড়ির সবাই নিশ্চিত সন্ধার ভোট গননে মাহিন মির্জাই জিতবে,, এই নিশ্চয়তা দ্বীপ মির্জা নিজে দিয়েছে। দ্বীপ যেহেতু বলেছে তার মানে আগে থেকেই সেলিব্রেশনের ব্যাবস্থা করতে হবে। তাই সকাল থেকে রান্নাবান্নায় বেশ ব্যাস্ত মির্জা বাড়ির বউরা। মেইডরা কেটে কুটে দিচ্ছে,, সাথি বেগম কি যেনো রান্না করছেন,, রোমানা বেগম রান্নার ফাকে ফাঁকে অর্পনার দিকে তাকাচ্ছেন। অর্পনার একটি বিশেষ গুন আছে কেউ যদি তাকে কোনোকিছু নিয়ে ব্লেইম করে,, তাহলে সে এটার দ্বীগুন কাজ করে ব্লেইমটা সত্যি করে দেয়। এখনো তাই করে যাচ্ছে। মূলত অর্পনা শ্বাশুড়িকে জ্বালানোর জন্যই বসার ঘরে এসে সোফায় এরকম ভঙ্গিতে শুয়ে ফ্রী ফায়ার খেলছে। সে চাইলেই আগের মতো সাইলেন্ট করে খেলতে পারতো কিন্তু নাহ!! সে তো অভদ্র,, শ্বাশুড়ি আম্মু তাকে অভদ্র বলেছে,, এখন সে অভদ্রতা কতো প্রকার কি কি সব বিশ্লেষণ সহ বুঝিয়ে দিবে। অর্পনার কান্ডে রোমানা বেগম বড্ড বিচলিত,, এই মেয়েটাকে দিয়ে উনার ছেলের আদেও কোনো উন্নতি হবে? হওয়া সম্ভব? সকাল বেলা সব শুনেছেন তিনি। এই মেয়ের জন্য তাদের ৪০ কোটি টাকা ( প্রায়) হাতছাড়া হয়েছে। উনার তো ইচ্ছা করছে দশটা কথা শুনিয়ে দিতে কিন্তু পারছেন না। এই না পারার ও কারন রয়েছে,, কারন খুজতে গিয়ে রোমানা বেগমের মন খারাপ হলো,, মনে পরে গেলো গতোকাল সকালের কথা,,,
গতকাল ১০ টা ৩৮ মিনিট ,,

,,, আজ সাত দিনের মাথায় মির্জা বাড়ির দোরগোড়ায় দ্বীপের গাড়ির দেখা মিললো,, মেধা তখন গোসল করে ছাদে কাপর মেলছিলো। হঠাৎ গেইট দিয়ে দ্বীপের গাড়ি ঢুকতে দেখে তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে মাথা ঘুরে সিরিতে পরে যায়। সিসি ক্যামেরা কন্ট্রোল রুমে থাকা গার্ড সাথে সাথে লোক পাঠিয়ে বাড়ির মানুষদের খবর দেয়৷ ততক্ষণাৎ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যায় সকলে,, বিহানের কানে খবর পৌছাতেই আতকে উঠেছে ছেলেটা। একপ্রকার উড়ে যাবার ন্যায় দৌড়ে ছাদের সিরি কোটায় পৌছালো। মেধা তখন সাথি বেগমের কোলে গুটিশুটি মেরে পরে আছে,, জ্ঞান হাড়ায়নি। বিহান তাড়াহুড়ো করে কোলে তুলে নিলো ওকে,, বাড়িতে তেমন কেউ নেই,, রোমানা বেগম, সাথি বেগম, আর মাহিদ মির্জা ব্যাতিত সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। পরশী কলেজে, আরিব স্কুলে, শাহিন মির্জা পার্লামেন্টে, মাহিন মির্জা ক্লাবে,, মাহিদ মির্জা তার ঘরে,, রোমানা বেগম আর সাথী বেগম বিহানের পিছু পিছু দৌড়ে গেলেন। দ্বীপ তখনো বাহিরে দাড়িয়ে গার্ডদের সাথে কথা বলছে,,

,,, বিহান মেধাকে এনে রুমে শুইয়ে দিলো, তাকে ঘিরে রেখেছে তিনজন। রোমানা বেগম ওর মাথায় তেল, পানি ঘসে দিচ্ছেন,, সাথি বেগম পা জোড়া মালিশ করছেন। শরীর মোটামুটি গরম, জ্বর টর হবে বোধহয়। বিহান মেধার মাথাটা নিজের উরুর উপরে রেখে চুলে হাত বুলাতে বুলাতে পারিবারিক ডাক্তারকে কল করতেই মেধা নিষেধ করলো,, বিহান ভাবলো মেয়েটা বোধহয় এমনি নিষেধ করছে কিন্তু মেধা যখন জোর পূর্বক ফোন কেড়ে নিয়ে ডাক্তারকে বললো “” আঙ্কেল!! আপনি না এসে বিকেলের দিকে মানহা আপুকে পাঠিয়ে দিবেন,, মেইলি ব্যাপার তো তাই “” ওপাশ থেকে হাসির শব্দ এলেও এপাশ থেকে থমকে গিয়েছে তিনটে মুখ। রোমানা বেগমের ঠোঁটে কিঞ্চিৎ হাসির রেখা দেখা গেলো সাথে সাথী বেগমের ও। ওনারা হুট করেই মেধাকে রেখে চলে গেলেন,, নিচে অনেক কাজ আছে,, রান্নার ব্যাবস্থা করতে হবে। ছেলে দুটো এতোদিন পর বাড়ি ফিরলো, একটু রেধে বেড়ে খাওয়াতে হবেনা? এইজে মা আর শ্বাশুড়ি চলে গিয়েছে তাতেও ভ্রুক্ষেপ নেই বিহানের,, সে বোকার মতো তাকিয়ে আছে। মেধার খুব হাসি পেলো,, বিহান মির্জার মতো ত্যাজি পুরুষ এটুকু কথায় এতো বোকা বনে গেলো? আজব তো!! বোকা বোকা মুখ করে থাকা শক্ত পোক্ত পুরুষটার চোখের আইরিশটা ঝাপসা হয়ে এলো, তাতে পানির আস্তরন। মেধা চোখ ছোট ছোট করে বললো — এই!! কাদবে নাকি?

,,, বিহান অপলক তাকিয়ে রইলো মেধার দিকে, যেনো এই পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য মেধা নিজের মুখশ্রীতে লুকিয়ে রেখেছে। মেধা মাঝে মধ্যে বড্ড আশ্চর্য হয়, এই লোকটা তার এই ভাঙাচুরা মুখে কি খুজে পায়? কি দেখে এভাবে? কই সে তো কিছু খুজে পায়না। এইযে এই লোকটা, কতোটা মারাত্মক সুন্দর, কাট কাট চেহারা, চুখা নাক, ঘন ভ্রু, মশৃন ঠোঁট, চোখ গুলো মাঝারি সাইজের,চোখের মনিটা কালো নয়তো চেহারা অনেকটাই বড়ো ভাইয়ার মতো দেখতে। যে কেউ বলে দিবে জোহান-বিহান এক মায়ের সন্তান, পরশীর বেলায় ও তাই। পরশীটাকেও এদের মতো সুন্দর দেখতে কিন্তু তার বেলায় ব্যাতিক্রম। সে তার নানাবাড়ির চেহারা পেয়েছে, তাই এদের সাথে মিলে না। ভাগ্যিস দাদু বাড়ির চেহারা পায়নি তাহলে যে দেখতো সেই তাদেরকে জামাই-বউ কম ভাই-বোন বেশি ভাবতো। মেধার মনে পরলো সেই দিনগুলোর কথা, যখন সে মামুদের সাথে ফিনল্যন্ডে থেকে পড়াশোনা করতো। যখনি দেশে আসতো, বিহান সকল ব্যাস্ততা ফেলে ওকে এখানে ওখানে ঘুরতে নিয়ে যেতো,, সকল আবদার পূরন করতো। ঘুরতে গেলে যদি পরিচিত কেউ জিজ্ঞেস করতো “” এটা কি তোমার বোন?” ব্যাচার চোখ মুখ তখন শক্ত হয়ে যেতো, যেনো এর চেয়ে অপ্রীতিকর কোনো বাক্য সে কোনোদিন শুনেনি। তারপর মেধা যদি সরল মনে স্বীকারুক্তি দিতো ” হে!! উনি আমার ভাইয়া” তাহলে লোকটার হাব ভাব পাল্টে যেতো, মেধার সাথে রুড আচরন করতো, কথা বলতো না। তখন ব্যাচারি মেধা বিহানের এসব আচরণের মানে বুঝতো না কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই বুঝিয়ে দিলেন। কি অসভ্যতা করেছিলেন সেদিন, ছিহ!! ভাবতেও এখন লজ্জা করে তার। মেধার ভাবনার মাঝে বিহান ওকে উরু থেকে সরিয়ে দিয়ে মাথা বালিশে রাখলো। মেধা হতচকিত হয়ে তাকালো, কিছু বলতে নিবে তখনি বিহান ওর গলায় মুখ গুজে দিলো। চুমুতে চুমুতে ভিজিয়ে দিলো পুরো গলার এক পাশ, আবারও মুখ গুজে বললো — এসব কখন হলো? আমায় জানালে না কেনো মেধা রানী?

,,, মেধা এক হাত উচিয়ে বিহানের লম্বা লম্বা চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে বললো– সকালে জেনেছি, কদিন ধরে আশঙ্কা হচ্ছিলো তাই কীট টেস্ট করিয়েছিলাম,, পজিটিভ এসেছে।
,,, বিহান কিছু বললো না, মেধা অনুভব করলো তার গলার ভাজে কয়েক ফোটা পানি পরেছে। মেধা জানে, বিহান কতোটা খুশি, আজ সেও খুশি। ঠিক সময় যদি বিহানকে মেনে নিতো তাহলে হয়তো তাদের ঘরে আরও একটা তিন কি দুই বছরের বাচ্চার পদচারণ থাকতো। তাদের আম্মু আব্বু বলে ডাকতো। তবুও বিহানের অনুভুতি জানতে মেধা কৌতুহল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো — খুশি হওনি?
,,, তৎক্ষণাৎ উত্তর এলো না, বিহান ওভাবেই মুখ গুজে পরে রইলো। অনেকটা সময় পর মেধার ছিন্নভিন্ন গালটা চুমুতে রাঙিয়ে দিতে দিতে বললো — যদি অনুভূতি মাপার কোনো থার্মোমিটার থাকতো, তাহলে সেটা ব্লাস্ট হয়ে যেতো সোনা।
,, মেধা হাসলো, সেই হাসিতে বিহান কিছুটা এলোমেলো হলো। আকরে ধরলো মেধার নরম উষ্ঠ। মেধা প্রথমে হকচকিয়ে গেলেও পরোক্ষনে স্বামীর নরম আদরে বিগলিত হলো, খেই হাড়ালো আবেশে।

,,, সিরি বেয়ে নিচে নামতেই দ্বীপকে ভিতরে ঢুকতে দেখা গেলো,, চোখে মুখে চিন্তার ছাপ, চুল গুলো উষ্কখুষ্ক, চোখ দুটো লাল, হালকা ফুলে আছে, বুকের কাছে তিনটে বোতাম খোলা। এটা দ্বীপের অভ্যাস, যাকে বলে বদ অভ্যাস,, বরাবরই সে শার্ট পরা কালিন বুকের তিনটে বোতাম খোলা রাখে যার ফলে গলার অনেকটা অংশই স্পষ্ট দেখায়। বদ অভ্যাস হলেও দেখতে ভালো লাগে। চোয়ালে থাকা এক সেইপের দাড়ি গুলো মাথা চারা দিয়ে উঠেছে, কিছুটা বড়ো লাগছে। ছেলের এহেন চেহারা দেখে রোমানা বেগমের বুকটা ধ্বক করে উঠলো। ছেলেটা পুরোপুরি সুস্থ ও হতে পারেনি, এরমধ্যে ঐ মেয়েটা তার ছেলের নাজেহাল অবস্থা করে ছেড়েছে। যদি এমনি করবে, তবে সুস্থ করলো কেনো?ওভাবেই পরে থাকতো। একবার হাড়ানোতে যতটা কষ্ট, দ্বিতীয়বার পেয়ে আবারও হাড়ানো তার থেকে অধীক যন্ত্রণা দেয়। রোমানা বেগম ছেলের কাছে যেতেই দ্বীপ উনাকে বুকে আগলে নিলো, সাথে সাথে কেদে দিলেন রোমানা বেগম। দ্বীপ৷ তার শক্ত পোক্ত খরখরা হাতটা মায়ের মাথায় রেখে নরম স্বরে বললো — কেদোনা আম্মু , তুমি কাদলে তোমার ছেলেরা কষ্ট পায়।
রোমানা বেগম ফোপাঁতে ফোপাঁতে বললেন — কে বলে? আমার ছেলেরা কখনো তাদের মায়পর কষ্টে কষ্ট পায়না। পেলে এতো দূরে থাকতি না বাবা, যে যাই বলুক মায়ের কাছে চলে আসতি।

,,, দ্বীপ তার মায়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বসার ঘরে এগিয়ে গেলো, মেধার কথা জানতে চাইলে রোমানা বেগম সবটা খুলে বললেন। বড্ড খুশি হয়েছে দ্বীপ,, তবে কিছুটা বিরক্ত ও হলো। এই যেমন, একটু ফাক ফোকর পেলেই বিহান এসে বলবে ” এক মাসেই বাবা হচ্ছি ইনশাআল্লাহ!! তুই কোন ঘাসটা কাটতে পেরেছিস? ” তখন দ্বীপ বেজায় বিরক্ত অনুভব করবে। আপাতত সেসব ভাবনা রেখে দ্বীপ তার মাকে সোফায় বসিয়ে নিজে মাটিতে হাটু গেড়ে বসতেঔ রোমানা বেগম ছেলের মসৃন চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন। দ্বীপ মায়ের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বললো– আম্মু!! তুমি অর্পনাকে বকেছো?

,,, রোমানা বেগমের হাত জোড়া থমকে গেলো, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন — ওহ!! তোমার বউকে বকেছি বলে মায়পর বিচার করতে এসেছো? করো, দেখি কি বিচার করতে চাও, আমি প্রস্তুত।
,,, মায়ের মুখে তুমি সম্মোধন শুনে দ্বীপ বুঝলো তার মা রাগ করেছেন, তাই নিজের মনের কিছু অনুভূতিকে আদো আদো আকৃতিতে ভেঙে চুরে বললো — আম্মু, তুমি আমার মা, এই পৃথিবীতে এমন কোনো সন্তান নেই যে তার বাবা মায়ের বিচারে বিচারক হতে পারে। কিন্তু আম্মু, অর্পনা আমার প্রান, আমার অস্তিত্ব, আমার বেচে থাকার উৎস। এইযে তোমার এতো বড়ো জোহান, সে শুধু ঐটুকু ঘারত্যারা মেয়ের মুখ চেয়ে বেচে আছে। নয়তো তোমার ছেলেটাও এতোদিনে কবরে সায়িত থাকতো। তাহলে ভাবো ওর মূল্য কতোখানি দামি? তোমার কি উচিৎ না ঐ মূল্যবান মেয়েটাকে যোগ্য মূল্য দেওয়া?

,,, রোমানা বেগম অভিমান ঝড়া কন্ঠে বললেন — দিয়েছিলাম তো, মেয়ে বলে মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু ও তকে কষ্ট দিচ্ছে, তকে যন্ত্রণা দিচ্ছে,, আমি তর কষ্ট সহ্য করতে পারিনা বাপ।
,,, দ্বীপ ক্ষীন হাসলো, মায়ের উড়ুতে মাথা রেখে বললো — আম্মু, “”সে এক জীবন্ত গোলাপ। তার থেকে আমি যাই পাই, আমার কাছে সুমধুর লাগে। সেটা হোক সুভাষ কিংবা কাটার আঘাত। “” ওর সাথে তুমি রুড হইয়ো না আম্মু,, ও মায়ের আদর পায়নি,, মা কেমন হয় জানেনা। পরিবার পায়নি তাই পরিবারের বন্ডিং টা আয়ত্ত করতে পারছেনা। সময় দাও, ভালোবাসা দাও, দেখবে ও দ্বিগুণ ফিরিয়ে দিবে। তুমি যদি ওর সাথে খারাপ বিহেব করো তাহলে কোনোদিনি ঠিক হবেনা,, মনে মনে সবাইকে অপরাধী ভেবে নিবে। তারপর সবাইকে কষ্ট দিবে সাথে নিজেও কষ্ট পাবে,, তুমি তো মা, ওর মা হয়ে উঠো। দেখবে ও একদিন সবাইকে আপন ভেবে অভ্যস্থ হয়ে যাবে।
,,,রোমানা বেগম সঙ্কিত হলো, অর্পনার বাবা মায়ের সেপারেশন সম্পর্কে উনি অবগত। তবুও ওর উগ্রতা টুকু মেনে নিতে পারছেনা তাই দ্বিধান্বিত কন্ঠে বললেন — কিন্তু,,

,,, কিন্তু কি আম্মু? কোনো কিন্তু নেই। তুমি যতোবার ওর মুখের দিকে তাকাবে ততোবার ওর মুখে আমায় খুজো,, আমি তো খুব একটা বাধ্য নই, অতোটা ভালো ও নই। ভেবে নিবে ওর অবাধ্যতাটুকু তোমার ছেলে করছে, তাহলেই সব মাফ। এরপরও যদি তুমি ওর সাথে খারাপ বিহেব করো আমি বড্ড আঘাত পাবো আম্মু, ইউ নো না? তোমার ছেলে একান্ত অনুভূতির অবহেলা টলারেট করতে পারেনা? তখন দেখবে, আমাদের মা ছেলের ভালোবাসায় দূরত্ব নামক শব্দটি চলে এসেছে। আমি তোমার আমার দূরত্ব চাইনা আম্মু, অর্পনার বেলায় আমি বড্ড স্যানসিটিভ। ওর জন্য পুরো পৃথিবী ত্যাগ করতেও দুবার ভাববো না আমি।
,, ছেলের ওই শক্ত কথাটুকুনের ভয়েই এই মেয়ের বেখেয়ালিপনা সহ্য করে যাচ্ছেন উনি। গতকাল ছেলের নরম স্বরে বলা কথাগুলোতে বড্ড অবাক হয়েছেন তিনি। দ্বীপ এতোটা নরম স্বরে কথা বলতে জানে? এতোটা? বিশ্বাস করার মতো না। জীবনে প্রথম ছেলেটাকে এতো নরম হতে দেখছেন তিনি। উনি বগঝতে পারেন না, এই উগ্র মেয়েটার মাঝে ছেলেটা কি এমন পেলো যার জন্য নিজেকে ভেঙে চুরে এই জায়গায় নামালো? দ্বীপ মির্জা আর কাতরতা? একই মূদ্রার দুপিঠ। কাছাকাছি হওয়া সত্তেও কেউ কাউকে ছতে পারেনা, অথচ সেই দ্বীপ কাতর হচ্ছে,, একটা অগোছালো মেয়ের জন্য সে পাল্টে যাচ্ছে।

,,,অবশেষে রাত্রির কান্নাকাটি দেখে খেলা মাঝখান থেকে বাদ দেওয়া হলো। এই মেয়েটাকে নিয়ে পারা যায়না,, নিজে সবকিছুতে আগে আগে হেড়ে যাবে পরে কান্নাকাটি করে ওদেরকেও হেড়ে যেতে বাধ্য করবে। নাহ!! মেয়েটা দিনকে দিন বড্ড আহ্লাদী হয়ে যাচ্ছে,, এবার আহ্লাদ পনাটা একটু কমাতে হবে। অর্পনা আবার সেট আপ দিতে লাগলো,, অস্র সস্র চেন্চ করে, কয়েকটা হাই লেভেলের গ্রেনেড কিনলো। যেনো যেই দিকে মারবে সেখানে থাকা সত্রুগুলো ঠাস ঠাস করে আকাশে উড়ে যায় । এরমধ্যে পাচজনের গেইমার একসাথে হয়েছে,, রাত্রির বন্ধুক নিয়ে ভাব সাব নিতে নিতে বললো “” যে আমায় গুলি কিংবা গ্রেনেড হামলা করবে তার সাথে ব্রেক আপ,, আর কখনো কথা বলবো না “” পল্লব ওর দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে ইরার পিছনে গিয়ে বললো “” তকে খুন করবো ভাবলেও আমার হাসি পায়,, তুই তো খেলাই পারিস না”” সাথে দাত কেলানোর ইমুজি। রাত্রি কিছু বললো না,, ২০+ মুখ গুমরা করার ইমুজি দিলো। অরুন বললো “” থাক রাগ করিস না, আমি তকে প্রোটেক্ট করবো “” ইরা বললো “” আমি তকে সহ তর প্রেমিকাকে বোমা মেরে উড়িয়ে দিবো”” অর্পনার সেদিকে খেয়াল নেই। সে চোখ ঘুরিয়ে সামনের সোফায় ঝিমানো মেধার দিকে তাকালো। একটু আগে বমি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে এখানে বসেছে,, দেখতে পুরো বাচ্চা ওলা মুরগীদের মতো দেখাচ্ছে। অর্পনাকে তাকাতে দেখে মেধা ভ্রু নাচালো,, অর্পনা নাক কুচকে কিছু বলতে চাইলো। আবার বলতে পারলো না, তবে মুখ নিসপিস করছে,, বলতে মন চাচ্ছে। মেধা বুঝতে পেরে হেসে বললো — কিছু বলবে? বলার হলে বলো, মনে কথা চাপিয়ে রাখতে নেই।

,,, অর্পনা চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বললো — তোমরা কি গাধা?
,, কেনো?
,,, তোমাদের মধ্যে না সেদিন সবকিছু ঠিক হলো? এখোনি বেবি নিচ্ছো কেনো? আর কটাদিন ইনজয় করলেও পারতে।
,,, মেধা কষ্মিক কালেও ভাবতে পারেনি অর্পনা এমন কথা বলবে। পরক্ষণেই অর্পনার স্বভাবের কথা ভেবে বিষয়টা মানিয়ে নিলো, মেয়েটা একটু বেশি আধুনিক কিনা? তাই হয়তো এগুলো সিম্পলি বলে ফেলছে। কিন্তু রোমানা বেগম সিম্পলি নিতে পারলেন না, কটমট করে তাকালেন,, সাথী বেগম খুক খুক করে কেশে উঠলেন। বড়ো ছেলের বউটা একটু বেশি ই আপডেট, বুঝা যাচ্ছে। অর্পনা মনে মনে হাসলো,, এটা চাইলে সে আছতেও বলতে পারতো,,তবে শ্বাশুড়িকে জ্বালাতে তার ভালোই লাগছে। মেধা মুচকি হেসে স্বাভাবিক ভাবেই বললো — মা হওয়ার একটা ব্যাপার থাকে,, যখন হবে তখন বুঝবে। মায়েরা সন্তানের বেলায় সবকিছু স্যাক্রিফাইস করতে পারে,, আমি তো ভাগ্যবান যে আমার ঘরে একটা চাঁদ এর আগমন ঘটছে।

,,,, অর্পনা সাবলীল ভাবে জবাব দিলো — আমি এসব মা টা হবো না,,
,,, কেনো?
,,, বিরক্ত লাগে, বাচ্চা কাচ্চা পছন্দ না আমার।
,,, কেনো পছন্দ না?
,,, অর্পনা মুখ বিকৃত করে বললো –১১ ইন্চি সাইজের একটা বাচ্চা হয়, তার হাত এটুকু, পা ওইটুকু, এটাকে কোলে নিবে কি করে? কোলে নিলে যদি হাতের ফাক দিয়ে পরে যায়? আবার কিছু হলেই কান্না করে দেয়। বছর খানিক আগে অনাহিতা আপুর একটা বেবি হয়েছিলো, দেখতে পুরো ডলের মতো,, ওহ!! অনাহিতা আপু পল্লবের বড়ো বোন। আমরা সবাই দেখতে গিয়েছিলাম,, আমার ওসবে ইন্টারেস্ট ছিলো না, সবাই মিলে ধরে বেধে নিয়ে গিয়েছিলো । আমি জাস্ট বাবুর হাতে তিন হাজার টাকা দিয়েছিলাম, সাথে সাথে কান্না করে দিয়েছে। টানা দের ঘন্টা কেদেছে বাবুটা, জাস্ট বিরক্তিকর,, এই বেবি টেবি আমি কখনো নিবোনা। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, আমি তোমার ভাইয়ের সংসার ই করবোনা, ওয়েট এন্ড সি!! ( বলেই ঠোঁট চুকা করে চুমু ছুড়লো)

,,, প্রথম দিকে অর্পনার বাচ্চামু কথায় মেধার হাসি পেলেও পরোক্ষনেই হাসিটা মিলিয়ে গেলো। অর্পনা মিথ্যা বলে না, মজার ছলেও না, তাহলে কি সত্যি ই ভাইয়ার সংসার করবে না? গতোকাল রাতে বিহানের কাছে সবটা শুনেছে সে,, বিহান আজ সকালেও বলে গিয়েছে অর্পনার সাথে অনেক কথা বলতে,, হাবভাবে খেয়াল রাখতে। মেয়েটার বিশ্বাস নেই,, বিহানের মতে অর্পনা সেই অতিথি পাখি, যে মরসুমে এসে সৌন্দর্য ছড়িয়ে, মায়া বাড়িয়ে হুট করে পালিয়ে যায়। এরকম অতিথি পাখিদের মায়ায় পরতে নেই অথচ দ্বীপ সেই ভুলটাই করে ফেলেছে। আর সবচেয়ে বড়ো ভুল করছে অর্পনাকে রাগিয়ে। মেধা মলিন স্বরে বললো — সংসার করবেনা?

,,, নো ওয়ে!!
,,, সংসার মানে বুঝো?
,,, কি আবার? তোমার ভাইয়াকে সহ্য করা।
,,,সংসার মানে শুধু একটি সম্পর্ক না বোকা মেয়ে। সংসার মানে একটি ঘর, একটি বাড়ি, একটি পরিবার, দায়িত্ব, ভালোবাসা, দুঃখ-সুখ। এখানে একজনকে ঘিরে সংসার হয়না। শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, সন্তান-সন্ততি সব লাগে। সংসার মানে হচ্ছে সেই বউটা, যে মাসের শুরুতে এক গাছি ফর্দ এগিয়ে দিবে তার স্বামীর হাতে, সেখানে সকলের প্রয়োজনীয় সবকিছুর লিস্ট থাকবে শুধু বউটার প্রয়োজন বাদে। সে সবার পছন্দ মতো রান্না করবে শুধু নিজেরটা বাদে। সে সবার খেয়াল রাখবে শুধু নিজেকে রাখবে অগোছালো। এখন যদি কেউ প্রশ্ন করে তাহলে তোমার প্রাপ্তি কোথায়? বউটা বলবে “” এইযে সংসার,, আমার সংসার,, এটাই আমার প্রাপ্তি। আমার শ্বশুর শ্বাশুড়ির প্রশংসা আমার প্রাপ্তি, আমার সন্তানদের মুখের হাসিটা আমার শক্তি।”” এখানেই সংসার শেষ নয়,, এইযে বউটা একা এতোগুলা মানুষকে সামলে দিলো, নিজের পছন্দ অপছন্দকে বিসর্জন দিলো। এগুলোর খেয়াল রাখার দায়িত্ব স্বামীর। স্বামীটা ঘরে ফেরার সময় খুজে খুজে বউয়ের পছন্দের খাবারটা নিয়ে এলো, ফুলটা, শাড়ীটা, ওই চুরিটা নিয়ে এলো,, এগুলোই সংসার। সংসারে আলাদা মাধুর্য থাকে, এগুলো সংসার না করলে বুঝতে পারবে না। ( এতো বুঝেও বিয়ে করতে মন চায়না, ঘোড়ার ডিম)

,,, অর্পনা চুপচাপ শুনলো, পরোক্ষনেই খেলায় মন দিলো। মুখ দেখে বুঝার উপায় নেই কথাগুলো ওর মনে কতটা ইফেক্ট ফেলেছে। তবে মেধা ইচ্ছে করেই ওকে এসব বলেছে যেনো সংসার মানে বুঝে। এসব প্রতিশোধ প্রতিশোধ খেলায় সংসার হয়না, একটা জীবন এভাবে কাটানো যায়না। এইযে অর্পনা রাগ বসতো এতোগুলা টাকা নষ্ট করলো,, কেউ একটা কথাও বলেনি,, ভাইয়া নিষেধ করেছে,, বলেছে এর থেকেও দ্বীগুন টাকা সে আর্ন করে ফুলফিল করে দিবে। কিন্তু, এটা ফুলফিল করতে ভাইয়াকে যথেষ্ট কষ্ট করতে হবে,, সেই কষ্টটা অর্পনার উপলব্ধি করা প্রয়োজন। স্বামি, সংসারের প্রতি একটা মায়া আসা দরকার। মেধার এই গভীর ভাবনা আর অসম প্রচেষ্টাকে মাটিতে পিষে দিয়ে অর্পনা গেইম খেলতে খেলতে উচ্চস্বরে গান ধরলো —
সংসার আমার ভাললাগেনা,,
সংসার বিষের বরি,,
শ্বাশুড়ির জালায় ইচ্ছা করে
গলায় দিতে দড়ি।

,,, অর্পনার গান শুনে ফুসে উঠলেন রোমানা বেগম। পরশী নিচে নামছিলো,, অর্পনার গান শুনে মায়ের দিকে তাকাতেই মায়ের চোখ মুখ দেখে হাসতে হাসতে সিরিতে বসে পরলো। তাদের ঘরে দুদিন ধরে রীতিমতো বউ শ্বাশুড়ির যুদ্ধ চলছে। গতকাল মা রেগে ছিলো আর আজ ভাবি ইচ্ছা করে রাগাচ্ছে। অর্পনার গান শুনে ওপাশ থেকে বন্ধু মহলের সবাই হেসে উঠলো,, পল্লব বললো — দোস্ত ল্যাটেস্ট মডেলের দড়ি নিস,, তকে গরুর দড়িতে ফাসি দিতে দেখলে আমার বড্ড আফসোস হবে,, নিজেকে গরিব মনে হবে।
,,, পল্লবের কন্ঠ শুনে তাড়াহুড়ো করে উঠে দাড়ালো পরশী। মনে মনে আল্লাহ এর কাছে দোয়া করলো এই মুহুর্তে যেনো মায়ের কাছে বকা না খায়। পরশীর মনোভাব পূর্ণ হলো না তার আগেই ধমকে উঠলেন রোমানা বেগম — তোমার দাত কেলানো বন্ধ করবো আমি,, কদিন পর রেজাল্ট। একটা সাবজেক্টে ফেইল আসুক,, তারপর দেখাবোনে মুখ দিয়ে কিভাবে হাসি আসে।

,,, মায়ের ধমকে চুপসে গেলো ব্যাচারি, উনি নিশ্চয়ই শুনে নিয়েছে? ইসস!! কি লজ্জার বিষয়। এমনিতেই মেসেজের রিপ্লাই দেয়না,, তার উপর এতো অপমান। মানা যাচ্ছে না। পরশী মুখ কাচুমাচু করে উঠে দাড়ালো,, হেলতে দুলতে সোফায় গিয়ে বসলো। ভাবির স্টাইলে পা দুটো টি টেবিলে রাখতে গিয়েও ভয় পেলো, মা যদি আবার বকা দেয়। থাক,, সে উঠে গিয়ে ফ্রিজ থেকে ওয়াটার পড এনে সোফায় বসে দু ঢোগ পানি খেলো। পরপর মেধার দিকে তাকিয়ে বললো — ওয়াটার খাবা?
,,, মেধা মাথা দুদিকে নাড়িয়ে না বুঝালো। পরশী টি টেবিল থেকে রিমোট নিয়ে টিভি অন করলো,, মাহিদ মির্জা সকাল বেলা নিউজ দেখছিলেন তাই বর্তমানে চ্যানেল জমুনা টিবিতে রয়েছে। টিভি অন হতেই স্ক্রিনে ভাসা দৃশ্য আর নিউজ শুনে থমকে গেলো সবাই।
,,,,রমনা ১২ নম্বর আসনের প্রার্থী মাহিন মির্জার ভাতিজা, ওরফে দ্বীপ জোহান মির্জাকে অতর্কিতভাবে আড়াল থেকে পরপর তিনটে গুলি করা হয়েছে। ঘটনাটি হঠাৎ করেই ঘটে, ফলে আশপাশের মানুষজন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।
এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত আততায়ীদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত শুরু করেছে এবং জড়িতদের খুঁজে বের করতে অভিযান চালাচ্ছে।

,,, অর্পনার হাত থেকে ফোনটা ফসকে পরে স্থান পেলো পেটের উপর,, মেয়েটা বাক রুদ্ব,, টিভিতে তাকানোর কথা ভুলেই গিয়েছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে এলো কাচ ভাঙার শব্দ, নিশ্চয়ই দ্বীপের মা নামক মানুষটাও অর্পনার মতো থমকে গিয়েছে। যাওয়ারি তো কথা,, একজন পুরুষ মানুষের সবচেয়ে আপন যদি কেউ থেকে থাকে তাহলে সেটা মা আর বউ। অর্পনার কানে বাজছে দ্বীপের গতকালের বলা সেই কথাটা ( দোয়া করো যেনো রাজনীতির মাঠ হতে আমার মৃত্যুর সংবাদ আসে৷) অজান্তেই অর্পনার চোখ দুটো জ্বালা করে উঠলো,, তিরতির করপ কেপে উঠলো ঠোট। অপরাধী শাস্তি পাওয়ার আগে পালিয়ে যাবে,, এটা কোনো নিয়মের কাতারে পরেনা। অপরাধীর সাথে তার অনেক হিসেব নিকেশ চুকনোর আছে। আগে নিজের কর্মের দায় নিবে তারপর যেখানে যাবার যাবে। অর্পনা বোকার মতো উঠে বসলো, জ্বালা করা চোখ জোড়াতে পানি জমলো, সে হতবুদ্ধের ন্যায় তাকিয়ে আছে টিভির স্ক্রিনে। সেখানে ভাসছে এম্বুলেন্সের দৃশ্য, যেই এম্বুলেন্সে করে দ্বীপকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অর্পনার চোখ জোড়া ঝাপসা হয়ে এলো, গাল বেয়ে দুফোটা পানিও গড়ালো,, কানে বাজলো চার রমনির কান্নার শব্দ।

দ্বীপের আম্মু জ্ঞান হাড়িয়েছে, তাকে আগলে নিলেন সাথী বেগম। মেধা ফুপিয়ে উঠলো,, পরশীটা তো বাচ্চা, সে ভাইয়া ভাইয়া কেদে উঠলো। অর্পনা অনেকটা সময় থম মেরে বসে রইলো,, বুকটা ভার লাগছে,, এমনটা তো কথা ছিলো না। সে তো লোকটাকে ভালোবাসে,, এতোটাই ভালোবাসে যে উনি যদি এখুনি ছুড়ি নিয়ে এসে বলে “” তোমার হৃদপিণ্ডটা আমার লাগবে ভেলোরা “” সে নির্ভীগ্নে দিয়ে দিবে। তার এতো এতো ভালোবাসা ফেলে উনি কোথায় যাবেন? পালাবেন কি? অর্পনা কি আবার একা হয়ে যাবে? এবার একা হয়ে গেলে কিভাবে বাচবে সে? দ্বীপকে ছাড়া বাচা এতোটাই সহজ? আচ্ছা!! তার ভাগ্যটা এমন কেনো? লোকটার কাছে কি চেয়েছিলো সে? একটু ভালোবাসা, এটা ওকে কেউ দেয়নি,, একজন ও না। ওর চাওয়াটা কি খুব বেশি হয়ে গিয়েছিলো? হয়তো হয়েছিলো,, মানুষ তো অপরিচিত ভিক্ষুককেও খালি হাতে ফিরিয়ে দেয়না,, অথচ লোকটা তাকে বারংবার ফিরিয়ে দিয়েছে। কেনো ফিরিয়ে দিলো? তাদের মিষ্টি সম্পর্কটা কেনো এতো টক্সিক হলো? অন্য পাঁচটা মেয়ের মতো সে কেনো দ্বীপের প্রথম ভালোবাসা হলোনা? এতোবার জিজ্ঞেস করার পরোও দ্বীপ কেনো একবার বললো না,, ভালোবাসি। অর্পনা উঠে দাড়ালো,, তাকে দ্বীপের কাছে যেতে হবে। বেহায়া না সে? ভালোবেসেছে তো,, ভালোবাসলে অতো সম্মানের আশা করতে নেই। একবার মির্জা গালিব বলেছিলেন,,

“”প্রেমে পরেছো আবার সম্মান ও চাও,, ভালোবেসেছো আবার মর্যাদা ও চাও। তুমি বড্ড নাদান গালিব,, বিষ খেয়েছো তুমি আবার বাচতেও চাও। “”
,,, অর্পনা সেচ্ছায় বিষ পান করেছে,, এবার কাতরাবে, যন্ত্রণা পাবে, মরন নিশ্চিৎ তবুও সম্মান চাইতে পারবেনা। অর্পনা তাড়াহুরো করে সদর দরজা পেড়িয়ে বাহিরে পা রাখতেই তিনজন গার্ড এসে পথ আটকালো,, অর্পনা শান্ত স্বরে বললো — সরুন, আপনাদের স্যারের গুলি লেগেছে,, উনার আমাকে প্রয়োজন।
,,, একজন গার্ড নরম স্বরে বললো– সরি ম্যাম, নির্বাচনের ফল প্রকাশের আগে আপনাদের বাহিরে বেরুতে দেওয়া নিষেধ। অ্যাটাক আসতে পারে।
,,, অর্পনা ফের শান্ত কন্ঠে বললো — আমি বলেছি আমি যাবো,, সরুন।
,,, গার্ডটি আবারও নাকোচ করে বললো — স্যারের অনুমতি ব্যাতিত এক পা বাড়ানোর ক্ষমতা নেই আমাদের। ক্ষমা করবেন।
,,, রেগে গেলো অর্পনা, দাতে দাত চেপে কর্কষ কন্ঠে বললো — আমি অর্পনা জামান নয় মিসেস জোহান মির্জা বলছি, সরে দাড়ান,, আমি আমার স্বামীর কাছে যাবো।

,,, সাথে সাথে তিনজন গার্ড মাথা নত করে নিলো,, ধীরে ধীরে সেখানে থাকা প্রত্যেকে মাথা নত করে নিলো। তারা মিসেস জোহান মির্জাকে সেই সম্মানটাই দিলো যেটা সর্বদা দ্বীপ জোহান মির্জার বেলায় এক্সিস্ট করে। সেই গার্ডটি এবার ভয় এবং কাতরতার সহিত বললো — ম্যাম!! স্যার বলেছেন,, উনি যদি মারাও যায়, তবুও যেনো উনার লাইফ লাইনের কোনো ক্ষতি না হয়। আপনাকে রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব,, স্যার সবাইকে নিয়ে রিস্ক নিতে পারলেও আপনার বেলায় নিরুপায়। দয়া করে ঘরে যান, প্লিজ!!

,,, “লাইফ লাইন” লোকটা কতোশতো নামে ডাকে তাকে,, অর্পনার ভালো লাগে কিন্তু আজ ভালো লাগছেনা। অর্পনা ভঙ্গুর পায়ে আবারও ভিতরে ঢুকে গেলো,, দরজা বেধ করে ভিতরে ডুকতেই গালে চর পরলো। অর্পনা এবেলায় বেশ অবাক হলো,, তাকে চর মেরেছে কেউ? কিন্তু কে? দেখার আশায় সামনে তাকানোর আগেই শুনা গেলো দ্বীপের মায়ের কর্কষ ধ্বনি — খুশি হয়ছো তুমি? ভালো লেগেছে না? এবার ছেলেটার কিছু হোক শুধু, তারপর তোমায় দেখে নিবো আমি। হাতে চুড়ি পরেনা, সে নিজেই আমার ছেলেকে সুস্থ রাখবে। তো যাও, সুস্থ করে দিয়ে আসো। বেয়াদব মেয়ে কোথাকার। আমি কাকে কি বলি? সংসার আর তুমি? কার থেকে শিখবে সংসার কাকে বলে? মাই তো সংসার টিকাতে পারলো না, তুমি আবার কি করবে? তোমার হাল তোমার মায়ের মতো, না না তোমার বাবার মতোই হবে। একা একা জীবন কাটাতে হবে সারাজীবন , দেখে নিও মেয়ে। বিয়ে করলেই বউ হওয়া যায়না,, হাজারটা দায়িত্ব পালন করতে হয়।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৭

,,, অর্পনা নিশ্চুপ, নিশ্চল, এতোগুলা বছরে কেউ কখনো তাকে মা নিয়ে কিছু বললে ছাড় পায়নি। সে ঐ মহিলাকে ভালো না বাসলেও কখনো অপমানিত হতে দেয়নি। আজ কোনো ভাষা খুজে পাচ্ছেনা, কি বলবে বলতে পারছেনা। অর্পনা আরও একবার অনুভব করলো পৃথিবীটা ফাকা, এলোমেলো। এই পৃথিবীতে বাবা আর স্বামী ব্যাতিত প্রতিটা মেয়ে অবহেলিত। সে যখন বাবার আওতায় ছিলো তখন লোকে একটা কটুক্তি তো দূর, চোখ তুলে তাকাতেও ভয় পেতো। তারপর যখন সে স্বামীর আওতায় এলো তখন স্বামির পরিবার তাকে মাথায় করে রাখলো। আজ স্বামী নেই তাই মাথা থেকে ছুড়ে মারলো,, এটাই কি তবে বাস্তব? বাবা আর স্বামী ব্যাতিত মেয়েরা অসহায়?

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৮ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here