৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৪
রুপান্জলি
মাঝে কেটেছে দের সপ্তাহ,, রোজা প্রায় শেষের দিকে,, পাঁচ দিনের মাথায় রমজানের ঈদ। সেদিন কাইসার বাড়ি থেকে ফিরার পর রুমে এসে তীব্র ভাঙচুর করেছে দ্বীপ,, সেটা ঠেকাতে গিয়ে আবারও জখম হয়েছিলো অর্পনা। পায়ের অনেকটা জায়গা কেটেছিলো সেদিন কিন্তু দ্বীপের ভ্রুক্ষেপ ছিলো না। সেদিনের পর থেকে দ্বীপ নিজের মতো থাকে,, অর্পনার সাথে কথা বলে না,, প্রয়োজন পরলেও না,, নিজের কাজ নিজে করে,, অর্পনার কোনো কাজেও ওকে হেল্প করেনা। সকালে ঘুম থেকে উঠে অফিসে যায়,, সেখান থেকে সন্ধার আগে ফিরে ফ্রেশ হয়ে আবার ক্লাবে চলে যায়,, রাতে ফিরতে ফিরতে ১২টা ১ টা বাজে। বাড়িতেও খায়না,, ইফতার ও করে ক্লাবে,, মোট কথা পুরো দের সপ্তাহ ধরে অর্পনাকে পুরো দমে ইগনর করছে দ্বীপ। রাতে অর্পনা ঘুমানোর সময় একা ঘুমায়, সকালেও নিজেকে একাই পায় তবে মাঝরাতে বিষয়টা আলাদা। অর্পনা অনুভব করে দ্বীপ শুরুতে এসে ওর বিপরীত মুখি হয়ে শুলেও পরবর্তিতে যখন গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় তখন ঠিকি তার উপরে চলে আসে আবার যখন সজাগ হয় তখন ভুল সুধরে দূরে সরে যায়। অর্পনা বিষয়গুলোকে বড্ড কষ্ট পায় কিন্তু বলতে পারেনা। ও কেনো যেনো মনে চলা কষ্ট গুলো হরহামেশাই প্রকাশ করতে পারেনা। সে কয়েকবার রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করেছে কিন্তু লোকটার হেলদোল নেই,, আর প্রতিবার লোকটার হেলদোল না পেয়ে উল্টো রাগ হয়েছে অর্পনার। এতোবার সরি বলার পরেও যদি কেউ না মানে,, কঠোর হয়ে থাকতে চায় তাহলে অর্পনাও যাবেনা তাকে গলাতে। যথেষ্ট চেষ্টা করেছে,, এখন আর চেষ্টা করতেও মন চায়না।
,,, এসা আর তারাবির নামাজ পরে বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পরলো অর্পনা, সিলিং এর দিকে তাকিয়ে কিছুটা সময় নিজের জীবন নিয়ে ভাবলো। নাহ!! তার জীবনের বেশ পদোন্নতি হয়েছে,, এই দুই- আড়াই মাসে দ্বীপ কতো কি করলো তার জন্য,, এতোটা সে প্রাপ্পো ছিলো কি? তার মতো অর্ধ-ধ*র্ষিতাকে যে লোকটা এতো সম্মান দিলো এইতো অনেক। ধীরে ধীরে লোকটার কাছে তার কৃতজ্ঞতা বাড়ছে,, এতো ঋন শোধ করা দায়। আজকেও লোকটাকে তার প্রয়োজন,, একটু হেল্প চাই কিন্তু লোকটা তো তাকে ইগনর করে,, কল ধরবে কি? সঙ্কোচ নিয়ে কল করলো অর্পনা,, ওপাশ হতে কল ধরা হলো না। পরপর চারটা কল দেওয়ার পরেও যখন দ্বীপের এটেনশন পাওয়া গেলো না নিরুপায় হয়ে মেসেজ করলো। কিছু কিছু সময় আমরা যখন খুব অসহায় হয়ে পরি তখন আত্মসম্মান টুকু বিসর্জন দিতে হয়,, বেহায়ার মতো চাইতেও হয়। এই বিষয়টাতে অর্পনা বেশ উইক,, উইক সাইডের জন্য শত্রুর থেকে হেল্প চাইতেও দ্বিধা করা উচিৎ না সেখানে দ্বীপ তো তার নিজের পুরুষ।
রাত ৮টা ২২,,
,,, ঢাকা ভার্সিটি থেকে ১০ মিনিটের দূরত্বে টিসি চত্তরের বিপরীত পাশে দ্বীপদের ক্লাব,, ক্লাবটি ইটের তৈরি ৪৮/২৪ ফুটের একটি একতলা ঘর। এই ক্লাবটি নির্মান করেছিলো দ্বীপের দাদু,, তাদের যেহেতু রাজনৈতিক পথচলাটা আজকের নয়,, যুগযুগ ধরে হয়ে এসেছে তাই আগে থেকেই এসব তৈরি করা ছিলো। প্রথম দিকে অবশ্য এতোটা পরিপাটি ছিলো না তবে দ্বীপ আর বিহান প্লান করে অনেক কিছুই পরিবর্তন করেছে ৷ ক্লাবের সামনে মেইন রোড,, রাস্তা দিয়ে গেলে ছেলে পুলেদের আড্ডার সম্মুখীন হতে হয়। বিশেষ করে এরুপ পথ দিয়ে মেয়েরা হেটে যেতে ভয় পায়, শঙ্কোচে পায়ে পা বেধে যায়। সে আবার এক মনোরোম দৃশ্য,, এরুপ দৃশ্য কিছু কিছু ছেলেদের বেশ খুশি প্রদান করে। এইতো মাত্রই একটা মেয়ে কাধে ব্যাগ ঝুলিয়ে গুটিগুটি পায়ে ওদের সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে পায়ে পা বেধে দাম করে পরে গিয়েছে,, সেই দৃশ্য দেখে খিলখিলিয়ে উঠেছে চা সি*গারেট খেতে থাকা ছেলে পুলেরা৷ মেয়েটা দ্বীগুন লজ্জা পেয়ে বুকের সাথে ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরে দৌড়ে পালিয়েছে। মেয়েটার দৌড় দেখেও হেসেছে সবাই,, এখানে বসে থেকে মানুষকে বিরক্ত করার মঝাই আলাদা। ছেলেপুলেদের পিছনে ক্লাবের বারান্দায় ক্যারাম খেলছে দ্বীপ, বিহান, আহাদ আর মিনহাজ । এগুলো তাদের পুরোনো অভ্যাস,, আগে যখন ইয়্যং ছিলো,, সদ্য যুবক বয়স,, তখন তাদের ডিমান্ড টাই ছিলো আলাদা। সারাদিন ক্লাবে পরে থাকতো,, ঠিকঠাক ভার্সিটি যেতো না,, খাবার খাওয়ার কথা মাথায় থাকতো না,, রোমানা বেগম কলের পর কল করতেন তবুও দুই ভাইকে টাইম মাফিক বাড়ি ফিরাতে পারতেন না। ওরা সারাদিন ক্লাবে ক্যারাম, স্নোকার, কখনো কখনো তাস,, কারো কারো মাঝে গাম্বলিং ও চলতো। দ্বীপ অবশ্য কখনো গাম্বলিং এ হাড়েনি,, সে এসবে পারফ্যাক্ট। দ্বীপ অতিতে বেশ অগোছালো ছিলো। নারীগঠিত বিষয় ব্যাতিত এমন কোনো বাজে অভ্যাস নেই যেটা দ্বীপের ছিলো না,, এমন কোনো নে*শা নেই যেটা দ্বীপ করেনি,, আরও নানান ধরনের অপরাধ সে নির্বিঘ্নে করে ফেলতো,, শাহিন মির্জা যদি দ্বীপের ক্রাইম সিন গুলো ধামাচাপা না দিতো তাহলে এতোদিনে তার যাবত জীবন কিংবা ফাসি হয়েই যেতো। এমন নয় যে দ্বীপ ভালো হয়ে গিয়েছে,, এখন আরও উগ্র হয়েছে। সুস্থ হওয়ার পর দু-আড়াই মাসে যা ঘটিয়েছে,, এরপরের দিন গুলো কিভাবে কাটবে বুঝার উপায় নেই। তবে বলতেই হবে দ্বীপ একটা জায়গায় এসে বেশ ধৈর্যশীল,, আর সেটা একমাত্র অর্পনা,, দ্বীপের উইকন্যাস।
,,, আহাদ ক্যারামের গুটি ফেলে চিৎকার দিয়ে উঠলো। সে আর বিহান, দ্বীপ -মিনহাজের বিপরীতে খেলছে। বিহান ক্যারামে বেশ পরিপক্ব হলেও আহাদ তেমন পরিপক্ব না, সে গুটি ফেলতে পারেনা। পুরো খেলাটা বিহান একাই চালিয়ে নিচ্ছে। বর্তমানে দ্বীপদের পয়েন্ট ১৮ আর বিহানদের ১১। ২৭ পয়েন্টে গেইম ওভার। অনেক সাধনার পর একটা গুটি ফেলতে পেরে খুশি খুশি মন নিয়ে এবার রেড গুটিকে টার্গেট করলো আহাদ। এবারের গুটি টাও বোর্ড পকেটে ঢুকেছে,, খুশিতে লাফিয়ে উঠলো আহাদ,, দ্বীপ অর্পনার মতো নাক কুচকে আহাদের দিকে তাকিয়ে রইলো,, অর্পনার সাথে থাকতে থাকতে দ্বীপের ও এই বদ অভ্যাসটা হয়ে গিয়েছে। বিহান, মিনহাজের ও একই দশা তারা আহাদের লাফিয়ে উঠা চাল চলন দেখে বিরক্ত। আহাদ এবার আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর হয়ে নিজেদের সাদা গুটিতে টার্গেট করলো কিন্তু অতিরিক্ত পাকামির ফল স্বরুপ এটা ফসকে গেলো। সাথে সাথে আহাদের মুখটা চুপসে এইটুকুনি হয়ে যেতেই মিনহাজ আর বিহান শব্দ করে হেসে উঠলো। আহাদ গাল ফুলিয়ে স্টিকটা মিনহাজের দিকে বাড়িয়ে দিলো, মিনহাজ বোর্ড পকেট থেকে রেড গুটিটা বের করে আবারও সারক্যালের মাঝখানে রাখলো। আহাদ ছেকাখোরদের মতো মুখ করে পকেট থেকে সি*গারেট বের করে ঠোঁটে চাপলো,, লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে লম্বা একটা টান দিলো। কয়েক টান দেওয়ার পর দ্বীপের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো — খাবি?
,,, দ্বীপ নাকোচ করে বললো– নো!! আমি এসব খাইনা।
,,, আহাদ তাজ্জব বনে যাওয়ার মতো মুখ করে মিনহাজ আর বিহানের দিকে তাকিয়ে সুধালো– কে যেনো আগে বলতো “” সি*গারেটের আগে আমি আমার বাবা মাকেও রাখি না,, মেয়ে মানুষ তো ইচরে পোকা “”
,, মিনহাজ ৩২ পাটি বের করে বললো — ভাবি তো সাধারণ কোনো মেয়ে না ভাই। দেখলেই আমার কেমন ভয় ভয় করে,, মনে হয় এখোনি দুটো তিতা কথা শুনিয়ে দিবে।
,,, বিহান হেসে ফেললো,, এরা শুধু অর্পনাকে দেখেছে,, খুব একটা কথাও হয়নি। এরা কি জানে মেয়েটা তার সাথে বাড়িতে কি পরিমান ঝগড়া করে? তাও হাজারটা তিক্ত কথায়,, যদিও বিহান এসব ইনজয় করে,, ছোট বোন বলে কথা। আহাদ সি*গারেটে আরও একটা টান দিয়ে বললো — আরে বাদ দে,, মেয়ে মানুষ কতো কি বলে, সব কানে নিতে নেই। আমার বউ ও তো আমায় কতো মানা করেছে,, কিন্তু এসব কি ছাড়ার জিনিস?
,,, মিনহাজ নাক ছিটকে বললো — ছিহ!! তর বউ নিষেধ করার পরেও তুই এসব খাস? আমার থেকে কিছু শিখ,, আমার বউ আমায় তার মাথা ছুয়িয়ে কসম কাটিয়েছে যেনো কখনো ম*দ, গা*জা, বি*য়ার, সি*গারেট, হি*রোইন না খাই। আমিও কথা দিয়েছি খাবো না, সেদিনের পর এসব ছুয়েও দেখিনি।
,,,আহাদ কপাল কুচকে বললো– মিথ্যাবাদি!! তুই না একটু আগেও পরপর চারটা বি*ড়ি খেয়েছিস?
,,, হ্যা তো? আমার বউ আমাকে ম*দ, গা*জা, বি*য়ার, সি*গারেট, হি*রোইন খেতে মানা করেছে। একবারও বি*ড়ির কথা বলেনি,, যেহেতু বি*ড়ির কথা বলেনি সেহেতু এটা খাওয়া যাবে।
,,, আহাদ কিংকর্তব্য বিমুর,, কি ছিলো এটা? সে বিহানের দিকে তাকালো, বিহান ভ্রু নাচালো। আহাদ সিগারেট টা এক আঙ্গুলে আকরে ধরে দুহাতে তালি দিতে দিতে বললো– বাহ বাহ!! কেয়া বাত হে,, কেয়া সিন হে!! সবাই মিলে হাত তালি দেও,, হাত তালি!!
,,, সাথে সাথে টুলে বসা ছেলেরা হাত তালি দিয়ে উঠলো,, সাথে খিলখিল করে হেসে উঠলো সবাই।সবাই হাসলেও দ্বীপ নিরুত্তাপ,, তার দৃষ্টি পাশে রাখা ফোনের স্ক্রিনে। “”লাইফ লাইন”” নামে সেইভ করা নম্বরটা থেকে মেসেজ এসেছে। দ্বীপ আর অর্পনার মাঝে নিরব ঝামেলা চলছে দের সপ্তাহ। এতে দ্বীপের কিছু আসে যায়না,, যেই নারী অন্য পুরুষের জন্য মরতে যেতে পারে ঐ নারীকে প্রয়োজন নেই দ্বীপের। মরে যাক সে। এর আগে বহুবার প্রতিজ্ঞা করেও ঐ রমনির থেকে দূরে থাকেনি দ্বীপ ,, কারন ঐ রমনি তখন অপূর্ণ ছিলো,, অতীতের কঠিন জখম ছিলো যেখানে একটুখানি প্রলেপ লাগায়নি কেউ। কিন্তু আজ সেই রমনি অপূর্ণ নয়,, সে তার ভাগের ভালোবাসা পেয়েছে,, অতীতের জখমটা না সারলেও জখম কারী শাস্তি পেয়েছে,, এখন শুধু একটা মায়ের অভাব। সেটাও খুব শীগ্রই পূর্ণ হয়ে যাবে। তাই আপাতত রমনীর জন্য কোনো সফ্ট সাইট নেই দ্বীপের কাছে,, কোনো ছলনাকারীকে ভালোবাসেনি সে। ছলনাময়ীদের দ্বীপ একদমি পছন্দ করেনা। প্রচন্ড অনিহা থাকা সত্ত্বেও ফোনের সাইড বাটন প্রেস করলে দ্বীপ। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো —
“” হাসবেন্ড!! আই নিড ইউর হেল্প””
,,,দ্বীপ নিরুত্বাপ, হেলদোল দেখা গেলো না। বিহানের দান শেষ হতেই স্টিক দ্বীপের কাছে এলো,, সে শান্ত চোখে তাকিয়ে মিনহাজের দিকে ইশারা করতেই বিহান বুঝলো বিষয়টা,, স্টিকটা মিনহাজের হাতে ধরিয়ে দিলো। দ্বীপ যেহেতু তার টিম ম্যামবার সেহেতু দ্বীপের চালটা বর্তমানে সেই চালবে। দ্বীপ তপ্ত শ্বাস ফেলে ইনবক্সে ঢুকলো,, স্বল্প শব্দে রিপ্লাই করলো —
“” কি চাই?””
রাত ১২ টা ২৫।
,,,রুম অন্ধকার করে বিছানা আকরে শুয়ে আছে ইরাদ। রুম মেইটরা সব বাড়ি চলে গিয়েছে,, দুদিন পর হোস্টেল বন্ধ হয়ে যাবে। অন্যান্য বছর গুলোতে ২৭ রোজায় অর্পনার কাছে চলে যায় সে তারপর অর্পনা আর আরশাদ জামানের সাথে ঈদ করে। অর্পনার একটা চরম বদ অভ্যাস আছে,, সে পুরো রোজার মাস বাদ দিয়ে ঈদের আগের দিন শপিং করতে যাবে। এর আগে ওকে ধরে বেধেও শপিং এ নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। অগত্যা, ইরাদ, অর্পনা, রাত্রি, অরুন, পল্লবকে নিয়ে ঈদের আগের দিন শপিং এ যান আরশাদ জামান। একমাত্র ঈদের দিনেই অর্পনা নরমাল মেয়েদের ড্রেস পরতো তাও তিনজন ম্যাচিং ম্যাচিং। অরুন আর পল্লব ও ওদের সাৎে ম্যাচ করে পান্জাবী পরতো। এবার আর তা হবে না,, সব অন্য রকম হবে।
,,,আজ দের সপ্তাহ যাবত ইরাদের পৃথিবী থমকে আছে। এই কটাদিন সে একপ্রকার হোস্টেলে বন্দি করে রেখেছে নিজেকে,,ভার্সিটি ও যায়নি। অরুন, পল্লব প্রায়সই হোস্টেলের নিচে এসে দাড়িয়ে থাকে তাই বারান্দা ও যায়না। রাত আর অর্পনা কয়েকবার হোস্টেলে ঢুকে ওর সাথে দেখা করতে চেয়েছে কিন্তু সে দরজা আটকে বসেছিলো। কোনোমতেই অর্পনার সামনে যেতে পারবে না সে,, এই কলঙ্কিত মুখ আর কলঙ্কিত ঘটনাটুকু প্রকাশ করতে পারবেনা। ইরাদ মনে মনে ঠিক করেছে সে একেবারে সিলেট ফিরে যাবে,, তারপর আব্বু কিংবা বড়ো ভাইয়াকে পাঠাবে তার টিসি নিয়ে যাওয়ার জন্য । অনেক আগেই চলে যেতো কিন্তু অনলাইনে ট্রেনের টিকেট পাওয়া যাচ্ছিলো না। অনেক অনুরোধ করার পর একপ্রকার বিরক্ত হয়েই ইরাদকে একটা টিকেট দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল সকাল আট টায় ট্রেন ,, সে ইচ্ছা করেই সকালের টিকেট নিয়েছে,, আটটার আগে নিশ্চয়ই হারামি গুলো ঘুম থেকে উঠবেনা? তাকে আটকাতেও পারবে না। বন্ধুদের কথা ভেবে ফুপিয়ে উঠলো ইরাদ,, ওদেরকে খুব মিস করছে,, কতোগুলো দিন হয়ে গেলো ওদের দেখে না,, কেমন আছে পাপি গুলো? আর ঐ লোকটাই বা কেমন আছে? ঠকিয়ে দিব্যি ভালো আছে নিশ্চয়ই? একটা জীবনে আদ্রিয়ান কাইসার মানুষকে মানুষ মনে করলো না,, মেয়েদেরকে অত্যন্ত সস্তা ভেবে গেলো। ইরাদের ভুল হয়েছে,, সে তো নিজের চোখে দেখেছিলো আদ্রিয়ান অর্পনার জন্য কতটা পাগল,, তিনটা বছরে কি পাগলামিটাই না করেছে।
একজনকে এতো ভালোবাসার পর একটু সময়ে তাকে কিভাবে ভালোবাসতে পারে? এটা কি আদেও সম্ভব? নিজের বোকামি গুলোর কথা ভাবলে ইরাদের মরে যেতে মন চায়।
,,, বর্তমানে ইরাদ দিনগুলো কান্নাকাটির মধ্য দিয়ে পার করতে পারলেও রাতগুলো বড্ড দূর্বিষহ লাগে। ১২ টার পর না চাইতেও সিদ্বার্থের আইডির ইনবক্সে ঢুকে, আগের মেসেজ গুলো একটা একটা করে পরে আর কান্না করে,, ওপাস থেকে সিদ্ধার্থ ও অনলাইনে থাকে তবে মেসেজ দেয় না। মেসেজ দিয়ে কি হবে? যেখানে সামনের রমনিটি তাকে সহ্যই করতে পারেনা সেখানে একটার পর একটা মেসেজ দিয়ে কি লাভ? অগত্যা দুজনেই ইনবক্সে গিয়ে চাতক পাখির ন্যায় চেয়ে থাকে। একজন জানে সে কি চায় আর অন্যজন জানেনা সে কি চায়,, তবুও তারা চেয়ে থাকে আর অপার্থিব কিছু আশা করে। আজকেও তার ব্যাতিক্রম হলো না,, ইরাদ আর সিদ্বার্থ দুজনেই অনলাইনে আছে,, হয়তো ওপাশের ব্যাক্তিটিও ইরাদের মতোই তাকিয়ে আছে একটু খানি রিপ্লাইয়ের আশায়। ইরাদ যখন মনোযোগ দিয়ে ম্যাসেজ পরতে ব্যাস্ত তখনি তার মুখের সামনে ঝুকে এলো কেউ, মুখে কালো কাপর বাধা। ইরাদ কিছু বলতে নিবে তার আগেই ওর মুখে কিছু একটা স্প্রে করে দিলো। হঠাৎ মুখের উপর কিছু একটা স্প্রে হতেই ভ্রু কুচকে নিলো ইরাদ, সাথে সাথে তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো,, ধীরে ধীরে চোখ বুঝে চেতনা হাড়ালো রমনী। ড্রিম লাইটের আলোয় লম্বা চওড়া গড়নের অবয়বটি ইরাদকে পাজাকোলা করে নিলো। পরপর হাটা দিলো বাহিরের উদ্দেশ্যে।
,,, অবয়বটি ইরাাকে কোলে নিয়ে রাস্তায় এসে দাড়িয়ে এদিক ওদিক তাকালো,, ঠোঁট দুটো মিলিয়ে শীস বাজাতেই আড়াল থেকে হইচই করে বেড়িয়ে এলো তিনজন। পল্লবের কোলে ইরাদকে দেখে লাফিয়ে উঠলো রাত্রি —
,,, ইয়েএএএস ইরাদকে পেয়ে গিয়েছি,,
,,,, বলতে বলতে ঘুরে ঘুরে নাচতে লাগলো। অরুণ বুকে হাত বেধে প্রেয়সীর বাচ্চামি দেখেছে। মেয়েটা এতো আদুরে,, ওদের বন্ধু মহলটাকে মাতিয়েই রাখে সবসময়। এই মেয়েটার আবদার মিটাতে মিটাতেই জান যায় তাদের চার জনার তবুও কারোর চোখে মুখে একটুখানি বিরক্তির আভাস ফোটে না। সেদিন যদি মুরি খেতে থাকা ভাবের কলসিটাকে না পেতো? তাহলে তাদের বন্ধু মহলটা বোধহয় প্রান হীন থেকে যেতো। অর্পনা গরমে বড়ো বড়ো চুলগুলো একসাথে নিয়ে একটা টাইট খোপা করতে করতে বললো — এই মরার মুখে পানি দেওয়ার ব্যাবস্থা কর।
,,, অরুন দ্বিধান্মিত কন্ঠে সুধালো — পানি? পানি কই পাবো? আমার কাছে তো পানি নেই।
,,, অর্পনা বিরক্ত হয়ে বললো– অজ্ঞান করার স্প্রে আনতে পেরেছিস আর এক বোতল পানি আনতে পারলিনা? হারামি সব!!
,,, গাড়িতে নেই?( অরুন)
,,, নাহ!! আসার সময় সব খেয়ে নিয়েছি ( অর্পনা)
,,,ওদের কথোপকথন শুনে তেতে উঠলো পল্লব,, মেয়েটাকে অজ্ঞান করেছে,, সাথে সাথে জ্ঞান না ফিরালে যদি কিছু হয়? সে মুখে বিদ্রোপ মাখা হাসি ফুটিয়ে বললো — নোবেল দেওয়ার মতো কাজ করেছেন আপনারা,, এখন কি হবে? কি করবেন বলে ভাবছেন?
,,, অর্পনার প্রচুর গরম লাগছে, সে একটা হাফ হাতা এক্সেল সাইজের টিশার্ট আর প্লাজু পরে চলে এসেছে সাথে উড়না নেই। সে রাত্রির উড়নার কানি টেনে বাতাস করতে করতে বললো– কি আর করবো? ওকে ড্রেনের কাছে নিয়ে চল, ওখান থেকে পানি নিয়ে মুখে ছিটিয়ে দে নয়তো মুখটা ড্রেনের কাছে নিয়ে ধর এমনি জ্ঞান ফিরে আসবে।
,, রাত্রি সাথে সাথে বমি করার মতো অঙ্গভঙ্গি করে বললো — ওয়াক, ছিহ!! কি বলিস এসব? ইরাদের মুখে ডাস্টবিনের পানি ছিটাবি?
,,, অর্পনা চোখে থাকা লাক্স ফ্রেমের চসমাটা ঠেলে বললো –ও এটাই ডিসার্ভ করে।
,,,রাত্রি বোকা বোকা চোখে তাকিয়ে রইলো ,, ওর বোকা চাহনি দেখে শব্দ করে হেসে ফেললো অরুন। বললো — আমি পানি কিনে আনছি, অপেক্ষা কর।
,,, বলেই হাটা দিলো,, রাত্রি দৌড়ে গিয়ে অরুনের বাহু আকরে ধরে আবদারের সহিত বললো — আমিও যাবো,, সবার জন্য স্পিড আনবো ঠিক আছে? বসন্ত কালে এতো গরম পরতে কখনো দেখিনি বাবা,, কি দিনকাল এলো।
,,, রাত্রি এসে হাত ধরতেই অরুন দাড়িয়ে পরলো,, পরপর ধীরে ধীরে বাহু থেকে রাতের হাতটা ছাড়িয়ে দিলো। থমকে গেলো রাত্রি,, না করে দিবে নাকি? সাথে নিবে না? চাঁদের আলোয় রাতের থমথমে মুখটা দেখে মনে মনে হাসলো অরুন। চট করে ওকে টেনে বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো। এক হাতে কাধ পেচিয়ে ধরে সামনের দিকে হাটা দিয়ে আদুরে কন্ঠে বললো — আমার জানটা!!
,,, আকষ্মিক কান্ডে হেসে ফেললো রাত্রি , এক হাত অরুনের পিঠের পিছনে নিয়ে পেচিয়ে ধরে হেলতে দুলতে হাটতে লাগলো। আড় চোখে ওদের দিকেই তাকিয়ে ছিলো পল্লব, ঠোঁটে নিদারুণ হাসির রেখা, সে চোখ ঘুরিয়ে অর্পনার দিকে তাকালো। মেয়েটা গরমে হাসফাস করছে। পল্লবকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু নাচালো। পল্লব গাড়ির দিকে ইশারা করে বললো –
,,, ভাইয়া এখনো রেগে আছে?
,,, অর্পনা আরচোখে গাড়ির দিকে তাকালো, কঠোর মানব চোখ মুখ শক্ত করে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে,, পরনে হোয়াইট টিশার্ট আর ফোর কোয়াটার। এক হাতে ভেপ,, যেটা একটু পরপর ঠোঁটে চেপে ধুয়া উড়াচ্ছে,, অন্য হাতে ফোন স্ক্রল করছে, কানে ইয়্যার পড। ফোনে এভাবে কি দেখে, কি করে কে জানে? এমন ভাব নিয়ে দাড়িয়ে আছে যেনো সে আর তার ইউজ কৃত ফোন ব্যাতিত এই পৃথিবীর বুকে একটি মানুষ ও বসবাস করে না। সম্পূর্ণ দুনিয়াটাই তার আর তার ফোনের। অর্পনা চোখ সরিয়ে এনে বললো — মারাত্মক!! কথাই বলে না।
,,, তুই সরি বলিসনি?
,,, বলবো না কেনো? চারবার রাগ ভাঙাতে গিয়েছিলাম,, সরিও বলেছি,, উনি পাত্তা দেয়নি। পাত্তা না পেয়ে আমার মাথায় রাগ চড়ে গিয়েছিলো তারপর আরও দশটা কথা শুনিয়ে ফিরে এসেছি। তুই ভাব!! অর্পনা কারোর রাগ ভাঙাতে গিয়েছে আর তাকে সে পাত্তা দেয়নি,, কতোটা ইগোতে লাগে ধারনা আছে?
,,, সবসময় ইগোকে প্রাধান্য দিলে হয়না বান্ধবী,, ইগো নিয়ে প্রেম হয় কিন্তু ভালোবাসা না।
,,, অর্পনা থমকালো,, আড় চোখে আবারও দ্বীপের দিকে তাকালো। এই মানুষটা তার,, যতোই রাগ করুক কখনো তার পিছন ছাড়েনি। এইতো সন্ধায় যখন বললো হল সুপারকে বলে পল্লবকে ভিতরে ঢুকার ব্যাবস্থা করে দিতে,, তারা ইরাদকে কিডন্যাপ করবে। লোকটা চাইলেই হল সুপারের সাথে কথা বলে বিষয়টা মিটিয়ে দিতে পারতো কিন্তু তা না করে তার সাথে এসেছে। লোকটা জানে সে এখন তার বন্ধুদের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিবে তারপর বাড়ি ফিরবে তবুও চলে না গিয়ে এখানেই দাড়িয়ে আছে। একটা মানুষ এতোটা ভালোবাসতে পারে কি করে? অর্পনা ভেবে পায়না। সে ভাবনা রেখে পল্লবের কাছে এগিয়ে গিয়ে বাহুতে চাপর মেরে বলো — এসেছে আমার ভালোবাসা বিসারদ। এই পল্লব সত্যি করে বলতো, তর কি সত্যি ১৮ টা প্রেমিকা ছিলো? ইরাদ তো বললো এসব নাকি মিথ্যা,, সত্যি করে,,
,,, আর বলতে পারলো না মেয়েটা, তার আগেই চোখ পরলো দ্বীপের চিলের ন্যায় তিখ্ন চোখে,, সে অগ্নি দৃষ্টিতে পল্লবের বাহুতে রাখা অর্পনার হাতটার দিকে তাকিয়ে আছে। অর্পনা ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে হাতটা সরিয়ে নিলো,, লোকটা দিনকে দিন চরম কঠোর হয়ে যাচ্ছে না? ইদানীং তার বন্ধুদের ও হিংসা করা শুরু করে দিয়েছে। কি জ্বালা!! অরুন আর পল্লব তো ছেলে না আবার সে রাত্রি, ইরা ও তো মেয়ে না। তারা হচ্ছে সোলম্যাট ,, যাকে বলে আত্মার সঙ্গি। রুহের জগতে নির্ঘাৎ ওরা পাঁচ জন একসাথে মিলে বন্ডামি করেছিলো তাইতো পৃথিবীতে এসেও তারা বন্ডামি করে বেড়ায়। অর্পনার ইনোসেন্ট হাসি দেখেও দ্বীপের মন গললো না, সে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ফোনে মন দিলো। অর্পনার মনে গভীর প্রশ্ন,, লোকটা তো ফোন দেখছে আবার কানেও ইয়্যার পড ও লাগিয়ে রেখেছে,, তাহলে ও যে পল্লবের বাহুতে চাপর মেরেছে এটা দেখলো কি করে? কি আজব লোক রে বাবা? অর্পনা নিজের হাত, পা, গলা, মুখ চেক করলো। ওর শরীরে আবার কোনো হিডেন ক্যামেরা ট্যামেরা লাগায়নি তো আবার? যেই দূরন্দর লোক,, মনের কথা জেনে গেলেও আশ্চর্য হবে না সে। অর্পনার গভীর ভাবনার মাঝে রাত্রি পানির বোতল নিয়ে ছুটে আসতে আসতে ওদের কাছে এসে ধাম করে পরতে নিলো,, ইরাদকে সামলে রাত্রির হাত টেনে ধরলো পল্লব, ধমকে বললো — এতো তাড়াহুড়োর কি হলো? তর জামাই কি আরেকটা বিয়ে করে নিচ্ছে? যে তাড়াতাড়ি না পৌঁছাতে পারলে জামাই হাতছাড়া হয়ে যাবে?
,,, রাত্রি মিষ্টি করে হাসলো,, চাঁদের আলোয় রাতের হাসিটুকু বড্ড স্নিগ্ধ লাগলো।সে হাঁপাতে হাপাতে পানির বোতলটা অর্পনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো —
,,, আরে ইরাদ তো অজ্ঞান হয়ে আছে ,, এটাকে জাগাতে হবে না? পরে যদি ওর কিছু হয়ে যায় তাহলে তো ওর ডাকাত বাপ ভাইরা মিলে আমাদের কেটে সিলেটের পাহাড়ে মাটি চাপা দিয়ে দিবে।
,,, রাত্রি কথায় হেসে ফেললো পল্লব — ইরাদ যদি জানতে পারে তুই আবার ওর বাপ ভাইকে ডাকাত বলেছিস তাহলে তুই শেষ।
,,, ভাই এরা ডাকাত ই,, সওদাগর নামটাতেই কেমন ডাকাত ডাকাত একটা ভাইব আছে আবার ওদের নাকের নিচে সেই বড়ো বড়ো গোফ,, আল্লাহ!! দেখলেই আমার আত্মা ছলকে উঠে।
,,, অর্পনা বোতলের ছিপি খুলে সম্পূর্ণ পানিটাই ইরাদের মুখের উপর ঢেলে দিলো। চোখে মুখে ঝড়নার মতো ঝপঝপ করে পানির স্রোত বইতেই চোখ পিটপিট করে তাকালো ইরাদ। ইরাদকে তাকাতে দেখে পল্লব ওকে ছেড়ে দিলো,, ধাম করে পিচ ঢালা রাস্তায় আছড়ে পরলো ইরাদ। কোমরে হাত দিয়ে ওমাহ!! বলে চিৎকার করে সামনে তাকাতেই চার মুর্তিকে নিজের চারপাশে দাড়িয়ে থাকতে দেখে ভরকে গেলো। কিছু বুঝে উঠার আগে অর্পনা সজোরে একটা লাত্থি মারলো ইরাদের পিঠে। আবার ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো মেয়েটা। অর্পনার দেখাদেখি রাত্রিও লাত্থি মারলো। অরুন নির্বিকার ভাবে দাড়িয়ে,, পল্লব রাগ সামলাতে না পেরে ইরাদের পাথায় চাটি মারলো। রাত্রি আর অর্পনা পরপর চারটে লাত্থি মেরেও ক্ষান্ত হলো না, মেরেই যাচ্ছে। সবার এই অতর্কিত আক্রমণে বোকা বনে তাকিয়ে রইলো ইরাদ, মার খেয়ে ব্যাথায় কাদা কাদা তার শরীর। সে ব্যাথায় হাপাতে হাপাতে বললো — কি করছিস? আল্লাহ!! মারছিস কেনো? আরে কি অবস্থা,, আমি এখানে এলাম কি করে। ওমাগো,, সর হারামিরা।
,,, অর্পনা একটু থামলো, দুটো শ্বাস নিলো পরপর রাত্রিকে সরিয়ে দিয়ে হাটু গেড়ে ইরাদের সামনে বসে পরলো। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ইরার চুল টেনে ধরে গালে ঠাস করে চর বসিয়ে বললো– এতোদিন ভার্সিটিতে আসিস নি কেনো?
,, ইরাদ নিশ্চুপ, অর্পনার দিকে তাকাতে পারছে না, চোখ নামিয়ে নিলো। অর্পনা শক্ত করে ইরাদের মুখ চেপে ধরে উপরে তুললো– তাকা আমার দিকে,, কতোবার হোস্টেলের ভিতর গিয়েছি? দাম দেখাও আমার সাথে? তাপ নেও? তোমার তাপ দেখবো বলে বসে আছি আমি?
,,, ইরাদের চোখ দুটো লাল, চোখের নিচে কালি পরে আছে। চাঁদের আলোয় ঝলঝল করা এই কালো দাগ গুলো সাক্ষী দিচ্ছে সামনের মেয়েটা কতগুলো নির্ঘুম রাত পারি দিয়েছে,, ফোলা চোখ গুলো সাক্ষী দিচ্ছে এই দের সপ্তাহে কতোটা কেদেছে মেয়েটা। ইরাদের চোখ বেয়ে এক সমানে কয়েক ফোটা পানি গড়ালো, অর্পনার সহ্য হলো না। তার চোখ জ্বালা করছে,, কতোদিন পর দেখেছে এই পাপিকে। অর্পনা কান্না আটকাতে পারছেনা কেনো? সেই রাগে আবারও ইরাদের গালে সজোরে চর বসালো,, ফুপিয়ে উঠলো ইরাদ,, দুহাতে ঝাপটে ধরলো অর্পনাকে। হাটু গেড়ে বসে থাকা অর্পনা এবার পিচ ঢালা রাস্তায় পা ভাজ করে বসে পরলো,, দুহাতে আগলে নিলো ইরাদকে। ইরাদ কান্নার দমকে কথা বলতে পারছেনা, তবুও ফোপাতে ফোপাঁতে নাক টেনে বললো — আমার জন্য এমন করছিস কেনো তরা? আমি ভালো নারে, বেইমান, সার্থপর। আমার জন্য তকে কতো কষ্ট পেতে হলো। আম, আমি তদের কাছে আর আসবো না। আমি একেবারে সিলেট চলে যাবো।
,,,, এতোক্ষণ নির্ভিগ্নে দাঁড়িয়ে থাকা অরুন ঠাস করে লাত্থি মারলো ইরাদের পিঠে,, ব্যাথায় শব্দ করে ফুপিয়ে উঠলো ইরাদ। অরুন আবার লাত্থি দিতে নিলে পল্লব ঝাপ্টে ধরে সরিয়ে নিলো। অরুন ফুসতে ফুসতে বললো — ওর জন্য কেনো এমন করছি মানে? ওকে বুঝাতে হবে কেনো করছি? জানেনা কিছু? সয়তান মহিলা!! বিধবা একটা!! দের সপ্তাহ ধরে ওনার হোস্টেলের সামনে দাড়িয়ে থাকি আর উনি ফিরেও তাকায়না,, যেনো কিছু এসে যায়না। বেয়াদব!!
,,, মার খাওয়ার ভয়ে অর্পনার দিকে সিটিয়ে গেলো ইরাদ, শক্ত করে পেচিয়ে ধরলো চিকন গড়নের মেয়েটাকে। অর্পনার সাইজ ছোট হলেও একজন বিজ্ঞ অবিভাবকের ন্যায় আগলে নিলো ইরাদকে। কয়েকদিন যাবত একাধারে কান্নাকাটি করার ফলে ইরাদের গলা একেবারে বসে গিয়েছে যার ফলে কান্নাটা বরই বিস্রি শুনাচ্ছে। ইরাদকে কাদতে দেখে রাত্রিও ফুপিয়ে উঠলো,, কাদতে কাদতে ওদের পাশে বসে ইরাদকে জড়িয়ে ধরলো। অর্পনাও এবার কান্না ধরে রাখতে পারলো না। এই হারামি গুলোর মধ্যে একটাও যদি হাড়িয়ে যায় তাহলে সে একেবারে নিশ্ব হয়ে যাবে,, পঞ্চম বারের মতো মরবে আর কখনো জীবিত হতে পারবে না। ইরাদ কাদতে কাদতে কি যেনো বলছে বার বার,, কিন্তু কিছুই বুঝা যাচছে না। রাত্রির কান্নাটা সুন্দর,, সুন্দর মানুষের হাসি কান্না সবি সুন্দর হয়। অরুন ব্যাথিত নজরে তাকিয়ে আছে প্রেয়সীর দিকে,, এভাবে কান্না করতে হবে কেনো? তার বুকে বুঝি ব্যাথা লাগে না? তবে পল্লবের চোখে বিরক্তি, মেয়ে মানুষের ঢং তার কোনোকালেই ভালো লাগেনি। এই অর্পনটাও বিয়ের পর কেমন ইমোশনের মা হয়ে গিয়েছে,, আগে ধরে পিটালেও চোখ থেকে এক ফোটা পানি গড়াতো না। দ্বীপ মির্জার চক্করে পরে ইদানীং ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদতেও শিখে গিয়েছে মেয়েটা,, সব দোষ ভালোবাসার। ভালোবাসা শব্দটাই বাজে,, যে পায় সেও পোড়ে,, যে না পায় সেও পোড়ে,, ভালোবাসার অপর নাম বোধয় জলন্ত কয়লা।
,,,, পিচঢালা রাস্তায় বসে আছে পাঁচ জন,, দ্বীপ এখনো গাড়িতে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে,, মাঝেমধ্যে আড় চোখে এদিকে তাকাচ্ছে আবার নিজের কাজে মন দিচ্ছে। অর্পনা ইরাদ মুখমুখি বসে। অর্পনার একপাশে রাত্রি আর অরন অন্যপাশে পল্লব বসেছে। ইরাদ আর রাত্রি এখনো নাক টেনে টেনে নিজেদের কান্নার প্রমান দিচ্ছে যেনো তারা কান্নার প্রতিযোগিতায় নেমেছে আর সেই প্রতিযোগিতার পুরস্কার স্বরুপ অস্কার দেওয়া হবে। ইরার কান্নাটা মানা যায়, সে কষ্টে আছে কিন্তু এই বেক্কলটা কেনো কাদছে? ভেবে পেলো না পল্লব। সহসা ধমকের স্বরে বললো — তুই আরেকবার নাক টানলে তর নাকটাই কেটে ফেলবো আমি।
,,, রাত্রি সাথে সাথে উড়না দিয়ে নাক চেপে ধরলো,, এই নাক হাড়ানো যাবে না। নাক ছাড়া নিশ্চয়ই তাকে দেখতে অনেকটা বিস্রি দেখাবে?, পল্লব যেই খারাপ, আবার কয়দিন আগে সে ওকে মারলো না? এখন যদি সত্যি সত্যি প্রতিশোধ নেয়? না না রিস্ক নেয়া যাবে না। অর্পনা এদের কান্ডে বিরক্ত হয়ে বললো — তরা থাম, বিধবা নারী!! আপনি বলুন, তারপর কি হয়েছে?
,,, ইরাদ নাক টেনে বললো — আদ্রিয়ান স্যার যখন হসপিটালে ভর্তি ছিলেন তখন আমিও ছিলাম ওনার পাশে,, তখনি প্রতিদিন সিদ্বার্থের সাথে দেখা হতো আমার।
,,, অরুন মাথা ঝাকিয়ে বুঝার মতো করে বললো– হুম!! আর ঐ ছেলে আমার বিধবা বান্ধবীকে দেখতে দেখতে ফিদা হয়ে গিয়েছে তাইতো?
,,, ইরাদ উপর নিচ মাথা নাড়ালো মানে হে দেখে দেখে ফিদা হয়ে গিয়েছে। পল্লব কনফিউস্ড হয়ে বললো — কিন্তু কি দেখে ফিদা হলো? তুই তো সুন্দর না মামা।
,,, ইরাদ কাদতে কাদতে চোখ রাঙিয়ে তাকালো,, পল্লব অন্যদিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো, রাত্রি আর অরুন ও হেসে ফেললো। অর্পনা বললো– থামিস কেনো? পরে বল।
,,,ইরাদ নাক ফুলিয়ে বললো– পল্লবকে কিছু বল, ও আমায় অসুন্দর বলেছে।
,,, অর্পনা পল্লবের দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে বললো — কিছু!!
,,, ইরাদ ব্যার্থতার নিশ্বাস ফেললো, এদের কাছে বিচার দেওয়া অনার্থক। কেউ ওর কষ্টটা বুঝছে না,, এমন ভাব করছে যেনো এটা কোনো কষ্টই না। অগত্যা হতাশ কন্ঠে আওড়ালো– আদ্রিয়ান স্যারকে যখন হসপিটাল থেকে রিলিজ দেওয়া হলো তারপর উনারা নিজেদের ফ্লাটে ফিরে গেলেন।সেদিনের পর আর দেখা হয়নি ওনাদের সাথে। তবে এর কিছুদিন পরেই হঠাৎ রাতে আদ্রিয়ান কাইসার নামক আইডি থেকে আমার ফোনে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এলো,, আমি যেহেতু আদি স্যারকে ভালোবাসতাম তাই এভোয়েট করতে পারিনি। রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করতেই ওপাশ থেকে মেসেজ এলো,, তারপর থেকে প্রেমালাপ শুরু। প্রতিদিন রাত জেগে কথা বলতাম দুজন,, একদিন ওপাশ থেকে মেসেজ এলো
“” অর্পনার সাথে একবার দেখা করিয়ে দিবে প্লিজ!! ওর সাথে আমার কিছু কথা ছিলো। আর আমি আমার আগের কৃতকর্মের জন্য ওর কাছে শেষ বারের মতো ক্ষমা চাইতে চাই। একটাবার দেখা করিয়ে দিলে আমি আর কখনো ওর খোজ করবো না। এরপর আমি আর তুমি একটা সুন্দর সংসার সাজাবো, যেমন করে আমরা রোজ কল্পনা করি “”
আমি বোকার মতো সেই ম্যাসেজ টা বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম আর ঠকে গিয়েছি। উনারা দুজন আমাকে ঠকিয়েছে,, আমি ওনাদেরকে ঘৃণা করি। আদ্রিয়ান স্যার নাহয় তকে ভালোবাসতো,, সিদ্বার্থ এটা কেনো করলো? উনি তো সব জানতো,, তারপরেও আমার ইমোশন নিয়ে খেলেছে। বেইমান একটা, জোচ্চর, ইংরেজের বাচ্চা,, ওকে কাছে পেলে একদম খুন করে ফেলবো। আমাকে নিয়ে নাকি সংসার করবে? আমাকে ভালোবাসবে,, আবার বলে আদর ও করবে। ওকে আদর করাচ্ছি,, কাছে এলে একদম গলা কেটে রেখে দিবো। বদমাস একটা,, বেইমানের বাচ্চা!!
,,,, বলতে বলতে হিতাহিত জ্ঞান হাড়িয়ে অন্য জগতে চলে গিয়েছে ইরাদ,, কি বলছে না বলছে সে নিজেই জানেনা। ইরাদের বচন ভঙ্গি দেখে থমকালো চারজন। এভাবে তো বউরা আচরন করে,, এরকম স্টাইলে বউরা জামাইদের সাথে রাগারাগি করে। ইরার হাব ভাব দেখে চারজন ঠোঁট টিপে হাসলো,, ইরাদ হয়তো সিদ্বার্থের প্রতি উইক নয়তো সব দোষ সিদ্বার্থের উপর চাপাতো না। মেয়েরা সর্বাবস্থায় তার ব্যাক্তিগ পুরুষের উপর দোষ চাপায়,, এটা নিজের হোক কিংবা অন্যার। পল্লব এবার সিরিয়াস হলো, বুঝানোর মতো করে বললো–
,, ইরাদ!! ঠান্ডা মাথায় ভাব,, তুই কার জন্য কষ্ট পাচ্ছিস? তকে যে ঠকিয়েছে? আদ্রিয়ান কাইসারের কাছে তর কষ্টের কোনো মূল্য নেই,, খোজ নিলে দেখবি সে তর কথা মনেও রাখেনি। শুধু তকে ব্যাবহার করেছে সাথে সিদ্বার্থকেও ব্যবহার করেছে। এমন একজন লোক কি সত্যি ই তর ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য? তার জন্য কেনো তুই নিজের জীবনটা নষ্ট করবি?
,,, ইরাদ উড়না দিয়ে নাক মুছে বলো — তুই কি বলতে চাচ্ছিস? আমার কষ্ট পাওয়াটা অনার্থক?
,,, অরুন নাকোচ করে বললে– নাহ!! অনার্থক না,, তবে আমরা এমন কোনো মানুষের জন্য কষ্ট পাবো না, যার কাছে আমাদের কষ্টের কোনো মূল্য নেই। তুই বরং সিদ্বার্থের কথা ভাব,, ছেলেটা তকে ভালোবাসে,, তর একটু সাহারা পাওয়ার জন্য মরিয়া। একজন সার্থপরের জন্য নিজের জীবন কেনো নষ্ট করবি?
,,, ইরাদ হতবিহ্বলের ন্যায় তাকিয়ে আছে,, এরা কি বলে? সিদ্বার্থকে নিয়ে ভাবতে? ইরাদ দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো — না না!! উনিও ঠক, আমি উনাকে নিয়ে কিছু ভাবতে চাইনা। উনি জাহান্নামে যাক আমার কিছু আসে যায় না।
,,, অর্পনা কাঠ কাঠ গলায় জিঙ্গেস করলো +– সত্যি ই আসে যায়না? ভেবে বল,, সময় আর ভালোবাসা একবার হাড়িয়ে গেলে দ্বিতীয়বার ফিরিয়ে আনা যায় না। পরে আবার আফসোস করবি নাতো?
,,, ইরাদ থম মেরে বডে রইলো, কি বলবে? কি উত্তর দিবে? তার নিজের কাছেই তো কোনো উত্তর নেই। উত্তর খুজে না পেয়ে ফুপিয়ে উঠলো মেয়েটা,, অর্পনা হাসলো,, সে জানতো ইরাদের রিয়্যাকশন এমন হবে। অর্পনা এবার নরম স্বরে বললো–
,,,ইরাদ!! এইযো তকে সিড ভাইয়া ভালোবাসলো না? তুই জানিস এই ভালোবাসাটা পেতে কতোটা ভাগ্য লাগে? এগুলো সবাই পায়নারে। কারোর জীবন, মন মস্তিষ্কে একা একা বিরাজ করতে ভাগ্য লাগে। এই ভাগ্যটা তর হয়েছে। সিড ভাইয়ার প্রথম ভালোবাসা তুই,, আমেরিকার এমন একটা কান্ট্রিতে থাকা সত্তেও সিড ভাইয়া কোনো মেয়ের দিকে তাকিয়েও দেখেননি। ( আড় চোখে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো) হ্যা!! হতে পারে আমার মামাতো ভাইরা একটু অহংকারি কিন্তু তাদের ক্যারেক্টার খুব ভালো। তুই ঠকবি না,, বুঝলি?
,,, ইরাদ ফ্যালফ্যাল করে তাকি আছে,, রাত্রি অর্পনার মতো ফিসফিস করে বললো — কিন্তু তুই এটা ফিসফিস করে বললি কেনো?
,,, অর্পনা চোখ দিয়ে দ্বীপের দিকে ইশারা করে হাত উচিয়ে গলা কাটার মতো অঙ্গভঙ্গি করে বললো — শুনতে পারলে ক্ষতম করে দিবে।
,,, রাত্রি উকি ঝুকি দিয়ে দ্বীপের দিকে তাকালো, শুনতে পেয়েছে কিনা বুঝার চেষ্টা করলো। তখনি দ্বীপ ঠোঁটে ভেপ চেপে অর্পনার দিকে তাকালো,, রাত্রি চোখ সরিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বললো — সাবধান!! ভাইয়া এই দিকেই তাকিয়ে।
,,, অর্পনা নাক কুচকে তাকালো,, সহসা দুজনের চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে নিয়ে নাক মুখ দিয়ে ধোয়া ছাড়লো দ্বীপ । দাতে দাত চেপে সহ্য করলো অর্পনা। নে*শাখোর একটা। এমন নে*শা করেছে যে এখন নে*শা ছাড়াতে গিয়েও নতুন করে নে*শা করতে হয়। ওসব ছাইপাঁশ না খেতে পেয়ে অসুস্থ হয়ে পরে বলে ডক্টর ভেপ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গেলে এটা ছেড়ে দিবে কিন্তু দিন শেষে ঠিকি ওর সাথে ভাব নিচ্ছে। লোকটা বোধহয় জানেনা, উনাকে ভেপ খাওয়ার সময় মারাত্মক লাগে,, না চাইতেও প্রেমে পরে যায় অর্পনা। নে*শা বিদ্যেশি নারী অর্পনা জামান একটা নে*শাখোরের নে*শা করা দেখে নে*শায় পরে যাচ্ছে,, মারাত্মক ব্যাপার সেপার।
,,,,মাঝে পেরিয়েছে দুই ঘন্টা। প্রায় তিনটা বাজে,, কান্নাকাটি শেষে উড়না দিয়ে চোখ মুখ মুছলো ইরাদ, এখন অনেকটা শান্তি লাগছে,, মনে হচ্ছে জীবনের অর্ধেক কষ্ট কমে গিয়েছে তার। পল্লব দুহাত উপরে তুলে টানা দিয়ে বললো — এ হোস্টেলে যাহ!! মহিলা মানুষের প্যাচাল শুনতে শুনতে ঘুম পেয়ে গিয়েছে। আমি বা্রি গেলাম।
,,, বলে উঠতে নিলে বাধা দিলো ইরাদ,, নাক ফুলিয়ে বললো — কেউ কোথাও যাবি না, আগে আমার পাওনা দিয়ে যা।
,,, তর আবার পাওনা কিসের? আজব তো!! ( অরুন)
,,, পাওনা মানে? তরা যে আমায় লাত্থি দিলি? এখন আমার জ্বর হলে? সবাই একটু একটু করে কোলে নে,, নয়তো আমি কাউকে যেতে দিবো না।
,,, বলতে বলতে সবাইকে টেনে তুললো ইরাদ,, পল্লব নাকোচ করে বললো– আমি তকে লাত্থি দেইনি,, শুধু চটকনা দিয়েছি। আর এমনিতেও তকে কিডন্যাপ করার সময় কোলে করেই এনেছি। মাফ কর মা,, রেহাই দে।
,,, ইরাদ মুখ বাকালো — আচ্ছ তাহলে তরা নে।
,,, অর্পনা তপ্ত শ্বাস ফেলে এগিয়ে এলো,, ইরাকে দুহাতে ঝাপটে ধরে কিছুটা উপরে তোলার প্রয়াস চালালো। ইরাদের উজন যেহেতু অর্পনার থেকে ১২ কেজি বেশি,, উপরে তুলতে বেশ কষরত করতে হয়েছে মেয়েটাকে। অর্পনা ছেড়ে দিতেই রাত্রি ওকে উপরে তোলার প্রয়াস চালালো,, অনেকটাই সফল হয়েছে কিন্তু লাস্ট মোমেন্টে ধরে রাখতে পারেনি। ইরাদকে নিয়ে ধাম করে রাস্তায় পরলো,, ব্যাথা পেয়েও খিল খিল করে হেসে উঠলো দুজন। অরুন এগিয়ে এসে রাত্রিকে উঠালো কিন্তু ইরাদকে ধরলো না। ইরাদ গাল ফুলিয়ে বললো — আজ কেউ নেই বলে।
,,, অর্পনা হেসে বললো — সিড ভাইয়াকে আসতে বলবো?
,,, ইরাদ ভ্রু গুটিয়ে মুখ বাকালো। অরুন বললো — তুই হাটু ভাজ করে বস, আর হাত দুটো পায়ের নিচে দিয়ে দুহাতে শক্ত করে ধর।
,,, ইরাদ তাড়াহুড়ো করে বসে অরুনের কথা মতো কাজ করলো,, অরুনের বেশ শক্তি । সে এক হাতে ওদেরকে তুলে নিতে পারে,, এটা আগেও করেছে কয়েকবার। বিষয়টা অনেক ভালো লাগে তিন জনার। অরুন এক হাতে ইরাদের হাত শক্ত করে ধরলো পরপর সত্যি ই উপরে তুলে নিলো ওকে। ডাম্প করার মতো একবার নিচে নামালো আরেকবার উপরে। খিলখিল করে হেসে উঠলো ইরাদ। ইরাদকে ছাড়ার পর রাত্রি বায়না ধরলো। প্রেয়সীর বায়না পুরন করার জন্য সর্বদা তৎপর অরুন। মেয়েটার আবদার সে ফেলতেই পারেনা।
,,, দ্বীপের ব্যাবহিত ভেপটা অর্পনার দখলে। ইচ্ছা করলো একটা টান দিতে কিন্তু ধোয়ায় কষ্ট হয় বলে দিলো না। স্ট্রভেরি ফ্লেভারটা কখনোই পছন্দ না তার তবে যন্ত্রটাতে লেগে থাকা কঠোর মানবের ঠোঁটের মিষ্টি ঘ্রাণটা তাকে প্রশান্তি দেয়। অর্পনা সেটা নাকে ঠেকিয়ে ঘ্রান নিলো পরপর দ্বীপের দিকে তাকালো। বিশ মিনিট হতে চললো তারা এখানে বসে আছে,, কিন্তু লোকটা গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছে না। অর্পন চোখের চসমাটা হেড বোর্ডে রেখে বললো–
,,, কি হলো, বসে আছেন যে? বাড়ি যাবেন না?
,,, দ্বীপ নিরব চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে, অর্পনার কথায় কোনো হেলদোল প্রকাশ করলো না। অর্পনা বিরক্ত হলো,, সে তার জীবনে কাউকে এতোটা তৈলমর্দন করেনি যতটা এই দের সপ্তাহ ধরে উনাকে করেছে। অর্পনা বিরক্ত হয়ে বাহিরের দিকে চোখ রাখতেই এক প্রকার ঝড়ের গতিতে ওর বুকের কাছের টিশার্ট খামচে ধরলো দ্বীপ,, টেনে কাছে আনার পরিবর্তে নিজেই এগিয়ে গেলো। কোনো বাক্য বিনিময় না করে অর্পনার গলায় মুখ গুজে দিলো। একটা রুক্ষ, পুরো উষ্ঠের ধ্বংসনে পিষ্ট হতে লাগলো অর্পনার মশৃন কলার বোন। অনুভুতির যাতাকলে পরে খিচে চোখ বন্ধ করে নিলো অর্পনা, তীব্র শিহরনে পায়ের ব্রক্ষ তালু পর্যন্ত শিরশিরিয়ে উঠলো,, ঠোঁট ফুরে বেড়িয়ে এলো ব্যাথাতুর শব্দ,, চোখ বেয়ে দুফোঁটা পানিও গড়ালো। লোকটা খুব খারাপ, বড্ড কঠোর আর নিষ্ঠুর,, বিন্দু মাত্র মায়া করেনা তার জন্য। অর্পনা দ্বীপের বুকে মৃধু ধাক্কা দিয়ে বললো — সরুন পাষান লোক, আজরাইল একটা।
,,, দ্বীপ সরলো না, নিজের কাজ অব্যহত রাখলো সাথে কঠোরতার পরিমান আরও বৃদ্ধি করলো। অর্পনা ঠাওর করতে পারছে এটা কোনো ভালোবাসাময় স্পর্শ নয়,, দ্বীপ নিজের রাগ প্রকাশ করছে এভাবে। বুঝতে পেরে অর্পনা আবারও দ্বীপের বুকে ধাক্কা দিতে নিলে আটকে দিলো দ্বীপ। একহাতে শক্ত করে ধরলো অর্পনার ডান হাত,, পরপর হাতের জোর বাড়ালো,, অর্পনার ডান হাতে তিনটে রিং ছিলো। একটা বিয়ের আগে থেকেই ছিলো,, একটা বড়ো চাচা শ্বশুর দিয়েছে আর অন্যটা দ্বীপ দিয়েছে। দ্বীপের শক্ত হাতের চাপে অর্পনার পাচটি আঙুল একসাথে মিশে গেলো,, হাতে রিং থাকার কারনে চাপ খেয়ে আঙুল ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো অর্পনা,, দ্বীপের এলো গেলোনা, সে হাতের চাপ আরও বাড়ালো। ব্যাথার তোপে অর্পনার শরীর মুচড়ে উঠতেই যেই তরে এসেছিলো সেই তরেই দূরে সরে গেলো দ্বীপ । স্টেয়ারিং শক্ত করে চেপে ধরে বললো —
,,, আর কখনো যদি কাউকে টাচ করতে কিংবা জড়িয়ে ধরতে দেখেছি,, তাহলে তর শরীরের চামড়া তুলে ফেলতে দ্বিতীয়বার ভাববো না আমি। মাইন্ড ইট!!
,,, ছাড়া পেতেই বাম হাতে ডানহাত চেপে ধরলো অর্পনা,, হাতটা পুরো লাল হয়ে গিয়েছে,, ব্যাথায় তার বুক ভেঙে কান্না আসছে, কিন্তু কাদবে না,, এটুকু ব্যাথায় কেউ কাদে নাকি? অর্পনা বড়ো করে একটা দম নিয়ে নিয়ে সামনের মিররে চোখ রাখতেই নিজের মসৃণ কলার বোনের নির্মম অবস্থা দেখে তপ্ত শ্বাস ফেললো। সে ইরাদকে একটু জড়িয়ে ধরেছিলো এতে কি এমন হয়েছে? পল্লব না হয় ছেলে ইরাদ তো ছেলে না। একটা মেয়েকে নিয়েও উনার এই জেলাসি কতোটা সঙ্গতিপূর্ণ? অর্পনা আড় চোখে দ্বীপের দিকে তাকালো। লোকটার চোখে মুখে কোনোরুপ অনুসুচনা নেই,, তাকে এতো বড়ো আঘাত করেও লোকটার কোনো ভাবাবেগ হলো না? অর্পনার শক্ত মনটাতে অভিমান ছেয়ে গেলো,, একটা দিনের পর একটা মানুষ এতোটা কঠোর কি করে হতে পারে?
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৩ (৬)
আগে তো ও একটু ব্যাথা পেলেই কি থেকে কি করবে খুজে পেতো না। একটু দূরে গেলে পাগলামি করতো, নিজেকে আঘাত টাগাত ও করতো কিন্তু এখন কতো অবলীলায় ওর ৎেকে দূরে থাকছে। অর্পনা কলার বোনে হওয়া নীলচে দাগ গুলোতে হাত বুলিয়ে অভিমানী স্বরে বললো — আপনি পাল্টে গিয়েছেন দ্বীপ,, যাচ্ছে তাই হয়ে গিয়েছেন।
,,, ওপাশ থেকে উত্তর এলো না,, ফিরেও তাকালো না। যেনো দ্বীপ মির্জার পাশে কেউ বসে নেই। অর্পনা নামক মানুষটা একটা জড়বস্তুর মতো,, তার কোনো অস্তিত্বই নেই।
