Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫১ (৩)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫১ (৩)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫১ (৩)
রুপান্জলি

অনেকক্ষন যাবত হইচই করার পর এট লাস্ট কেক কাটার মুহুর্ত এসে হাজির হলো। সবাই মিলে একসাথে জড়ো হলো লাইটিং এড়িয়ার মধ্য প্রান্তে। কেক কাটার জন্য মাঝখানে অর্পনা দাড়ালো তার এক পাশে বিহান অন্য পাশে আরশাদ জামান আর বাকি সবাই ওদের সামনে দাড়ানো। দ্বীপ কিছুটা দূরে দাড়িয়ে বুকে হাত ভাজ করে অর্পনার দিকে তাকিয়ে। এই মেয়েটার চলন বলন, কথা বার্তা, নাক কুচকানো, ঠোট নাড়ানো তাকে বড্ড আকার্ষন করে। চেহারার প্রশংসা নাই করলো,, হয়তো চেহারার প্রশংসা করলে অর্পনা ভাববে সে পারুর মতো দেখতে বলে দ্বীপ ওকে ভালোবাসে। তারপর আবার নিজের চেহারাকে ঘৃণা করতে চাইবে। অথচ দ্বীপ তার মনকে যতোবার জিজ্ঞেস করেছে,, অর্পনাকে ভালোবাসার কারন কি? দ্বীপের মন ততোবার উত্তর করেছে,, এই ভালোবাসার কোনো কারন নেই, সে অকারনেই এই মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছে। কবে? কখন? কিভাবে ভালোবাসাটা হয়েছিলো তার জানা নেই। ঐতো, কিছু সময় আগে অর্পনা বললো না? ভালোবাসা নাকি হুটহাট হয়ে যায়। দ্বীপের বেলায় ও তাই হলো। হয়তো একটা সময় অবুঝ থাকার কারনে অর্পনাকে পারু ভেবে কাছে ঘেষতে দিয়েছিলো কিন্তু ভালোটা সে অর্পনাকেই বেসেছে,, শুধুই অর্পনাকে,, পারুর চেহারাকে নয়। দ্বীপকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অর্পনা ডাকলো

— দূরে দাড়িয়ে আছেন কেনো? আসুন!!
,,, দ্বীপ নাকোচ করে বললো — তুমি তো জানো আমি এসব পছন্দ করি না, কেক ও কাটিনা। তোমরা কাটো আমি আছি।
,,, আরশাদ জামান নাক কুচকালেন,, কন্ঠে বিরক্তি ঢেলে বললেন — তোমায় না ভাব ধরতে মানা করলাম? আসো, একসাথে কেক কাটো।
,,, দ্বীপ চোখ রাঙাতে গিয়েও রাঙালো না। ওখানে উনার মেয়ে দাড়িয়ে,, বউটা যেই বাবা পাগল। যদি দেখে সে ওর বাবার সাথে ঝামেলা করছে তাহলে মেয়েটা আবার তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিবে। এই প্রথম দ্বীপ অনুভব করলো সে তার বউকে ভয় পাচ্ছে। এটাকে শুধু ভয় না তীব্র ভয় যাকে বলে। তাহলে কি এটাই ফ্যাক্ট? পুরুষ মানুষ বাহিরে যতই হম্বিতম্বি করুক বউয়ের কাছে এলে ভেজা বিড়াল হয়ে যায়? বিহান দ্বীপের মনের ভাবনাটুকু বুঝে আরশাদ জামানের উদ্দেশ্য বললো — থাক আঙ্কেল,, ও এরকমি। শতো বলেও কোনোদিন কেক কাটাতে পারিনি।
,,, আরশাদ জামান ফের নাক কুচকালেন,, বিহান যেহেতু ভদ্র ছেলে তাই ওর কথা মেনেও নিলেন কিন্তু অর্পনা মানলো না। সে চোখ মুখ অন্ধকার করে দ্বীপের দিকে তাকালো। মুখবিবরে কাঠিন্যতা থাকলেও চোখে একরাশ মায়া। এতোটাই মায়া যতটা মায়া থাকলে ৩২ বছরের শক্ত মানবের মন নড়ে যেতে সক্ষম। অর্পনা চোখে মায়া আর কন্ঠে জেদ চেপে সুধালো — আপনি আসবেন না?

,,, দ্বীপের নিজের কাছেই নিজেকে অসহায় ঠেকলো। অর্পনাকে কিভাবে বুঝাবে তার এসব পছন্দ না, সে পাশে আছে, এতো কিছু এরেন্জ করেছে এটাই অনেক। এর আগে তো এসব করেনি, করার প্রয়োজন ও মনে করেনি। এমনকি বিহান সবকিছু এরেন্জ করে রাখলেও তাকে খুব একটা এটেন্ড করতে দেখা যেতো না। দ্বীপকে কিছু বলতে না দেখে অর্পনা যা বুঝার বুঝে গেলো,, তার খুব রাগ হচ্ছে,, একবার ভাবলো সম্পূর্ণ কেকটাই ফেলে দিবে পরোক্ষনেই বিহানের হাসিখুশি মুখটা দেখে মায়া হলো। উনার তো এখানে থাকার কথাই ছিলো না,, উনার জন্মদিন, উনার উচিৎ ছিলো বউয়ের সাথে সময় কাটানো অথচ শুধু তার জন্মদিনের এরেন্জম্যান্ট করতে এখানে রয়ে গিয়েছে।অগত্যা আরশাদ জামানের হাত ছেড়ে উল্টো পথে হাটা দিলো। অর্পনার কান্ডে বোকা বনে গেলো দ্বীপ। নিজের সকল জেদ, দাম্ভিকতা দূরে সরিয়ে দৌড়ে গিয়ে অর্পনার হাত টেনে ধরলো । অর্পনা হাত মুচড়াতে মুচড়াতে বললো — ছাড়, তর কেক তুই খা। ঐ কেক আমি কাটবো না। তুই তর পছন্দ অপছন্দ নিয়ে বসে থাক, একদম আমার পিছনে আসবিনা, আসলে একদম খুন করে ফেলবো।
,,, দ্বীপ হতাশ হলো,, দুহাতে ঝাপ্টে ধ রে কোলে তুলে নিলো। এই ত্যারার সাথে পেরে উঠবেনা জানার পরেও তার নিষেধ করাটা উচিৎ হয়নি। তার একটা না এর জন্য পুরো আয়োজন না বেস্তে যায়। অতঃপর,, ৩২ বছরের রেকর্ড ভেঙে এই প্রথম কেক কাটতে রাজি হলো দ্বীপ। অর্পনাকে নিয়ে কেক কাটার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলো। দ্বীপের বুকে মুখ গুজে একটা সয়তানি হাসি দিলো অর্পনা, কাকে কিভাবে বাডে আনতে হয় তার ভালো করেই জানা আছে। তার সাথে পছন্দ অপছন্দের হিসেব করে,, ফালতু লোক।

,,, কেক কাটার শেষে মাদুর বিছিয়ে সবাই খেতে বসেছে,,সবাই যেহেতু একসাথে হয়েছে সুতরাং তারা আরও কয়েকটা দিন এখানে থেকে যাবে। ঘুরবে ঘারবে, মজা টজা করে তারপর বাড়ি ফিরবে। ইরা যেহেতু হোস্টেলে থাকে তাই তার কোনো প্রবলেম নেই আর অরুন, পল্লব তো ছেলে। ওদের বাড়ি থেকে তেমন কোনো রেস্ট্রিকসন দেওয়া হয়নি শুধু বাড়িতে কল দিয়ে এক্সেক্ট লোকেশন জানিয়ে দিলেই হলো। রাতের ব্যাপারটা আলাদা তাই বিহান নিজে দায়িত্ব নিয়ে ওকে এখানে এনেছে। কেক কাটার পরপরি বিহান ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে,, জন্মদিনের বাকি রাতটুকু সে তার মেধা রানীর সাথে কাটাতে চায়। মেধা যদি সুস্থ থাকতো তাহলে সেও এখানে থাকতো কিন্তু প্রেগন্যান্ট অবস্থায় তো রাতে বাহিরে বেরুনো ঠিক না,, বদ নজর লাগতে পারে তাই ওকে নিয়ে আসেনি বিহান। তবে আগামীকাল সকাল সকাল মেধাকে নিয়ে হাজির হবে। সবাই মাদুরে বসে খেলেও দ্বীপ এখানে নেই, সে কিছুটা দূরে ফোনে রাজনৈতিক আলাপচারিতায় ব্যাস্ত। অর্পনা এই বিষয়টাতে জোর করলো না, লোকটাকে দিয়ে বহু কাজ করায় সে,, যেগুলো দ্বীপ কখনোই করতো না বা করতে পছন্দ করেনা।

তাই আপাততঃ এই বিষয়টা বাদ দিলো,, ওকে আর ঘাটালো না। আরশাদ জামান অর্পনাকে খাওয়াতে খাওয়াতে খেয়াল করলেন রাত নামক মেয়েটা বার বার ওদের দিকে তাকাচ্ছে,, চোখ জোড়া ছল ছল। কেক কাটার পর অর্পনা যখন ওনাকে জড়িয়ে ধরেছিলো, আরও অনেক আহ্লাদ – আবদার করছিলো তখনো মেয়েটা এভাবে তাকিয়ে ছিলো। আগে তো রাতের সম্পর্কে তেমন ধারনা ছিলো না উনার কিন্তু এখন তো জানেন রাতের বাবা নেই। অগত্যাই বুঝে নিলেন মেয়েটার অবচেতন মন বাবার আদর স্নেহ খুজে। উনার মনটা কেমন করে উঠলো, উনার অর্পনটাও তো মায়ের জন্য তরপায়। আজ বুঝছেন তিনি,, একটা সন্তানের সুস্থ ভাবে বড়ো হতে হলে বাবা মা দুজনকেই প্রয়োজন। অর্পনা উনার মতো মানুষের আওতায় মানুষ হয়েছে বলেই হয়তো এতোটা কঠোর হয়েছে আর রাত্রি তার মায়ের মতো হয়েছে বলেই এতোটা নরম সরম। ভীতর থেকে আসা দীর্ঘশ্বাস গোপন করলেন আরশাদ জামান। আরশাদ জামানকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাত্রির বিষম উঠে গেলো,, অর্পনা তাড়াহুড়ো করে পানি এগিয়ে দিলো। অরুন ওর পিঠে হালকা চাপর মারতে মারতে শান্ত করার চেষ্টা করলো। বহুক্ষণ পর কিছুটা ঠিক হলো রাত, ওর চোখে পানি তবে পানিটা কিসের সেটা ধারনা করা গেলো না। বিষম লাগার যন্ত্রণা নাকি বাবার সূন্যতা ঠাওর করা যাচ্ছেনা। কিছুটা ঠিক হওয়ার পর রাত্রি আবারো খেতে নিলে বাধ সাধলেন আরশাদ জামান। বললেন– এই মেয়ে, এদিকে আসো, অর্পনের পাশাপাশি এসে বসো।

,,, রাত্রি বুঝলো না আঙ্কেল ওকে ডাকছে কেনো? তাই সে বোকা বোকা নজরে তাকিয়ে রইলো। অর্পনা পাপ্পার অভিব্যাক্তি বুঝতে পেরে রাত্রির সামনে থেকে প্লেট টা সরিয়ে বললো — আয়!!
,,,, বলতে বলতে হাত ধরে টেনে নিলো, রাত্রিও এগিয়ে এলো কিছুটা। আরশাদ জামান লোকমা বানিয়ে এগিয়ে দিলেন রাতের মুখে,, সে সহাস্যে গ্রহন করলো সেটা। দ্বীপ ফোনালাপ শেষ করে এদিকেই তাকিয়ে ছিলো। ব্যাপারটাতে কিছু একটা পেলো সে, ঠোঁট বাকিয়ে একটা সয়তানি হাসি দিলো।

,,, সময়টা মধ্যরাত,, ২ টা ৩ টা নাগাদ। যেহেতু সবাই কিছুক্ষণ আগেই খাবার খেয়েছে তাই কেউ আর সেহরি করবে না। অগত্যা ঘুমানোর জন্য সবাই ভিলাতে চলে গেলো,, তবে অর্পনা গেলো না। সে সমুদ্র তটে মাদুরের উপর বসে আছে। তার একপাশে দ্বীপ অন্যপাশে আরশাদ জামান। অর্পনা তার দুদিকে নিজের সম্পূর্ণ পৃথিবী নিয়ে নির্ভিগ্নে সমুদ্রের ঢেউ পর্যবেক্ষণ করছে। সমুদ্রে এখনো ভাটা,, যার ফলে পানির অবস্থান তাদের থেকে অনেকটা দূরে। পরিবেশ নিরব,, কেউ কোনো কথা বলছে না শুধু সমুদ্রের গর্জন শুনা যাচ্ছে, মৃধু মৃধু বাতাস এসে গা ছুয়ে যাচ্ছে,, অর্পনার বেশ ভালো লাগছে। ইচ্ছে করছে এভাবে, এখানেই তার একটা জীবন কেটে যাক। অর্পনার ভালো লাগলেও দ্বীপ বেশ বিরক্ত, এই মেয়ের সমুুদ্র দেখতে ইচ্ছা হলে তাকে বলতো,, সে সারা রাত তাকে নিয়ে সমুদ্রের প্রতিটি ঢেউ গননা করে দিতো। এতে বাপকে টানার কি হলো? কোনো জ্ঞান সম্পন্ন নারী হাসবেন্ডের সাথে সময় কাটানোর সময় বাবাকে সাথে রাখে? আল্লাহ মালুম। আর এই শ্বশুরটাও বড্ড বিরক্তিকর। উনার মেয়ের নাহয় জ্ঞান বুদ্ধি লোপ পেয়েছে কিন্তু উনার জ্ঞান নেই। অবলীলায় মেয়ে আর মেয়ের জামাইয়ের পাশে বসে আছে, সত্যি ই রিডিকিউলাস শ্বশুর!!

,,, আরশাদ জামান ফোনে সময় দেখে নিয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন — অনেক রাত হয়েছে মাম্মা,, চলো ঘুমিয়ে পরো।
,,, অর্পনা নাকোচ করে বললো — পাপ্পা, আরেকটু।
,,,, নো মাম্মা,, দ্রুত ঘুমাও নয়তো কাল মিটিং এ গাফলতি হয়ে যাবে।
,,, অর্পনা রাজি হয়ে গেলো,, কিছুটা গুটিশুটি মেরে বাবার কোলে মাথা রাখতে নিতেই বাধা দিলো দ্বীপ। অর্পনার হাত ধরে টেনে বললো — ভেলোরা!! আমার কাছে ঘুমাবে,, এখানে আসো।
,,, আরশাদ জামান মেয়েকে আটকে রেখে বললেন — তুমি মনে হয় ভুলে যাচ্ছো আমি ওর পাপ্পা।
,,, আপনিও ভুলে যাচ্ছেন ও আমার ভেলোরা।( অর্পনার উদ্দেশ্য) ভেলোরা তুমি কার কাছে ঘুমাবে?
,,,অর্পনা বিরক্ত হলো,, সে দুজনার থেকে হাত ছাড়িয়ে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললো — আমি এখন সমুদ্রে ঝাপ দিয়ে কবরে গিয়ে ঘুমাবো। কি শুরু করেছেন দুজন? একসাথে হলেই শুধু আমাকে নিয়ে টানাটানি। আমি কি রসি? একজন এদিকে টানে তো, অন্যজন ওদিকে টানে। ধূর, থাকবোই না এখানে। আমি রুমে গেলাম আপনারা বসে বসে তর্ক করুন।

,,, বলতে বলতে উঠে যেতে চাইলে ওর হাত ধরে আটকে দিলো দ্বীপ হাড় মেনে বললো— যেওনা,, তোমার পাপ্পার কাছেই ঘুমাও।
,,, দ্বীপের কন্ঠটা কেমন শুনালো, অর্পনা বুঝলো লোকটা রাগ করেছে কিন্তু আরশাদ জামান সেসবে পাত্তা দিলেন না। মেয়েকে টেনে কোলে শুইয়ে দিলেন পরপর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কিছুদিন আগে সল্ভ করা কেইসটার পুরো ঘটনা গল্প আকারে বলতে লাগলেন। অনেক রাত হওয়ার দরুন অর্পনার বেশ ঘুম পেয়েছে তবুও আড় চোখে বার বার দ্বীপের দিকে তাকালো। চাঁদের আলোয় লোকটার মুখে অভিমানটুকু সহজেই ক্যাচ করে নিলো অর্পনা, লোকটা তার দিকে তাকাচ্ছে না। ফোনে কি যেনো করছে, ফোনের আলোয় চোখ দুটো কোমন লাল দেখালো,, কোনায় কোনায় হালকা পানি জমা হয়েছে বোধহয়। লোকটার কি হয়েছে? সে উনার কাছে ঘুমায়নি বলে রাগ করেছে? আচ্ছা!! সে কি এতোটাও সুখ ডিসটার্ব করে? এই এতোগুলা দিন যাবত তার সাথে এসব কি হচ্ছে? এতো কেয়ার, এফোর্ট, একটা সময় শেষ হয়ে যাবে না তো? সুখে থাকার লোভ দেখিয়ে দ্বীপ আবার তাকে দুঃখের দুনিয়ায় ছেড়ে দিবে নাতো? এসব কল্পনা ঝল্পনা করতে করতে ঘুমিয়ে পরলো অর্পনা। চারদিক তখনো নীরব, অর্পনা ঘুৃমিয়ে যেতেই অর্পনার গুটিশুটি মেরে রাখা পাটা টেনে নিজের উরুর উপরে নিয়ে নিলো দ্বীপ। আরশাদ জামান মনে মনে প্রশন্ন হলেন,, তবে মুখে বললেন — সারাজীবন এতোটা যত্ন করে রাখতে পারবে তো? তুমি কিন্তু আমায় কথা দিয়েছিলে,, এই জন্যই সেদিন তোমায় ওর খোজ দিয়ে আমার টিমকে সরিয়ে নিয়েছিলাম নয়তো অর্পনা এতোদিনে অস্ট্রেলিয়া থাকতো।

,,, দ্বীপ সতর্ক দৃষ্টিতে অর্পনার দিকে তাকালো পরপর সাবধানের সহিত বললো — থামুন,, আপনার মেয়ে শুনতে পাবে।
,,, আরশাদ জামান বড়াই করে বললেন — নাহ, পাবে না। আমার মেয়ে জানে ও আমার কাছে কতোটা নিরাপদ। তাই এখন ও নিশ্চিন্তে ঘুমাবে।
,,,, দ্বীপ নিজেও কন্ঠে অহঙ্কার বহাল রেখে বললো– আমার ওয়াইফকে আমি কতোটা হেপি রাখবো সেটা আমার নিজস্ব ব্যাপার,, আপনি সেদিন লোক না সরালেও আমার চার আনার ক্ষতি হতো না। অবশ্যই আমার এভিলিটি সম্পর্কে আপনার ধারনা রয়েছে? আপনার ঐ কটা লোক আমার কাছে জাস্ট ছাড়পোকা ব্যাতিত কিছুই না।
,,, আরশাদ জামান টললেন না। সেদিন যদি উনি দ্বীপকে আরও একটা সুযোগ না দিতেন তাহলে দ্বীপ যতোবারই অর্পনাকে তুলে নিয়ে যাক না কেনো নিজের কাছে আটকে রাখতে পারতো না। আরশাদ জামান ঠিক নিজের কাছে ফিরিয়ে আনতো কিন্তু মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে দ্বীপকে তৃতীয় এবং শেষ বারের মতো সুযোগ দিয়েছিলে। বলেছিলেন,, আরেকবার উনার মেয়ে কষ্ট পেলে উনি মেয়েকে নিয়ে এমন জায়গায় চলে যাবে যেখানে দ্বীপ কেনো ওর ১৪ গুষ্টি ও খুজে বের করতে পারবে না। দ্বীপ ও সেদিন গম্ভীর কন্ঠে কথা দিয়েছিলো “” অর্পনার যত্ন নিয়ে অর্পনা নিজেও কখনো অভিযোগ তুলতে পারবে না। “” দ্বীপের ঐ কথার উপর ভিত্তি করেই অর্পনাকে দ্বীপের কাছে ছেড়েছিলেন তিনি। সেসব ভেবেই প্রতিবারের ন্যায় হুমকি স্বরুপ বললেন– এতো ভাব ধরবে না ছেলে ,, মেয়েটা কিন্তু আমার, যখন তখন,,,

,,, থামিয়ে দিলো দ্বীপ,, বাধ সেধে বললো — আপনিও এতো হম্বিতম্বি করবেন না। আপনার জন্য একটা বেড নিউজ আছে,, খুব শীগ্রই আমি আপনার লাইফটা ডেস্ট্রয় করতে যাচ্ছি,, রেডি হোন।
,,, দ্বীপের কথায় চোখ ছোট ছোট করে তাকালেন আরশাদ জামান,, দ্বীপের ঠোঁটে সয়তানি হাসি। এই হাসি দেখে কিছুটা চিন্তিত হলেন। এই বেয়ারা ছেলের মনে আবার কি চলছে? কি অঘটন ঘটাবে আবার? নির্ঘাৎ এমন কিছু যেটা উনি চাইলেও হজম করতে পারবে না আবার না চাইলেও হজম করতে পারবে না। নাহ!! উনার মেয়েটা দেখে শুনে একটা জামাই উপহার দিয়েছেন উনাকে,, একদম বাধিয়ে রাখার মতো একটা জামাই। এতোক্ষণ চেয়ে থেকেও কিছু ধরতে পারলেন না তিনি,, এই ছেলের মতিগতি বুঝা দায়,, জিঙ্গেস করলেও উত্তর মিলবে না। চিন্তায় হাত পা অসার হয়ে আসার যোগার আরশাদ জামানের ,, কখন না জানি প্রেসারটা হাই হয়ে যায়।

,,, শরীরে ঠান্ডা পানির ছোয়া লাগতেই অর্পনার ঘুম ছুটে গেলো,, সে ঘুমঘুম চোখে তাকাতেই নিজেকে দ্বীপের বুকের উপর আবিষ্কার করলো। আবারো পেটে ঠান্ডা পানির ছোয়া লাগতেই পানি কতথেকে আসছে সেটা দেখার উদ্দেশ্য আড় চেখে পিছনে তাকালো। দ্বীপ ওকে নিয়ে সমুদ্রের বালিতে শুয়ে আছে,, সমুদ্রের পানিতে ওদের পা ডুবানো,, ঢেউ পেট পর্যন্ত পৌছে গিয়েছে। সমুদ্রের ঢেউ ধীরে ধীরে বাড়ছে,, জোয়ার আসার সম্ভাবনা। অর্পনা চোখে মুখে বিরক্তি প্রকাশ করে হালকা ধমকের স্বরে বললো —
,,, আরে বালিতে শুয়ে আছেন কেনো? পোশাক তো নিজে ধোন না,, আমাকেই ওয়াসিং মেসিনে দিতে হয় আবার সেসব আইরন ও করে দিতে হয়। উঠুন তো, ছাড়ুন আমাকে।
,,, বলতে বলতে অর্পনা উঠতে চাইলে ওর কোমর ধরে আটকে দিলো দ্বীপ, ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললো — সমস্যা কি? সমুদ্রে ডুবে মরতে চেয়েছিলি না? চল মরে যাই।
,,, এই পর্যায়ে অর্পনার চোখ ছোট ছোট হয়ে এলো,, লোকটা কি রাতের ঐ কথার জন্য রেগে আছে নাকি?অর্পনা ঠোট বাকিয়ে হেসে ফেললো। দ্বীপের বুকে আছতে করে চাপর মেরে বললো — আপনি কথায় কথায় এতো সেন্টি খান কেনো মিঞা? এখনো ঐ কথা নিয়ে পরে আছেন? আমি তো এমনেই কথার কথা বলেছিলাম। সরুন, উঠতে দিন।

,,, দ্বীপের চোখ মুখ এমনিতেই শক্ত ছিলো এখন অর্পনার এই কথার কথা শব্দটিতে চোখ মুখের রং বদলালো। এই মেয়ে জানে?তার ঐ টুকু কথাতে দ্বীপের কতটা লেগেছে? জানবে কেনো,,পারে তো শুধু দ্বীপকে জ্বালাতে। কিভাবে কিভাবে দ্বীপকে যন্ত্রনা দেওয়া যায় সবটা আয়ত্বে আছে এই রমনির কিন্তু কিভাবে ভালোবাসতে হয় তা জানা নেই। এই ঘারত্যাড়া নারী ভালোবাসতেও জানেনা, আবার ভালোবাসা গ্রহণ করতেও জানো না। সারাক্ষণ খিটখিটে মেজাজ নিয়ে ঘুরে। অর্পনা ফের উঠতে চাইলে দ্বীপ ওকে ঘুরিয়ে বালিতে ফেলে দিলো,, আকষ্মিক কান্ডে আবারো কোমরে ব্যাথা পেলো রমনি। বালিতে ফেলার দরুন ঘৃনায় নাক কুচকালো,, পানির সাথে কি না কি এসে এই বালির মধ্যে আটকায়,, আর উনি তাকে এই বালির মধ্যেই ফেলেছে। ফালতু লোক!! অর্পনার বিরক্তিতে ভ্রুক্ষেপ নেই দ্বীপের,, সে অর্পনার উপরে শরীরের সম্পূর্ণ ভার ছেড়ে দিয়ে এক হাতে মুখ চেপে ধরে রাগি কন্ঠে বললো —
,,, কথার কথা তাই না? তর এই কথার কথায় যে কারোর ভিতর ধ্বংস হয়ে য়ায় সেই খবর রাখিস তুই? তর মরার যখন এতো শখ, চল মরবো আজ।

,,, মুখের ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো অর্পনা, কিন্তু বিচলিত হলো না। সামনের মানুষটার চোখ মুখ বলে দিচ্ছে লোকটা কতোটা রেগে আছে। এই মুহুর্তে মুখের কথায় উনাকে শান্ত করা অসম্ভব, এই পর্যায়ে বুদ্ধি খাটালো অর্পনা। সম্পূর্ণ স্থির হয়ে মুখ চেপে রাখা দ্বীপের হাতে ভেজা চুম্বন করলো,, সাথে সাথে দ্বীপের হাত শিথিল হয়ে এলো। ঠোট বাকিয়ে হাসলো অর্পনা,, দ্বীপ বোধয় জানেনা সে মানুষটা কেমন। সে চাইলে সামনের পুরুষটাকে এক মুহুর্তে ভালোবাসায় উন্মাদ করে দিতে পারে আবার চাইলে অবহেলার সাগরে ডুবিয়ে পারমানেন্ট পাগল ও বানিয়ে দিতে পারবে। আবার চাইলে ঐ পাগল অবস্থা থেকে মানুষেও রুপান্তর করতে পারবে। আল্লাহ যে তাকে কতো কতো গুন দিয়ে দিলো,, সেসব হিসেব করাও দায়। অর্পনা হাত উচিয়ে দ্বীপের গলার ভাজে হাত রাখলো,, ধীরে ধীরে হাত বুলাতেই দ্বীপ শক্ত কন্ঠে বললো — জ্বালাস না ভেলোরা,, আমি রেগে আছি।

,,, অর্পনা কাধ উচালো, মানে দ্বীপের রাগে তার কিছু এসে যায়না। সে আবারও দ্বীপের হাতের তালুতে চুম্বন করলো। এই পর্যায়ে চোখ বন্ধ করে নিলো দ্বীপ,, এটা কেমন মেয়ে? তার মতো পুরুষকে কিনা টিজ করে? এখন কি এর নামে মেইল টিজিং এর মামলা দেওয়া উচিৎ? দ্বীপের নিজের কাছেই নিজেকে অসহায় লাগলো। এরকম করলে সে রাগটা দেখাবে কি করে? তার তো সব রাগ মাটি হয়ে গিয়েছে। এই পর্যায়ে দ্বীপ অর্পনার মুখ থেকে হাত সরিয়ে থমথমে কন্ঠে সুধালো — তুই খুব খারাপ ভেলোরা, আমাকে অসম্ভব জ্বালাস,, এলোমেলো করে দিস তারপর গুছিয়ে দেবার বেলায় পালাই পালাই করিস,, তুই এমন কেনো?

,,, আমি এমনি, এবার সরুন।
,,, সরবোনা,, তুই কি আবার পালটে যাবি?
,,, পাল্টাবো মানে? আমি কি পোষাক নাকি যে একটার পর একটা পালটে যাবো।
,,,, মজা করিস না ভেলোরা,, বল!! তুই কি আবার আগের মতো হয়ে যাবি?
,,, আগের মতো মানে? আগে কেমন ছিলাম আর এখন কেমন হয়েছি?
,,, কাল থেকে তুই আমার সাথে খুব ভালো ব্যাবহার করছিস।
,,, আগে খারাপ ব্যাবহার করতাম?
,,, বরাবর!!
,,, বুঝলাম,, এবার সরুন।
,,, না, আগে কথা দে পাল্টে যাবি না।
,,, অতো কথা টথা দিতে পারবো না,, সরুন।
,,, এই পর্যায়ে দ্বীপের কন্ঠে কাতরতা ধরা দিলো— তুই কি আমার উপর প্রতিশোধ নিবি? মায়া বাড়িয়ে দূরে সরে যাবি?
,,, কি বলেন না বলেন? আপনার আর আমার কি প্রতিশোধের সম্পর্ক?
,,, তাহলে কিসের সম্পর্ক?
,,, জানেন না নাকি?
,,, জানি না, তুই বল।
,,, আগে উঠেন তারপর বলছি।

,,, ইচ্ছা না থাকলেও অর্পনাকে ছেড়ে উঠে বসলো দ্বীপ,, সে বেশ সিরিয়াস। অর্পনার মনের কথাটা শুনতে চায়,, ও সত্যি কি চায় জানতে চায়। অর্পনা হাফ ছেড়ে বাচলো, উঠে বসতে বসতে বললো — আপনি আজ থেকে ডাইয়েট করবেন,, আপনার ভারে আমার হাড় মরমর করে। কবে না জানি ভেঙে গুরো গুরো হয়ে যায়, আল্লাহ মালুম।
,,, অর্পনা উঠে বসতেই দ্বীপ ওর কোমর জড়িয়ে ধরলো,, কাছে টানতে টানতে বললো — এবার বল আমাদের কি সম্পর্ক?
,,, অর্পনা একটু ভাবুক হলো, বেশ খানিকটা সময় ভেবে দ্বীপের বুকে সজোরে ধাক্কা মারলো। দ্বীপ নরম হয়ে বসে থাকায় সহজেই ছাড়া পেয়ে গেলো অর্পনা। দ্বীপকে ধাক্কা মেরে পানির কিনারা ধরে পিছাতে পিছাতে বললো — বলবো না, না বললে কি করবেন আপনি?
,,, অর্পনার কারসাজি বুঝতে পেরে বসা থেকে উঠে দাড়ালো দ্বীপ , অর্পনার উদ্দেশ্যে দাতে দাত চেপে বললো — বেইমানের বাচ্চা,, দাড়া তুই!!

,,, অর্পনা এতোক্ষন দ্বীপের দিকে তাকিয়ে পিছাচ্ছিলো, দ্বীপকে রেগে মেগে আসতে দেখে উল্টো পথে দৌড় দিলো। দ্বীপ ও দৌড়াচ্ছে পিছু পিছু,, অর্পনা একটু দৌড়াচ্ছে আবার পিছনে ফিরে ফিরে দেখছে দ্বীপ ওর কতোটা কাছে পৌছেছে। দুজনার দৌড়ের তালে আর সমুদ্রের গর্জনে পানির কল কল শব্দে মুখরিত হচ্ছে চারিপাশ। ওরা যেই পথ দিয়ে দৌড়াচ্ছে সেই পথে থাকা পানি এদিক ওদিক ছিটকে পরছে। অর্পনার পরনে লম্বা গাউন থাকায় বেচারির দৌড়াতে খুব কষ্ট হচ্ছে,, অগত্যা গাউন দুহাতে আগলে ছুটতে লাগলো। অর্পনার দিকে তাকিয়ে ছুটতে থাকা দ্বীপের নজর আটকালো অর্পনার মসৃণ উন্মুক্ত পায়ে যা পায়ের পাতা সহ আরও অনেকটা উপরের অংশ দৃশ্যমান। শক্ত পোক্ত ঢোক গিললো দ্বীপ, অনুভব করলো সে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সাথে এটাও অনুভব করলো ঐ মসৃন পা দুটোর খালি থাকা একদমি মানাচ্ছে না। ঐ পায়ে দুটো নূপুর কিংবা পায়েল থাকলে বেশ মানাতো। নিজের ভাবনায় নিজেই অবাক হলো দ্বীপ,, নিজের মধ্যকার পরিবর্তন গুলো লক্ষ করলো,, সে সত্যি ই পাল্টে যাচ্ছে যার সবটা জুড়ে শুধু অর্পনা। ভাবনা রেখে দ্বীপ পায়ের জোর বাড়িয়ে অর্পনার কাছে গিয়ে ওর কোমর পেচিয়ে ধরল। অর্পনা ছুটতে চাইলে দুজনেই বেখেয়ালে পানিতে আছড়ে পরলো। প্রথমে দ্বীপ পরলো পরপর দ্বীপের বুকের উপর অর্পনা। দ্বীপ তখনো অর্পনার কোমর জড়িয়ে রেখেছে,, তৎক্ষনাৎ একটা বড়ো ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিলো দুজনকে। অর্পনা হাপাতে হাপাতে বললো — আল্লাহ!! আরেকটু চুবানি খেলেই পানি খেয়ে আমার রোজাটা ভেঙে যেতো,, ছাড়েন আমায়। রোজা রমজানের দিনে কি শুরু করেছে এসব। রোজাটা ভাঙুক খালি আপনায় আমি চরম মজা দেখাবো।

,,, দ্বীপের এই মুহুর্তে মনে পরলো সে রোজা,, এতোক্ষণ তো মনেই ছিলো না। দ্বীপ অর্পনাকে নিয়ে উঠে বসলো। সমুদ্রের পানি এখন দ্বীপের কোমর থেকে একটু উপরে। অর্পনাকে কোলের উপর বসিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে বললো — এবার বল তর আর আমার সম্পর্ক কি?
,,, অর্পনা বিরক্ত, এই লোক কি জানেনা? তারা যে জামাই বউ? জামাই বউয়ের কখনো ব্রেক আপ হয়? হলে ডিভোর্স হয় কিন্তু তাদের মাঝে তো ডিভোর্স দেওয়ার কোনো সিস্টেম নাই। তাদের তো বিয়ের কাগজ ই তৈরি হয়নি, দুজন কবুল বলেছে এটুকুই। এখন এই লোক তালাক না দিলে বিয়ে ভাঙবে কি করে? অর্পনার ভাবনার মাঝেই হঠাৎ কানে এলো অনেকগুলো উচ্ছাসিত স্বর —
,,,, এসে পরেছি। ( সবাই)
,,, চার মুর্তি আর পরশি, বিহান, মেধাকে দেখে উচ্ছাসিত হলো অর্পনা। সবাইকে পানিতে নামার জন্য ইশারা করলো। অরুন আর পল্লব দৌড়ে গিয়ে পানিতে ঝাপ দিলো,, বিহান মেধাকে নিয়ে ধীরে ধীরে পানিতে নামতে লাগলো। রাত্রি, ইরা আর পরশী সমুদ্রের পারে বসে পরলো,, তারা বালির স্তুপ বানাবে। ইরা তাড়াহুড়ো করে গর্ত বানাতে লাগলো,, ওর দেখাদেখি পরশী আর রাত ও গর্ত বানাচ্ছে,, পানি উঠে আসতেই তারা একটু একটু বালি নিয়ে স্তুপ বানানোর কাজে লেগে পরলো। বিহান মেধাকে নিয়ে হাটু থেকে কিছুটা নিচ পর্যন্ত পানিতে পা ছড়িয়ে বসে পরলো। মেধা বসলো না, সে ছুটে গেলো অর্পনার দিকে। মেধাকে আসতে দেখে অর্পনাও দ্বীপের কোল থেকে উঠে এগিয়ে এলো,, দুজন মুখোমুখি হতেই অর্পনাকে জড়িয়ে ধরলো মেধা। প্রাণোচ্ছল হেসে বললো — শুভ জন্মদিন কিউটি,, কেমন আছো?

,,, অর্পনা আলতো করে জড়িয়ে ধরে বললো — থ্যাংক ইউ, বাবু আর বাবুর মা কেমন আছে?
,,, মেধা অর্পনাকে নিয়ে পানিতে বসে পরলো,, ওদের বসতে দেখে ইরা আর পরশী নিজেদের কাজ ফেলে ছুট্টে এসে ওদের পাশে বসলো। বিহান মুখ বাকালো,, মেয়েটা কি অবলীলায় তার বউকে কেড়ে নিলো,, এখন সেও অর্পনার জামাইকে কেড়ে নিবে। বিহান উঠে দাড়িয়ে দ্বীপের পাশে গিয়ে বসলো। দ্বীপ এতোক্ষণ অর্পনার দিকে তাকিয়ে ছিলো,, বিহানকে পাশে বসতে দেখে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে নাক কুচকালো। বিহান ভ্রু কুচকে বললো — ভাই!! আমি তর কাছে এলে তুই এমন করিস কেনো? তর বউ কাছে এলে তো এমন করিস না।
,,, বিহানের কথায় তাজ্জব বনে গেলো দ্বীপ, ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললো — ওটা আমার বউ, কোলে নেওয়ার জিনিস ,, তুই কি আমার বউ? ওর সাথে নিজের তুলনা করার অপশন পাশ কই?
,,, বিহান হতাশ হলো, দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো — যখন তোমার কেউ ছিলো না তখন ছিলাম আমি,, এখন তোমার বউ হয়েছে পর হয়েছি আমি।

,,, দ্বীপ বিহানের চাপায় শক্ত একটা ঘুসি বসিয়ে বললো — ড্রামাবাজ!! এতো ড্রামা কিভাবে করিস? ক্লান্ত হোস না?
,,, বিহান শব্দ করে হাসলো। দ্বীপের বাহু পেচিয়ে ধরে খানিক্ষন মজা নিলো। তারপর হুট করেই দুজন গম্ভীর হয়ে গেলো। দুজন মিলে কি নিয়ে যেনো গভীর আলোচনায় মেতেছে,, এই মুহুর্তে ঠাওর করা যাচ্ছে না।
,,, সমুদ্রের পাড়ে বসে চার রমনি দুঃখ সুখের আলাপ করছে। এটাকে আলাপ বলেনা এক প্রকার গসিব বলা চলে,, কে কখন কি দেখেছে, কে কার সাথে প্রেম করছে,, কে কোথায় কট খেয়েছে সেসব বলে বলে হাসছে। অর্পনা গসিব না করলেও মন দিয়ে সব শুনছে,, ইরার বলা কথাগুলো তার আয়ত্তে থাকলেও পরশী আর মেধার থেকে অনেক নতুন কিছু জানছে, শিখছে৷ রাত্রি একা একা মন দিয়ে বালির স্তুপ বানাচ্ছে,, এটা সে প্রতিবারই করে। যখনি সমুদ্রের পাড়ে যায় এই কাজটা করেই থাকে, সে একপ্রকার অবসেস্ট এই বিষয়টায়। অরুন আর পল্লব কিছুক্ষণ পানিতে হুড়োহুড়ি করলো,, ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে সাতার কাটলো। সাতার কাটতে কাটতে যখন হাপিয়ে উঠলো তখনি উঠে এলো তিন রমনিকে জ্বালাতে। অরুন আর পল্লব দুই হাত ভর্তি করে বালি নিলো। আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে অর্পনা আর ইরার পিছনে দাড়ালো।

ইরার পিছনে অরুন আর অর্পনার পিছনে পল্লব। সবাই নিজেদের ধ্যানে থাকলেও পরশী বিষয়টা খেয়াল করলো, সে চোখ বড়ো বড়ো করে পল্লবের দিকে তাকাতেই পল্লব ইশারায় চুপ থাকতে বললো। ক্রাস বয়ের এটুকু আবদার ফেলতে পারলো না কিশোরী,, মেনে নিলো। অগত্যা কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই অর্পনা আর ইরার মাথায় মুঠো করা বালি ঘষে দিলো। চিৎকার করে উঠলো দুই রমনি,, সাথে সাথে বালি নিয়ে দুজনের দিকে ছুড়ে দিলো। অরুন নিজেকে বাচাতে পানিতে ঝাপ দিলেও পল্লব চলে গেলো ডাঙায়। গেলো তো গেলো, একদম রাত যেখানে বালির স্তুপ বানাচ্ছিলো তার উপর দিয়ে চলে গেলো। বেখেয়ালে পল্লবের পা লেগে রাতের বালির স্তুপ কিছুটা ভেঙে গেলো। পল্লব তখনো বিষয়টা খেয়াল করেনি কিন্তু যখন দেখলো অর্পনা আর ইরা স্থির হয়ে গিয়েছে,, অরুন ও বোকা বনে তাকিয়ে,, তখনি রাতের উদ্দেশ্য তাকালো।

রাতের চোখ জোড়া ছল ছল,, তিরতির করে ঠোঁট কাপছে। ভয়ার্ত ঢোক গিললো পল্লব,, তাড়াহুড়ো করে ওর পাশাপাশি বসে স্তুপের ভেঙে যাওয়া অংশ টুকু ঠিক করতে চাইলে পল্লবের বুকে ধাক্কা মারলো রাত পরপর বালির স্তুপটা পুরোপুরি ভেঙে দিয়ে ফুপিয়ে উঠলো। সবাই তো জানে সে এটা বানাতে কতো ভালোবাসে কিন্তু পল্লবটা সেটা ভেঙে দিলো। রাত্রি ফোপাঁতে ফোপাঁতে চিৎকার করে বললো– তুই ইচ্ছা করে করেছিস এটা, তাই না? তুই সবসময় এমন করিস। আমার সবকিছু নষ্ট করে দেওয়া তর স্বভাব। দেখিস,, তর কারনে একদিন আমার জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাবে,, তুই শেষ করে দিবি আমায়।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫১ (২)

,,, রাতের কথায় থমকে গেলো পল্লব,, চোখ মুখ কঠিন হয়ে এলো। এটা কি সত্যি? ওর কারনে ওর বন্ধু মহলের কোনো ক্ষতি হতে পারে? যদি এমন দিন আসেও,, তাহলে নিজেকেই নিজে শেষ করে দিবে সে। তবুও কারোর কোনো ক্ষতি হতে দিবেনা।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫২

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here