৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৪
রুপান্জলি
রাত ৩টা ২৭,,
,,,হুট করেই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল অর্পনার। মাঝে কেটে গিয়েছে আরও কয়েকদিন। এতগুলো দিনেও আরাফাতের দেওয়া চিঠিটা পড়া হয়ে ওঠেনি। অর্পনা সাহস করতে পারে না। জীবন তাকে এই সাড়ে তেইশ বছর বয়সে কত কিছুর সম্মুখীন করল, কত অপূর্ণতা মিলে গ্রাস করল তাকে। নতুন করে আবারও নতুন কোনো কিছুর মুখোমুখি হওয়ার তীব্র ভয় তার। তীব্র ব্যথায় বুকটা তো এমনিতেই ভার হয়ে থাকে, নিশ্বাস নিতে চাইলেও কেমন ব্যথা ব্যথা করে। আবারও নতুন কোনো ব্যথার সাক্ষী হতে সাহসের বড় প্রয়োজন। এতগুলো দিনে একটু একটু করে সেই সাহসটাই জুগিয়েছে অর্পনা। আজ খোলা যাক সেই চিঠি নামক কাগজ খানা , যেখানে উল্লেখ আছে অর্পনার আপন অস্তিত্ব, অপরাজিতা হামিদের গল্প।
,, অর্পনা বুকের উপর মুখ গুঁজে শুয়ে থাকা লোকটার দিকে তাকাল একবার। কেমন নাক-মুখ ডুবিয়ে রেখেছে দেখো। কপালের যতটা অংশ দৃশ্যমান হওয়ার কথা ছিল, সেই অংশটুকুও মাথার বড় বড় চুলগুলো দ্বারা আবৃত। যার ফলস্বরূপ লোকটার মুখের কিছুটা অংশ দেখারও ফুরসত পাচ্ছে না অর্পনা। সে ডান হাত উঠিয়ে দ্বীপের কপাল থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিল। দৃশ্যমান হলো কপালখানা আর তার নিচে থাকা তীরের ফলার ন্যায় একটা ভ্রু। লোকটার এই মুখ ডুবিয়ে রাখার বদঅভ্যাসটা এই দেড় বছরে অর্পনারও বদঅভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ইদানীং লোকটা শরীরের সম্পূর্ণ ভার ছেড়ে দিয়ে সাপের ন্যায় পেঁচিয়ে ধরে বুকে মুখ না গুঁজলে অর্পনাও শান্তিতে ঘুমাতে পারে না।
অর্পনা ধীরে ধীরে লোকটাকে নিজের থেকে সরাতে চাইল। দ্বীপ সরতে নারাজ, আরও পেঁচিয়ে ধরল। ঘুমের ঘোরে যতটা নিচে নেমে গিয়েছিল, এবার সম্পূর্ণ উপরে উঠে ভার ছেড়ে গলায় মুখ গুঁজে দিল। অর্পনা হতাশ হলো। ফিসফিস করে বলল—
— সরুন,, আমি একটু উঠবো,, হাত পা ম্যাজ ম্যাজ করছে।
,,, দ্বীপ সরে গেল। অর্পনা সঙ্গে সঙ্গে উঠল না। দ্বীপকে ঘুমানোর সময় দিল। যখন লোকটার নিশ্বাস ভারী হয়ে এল, তখনই উঠে বসল সে। সাইড টেবিল থেকে নিজের গোল ফ্রেমের চশমাটা নিয়ে চোখে চাপলো। ইদানীং চোখের সমস্যাটা বেড়েছে, ডাক্তার দেখাতে হবে একবার। অর্পনা ধীরে ধীরে উঠে ব্যক্তিগত ড্রয়ারের লক খুলে জুয়েলারি বাক্সে যত্ন করে তুলে রাখা কাগজটা বের করল। চুপচাপ বসে পড়ল সেখানেই। মেঝেতে বসে ধীরে ধীরে কাগজটা খুলল। হাত দুটো কেমন থরথর করে কাঁপছে। অর্পনা বড়ই আশ্চর্য হলো। যে হাতে সে অবলীলায় খু*ন করতে পারে, সেই হাত সামান্য কাগজ খুলতে গিয়ে এভাবে কাঁপছে কেন? এটা একটু বেশি নাটকীয় হয়ে যাচ্ছে না? অর্পনার এত নাটক মানায় বুঝি? দুঃখে যার জীবন গড়া, তার আবার দুঃখ কিসের? অর্পনা দুটো লম্বা শ্বাস টেনে কাগজটা মেলে ধরল। ড্রিম লাইটের আলোয় স্পষ্ট হলো প্রতিটি বাক্য—
প্রিয় অপু,
,,, আমার অপরাজিতা আম্মা!! কেমন আছো তুমি? হয়তো ভালো আছো, নয়তো না। কিন্তু আমি যে ভালো নেই, আম্মা। তুমিই আমার হারিয়ে যাওয়া অপু। এটা জানার পরেও আমি তোমার কাছে ছুটে যেতে পারছি না, জড়িয়ে ধরে বলতে পারছি না আমি তোমার আব্বা। সন্তানকে সন্তান বলতে না পারার যে যন্ত্রণা, তা একশোটা ছুরির আঘাতকেও হার মানায়। তবে তোমার ভালোর জন্য আব্বা সেই আঘাত হাসিমুখে সয়ে নিতেও রাজি।
ইদানীং হুটহাট শহরে চলে যাই জানো? শুধু তোমায় দেখব বলে। যখন দূর থেকে তোমার মুখটা দেখি, এক পশলা শান্তি এসে ভিড় জমায় আমার বক্ষপাঁজরে। মায়ের পর মেয়ের মুখেও যে এতটা শান্তি বিরাজ করে, বাবা না হলে বোধহয় জানতেই পারতাম না, মা।
তুমি কি জানো? তুমি একদম কাটায় কাটায় আমার চেহারা পেয়েছ। একদম আমার। তোমার বড় আপাও পেয়েছিল। তোমরা দুই বোন একদম আমার অনুরূপ, আর ভীষণ আদরের।
২০০০ সাল,,
,,, জয়পুরহাট জেলা/উপজেলার দোগাছি গ্রামের এক কোণায় হোসেন বাড়ির বসবাস। নাহ! এটাকে হোসেন বাড়ি বলা চলে না। কারণ এই বাড়ির সকল পুরুষের নামের শেষে হোসেন শব্দটি নেই। কারও মিঞা, কারও রহমান, কারও ইসলাম,, শুধু হামিদ হোসেনের নামের পেছনেই রয়েছে হোসেন শব্দটা। আহামরি কোনো বংশমর্যাদা না থাকায় বাবা-ভাইদের নামের এই হাল। হামিদ হোসেনের আরও দুই ভাই ও তিনটা বোন রয়েছে। তিনি ভাইদের মধ্যে দ্বিতীয়। আপাতত সবাই বিয়ে-শাদি করে নিজেদের মতো জীবন গড়ে নিয়েছেন, শুধু গড়তে পারেননি হামিদ হোসেন। এখনো মা আর অবিবাহিত ছোট বোনটা উনার সাথেই খায়। সে নিয়ে হামিদ হোসেনের কোনো আপত্তি না থাকলেও একদিক থেকে বেজায় দুঃখেই আছেন তিনি। মা-বোন মিলে বউটার উপর চরম অত্যাচার চালায়। হামিদ হোসেন বাড়ি না থাকলে বউকে খাবারও দেয় না ঠিকমতো, দিলেও মেপে মেপে দেয়, তরকারি দিলে লবন দেয় না আবার তো মাঝে মাঝে বসে খাওয়ার জন্য পিড়ি ও দিতেও আপত্তি জানান। তাসনোভা বেগম মানুষটা বড় সাধাসিধে, শান্তশিষ্ট, ভদ্র। শাশুড়ি-ননদের ভয়ে কথা বলতে পারেন না। এ নিয়েও মুশকিলে আছেন হামিদ হোসেন,, মেয়েদের এতো নরম হতে হয় না।
,,বিয়ের বছর দুই পেরুতেই হামিদ হোসেনের ঘরে জান্নাত উঁকি দিল। ঘর আলো করে জন্ম হলো একটা মেয়ে শিশুর। তবে সেই আলোর ছটা শুধু হামিদ হোসেনকেই আনন্দ দিয়েছিল। মা, ভাই, বোন, পাড়া-প্রতিবেশী, কেউ খুশি হয়নি যেন। সবাই কেমন আফসোস করে গেল একটার পর একটা বাক্য ব্যয় করে। তবে হামিদ হোসেন সেসব কান দিলেন না। সখ করে মেয়ের নাম রাখলেন নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে। হয়তো উনার মেয়েদের নামকরা বংশ নেই, তবে তাদের একটা বাবা রয়েছে। বাবার নামেই পরিচিত হবে হামিদ হোসেনের মেয়েরা। অগত্যা প্রথম মেয়ের নাম রাখলেন পারমিতা হামিদ। তারও বছর তিনেক পর জন্ম হলো অপরাজিতা হামিদের। এ নিয়েও বাড়িতে ঝামেলার কমতি পড়ল না। না পড়ুক, তাতে হামিদ হোসেনের কিছু আসে যায় না। তিনি একবার মাহফিলে গিয়ে শুনেছিলেন, আল্লাহ যখন বান্দার উপর খুব খুশি হন তখন তাকে মেয়ে সন্তান দান করেন। আর যখন একটু কম খুশি হন, তখন প্রকৃতিতে বর্ষণ নেমে আসে। অপরাজিতা আষাঢ়ের ঝড়-বাদলার গভীর রাতে জন্ম নিয়েছিল। আল্লাহ বোধহয় উনার প্রতি একটু বেশি খুশি হয়েছিলেন, তাই তো দুটো জিনিস একসাথে উপহার দিলেন হামিদ হোসেনকে।
,,, পারমিতা এবং অপরাজিতা!! দুই বোন অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই একই রকম দেখতে হয়েছে। তবে দুটো পার্থক্য রয়েছে অবশ্য। পারমিতা ঠোঁট পেয়েছে তার দাদির, অপরাজিতা পেয়েছে হুবহু বাবার। পারমিতার চুল কোঁকড়া, পাতলা, একদম মায়ের মতো। অপরাজিতার চুল সোজা, নরম, ঝরঝরে, ঘন, একদম বড় ফুফুর মতো। দুজনের চেহারা একই রকম হওয়াটাকেও অনাকাঙ্ক্ষিত বলা যায় না। এটা জিনেটিক্স দ্বারা প্রভাবিত একটি প্রক্রিয়া। ম্যাক্সিমাম ক্ষেত্রেই ভাই-বোনের ডিএনএ-তে ৩০%-৫০% জিন মিলে যায়। তবে পারমিতা এবং অপরাজিতার ক্ষেত্রে জিন পরিমাপ করলে আনুমানিক ৯০%-৯৫% মিল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ক্ষেত্রে দুই বোন দেখতে এক রকম বলার চেয়ে শোভনীয় হবে এটা বলা যে, দুই বোনের চেহারা একদম বাবার মতো হয়েছে। মায়ের থেকে পেয়েছে শুধু হলুদ ফর্সা রংটা। সে নিয়ে তাসনোভা বেগমের কী যে আপত্তি! সারাক্ষণ মেয়েদের দেখেন আর বকাবকি করেন এই বলে— একেবারে বাপের মতন হইছত, এক নাক, এক মুখ, এক চেহারা। যেমন তগো বাপ একলা জন্ম দিছে তগো, আমি পেটে ধরিনাই? যাহ সর, বাপের ছাওয়াল।
,,, পারমিতা বিনিময়ে কিছু বলে না, শুধু মুচকি হাসে। সে যে মায়ের মতোই শান্তশিষ্ট, ভদ্র, সুনিপুণা। তবে অপরাজিতা হয়েছে একেবারে বিপরীত। মেয়েটা কথা বলতে পারে না, তবুও আড়াই বছরের অপরাজিতা মায়ের বকাবকিতে কেমন কপাল কুঁচকে নেয়, ঠোঁট নাড়িয়ে ;আব্বা, আব্বা করে। যেন বাপের হয়ে ঝগড়া করছে সে। এ নিয়ে আরও রেগে যান তাসনোভা বেগম। এই রাগ সাধারণ নয়, একটু বেশিই রেগে যান তিনি। মহিলা যে আর কারও সঙ্গে রাগ দেখাতে পারেন না। স্বামী ব্যতীত বাকি সবাই খালি তাকে পরপর দুটো মেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার কারণে কথা শোনায়। এই তো সেদিন মেয়ে দুটো কলাপাতা ছিঁড়ে রান্নাবাটি খেলছিল। উনার শাশুড়ি এসে মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন—
— কলাপাতা নিয়া খেলতে ওই পারোস? কলাগাছের মতো গাঙ্গে গিয়া ভাসতে পারোস না?
,,, মেয়েদের মৃত্যু কামনার কথা নিজ কানে শুনেও কিছু বলতে পারলেন না তাসনোভা বেগম। তবে রাগ ঝাড়লেন মেয়েদের উপর। মারলেন দুটোকে।
পারুটা মার খেয়েও কাঁদল না, বোনকে কোলে নিয়ে পালাল। তবে অপুটা কেঁদেকুটে একশা। ছয় বছরের পারমিতা বোনকে থামানোর জন্য কত যে মা-সুলভ বাক্য আওড়ালো তার কোনো ইয়ত্তা নেই। লোকে বলে বড় বোন নাকি মা সমান, পারুটা তারই প্রতিচ্ছবি।
এত বাক্য আওড়ানোর পরও অপু থামল না। উল্টো আপার চুল টেনে-টুনে একশা করে দিল। ছোট ছোট হাতের খামচি, কামড়গুলোতে পারু ব্যথা পেলেও কিছু বলে না। বোনটা যে তার বড় আদরের।
কত সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত রয়েছে তাদের। অপুটা যে একেবারে তার নেওটা। সারাক্ষণ তার পিছু পিছু ঘোরে। খেলতে গেলেও মেয়েটাকে সঙ্গে নিতে হয়, স্কুলে যেতে নিলেও সঙ্গে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করে, নদীতে গোসল করতে গেলেও সঙ্গে নিতে হয় তাকে। অপরাজিতা আবার বড় চঞ্চল। আপা ওকে রেখে কোথাও চলে গেলে একা একা ঘুরে ঘুরে আপাকে খুঁজে বের করে ফেলে। একা একাই বহুদূর চলে যায়। মেয়েটার বুদ্ধিও আছে ভীষণ। এই বয়সেই যে পথ দিয়ে যায়, সেই পথের কোণা থেকে কোণা পর্যন্ত মনে রাখতে পারে। একা একা মোড়ের দোকানে চলে যায়, ক্ষেতে আব্বা যেখানে চাষ করে সেখানেও চলে যায়। কীভাবে যে যায় আল্লাহ মালুম!
পারু তো বছর খানেক আগেও কেমন গুলিয়ে ফেলত সব। এখন অবশ্য বড় হওয়ার দরুন আব্বার জন্য খাবার নিতে নিতে ক্ষেত, মাঠ, ঘাট সব চেনা হয়েছে তার।
,,, ইদানীং গ্রামে একটা খবর নিয়ে বেশ কানাঘুষা হচ্ছে। হামিদ হোসেনের অবিবাহিত বোন কুসুম নাকি শহরের কোনো ছেলের সঙ্গে প্রেমে মজেছে। ছেলেটাকে চেনে না হামিদ হোসেন, তবে কয়েকদিন আগে মোড়ের দোকানটাতে দেখেছিলেন। ছেলেটার নাম নাকি অসীম। ছেলেটা উনাকে দেখেই কেমন চোরের মতো পালানোর চেষ্টা করেছিল সেদিন।
অসীম নামক ছেলেটার বাড়ি শহরে হলেও কর্মের দিক থেকে সে একজন সাধারণ কাঠমিস্ত্রি। এই তো মাস তিনেক আগের কথা। মেম্বারের বাড়িতে বড় তিনতলা কাঠের বাড়ি করবে বলে দলবল নিয়ে হাজির হয়েছিল ছেলেটা। সেদিন শুনল ঘরের কাজ নাকি প্রায় শেষ, দুদিনের মাথায় এদের বিদায় ঘটবে। তাই আর কথা বাড়ালেন না তিনি। ঘরের মেয়ে মানে সম্মান। তা নিয়ে দোকানে হাঙ্গামা করলে ঘরের সম্মান যাবে। এমন তো নয় যে উনার বোন নির্দোষ। ছেলেটার যেমন দোষ রয়েছে, তেমনি উনার বোনও সমান দোষী। তাই অসীমের সঙ্গে ঝামেলা না করে বাড়িতে গিয়ে বোনকে শাসন করলেন। ছেলেটা বিদায় হওয়ার আগ পর্যন্ত বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিলেন। তবে এতে খুব একটা ভালো কিছু হলো না।
,,, কুসুমকে বাড়ি থেকে বের হওয়ার জন্য মানা করার চারদিনের মাথায়। দিনটা রবিবার ছিল, বেলা বারোটা। পারু তখন স্কুলে, তাসনোভা বেগম রান্নার তোড়জোড় চালাচ্ছেন। হামিদ হোসেনের মা ডাঁটা বাছছেন আর ছোট ছেলের বউটাকে বকাঝকা করছেন। বউটা বেয়াদব, মুখে মুখে তর্ক করে বেশ। সে নিয়েই শাশুড়ি-বউয়ের ঝগড়া বাধল। বড় বউ বাপের বাড়ি গিয়েছে। তার ভাতিজার নাকি বিয়ে, সেই অজুহাতে ছেলেপুলে নিয়ে বাপের বাড়ি পড়ে আছে আজ চারদিন। ঝগড়ার ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছেলের বউয়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় ছেলের বউকেও বকলেন কিছুক্ষণ।
কুসুম অপরাজিতাকে কোলে নিয়ে বাড়ির এপাশ-ওপাশ ঘুরছে। মেয়েটা কেমন অকারণেই কাঁদছে আজ। এমনিতে অপু খুব একটা কাঁদে না। শুধু মা মারলে, আব্বা কাজে গেলে আর আপা স্কুলে যেতে নিলেই কাঁদে। আজ হঠাৎ দুপুরবেলা কাঁদতে দেখে তাসনোভা বেগম সুতির শাড়ির আঁচল থেকে দুটো টাকা এগিয়ে দিলেন। এক টাকা অপুর, আরেক টাকা কুসুমকে দিলেন। ওই ছেলের চক্করে ভাইয়ের নিষেধ থাকায় মেয়েটা কয়েকদিন ধরে স্কুলেও যেতে পারে না, তাই ভাইয়ের কাছ থেকে টাকাও আদায় করতে পারে না। কাল নাকি ছেলেটা দোগাছি গ্রাম থেকে বিদায় হয়েছে, তাই কুসুমকে বাড়ি থেকে বের হওয়ার অনুমতি দিলেন তাসনোভা।
আজ বড় বউয়ের বাপের বাড়িতে হামিদ হোসেনের দাওয়াত ছিল। উনার ভাইপোর নাকি আজ বউভাত। কাজ থেকে ফিরে দুই মেয়েকে নিয়ে সেই পথেই রওনা দেবেন হামিদ হোসেন। যার ফলস্বরূপ, অপুকে গোসল করানোর পরপরই হাতে কাজ করা সুতির ফ্রক, কাজল-কালি দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছেন তাসনোভা। মেয়েটাকে আজ ভীষণ সুন্দর লাগছে। একটু বেশিই সুন্দর লাগছে বোধহয়। তাই কুসুমের সঙ্গে বাইরে দেওয়ার বেলায় অপরাজিতার চোখে-মুখে থুতু ছিটালেন তাসনোভা বেগম। মেয়ের চোখের কোণা থেকে একটু কাজল নিয়ে আবারও কানের পিঠে ছুঁইয়ে দিলেন, যেন কারও নজর না লাগে।এতে আরও জোরে কেঁদে উঠল অপরাজিতা। কুসুম অপরাজিতাকে নিয়ে দৌড়ে বাড়ি থেকে বের হলো। এই যে বের হলো, আর ফিরে এলো না।
,,, দুপুরের দিকে হামিদ হোসেন কাজ সেরে গোসল দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় লোকজনের কাছে শুনলেন কুসুম নাকি শহরের সেই ছেলের সঙ্গে পালিয়েছে। ভদ্রলোক তখনও জানতেন না, কুসুমের কোলে তার ছোট্ট জান্নাত অপরাজিতা আম্মাও ছিল। তিনি হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেন। স্ত্রীকে পাগলপ্রায় হয়ে মাটিতে বসে কাঁদতে দেখে যেন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়লেন। ছুটে গেলেন স্ত্রীর কাছে। পারুটা তখনই নীল ফ্রক পরে দুটো বই আর খাতা হাতে বাড়ি ফিরল। কুসুম ফুপু বোনকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছে শুনে মেয়েটার সে কী কান্না! সারাজীবন সাপ-সাপান্ত করা হামিদ হোসেনের মা, বোন, ভাইয়ের বউরাও আফসোসে ফেটে পড়লেন। সবাই মিলে খুঁজতে লাগলেন ছোট্ট অপুকে, যদি যাওয়ার বেলায় মেয়েটাকে কোথাও রেখে যায় কুসুম। কিন্তু আশানুরূপ কিছুই পেলেন না। পুরো গ্রামজুড়ে অপরাজিতার এক টুকরো চিহ্ন পর্যন্ত নেই।
,,, সেই সময় মানুষ এত কথায় কথায় থানায় ছুটে যেত না। যা বিচার করার, ওই গ্রাম্য প্রধান, মেম্বার আর বেশি হলে চেয়ারম্যানরাই মিলেই করত। তখন তো এত রাস্তাঘাটও ছিল না, যেখানে যাওয়ার পায়ে হেঁটে যেতে হতো। তবুও অপুর খোঁজে মাসের পর মাস দূর-দূরান্তের পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়ে থানায় পৌঁছেছিলেন হামিদ হোসেন। কিন্তু কোনো খোঁজ পেলেন না। প্রথম দিকে পুলিশ কর্মকর্তারা খোঁজখবর চালালেও মাসখানেক পর তারা কেমন মিইয়ে গেলেন। বহু পথ পাড়ি দিয়ে হেঁটে আসা ঘামভেজা হামিদ হোসেনকে কেমন দূর দূর করতো। যেন উনার প্রতি চরম বিরক্ত তারা।
এদিকে অপরাজিতা হারিয়ে যাওয়ার পর তাসনোভা বেগম কেমন যেন হয়ে যান। সারাদিন পাগলের মতো মেয়েকে খোঁজেন। মোড়ের দোকানটার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। এই বুঝি অপু মা মা ল করতে করতে ছুটে এলো। ছোটার তালে তালে নাদুসনুদুস হাত দুটোতে থাকা রুপোর বালা আর পায়ে পরা রুপোর নুপুরের ঝুনঝুন শব্দে মুখরিত হলো পরিবেশ। মেয়েটা এসে ঝাপটে পড়ল তার বুকে।কিন্তু অপু তো আসে না,, জড়িয়ে ধরে না তার মাকে।
,,, পারমিতার পর আবারও অপরাজিতা হওয়ায় তাসনোভা বেগম অপরাজিতার প্রতি খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না। শাশুড়ি, ননদ, জাদের খোঁটা শুনে অতি দুঃখে আফসোস করতেন আর মেয়েকে মারতেন। বারবার বলতেন— পোলা হইলি না কেন? পোলা হইলেই তো তর মারে এত কথা শুনতে হইতো না। মায়ের দুঃখ বুঝোস না, কেমন সন্তান তরা?
মার খেয়ে অপরাজিতা শুধু কাঁদত। বুঝতে পারত না সে তার মায়ের আফসোসের কারণ। মাঝে মাঝে অপরাজিতা যখন রাতে জ্বালাতো, তখনও তাসনোভা ছোট্ট মেয়েটাকে ধরে ধরে মারত। কেন মারত, কোন দুঃখে মারত জানা নেই, তবে অপরাজিতা প্রায়ই মায়ের হাতে মার খেত। তখন হয় হামিদ হোসেন মেয়েকে সামলাতেন, নয়তো পারমিতা ছুটে এসে বোনকে নিয়ে দাদির ঘরে চলে যেত। মেয়েদের মারতে মারতে ছেলের জন্য আফসোস করা নারী আজ মেয়ে মেয়ে করে পাগলপ্রায় অবস্থা। ঠিকমতো খায় না, ঘুমায় না। ঘুমের ঘোরে শুধু পাশে অপুকে খোঁজে। অপুর কোলবালিশ বুকে জড়িয়ে কাঁদে। বারবার বালিশে আঘাত করে বলে “” আপু কান, মায় তরে মারতাছি,, কান, কান্দোছ না ক্যা? মারতাছি তো। “” কিন্তু অপু কাদে না,, এটা তো অপু না,, এটা তো বালিশ। বালিশ কি আর অপুর মতো কাঁদতে পারে?
,,, এরপর টানা সাত বছর পাগলের মতোই আচরণ করেন তাসনোভা বেগম। এই সময়টা বড় কষ্ট করে স্ত্রীকে সামলে রেখেছিলেন হামিদ হোসেন। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজ উনি নিজেই করতেন। মাঝেমধ্যে উনার ভাইয়ের বউরা টুকটাক সাহায্য করত। কুসুম পালিয়ে যাওয়ার পর হামিদ হোসেনের মাও ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে আজীবনের জন্য বিছানা আকরে ধরেন। হাঁটতে পারেন না, চলতে পারেন না, নিজ হাতে খেতে পারেন না। এই সময়টাতে পারুটা ধীরে ধীরে বড় হওয়ার পরিবর্তে হুট করেই কেমন বড় হয়ে গেল। আট বছর বয়স থেকেই দাদির খেয়াল রাখা থেকে শুরু করে বাবার কাজে সাহায্য করা, মাকে দেখে রাখা, বাড়িঘর গোছানো, স্কুলে যাওয়া,সব করত। নয় বছর বয়স থেকে কীভাবে কীভাবে যেন রান্নাও শিখে গেল। পারুর যখন এগারো বছর, তখন আরাফাতের জন্ম হয়। আরাফাত হওয়ার পর তাসনোভা বেগম ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। অপরাজিতার শূন্যতা কাটাতেই বোধহয় আরাফাতের জন্ম হয়েছিল। ছেলেটার আচার-আচরণ একদম অপরাজিতার মতো।
,,আরাফাতের জন্মের মাসখানেক পর হামিদ হোসেনের মা মারা যান। এরপর ধীরে ধীরে সবকিছু কেমন স্বাভাবিক হয়ে উঠল। এখন আর অপরাজিতার শূন্যতা কাউকে কাঁদায় না। রাতের শেষ প্রহরে তাসনোভা বেগম যখন হুট করেই জেগে যান, তখন মাঝেমধ্যে অপরাজিতা নামক সন্তানের জন্য বুকটা মুচড়ে ওঠে। তপ্ত দুপুরে ক্ষেতে কাজ করা হামিদ হোসেন মাঝেমধ্যেই একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ের” বাব্বা, বাব্বা “ডাকটা মনে করে তপ্ত শ্বাস ফেলেন। পারুটাও এখন আর স্কুলে যাওয়ার পথে কাঁদে না। পিছু পিছু “”আপা, আপা”” করে কাদতে থাকা মেয়েটাও যে কাঁদে না বহুদিন। এি পর্যায়ে অপরাজিতাকে ছাড়া থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে তারা। এখন তাদের সবটাজুড়েই ছোট্ট আরাফাতের বিচরণ।
,, পারমিতাকে এখন আর তেমন কষ্ট করতে হয় না। মা সুস্থ হয়ে গিয়েছেন যে, তাই। ধীরে ধীরে সে স্কুল, কলেজ পাস করে ঢাকায় পড়তে গেল। পারমিতাকে নিয়ে বড় আশা ছিল হামিদ হোসেনের। ভেবেছিলেন মেয়েটা যত পড়তে চাইবে, ততই পড়াবেন। কুসুমের সেই ঘটনার পর থেকে তিনি প্রেম-ভালোবাসা শব্দ দুটোকে বেশ ঘৃণা করতেন। মেয়েকে ঢাকায় দেওয়ার বেলায় পই পই করে মানা করেছিলেন কোনো ছেলের মায়ায় জড়াতে। পারমিতাও সহাস্যে মেনে নিয়েছিল বাবার কথা। কিন্তু হুট করেই পারমিতা যাওয়ার মাস তিনেক পর একজন যুবক উনাকে কল করে জানাল, পারমিতা নাকি বেশিদিন বাঁচবে না। যুবকটির নাম বিহান। অর্থমন্ত্রীর ছেলে সে। আর তার বড় ভাইয়ের সঙ্গে নাকি প্রণয়ে লিপ্ত হয়েছিল পারমিতা। এখানেও সেই শহরের ছেলে,, শহরের ছেলেগুলো এতো ভয়ানক কেনো? তারা কেনো উনার জীবন থেকে সুখ কেড়ে নিতে আসে? তবে মেয়ের অবস্থার কথা শুনে মেয়ের সঙ্গে রাগ করার ফুরসত পেলেন না হামিদ হোসেন। ছেলেকে ভাইয়ের বউয়ের কাছে রেখে বউকে নিয়ে ছুটে গেলেন ঢাকার উদ্দেশ্যে।
,,,এর মধ্যে বিহান নামক ছেলেটি গাড়ি নিয়ে তাদের বাড়ি এসেছিল উনাদের নিয়ে যাবে বলে। কিন্তু হামিদ হোসেন সাফ সাফ মানা করে দিয়েছেন। তিনি কোনো অপরিচিত লোকের গাড়ি করে যাবেন না। বিহানও আর কিছু বলতে পারেনি। আত্মসম্মানীয় লোকেদের উপর জোরজবরদস্তি করা বড় অন্যায়, এই অন্যায়টা সে নাহয় নাই করলো,, অগত্যা ফিরে এসেছিল খালি হাতে।
,,, স্ত্রীকে নিয়ে যাত্রাবাড়ীতে এসে সিএনজিতে উঠতেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্মুখীন হলেন হামিদ হোসেন। সিএনজিতে তো পাঁচটা সিট থাকে। পেছনে তিনটা আর সামনে দুটো। লোকভর্তি না হওয়ায় হামিদ হোসেন তাসনোভা বেগমকে সিএনজির পেছনে বসিয়ে তেঁতুলের আচার আনতে গেলেন। কখনো বাসে না ওঠা রমণী আজ চার ঘণ্টা বাস জার্নি করেছে। বমি করতে করতে মরি মরি অবস্থা প্রায়।তাসনোভা বেগম স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। উনার পরনে কালো বোরকা, মুখমণ্ডল কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা। তখনই পাশে এসে একজন রমণী বসল। রমণীর পরনে কেমন অভদ্র পোশাক, সাজটাও তেমনি। তাসনোভা বেগম আড়চোখে মহিলাটির দিকে তাকাতেই কেমন চমকে উঠলেন। এটা তো কুসুম! নাম ধরে ডাকতেই কুসুম সিএনজি থেকে পালাতে চাইলো। কিন্তু তাসনোভা বেগম পালাতে দিলেন না। শক্ত করে চেপে ধরে স্বামীকে ডাকলেন। ছুটে এলেন হামিদ হোসেন। দুজন মিলে নানান প্রশ্ন করতেই কেঁদে উঠল কুসুম। কাঁদতে কাঁদতে জানাল—
,,, সেদিন বাড়ি থেকে বের হতেই অসীমের সঙ্গে দেখা হলো তার। ভর দুপুর হওয়ায় আশপাশে তেমন লোক ছিল না। অসীম আগেই বলেছিল কুসুমকে তার সঙ্গে পালিয়ে যেতে। শহরে তাদের সংসার হবে, লাল-নীল সংসার। যেখানে অসিম একটা ভাড়া বাসা নেবে। অসীম কাজে গেলে কুসুম রান্না করবে, আর অসীম কাজ থেকে ফিরে কুসুমের হাতের রান্না খাবে। তাদের বাচ্চাকাচ্চা হবে। সেই বাচ্চারা কুসুম আর অসীমকে আব্বা-আম্মা বলে ডাকবে। কুসুম স্বপ্ন দেখেছে। কল্পনায় অসীমের সঙ্গে লাল-নীল সংসার সাজিয়েছে। এই সংসারের মোহে পড়েই সেদিন অসীমের হাত ধরে পালিয়েছিল কুসুম। বেখেয়ালেই সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল ছোট্ট অপুকে। যখন খেয়াল হলো, অসীম বলল সে নাকি অপুকে মেয়ের মতো ভালোবাসবে। অপু হবে তাদের প্রথম সন্তান। ভাইয়ের মেয়েকে আগে অবহেলা করলেও সেদিন নিজের আপন সম্বল হিসেবে অপুকে বুকের সঙ্গে ঝাপটে ধরেছিল ষোলো বছরের কিশোরী।ভাতিজিকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল চলন্ত বাসে।
ঘুম ভাঙতেই নিজেকে পেল লাল-নীল আলোয় সজ্জিত প*তিতা পল্লিতে। ষোলো বছরের কিশোরী তখন কূলহারা নাবিকের ন্যায় মাঝসাগরে সাঁতার কেটে কূল খুঁজতে ব্যস্ত। বারবার জিজ্ঞেস করছিল – সে কোথায় আছে? অসীম কোথায়? অপু কোথায়. বিপরীতে শুধু শুনেছে প*তিতালয়ের আম্মিজানের কর্কশ ধ্বনি– তর অসীম তরে মোটা টাকায় বিক্রি কইরা দিছে মাইয়া। কান্দিস না। অহন থাইক্কা এই তর বাড়ি, এই তর ঘর।
,,, কিশোরী কুসুম তখনও বিশ্বাস করেনি আম্মিজানের বলা কথাটা। সে অসীমকে ভালোবাসে, অসীমকে বিশ্বাস করে। অসীম কখনো এমন করতে পারে না।কিন্তু তার সব ভাবনা ভুল প্রমাণ করে সেই রাতে ওর ঘরে সর্বপ্রথম অসীমই এলো। সঙ্গে নিয়ে এলো আরও দুজনকে। ছিঁড়ে-খুঁড়ে শেষ করে দিল কুসুম কলির সংসার। অসীম তাকে লাল-নীল সংসারের স্বপ্ন দেখিয়ে লাল-নীল আলোয় ভরা গলিতে বিক্রি করে দিয়েছে। এখন কুসুম আর কুসুম নেই,, সে হয়ে উঠেছে নি*ষিদ্ধ পল্লীর লাল ভানু। এখন প্রতিদিন সে সংসার সাজায়, একেকজনের সঙ্গে একেকভাবে।
এর মধ্যে অপুর কী হলো, ওকে অসীম কী করেছে, মেয়েটা আদৌ বেঁচে আছে কিনা, জানা নেই কুসুমের।
,, সেই কথা শুনে হাউমাউ করে কেঁদেছিলেন তাসনোভা বেগম। কেঁদেছেন হামিদ হোসেন নিজেও। কুসুমকে পেয়ে ভেবেছিলেন এই বুঝি অপুটার খোঁজ পেলেন। কুসুম বুঝি জানে অপুটা কোথায়। কিন্তু পেলেন না। ওই জানোয়ারটা কুসুমকে এমন জায়গায় পাঠাতে পারলে অপরাজিতার না জানি কী করেছে! কার হাতে দিয়েছে মেয়েটাকে? অপু বেঁচে আছে তো? নাকি… আর ভাবতে পারলেন না স্বামী-স্ত্রী। পুরোনো ঘা তাজা হতেই জ্ঞান হারালেন তাসনোভা বেগম।
,,, সিএনজি থেকে নামার কালে হামিদ হোসেন বোনকে বলেছিলেন বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্তু কুসুম রাজি হলো না। ভাইয়ের কথার বিপরীতে মলিন হেসে বলল—
— ইদানীং শরীরে নিজের গন্ধ পাই না ভাইজান, সব খালি পরপুরুষের গন্ধ। এই গন্ধে আমি অভ্যস্ত। পথ ছাড়ার উপায় নাই। ছাড়লে আমার জীবন যাইবো সাথে আপনাগো ও।
,,, তোমার আপা মারা যাওয়ার পর তোমার মা আবার পাগল হয়ে গেলো,, পাগলের মতো রাস্তায় ঘুরে ঘুরে তোমাকে আর পারুকে খোঁজে,, তাকে শিকল দিয়েও আটকে রাখা যায় না। সারাক্ষণ পারু পারু, অপু অপু বলে চিৎকার করে। জোর খাটানোর ফলে শিকলে টান লেগে হাত-পা কেটে যায়,, ছেড়ে দিলে আবারও ছুটে যায় রাস্তায়। সে শহরে যাবে,, খুঁজে খুঁজে ফিরিয়ে আনবে অপু আর পারুকে। আরাফাত তখন আট বছরের। ছেলেটা সারাক্ষণ মা মা করে কাঁদে, কিন্তু মাকে পায় না,, কাজ সামলে তোমার মাকে সামলে আমিও ছেলেটাকে সময় দিতে পারি না। আরাফাত মাঝে মাঝে কাঁদলেও একটা সময় চুপ হয়ে গেলো,, মায়ের পাশে পাশে থাকতে শুরু করলো। আরাফাতের এই আচরণ দেখে একদিন ভরসা করে তোমার মাকে আরাফাত আর তোমার দুই চাচির কাছে রেখে কাজে গিয়েছিলাম। সেই কাজে থাকা অবস্থায় খবর এলো, তোমার মা রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা গিয়েছে,, ছুটে গেলাম তার কাছে, তবে আটকে রাখতে পারিনি,, পালিয়ে গেলো আমাদেরকে ফাঁকি দিয়ে। আজ যদি তোমার মা বেঁচে থাকতো খুব খুশি হতো আম্মা,, আমি তো নিজেকে আটকে রাখতে পারি,, তোমার মা বোধহয় পারতো না। কেদে কুটে চুটে যেতো তোমার কাছে।
,,, কাগজ তো ফুরিয়ে গেলো আম্মা,, খুব একটা জায়গা নেই। কাগজ ফুরিয়ে গেলেও তোমার আব্বার কথা ফুরিয়ে যায়নি। যেদিন তুমি সব জানতে পেরে আব্বার কাছে আসবে, সেদিন আমরা অনেক কথা বলবো,, অনেক অনেক। এই কথাগুলো তোমায় সামনাসামনি বলার ক্ষমতা নেই বিদায় লিখতে বাধ্য হয়েছি আম্মা। একদিন আমাদের দেখা হবে, সেদিন অতীত টেনে দুঃখ দিয়ো না আম্মা। আব্বা ডেকে আমার মনটা শান্ত করে দিয়ো। আব্বা তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি,, হয়তো তোমার পাপ্পার মতো বাসতে পারিনি,, বাসার সময় পাইনি, তবুও আব্বা তোমাকে তার নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসে আম্মা!!
,,, তোমার আব্বা,,
,,, চিঠির লাইন ফুরাতেই অর্পনার চোখ বেয়ে দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো, তবে তা নিচে পড়ার আগেই একটা পুরুষালি হাত এগিয়ে এসে পানিটুকু হাতের আজলায় নিয়ে নিলো,, আপন পুরুষের পরিচিত ঘ্রাণ নাকে ঠেকতেই চোখ তুলে তাকালো অর্পনা। এই তো পাশাপাশি এসে মেঝেতে বসেছেন লোকটা,, কে বলবে লোকটা অতো দামি মানুষ? তার মতো নিঃস্ব মেয়েকে ভালোবাসার এতো কেন তাড়া লোকটার? উত্তর জানা নেই অর্পনার। দ্বীপ অর্পনার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে চোখের চশমাটা খুলে দিলো,, মেয়েটার চোখে টলমল করা পানি,, এখনই ঝরে পড়বে বোধহয়, তার আগেই ঝুঁকে এলো দ্বীপ,, ঠোঁট দাবিয়ে চোখের পানিটুকু শুষে নিলো। অর্পনা এবার দ্বীপের বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠলো,, খামচে ধরলো লোকটার উন্মুক্ত কাঁধ,, আফসোসের স্বরে বললো— ভালোবাসা ভালো না দ্বীপ,, ভালোবাসা সর্বনাশা। প্রতিটি প্রেমকাব্যে এতো বিতৃষ্ণা কেন? কেন আমরা ঠকে যাই? আর কেনই বা ঠকাই? ভালোবাসায় এতো ভুলচুক কেন? এটা কি নির্ভুল হতে পারতো না? কেউ কাউকে ভালোবাসার দোহাই দিয়ে কী করে এভাবে ঠকাতে পারে? লাল-নীল সংসারের প্রলোভন দেখিয়ে লাল-নীল গলিতে কীভাবে বিক্রি করতে পারে? আমার নিজের জন্য এক বিন্দুও আফসোস হচ্ছে না,জানেন? আমার পাপ্পা তো আমাকে রাজকন্যার মতো বড়ো করেছে, কিন্তু কুসুম ফুফু,, ভালোবাসা তাকে কী উপহার দিলো? কী পেলো সে? নরম চামড়ায় হাজারটা পুরুষের ঘা? প্রতিনিয়ত ভিতর থেকে আসা হৃদয় পচার গন্ধ? ভালোবাসায় এতো যন্ত্রণা কেন?
,,, উত্তর করতে পারলো না মানব, শুধু আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিলো মেয়েটাকে। বক্ষকুঠরিতে আশ্রয় দিলো ছোট্ট নাজুক শরীরের অধিকারী নীড়হারা পাখিটাকে। পাখিটা ও কেমন ডানা গুটিয়ে মিলিয়ে গেলো স্বামী নামক আশ্রয় স্থলে।
””বেলা ফুরালে সব ক্ষেত্রেই যে ইস্ক মোহাব্বাত হবে এমন তো কথা নেই কিছু কিছু ক্ষেত্রে, লাভ ইজ পেইন, লাভ ইজ দার্দ,, এট লাস্ট দার্দ মোহাব্বাত ও হয়। “”
,,,, আজ রবিবার,, সকাল সকাল দ্বীপ আহাদকে নিয়ে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। সাথে অবশ্য বিহানেরও যাওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু মেধাটার শরীর ইদানীং ভালো যাচ্ছে না। নয় মাস চলছে,, যদিও ডাক্তার ডেলিভারি ডেট আরও এক মাস পর দিয়েছেন,, তবে মেধার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে না এতোটা লেট হবে। যখন-তখন মির্জা বাড়ির দুয়ার আলো করে আগমন ঘটতে পারে তাদের প্রথম বংশধরের। তাই বিহান আর রিস্ক নিলো না,, বর্তমানে যা কাজ করার ঢাকা থেকেই করবে,, দ্বীপও সায় জানিয়েছে তাতে। সবকিছুর আগে তার বোন, বোনের আগে কিচ্ছু না।
,,, অর্পনা হন্তদন্ত পায়ে রুমে এলো,, মেইডকে বলে এসেছে রুমে খাবার দিয়ে যেতে। এখন জোর-জবরদস্তি খাবার না খাওয়ালে এই লোক না খেয়েই পালাবে, তখন অর্পনার আবার একটু একটু কষ্ট হবে। এমনিতেই লোকটা কয়েকদিন কাছে থাকবে না, বিষয়টা ভাবতেই অর্পনার কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। সে রুমে এসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে লোকটাকে খুঁজলো, কিন্তু পেলো না। অর্পনা খোঁজার প্রয়াস না চালিয়ে এগিয়ে গেলো বিছানার উপর ফেলে রাখা অর্ধগোছানো ট্রলিটার দিকে। ইদানীং দ্বীপ মির্জা আরও কিছুটা বদ লোক হয়ে গিয়েছেন,, অর্পনাকে দিয়ে হরহামেশাই নিজের কাজগুলো করিয়ে নেয়। আগে তো ঠিকই বলেছিলো, তোমায় রানি করে রাখবো, একটু ও কষ্ট পেতে দিবো না,, এমন করবো, তেমন করবো, এখন সব মিষ্টি কথা হাওয়া। নয়তো তাকে দিয়ে এতো কাজ করানো হবে কেনো? ওয়ালেট গোছানো থেকে শুরু করে শার্টের বোতাম লাগিয়ে দেওয়া, স্যুট পরিয়ে দেওয়া, ড্রেস সিলেক্ট করে দেওয়া, আয়রন করে দেওয়া, ফিরে এলে সব একে একে কালেক্ট করে ডাস্টে ফেলা। অর্পনা মুখ বাঁকিয়ে ট্রলিতে অবশিষ্ট জামাগুলো রাখতে রাখতে দ্বীপের উদ্দেশ্যে ডাক পাঠালো– শুনছেন? কোথায় আপনি?
,,, দ্বীপ তখন বান্দরবানের আর.এস. মির্জা’স ব্রাঞ্চের এমডির সাথে কথা বলছিলো,, ওখানেই যাবে আজ। নিউ প্রজেক্ট নিয়ে দুটো ক্লায়েন্ট মিট হবে। মিট শেষে ডিল কনফার্ম হলে সম্পূর্ণ প্রজেক্টের প্রসেসিং ফিল-আপ করে তারপর বাড়ি ফিরবে দ্বীপ। আপাতত সেই বিষয়েই গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে দুজনার। হঠাৎ অর্পনার এহেন ডাক কানে আসতেই কেমন থমকে গেলো মানব,, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো থাই ব্যাধ করে সরাসরি রুমের দিকে। কাঁচা হলুদ রঙা অদ্ভুত রকমের ড্রেস পরা রমণী,, দ্বীপের ট্রলিতে ভাঁজ করা কাপড়গুলো একে একে সাজিয়ে রাখছে। কাজ করার ফাঁকে সামনে আসা লম্বা চুলগুলো কেমন বিরক্ত হয়ে পিছনে সরিয়ে দিলো, যার স্থান হলো কোমরের একটু-খানি নিচে,, অজান্তেই দ্বীপের গলা শুকিয়ে এলো। তখনই আবারও কানে এসে বাড়ি খেলো,,
,,, কিগো, কই গেলেন? শুনছেন না?
,,, দ্বীপের সম্বিত ফেরার বদলে সে কেমন ঘোরে চলে গেলো, তার ধ্যান এই দুনিয়ার কোথাও নেই। এই যে ফোনের অপর পাশের ব্যক্তিটি বারবার “”হ্যালো স্যার, হ্যালো স্যার, আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন? এহেন বাক্য আওড়াচ্ছে, তা মানবের কর্ণকুহরে পৌঁছাচ্ছে না। তার কানে শুধু বাজছে রমণীর বলা “কিগো, কই গেলেন? শুনছেন না?” দ্বীপ সত্যিই শুনছে না। এই বাক্যগুলো ব্যতীত এই পৃথিবীতে চলমান একটা বাক্যও তার কর্ণকুহরে পৌঁছাচ্ছে না।
ওইদিকে কথার উত্তর না পাওয়া সত্ত্বেও ফোনের ওপাশে থাকা লোকটা কল কাটতে পারছে না। পাছে যদি চাকরিটা চলে যায়, সেই ভয়ে। এই পর্যায়ে মেহেরবানি করলো দ্বীপ,, ক্ষীণ স্বরে আওড়ালো–
মিটিংটা সন্ধ্যায় ফিক্সড করো।
,, ওপাশ হতে উত্তর আসার আগেই কল কেটে দিলো দ্বীপ। শিকারী বাঘ যেমন হরিণ শাবক শিকার করার আগে ধীর কদমে এগিয়ে যায়, যেনো শুকনো পাতায় মরমর শব্দে হরিণী সজাগ হওয়ার সুযোগ না পায়। দ্বীপ তেমনি করে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো,, একদম অর্পনার কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো– এভাবে ডাকা কত থেকে শিখেছো?
,,, হঠাৎ কানের কাছে পুরুষালি গম্ভীর স্বর এসে বাড়ি খেতেই কিছুটা কেঁপে উঠলো অর্পনা,, দ্বীপের গরম নিশ্বাস কান আর গলার এক পাশ ছুঁয়ে যেতেই এক হাতে মুঠো করে ধরলো পরনের পোশাক,, অন্য হাতে থাকা দ্বীপের শার্টটা পড়ে গেলো বিছানায়,, চোখ বুজে নিলো সাথে সাথে। দ্বীপের নজর এড়ালো না তা, সহসাই ঠোঁট বেঁকে এলো মানবের। অর্পনার বাহু ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করলো। অর্পনার পরনে কাঁচা হলুদ রঙা কুর্তি, যার লেন্থ কোমরের একটু নিচ পর্যন্ত,, সালোয়ারটা কুঁচি করা, হালকা ফুলে আছে, পায়ের দিকটাও কেমন ঢিলেঢালা, ওড়নাটা ফেলে রেখেছে এক পাশে,, দ্বীপ জানে না এইসব ড্রেসের নাম কী। সে হাত বাড়িয়ে অর্পনার একপাশে ফেলে রাখা ওড়নাটা টেনে ধীরে ধীরে গলায় পেঁচিয়ে নিলো। দ্বীপের কাণ্ডে কেঁপে উঠলো অর্পনা,, লোকটা সদ্য গোসল সেরে বারান্দায় গিয়েছিলো,, পরনে শুধুমাত্র একটা ট্রাউজার, উন্মুক্ত ফর্সা বুকে অর্পনার ওড়নাটা বেশ মানিয়েছে, কিন্তু অর্পনা মেনে নিতে পারছে না।
তার কেমন হাঁসফাঁস লাগছে,, মনে হচ্ছে সে নিজেই বুঝি মিশে আছে লোকটার উন্মুক্ত বুকে। অনুভূতির যাঁতাকলে পড়ে এই ঠান্ডা এসির মাঝেও অর্পনার নাক, থুতনির নিচ আর কপালখানা কেমন ঘেমে উঠলো। বিয়ের এতোগুলো দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরেও এটুকুতে অর্পনার এহেন অবস্থা হওয়াটা কতটা স্বাভাবিক? একটু বেশি নাটকীয় না? অর্পনা ঢোক গিলে নিজেকে সামলাতে চাইলো। সাথে সাথে তার শক্ত ভাবমূর্তিকে ভেঙে দিয়ে কোমর পেঁচিয়ে ধরলো দ্বীপ,, এক ঝটকায় বুকে এনে ফেললো তাকে ,, বৃদ্ধাঙ্গুল উঁচিয়ে নাকের ঘামটুকু মুছে দিতেই ফের চোখ বুজে নিলো অর্পনা। থুতনির ঘামটুকু মুছতে দ্বীপ নিজেই এগিয়ে এলো,, ঠোঁট দাবিয়ে নিবিড় চুম্বন করলো সেখানে। এই পর্যায়ে আরও কেঁপে উঠলো অর্পনা,, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে আবেগঘন চুম্বন বোধহয় এটাই। দ্বীপ যখনই অর্পনার থুতনিতে চুমু খায়, অর্পনা কেমন নিজেকে হারিয়ে ফেলে,, এতোটা তীব্র অনুভূতি সহ্য করে ঠিক থাকার মতো শক্তি ফুরিয়ে যায় অবলীলায়। দ্বীপ অর্পনাকে বুকের সাথে আটকে রেখে কাঁধ হতে চুলগুলো সরিয়ে দিলো। কানে থাকা হীরার দুলটাতে আঙুল চালিয়ে ক্ষীণ স্বরে শুধালো–এটা কী?
,,, দ্বীপের খরখরে আঙুল অর্পনার কানের লতি ছুঁতেই থরথর করে কেঁপে উঠলো অর্পনা, কাঁপা কণ্ঠে উত্তর করলো– কানের দুল,, আপনি তো চেনেন।
,,, ওহুম এটা না,, ড্রেসের কথা বলেছি।
,,, ফরাসি কুর্তি-সালোয়ার।
,,, দ্বীপ ততক্ষণে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে, কানের লতিতে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে মাদকীয় কণ্ঠে আওড়ালো– মাশা-আল্লাহ!!
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৩
,,, অর্পনা নিজেকে সামলাতে না পেরে কাঁধ আঁকড়ে ধরলো লোকটার– কী করছেন? আপনার লেট হয়ে যাচ্ছে তো।
,,, লোকটা সেসব কানে তুললো না, উল্টো হয়ে উঠলো অবাধ্য, অর্পনার উন্মাদ দ্বীপ। যে কোনো শাসন-বারণ মানে না, কম্প্রোমাইজ করতে জানে না। বারবার যার কাছে জিতে গিয়েও হেরে যায় অর্পনা। লোকটা বাজে, অভদ্র আর কঠোর। সেই অভদ্রতার মাঝেই একপর্যায়ে সেই বেপরোয়া মানবের ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো–
,,৷ এভাবে আর ডাকবে না,, নিজেকে ঠিক রাখা দায়।
