অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৪৯
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
তপ্ত দুপুর, সবাই তখন ঘরবন্দী। এমন গা জ্বালা করা রোদে কেউই বাইরে বেরোনোর সাহস করছে না। যার দরুণ অলিতে গলিতে বিরাজ করছে নীরবতা। ঢাকার এমনই এক নিঝুম গলি দিয়ে দুটো প্রাইভেট ক্যার সমেত ঢুকলো নিরবদের পুরো পরিবার। এক টাতে শুধু মহিলাদের রাজত্ব আর আরেকটা তে পুরুষ সদস্যের। পুরুষদের গাড়িটাতে যতটা নীরবতা ঠিক ততটাই সরব হয়ে আছে মহিলাদের গাড়িতে। চাপা গুঞ্জন চলছে সবার মাঝে। গুঞ্জনের এক ফাঁকে রীতি তার মায়ের উদ্দেশ্যে সন্ধিহান কণ্ঠে বলল,
“ আম্মু, এটা তো খালামনি দের বাড়ির সামনের গলি! এখানেই ভাবীদের বাড়ি? ”
“ হুঁ, তোর বাবা তো তাই বলেছেন। ”
উত্তর পেয়ে গুঞ্জন কমে আসল কিছুটা। কিছুক্ষনের মধ্যেই কাঙ্ক্ষিত জায়গায় এসে গাড়িগুলো থামল নিরবদের। সবার শেষে নিরুৎসাহিত ভঙ্গিতে গাড়ি থেকে বেরোলো নিরব। পুরোটা সময়ই সে অমনোযোগী ছিলো, কোন রাস্তা দিয়ে এসেছে, কার বাড়ির আশপাশ দিয়ে গাড়ি চলেছে এসব কিছুই খেয়াল করে নি সে। গাড়ি থেকে নামতেই চোখে পড়লো একটা তিন তলা ভবন। যার নেমপ্লেটে খুদাই করে লিখা “ খান ভবন ” এইটুকুই চোখে পরল নিরবের। তারপর বাড়িতে প্রবেশ করলো সে।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
বিছানায় হেলান দিয়ে অনড় হয়ে বসে আছে এক অষ্টাদশী রমনী। পরনে তার বিয়ের শাড়ি অথচ তার মুখ দেখে কেউই বলবে না তার আজকে বিয়ে, উল্টো বলবে আজকে কারো মৃত্যু উপলক্ষে সে শোক পালন করছে। কোনোমতে ছেলের বাড়ি থেকে আনা শারিটুকু পড়েছে সে, সাজ সজ্জার অলংকার গুলো লাগেজের মধ্যেই পড়ে আছে অবহেলায়। এর মধ্যেই কাজী উপস্থিত হলো সেখানে, সে এসেই তাড়া দিতে শুরু করলে না সাজিয়েই বিয়ের কাজ সম্পূর্ণ করতে উদ্যত হলো সকলে। রমনীও এতে তেমন কিছুই বলল না। চুপচাপ পাশে বসা মায়ের কথা মতো ঘুমটা দিয়ে বসে পড়লো। কাজী সাহেব বিয়ের প্রয়োজনীয় কথা বার্তা শুরু করলেন। তার কথার মাঝেই বিদীর্ণ চেহারাটায় পাহাড় সম বিস্ময় নিয়ে তার দিক তাকালো মেয়েটি।
“ নাজদিদ সরকার নিরব ”
কাজীর মুখে নিজের স্বামীর জায়গায় সুপরিচিত সেই নামটি উচ্চারিত হতেই নেত্রযুগল কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইল তাপসির। মেয়েটা যেনো এবার ধ্যান জ্ঞান সব হারালো। এক দৌঁড়ে বিছানা ছেড়ে দুতলার রেলিং- এ দাঁড়িয়ে নিচে তাকাতেই মাথায় আকাশ ভেঙে পরল তার। উনি! উনি এখানে! তার মানে উনিই আব্বুর বন্ধুর ছেলে? কিন্তু উনার তো আনিকার সাথে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল গত শুক্রবারে। তাহলে কী আনিকা বিয়ে করেননি উনাকে? তার ভাবনার মাঝেই তাকে হেঁচকা টানে সেখান থেকে নিয়ে আসল তার মা। কিছু বলতে যাবে এর আগেই তাপসি রুমে প্রবেশ করে অকপটে তিন কবুল উচ্চারন করে দিলো। তার কাণ্ডে সকলেই হকচকিত, কাজী সাহেব তীক্ষ্ণ চোখে পরখ করল তাকে। তার নজরই বলে দিচ্ছে এর আগে এমন মেয়ে দেখেনি।
বেশি ঘাটলেন তিনি। তাপসির দিক থেকে বিয়ের কাজ শেষ হতেই নিচে নিরবের নিকট গেলেন তিনি। সেখানে গিয়েও বউয়ের জায়গায় “তাহরিমা খান তাপসি” নামটা কানে পৌঁছাতেই সজাক নজরে তার পানে চাইল নিরব। নামটাকে বড্ডো চেনা চেনা মনে হলেও তৎক্ষনাৎ সেটা স্মরণে আসলো না তার। এক পর্যায়ে সেও এদিক সেদিক না ভেবেই সেই মেয়ের নামে কবুল পড়ে নিলো। তাপসির মতো অপরপাশে মানুষটাকে জানার তেমন আগ্রহ লক্ষ্য করা গেলো না তার বেলায়।
অপরাহ্নে, সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। তার তেজহীন ম্লান আলোতে অত্যধিক আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে ধানের কাঁচা ছড়িগুলো। কালো মরিচের বেগুনি রঙা ফুলগুলো যেনো ভিনদেশের জানা অজানা সব ফুলের সৌন্দর্যকে হার মানাচ্ছে- সেই দৃশ্যই ধান ক্ষেতের সরু আইল দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মন দিয়ে দেখছে আনিকা। তার সামনে হেঁটে চলছে আরও পাঁচ ছজন মেয়ে। মেয়েগুলো এক দিনেই কেমন ভাব করে ফেলেছে আনিকার সাথে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই আনিকা দেখেছে অসংখ্য বাচ্চা আর বড়ো মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার অপেক্ষায়।
সকলেই তাকে দেখে কী আহ্লাদ। একেকজন সে কী মধুর মধুর ডাকে ডাকছে তাকে! আনিকাও খুব সহজেই মিশেগেছে সবার সাথে। গ্রামের মানুষ যে এতো সহজে কাউকে আপন করে নেয় সেটা আজ জানতে পারল আনিকা। আজ সারাটা দিন বেশ আনন্দে কেটেছে তার। এখন সবাই মিলে ঘুরতে এসেছে তারা। সবার সাথে হাসি ঠাট্টা করতে করতেই চারপাশের সকল জমিজামায় লাগানো ফসল, সবজি, সবকিছু দেখলো আনিকা। সন্ধ্যা নেমে আসার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে- তাই আর দেরী না করে বাড়ির উদ্দেশ্যে পা চালালো সবাই। কিন্তু হাঁটতে গিয়ে আরেক বিপত্তি ঘটলো আনিকার সাথে, পুরো পা কাঁদায় লেপ্টে গেছে তার। যার দরুণ হাঁটতে গেলেই পিছলে পড়ে যেতে নেয় মেয়েটা। তার এই অবস্থা দেখে এগিয়ে এলো মেয়েগুলো। তন্মধ্যে সাদিকের চাচাতো বোন রিমঝিম বলল,
“ আমার কাছে জুতা গুলো খুলে দেন ভাবী। সামনে একটা পুকুর আছে ঐহানে গিয়া পা ধুইয়া আবার পইড়া ফেইল্লেন। ”
উপায় না পেয়ে জুতো জোড়া খুলে নিলো আনিকা। তবে তা রিমঝিম এর হাতে না দিয়ে নিজের কাছেই রাখলো। রিমঝিমের অনেকবার বলার পরেও কাজ হোলো না। কিছুদুর যেতেই সামনে পড়লো সাদিক। সে তাড়াহুড়ো করে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে।
“ একটু পর আযান দিয়া দিব এতক্ষনে আসার সময় হইছে তোদের? ফোন কোথায় তোর? ”
সাদিকের এমন রাগী স্বরে আনিকা ব্যাতিত সবার মুখটাই চুপসে গেলো। রিমঝিম অপরাধী মুখে বলল,
“ বাড়িতে ফেলে এসেছি ভাইয়া, মনে ছিলো না। ”
আর কিছু বলল না সাদিক। সবাইকে সামনে যেতে বলে নিজে আনিকার দিক এগিয়ে এলো। আনিকার নাজেহাল অবস্থা দেখে তড়িঘড়ি করে তাকে নিয়ে পুকুর পাড় গেলো। পুকুরে চিকন চিকন দুটো বাঁশে দিয়ে ঘাট বাঁধা। সবুজ শ্যাওশার আস্তরণে পিচ্ছিল হয়ে আছে তা। সেখানে আনিকার নরম তুলতুলে, মসৃণ পা জোড়া যেনো সাবানের কাজ করল, পা রাখতেই ব্যালেন্স হারিয়ে পড়তে নিলো সে। সাথে সাথেই খামচে ধরল সাদিককে। তার আতঙ্কিত চেহারা দেখে বেশ মজা পেলো সাদিক। ঠোঁট চেপে বলল,
“ সারাক্ষন যে আমার মুখে মুখে তর্ক করো, এখন যদি ফালিয়ে দিই এখানে। ”
“ তর্ক শুধু আমি করিনা আপনিও করেন। তাই পড়লে আপনাকে নিয়েই পড়বো। ”
“ দেখি কতোটুকু জোর আছে তোমার! ”
বলেই আনিকাকে কোলে তুলে নিলো সাদিক। তার মতিগতি সুবিধার ঠেকলো না আনিকার কাছে। মেয়েটা চেঁচিয়ে উঠলো,
“ এই এই বান্দর লোক, সত্যি সত্যি ফেললে কিন্তু আপনাকে মেরে ফেলবো আমি। আর…”
কথা সম্পূর্ণ করতে পারল না আনিকা। তার আগেই শীতল পানিতে ডুবে গেলো তার পা জোড়া। অকস্মাৎ ঠাণ্ডা স্পর্শে কথা বন্ধ হয়ে গেলো তার।
“ কথা বন্ধ করে পা ধোও। ”
মাথা উঁচিয়ে নিজের পায়ের দিক তাকালো আনিকা। হাতের মাধ্যমে সাদিকের গলা জড়িয়ে রাখায়- এক পা দিয়েই আরেক পা পরিষ্কার করার চেষ্টা চালালো। তবে এতে পা পুরোপুরি পরিষ্কার হলো না। এখনো অনেক জায়গায় কাঁদা লেগে আছে। তা দেখে মেয়েটা অসহায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করল সাদিকের পানে। সাদিক ব্যাপারটা বুঝতে পেরে একহাতে আনিকাকে ধরে, নিজের পায়ের উপর আনিকার ভার নিয়ে, কিছুটা ঝুঁকে আরেক হাতে আনিকার পা ছুঁলো। চমকে গেলো আনিকা। মেয়েটা কল্পনাতেও ভাবতে পারেনি সাদিক তার পায়ে হাত দেবে। সে প্রবল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে কিছু বলতে নিবে এর আগেই তাকে থামিয়ে দিয়ে সাদিক বলে উঠলো,
“ আর একটা কথা বললে একদম পানিতে ফেলবো। ”
সাদিকের কথায় একদম চুপ হয়ে গেলো সে। মনোযোগ দিয়ে তার স্বামীর কর্মকান্ড দেখতে লাগলো। ঝুঁকে থাকার কারণে সাদিকের গালের এক পাশটা তার মুখের একদম নিকটে এসে গেছে। চাপ দাঁড়িতে ভরপুর শুভ্র কপোলটায় সহসাই নিজের ঠোঁট দাবিয়ে দিলো আনিকা। কর্মরত হাতটা কিছুক্ষনের জন্য থেমে গেল সাদিকের। তারপর পা পরিষ্কার করে ঘাট থেকে উঠে এলো তারা। আনিকার জুতো জোড়া নিচে রেখে, কোল থেকে নামিয়ে তাকে জুতোর উপর দাঁড় করিয়ে দিলো সাদিক। ফটাফট জুতো পরে নিলো আনিকা। তারপর সাদিকের দিক তাকিয়ে খুশিমনে কিছু বলতে নিবে এর আগেই সাদিক তাতে পানি ঢেলে বলে উঠল,
“ বিপদগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য করা একজন আদর্শ নাগরিকের কাজ। সুতরাং ধন্যবাদ দিয়ে লজ্জিত করিবেন না। ”
সাথে সাথেই মেজাজটা তুঙ্গে উঠে গেলো আনিকার। ত্রস্ত পায়ে সামনে এগোতে এগোতে বিড়বিড়ালো,
“ লঙ্কার বান্দর কী শুধু শুধু বলি আমি। অসহ্য লোক একটা। ”
পরক্ষণেই কিছু একটা মনে পরতেই শকুনের চোখে ফিরে তাকালো সাদিকের দিক। বলল,
অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৪৭+৪৮
“ আপনি কী সবাইকে কোলে তোলেই সাহায্য করেন? ”
“ নাহ, হতে পারি আমি দয়াল, তবে আমার বউ এর হকের ব্যাপারে আমি খুবই লয়াল। ”
বলতে বলতেই আনিকার হাত ধরে তাকে নিয়ে হাঁটা ধরলো। আনিকাও আর কথা বাড়াল না। মুচকি হেসে সাদিকের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে লাগল।
