Home অগ্নিশিখার অন্তরালে অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ১০

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ১০

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ১০
YASH

কিয়ারা আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না
মুখ হাঁ করে বাসের ভেতর গগন কাপানো চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল। তার সেই কান্নার তীব্র আওয়াজে বাসের ভেতরে থাকা শিক্ষক-শিক্ষিকা থেকে শুরু করে সব ছাত্র-ছাত্রীরা চমকে উঠে একযোগে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। পুরো বাসের মনোযোগ এখন তাদের দিকে।
পরিস্থিতি সামলাতে তুষ্টির মা তড়িঘড়ি করে সিটের ওপর উল্টো হয়ে বসা তুষ্টিকে টেনে সোজা করলেন। তিনি কিয়ারার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নরম ও আদুরে গলায় বললেন, “নাহ মা, কাঁদে না সোনা মা। আর কখনো তুষ্টি এমন কথা বলবে না। তুমি কেঁদো না লক্ষ্মী মা।”
পাশ থেকে ইনায়াও কিয়ারাকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। সে কিয়ারার পিঠে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কেঁদো না বুনু, ছিহ! বাসের সবাই তাকিয়ে আছে তো। এভাবে কাঁদলে মানুষ তোমাকে পঁচা মেয়ে বলবে।”

কিন্তু কিয়ারা তখন কারোর কথাই শুনছে না। তার কান্না যেন থামার নামই নিচ্ছিল না। বাসের সবার এমন উৎসুক চাহনি আর কিয়ারার এই অনড় কান্নায় ইয়াশের মাথাটা এবার সত্যিই গরম হয়ে গেল।
সে নিজের চোয়াল শক্ত করে, চোখের মণি জোড়া বড় বড় করে কিয়ারার দিকে তাকাল। তারপর অত্যন্ত কড়া এবং ভারী গলায় একটা ধমক দিয়ে বলল,
“আর একটা কান্নার শব্দ যদি আমার কানে আসে, তবে তোকে এই বাসের জানালা দিয়ে টেনে সোজা নিচে ফেলে দেবো, মনে থাকে যেন!”
ইয়াশ ভাইয়ার এমন ভয়ংকর আর কড়া ধমক শুনে খেল এক নিমেষে খতম। কিয়ারার মস্ত বড় কান্নার হাঁ-টা এক পলকে বন্ধ হয়ে গেল। সে আর মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ করার সাহস পেল না। কান্নাটা গলার কাছে আটকে যাওয়ায় সে শুধু কিছুক্ষণ পর পর জোরে জোরে ফুঁপিয়ে উঠতে লাগল। তার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু মুখ একদম বন্ধ।
সামনের সিট থেকে পুচকে তুষ্টি নিজের ফ্রকের জামাটা হাত দিয়ে গুটাতে গুটাতে ইয়াশের দিকে তাকিয়ে আধো-আধো গলায় বলল, “ও পতা মেয়ে, তান্না কলে!”
নিজের বাটারফ্লাইকে পঁচা মেয়ে বলা ইয়াশ এক বিন্দুও সহ্য করল না। সে চোখের পলকে তুষ্টির দিকে চোখ রাঙিয়ে তীব্র রাগী গলায় ধমকে উঠল, “শাট আপ! তোমার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলে তোমাকেও জানালা দিয়ে ফেলে দিবো”

ইয়াশের ওই রক্তচক্ষু আর ধমক খেয়ে তুষ্টি এবার সত্যিই ভয় পেয়ে গেল। সে তার মায়ের পেছনের দিকে মুখ লুকাতে চাইল। তুষ্টির মা-ও বুঝতে পারলেন পরিবেশটা বেশ থমথমে হয়ে উঠেছে।
তিনি আর কথা না বাড়িয়ে তুষ্টির হাত ধরে বাসের একেবারে সামনের দিকের একটা ফাঁকা সিটে গিয়ে বসলেন।
সামনের সিটটা ফাঁকা হতেই ইয়াশ এক বুক স্বস্তির শ্বাস ফেলল। সে কিয়ারাকে নিজের কোলের ওপর সোজা করে বসিয়ে একদম তার মুখের সামনে ধরল। কিয়ারার জলভরা কালো চোখ দুটোর দিকে সরাসরি তাকিয়ে শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল, “আমি কি ওকে কোলে নিয়েছি?”
কিয়ারা আলতো করে নিজের ছোট্ট মাথাটা দুই দিকে নাড়িয়ে ফুঁপিয়ে উত্তর দিল, “না।”
ইয়াশ আবার জিজ্ঞেস করল, “তাহলে ওভাবে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছিস কেন?”
কিয়ারা নিজের দুই হাত দিয়ে ইয়াশের শার্টের কলারটা খপ করে ধরে কেঁদে ওঠার ভঙ্গিতে বলল, “ও তোমাল তোলে উঠতে চেয়েতে… অ্যা অ্যা অ্যা!”
ইয়াশের গলার স্বর এবার কিছুটা নরম হলো। সে কিয়ারার ভেজা গাল দুটো নিজের দুই ফর্সা হাত দিয়ে আলতো করে ধরে বলল, “ও উঠতে চেয়েছে বলেই কি ওকে আমি কোলে তুলবো? আমার কোলে শুধু আমার বাটারফ্লাই বসবে”

কিয়ারা কেঁদে কেঁদে বললো “অ্যা অ্যা অ্যা”
এরপর সে তার বড় বড় চোখ দুটো মেলে ইয়াশের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কিয়ারার এই নিষ্পাপ চাহনি দেখে ইয়াশের ভেতরের সব রাগ মুহূর্তে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে আলতো করে ঝুঁকে কিয়ারার নরম তুলতুলে বাঁ গালে একটা চুমু খেল। তারপর বললো “কেঁদো না মুরগির বাচ্চা লক্ষী মেয়েরা কখনো কাঁদে না”
ইয়াশ ভাইয়ার আদর পেয়ে কিয়ারার মনের সব মেঘ কেটে গেল। সে আর এক ফোঁটাও কাঁদল না। ইয়াশের কোলের ওপর শান্ত হয়ে বসে সে নিজের ছোট্ট আঙুলগুলো দিয়ে ইয়াশের শার্টের ওপরের বোতামটা ধরে আপন মনে নাড়াচাড়া করতে লাগল। বাসের জানলা দিয়ে আসা সকালের মিষ্টি হাওয়া তখন কিয়ারার কোমর ছাড়ানো লম্বা চুলগুলোকে আলতো করে উড়িয়ে দিচ্ছিল, আর ইয়াশ এক হাত দিয়ে তাকে শক্ত করে আগলে রেখে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।

গন্তব্যে এসে যখন বড় স্কুল বাসটা থামল, তখন চারপাশের কোলাহল আরও বেড়ে গেল। ইয়াশ বেশ সাবধানে কিয়ারাকে নিজের কোলে জাপটে ধরেই বাস থেকে নামল। এতক্ষণের কান্নাকাটিতে মেয়েটার চেরি ফলের মতো নরম মুখটা শুকিয়ে গেছে।
ইয়াশ বাস থেকে নেমেই নিজের ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করল। কিয়ারাকে আলতো করে কয়েক চুমুক পানি খাইয়ে, পকেট থেকে টিস্যু বের করে ওর মুখ আর চোখ মুছে দিল।
সবাই মিলে হেঁটে গিয়ে একটা বড়, ফাঁকা সবুজ মাঠের মতো জায়গায় বসল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আদিল মির্জা আর আবির মির্জাও তাদের গাড়ি পার্ক করে সেখানে এসে পৌঁছালেন। আজকের আবহাওয়াটা সত্যিই দারুণ। কড়া রোদ নেই, আকাশটা একদম গাঢ় নীল হয়ে আছে। বেশি গরমও না, আবার ঠান্ডাও না
একটা মিষ্টি ফুরফুরে হাওয়া বইছে চারপাশে।
ওরা সবাই ঘাসের ওপর বসে সবেমাত্র একটু গল্পগুজব শুরু করেছে, ঠিক তখনই আবির মির্জার ফোনটা বেজে উঠল। ফোন কানে নিতেই উনার মুখের হাসিখুশি ভাবটা উধাও হয়ে গেল। একটা ক্যাচাল লেগেছে লেগেছে, ওনাকে এখনই ইমার্জেন্সি চট্টগ্রামে রওনা হতে হবে। আবির মির্জা বেশ চিন্তিত মুখে বড় ভাই আদিল মির্জার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “ভাই, একটা ঝামেলা হয়েছে, আমাকে এখনই বের হতে হচ্ছে। বাচ্চাদের একটু দেখে-শুনে রেখো।”

আদিল মির্জা আশ্বস্ত করতেই উনি দ্রুত পায়ে গাড়ির দিকে চলে গেলেন।
এদিকে চার বছরের কিয়ারা মাঠের সবুজ ঘাস আর উন্মুক্ত আকাশ দেখেই যেন ডানা মেলার সুযোগ পেল। সে খিলখিল করে হাসতে হাসতে গোটা মাঠ জুড়ে টইটই করে দৌড়াতে শুরু করল। আর তার পেছন পেছন লম্বা পা ফেলে ছুটতে হলো ইয়াশকে। ইয়াশ গম্ভীর গলায় অনবরত ডেকে চলেছে, “স্টপ বাটারফ্লাই! দৌড়ে যেও না, পড়ে যাবে!”
কিন্তু এই মুরগির বাচ্চা কি আর কারও কথা শোনে? সে উল্টো ইয়াশকে দেখে আরও জোরে ছুটছে। ইনায়াও হাসতে হাসতে বোনের পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে। আশেপাশে স্কুলের আরও অনেক বাচ্চারা খেলছে, পুরো মাঠ জুড়ে একটা আনন্দের উৎসব চলছে।
ঠিক এমন সময় প্রকৃতির রূপ যেন বদলে গেল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই আকাশটা কালো মেঘে ঢেকে গেল এবং হঠাৎ করেই ঝমঝমিয়ে মস্ত বড় বড় ফোঁটায় তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির সাথে সাথে মেঘের এক একটা ভয়ংকর ডাক পুরো গার্ডেনকে কাঁপিয়ে তুলতে লাগল। চারপাশের বাচ্চারা আর শিক্ষকরা যে যার মতো মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে এদিক-ওদিক ছুটল। শিক্ষকরা সব শিক্ষার্থীদের এক জড়ো করতে লাগলো। ওরা সবাইকে ডাকতে লাগলো।

আর এই হুড়োহুড়ির মাঝেই ইয়াশের চোখের সামনে থেকে হঠাৎ কিয়ারা উধাও হয়ে গেল!
মাত্র এক সেকেন্ড আগেও যে মেয়েটা তার চোখের সামনে ছিল, সে হুট করে কোথাও নেই। ইয়াশ চোখের পলক ফেলে চারপাশের ধোঁয়াটে বৃষ্টির মধ্যে পাগলের মতো তাকাল, কিন্তু কোথাও সেই চেনা ছোট শরীরটা দেখা গেল না। আদিল মির্জা বৃষ্টির মধ্যে মাথা বাঁচাতে বাঁচাতে ইয়াশের কাছে এসে ব্যাকুল গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়াশ, মা কই? কিয়ারা কোথায়?”
পাশ থেকে ইনায়াও চিৎকার করে কেঁদে উঠে বলল, “এইখানেই তো ছিল ও! এখনই তো আমার সামনে দৌড়াচ্ছিল!”
ইয়াশের মাথার ভেতরের সমস্ত চিন্তা যেন এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বৃষ্টির মধ্যেই দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে মাঠের চারদিকে দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করে ডাকতে লাগল। বৃষ্টির পানি তার চোখ-মুখ বেয়ে নামছে, কিন্তু তার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে ভাঙা গলায় ডাকল, “বাটারফ্লাই! কই তুই? রাগ লাগছে কিন্তু আমার! প্লিজ আমার কাছে আয়, আমি কিন্তু বকা দেবো তোকে! লুকোচুরি খেলিস না বাটারফ্লাই, প্লিজ!”

কিন্তু বাতাসের গর্জন আর বৃষ্টির তীব্র শব্দ ছাড়া ইয়াশের কথার কোনো উত্তর এলো না। আদিল মির্জা তখন স্কুলের প্রধান শিক্ষক আর ম্যামদের কাছে ছুটে গেলেন। পুরো ঘটনা শুনে শিক্ষকরাও ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। এত বড় গার্ডেনে এই দুর্যোগের মধ্যে একটা চার বছরের বাচ্চা হারিয়ে যাওয়া মানে মস্ত বড় বিপদ।
সবাই মিলে তন্নতন্ন করে কিয়ারাকে খুঁজতে শুরু করল।এদিকে ইয়াশ তখন সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। এক উন্মাদ রূপ নিয়েছে। সে নিজের চুল খামচে ধরে বন্য পশুর মতো চিৎকার করছে আর কিয়ারার নাম ধরে ডাকছে। ছেলের এই ভয়ংকর পাগলামি আর চোখের চাউনি দেখে খোদ আদিল মির্জার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে এলো। উনি বুঝতে পারলেন পরিস্থিতি আর তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। উনি কাঁপতে থাকা হাতে পকেট থেকে ফোন বের করে সাথে সাথে পুলিশ কমিশনারকে কল করলেন এবং তাদের নিজস্ব কয়েকজন পার্সোনাল বডিগার্ডকে দ্রুত সেখানে আসার নির্দেশ দিলেন।
ঠিক তখনই মাঠের শেষ প্রান্তে, বেশ কিছুটা দূরে একটা পুরনো পরিত্যক্ত পুকুরের দিকে চোখ গেল ইয়াশের। বৃষ্টির চাবুকের মতো ফোঁটাগুলো পুকুরের ঘোলা পানিতে আছড়ে পড়ছে। আর সেই পানির মাঝখানে একটা ছোট নীল ফ্রকের অংশ আর দুটো ছোট্ট হাত বাঁচার জন্য ছটফট করছে!ইয়াশের চোখের মণি দুটো এক ঝটকায় স্থির হয়ে গেল। বুকের ভেতরের কলিজাটা যেন ছিঁড়ে নিচে পড়ে গেল তার। সে একছুটে আদিল মির্জার কাছে এসে উনার জ্যাকেটটা খপ করে চেপে ধরে এক বুক ফাটানো তীব্র চিৎকার দিয়ে বলল, “পাপা! আমার বাটারফ্লাই ডুবে যাচ্ছে! পাপা ও ডুবে যাচ্ছে!”

কথাটা বলেই ইয়াশ আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। সে বাতাসের গতিতে মাঠের শেষ প্রান্তের দিকে ছুটে গেল। পুকুরের পাড়ে পৌঁছানো মাত্রই জুতো-জামা সুদ্ধ এক মস্ত বড় লাফ দিল ঘোলা পানির বুকে।
ভাগ্যিস ইয়াশ সাঁতার জানত! সে পানির নিচে হাত বাড়িয়ে কিয়ারার ছোট শরীরটাকে খপ করে আঁকড়ে ধরল। পুকুরটা খুব একটা গভীর ছিল না, আর কিয়ারাও পাড় থেকে বেশি দূরে যায়নি। ইয়াশ ওকে এক ঝটকায় নিজের বুকে লেপ্টে ধরে পাড়ের দিকে নিয়ে এলো। ঘাসের ওপর কিয়ারাকে শোকাতেই মেয়েটা খকখক করে কাশতে লাগল। ফুসফুসে ঢুকে যাওয়া সামান্য কিছু পানি সে মুখ দিয়ে উগরে দিল। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আর ভয়ে সে কাঁপছিল।
বাটারফ্লাইকে অক্ষত দেখেও ইয়াশের চোখের মণি দুটো এক অদ্ভুত ও ভয়ংকর রূপ নিল। তার চোখের সাদা অংশ নিমেষে রক্তবর্ণ টকটকে লাল হয়ে উঠল। কানের লতি আর গলার রগগুলো রাগে ও ফুলে উঠতে লাগল। চারপাশের ধোঁয়াটে বৃষ্টির মাঝেই ইয়াশের মনে হলো তার চারপাশের পুরো পৃথিবীটা বনবন করে ঘুরছে।

আসলে ইয়াশের একটা মস্ত বড় মানসিক ও স্নায়বিক সমস্যা রয়েছে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় “মনোফোবিয়া অ্যান্ড প্যানিক অ্যাটাক” নামে পরিচিত। এটা এক ধরনের গভীর মানসিক ক্ষত। তার অবচেতন মন এটা বিশ্বাস করে নিয়েছে যে, তার খুব কাছের কোনো মানুষ বা তার নিজের বলতে যা কিছু আছে, তা এক মুহূর্তের অসতর্কতায় চিরকালের জন্য হারিয়ে যেতে পারে। আর যখনই তার এই তীব্র ভয়ের জায়গাটাতে আঘাত লাগে যেমন আজ কিয়ারা চোখের আড়াল হয়েছিল। তখনই তার মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো অবশ হয়ে যায়। রক্তচাপ তীব্রভাবে বেড়ে গিয়ে সে নিজের ওপর থেকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই সমস্যাটা হয়েছে ওর মা যখন চলে যায় তখন থেকে।
ইয়াশ তার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ধপ করে ঘাসের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি তখন কেবল কিয়ারার ফ্যাকাশে মুখের ওপর স্থির। আশেপাশে ততক্ষণে আদিল মির্জা, ইনায়া আর স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মস্ত বড় ভিড় জমে গেছে। সবাই হুলস্থুল করছে, ইয়াশকে ডাকছে। কিন্তু ইয়াশের কানে তখন আর কোনো শব্দ পৌঁছাচ্ছে না। তার চোখের চারপাশটা ধীরে ধীরে ঘন অন্ধকারে ঢেকে যেতে লাগল। এরপর কী হয়েছিল, সেই কিশোরের আর কিছুই মনে নেই। সে কিয়ারার ছোট্ট হাতটা নিজের মুঠোর মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরে ওখানেই জ্ঞান হারিয়ে ধপ করে পড়ে গেল।

বর্তমান…
জানলার বাইরে নিউ ইয়র্কের আকাশটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। ইয়াশ ধড়ফড় করে চোখ মেলে তাকাল। আজকেও মাথার ভেতর সেই পুরনো তীব্র ব্যথাটা চাড়া দিয়ে উঠেছে। স্নায়ুগুলো যেন ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। চোখের মণি দুটো রাগে আর উত্তেজনায় লাল হয়ে আছে বিয়ের খবর ইয়াশের ভেতরটা উথাল-পাতাল করে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে এখন সামনে যাকেই পাবে তাকেই জ্যান্ত মেরে ফেলবে। শুধু সে সিটে হেলান দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, “কিয়ারা যদি অন্য কারও হয়, আই সোয়ার আদিল মির্জা আর আবির মির্জাকে এর জন্য মারাত্মক মাশুল দিতে হবে। আপনাদের এতো অহংকার মাটিতে মেশাতে এক সেকেন্ড লাগবে আমার!”
প্লেন ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে সে তার গার্ডকে ফোন করে কড়া গলায় শুধু একটা কথাই বলল, “সব রেডি রাখো, আমি প্লেনে উঠছি।”
এরপর ফোনটা অফ করে সে জানলার বাইরে তাকাল। বিমানটি তখন মেঘের বুক চিরে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে ডান মেলেছে।

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ৯

বাংলাদেশ…
পুরনো সেই মির্জা বাড়িতেও সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু বদলে গেছে। ইনায়ার বয়স এখন আটাশ বছর। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে সে এখন পুরোদমে ওকালতি করছে। সে
জুনিয়র হিসেবে সিনিয়র কোনো ল-ইয়ারের আন্ডারে কিছুদিন প্র্যাকটিস করার পর, সে এখন ঢাকা জজ কোর্টে স্বাধীনভাবে কেস লড়ছে। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর শান্ত স্বভাবের কারণে আইন পাড়ায় ইতিমধ্যেই ইনায়া মির্জা হিসেবে তার একটা আলাদা নাম ডাক তৈরি হয়েছে।
আর উনিল বছর বয়সী কিয়ারা এখন তার জীবনের এক মস্ত বড় চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। সে এখন ভার্সিটি এডমিশন পরীক্ষা দিচ্ছে।

অগ্নিশিখার অন্তরালে পর্ব ১১