Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১২ (২)

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১২ (২)

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১২ (২)
সাজিয়া জাহান সুবহা

“এভাবেই শুধু তাকিয়ে থাকিস তুই। তোর এই নিরবতা একদিন সায়েরীকে তোর নিকট হতে অনেক দূরে সরিয়ে দিবে দেখিস। সেদিনও এমন তাকিয়ে ছাড়া কিচ্ছুটি করার সাধ্য থাকবে না তোর। ”
আয়ানের বলা অতি সামান্য কথাটা শুনেই বুকের ভিতরটা উত্তাল পাতাল শুরু করলো ফায়াজের। সে কি ভুল করছে! তার কি উচিৎ ছিলো বন্ধুত্বের বাইরে তার ছোট্ট প্রেয়সীকে একটু ইঙ্গিত দেওয়ার! আয়ানের কথাটা কি সত্যি হয়ে যাবে? সায়েরী অন্য কারো হয়ে যাবে? ধ্ক করে উঠলো বুকের ভিতরটা। কি নিষ্ঠুর বাক্য। এমনটা হলে বেঁচে থেকেও লাশ হয়ে যাবে ফায়াজ। এবার আর কোনো হেয়ালি নয়।

সায়েরীর মনে তার প্রেমের বীজ বপণ করতেই হবে৷ আজকের দিনটা নাহয় কেটে গিয়েছে। আগামীকাল হতে প্রতিটা মুহুর্ত সায়েরীকে প্রেম ফাঁদে ফেলার জন্য চেষ্টা চালাবে সে। মনে মনে কথাগুলো ভেবেই একদফা হাসলো ফায়াজ। নুহাশের ডাকে হুশ ফিরলো তার। দুজনের গন্তব্য একই রাস্তায় হওয়ায় একসাথে রাস্তায় নামলো তারা। তাদের চেয়ে কিছুটা দূরত্বে রোদের উত্তাপে শরীর পুড়িয়ে রিক্সার অপেক্ষা করছে তোহা। তার দিকে সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকালো আয়ান। মেয়েটা পুরোদমে ইগনোর করে যাচ্ছে তাকে। কিন্তু কারণটা এখনো জানা নেই আয়ানের। তপ্ত শ্বাস ফেলে তোহার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো সে। তার উপস্থিতি বুঝেও চুপ করে রইলো তোহা। নিরবতা ভেঙ্গে আয়ান বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ এখান থেকে রিক্সা পাবি না এসময়। সামনে চল। ‘
তোহা নিশ্চুপ। তার এমন নির্লিপ্ততা দেখে রেগে গেলো আয়ান। বাহু টেনে তোহাকে মুখোমুখি এনে ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল,
‘ সমস্যা কি তোর? এমন ভাব নিচ্ছিস কেনো? ‘
ঝারা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিলো তোহা। খানিক উচ্চ স্বরে চেঁচিয়ে বললো,
‘ আমার ব্যাপারে তোর না জানলেও চলবে। আগেও উদাসীন ছিলি এখনো উদাসীন থাক। প্লিজ এসব এক্সট্রা কেয়ার দেখাতে আসবি না। আমার অসহ্য লাগছে! ‘

উল্টো পথে হাঁটা ধরলো তোহা। আয়ান তখনো বিষ্ময় চোখে তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে। আজ তোহার এমন ভারী ভারী কথাগুলো মস্তিষ্কে ঝড় তুলছে তার। একে একে সকালের সব কথার সমীকরণ মিলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো আয়ান। এবং তার চতুর মস্তিষ্ক মিলিয়েও নিলো খুব দ্রুত। কুঁচকে রাখা কপালের ভাজগুলো সমান্তরাল হয়ে উঠলো। বুকের ভিতরটা হয়ে উঠলো অশান্ত। তোহা তখন আয়ানের দৃষ্টিসীমা হতে মিলিয়ে যাচ্ছে প্রায়। দ্রুত গতিতে ছুট লাগালো আয়ান। কাছাকাছি এসে পেছন থেকেই তোহার বাহু ধরে টান মারলো। হুমড়ি খেয়ে আয়ানের বুকে আছড়ে পড়লো তোহার ভারী শরীর। হঠাৎ আক্রমণে ভয় পেয়ে গেলো তোহা। তার চেয়ে দ্বিগুণ চমকালো আয়ানের উৎকন্ঠা ভরা মুখ দেখে। বড় বড় দুই খানা শ্বাস ফেলে তোহার চমকে উঠা মুখশ্রীর দিয়ে তাকিয়ে আয়ান বলল,

‘ পছন্দ করিস আমাকে? ‘
আকষ্মিক এমন প্রশ্নে হতভম্ব হয়ে গেলো তোহা। চঞ্চল হয়ে উঠলো চোখজুড়া। তার গতিবিধি সব তীক্ষ্ণ চোখে পরখ করলো আয়ান। সহসা নজর এড়িয়ে গেলো তোহা। আশেপাশে নজর বুলিয়ে আয়ানের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
‘ ক..কি সব আবুল তাবুল বকছিস ত..তুই। হাত ছা…. ‘
তোহার কথাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা দুহাতে তোহার দুই বাহু চেপে ধরলো আয়ান। দূরত্ব গুছিয়ে আরেকটু কাছে এগিয়ে আনলো তুহার মুখ। চোখে চোখ রেখে গভীর কন্ঠে জানতে চাইলো,
: কবে থেকে পছন্দ করিস? ‘

ভয়,উত্তেজনা,অস্বস্তিতে কেঁপে উঠলো তোহা। দৃষ্টি মিলাতে পারলো না আয়ানের গভীর চোখজোড়ার সাথে। অপরাধীর ন্যায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো সে। তার এমন মুখশ্রী দেখে বাহু ছেড়ে দূরে সরে গেলো আয়ান। চিন্তিত মুখে আঙুল ঘসলো কপালে৷ এমন কিছু সে কল্পনা করেনি কখনো। মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে তার। খালি রিক্সা চোখে পড়তেই কাছে ডাকলো আয়ান। তোহাকে নির্দেশ দিলো উঠে বসার। আয়ানের জেরার মুখ থেকে বাঁচতে তোহা নিম্ন কন্ঠে জবাব দিলো,

‘ তুই চলে যা। আমি অন্য রিক্সা পেয়ে যাবো। ‘
রাগ জিনিসটা খুব কম আয়ানের। কিন্তু আজ তোহার একে পর এক কান্ডে মস্তিষ্ক বিগড়ে আছে তার। এখন আবার তোহার এমন কথা শুনে দাঁতে দাঁত চেপে রাগ কমানোর বৃথা চেষ্টা করলো আয়ান। ধমকে উঠে বলল,
‘ বসতে বলেছি চুপচাপ বসবি। এতো পাকনামি করতে কেউ বলেছে তোকে? এই সময় একা রাস্তায় তোকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে তন্ময় ভাইয়া কি করবে সেই খেয়াল আছে তোর? ‘

আয়ানের ধমক শুনেই দ্রুত রিক্সায় চড়ে বসলো তোহা। তন্ময় তার আপন বড় ভাই। তাদের বয়সের পার্থক্য প্রায় ১২ বছর। তোহা ছোট থাকতেই বাবা হারিয়েছে। বড় ভাইকে যেমন ভালোবাসে তেমন ভয়ও পায় সে। তাই আয়ানের কথার দ্বিরুক্তি করলো না সে। তোহা ভেবেছিলো এমন ঘটনার পর হয়তো আয়ান তার মুখটাও দেখতে চাইবে না। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে এক লাফে রিক্সায় চেপে বসলো আয়ান। দীর্ঘ বহু বছরের বন্ধুত্বে আজ আয়ানের উপস্থিতি বুকে ঝড় তুলছে তোহার। কিন্তু আয়ান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চোখ বুজে রিক্সার মাথা এলিয়ে দিলো । শহরের ব্যাস্ত রাস্তায় চলতে লাগলো রিক্সা। আশেপাশে এতো কোলাহল। কিন্তু রিক্সায় বসা মানুষ দুজনের মাঝে গ্রাস করেছে জন্মের নিরবতা।

‘ এমন বোকামি কি করে করলি তোহা!! ‘
কোলের উপর রাখা শাড়ির আঁচলে আঙুল পেছিয়ে অস্থিরতা কমানোর বৃথা চেষ্টা চালাচ্ছিলো তোহা। তখনই আয়ানের শীতল কন্ঠের বাণী শুনে চমকে উঠলো সে। বোকামি! তার অনুভূতি আয়ানের কাছে বোকামি মনে হয়! তীব্র অভিমানে গলা ধরে আসলো তোহার। চোখে জমলো বেদনার অশ্রু। যা গড়িয়ে পড়ার আগেই আয়ানের অগোচরে সন্তর্পণে মুছে ফেললো তোহা। এতোক্ষণ পর চোখ খোলে সোজা হয়ে বসলো আয়ান। সরাসরি তোহার দিকে তাকিয়ে শীতল কন্ঠে বলল,

‘ তোর কাছ থেকে এমন কিছু আমি আশা করিনি। আমি তোদেরকে বন্ধু ব্যাতিত অন্য নজরে দেখিইনি কখনো৷ আমার মনে হয়না আমি কখনো তোর সাথে এমন কোনো ব্যাবহার করেছি যার কারণে তুই এমন কিছু মনে পুষে নিবি। আজ যদি তোর জায়গায় সায়ু থাকতো তবে হয়তো আমি নিজেকে অপরাধী ভাবতাম। কারণ বাকি বন্ধুদের চেয়ে আমি বরাবরই সায়ুকে আলাদা যত্ন, আলাদা ভালোবাসা দিয়ে এসেছি। ওর সবকিছুতে আমি আগ বাড়িয়ে সঙ্গ দিয়েছি। সে ছোট বেলা থেকে সায়ুর প্রতিটা পদক্ষেপ প্রতিটা কিছু আমার জানা। আমি কখনো ওকে আমার দৃষ্টিগোচরের বাইরে যেতে দেইনি। কারণটা তোরাও জানিস। সায়ু আমাদের সবার চেয়ে আলাদা। অতিরিক্ত সরল, অতিরিক্ত চঞ্চল। কিন্তু বিকেক বুদ্ধিতে একেবারে জিরো। তাই আমি সর্বদা ওর ডাল হয়ে পাশে থেকেছি। কিন্তু তুই! আমি তোর নিঃস্বার্থ বন্ধু ঠিকই।কিন্তু তোর সাথে আমি কখনো এমন কিছু করিনি যেটার কারণে তুই আমাকে নিয়ে আলাদা করে ভাবতে বাধ্য হবি। তবুও এমন কিছু…..আমি ভাবতে পারছি না তোহা! তুই তো আমার আর প্রভার ব্যাপারেও সবটা জানতি। তারপরেও কেনো!!!

বেশ কিছুক্ষণ নিরবতায় কাটলো। মাথা নত অবস্থায় আয়ানের সব কথা শুনলো তোহা। বহু দিনের শক্ত খোলসে আবৃত অনুভূতির ভান্ডার খুলল আজ৷ নিম্ন, শান্ত কন্ঠে বলল,
— তোর প্রতি আমার অনুভূতি কবে থেকে জমেছে আমার জানা নেই। কিন্তু প্রথম যেদিন তোর চোখে অন্য মেয়ের প্রতি প্রেমানুভূতি দেখেছিলাম। ঠিক সেদিন অনুভব করেছিলাম হিংসা নামক শব্দটার গভীরতা। তোর পাশে প্রভাবে আমি মেনে নিতে পারছিলাম না একদমই। অদ্ভুত রাগে নিজেই নিজের প্রতি বিরক্ত হচ্ছিলাম। একটা সময় যখন বুঝতে পারলাম এই অনুভূতি কিসের তখন তোদের মাঝে মাখোমাখো প্রেম চলছিলো৷ আমি নিজেকে অনেক বুঝিয়েছি বিশ্বাস কর৷ কিন্তু মনের উপর যে কারো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আমারো ছিলো না। আমি পারিনি নিজের অনুভূতিগুলোকে বাধা দিতে। নিজেই নিজের ভিতরে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম।

আমি মেনে নিয়েছিলাম তুই আমার ভগ্যে নেই। কিন্তু যেদিন হুট করে তুই জানালি প্রভার সাথে তোর ব্রেকআপ হয়েছে। সেদিন চেয়েও তোর মুখ দেখে খুশি হতে পারিনি। তোর সময়ের প্রয়োজন ছিল সবটা মেনে নেওয়ার জন্য। আমি বুঝেছিলাম সেটা। সময় দিয়েছিলাম তোকে পুণরায় নিজেকে গড়ে তোলার জন্য। ভেবেছিলাম ভাগ্য হয়তো আমাকে দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু আমি সাহস করে উঠতে পারিনি এতো দ্রুত তোকে কিছু জানানোর। কারণ আমি জানি তুই আমকে নিয়ে কখনো এমন কিছু ভাবিসনি। মাত্র চার মাস হয়েছে তোদের ব্রেকাপ হলো। এর মাঝে আজ হঠাৎ যখন মিনি নামের মেয়েটা আমাকে ঢেকে বললো তুই মেয়েটাকে পছন্দ করে চিঠি পাটিয়েছিস। কথাটা শুনে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারিনি। আমার মনে হচ্ছিলো আমি আবারো তোকে হারিয়ে ফেলেছি। অজান্তেই তোর উপর আমার রাগ চেপে বসেছিলো যে কেনো আমাকে একটা সুযোগ দিলি না। আমি চাইনি তোকে এভাবে.. আজ কথাগুলো বলতে। আমি ভাবতে পারিনি তুই এভাবে বুঝে যাবি। আ..আমি তোর সাথে অন্য কাউকে মেনে নিতে পারবো না আয়ান। খুব ভ..ভালোবাসি তোকে বিশ্বাস কর। আই রিয়েলি লা…

‘ রিক্সা থাকাও মামা!! ‘
তোহার কথা শেষ হওয়ার আগেই আয়ানের এমন আদেশ শুনে চমকে তাকালো তোহা। শেষ কথাগুলো বলতে বলতে গলা কাঁপছিলো তার। কিন্তু আহানের মুখ দেখে মনে হলো সে মহা বিরক্ত এসবে। ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছিলো তোহার। রিক্সা থামার সাথে সাথেই নেমে পড়লো আয়ান। ভাড়া মিটিয়ে তোহার রিক্সাকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হতেই তার কাঁধের দিকের পাঞ্জাবি খামছে ধরলো তোহা। ফিরে তাকালো আয়ান। নজর কাড়লো তোহার হলদে মুখশ্রী। চোখজোড়া চিকচিক করছে তার। যেকোনো সময় বাধ ভেঙ্গে নেমে পড়বে অশ্রুকণা। গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠা কান্নাগুলো গিলে ফেললো তোহা। আকুলতা ভরা কন্ঠে বললো,
‘ আমি কি তোর এতোই অযোগ্য,আয়ান! ‘
অজানা কারণে তোহার এই কন্ঠ শুনে বুক কেঁপে উঠলো আয়ানের। তোহার ওই টলমল চোখজোড়ার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকার সাহস পেলো না সে। তোহার হাত ছাড়িয়ে দ্রুত পথে মিলিয়ে গেলো জনবহুল রাস্তার ভীড়ে। আয়ানের গমন পথের দিকে তাকিয়ে দুহাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে দিলো তোহা। আয়ানের এই নিরবতা যেনো জবাব ছিলো, যে তাদের গন্তব্য কখনো এক হবে না!!

অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে শ্বশুর বাড়িতে প্রবেশ করে শুরুতে বেশ ভয় পেয়েছিলো নাজরাত। কিন্তু এখন সে ভয়ের যায়গায় দ্বিগুণ ভলোলাগা বইছে। ঘরের প্রতিটা সদস্য ভীষণ অমায়িক। ছোট্ট নাহিয়ানকে শুরুতে উত্তেজনা বশত কাছে টেনে নেয়নি বলে ছেলেটা ভয় পেয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে নাজরাত যখন নিজ থেকে তার সাথে ভাব জমালো তখন সে নাজরাতকে ছাড়তেই রাজি হচ্ছিলো না। বউমনি, বউমনি করে মুখে যেনো কই ফুটছে তার। স্বল্প সময়ের মধ্যেই ছেলেটার সাথে বেশ ভাব হয়ে গিয়েছে নাজরাতের। কিন্তু এই অতিরিক্ত ভাব খানা এখন দুঃখ নামিয়ে এনেছে। নাজরাতের বাড়ি ফিরার সময় হয়ে এসেছে। তার বাবার কড়া আদেশ ছিলো। মেয়ে যেনো দুপুর সাড়ে তিনটার মধ্যেই ঘরে ফিরে আসে। কিন্তু নাহিয়ান তার বউমনি কে ছাড়তে নারাজ। দুহাতে এমনভাবে গলা জড়িয়ে ধরে আছে যে কেউ ছাড়াতে পারছে না।

নাহিয়ানের কান্নাকাটি দেখে সাদিফের দিকে করুণ চোখে তাকালো নাজরাত। উপায় না পেয়ে সাহিল এসে বাইকে ঘোরাবে বলে লোভ দেখিয়ে বাইরে নিয়ে গেলো তাকে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো সকলে। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে চড়লো সাদিফ এবং নাজরাত। সারা রাস্তা কোনো কথা বললো না কেউ। নাজরাতের ঘরের সামনে আসতেই নড়েচড়ে বসলো নাজরাত। রাস্তাটা যেনো আজ খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেছে এমন মনে হচ্ছে তার। আর এদিকে তার বর। যে কিনা মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। রাগ লাগলো নাজরাতের। পার্স নিয়ে শাড়ি ঠিক করে গাড়ির দরজার দিকে ঘুরতেই দুটো হাত এসে তার কোমর ছুঁয়ে কাছে টেনে নিলো তাকে। চমকে উঠলো নাজরাত। যেই একটু গাড়ির দরজা ফাঁক করেছিলো তা পুণরায় সাদিফ হাত টেনে বন্ধ করে দিলো। পরপরই নাজরাত অনুভব করলো তার কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে ঘাড়ে মুখ ডুবিয়েছে সাদিফ। কেঁপে উঠলো নাজরাত। খামছে ধরলো কোমরে থাকা সাদিফের হাত। এক লম্বা শ্বাস টেনে নাজরাতের কাঁধে মুখ ডুবিয়ে সাদিফ বললো,

‘ নাহিয়ান আরেকটু জেদ করে তোমাকে আজ রেখে দিতে পারলো না! (খানিক থেমে) আমার একটুও ইচ্ছে করছে না তোমকে যেতে দিতে! ‘
কথার ফাঁকে ফাঁকে সাদিফের উষ্ণ ঠোঁট যতবার নাজরাতের কাঁধ ছুঁয়ে দিচ্ছিল ততবারই কেঁপে কেঁপে উঠছিলো নাজরাতের দেহ৷ নিজের অনুভূতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সে। নিশ্বাস ভারী হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে। বহু কষ্টে মুখ খুলে সে বলল,
‘ স..সাদিফ। কেউ এসে প..রবে। ছ..ছাড়ুন। ‘
লম্বা শ্বাস টেনে নাজরাতকে ছেড়ে সোজা হয়ে বসলো সাদিফ। স্বস্তির শ্বাস ফেললো নাজরাতও। তার কাঁধে লাল হয়ে উঠা স্থানটাকে আঁচল দিয়ে ঢেকে দিলো সাদিফ। এলোমেলো চুল ঠিক করে দিতে দিতে বললো,
‘ সরি। কন্ট্রোল হচ্ছিলো না। চুলগুলো সামনে রাখো। রাতে ফোন দিবো, এখন ঘরে যাও। ‘
সাদিফের বলতে দেরি। কিন্তু নাজরাতের বেরুতে দেরি নেই। অস্থিরতার বসে সাদিফকে বিদায় জানাতেও ভুলে গেলো সে। তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে গাড়ি ঘোরালো সাদিফ।

পিনপিন নিরবতায় এগিয়ে চলছে গাড়ি। ব্যাক সিটে অসুস্থ শরীর নিয়ে চোখ বুজে পড়ে আছে মিহাদ। গম্ভীর মুখে স্টিয়ারিং ঘুরাচ্ছে সাফওয়ান। অন্যদিকে কাঁচ উঠানো জানলার বাইরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সায়েরী। ভেতরটা বিরক্তিকর এক অনুভূতি-তে তেঁতু হয়ে উঠেছে তার। কতো সুন্দর হাসিমুখে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে দিয়ে বাড়ি ফিরতে পারতো সে। তা না, এই গোমড়ামুখো রাক্ষসটার সাথে নিরবতা পালন করতে হচ্ছে তাকে। গাল ফুলিয়ে জানালার কাঁচ নামিয়ে দিলো সে। মাথা এলিয়ে দিলো সিটের সাথে। যেই একটু স্বস্তিতে শ্বাস ফেলবে অমনি পাশে বসা সাফওয়ান মুখ কুঁচকে গম্ভীর কন্ঠে বললো,

‘ এই ধুলাবালির মধ্যে কাঁচ নামিয়ে দিয়েছো কেনো! দেখছো না মিহাদ অসুস্থ? কাঁচ উঠাও। ‘
কালো মেঘ জমা মনটা আরো আমাবস্যায় ছেয়ে গেলো সায়েরীর। সবসময় এমন ধমকা-ধমকি মেনে নিতে পারেনা সে। একমাত্র এই ব্যাক্তিটা ছাড়া কেউ তার সাথে এমন ব্যাবহার করেনা। সবার আদরের দুলালি হয়ে বেড়ে উঠেছে কিনা। সেখানে আজ একাধিকবার সাফওয়ানের গম্ভীর বাণীর সম্মুখীন হয়ে মুখখানা চুপসে গেলো তার। সায়েরীর মনের অবস্থাটা অজান্তেই যেনো বুঝে ফেললো মিহাদ। ক্ষীণ সুরে বললো,
‘ মেয়েটার সাথে সবসময় এমনভাবে কথা বলিস কেনো সাফওয়ান! কাঁচই তো নামিয়েছে মাত্র৷ এতে এমন করার কি আছে! ‘

জবাব দিলো না সাফওয়ান। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখনো সামনের ব্যাস্ত রাস্তায়। কিন্তু মিহাদের সামান্য বকাঝকা শুনেই ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো সায়েরীর। তবে সাফওয়ানের প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় যথাযথ শান্তি মিললো না। পুণরায় জানালার বাইরে চোখ রাখলো সে। সাফওয়ান শুনে মতো নিচু কন্ঠে আওড়ালো,
‘ রামগরুড়ের ছানা, হাসতে যাদের মানা। ‘
এতোক্ষণের মনযোগে ব্যাঘাত ঘটলো সাফওয়ানের। কপালে ভাঁজ ফেলে তাকালো সায়েরীর দিকে। অবাক কন্ঠে বললো,
‘ এই মেয়ে! তুমি আমাকে রামগরুড় বলেছো! ‘
ঠোঁট চেপে হাসি আটকালো সায়েরী৷ অবশেষে পেরেছে গোমড়ামুখোকে ক্ষ্যাপাতে। রাস্তার দিকে দৃষ্টি রেখেই সে জবাব দিলো,

‘ আমি রামগরুড়ের ছানার কথার বলেছি। তাদের নাকি হাসতে মানা। ছানাদের যদি হাসতে মানা হয়, তবে রামগরুড়ের নিশ্চয় কথা বলতেও মানা। সেই দিক থেকে ধরতে গেলে আপনি……… ‘
কথাটা পুরোপুরি শেষ করলো না সায়েরী। কিংবা বলা যায় শেষ করার সাহস পেলো না। কিন্তু তার অসমাপ্ত কথাটায় যথেষ্ট ছিলো সাফওয়ানের চোয়াল শক্ত করে তুলতে৷ সায়েরীর কথার রেশ ধরে এই পর্যায়ে হাসতে হাসতে মিহাদ বললো,
‘ একদম ঠিক বলেছো সুন্দরী৷ এই ছেলে রামগরুড়-ই বটে। বোম ফাটলেও তার মুখ ফাটে না। ‘
ফিক করে হেসে দিলো সায়েরী। তার দিকে রাগী চোখে তাকালো সাফওয়ান। ধমকে উঠে বললো,
‘ তোমার মতো সারাক্ষণ খলখল করা রেকর্ডার ভেবেছো নাকি আমাকে? কান্ড জ্ঞান ছাড়া যেখানে সেখানে লাফালাফি তোমার মতো মাথামোটা মেয়েই করতে পারে। (বিড়বিড় করে) ইডিয়ট! ‘

ফুঁসে উঠলো সায়েরী। সাফওয়ানের কথার তীব্র প্রতিবাদ করে বলে উঠলো,
‘ আমি মোটেও যেখানে সেখানে লাফালাফি করি না। সবসময় আমার সাথে এভাবে কথা বলবেন না। ‘
‘ আওয়াজ নামিয়ে কথা বলো। বাড়াবাড়ি করলে এক্ষুনি নামিয়ে দিবো। মেজাজ খারাপ করবে না আমার। ‘
‘ আপনার মেজাজ ভালো থাকেইবা কখন? আমার তো মনে হয় আপনার জন্মের পর ডক্টর আপনার বাবাকে গিয়ে বলেছিলো ” অভিনন্দন! আপনাদের মেজাজ খারাপ হয়েছে….’

হু হা করে হেসে উঠলো মিহাদ। সায়েরীর কথায় আকষ্মিক গাড়ির ব্রেক কষলো সাফওয়ান। অপ্রস্তুত অবস্থায় সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লো সায়েরী। মাথায় ব্যাথা পেতে পেতে বেঁচে গেলো। কিন্তু বাঁচতে পারলো না সাফওয়ান নামক পুরুষটার অগ্নিররূপ থেকে। সাফওয়ানের বাদামি চোখজোড়া রাগী ভাবে তাকিয়ে আছে সায়েরীর দিকে। সেই অগ্নি চোখ দেখেই বুক কেঁপে উঠলো সায়েরীর৷ অবচেতন মস্তিষ্কে বলা এতোক্ষণের সব কথা স্মরণে আসতেই নিজেরই নিজের গালে চড় মারতে ইচ্ছে হলো৷ কেনো ভুলে গেলো কার পাশে বসে কথা বলছে সে! হলো তো এবার!

‘ গেট আউট! ‘
অতি শীতল তবে ধারালো কন্ঠে বলা কথাটা শুনেই চমকে উঠে আশেপাশে তাকালো সায়েরী। এভাবে মাঝ রাস্তায় নামিয়ে যেতে হবে! ফাঁকা ঢোক গিলে কিছু বলতে যাবে তখনই তার পক্ষ হয়ে মিহাদ বলে উঠলো,
‘ বাজে বকিস না তো সাফওয়ান। এভাবে মাঝ রাস্তা থেকে কিভাবে যা… ‘
‘ আই সেইড গেট আউট অফ মাই কার! রাইট নাও। ‘

মিহাদের কথা শেষ হওয়ার আগেই সায়েরীর দিকে তাকিয়ে উক্ত বাণী ছাড়লো সাফওয়ান। তার গম্ভীর কন্ঠটা শুনেই দিকবিদিকশুন্য হয়ে দ্রুত গাড়ি থেমে গেলো সায়েরী। মিহাদ অবশ্য ডেকেছিলো। কিন্তু সেদিকে পাত্তা না দিয়ে শা শা গতিতে গাড়ি এগিয়ে নিয়ে গেলো সাফওয়ান। যেতে যেতে মিহাদকেও হুমকি দিলো বাড়াবাড়ি করলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবে। অগত্যা চুপ করে গাড়িতে শুয়ে থাকা কিছু করার ব্যার্থ চেষ্টা করলো না সে।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১২

ভর দুপুর। সময় হয়তো সাড়ে তিনটা পেরিয়েছে। তিন রাস্তার মাঝে অবহেলায় বেড়ে উঠা বিশাল কাঠগোলাপ গাছটার ছায়াতলে বিরস মুখে দাঁড়িয়ে সায়েরী। নিজের কান্ডে একবার নিজের উপর রাগ লাগছে। আবার সাফওয়ানের উপর ক্ষোভ জন্মাচ্ছে। এই মাঝ রাস্তায় একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে রাগে, দুঃখে কান্না পেয়ে গেলো তার। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো একদিন সাফওয়ান ভাই নামক দৈত্য দানবটাকে তীব্র অনুশোচনায় ভোগাবে। জীবনেও ক্ষমা করবে না। কঠিন শাস্তি দিবে। নিজে নিজেই বিড়বিড় করলো সে,
“অপেক্ষা করো সাফওয়ান ভাই। তোমাকে যদি একদিন চরকির মতো না ঘুরিয়েছি, তবে আমিও “সায়েরী সুবহা” না”!!

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৩