Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৩

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৩

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৩
সাজিয়া জাহান সুবহা

বেলা সাড়ে দশটা। বহু বছর পুরনো সেই কাঠগোলাপ গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে সায়েরী। শূন্য চোখে একবার তাকালো আশেপাশে। বছর কয়েকের ব্যাবধানে পরিবর্তন এসেছে আশেপাশে। ঠিক যেমন পরিবর্তন স্পষ্ট লক্ষ্যনীয় সায়েরী নামক মানবীর সর্বাঙ্গে। মাঝে কেটে গিয়েছে তিন বসন্ত। কিছু সম্পর্কে ফাটল ধরেছে, কিছু হয়েছে খাটিঁ। আবার কেউ কেউ হারিয়ে গিয়েছে চেনা জানা স্থান থেকে। রেখে গিয়েছে তাদের বিরহে প্রতিনিয়ত ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকা আপনজনগুলোকে। এই সেই তিন বছর আগের কাটগোলাপ গাছ তলা। কিন্তু সেখানে আজ কোনো চঞ্চল কিশোরী রণমুর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে নেই। আছে এক বিশ বছরের যুবতী।

একদা যার ছোট্ট দেহশ্রী জুড়ে জিন্স, লং টপ অথবা স্কার্ট জড়িয়ে থাকতো, আজ তার গায়ে গোলাপি রঙের চুড়িদার। পূর্বের ন্যায় গোল করে গলায় পেছিয়ে রাখেনি ফিনফিনে উড়নাটা। বরং আজ বড় যত্নের সঙ্গে আলতো করে মাথায় দিয়েছে। কপালের দুপাশে উড়ে এসেছে ছোট ছোট বেবি হেয়ার। ঢেউ খেলানো লম্বা চুলগুলো আজ খোপায় আটকানো। সময়ের বিবর্তনে তার শারিরীক গঠনেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ রঙটা আরো খানিকটা উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। কিন্তু চোখে মুখে নেই সেই আগের মতো উজ্জ্বলতা। খুবই হালকা রাঙা গোলাপি ঠোঁটজোড়া ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। যেনো হাসি নামক শব্দটা জীবন থেকে মিলিয়ে গিয়েছে বহু বছর পূর্বে। সকালের মিষ্টি রোদ গায়ে পড়তেই বিষন্ন চোখে একটা বার কাটগোলাপ গাছটার দিকে তাকালো সায়েরী। পাতা ছাড়া কিছুই চোখে পড়লো না। আপনমনে সে গাছটার কাছে প্রশ্ন করে বসলো, “তুমিও কি আমার মতো প্রিয়জনের অপেক্ষায় ফুলের ছোঁয়া নিচ্ছো না?”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

নির্জীব বস্তুর পক্ষ হতে উত্তর মিললো না কোনো। সায়েরী আশাও করলো না উত্তরের। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পা বাড়ালো নির্দিষ্ট গন্তব্যে। এই রোডের কিছুটা কাছাকাছি একটা বাসায় দেড় বছর ধরে টিউশন করছে সে। টিউশনের সময়কাল অবশ্য বিকেলে। কিন্তু আজ হুট করেই তাকে সকাল বেলা ডাকিয়েছে স্টুডেন্ট এর মা। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাতেই শান্ত’র দেখা মিললো। শান্ত হলো সায়েরীর স্টুডেন্ট। বর্তমানে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে সে। ভীষণ দুষ্টু এবং মেধাবী ছেলে সে। প্রতিদিনের তুলনায় আজ অনেক বেশি খুশি দেখাচ্ছে বাচ্চাটাকে। সায়েরীর দেখা মিলতেই দৌড়ে আসলো সে। সালাম দিয়ে ভদ্রতার সহিত ড্রইংরুমের সোফায় বসতে দিলো সায়েরীকে। এতে কিঞ্চিৎ ভাঁজ পড়লো সায়েরীর কপালে। রোজ তো শান্ত’র স্টাডি রুমেই পড়ায়। আজ হলো কি! তার ভাবনার মধ্যেই হাতে খাবারের ট্রে সমেত উপস্থিত হলেন শান্ত’র মা। তাকে দেখেই দাঁড়িয়ে পড়লো সায়েরী। সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করার পর, তিনি জানালেন কিছুদিনের জন্য ফ্যামিলি ট্যুরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন শান্ত’র বাবা। এজন্য ছুটির বিষয়ে আলাপ করতে সায়েরীকে তলব করেছে। সায়েরীও সম্মতি দিয়ে দিলো সপ্তাহ খানিক এর জন্য। মিষ্টি হেসে জানতে চাইলো,

‘ কোথায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন? ‘
‘ বান্দরবান। আগে যখন গিয়েছিলাম তখন শান্ত ছোট ছিলো। ছুটাছুটিতে হারিয়ে গিয়েছিলো। সেকি ভয় পেয়েছিলাম আমরা। শান্ত’র এসব মনেই নেই। বান্দরবান দেখবে বলে বায়না করছে৷ ওর কথাতেই বান্দরবান যাওয়ার পরিকল্পনা করছি। ‘

আকষ্মিক চেহারার রঙ বদলে গেলো সায়েরীর। কানে বাজতে লাগলো শান্ত’র মায়ের বলা একটি কথা “বান্দরবানে হারিয়ে গিয়েছিলো”। কথাটা শুনেই বুকের মধ্যে উত্তাল পাতাল ঝড় শুরু হলো তার। চোখে ভেসে উঠলো কিছু আপসা ঝাপসা জঘন্যতম স্মৃতি। নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে চেয়েও ব্যর্থ হলো রমনী। অল্পতেই ঘাড়বে যাওয়ার নতুন ব্যধি যে বেঁধেছে বছর তিনেক ধরে। তাইতো, নিশ্বাস আটকে আসতে লাগলো হুট করেই। চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। অবাক হলেন ভদ্রমহিলা এতে। লক্ষ্য করলেন সায়েরীর অস্বাভাবিক আচরণ। চিন্তিত কন্ঠে বললেন,
‘ তুমি ঠিক আছো তো, সায়েরী? এমন লাগছে কেনো? ‘
বহু কষ্টে নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলো দমিয়ে রাখলো সায়েরী। তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ কাধে নিয়ে বলল,
‘ আ-আমি ঠ-ঠিক আছি আন্টি। আপনারা ফিরলে আমাকে জানিয়ে দিয়েন। আসছি। ‘
দ্রুত মুখে সালাম দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেলো সে। আশ্চর্য ভঙ্গিমায় সেদিকে তাকিয়ে রইলেন ভদ্রমহিলা। মনে মনে ভাবতে লাগলেন সায়েরীর হঠাৎ পরিবর্তনের কারণ।

দ্রুত পায়ে গেইটের বাইরে এসে বড় বড় দম নিলো সায়েরী। শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে বুঝতে পেরেই চঞ্চল হাতে ব্যাগ ঘেটে ইনহেলার বের করে মুখে দিলো সে। পরপর কয়েকবার নেওয়ার পর স্বাভাবিক অনুভব করলো৷ ইতিমধ্যে শরীর ঘেমে উঠেছে তার। উড়নার একাংশ দিয়ে ঘাম মুছছে এমন সময় ফোন বেজে উঠলো। রিসিভ করে কানে ফোন কানে নিতেই উপাশ থেকে শুনা গেলো আয়ানের কন্ঠ,
‘ সায়ু! টিউশনে তুই? ‘
‘ নাহ, বেরিয়ে পড়েছি। ‘
সায়েরীর ক্লান্ত কন্ঠ শুনে কপালে ভাঁজ পড়লো আয়ানের। উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললো,

‘ তোর গলা এমন শোনাচ্ছে কেনো? শরীর খারাপ লাগছে? আমি কাছাকাছি আছি। আসবো? ‘
সায়েরী ছোট্ট করে জবাব দিলো, ‘ আয়। ‘
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই উপস্থিত হলো আয়ান। দেখতে পেলো দোতলা বাড়িটার গেইটের বাইরে ফুটপাতে বসে আছে সায়েরী। দ্রুত পায়ে রিক্সা থেকে নেমে আসলো আয়ান। সায়েরীর ক্লান্ত মুখ, হাতে ইনহেলার দেখে তার চিন্তা বাড়লো। নির্দ্বিধায় হাতের উল্টো পিঠ ছোঁয়ালো মেয়েটার কপালে। তাপমাত্রা স্বাভাবিক অনুভব করে স্বস্তি পেলো খানিকটা। উড়না ঠিক করে রিক্সায় উঠে বসলো সায়েরী। আয়ানের উদ্দেশ্যে বললো,

‘ আমি ঠিক আছি। উঠে আয়, বাকিরা অপেক্ষা করছে হয়তো। ‘
আয়ান উঠে বসতেই রিক্সা এগিয়ে চললো। সায়েরীর ক্লান্ত মুখশ্রীটা আরেকবার দেখে নিয়ে আয়ান বললো,
‘ শরীর খারাপ নিয়ে ক্যাম্পাসে যাওয়ার কি দরকার?বাড়ি ফিরে রেস্ট কর। ‘
‘ উঁহু! তোদের সাথে থাকি কিছুক্ষণ। বাসায় গেলে দম বন্ধ লাগে। ‘
বড্ড বিষন্ন শুনালো মেয়েটার কন্ঠ৷ আয়ান বুঝলো তার মনের অবস্থা। আরেক পলক থাকালো সেই মুখখানার দিকে৷ সর্বদা ঘুমকাতুরে উপাধি পাওয়া মেয়েটার চোখের নিচে কালচে ভাব দেখে বুকের ভিতরটা চিনচিন করে উঠলো তার। আগে পাশাপাশি বসলে মুখ দিয়ে খই ফুটতো সায়েরীর। কিন্তু এখন প্রশ্ন করে উত্তর পাওয়ার আশাও রাখা যায় না। বুক ছিড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হলো আয়ানের। সায়েরীকে স্বাভাবিক করতে জিজ্ঞেস করলো,

‘ আজ হঠাৎ তোকে এই সময় ডেকে পাঠালো কেনো? ‘
‘ উনারা ট্রিপে যাচ্ছে৷ ছুটি নিতে ডেকেছিলো৷ ‘
‘ ওহ! কোথায় যাচ্ছে? ‘
দুই সেকেন্ডের নিরবতার পর সায়েরী নিম্ন কন্ঠে জবাব দিল, ‘ বান্দরবান। ‘
সহসা ফিরে তাকালো আয়ান। লক্ষ্য করলো সায়েরীর বিষন্ন দুই চোখ৷ বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না সে৷ সায়েরীও কথা বাড়ালো না। চোখ বুজে বিনা সংকোচে মাথা রাখলো আয়ানের কাঁধে। খানিক বাদে ফোন বেজে উঠলো আয়ানের। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো তোহার হাসিমুখ। রিসিভ করে ফোন কানে দেওয়ার সাথে সাথে উপাশ থেকে তোহা ব্যস্ত কন্ঠ বলে উঠলো,

‘ হ্যালো, আয়ান! তুই কি ক্যাম্পাসে আসছিস? ‘
‘ হুহ। ‘
‘ সায়ু কি তোর সাথে আছে? ‘
‘ হ্যাঁ। কেনো কোনো সমস্যা হয়েছে? ‘
ফাঁকা ঢোক গিললো তোহা। আমতা আমতা করে বললো,
‘ ফ-ফায়াজ। ফায়াজকে দেখলাম গেইটের অপজিটে৷ হঠাৎ এখানে আসার কারণ বুঝতে পারছি না। রাজু বললো, সে আমাদের খোঁজ নি.. ‘
বাকি কথা না চট করে শুনেই লাইন কেটে দিলো আয়ান৷ তোহা দীর্ঘশ্বাস ফেলল এতে। না দেখেও বুঝতে পারলো সদা শান্ত, ভদ্র থাকা ছেলেটা এই মুহূর্তে রেগে বোম হয়ে উঠেছে। হঠাৎ মেসেজ টুন বেজে উঠতেই মোবাইলে চোখ দিলো তোহা। দেখলো আয়ানের আইডি থেকে আসা টেক্স। যেখানে গোটা গোটা অক্ষরে লিখা,

” পেছন গেইট দিয়ে এসে সায়ুকে ভিতরে নিয়ে যা৷ ওই বেইমানের ছায়াও যেনো সায়ুর উপর না পরে৷ এতগুলো বছর পর কি নাটক জুড়াতে এসেছে?
আর তোকে আমি লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি , ওর সাথে কোনো রকম যোগাযোগ করতে দেখলে আমি ভুলে যাবো তুই আমার বন্ধু হোস।”
মেসেজটা দেখে গলা শুকিয়ে আসলো তোহার। মনে হলো যেনো কানের কাছে চিল্লিয়ে গেছে আয়ান। শান্ত মানুষদের রাগ যে ভয়ংকর হয় সেটা প্রথমত আয়ানকে দেখেই বুঝেছে সে।

কথামতো পেছন গেইট দিয়েই এসেছে আয়ান,সয়েরী। তারা দুজন এসে পৌঁছাতেই দ্রুত পায়ে সায়েরীর কাছে এগোলো সাফ্রিন এবং তোহা। তাদের প্রাণোচ্ছল বান্ধবীকে দিনের দিন এমন বিষন্ন মুখে দেখতে দেখতে মনটা বিষিয়ে উঠেছে তাদের। আজও ব্যাতিক্রম হলো না। বরং প্রতিদিনের তুলনায় আজ সায়েরীর ক্লান্ত মুখখানা আরো উদ্বিগ্ন করে তুললো তোহা ও সাফ্রিনকে। তিনজনকে ভেতরে ঢুকতে বলে মেইন গেইটের দিকে পা বাড়ালো আয়ান। তার মতিগতি ঠিক মনে হলো না তোহার। সায়েরীর অগোচরে হাত টেনে আটকে ফেললো আয়ানকে। ইশারায় বুঝালো যাতে কোনো ঝামেলা না পাকায়৷ গম্ভীর হলো আয়ান। চাপা স্বরে বললো,
‘ হাত ছাড়, তোহা। আমি জানতে চাই ও আবার কোন অঘটন ঘটানোর ধান্ধা নিয়ে এখানে এসেছে। সায়ু এখন একা বলে আবার নিজের মতলব খুঁজতে এসেছে নিশ্চয়ই? মেয়েটা এমনিতেই জিন্দা লাশ হয়ে আছে এক ঘটনার জন্য। আগের বারের মতো কোনো ভুল আমি রিপিট করতে চাচ্ছি না। ফায়াজের ছায়া-ও আমি পড়তে দিব না সায়ুর উপর।

আয়ানের কথা ভুল নয়। তোহা বুঝল, পরিস্থিতি ঠিক নেই। ফায়াজ এতগুলো বছর যেমন দূরত্ব বজায় রেখেছে, সামনেও তা অব্যাহত রাখা মঙ্গলজনক হবে সকলের জন্য। বিশেষ করে সায়েরীর জন্য। মেয়েটা মানসিক ভাবে ভীষণ ভেঙ্গে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ফায়াজের আগমনে সে আরও বেশি ডিস্টার্ব হয়ে উঠতে পারে। সবটা ভেবে আয়ানের মতো চাপা কন্ঠে তোহা বলে উঠলো,
‘ আজ কিছু করিস না প্লিজ। দেখ সায়ুর শরীরটা এমনিতেই খারাপ। তুই যদি আবার এর মধ্যে রাগের মাথায় কিছু করে বসিস, সেটা সায়ু জানতে পারলে ওর উপর কেমন প্রভাব পড়বে, ভাব। এমনিতেই চাচ্ছি মেয়েটাকে একটু স্বাভাবিক করতে। হাসিখুশি রাখতে। আগের সব তিক্ত স্মৃতি থেকে দূরে রাখতে৷ জানিস না সেই কথাগুলো মনে পড়লে ও কেমন হয়ে যায়? তাই বলছি, আজকে বাদ দে। প্লিজ! ‘
তোহার কথায় সায়েরীর দিকে একপলক তাকিয়ে দমে গেলো আয়ান। সবাই এগিয়ে গেলো ক্লাসরুমের দিকে। কাছাকাছি আসতেই দেখলো, দাঁতমুখ খিঁচে রাগে গজগজ করতে করতে এগিয়ে আসছে নুহাশ। তাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লো বাকিরা৷ তাদের চারজনের দিকে তাকিয়ে বিশ্রী গালি ছুড়লো নুহাশ। তোহা এবং সাফ্রিনের উদ্দেশ্যে রাগি সুরে বললো,

‘ বজ্জাত মহিলা! তোরা আমাকে রেখে ভেগে এসেছিস কেন? যাওয়ার আগে বলে যাবি না বা*ল! তোদের পিছো নিতে গিয়ে ধরা খাইছি হারামি। ওই টাকলা প্রফেসর সবার সামনে অপমান করে ক্লাস থেকে বের করে দিছে। কি সুন্দর ক্রাশরে পটানোর ফন্দি করতেছিলাম। সব ভেসে গেলো। ক্রাশের সামনে ইমেজ ফালা ফাল হয়ে গেলো আমার। ব্যাডা খচ্চর! এবার ওই টাকলার মেয়ে নিয়ে যদি না ভাগছি তবে আমার নামও নুহাশ সিকদার না, হুহ! ‘
নুহাশের কথা শুনে উচ্চস্বরে হেসে ফেললো তোহা, সাফ্রিন এবং আয়ান। সায়েরীর মুখে হাসির ছিটেফোঁটাও নেই। কপালে চিন্তার ভাজ পড়েছে তার। সকালে আজও না খেয়ে বেরিয়েছে৷ এবার আর শক্তি পাচ্ছে না দাঁড়িয়ে থাকার৷ ক্লান্ত গলায় সে বললো,

‘ ক্লাসে না ঢুকলে ক্যানটিনে চল। আমি একটু বসবো। ‘
সায়েরীর এক কথাতেই রাজি হয়ে গেলো সবাই। পা বাড়ালো ক্যান্টিনের উদ্দেশ্যে। বর্তমানে পরিস্থিতিটা এমন যে সায়েরীর এক কথায় তার বন্ধুমহল চাঁদ হাসিল করতেও রাজি। এতে যদি তাদের আগের সেই হাসি মুখি সায়েরী ফিরে আসে!
তোহা,আয়ান এবং সাফ্রিন এগিয়ে। পেছনে সায়েরী এবং নুহাশ। ডান হাতে নিজের ঝাকড়া চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে সায়েরীর মাথায় ঠোকা মারলো নুহাশ। মুখ কুঁচকে তাকালো সায়েরী। তার তাকানো দেখেই বিরক্ত মুখে নুহাশ বললো,

‘ মুখটাকে সবসময় এমন বানিয়ে রাখিস কেন? হাসলে কি কেউ ট্যাক্স নিবে বলছে নাকি? হুহ?’
প্রতিউত্তর করলো না সায়েরী। নুহাশের অবশ্য জানা ছিলো যে কোনো উত্তর আসবে না সায়েরীর তরফ থেকে৷ বিগত তিনবছরে সায়েরীর এরূপ দেখে অভ্যস্ত তারা। কিন্তু তবুও আজ অবধি আশা ছাড়লো না কেউ। প্রতিনিয়ত তারা চেষ্টা করে সায়েরীর সাথে স্বাভাবিক ব্যবহার করতে। সেই আগের মতো করেই মিশে৷ যেনো কোনো তিক্ততা নেই জীবনে। সবটাই স্বাভাবিক। অথচ কিছুই নেই সেই আগের মতো। প্রথমত নেই তাদের সাতজনের সেই গ্যাঞ্জাম পার্টি। একজনকে ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে তারা৷ কষ্ট তাদেরও হয়। শত হোক, সেই ছোট্ট বেলা থেকে ফায়াজ নামক বন্ধুটার সাথে বেড়ে উঠা তাদের। রক্তের সম্পর্ক না হলেও ভাইয়ের মতো ছিলো আয়ান, ফায়াজ এবং নুহাশ। বন্ধুত্বের গভীরতা এতো বেশি ছিলো বলেই হয়তো বিশ্বাসঘাতকতা-টা এতো গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। যেটা আজও তাজা রয়ে গিয়েছে। তবুও ফায়াজের করুণ মুখটা দেখলে বুকের ভিতরটা হাহাকার করে উঠে তাদের৷ মনে হয়,

” ইশশ!! যদি ওই দুর্ঘটনা-টা না ঘটতো!!” কিন্তু সায়েরীর মুখখানার দিকে তাকিয়ে বাকি পাঁচজন সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করে নিয়েছে। এখন শুধু সায়েরীর ভালো থাকাটাই মোক্ষম উদ্দেশ্য৷
ক্যান্টিনে কর্মরত মাঝবয়সী ব্যাক্তিটার নাম সুলল। সকলে তাকে সুলল মামা বলেই ডাকে। আগে তিনি একাই সামলাতেন সব। কিন্তু চারবছর যাবত ছোট একটা এতিম ছেলে যোগ দিয়েছে। অবশ্য তাকে নিয়োগ দিয়েছিলো উপর মহল হতে একজন গণ্যমান্য ব্যাক্তি। ছেলেটাকে সবাই “রাজু” বলে একনামে চিনে। ক্যান্টিনে গিয়ে উপস্থিত হওয়ার পরপরই সায়েরীকে দেখে ছুটে আসলো রাজু৷ বাকিদের দিকে তাকিয়ে ক্যাবলা মার্কা হাসি দিলো। বর্তমানে তার বয়স পনেরো। যখন থেকে কাজ শুরু করেছে তখন বয়স ছিলো মাত্র বারো। চেয়ারে বসা পাঁচ মানব-মানবীর দিকে তাকিয়ে রাজু মুখস্থ বাণী’র মতো করে বলল,

‘ গরম সিঙ্গারা আর চা বাদে আর কিছু লাগবে, ভাই? ‘
মাথা নেড়ে না বললো আয়ান। কিন্তু রাজু’র সব মনযোগ সায়েরীকে ঘিরে। যে আসার পর থেকেই টেবিলে মাথা নেড়ে চোখ বুজে আছে। ভেতরে ভেতরে খুব আফসোস হলো রাজু’র। আয়ানের দিকে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বললো,
‘ আপা কি আজকেও চিপস খাইবো না? আমি মামারে বইলা নতুন চিপস আনাইছি। একবার আপার কাছে জিজ্ঞেস করে দেখো না!! ‘
রাজু’র কন্ঠটা কর্ণগোচর হতেই বুকের ভিতরটা চিনচিন করে উঠলো চার বন্ধু-বান্ধবীর৷ একে অপরের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করে তারা তাকালো সায়েরীর দিকে। সেই আগের ভঙ্গিতেই চোখ বুজে রয়েছে মেয়েটা। রাজুসহ বাকি চারজনের বুক ছিড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হয়। রাজুর কাঁধ চাপড়ে মুখে হাসি টেনে আয়ান বললো,

‘ প্রতিদিন এই একটা কথা জিজ্ঞেস করে তুই বিরক্ত হোস না? জানিস ও খাবেনা। তবুও কেনো অযথা চেষ্টা করছিস বলতো। ‘
মলিন হাসলো রাজু৷ সায়েরীর দিকে তাকিয়ে নিম্ন কন্ঠে বললো,
‘ আপার উদ্দেশ্যেই তো আমি এই কাজ পাইছি ভাই। এইখানে আজও আমার একমাত্র দ্বায়িত্ব আপার দেখভাল করা। সব আবার কবে ঠিক হইবো! আপাকে এমনে দেখতে আমার ভালা লাগেনা। ‘
শেষের কথাটা বলেই নিজ কাজে চলে গেলো রাজু। ফেলে গেলো চার মানব-মানবীর মন মস্তিষ্কে রঙিন এবং বিষাক্ত কিছু স্মৃতি। সময়ের সাথে সাথে তাদের মাঝের আড্ডাগুলোও যেনো ফিকে হয়ে গিয়েছে। একসাথে বসলে কথায় বেরোয় না। সবার অবস্থা দেখে ফোন বের করে কাউকে কল লাগালো সাফ্রিন। মোবাইলটা সেট করলো টেবিলের উপর থাকা ব্যাগের সাথে। মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে উঠলো নাজরাতের হাসিমুখ। আকাশী রঙের শাড়ি পরণে। কানে ছোট ছোট ঝুমকা, গলায় চিকন চেইন। নাকে জ্বলজ্বল করছে ডায়মন্ডের নোসপিন। সাফ্রিনের দিকে তাকিয়ে মুখে হাসি ফুটলো নাজরাতের। কৌতুক গলায় বললো,

‘ বাব্বাহ! অবশেষে আমার কথা মনে পড়লো তবে! ‘
সাফ্রিনের আগে ফোঁড়ন কেটে নুহাশ জবাব দিলো,
‘ তোরে কল দিয়েছে ভালা কথা। বিয়ে করিয়েছি শ্বশুর বাড়ির কাজ করার জন্য। তা না করে কল পাওয়া মাত্র মোবাইল নিয়ে বসে গেছস কেনো? শরম করে না তোর! জামাই বাচ্চা থাকতে কাজ কাম ফেলে আড্ডায় সামিল হচ্ছিস! ‘
ফুঁসে উঠলো নাজরাত। তেজী কন্ঠে বললো,
‘ তোর সাথে কথা বলছি আমি? কথার মাঝে বা হাত না ঢোকালে কি শান্তি হয় না তোর! ‘
‘ না হয় না। আর এতো শান্তি শান্তি করবি না। এই শান্তি নামক অশান্তির ঝড় এসে আমার মতো মাসুম ছেলেটাকে ছ্যাকা দিয়া ভেগে গেলো। এই নাম নিবি না বলে দিলাম। ‘
নুহাশের চুপসে যাওয়া মুখ দেখেই হেসে ফেললো বাকিরা। হাসি চেপে নাজরাত বলল,

‘ বেশ ভালো হয়েছে। ওই মেয়েকে পেলে নোবেল ছুড়ে মারতাম আমি। তোর সাথে যে দেড় মাস রিলেশনে ছিলো এটা শুনেই কোমায় চলে যেতে মন চাই আমার। মেয়েটা যে কি দেখে তোকে পছন্দ করলো! ‘
‘ একদম নুহাশ সিকদারকে আন্ডারেস্টিমেট করবি না মহিলা। তোরা জানিস কতো মেয়ে আমাকে দেখে শরমে নজর লুকায়! আমার বাড়ির দারোয়ান কাকা দিনরাত আমার নামের লাভ লেটার গ্রহণ করতে করতে ক্লান্ত। কিন্তু মেয়েরা ক্লান্ত হলো না এখনো। হবে কীভাবে? এই নুহাশ সিকদারের রূপের আগুনে তারা পাগল!
ফিক করে হেসে দিলো উপস্থিত চারজন। মোবাইল হাতে নিয়ে টুকিটাকি কিছু কথা বললো আয়ান৷ এই পর্যায়ে এসে উৎসুক হয়ে উঠলো নাজরাত। অস্থির কন্ঠে জানতে চাইলো,

‘ সে কই? ‘
প্রতিউত্তরে ব্যাক ক্যামেরা দিয়ে সায়েরীর ঘুমন্ত মুখটা দেখালো আয়ান। নাজরাত বুঝতে পারলো সায়েরী ঘুমিয়ে আছে। এটা নতুন না তাদের কাছে। আগেও ঘুমকাতুরে ছিলো সায়েরী। কিন্তু অতীত বর্তমানের মধ্যে পার্থক্য একটাই। আগে রাত ১০টা বাজতেই ঘুমে ঢুলে পড়তো সায়েরী। কিন্তু এখন সারা রাত মিলেও দুই চোখের পাতা এক করতে পারে না সে। ফলস্বরূপ চোখের নিচে কালচে ভাব স্পষ্ট দৃশ্যমান তার। সারা রাত নির্ঘুম কাটানোর পর এই সময়টায় চোখে রাজ্যের ঘুম এসে ভর করে তার। কিন্তু পুরনো দিনের মতো গভীর হয়না সেই ঘুম। সামান্য ডাকেই জেগে উঠে। এখনো ঠিক তাই হলো। সবার জন্য চা,সিঙ্গারা নিয়ে উপস্থিত হলো রাজু। অগত্য তোহার এক ডাকেই মাথা তুলে বসলো সায়েরী। চোখজোড়া রক্তিম হয়ে আছে তার। চোখ কচলে চায়ের কাপে হাত দিতেই বাঁধা দিলো আয়ান। পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে শাসাল তাকে,

‘ সকাল থেকে খালি পেটে আছিস নিশ্চয়ই? আগে পানি খেয়ে ভালো কিছু খা। আমি কেক অর্ডার করছি। সেটা খেয়ে তারপর চা খাবি। ভালো করে পানি খা আগে.. ‘
চুপচাপ সব মেনে নিলো সায়েরী। আয়ানের অর্ডারকৃত কেকের সাথে কোল ড্রিংকস, চিপস, চিকেন স্যান্ডউইচ নিয়ে হাজির হলো রাজু। এতো কিছু দেখে অবাক হলো সবাই। নুহাশ আর নাজরাত তখনো কথা কাটাকাটি তে ব্যস্ত। এতো খাবার দেখে তোহা বলে উঠলো,
‘ এসব তো আমরা অর্ডার করিনি রাজু। মনে হয় অন্যদের অর্ডার নিয়ে এসেছিস। ‘
রাজু আমতাআমতা করে জবাব দিলো,

‘ ন..না মানে, আপা আ..সলে এগুলা ম…মানে এগুলা আমাগো তরফ থেইকা। আপনাদের সবার জন্য। ‘
অবাক হলো সকলে। কপালে ভাঁজ ফেলে রাজু’র দিকে তাকালো আয়ান। গম্ভীর কন্ঠে জানতে চাইলো,
‘ এসব কার কথায় এনেছিস, রাজু? একদম ঠিক ঠিক উত্তর দিবি কিন্তু! ‘
ভয় পেলো রাজু। কিন্তু জবাব দিলো না। কয়েক সেকেন্ড নিরবতায় পার হলো। হুট করে আয়ান বলে উঠলো,
‘ এসব ফায়াজ করতে বলেছিলো? ‘
চমকে উঠলো রাজু। তার চেয়ে দ্বিগুণ চমকালো সায়েরীসহ বাকি পাঁচজন। কিন্তু আয়ান স্বাভাবিক। তার দৃষ্টি তখনো রাজুর উপর। উত্তর না পাওয়ায় সে পুণরায় জানতে চাইলো,

‘ জবাব দিচ্ছিস না কেনো! এসব ফায়াজ অর্ডার করেছে আমাদের জন্য? ‘
‘ হ..হ্যাঁ ভাই! ‘
বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে রইলো উপস্থিত পাঁচ মানব মানবী। অবাক কন্ঠে তোহা বললো,
‘ ফায়াজ হঠাৎ আমাদের জন্য এসব কেনো… ‘
কথা আটকে গেলো তার। তবুও তার কথার রেশ ধরে আয়ান হটাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে জবাব দিলো,
‘ আজ ওর জন্মদিন। ‘
আয়ানের নিম্ন কন্ঠের ছোট্ট জবাব। যেটা শুনে আজকের দিনের শেষ চমকটা পেলো বাকিরা। বিগত তিন বছর যাবত ফায়াজ নামক বন্ধুটার সব কিছু থেকে দূরত্ব গুছিয়ে চলতে চলতে আজকের এই দিনটার কথা মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিলো তাদের। ভুলেনি কেবল আয়ান। কি করে ভুলতো! জন্মদিন শব্দটার অর্থ যবে থেকে বুঝতে শিখেছে, তবে থেকে ফায়াজের প্রতি জন্মদিনে সে সবার আগে উইশ করতো। একই নিয়ম ছিলো আয়ানের জন্মদিনের বেলাতেও৷ তাই তো এই দিনটা না চাইতেও গেঁথে আছে মন, মস্তিষ্কে।

আয়ানের নিজের প্রতি নিজেরই ক্ষোভ জন্মালো। কেনো ভুললো না আজকের দিনটা! অন্যদিকে সায়েরী ব্যতিত নাজরাত, তোহা, সাফ্রিন, নুহাশ নিজেদের ধিক্কার জানালো যে কেনো ভুলে গেলো এই দিনটার কথা! যা কিছু হওয়ার ছিলো হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তাদের বন্ধুত্বে কোনো ত্রুটি ছিলো না কারো পক্ষ থেকে। ফায়াজ নিজেও সব কিছুর উর্ধ্বে গিয়ে বন্ধুদের জন্য প্রাণ দিতে রাজি আজও। তবুও সবটা কতোটা ছন্নছাড়া আজ!
সবার নিরবতা উপেক্ষা করে ফায়াজের অর্ডারকৃত স্যান্ডউইচ এবং কোলড্রিংক উঠিয়ে নিলো সায়েরী। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কামড় বসালো স্যান্ডউইচে। ফ্যালফ্যাল করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো বাকিরা। সবার দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে সায়েরী বললো,

‘ আমি তোদের বলিনি আমার জন্য ফায়াজকে ছেড়ে দে। হ্যাঁ, সিচুয়েশনটা এমনই ছিলো যে, কেউ ওকে খুন করতেও দ্বিধা করতো না। কিন্তু কোনো কিছুই সে সুস্থ মস্তিষ্কে করেনি। সেটা তোরাও জানিস। আর সময়ের সাথে সাথে ফায়াজ এখন অনেক অনুতপ্ত। এই কথাটা তোদেরও অজানা নয়। আমি এখন এমনিতেই তোদের সাথেও স্বাভাবিক নেই। ফায়াজ এই তিন বছরে আমার মুখোমুখি হয়নি। একটাবার নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চায়নি। সেক্ষেত্রে ওর সঙ্গে স্বাভাবিক হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। কিন্তু তোরা কেনো নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিস? কেনো নিজেদের সাথে সাথে ছেলেটাকেও কষ্ট দিচ্ছিস, বল? নিজের কর্মের জন্য প্রয়োজনের চেয়েও অধিক শাস্তি পেয়েছে সে। আমার জানা মতে ওর নিজের পরিবার দুই বছর মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলো ওর কাছ থেকে। অনেক হয়েছে। আমার কথা ভাবা এবার বাদ দে তোরা। এবার সবটা ঠিক কর। ‘

একটা কোল্ড ড্রিংকসের বোতল উঠিয়ে সায়েরী মৃদু হেসে বললো, ‘ চিয়ার্স ফর আওয়ার বার্থডে বয়! ‘
নিজেদের বিষ্ময় কাটিয়ে একমাত্র সায়েরীর জন্য, জোরপূর্বক মুচকি হেসে একটা করে বোতল তুলে নিলো বাকিরা৷ একত্রে বোতলের টুংটাং আওয়াজ তুলে বলে উঠলো, – চিয়ার্স!!!
মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকে নাজরাতও সঙ্গ দিলো বন্ধুদের সাথে। বহুদিন পর বুকের ভিতর জমে থাকা পাথরটার বোঝা কিছুটা কমলো বলে মনে হলো তাদের৷ সেই সাথে ভাবিয়ে তুললো সায়েরীর এমন বড় বড় কথা। পরিস্থিতি কি মেয়েকে কি বানিয়ে দিলো! কিন্তু সবাই বুঝতে পারলো সায়েরী যতটা স্বাভাবিক ভাবে কথাগুলো বললো। আসলে ব্যাপারটা ততটাও সহজ নয়৷ তিনবছরের দূরত্ব কমানো আদৌও কি এতো সহজ? তাছাড়া যেখানে অপরাধী নিজ থেকে এসে ক্ষমাটুকু চাইলো না এত বছরে, সেখানে অন্যরা কেনই বা আগ বাড়িয়ে ক্ষমার হাত বাড়াবে?
আরো কিছুক্ষণ গল্প করে ক্লাসে ঢুকলো সকলে৷ পরপর তিনটা ক্লাস করে যে যার রাস্তায় বেরিয়ে গেলো। সাফ্রিন অনেক করে বলেও সায়েরীকে নিজের সাথে নিতে পারলো না। একা রাস্তায় পুরনো স্মৃতির পাতা উল্টাতে উল্টাতে এগিয়ে যাচ্ছে সায়েরী। এই পথের ইট, পাথরগুলো ও যেনো যথেষ্ট তার অতীতের রঙিন মুহূর্তে মনে করিয়ে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে মনকে বিষাক্ত করে তুলতে।

সুইডেনে তখন ভোর আটটা। জগিং শেষ করে নিজ ঘরে উপস্থিত হয়েছে এক সাতাশ বছরের যুবক। পরণে হাত কাটা ব্ল্যাক গেঞ্জি, ব্ল্যাক ট্রাউজার এবং হোয়াইট স্ন্যাকারস। ফর্সা মুখ, গলা, বুক এবং বাহুতে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে তার। এলোমেলো সিল্কি চুলগুলো ব্যাক ব্রাশ করে ডাইনিং টেবিলে রাখা জগ থেকে পানি ঢেলে গলা ভিজিয়ে নিলো সে। তার প্রতিটা মুভমেন্টে হাতের পেশিগুলো ফুলে উঠছিলো। ফর্সা পেশিবহুল বাহুতে স্পষ্ট ভেসে উঠেছে লালছে রগ। পানি পান করে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো সে৷ যেতে যেতে ডাইনিং টেবিলের পাশে দন্ডায়মান মানবটার উদ্দেশ্যে বলে গেলো,

‘ এলিক, কাম টু মাই রুম উইথ ব্ল্যাক কফি। ‘
এতোক্ষণ যাবত এলিক নামক ইংরেজ মানবটা খুব মনযোগ দিয়ে দেখছিলো এই যুবকের চালচলন। সে এই বাসায় কাজ করছে দুই মাস যাবত। এর আগে কেউ তার জায়গায় এখানে কাজ করেছে কিনা জানা নেই তার। জানার কোনো আগ্রহও নেই অবশ্য৷ তার সকল আগ্রহ এই সুদর্শন যুবককে ঘিরে। এমন যান্ত্রিক মানুষ আজ অবধি দেখেনি সে। একটা মানুষ কিভাবে সারাদিন কাজে ডুবে থাকে! না কোনো অযথা কথা না এই সুন্দর দেশে বন্ধু বান্ধব নিয়ে ঘুরাঘুরি। কিভাবে কেউ একটা রুমে সারাক্ষণ ল্যাপটপে মুখ গুজে বসে থাকতে পারে! এর মধ্যে কি অনুভূতি নামক কোনো ফোল্ডার নেই? জীবনে বহু বাঙালি দেখেছে সে। অনেকের সাথে তার গভীর সখ্যতা রয়েছে। তবে এই যুবকের মতো রহস্যময় মানব দ্বিতীয়টি দেখেনি সে।

নিজ মনে কথাগুলো ভাবতে ভাবতে যুবকের রুমের দরজায় নক করলো এলিক। ভেতর থেকে ভেসে আসলো বলিষ্ঠ, রাশভারী কন্ঠ “কাম ইন”। কফি কাপ নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো এলিক। দেখতে পেলো সদ্য স্নান সেরে বের হওয়া যুবকের আকর্ষণীয় শরীর। এলিক রুমে প্রবেশ করা মাত্রই দ্রুত হাতে স্কাই ব্লু কালারের টি-শার্ট গায়ে জড়ালো যুবকটি। এলিকের নজরে শুধু যুবকের ফর্সা পিঠটাই দৃশ্যমান হয়েছে। যুবকের ভাবখানা এমন ছিলো যেনো তার আকর্ষণীয় শরীরের দ্বিগুণ আকর্ষণীয় বুকটা দেখার অধিকার কারোর নেই। হোক সে কোন পুরুষ। তবুও এই অধিকার কারোর নেই। কাঁধের দুপাশে ঝুলিয়ে রাখা টাওয়াল-টার একাংশ দিয়ে নিজের ভেজা সিল্কি চুলগুলো মুছতে লাগলো সে। সেই সাথে অন্য হাতে গ্রহণ করলো কফির কাপ।

রুমের চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলো এলিক। কি সুন্দর পরিপাটি রুম! প্রতিটা জিনিস যেনো ইঞ্চিতে মেপে মেপে রাখা। নিজ কাজ শেষ করেই বের হতে নিচ্ছিলো এলিক। তখনই নজর গাঁথল বেডের সোজা অপজিট দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখা ফটো ফ্রেমটার দিকে। ছবিতে সেই যুবককে দেখা যাচ্ছে যে বর্তমানে এলিকের সামনে উপস্থিত। কিন্তু যখন ছবিটা তোলা হয়েছিলো তখন বোধহয় যুবকের বয়স কিছুটা কম ছিলো বর্তমানের চেয়ে। কথা সেটা নয়, কথা হলো ছবিতে উপস্থিত যুবকের পাশের মেয়েটা কে! এলিক স্পষ্ট বুঝতে পারলো ছবিটা হয়তো কোনো অনুষ্ঠানের ডান্স ফ্লোরে তোলা। একেবারে ক্যান্ডিট। ছবিতে উপস্থিত দুই নর-নারী একে অপরের শরীরের সাথে মিশে দাঁড়িয়ে আছে। যুবকের গায়ে অফ হোয়াইট পাঞ্জাবি যার উপর মাল্টি কালারের কারুকাজ করা ম্যাগি হাতা কটি। মেয়েটার গায়ে ডার্ক গ্রীণ এবং গোল্ডেন কম্বিনেশনের লেহেঙ্গা। কানে বড় বড় ঝুমকা। লম্বা চুল ছড়িয়ে আছে পিঠ বেয়ে কোমর অবধি।

যুবকের দুই হাত মেয়েটার সরু কোমর জড়িয়ে। মেয়েটার এক হাত যুবকের বাহুতে এবং অন্যটা কাঁধে। দুজনের মুখে মৃদু হাসির আভাস। দৃষ্টি আটকে আছে একে অপরের চোখে। মেয়েটা অনেকটা যুবকের বুক অবধি ঠাই পেয়েছে বলে যুবকটি মাথা ঝুঁকিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। এলিক স্পষ্ট দেখলো যুবকটার চোখে এক সমুদ্র মুগ্ধতা। যেই মুগ্ধতা নিয়ে সে তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে। মেয়েটার মুখের একাংশ ফুটে উঠেছে ছবিতে। স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে তার ফোলা ফোলা গাল, ক্ষীণ টোলপড়া লাজুক হাসি। এবং বড় বড় চোখগুলোতে খুশির ঝিলিক।এলিক ছবি দেখেই বুঝে ফেললো দুজনের সম্পর্কের গভীরতা। আর গভীরতা আছে বলেই তো এই ছবি ফ্রেম বাঁধিয়ে রুমে টাঙিয়ে রেখেছে। এমন ভাবে টাঙিয়েছ যেনো রোজ ঘুম থেকে উঠেই এই মিষ্টিমুখের দিকে সবার আগে চোখ পড়ে। আবার ঘুমাতে যাওয়ার আগেও এই মুখ দেখে ঘুমাতে পারে।

কিন্তু আসলে কে এই মেয়ে! কি তাদের সম্পর্ক? সত্যি যদি তাদের মধ্যে এতো গভীর সম্পর্ক থেকে থাকে তবে এই দুই মাসে কখনো দেখলো না কেনো এই মেয়ের সাথে কোনো সাক্ষাৎ বা যোগাযোগ করতে। এমনকি এই যুবক ফোনেও কারো সাথে স্বাভাবিক যোগাযোগ খুব কম করে। মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো এলিকের। কৌতুহল দমাতে না পেরে যুবকের দিকে ফিরে প্রশ্ন করলো,
‘ স্যার! ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড মে আই নো , হু ইজ সি? ‘

বেশ কিছুক্ষণ যাবত এলিকের গতিবিধি লক্ষ্য করছিলো যুবকটি। ছবিটার দিকে এতো গভীর মনযোগে এলিককে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেজাজ খারাপ হয়ে উঠেছিলো তার। আর একটু হলেই কিছু বলে বসতো সে। এমন সময় নমনীয় ভঙ্গিতে প্রশ্নটা করলো এলিক। কফিতে চুমুক দিয়ে ছবির মেয়েটার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকালো যুবকটি। প্রিয়তমার গোলগাল মুখের মিষ্টি হাসিটা দেখে নিজেও মুচকি হেসে জবাব দিলো, “সি ইজ মাই ওয়াইফ!”
যুবকের উত্তর শুনে অবাক না হলেও হাসি দেখে অবাক হলো এলিক। এই বাড়িতে গার্ডেন এরিয়া দেখাশুনা করার জন্য কয়েকবছর যাবত একজন বয়স্ক কেয়ারটেকার রয়েছে। তার কাছে এলিক শুনেছে তার সামনে উপস্থিত এই যুবক অত্যন্ত শান্ত মেজাজের, নম্র, ভদ্র একজন ব্যাক্তি। কথা খুব কম বললেও সর্বদা সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলে। কিন্তু এই দুই মাসে এমন কিছু এলিকের সামনে হয়নি বলে সে বিশ্বাস করেনি কথাটা। কিন্তু আজ বিশ্বাস করতে বাধ্য হলো সে। সেই সাথে আরো একদফা মুগ্ধ হলো যুবকের কিঞ্চিৎ গোলাপি রাঙা অধরের মৃদু হাসি দেখে। রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে ভাবলো, সে ছেলে হয়ে এই যুবকের রূপে মুগ্ধ হচ্ছে, এই স্থানে যদি কোনো মেয়ে থাকতো , তবে কেমন হতো!

এলিক বের হওয়ার পরেও নিজের জায়গায় ঠাই দাঁড়িয়ে রইলো যুবকটি। দৃষ্টি এখনো ছবিতে নিবন্ধ তার। মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। এখন উপস্থিত হয়েছে বুক পিঞ্জিরায় চিনচিনে ব্যথা। চোখ ফিরিয়ে কাঁচের দেওয়ালের বাইরের সুইডেন শহরের নিস্তব্ধতা দেখতে লাগলো সে। ঠান্ডা হয়ে আসা কফিটাই শেষ চুমুক দিয়ে আপনমনে আওড়ালো,

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১২ (২)

” রাত্রিভর স্বপ্ন দেখে
ভোরসকালে ক্লান্ত।
যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা,
সে যদি তা জানতো!”

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৪