অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৫
সাজিয়া জাহান সুবহা
মাঝে কেটে গেলো পাঁচদিন। এরমধ্যে পরিবর্তন ঘটলো আয়ান এবং তোহার সম্পর্কে। আগের মতো সেই নিঃসংকোচ ব্যাবহারটা এখন করতে পারেনা দুজনের কেউই। বন্ধুত্বে দূরত্ব এসেছে। সেদিন আয়ান তোহাকে নিরবতা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করার পর তোহা দ্বিতীয় বার এ নিয়ে ঘাটাইনি। কিন্তু পরেরদিন তোহার অসম্ভব ফোলা চোখ মুখ দেখে বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠেছিলো তার৷ বাকিরা তোহাকে এই ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতেই তোহা হাসিমুখে বললো রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার কারণে এমন অবস্থা হয়েছে। কিন্তু এই মেয়ে যে সারারাত অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে তা বুঝতে বেগ পেতে হলো না আয়ানের। কিন্তু তবোও তার কিছু করার নেই। সে না তোহাকে নিয়ে এমন কিছু কখনো কল্পনা করেছে। আর না কল্পনা করতে চাই!
তাদের মধ্যকার জটিলতা ধরতে পারলো না কেউ। তোহা কিংবা আয়ান কাউকে কিছুই বুঝতে দিলো না। অবসরে আড্ডা, গান, ঘুরাঘুরি, সায়েরীর দুষ্টুমি, দুরন্তপনায় কেটে যেতে লাগলো তাদের দিন। অবশ্য সবার অগোচরে আরো একটা জিনিসের পরিবর্তন হয়েছে। তা হলো ফায়াজের প্রেমিক হওয়ার প্রচেষ্টা। এখন আয়ানের বদলে সায়েরীকে ক্লাস শেষে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দ্বায়িত্বটা মাঝে মাঝে সে পালন করে৷ চলার পথটা দীর্ঘ করতে মাঝে মধ্যেই ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ফুচকা, আইসক্রিম খাওয়ার অফার করে৷ যে সুযোগ-গুলো লাফাতে লাফাতে লুফে নেয় সায়েরী। তার হাসিমুখটার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত প্রশান্তি পায় ফায়াজ। মেয়েটাই যে এমন। সহজ-সরল, চঞ্চল, যার হাসিমুখটা দেখে যে কেউ প্রেমে পড়তে বাধ্য। এমনভাবেই তো বাধা পড়েছিলো ফায়াজ। তাও স্কুল জীবনের শেষ ভাগে এসে। সেই থেকে আজও মেয়েটার মায়ায় আটকে সে। না পেরেছে নিজের প্রেমের স্বীকারোক্তি করতে, না পেরেছে মেয়েটার মনে তার জন্য একটু জায়গা গড়ে তুলতে। মনে মনে তার একটাই আক্ষেপ “এই মেয়েটা কবে একটু বুঝতে শিখবে তাকে!! কবে হবে তার সঠিক বোধশক্তি!!”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
এই অবধি আদনানের পরপর তিনটা নাম্বার ব্লক করলো নাজরাত। সেদিনের পর দুদিন যাবত সবটা শান্ত দেখে সে ভেবেছিলো আদনান হয়তো আবেগের বশে একটা ভুল করে বসেছিলো। এখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে নিজেকে সামলে নিয়েছে। কিন্তু গতকাল রাতে তার এই ভুল ধারণা ভেঙ্গে আদনানের মেসেজ আসলো। যেখানে ছিলো আবেগ মেশানো কিছু কথা। মেসেজের জবাব না পাওয়ায় একের পর এক কল করে নাজরাতের জন্য রাতটা অতিষ্ঠ করে তুললো আদনান। নাজরাত এবার উপায় না পেয়ে আদনানের নাম্বার ব্লক করলো পরপর দুটো৷ রাত কেটে যাওয়ার পর সব শান্ত।
কিন্তু অল্প কিছুক্ষণ আগে আবারো অন্য নাম্বার হতে আদনানের কল পেয়ে রাগে শরীর কেঁপে উঠলো নাজরাতের। ফোন ছুড়ে মারলো বিছানায়। নিজেই নিজের চুল খামচে ধরে বড় বড় শ্বাস ফেললো কয়েকটা। ইচ্ছে করলো পুরনো সব দিনে ফিরে গিয়ে আদনানের সব স্মৃতি মুছে ফেলতে। কোন কুলক্ষণ দিনে যে এই ছেলের সাথে শুধু কাজিন সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছিলো!! সেসময় যদি এই বন্ধুত্বটা না থাকতো, তবে হয়তো আজকের এই দিন দেখতে হতো না। আবারো কর্কশ শব্দে বেজে উঠলো ফোন। এবার যেনো ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গলো নাজরাতের। রাগের মাথায় কোনো কিছু না দেখেই ফোন কানে নিয়ে একনাগাড়ে বলে উঠলো,
‘ সমস্যা কি তোমার! দেখছো যখন আমি ফোন তুলছি না মানে আমি কথা বলতে চাচ্ছি না তোমার সাথে। এই সামান্য কথাটা বুঝার ক্ষমতা কি নেই তোমার!!আরেকবার যদি কল করেছো তাহ……… ‘
‘ নাজরাত! নাজরাত!! কুল ডাউন এইটা আমি!! ‘
অতি পরিচিত কন্ঠস্বরটা শুনে চমকে উঠলো নাজরাত। কান থেকে ফোন নামিয়ে চোখের সামনে ধরতেই দেখলো স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে সাদিফের নামটা। যা দেখে চোখ মুখ খিচে ফেললো সে। বিড়বিড় করে নিজেই গালাগাল করলো নিজেকে। উপাশ থেকে আবারো সাদিফের কন্ঠ ভেসে আসতেই নাজরাত দ্রুত বলে উঠলো,
‘ স..সরি! আমি..মানে আমি আসলে বুঝতে পারিনি আপনি ফোন দিয়েছেন। আ’ম সো সরি! আমি জানতাম না এটা আপনি। আমি এভাবে বলতে চাইনি সত্যি! প্লিজ কিছু মনে কর…. ‘
‘ অবশ্যই মনে করবো। ‘
সাদিফের এমম গম্ভীর কন্ঠ শুনেই কেঁপে উঠলো নাজরাত। এক্ষুনি কেঁদে দিবে দিবে ভাব। অত্যন্ত নমনীয় ভেজা কন্ঠে সে বললো,
‘ প..প্লিজ সাদিফ, বিশ্বাস করুন আমি ইচ্ছে করে এসব বলিনি। আমি সত্যিই জানতাম না আপনি ফোন করেছেন। প্লিজ আমাকে ভুল বুঝবেন না! ‘
নাজরাতের এমন কাঁদোকাঁদো কন্ঠটা শুনেই হেসে উঠলো সাদিফ৷ হাসিমুখেই বললো,
‘ কষ্ট করে একটু ভিডিও কলে আসা যাবে ম্যাডাম? বউয়ের কাঁদোকাঁদো মুখটা দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করছে! ‘
সহসা বিচলিত হয়ে উঠলো নাজরাত। এমন একটা সিচুয়েশনে সাদিফের এমন কথাটা শুনে লজ্জাও পেলো বটে। সাদিফ ততক্ষণে কল কেটে ভিডিও কল দিয়েছে। এতোক্ষণ কাঁধের একপাশে ঝুলিয়ে রাখা উড়নাটা এবার ভালোভাবে দু’কাধে মেলে দিলো নাজরাত। হাত দিয়ে যথাসম্ভব দ্রুত আঁচড়ে নিলো এলোমেলো চুল৷ এর পর কল রিসিভ করলো। কিন্তু সরাসরি স্ক্রিনে তাকানোর সাহস পেলো না। তবে না দেখেও বুঝতে পারলো উপাশের মানুষটার গভীর দুই চোখ নাজরাতের মুখশ্রীতে আটকে। লজ্জায় হাঁসফাঁস করে উঠলো নাজরাত। তার এমন বিচলিত ভাব দেখে সাদিফ বললো,
‘ আমি কি ভুল করে অন্য কারো বউকে ফোন করে বসলাম? ‘
সহসা চমকে উঠে সাদিফের চোখে চোখ রাখলো নাজরাত। অবাক কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ মানে!! আমি অন্য কারো বউ হতে যাবো কেনো! ‘
‘ দেখে তো আমার বউ বলেও মনে হচ্ছে না। না মানে বউটা যদি আমার হতো তাহলে বরের দিকে তাকাতে এতো দ্বিধা করতো না তাইনা! ‘
জবাব দিলো না নাজরাত। পুণরায় দৃষ্টি সরালো মোবাইল স্ক্রিন হতে। এবার যেনো একটু বেশিই হতাশ হলো সাদিফ। বড্ড আফসোস কন্ঠে বললো,
‘ এখন হারে হারে বুঝতে পারছি প্রেম ছেড়ে সোজা বিয়ে করে কতো বিরাট ভুল করেছি। আমার উচিত ছিলো আগে তোমার সাথে বেশ কয়েকমাস ছুটিয়ে প্রেম করা। তারপর একদম সুযোগ বুঝে বিয়ে। তাহলে হয়তো তুমিও বাকি বউদের মতো ঘন্টায় ঘন্টায় ফোন/টেক্সট করে বরের খোঁজ নিতে। সারা রাত গল্প করতে, আর এইযে নজর লুকাচ্ছ। এটার বদলে কখনো ভালোবেসে, কখনো রাগী চোখে তাকাতে। ইশশ!! কি মিসটাই না করলাম বলো!! ‘
সাদিফের এমন চুপসে যাওয়া মুখের কথাগুলো শুনে ঠোঁট চেপে হাসলো নাজরাত। তার হাসি দেখে আবারো আফসোস করলো সাদিফ। যেনো প্রেম না করে বিয়ে করাটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস। হাসি চেপে নাজরাত বললো,
‘ আপনি বললেই আমি প্রেম করার জন্য রাজি হয়ে যেতাম এমন মনে হওয়ার কারণ? ‘
ভ্রঁ কুঁচকালো সাদিফ। গর্বের সাথে বললো,
‘ আমার মতো গুড লুকিং, ওয়েল সেটেল্ড, ভদ্র একটা ছেলেকে তুমি রিজেক্ট করতে পারতে? ‘
হেড বোর্ডের সাথে হেলান দিয়ে বসলো নাজরাত। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বললো,
‘ যতো যায় হোক। লাভ/রোমেন্সের ক্ষেত্রে মেয়েরা কিন্তু ব্যাড বয় বেশি পছন্দ করে। ‘
নাজরাতের এমন উত্তর কল্পনাতেও প্রত্যাশা করেনি সাদিফ। উত্তরটা হজম করতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো তার। তারপর অধর কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো, “রোমান্স!!”
লজ্জায় চোখ মুখ খিচে ফেললো নাজরাত। দ্বিতীয় বারের মতো সাদিফের দিকে তাকানোর মতো ভুল করলো না। নাজরাতের এমন প্রতিক্রিয়া দেখে খানিক শব্দ করে হাসলো সাদিফ। নাজরাতের লজ্জা আরেকটু বাড়িয়ে দিতে আগেরমতো দুষ্টু হেসে বললো,
‘ আপনার কথাটা তুলে রাখলাম ম্যাডাম। নেক্সট যেদিন সামনাসামনি দেখা হবে সেদিন জেনে নিবো রো..মা..ন্সের ক্ষেত্রে আপনার ঠিক কেমন ব্যাড বয় পছন্দ। ‘
“রোমান্স” শব্দটা এমন টেনে টেনে বলায় নাজরাতের লজ্জা এবার যেনো মাত্রা ছাড়লো। হাঁসফাঁস করতে করতে কোনো রকমে বললো,
‘ অ..অনেক রাত হয়েছে৷ আমি ঘুমাবো। ‘
‘ আচ্ছা আচ্ছা। আর লজ্জা পেতে হবে না। আমি প্রসঙ্গ পাল্টাচ্ছি। ‘
নড়েচড়ে বসলো নাজরাত। লক্ষ্য করলো এই পর্যায়ে যেনো একটু গম্ভীর হলো সাদিফের মুখ। নাজরাতের ধারণাকে সঠিক প্রমাণ করে হঠাৎ সাদিফ বললো,
‘ এতো রাতে কে ফোন করেছিলো? ‘
চমকে উঠলো নাজরাত। কেঁপে উঠলো ভেতরটা। তাদের সম্পর্ক বৈধতা পেলেও এখনো যে তাদের মনের সম্পর্কে বিরাট দুরত্ব। তাই হুট করে আদনানের ব্যাপারটা বলার মতো সাহস করে উঠতে পারলো না সে। যদি সাদিফ তাকে ভুল বুঝে! যেমন ভালোবাসা থাকুক না কেনো। যেখানে এখনো দুজন দুজনের বিশ্বাসটা ঠিকঠাক অর্জন করার সময় করে উঠতে পারলো না, সেখানে শুরুতেই আদনানের ব্যাপারে জানিয়ে সম্পর্কের শুরুটাকে আরো জটিল করতে ইচ্ছে হলো না নাজরাতের৷ তাকে এমন ভাবুক হতে দেখে নম্র কন্ঠে ডাকলো সাদিফ। বললো,
‘ কেউ কি কোনো ভাবে তোমাকে উত্যক্ত করছে? কোনো সমস্যা হয়ে থাকলে আমাকে বলো? ‘
‘ ন..না নাহ!! কোনো সমস্যা হয়নি। আসলে নুহাশ ফোন করছিলো বারবার। ওর স্বভাব তো দেখেছেন। উল্টাপাল্টা কথা বলে মাথা খারাপ করে ফেলে। কিছু নোটস এর জন্য ফোন দিয়েছিলো। একটা ডাউট বার বার জিজ্ঞেস করছিলো বলে রাগ করেছিলাম। আর কিছু না। ‘
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৪
একনাগাড়ে এতোগুলো মিথ্যা বলে হাঁপিয়ে উঠলো নাজরাত। সাদিফ বিশ্বাস করলো কি করলোনা সেটা বুঝে উঠতে পারলো না সে। প্রসঙ্গ পাল্টালো দ্রুত। এক কথা দু’কথায় রাত গভীর হলো। শুরুতে ঘুম আসছে বললেও এখন যেনো সব ঘুম জানলা দিয়ে পালিয়েছে নাজরাতের। কলেজ পড়ুয়া কিশোর কিশোরীর মতো রাত জেগে ফোনে প্রেমালাপ চললো অনেক। দ্বিধা দ্বন্দ্বের সুতো ছেড়ে নাজরাত একটু একটু করে সহজ হয়ে উঠতে লাগলো সাদিফের সাথে। সাদিফকে প্রথম দেখে সে শুধু প্রেমে পড়েছিলো৷ এখন সময় চলছে প্রেমটা ভালোবাসায় রূপান্তর করার৷ তবে যেখানে সম্পর্কের পূর্ণতা উপরওয়ালা লিখে দিয়েছে। সেখানে মনে ভালোবাসা জাগানো তো নিছক এক বাহানা মাত্র!!
