Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৯

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৯

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৯
সাজিয়া জাহান সুবহা

ওয়াশরুমের আয়নায় নিজ প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রক্তাক্ত শার্ট-টার একে একে সব বোতাম খুলে দেহ থেকে ছুড়ে ফেললো সাফওয়ান। বুক থেকে দগদগে লাল রক্ত এখনো গড়িয়ে পড়ছে অল্প অল্প। রক্তের সুক্ষ্ম দাগ বসে গিয়েছে বুক বেয়ে মেদহীন পেটের ভাঁজে ভাঁজে এবং নাভীমূলে। থেমে থেমে টনটনে ব্যাথায় শরীর খিঁচিয়ে উঠছে তার। তবে গম্ভীর, শক্ত মুখটা দেখে বুঝার উপায় নেই ভেতরে কেমন দহন বয়ে বেরাচ্ছে সে। কাটা জায়গাটা ফাঁক হয়ে দেখা দিচ্ছে গোলাপি রঙের মাংস্পিন্ড। এই জায়গাটা সেলাই করা ছাড়া উপায় নেই কোনো। তবে আপাতত ঠান্ডা পানি দ্বারা শাওয়ার নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। শরীর ম্যাজম্যাজ করছে ভীষণ। চোখ বুজে আসছে। তারমধ্যে ক্ষুধায় পেট চুঁইচুঁই করছে। সেই দুপুরের পর থেকে পেটে একটা দানা পানিও পড়েনি৷ শরীরের সব শক্তি ফুরিয়ে এসেছে। কোন রকম চোখে মুখে পানি ঝাপটা দিয়ে কাটা জায়গাটা শুকনো রেখে বাকি শরীরে পানি দিয়ে স্নান সেরে নিলো সে। মাথায় তখনো ঘুরছিলো জঙ্গলের সেই মুহূর্তটা।
ঘন্টা দুয়েক আগে__

কালো অন্ধকারে ঘেরা চারপাশ। বুকের সাথে লেপ্টে রয়েছে মেয়েলী শরীরটা। থেমে থেমে দেহে কম্পনের সৃষ্টি হচ্ছে তার। উষ্ণ জলে ভিজিয়ে চলছে প্রসস্থ বুকের মধ্যখান’টা।হঠাৎ কয়েক জোড়া পায়ের শব্দ বেরিয়ে আসলো গ্রামের ভিতর হতে। অন্ধকার পেরিয়ে আলো বেরিয়ে আসলো দুইটি হারিকেনের। সেই আলোতে স্পষ্ট হয়ে উঠলো পাঁচ যুবকের মুখ৷ তিনজনকে আগেই দেখেছে। ছেলেগুলো এতোক্ষণ যাবত খোঁজার পর এবার সাফওয়ান, সায়েরীকে দেখে বাঁকা হাসলো একে অপরের দিকে তাকিয়ে। গোল হয়ে দাঁড়ালো সাফওয়ান ও সায়েরীকে ঘিরে। পাঁচজনের মধ্যে দুজনের হাতে হারিকেন। তাদের উপস্থিতি ঠের পেয়ে সাফওয়ানের উষ্ণ বুকের মধ্যিখানে আরো গভীরভাবে ডুবে গেলো সায়েরী। কান্নার বেগ কমলেও ভয় বাড়লো কয়েক ধাপ৷ থেমে থেমে শরীর কেঁপে উঠছে তার। সাফওয়ান অনুভব করলো সবই৷ জড়িয়ে রাখা হাতদুটোর বন্ধন আরেকটু নিবিড় করলো সে। বুঝাতে চাইলো, “আমি আছি তো! কিছু হতে দিবো না!”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সায়েরীর অবস্থা দেখে কি ঘটেছিলো তা কিছুটা আন্দাজ করেছিলো সাফওয়ান। তবে তিনজনের জায়গায় পাঁচজন দেখে চোয়াল শক্ত হলো তার। কপালের রগ ফুলে উঠলো টান টান করে৷ বাদামি চোখজোড়া এখন রাগে লালছে হয়ে উঠেছে। ক্রোধে ভরা দৃষ্টি মেলে সে পর্যবেক্ষণ করলো উপস্থিত পাঁচ নরপিশাচ’কে৷ সাফওয়ানের তাকানো দেখে হেসে উঠলো তারা। একজন বললো,

‘ ঘুরতে এসে জঙ্গলে রঙ্গলীলা করতে অনেককেই দেখেছি। একা একা মজা না নিয়ে আমাদেরকেও ভাগ দে। ‘
কথাটা শুনেই উচ্চস্বরে হেসে ফেললো বাকি চারজন। কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো সাফওয়ানের। মুষ্টিবদ্ধ হলো হাত। কিন্তু উপস্থিত সকলকে চমকে দিয়ে হঠাৎ নিজের বুক থেকে দূরে সরিয়ে দিলো সায়েরী’কে। বুক কেঁপে উঠলো সায়েরী’র৷ অবিশ্বাস্য নয়নে তাকালো চিরপরিচিত গম্ভীর মুখশ্রীটার দিকে। ছেলেগুলো ভ্রুঁ কুঁচকে বুঝার চেষ্টা করলো সাফওয়ানের উদ্দেশ্যে। হতেই পারে এটা কোনো ফাঁদ। কিন্তু তাদেরকে অবাক করে দিয়ে দুই হাত টান টান করে আড়মোড়া ভেঙে সাফওয়ান বললো,

‘ দেখ, এই মেয়ের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। একে নিয়ে তোরা পিকনিক করবি, না সুলে চড়াবি এসব তোদের ব্যাপার। আমাকে শুধু এখান থেকে বের হওয়ার রাস্তাটা বলে দে। এই বন জঙ্গলে থাকতে থাকতে নিজেকেও এখন জীব জন্তু মনে হতে শুরু করেছে। এখানে থাকা আর সম্ভব না। ‘
ছেলেগুলো চোখে চোখে কিছু আলাপ করলো। এই মুহূর্তে নারী শরীরের লালসার বাইরে অন্য কিছুতে তাদের ধ্যান নেই বললেই চলে। একজন তাড়া দিয়ে বললো,
‘ এতো ভাবাভাবির কি আছে? এই জঙ্গলের মধ্যে মিনিট পনেরো হাঁটলেই মেইন রোড। যা তোর রাস্তায়। একে নিয়ে আর না ভাবলেও চলবে। ‘

সাফওয়ান দায়সারা ভাব নিয়ে শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে পা বাড়ালো সেদিকে। একটা বারের জন্যও ফিরে তাকালো না সায়েরী’র টলমল চোখজোড়ার দিকে। যে অবিশ্বাস্য নয়নে একবুক আশা নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে সাফওয়ানের যাওয়ার পানে। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে সাফওয়ান বেরিয়ে গেলো ছেলেগুলোর ঘিরে ধরা গোল বিন্দু থেকে। সাথে সাথেই হারিকেন দুটি মাটিতে রেখে লোভনীয় কোনো বস্তুর মতো তার দিকে ঝেঁকে আসতে লাগলো ছেলেগুলো। ভয়ে, অস্থিরতায় ঠোঁট কামড়ে ফুঁপিয়ে উঠলো সায়েরী। তার অবচেতন মস্তিষ্কে যেনো জানা হয়ে গিয়েছে, এই মুহূর্তে তাকে রক্ষা করার জন্য কেউ আসবে না৷ কেউ না!!

এক জোড়া নোংরা হাত তার দিকে এগিয়ে আসছিলো এমন সময় হঠাৎ আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো ছেলেটা। চমকে উঠলো সায়েরী-সহ বাকি চারজন। দেখতে পেলো হারিকেনের ভাঙা হাতল নিয়ে দাঁড়িয়ে সাফওয়ান। মাটিতে লুটিয়ে পড়া লোকটার গায়ে কেরোসিন, জামায় আগুন লেগেছে। ধীরে ধীরে বেড়ে চলছে আগুনের মাত্রা। ছেলেটা গড়াগড়ি খেয়ে প্রাণপণে চেষ্টা করছে তা নিভানোর। তার অবস্থা দেখে তেড়ে আসলো আরেকজন। দক্ষ হাতে শক্ত ঘুষি বসালো সাফওয়ানের নাক বরাবর। ব্যাথায় মৃদু আর্তনাদ করলো সাফওয়ান। ছেলেটা আবারো হাত উঠাতে আসলে তলপেটে লাথি বসিয়ে দিলো সে। এমন ভাবে মারলো যে দ্বিতীয়বার উঠে দাড়াঁনোর সাহস হলো না তার। নিজেকে ধাতস্থ হওয়ার আগেই একসাথে দুইজন এগিয়ে আসলো সাফওয়ানের দিকে। পরপর আঘাতে সাফওয়ানকে ক্লান্ত করে তুলতে ব্যস্ত হলো তারা। পালটা আক্রমণের কোনো সুযোগ মিস করলো না সাফওয়ান’ও।

কিন্তু হঠাৎ সায়েরীর চিৎকার কানে আসতেই থেমে গেলো তার মস্তিষ্ক। দ্রুত চোখ তোলে তাকালো সেই স্থানটাই যেখানে সায়েরী দাঁড়িয়ে ছিলো কিছুক্ষণ আগ অবধি৷ কিন্তু একি! জায়গাটা ফাঁকা কেনো? সাফওয়ানের মনযোগে ব্যঘাত ঘটেছে দেখেছে কোমরের ভাজ থেকে ছোট্ট একখানা চাকু বের করলো একজন। দ্রুত হাত চালিয়ে সেটা চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো সাফওয়ানের গলায়। ঠিক সেই সময়ে পিছু সরলো সাফওয়ান। তবে নিজেকে রক্ষা করতে পারলো না পুরোপুরি। ধারালো ছুরি টান পরলো বুকের বাম পাশে হতে ডান পাশে। সাথে সাথেই গলগল করে রক্ত গড়িয়ে ভিজে উঠলো সাদা টি-শার্ট। ব্যথায় মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে আওয়াজ বের হলো সাফওয়ানের। পিছিয়ে গেলো কয়েক কদম। কিন্তু এবার আর কোনো ভুল করলো না, কোনো মানবতা দেখালো না। চাকু ধরে রাখা ছেলেটার কন্ঠনালী চেপে ধরলো দুই আঙ্গুলে। ছিনিয়ে নিলো চাকু। পরপরই সেটা বসিয়ে দিলো হাটুর উপরিভাগে। ছেলেটা আর্তনাদ করে উঠলো। চোখ মুখ অন্ধকার হয়ে উঠেছে তার। পেছন থেকে অন্যজন আঘাত করতে আসলে তার বাহুতে পরপর আঘাত করলো চাকু দিয়ে। শেষে পায়ের পাতার ঢুকিয়ে সাথে সাথে আবারো বের করে আনলো চাকুটা। দুজনের কারোরই এখন চলার মতো অবস্থা নেই। সাফওয়ান উঠে দাঁড়ালো। শ্বাস পড়ছে বড় বড়। বুকের কাছটা ভিজে উঠেছে রক্তে৷ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে পরখ করলো আশপাশটা।

সায়েরী যে স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলো সেখান থেকে টেনে হিঁচড়ে নেওয়ার ছাপ বসে আছে মাটিতে। হারিকেন হাতে সেই ছাপ অনুসরণ করে এগিয়ে গেলো সে। গ্রামের উল্টো দিকে গাছ গাছালির মধ্য দিয়ে দুজন মিলে টেনে নিচ্ছে সায়েরীকে। একজন মুখ চেপে ধরেছে। অন্যজন হাত বাঁধার চেষ্টা চালাচ্ছে প্রাণপণে। সায়েরী বার বার হাত পা নাড়িয়ে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রতিবারই পুরুষালি শক্তির কাছে হার মানতে হচ্ছে তাকে। হঠাৎ করে লতাপাতায় ভরা ঝোপের ভেতর ধুম করে পড়লো কিছু একটা। সাথে সাথে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো।

ছেলেগুলো সেদিকে তাকাতেই একজনের পুরুষাঙ্গ বরাবর লাথি বসিয়ে দিলো সায়েরী। সাথে সাথে সায়েরীর হাত ছেড়ে বসে পড়লো ছেলেটা। ছাড়া পেতেই পেছন থেকে মুখ চেপে রাখা ছেলেটার হাতে দু’হাতে শক্ত খামছি বসালো সে। বাধ্য হয়ে মুখ থেকে হাত সরালো ছেলেটা। বড় বড় দম নিয়ে মাটি থেকে মোটা লাকড়ি তুলে ছেলেটাকে আঘাত করতে গেলেই ছেলেটার হাতের ধাক্কায় ছিটকে পড়লো সে। ভাঙ্গা পাথরের উপর পড়ে কপাল কেটে গলগল করে রক্ত বেড়িয়ে আসলো। তখনই সাফওয়ানের কন্ঠস্বর বাজলো কানে। ঝাপসা চোখে দেখলো উপস্থিত ছেলেটার দুই পায়ের মাঝে হাটু দিয়ে পরপর দুবার আঘাত করে হাটুতে ছুরি ঢুকিয়ে দিয়েছে সে। পরপরই হাতের ছুরিটা দূরে ছুড়ে মেরে দ্রুত এগিয়ে আসলো সায়েরীর দিকে।

ওয়াশরুমের দরজায় করাঘাতের শব্দে ঘোর কাটলো সাফওয়ানের। মিহাদ অনবরত ঢেকে চলছে তাকে। কালো শার্ট গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে আসলো সে। এখনো অবধি কারো নজরে আসেনি তার বুকের ক্ষত স্থান। না সে কিছু জানতে দিয়েছে। শার্টের শুকনো অংশ ক্ষত জায়গায় লাগতেই জ্বলে উঠলো জায়গাটা। চোখ কুঁচকালো সাফওয়ান। তবুও সব বোতাম লাগিয়ে স্বাভাবিক মুখভঙ্গি নিয়ে বের হলো ওয়াশরুম থেকে। রুমে মিহাদ, রায়ান, জিমন এবং সে। বেড সাইড ছোট্ট টেবিলে তার জন্য খাবার রেখেছে মিহাদ। কোনো কথা না বলে চুপচাপ খেতে বসলো সে। আড়চোখে একবার পরখ করলো বাকিদের।

মিহাদ রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে। রায়ান এবং জিমন থমথমে মুখে শুয়ে আছে বেডে। সাফওয়ান বুঝতে পারে, না চাইতেও তার উপর চাপা রাগ জমেছে বন্ধুমহলের সকলের। বিশেষ করে নীতি এবং ইরার। ফায়াজ যখন সাফওয়ানের কলার চেপে জঘন্য অপবাদটা দিয়েছিলো, তখন রাগে মাথা গরম হয়ে উঠেছিলো তার। সকলের কৌতুহল ভাঙতে একে একে খুলে বলেছিলো সব ঘটনা। সেই থেকে থমথমে মুখ সবার। সাফওয়ানকে না বললেও সে বুঝে নিয়েছে সায়েরীকে একা সেই উপজাতি মহিলাদের কাছে রেখে আসায় তার উপর অসন্তুষ্ট সকলে। তাদের মতে সায়েরী’কে একা না ছাড়লে এসব হতোই না।

আয়ান,নুহাশ এবং ফায়াজ বহু কষ্টে নিজেদের রাগ সংযত করেছে। বান্ধবীর বড় ভাই না হলে হয়তো সম্মানের জায়গাটা আজই পিছে ফেলতো তারা৷ সাফ্রিন নিজেও ভাইয়ের এমন কাজে ভীষণ অসন্তুষ্ট। না একবার নিজ থেকে কথা বললো, না ঠিকঠাক তাকিয়ে দেখলো ভাইয়ের মুখের দিকে৷ নীতি এবং ইরা সেই যে নাজরাত কে সায়েরীর খেয়াল রাখতে বলে নিজেদের রুমে ঢুকেছে আর বের হয়নি। সকলের মনে হতে লাগলো সায়েরীর আচরণে বরাবরের মতো অতিষ্ঠ হয়েই সাফওয়ান তাকে একা ছেড়ে দিয়েছিলো। যার ফলস্বরূপ আজ সায়েরীর জীবনে এমন একটা দাগ লাগলো। সকলের এহেন আচরণ দেখে একটু হলেও বুক ভাড় হলো সাফওয়ানের। সায়েরীর বন্ধুদের নাহয় বাদ দিলো। তার আপন বোন এবং বন্ধুরা কীভাবে ভেবে নিলো এমন নিচু মানসিকতার কাজ করবে সাফওয়ান!

সায়েরীর উপর যতই বিরক্ত হোক না কেনো, কোনো নরপিশাচের হাতে ছেড়ে দিয়ে আসবে এমন ভাবনা আসলো কীভাবে তাদের মাথায়! এতোগুলা বছরে এই চিনলো তারা তাকে? মুখ ফুটে সব কথা স্বীকার করেনা বলে কি তারা বুঝার চেষ্টাও করবে না! মন মস্তিষ্ক বিগড়ে গেলো তার। ক্ষুধা মিটে যাওয়ায় খেতে পারলো না কিছু৷ খাবারগুলো সেভাবে রেখেই পানি খেয়ে শুয়ে পড়লো চোখ বুজে। সারাদিনের ক্লান্তির পর এবার আর চোখ খোলা রেখে অন্য চিন্তা করার মতো শক্তি অবশিষ্ট নেই শরীরে। চোখ জোড়া বন্ধ করতেই রাজ্যের ঘুম এসে হানা দিলো চোখে৷

ঘড়ির কাঁটায় রাত ১টা বেজে ৪৫ মিনিট। আজকের রাতটা যেনো শেষ হওয়ার নয়। বেডের উপর সায়েরীর অচেতন দেহ। গায়ের জামা বদলে পাতলা টি-শার্ট পড়িয়ে দিয়েছে নাজরাত। হাতে,ঘাড়ে এবং গলায় খামচির দাগগুলোতে মলম লাগিয়ে দিয়েছে। কপালের ব্যান্ডেজটা আগের মতোই আছে। সায়েরীর খোলা চুলে হাত বুলিয়ে বেড ছেড়ে নেমে পড়লো নাজরাত৷ সবসময়ের হাসিখুশি, চঞ্চল মেয়েটাকে এতো সময় যাবত চুপচাপ বেডে পড়ে আছে দেখে বুক ফেটে কান্না পাচ্ছে তার। রুমটাতে শুধু তারা দুজন রয়েছে। সাফ্রিন এবং তোহা আগের রুমেই ফিরে গিয়েছে। যাতে সায়েরীর কোনো অসুবিধা না হয়। তাছাড়া নাজরাত আছেই দেখাশোনা করার জন্য৷

এতোক্ষণ যাবত বেডে শুয়ে এপাশ ওপাশ করেও ঘুম আসলো না নাজরাতের চোখে। আগে সায়েরীর পাশে শুতে আসলেই তার গায়ের উপর এক পা, একহাত তুলে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতো সায়েরী। নাজরাত বিরক্ত হয়ে সরিয়ে দিলেও অভ্যাস কখনো বদলাতে পারেনি সায়েরীর। কিন্তু আজ!! আধ ঘন্টা যাবত সায়েরী পাশে শুয়ে থাকার পরেও নড়চড় হলো না সায়েরীর। এক পর্যায়ে বেড ছাড়তে বাধ্য হলো নাজরাত। গুমোট অস্থিরতায় কন্ঠস্বর রূদ্ধ হয়ে কান্না আসছে তার। আবছা আলোয় রুমের এপাশ হতে উপাশে বার কয়েক পায়চারি করেও শান্তি মিললো না মনে। কানে বাজছে সাফওয়ানের কথাগুলো।

সেই সাথে সায়েরীর শরীরের খামচির দাগগুলো ভাসছে চোখে। পাঁচ পাঁচজন পশু মিলে তার ছোট্ট বোনটার উপর ঝাপিয়ে পড়েছিলো ভেবেই বুক ভারী হয়ে উঠলো তার। নিজের ভেতরের উত্তেজনা কমাতে না পেরে সুইচড অফ করে রাখা মোবাইলটা অন করলো সে। সন্ধ্যার দিকে বেশ কয়েকবার ফোন করেছিলো সায়েরীর আম্মু। নাজরাত মিথ্যে বলতে পারবে না। আবার সত্যিটা জানিয়ে তাদের চিন্তায় ফেলতেও পারবে না তাই বাধ্য হয়ে মোবাইল বন্ধ করে দিয়েছিলো।

মোবাইল অন করার সাথে সাথে সায়েরীর আম্মু,আবরার, নিজের মা-বাবা সাথে সাদিফের ও কয়েকটা কল ভেসে উঠলো স্ক্রিনে। সবাইকে উপেক্ষা করে সাদিফের নাম্বারে কল করলো সে। কতো রাত হয়েছে কিংবা সাদিফ আদো কল ধরবে কিনা সেসব ভাবার মতো অবস্থা নেই তার। রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো সে। গ্রীলের সাথে মাথা ঠেকিয়ে দৃষ্টি রাখলো দূর আকাশের পূর্ণ চাঁদে। রিং বাজতে বাজতে কল কাটবে এমন মুহূর্তে রিসিভ হলো কলটা। নাজরাতের সেদিকে খেয়ালই নেই। উপাশ থেকে হঠাৎ সাদিফের উদ্বিগ্ন কন্ঠের ডাক ভেসে আসলো, ‘ নাজরাত!! ‘

হঠাৎ আওয়াজে কিঞ্চিৎ চমকালো নাজরাত। সাদিফ আবারো ডাকলো। তার কন্ঠ শুনে হুট করে ভীষণ কান্না পেয়ে গেলো নাজরাতের। কথায় আছে মন খারাপে প্রিয় মানুষটার সান্নিধ্য পেলে মন খারাপ কান্না রূপে ভেসে যায়। তাই হয়তো নাজরাতের অবচেতন মন এই মুহূর্তে মন খুলে কাঁদার জন্য খুঁজে নিয়েছে সাদিফের সান্নিধ্য। তাই সাদিফের কন্ঠটা কর্ণগোচর হতেই মোবাইল কানে চেপে ফুঁপিয়ে উঠলো সে। তার কান্নার আওয়াজে বুক কেঁপে উঠলো সাদিফের। একে তো রাত দুটোর সময় হঠাৎ নাজরাত নিজ থেকে ফোন করলো। আবার এখন কান্না জুড়িয়ে দিয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই ভয় পেয়ে গেলো সাদিফ। উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললো,

‘ নাজরাত! কি হয়েছে কাঁদছো কেনো?? হ্যালো!! নাজ! কাঁদছো কেনো বলো আমাকে! হ্যালো?? ‘
‘ স..সাদিফ!! ‘
‘ হ্যাঁ জান বলো। শুনতে পাচ্ছি আমি। কি হয়েছে? কাঁদছো কেনো! কেউ কিছু বলেছে তোমাকে? হ্যালো! নাজরাত? টেল মি জান, হোয়াট হ্যাপেন্ড?? ‘
‘ স..সাদিফ! আম..আমার সায়ু, স..সায়েরী ও ঠিক নেই সাদিফ। আমি ওকে এভাবে দেখে সহ্য করতে পারছি না৷ আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে সাদিফ!! আমার বোনকে এভাবে দেখতে পারবো না আমি। ‘
কপালে ভাঁজ পড়লো সাদিফের। নাজরাতের কথার অর্থ বুঝতে না পেরে বললো,
‘ সায়েরী? কি হয়েছে ওর?? ‘

ঠোঁট চেপে কান্না আটকালো নাজরাত। হেঁচকি তুলে একে একে খুলে বললো সবই। সম্পূর্ণ ঘটনা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলো সাদিফ। স্বল্প সময়ের পরিচিত ছোট্ট, মিষ্টি মুখটা ভেসে উঠলো চোখের দৃশ্যপটে। হাসিখুশি মেয়েটার এমন করুণ অবস্থার কথা শুনে অজান্তেই মন খারাপ হয়ে উঠলো তার। গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সাদিফ। ফোনের উপাশে তখনো নাজরাতের হেঁচকি তোলার আওয়াজ আসছে। বুকের অস্থিরতা বাড়লো সাদিফের। ইচ্ছে করলো অদৃশ্য কোনো শক্তির বলে ছুটে গিয়ে বউকে বুকে জড়িয়ে নিতে।

‘ সাফওয়ান কোথায়? সে ঠিক আছে? ‘
নামটা শুনেই আচমকা চাপা ক্রোধে জ্বলে উঠলো নাজরাত। রাগ নিয়েই জবাব দিলো,
‘ জানিনা কোথায় আছে। তবে একদম ফিটফাট আছে আপনার ভাই। যা ক্ষতি হয়েছে সব আমার বোনেরই হয়েছে৷ সাফওয়ান ভাই কখনোই সায়েরীকে পছন্দ করতো না। তাই বলে আজ উনি যেটা করেছে সেটা একেবারেই ক্ষমার যোগ্য নয়। আমি ভাবতেও পারছি না সায়েরীর উপর অতিষ্ঠ হয়ে সাফওয়ান ভাই ওকে এভাবে যার তার কাছে ছেড়ে আসবে। আজ যা হয়েছে সবকিছুর জন্য একমাত্র আপনার ভাই দায়ী। ‘
না চাইতেও নাজরাতের কথায় অসন্তুষ্ট হলো সাদিফ। সে বুঝলো ছোট বোনের অবস্থা দেখে নাজরাতের মন মস্তিষ্ক বিগড়ে আছে। তবে তাই বলে সাফওয়ানের উপর এমন অপবাদ মেনে নিতে পারলো না সাদিফ। শান্ত কন্ঠে সে জবাব দিলো,

‘ তুমি যা ভাবছো সেটা মোটেও ঠিক না নাজরাত। সাফওয়ান আমার বছর তিনেকের ছোট হলেও তার ব্যক্তিত্ত্ব আমার চেয়েও অনেক দৃঢ়। রগচটা, গম্ভীর হতে পারে তবে মানসিকতা এমন নিচু না যে একজন মেয়েকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে আসবে৷ আমার ভাই বলে আমি এসব বলছি ভেবো না। তবে ছোট থেকেই দেখে আসছি ওকে। আর যাই হোক, কোনো মেয়ের সম্মানহানি করার মতো ছেলে সাফওয়ান খান নয়। ‘
একটুখানি দমে গেলো নাজরাত। বুঝলো রাগের মাথায় বেশি বেশি বলে ফেলেছে সে৷ ভুল বুঝতে পেরে ছোট্ট করে বললো,

‘ সরি! আসলে আমি… ‘
‘ ইট’স অলরাইট। আমি কিছু মনে করিনি৷ এবার বলো, সায়েরীর শরীর কেমন এখন? ‘
‘ ভীষণ দুর্বল। আসার পথে কয়েকজন ইন্টার্ন ডক্টরের সাথে দেখা হয়েছিলো ওদের। তারা বলেছে ব্লিডিং কমেছে বিধায় কোনো সমস্যা হবে না। সকাল অবধি জ্ঞান ফিরবে। হেলদি কিছু খাইয়ে তবে মেডিসিন দিতে বলেছে। সাথে মেন্টালি যদি ট্রমাটাইজ’ড হয় তাহলে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে বলেছে। ‘

শেষের কথাটা বলতে গিয়ে কন্ঠ কেঁপে উঠলো নাজরাতের। সাদিফের মনেও দাগ কাটলো কথাটা। ঘন্টা কয়েকের ব্যাবধানে কি থেকে কি হয়ে গেলো মেয়েটার জীবন। চঞ্চলতায় মেতে থাকা মেয়েটাকে এখন কিনা সাইকিয়াট্রিস্ট’র প্রয়োজন পড়তে পারে। মানা যায় কথাটা!! সাদিফ বুঝলো নাজরাতের মনের অবস্থা। তাকে স্বাভাবিক করার জন্য কথা ঘুরালো। রাত বাড়ার সাথে সাথে চোখে ঘুম হানা দিলো দুজনের। কথা বলতে বলতেই সায়েরীর শরীর ঘেঁষে শুয়ে পড়লো নাজরাত৷ নিজের কথার বিপরীতে নাজরাতের হু,হা সাড়া শুনে সাদিফ বুঝলো তার বউ এবার ক্লান্ত ভীষণ। কান থেকে মোবাইলটা মুখের কাছে এসে সেও বালিশে মুখ গুজে মৃদু কন্ঠে বললো,

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৮

‘ গুড নাইট অ্যন্ড.. লাভ ইউ মিসেস সাদিফ। ‘
ঘুম ঘুম চোখে আচমকা হেসে ফেললো নাজরাত। কল কেটে মোবাইলটা বুকে জড়িয়ে চোখ বুজলো সে। মন খারাপের মেঘ কেটে এখন ঠোঁট মুচকি হাসি ধরা দিয়েছে তার।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২০