Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২০

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২০

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২০
সাজিয়া জাহান সুবহা

হারিকেনের উজ্জ্বল আলোয় ছোট্ট কুড়েঘর’টা পরখ করছিলো সায়েরী। তখনই দুজন যুবক এগিয়ে এসে বললো তাকে সাফওয়ান ডেকেছে। কথাটা শুনে কপালে একটুখানি ভাঁজ পড়লো চিন্তার। কিন্তু পরমুহূর্তেই ভাবলো এই ছেলেদের কাছ থেকেই তো রাস্তার খোঁজ নিয়েছিলো সাফওয়ান, এখন হয়তো ডাকছে এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। চটপট ভঙ্গিতে ছেলে দুজনের সাথে বেরিয়ে গেলো সে। গ্রামটা নিরব, নিস্তব্ধ। রাত অবশ্য কম হয়নি। নিস্তব্ধ হওয়াটা স্বাভাবিক। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বেড়ার একটা ঘরের সামনে এসে পড়লো তারা। সায়েরী আশেপাশে তাকালো। কোথাও সাফওয়ানের অস্তিত্ব নেই।

অবচেতন মন একটুখানি বিপদের আভাস পেলো৷ কদম পিছিয়ে নিলো নিস্তব্ধে।কিন্তু ধরা পড়ে গেলো একজনের নজরে। পালাতে গিয়ে হঠাৎ বাধা পড়লো পুরুষালি নোংরা হাতের শক্ত থাবায়। সহসা সাফওয়ানের নাম ধরে চিৎকার করে উঠলো সে। সাথে সাথে মুখ চেপে ধরলো একজন। এরপর দুজন মিলে টেনে হিঁচড়ে তাকে নিয়ে ঢুকলো বেড়ার ছোট্ট ঘরটায়। আতংকের সাথে সায়েরী লক্ষ্য করলো ঘরে আগে থেকে আরো দুজন যুবকের উপস্থিতি। লোভাতুর, কামুকী নজরে যারা তাকিয়ে আছে সায়েরীর সদ্য প্রস্ফুটিত কিশোরী শরীরটার দিকে। ঘরের চারকোনায় মৃদু আলোর হারিকেন জ্বলছে চারটা। সেই আলোতে দুজন ব্যাক্তি অপর দুজনের সাথে সায়েরীর ধস্তাধস্তি বেশ মজার সাথে দেখতে লাগলো ৷

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সাথে অল্প অল্প চুমুক দিতে লাগলো হাতের মাঝারি আকৃতির কাঁচের বোতলের বাদামি বর্ণের তরল পানীয়-তে। তারা প্রবল আত্মবিশ্বাসী হয়ে চৌকিখাটের উপর বসে আছে, কারণ তাদের জানা এই মুহূর্তে সায়েরীকে রক্ষা করার মতো কোনো প্রাণী নেই এই জায়গায়। নিজেকে রক্ষার জন্য হাত, পা ছুড়ছে সায়েরী। মুখ তখনো চেপে ধরে আছে একজন। আচমকা নিজের শরীরের শুভ্র রাঙা ওড়নাটায় টান পড়লো। সেটা খসে পড়লো মেঝেতে। ভয়ে বুক কেঁপে উঠলো সায়েরীর। ছটফটানি বাড়লো দ্বিগুণ। তার আচরণে বিরক্ত হয়ে একজন টান মারলো কাঁধের দিকে জামার অংশ। ফরফর শব্দ তুলে ছিড়ে গেলো জামা৷ উন্মুক্ত হয়ে গেলো চার নরপিশাচের সামনে মেয়েলি শরীরের উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ঘাড়, কাঁধ এবং পিঠের একাংশ।

জামায় টান পড়ার কারণে ছিটকে গেলো গলার দিকে টপ বাটন দুটি। তীব্র লজ্জা, ভয় এবং আতংকে চোখ ভিজে উঠলো সায়েরীর। ধস্তাধস্তিতে নখের আঁচড়ে জ্বলে উঠলো ঘাড়, পিঠ। তীব্র অসহায়ত্ব নিয়ে মনে মনে এক আল্লাহ্ কে স্বরণ করা ছাড়া আর কোনো আশার আলো দেখলো না সে। তার এমন ছটফটানি দেখে বেশ বিরক্ত হলো বসে থাকা যুবকদের মধ্যে একজন। হাতের বোতলটাতে চুমুক দিতে দিতে গিয়ে দাঁড়ালো সায়েরীর মুখোমুখি। প্রথমে লোভাতুর দৃষ্টি নিয়ে হাত ছোঁয়াল কিঞ্চিৎ উন্মুক্ত পিঠে। ঘৃণায় কাঁধ ঝাকিয়ে তুললো সায়েরী। রাগ হলো লোকটার। সায়েরীর ভেজা চোখে তাকিয়ে আচমকা খামচে ধরলো মেয়েলি বক্ষের বাম দিকের নরম অংশ। তীব্র ব্যাথায় গুঙিয়ে উঠলো সায়েরী। কিশোরী শরীর, মন এবং মস্তিষ্কে তীব্র প্রভাব পড়লো এই আচরণে। একবুক অসহায়ত্ব নিয়ে ডুকরে উঠলো সে৷ অবিরাম জলধারা বয়ে চলছে দুই গাল বেয়ে৷ মুখ গিয়ে শুধু গোঙানির শব্দ আসছে। লোকগুলো যেনো বড্ড তৃপ্তি পেলো সায়েরীর অসহায়ত্ব দেখে।

হু হা করে হেসে উঠলো একে অপরের দিকে তাকিয়ে। তীব্র আত্মবিশ্বাসের জুড়ে হাতের বাঁধন আলগা করে দিলো। ঠিক সেই সুযোগটা লুফে নিলো সায়েরী। হাটু দ্বারা লাথ মারলো সামনে উপস্থিত যুবকটার দুই পায়ের মাঝের দুর্বল জায়গায়। এবং সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের বোতলটা নিয়ে ছুড়ে মারলো বেড়ার দেয়ালে আটকানো হারিকেনের দিকে। কাঁচের বোতলের তীব্র আঘাত লেগে হারিকেনের কাঁচ ভেঙ্গে ছিটকে পড়লো আগুন। সেই আগুনের সাথে তরল পানীয় মিশে আরো আশকারা পেলো তারা৷ মুহূর্তেই শুকনো বেড়ার চাল জ্বলে উঠলো দাউদাউ করে। ছেলেগুলো চমকে উঠার সুযোগটুকু পেলো না। তার আগেই গায়ের সর্ব শক্তি দিয়ে একজনকে ধাক্কা মেরে আগুন জ্বলতে থাকা পথ দিয়েই দৌড় দিলো সায়েরী। তার মস্তিষ্কে তখন মৃত্যু ভয়ের চেয়েও বেশি ভয় ছিলো এই পশুগুলোর কাছে নিজের সতীত্ব হারানোর ভয়। আগুনের তাপে জ্বলে উঠলো পিঠের খোলা অংশ। তবুও ভ্রুক্ষেপ হলোনা সায়েরীর।

দিকবিদিকশুন্য হয়ে ছুটলো গ্রামের উল্টো দিকে৷ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগলো গাঢ় অন্ধকারে৷ হঠাৎ ধাক্কা লাগলো শক্ত কিছুর সাথে। সায়েরী সরে আসতে গিয়েও আটকে গেলো চিরপরিচিত পুরুষালি শরীরের ঘ্রাণে৷ শাওয়ার জেল এবং মিষ্টি সুগন্ধিযুক্ত পারফিউমের গন্ধ নাড়িয়ে তুললো তার ভেতরটা। না দেখেও বুঝে ফেললো মানুষটা সাফওয়ান ভাই। এক বুক আশা নিয়ে দুহাতে পেছিয়ে ধরলো শক্ত শরীরটা এবং গুটিয়ে গেলো মানুষটার প্রসস্থ বুকের মধ্যিখানে। এরপর…এরপর ঘটে কিছু অনেক কিছু। আবারো সেই নরপিশাচ দের আক্রমণ ঘটলো তার উপর। সাফওয়ান যখন দুজনকে একসাথে ঘায়েল করতে ব্যাস্ত, তখনই সায়েরীর দেহে আবারো পড়লো সেই নোংরা হাতের ছোঁয়া। ঘৃণায় মুখ শক্ত হলো সায়েরীর। হাজার চেষ্টা করেও মোকাবিলা করার সব পথ বাধা হয়ে পড়লো। কাপুরুষটার শক্ত নোংরা হাত সায়েরীর ঘাড় ছুঁয়ে নামলো পিঠে, তারপর পিঠ বেয়ে আরো………..

নাআআআ!!!!
হঠাৎ ঘুমের মধ্যেই চিৎকার করে উঠে বসলো সায়েরী। দু’হাতে কান চেপে চোখ মুখ খিচে বারবার আওড়াতে লাগলো “ছুঁবে না আমাকে, ছাড়ো! ছাড়ো!! কেউ হাত দিবেনা গায়ে…কেউ ছুঁবে না। কেউ না!!”
আকস্মিক তার এমন আচরণে চমকে উঠলো নাজরাত, তোহা এবং সাফ্রিন। তারা তিনজন উদাস মুখে বসে ছিলো বেডের তিনকোণায়। সায়েরীর এমন চিৎকারে ভয় পেয়ে গেলো তারা। নাজরাত সায়েরীর কান থেকে হাত সরাতে চাইলে আচমকা তার স্পর্শে ছিটকে দূরে সরে গেলো সায়েরী। হাতে ক্যানোলা লাগানো ছিলো। যা টান পড়ায় ছিটকে বেরিয়ে আসলো হাত থেকে। সাথে সাথে ফিনকি দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়লো সেই স্থান হতে। কিন্তু সায়েরীর ভ্রুক্ষেপ নেই সেদিকে। চোখের সামনে উপস্থিত তিন রমনীকে দেখে পিছিয়ে যেতে লাগলো সে। মুখে আওড়াচ্ছে সেই আগের মতো “কাছে আসবে না”।

তার অস্বাভাবিক আচরণ দেখে নাজরাত এগিয়ে গেলো কাছে৷ সায়েরী ভয় পেয়ে গেলো এতো কাছ থেকে কারো উপস্থিতি ঠের পেয়ে। চটজলদি বেড থেকে নেমে নিজের শরীরের দিকে লক্ষ্য করে বেডের চাদর টেনে জড়িয়ে নিলো সম্পূর্ণ শরীরে। বাকি তিনজন বারবার ডাকছে তাকে। সায়েরী কিছু শুনার অবস্থাতে নেই। নাজরাত সবে হাত রেখেছিলো সায়েরীর কাঁধে এমন সময় বেড সাইড টেবিল থেকে কাঁচের গ্লাস তুলে তার দিকে ছুড়ে মারলো সায়েরী। ঠিক সেই সময় তোহা সরিয়ে দিলো নাজরাতকে। গ্লাসটা ধরাম করে বাড়ি খেলো দরজার সাথে। কাঁচের ভাঙ্গা টুকরো ছড়িয়ে পড়লো রুমের প্রতিটা কোণায়। বিষ্ময়ে হতভম্ব তিন রমনী। দরজার বাইরেই ছিলো আয়ান, ফায়াজ এবং নুহাশ। গ্লাস ভাঙ্গার আওয়াজ শুনে দ্রুত দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো তারা।

সায়েরী তখন নিজের শরীরে চাদর জড়িয়ে ঢেকে নিয়েছে নিজেকে। মুখ নিচু করে বারংবার অর্ধ উন্মুক্ত হাত ঢাকছে, পা ঢাকছে। বিরবির করে আওড়াচ্ছে সেই আগের বুলি। তার এমন অস্বাভাবিক আচরণ দেখে উপস্থিত ছয় জনের বুকের ভিতর অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে। মেয়ে তিনজন কেঁদেই ফেলেছে ইতিমধ্যে। আয়ানের চোল টলমল করছে৷ ক্ষীণ স্বরে সে ডাকলো, সায়ু!!

সায়েরী চমকালো পুরুষালি কন্ঠটা শুনে। ভীত, ছলছল দৃষ্টি তুলে তাকাতেই উপস্থিত তিন ছেলেকে দেখে বুকের ভিতরটা আতংকে কেঁপে উঠলো তার। পিছিয়ে যেতে যেতে দেয়াল ঘেঁষে দাড়ালো সে।
আয়ান এবং ফায়াজ একটু এগিয়ে যেতেই দু’হাতে কান চেপে আর্তনাদ করে উঠলো সায়েরী।
‘ কাছে আসবে না আমার! কেউ কাছে আসবে না! দ..দূরে থাকো। দূরে যাও…ছোঁবে না কেউ…. ‘
কদম থমকে গেলো দুজনের। কান জ্বলে উঠলো জঘন্য বাক্যগুলো শুনে। চোখের সামনে দেখছে আদুরে মেয়েটার বেহাল দশা৷ নিজের বাহু, হাত, গলা ঢলতে ঢলতে সে বসে পড়লো সেই স্থানেই। দুই গাল বেয়ে অশ্রু ঝরছে৷ মাথা নিচু করে সে বারে বারে বলে চলছে,

‘ ছাড়ো…ছাড়ো আমাকে, ছোঁবে না কেউ!! ছাড়ো, ছাড়োওও!! ‘
সায়েরী বলা একেকটা বাক্য নাড়িয়ে তুললো উপস্থিত সকলের সর্বত্র। নাজরাত, তোহা, সাফ্রিন মুখ চেপে ফুঁপিয়ে উঠলো। ছেলে তিনজনের লালছে টলমল চোখ৷ বুকে অসহ্য যন্ত্রণা। সায়েরীর এমন আচরণ দেখে আর কেউ কাছে যাওয়ার সাহস পেলো না। নিজের শরীরের খামচির দাগগুলো ঢলে ঢলে মুছে ফেলতে চাইছে সায়েরী। মস্তিষ্ক আটকে আছে এখনো সেই ঘন অন্ধকার জঙ্গলে। মস্তিষ্ক জানান দিচ্ছে, এখানে কারো কাছে সে নিরাপদ নয়। কেউ নেই সাহায্যের জন্য। কেউ না!!

হঠাৎ রুমের ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজের সাথে ভেসে আসলো অতি পরিচিত উদ্বিগ্ন কন্ঠের ডাক, ‘ সুবহা!! ‘
সায়েরী চমকালো, থমকালো৷ থেমে গেলো ক্ষত স্থান ঢলতে থাকা হাত। টলমল চোখজুড়া বুজে নিতেই গড়িয়ে পড়লো দুই ফোঁটা নোনাজল। বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠলো ঘন অন্ধকারে অনুভব করা সেই উষ্ণ বুকের নিরাপদ আশ্রয়। সেই মোহনীয় কন্ঠের ডাক৷ চুলের ভাঁজে পাওয়া শক্ত পুরুষালি হাতের পবিত্র স্পর্শ। যেই স্পর্শ বুঝিয়ে দিয়েছিলো, “আমি আছি! কিছু হতে দিবো না!!”

সায়েরীকে দেখার জন্যই রুমে এসেছিলো সাফওয়ান। কিন্তু দরজার কাছে এসে সায়েরীর এমন আচরণ দেখে চমকে উঠেছিলো সে। মুখ দিয়ে আপনা আপনি ডাক বেরিয়ে এসেছিলো। সাফওয়ানের কন্ঠ শুনে ফিরে তাকালো ফায়াজ। চোখে মুখে উপচে পড়া রাগ তার। সাফওয়ান যখন তাকে ক্রস করে সামনে এগোনোর চেষ্টা করলো, তখনই তার হাত চেপে তাকে আটকে দিলো ফায়াজ। সাফওয়ান একপলক তাকালো শুধু সেদিকে। কিছু বলতে যাবে এমন সময় চোখ মেলে সাফওয়ানের চোখে চোখ রাখলো সায়েরী। এবং উপস্থিত সকলকে চমকে দিয়ে আচমকা উঠে গিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো সাফওয়ানের প্রসস্থ বুকে৷ দু’হাতে পিঠ খামচে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো সে৷

থমকে গেলো সাফওয়ান সহ উপস্থিত সকলে। কাটা জায়গায় পুণরায় ছুরাঘাতের মতো জ্বলে উঠলো সাফওয়ানের বুক। কিন্তু তবুও বিন্দু পরিমাণ নড়লো না সে। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে মিহাদ,ইরা,নীতি,জিহান এবং রায়ান। তারাও হতভম্ব নয়নে তাকিয়ে সাফওয়ান এবং সায়েরীর দিকে। সায়েরীর হাউমাউ কান্নার সুর ব্যাতিত অন্য কোনো সুর নেই রুমে। অথচ উপস্থিত অনেকগুলো মানুষ। হতভম্ব আয়ান সায়েরীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আচমকা ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো ফায়াজের দিকে। যে লালছে টলমল চোখ নিয়ে ব্যাতিত নয়নে তাকিয়ে আছে সায়েরীর দিকে। বুকের ভিতরটা অদ্ভুত ব্যাথায় জর্জরিত হচ্ছে তার। কন্ঠনালী যেনো চেপে ধরেছে কেউ। অজানা দহনে পুড়ছে ভেতরটা। ফায়াজের অবস্থা দেখে আয়ান ফাঁকা ঢোক গিললো। কম্পিত হাত রাখলো ফায়াজের কাধে। সহসা চমকে উঠলো ফায়াজ। অশ্রু লুকাতে দ্রুত পায়ে মিহাদকে ঠেলে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে৷
অতিরিক্ত কান্নায় কন্ঠ ভেঙ্গে বসলো সায়েরীর। তাকে থামানোর জন্য জোর করে নিজ থেকে ছাড়িয়ে নিলো সাফওয়ান। তখনই সেখানে উপস্থিত বাকিদের দেখে সাফওয়ানের বাহু খামচে ধরলো সায়েরী। সাফওয়ানের চোখে চোখ রেখে ভাঙ্গা গলায় আতংকিত কন্ঠে বলতে লাগলো,

‘ ওরা..ওরা আবার এসেছে! আবারো এসেছে সাফওয়ান ভাই!! এখান থেকে চলুন। এখনই চলুন। ওরা এসে গিয়েছে তো। আমাকে আবার ছোঁবে.. আবারো গায়ে হাত দিবে!! আ..আমি আমাকে নিয়ে চলুন না, ওরা আবার…. ‘
একমাত্র সাফওয়ানের দিকে ছাড়া অন্য কোনো দিকে তাকানোর সাহস নেই সায়েরীর। কান্নারত অবস্থায় বারবার সাফওয়ানের হাত ঝাকিয়ে সে একই কথা বলে যাচ্ছে। সাফওয়ান ডাকলো তাকে বারকয়েক। কিন্তু সায়েরী শুনতে নারাজ। বাধ্য হয়ে দুহাতে সায়েরীর গাল চেপে মুখটা নিজের মুখোমুখি টেনে নিলো সাফওয়ান। ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
‘ সুবহা! সুবহা..কাম ডাউন! চুপ, দেখো ওরা সবাই তোমার বন্ধু৷ সুবহা স্টপ ইট! লুক এট দেম। কেউ কিছু করবে না তোমায়। শান্ত হও। চুপ!! ‘
সায়েরী চুপ করলো না। নিজের গালে রাখা সাফওয়ানের হাতদুটোর উপর হাত চেপেই সে কেঁদে যাচ্ছে। ছটফট করছে। যতবারই চোখে পড়ছে সাফওয়ানের পেছনে উপস্থিত মানুষগুলোকে। ততবারই সাফওয়ানের হাতে, বুকে ঝাকিয়ে বলে যাচ্ছে,

‘ ও..রা ওরা এখানেই আছে সাফওয়ান ভাই! ওরা আপনাকেও আঘাত করবে। আমাকে.. আমাকে আবারো ওই ঘরে..ওখানে! ওখানে নিয়ে যাবে৷ ওদেরকে চলে যেতে বলুন না। ওদেরকে চলে যেতে বলুন। আম..আমি আমি এখানে থাকবো না, ওরা আমাকে আবারো ছোঁবে। আমাকে গায়ে হাত দিবে ভাইয়া প্লিজ!! আম..আমি….. ‘
শেষের কথাগুলো শুনে কান জ্বলে উঠলো সাফওয়ানের। সহসা সায়েরীর মাথাটা নিয়ে নিজের বুকে চেপে ধরলো সে। সেই অবস্থাতেই ছটফট করে হুহু করে কাঁদছে সায়েরী। সাফওয়ান চোখ বুজে লম্বা শ্বাস নিলো। গলার স্বর উঁচু করে সবার উদ্দেশ্যে বললো,
‘ আমি সুবহার সাথে কিছুক্ষণ একা কথা বলতে চাই। তোমরা বাইরে যাও। ‘
কপালে ভাঁজ পড়লো আয়ানের। বাকিরাও সন্তুষ্ট না এই প্রস্তাবে। অবস্থা বুঝে সাফ্রিন বললো,
‘ কিন্তু ভাইয়া, আমরা…. ‘
‘ আই সেইড গেট আউট ফ্রম হিয়ার। রাইট নাও!! ‘

আচমকা সাফওয়ানের হুংকারে কেঁপে উঠলো সকলে। কোনো প্রতিউত্তর করার সাহস পেলো না কেউ। একে একে সকলে বেরিয়ে গেলে দরজা চাপিয়ে দিলো নীতি। ভেতরে তখনো সাফওয়ানের বুকে নিরব কান্নার সাথে হেঁচকি তুলছে সায়েরী। তার এলোমেলো খোলা চুলে হাত বুলিয়ে দিলো সাফওয়ান। বলার মতো কিছু খোঁজে পেলো না। কি বলে সান্ত্বনা দিবে এই মেয়েটাকে?আদো কি কোনো উপায়ে ভুলাতে পারবে মন, মস্তিষ্কে তীব্র প্রভাব ফেলা সেই মর্মান্তিক ঘটনাটা!!
নিজের হাতের লালছে আঁচড়ের দাগগুলোর দিকে চোখ পড়তেই আচমকা সাফওয়ানের কাছ থেকে ছিটকে দূরে সরে গেলো সায়েরী। সাফওয়ান চমকে গেলো। লক্ষ্য করলো অনবরত নিজের হাতে আঁচড়ের দাগ পড়া জায়গাগুলো ঢলে ঢলে মুছে ফেলতে চাইছে সে। সাফওয়ান হাত টেনে আটকানোর চেষ্টা করলো তাকে৷ কিন্তু ব্যার্থ হলো বারবার। অধৈর্য গলায় সে বলে উঠলো,

‘ কি করছো সুবহা! হাত লাল হয়ে গিয়েছে তোমার। এভাবে ঢলছো কেনো? ছাড়ো। থামো বলছি!! ‘
সায়েরী থামলো না। আগের মতো হাত ঘষাঘষি করতে করতে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
‘ এসব আমি রাখলো না। সব মুছে ফেলবো সব! এই নোংরা ছোঁয়া আমি রাখবো না আমার শরীরে। এসব অপবিত্র ছোঁয়া আমি রাখতে চাইনা! ‌! ‘
নড়াচড়ায় গায়ে জড়ানো চাদরটা সরে গিয়ে উন্মুক্ত হয়ে গেলো সায়েরীর গলা,ঘাড়৷ তার মাঝে লাল লাল আঁচড়ের দাগগুলো দেখে চোখ খিচলো সাফওয়ান। পরপরই দু’হাতে সায়েরীর বাহু চেপে নিজের মুখোমুখি এনে চিৎকার করে উঠলো, – সুবহা!!!
কেঁপে উঠলো সায়েরী। থেমে গেলো কান্না। চোখ রাখলো মুখোমুখি সাফওয়ানের গাঢ় বাদামি চোখজোড়াতে। সেকেন্ড দুয়েক তাকিয়ে রইলো অপলক। আবারো টলমল জলে গাল ভিজে উঠলো। কম্পিত ঠোঁট নেড়ে ভাঙ্গা গলায় বললো,

‘ আমি কি অপবিত্র হয়ে গিয়েছি সাফওয়ান ভাই?? ‘
সামান্য প্রশ্নটা তীর হয়ে বিধলো সাফওয়ানের বুকে। সায়েরীর ওই ছলছল চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে কিছু বলার ভাষা পেলো না সে। তার দিকে তাকিয়ে থেকেই সায়েরী আবারো বললো,
‘ আমার নিজেকে ভীষণ নোংরা লাগছে। আমি অপবিত্র হয়ে গিয়ে…. ‘
সহসা সায়েরীর পাতলা ঠোঁটের উপর তর্জনী চেপে ধরলো সাফওয়ান। নিম্ন কন্ঠে বললো, — হুশশ!! চুপ।
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো সায়েরী। তার নরম গালে একহাত রেখে গড়িয়ে পড়া অশ্রুটুকু বৃদ্ধ আঙ্গুল দিয়ে মুছে দিলো সাফওয়ান। এরপর একটুখানি মুখ নিচু করে শান্ত, দৃঢ় গলায় বললো,
‘ তুমি অপবিত্র নও সুবহা। যেই নোংরা ছোঁয়া লেগেছে, সেগুলো খুব দ্রুত মিলিয়ে যাবে৷ তুমি চাইলে স্মৃতি থেকেও মুছে যাবে সেই কালোরাত। শুধু তুমি শক্ত হও। নিজেকে নোংরা ভাববে না৷ তুমি এখনো ততোটুকু পবিত্র আছো, যতটুকু আগে ছিলে৷ বি স্ট্রং!! ‘

কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনলো সায়েরী। চোখের পলক ফেললো না এক মুহূর্তের জন্যও। সাফওয়ান নিজেও ঘোরে ডুবে গেলো। সায়েরীর ডাগর ডাগর ভেজা আখিঁজুগলের দিকে তাকিয়ে কোথাও যেনো আটকা পড়লো। আবার নিজেই সামলে নিলো নিজেকে৷ সন্তর্পণে হাত সরিয়ে নিলো সায়েরীর নরম গাল থেকে৷ ঠান্ডা কন্ঠে জানতে চাইলো,
‘ বিশ্বাস আছে তো আমার উপর?? ‘
সাফওয়ানের চোখে চোখ রেখেই মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো সায়েরী। সেটা দেখেই বুক টান টান করে দাঁড়ালো সাফওয়ান। সেই আগের মতো গম্ভীর কন্ঠ নিয়ে বললো,
‘ বিশ্বাস থেকে থাকলে আশেপাশে তাকাও। দেখো কে আছে এখানে? কাকে দেখে চিৎকার করছিলে? কার কাছ থেকে দূরে যেতে চাচ্ছিলে?? তাকাও আশেপাশে! দেখো!! ‘

ভীত নজরে রুমের প্রতিটা কোণায় চোখ বোলালো সায়েরী। নেই! কোথাও কেউ নেই। দরজার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড। ভীতু মন বলছে এই পথ দিয়ে হয়তো আবারো ঢুকে পড়বে সেই নরপিশাচগুলো। ফাঁকা ঢোক গিললো সে৷ সাফওয়ান লক্ষ্য করলো সবই। বুঝতে পারলো, ভয় কাটেনি পুরোপুরি। এখনো রেশ থেকে গিয়েছে। লম্বা শ্বাস নিয়ে সায়েরীর হাত টেনে বিছানায় বসিয়ে দিলো। বেড সাইড টেবিলে রাখা ফার্স্ট এইড বক্সটা নিয়ে মুখোমুখি বসলো সায়েরীর। তুলো-তে স্যাভলন লাগিয়ে সায়েরীর বাম হাত তুলে নিলো নিজের হাতে। যেটাতে একটু আগে ক্যানোলা টান পড়ায় রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। আজ ভোর সকালে সদর হাসপাতাল থেকে ডক্টর এনে স্যালাইন লাগিয়েছিলো সায়েরীকে। সেটা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই এই অবস্থা। ক্ষত জায়গায় ভেজা তুলোর ছোঁয়া লাগতেই জায়গাটা জ্বলে উঠলো। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে আওয়াজ করে উঠলো সায়েরী। সাফওয়ান তার দিকে তাকালো এক পলক। এরপর ফু দিয়ে আলতো হাতে জায়গাটা পরিষ্কার করে ওয়ান টাইন ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিলো। শান্ত কন্ঠে সে বললো,

‘ বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছো কেনো? কে আছে ওখানে?? ‘
একটুখানি চমকালো সায়েরী। ভীতু গলায় বললো,
‘ বাইরে থেকে কারো হাঁটার আওয়াজ আসছে। ওখানে কে আছে? ‘
‘ তোমার বন্ধুরা আছে। ‘
কথাটা শুনে একটুখানি ভাবুক হলো সায়েরী। সাফওয়ান ছোট্ট করে ডাকলো তাকে, — সুবহা!!
‘ হুম? ‘
ধরে রাখা সায়েরীর নরম হাতটার উপর হাত রেখে সাফওয়ান বললো,

‘ স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করো। এখানে তোমার ক্ষতি করার কেউ নেই। যারা আছে সবাই তোমার খুব আপন। ওরা সব কিছু থেকে তোমাকে আগলে রাখবে। যা হয়ে গিয়েছে, আমি কিংবা তুমি বদলাতে পারবো না। তবে সেই ঘটনার রেশ ধরে এমন গুটিয়ে থাকলে কিন্তু তোমার জীবনটাই থমকে যাবে। গ্রো আপ!
তাকিয়ে দেখো, এই জায়গাটাতে এনজয় করতে এসেছো তুমি। ভয়,ডর যা আছে সব দূর করার জন্য এখান থেকে বের হতে হবে। সবার সাথে মিশতে হবে। ভাবনা থেকে বেরিয়ে বাস্তবে ফিরে আসো৷ এখন কোনো বিপদ নেই তোমার। আমরা সবাই আছি তোমার সাথে। বি ব্রেইভ! ‘
সায়েরী চুপচাপ মাথা নামিয়ে বসে আছে। তার নিরবতা দেখে সাফওয়ান আবারো বললো,

‘ আমি কি বলেছি বুঝছো তো?? ‘
নড়েচড়ে বসলো সায়েরী। ঠোঁট উলটে জবাব দিলো,
‘ খুব জোরে জোরে খিদে পেয়েছে। খালি পেটে বুঝা যাচ্ছে না কথা! ‘
এমন পরিস্থিতি’তে সায়েরীর বলা কথাটা শুনে আচমকা ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেললো সাফওয়ান। পকেট থেকে মোবাইল বের করে কাউকে মেসেজ করলো৷ পরপরই ভিড়িয়ে রাখা দরজার দিকে তাকিয়ে উচ্চ স্বরে ডাকলো, — সাফা!!
সাথে সাথেই দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লো সাফ্রিন। তার এমন হতদন্ত হয়ে ছুটে আসায় চমকে উঠে সাফওয়ানের ধরে রাখা হাতটা চেপে ধরলো সায়েরী। ড্যাবড্যাব করে তাকালো সাফ্রিনের দিকে। সাফ্রিন ও দ্বিধা নিয়ে তাকিয়ে। বুঝে উঠতে পারছে না সায়েরীর মনের অবস্থা কি৷ কাছে যাবে কিনা। সায়েরীর হাত ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সাফওয়ান। সাফ্রিনের কাছে এসে নিম্ন কন্ঠে বললো,

‘ ওর জন্য খাবার পাঠাবো। ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিতে বলবে। আর কাল রাতের ব্যাপারে কেউ কিছু জানতে চাইবে না। এখন একটু স্টেবল হয়েছে। আবার ওসব মনে করলে প্যানিক করতে পারে। ‘
মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় সাফ্রিন। সাফওয়ান বেরিয়ে যাচ্ছিলো এমন সময় তার হাত টেনে ধরলো সে। সাফওয়ান তাকাতেই অপরাধী গলায় বললো,
‘ সরি ভাই!! কাল সায়ুর অবস্থা দেখে তোমার উপর অকারণে রেগে গিয়েছিলাম। ‘
সাফওয়ান মুচকি হেসে সাফ্রিনকে একপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে বললো,
‘ ইট’স ওকে! ওকে দেখে রেখো৷ আমি আসছি। ‘

সাফওয়ান বেরিয়ে যেতেই সায়েরীর দিকে এগিয়ে গেলো সাফ্রিন। কিন্তু কিছু বলার বা কাছ ঘেঁষার সাহস হলো না। তাকে এমন দ্বিধা দ্বন্দ্বে দেখে নিজ থেকেই হাত বাড়ালো সায়েরী। গাল ফুলিয়ে বললো,
‘ এখন কি আমার কাছ থেকে নিমন্ত্রণ পত্র পাঠাতে হবে কাছ আসার জন্য?? ‘
কথাটা শুনার সাথে সাথে সায়েরীর উপর ঝাপিয়ে পড়লো সাফ্রিন। আচমকা এমন হওয়ায় তাল সামলাতে না পেরে ধপ করে বেডে পড়ে গেলো সায়েরী। চাপে পড়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ আহ!!! মেরে ফেলবি নাকি?? ‘
সায়েরীকে জড়িয়ে রেখেই কান্না চোখে সাফ্রিন জবাব দিলো,
‘ ইচ্ছে করছে ফেলেই ফেলি। কতো ভয় পেয়েছিলাম জানিস তুই!! এমন খামখেয়ালি কেউ করে? আমাদের উপর দিয়ে কি গিয়েছিলো ধারণা আছে তোর!! ‘

সায়েরী ছলছল চোখ নিয়ে হেসে ফেললো। তার বন্ধুরা সব কেমন পাগল তা বেশ ভালো করে জানা আছে তার। সাফ্রিন উঠে বসতেই লম্বা শ্বাস ফেলে সায়েরী নিজেও উঠে বসলো। লক্ষ্য করলো দরজার কাছে গোমড়া মুখে দাঁড়িয়ে আছে তোহা এবং নাজরাত। সায়েরী তাকাতেই তোহা বললো,
‘ আমাদের আর এখানে কি কাজ? কেউ তো আর চাচ্ছে না আমরা আসি। চল নাজরাত, মনে হয়না আমাদের এখানে প্রয়োজন আছে কোনো। ‘
নাজরাতও তাল মিলিয়ে বললো,
‘ ঠিক বলেছিস। এখন আমাদের লাগবে কেনো! এরা দুই ভাই বোন থাকলেই হলো। ‘
সাফ্রিন মিটিমিটি হাসছে। সায়েরী নিজেও হেসে ফেললো তোহা এবং নাজরাতের অভিমানী কথাগুলো শুনে। হাত বাড়িয়ে বললো,

‘ আয়,আয়। এতো ন্যাকা কান্না করতে হবে না৷ আমি আবার ভীষণ বড় মনের মেয়ে। গরীবের দুঃখ সহ্য হয়না৷ ‘
সাফ্রিন শব্দ করে হেসে উঠলো। তোহা এবং নাজরাত এসে ঝাপটে ধরলো সায়েরীকে। দুজনের ভাড়ে আবারো ধপ করে বেডে পড়ে গেলো সায়েরী। সাফ্রিন নিজেও এসে গা এলিয়ে দিলো তোহার উপর। তিনজনের নিচে চাপা পড়ে শ্বাস আটকে গেলো সায়েরীর। কোনো রকমে বললো,
‘ আল্লাহ্!! আমার প্রাণ নিবি বলে পণ করেছিস নাকি তোরা! আহ!!! চেপ্টা হয়ে যাচ্ছি অসভ্যের দল৷ ছাড় আমাকে!!
ছাড়া পেতেই লম্বা শ্বাস ফেললো সায়েরী। আরেকটু হলেই বোধহয় দম আটকে মরে যেতো। রাগত্ব স্বরে সে বললো,
‘ তোদেরকে এতো ভরসা করাই ভুল হয়েছে! উফফ!! আরেকটু হলেই আমার মাসুম প্রাণটা অক্ষা পেতো। ‘
ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো তোহা। কৌতুক গলায় বললো,
‘ সেটা তো মনে হবেই। ভরসা করার জন্য সাফওয়ান ভাইকে যে পেয়েছো। কি দিনকাল আসলো বাপরে!! আমাদেরকে!! মানে এতো বছরের বন্ধু গুলোকে কাছ ঘেঁষতে দেয়নি। অথচ সাফওয়ান ভাইকে জড়িয়ে ধরে ছিলো। এটাও মানা যায়?? ‘

ধীরেসুস্থে উঠে বসলো সায়েরী। ভাবলো আধ ঘন্টা আগের ঘটনা। আচমকা সেই মর্মান্তিক দৃশ্যটা দেখে ঘুম ভাঙ্গার পর মস্তিষ্ক অচল হয়ে পড়েছিলো তার। আশেপাশে কে আছে, কে ভালো, কে খারাপ এসব ভাবার মতো বোধশক্তি ছিলো না তখন। চোখে ভাসছিলো নোংরা চেহারাগুলো, অনুভব হচ্ছিলো অপবিত্র স্পর্শগুলো। এজন্যই অস্বাভাবিক আচরণ করেছে সে। কারো কথা কানে যাচ্ছিলো না তখন। এমন মুহূর্তে সাফওয়ানের উপস্থিতি দেখে বুক শীতল হয়ে উঠেছিলো তার। একমাত্র ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছিলো সাফওয়ান। সায়েরীর অবচেতন মন বলছিলো, “সাফওয়ান ভাই রক্ষা করবে। ঠিক যেমন কালো অন্ধকার রাতে ওই নারপিচাশদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলো।

এখনো সে সামলে নিবে সবটা।” হলোও তাই। সাফওয়ান সামলে নিলো। তার নিখুঁত ব্যাক্তিত্ব দিয়ে সায়েরীর ভাবনা কেটে তাকে বাস্তবে রূপান্তর করালো। নিজের গম্ভীর স্বত্বা থেকে বেরিয়ে শীতল কন্ঠে বুঝিয়ে দিলো, এখন আর কোন ভয় নেই। কোনো বিপদ নেই৷ তার এক একটা কথা খুব দ্রুত প্রভাবিত করলো সায়েরীর কোমল মন। ভয়ের রেশ কাটলো একটু একটু। এবার সাফওয়ানের কথামতো এই জায়গা থেকে বেরিয়ে বাহিরের দুনিয়ার সাথে মিশলেই হয়তো ভয়টা পুরোপুরি কেটে যাবে৷

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৯

নিজের বাম হাতের উল্টো পিঠে লাগানো ছোট্ট ব্যান্ডেজটার দিকে তাকিয়ে একটুখানি হাসলো সায়েরী। অবচেতন মনে প্রশ্ন জাগলো,
‘ আচ্ছা, লোকটা কি জাদু টোনা জানে? নয়তো কীভাবে এতো সহজে মন ভুলিয়ে তুললো আমার!! ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২১+২২