Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৫+৩৬

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৫+৩৬

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৫+৩৬
সাজিয়া জাহান সুবহা

‘ একই কথা কতোবার বলতে হয় তোকে? আমি এই প্রসঙ্গে কোনো কথা বলতে চাইছি না। এটাকি বুঝতে পারছিস না তুই? ‘
মিহাদের উঁচু কন্ঠে চমকে উঠলো বন্ধুরা। ইরা’র ব্যাপার নিয়ে আজ আবারো প্রশ্ন তুলেছে সাফওয়ান। যার কারণে রেগে গিয়েছে মিহাদ৷ সাফওয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে তাকিয়ে রইলো মিহাদের দিকে। বাকি তিনজন গোলগাল চোখে তাকিয়ে। সাফওয়ান গমগমে গলায় বললো,

‘ তুই কথা বলতে চাইছিস না বলে কি ব্যাপারটা এখানেই দামাচাপা দিয়ে দিবো? ইচ্ছে অনিচ্ছা সব তোর একার? ইরা ইনভলভ নেই এসবে? ‘
‘ ওর কথা আমি জানি না। জানতে চাইছিও না। দয়া করে তোরা আর আমাকে বলতে আসবি না এসব। কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে ইচ্ছুক নয় আমি। ‘
রেগে গেলো সাফওয়ান। চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
‘ তুই ইচ্ছুক নয় বলে আমরা ইরাকে ভুলে যাবো? চারবছর ধরে কি চোখে পট্টি লাগিয়ে প্রেম করেছিলি? আজ তাকে ভালো লাগছে না। চার বছরে নজরে আসেনি মেয়েটা কেমন? ‘
মিহাদও সমান তালে চেঁচিয়ে বললো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ না আসেনি। এখন ভালো লাগছে না মানে লাগছে না। সারাজীবন সবার পছন্দ যে এক থাকবে এটা লিখা আছে কোথাও? আমার লাইফ, আমি যাকে ইচ্ছা সাথে রাখবো। তোদের কোনো অধিকার নেই আমার পার্সোনাল ম্যাটারে বলার। ‘
আচমকা মিহাদের এমন বাক্যে থমকে গেলো উপস্থিত চারজন। হতবাক, বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মিহাদের দিকে। সাফওয়ান একটুখানি হাসার চেষ্টা করে নির্লিপ্ত কণ্ঠে জানতে চাইলো,
‘ কোনো অধিকার নেই? ‘
দৃষ্টি সরিয়ে ফেললো মিহাদ। জবাব দিতে গিয়ে কন্ঠস্বর কেঁপে উঠলো তার। তবুও থেমে থেমে ধীর কন্ঠে বললো,
‘ নাহ। নেই। ‘

প্রতিউত্তর করার ভাষা হারালো সকলে। ওয়ান টাইম চায়ের কাপটা ঘাসের উপর রেখে ব্যাগ তুলে দাঁড়িয়ে পড়লো মিহাদ। যেতে গিয়েও সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,
‘ দুদিন আগেও আমার বাসায় গিয়ে মা,বাবার কাছে জানতে চেয়েছিস আমার ব্যাপারে। এর আগেও গিয়েছিলি। তখন নিষেধ করেছিলাম। শুনিসনি। এখন আবারো বলছি, আমার ব্যাক্তিগত ব্যাপার থেকে দূরে থাক তুই৷ ইরা’র সাথে প্রেমের সিদ্ধান্ত যেমন আমার একার ছিলো, বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তটাও আমার একান্ত৷ এসব থেকে তোরা দূরে থাকলেই আমি খুশি হবো৷ ‘

কথা শেষ করে এক সেকেন্ডও থাকলো না সে। গটগট পায়ে পেরিয়ে গেলো মাঠ। নীতি টলমল চোখে সাফওয়ানের দিকে তাকালো। ঘাসের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। চোয়াল শক্ত। চোখজোড়া রক্তলাল। বিষ্ময়ের সাথে নীতি লক্ষ্য করলো সাফওয়ানের হাতে থাকা মিনারেল ওয়াটারের বোতলটা দুমড়ে মুচড়ে চুপসে আছে হাতের মুঠোয়। বাহ্যিক ক্ষোভ সব এটার উপর বয়ে গেছে। পিনপিন নিরবতা ভেদ করে শব্দ করে শ্বাস ফেললো সাফওয়ান। গমগমে গলায় জিমনকে বললো,
‘ এই ইডিয়ট এর উপর নজর রাখ। কিছু একটা তো হয়েছেই ওর। আই হ্যাভ টু নো। ‘
‘ কিন্তু ও যে বললো…. ‘
‘ তো? তোর মনে হয় এসব কথা মিহাদ মন থেকে বলেছে? ইচ্ছে করে বলেছে যাতে আমরা খোঁজ না করি। ওর শিরা উপশিরা অবধি জানা আমার। এবার শুধু এই ব্যাপারটা জানতে পারলেই হলো। ‘
সাফওয়ানের কথায় বাকিরা স্বস্তি পেলো। সত্যিই তো৷ মিহাদ এমন রগচটা ছেলেই না। প্রাণোচ্ছল ছেলে সে। বন্ধুদের জন্য জান প্রাণ দিয়ে দিবে এমন টান। সেই ছেলে কিনা এতো কঠিন বাক্যে কথা বলছে! ব্যাপারটা রহস্যজনক বটে।

ব্রেক টাইম। ক্লাসের এক কোনায় জড়সড় হয়ে বসে আছে নাজরাত। তার দুই পাশে তোহা এবং সাফ্রিন। দুজনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রীতিমতো গিলে খাচ্ছে নাজরাত’কে। অস্বস্তিতে গুটিয়ে যাওয়া নাজরাত এবার ধমকে উঠলো দুজনকে,
‘ কি শুরু করেছিস তোরা? কখন থেকে বখাটে ছেলেদের মতো তাকিয়ে দেখছিস আগাগোড়া। চোখ সরা। আমার অস্বস্তি হচ্ছে৷ ‘
তোহা এবার ধীর কন্ঠে বললো,
‘ ফটাফট হানিমুন জার্নি এক্সপ্লেইন করে ফেলো তো জান। পাঁচদিন ধরে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে এবার আমি ক্লান্ত।
‘ ছিঃ ছিঃ। লজ্জা নেই তোদের? ‘
সাফ্রিন ঘোর বিরোধিতা করে বললো,
‘ লজ্জা থাকতে হবে কেনো? বান্ধবীর থেকে যদি আগে ভাগে জেনে নিয়ে এক্সপার্ট না হয়, তাহলে আর বিবাহিত বান্ধবী রাখলাম কেনো? ‘

তোহা মাথা নেড়ে বললো, ‘ একদম! ‘
সাফ্রিনের দিকে তাকিয়ে নাজরাত বললো,
‘ আমি না তোর বড় ভাইয়ের বউ? বড় ভাইয়ের হানিমুনের গল্প শুনতে চাইছিস। লজ্জা নেই তোর? ‘
‘ আবার লজ্জা! আরে বড় ভাই হবে সে ঘরে৷ আমি তো বান্ধবীর গল্প শুনতে চাইছি। আমার এতো লাজ লজ্জা নেই রে৷ আমি নির্লজ্জ মেয়ে৷ এবার তুই ফটাফট বল, কি কি হলো? ‘
তোহাও সায় জানিয়ে বললো,
‘ আমিও নির্লজ্জ টু। এখন তুই মুখ খোল দয়া করে৷ ‘
দুই লাগামছাড়া বান্ধবীর চাপে পড়ে লজ্জায় পরাণ যায় যায় অবস্থা নাজরাতের। তার নিরবতায় বাকি দুজন বড্ড বিরক্ত হলো। নাজরাতকে একটু সহজ করতে তোহা ধীর কন্ঠে বললো,

‘ আচ্ছা সব বাদ। আগে বল…
অর্ধের কথা বলে থেমে গেলো সে। নাজরাত তাকাতেই ঠোঁটের দিকে ইশারা করে বললো,
‘ চুমু খেয়েছে? ‘
বিষ্ময়ে চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেলো নাজরাতের। লজ্জায় কান জ্বলে উঠলো যেনো। তোহার কথায় সে জবাব দেওয়ার আগে সাফ্রিন ঠাশ করে এক চড় মারলো তোহার মাথায়৷ চাপা স্বরে ধমকে উঠে বললো,
‘ গর্দভ কোথাকার! বিয়ের এতোগুলা দিন হয়ে গেলো। হানিমুন সেরে আসলো ৪দিনের। সেখানে সামান্য একটা চুমু খাবে না? আমার ভাইকে কি ইম্পোট্যান্ট মনে হয় তোর? ‘

মাথা ডলতে ডলতে তোহা মিনমিনিয়ে বললো, “হ্যাঁ, তাইতো। ”
সেদিকে পাত্তা না দিয়ে সাফ্রিন এবার সরাসরি বলে বসলো,
‘ এবার বল। কতোটুকু কি হলো? আমাকে ফুপি বানানোর প্রসেসিং হলো তো? ‘
লজ্জায় চোখ খিচলো নাজরাত। এসব কেমন কথা? এই দুই বিচ্চু পিছু ছাড়ছে না কেনো তার? তোহা মুখ টিপে হাসছে। নাজরাত জানে জবাব না পাওয়া অবধি ছাড় পাবে না সে। তাই ধীর কন্ঠে বললো,
‘ এসব কিছুই হয়নি। ওই স.. সামান্য…. ‘
চোখ বড় বড় করে তাকালো দুজন। নাজরাত কথা শেষ করতে পারলো না লজ্জায়৷ তোহা হাহাকার করে উঠলো,
‘ হলো না! চার চারটা রাত কেটে গেলো কিন্তু কিছু হলো না? সাদিফ ভাইয়কে ধৈর্যশীল অব দ্যা ইয়ারের এওয়ার্ড ছুড়ে মারতে মন চাচ্ছে। বাহ! ধৈর্যশীল পুরুষ। বাহ! ‘

মন ক্ষুন্ন হলো সাফ্রিনেরও। সেটা সাইডে রেখে সে পুণরায় বলে উঠলো,
‘ সামান্য মানে? কতো দূর এগো…..
লজ্জায় মূর্ছা যাওয়া অবস্থা নাজরাতের। তবুও সাফ্রিনের কথাটুকু শেষ করতে না দিয়ে শক্ত করে মুখ চেপে ধরলো সে। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
‘ আল্লাহ’র ওয়াস্তে এবার চুপ কর তোরা। আর কিছু শুনার শক্তি নেই আমার। ‘
দমে গেলো দুজন। ঠিক সেই মুহূর্তে চিপসের প্যাকেট হাতে নিয়ে হাজির হলো সায়েরী৷ খেতে খেতে বললো,
‘ কি নিয়ে কথা চলছে? ‘
তোহা ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বললো,
‘ শুনে কি করবি? আগামাথা জানিস কিছুর? ‘
‘ জানবো না কেনো? আমি জানি না এমন কিছুই নেই এই পৃথিবীতে। ‘
তোহা ঠোঁট চেপে হেসে ফিসফিসিয়ে বললো,

‘ তাই নাকি? আমরা বাসর রাতের এক্সপেরিয়েন্স নিচ্ছি। তুই চাইলে কিছু টিপস দিতে পারিস। তোর তো সব জানা। ‘
বলেই শব্দ করে হেসে উঠলো সে৷ “বাসর রাত” শব্দটা শুনেই খুকখুক করে কেশে উঠলো সায়েরী। মুখ দিয়ে আপনা আপনি বেরিয়ে আসলো “আসতাগফিরুল্লাহ্!”
সেই মুহূর্তে হাজির হলো নুহাশ, আয়ান এবং ফায়াজ। এতোক্ষন সায়েরী-সহ তারা ছিলো ক্যান্টিনে। নুহাশ এসে সায়েরীর বলা “আসতাগফিরুল্লাহ্” শুনে বলে উঠলো,
‘ শয়তানে ধরলো নাকি? আসতাগফিরুল্লাহ্ পড়তেছস ক্যান? ‘
জবাব দিলো না কেউ৷ তোহা ও সাফ্রিন মিটিমিটি হাসছে। নাজরাতের রক্তিম মুখশ্রী দেখে নুহাশ ভ্রুঁ কুঁচকে বললো,
‘ তুই এমন লজ্জায় লাল মরিচ হয়ে আছোস কেনো? চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সাদিফ ভাই আজই প্রথম দেখা করতে আসতেছে। হইছে কি? ‘

নুহাশের কথায় এবার শব্দ করে হেসে উঠলো সাফ্রিন এবং তোহা৷
লজ্জায় নতজানু হয়ে রইলো নাজরাত৷ আয়ান বোধহয় আঁচ করতে পারলো কিছুটা। মৃদু কেশে উঠে দাঁড়ালো সে৷ নুহাশের উদ্দেশ্যে বললো,
‘ চল বাইরে যায়। ‘
‘ মাত্রই না আসলাম। এখানে বসি কিছুক্ষণ। ‘
আয়ান কথা শুনলো না। কাছে এসে নুহাশের ঝাকড়া চুল মুঠোবন্দি করে বলে উঠলো,
‘ আসতে বলেছি আয়৷ ‘
ফায়াজ সহ তিনজন পুণরায় যেতে লাগলো। তোহা এবং সাফ্রিনের দিকে তাকিয়ে সায়েরী চোখ মুখ কুঁচকে বলে উঠলো,

‘ ফায়াজ! দাড়া। আমিও আসছি৷ ‘
মুখ ভেংচি কেটে বেরিয়ে গেলো সে। দরজার কাছে অপেক্ষা করছে ফায়াজ। সায়েরী যেতেই পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটতে লাগলো দুজন। চিপস খেতে খেতে সায়েরী হঠাৎ বলে উঠলো,
‘ তুই আজকাল এতো চুপচাপ থাকিস কেনো বল তো? ‘
ফায়াজ চমকালো। সায়েরী তার দিকে নজর দিয়েছে। সে চুপচাপ থাকে এটুকু লক্ষ্য করেছে৷ ব্যাপারটা জেনে বুক ফুলে উঠলো তার। নিজেকে সামলে বললো,
‘ কোথায় চুপচাপ থাকি? আগের মতোই আছি। ‘
‘ উঁহু। আগেও চুপচাপ থাকতি। কিন্তু আজকাল বেশি বেশি চুপ থাকিস। টেনশনে আছিস নাকি? এতো কিসের চিন্তা? ‘
ফায়াজ হাসলো। হাঁটতে হাঁটতে জবাব দিলো,
‘ কোনো চিন্তা নেই৷ এমনিতেই চুপচাপ থাকি। ‘
দিঘির নিরিবিলি জায়গায় পৌঁছে সিমেন্ট দ্বারা বাধাই করা বসার স্থানে পা গুটিয়ে বসলো সায়েরী। ভাবুক কন্ঠে বললো,

‘ তোকে দেখে তো মনে হচ্ছে তুই গভীর চিন্তায় মগ্ন। হলো কি? চটপট বল। ‘
সায়েরীর মুখোমুখি বিপরীত জায়গায় গিয়ে বসলো ফায়াজ। নিরব চোখে তাকিয়ে রইলো চিপসে মগ্ন সায়েরীর দিকে। সেকেন্ড দুয়েক পর ধীর কন্ঠে বললো,
‘ পছন্দ করি। ‘
সায়েরী ড্যাবড্যাব চোখ করে তাকালো। চিপস ভুলে ঝুঁকলো সে ফায়াজের দিকে। অবাক কন্ঠে বললো,
‘ কাকে পছন্দ করিস? তুই প্রেম করছিস? কবে থেকে? ও মাই গড! এতো কিছু হয়ে গেলো আর একবার বললিও না? ‘
দীর্ঘশ্বাস ফেললো ফায়াজ। মলিন গলায় বললো,
‘ এখনো মানুষটাকেই জানাতে পারলাম না। ‘
‘ সে কি কথা? বললি না কেনো? আচ্ছা, আগে বল মেয়েটা কে? নাম কি? কেমন দেখতে? ‘
উত্তেজনায় করা প্রশ্নগুলো শুনে ফায়াজ নিরব চোখে শুধু দেখেই গেলো সায়েরীকে। তার নিরবতায় বিরক্ত হয়ে সায়েরী অধৈর্য কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ বল না, কেমন দেখতে? ‘
ফায়াজ সেকেন্ড দুয়েক সময় নিয়ে ধীর কন্ঠে বললো,
‘ খুব সুন্দর। মায়ারাজ্যের মায়াবতী একদম। ‘
‘ আয়হায়! আমার বন্ধু তো দেখি গভীর প্রেমে ডুবে গিয়েছে। ‘
ফায়াজ আবারো হাসলো। সায়েরী এবার সিরিয়াস হয়ে বললো,
‘ মেয়েটাকে জানালি না কেনো এখনো? ‘
‘ ভয়ে। ‘

‘ ভয়? ভয় কিসের? ওর বাবা কি পুলিশ টুলিশ নাকি? ‘
‘ উঁহু। তার আর আমার মাঝে সুন্দর একটা বন্ধুত্ব আছে৷ সেটা হারিয়ে ফেলার ভয়। ‘
‘ প্রেম নিবেদন করলে বন্ধুত্ব হারিয়ে যাবে কেনো? ‘
‘ সে যদি আমাকে গ্রহণ না করে। ভুল বুঝে গুটিয়ে যায়, সেটা সহ্য করতে পারবো না রে। ‘
ফায়াজের একথা শুনে সায়েরী নিজের জায়গা ছেড়ে ফায়াজের পাশে গিয়ে বসলো। কাঁধে হাত রেখে বললো,
‘ তোকে রিজেক্ট করবে? প্রশ্নই উঠে না। আমার বন্ধু বেস্ট। ‘
সায়েরীর চোখে চোখ রেখে ফায়াজ বললো,

‘ আমাকে প্রেমিক হিসেবে যে কেউ গ্রহণ করবে? ‘
‘ করবে না কেনো? আলবাত করবে। আমি গ্যারেন্টি দিয়ে বলতে পারি। তোর প্রেমিকা হোক বা বউ। যেই মেয়েই হবে, খুব ভাগ্যবতী হবে। ‘
ফায়াজ হেসে উঠলো। সায়েরীর চোখে চোখ রেখে ধীর কন্ঠে বললো,
‘ মনের কথা জানিয়ে দিই তবে? ‘
‘ একদম। ‘
‘ ঠিকাছে৷ শীঘ্রই জানিয়ে দিবো। ‘
‘ অল দ্যা বেস্ট। ‘

বেলা ৩টা বেজে ৩৫ মিনিট। অল্প কিছুক্ষণ আগেই কলেজ ছুটি হয়েছে। সাফ্রিন বেরিয়ে গিয়েছে৷ ছেলে তিনজন বেরিয়েছে সবার আগে। সায়েরী ব্যাগ গুচাচ্ছে। তার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে নাজরাত এবং তোহা। দুজনেই মহা বিরক্ত। এই মেয়েটা এতো অলস! সব কিছুতে আলসেমি তার। ব্যাগে বইপত্র ঢুকাতে গিয়ে সায়েরী লক্ষ্য করলো তার নোট করা খাতাটা নেই। পরপর দুইবার চেক করার পর সে কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকালো নাজরাতের দিকে। নাজরাত ধমকে উঠলো,

‘ আবার কোন ঝামেলা পাকিয়েছিস? ‘
‘ আমার নোট খাতাটা নেই। পাচ্ছি না। ‘
কপাল চাপড়ালো নাজরাত। এই মেয়েটা এতো অগোছালো কেনো? তোহা হুট করে বলে উঠলো,
‘ সকালে তো লাইব্রেরি রুমে বসে লিখছিলি। ওখানে ফেলে আসিস নি তো আবার? ‘
মনে পড়তেই চট করে ব্যাগ কাঁধে নিলো সায়েরী। দুজনের উদ্দেশ্যে বললো,
‘ তোরা চলে যা। এমনিতেও আলাদা রাস্তা দিয়েই যেতে হবে। ‘
‘ একা যেতে পারবি তো? ‘
নাজরাতের কথা প্রতিউত্তরে সায়েরী যেতে যেতে উঁচু কন্ঠে বললো,
‘ পারবো না কেনো? আজ কি নতুন একা বাড়ি ফিরবো আমি? আজব কথাবার্তা। যা তোরা। টাটা। ‘

তপ্ত শ্বাস ফেলে বেরিয়ে গেলো দুজন। সায়েরী রুম থেকে বেরিয়ে সিড়ির কাছাকাছি পৌঁছাতেই আচমকা তার সামনে এসে দাড়ালো একজন মেয়ে। চমকে উঠলো সায়েরী। মেয়েটার ভাবভঙ্গি দেখে লাগলো যেনো সে অনেক্ষন যাবত সায়েরীর অপেক্ষাতেই ছিলো। কলেজ জুড়ে হাজারো মেয়ে। তাই সামনের মেয়েটাকে সে ঠিক চিনে উঠতে পারলো না। ভ্রুঁ কুঁচকে তাকাতেই মেয়েটা হুট করে তার হাতে একটা কাগজ গুজে দিয়ে চলে গেলো। তাজ্জব হয়ে কয়েক সেকেন্ড হাবলার মতো দাঁড়িয়ে রইলো সায়েরী। তারপর তাকিয়ে দেখলো কাগজটার দিকে। এবড়োখেবড়ো করে ছিড়া একটি সাদা কাগজ। তার মাঝে কালো কালির একটা লাইন লিখা। সেটা পড়ে লিখাটার নিচে লিখা নামটা দেখে আরো বেশি অবাক হলো সে।

ফ্যালফ্যাল করে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর ধীর কদম পেললো সিড়িতে। লাইব্রেরি রুম তিন তলায়। কিন্তু সে গিয়ে দাঁড়িয়েছে দ্বিতীয় তলায়। সম্পূর্ণ ফ্লোর নিরিবিলি। কোনো স্টুডেন্টের আনাগোনা নেই। থাকবে কেনো? ছুটি হয়েছে দশ মিনিটেরও বেশি সময় হচ্ছে। এতোক্ষণ যাবত কেউ বসে থাকবে না নিশ্চয়ই। দ্বিতীয় তলার শেষ মাথায় ছোট্ট একটা ছাদ আছে। খুব ছোট সেটা। সচরাচর কেউ যায়না সেদিকে। কলেজের পেছন দিকের নিরিবিলি ঝোপঝাড় দেখা যায় শুধু সেদিক থেকে। মানুষের আনাগোনা দেখা যায় না। জং ধরা লোহার দরজা ঠেলে আজ বহু মাস পর সেই ছাদে পা রাখলো সায়েরী। মেঘলা আকাশের নিচে ছোট্ট, নির্জন ছাদ। সায়েরী আশেপাশে তাকালো। কোথাও কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তিটির দর্শন না পেয়ে কপালে ভাঁজ পড়লো তার। যেই পিছু ফিরতে যাবে অমতি শক্ত কিছু দিয়ে মাথায় তীব্রভাবে আঘাত করলো কেউ। সঙ্গে সঙ্গে মুখ হা হয়ে গেলো সায়েরী’র। কিন্তু তার গগন কাঁপানো আর্তনাদ চাপা পড়লো কারো হাতের চাপে৷ মুখ দিয়ে উম উম জাতীয় শব্দ শুনা গেলো গেলো শুধু। তীব্র ব্যাথায় মুহুর্তের মধ্যে সব গুলিয়ে যেতে লাগলো সায়েরীর কাছে। চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো একফোঁটা নোনাজল। ছোট্ট, নরম দেহটা ধপ করে আঁচড়ে পড়লো শক্ত জমিনে। তারপর… তারপর সব অন্ধকার।

বিকেল ৪টার কিছু মুহুর্ত পর্ব হতে ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। বাতাসে বাতাসে তান্ডব চলছে চারিদিকে। সময় এখন ৪টা বেজে ২০মিনিট। বসার ঘরে চিন্তিত মুখে বসে আছেন মেহরিন বেগম। সায়েরী এখনো ঘরে ফিরেনি। বারবার দরজার দিকে উৎসুক নজরে তাকাচ্ছেন তিনি। এই মেয়েটা ঘরে ঢুকলো বলে। সচরাচর সাড়ে তিনটায় ছুটি হলে চারটা নাগাদ ঘরে পৌঁছে যায় সায়েরী। মাঝে মধ্যে ট্রাফিকের কারণে অথবা গাড়ি পেতে সমস্যা হলে একটু দেরি হয়। কিন্তু এতো দেরি কখনো হয়না। তারমধ্য আজ আবার বৃষ্টি হচ্ছে একনাগাড়ে। থামাথামির নাম নেই। মেয়েকে দুইবার কল করেও সংযোগ পেলো না বলে মেহরিন বেগম আরো বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। দেয়াল ঘড়ি জানান দিচ্ছে সময় এখন সাড়ে চারটা। সেটা দেখে বুক ধরফর করে উঠেছে মেহরিন বেগমের। নাজরাতের কথা মাথায় আসতেই দ্রুত কল লাগালেন তিনি। পরপর তিনবার রিং হওয়ার পর রিসিভ করলো নাজরাত। সালাম বিনিময় করার পরপরই মেহরিন বেগম উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললেন,

‘ নাজ! বাড়ি পৌঁছে গিয়েছো তুমি? ‘
‘ হ্যাঁ মামীমা। আমি তো চারটার আগেই পৌঁছে গিয়েছি। ‘
‘ সায়েরী এখনো ফিরলো না কেনো তাহলে? ও কি তোমাদের সাথে বের হয়নি? ‘
চমকে উঠলো নাজরাত। সায়েরী এখনো বাড়ি ফিরেনি! অবাক কন্ঠে সে বললো,
‘ সায়ু এখনো পৌঁছাইনি? এত দেরি হওয়ার তো কথা নয়। ‘
‘ আমিও সেটা ভাবছি। আজ এতো দেরি হচ্ছে কেনো? বন্ধুদের কারো সাথে আছে কি? একটু খোঁজ নিয়ে দেখ না মা। ‘
নাজরাতের মনে পড়লো সায়েরী একা বাড়ি ফিরবে বলে তারা আগেই চলে এসেছিলো। তবুও মেহরিন বেগমকে আশ্বস্ত করে বললো,

‘ আমি ওদের কাছে ফোন করে জেনে নিচ্ছি। তুমি চিন্তা করো না। হয়তো জ্যামে পড়েছে। ‘
কল কাটার পরে মেহরিন বেগমের চিন্তা বাড়লো। অস্থির হয়ে ঘরময় পায়চারি করছেন তিনি। বাসায় এখন তিনি এবং আবরারের মা আছেন। সাথে আছে মিনহা। আবরার যদিও আজ সকালে এসেছে চট্টগ্রাম থেকে। কিন্তু আপাতত বাসায় নেই সে। সায়েরীর বাবা এবং বড় বাবা দুজনে এখনো কর্মস্থলে। তারা ফিরবে পাঁচটার পর। মেহরিন বেগমের অস্থিরতা দেখে আবরারের মা এগিয়ে আসলো। সায়েরীর ব্যাপারে জানার পর তিনি নিজেও চিন্তায় পড়ে গেলেন। বাহিরে তখন কালো অন্ধকার। সময়টা বিকেল সাড়ে চারটা হলেও কালো মেঘে ঢেকে রাখা আকাশ দেখে মনে হচ্ছে সন্ধ্যা ছ’টা। মেহরিন বেগম সদর দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মেঝেতেই বসে পড়লেন। নানান ধরনের খারাপ চিন্তা ভাবনা ঘুরছে মাথায়৷ মেয়েটা ঠিক আছে তো? মাত্র সপ্তাহ তিনেক আগে বান্দরবানে এতো বড় ঘটনা ঘটলো। পুণরায় সেটা মনে পড়তেই ভয়ে হৃদপিণ্ড বন্ধ হওয়ার জোগাড় হলো মেহরিন বেগমের।
তোহা, আয়ান এবং ফায়াজকে কল করে সায়েরীর ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে নাজরাত। যদিও সে জানতো আশানুরূপ কোনো খবর পাবে না। হলোও ঠিক তাই। কেউ জবাব দিতে পারলো না। বরং আশ্চর্য হয়ে গেলো এই খবর শুনে। আয়ান এবং ফায়াজের সাথেই নুহাশ ছিলো বলে তাকে আর কল করলো না৷ সাফ্রিন তো সবার আগেই বেরিয়ে গিয়েছিলো। তাকে বলেও লাভ বিশেষ হতো না তাই আর কল করলো না।

বৃষ্টি মাথায় বাড়ি ফিরলো আবরার। মেহরিন বেগম তাকে দেখেই ছুটে আসলেন। সায়েরী ঘরে ফিরেনি একথা বলতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। আবরার আতংকের সাথে বলে উঠলো,
‘ এই ঝড় বৃষ্টির মাঝে সায়ু বাইরে আছে! আর একথা তোমরা আমাকে এখন বলছো? পাঁচটা বাজতে চললো। ‘
মেহরিন বেগম ডুকরে কাঁদছেন। বৃষ্টির মাঝে পুণরায় বেরিয়ে গেল আবরার। সোজা গেলো কলেজে। ছুটি হয়েছে আরো ঘন্টা দেড়েক আগে। ঝুম বৃষ্টি পড়ছে। গেইটে তালা লাগানো। বুক ধরফর করে উঠলো আবরারের। গেলো কোথায় মেয়েটা? কোথায় আছে? আদৌ ঠিক আছে তো? মস্তিষ্ক এলোমেলো ঠেকছে তার। গেইট খুলতে হবে। ভিতরে একটাবার চেক করাটা জরুরি। কিন্তু কাকে বলবে এই মুহূর্তে?

বৃষ্টির দিনে গরম গরম চা এবং পাকোড়া’র আসর বসেছে খান পরিবারে। খুশবু পেয়ে ছুটে আসলো সাফ্রিন। সবে চায়ের কাপ নিয়ে বসেছে এমন সময় ফোন বেজে উঠলো তার। তোহা ফোন করছে। পাশের চেয়ারে ছিলো সাফওয়ান। একই সময় বেজে উঠলো তার মোবাইলটাও। সাফ্রিন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ফোন চাপলো কানে। কিন্তু অপর প্রান্ত হতে কান্না মিশ্রিত কন্ঠে তোহার বলা বাক্যগুলো শুনে হাতের কাপ নড়েবড়ে উঠলো তার। দাঁড়িয়ে পড়লো চট করে। আতংকিত কন্ঠে বললো,

‘ এসব কি বলছিস! সাড়ে পাঁচটার বেশি হয়েছে সময়৷ এখনো সায়েরী বাসায় ফিরেনি? ‘
আবরারকে কল ব্যাক করতে গিয়ে আচমকা হাত থেমে গেলো সাফওয়ানের। চোখ তুলে তাকালো সাফ্রিনের চিন্তিত মুখটার দিকে। কি বললো সে? সায়েরী! সায়েরী এখনো বাসায় ফিরেনি? ভাবনায় ছেদ পড়লো পুণরায় রিংটোনের আওয়াজে। কল রিসিভ করে কানে ধরতেই উপাশ থেকে আবরার অস্থির কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ হ্যালো? সাফওয়ান! শুনতে পাচ্ছিস? ‘
‘ হুম, বল। ‘
‘ সায়েরী এখনো বাড়ি ফিরেনি দোস্ত। তিনটার পর ছুটি হয়েছে কলেজ। এখন ছটা বাজতে চললো। আমি..আমি কলেজ গেইটের সামনে। ভিতরে খালি দেখাচ্ছে। কিন্তু একবার চেক করতে চাচ্ছি। বুঝে উঠতে পারছি না কি করবো। আই নিড ইউর হেল্প দোস্ত। প্লিজ কিছু কর। ‘
আবরারের বলা কথাগুলো শুনে থম মেরে রইলো সাফওয়ান। মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে পড়েছে যেনো। আবরার উপাশ থেকে হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছে। ঘোর কাটতেই চট করে উঠে দাঁড়ালো সাফওয়ান। আবরারের উদ্দেশ্যে ছোট্ট করে বললো,

‘ আমি আসছি। ‘
গাড়ির চাবি নিয়ে বেরুতে গিয়েও থামলো সেকেন্ড দুয়েকের জন্য। আবরারের চিন্তার কারণ বুঝতে পেরে সে দ্রুত পা ফেললো তার বাবা নওশাদ খান’র রুমের উদ্দেশ্যে। তাড়াহুড়ায় নক না করেই রুমে পা ফেললো সে। নওশাদ খান তখন রকিং চেয়ারে বসে কিছু ফাইল ঘাটছিলেন। হুট করে সাফওয়ানের আগমনে চোখ তুলে তাকালেন তিনি। তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সাফওয়ান ব্যাস্ত কন্ঠে বললো,
‘ কলেজে যাচ্ছি। অথোরিটি থেকে কোনো কমপ্লেইন আসলে সামলে নিও। ‘
বলেই দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো সে। তাজ্জব হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন নওশাদ খান। কি বলে গেলো এই ছেলে? কলেজ যাচ্ছে তাও এসময়! আবার বলছে অথোরিটি থেকে কমপ্লেইন আসার কথা৷ এই ছেলে করতে চাইছে টা কি?

ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে গেলো সাফওয়ান। পেছন থেকে তাহুরা খান বেশ কয়েকবার নিষেধ করলেন বৃষ্টির মধ্যে বের না হওয়ার জন্য। কিন্তু সাফওয়ান না শুনার মতো করে বেরিয়ে পড়লো গাড়ি নিয়ে। গাড়ি স্টার্ট করে খবর দিলো জিমনকে। তারপর কল করলো নাজরাতের নাম্বারে। রিসিভ হতেই গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ সাফওয়ান বলছি। ‘
নাজরাত একটুখানি ভয় পেলো বোধহয়। ঢোক গিলে জবাব দিলো,
‘ বলুন ভাইয়া। ‘
‘ সুবহা কলেজ ছুটির পর কোথাও গিয়েছিলো? ‘
‘ না ভাইয়া। কোথাও গেলে তো আমরা জানতামই। ‘
‘ কলেজ থেকে বেরুতে দেখেছিলে? কারো সাথে গিয়েছে? ‘
‘ আমরা যখন বেরিয়েছি তখন ও লাইব্রেরি রুমে যাচ্ছিলো। ওর নোটস ছিলো সেখানে। ‘
‘ তারপর? ‘
‘ এরপর বেরিয়েছে কিনা জানি না। আমরা আগেই চলে এসেছিলাম। ‘

সেকেন্ড দুয়েক নিরবতার পর খট করে শব্দ হলো। লাইন ডিসকানেকটেড হয়ে গিয়েছে। মোবাইল হাতে নিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেললো নাজরাত। সাফওয়ানের স্বাভাবিক কন্ঠের প্রশ্ন শুনেও ভয়ে দুরুদুরু কাঁপছিলো সে।
কলেজ গেইটের কাছাকাছি পৌঁছে দ্রুত গাড়ি ছেড়ে নেমে দাঁড়ালো সাফওয়ান। ফুটপাতে ছাউনির নিজে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে আবরার। ভিজে ছুপছুপ হয়ে আছে মাথা থেকে পা অবধি। তার এই অবস্থা দেখে সাফওয়ান দ্রুত এগিয়ে গেলো। তার উপস্থিতি ঠের পেয়ে মাথা তুললো আবরার। ক্লান্ত গলায় বললো,
‘ আশেপাশের সব জায়গায় দেখেছি। কোথাও নেই ও। এতোক্ষণ হয়ে গেলো। আমি বুঝতে পারছি না কিছু দোস্ত। আমার মাথা ঘুরছে৷ ‘

আবরারের কন্ঠটা শুনে সাফওয়ান দীর্ঘ শ্বাস ফেললো গোপনে। কাঁধে হাত রেখে বললো,
‘ কলেজের ভিতরে একবার দেখে নিই আগে। হয়তো সেখানেই আছে। ‘
‘ না জানি কোন অবস্থায় আছে। উল্টো পালটা ভাবতেও বুক কাঁপছে আমার। ‘
‘ ভাবতে বলেছে কে? ইন শা আল্লাহ, কিছু হবে না ওর। উঠ, আয়। কলেজের ভিতরটায় চেক করি। ‘
ইতোমধ্যে জিমন, রায়ান,মিহাদ তিনজনই হাজির। সাফওয়ানের বলার অপেক্ষা না করে তারা এসেই আগে তালা ভাঙ্গলো। ভেতরে প্রবেশ করে তিনজন গেলো অনার্স ভবনের দিকে। দুজন গেলো ইন্টারমিডিয়েট ভবনের দিকে। প্রতিটা রুমের তালা ভেঙ্গে চেক করলো। গলা ফাটিয়ে চেঁচালো। কিন্তু কোনো জবাব পেলো না। কোথাও কোনো হদিস মিললো না সায়েরীর। আবরার ভেঙ্গে পড়লো খুব। পরিবারের সকলে একের পর এক কল করেই যাচ্ছে। মেহরিন বেগমের প্রেশার লো হয়ে মাথা ঘুরে উঠেছে। সম্পূর্ণ কলেজে তল্লাশি করেও সায়েরীর হদিস পেলো না কোনো। সকলে যখন একত্রিত হলো, ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে উপস্থিত হলো আয়ান, ফায়াজ এবং নুহাশ। তিনজনই উৎসুক নজরে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু বাঁকি পাঁচজনের মুখশ্রী দেখে বুঝলো, ফলাফল শূন্য। সকলের দিকে তাকিয়ে জিমন বললো,

‘ কলেজে তো দেখলামই। এখানে নেই। বাইরে গিয়ে আশেপাশে ভালো করে খোঁজ নেওয়া উচিৎ। ‘
সম্মতি জানালো বাকিরা৷ চলে যেতে উদ্যত হয়ে খেয়াল করলো সাফওয়ান এখনো ঠাঁই দাঁড়িয়ে। রায়ান বললো,
‘ দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? চল। ‘
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কিছু এক ভাবলো সাফওয়ান। তর্জনী দিয়ে ভ্রুঁ চুলকে বললো,
‘ আমার মনে হচ্ছে আরো একবার ভালো করে দেখা উচিৎ। আমার সাথে দুজন থেকে বাকিরা আশেপাশে খোঁজ নাও।

সাফওয়ানের কথায় মত পোষণ করে থেকে গেলো মিহাদ এবং আয়ান। বাকিরা গাড়ি নিয়ে ছুটলো আশেপাশে খোঁজ নিতে। সাফওয়ান শুরুতেই গেলো তৃতীয় তলায় লাইব্রেরি রুমে। গলির এমাথা থেকে ওমাথা অবধি চেক করলো। ব্যার্থ করে নেমে আসলো দ্বিতীয় ফ্লোরে। সেটা পেরিয়ে নিচে নামবে এমন সময় কানে আসলো বাতাসের দাপটে লোহার দরজার তীব্র আওয়াজ। ফিরে তাকালো তিনজনই। প্রতিটা ক্লাসরুমের দরজা কাঠের তৈরি। তাহলে এই শব্দ! কৌতুহল বশত এগিয়ে গেলো তারা। ফোনের লাইন অন করে অন্ধকার বারান্দায় ধরলো মিহাদ। শেষমাথায় ছাদের দরজার সামনে পড়ে থাকা ব্যাগটা দূর থেকেই চিনে ফেললো আয়ান। উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ এটা…এটা সায়েরীর ব্যাগ। ‘

দ্রুত পায়ে এগুলো তারা। সবার আগে জং ধরা দরজা ঠেলে ছাদে পা ফেললো সাফওয়ান। চোখের সামনে বৃষ্টির মাঝে জবুথুবু হয়ে অচেতন হয়ে থাকা মেয়েটাকে দেখে হৃদস্পন্দন থমকে গেলো তার। বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সেকেন্ড দুয়েক। তারপর একছুটে কাছে গিয়ে ছোট্ট দেহটা আগলে নিলো বুকের মধ্যিখানে। শরীরে স্পর্শ লাগতেই আৎকে উঠলো সে। এতো ঠান্ডা! সাফওয়ানের ছুটে যাওয়া দেখে ঘোর থেকে বেরিয়ে ছুটে আসলো বাকি দুজন। সায়েরীর মাথাটা বুকে চেপে ধরে সাফওয়ান চাপড় মারলো গালে। অস্থির কন্ঠে ডাকলো বারকয়েক। কন্ঠস্বর কেঁপে কেঁপে উঠছে তার। ধরফর করছে বুক। চঞ্চল চোখে সে মোবাইলের আলোয় যতোটুকু সম্ভব পরখ করলো সায়েরীর দেহ। নাহ! শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। সবটা স্বাভাবিক দেখে একটুখানি স্বস্তি পেলো যেনো। কিন্তু অস্থিরতা কমলো না। সাফওয়ানের এমন অস্থিরতা দেখে মিহাদ মুখ খুলল,

‘ সায়েরীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে দোস্ত। এমনিতেই অনেক্ষন বৃষ্টির মধ্যে ছিলো। ‘
ঘোর কাটলো সাফওয়ানের। দ্রুত পাজা কোলে তুলে নিলো শীতল, নরম শরীরটা। বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে যেতে লাগলো। পেছন থেকে মিহাদ সায়েরীর ব্যাগ তুলে নিলো বারান্দা থেকে। সেই সময় সাইড পকেট থেকে টুপ করে পড়লো কিছু একটা। মিহাদ তুলে নিলো কাগজটা। কৌতুহল বশত সেদিক তাকিয়ে বোকা বনে গেলো সে। এবড়োখেবড়ো সাদা কাগজের মাঝ বরাবর লিখা রয়েছে,
‘ সেকেন্ড ফ্লোরের দক্ষিণের ছাদে আসো। আমি অপেক্ষা করছি। ‘
~সাফওয়ান

মিহাদ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো কাগজটার দিকে। আয়ানের ডাক পড়তেই চট করে কাগজটা পকেটে ঢুকিয়ে সে দৌঁড় লাগালো। মিহাদ বসেছে ড্রাইভিং সিটে। পাশে আয়ান। ব্যাক সিটে সায়েরীকে নিয়ে বসেছে সাফওয়ান। সায়েরীর ভেজা শরীর থরথর কাঁপছে। ঠান্ডায় হীম হয়ে উঠছে আরো বেশি। সাফওয়ান হাতে হাত ঘঁষেও কূল পাচ্ছে না। হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে সে বলে উঠলো,

‘ গাড়ির ডিকিতে আমার জিমিং ব্যাগে শার্ট আর তোয়ালে আছে৷ ওগুলো বের করে দে। ‘
মিহাদ গাড়ি স্টার্ট করছিলো বলে আয়ান নিজেই বের করে দিলো। চতুর সে সাফওয়ানের সব গতিবিধি লক্ষ্য করতে লাগলো সুক্ষ্ম চোখে৷ সাফওয়ান বললো গাড়ির লাইট নিভিয়ে দিতে। কথামতো সেটাই করলো মিহাদ। অন্ধকারের মধ্যেই সাফওয়ান নিজের শুকনো শার্ট জড়িয়ে দিলো সায়েরী’র ভেজা শরীরে। তোয়ালে দিয়ে যতোটুকু সম্ভব চুলের পানি শুষে নিলো। পালা করে ঘষছে সায়েরীর দুহাতের তালু। কিন্তু দেহের কম্পন থামছেই না। সাফওয়ান সহ্য করতে পারলো না এই দৃশ্য। শক্ত করে বুকের মাঝে চেপে ধরলো সিক্ত,নরম দেহটি। চোখ বুজে বড় বড় শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলো। বুকের বাঁ পাশে পুণরায় উপলব্ধি হচ্ছে সেই তীক্ষ্ণ ব্যাথা৷ হৃদস্পন্দন এতো জোরে জোরে বাজছে যেনো এখুনি ফেটে যাবে।

হাসপাতালে পৌঁছে দ্রুত ইমার্জেন্সি তে পাঠিয়ে দিলো সায়েরীকে। ইতোমধ্যে খবর পেয়ে আবরার সহ সায়েরীর মা বাবা সকলে হাজির। মেহরিন বেগম কাঁদতে কাঁদতে নাজেহাল হয়ে আছে। সায়েরীর বাবাও চিন্তায় চিন্তায় প্রেশার ডাউন করে বসেছে। চিকিৎসা শেষে ডক্টর বেরিয়ে আসতেই সকলে উৎসুক নজরে তাকালো ডক্টরের দিকে। চোখের চশমা ঠেলে ডক্টর বলে উঠলো,
‘ পেশেন্টের হাইপোথারমিয়া ( hypothermia ) হয়েছে। ‘
আবরার অবাক কন্ঠে বললো,
‘ মানে? ও ঠিক আছে তো? ‘
‘ আপাতত ঠিক আছে। বডি টেম্পারেচার একদম লো হয়ে গিয়েছিলো। ভালো করেছেন সঠিক সময়ে নিয়ে এসে। নয়তো.. হার্ট ফেইল করার সম্ভাবনা ছিলো। ‘

বাক্যটা কর্ণগোচর হতেই থমকে গেলো সকলে। মেহরিন বেগম ডুকরে উঠলেন পুণরায়। তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে আবরারের মা। ধীরে ধীরে রাত বাড়লো। সায়েরীকে নরমাল কেবিনে শিফট করা হলো৷ মাঝ রাতের দিকে জ্ঞান ফিরবে বলে জানিয়েছে ডক্টর। মেহরিন বেগমের অবস্থা খারাপ বলে আবরার তাকে জোর করে পাঠিয়ে দিলো বাসায়। সেই সাথে সায়েরীর বাবা এবং নিজের বাবাকেও পাঠিয়ে দিলো। রাতটুকু রেস্ট দরকার। নয়তো সকালে সায়েরীর খেয়াল রাখতে পারবে না। মিহাদ, জিমন, রায়ান, ফায়াজ, নুহাশ আয়ান সকলে থম মেরে বসে রইলো জায়গায় জায়গায়। রাত ১১টার দিকে এক প্রকার জোর করে আয়ানদেরকে বাসায় পাঠিয়ে দিলো আবরার। নিজের বন্ধুদের কেও চলে যেতে বলেছিলো। মিহাদ যাবেনা বলে অনড়। সাফওয়ান ডক্টরের কথা শুনে সেই যে মাথা ঝুঁকিয়ে বসেছে, আর নড়নচড়ন নেই তার। শেষ অবধি সাফওয়ান এবং মিহাদ বাদে চলে গেলো সকলে। রাত বাড়তে লাগলো ধীরে ধীরে। সাফওয়ানের থমথমে মুখশ্রী দেখে মিহাদ আবরারের উদ্দেশ্যে বললো,

‘ চল, নিচে গিয়ে চা খেয়ে আসি। একটু ফুরফুরা লাগবে। রাত তো পরেই আছে এখনো। ‘
‘ তোরা যা। আমি ঠিক আছি। ‘
‘ আরে সাফওয়ান চা খায়না, জানিস না? চল তুই। নিজের হাল দেখ। সাফওয়ান আছে তো পাহাড়া দেওয়ার জন্য। আয় আয়, চল ‘
অগত্য মিহাদের জোড়াজুড়ি তে উঠে গেলো আবরার। সাফওয়ান তখনো থম মেরে বসে। না মাথা তুলে তাকালো, না কোনো প্রতিউত্তর করলো।

নিস্তব্ধ রুম। বেডের উপর অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে চোখ বুজে পড়ে আছে সায়েরী। একটু একটু করে চেতনা ফিরছে তার৷ উপলব্ধি করতে পারছে, সে এখন হাসপাতালের বেডে। রুমের নিস্তব্ধতা ভেদ করে কানে আসলো দরজা খোলার শব্দ। সায়েরী চোখ মেলে তাকাতে চাইলো। কিন্তু শক্তি পেলো না। কে এসেছে? কোনো পদচারণের শব্দ শুনা যাচ্ছে না কেনো? দরজা বন্ধ করার শব্দ আসলো কানে। সঙ্গে সঙ্গে অক্সিজেন মাস্ক ভেদ করে নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করলো চিরপরিচিত পুরুষালি সুঘ্রাণ। বুক ধরফর করে উঠলো সায়েরীর। অনেক জোর করেও চোখজোড়া মেলতে পারলো না সে। মানুষটার কোনো গতিবিধি ও অনুভব করতে পারছে না৷ এভাবে কাটলো মিনিট পাঁচেক।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৩+৩৪

সায়েরীর মনে হলো মানুষটা এইতো তার পাশে দাঁড়িয়ে। নিজের বাদামি মণির চোখজোড়া দিয়ে হয়তো পরখ করছে সায়েরীকে। ভাবনার মাঝে হঠাৎ সায়েরীর মুখের উপর নেমে আসলো উত্তপ্ত শ্বাস প্রশ্বাস। সেই সাথে তার ছোট কপালে নরম এক স্পর্শ। হৃদস্পন্দন থমকে গেলো যেনো সায়েরীর। পরপর কানের কাছে অনুভব করলো সেই নরম স্পর্শটা। সেই সাথে শুনা গেলো মানুষটার শান্ত, শীতল কন্ঠস্বর,
‘ তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাও বোকাপাখি। তোমার এই নিরবতা আমার বুকে ঝড় তুলছে। ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৭+৩৮