অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫৯+৬০
সাজিয়া জাহান সুবহা
সময়ের বিবর্তনে কেটে গিয়েছে প্রায় দুটো সপ্তাহ। মে মাসের শেষের দিক এখন। আগামী মাস হতে রমযান। ঈদের পর প্রি-টেস্ট এক্সাম। পড়াশোনার বেড়াজালে হাঁসফাঁস অবস্থা ছয় বন্ধু বান্ধবের৷ নুহাশ বরাবরের ন্যায় গা ছাড়া ভাব ধরে আছে। কিন্তু তার সঙ্গ দেওয়ার জন্য এবারে আরেক ফাঁকিবাজ মেয়েটা নেই। নুহাশ দিন দিন আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করে এই তিন ফুট দুই ইঞ্চির মেয়েটা ইদানীং পড়াশোনা নিয়ে ব্যাপক সিরিয়াস। সন্ধ্যা রাতে ঘুমে তলিয়ে থাকার বদলে এখন রাত প্রায় বারোটা অবধি ডুবে থাকে বইয়ের পাতায়৷ এই মীরজাফর গিরি সে মেনে নিতে পারেনা৷ মেয়েটা এমন পল্টি খেয়ে যেতে পারল? সিঙ্গেলত্ব তো দেখি সব দিক থেকেই আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে তাকে। যেদিকে তাকায় সেদিকেই সে একা। কেউ নেই সাথে। এ কেমন কপাল তার? অন্তত একটা ফেইল পার্টনার তো ডিজার্ভ করে সে! কিন্তু এখন দেখো, যে একটা মাথামোটা পার্টনার ছিল সেও এখন বিদ্যাসাগরে রূপান্তর হয়েছে। সবকটা ধান্ধাবাজ!
রাত এখন সাড়ে এগারোটা। নিজের রুমের স্টাডি কর্ণারে চেয়ারে দুই পা গুটিয়ে বসে আছে সায়েরী। ভীষণ রকমের এলোমেলো হয়ে থাকা চুলগুলো এই যাত্রায় দক্ষ হাতে খোঁপায় আটকে ফেললো সে। তাতে গুজে দিল হাতে থাকা পেন্সিল-টা। ঘুমঘুম চোখ মেলে খাতায় দৃষ্টি রেখেছে সে। কুঞ্চিত কপাল, ঠোঁটে ঠেসে ধরেছে কলম। মস্তিষ্কে জট লেগে আছে। কিছুতেই ম্যাথ টা সলভ করতে পারছে না সে। মিনিট খানিক নিরবতায় কাটিয়ে এই যাত্রায় বইয়ের সঙ্গে ঠেস দেওয়ানো মোবাইল-টার দিকে তাকালো সে। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে পাঁচ বন্ধু বান্ধবের মুখশ্রী। সেদিকে তাকিয়ে সে থমথমে গলায় বলে উঠলো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
‘ তোরা কেউ-ই পারবি না? সাফা! আবার একটু ট্রাই করে দেখ না, প্লিজ!! ‘
বই পাতায় মুখ গুঁজে রাখা সাফ্রিন ফুঁস করে শ্বাস ফেলে জবাব দিল,
‘ এই অবধি চার বার ট্রাই করলাম। মিলছে না তো। হয় রুলস ভুল হচ্ছে, না তো অ্যামাউন্ট এদিক সেদিক বসিয়েছি। আচ্ছা আপাতত এভাবেই রেখে দে না। কাল নাহয় তোর টিচার কে বলে দিবি সলভ করে দিতে। কার কোচিং-এ যেন পড়িস… রাতুল ভাইয়া, না? ‘
সায়েরী থতমত খেয়ে গেল পুণরায় এই প্রশ্নে৷ এই মিথ্যেটা বারে বারে বলতে বলতে সে ক্লান্ত। আজও মাথা দুলিয়ে সায় জানাল সে। আয়ান বললো,
‘ এত প্যারা নেওয়ার কি আছে? ট্রাই করেছিস তো নাকি! রাতুল ভাইয়া তো যথেষ্ট ঠান্ডা মেজাজের। তুই অযথা এত প্যানিক করিস কেনো বুঝি না। ঠান্ডা মাথায় ঘুমা৷ আর আমাদের কেও ঘুমাতে দে এবার। ‘
একথার রেশ টেনে নাজরাত বলে উঠলো,
‘ একদম ঠিক কথা। তুই শুধু শুধু উটকো চিন্তা করছিস। ফোন রাখ বোন এবার। আমার বর-টা সেই কখন দুই দুইবার ফোন দিয়েছে। ওয়েটিং দেখে নিশ্চয়ই ভাবনায় পড়ে গেছে। তোর ম্যাথ এর চক্করে এদিকে আমার সংসার ভেসে যাবে। ‘
তোহা বহু আগেই বেডে গা এলিয়ে দিয়েছিল। নাজরাতের কথা শুনে সে মুখ থেকে চাদর সরিয়ে বলে উঠলো,
‘ তুই কেন যে এখনো এসব পড়াশোনা নিয়ে প্যারা নিচ্ছস সেটাই আমি বুঝতে পারছি না। আমি হলে কবেই ঠ্যাং দেখিয়ে সরে আসতাম। আরামে সংসার করে ডজন খানিক বাচ্চা জন্ম দিতাম। আহ জীবন! ‘
আয়ানের কপালে ভাঁজ পড়ল একথায়। সে প্রতিউত্তর করলো দ্রুত গলায়,
‘ ডজন খানিক বাচ্চা! সিরিয়াসলি? আমি যথেষ্ট সচেতন নাগরিক। দুটোর বেশি বাচ্চা জন্ম দেওয়ার স্বপ্ন দেখা বাদ দিয়ে দে। ‘
‘ তোর সচেতনতার জন্য আমি ভাবনা বন্ধ করবো কেনো হ্যাঁ? আমার বাচ্চার সাথে তোর কি সংযোগ? তোকে বিয়ে করবো বলেছি আমি? ‘
এটুকু কথা শুনে বাকি তিন বান্ধবী কপাল চাপড়াল৷ হতাশ গলায় আওড়াল,
‘ আবারো ব্রেকআপ!! ‘
সকলের এমন গাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে নুহাশ-ও দারুণ গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
‘ ভুলে আপনাদের ব্যাক্তিগত কামরায় ঢুকে পড়েছি বোধহয়। আমি মাসুম পথ হারিয়ে ফেলেছি। দয়া করে সঠিক পথ চিনিয়ে দিয়ে ধন্য করুন। ‘
তার কথা শুনে ফিক করে হেসে দিলো বাকি তিনজন। রাত হয়েছে যথেষ্ট। একে একে কথা সেরে কল রাখার আগ মুহুর্তে নুহাশ আচানক সিরিয়াস কন্ঠে খানিকটা চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
‘ এই খাড়া! শুন, শুন। ঘুমানোর আগে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা মাথায় রাখ.. ‘
সকলে কল কাটতে নিয়েও উৎসুক নজরে তাকায়। নুহাশ দাঁত খেলিয়ে হেসে বেসুর কন্ঠে গেয়ে উঠে,
❝ সখি তোরা প্রেম করিওনা
পিরিত ভালা না!! ❞
সাফ্রিন হেসে উঠলো উচ্চ স্বরে। বাকিরা সরু চোখে চেয়ে। বিড়বিড় করে নুহাশকে দুই চারটা গালিও দিল বোধহয়। তারপর কল কাটলো একে একে। স্ক্রিন হতে বন্ধুদের মুখশ্রী মিলিয়ে যেতেই সায়েরীর মুখের হাসিটুকু-ও মিলিয়ে গেল কোথাও। উদাসীন নজরে তাকাল খাতার দিকে৷ বন্ধুদের কাছ থেকে চেপে গিয়েছিল রোজ সকালে গ্রীন ভ্যালি যাওয়ার কথাটা। কেন যেন ভীষণ সঙ্কোচ লাগছিলো একথা বলতে। এত বড় বাড়িতে কেবল সাফওয়ান ভাই এবং সে ঘন্টা খানিক সময় একাকী থাকে৷ এসব শুনে না জানি কি ভেবে বসে তারা। এজন্যই লজ্জায়, সঙ্কোচে বলার সাহস হয়নি সায়েরীর।
খাতা বন্ধ করে চেয়ার থেকে পা নামালো সে৷ হাঁটতে গিয়ে রিনিঝিনি শব্দ তুলল বাম পায়ে পরিহিত পায়েল-টা। সায়েরী বেডে বসে পায়েল টার দিকে তাকিয়ে রইল কিয়ৎক্ষণ। রূপালী রঙের খুবই ইউনিক ডিজাইনের পায়েল-টি৷ খানিকটা ভারীও। দুই সপ্তাহ আগে, বদ্ধ গাড়িতে দীর্ঘ এক আলিঙ্গনের পর এই পায়েল-টা সায়েরীর আহত পায়ে পরিয়ে দিয়েছিল সাফওয়ান। প্রেমিক পুরুষ হতে প্রথম উপহারটি পেয়ে সায়েরী পুলকিত হয়েছিল সেদিন। কিন্তু এখন কেন যেন এই দামী বস্তুটি দেখলেই মন খারাপেরা আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তাকে। সে তো সেদিন সাফওয়ান ভাইয়ের উপস্থিতি পেয়েই সব অভিমান ভুলে গিয়েছিল। মনেও রাখেনি যে সাফওয়ানের দেওয়া আঘাত বয়ে বেড়াচ্ছে সে। অভিমান ভাঙ্গাতে একটুখানি সঙ্গ, একটা উষ্ণ আলিঙ্গন চেয়েছিল কেবল। সেসব পেয়েছিল-ও।
কিন্তু বোকা সে জানতই না সেদিনের ওই বৃষ্টির জলের সাথেই মিলিয়ে গেছে সব। নতুন দিনের সূচনাতে সাফওয়ান ভাই ফের নিজেকে মোড়ে নিয়েছে গাম্ভীর্যের আড়ালে। এখন সে কেবলই সায়েরীর পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়ে রেখেছে। এর বাহিরে যেন সায়েরী নামক রমনীর সঙ্গে কোনো সখ্যতা নেই তার। আদুরে স্বরে কথা বলা বোধহয় ভুলেই গিয়েছে। আহামরি ঘনিষ্ঠতা তো কখনো ছিলই না তাদের মাঝে। যা ছিল তা-ও খেই হারিয়েছে। গত দুই সপ্তাহ যাবত যে সাফওয়ানের সঙ্গে রোজ ঘন্টা দুয়েক সময় কাটাচ্ছে সায়েরী, ওই সাফওয়ান কে সে বোধহয় চিনেই না। মানুষটা কেন এতোটা কঠোর হয়ে থাকে আজকাল? কেন একটাবার পড়াশোনার বাহিরে অন্য কোনো কথা টানে না। কেনো এই ছোট্ট প্রেয়সীর মন খারাপ টুকু আজকাল তার হৃদয় ছুঁই না? কেনো আজকাল ওই সুন্দর বাদামী চোখজোড়া গভীর নজর ফেলে তাকায় না তার দিকে?
ভাবতে ভাবতে দৃষ্টি টলমল করে উঠল সায়েরীর। আলগোছে কাত হয়ে শুয়ে পড়লো সে। রোজ রাতের মতো আপনমনে ফের একবার অভিযোগ তুলল,
‘ আপনি কেনো এমন বদলে যাচ্ছেন সাফওয়ান ভাই? ‘
সকাল সাড়ে সাতটার দিকে বাধ্যগত কারণে বিছানা ছাড়তে হয়েছে সায়েরীকে। ফ্রেশ হয়ে জামা বদলাতে হয়েছে। শরীর খারাপ হয়েছে আচমকা। মেহরিন বেগম নাশতার সঙ্গে এককাপ গরম দুধ দিয়ে গেলেন তাকে। মিনহার দেরি হচ্ছে বলে দাঁড়িয়ে থেকে সায়েরীকে খাওয়ানোর ফুসরত পেলেন না। মেডিসিন রেখে গেলেন নাশতার প্লেটের পাশেই। বারবার করে বললেন যেন পেট ভরে খেয়ে ঔষধ টুকু খেয়ে নেয়। সায়েরী চেয়েও খেতে পারল না। সকালে ঘুম ছেড়ে উঠামাত্র খেতে বসলেই বমি পায় তার। এই অভ্যাস বহু বছরের। তবুও আজ অল্পখানি খাবার মুখে তুলল সে। মেডিসিনের পাতা হাতে নিয়েছে এমন মুহুর্তে তার মোবাইল বেজে উঠলো কর্কশ শব্দে৷ সাফওয়ান ফোন করছে। তপ্ত শ্বাস ফেলে কল রিসিভ করে মোবাইল কানে চাপল সে। শুনা গেল বরাবরের সেই রাশভারি কন্ঠ,
‘ এখনো উঠোনি? আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি সুবহা! ‘
সায়েরী মিনমিন কন্ঠে শুধালো,
‘ আজ না আসি? একটু শরীর খারাপ লাগ… ‘
বাকি কথাটুকু শেষ করার পূর্বে সাফওয়ানের ধমক শুনে কেঁপে উঠল মেয়েটা৷
‘ ফাজলামি পেয়েছো? কাল বলেছিলাম আজ টেস্ট নিব। আর আজকেই শরীর খারাপ হয়ে গেলো তোমার? এক্সাম নিয়ে আদো চিন্তা আছে? আমি এত এত এফোর্ট ঢালছি সেটা কোনো ভ্যালিও নেই তোমার কাছে? নিজেকে নিয়ে আর কবে সিরিয়াস হবে? সব কিছু টলারেট করি বলে এসবও মেনে নিব তা ভাবলেও কি করে? চুপচাপ নিচে এসো।
আজকের এই ব্যবহার ভীষণ রকমের অপ্রত্যাশিত ছিল সায়েরীর কাছে। সাফওয়ানের এহেন প্রতিক্রিয়া ঘূর্ণাক্ষরেও আশা করেনি সে। তীব্র অভিমানী হৃদয় আরও বেশি ভারী উঠলো আজ। থুতনি কাঁপছে কান্না চেপে রাখার প্রচেষ্টায়। নিজেকে যথেষ্ট স্বাভাবিক রেখে সে অনুভূতিহীন কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ দশ মিনিট সময় দিন। আমি আসছি। ‘
সাফওয়ানের প্রতিউত্তর শোনার অপেক্ষা না করেই ফোন কেটে দিল সে। ঘনঘন চোখের পলক ঝাপটে, দুইহাতে মুখ ঘষে সামলাল নিজেকে। অশ্রু গড়াতে দিল না আজ। অতঃপর তৈরি হয়ে বের হলো রুম থেকে৷ মেহরিন বেগম যাওয়ার জন্য নিষেধ করতেই সে নিম্ন কন্ঠে জবাব দিল,
‘ কোচিং থেকেই ফিরে আসব আম্মু। কলেজে যাব না। চিন্তা করো না। ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে তাই যেতে হচ্ছে। ‘
সায়েরীর পরণে কালো জিন্স, হাটু সমান কালো টপ এবং গোল করে পেঁচানো কালো একখানা স্কার্ফ। কলেজ ইউনিফর্ম এর বদলে সম্পূর্ণ কালো রঙে নিজেকে মুড়িয়ে নেওয়ার মানে বুঝলো না সাফওয়ান। গাড়ির কাচের উপর দিয়েই সায়েরী’র দিকে তাকিয়ে রইল সে। সায়েরী নিঃশব্দে দরজা খুলে ফ্রন্ট সিটে বসে পড়ল। ব্যাগ রাখল কোলের উপর। তার চোখ মুখ আজ অন্যরকম। সাফওয়ানের কপালে ভাঁজ পড়ল। মেয়েটা কি আসলেই অসুস্থ! চিন্তিত ভঙ্গিতে সে হাত বাড়াল সায়েরীর কপাল ছোঁয়ার তাগিদে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে চট করে মুখ সরিয়ে ফেললো সায়েরী। অনুভূতিহীন কন্ঠে জানতে চাইল,
‘ কি করছেন? ‘
‘ মুখ শুকনো লাগছে কেনো? আজকেও খাওনি? শরীর খারাপ লাগছে? ‘
কন্ঠে বোধহয় একটুখানি অস্থিরতা, উদ্বেগ ঠের পেল সায়েরী। কিন্তু অভিমান ছাপিয়ে মন ছুঁতে পারল না সেসব। নির্লিপ্ত কণ্ঠে সে জবাব দিল,
‘ শরীর খারাপ হবে কেনো? আমি তো রোবট। এসব শরীর খারাপের বাহানা আমার সাথে যায় না। ‘
তার কন্ঠের এই নির্লিপ্ততা ঠাহর করতে পেরে তপ্ত শ্বাস ফেললো সাফওয়ান। নিত্যদিনের ন্যায় সিটবেল্ট বাধার জন্য কাছ ঘেঁষতে চাইলে সায়েরী সেই সুযোগ টাও ছিনিয়ে নিল আজ। নিজেই আটকাতে চাইল সিটবেল্ট। কিন্তু বরাবরের মতোই সে ব্যর্থ। টানতে টানতে শক্তি ফুরিয়েছে এমন সময় হাতের উপর এগিয়ে আসলো সাফওয়ানের শক্তপোক্ত একটি হাত। সায়েরী না চাইতেও ফিরে তাকালো। সে অবস্থাতেই সাফওয়ান নম্র কন্ঠে শুধালো,
‘ ধমক দিতে চাইনি। কিন্তু তুমি বাধ্য করেছ। যা বলেছি তোমার ভালোর জন্যই বলেছি। ‘
সাফওয়ানের চোখে চোখ রাখল সায়েরী৷ কেমন এক মলিন সুরে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আফসোস! আমার ভালোটা কিসে, তা আপনি আজও বুঝে উঠতে পারলেন না৷ ‘
সাফওয়ান এক মুহুর্তের জন্য চমকাল বোধহয়৷ ভাবলো, সে কি আসলেই সায়েরীকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে?
‘ এখন আপনার দেরি হচ্ছে না? ‘
গম্ভীর কন্ঠ সায়েরীর। মেয়েটা জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। সাফওয়ান বেজায় অবাক আজকের এমন আচরণে। অন্য দিনের মতো মেয়েটা আগ বাড়িয়ে কথা আগাচ্ছে না। নিজ থেকে দিনের অহেতুক ঘটনা বলে শুনাচ্ছে না৷ সামান্য ধমকের জন্য এমন আচরণের মানে হয়?
গ্রীন ভ্যালিতে দুজন উপস্থিত হয়েছে আধ ঘন্টা হলো। সায়েরী আজ বইয়ের দিক থেকে চোখ-ই তুলছে না। সাফওয়ান গতকাল যে দুটো ম্যাথ দিয়েছিল সেখান থেকে একটা সলভ করতে সফল হয়নি সায়েরী। সাফওয়ানের ইচ্ছে করলো না চুপসে থাকা মেয়েটাকে ফের ধমকাতে। কোথাও যেন আটকে গেলো ধমক গুলো। সম্মুখে নত মাথায় বসে থাকা সায়েরীর উদ্দেশ্যে সে নরম স্বরে বলে উঠলো,
‘ এখানে এসো। আমি সলভ করে দিচ্ছি। পরে যেন তুমি করে দেখাও। ‘
পাশের চেয়ার-টাকে ইশারা করে উক্ত কথাটা বলল সাফওয়ান। সায়েরী একপলক তাকালো চেয়ারটার দিকে। প্রায়-ই সে ইনিয়েবিনিয়ে সাফওয়ানের পাশে বসার ফন্দি আঁটত। দুই দিন আগেও বসেছিল। এত গুলো দিনে এই প্রথম সাফওয়ান নিজ থেকে কাছে আসার আহবান দিয়েছে তাকে। কিন্তু সায়েরী চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে। নিজের চেয়ার টেনে টেবিলে দুই হাত রেখে গলা উঁচু করে খাতায় দৃষ্টিপাত করলো সে। অত্যন্ত শীতল গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ এভাবেও বুঝতে পারছি। শুরু করুন। ‘
সাফওয়ানের হাত থেমে গেল। তার দৃষ্টিতে অবিশ্বাস। সায়েরী অগ্রাহ্য করেছে তাকে! তার আশেপাশে মৌমাছির মতো বিনবিন করতে থাকা মেয়েটা আজ সুযোগ পায়ে ঠেলছে! কেনো! কিসের এত অভিমান!
‘ আমি তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে চাই। প্লিজ দ্রুত দেখিয়ে দিন। ‘
সায়েরীর কন্ঠে ক্লান্তি। কপাল কুঁচকে রেখেছে মেয়েটা। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে আছে। সাফওয়ান চিন্তিত হলো। কিন্তু বলল না কিছু। খাতায় কলম বসিয়ে ঠান্ডা স্বরে বুঝিয়ে দিতে লাগল একের পর এক সূত্র। তার ধ্যানজ্ঞান যখন সম্পূর্ণ খাতায় নিবন্ধ এমন সময় কর্ণগোচর হলো সায়েরীর ব্যথাতুর কন্ঠ,
‘ অ..আমি বাসায় যাব। ‘
সহসা নজর তুলে চাইল সাফওয়ান। চেয়ারে গা এলিয়ে চোখ মুখ খিচে রাখা সায়েরীকে দেখে আকস্মিক ধরফরিয়ে উঠল বুক। মুহুর্তেই চেয়ার পায়ে ঠেলে স্থান পরিবর্তন করলো সে। বলিষ্ঠ হাতে চেয়ার সমেত সায়েরীকে ঘুরালো নিজের দিকে। সম্মুখে হাটু ভেঙ্গে ফ্লোরে বসে পড়লো সে। কেমন এক যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা মেয়েটার গাল ছুঁতেই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে সাফওয়ানের হাত খামচে ডুকরে উঠলো সায়েরী। দাঁতে দাঁত চেপে করুণ সুরে ডাকল,
‘ আহ!! আম্মু! ‘
সাফওয়ান হতবিহ্বল হয়ে চেয়ে। এই আকুতি শুনে তার হৃদকম্পন থমকে গেছে বোধহয়। চরম উদ্বিগ্নতায় সে বুকে চেপে ধরলো সায়েরীকে৷ দেহের ভাড় ছেড়ে দেওয়া মেয়েটার গালে অনবরত হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অস্থির কন্ঠে বলতে লাগলো,
‘ সুবহা! কি হয়েছে? এই মেয়ে, তাকাও আমার দিকে। কোথায় খারাপ লাগছে বলো! সুবহা! চোখ খোল! ‘
সায়েরী তখনো ফোঁপাচ্ছে। নিদারুণ এক যন্ত্রণায় দাঁত দিয়ে পিষে ফেলছে নিচের ঠোঁট। সাফওয়ান অস্থির চিত্তে ফের ডাকে তাকে। এরপর আচানক লক্ষ্য করে সায়েরী দুইহাতে নিজের পেট চেপে ধরেছে৷ পেটের কাছের টপ-টা দুমড়েমুচড়ে গেছে। সেথায় চেপে যন্ত্রণায় ছটফট করছে মেয়েটা। এই দৃশ্য দেখে আচমকা মস্তিষ্কে কিছু একটা খেলে গেল সাফওয়ানের। উৎকন্ঠায় শুকিয়ে যাওয়া গলা ভেজাল সে। প্রেয়সীকে বুকে আগলে পুণরায় গালে হাত রাখল। চোখ মুছে দিয়ে নিম্ন কন্ঠে জানতে চাইল,
‘ তোমার মেন্সট্রুয়েশন চলছে? ‘
সায়েরী বোধহয় একথা শুনে বিব্রতবোধ করলো বেশ। সাফওয়ান বুঝলো না সেসব। তার বুকে মুখ লুকিয়ে নেওয়া মেয়েটার মুখশ্রী ফের একবার আগলে নিল সে। অত্যন্ত আদুরে গলায় শুধালো,
‘ উত্তর দিচ্ছ না কেনো? তুমি না বললে আমি কীভাবে বুঝব কোথায় সমস্যা হচ্ছে, হুহ? স্যা সামথিং না। আমার চিন্তা হচ্ছে তো! ‘
‘ স্পিক আপ, সুবহা। তোমার মেন্সট্রুয়েশন উইক চলছে? ‘
এই যাত্রায় না চাইতেও মাথা দুলিয়ে সায় জানাল সায়েরী। তা দেখে সাফওয়ানের উদ্বেগ বাড়ল। আগপিছ না ভেবে সে পাজা কোলে তুলে নিল প্রেয়সীর নাজুক তনু। বড় বড় কদম ফেলে এগিয়ে চললো নিজের রুমের দিকে। এক হাতে তার বুকের শার্ট খামচে ধরে তখনো ফোঁপাচ্ছে মেয়েটা। সাফওয়ানের সহ্য হয়না সেই কান্না। যেতে যেতে সে মুখ নামিয়ে বারকয়েক প্রেয়সীর ঠোঁট ছোঁয়ায় ছোট্ট কপালটাতে৷ আদর মাখা গলায় আশ্বস্ত করে,
‘ কিচ্ছু হবে না। আমি আছি তো। মেডিসিন খেলেই ঠিক হয়ে যাবে। কান্না করে না৷ ‘
রুমে ঢুকার পর বিছানার কাছে এসে থেমে গেল সাফওয়ান। একটুখানি গলা ভিজিয়ে বিব্রত কন্ঠে জানতে চাইল,
‘ কিছু লাগবে? প্রোটেকশন আছে? ‘
সায়েরী মাথা নেড়ে বুঝালো, আছে। বিছানায় শুইয়ে দেওয়া মাত্র পেট চেপে কাত হয়ে গেল সে। তার করুণ কন্ঠে কেবল মা’কে কাছে পাওয়ার আকুতি৷ সাফওয়ান বুঝে উঠতে পারে না কি করবে। এই অবস্থায় ওকে বাড়ি পৌঁছে দিতেও মন সায় দিচ্ছে না। মেয়েটা হাঁটার ক্ষমতাও হারিয়েছে। সাফওয়ান সেসব দেখে দিশেহারা। এসব মেয়েলী ব্যাপার নিয়ে তার যা জ্ঞান আছে সব অল্পস্বল্প। এহেন পরিস্থিতির স্বীকার হতে হবে তা সে ইহজনমে কল্পনা করেনি। রীতিমতো শরীরে ঘাম দেওয়া শুরু করেছে উদ্বিগ্নতায়। তন্মধ্যে সায়েরীকে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে নিজেকে উন্মাদ মনে হচ্ছে। সে চট জলদি কম্ফোর্টার টেনে ঢেকে দিল সায়েরীর শরীর। গালে দুই হাত রেখে আবারো স্বান্তনা দিল,
‘ আমি মেডিসিন নিয়ে আসছি। কিছু খেয়ে মেডিসিন খেয়ে নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি, হ্যাঁ? ‘
তার হাত চেপে সায়েরী ক্ষীণ স্বরে আওড়াল,
‘ ওয়াটার ব্যাগ.. ‘
‘ হুম? কি? ‘
সাফওয়ান বুঝে উঠতে পারলো না প্রথমে৷ পরক্ষণেই বুঝতে পেরে ‘ এক্ষুণি আনছি’ বলেই সে এ সি অন করে ছুটে বেরিয়ে গেল রুম থেকে৷ পেটের উপর বালিশ চেপে অসহনীয় যন্ত্রণায় ফের একবার ফুঁপিয়ে উঠলো সায়েরী। হাত পা সোজা করে থেমে থেমে, ভীষণ ধীর গতিতে শ্বাস টানছে সে। এমন মুহুর্তে একচুল পরিমাণ নড়লেও ব্যাথায় ছটফট করতে হয় তাকে। আজও ব্যতিক্রম নয়। বিছানায় তার দেহটি পড়ে আছে নিথর দেহের মতো। খুব সুক্ষ্ম চোখে না দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না যে সে শ্বাস টানছে।
মিনিট পাঁচেকের ব্যাবধানে রুমে উপস্থিত হলো রহিম চাচার মেয়ে শিউলি। মেয়েটার হাতে খাবারের ট্রে। সায়েরীর হাল দেখে হা হুতাশ শুরু হলো তার। বেশ যত্ন নিয়ে সে সায়েরীকে উঠে বসতে সাহায্য করলো। জোর করে খাওয়াল যেন ঔষধ খাওয়াতে পারে৷ সাফওয়ান কড়াভাবে তাকে আদেশ দিয়ে গেছে। কোথায় গেছে কে জানে। বলে গেছে যত তাড়াতাড়ি পারে সায়েরীকে খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে দিতে। মেয়েটাও পইপই করে পালন করলো সে দ্বায়িত্ব। তাছাড়া মেয়ে হয়ে অন্য মেয়ের এই সময়ের যন্ত্রণা সে উপলব্ধি করতে পারছে।
খাবারটুকু খেয়ে মেডিসিন খেলেও গরম গরম আনা দুধটুকু দেখেই মুখ ফিরিয়ে নিল সায়েরী। পুণরায় শুয়ে পড়লো পেট চেপে। এই অসহনীয় যন্ত্রণা কমছে না কেনো!
সাফওয়ান এসেছে প্রায় বিশ মিনিট পর৷ তার বেশভূষা ভীষণ অগোছালো হয়ে আছে। উষ্কখুষ্ক চুল এবং উদ্বিগ্ন মুখে সে দ্রুত পায়ে প্রবেশ করেছে বেডরুমে। শব্দ শুনে সায়েরী চোখ মেলে তাকালো। নিভু নিভু চোখে দেখল হাতে বড় সাইজের দুটো শপিং ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। সেসব সোফায় রেখে সে বিছানার পাশে, ফ্লোরে বসে পড়লো। সায়েরীর গাল,কপাল ছুঁয়ে ব্যাকুল স্বরে জানতে চাইল,
‘ পেইন লাগছে এখনো? মেডিসিন নিয়েছ? দুধ খাওনি কেনো? গরম করে আনছে। খেয়ে নিলে ভালো লাগবে। ওয়াটার ব্যাগ নিয়ে এসেছি। গরম পানি ভরতি করে শিউলিকে নিয়ে আসতে বলেছি। এক্ষুণি চলে আসবে৷ ওটা দিলেই ব্যাথা কমে যাবে তো নাকি? আর কিছু লাগবে? কিছু খাবে? ‘
উদ্বিগ্ন কন্ঠের একের পর এক বাক্যে জানান দিল হৃদয়ের সবটুকু ব্যাকুলতা, সবটুকু অস্থিরতা, চিন্তা। সায়েরী কান খাড়া করে শুনে সেসব। অভিমানী মনে কিঞ্চিৎ শীতলতা বয়ে আনে। সেই সময় শিউলি প্রবেশ করে দুধ আর ওয়াটার ব্যাগ নিয়ে। সেসব টেবিলে রেখে সে প্রস্থান করে। সাফওয়ানের জোরাজোরি-তে সায়েরী বাধ্য হয়ে উঠে বসে। সাফওয়ান সাহায্য করে তাকে। নিজের বুকের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসায় সায়েরীকে৷ গরম দুধের গ্লাসটা মুখের সামনে ধরতেই সায়েরীর গা গুলিয়ে আসে৷ কিন্তু সাফওয়ান নাছোড়বান্দা। অগত্যা গ্লাস খালি করতেই হলো সায়েরীকে। বাজে রকমের ঢেকুর তুলে সে দেহের ভার ছাড়ল সাফওয়ানের বুকের উপর। চোখ, মুখ খিচে বিরক্তিকর কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আপনি এতটা খারাপ কেনো? ‘
সাফওয়ান জবাব দেয়না সেকথার। বহুবার শুনা কথাটা এবারেও অগ্রাহ্য করে গেল সে। সায়েরীকে শুইয়ে দিয়ে নিজেই ওয়াটার ব্যাগটা রাখল পেটের উপর। তারপর পুণরায় কম্ফর্টার টেনে দিলো। শরীর ঢেকে যেতেই সায়েরী টপের ভেতর ঢুকিয়ে নিল ব্যাগটা। অত্যাধিক গরম তাপ সরাসরি ত্বক জ্বালিয়ে দিচ্ছে। তবুও সেটা সরালো না সে৷ এভাবে যদি রেহাই পাওয়া যায় এই যন্ত্রণা থেকে। তবে তা-ই সই।
সাফওয়ান তার শিয়রে বসে। চুলে হাত ডুবিয়ে সে ক্ষীণ স্বরে জানতে চাইল,
‘ আর কিছু লাগবে? ‘
বিনিময়ে মেয়েটা চোখ বুজে থাকা অবস্থাতেই হাত চেপে ধরে সাফওয়ানের৷ সাফওয়ান যেন বুঝতে পারল তার নিরব আবদার। ধরে রাখা হাতটা উঁচু করে সে নিঃশব্দে ঠোঁট ছোঁয়াল। কন্ঠে খাদ নামিয়ে বললো,
‘ তোমার কাছেই আছি। কোথাও যাচ্ছি না। ‘
বেলা সাড়ে আটটা থেকে এগারোটা অবধি লাশের মতো ঘুমিয়ে সায়েরী। সাফওয়ান-ও বের হলো না রুম থেকে। ডিভানে বসে কাটিয়ে দিল পুরোটা সময়। একটু আগেই আয়ানকে ফোন করে সে বলেছে যেন সায়েরীর বাসায় বান্ধবীদের দিয়ে কিছু একটা বলে ম্যানেজ করে নেয়। জানিয়েছে সায়েরী খানিকটা অসুস্থ, তার সাথেই আছে৷ সময় মতো পৌঁছে যাবে বাড়িতে। সাফওয়ান জানে আয়ান এবং বাকিরা মিলে ব্যাপারটা সামলে নিবে৷
সায়েরী নিজেকে পুরোপুরি ঢেকে নিয়েছে কম্ফোর্টারের মধ্যে। গুটিসুটি মেরে ঘুমাচ্ছে সে। একটুখানি চুল দেখা যাচ্ছে কেবল। তাছাড়া এই অসুস্থতা নিয়েও বারবার পজিশন চেঞ্জ করছে সে। সম্পূর্ণ বিছানায় বিচরণ করছে ঘুমের ঘোরে। অথচ শরীর থেকে বিন্দুমাত্র সরছে না কম্ফর্টার-টা। রীতিমতো প্যাকেট করে ফেলেছে নিজেকে। সাফওয়ান আশ্চর্য হয়ে দেখে ওর কান্ড৷ অবচেতন মনে প্রশ্ন জাগে, এই মেয়ের পাশে আদো কখনো স্থান পাবে সে! খোদা জানে।
সাড়ে এগারোটা নাগাদ ঘুম ভাঙ্গলো সায়েরীর। আড়মোড়া ভেঙে মুখ থেকে কম্ফোর্টার-টা সরাতেই নজর গাঁথল সাফওয়ানের উপর। যে ডিভানে বসে উরুতে ল্যাপটপ রেখে অনবরত আঙুল চালাচ্ছে কি-বোর্ডের উপর। সহসা লজ্জায় ফের চোখ খিচল সে। এই মুখ কীভাবে দেখাবে সে! এত লজ্জা কোথায় লুকাবে!
সায়েরীর দিকে নজর যেতেই সাফওয়ান উঠে দাঁড়ালো। তাকে কাছে আসতে দেখেই সায়েরী থতমত খেয়ে পুণরায় ঢুকে যেতে চাইল কম্ফোর্টার এর ভেতরে। কিন্তু সফল হতে পারল না৷ পূর্বেই তার ঠান্ডা কপালে হাত ছোঁয়াল সাফওয়ান।
‘ ব্যথা আছে এখনো? ‘
‘ উম..ন.নাহ। ‘ মিহি স্বরে উত্তর দিল সায়েরী।
তার জড়তা বুঝতে পেরে সাফওয়ান সরে দাঁড়ালো। বলতে বিব্রত লাগলেও সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘ আমি বাইরে যাচ্ছি। প্রয়োজন হলে চেঞ্জ করে নিতে পারো। ওখানে ড্রেস রাখা আছে। ‘
একটু থেমে পূর্বের চেয়েও বেশি নিভু নিভু কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আরও কিছু জিনিস আছে। আমার ধারণা নেই এসব ব্যাপারে। দেখে নিও। ‘
এটুকু বলে ধুপধাপ পা ফেলে স্থান ত্যাগ করলো সে। সায়েরী এতক্ষণ যাবত অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ছিল। সাফওয়ান যেতেই সে মুখ ঢেকে ফেলল৷ চাপা স্বরে আওড়াল,
‘ আল্লাহ! আমাকে নতুন মুখ দাও৷ এইটা নিয়ে আমি উনার সামনে যাব কীভাবে? ছিঃ… ‘
বেড থেমে নেমে সে শুরুতেই দৃষ্টিপাত করলো বেডশিটের দিকে। সব ঝকঝকে পরিষ্কার দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ওয়াশরুমে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সাফওয়ানের বেডরুমের এই ওয়াশরুম ইউজ করার সাহস নেই তার। তাছাড়া এই বাড়িতে তার জন্য বরাদ্দকৃত একটি রুম রয়েছে। পূর্বে অনেকবার নানান বাহানায় সাফওয়ানের রুমে এসে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে অনেক অঘটন ঘটিয়েছিল সে। দুই দুটি ফ্লাওয়ার ভাস ভেঙ্গে ফেলেছিল৷ জগ থেকে পানি ফেলে ডিভান ভিজিয়ে দিয়েছিল। রঙ তুলি দিয়ে মেঝে বরবাদ করে ফেলেছিল। এমন আরও দুই একটা অঘটনের পর সাফওয়ান পুরোপুরি নিষেধ করেছে যেন তার রুমে না ঢুকে।
বরং নিজের রুমের পাশের রুমটা সায়েরীর নামে বরাদ্দ করে দিয়েছে সে৷ সেই থেকে মেয়েটা নিজের সব কাজ ওই রুমেই করে। তার টুকিটাকি অনেক কিছুই রয়েছে সেখানে। তাই আজ-ও সায়েরী সোফায় রাখা প্যাকেট দুটো নিয়ে গুটি গুটি পায়ে চলে গেল নিজের রুমে। কৌতুহলী হয়ে খুলে দেখল প্যাকেট দুটো। প্রথম টাতে একটি নেভি ব্লু টপ এবং ব্লাক লেগিন্স। সাইজ দেখেই সায়েরী বুঝে ফেললো এসব একদম তার মাপের। পরের প্যাকট-টা খুলতেই চোখ বড় বড় হয়ে গেল তার। পাঁচ পাঁচটা আলাদা ব্রান্ডের প্যাকেট একই সঙ্গে৷ নিশ্চয়ই সাফওয়ান বুঝে উঠতে পারছিল না কোনটা রেখে কোনটা নিবে৷ তাই এতগুলো উঠিয়ে নিয়ে চলে এসেছে। সায়েরী পারছে না লজ্জায় মাটি ফাঁক করে ঢুকে যেতে। এই দিনও তার দেখার ছিল!
প্রয়োজনীয় কাজ সেরে, নিজেকে পরিপাটি করে রুম থেকে বের হতেই সাফওয়ানের মুখোমুখি হতে হলো সায়েরীকে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই সে মাথা নত করে ফেললো।
‘ চলো, যাওয়া যাক? ‘
সায়েরী মাথা নেড়ে পা বাড়ালো সম্মুখে। কিন্তু এক কদম বাড়ানোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শূন্য ভেসে উঠলো সে। তার দেহখানা পুরোপুরি ভর ছাড়লো সাফওয়ানের পোক্ত দুই হাতের উপর৷ হকচকিয়ে উঠে সহসা সাফওয়ানের গলা চেপে ধরলো সে৷
‘ মেরে ফেলবে নাকি? গলা ছড়ো। সুন্দর করে ধরো। ‘
‘ নামান আমাকে..আমি কি হাঁটতে পারব না বলেছি? ‘
‘ অসুস্থ তুমি। সিড়ি বেয়ে নামতে পারবে না। আজ নিয়েছি বলে সবসময় নিব ওই চিন্তা বাদ দাও। চুপ করে থাকো। ‘
‘ আমি যথেষ্ট সুস্থ আছি। বললাম তো নামাতে। ‘
সাফওয়ান সেকথায় পাত্তা দিল না। লিভিং রুম পেরিয়ে যেতে গিয়ে সায়েরী ফের চিল্লিয়ে উঠলো,
‘ আরে আমার ব্যাগ, বই.. ‘
‘ সব গাড়িতে আছে। তুমি চুপ করো শুধু। ‘
সাফওয়ানের গম্ভীর কন্ঠের বিপরীতে সায়েরী চুপ মেরে গেল। তাকে গাড়িতে বসিয়ে সিটবেল্ট লাগিয়ে দিল সাফওয়ান। রাস্তায় গাড়ি চলতে শুরু করামাত্র সে লক্ষ্য করলো সকালের মতোই নিশ্চুপ সায়েরী। এই আচরণের অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না সে৷ এসব কি মুড সুয়িং? না অন্য কোনো কারণে?
বাড়ির সম্মুখে গাড়ি থামতেই নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে চুপচাপ নেমে যেতে উদ্যত হলো সায়েরী। এমন সময় তার হাত টেনে আটকাল সাফওয়ান। সায়েরী ফিরতেই সে সায়েরীর চিবুক ছুঁয়ে বলে উঠলো,
‘ সকাল থেকে এমন চুপচাপ হয়ে আছে কেনো? আমার উপর কোনো কারণে রেগে আছো? ‘
অষ্টাদশী রমনীর অভিমানী মনে নাড়া দিয়ে উঠল বিগত দিনের অবহেলা সব। সাফওয়ান ভাই কেনো বুঝতে পারছে না সেসব? সে কেনো এখনও দেখতে পারছে না ছোট্ট প্রেয়সীর মায়াবী চোখের ওই একছত্র অভিমান?
ক্যালেন্ডার থেকে মুছে গিয়ে গিয়েছে আরও দুটো দিন। এই দুইদিন সায়েরী বাড়িতেই কাটিয়েছে নিজের মতো। না গ্রীন ভ্যালি যাওয়ার তাড়া ছিল, না কলেজে যাওয়ার। অবশ্য এই অপরিকল্পিত ছুটি কাটানোর সৌভাগ্য তার হতো না। যদি না সাফওয়ান নিত্যদিনের ন্যায় সকালে ফোন করে তার ঘুম ভাঙ্গাত, নিজেই গ্রীন ভ্যালি নিয়ে গিয়ে বইয়ের সাগরে ডুবিয়ে রাখত। আর তারপর নিজেই কলেজে ড্রপ করে দিয়ে আসত। কি জানি কি হলো সাফওয়ানের। গত দুদিন ধরে সে এসবের কিছুই করলো না। সায়েরী অবশ্য বুঝল এর কারণ। তাই তো, উৎফুল্ল চিত্তে দু’টো দিন আরাম করে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়েছে সে।
আজ বুধবার। আবরার প্রায় দুই সপ্তাহ আগেই ফিরে গিয়েছিল চট্টগ্রাম। আজ ভোরে আবার এসেছে। চট্টগ্রাম যাওয়ার পূর্বে আবরারের আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছে সায়েরী। খিটখিটে হয়ে ছিল খুব। একদিন ভোর বেলা তুচ্ছ একটা বিষয় নিয়ে কত বড় ধমক দিয়েছিল সে সায়েরীকে৷ বেচারি ভয়ে গুটিয়ে গিয়েছিল তখন। এর আগে কখন আবরার তার সাথে উঁচু গলায় কথা বলেছে, তাও মনে নেই তার। তাই তো, অকারণে এত বড় ধমক শুনে সে সারাটাদিন কেঁদে ভাসিয়েছিল৷ আশ্চর্যজনক ভাবে আবরার আসেনি বোনের মান ভাঙ্গাতে। সে ফিরে গিয়েছিল চট্টগ্রামে। সেই থেকে সায়েরীর অভিমান ভারী হয়েছে ভাইয়ের প্রতি৷
এতগুলো বছরে এই প্রথম আবরার তাকে এমন করে শাসন করেছে। শাসন করেও পূর্বের মত আদর দিয়ে স্যরি বলেনি৷ কিংবা বলা যায়, কোনটা কথা-ই বলেনি।
আজ আবরার ফিরেছে সেই সম্পর্কে অবগত ছিলনা সায়েরী। সে লম্বা ঘুম দিয়ে সাড়ে দশটায় বিছানা ছেড়েছে। হেলেদুলে ডাইনিং টেবিলে এসে বসার পরপরই পাশে চেয়ার টেনে বসেছে আবরার৷ তাকে দেখে সায়েরী কিঞ্চিৎ অবাক হলো। বসে রইল থমথমে মুখে। আবরারের মা দুজনকে দেখেই হটপট থেকে পরোটা বের করে প্লেটে দিলেন। সবজি রাখলেন সম্মুখেই। আবরার নিজেই আগ বাড়িয়ে নিল সেসব। শুরুতেই পরোটা,সবজি তুলে দিল সায়েরীর প্লেটে। মেয়েটা অবাক চোখে তাকাতেই সে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ বসে আছিস কেনো? খা। মানুষ দিনে দুইবার খেয়ে হজম করে ফেলেছে৷ আর তোর এখনো একবার খাওয়ার-ও সময় হলোনা৷ ‘
এটুকু কথা কিচেনে অবস্থান রত মেহরিন বেগমের কানে যেতেই তিনি আশকারা পেলেন খুব। বিনা রিমোটের রেডিওর মতো সাত সকালে সায়েরীকে কথা শুনাতে লাগলেন একের পর এক৷ সায়েরী ছোট ছোট চোখ করে তাকাল আবরারের দিকে৷ যে নিজেও নিজের কান্ডে হতবাক। ভাবেনি এটুকু কথায় অন্যদিকে আগুন লেগে যাবে। তবুও কিছুই হয়নি এমন ভাব ধরে রেখে খাওয়ায় মনযোগ দিল সে। সায়েরী চেয়েও বললো না কিছু। তার খাওয়ার মাঝেই আবরার বলে উঠলো,
‘ বিকেলে রেডি থাকিস। বাইরে যাব। ‘
কথা বলবে না বলবে না ভেবেও সায়েরী চট করে প্রশ্ন করে বসল, ‘ কোথায় যাব? ‘
‘ ইরার বাসায়। ‘
‘ সেখানে কেনো? ‘
‘ দশ পনেরো দিন ধরে ইরা একা একা আছে। গত কাল নাকি ভীষণ মন খারাপ করে ছিল। এজন্য জাদিদ ভাই বলেছে যেন আমরা গিয়ে ঘন্টাখানিক সময় কাটিয়ে আসি। ওর ভালো লাগবে। ‘
‘ তোমাদের মাঝে আমি যাব কেনো? ‘
‘ সাফ্রিন আর তোকেও যেতে বলেছে ইরা। অনেক দিন কারো সাথে দেখা হয়না বলে ও পারছে না সবাইকে নিজের কাছে রেখে দিতে। বলেছে মিনহাকেও নিয়ে যাওয়ার জন্য। সন্ধ্যা বেলা ওকে তো নিয়ে যেতে পারবো না। তাই তোকে নিয়ে যাব। ‘
‘ ইরাপু বলেছে এজন্য চট্টগ্রাম থেকে ফিরেছ তুমি? নয়তো ফিরতে না? ‘
‘ নাহ। ‘
উত্তরটুকু শুনে ফের মুখ ভাড় হলো সায়েরীর। সে মাথা নুইয়ে ফেলল। আবরার আড়চোখে সেদিক তাকিয়ে হেসে ফেললো। চেয়ারের সঙ্গে, ফ্লোরে রাখা শপিং ব্যাগ-টা বাড়িয়ে দিল সায়েরীর দিকে। নির্বিকার কন্ঠে বললো,
‘ বিকালে এইটা পড়বি। ‘
সায়েরী জুলুজুলু নজরে তাকায়। অনাগ্রহী ভাব দেখিয়ে অস্বীকার করে নিতে। আবরার হাল ছাড়ে না। এক কথায় দুই কথায় ঠিকই মানিয়ে নেয় সায়েরীকে। ছোট্ট করে দুঃখ প্রকাশ করে পূর্বের আচরণের জন্য। সায়েরী সেটুকুতেই গলে পানি। হাস্যজ্বল চিত্তে প্যাকেট খুলে। লাল,সাদা সংমিশ্রণের কামিজ-টা নেড়েচেড়ে দেখে সে। আমোদিত গলায় প্রসংশা করে আবরারের পছন্দের। আবরার হাসে। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে ছোট বোনের দিকে। মনে মনে ভাবে,
‘ মেয়েটা এত বড় কবে হলো! ‘
বড়সড় অ্যাপার্টমেন্ট-টার সবত্রে শৌখিনতার ছোঁয়া। বেশ সুন্দর, সাজানো গোছানো। দেয়াল জুড়ে ফ্লোরাল, ন্যাচার ওয়াল বোর্ড৷ জায়গায় জায়গায় নানান রকমের ফ্লাওয়ার ভাস। জানলায় উড়ছে নীল,সাদা মিশেলের ফিনফিনে পর্দা। লিভিং রুমে ছোট খাটো একটা ঝাড়বাতি। যার আলোতে ঝলমল করছে লাল কামিজ পরিহিতা ইরা। সোফার কুশন সব নিজ নিজ স্থানে গুছিয়ে রাখছে সে। হাত খোপা করা চুলগুলো কাধের ডানপাশে এসে ঠাই পেয়েছে। বিগত দশ পনেরো দিনের যত্নে পূর্বের সেই মলিনতা অনেকখানি কমেছে চেহারা হতে। পুণরায় ফিরছে পূর্বের সেই রূপ, লাবণ্য। ইরা’কে ডাকতে এসে জাদিদ সম্মুখের এই নারীমূর্তি দেখে থমকায়। তাকিয়ে থাকে ফ্যালফ্যাল নজরে। প্রতিটা দিন নতুন করে এই মেয়ের প্রেমে মত্ত হচ্ছে সে। থেকে থেকে গভীর হচ্ছে বক্ষপিঞ্জরে যত্ন করে রাখা ভালোবাসাটুকু। সেই সাথে দহনও বাড়ছে। এই যে মেয়েটা তার সামনে। তার-ই ঘরে অবস্থান করেছে দিনের পর দিন৷ অথচ তাকে কাছে টানার সৌভাগ্য নেই। দুটো প্রেমময়ী বাক্যে মেয়েটাকে নিজের দিকে আকর্ষিত করার সাহস নেই। এত এত না পাওয়ার মাঝেও বড্ড তৃপ্ত জাদিদ। যেন সব অপূর্ণতার মাঝে সব চেয়ে বড় পূর্ণতা নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছে সে। তাই তো, এই দহনে পুড়েও সুখী সে।
‘ দাঁড়িয়ে আছেন যে? আপনার দেরি হচ্ছে না? ‘
ইরা’র চিকন সুর কর্ণগোচর হতেই জাদিদের ঘোর কাটে। সে ব্যস্ত পায়ে ইরা’র কাছাকাছি এসে প্রশ্ন করে,
‘ আপনি কি করছেন এখানে? ‘
‘ তেমন কিছু না। ঘর ঝাড়ু দিচ্ছিলাম৷ অনেক ধুলোব…. ‘
‘ আপনাকে করতে হবে না। এসবের জন্য তো মিতু আছেই। আপনি নিজের রুমে যান। ‘
‘ সামান্য কাজ। এটুকু করলে কিছু হবে না। ‘
‘ সামান্য কাজটা না করলেও তো হচ্ছে। ‘
‘ না, হচ্ছে না। আজকে আমার বন্ধুরা আসবে। সায়েরী, সাফা, ইরিনা সবাই আসবে। আমি কতটা খুশি এতদিন পর ওদের দেখব বলে৷ আপনি বললেও রুমে বসে থাকতে পারবো না। ‘
‘ রুমে বসে থাকতে তো বলছি না। হাঁটুন। বই কিনে দিয়েছি সেসব পড়ুন। এসব করে আমাকে টেনশনে ফেলবেন না। এমনিতে হসপিটালে গেলে আমি সারাক্ষণ আপনাকে নিয়ে চিন্তায় থাকি। আর চিন্তা বাড়িয়ে দিবেন না। প্লিজ, কথা শুনোন। ‘
ইরা মহাবিরক্ত এই অতিরিক্ত যত্ন দেখতে দেখতে। কুশন সব ঠিক জায়গায় রেখে সে সোফাতেই বসে পড়ল। অসন্তুষ্ট গলায় বললো,
‘ করছি না কিছু। যেতে পারেন আপনি। ‘
জাদিদ তপ্ত শ্বাস ফেলে ওর প্রতিক্রিয়া দেখে। উঁচু গলায় ‘মিতু’ বলে ডাকতেই কিচেন থেকে ছুটে আসে অল্প বয়সী এক রমনী। বিশ বছর কিংবা তার চেয়ে একটু বেশি হবে মেয়েটার বয়স। জাদিদ অনেক খোঁজ করার পর গত সপ্তাহে কাজের জন্য নিয়োগ করেছে মিতুকে। সারা দিন রাত ইরার সেবায় নিয়োজিত থাকে মেয়েটা। এই
আপার্টমেন্টের বাড়তি ছোট্ট কামরা-টা বরাদ্দ তার জন্য। সার্জারী থাকাকালীন জাদিদের বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়। অনেক সময় ফিরে ভোর রাতে। কিংবা চাপ বেশি থাকলে দুই এক দিন কাটিয়ে দিতে হয় হসপিটালে। তাই তো ইরা’র সঙ্গ দেওয়ার জন্য মিতুকে নিজেদের কাছেই রেখে দিয়েছে সে।
মিতু ব্যস্ত পায়ে ছুটে আসলো। নম্র কন্ঠে শুধালো,
‘ কি লাগবো, ভাইজান? ‘
‘ কিছু লাগবে না। জাগে পানি ভর্তি করে ইরা’র রুমে, ডাইনিং-এ, আর এখানে রাখো। আধ ঘন্টা পরপর ওকে পানি খাওয়ার কথা মনিয়ে করিয়ে দিবে । আর… ‘
জাদিদের কথা শেষ হওয়ার আগেই মিতু বলে উঠে,
‘ আর ফেরেশ ফলের জুস দিব দশটায়। তার লগে ফল কাইট্টা দিব। ঘন্টা পার হলে হালকা নাশতা দিব৷ কি জানি কয়..হলতি (হেলদি) নাশতা। আমি শিখা রাখছি কেমনে বানায়৷ বেশি তেল, বেশি ঝালের কিচ্ছু রানমু না। দুপুরে তাড়াতাড়ি ভাত দিয়া দিমু। বিকেলে ঘুম থেকে উঠলে ছাদে নিয়া যামু হাওয়া বাতাস লাগানোর জন্যে। আর কিছু আছে? আমার তো মুখস্থ হইয়া গেছে গা পতিদিন হুনতে হুনতে। ‘
মিতুর কথা শুনে জাদিদ হা করে তাকিয়ে থাকে৷ ইরা হেসে ফেলে শব্দ করে। তার হাসির শব্দে মিতু,জাদিদ দুজনেই চমকায়। তাদের অবাক দৃষ্টি লক্ষ্য করে ইরা চুপ মেরে গেল পুণরায়। জাদিদ কিছু বলে না আর। ইরা’কে সাবধানে থাকতে বলে বেরিয়ে যায় হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। নতুন জয়েনিং বলে শুরুর কয়েক মাস সে নিয়মিত এবং পানচুয়্যাল থাকতে চায়। এজন্যই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যাওয়া। মিতু গেল পেছন পেছন। জাদিদ বের হতেই সে দরজা লাগিয়ে দিয়ে ফিরে আসলো ইরা’র কাছে। দেখল ইরা পুণরায় ঘর ঝাড়ু দিতে উদ্যত হয়েছে। মিতু দ্রুত গিয়ে তাকে আটকালো। হন্তদন্ত গলায় বললো,
‘ আপনে এসব করবেন না ভাবী। এমনিতেই ভাইজান দিনে দুইশো বার ফোন করে আমারে আদেশ করতেই থাকে। আপনে কাজ করতেছেন জানলে আমার তো রক্ষা থাকবো না। ‘
ইরা হতাশ হয়ে বসে পড়ে সোফায়।
‘ তুমি আর তোমার ভাইজান মিলে আমাকে শান্তি দিলেনা মিতু। এত এত নিষেধাজ্ঞা মানা যায়! অসহ্যকর। ‘
মিতু মিটিমিটি হেসে বলে উঠে,
‘ ভাইজান আপনারে মেলা ভালোবাসে। তাই তো এমনে চোখে হারায়। কপাল গুণে একখান জামাই পাইছেন আপনে। পেমের বিয়া নাকি ভাবী? ‘
মিতুর সরল মনের এই প্রশ্নে আকস্মিক বদলে গেল পরিবেশ। ইরা’র হাস্যজ্বল মুখশ্রী নিভে গেল ধপ করে। সে সেকেন্ড দুয়েক থমকে থেকে উঠে চলে গেল নিজের রুমের দিকে৷ মিতু ভেবে পেলনা এহেন প্রতিক্রিয়ার অর্থ। সে কি কিছু ভুলভাল বলে ফেলেছে? দশ দিন যাবত কাজ করছে সে। এই দশদিনে আজই প্রথম ইরা’র মুখে একটুখানি হাসি দেখল সে৷ মেয়েটা সারাক্ষণ নিজের রুমে বসে থাকে। কি যেন ভাবে আনমনে। দুয়েক বার কাঁদতেও দেখেছে রাতের বেলা। আজ মেহমান আসবে বলে মনটা বোধহয় ফুরফুরে হয়েছিল। আর মিতু কি-না পুণরায় মন খারাপ করে দিল তার!
অবশ্য তার-ই বা দোষ কোথায়! আসার পর থেকে দেখছে জাদিদ নামক ডাক্তার ভদ্রলোক টা চোখে হারাচ্ছে তার স্ত্রী-কে। কত কত যত্ন তার! গত শুক্রবারে সারাটা দিন বউ নিয়ে বাহিরে ঘুরেছে৷ ফিরে এসেছে বউয়ের পছন্দসই নানান ঘর সাজানোর সরঞ্জাম নিয়ে। বউয়ের বলা মতো নিজেই সাজিয়েছে সেসব। এত এত ভালোবাসার মাঝেও দুজন দুই রুমে থাকার মানে খুঁজে পায়না মিতু। বউ অন্তঃসত্ত্বা বলেই কি এই দুরত্ব? কিন্তু এমন হতে যাবে কেনো? এই সময় টা তে তার উচিত সারাক্ষণ বউয়ের কাছাকাছি থাকা। তা না করে দুজন দুই রুমে পরে থাকে। মিতু খুঁজে পায়না এসবের আসল কারণ। অগত্যা সে ঘর ঝাড়ু দিতে দিতে বিড়বিড় করে,
‘ বড়লোকের বড় কারবার। আরও যে কি কি দেখার বাকি আছে কে জানে! ‘
শেষ বিকেলের দিকে জাদিদ-ইরার নিস্তব্ধ ফ্ল্যাট-টা কোলাহলে ভরপুর করে দিয়ে আগমন ঘটিয়েছে বন্ধুরা। শুরুতেই পৌঁছেছে নীতি এবং রায়ান। পরপর গেইটের সম্মুখে একে একে দেখা মিলেছে জিমন, সাফওয়ান-সাফ্রিন এবং আবরার -সায়েরী’র। উৎফুল্ল চিত্তে একে একে ভিতরে ঢুকলো তারা। এলভেটর বন্ধ বিধায় সিড়ি বেয়ে উঠতে হচ্ছে সকলকে। শুরুতেই সাফ্রিন-সায়েরী পা বাড়িয়েছে সিড়ির পথে। কয়েক ধাপ দুরত্বে সাফওয়ান এবং আবরার। সাফওয়ানের তীক্ষ্ণ চোখ সায়েরীর দুই পায়ের দিকে নিবদ্ধ। পায়েলের রিনিঝিনি শব্দ তুলে ধাপে ধাপে সিড়ি বেড়ে উঠতে থাকা পা জোড়া আচমকা খেই হারালো। হোচট খেয়ে পড়ার আগ মুহুর্তেই পূর্ব হতে সচেতন থাকা সাফওয়ান পেছন থেকে বাহু টেনে ধরলো তার৷ সায়েরী তাল হারিয়ে পড়লো সাফওয়ানের বুকের উপর। সাফওয়ান সেদিকে তাকিয়ে হতাশা, শাসন মিশানো কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ ধীরে সুস্থে হাঁটা যায়না? ‘
অপ্রত্যাশিত এই কান্ডে সায়েরী তখনো হতবাক। দুজনের নিরবতার মাঝে আচমকা সায়েরী’র হাত টেনে সাফওয়ানের কাছ থেকে সরিয়ে আনলো আবরার। চোখের পলকে নিজের অবস্থানে সায়েরীকে দাঁড় করিয়ে নিজে দাঁড়ালো সাফওয়ানের পাশটাতে। গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
‘ ব্যাথা পেয়েছিস? ‘
সায়েরী মাথা নেড়ে বুঝালো ব্যাথা পায়নি। আবরার তখনো সায়েরীর হাত চেপে রেখেছে। থমকে দাঁড়ানো সাফওয়ান-সাফ্রিনের দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠে,
‘ তোরা পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? যা। ‘
আবরারের আচরণে সুক্ষ্ম পরিবর্তন লক্ষ্য করে কপালে ভাঁজ পড়লো সাফওয়ানের। কিন্তু কিছু বললো না সে৷ সকলে মিলে প্রবেশ করলো ভেতরে। তাদের দেখা পেয়ে ইরা’র চেহারা ঝলমলিয়ে উঠলো। মেয়েটা হাস্যজ্বল চিত্তে এদিক সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। তার এহেন আচরণে জাদিদ খুশি হতে চেয়েও পারছে না। বেচারা চিন্তায় চিন্তায় অস্থির। ইরা যতবারই ছুটে চলে, সে নিজেও ছুটে যায় পিছু পিছু। অসহায় গলায় বলে বলে,
‘ ইরা! আস্তে হাঁটুন। ধীরে ধীরে কাজ করুন। ওরা মাত্র-ই এসেছে। কোথাও পালিয়ে যাচ্ছে নাকি? ‘
ইরা’র বিরক্তি আকাশ ছুঁল জাদিদের আচরণে৷ মেহমান এসেছে বাড়িতে। আর এই লোক কি-না বউয়ের পিছু পিছু ছুটছে! বন্ধুরা দেখলে ভাববে টা কি! বিরক্ত কন্ঠেই সে এই প্রথম দুই দুইবার ধমক দিয়েছে জাদিদ কে। কঠোরভাবে আদেশ দিয়েছে বন্ধুদের সাথে গিয়ে বসার। না চাইতেও ভোঁতা মুখে সেই কথা মেনে নিতে হলো জাদিদকে।
মিতু মেয়েটা বেশ কাজের। একা একাই নানান পদের নাশতার আয়োজন করে ফেলেছে সে। ইরা অবশ্য অল্পস্বল্প হাত মিলিয়েছে। কিন্তু অর্ধেকের বেশি কাজ মেয়েটা একাই করেছে। ইরিনা আসলো সকলের শেষে। ইরা আবেগে কেঁদে ফেললো বোনকে দেখে। পূর্বের কিছুই মনে রাখতে চাইনা মেয়েটা। ইরিনাকেও দেখাল বেশ আবেগী। যেমন-ই হোক, বোন তো। কতদিন-ই বা দূরে থাকা যায়! দুই বোনের মিলন পর্ব শেষ হলে ইরিনাও গিয়ে যোগ দিল বাকিদের সাথে। নীতি তাকে ডেকে নিজের পাশে বসাল। সাফ্রিন-সায়েরী এককোনায়, পাশাপাশি বসে। ইরিনাকে দেখে দুই বান্ধবী ইশারায় কথা বলে৷ ইরিনার পরণে লাইট পিঙ্ক টপ এবং হোয়াইট ডেনিম জিন্স। যা ইন করে পরেছে। লালছে, ছোট ছোট চুলগুলো উন্মুক্ত৷ হ্যাভি মেকওভার করেছে ৷ হাইলেটার চিকিমিকি করছে গালে,নাকে। ঠোঁটে নিউড পিঙ্ক লিপস্টিক।
অরনামেন্টস ও পরেছে একাধিক। সাফ্রিন ঠোঁট চেপে হেসে ফেলে। সায়েরী’র কানে ফিসফিস করে বলে,
‘ এই মেয়ে কি সিনেমার শোটিং করতে এসেছে নাকি রে? এত্তো মেক-আপ? আমাদের মতো সামান্য কাজল,লিপস্টিক দিলেই তো হতো। এমন হ্যাভি মেকওভারের কি প্রয়োজন? তাও আবার বোনের বাড়িতে। ‘
‘ সে মেক-আপ করেনা কখন? আমি যতবার দেখেখি ততোবারই এমন বোল্ড লুক নিয়েছে। ড্রেস সেন্স দেখ, এমন কাপড় এধরণের গেট টুগেদারে পড়লে মানায়? ‘
‘ আমার বিশ্বাস হয়না এই মেয়ে ইরাপুর বোন। আকাশ, পাতালের তফাৎ দুটোতে৷ ‘
দুজনের ফুসুরফাসুর চললো অনেক্ষণ। ইরা প্রবেশ করতেই বন্ধুদের কথা থামে। সাফওয়ান বলে উঠে,
‘ এমন ছুটাছুটি করছিস কেনো? এখানে আয়, বোস। আমরা আছি রাত অবধি। ধীরে সুস্থে খাওয়া যাবে। তুই শান্ত হ। ‘
জাদিদ-ও তাল মিলিয়ে বলে,
‘ আমি কতবার বলেছি একথা। তোমাদের বান্ধবী কানেই নিচ্চে না। তোমরা বুঝাও এবার। আমার কথার তো দাম নেই। ‘
জাদিদের বলার ভঙ্গিমা দেখেই হেসে ফেললো সকলে। ইরা থমথমে মুখে গিয়ে বসলো সাফওয়ানের পাশে। সে বসতেই সাফওয়ান ফিরে তাকালো তার দিকে। নিম্ন কন্ঠে শুধালো,
‘ ভালো আছিস? ‘
ইরা মাথা দোলায়। মিষ্টি হেসে জবাব দেয়,
‘ আলহামদুলিল্লাহ। খুব ভালো আছি। ‘
এটুকু জবাবে সাফওয়ানের বুক শীতল হয়ে আসে। আসার পর থেকেই ইরা এবং জাদিদকে লক্ষ্য করছিলো সে। ইরা’র প্রতি জাদিদের ছোট ছোট যত্নগুলো তাকে মুগ্ধ করেছে, আশ্বস্ত করেছে।
ইরা’র বেডরুমে আসর পেতেছে মেয়েরা সকলে। সাফ্রিন-সায়েরী ইরা’র দুইপাশে বসে নানান প্রশ্ন জাহির করছে ইরা’র কাছে। বেবি কিক করেছে
কি-না, নড়াচড়া অনুভব করতে পারে কিনা, ছেলে চাই নাকি মেয়ে? এধরণের প্রশ্ন করে চলেছে একের পর এক। দুজনের কৌতুহল দেখে ইরা হাসে। জবাব দেয় ধীরে সুস্থে। নীতিও তাল মিলিয়ে কথা বলছে। চুপচাপ বসে আছে ইরিনা। মূলত সায়েরীকে তার সহ্য হচ্ছে না। সব কিছুতে এই মেয়ের অধিপত্য তার ভালো লাগছে না। কে হয় এই মেয়ে? ভাইয়ের বান্ধবীর বাসায়,বার্থডে পার্টিতে কেনো উড়ে উড়ে চলে আসতে হবে তাকে? ভাব দেখে মনে হয় সকলে তার বন্ধুবান্ধব। ন্যাকামি যত্তসব। অসন্তুষ্ট মুখেই এককোনায় বসে রইলো সে। কয়েক বার বলেছিল লিভিং রুমে ফিরে যাওয়ার কথা। সেদিকে পাত্তা দেয়নি কেউ। ছেলেরা নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিচ্ছে,দিক। মেয়েরা গিয়ে করবে টা কি সেখানে!
এরইমধ্যে নীতি অল্প কিছুক্ষণের জন্য বের হয়েছিলো রুম থেকে। সে বের হওয়ার মিনিট খানিকের মধ্যেই ছুটে আসলো পুণরায়। সেই সঙ্গে পেছন হতে ভেসে আসল সাফওয়ানের চওড়া গলার স্বর,
‘ নীতি! মোবাইল দে বলছি। জিমনের টা নিয়ে যা। আমার টা তে কি কাজ তোর? ‘
নীতি-ও সমান গলা চেঁচিয়ে জবাব দিল,
‘ এমন চোর চোর মুখ করে রেখেছিস সেজন্যই নিয়েছি। জিমন,আবরার কারোর-টাই নিব না। আগে দেখি কোন হীরা লুকিয়ে রেখেছিস এই সস্তা মোবাইলে। ‘
কটাক্ষ করে সস্তা মোবাইল বলেই লেটেস্ট মডেলের আইফোন-টা নেড়েচেড়ে দেখল নীতি। বাব্বাহ! বের হতে না হতেই কিনে ফেলেছে!
‘ কি হয়েছে আপু? ভাইয়া চিৎকার করছে কেনো?
সাফ্রিনের কথা শুনতেই নীতি আয়েশ করে বিছানায় বসে জবাব দিল,
‘ আমার ফোনের ব্যালেন্স শেষ বলে তোমার বড়লোক ভাইকে বলেছিলাম একটু তার মোবাইলটা দেওয়ার জন্য। আমার বাসায় ফোন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে এমন ভাব দেখাল যেন মোবাইল না, মহামূল্যবান হীরা চুরি করতে গিয়েছি তার। বলে কি-না অন্য কারো কাছ থেকে নে। এটা কোনো কথা? এমন ভাবে আমাকে রিজেক্ট করলো দেখেই হাত থেকে মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে চলে এসেছি। দেখব, কি ছাতার মাতা লুকিয়ে আছে এখানে। ‘
নীতি’র কথা শুনেই হেসে উঠলো বাকিরা। ইরা বললো,
‘ পারসোনাল কিছু থাকতে পারে। শুধু শুধু রাগাচ্ছিস ছেলেটাকে। দিয়ে আয় মোবাইলটা। ‘
‘ ওর পারসোনালিটির গুল্লি মারি। আমাকে এমনে রিজেক্ট করলো কেনো! দেখি কি আছে এতে। ‘
‘ ফোনে পাসওয়ার্ড দেওয়া। দেখবি কি করে? ‘
নীতি চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে।
‘ সেটা তো ভাবিনি। কি করা যায় এখন? ‘
ওর বোকামিতে অন্য তিনজন পুণরায় হাসে। নীতি হাতের মোবাইলটা নেড়েচেড়ে দেখে৷ লেটেস্ট মডেল বলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর নেই এটাতে। ফেইস আইডি সেন্সর রয়েছে। কি যেন ভেবে সে হুট করে সায়েরীকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
‘ এই যে খান সাহেবের সুবহাপাখি! তাকাও তো এদিকে। ‘
সায়েরী ফিরে তাকালো চট করে। চমকিত নজর তার। সম্মুখেই সাফওয়ানের ধূসর বর্ণের মোবাইলটা ধরে রেখেছে নীতি। ফেইস আইডি ম্যাচ হতেই শব্দ করে আনলক হয়ে গেল মোবাইলটা। চমকে উঠলো উপস্থিত সকলেই। নীতি মোবাইল সরিয়ে নিয়ে আশ্চর্য কন্ঠে শুধালো,
‘ ওরেব্বাস! আমাদের ওভার পজেসিভ রাগের ভান্ডার টার এতো উন্নতি! অবিশ্বাস্য! টু মাচ অবিশ্বাস্য। ‘
সায়েরী লজ্জায় নুইয়ে গেল। অবাক-ও হলো বটে। সাফওয়ান কবে তার ফেইড আইডি দিয়ে লকস্ক্রিন সেট-আপ করেছে তার মনেই নেই। মাস দেড়েক আগে প্রয়োজন হয়েছিলো বিধায় একবার মাত্র সাফওয়ানের মোবাইল ব্যবহার করেছিল সে। সেদিন স্ক্রিন আনলক করে দেওয়ার জন্য সাফওয়ানের দিকে মোবাইল বাড়িয়ে দেওয়ার পরপরই সাফওয়ান এই কাজ করেছিল। তা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সায়েরী। পরবর্তীতে প্রয়োজন পড়েনি কিংবা সঙ্কোচ কমেনি বলেই ফের কখনো ছুঁয়ে দেখেনি মোবাইলটা। তাই তো হঠাৎ এই কান্ডে সে বেশ আশ্চর্য হয়েছে। তাকে পুণরায় চমকে দিয়ে নীতি ফের চিল্লিয়ে উঠলো
‘ ওহ মাই গড! ওহ মাই গড! ‘ বলে। মোবাইল আনলক হওয়ার পর ওয়ালপেপারে দৃষ্টিপাত করতেই মূলত ভাষা হারিয়েছে সে। সকলে তার এহেন প্রতিক্রিয়া দেখে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকিয়ে। সেকেন্ড দুয়েক আশ্চর্য হয়ে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেললো নীতি। দুষ্টুমি ভরা হাসি নিয়েই মোবাইল ঘুরালো বাকিদের দিকে। আমোদিত গলায় বললো,
‘ অবশেষে সু-শিক্ষা দিতে পেরেছি আমাদের খাটাশ বন্ধুটাকে। দেখ কেমন প্রকৃত প্রেমিকের মতো প্রেমিকার ছবি লাগিয়ে লেগেছে ওয়ালপেপারে। ইশ!! হাউ রোমান্টিক! ‘
দ্বিতীয় দফায় তব্দা খেল উপস্থিত চারজন। সায়েরী হা করে তাকিয়ে রইল মোবাইলটার দিকে। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে তার ঘুমন্ত মুখশ্রী। এককাত হয়ে ঘুমাচ্ছে সে। কুশন জড়িয়ে রেখেছে বুকের সঙ্গে। কুশনের সঙ্গে ঠেশ দেওয়ার কারণে ডান গাল এবং ঠোঁটের মাংসপিণ্ড ফুলে রয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে আদুরে কোনো বিড়ালছানা উম পেয়ে আরামে ঘুমাচ্ছে। ছবিটাও বেশ কায়দা করে তোলা। সায়েরী অনেক ভেবেও কুল পেলনা, এই ছবি কখনের। তবে গ্রীন ভ্যালি’র সোফা এবং কুশল চিনতে ভুল হলো না তার। সে লজ্জায়, অস্বস্তি-তে সাফ্রিনের বাহুতে মুখ লুকালো। সাফ্রিন এবং নীতি উচ্চ স্বরে হেসে ফেললো তার প্রতিক্রিয়া দেখে। অন্যদিকে ইরিনা এবং ইরা আশ্চর্য হয়ে আছে এখনো। ইরা অবগত ছিলনা সাফওয়ান – সায়েরীর ব্যাপারে। তাকে বলবে এই সুযোগ ও পায়নি কেউ। পেলেও মনে ছিলনা। তাই তো সে হতবাক। মেনে নিতে পারছে না এমন কিছু। নিজেকে সামলে সে আড়চোখে চাইলো ইরিনার দিকে। মেয়েটার শক্ত মুখাবয়ব দেখে অগোচরে ঢোক গিলল সে। নীতিকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ এসব কবে থেকে চলছে? তোরা কেউ আমাকে বললি না কেনো? ‘
‘ বলার সুযোগ-টা পেলাম কখন? তুই তো ছিলি ঝামেলার মধ্যে। এসবের মাঝে বলার কথা মাথাতেই ছিলনা। ‘
পুণরায় ভেসে আসল সাফওয়ানের কন্ঠ। নীতিকে ডাকছে সে। নীতি ভয় পেল এবারে৷ তড়িঘড়ি করে ফোন লক করলো। সায়েরীর হাত টেনে বিছানা থেকে নামাতে নামাতে বললো,
‘ যাও গিয়ে তোমার এই উন্মাদ প্রেমিক কে সামলাও। আমি সামনে গেলে নির্ঘাত কানের পর্দা ফাটাবে আমার। তুমি-ই সামলাও এটাকে। আমার দ্বারা সম্ভব না বইন। ‘
সায়েরী যেতে অস্বীকার করলো বারকয়েক। কিন্তু নীতির জোরাজোরি তে হার মেনে যেতে হলো শেষ মেশ। সাফওয়ান ডাইনিং স্পেসে দাঁড়িয়ে। বাকিরা লিভিং রুমে। সায়েরী থমথমে মুখ করে এগিয়ে গেল। বাড়িয়ে দিল মোবাইল। চাপা স্বরে বলে উঠলো,
‘ গ্যালারীতে কি নিজের ছবির অভাব পড়েছিলো? আমার ছবি সেট করেছেন কেনো? সবার সামনে কত লজ্জা পেতে হয়েছে আমাকে, জানেন? ‘
সাফওয়ান আশ্চর্য কন্ঠে প্রশ্ন করে,
‘ তুমি ওদেরকে ফোন আনলক করে দিয়েছ কেনো? ‘
‘ আমি দিতে যাব কেনো? নীতি আপু তাকাতে বলেছিল তাই আমি শুধু তাকিয়েছিলাম। এতেই তো আনলক হয়ে গেল। আমার কি দোষ? ‘
সাফওয়ান চোয়াল শক্ত করে তাকায়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
‘ মাথামোটা! জানো না ফোনে তোমার ফেইড আইডি সেট করা আছে? তবুও গাধামি করেছ? ‘
‘ আমাকে বকছেন কেনো নিজে দোষ করে? কখন কোন যুগে এসব করেছেন আমার মাথাতেই তো ছিল না। ‘
‘ তা থাকবে কেনো। মাথাটা আছেই তো ফালতু চিন্তার জন্য। প্রয়োজনীয় কিছু তো স্থায়ী হবেও না ওতে। মাথামোটা কোথাকার। ‘
আবার! আবার অপমান! সায়েরী রাগে কিড়মিড়িয়ে উঠে। কিন্তু চওড়া গলায় বলতে পারেনা কিছু। কানে আসে সাফওয়ানের বিড়বিড় কন্ঠ,
‘ এজন্যই বাচ্চা-কাচ্চার সাথে সম্পর্ক গড়তে নেই। বিনা নোটিশে মান-সম্মান নিলামে তুলে দিল। ইডিয়ট! ‘
সায়েরী প্রতিউত্তর করার সময়টুকু পায়না। পূর্বেই দেখা মিলে আবরারের। উপস্থিত দুজনের দিকে তাকিয়ে সে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করে,
‘ তোরা এখানে কি করছিস? ‘
সায়েরী আমতাআমতা করে জবাব দিল,
‘ নীতি আপু পাঠিয়েছিল উনার মোবাইল ফেরত দিতে। এজন্যই এসেছিলাম ভাইয়া। ‘
আবরার কিছু বলে না। সায়েরী দ্রুত পায়ে ফিরে যায় ইরা’র রুমে। বাকি দুজন সেখানেই দাঁড়িয়ে। আবরার পা বাড়াতে গিয়েও থামল সাফওয়ানের কন্ঠ শুনে,
‘ দেখা হওয়ার পর থেকেই চুপচাপ হয়ে আছিস। গত দুই সপ্তাহ ধরে আমার টেক্সট,কল কিছুরই রেসপন্স করিস নি। কারণ কি? ইগনোর করিছিস? ‘
আবরার মাথা তুলে, চোখে চোখ মিলিয়ে ঠাই দাঁড়িয়ে। গম্ভীর কন্ঠে সে ফিরতি প্রশ্ন করে,
‘ ব্যস্ত ছিলাম। ইগনোর করবো কেনো? ইগনোর করার মতো কি কিছু করেছিস? ‘
এই যাত্রায় চুপ মেরে গেল সাফওয়ান। আবরার হাসলো তা দেখে। সাফওয়ানের কাধ চাপড়ে বললো,
‘ মজা করছিলাম। সিরিয়াস হচ্ছিস কেনো? ব্যস্ত ছিলাম বলেই রেসপন্স করতে পারিনি। আজ এসেছি, দেখা হবে জানতাম তাই আর বলিনি কিছু। ‘
সাফওয়ান মাথা দোলায়। দুজন গিয়ে পুণরায় যোগদান করে লিভিং রুমের আড্ডায়।
ইরিনাকে নিয়ে বেশ ভয়ে আছে ইরা। মেয়েটা সেই কখন থেকে চোখ মুখ শক্ত করে বসে আছে। ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সায়েরীর দিকে। যেন চোখ দিয়েই ভস্ম করে দিবে। ইরা চাইছে কোনো রূপ ঝামেলা ছাড়া আজ সকলে বিদায় নিক। তারপর সে ইরিনাকে বুঝাবে। এর আগে যেন কোনো অঘটন না ঘটে। মেয়েটা যেন নিজের রাগটুকু সংযত রাখতে পারে এটাই চায় সে।
রাত সাড়ে আটটার পরপরই ডিনারের আয়োজন করা হলো। যেন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে পারে সকলে। পাশাপাশি ডাইনিং টেবিল দুটো বসিয়ে, চেয়ার পেতে বসেছে সকলে। সাফ্রিন এবং সায়েরী পাশাপাশি বসার পরপরই সায়েরীর পাশের চেয়ার টেনে বসলো ইরিনা। ইরা আড়চোখে তাকাল সেদিকে। বলতে পারলো না কিছু। সে এবং নীতি ব্যস্ত সবাইকে সার্ভ করে দেওয়ায়। এই যাত্রায় ইরিনাও রয়েসয়ে দাঁড়ালো সার্ভ করার বাহানায়৷ শুরুতেই বিফ ভর্তি মাংস হাতে নিল সে। চামচ নাড়তেই গরম গরম ঝুল এসে পড়ল সায়েরীর হাতে, কাপড়ে। গরম তাপে মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো মেয়েটা। উপস্থিত সকলে চমকে উঠলো হঠাৎ ঘটা ঘটনায়। ইরিনা হন্তদন্ত গলায় বলে উঠলো,
‘ আ’ম সো স্যরি। আমি একদম খেয়াল করিনি। বেশি পড়েছে? আসো আমি ক্লিন করে দিই। ‘
সায়েরী জোরপূর্বক হাসে। সৌজন্য বজায় রাখতে বলে,
‘ ইট’স ওকে আপু। আমি ক্লিন করে আসছি। ‘
বলেই উঠে গেল সে। ব্যস্ত পায়ে ঢুকল ইরা’র রুমের দিকে। ইরা গম্ভীরমুখে বোনের দিকে তাকিয়ে। তার এই দৃষ্টি উপেক্ষা করে ইরিনা নাটকিয় ভঙ্গিতে অপরিষ্কার হাত দেখিয়ে বলে উঠলো,
‘ আমারও একটু ওয়াশরুমে যাওয়া প্রয়োজন। আপনারা শুরু করুন। আমি আসছি। ‘
ইরা তাকে আটকাতে চেয়েও পারে না। সবার সামনে কি বলেই বা আটকাবে! জাদিদ এবং বন্ধুদের জোরাজুরি দেখে ভেতরে যেতে চেয়েও সে ব্যর্থ হয়। খেতে বসতে হয় সকলের সাথে।
সায়েরী রুমে প্রবেশ করেছে ঠিক। কিন্তু ওয়াশরুমে ঢোকার সময়টুকু পেল না সে। মৃদু শব্দ তুলে রুমের দরজা বন্ধ হতেই সে চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকালো। ইরিনা দাঁড়িয়ে আছে শক্ত মুখাবয়ব নিয়ে। সায়েরী ফিরতেই সে লম্বা লম্বা কদম বাড়িয়ে সামনে আসে। ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলে উঠে,
‘ সাফওয়ান তবে তোমাকে ডেট করছে! কান্ট বিলিভ ওর চয়েজ এতটা ন্যাইভ! (Naive) ‘
সায়েরী আশ্চর্য হয় এধরণের কথায়। অপমানিত বোধ করে খুব। রুষ্ট গলায় প্রতিউত্তর করলো সে,
‘ এসব কি ধরনের কথাবার্তা আপু? আপনি আমাকে অপমান করছেন কেনো? ‘
ইরিনা উচ্চ স্বরে হাসে। পুণরায় তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
‘ অপমান! তোমার তবে মান-ও আছে? ওয়াও! আমার জানা মতে নিজেরদের ইনোসেন্সি দেখিয়ে বড় লোক ছেলেকে হাত করা মেয়েদের সম্মান বলতে কিছুই থাকে না। তোমার আছে শুনে ভালো লাগলো। ভেরি গুড। ‘
সায়েরীর চোয়াল শক্ত হয়। তার চরিত্র নিয়ে এমন আজেবাজে কথা বলার অধিকার কে দিয়েছে এই মেয়েকে?
‘ আপনার সাথে আমার শত্রুতা নেই কোনো। তাহলে যেচে পড়ে আমার চরিত্র নিয়ে এধরণের মন্তব্য করছেন কেনো? কতটুকু জানেন আমার ব্যাপারে? আমি সাফওয়ান ভাইয়ের পিছনে পড়েছিলাম, না কি সে ভালোবেসে আমাকে কাছে টেনেছিল সেসব না জেনেই যা ইচ্ছে বলে যাচ্ছেন কোন অধিকারে? ‘
‘ ভালোবেসে! সিরিয়াসলি তুমি বিশ্বাস করো সাফওয়ান তোমাকে ভালোবাসে বলে? ‘
‘ আপনার বড় হয় সে। নাম ধরে ডাকা বন্ধ করুন। আর আমি তাকে বিশ্বাস করি কি না এই কৈফিয়ত আমি আপনাকে দিতে যাব কেনো? ‘
‘ বিশ্বাস করোনা সেটা মেনে নিলেই পারো। আসলে দোষ তোমার না। তোমার বয়সের। এই বয়সে হ্যান্ডসাম, চার্মিং কোনো ছেলে দুই চারটা মিষ্টি কথা বললে এমনিতেই মেয়েরা গলে যায়। বাকি রইল সাফওয়ানের কথা। সে নিশ্চয় ইনফেচুয়েশন-এ ভোগে দুই চারটা মিষ্টি কথা বলে ফেলেছে তোমাকে। আর তুমি আগ বাড়িয়ে জড়িয়ে গিয়েছ বলেই সে এখন চেয়েও দূরে সরাতে পারছে না। বেস্ট ফ্রেন্ডের বোন বলে কথা। তোমাকে কষ্ট দিলে তো ওদের বন্ধুত্ব টাই ভেঙ্গে যাবে। নয়তো তোমার মতো ইম্যাচিউর, হাঁটুর বয়সী একজনের সাথে রিলেশন রাখতো সাফওয়ান? ওর স্ট্যাটাস সম্পর্কে ধারণা আছে তো তোমার? কখনো কারো সামনে তোমাকে নিজের গার্লফ্রেন্ড বলে পরিচয় দিতেও তো হাজার বার ভাবতে হবে ওকে। হি ডিজার্ভ অ্যা ওয়েল স্ট্যান্ডার্ড, ম্যাচিউর গার্ল। এইজ গ্যাপ হবে তিন অথবা চার। না কি তোমার মতো নিব্বি মেয়ে পেলে তুলে বড় করবে। আর তোমার আছে টা-ই বা কি? এভারেজ মিডল ক্লাস ফ্যামিলি। তোমার তো সাফওয়ান কে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেও ভাগ্য লাগবে। সে-ই তুমি নিজেকে ওর গার্লফ্রেন্ড বলে দাবি করছ? সাফওয়ান কি কখনো নিজ থেকে কনফেশন দিয়েছে তোমাকে? বলেছে কারো সামনে যে তুমি ওর সো কল্ড গার্লফ্রেন্ড? কি হলো জবাব দাও, বলেছে?
সায়েরী জবাব দিতে পারে না। বহু পূর্বে যেই সত্যগুলো তার অবচেতন মন তুলে ধরেছিল। আজ তা অন্য কেউ তুলে ধরেছে। আরও তীব্রভাবে। একদম বুক এফোড় ওফোড় করে দেওয়ার মতো করে।
‘ আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। ওইযে, তোমার বয়স টাই এখন এমন। তবে তুমি চাইলে নিজ থেকেই সাফওয়ান কে এই দোটানা থেকে মুক্তি দিতে পারো। ভেবে দেখো, ওর চয়েস কি আর তোমার মতো সাধারণ হবে? ও কতটা ম্যাচিউর একজন ছেলে। নিজের জন্যও চাইবে এমন কাউকে। যে ওকে বুঝবে, ওর পরিস্থিতি বুঝবে। কিন্তু তুমি! আই গেস তোমাকে বোঝাতে বোঝাতেই ওর দিন চলে যায়। আবরার ভাইয়ের সাথে ওর ফ্রেন্ডশিপ যেন নষ্ট না হয়, এজন্যই হয়তোবা ও বলছে না তোমাকে কিছু। তাই বলে তুমিও বুঝবে না কিছু? এতটা বোকামিও কিন্তু মানায় না তোমাকে। ‘
সায়েরী স্তব্ধ! বিমূঢ়! প্রতিউত্তর করার বিন্দুমাত্র ভাষা নেই। ইরিনা ওর অগোচরে হাসে। সাইকোলজির স্টুডেন্ট সে। খুব সহজের মানুষের মস্তিষ্ক পড়তে পারে সে। তাই তো, অনাসয়ে সায়েরী ‘র ব্রেন ওয়াশ করতে পেরেছে। বাঁকা হেসে ওয়াশরুমে ঢুকতে গিয়েও সায়েরীর ডাক শুনে থামলো সে। ফিরতেই তার কাছাকাছি এগিয়ে আসলো সায়েরী। চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আজ আপনি কথাগুলো না বললে জানতেই পারতাম না আমি কতটা স্পেশাল। বলেছেন না সাফওয়ান ভাইয়ের চয়েজ সাধারণ হতে পারে না? একদম ঠিক। সাফওয়ান ভাইয়ের চয়েজ সবথেকে আলাদা। সব চেয়ে বেশি স্পেশাল। আর সেই স্পেশাল মেয়েটা হলাম আমি। লাভ না ইনফেচুয়েশন? এই দোটানায় ভুগে একটা মেয়ের ফিলিংস নিয়ে খেলা করার মতো ছেলে সাফওয়ান খান নয়। আর না তো তার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করার জন্য কারো সামনে আমাকে নিয়ে কোনো স্বীকারোক্তি দিতে হবে তাকে। আমি জানি, আমি অনুভব করি সে আমাকে ভালোবাসে। আর আমার জন্য এটাই যথেষ্ট। আপনি কিংবা অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের কোনো চিন্তা করতে হবে না আমাদের নিয়ে৷ আমরা আমাদের মতো যথেষ্ট ভালো থাকব। আপনি বরং নিজের কথা ভাবুন। আমার জামা নষ্ট করার ইনটেনশন নিয়ে নিজের জামা নষ্ট করে ফেলেছেন৷ আশা করবো অন্যের জীবন নষ্ট করার কথা ভাববেন না। পাছে যদি জামার মতো জীবনটাও নষ্ট হয়ে যায়! ‘
মিষ্টি কন্ঠে সুক্ষ্ম অপমান-টুকু করে, ইরিনাকে ডিঙিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো সায়েরী। শব্দ করে দরজা লাগালো৷ ইরিনা ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে৷ রাগে শরীর জ্বলছে তার। এতটা অপমান ইহজীবনে কেউ করেনি তাকে। এই সাধারণ মেয়েটার সাহস কি করে হলো তাকে এতগুলো কথা শুনানোর?
সায়েরী বের হলো অল্প সময়ের মধ্যেই। ইরিনাকে যেন চোখেও পড়লো না এমন ভাব নিয়ে পুণরায় ডাইনিং-এ ফিরে গেল সে। নিজের স্থানে বসলো গম্ভীর মুখে৷ খাওয়ার ইচ্ছেটুকু বেঁচে নেই আর। প্লেটে থাকা খাবারটুকু নাড়াচাড়া করছে কেবল৷ উপস্থিত প্রায় সকলেই লক্ষ্য করলো ওর এই থমকানো রূপ। শরীর খারাপ লাগছে বলে ব্যাপারটা এড়িয়ে গেল সায়েরী। না চাইতেও অল্পস্বল্প খাবার মুখে তুললো। না দেখেও সে স্পষ্ট ঠের পেল সম্মুখে অবস্থানরত সাফওয়ান তার দিকেই চেয়ে। সায়েরী ভুলেও চোখ তুললো না৷ কোনো রকমে খেয়ে সবার আগেই উঠে গেল। গিয়ে বসল লিভিং রুমে। ইরিনা খাবে না বলে রুমেই বসে ছিল। ইরা জোর করে নিয়ে এসেছে। সে এখনো ডাইনিং-এ বসে।
খাওয়ার পর অল্প সল্প ডেজার্টের ব্যবস্থা করেছিল। সেসব সাজিয়েছে লিভিং রুমের টেবিল জুড়ে। সাফ্রিন একপিস বাদামের বরফি মুখে তুললো। সায়েরীকেও সাধলো খাওয়ার জন্য। মেয়েটা পাত্তা দিলনা। সাফ্রিন জোর করে সায়েরীর মুখে তুলে দিতে গেলে সম্মুখ হতে ভেসে আসল সাফওয়ানের কন্ঠস্বর,
‘ ওটা চীনা বাদামের বরফি সাফা। ওকে দিচ্ছ কেনো? ‘
সহসা থেমে গেল সাফ্রিন। চীনা বাদামে এলার্জি আছে সায়েরীর। খেলেই র্যাশ উঠে যায় শরীরে। শ্বাসকষ্ট হয়। সায়েরী মাথা তুলে চাইলো এবারে। জেদ দেখিয়ে খপ করে সাফ্রিনের হাত থেকে বরফি কেড়ে নিয়ে মুখে পুরে নিল সে। আবরার মাত্রই পা রেখেছে লিভিং রুমে। সায়েরী প্লেট থেকে আরও দুটো বরফি তুলে ঠেশে দিলো মুখের ভিতর। আবরার,সাফওয়ান এবং সাফ্রিন হতবাক তার এহেন কান্ডে। সাফওয়ানের পূর্বে আবরার চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ কি করছিস সায়ু? এটা চীনা বাদামের বরফি। তোকে স্যুট করে না, জানিস না নাকি? ‘
সায়েরী প্রতিউত্তর করে না। যেন শুনতেই পারে নি। দাঁড়িয়ে গিয়ে সে বলে উঠলো,
‘ অনেক্ষণ হল ভাইয়া। আমার মাথা ব্যাথা করছে। আমি বাসায় যাব। এক্ষুনি। ‘
অজানা কারণে সায়েরীর আচরণ দেখে আবরার না করলো না। বললো সব গুছিয়ে নিতে। সায়েরী ছুটলো ভিতরে। ইরা’র রুমে তার পার্স এবং মোবাইল রাখা৷ সেসব নিয়েই চলে যাবে বাসায়। সাফ্রিনও আসলো পেছন পেছন। সেও নিজের ব্যাগ,মোবাইল হাতে নিল। সায়েরী চলে গেলে সে থাকবে কেনো!
ইরা এবং ইরিনা সেখানেই উপস্থিত ছিল। সায়েরী রুম থেকে বের হচ্ছে দেখে ইরা পা বাড়ালো তার সঙ্গে সঙ্গে। নম্র কন্ঠে বললো যেন আবার আসে। সায়েরী মুচকি হেসে প্রতিউত্তর করলো, অবশ্যই আসবে। দুজন পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটছে, এমন সময় আচমকা ইরা’র পা আটকালো কিছু একটাতে। আকস্মিক তাল হারিয়ে সে মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছিলো ফ্লোরে। ভাগ্যক্রমে পেছন থেকে ইরিনা টেনে ধরলো তার হাত। ইরা’র শ্বাস যেন গলায় আটকা পড়েছিল এক মুহুর্তের জন্য। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই সে দুইহাতে নিজের পেট চেপে ধরলো। এই মাত্র কতবড় অঘটন ঘটতে নিচ্ছিল! আল্লাহ বাঁচিয়েছে।
‘ ইরাপু! ঠিক আছো তুমি? পা আটকালো কিসে? ‘
সায়েরী’র উদ্বিগ্ন কন্ঠ। ইরা প্রতিউত্তর করার সময়টুকু পেলনা। পূর্বেই ‘ঠাশ!!!!’ করে শব্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে সায়েরীর মাথা হেলে গেল বাম দিকে। জোড়ালো হাতের থাপ্পড়ে কান ভোঁ ভোঁ করে উঠলো তার। জ্বলে উঠল গাল। আশ্চর্য হয়ে গালে হাত রাখল সে৷ চোখ তুলে চাইল ইরিনার দিকে। ইরা আশ্চর্য হয়ে মৃদু কন্ঠে শাসাল,
‘ ইরিনা!!! ‘
ইরিনা মোটেও পাত্তা দিল না সেদিকে। সায়েরীর দিকে আঙ্গল তুলে সে চাপা স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ ইচ্ছে করে আপুকে ধাক্কা দিয়েছ তাইনা? আমার উপর রাগ ঝেড়ে মন ভরেনি বলে এখন আপুর বাচ্চা মেরে মন ভরাতে চাইছো! ইউ চিপ…. ‘
‘ ইরিনা!! চুপ কর। সায়েরী ধাক্কা দেয়নি আমাকে।
‘ আপু এই মেয়েটা… ‘
‘ চুপ!! বললাম না ও করেনি কিছু। স্যরি বল। ওর গায়ে হাত তুলার সাহস হল কি করে তোর? স্যরি বল। ‘
ইরিনা শক্ত মুখাবয়ব নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে। পেছনে স্তব্ধ সাফ্রিন,নীতি। দুজনেই রাগে ফেটে পড়েছে ইরিনার আচরণে। একমাত্র ইরা’র বোন বলেই তারা চুপ করে আছে। সায়েরী’র দৃষ্টি টলমল করে উঠলো। এতগুলো বছরে তার মা-ও গায়ে তুলেনি কখনো। আর আজ কি না…। সহ্য করতে না পেরে নিরবেই সে ছুটে গেল বাহিরে। ছেলেরা অনেক আগেই নেমে গিয়েছে। সিড়ির পথে আচমকা সায়েরী মুখোমুখি হলো সাফওয়ানের। সায়েরীর চোখেমুখের হাল দেখে সাফওয়ানের কপালে ভাঁজ পড়ল। কাছ ঘেষে সে থুতনি উঁচু করে ধরলো সায়েরী’র। বিচলিত কন্ঠে শুধালো,
‘ কি হয়েছে? কাঁদছো কেনো? ‘
একথা শুনে অবাধ্য অশ্রু গাল বেয়ে নামলো। মেয়েটা ঠোঁট নেড়ে কিছু বলতে চেয়েও ব্যর্থ হলো। সাফওয়ানের নজরে আসলো ডান গালের আঙ্গুলের চাপ। চোয়াল শক্ত হলো তার। গম্ভীর কন্ঠে সুধাল,
‘ কে করেছে এটা? ‘
সায়েরী জবাব দিতে পারে না। পূর্বেই হাজির হলো সাফ্রিন। তাকে দেখে সাফওয়ান হাত সরিয়ে নিল নিজের। সাফওয়ানের প্রশ্ন শুনেছে বলে সাফ্রিন নিজেই জবাব দিল,
‘ ইরিনা আপু করেছে ভাইয়া। সবার সামনে থাপ্পড় মেরেছে সায়ুকে। ‘
‘ ও কেনো হঠাৎ থাপ্পড় মারতে যাবে তোমাকে? কি করেছ তুমি? ‘
সায়েরীর উদ্দেশ্যে প্রশ্নটা করতেই সাফ্রিন হতবাক হয়ে গেল। এ কেমন কথা বললো তার ভাই? সায়েরীও অবাক চোখ মেলে তাকায়। মনে পড়ে ইরিনার বলা কথাগুলো। গাল বেয়ে অবিরাম অশ্রু ঝরে তার। দুইহাতে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয় সাফওয়ান কে। দ্রুত পায়ে নেমে যায় নিচে। সাফওয়ান পেছন থেকে বেশ কয়েকবার ডাকে তাকে। কি বলতে কি বলেছে তা নিজেও ঠের পায়নি সে। সাফ্রিন হতাশ এদের কান্ড দেখে। দুই দিন পরপর কোনো না কোনো ঝামেলা লেগেই থাকে।
বাসায় ফিরেই রুমের দরজা আটকে দিয়েছে সায়েরী। চলতি পথে আবরার বেশ কয়েকবার জানতে চেয়েছে তার কান্নার কারণ। শরীর খারাপ লাগছে বলে এড়িয়ে গেছে সে। গালের লালছে দাগকে র্যাশ হয়েছে বলেছে। আবরার বেশ বকেছে একথা শুনে। সায়েরী শুনেও শুনেনি সেসব৷ নিজের রুমে ঢোকেই সে শব্দ করে কাঁদল। ইরিনার কথাগুলোর বিপরীতে দৃঢ় গলায় প্রতিউত্তর করেও তার মনে সংশয় থেকে গেছে। মনে হচ্ছে সে আসলেই যোগ্য নয় সাফওয়ানের। সাফওয়ান হয়তো সত্যিই চায়না তাকে। তাইতো বিগত কয়েক দিন যাবত এড়িয়ে চলছে। মন থেকে কাছে টানলে তো বুঝত তার অভিমান। কিন্তু সে বুঝল না। আজ সায়েরীকে থাপ্পড় মেরেছে একথা শুনার পর সাফওয়ানের উচিত ছিল মানুষটাকে শাস্তি দেওয়ার। কিন্তু সে সায়েরীর দোষ খুঁজেছে। কেনো! সায়েরীর প্রতি কি তার বিন্দু মাত্র ভরসা নেই? সায়েরী শুধু ঝামেলা করে এমনই মনোভাব তার? আসলেই কি সাফওয়ান ভদ্র,সভ্য কাউকে চায় নিজের পাশে?
আজকে তো সম্মুখেই বলেছিলো, বাচ্চা-কাচ্চার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পস্তাচ্ছে সে। মানে সে সত্যিই বিরক্ত সায়েরী’র উপর?
কর্কশ শব্দে মোবাইল বাজছে। সায়েরী দেখল সাফওয়ানের কল। শ্বাস কষ্ট শুরু হয়েছে তার। গলায় অস্বস্তি শুরু হয়েছে। তখন জেদ করে বরফি খেয়েছে বলে এখন আফসোস হচ্ছে। গলার ভেতরের এই অস্বস্তি সহ্য হচ্ছে না। না চাইতেও অনবরত বাজতে থাকা কলটা রিসিভ করতে হলো তাকে। শুনা গেল সাফওয়ানের ব্যস্ত কন্ঠ,
‘ সুবহা! আর ইউ ওকে? মেডিসিন নিয়েছ? শরীর খারাপ লাগছে এখনো? ‘
অনবরত গলা হতে বুকে হাত মালিশ করে মুখ দিয়ে শ্বাস ফেলছে সায়েরী। ক্ষীণ গলায় উত্তর দিল,
‘ অ..হ আমি! আমি ঠ..ঠিক আছি। ‘
কন্ঠ-টা কর্ণগোচর হতেই সাফওয়ানের রাগ বাড়লো। শুনা গেল তার উচ্চ কন্ঠের গর্জন,
‘ ঠিক থাকলে শ্বাস আটকে আসছে কেনো? মানা করেছিলাম না বরফি না খেতে? জেদ দেখিয়ে খেয়েছ কেনো? কার সাথে জেদ দেখাচ্ছিলে তুমি হ্যাঁ? নিজেকে কষ্ট দিয়ে কি বুঝাতে চাইছো? সামনে পেলে মাথায় তুলে আছাড় মারতাম বেয়াদব মেয়ে। জেদ দেখাচ্ছে! ‘
সায়েরী ফুঁপিয়ে উঠলো কথাগুলো শুনে। অবুঝ কন্ঠে ফের বলে উঠলো,
‘ আপনি সোজাসাপ্টা বলে দিলেই তো পারেন যে আপনি আমার উপর বিরক্ত। আমি যেচে পড়ে এটেনশন চাইছি। অহেতুক বায়না করে আপনাকে বিরক্ত করি। আবার মতো টিনেজার মেয়ে তো আপনার যোগ্য না। ম্যাচিউর কাউকে চান সেটা বলে দিলেই পারতেন। বিশ্বাস করুন, আমি একদম বিরক্ত করতাম না আপনাকে। এখন থেকে করবো ও না। কখনো সামনেও… ‘
বাকি কথাটুকু বলার পূর্বে সাফওয়ানের এক ধমকে সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কেঁপে উঠল তার।
‘ সুবহা!!!!! বড্ড সাহস বেড়ে গিয়েছে না? লাই দিয়েছি বলে যা খুশি বলবে? সামনে থাকলে ঠাটিয়ে চড় লাগাতাম বেয়াদব মেয়ে। এ্যাঁই তোমার ফালতু মাথায় এসব কে ঢুকিয়েছে হ্যাঁ? নাম বলো, আই’ল কিল দ্যাট বাস্টার্ড। ‘
‘ চুপ করে আছো কেনো? নাম বলতে বলেছি। স্কিপ আপ ইডিয়ট!!! ‘
সায়েরী পুণরায় কেঁপে উঠল ধমক শুনে। চট করে কল কেটে দিল সে। অদম্য সাহস জুগিয়ে নাম্বার টা ছুড়ে ফেললো ব্লকলিস্টে। দরকার নেই এমন হাই স্ট্যান্ডার্ড ছেলের কাছে অযাচিত কোনো অপশন হয়ে থাকার। ভালোবাসে বলে কি নিজের আত্মসম্মান চাপা দিয়ে কেবল এক দোটানা হয়ে পড়ে থাকবে সাফওয়ানের কাছে? এর চেয়ে ভালো না থাকুক কোনো সম্পর্ক। সাফওয়ান খুঁজে নিক বেটার কাউকে। সায়েরীও ভালো থাকবে তাকে ছাড়া। ভীষণ ভালো থাকবে।
ভাবতে ভাবতে সে ফের ডুকরে কেঁদে উঠল। সে তো সাফওয়ান ভাই ছাড়া নিজেকে কল্পনা-ও করতে পারে না আজকাল। ওই মানুষটা ছাড়া সে বেঁচে থেকেও মরে যাবে। একদম মরে যাবে।
অনবরত দরজায় কষাঘাতের শব্দে ধরফরিয়ে উঠে দরজা খুললো সাফ্রিন। সাফওয়ান দাঁড়িয়ে কঠোর ভঙ্গিতে। সাফ্রিন দরজা খোলামাত্র সে শক্ত গলায় বললো,
‘ মোবাইল দাও তোমার। ফাস্ট! ‘
মোবাইলটা হাতেই ছিল। বিনা বাক্যে এগিয়ে দিল সাফ্রিন। ঢিপঢিপ করছে তার বুক। হয়েছে কি ভাইয়ের? এত রাতে তার মোবাইল চাইছে কেনো? প্রেমজনিত কিছু না থাকার পরেও কুলকুল করে ঘামছে সে। সাফওয়ান কললিস্টে ঢুকে নির্দিষ্ট নাম্বারটাতে ডায়াল করলো। রিং বাজছে দেখে আরও বেশি শক্ত হয় তার মুখশ্রী। তাকে ব্লক করে রেখেছে তবে! এত্ত সাহস? কল কেটে দিল সে। সাফ্রিনের সিম কার্ড বের করে নিজের ফোনে ঢুকিয়ে নিল। মোবাইল সাফ্রিনকে ফিরিয়ে দিয়ে সিড়ি বেয়ে নেমে গেল গটগট পায়ে। সাফ্রিনের মনে কু ডাকছে। অজান্তেই প্রিয় বান্ধবীটার জন্য চিন্তা হচ্ছে তার। সিম নেই। তাই সে অনলাইনে কল করলো সায়েরীকে। কিন্তু মেয়েটা অফলাইন। সাফ্রিন চিন্তিত হয়ে দোয়া করে মনে মনে। ঘুম হারাম হয়ে গেছে তার।
দোতলা বাড়িটার সম্মুখে নিস্তব্ধ রাস্তার কিনারে দাঁড়িয়ে সাফওয়ানের চকচকে কালো বাইকটি। পাশেই সে কঠোর দৃষ্টিতে অবলোকন করছে দোতলা বাড়িটার উত্তর দিকের আবছা অন্ধকার বারান্দাকে। খোলা বারান্দার ঝুলন্ত দোলনাটার দিকে তাকিয়ে সে কল লাগাল কাউকে। নিম্ন কন্ঠে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ামাত্র পুরো এলাকার পাওয়ার কাট হয়ে গেল। মুহুর্তেই অন্ধকারে তলিয়ে গেল চতুর্দিক। সাফওয়ান বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল। বাড়িটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, ভাগ্য আজ কি কি করাচ্ছে তাকে দিয়ে। একটা সময় এমন কিছু কান্ডের জন্য সে মিহাদকে কথা শোনাত। অথচ আজ নিজেই অধৈর্য হয়ে ছুটে এসেছে।
অল্প কিছুক্ষণ আগেই শাওয়ার নিয়ে বের হয়েছে সায়েরী। ঢিলেঢালা টি-শার্ট, ট্রাউজার পরে খোলা চুল মেলে ফ্লোরেই বসে পরেছে সে। টুপটুপ জলকণা ভিজিয়ে তুলেছে টি-শার্ট, ফ্লোর। মেয়েটার ধ্যান নেই সেদিকে। নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে সে বিছানায় মাথা রেখে। এমন সময় আচমকা মোবাইল বেজে উঠলো তার। রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে এই শব্দে তার বুক কেঁপে উঠলো। কারেন্ট-ও আসল ঠিক সেই মুহুর্তে। সাফ্রিনের কল। রাত দেড়-টা বাজে এই মেয়ে না ঘুমিয়ে তাকে কল দিচ্ছে কেনো? ভাবনাটা মাথায় আসলেও সায়েরীর অবচেতন মন বলছে এটা সাফ্রিনের কল নয়। অন্য একজনের কল। সেই অন্য একজন টা কে তা সে বেশ ভালো করেই জানে। ভয়ে ভয়ে কল রিসিভ করল সে। ভাঙ্গা স্বরে আওড়াল, ‘হ..হ্যালো? ‘
‘ বারান্দার দরজা খোলো। ‘ সাফওয়ানের গম্ভীর কন্ঠ।
সায়েরী আৎকে উঠে দাঁড়িয়ে গেল। নিজের রুমের বারান্দার দরজার দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো, ‘ কিহহহহ! ‘
‘ ৩০ সেকেন্ড মাত্র সময় দিলাম। এর। মধ্যে দরজা না খুললে আমি দরজা ভেঙ্গে ভেতরে আসব। ব্যাপারটা তোমার জন্য কতটা খারাপ হবে আই ডোন্ট কেয়ার। হয় দরজা খোলো, নয়তো আমি….. ‘
‘ ন..নাহ!!! এমনটা করবেন না প্লিজ। আপনি! আপনি কেনো এসেছেন এখানে? ‘ ভয়ে কেঁদে উঠল সায়েরী।
‘ টুয়েন্টি সেকেন্ড লেফট। চয়েস ইজ ইয়োর্স। সেভেন…সিক্স..পাইভ… ‘
ভয়ে আৎকে উঠে দ্রুত কল কাটল সায়েরী। অন্ধকারে ছুটে গিয়ে প্রথমেই নিজের রুমের ছিটকিনি লাগালো। পরপরই একছুটে খুলে দিল বারান্দার দরজাটা। সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁচকা টান পড়ল তার বাহুতে। মৃদু শব্দে বন্ধ হয়ে গেল বারান্দার দরজাটা। সেটার সঙ্গেই পিঠ ঠেকল সায়েরীর। ডান হাত মুছড়ে পিঠে ঠাঁই পেয়েছে। ভয়ের চোটে চিৎকার করতে গেলেই একটি পোক্ত হাত এসে চেপে ধরলো তার মুখ। আবছা অন্ধকারে মানুষটার অসম্ভব রাগ মিশ্রিত চোখজোড়া দেখেই আত্মা উড়ে গেল সায়েরীর। আজ বোধহয় আর তার রক্ষা নেই। সে শেষ! একদম শেষ!
আবছা অন্ধকার বারান্দা। আলো হিসেবে কেবল দোতলা বাড়িটার গেইটের লালচে লাইট-টার ক্ষীণ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। নিস্তব্ধতায় ঘেরা চতুর্দিক। সিলিং ফ্যানের শো শো আওয়াজে ভারী হয়ে আছে পরিবেশ। আবছা অন্ধকার বারান্দা-টার দরজার সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে সায়েরী। পিঠে চেপে ধরা ডান হাতটায় পীড়াদায়ক অনুভূতি হচ্ছে। পোক্ত হাতের জোরে হাতের কব্জি যেন খসে পড়বে। মানুষটার অন্য এক জেদি হাত সায়েরীর মুখ চেপে ধরেছে। অন্ধকার ছাপিয়ে সায়েরীর দৃষ্টি পড়ল ক্রোধ মিশ্রিত বাদামী মনির চোখজোড়াতে। কঠোর চোয়াল, কপাল এবং ঘাড়ের ফুলে উঠা নীল রগ৷ সায়েরীর বুক ঢিপঢিপ করে উঠল মানুষটার ক্রোধের মাত্রা বিবেচনা করে। বাধাপ্রাপ্ত মুখ দিয়েই ছাড় পাওয়ার আকুতি স্বরূপ ‘উম! উম!!’ জাতীয় অস্পষ্ট শব্দ তুললো সে। বিপরীতে সাফওয়ানকে দেখালো পূর্বের ন্যায় অটুট, কঠোর ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকতে। তার বলিষ্ঠ দেহের ভারে চাপা পড়া মেয়েটাকে ছটফট করতে দেখে সে নিম্ন কন্ঠে ধমকে উঠলো,
‘ স্টপ ইট! আওয়াজ করেছ তো বারান্দা থেকে ছুড়ে মারবো একদম। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো। ‘
ধমক শুনেই জমে গেল সায়েরী। ফের একবার আহত হলো হৃদয়। এবার আর নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো না সে। নামিয়ে নিল চোখ। সঙ্গে সঙ্গে নিরব এক তপ্তাশ্রু গড়াল গাল বেয়ে। টুপ করে এসে ঠাঁই জমাল সাফওয়ানের হাতের উল্টো পিঠে। প্রেয়সীর চোখের এই একফোঁটা অশ্রু স্পর্শ বোধহয় যথেষ্ট ছিল কঠোর প্রেমিক হৃদয়ে একটুখানি নমনীয়তা এসে হানি দেওয়ার জন্য। নমনীয় হলো সাফওয়ান নিজেও। সায়েরীর মুখ থেকে সরিয়ে নিল হাত। এই মেয়ের ক্রন্দনরত মুখশ্রী তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। যে দুর্বলতার কাছে হার মেনে তার আকাশস্পর্শী ক্রোধ ধসে পড়ল এক নিমেষেই। কিন্তু তবুও উপরে উপরে কঠোর ভাব ধরে রাখল সে। হাতের বাঁধন আগলা করলো ঠিকই। কিন্তু পিঠে মুছড়ে ধরা হাতটা সে ছাড়লো না। বরং সেই হাতে জোর প্রকাশ করে দরজার কাছ থেকে সরিয়ে নিল সায়েরীকে। ঠেসে ধরল নিজের প্রসস্থ বুকের সঙ্গে। মুখ ছেড়ে এবার আলতো জোর প্রকাশ করে ফুলোফুলো গালজোড়া চেপে ধরলো সে। উঁচু করলো ভীতু মুখশ্রী-টি। দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে উঠল,
‘ বড্ড বেশি সাহস বেড়ে গিয়েছে না? খুব বড় হয়ে গিয়েছ? আমার নাম্বার ব্লক করে রেখেছ। আমার!’
‘ এ্যাঁই তোমার রিজেকশন মেনে নেওয়ার মতো ছেলে আমি? তুমি বলবে আর আমি ছেড়ে দিব এটা ভাবলেও কি করে হ্যাঁ? এই মাথামোটায় কে ঢুকিয়েছে এসব? স্পিক আপ, ইডিয়ট! ‘
শেষের ধমকটা এত জোরে ছিল যে সায়েরী চোখ খিচে ফেলল। কান্না আটকানোর প্রচেষ্টায় ঠোঁট কামড়ে ধরলো দাঁত দিয়ে। কিন্তু দমাতে পারলো না। ফুঁপিয়ে উঠলো দৃষ্টি নত করে। ভাঙ্গা গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ ভুল কি বলেছি? আমি তো আপনার অযোগ্য-ই। আপনার পাশে দাঁড়াতে হলে যদি মানুষের কাছে নিজের আর পরিবারের আত্মসম্মান খোয়াতে হয়, তাহলে না দাঁড়ানোই ভালো। লাগবে না আমার আপনা… ‘
‘ শাট আপ!!!! ‘
কথাটুকু শেষ করার পূর্বেই সাফওয়ানের এই চাপা কন্ঠের গর্জন শুনেই কন্ঠ হারিয়ে গেল সায়েরীর। সাফওয়ান পারছে না গলা ফাটিয়ে গর্জন করতে। ইচ্ছে করছে ঠাটিয়ে দুটো চড় লাগাতে এই তুলতুলে গালে। তবে যদি সু-বুদ্ধি হয় এই মেয়ের। কিন্তু তা তো সম্ভব নয়। সাফওয়ানের ঝড়ে পড়া রাগ ফের জেগে উঠেছে। এবারে সে শক্ত করলো হাতের চাপ। ক্রন্দনরত মুখশ্রী টা নিজের মুখোমুখি টেনে হিসহিসিয়ে উঠল,
‘ একবার নিষেধ করিনি এসব ভাবতে? তাহলে আবারো এই মোটামাথায় এগুলো কে ঢুকিয়েছে? ‘
সায়েরী ক্লান্ত সৈনিকের ন্যায় নেতিয়ে পড়লো এবারে। ধপ করে মাথা ঠেকাল সাফওয়ানের কিঞ্চিৎ উন্মুক্ত বুকে। ডুকরে কেঁদে উঠল। তার এহেন প্রতিক্রিয়ায় সাফওয়ান থমকাল। ছেড়ে দিল পিঠে চেপে রাখা হাত। আদুরে ভঙ্গিতে পিঠ জড়িয়ে ধরল। নিভু নিভু কন্ঠে ডাকলো, ‘সুবহা!’
সায়েরী দুইহাতে খামচে ধরল সাফওয়ানের পৃষ্ঠদেশ। বুকে মুখ ডুবিয়ে অস্পষ্ট স্বরে ব্যক্ত করলো বক্ষপিঞ্জরে জমিয়ে রাখা সমস্ত অভিমান। ভাঙ্গা স্বরে বলে উঠলো,
‘ আপনাকে আমি কেনো বুঝতে পারছি না? এমন কঠোর মনোভাবের কাউকে তো ভালোবিসিনি আমি। আপনি কেনো এমন বদলে যাচ্ছেন সাফওয়ান ভাই? মিহাদ ভাইয়ার সাথে সাথে বোধহয় আমি আমার সাফওয়ান কেও হারিয়ে ফেলেছি। গত পনেরো দিন ধরে আপনি ঠিক করে আমার দিকে তাকিয়ে অবধি দেখেন নি। বুঝতে চাননি আমিও ভালো নেই আপনাকে কষ্টে দেখে, বদলে যেতে দেখে। আপনার হুটহাট রাগ উঠার স্বভাব আছে ঠিক। কিন্তু আমার সামনে তো রাগ উঠতো না। ভুল করলেও রাগ ঝাড়তেন না। অথচ এখন! সবার রাগটা আমার উপর দিয়েই যায়। পড়াশোনার বাইরে আমার সামান্যতম কথা শুনতে চান না। আগের মতো নরম সুরে কোনো কথায় বলেন না। আমি যেন শুধু একটা দায়িত্ব হিসেবে পড়ে রইছি আপনার জীবনে। ‘
‘ ইরাপুর চেকাপের কথা আপনার মনে থাকে। জাদিদ ভাইয়া থাকা স্বত্তেও আপনি আপুর সব প্রয়োজনে সঙ্গে থাকছেন। মিহাদ ভাইয়ার ফ্যামিলির জন্য রোজ আপনার সময় হয়। উনাদের সব প্রয়োজন, ভালোলাগা, দুঃখ সব কিছুর খেয়াল আছে আপনার। কিন্তু আমি! এতকিছুর ফাঁকে আপনার সুবহা কেনো হারিয়ে যাচ্ছে? আমাদের মাঝে কতটা দুরত্ব এসে পড়েছে সেটা আপনি বুঝতে পারছে না কেনো? দিনের শুরুতে আপনার সাথে সময় কাটানোর পর সারাদিন আমার ভালো যেত। কিন্তু এখন শুরু থেকেই বিষাদে ভরে থাকে সারাদিন। আপনি কখনো নিজ থেকে স্বীকারোক্তি দেননি ভালোবাসার। আমার প্রয়োজনও পড়েনি। আপনার ছোট ছোট যত্নগুলোতেই আমি আমার জন্য ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন তো সে-সব ও হারিয়ে ফেলেছি। আপনার খেয়ালই হয়না আমার দিকে। আমার মন খারাপ, রাগ, অভিমান কিছুই আপনি টের পান না। এত এত অবহেলা নিয়ে আমি আর কতদিন লড়ব? আমি যে নিজেকে আপনার বিরক্তিকর কারণ বলে দাবি করছি, এটার জন্য কি আপনি দায়ী নন? যাকে আমি ভালোবেসে ছিলাম, সেই সাফওয়ান তো অনেক গুলো দিন আগেই হারিয়ে গিয়েছে। তাহলে আপনার সঙ্গে কেনো থাকব আমি? বেনামী, প্রতিশ্রুতি হীন সম্পর্কে আটকে থেকে কি লাভ? ‘
সায়েরী থামে। ভাঙ্গা স্বরে কথাগুলো বলতে বলতে সে হাঁপিয়ে উঠেছে। কান্না থামলেও থেমে থেমে হেঁচকি উঠছে এখনো। অন্যদিকে সাফওয়ান কে দেখাল শান্ত নদীর মতো স্থির৷ আজ বহুদিন পর ফের বুকে উদিত হয়েছে পুরনো সেই চিনচিনে ব্যথা। একদা যে ব্যথা ছিল সুখ মিশ্রিত যন্ত্রণার, আজ তা কেবল বিষাদে ভরা। প্রেয়সীর হৃদয়ে যে এত এত আঘাত দিয়েছে সে। তা সে ঘূর্ণাক্ষরেও টের পায়নি। কিংবা টের পাওয়ার চেষ্টাও করেনি। মেয়েটা এত অভিমান পুষে রেখেছিল হৃদয়ে! বুক ফুলিয়ে বিষাদের শ্বাস ছাড়ল সাফওয়ান। দেহের সঙ্গে লেপ্টে থাকা মেয়েটার গাল ছুঁয়ে উঁচু করলো মুখ। ঝাপসা দৃষ্টিতে সাফওয়ানের দিকে দৃষ্টি তাক করলো সায়েরী। ছেলেটার চোখে এখন ক্রোধের পরিবর্তে একরাশ অসহায়ত্ব৷ নিজের চোখে আজ মস্ত বড় অপরাধী সে।
প্রেয়সীর অসম্ভব ফুলোফুলো চোখ,মুখ এবং অবিরাম অশ্রু দেখে সাফওয়ানের হৃদয় ভারী হয়ে উঠে। একসময় কাঁদতে বারণ করে আজ সে কতটা কাঁদিয়েছে মেয়েটাকে! সাফওয়ানের দৃষ্টি কোমল হয়ে আসে। মাথা নিচু করে সায়েরীর কপালে কপাল ঠেকাল সে। সেই সঙ্গে দুজনের নাকে নাক স্পর্শ করলো। দুইহাতে প্রেয়সীর কোমর বেষ্টনী চেপে কাছে টেনে নিল। তার কন্ঠ শুনালো আঁধারের মতো আবছা,
‘ এত কষ্ট দিয়েছি! আগে বললে না কেনো? ‘
কন্ঠ-টা শুনে সায়েরীর কোমল হৃদয় ব্যথিত হলো। শক্তপোক্ত মানুষটার এমন অপরাধীর ন্যায় মাথা ঝুঁকানো তার সহ্য হলো না। সে পায়ের পাতা উঁচু করলো। চেষ্টা চালালো সাফওয়ানের ঝুঁকানো মাথাটা নিজের ছোট্ট কাঁধে ঠাঁই দেওয়ার। সাফওয়ান বোধহয় বুঝে ফেললো তার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা টুকু। সে ঝুঁকে গেল আরও খানিকটা। সায়েরী দুইহাতে তার গলা জড়িয়ে ধরতেই পুণরায় সোজা হলো সে। সঙ্গে সঙ্গে জমিন থেকে কয়েক ইঞ্চি উপরে উঠে গেল সায়েরীর পা জোড়া৷ তার দেহের সবটুকু ভার গিয়ে ঠেকল প্রেমিক পুরুষের শক্তপোক্ত দেহটির উপর। মানুষ-টা কত অবলীলায় আগলে নিয়েছে তাকে। কোমরে, পিঠে হাত রেখে আটকে নিয়েছে বক্ষপিঞ্জরে। এই যাত্রায় মুখ তুললো সায়েরী। সাফওয়ানের গলা জড়িয়ে রেখে এবার নিজেই মিলিয়ে নিল দুজনের কপাল,নাক৷ মিহি স্বরে আকুতি জানাল,
‘ সব কষ্ট ভুলে যাব। শুধু আমাকে আমার পূর্বের সাফওয়ান ফিরিয়ে দিন। আমার আর কিছু চাই না। ‘
সাফওয়ানের বুকে তীর হয়ে বিঁধল এই আকুতিভরা কন্ঠ, এই আবদার। সে স্থির দৃষ্টিতে সেকেন্ড দুয়েক তাকিয়ে রইল সায়েরীর বন্ধ চোখের পানে। অতঃপর এতগুলো মাসের সংযম ভেঙ্গে সহসা মুখ ডুবাল প্রেয়সীর অর্ধ উন্মুক্ত, বাম ঘাড়ে। হলদেটে ঘাড়ের লাল,কালো তিল দুটোর উপর অধিপত্য জমালো তার পুরু অধর জোড়া। অনাকাঙ্ক্ষিত এই স্পর্শে সায়েরীর দেহ ঝংকার তুলল। মেয়েটা উষ্ণ অধরের সামান্যতম স্পর্শ টুকু তে প্রতিক্রিয়া করার সুযোগ টুকু পেলো না৷ পূর্বেই উক্ত স্থানে ছাপ পড়লো দন্ত স্পর্শের। ব্যথায় সাফওয়ানের কাঁধ, ঘাড়ের চুল খামচে ধরল সে। অস্পষ্ট স্বরে “উঁউহহ্” ধরনের ক্ষীণ আর্তনাদ বের হলো মুখ দিয়ে।
তার প্রতিক্রিয়ায় সাফওয়ানের অনুভূতি যেন আরও তুঙ্গে উঠল। কামড় দেওয়া স্থানে এবার শব্দ করে ভেজা ওষ্ঠ ছুঁয়ে দিল সে৷ একবার, দুইবার, অগণিত বার। আধ ঘন্টা পূর্বে স্নান করা শীতল দেহটি প্রেমিক পুরুষের উষ্ণ স্পর্শে উষ্ণ হতে শুরু করেছে। কোমল তনু কাঁপছে মৃদুমন্দ। মাত্র সেকেন্ড তিনেকের জন্য ঘাড় হতে মুখ তুললো সাফওয়ান। এক পলক চাইল তাকে আঁকড়ে ধরে তিরতির কাঁপতে থাকা মেয়েটার মুখপানে। গভীর অনুভূতি টুকু সামাল দেওয়ার চেষ্টায় ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রেখেছে মেয়েটা। চোখের ভেজা পাপড়ি যুগল কাঁপছে। সাফওয়ান মুখ উঠাতেই কিঞ্চিৎ স্বস্তি পেয়েছিল মেয়েটা।
একের পর এক জোড়ালো নিশ্বাসের তোড়ে নিজেকে সামলানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল কেবল৷ কিন্তু সেকেন্ড তিনেক অতিক্রম হতে না হতেই ফের ঝংকার খেলে গেল দেহজুড়ে৷ কণ্ঠনালী বরাবর ফের একবার অধিপত্য জমালো প্রেমিক পুরুষের উন্মাদনায় ভরা ওষ্ঠযুগল। টুকরো টুকরো স্পর্শে গ্রীবাদেশ সিক্ত করে তুলছে। সায়েরী পূর্বের চেয়েও অধিক শক্তি দিয়ে খামচে ধরেছে সাফওয়ানের কাঁধ এবং ঘাড়। দম বন্ধকর এই পরিস্থিতিতে দুজনের জোড়ালো শ্বাসের শব্দ ছাপিয়ে শোনা গেল সাফওয়ানের গভীর কন্ঠস্বর,
‘ আ’ম স্যরি, সুইটহার্ট। রিয়েলি ভেরি স্যরি। অ..আই নেভার ম্যান্ট (meant) টু হার্ট ইউ। নেভার, এভার! ‘
সায়েরীর বক্ষ ভারী হলো এই মলিন কন্ঠে। মুখোমুখি হলো দুজনই। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই সায়েরী একহাতে ছুঁয়ে দিল সাফওয়ানের গাল৷ মিহি স্বরে আওড়াল,
‘ আমি জানি। ‘
সাফওয়ান পুলকিত হয় এটুকু আশ্বাস পেয়ে। পুণরায় গ্রীবাদেশে মুখ ডুবাল সে৷ অধর ছুঁয়ে দিল নিঃশব্দে। শীতল গলায় বললো,
‘ জানি না আমার কি হয়ে গিয়েছিলো। মিহাদের সব আমানত রক্ষা করতে গিয়ে এতটায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, আমি আমার আমানত টাকে-ই ভুলে বসেছিলাম৷ আমার ইগনোরেন্স তোমার উপর কেমন ইফেক্ট ফেলেছে তা আমি বুঝতেই চাইনি। [কণ্ঠনালী-তে ঠোঁট ঘষে] অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি না? অনেক কাঁদিয়েছি? ‘
প্রশ্নটুকু করেই সে চোখ তুলে চাইল পুণরায়। দেখল, প্রেয়সীর টলমল চোখজোড়া। কম্পিত থুতনি,অধর। আবছা অন্ধকারে বুঝা না গেলেও সে জানে এই মুহূর্তে মেয়েটার হলদেটে নাকের ডগা গোলাপি বর্ণ ধারণ করেছে। দৃশ্যটি কল্পনা করেই মুখ বাড়ালো সাফওয়ান। শব্দ করে অধর ছুঁয়ে দিল প্রেয়সীর নাকের ডগায়। ফিসফিস কন্ঠে শুধালো,
‘ সব কষ্ট আদর দিয়ে পুষিয়ে দিব। আর কাঁদাবো না। একদম বকবো না। প্রমিস। ‘
সায়েরী লজ্জা পেল এবারে। বহু দিনের মান-অভিমানের পাহাড় ধসে পড়লো এটুকু আদুরে প্রতিশ্রুতি শুনে। ভালোলাগা, ভালোবাসায় সিক্ত হলো হৃদয়। দীর্ঘক্ষণ পর গিয়ে তার খেয়াল হলো নিজের অবস্থানের দিকে। ফ্লোর হতে কয়েক ইঞ্চি উপরে ঝুলছে সে। হাতদুটো সাফওয়ানের গলা জড়িয়ে আছে। কোমর, পিঠ জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের সঙ্গে আগলে রেখেছে সাফওয়ান। সায়েরীর গাল গরম হয়ে উঠে ব্যাপারটা লক্ষ্য করে, ক্ষনিক পূর্বের উষ্ণ স্পর্শ টুকু মনে করে। সে নড়েচড়ে উঠে। মিহি স্বরে আবদার জানায়,
‘ নামান আমাকে। ‘
সাফওয়ান বিনা বাক্যে মেনে নিল সে কথা৷ জমিনে পা রাখা মাত্রই কয়েক কদম পিছিয়ে গেল সায়েরী। অর্ধ ভেজা পিঠ গিয়ে ঠেকল বারান্দার সফেদ দেওয়ালে। সাফওয়ান আলো আঁধারের মাঝেই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল লজ্জায় হাঁসফাঁস করতে থাকতে থাকা লাজুক প্রেয়সীকে। ডান হাতে নিজের চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে সে দুই কদম বাড়াল। কাছাকাছি এগিয়ে বিনাবাক্য ছুঁল পিঠময় ছড়িয়ে থাকা সায়েরীর ভেজা চুল৷ মেয়েটা অবুঝ চোখে মেলে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সাফওয়ান বললো না কিছু। নিজ মনে চুলগুলো স্পর্শ করতে করতে পিঠ হতে কাঁধের সামনে নিয়ে আসল। দুই কাঁধের দুই পাশে এলোকেশ সব এসে ঠাঁই জমাতেই গোলগাল মুখখানা ঢেকে গেল প্রায়। সাফওয়ান দুই হাতের আদলে তুলে নিল মুখশ্রী-টি। ডান গালে গম্ভীর দৃষ্টি ফেললো। আলতো ভাবে স্পর্শ করলো আঙ্গুলের লালচে ছাপ পড়া স্থানে। রাশভারি কন্ঠে শুধালো,
‘ ইরিনা মেরেছে? ‘
সায়েরী মুখ ফিরিয়ে নিল এবারে৷ অভিমানী গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ তা জেনে আপনার কি কাজ? জিজ্ঞেস করুন আমি কি করেছি? তখন তো জবাব পান নি৷ এখনো বলবো? ‘
‘ কে কে ছিল সেখানে? ‘
অতী মাত্রায় গম্ভীর শুনালো সাফওয়ানের কন্ঠস্বর। চাপা স্বরের ক্রোধে ভরা কণ্ঠটি। দপদপ করছে কপাল এবং ঘাড়ের নীল রগ৷ হিসহিসিয়ে বলে উঠলো,
‘ তোমার হাত ছিলনা? উল্টো ফিরে দু’টো লাগিয়ে দিতে পারোনি? ‘
‘ কিসব বলছেন! আমার বড় হয় সে! ‘ সায়েরী আৎকে উঠে।
সাফওয়ান পাত্তা দেয় না সেকথার। তার অসম্ভব রকমের রাগ লাগছে। ওই মেয়ের সাহস কি করে হয় সায়েরীর গায়ে হাত তোলার? ফোঁসফোঁস শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বারান্দার মধ্যস্থানে পড়ে থাকা হলদেটে বিন ব্যাগ টার উপর ধপ করে বসে পড়ল সে। পরপরই সায়েরীর হাত টেনে বসিয়ে দিল নিজের উরুর উপর৷ সায়েরীর পিঠ গিয়ে ঠেকল তার বুকের সঙ্গে। মেয়েটা হতভম্ব হয়ে গেল এই কান্ডে। প্রতিউত্তর করার পূর্বে সাফওয়ান রাগত্ব স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
‘ কি কি হয়েছিল কাল? ‘
‘ স্পিক আপ। আই ওয়ানা হিয়ার এভ্রি সিঙ্গেল
ওয়ার্ড । ‘
হাড়হীম করা এই কন্ঠ শুনে সায়েরী ঢোক গিলল। সাফওয়ানের পোক্ত দুই হাত তার উদরে চেপে বসেছে৷ জড়িয়ে রেখেছে বুকের সঙ্গে। সায়েরী চেয়েও কথা এড়াতে পারলো না৷ সাফওয়ান কঠোর কন্ঠে ফের একই প্রশ্ন ছুড়ল। অগত্যা সে দেহের ভারটুকু প্রসস্থ বুকটাতে ঠেসে দিয়ে থমথমে গলায় বলতে আরম্ভ করলো। শুরু থেকেই বলে দিল সব ঘটনা। কিচ্ছুটি লুকাল না। ইরিনার বলা কথাগুলো শুনে সাফওয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছিল। দেহের রক্তকণিকা টগবগিয়ে উঠেছে আকাশচুম্বী ক্রোধে। কিন্তু পরবর্তীতে সায়েরীর গর্বিত কন্ঠের প্রতিউত্তর টুকু শুনে এক নিমেষেই ক্রোধের মাত্রা মিলিয়ে গেল তার। বিষ্ময় ধরা দিল চোখে মুখে। ভুল শুনছে না তো! এই বোকাসোকা, ছিঁদকাঁদুনি মেয়েটা সত্যি এই কথাগুলো বলেছে ইরিনা কে? নিজের বিষ্ময়ভাব কাটাতে না পেরে সে আশ্চর্য কন্ঠে শুধালো,
‘ এসব তুমি বলেছো? ‘
বিপরীতে সায়েরী আরও নিবিড়ভাবে গুটিয়ে গেল সাফওয়ানের উষ্ণ বুকে। উদরে থাকা হাত দুটোর উপর হাত রেখে গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো,
‘ বলবো না কেনো? যা বলেছি কম বলেছি। উনার সাহস কীভাবে হলো আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে এমন নিকৃষ্ট কথাবার্তা বলার? আপনার ব্যাপারে এমন খারাপ মন্তব্য করার অধিকার তাকে কে দিয়েছে? বড় হয় বলে কি যা বলবে শুনে যাব? আপনাকে নিয়ে কেউ সামান্যতম বাজে মন্তব্য করলেও আমি ছেড়ে কথা বলবো না।!’
অতি শোকে মানুষ যেমন পাথর বনে যায়, ঠিক তেমনি অতি বিষ্ময়ে, ভালোলাগায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে সাফওয়ান। প্রেয়সীর সরল মনের এটুকু স্বীকারোক্তি তার সর্বত্র বশ করে নিয়েছে যেন। শীতলতা বয়ে চলেছে বক্ষজুড়ে। ক্ষণিক পূর্বে যে দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ক্রোধের দাবানল জ্বলছিল, এখন তাতে বয়ে চলেছে সুখের ফোয়ারা। সে কখনো ভাবেনি স্বীকারোক্তি হীন, প্রতিশ্রুতি হীন এই সম্পর্কে সায়েরী এতটা জড়িয়ে যাবে। সাফওয়ানের চেয়েও গভীর ভাবে সাফওয়ান’কে বুঝবে, ভালোবাসবে। কল্পনা করেনি প্রেমিক পুরুষের ব্যক্তিত্ব নিয়ে বাজে মন্তব্য করায় ভীতু মেয়েটা এমন তুখোড় জবাব দিবে। আজ এসবের স্বাক্ষী হয়ে পুলকিত হলো সাফওয়ানের প্রেমিক হৃদয়। ইরিনার মুখে উপর ছুড়া অপমান সূচক বাক্যগুলো কল্পনা করে হেসে ফেললো সে। গর্বে বুক ফুলে উঠলো। অধর কোণে বক্র হাসি ফুটিয়ে মুখ নামিয়ে আনল প্রেয়সীর কাঁধের উপর। নিঃশব্দে অধর ছুঁয়ে দিয়ে ক্ষীণ স্বরে আওড়াল,
” দ্যাট’স মাই গার্ল! ”
সায়েরীর কানে আসলো না সে কথা। অধরের স্পর্শে ছটফটিয়ে উঠল সে। জোর করে সাফওয়ানের হাত ঠেলে সরাতে চাইল। কিন্তু সরতে পারলো না বলিষ্ঠ হাতের বাঁধন হতে। অনবরত নড়াচড়ার কারণে অসতর্কতায় আচমকা তার নখের ধারালো স্পর্শ লাগে সাফওয়ানের বাম কনুই-য়ে। সামান্যতম স্পর্শ হওয়া স্বত্বেও ছেলেটা অস্পষ্ট শব্দে ব্যাথাতুর শব্দ করে বসে। সায়েরী চমকে উঠলো তা শুনে। চোখ ঘুরিয়ে সাফওয়ানের দিকে তাকাল সে। উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,
‘ কি হয়েছে? ‘
সাফওয়ানের জবাব না পেয়ে সায়েরীর কপালে ভাঁজ পড়ল। সে আগ বাড়িয়ে টেনে নিল হাতটা। কনুইয়ে স্পর্শ করা মাত্র আঠালো তরলে সিক্ত হলো তার হাতের তালু। সায়েরী আৎকে উঠলো। আবছা অন্ধকারেও সে স্পষ্ট বুঝতে পারলো তার হাতের তালু রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে। মুহুর্তেই দেহ শিউরে উঠল তার। সাফওয়ানের উরু হতে উঠে গিয়ে পাশেই ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসলো। উদ্বিগ্ন দুই চোখ গিয়ে আটকালো সাফওয়ানের রক্তে রঞ্জিত কনুইয়ে। চামড়া কেটে গিয়েছে। কনুই হতে কব্জি বেয়ে নেমেছে সরু রক্তের স্রোত। সায়েরীর বুক ধরফরিয়ে উঠল তা দেখে৷ অস্থির কন্ঠে শুধালো,
‘ এটা কীভাবে হলো? ব্যাথা পেয়েছেন কোথায়? ‘
সাফওয়ান গা ছাড়া ভাব নিয়ে সরিয়ে নিল হাত। শান্ত কন্ঠে প্রতিউত্তর করলো,
‘ সিরিয়াস কিছু না। দেওয়াল টপকাতে গিয়ে লেগে গেছে একটু। ‘
সায়েরীর কোমল হৃদয় ব্যথিত হয় এমন নির্লিপ্ত কথায়। রাগ মিশ্রিত কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আপনাকে কে বলেছিলো ডাকাতের মতো দেয়াল টপকে ঘরে ঢুকতে? যদি কেউ দেখে ফেলতো? ভাইয়া, আব্বুরা সবাই আজকে বাসায়। যদি কেউ ঠের পেয়ে যায় তাহলে কি হবে জানেন? ‘
কপাল কুঁচকে তাকাল সাফওয়ান। ডাকাত! তুলনা করার আর মানুষ পেলোনা মেয়েটা! সে গম্ভীরমুখে চেপে ধরলো সায়েরীর দুই গাল। নিজের দিকে টেনে নিয়ে রাশভারি কন্ঠে শুধালো,
‘ মাঝ রাতে দেয়াল টপকে ঘরে ঢুকতে বাধ্য করেছে কে? বারবার বলেছি, আমাকে রাগাবে না। কিন্তু তোমার সাহস তো মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ব্লক করেছ আমাকে! এবার ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু ফের যদি এমন দুঃসাহস দেখিয়েছ, তাহলে দেয়াল টপকে না। তোমার বাপ – ভাইয়ের সামনে দিয়ে এসে সাহস গুড়ো গুড়ো করবো৷ আই ওয়ার্ন ইউ সুবহা, আমাকে নিজের কাছ থেকে দূর করার চেষ্টা করেছ তো খুন করে ফেলবো। মৃত্যুর আগ অবধি আমার কাছ থেকে তোমার নিস্তার নেই। এই মোটামাথায় কথাগুলো সেট করে নাও। যদি আবারও মনে করানোর প্রয়োজন পড়ে, তখন বুঝানোর পন্থাটা তুমি সহ্য করতে পারবে না। বুঝেছো? ‘
শেষের কথাটার সঙ্গে খানিকটা ধমক মিশানো ছিল। যা শুনে ঠোঁট ফোলাল সায়েরী। গাল চেপে থাকা অবস্থাতেই মিনমিন কন্ঠে অভিযোগ তুলল,
‘ আপনি আবারো আমাকে ধমকাচ্ছেন! ‘
সাফওয়ান তার গাল টেপে, মুখখানা টেনে নিয়ে আরও ঘনিষ্ঠ করলো। গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিল,
‘ সারাজীবন ধমকাব। তুমি মাথামোটা ধমকের-ই যোগ্য। ‘
‘ তাহলে চিকন মাথা খুঁজে নিন না একটা। আমি কেন ধমক শুনবো সারাজীবন? ‘
ঠোঁট উল্টে বলা কথাটুকু শুনে সাফওয়ান অধর বাঁকিয়ে হাসলো। গাল ছেড়ে পিঠ জড়িয়ে কাছে টেনে নিল সায়েরীকে। বাম কাঁধের চুল সরিয়ে তিল দুটোর উপর অধর ছুঁয়ে দিল শব্দ করে৷ শান্ত, শীতল কন্ঠে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আমার হৃদস্পন্দনের প্রতিটা কম্পন, প্রতিটি প্রেমানুভূতি যাকে ঘিরে, সেই এক মাথামোটা কে ছাড়া আমার আর কাউকে চাই না। ‘
সায়েরী শিউরে উঠে এই স্পর্শে, এই আবছা প্রেম প্রকাশে। সব কিছু বলেও খোলাখুলি ভাবে কিছুই বলে না এই ছেলে। নিজের মনের খুশিটুকু প্রকাশ করলো না সে। গাম্ভীর্য ধরে রেখে ফের বলে উঠলো,
‘ এই করলার মতো মুখ দিয়ে যখন ‘ভালোবাসি’ বলতে এতই কষ্ট। তাহলে কিছুই বলার দরকার নেই। ‘
‘ গুড ডিসিশন! আমার জন্যই ভালো। ‘ সাফওয়ানের নির্লিপ্ত কণ্ঠ৷
সায়েরী দাঁতে দাঁত চাপে তা শুনে। থমথমে গলায় বলে উঠে,
‘ ভালো হবে না কেনো? আমি তো মাথামোটা। বলে তো দিয়েছেন – ই বাচ্চা কাচ্চার সাথে সম্পর্ক গড়তে নেই। এডাল্ট একজন তো আছেই। ম্যাচিউর, হাই স্ট্যান্ডার্ড, মেডিকেল স্টুডেন্ট। নাম ধরে ডাকে। আগেপিছে ঘুরঘুর করে। এসবের মানে কি আপনি বুঝেন না? আমার বেলায় যত মেজাজ। তাকে তো জীবনেও বলেননি যেন নাম ধরে না ডাকে। খুব ভালো লাগে শুনতে তাইনা? মধু ঝরে সে ডাকলেই? ‘
কথা কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেছে! সাফওয়ান বিষ্ময়ে বিমূঢ়। পরমুহূর্তেই সায়েরীর ঈর্ষান্বিত মনোভাব বুঝতে পেরে সে হেসে ফেলে। হুশ হারিয়ে শব্দ করেই হেসে উঠেছিল সে। সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ চেপে ধরলো সায়েরী। ভীতু নজরে তাকিয়ে, হন্তদন্ত গলা বলে উঠলো,
‘ আল্লাহ! আস্তে হাসুন। কেউ শুনে ফেললে রক্ষা থাকবে না। ‘
সাফওয়ান থেমে গেল৷ দুইহাতে পুণরায় মেয়েটাকে কাছে টেনে নিল। ঘাড় কাত করে পরখ করলো থমথমে মুখখানা। ফিচেল হেসে, ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে উঠলো,
‘ জেলাস? ‘
সায়েরী ভেংচি কাটে। থমথমে গলায় প্রতিউত্তর করে,
‘ বয়েই গেছে আপনাকে নিয়ে জেলাস হতে।’
সাফওয়ান পুণরায় অধর কামড়ে হাসলো। সায়েরীর মুখের উপরের চুলগুলো সরিয়ে দিল তর্জনী দ্বারা। ললাটে গভীরভাবে চুমু এঁকে আবছা কন্ঠে আদুরে এক স্বীকারোক্তি দিল,
‘ আমার চারধারে তুমি ছাড়া অন্য কোনো নারী অধিপত্য জমাতে পারবে না, বোকাপাখি। পৃথিবীর অন্য কোনো নারীর সাধ্য নেই আমাকে রূপ,লাবণ্য, অনুভূতি দিয়ে বশ করার। আমার বক্ষপিঞ্জরের সকল প্রেমানুভূতি একমাত্র তোমায় ঘিরে। ‘
রাত প্রায় দুইটায় কাছাকাছি সময়। সাফওয়ান একই পন্থা অবলম্বন করে বেরিয়ে গিয়েছে মাত্রই। ফার্স্ট এইড বক্স হাতে নিয়ে রুমে প্রবেশ করলো সায়েরী। বাক্স টা যথাস্থানে রেখে প্রথমেই আনব্লক করলো সাফওয়ানের নাম্বার। তারপর রুমের চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলা কাপড়, অরনামেন্টস সব গুছিয়ে নিল কোনো রকমে। ঘুমের তাড়নায় চোখ ভারী হয়ে উঠেছে। এমন সময় শব্দ করে কেঁপে উঠল তার মোবাইলটা। নোটিফিকেশনের শব্দ আসলো কানে। সায়েরী কৌতুহল বশত চেক করলো মেসেজ। সঙ্গে সঙ্গে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল তার। লজ্জায় গাল গরম হয়ে উঠল। উবে গেল ঘুম। সাফওয়ানের আইডি থেকে গোটা গোটা অক্ষরের ছোট্ট একখানা বার্তা এসেছে,
‘ পরেরবার ধমক শুনেই নিজের দিকে না তাকিয়ে ছুটে চলে আসবে না, মাথামোটা। আজ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে ছিলাম বলে সমসময় থাকবো না। আমি মোটেও ভদ্র, সভ্র ছেলে না। ‘
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫৭+৫৮
এটুকু পড়ে সায়েরী দ্রুত নজর দিল আয়নার দিকে৷ চুলগুলো সে হাত খোপা করেছে মাত্রই। ঢোলা ঢিলা টি-শার্ট টা প্রায় কাধ ছড়িয়ে পড়ে যাবে যাবে ভাব। উড়না! উড়না তো নেই শরীরে। কথাটা মাথায় আসতেই লজ্জায় হতভম্ব হয়ে গেল সায়েরী। এজন্যই কি সাফওয়ান চুল দিয়ে দুই কাঁধ ঢেকে দিয়েছিলো তার? লজ্জায় দুই হাতে মুখ ঢাকল সে। পারেনা চড়িয়ে নিজেই নিজের গাল ফাটাতে। ইশ!! এমন বোকামিও করে মানুষ! সাফওয়ান ঠিকই বলে। সে আসলেই মাথামোটা।
