Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬১+৬২

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬১+৬২

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬১+৬২
সাজিয়া জাহান সুবহা

পরিচ্ছন্ন সকাল। নেই রোদের উত্তাপ, ধূসর নয় আকাশ৷ সাদামাটা পরিবেশ। চার চাকার নতুন গাড়িটার ফ্রন্ট সিটে বসে খোলা জানালার বাহিরে দৃষ্টি রেখেছে সায়েরী। দুইহাতে জানালায় ভর দিয়ে তাতে থুতনি রেখেছে৷ শো শো বাতাস এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে তার ঘুম ঘুম মুখশ্রী। বেবি হেয়ার গুলো এলোমেলো ভাবে উড়ছে। ভোরের প্রাকৃতিক বাতাসের সুভাস নেওয়া বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না তার। কানে আসলো সাফওয়ানের গম্ভীর কন্ঠস্বর। আদেশ ছুড়েছে মাথা ভেতরে ঢুকানোর।

এই নিয়ে তৃতীয় বার একই কথা আওড়াল সে৷ প্রথম দুই বার নম্র স্বরে বলেও যখন সায়েরীর হেলদোল পায়নি। তখন বাধ্য হয়েছে নিজের গম্ভীর ফর্মে ফিরে আসতে। তাতে অবশ্য কাজ হলো। কন্ঠটা শুনামাত্র ভদ্র বাচ্চার ন্যায় সোজা হয়ে বসলো সায়েরী। তবে কাঁচ উঠাল না৷ খোলা রেখে উপভোগ করতে লাগলো স্নিগ্ধ, শীতল হাওয়া। গত রাতে সকল মান অভিমান মিটে যাওয়ার পরেও আজ সায়েরী চুপচাপ। বরং একটু বেশিই চুপচাপ। কারণ কি? সাফওয়ান অনেক ভেবে আচমকা জবাব পেলো, “লজ্জা”। গত রাতে তার পাঠানো ছোট্ট বার্তাটুকুর মর্মার্থ ধরতে পেরে নিশ্চয়ই ভীষণ রকমের লজ্জা পেয়েছিল মেয়েটা। তাই তো, আসার পর থেকেই নত করে রেখেছে দৃষ্টি।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

হাঁসফাঁস করছে অদ্ভুত রকম ভাবে। ব্যাপার-টা ধরতে পেরে অগোচরে বক্র হাসি ফুটল সাফওয়ানের অধর কোণে।
গ্রীণ ভ্যালির গেইট পেরিয়ে গাড়িটা ভেতরে প্রবেশ করামাত্র প্রথমেই লাফিয়ে নেমে পড়লো সায়েরী। কিয়ৎ ক্ষণ পূর্বেও তার নিকট যে পরিবেশ টা অত্যন্ত সাদামাটা মনে হচ্ছিলো, মুহুর্তেই তা বদলে গেল। গ্রীণ ভ্যালির রূপ আজ ভিন্নরকম। গাড়ির বাহিরে পা রাখতে না রাখতেই তাজা রজনীগন্ধার সুগন্ধে মাতোয়ারা হয়ে উঠলো সে। চারপাশে ম-ম করছে এই সুঘ্রাণ। সায়েরী আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলো বাগানের জমিটুকু আজ সাদা রূপে সজ্জিত। পূর্বে যেখানে ছিল ক্যাকটাস নামক বিরক্তিকর উদ্ভিদের অধিপত্য। আজ সেখানে সেজেগুজে আছে সাদা গোলাপ এবং সাদা রজনীগন্ধা।

সম্পূর্ণ বাগান জুড়ে এই দুই ফুলের ছড়াছড়ি। গোলাপ গাছ সব একই উচ্চতার৷ আবার রজনীগন্ধা গাছের ক্ষেত্রেও একই উচ্চতা। রহিম চাচা এবং তার বউ,মেয়ে মিলে গাছগুলো পরিচর্যা করছে। ঘাস কেটে পরিষ্কার করছে চতুর্দিক৷ সচরাচর তাদের ভোর বেলা বাগানে দেখা মিলে না৷ এতো গুলো দিনে আজ-ই প্রথম দেখলো৷ হঠাৎ এই নিয়ম বদলানোর মানে কি! আর এই ফুল গাছ গুলো! সাত সকালে এসব কেনো লাগাচ্ছে তারা? মনে হচ্ছে ভোর বেলা এসেছে এসব৷ সব গুলো এখনো সাজিয়ে রাখা হয়নি। বেশ কয়েকটা দাঁড়িয়ে আছে অদূরে। সায়েরী অবুঝ নয়নে তাকিয়ে রইলো। আনমনে এগিয়ে গেল কয়েক কদম। শিউলি তাকে লক্ষ্য করতেই একগাল হেসে এগিয়ে আসলো। বাড়িয়ে দিল একটিমাত্র সাদা গোলাপ। সায়েরী বিনা বাক্যে গ্রহণ করলো সেটি। হাতে নেওয়া মাত্র লক্ষ্য করলো গোলাপের সরু ডালে মুড়ে রয়েছে একটি ছোট্ট চিরকুট। সবুজ রাঙা রঙ তার। চিরকুটে নজর দিতেই সায়েরী আটকে গেলো পরিচিত অক্ষর গুলোতে,,

‘ অভিমানী বোকাপাখি’র মান ভাঙ্গানোর ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা চালিয়েছে অধম প্রেমিক পুরুষ। মান ভুলে, একটু টুকরো হাসি উপহার দিয়ে অধম কে ধন্য করুন, অভিমানিনী! ‘
আশ্চর্য চিত্তে পরপর দুইবার একই বাক্যগুলো মনে মনে উচ্চারণ করলো সায়েরী। দুই বার পড়ার পর মর্মার্থ বুঝতে পেরে শিরশির করে উঠলো তার তনু। শীতলতা বয়ে চলল বক্ষজুড়ে। আবেগে দৃষ্টি টলমলিয়ে উঠলো তার। সেই অবস্থাতেই ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সে। অদূরে, গাড়ির সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলছে বুঝি! কে জানে। কিন্তু তার দৃষ্টি হাসছে। বাদামি মণি দুটো জ্বলজ্বল করছে।

ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে স্তব্ধ ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রেয়সীর দিকে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই বুকে বেঁধে রাখা দুই হাত প্রসারিত করলো সে৷ নিরবে আহ্বান জানালো এক শক্ত আলিঙ্গনের। এই আহ্বান অগ্রাহ্য করার সাধ্য কি আছে অভিমানী প্রেয়সীর? উঁহু। ছিল-ও না কখনো। তাই তো সাফওয়ানের নিরব আহ্বান পাওয়া মাত্র ঠোঁট ভেঙ্গে কান্না আসলো তার৷ ছুটে গিয়ে ঠাঁই জমাল প্রেমিক পুরুষের প্রসস্থ বক্ষপটে৷ দুই হাতে শক্ত করে আকড়ে ধরলো পৃষ্ঠদেশ। নিরব কান্নায় ভিজে উঠল গাল, সাফওয়ানের আকাশী-নীল টি-শার্ট। বিপরীতে সাফওয়ান-ও দুইহাতে শক্ত আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলো তাকে। আলগোছে ঠোঁট ছোঁয়াল চুলের ভাঁজে। সায়েরী মুখ তুললো। থুতনি তখনো স্পর্শ করে রেখেছে সাফওয়ানের বুকের মধ্যিখান। তার ভেজা চোখদুটো দেখে সাফওয়ান একটুখানি হাসে। মেয়েটা এতো বেশি ছিঁদকাঁদুনি! দুইহাতের বৃদ্ধ আঙ্গুলের সহিত সে মুছে দিল সায়েরীর ভেজা গাল। অত্যন্ত আদুরে গলায় শুধালো,

‘ কাঁদছ কেনো? সারপ্রাইজ পছন্দ হয়নি? ‘
সায়েরী পুণরায় মুখ গুঁজল বুকে। টি-শার্টের একটুখানি ফাঁক গলিয়ে উঁকি দেওয়া কিঞ্চিৎ উন্মুক্ত বুকে নাক,ঠোঁট ডুবিয়ে দিল সে। মুখ ঘষল আদুরে বিড়াল ছানার মতো। তুলতুলে অধর জোড়ার স্পর্শ লাগিয়ে মিহি স্বরে প্রতিউত্তর করলো,
‘ খুব পছন্দ হয়েছে। ‘

তার এক একটা প্রতিক্রিয়ায় সাফওয়ানের দেহের রক্তকণিকা টগবগিয়ে উঠে। দেহ উষ্ণ হয়ে উঠেছে প্রেয়সীর উষ্ণ অধর যুগলের সামান্যতম স্পর্শ পাওয়া মাত্র। নিশ্বাস আটকে এসেছে বোধহয়। এই মেয়ে কি বুঝে-না সে কতটা কষ্টে সামলে রাখে নিজেকে! বুকে পাথর চেপে দুরত্ব বজায় রাখে। এমনিতেই গতরাতের পর বেসামাল হৃদয় আশকারা খুঁজছে অধিক হারে৷ মধ্যরাতের সেই ঘনিষ্ঠ মুহুর্ত টুকু যে অতটুকু – তেই সীমাবদ্ধ ছিল। এটার জন্য মনে মনে বেশ স্বস্তি পেয়েছে সে। যদি সীমা ছাড়িয়ে যেত সাফওয়ান! কি হতো তবে! মধ্যরাত, ফাঁকা রুম। কতটা কাছাকাছি ছিল দুজন। যা খুশি হয়ে যেতে পারতো। ভাগ্যিস!

ভাগ্যিস সে নিয়ন্ত্রণ করেছিল নিজেকে। নয়তো আধ ভেজা শরীর, ভেজা চুল, কাঁধ ছড়িয়ে পড়তে চাওয়া টি-শার্ট পরা অবস্থায় প্রেয়সীকে দেখেই তো অনুভূতি টগবগিয়ে উঠেছিল তার৷ আবছা আলোয় দেখা হলদেটে নরম দেহটির উন্মুক্ত গলা, ঘাড়, বিউটিবোন সব দেখে তার গলা শুকিয়ে এসেছিলো। কেমন স্নিগ্ধ, শীতল হয়ে ছিল মেয়েটা। ওই শীতল দেহটিকে নিজ হৃদয়ের সবটুকু উষ্ণ ভালোবাসা দিয়ে উষ্ণ করে দিতে মন চাচ্ছিল। কিন্তু পারেনি! বিবেক সায় দেয়নি তার। সদ্য অষ্টাদশী রমনীর কাতারে নাম লেখানো মেয়েটার মন গহীনে এত বড় দাগ কাটাতে পারেনা সে। তার ব্যাক্তিত্ব মুর্ছা যাবে নয়তো। সে চায়, তাদের কাছা আসা হবে সংশয় বিহীন। যেখানে বিবেকের বাঁধা থাকবে না। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়াস থাকবে না৷ থাকবে কেবল দেহ, মন উজাড় করা ভালোবাসা। উত্তপ্ত কিছু প্রেমানুভূতি।
ভাবনা চিন্তা শেষে গাল ফুলিয়ে তপ্ত শ্বাস ছাড়ল সাফওয়ান। জোরপূর্বক সায়েরীর কানের নিচে হাত গলিয়ে মুখখানা উঠিয়ে নিল বক্ষ হতে। ফুলোফুলো গালজোড়া, সিক্ত আঁখিদুটি দেখে টালমাটাল হলো তার অবস্থা। কাঁদলে মেয়েটাকে এমন আদুরে লাগে কেনো!

‘ ফুল গুলো আপনার পছন্দের? এজন্য এই দুটো আনিয়েছেন? ‘
সায়েরী প্রশ্ন করলো উৎসুক গলায়। দুইহাতে তখনো সাফওয়ানের বলিষ্ঠ দেহ ঝাপটে ধরে রেখেছে। যেন ছাড়ার ইচ্ছে, খেয়াল কোনোটাই নেই৷ তার প্রশ্নের বিপরীতে সাফওয়ান চোখে চোখ রেখে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আমার পছন্দের হবে কেনো? আমি তো জানি অন্য কারো পছন্দ এই শুভ্র ফুল দুটো। “এসব ক্যাকটাস – ফ্যাকটাস কাঁটাতারের পরিবর্তে বাগানে সাদা গোলাপ কিংবা রজনীগন্ধার গাছ থাকলে বেশি ভালো হতো। সুগন্ধে ভরে থাকতো। দেখেই চোখ জুড়িয়ে যেত সবার।” এটাই তো বলেছিলে তাইনা? চোখ জুড়িয়েছে? ‘

বিষ্ময়ে চোয়াল ঝুলিয়ে ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে গেল সায়েরীর। হা মুখ করে সে ড্যাবড্যাব নয়নে তাকিয়ে রইলো সাফওয়ানের দিকে। আজ থেকে বহু দিন আগে, পড়ার ফাঁকে এসব হাবিজাবি টপিক নিয়ে অনবরত বকবক করেছিল সে৷ সাফওয়ান তখন সায়েরীর জন্য নোটস বানাতে ব্যস্ত। সায়েরী ভেবেছিল কথাগুলো সাফওয়ানের কানেই যায়নি। কিন্তু না। সে শুনেছে সবটা। এবং মনেও রেখেছে। আর আজকে তো ইচ্ছে টা পূরণও করে ফেলেছে! আবেগে আপ্লূত হয়ে সায়েরী কান্নাভেজা গলায় শুধালো,

‘ আপনি সবসময় এমন-ই থাকুন। আর কখনো বদলাবেন না, প্লিজ! ‘
সাফওয়ান গভীর নজরে তাকিয়ে৷ বুকে থুতনি ঠেকিয়ে রাখা মেয়েটার মায়াময়ী মুখশ্রী টির নিকট নিজের মুখ নামাল সে। হলদেটে ললাটে গভীর ভাবে ঠোঁট ছুঁইয়ে শীতল গলায় জবাব দিল,
‘ এমন-ই থাকব। কক্ষনো বদলাব না, প্রমিস৷ ‘
জবাব পেয়ে সায়েরীর অধর কোণে বিস্তর এক হাসি ফুটল। প্রশান্তির হাসি। চোখেও ধরা দিল তার রেশ। এবারে সে দূরে সরে দাঁড়ালো। ক্ষণিক পূর্বের আবেগী রূপ ধামাচাপা দিয়ে চঞ্চল হয়ে উঠলো মুহুর্তেই। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললো,

‘ আমিও ওদের সাথে গাছ লাগাই? ‘
সাফওয়ানের কপালে ভাঁজ পড়ল একথা শুনে৷ সেকেন্ডের মধ্যে যেন বদলে গেল মুখাবয়ব। কন্ঠ হলো গম্ভীর।
‘ সেখানে তোমার কি কাজ? যেভাবে বলবে, সেভাবে লাগিয়ে দিবে ওরা৷ তোমার পড়া বাকি। ‘
‘ একটা দিন না পড়লে কিচ্ছু হবে না। একটু যাই,প্লিজ! আচ্ছা..পরে ডাবল ডাবল পড়ে পুষিয়ে নিবো। তাহলেই তো হলো৷ ‘
বাচ্চা বাচ্চা মুখ করে বলা আবদার টুকু ফেলতে পারলো না সাফওয়ান। প্রেয়সীর আবদারের কাছে হেরে যাওয়া পথিকের ন্যায় হতাশ শ্বাস ফেলে সম্মতি দিল,

‘ ঠিকাছে, যাও। ‘
তার বলতে দেরি হলেও সায়েরীর ছুট লাগাতে দেরি হলো না৷ মুহুর্তেই মেয়েটা মিলিয়ে গেল শুভ্র রাঙা ফুল গাছগুলোর মধ্যিখানে। সাফওয়ান আসল ধীরে, সুস্থে। বাড়ির সম্মুখের ডিজাইনিং সফেদ, গোল পিলারের সঙ্গে বাহু ঠেকিয়ে দাঁড়ালো সে৷ পা দুটো আড়াআড়ি ভাবে ভাঁজ করে সম্পূর্ণ ভর ঢেলে দিল বাম পায়ে৷ বুকের কাছে বেঁধে রাখল হাতদুটো। মোহনীয় দৃষ্টি জোড়া সম্মুখের শুভ্রতা-র দিকে স্থির। রজনীগন্ধা গাছগুলোর উচ্চতা কম হলেও, গোলাপ গাছগুলোর উচ্চতা প্রায় সায়েরীর মুখ সমান। থুতনি অবধি এসে ঠেকেছে।

শুভ্র রাঙা ফুলগুলোর মধ্যিখানে শুভ্র ইউনিফর্ম পরিহিতা রমনী-টিকেও আস্ত এক শুভ্র ফুল বলে মনে হল সাফওয়ানের কাছে৷ তার মনে পড়ে গেল বান্দরবানের সেই ভোর সকালের কথা। যেদিন নীলাচলের নতুন এক দিনের সূচনাতে এমনই এক শুভ্র পরী তীব্র ভাবে আকর্ষিত করেছিল তাকে। সেদিনও মেয়েটার পরনে ছিল শুভ্র রাঙা জামা। পরিবেশ ছিল শুভ্র মেঘে ঢাকা। পরবর্তীতে স্বপ্নেও এসে হানা দিয়েছিল এই হৃদয়হরণী। তবে সেখানে ছিল শুভ্র শাড়ির এক আবেদনময়ী। যার এক দর্শনে পুরুষ চিত্ত টালমাটাল হয়ে উঠে। সাফওয়ান আশ্চর্য হয়ে ভাবে, শুভ্র রঙে এমন আকর্ষণীয় লাগে কেনো এই মেয়েকে!
তার কল্পনার মাঝেই দৃষ্টি মিলল সায়েরীর উচ্ছ্বাসিত, ডাগরডাগর চোখজোড়ার সঙ্গে। উপচে পড়া খুশিতে মেয়েটার মুখ হতে হাসি সরছেই না। সাফওয়ানের বক্ষ শীতল হয়ে এলো সেই হাসি দেখে। এই তো প্রশান্তি! তার বেঁচে থাকার অন্য এক সম্বল।

দীঘির পাড়ে আসর পেতেছে ছয় বন্ধু-বান্ধব। আয়ান-তোহার মাঝে আজ গদগদ ভাব। আয়ানের শান্তশিষ্ট স্বভাবের কারণে তা লক্ষনীয় না হলেও, হাস্যজ্বল তোহাকে দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আজ মেয়েটা কোনো ত্যাড়া কথা বলেনি। ‘এই ছেলেকে বলে দে আমি ওকে চিনিনা’ ধরণের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি আয়ানকে। বরং পাশেই বসে আছে। সরাসরি প্রকাশ না করলেও বাকিরা বুঝে ফেলেছে তোহার হাতের কোল্ড ড্রিংকস টা দুজন শেয়ার করছে ফাঁকে ফাঁকে। এসব দেখেও কেউ বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখাল না। থাকুক না কিছু মুহুর্ত একান্ত ওদের। সব বিষয়ে কেনো পিঞ্চ করবে বন্ধুরা!

‘ উফফ! বুকে কেমন কেমন জ্বলছে রে! ‘
নুহাশের ব্যথাতুর কন্ঠ। সকলে উৎসুক হয়ে তাকায়৷ নাজরাত বাঁকা চোখে তাকিয়ে পিঞ্চ করে বলে,
‘ কেমন কেমন জ্বলছে? কেনো জ্বলছে? কি লাগবে বুকের আগুন নিভাতে? ‘
সঠিক প্রশ্নটাই যেন করেছে সে। যা শুনামাত্র নুহাশ মুখ লটকিয়ে জবাব দিল,
‘ একটা প্রেমিকা লাগবে। সে ছাড়া এই বুকের আগুন কেউ নেভাতে পারবে না। ‘
একথা শোনামাত্র তোহা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে উঠলো,
‘ তাহলে পুড়েই মরে যা। এই জনমে তোর বুকের আগুন নিভানোর জন্য কোনো মেয়ে আসবে না। মরার পর অবশ্য হুরপরী পাবি৷ সেজন্য মরে যাওয়াটা-ই ভালো। ‘

‘ ওই তোরে জিগাইছে কেউ? শয়তান তুই তো চাস-ই যেন আমি মরে যায়। আমার ভালা তো কানা চোখে দেখতেই পারোস না তুই। হিংসুটে মহিলা! ‘
তোহা আজ ক্ষেপল না। কোল্ড ড্রিংকসের বোতলে শেষ চুমুক লাগিয়ে বললো,
‘ কে হিংসুটে সেটা তো দেখাই যাচ্ছে। জ্বলনের খুশবু তে ভোঁ ভোঁ করছে চারিদিক। ইশ! কেমন পুড়ছে বোধহয় ভিতরটা। ‘
নুহাশ ভোঁতা মুখে তাকায়। বাকিরা মিটমিটিয়ে হাসছে ওর মুখ দেখে। আয়ানের দিকে তাকিয়ে সে তোহার দিকে আঙ্গুল তাক করে বলে উঠলো,

‘ তোর জিনিসপত্র নিয়ে এখান থেকে দূর হ আয়ান্না। সামাল দে এরে৷ মানুষের ফিলিং নিয়ে ছিনিমিনি করা মানুষের উপর কিন্তু বদদোয়া পড়ে, মনে রাখিস। ‘
একটু থেমে ফের বলে উঠলো,
‘ ভালো থাকতে চাইলে একটা ভাবী খুঁজে আন। কবি বলেছেন, বন্ধুকে সিঙ্গেল রেখে সংসার পাতানো মানুষ জন সংসারে সুখী হতে পারে না। ‘
তোহা ফিক করে হেসে দিল সেকথা শুনে৷ বললো,
‘ কোন কবি বলেছেন? কবি নুহাশানন্দ সিকদার? ‘
নুহাশ পাত্তা দিল না সেকথার। তার পাশে বসে থাকা সায়েরী এবারে তার কাঁধে মাথা রেখে স্বান্তনার সুরে বলে উঠলো,

‘ থাক বাচ্চাটা! মন খারাপ করে না৷ ভাবী খুঁজে আনার দায়িত্ব আমার। ‘
‘ দুর বা*র কথা। ভাবছিলাম তোদের মধ্যে কেউ একজনের ননদ, শালীকা পটিয়ে ফেলব আজীবনের জন্য। কিন্তু তোরা কি করলি? এই মুরুব্বি-(নাজরাত) বিয়ে করেছে যে ভাইয়ের কোনো বোন-ই নাই। শ্বশুর ব্যাটা এত্ত কমজোর! তৃতীয় বারের জন্য শক্তি হলো না তার। আর এই দুজন রে দেখ। প্রেম করার আর মানুষ পাইলো না। এই আনা কানার না আছে কোনো কানা বোন। আর না পাবে কোনো ননদ। সেদিক দিয়েও আমি বা**র লস। আর তুই? মহিলা তুই তো আরও একধাপ এগিয়ে। সোজা বোয়ালমাছ হাতিয়ে নিয়েছিস। তোর যদিও ননদ আছে। কিন্তু…
কথাটুকু বলেই সে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সাফ্রিনের দিকে। সাফ্রিনও তাকাল সেই মুহুর্তে। চোখে চোখ পড়তেই সাফ্রিন হাতের কলম উঁচিয়ে গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,

‘ খবরদার! একদম খুন করে ফেলবো। ‘
নাক মুখ কুঁচকে চোখ ফিরিয়ে নিল নুহাশ।
‘ তোর মত পোল্ট্রি মুরগী আমার লাগবেও না। দূর হ! ‘
দুজনের প্রতিক্রিয়া দেখেই বাকিরা হেসে ফেললো উচ্চ স্বরে। এমন মুহুর্তে ভাইব্রেশনে থাকা নাজরাতের মোবাইলটা কেঁপে উঠল। সাদিফের কল দেখে আলগোছে স্থান পরিবর্তন করলো সে। রিসিভ করার পর টুকটাক কথা বলে সাদিফ জানতে চাইল ক্লাস কখন শেষ হবে। নাজরাত বলে দিল নির্দিষ্ট সময়। সেই সাথে জানতে চাইল,

‘ তুমি নিতে আসবে? ‘
‘ হ্যাঁ। ‘
‘ হঠাৎ? ‘
‘ কেনো? আমার ইচ্ছে হতে পারে না বউকে দেখার? ‘
নাজরাত হেসে ফেললো একথা শুনে। মৃদু কন্ঠে প্রতিউত্তর করলো,
‘ সাদিফ! মাত্র পরশু দিন দেখা করেছি আমরা। কলেজ মিস দিয়েছিলাম। একদিন পরেই যদি আবার যায় তাহলে বাসার সবাই কি ভাববে! কি বলবো আমি তাদেরকে? ‘
অজানা কোনো কারণে আজ সাদিফের কন্ঠস্বর শোনাল অতিমাত্রায় গম্ভীর,
‘ যা ভাবার ভাবুক। ম্যারিড আমরা। এখানে এত লুকোচুরি করার কি আছে? না-কি আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছে নেই? মন বদল হয়েছে? ‘

অপ্রত্যাশিত এই প্রশ্নে কথা থেমে গেল নাজরাতের। পূর্বে কখনো সাদিফ এই ধরনের কোনো কথা বলেনি তাকে। তবে আজ কেনো! কিসের ভিত্তিতে এই প্রশ্ন তুলেছে সে! মুহুর্তেই নাজরাতের চোখ টলমল করে উঠল। গলায় দলাপাকিয়ে উঠা কান্না টুকু গিলে সে ক্ষীণ স্বরে আওড়াল,
‘ এভাবে বলছো কেনো? কি হয়েছে? ‘
‘ কিছু হয়নি। ছুটির পর আমি নিতে আসব। রাখছি এখ… ‘
‘ ছুটির পর কেনো? এক্ষুনি আসুন। আমি এই মুহুর্তেই দেখা করতে চাই আপনার সাথে। ‘
সেকেন্ডের ব্যবধানে তুমিময় সম্পর্ক-টা ফের আপনিতে রূপান্তর হলো। তীব্র জেদি কন্ঠে কথাটুকু বলেই কল কেটে দিল নাজরাত। সাদিফের প্রতিউত্তর টুকু শোনার-ও প্রয়োজন বোধ করলো না সে। কষ্ট লাগছে। এই প্রথম সাদিফের কাছ থেকে এধরণের আচরণ পেয়ে কোমল হৃদয় মুর্ছা গেছে যেন। সাদিফ কেনো বলল একথা! কি দোষ নাজরাতের!

গাড়ির ভেতরটা নিস্তব্ধতায় ঘেরা। গুমসুম মুখশ্রী সাদিফের। দৃষ্টি স্থির ব্যস্ত সড়কপথে। পাশেই থমথমে মুখ করে বসে রয়েছে নাজরাত। গাড়িতে উঠার কিছু মুহূর্ত পরেও যখন সাদিফের তরফ থেকে কোনো রকমের কথাবার্তা আগায়নি, তখন সে নিজেই জিজ্ঞেস করেছিল,
‘ কোথায় যাচ্ছি? ‘
বিপরীতে সাদিফ গম্ভীর কন্ঠেই জবাব দিয়েছিল,
‘ বাসায়। নাহিয়ানের জন্মদিন আজকে। গেস্ট আসবে কিছু। মা বলেছিল যেন আজ তোমাকেও নিয়ে আসি। কাল বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। ‘

নাজরাত নিশ্চুপ থেকে শুনে গেল। মায়ের বলা কথাটা ভুলে যাওয়ার মতো ছেলে নয় সাদিফ। সে তো পারলে কথাটা শুনামাত্র নাজরাতকে বলে দিত। কিছু বেসামাল কথাবার্তায় লজ্জায় ফেলত মেয়েটাকে। কিন্তু সে করেনি এমন। নাজরাতের মনে পড়লো, গতকাল সকালের পর সাদিফ তাকে একটাবারের জন্য ফোন-ই করেনি। সে ভেবেছিল হয়তোবা সাদিফ ব্যস্ত আছে৷ কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সাদিফ বোধহয় ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেছে তাকে। কিংবা বলা যায়, কথা বলার ইচ্ছে-ই ছিল না তার। এসব কল্পনা করতে গিয়ে ভেতরটা জর্জরিত হয়ে উঠল তার। হঠাৎ সাদিফের এমন আচরণ সে মেনে নিতে পারছে না।

বাড়ির সম্মুখে গাড়ি থামতেই নেমে গেল নাজরাত। ইচ্ছে করলো সাদিফকে রেখেই চলে যেতে। কিন্তু পারলো না। হাতে গোনা চার বার আসা হয়েছে এই বাড়িতে। চাইলেই তো আর ড্যাংড্যাং করে ঢুকে যেতে পারে না। অগত্যা দুজন এক সঙ্গেই ঢুকলো ভিতরে। লিভিং রুমেই উপস্থিত ছিল বাড়ির তিন কর্ত্রী। নাজরাতকে দেখেই এগিয়ে আসলেন তারা। সকলকে সালাম দিয়ে হাসিমুখে কথা আগাল নাজরাত৷ বিন্দুমাত্র বুঝতে দিল না ভিতরে কেমন দহন বয়ে চলেছে তার। আড়চোখে দেখল সিড়ি বেড়ে ধুপধাপ পা ফেলে চলে যাওয়া সাদিফকে। নিশি ভাবি কাছেই ছিল। সর্বদা হাসিখুশি থাকা মেয়েটা আজও অনেক কথা বললো নাজরাতকে। পরবর্তীতে শাশুড়ী তাড়া দিতেই সে তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,

‘ একটু পরেই আমার ফ্যামিলির সবাই আসবে। সাফ্রিন দেরও আসার কথা। বোধহয় বিকলে আসবে। তুমি যাও, ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করে নাও। ছোট মা তোমার রুমে আগে থেকেই শাড়ি রেখেছে। আমাদের দুজনের জন্য তোমার ভাইয়া কালকেই ম্যাচিং শাড়ি কিনেছে। সাদিফ ভাই বলেছে নিশ্চয়ই। সেটাই পড়ে নাও গিয়ে। আমার এদিকে একটু কাজ আছে। নয়তো আমি-ই হেল্প করতাম তোমাকে। ‘
নাজরাত মিষ্টি করে হাসলো নিশির আন্তরিকতা দেখে।
‘ কোনো সমস্যা নেই ভাবী। আমি ফ্রেশ হয়েই চলে আসছি। আমাকে বলে দিও কি কি কাজ বাকি। আমি হেল্প করে দিব। ‘

‘ যখন পারমানেন্টলি চলে আসবে তখন করো এসব কাজ বাজ। আপাতত এনজয় করো। যাও যাও। তোমার বর নিশ্চয়ই অপেক্ষা করতে করতে শুকিয়ে যাচ্ছে। ‘
নাজরাত জোরপূর্বক হাসল সেকথা শুনে। ধীর পায়ে উঠে গেল সিড়ি বেয়ে। সাদিফের রুমের দরজায় কষাঘাত করতেই শুনা গেল তার গম্ভীর কন্ঠ, ‘দরজা খোলা আছে।’
তপ্ত শ্বাস ফেলে ভেতরে প্রবেশ করলো নাজরাত। দেখল, ওয়াশরুমের দরজা ঠেলে রুমে পা রাখা সদিফকে। সবে মাত্র গোসল সেরে বের হয়েছে সে৷ নাজরাতের দিকে এক পলক তাকিয়ে কাবার্ডের দিকে এগিয়ে গেল সে। একটি প্যাকেট বের করে বেডের উপর রাখল। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো,

‘ এখানে শাড়ি রাখা আছে। ‘
কথাটা বলেই সে নাজরাতের পাশ কাটিয়ে রুম ত্যাগ করতে উদ্যত হলো। পূর্বেই নাজরাত স্ব শব্দে লাগিয়ে দিল দরজাটা। সাদিফের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলে উঠলো,
‘ কথা আছে আপনার সাথে। আমার সঙ্গে এমন পর পর আচরণ কেনো করছেন, সেটার উত্তর না দিয়ে আপনি কোথাও যাবেন না। ‘
সাদিফ মুখোমুখি দাঁড়াল৷ যথাসম্ভব ঠান্ডা স্বরে জবাব দিল,

‘ আমি এই মুহুর্তে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বাড়াতে চাইছি না। বাসায় গেস্ট আসবে। ঝামেলা করো না। ‘
বলেই সে ফের এগোল দরজার নিকট। নাজরাত টেনে ধরলো তার পরণের শার্ট। কান্না মাখা গলায় বলে উঠলো,
‘ আমি ঝামেলা করছি? তুমি কারণ ছাড়া আমাকে যা খুশি বলছ। অপরিচিত দের মতো আচরণ করছ। এসব দেখেও আমি চুপ থাকবো সাদিফ? আমি জানতে চাইবো না আমার দোষ টা কোথায়? ‘
সাদিফের শান্ত অতিভক্তি পালটে গেল মুহুর্তেই। শক্তি প্রয়োগ করে সে চেপে ধরলো নাজরাতের দুই বাহু। চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে উঠল,

‘ অপরিচিত দের মতো আচরণ করছি বলে কষ্ট লাগছে কেনো? তুমি তো এটাই চাও৷ আমি কে হই তোমার? আদো আমার কোনো ভ্যালিও আছে তোমার লাইফে? ‘
‘ এসব কি বলছো! ‘ নাজরাত বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল।
সাদিফ বাহু ছেড়ে দিল তার। অসম্ভব রকমের এক ক্রোধে চোখ মুখ রক্তিম আকার ধারণ করেছে তার। দরজার সঙ্গে লেপ্টে থাকা নাজরাতের দিকে তাকিয়ে সে শীতল গলায় জানতে চাইল,
‘ শাওন মাহমুদ। ইংলিশ লেকচারার। তোমাদের ডিপার্টমেন্টের-ই। চিনো নিশ্চয়ই? ‘
নামটা শুনে এক মুহুর্তের জন্য চমকে উঠলো নাজরাত। সাদিফ লক্ষ্য করলো সেটা। ফের শক্ত কন্ঠে বলে উঠলো, ‘ উত্তর দাও! ‘

নাজরাত কেঁপে উঠল অজানা এক ভয়ে৷ মাথা দুলিয়ে সায় জানাল সে। কঠোর গলায় সাদিফ পুণরায় বলে উঠলো,
‘ দুই দিন আগে তোমাকে সে প্রপোজাল দিয়েছিল? ‘
‘ স..সাদিফ! আমি উনাকে বলে… ‘
‘ দিয়েছিলো কি-না? ‘
‘ হ..হ্যাঁ। ‘
‘ কথাটা কি আমাকে বলার প্রয়োজন ছিল না? ‘
‘ সাদিফ..অ..আমি.. ‘

‘ তুমি কি হ্যাঁ? কি বলতে চাচ্ছো এখন? আমি সেদিনই তোমার সঙ্গে ঘন্টা ধরে কথা বলেছিলাম। তুমি বলোনি আমাকে। তার পরের দিন দেখাও করেছিলাম। সারাদিন সাথে ছিলে তাও বলোনি। আমি মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু গতকাল সে তোমাকে একই প্রপোজাল আবারো দিয়েছিলো কেনো? প্রথম বারে তুমি জানাওনি কেনো তুমি ম্যারিড? না-কি ভুলেই গিয়েছিলে আমাকে? ‘
স্তব্ধ নাজরাত বলতে চাওয়া কথাগুলো ভুলে বসলো যেন। ক্রন্দনরত গলায় আওড়াল একটামাত্র বাক্য,
‘ তুমি আমাকে অবিশ্বাস করছো? ‘

সাদিফ যেন শুনেও শুনল না সেকথা। ফিরিয়ে নিল মুখ। ধুপধাপ পা ফেলে বারান্দার কাছটাতে গিয়ে দাঁড়ালো সে। হয়তো রাগ দমানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। নাজরাতের ভেতর টা চুরমার হলো এই দৃশ্যে। ঠোঁট কামড়ে ফুঁপিয়ে উঠলো সে। দুজনের নিরবতায় কেটে গেল বহুক্ষণ। থেমে থেমে কেবল নাজরাতের কান্নার ক্ষীণ শব্দ শুনা গেল। তাও বেশ আবছা ভাবে৷ কতক্ষণ কাটলো কে জানে! নাজরাত বহু কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে ভাঙ্গা গলায় বলে উঠলো,
‘ সেদিন কলেজ গেইটের সামনেই স্যার এমন একটা কথা বলবে আমি ভাবিইনি। স্টুডেন্টস ছিল আশেপাশে। কেউ কিছু শুনে ফেলে কি-না সেই ভয়ে আমি কথা আগায়নি। কিন্তু ছোট্ট করে বলেছিলাম আমি বিবাহিত। স্যার হয়তো শুনেইনি সেটা। আয়ান দেখেছিল আমাদের কে।

ওকেই বলেছি একথা। ভেবেছিলাম সেখানেই শেষ। ব্যাপারটাকে তেমন গুরুত্ব দেইনি। তোমার সাথে কথা বলার সময় মনেও ছিলনা। তাই বলিনি। আয়ান নিজে স্যারকে জানিয়েছিল যে আমি ম্যারিড। কিন্তু উনি বিশ্বাস করেননি। আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন। বাধ্য হয়ে কাল কথা বলেছিলাম। আয়ান ছিল সেখানে। স্যার বলেছিলেন উনার ভুল হয়েছে। যা বলেছে সব যেন ভুলে যায়। আমি ভুলেও গিয়েছিলাম। তোমাকে ছাড়া অন্য কোনো ছেলেকে নিয়ে বিশেষ কিছু কখনো ভাবিইনি যে, ব্যাপারগুলো মনে পুষে রাখবো। কিন্তু আমি জানতাম না তুমি এতো বেশি অবিশ্বাস পুষে রেখেছ আমাকে নিয়ে৷ এতটাই সংশয় যে পেছনে স্পাই লাগিয়ে দিয়েছ! এতো অবিশ্বাস! ‘

ক্রন্দনরত গলায় বলা কথাগুলো শুনে সাদিফ কেমন দমে গেল। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল সে। মেয়েটা তার দিকেই তাকিয়ে। নিরব অশ্রু ঝরছে গাল বেয়ে৷ এগিয়ে আসলো সাদিফ৷ কিন্তু কাছাকাছি পৌঁছাতে পারল না৷ হাত বাড়িয়ে তাকে থামিয়ে দিল নাজরাত। কান্না চেপে বললো,

‘ তুমি বলতে চাইছো তোমার কাছ থেকে দূরে আছি বলে আমি এখনো মেনে নিতে পারিনি তোমাকে? গ্রহণ করতে পারিনি মন থেকে? অথচ তোমার সম্মুখেই আমার ভালোবাসার স্বীকারোক্তি দিয়েছিলাম আমি৷ একবার না, বহুবার। শুধুমাত্র নিজেকে উৎসর্গ করা বাকি আছে। সেটাও তোমার কারণে। যদি এর জন্যই তোমার মনে হয়ে থাকে আমি মেনে নিতে পারিনি তোমাকে। তাহলে আজকে সেই সংশয় টাও দূর করতে রাজি আছি তোমার। যা ইচ্ছে করতে পারো। আমার পূর্ণ সম্মতি আছে৷ তবুও অবিশ্বাস করো না। অ..আমি মানতে পারছি না। ‘

বলতে বলতে ফের ফুঁপিয়ে উঠলো সে৷ সাদিফের বুকের ভেতরটা কেমন ছটফট করে উঠলো সেই কান্না দেখে। সে হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিল নাজরাতকে। মেয়েটা ছটফটিয়ে উঠল ছাড় পাওয়ার চেষ্টায়। কিন্তু সাদিফের শক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হলো। অগত্যা বুকেই ঠাঁই জমাল সে। কিন্তু থামল না কান্না৷ সাদিফ শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে তাকে৷ শীতল গলায় বললো,

‘ আমি একবারের জন্যেও বলেছি কি, আমি তোমাকে অবিশ্বাস করেছি? ‘
‘ আর কি বলার বাদ রেখেছ! আমার উপর নজর রাখছ তুমি। কেনো? ‘
‘ ভুল বুঝছ। আমার শুধুমাত্র রাগ হয়েছিল তুমি আমাকে কিছু বলোনি দেখে। আদনানের ব্যাপারটা নিয়ে আমি তোমাকে কোনো জবাবদিহি করিনি। কিন্তু আবারো একই ভুল রিপিট করেছ তুমি। কখন বলতে আমাকে? এই লেকচারার টাও আদনানের মতো উল্টো ফাঁদ পাতলে তখন? ‘

‘ আমি তোমার হাসবেন্ড হয় নাজরাত। তোমার সব বিষয়ে জানার অধিকার আমার আছে। প্রপোজালের ব্যাপারটা তুমি হালকা ভাবে নিলেও আমি নিতে পারছি না। কোনো হাসবেন্ড-ই পারবে না। ‘
নাজরাত যেন শুনেও ঝেড়ে ফেললো কথাগুলো। সে পুণরায় ছটফটিয়ে উঠল।
‘ আমার পেছনে স্পাই লাগানোর মানে টা কি তাহলে? স্বীকার করো যে আমার প্রতি তোমার বিন্দুমাত্র ভরসা নেই। আমার ভালোবাসা টাও মিথ্যা মনে হয় তাইনা? রেখে দিয়েছ কেনো তাহলে? ভেঙ্গে ফেলো সম্পর্ক। ডিভো.. ‘
কথাটুকু শেষ করার পূর্বে নাজরাতের ব্যস্ত ওষ্ঠে শক্তপোক্ত কামড়ের ছাপ পড়ল। ব্যথায় অস্পষ্ট স্বরে আর্তনাদ করে উঠলো সে৷ খামচে ধরল সাদিফের বুক। জল জমল চোখে। সাদিফ গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ দুই লাইন বেশি বোঝাটা তোমাদের জাতগত সমস্যা তাইনা? আমি একবারও বলেছি আমি তোমাকে অবিশ্বাস করেছি? তুমি আমার ওয়াইফ। ভালোবাসি তোমাকে। বাইরের একজন পরপর দুইবার তোমাকে একাকিত্বে ঢেকে প্রপোজাল দিয়েছে। অথচ সেই ব্যাপারে তুমি আমাকে জানালে না কিছু। তাহলে আমার কি রিয়েক্ট করাটা স্বাভাবিক না? আমার মনে হতে পারেনা আমি তোমার লাইফে ভীষণ মূল্যহীন? নয়তো জানালে না কেনো? ‘
অপরাধী’র ন্যায় মাথা নুইয়ে ফেলল নাজরাত। ভাঙ্গা গলায় বললো,

‘ আর কক্ষনো এমন হবে না। তবুও এসব বলো না। আমার জীবনের সবটুকু অংশ জুড়ে রয়েছ তুমি। নিজেকে তুচ্ছ ভেবে আমার অনুভূতির অসম্মান করো না। আমি সত্যি অনেক ভালোবাসি তোমাকে। অনেক..অনেক বেশি। ‘
সাদিফ বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল। একহাতে নাজরাতের গাল মুছে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল ঠোঁটে। মৃদু কন্ঠে বললো, ‘ আমি জানি। ‘
মান অভিমানের পালা শেষে দুজনেই গিয়ে বসল ডিভানে। নাজরাত তখনো সাদিফের বুকের সঙ্গে লেপ্টে রয়েছে। সে ক্ষীণ স্বরে বলে উঠলো,

‘ তোমার এত রাগ আছে তা তো জানতাম না। ‘
সাদিফ হাসে। নাজরাতের চুলের ভাঁজে চুমু খেয়ে প্রতিউত্তর করে,
‘ তোমার ব্যাপারে আমি, আমি হিসেবে থাকি না। ওভার পজেসিভ হয়ে যায়। যতটা পজেসিভ হলে আমার বউয়ের দিকে হাত বাড়ানোর শাস্তি সরূপ কারো হাত ঝুলিয়ে দিতে পারি, ঠিক ততোটা।

একটা শুনে আকস্মিক থমকে গেল নাজরাত। মনে পড়ে গেল আদনানের কথা। পূর্বের সেই ঘটনার কিছুদিন পর সে শুনেছিল, আদনানের ডান হাত ভেঙ্গে গিয়েছে কোনো এক দুর্ঘটনায়। কেমন দুর্ঘটনা সেটা আদনান খোলাখুলি ভাবে বলেনি কাউকে। কিন্তু আজ সাদিফের কথা শুনে নাজরাতের শরীর শীতল হয়ে এলো। সে ভেবেছিলো সাদিফ মোটেও তার মা, মামা, নানুদের মতো কঠিন ব্যক্তিত্বের নয়। কিন্তু সে ভুল ছিল। সাদিফের উপরের খোলস বাবার মতো শান্ত হলেও ভেতর থেকে মায়ের রক্তের বৈশিষ্ট্য টাই পেয়েছে। যেই বৈশিষ্ট্য রয়েছে তার মামাতো ভাই সাফওয়ানের। দুই ভাই যেন একই নৌকার ভিন্ন দুজন মাঝি।

একজনের টা প্রকাশ্য হলেও অন্য জনের রূপ রয়েছে সকলের অগোচরে। নাজরাত জানে সাফ্রিনের অগোচরে সর্বদা দুজন স্পাই খোঁজ রাখে তার। ব্যাপার টা বহু বছর যাবত হয়ে এসেছে। সাফ্রিনও জানে সেটা। কিন্তু সঠিক ভাবে ধরতে পারেনি আজ অবধি। বিগত কিছু মাস যাবত সায়েরীর ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটছে বলে ধারণা আয়ানের। নাজরাতকে সে বলেছিল সেটা। সেসব নিয়ে কেউ ঘাটাঘাটি করেনি। কিংবা সায়েরীকেও জানায়নি। কারণ তারা জানে সাফওয়ান এই কাজ ঠিক কেন করেছে। কিন্তু নাজরাত ঘূর্ণাক্ষরেও আশা করে নি যে সাদিফও তার ক্ষেত্রে এমন কিছু করবে। ব্যাপার টা কে সে এখন অবিশ্বাস বলে মানতে পারছে না। সে বুঝেছে এর কারণ কি। ফাঁকা ঢোক গিলল সে । মনে পরে গেল বোন সায়েরীকে। দুই বোনের ভাগ্যে এরা কারা এসে জুটলো! এমন রক্ত গরম দুই পুরুষ কে সারাজীবন কীভাবে সামলাবে তারা!

‘ তোমাকে এই মেয়েটা মিথ্যা বলেছে, সাফওয়ান। ও ইচ্ছে করে আপুকে ধাক্কা দিয়েছিলো। ভাগ্য ভালো, আমি ছিলাম পেছনে৷ নাহলে কি হতো ভাবতেই পারছি না আমি। এজন্য ওকে থাপ্পড় মেরেছি। ভুল কি হয়েছে এতে? কান্ট বিলিভ তুমি এই মেয়েটার জন্য আম… ‘

ইরিনার কন্ঠ আচমকা থেমে গেল সাফওয়ানের কঠোর মুখাবয়ব দেখে। শক্ত চোয়াল, দাঁত কিড়মিড়িয়ে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে৷ ইরিনা অগোচরে ঢোক গিলল সেটা দেখে। যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে এসেছিল, সবটা গুড়িয়ে গেছে। সে আড়চোখে ক্ষুদ্ধ নজর তাক করলো সাফওয়ানের পাশে অবুঝ নয়নে দাঁড়িয়ে থাকা সায়েরীর দিকে। কিছু বলার জন্য পুণরায় মুখ খুলেছে, এমন সময় হুট করে সায়েরীকে টেনে নিজের সম্মুখে দাঁড় করাল সাফওয়ান। ইরিনা আশ্চর্য চোখে দেখল কঠোর ব্যক্তিত্বের মানবটার পুরুষালী একহাত পেছন থেকে ঝাপটে ধরেছে সায়েরীর উদর। নিজের প্রসস্থ বুকের সঙ্গে লেপ্টে নিয়েছে মেয়েটাকে। এই দৃশ্যে ইরিনার হৃদয় ভেঙ্গে চুরচুর হলো। অবাক হলো সায়েরী ও। সাফওয়ান কখনো কারো সামনে প্রকাশ করে না সায়েরীর সাথে তার সম্পর্ক কেমন। এভাবে কাছে টেনে নেওয়া তো দূরের কথা। তাহলে আজ হলো কি!
সে ঘাড় উঁচিয়ে চাইল৷ সাফওয়ান-ও চোখ নামিয়ে তাকাল তার দিকে। গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,

‘ আমার ব্যাপারে খারাপ মন্তব্য করেছে বলে এই মেয়েটাকে তুমি উচিত জবাব দিয়েছিলে। তাহলে তোমার গায়ে হাত তোলার অপরাধে ওকে আমার কি শাস্তি দেওয়া উচিত? ‘
ইরিনা ভয় পেয়ে গেল একথা শুনে। সায়েরী তাকিয়ে রইল চোখ বড় বড় করে। পরপরই আবার ইরিনার দিকে এবং আশেপাশে তাকিয়ে উদরের উপর থাকা সাফওয়ানের হাতটার উপর হাত রাখল। মিনমিন কন্ঠে বললো,
‘ বাদ দিন না। আমি ওসব মনে রাখতে চাচ্ছি না। চলুন এখান থেকে। ‘
সাফওয়ানের চোখে মুখে বিরক্তি ফুটে উঠলো এহেন জবাবে। চাপা স্বরে ধমকে উঠলো,

‘ তোমার পারমিশন চেয়েছি আমি? আন্সার দিতে হবে না। সোজা থাপ্পড় মারবে। ঠিক সেভাবে, যেভাবে তোমাকে মেরেছিল। ‘
‘ কাম অন, গো এহেড! ‘
সায়েরী এবং দু’জনেই চমকে উঠলো একথা শুনে। ইরিনা আৎকে উঠেছে রীতিমতো। আনমনেই সে পিছিয়ে গেল এক কদম। হন্তদন্ত গলায় বলে উঠলো,
‘ স..সাফওয়ান! ত..তুমি ভুল বুঝ… ‘
কথাটুকু শেষ হওয়ার পূর্বেই সায়েরী ফিরে তাকালো ইরিনার দিকে। কঠোর গলায় জবাব দিল,

‘ বয়সে বড় হয় আপনার। সম্মান দিয়ে, ভাই ডাকতে শিখুন। আর আমি সেদিন কোনো ভুল করেছিলাম কি-না সেটা ইরাপু বেশ ভালো জানে। আপনি ঠিক কোন কারণে আমাকে থাপ্পড় মেরেছিলেন সেটা আপনি,আমি, সাফওয়ান এবং ইরা আপু বেশ ভালো করেই জানি৷ একবার মাফ করেছি বলে বারবার করব না। আমাকে নিয়ে, আমার ফ্যামিলি নিয়ে কিংবা সাফওয়ান কে নিয়ে ফের যদি কোনো খারাপ কথা বলেছেন তো আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না, আপু। আমাকে বাধ্য করবেন না আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে। ‘

ইরিনা অপমানে,বিষ্ময়ে স্তব্ধ হয়ে আছে। সে ভাবেনি সায়েরী পুণরায় আরও একবার এমন ভাবে অপদস্ত করবে তাকে। ভেতরে ভেতরে ক্রোধে ফেটে পড়লো সে। কিন্তু শত চেয়েও মুখ ফুটে বলতে পারলো না কিচ্ছুটি। বলবে কি করে! যে মেয়েটা সম্মুখে গলা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সে তো একা নেই। তাকে জড়িয়ে আছে এমন এক মানব। যার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে সামান্যতম গলা উঁচু করে কথা বলার সাহস নেই কারো। ইরিনা দমে গেল পুরোপুরি। খোলা আকাশের নিচে নিরিবিলি রুফটপের ফ্লোরে টকটক আওয়াজ তুলে স্থান ত্যাগ করলো সে। সাফওয়ান ফিরেও তাকাল না সেদিকে। একমাত্র ইরা’র বোন বলে বেঁচে গিয়েছে এই মেয়ে। নয়তো সায়েরীর গায়ে হাত তোলার অপরাধে সে যে কতটা মর্মান্তিক শাস্তি পেত তা ভাবনাতীত। থাপ্পড় মারার দৃশ্যটা কল্পনা করেই প্রতিবার রাগে কিড়মিড়িয়ে উঠে সাফওয়ান। ইরিনাকে কিছু করতে পারছে না বলে তার উলটো রাগ হয় সায়েরীর উপর। মেয়েটা চুপচাপ থাপ্পড় খেয়ে ফিরে আসলো কেনো? উলটো ঘুরে নিজেও একটা লাগিয়ে দিতে পারেনি! কিন্তু পরমুহূর্তেই সায়েরীর কথাগুলো শুনে শান্ত হলো সে। মনে মনে হাসলো গর্বের সহিত। ইরিনা প্রস্থান করা মাত্র সায়েরীর উদরে থাকা হাতটার বাঁধন শক্ত করলো সে৷ বুকের সঙ্গে ঝাপটে ধরল সায়েরীকে। মেয়েটার ড্যাবড্যাব চোখের চাহনি অগ্রাহ্য করে সে মাথা নুইয়ে আলতোভাবে অধর ছুঁয়ে দিল সায়েরীর কানের নিচে। অস্পষ্ট কন্ঠে আওড়াল,

‘ প্রাউড অফ ইউ, সুইটহার্ট! ‘
সায়েরী সেকথা শুনল কি-না কে জানে। কিন্তু ঘাড়ের উপর সাফওয়ানের অস্তিত্ব ঠের পেতেই ছটফটিয়ে উঠল সে। হাসির তালে মৃদু ছন্দে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ উউঁহ!! সুরসুরি লাগে! ‘
মুহুর্তেই থেমে গেল সাফওয়ান। মুখ জুড়ে বিরক্তি ভাব তার। মনে পড়ে গেল মাঝরাতে বারান্দায় কাটানো মুহুর্ত গুলো। ফিরে আসার আগ মুহুর্তে সাফওয়ান যখন এক সমুদ্র আবেগ নিয়ে আবেশে সায়েরীর ঘাড়ে উষ্ণ একখানা চুমু খেতে উদ্যত হয়েছিল। তখন ঠিক এমন করেই দূরে সরে গিয়েছিল মেয়েটা। কারণ কি? সুরসুরি। এক লাহমায় সাফওয়ানের সকল আবেগ অনুভূতি জলে ভাসিয়ে দিয়েছিল মেয়েটা। যেমনটা এখন করলো। মুখ দিয়ে ‘চ’ ধরনের বিরক্তি সূচক শব্দ করে সায়েরীকে ছেড়ে দিল সাফওয়ান। পরমুহূর্তেই আবার একই ভঙ্গিতে কাছে টেনে দাঁত বসিয়ে দিল সায়েরীর তুলতুলে কানের লতি-তে। ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠলো সায়েরী। পরপরই শুনতে পেল সাফওয়ানের রাশভারি কন্ঠ,

‘ তোমার এই সুরসুরি-র রফাদফা না করা অবধি আমার নিস্তার নেই। ‘
কানে হাত চেপে চোখ,মুখ কুঁচকে তাকাল সায়েরী। উদরের উপর চেপে থাকা সাফওয়ানের হাত টাতে চিমটি কেটে থমথমে গলায় বলে উঠলো,
‘ আমাকে এখানে এনেছেন কেনো? সেদিন কি কম কথা শুনিয়েছিল ইরিনা আপু? যে আজকে আবারও নিয়ে এসেছেন শুনানোর জন্য? ‘
সাফওয়ান এবারে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল সায়েরীকে। একহাত দখল করলো সায়েরীর পাতলা, সরু কোমর। মেয়েটার ছোট ছোট চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে সে শান্ত গলায় প্রতিউত্তর করলো,

‘ কথা শুনাতেই নিয়ে এসেছি। কিন্তু তোমাকে না, ইরিনা-কে। সে তোমাকে, তোমার ফ্যামিলিকে এবং তুমি যাকে ভালোবাসো তাকে নিচু করে কথা বলেছে। বিনা কারণে তোমাকে থাপ্পড় মেরেছে। এসবের জবাব টাও তোমাকেই দিতে হতো। বড় হচ্ছো, নিজের অধিকার বুঝে নিতে শিখো। তোমার সব সমস্যার সমাধান করতে সবসময় আমি, আবরার কিংবা তোমার ফ্রেন্ড-রা থাকবে না। তোমার লাইফের সব কিছু তোমাকে একাই হ্যান্ডেল করতে হবে। আর আমিও চাই এমনটাই হোক। সবসময় ফ্যাচফ্যাচ করে না কেঁদে প্রতিবাদ করতে শিখো। আজ যেমন ইরিনার মুখের উপর জবাব দিয়েছ, ঠিক সেভাবে নিজের জন্য বলতে শিখো। আজকের এই সুবহা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি পছন্দের, গর্বের। আমি এই সুবহা-টাকে চাই। যে আমার জন্য, নিজের জন্য গলা উঁচিয়ে প্রতিবাদ করতে পারবে। বুঝেছ, মাথামোটা? ‘

সাফওয়ানের বুকে থুতনি ঠেকিয়ে মুগ্ধ হয়ে সব কথা শুনছিলো সায়েরী। কিন্তু শেষে এসে ‘মাথামোটা’ সম্বোধন টা শুনেই সে ধুম করে এক কিল বসালো সে সাফওয়ানের বুকে। দূরে সরে গিয়ে ক্ষুব্ধ গলায় বলে উঠলো,
‘ সব কথার সাথে মাথামোটা না বললে হয়না? ‘
সাফওয়ান বুকে হাত ঘষে মাথা নুইয়ে, ঠোঁট চেপে হাসলো। পুণরায় কাছে টানতে চাইল সায়েরীকে। কিন্তু মেয়েটা লাগাতার কয়েকটা চড়-থাপ্পড় মারল বাড়িয়ে দেওয়া হাত টাতেই। পাখির কিচিরমিচির শব্দের ন্যায় বলতে লাগলো,
‘ দূরে সরুন। আপনার সাথে কথা-ই নেই। ‘
‘ সবসময় এমন করেন। আন-রোমান্টিক, নিরামিষ, পাষাণ লোক। ‘

বিড়বিড় করতে করতে সে চলে যেতে উদ্যত হতেই সাফওয়ান পেছন থেকে হাত টেনে ধরল তার। সায়েরীর ছটফট করতে থাকা দুইহাত শক্ত করে চেপে ধরলো নিজের হাতের নিচে। পেছন থেকেই জড়িয়ে ধরেছে নিজের বুকের সঙ্গে। সায়েরী চাপে পরে হাঁসফাঁস করে উঠে। অসন্তুষ্ট গলায় বলে,
‘ সবসময় অপমান করেন। আমার মোটামাথা নিয়ে এত সমস্যা হলে চিকন মাথা একটা খুঁজে নিতে বলেছি না? ‘
‘ সত্যিই খুঁজে নিব? পারমিট দিচ্ছ তবে? ‘
সায়েরী দমে গেল একথা শুনে। চুপসে গেল মুখ। মিনমিন কন্ঠে জবাব দিল, ‘ জানি না। ‘
সাফওয়ান নিঃশব্দে হাসলো সায়েরীর প্রতিক্রিয়া দেখে। মুখ নামাল সে। গাল ঘষল সায়েরীর তুলতুলে গালের সঙ্গে। শান্ত, শীতল গলায় বলে উঠলো,

‘ আমিও তো বলেছিলাম, এই মাথামোটা কে ছাড়া আমার আর কাউকে লাগবে না। ‘
‘ তাহলে মাথামোটা-ও ডাকতে পারবেন না। ‘
‘ অবশ্যই ডাকতে পারবো। আমার অধিকার। তুমি বারণ করার কে? ‘
সায়েরী গাল ফোলাল। অভিমানী গলায় আওড়াল,
‘ আপনি ভীষণ খারাপ, সাফওয়ান ভাই! ‘
মুহুর্তেই সাফওয়ানের হাসিহাসি মুখখানা চুপসে গেল। ছেড়ে দিল সে সায়েরীকে। দাঁতে দাঁত চেপে অসন্তুষ্ট গলায় বলে উঠলো,

‘ সব কথার সাথে ভাই লাগানো টা কি জরুরি? ‘
সায়েরী অবাক হলো এহেন প্রতিক্রিয়ায়। পিটির পিটির চোখে তাকালো সে। জিহ্ব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে শুধালো,
‘ তাহলে কি বলে ডাকবো? ‘
সাফওয়ান আলতো চাপে চেপে ধরলো সায়েরীর দুই গাল। মুখ ছুঁইছুঁই হয়ে শীতল গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ একটু আগে, আর রাতে বারান্দায় যেটা বলে ডেকেছ সেটা ডাকবে। টোটাল পাঁচ বার ডেকেছ। ‘
‘ আই রিয়েলি লাইক দ্যা অ্যাপীল। স্যা দ্যাট অ্যাগেইন! (Appeal- সন্বোধন)
সাফওয়ানের শীতল কন্ঠের আবদার টুকু শুনে ফাঁকা ঢোক গিলল সায়েরী। মনে পড়লো, সে অবচেতনে বেশ কয়েকবার সাফওয়ান ভাই কে কেবল সাফওয়ান বলে সম্বোধন করেছে। ভাবতেই তার দেহ শিরশির করে উঠলো। কি করে ডাকল নাম ধরে! এখন তো চেয়েও মুখ দিয়ে টু শব্দ টুকু অবধি বের হচ্ছে না। সে কখনো পারবে না সরাসরি এই নামে সম্বোধন করতে।

সায়েরীর মুখ দেখেই সাফওয়ান যেন আন্দাজ করে ফেললো তার মনের ভাবনা। হতাশ হয়ে গাল ছেড়ে দিল সে। কথা বাড়ালো না আর। রেস্টুরেন্টের রুফটপ হতে নেমে গেল নিচে। রুফটপ বুকিং দেওয়া ছিল বিধায় কোনো মানুষের আনাগোনা ছিল না সেখানে। কিন্তু নিচে কাস্টমারে ভরপুর। সিড়ি বেয়ে নামতে নামতে মুখে মাস্ক লাগালো সাফওয়ান। পকেট হতে সায়েরীর মাস্ক খানা বের করে দিল। সাফওয়ানের দেখাদেখি সায়েরী-ও বিনাবাক্যে ঢেকে নিল নিজের মুখশ্রী। মনে মনে ভেংচি কাটলো সাফওয়ানের হাবভাব দেখে। আজকাল এমন ভাবে চলে, যেন কোথাকার কোন সেলিব্রিটি। অবশ্য সেলিব্রিটি বললেও ভুল হবে না। আগে শুধুমাত্র কলেজের একজন গণ্যমান্য বড় ভাই ছিল সে৷ কিন্তু সকলে এমন ভাবে তাকে মেনে চলত যেন সে কোনো পলিটিক্যাল লিডার৷ আর এখন নওশাদ খান এমপি পদ পাওয়ার পর থেকে অপ্রত্যাশিত ভাবে সাফওয়ানের ফ্যান ফলোয়ার বেড়ে গিয়েছে কয়েক গুণ। সাফওয়ানের নিজস্ব ফেসবুক অ্যাকাউন্ট তেমন ব্যবহার হয়না। অনেকেই চিনেও না। কিন্তু তারই নামে আস্ত একটা ফ্যানবেস তৈরি। যেখানের এক একটা পোস্টে রিয়েক্ট,কমেন্ট লাখের উর্ধ্বে। তন্মধ্যে নিরানব্বই শতাংশ মানুষ তাকে সম্বোধন করে

“JUNIOR KHAN” নামে। আজকাল এসব কারণেই বেশ গুটিয়ে চলাফেরা করে সাফওয়ান। বিশেষ করে সায়েরীর ক্ষেত্রে তার সচেতনতা সবচেয়ে বেশি। সে চায়না তার সঙ্গে ঘূর্ণাক্ষরেও কেউ সায়েরীকে দেখুক। তাদের পথচলা সবে শুরু। অনেক দূর অবধি যাওয়া বাকি। এসব সোস্যাল মিডিয়ার খপ্পরে পরে শুরুতেই সবটা গন্ডগোল হয়ে পড়ুক তা সে কামনা করে না।
গাড়ির কাছে আসতেই আচমকা সায়েরীর নজর আটকায় রাস্তার অপজিটে দন্ডায়মান ইরিনা-র উপর। মেয়েটা অদ্ভুত ভঙ্গিমায় ছটফট করছে। ডান হাতে পানির বোতল ধরে পানি ঢালছে বাম হাতে। হলদেটে জামাটা অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই কেমন দাগ পরে নোংরা হয়ে গিয়েছে৷ সম্ভবত চা/কফি জাতীয় কিছু পরেছে এতে। আর হাতে! হাতে কি হলো? এমন কাতরাচ্ছে কেনো সে?

‘ দাঁড়িয়ে আছো কেনো? উঠো! ‘ সাফওয়ানের ব্যস্ত কন্ঠ।
সায়েরী উঠতে গিয়ে পুণরায় ফিরে তাকায়। কৌতুহলী কন্ঠে বলে,
‘ ওদিকে দেখুন। ইরিনা আপু দাঁড়িয়ে আছে। হাতে কিছু হয়েছে বোধহয়। ‘
রোদ চশমা-টা চোখে লাগিয়ে তীক্ষ্ণ নজরে এক পলক তাকালো সাফওয়ান। অগোচরে হাসলো পৈশাচিক এক আনন্দ নিয়ে। বিড়বিড় করে আওড়াল,
‘ ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু ছাড় দিব তো বলিনি। তোমার উপর আসা প্রত্যেক আঘাতের জবাব আমি এভাবেই দিব, বোকাপাখি! ‘

রাত ন’টা৷ শ্বশুরবাড়ি তে আজ প্রথম রাত্রিযাপন নাজরাতের। থেকে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না তার। কিন্তু সকলের আবদারের কাছে হার মেনে তার বাবা সম্মতি দিয়েছে একটা রাত কাটানোর। তাছাড়া এই বাড়ির বউ হয় সে। জোর গলায় তার বাবা কি করেই বা না করতো!
বিকালের দিকে সাফ্রিন, তার মা তাহুরা খান এবং ছোট চাচি এসেছিলেন। সঙ্গে এসেছে সাফ্রিনের দুই চাচাতো ভাই-বোন। সাম্য এবং সামান্তা। সন্ধ্যা নাগাদ নিশি ভাবির পরিবারের সকলের সঙ্গে নাহিয়ানের জন্মদিনের কেক কাটা হয়েছে। বেশ রমরমা ভাবে পালন করেছে জন্মদিন। সাফওয়ান এসেছে সন্ধ্যার শেষ প্রহরে। তা-ও শুধু মাত্র সাদিফের জোরাজোরি-তে। সে যখন পৌঁছাল তখন লিভিং এরিয়ায় বসে আড্ডা জমিয়েছে সকলে। ইফাজ-নিশি, সাদিফ -নাজরাত

সাহিল-ইভান, সাফ্রিন-সামান্তা-সাম্য, সাথে রয়েছে নিশির বোন নীলাশা। এদের মধ্যে এসে যোগ হলো সাফওয়ান। সে গিয়ে বসলো সাদিফের পাশে। বাকিরা নিজেদের মধ্যে নানান খোশগল্প করছে। এই দুই ভাই জমিয়েছে নিজেদের আড্ডা। এরই মাঝে আচমকা সাফওয়ানের বাহু ঘেঁষে বসলো তার আদরের দুলালি সামান্তা। বারো বছরের পুতুলের ন্যায় বাচ্চা মেয়েটা সাফওয়ানের পাশে বসে চট করে সাফওয়ানের পুরুষালী ডানহাত তুলে নিল নিজের ছোট্ট হাতজোড়া-র মধ্যে। বড় আশ্চর্য কন্ঠে শুধালো,

‘ ভাই!!! ব্যথা দিয়েছে কে? কে চিমটি দিয়েছে তোমাকে? সাম্য? ‘
সামান্তা-র কৌতুহলী কন্ঠে ভাটা পড়ল আড্ডায়৷ সকলের নজর গিয়ে আটকালো সাফওয়ানের ফর্সা হাতের উল্টো পিঠে৷ যেথায় স্পষ্ট দুই নখের ছাপ। লাল হয়ে আছে জায়গা-টা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কেউ চিমটি কেটেছে সেথায়। সাফওয়ান থতমত খেয়ে গেল আচমকা। আলগোছে হাত সরিয়ে নিল। সামান্তার কথা শুনামাত্র তার জমজ ভাই সাম্য ঘোর বিরোধিতা করে বলে উঠলো,

‘ মিথ্যে মিথ্যে বলছো কেনো সান্তা? আমি ব্যথা দেইনি ভাই-কে। তুমি দিয়েছো। ‘
সামান্তা ফুঁসে ওঠে
‘ সান্তা না, সামান্তা। ঠিক করে ডাকো। তুমিও মিথ্যে মিথ্যে বলবে না। আমি কেনো ভাই-কে ব্যথা দিব? ভাই আমাকে সব থেকে বেশি আদর করে। তোমার চেয়েও বেশি, সাফা চুন্নি থেকেও বেশি। ‘
একথা শোনামাত্র উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো সকলে। সাফ্রিন কপাল কুঁচকে চুল টেনে দিল সামান্তার৷ খোচা দিয়ে বললো, ‘ হিংসুটে! ‘

চুলে টান পড়ামাত্র সামান্তা ঠোঁট উলটে ফেললো। সাফওয়ানের বাহু জড়িয়ে আহ্লাদী স্বরে ডাকল। বিপরীতে সাফওয়ান গালে হাত বুলিয়ে দিল তার৷ গম্ভীর কন্ঠে সাফ্রিনের নাম ধরে ডাকল৷ যেন শাসন করেছে। সেটা শুনেই হাসিহাসি মুখ করে সাফ্রিনের দিকে তাকালো বাচ্চা মেয়েটা। বিশ্ব জয়ের হাসি তার আদুরে, রূপবতী মুখজুড়ে।
‘ ব্রো! বললে না তো, চিমটি কাটলো কে? তা-ও আবার তোমাকে? এত সাহস হলো কার? ‘
ইভান ফিচেল হেসে প্রশ্নটা করতেই বাকিরা মুখ টিপে হাসলো। সাফ্রিন এবং নাজরাত মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। তাদের বেশ ভালো করে জানা কথায় কথায় চিমটি কাটার অভ্যাস কার আছে। সাফওয়ানের অপ্রস্তুত মুখখানা দেখে দুজনে পারছে না হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে। সাফওয়ান গলা খাঁকারি দিয়ে রাশভারি কন্ঠে বললো, ‘ কেউ না। ‘
কন্ঠ-টা শুনে ফের কিছু বলার সাহস হলো না কারো৷ সকলে যখন পুণরায় আড্ডায় মশগুল হলো তখন সাদিফ নিচু স্বরে, পিঞ্চ মেরে বলল,

‘ সত্যিই কেউ না? ‘
‘ আহ! তুমি-ও?’ সাফওয়ান হতাশ চোখে তাকায়।
সাদিফ হেসে ফেলে। একই সুরে ফের বলে,
‘ কেন জানিনা আজকাল তোকে অন্যরকম লাগছে। কিন্তু মানতে কষ্ট হচ্ছে বলে মানতে পারছিনা। অন্যরকম কিছু থেকে থাকলে কিন্তু আমাকে বলতে পারিস। যদি কোনো হেল্প লাগে! ‘
সামান্তার বাড়িয়ে দেওয়া ‘চিকেন নাগেটস’ এর একাংশ মুখে পুড়ে হেসে ফেললো সাফওয়ান। মাথা দুলিয়ে সায় জানাল,
‘অবশ্যই জানাব। সহ্য করতে পারবে কি-না সেটাই ভাবার বিষয়। ‘
সাদিফ ভীষণ রকমের আশ্চর্য হলো এহেন জবাবে। অন্য সময় হলে সাফওয়ান বিরক্ত মুখে জবাব দিত, ‘ এসব আমাকে দিয়ে হবে না। ‘ ‘ফালতু কথা বলবে না। ‘ কিন্তু আজ এটা কি বললো! সত্যিই অন্যরকম কিছু ঘটে যায়নি তো!

সারাদিনের হৈ-হুল্লোড় শেষে সকলে ডিনার সেরেছে প্রায় দশটার দিকে। পুণরায় আবারো জমেছে আড্ডা। এবারে রয়েছে কেবল সাফ্রিন, নাজরাত এবং নীলাশা। নিশি এবং দুই শাশুড়ী মিলে ডিনারের পর সব গুছিয়ে রাখছে। সঙ্গে আছে সাফ্রিনের মা-চাচি৷ নাজরাত বার কয়েক সেদিকে পা বাড়িয়েছিল। কিন্তু তাকে ফিরে আসতে হয়েছে। কেউ তাকে একটা কাজ করতে দিতেও রাজি নন। অগত্যা সে বসে রইলো সাফ্রিন এবং নীলাশার সঙ্গে৷ রাত প্রায় অনেক হলো। এরই মাঝে গুনে গুনে পাঁচবার সিড়ি বেয়ে নেমে লিভিং এরিয়ায় খানিকটা ঘুরাঘুরি করে পুণরায় রুমে ফিরে গিয়েছে সাদিফ। প্রথম দুই বার বিষয়টি স্বাভাবিক ভাবে নিলেও পরের দুইবারে গিয়ে নাজরাত সহ উপস্থিত বাকি দুই রমনী বুঝতে পারলো এই আচরণের কারণ। এবং বুঝতে পেরে উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো দুজন। নাজরাতকে লজ্জায় ফেললো একেকটা কথার মাধ্যমে। পঞ্চম বারে সাদিফ না পারতে এসে দাঁড়ালো তিন জনের সম্মুখে। যথাসম্ভব স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,

‘ রাত ক’টা বাজে? তোমাদের কি ঘুম পাচ্ছে না? এখানে বসে এমন শব্দ করছো কেনো? সবাই ঘুমাতে গিয়েছে। ডিস্টার্ব হচ্ছে তো না-কি? ‘
সাফ্রিন বড় কষ্টে নিজের হাসি চেপে অবুঝের মতো করে জবাব দিল,
‘ অনেক রাত হয়েছে না-কি ভাইয়া? খেয়ালই করিনি আমরা। আচ্ছা, আর শব্দ হবে না। আমরা রুমে যাচ্ছি। বাকি আড্ডা রুমের দরজা বন্ধ করে দিব। এ্যাঁই চল, চল। ‘
সাদিফের মুখখানা চুপসে গেল ফাটা বেলুনের মতো। আড়চোখে নাজরাতের দিকে তাকিয়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,
‘ খুব ভালো আইডিয়া। রুমে গিয়ে সারারাত আড্ডা দাও। আড্ডা দেওয়ার জন্য তো সারাদিন কম পড়েছিল। ভেরি গুড ডিসিশন। ‘

বলেই সে গটগট পায়ে উঠে গেল সিড়ি বেয়ে। তার প্রতিক্রিয়া দেখে নাজরাত ব্যতিত বাকি দুজন হেসে কুটিকুটি। নাজরাত বুঝতে পারল সাদিফের রাগ। অগোচরে ঢোক গিলল সে। কিন্তু চেয়েও সম্ভব হল না আড্ডা ছেড়ে উঠা। সাফ্রিন কোনো ভাবেই যেতে দিতে রাজি নয় তাকে৷ তাছাড়া জোর করে বরের পিছু ছুটতে নাজরাতের ও লজ্জা লাগছিল ভীষণ। বাধ্য হয়ে সে বসে রইলো। অথচ মন পড়ে আছে সাদিফের কক্ষে৷

দীর্ঘ আধঘন্টা পর গিয়ে নাজরাতের মুক্তি মিলল সাফ্রিন এবং নীলাশা-র কাছ থেকে। ছাড় পেয়ে সে বিন্দুমাত্র সময় অপচয় করলো না। দ্রুত পায়ে ছুটে গেল রুমের দিকে৷ দরজাটা হালকা ভিজিয়ে রাখা। সাদিফ বোধহয় আশা রেখেছিল যে নাজরাত আসবে। নাজরাত দুরুদুরু বুকে ভিতরে প্রবেশ করলো। নিঃশব্দে লক করলো দরজা। ব্লু শেডের আবছা আলোয় দেখল বিছানার ডান পাশে সটানভাবে শুয়ে আছে সাদিফ। একহাত রাখা কপালের উপর। নাজরাত আলতো পায়ে গিয়ে উঠলো বিছানায়। খানিকটা উঁকিঝুঁকি মেরে দেখল আদৌ সাদিফ জেগে আছে কি-না। মুখের উপর ঝুঁকে যাওয়া মাত্র আচমকা তার পিঠ চেপে ধরলো সাদিফ। এক টানে নাজরাতের পিঠ গিয়ে ঠেকল নরম গদির বিছানায়। আতর্কিত হামলায় সে ভয় পেয়ে গেল। চিৎকার করে উঠলো চাপা স্বরে। সাদিফ কনুইয়ে ভর দিকে ঝুঁকে ছিল নাজরাতের উপর। খানিকটা শাসনের সুরে সে বলে উঠলো,

‘ এসেছো কেনো? বাকি রাতটুকু-ও কাটিয়ে আসতে একেবারে। ‘
নাজরাত জোরপূর্বক হেসে বলে উঠলো,
‘ রাগছো কেনো? এত বেশি দেরি তো হয়নি। ‘
‘ হয়নি? কয়টা বাজে সেই খেয়াল আছে? একটা বাজতে মাত্র পনেরো মিনিট বাকি আছে। ‘
‘ ওহ! বাকি আছে তো। মাত্র সাড়ে বারোটা ক্রস করেছে। এ আর এমন কি! ‘
সাদিফের মুখজুড়ে হতাশা চেয়ে গেল। এবারে সে পুরোপুরি দেহের ভর ছাড়লো নাজরাতের উপর। আঙুলের ভাঁজে ভাঁজে নাজরাতের দুইহাতের আঙুল মিলিয়ে নিয়ে মেয়েলি অধরে আলতো এক কামড় বসালো। কন্ঠে খাদ নামিয়ে বললো,

‘ তোমার জন্য কম সময় হলেও আমার কাছে এক একটা যুগের মতো লাগছিল। এতগুলো দিন পর একটু সুযোগ পেয়েছি। একটা রাত পেয়েছি তোমার কাছাকাছি থাকার। আর তাতেও তুমি দূরে দূরে ভাগছো! ‘
কিঞ্চিৎ ব্যথায় চোখ মুখ খিচে রেখেছে নাজরাত। সেই অবস্থাতেই জবাব দিল,
‘ তা নয়তো কি করতাম? ওদের সামনে থেকে উঠে আসতে চাইলে কি ভাবতো ওরা? এমনিতেই লজ্জা দিয়ে দিয়ে মেরেছে। এমন কিছু করলে তো আস্ত রাখত না। ‘
সাদিফ জবাব দিল না এবারে। বউয়ের উষ্ণ দেহের কোমল গ্রীবাদেশে টুকরো টুকরো স্পর্শে রাঙিয়ে তুলতে ব্যস্ত সে৷ একহাত অধিকার বুঝে নিয়েছে শাড়ির ফাঁকে মেয়েলী উদরে, কোমরে, খোলা পিঠে। অনুভূতির জোয়ারে যখন দুজনেরই টালমাটাল অবস্থা ঠিক সেই মুহুর্তে নাজরাতের অধর ছেড়ে বালিশে মাথা রাখল সাদিফ। ঘনঘন শ্বাস ফেলে অস্থির কন্ঠে শুধালো,

‘ তুমি এত তাড়াতাড়ি আমাকে ভালোবাসে ফেলবে জানলে কখনো আমি ওই প্রতিজ্ঞা করতাম না। ‘
‘ উফ!! আমাকে কে বলেছিল এত বড় সিদ্ধান্ত-টা নিতে! ‘
সাদিফের কন্ঠের হতাশা এবং বাক্যগুলো শুনে লজ্জায় হাঁসফাঁস করে উঠলো নাজরাত। অগোছালো শাড়ির আঁচল গুছিয়ে নিতে উদ্যত হতেই আচমকা সাদিফ বুকে টেনে নিল তাকে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হতাশ কন্ঠে বললো,
‘ ঘুমাও! ‘
নাজরাত চোখ বুজল বিনাবাক্যে। পরপরই আবার কানে আসলো সাদিফের কন্ঠস্বর,

‘ সময়গুলো এত ধীরে কাটছে কেনো? ‘
নাজরাতের মনেও উদিত হয় একই প্রশ্ন। কেনো এত ধীরে কাটছে সময়গুলো! আজকের এই রাতটা তো অন্যরকমও হতে পারতো। দুজন কাছাকাছি, পাশাপাশি থেকেও হতাশায় ডুবে আছে। পূর্ণতা পেয়েও ছেয়ে আছে অপূর্ণতা। না জানে আর কতগুলো দিন, কতগুলো মাস যাবত ধৈর্য ধরে থাকতে হবে এভাবে! ‘

রমযানের মাঝামাঝি সময়। জাদিদের নাইট ডিউটি ছিল বলে আজ সে ছুটিতে আছে। কিন্তু ব্যস্ততা থেমে নেই তবুও। নিজের রুমে বসে ল্যাপটপে পেশেন্ট দের রিপোর্ট চেক করছে সে। গতকালই এক যুবকের হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছে৷ আশঙ্কা মুক্ত হলেও ৭২ ঘন্টা অবজারভেশনে রাখতে হবে তাকে। দুজন সার্জন যদিও আছে হাসপাতালে। তবুও দায়িত্ব বোধ থেকে খোঁজ নিয়ে রাখছে জাদিদ। তার মন মস্তিষ্ক যখন পুরোপুরি ল্যাপটপে স্ক্রিনে মগ্ন, ঠিক সেই মুহুর্তে কর্ণগোচর হলো ইরা’র ক্ষীন আর্তনাদ। আচমকা চিৎকার করে উঠেছে মেয়েটা। ভাবনায় বিভোর জাদিদ চমকে উঠলো। প্রথমেই মনে প্রশ্ন জাগল, ভুল শোনেনি তো? কিন্তু না। পরপর আরও একবার কানে আসল ইরা’র আর্তচিৎকার। এবারে হুশ জ্ঞান হারিয়ে ব্যস্ত পায়ে ছুট লাগাল জাদিদ। বিনা অনুমতি তে প্রথম বারের মতো প্রবেশ করলো ইরা’র কক্ষে। মেয়েটা ড্রেসিং টেবিলের সম্মুখে ফ্লোরে হাঁটু চেপে বসে আছে। খোলা চুলে ঢাকা পরেছে মুখের অর্ধভাগ। ডান হাতে চিরুনি। বাম হাত উদরের উপর। জাদিদ দ্রুত পাশে গিয়ে বসল তার পাশে। বাহু ছুঁয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে আওড়াল,

‘ কি হয়েছে! কোথাও ব্যথা পেয়েছেন, ইরা? পেটে আঘাত লেগেছে? ‘
ইরা’র চোখে টলমল জল। মাথা তুলে তাকাল সে। চিন্তিত ভঙ্গিতে হাত বুলালো পেটে৷ থেমে থেমে জবাব দিল,
‘ জানি না কি হয়েছ। হঠাৎ করে পেটে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেছে। ব্যাথা-ও লেগেছে। ‘
আচমকা কথাটা শুনে জাদিদ বুঝে উঠতে পারলো না কিছু। সে উদ্বিগ্ন চিত্তে হাত রাখল ইরা’র উদরে।
‘ ঝাঁকুনি! হঠাৎ ঝাঁকুনি দিলো কে… ‘

তৃতীয় বারের মতো পেটের মধ্যভাগ নড়ে উঠতেই কন্ঠ থেমে গেল জাদিদের। সেই সঙ্গে ইরা পুণরায় আর্তনাদ করলো ক্ষীণ স্বরে। খামচে ধরল জাদিদের বাহু। জাদিদ স্তব্ধ! সে স্পষ্ট টের পেয়েছে ঝাঁকুনি টুকু। ঠিক যেন তার হাতে লেগেছে এই স্পর্শ। ইরা যখন চিন্তায়, পীড়া-য় মগ্ন। তখন আচমকা হেসে উঠলো জাদিদ। অস্পষ্ট স্বরে আওড়াল, ‘ মাশা আল্লাহ! ‘
ইরা বুঝে উঠতে পারলো না এহেন আচরণের অর্থ। সে ভেজা চোখে, অবুঝ নয়নে তাকিয়ে। জাদিদ পুণরায় হাসলো ইরার মুখশ্রী দেখে৷ হাত ধরে তাকে ফ্লোর হতে তুলে বিছানায় বসাল। নিজে বসলো ইরা’র সম্মুখে, হাঁটু গেড়ে। মৃদু হেসে জবাব দিল,

‘ চিন্তার কিছু নেই, ইরা। আপনার তো খুশি হওয়া উচিত। বেবির মুভমেন্ট টের পাচ্ছেন আপনি। ‘
ইরা আশ্চর্য হলো এহেন জবাব শুনে৷ মুভমেন্ট! বাচ্চার নড়াচড়া টের পাচ্ছে সে! এসব ব্যাপারে বহু শুনেছে, পড়েছে৷ কিন্তু অভিজ্ঞতা এই প্রথম৷ তাই সে বুঝে উঠতে পারেনি ঝাঁকুনির অর্থটুকু। কিন্তু এখন বুঝতে পেরে আবেগে আপ্লূত হয়ে উঠলো সে৷ ডাক্তার আগেই বলেছিল, চার মাসের পর থেকে একটু একটু সে অনুভব করতে পারবে বাচ্চাকে। এখন সাড়ে চার মাস চলছে। এজন্যই বুঝি টের পাচ্ছে ছোট্ট প্রাণ-টাকে। সে আবেশে বার কয়েক হাত বুলালো পেটে। আশ্চর্যজনক ভাবে তার স্পর্শ পেয়ে ফের একবার নড়ে উঠলো পেটের ভিতর-টা। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাথায় আবারো অস্পষ্ট শব্দ করলো ইরা। সেই সঙ্গে হেসে উঠলো জাদিদ৷ ইরা’র ঠোঁটে-ও মৃদু হাসির রেশ। জাদিদ হাস্যজ্বল চিত্তে ইরা’র উদর ছুঁয়ে আচমকা বলে উঠলো,

‘ এ তো দেখছি ভারী চঞ্চল! মনে হচ্ছে বড় হয়ে ফুটবল প্লেয়ার হবে আমাদের বেবি! ‘
ইরা’র কানে ঝংকার তুলল কথাটা। জ্বলজ্বল নয়নে সে তাকাল জাদিদের হাস্যজ্বল মুখশ্রী’র দিকে৷ কতটা সাবলীলভাবে মিহাদের বাচ্চাটাকে নিজের বলে দাবি করলো জাদিদ! বাচ্চার মুভমেন্টে ইরা যেমন খুশি৷ তার চেয়েও যেন দিগুণ উচ্ছ্বাসিত জাদিদ। ইরা ফের একবার মুগ্ধ হয় জাদিদের ব্যক্তিত্বের উপর। মানুষটা কীভাবে পারে ইরা’র সবকিছু এতটা আপন করে নিতে! ভালোবাসা এমনও হয় বুঝি!

ইরা’কে রেস্ট নিতে বলে বেরিয়ে গেল জাদিদ৷ তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে পুণরায় পেটে হাত বুলালো ইরা। না চাইতেও চোখ ভিজে উঠল নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে স্মরণ করে৷ এই মুহূর্তে, যদি জাদিদের পরিবর্তে মিহাদ থাকতো। তবে সে-ও এমন খুশি হতো। কিন্তু তার খুশি হতো প্রকাশ্য৷ দেখা যেত, খুশির জোয়ারে ইরা’কে কোলে তোলে সারা বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছে৷ উদর ভিজিয়ে তুলেছে চুমু-য় চুমু-য়।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইরা। গাল মুছল আলগোছে। কান্না চোখে হাসি লেপ্টে নিয়ে তাকাল পেটের দিকে। কান্নাভেজা গলায় বলে উঠলো,

‘ বাবা-টা কেমন পাগলাটে দেখেছ! তার ভালোবাসা তোমার ভাগ্যে জুটবে না বলে সে আরেকটা বাবা রেখে গিয়েছে৷ আমার বিশ্বাস, সে তোমার বেস্ট বাবা হয়ে দেখাবে৷ কখনো বুঝতে দিবে না, যে তুমি তার বাচ্চা নও৷ ভিষণ ভালোবাসা দিবে৷ তুমিও তার বেস্ট বাচ্চা হবে, কেমন? ‘
দরজার সম্মুখে এসে আচমকা ইরা’র কথাটা কর্ণধার হতেই থমকে গেল জাদিদ। ইরা’র কথাটা তে যেন ছিল একবুক আশা, জাদিদের প্রতি অগাধ ভরসা, আকাঙ্খা। জাদিদের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠলো। প্রশ্ন জাগলো নিজের কাছেই। আদৌ ইরা’র এই আশা, ভরসা, আকাঙ্খা-র মূল্য দিতে পারবে তো সে?

‘পিংক সিটি’ শপিংমলে ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছে খান পরিবার। খান পরিবারের তিন ভাইয়ের মধ্যে মেঝ জন পরিবার নিয়ে সিলেটে থাকে ঠিকই। কিন্তু ঈদের আগে করে জাহুরা খান সমেত সকলে এসে পাড়ি জমায় নওশাদ খান’র ঢাকার বাসস্থানে৷ এবং সকলে মিলে যেকোনো একদিন বের হয় শপিংয়ে। এবারেও তার ব্যতিক্রম হলো না৷ তিন কর্ত্রী, সাফ্রিন – রূপসা, সাফওয়ান-রূপম-রাহাত, সামান্তা-সাম্য এবং তিন কর্তা মিলে এসেছেন পিংক সিটি মলে। মহিলা গণ নিজেদের মতো ব্যস্ত। তাদের ব্যাগ সামলানোর দায়িত্ব পরেছে রূপম এবং রাহাতের উপর। সেই সঙ্গে সামলাচ্ছে চঞ্চল সাম্য কে৷ বাচ্চাটা ভীষণ দুষ্টু।

সামান্তা ভদ্র বাচ্চার ন্যায় বসে আছে সাফওয়ানের পাশে। বড় ভাইয়া কাছে থাকলে তার চেয়ে ভদ্র মেয়ে পৃথিবীর অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সাফওয়ান বসে আছে সকলের চেয়ে খানিকটা দূরে৷ তার বাবা, চাচাদের পাশে। পুরুষ-রা না আসতে চাইলেও আসতে হয় প্রতিবার। কর্ত্রী-গণ তাদের নিজস্ব পুরুষ দের পছন্দসই কাপড় কিনতে পছন্দ করেন। তাদের এটুকু আবদার অগ্রাহ্য করে না কেউ। মাথা পেতে নেই দীর্ঘ ৪-৬ ঘন্টার জুলুম৷ সাফ্রিন এবং রূপসা রীতিমতো কাপড়ের স্তুপে ডুবে রয়েছে। এ আর নতুন নয়। একপর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে দুজনেই নিরীহ কন্ঠে ডেকে উঠল একমাত্র আশা ভরসা বড় ভাইকে। সাফওয়ান যেন এই ডাকের অপেক্ষাতেই বসে ছিল এতক্ষণ। ধীরেসুস্থে এগিয়ে গেল সে। খুটিয়ে খুটিয়ে দেখল সব ড্রেস। অবশেষে অনিয়ন পিঙ্ক কালারের একই ডিজাইনের দুটি জামা সিলেক্ট করে দিলো সে। ড্রেস দুটো দেখে সাফ্রিন এবং রূপসার চোখ চকচক করে উঠলো। সাফওয়ানের চয়েজ বরাবরই অসাধারণ। আজও ব্যতিক্রম হলো না অসাধারণ দুটো জামা দুই বোনের জন্য পছন্দ করে দিতে।

সাফওয়ান পুণরায় নিজের স্থানে ফিরে আসতে গিয়েও আচমকা পা থামাল। দৃষ্টি তার অদূরে। সম্মুখের অন্য এক সেকশনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে একটি ম্যানি কুইন৷ পরণে তার অফ হোয়াইট এবং গোল্ডেন কম্বিনেশনের ফুল স্লিভ আনারকলি। কারুকাজ খচিত লম্বা, চওড়া দোপাট্টা। অসম্ভব সুন্দর ডিজাইন। সাফওয়ান তাকিয়ে রইল সেকেন্ড দুয়েক৷ পরপর এগিয়ে গেল সেদিকে। কাছ থেকে, ছুঁয়ে দেখল জামাটি। তার দৃষ্টিতে ভেসে উঠলো এই সুন্দর, শুভ্র রাঙা আনারকলি পরণে সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে তার শুভ্রতা। তার সুবহা পাখি৷ ভেবেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। বিনা কিছু ভেবে কিনে নিলো জামাটি। ব্যবহার করলো তার ব্যক্তিগত ক্রেডিট কার্ডটি। যাতে রয়েছে তার নিজস্ব উপার্জনের অর্থ। এই টাকা খরচ করতেও একপ্রকার প্রশান্তি অনুভব করলো সে। যার জন্য ব্যয় করছে, সেই মানুষটাকে ঘিরে নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপে যেন সুখ জড়িয়ে আছে।

দুপুর আড়াই-টা। কলেজ ছুটি হয়েছে মাত্রই। বন্ধুরা ফিরে যাচ্ছে যার যার মতো করে৷ রমযানের শুরু থেকে প্রতিটি দিন সাফওয়ান নিজে ড্রপ করে দিয়ে যায় সায়েরীকে। মাঝে দুদিন নাজরাত ছিল সঙ্গে। কয়েক দিন ছিল সাফ্রিন। আজ সায়েরী একা। খিদে পেটে, গরমে নাজেহাল অবস্থা তার৷ গাড়িতে বসতেই শীতল,কৃত্রিম বাতাসে স্বস্তি মিললো কিছুটা। সাফওয়ান আড়চোখে তাকাল। বললো না কিছু। নিরবে গাড়ি ছুটিয়ে নিল কলজে থেকে অনেকটা দূরে। কোলাহল পূর্ণ সড়কের একপ্রান্তে থামাল গিয়ে। ব্যাক সিট হতে হাতে নিল এক বোতল পানি৷ এক প্যাকেট টিফিন কেক। বাড়িয়ে দিল সায়েরীর দিকে। সেসব দেখে থতমত খেয়ে গেল সায়েরী। আমতাআমতা করে বলে উঠলো,

‘ এ-এসব কেনো? আমি তো রোজা.. ‘
‘ আমি জানি তুমি রোজা রাখনি। খেয়ে নাও। নাহলে শরীর খারাপ লাগবে। ‘
‘ আমি বাহিরে যাচ্ছি। একটু কাজ আছে এদিকে। লেট হবে না। গাড়িতেই থাকো। কিছু লাগলে ফোন করবে। ‘
বলতে বলতে কালো মাস্কের আড়ালের মুখ ঢেকে বেরিয়ে পড়লো সে। রেখে গেল স্তব্ধ, বিব্রত সায়েরীকে। মেয়েটা তব্দা খেয়ে কথা বলতেই ভুলে গিয়েছে। ভাবছে, সাফওয়ান ভাই কি করে জানল সে রোজা রাখেনি সেটা? এরপর আচমকা মনে পড়লো আজকের ডেট। গত মাসে, ঠিক এই দিনেই….।

মনে পড়া মাত্র লজ্জায় গাল গরম হয়ে উঠলো তার। সাফওয়ান ভাই মনে রেখেছে তারিখটা! যদিও তারিখের এদিক সেদিক হয়েছে৷ রোজা রাখা থেকে বঞ্চিত হয়েছে আজ দুদিন। গত দিন সপ্তাহিক ছুটি ছিল। আজ এসেছে কলেজে। আর আজকেই কি-না সাফওয়ান ধরে ফেলল সব! কি এক জ্বালা। এই ছেলেকে কে বলেছে এত বেশি সার্প মাইন্ডের হতে!
সাফওয়ান ফিরল প্রায় মিনিট বিশেক পর। গাড়িতে বসেই জোরে জোরে শ্বাস টানল সে। ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা তার৷ সায়েরীর মায়া হল দেখে। কিন্তু কিছুই করার নেই।
সাফওয়ান নিরবে অবলোকন করলো আধখাওয়া পানির বোতল টা। সায়েরীর জামায় স্থান জমানো কেকের ছোট ছোট দানা৷ বুঝ পেয়ে সে পুণরায় গাড়ি ছোটাল।

নিস্তব্ধ গাড়িটাতে থমথমে মুখে দুই প্রান্তে বসে আছে দুজন। সায়েরীর মুখশ্রী-তে ভীতি, দ্বিধা। আড়চোখে সে পরখ করলো সাফওয়ান কে। চোয়াল শক্ত করে সম্মুখে তাকিয়ে আছে সে। পোক্ত হাত দুটো জেদি ভঙ্গিতে চেপে রেখেছে স্টিয়ারিং। সায়েরী ঢোক গিলল। মিনমিন কন্ঠে বললো,
‘ আপনি বুঝতে পারছেন না। এটা আমি বাসায় নিয়ে গেলে আম্মু কতশত প্রশ্ন করবে৷ আমি কি বলবো তখন? আমাকে সন্দেহ করবে নিশ্চিত। ‘

সাফওয়ান তাকাল না সেদিকে। কপালে দুই আঙ্গুল ঘষল তীব্র আক্রোশ নিয়ে। পরমুহূর্তেই সায়েরীর কোলের উপর হতে ছিনিয়ে নিল প্যাকেট-টা৷ ছুড়ে ফেললো ব্যাক সিটে। অত্যাধিক গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
‘ নিয়ে যেতে হবে না। বের হও গাড়ি থেকে। আউট! ‘
সায়েরী কেঁপে উঠলো প্যাকেট ছুড়ে ফেলার শব্দে। আশ্চর্য ব্যাপার! এত জেদ করার কি আছে সামান্য একটা গিফট নিয়ে? এমনিতেই পায়েল টা নিয়ে হাজার টা কৈফিয়ত দিতে হয়েছিল তাকে। এখন যদি এই বড়সড় প্যাকেট টা নিয়ে যায় তাহলে তো তার মা সন্দেহ করবে নিশ্চিত। সাফওয়ান কেনো বুঝতে চাইছে না সেটা!

‘ আমার লেট হচ্ছে, সুবহা! বলেছিনা বাসায় যেতে? ‘
রাশভারি কন্ঠ-টা শুনে সায়েরী থামলো না আর। বেরিয়ে গেল নিঃশব্দে। সাফওয়ান আহত চোখে তাকালো সেদিকে। যতটা ফুরফুরে মেজাজে এসেছিল সবটা বিগড়ে গিয়েছে। মানুষ প্রেমিকের জন্য কতশত মিথ্যে বলে। আর তার বেলায় এমন এক মাথামোটা জুটেছে যে সামান্য উপহার টুকু বাসায় নিতে পারছে না। বিরক্তিতে দাঁতে দাঁত চাপলো সে৷ কত ভালোবেসে এনেছিল জামাটা। মেয়েটা বুঝতেই চাইল না তার অনুভূতি।

ইফতারের ঘন্টা খানিক পূর্বে বড় বাবা ডেকে পাঠালেন সায়েরীকে। নিজ রুমে ক্ষুন্ন মনে বসে ছিল সায়েরী। সাফওয়ান রেগে আছে দেখে অস্থির হয়ে আছে তার কোমল হৃদয়। একবুক সাহস সঞ্চয় করে সে সাফওয়ান কে অনেকগুলো মেসেজ দিল। বুঝাতে চাইল তার পরিস্থিতি। সাফওয়ান সেসব দেখল ঠিকই। কিন্তু ফিরতি বার্তা পাঠাল না। সেজন্য আরও বেশি মন খারাপ সায়েরীর। এমন মুহুর্তে বড় বাবার ডাক শুনেই ব্যস্ত পায়ে ছুটে গেল সে। দেখল, মেইন গেইটের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। সায়েরী কাছে যেতেই নম্র কন্ঠে বললেন,
‘ দেখ তো মা, একটা ছেলে এসেছে। ডেলিভারি ম্যান না কি যেন। তোর নাম বলছে। জিনিস কিনেছিস বললো। যা, গিয়ে দেখ। ‘

সায়েরীর কপালে ভাঁজ পড়ল। সে তো বিগত কয়েক মাস যাবত কিছুই অর্ডার করেনি। তাহলে পার্সেল আসলো কোথা থেকে? মনে মনে হাজারটা প্রশ্ন নিয়ে সে সিড়ি বেড়ে এগোল গেইটের কাছে। কাছাকাছি যেতেই সম্মুখের হ্যাংলা পাতলা গড়নের পরিচিত এক মানবকে দেখে অবাক হলো সে। কলেজে বহুবার দেখেছে এই ছেলেকে। বিশেষ করে সাফওয়ানের আগেপিছে ঘুরঘুর করতে দেখেছে। ঠাট্টার সুরে বহুবার একে সাফওয়ান ভাইয়ের চামচা বলে আখ্যায়িত করেছে নুহাশ। কিন্তু এই ছেলে এখানে কেনো? অবুঝ কন্ঠে সায়েরী হুট করে বলে উঠলো,

‘ আরে ভাইয়া আপ… ‘
কথাটুকু’র সমাপ্তি টানার পূর্বেই ছেলেটা হন্তদন্ত গলায় বলে উঠলো,
‘ আসসালামু আলাইকুম, ম্যাম। আপনি-ই সায়েরী সুবহা? পার্সেল আছে আপনার নামে৷ ‘
সায়েরী আহাম্মকের মতো তাকিয়ে। এই ছেলে তাকে আজ নতুন তো দেখছে না। বেশ ভাল করেই তো চিনে। তবে এমন ভাব ধরে থাকার মানে টা কি? ভাবতে গিয়ে সে লক্ষ্য করলো ঠিক তার পাশেই তার বড় বাবা দাঁড়িয়ে। পরখ করছে ছেলে টাকে। সায়েরী যেন বুঝতে পারলো সবটা। সে-ও তালে তাল মিলিয়ে গ্রহণ করলো পার্সেল টি৷ হাসিও পেলো ব্যাপক। এরপর বিনা বাক্যে ফিরে আসলো ঘরে। পেছন পেছন কক্ষে ঢুকলেন মেহরিন বেগম। সায়েরী হাসি হাসি মুখে খুলতে লাগলো প্যাকেট টি৷ সেই প্যাকেট, যেটা কিছু ঘন্টা পূর্বে সাফওয়ান হতে গ্রহণ করেনি সে। কিন্তু সাফওয়ান ঠিকই নিজের জেদ বজায় রেখেছে। সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে সঠিক উপহারটি।
প্যাকেটের ভেতর হতে বেরিয়ে আসা ভারী, এবং অসম্ভব সুন্দর জামাটি দেখে চোয়াল ঝুলিয়ে হা হয়ে গেল সায়েরীর। অবাক হলেন মেহরিন বেগমও। আশ্চর্য কন্ঠে শুধালেন,

‘ এটা কোথা থেকে কিনেছিস? দেখে তো মনে হচ্ছে অনেক দাম? ‘
সায়েরী থতমত খেয়ে গেল। অগোচরে হাতের মুঠোয় লুকিয়ে ফেললো প্রাইস ট্যাগ-টা। আমতাআমতা করে জবাব দিল,
‘ মোটেও বেশি দাম না, আম্মু। অনলাইনে কম দামে অনেক সুন্দর সুন্দর জামা পাওয়া যায়, জানোই তো। এটাও এমন। ‘
‘ সেটা ঠিক আছে। কিন্তু তোর পছন্দ এত সুন্দর হলো কবে থেকে? ‘
গাল ফোলাল সায়েরী। তাকে অপমান করতে তার প্রিয় দুটো মানুষ এত বেশি উস্তাদ! খোচা না মারা অবধি এদের পেটের ভাত হজম হয়না বোধহয়।
ইফতারে’র সময় হয়েছে বলে বেশি ঘাটালেন না মেহরিন বেগম৷ ব্যস্ত পায়ে ফিরে গেলেন রান্নাঘরে। সায়েরী দ্রুত গিয়ে ছিটকিনি লাগালো দরজায়। ফিরে এসে ঘুরিয়ে ফিরয়ে দেখল জামাটা। নিজের গায়ের সঙ্গে লেপ্টে আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে দেখল। একদম তার মাপের৷ সেটা দেখে সে আরেক দফা বিমোহিত হলো। মানুষ টা কি করে এত কিছু বুঝে ফেলে! সায়েরী নামক রমনীর রগ রগ অবধি জেনে নিয়েছে যেন সে।
জামাটা বিছানায় রেখে এবার সে মোবাইল হাতে তুলে নিল। ডায়াল করলো নির্দিষ্ট নাম্বারটাতে। রিং বেজে উঠার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রিসিভ হলো। শুনা গেল চির পরিচিত সুগভীর কন্ঠটি,

‘ বলো। কি হয়েছে? ‘
সায়েরী থমকায়। গলায় আটকে গেল উচ্ছ্বাসিত সব কথা। কেবল থেমে থেমে প্রতিউত্তর করে,
‘ ড্রেস-টা ভীষণ সুন্দর। ‘
‘ সুন্দর না হলে কিনতাম না। অন্য কথা থাকলে বলো। ‘
সায়েরী মুখ কুঁচকায় এমন ত্যাড়া জবাবে৷ নিশ্চয়ই তখনকার রাগ কমেনি এখনো। রাগটুকু কমানোর চেষ্টা চালিয়ে সায়েরী হাসিমুখে ফের বলে উঠলো,

‘ এটা আপনি পছন্দ করেছেন? আপনার পছন্দ তো বেশ ভালো। ‘
‘ জানা আছে। এক মাথামোটা কে পছন্দ করার ব্যাপারে শুধু অন্ধ হয়ে গেছিলাম৷ বাকি সব ঠিকঠাক। ‘
মুহুর্তেই সায়েরীর হাস্যজ্বল মুখশ্রী নিভে গেল ধপ করে৷ ক্ষিপ্ত হয়ে দাঁতে দাঁত পিষল সে। প্রতিউত্তর করলো ক্ষুব্ধ কন্ঠে,
‘ কেউ বলেছিলো অন্ধ হতে? হয়েছেন কেনো তবে? আপনি…আপনি আসলেই একটা অসহ্য। নেহাৎ আমি মানবতার খাতিরে সম্পর্কে জড়িয়েছি আপনার মতো খাটাশের সাথে। অন্য কেউ হলে দুই দিন-ও সহ্য করতো না। ‘
‘ মানবতার খাতিরে! রিয়েলি? ‘ সাফওয়ানের ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠ৷ যেন সে ভীষণ প্রফুল্ল এপাশের মেয়েটাকে রাগাতে পেরে৷
সায়েরী’র অসহ্য লাগলো কন্ঠটা শুনে। বিড়বিড় করে বকতে বকতে কল কাটলো সে। ডিসকানেকটেড হওয়ার পূর্বে ক্ষীণ শব্দ আসল কানে। খুব সম্ভবত ওপাশের বিরক্তিকর মানবটার হাসির শব্দ ছিল সেটা। যা শুনে আরও বেশি রাগ লাগল তার। এতটা অসহ্য কেনো এই বান্দা!

চাঁদ রাতের বাকি আর দুই দিন। ভিন্ন শহরে কর্মরত সকলে এই সময়ে প্রস্তুতি নেয় নিজ শহরে ফিরার। পরিবার হতে দূরে থাকা স্টুডেন্ট রাও উৎফুল্ল চিত্তে গোছগাছ করে বাড়ি ফিরার জন্য। নারায়ণগঞ্জের একটি ছয় তলা বিল্ডিংয়ের চতুর্থ তলায় এমনই এক দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। খুশ মেজাজে ব্যাগে নিজেদের কাপড়চোপড় ভাঁজ করছে দুই যুবক। দুজনের বয়স হয়তোবা ২২-২৪ এর মধ্যে হবে। সঙ্গে রয়েছে ১৯-২০ বয়সের এক কিশোর৷ যে নিজে গোছগাছ করে আরামে শুয়ে আছে ফ্লোরে পাতানো বেডে। ফাঁকে ফাঁকে হাসি তামাশা ও চলছে। তিনজনের ধ্যানমগ্ন হলো চতুর্থ এক জনের আগমনে। ফ্যাকাশে মুখের উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ এক ছেলে। তার বয়সও ১৯-২০ এর মধ্যে। চেহারায় সবসময় একটা উদাস উদাস ভাব জমে থাকে তার। ডান হাতে প্লাস্টার। শ্যামবর্ণ গায়ের গড়ন হলেও মায়া মায়া একটা ভাব আছে তাতে। সর্বদা অগোছালো বেশে থাকে বলে তাকে দেখতে চোখে লাগে না৷ কিন্তু অপর তিন জনের ভাষ্যমতে, পরিপাটি করে চললে এই ছেলেকে দেখতে বেশ লাগবে। কিন্তু ছেলেটা সে কথা শুনলে তো। কেমন দেবদাস হয়ে ঘুরে বেড়ায় সারাক্ষণ। এত অল্প বয়সে কিসের এত দুঃখ তার?
ছেলেটা ঘরে ঢুকেই নিরব চোখে দেখল তিনজনের গোছগাছ। কেমন এক নিস্তেজ গলায় বললো,

‘ বাড়ি যাবে তোমরা? ‘
সকলের বড় রাকিব জবাব দিল হাসি হাসি মুখে,
‘ হ্যাঁ রে। ক্যাম্পাস থেকে যেহেতু ছুটি পেয়েছি তাহলে আর দেরি কীসের? মা এমনিতেই অস্থির হয়ে আছে। বোনও ফোন দিল বেশ কয়েক বার। দেরি করা যাবেনা৷ আজ রাতের বাস ধরবো। ‘
বাকি দুজনেরও একই রকমের উত্তর। ছেলেটা মলিন মুখে হাসল। বিষন্ন গলায় আওড়াল,
‘ পরিবার আর বন্ধুরা ছাড়া কি ঈদ জমে না-কি? যাও তোমরা। অনেক মজা করো। ‘
বলেই সে নিরব পায়ে চলে গেল বারান্দার। বাকি তিনজন তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যাল নজর। সম বয়সী ছেলেটা শোয়া হতে উঠে ডাক দিল,

‘ এই ফায়াজ! তুমি কি বাড়ি ফিরবে না? ‘
বারান্দার গ্রিলের ফাঁকে ধূসর আকাশে দৃষ্টি রাখল ফায়াজ। জবাব দিল ক্ষীণ স্বরে, ‘না।’
তিন যুবক একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। রাকিব নিজ কর্মে অব্যাহত থেকে বলে উঠে,
‘ তোমার কাহিনি বুঝলাম না, মামা। কথাও বলো না ঠিকঠাক। না দেখলাম এতগুলো মাসে কোনো ফ্যামিলি মেম্বার দেখা করতে আসতে। না গেলে কখনো বাড়িতে। কোনো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে, কথা বলতেও দেখলাম না। সেসব নাহয় বাদ দিলাম। তুমি তো বলেছিলে মা-বাবা, বড় ভাই, বোন সবই আছে। তাহলে ঈদে বাড়ি ফিরবে না কেনো? এটা কেমন কথা? ‘

ফায়াজ জবাব দিলো না কোনো। তার সমবয়সী, সুজন নামক ছেলেটা ঠাট্টার সুরে বলে উঠলো,
‘ বন্ধু ও তো আছে বলেছিলে। ছবি, ভিডিও কত কি দেখলাম। সব থেকেও যাচ্ছ না কেনো? কথাও বলো না কারো সাথে। কি এমন দোষ করেছ বলতো? ‘
একথায় ধ্‌ক করে উঠলো ফায়াজের বুক। মনে পড়ে গেল কিছু মাস পূর্বে পহেলা বৈশাখের সেই ঘটনার কথা। তার রাগ, জেদ, প্রতিহিংসার দাবানলে পিষ্ট হয়েছিলো তার ভালোবাসা। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে কত গভীর এক ছাপ ফেলেছিল সে সায়েরীর মনে। এক নিমেষেই হারিয়ে ফেললো সে তার ভালোবাসা, তার বন্ধুগণ এবং তার পরিবার কে। সকলে মুখ ফিরিয়ে নিল তার কাছ থেকে। কেউ তার মতন নিকৃষ্ট ছেলের সঙ্গ রাখতে চায় না। কেউ চায় না। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ বুজল সে৷ চোখের কোণ ঘেঁষে গাড়িয়ে পড়লো একফোঁটা অশ্রু। সুজনের কথার বিপরীতে সে বিড়বিড় করে জবাব দিল,
‘ আমি শুধু ভালোবেসেছিলাম। ‘

ঈদের সকাল। এই দিনটা সবসময় সকলের জন্য সুখ বয়ে আনে না তার প্রমাণ আজ অনেকেই। সায়েরীদের দলের বহু বছরের অভ্যাস হলো, ঈদের নামাজ শেষ করার কিছু মুহুর্ত পরই সাত বন্ধু ভিডিও কলে আসে। সালামি নিয়ে তুমুল তর্কবিতর্ক চলে৷ আড্ডা চলে দীর্ঘক্ষণ। কিন্তু এবারে যেন সবেতে ভাটা পরেছে। ছয় জনেরই মন আকাশে মেঘ জমেছে । অজান্তেই মন পড়ে আছে ফায়াজ নামক বন্ধুটার কাছে। কেউ জানে না সে কোথায়। কেবল জানা আছে কলেজ থেকে তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। সেটাও পূর্বের ঘটনাটার পর পরই। কিন্তু এই খবর জানে না অনেকেই৷ কলেজ থেকে স্পষ্ট ভাবে কিছুই জানানো হয়নি। যা হয়েছে সবটা অগোচরে। কেউ জানেও না সাসপেন্ড করানোর পেছনে কার হাত রয়েছে। আয়ানের কাছ থেকেই শুনেছিল বাকিরা।

কিন্তু আয়ানকে কে জানিয়েছে, একথা তারা জানে না। সেদিনের পর হতে ফায়াজের দেখা সাক্ষাৎ পায়নি তারা। শুরুতে শুরুতে অসম্ভব রকমের রাগ জমে থাকলেও একটা সময় গিয়ে রাগের মাত্রা কমে আসলো সকলেরই। সেদিন সায়েরীর শরীরে নখের আঁচড়, ছেড়া জামা দেখে বাকিরা ভেবেছিল ফায়াজ হয়তোবা সায়েরীর সুযোগ তুলতে চেয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সায়েরীর মুখ হতে সকল ঘটনা শুনে নিজেদের ভুল বুঝতে পারল তারা। দোষ অবশ্যই আছে ফায়াজের। কিন্তু যা হলো তা তো বদলানো যাবেনা৷ সেই সাথে সকলের মনে জমে থাকা অভিমান কমতেও সময় লাগবে অনেক।
অন্যান্য ঈদের মতো এবারে তারা জমিয়ে ঈদের আনন্দটুকু উপভোগ করতে পারলো না। মোবাইল স্ক্রিনে একজনের হাস্যজ্বল চেহারার দেখা না পেয়ে মন পুড়ল ভীষণ। সায়েরীর মন খারাপ হল সব চেয়ে বেশি। সব কিছুর মূলে যে সে রয়েছে। না চাইতেও নিজের উপর আঙ্গুল উঠে আসে। এই অপরাধবোধ নিয়ে বাঁচা যেন ভীষণ মুশকিল।

কবরস্থানের নিস্তব্ধ পরিবেশ। আপাতত কোনো মানুষের আনাগোনা নেই। নিরবতা ভেদ করে শুনা গেল বাইকের শব্দ। চকচকে কালো একখানা বাইক এসে থামলো কবরস্থান হতে খানিকটা দূরে। দেখা মিললো পাঞ্জাবি পরিহিত সাফওয়ান-কে। তার নিষ্প্রাণ দুই চোখ স্থির হয়ে আছে নির্দিষ্ট একটি কবরের দিকে। নিরব পায়ে সেখান টাতে গিয়ে দাঁড়ালো সে। কিছু বলার ছিল বোধহয়! এখানে এসেই ভুলে গিয়েছে। কেবল মুখ ফুটে জানাতে চাইছে পুরনো সব অভিযোগ।
বাইকের শব্দ হলো পুণরায়। একে একে তিনটি বাইক এসে থামল সাফওয়ানের বাইকের পাশটাতে৷ দেখা মিলল আবরার, জিমন এবং রায়ানের। সাফওয়ান তাকিয়ে তাদের দিকেই। এগিয়ে আসলো তিন বন্ধু। আঁধার মুখে কোলাকুলি করলো। শেষে কাঁধে কাঁধ জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলো উঁচু মাটির দিকে ঝাপসা দৃষ্টি ফেলে। যেন আপন বন্ধুটাকে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেছে, তেমন করেই মাটি ছুঁয়ে বিড়বিড় করলো,

‘ ঈদ মোবারক, মিহাদ! ‘
চারজনের নিরবতার মাঝে আচানক পুণরায় কানে আসল গাড়ির শব্দ। দেখল, সাদা রঙের স্করপিউ গাড়ির ড্রাইভিং সিট হতে নামছে জাদিদ। চারজন অবাক হলো কিঞ্চিৎ। আবার খুশিও হলো। জাদিদ এগিয়ে আসতেই কোলাকুলি করলো একে একে৷ অতঃপর মোনাজাত শেষ করে ফিরে আসলো গাড়ির কাছে। জাদিদ ব্যস্ত ভঙ্গিতে হাত ঘড়িতে সময় দেখে বলে উঠলো,

‘ আজ সন্ধ্যায় সবাই আসবে তো তাইনা? সায়েরী,সাফ্রিন সহ বাকিদের কেও নিয়ে এসো৷ ইরা ভীষণ মন খারাপ করে আছে। আজকের দিনটাতেও আমরা দুজন ছাড়া কেউ নেই বাসা টাতে। তোমরাও যদি না আসো তাহলে আর কে আসবে বলো! চলে এসো সকলে। ইরা খুশি হবে খুব। ‘
চার বন্ধু সায় জানাল একথায়। অবশ্যই যাবে তারা। জাদিদ দাঁড়াল না বেশিক্ষণ। ইরা বাসায় একা। তাকে যেতে হবে। ভেবেছে একটাবার নিজের বাবার বাড়ি যাবে ইরাকে নিয়ে। অন্তত আজকের দিনে মা,বাবার দোয়া নেওয়াটা তার জন্য ফরজ।

জাদিদ প্রস্থান করতেই চার বন্ধু চেপে বসলো নিজেদের বাইকে। গন্তব্য তাদের একই স্থানে। একে একে বাইক ঢুকলো পরিচিত বাড়িটার গেইট পেরিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে কানে আসলো মেয়েলি কন্ঠের আহাজারি। ধুকপুক শুরু হলো চার যুবকের বুকজুড়ে। নিজেদের সামলে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলো তারা। ড্রয়িং রুমে দেখা মিলল মাহাদীর। পনেরো বছরের কিশোর ছেলেটা বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করার পরিবর্তে সোফায় বসে আছে মাথা ঝুকিয়ে। গাল বেয়ে টুপটুপ জলকণা গড়িয়ে পড়ছে। হাতের মোবাইলে জ্বলজ্বল করছে বড় ভাইয়ের ছবি। দুই ভাই কি সুন্দর জড়িয়ে আছে একে অপরের কাঁধ।
‘ মাহাদী! ‘

সাফওয়ানের কন্ঠের ডাক শুনে মাথা তুলে তাকাল সে। ভাইয়ের সব থেকে কাছের মানুষ গুলোকে দেখে আবেগে আপ্লূত হয়ে উঠলো৷ ছুটে এসে বুকে বুক মিলালো সাফওয়ানের। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো। সাফওয়ান নিরবে কেবল মাথায় হাত বুলিয়ে দিল সান্ত্বনা সরূপ। কণ্ঠনালী দিয়ে কথা বের হতে চাইছে না তার। একে একে সকলের সঙ্গে কোলাকুলি করলো সে। এরপর দ্রুত চোখ মুছে সবাইকে বসতে বলে ছুটে গেল ভেতরের দিকে। মা কে ডাকছে ব্যস্ত কন্ঠে। সে যাওয়ার পরপরই ভেতর ঘর থেকে ছুটে আসলেন মিহাদের বাবা। সকলকে দেখে আবেগে কেঁদে ফেললেন তিনিও। এই ছেলেগুলোর সঙ্গে আজ তার সন্তান-ও থাকতে পারতো। হাসি তামাশায় মাতিয়ে রাখত সারাবাড়ি। কিন্তু ভাগ্যের ছলনায় আজ সেই সন্তান শুয়ে আছে সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে। বাবা হয়ে এই নির্মম সত্য কি করে মেনে নিবেন তিনি!

মিহাদের মায়ের আগমনে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠলো আরও বেশি। মাহাদী উনাকে ধরে বসালেন সোফায়। মাস দেড়েকের ব্যবধানে কি থেকে কি হয়ে গেলেন তিনি! চোয়াল ভেঙ্গে পড়েছে৷ জীর্ণশীর্ণ দেহ৷ কালি জমেছে চোখের নিচে৷ সাফওয়ানের দুইহাত কপালে চেপে ঝরঝর করে কেঁদে দিলেন তিনি। এই আহাজারি যেন সারাজীবন কমবার নয়। উনাকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে শান্ত করলো সাফওয়ান এবং মাহাদী। এক ছেলের অনুপস্থিতিতে অন্য চার ছেলের সঙ্গ পেয়ে কিঞ্চিৎ শীতল হলো মায়ের মন। কান্না থামিয়ে ব্যস্ত হলেন আপ্যায়নে। কেউ বাঁধা দিল না উনাকে। অপেক্ষা করে গেল কেবল। এক কথা দুই কথায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে তুলল তারা।

জাদিদের বাবার বাড়ি হতে ফিরে এসে সেই যে রুমে ঢুকেছে ইরা। এখনো বের হয়নি। জাদিদ চিন্তিত ভঙ্গিতে পায়চারি করছে। রাগ লাগছে নিজের উপর। নিজের পরিবারের উপর। কি দরকার ছিল ইরা’কে নিয়ে যাওয়ার! কতটা অপমানিত হয়েছে মেয়েটা। নিশ্চয়ই খুব কাঁদছে এখন! অস্থির চিত্তে ইরা’র দরজায় করাঘাত করলো সে,
‘ ইরা! ইরা প্লিজ বাইরে আসুন৷ আমার ভুল হয়েছে। আমি বুঝতে পারিনি আপনাকে এতটা অপমানিত হতে হবে। জানলে এমনটা কখনো করতাম না। আমি ক্ষমা চাচ্ছি। প্লিজ বাইরে আসুন। ‘
‘ কান্নাকাটি করলে বেবির উপর ইফেক্ট পরবে। আমার উপর রাগ ঝাড়ুন দরকার হলে৷ তবুও নিজেকে আটকে রাখবেন না, প্লিজ৷ ‘

‘ইরা! শুনতে পাচ্ছেন? বাহিরে আসুন দয়া করে। আমার ভীষণ চিন্তা হচ্ছে। এমন করবেন না৷ প্লিজ, দরজা খু… ‘
কথার মাঝেই খুলে গেল দরজাটা। দেখা মিলল ইরা’র। কান্নাকাটি করে ভয়াবহ অবস্থা করেছে চোখে মুখের। জাদিদের বুক কেঁপে উঠল এই দৃশ্যে। সে ফের কিছু বলতে উদ্যত হয়েছে, এমন মুহুর্তে আচমকা তার বুকে লুটিয়ে পড়লো ইরা। কেঁদে উঠল শব্দ করে। ভাঙ্গা স্বরে আওড়াল,
‘ আমি জানি আমি খারাপ মেয়ে। আমার চরিত্র খারাপ, লোভী বলে আপনাকে হাত করেছি। সব সত্যি। এসবের জন্য যা শাস্তি দেওয়ার আমাকে দিত। কিন্তু তারা আমার বাচ্চাটাকে অভিশাপ দিল কেনো? এখানে আমার নিস্পাপ বাচ্চা টার কি দোষ? ‘

‘ সে তো এখনো পৃথিবীর আলোটাও দেখল না। অথচ আপনার মা ওকে….। উনি কীভাবে পারলেন এত খারাপ কথা বলতে? উনিও তো মা। একবার-ও বুক কাঁপল না উনার? ‘
জাদিদ কি বলবে! আত্মগ্লানি তে ভেতরটা চুরমার হয়ে উঠেছে তার। আলতো হাতে জড়িয়ে ধরল ইরা’কে। অপরাধী কন্ঠে বললো,
‘ আ’ম স্যরি, ইরা। আমি ভাবিনি মা এমন আচরণ করবে। জানলে কখনোই আপনাকে নিয়ে যেতাম না। ক্ষমা করুন। এই ভুল আর কক্ষনো হবে না৷ ‘
জাদিদকে ছেড়ে দিল ইরা। নিজেকে সামলে নিয়ে পুণরায় বলে উঠলো,

‘ আপনার পরিবার হন তারা। আমার কোন অধিকার নেই আপনাকে উনাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার। কিন্তু আমার একটাই রিকুয়েস্ট, প্লিজ আর কখনো আমাকে বাধ্য করবেন না ওই বাড়ির চৌকাঠে পা রাখতে। যেখানে আমার বাচ্চার জন্য এত বেশি আক্রোশ জমিয়ে রেখেছে সবাই। যে বাড়ির, সেই পরিবারের কারোর ছায়া ও মাড়াতে চাই না আমি। ‘
জাদিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দুইহাতে গাল মুছল ইরা’র। আশ্বস্ত গলায় বললো,
‘ মনে থাকবে কথাটা। কাঁদবেন না আর। এই পরিস্থিতি তে ফের কখনো পড়তে হবে না। কথা দিলাম। ‘
জাদিদের আশ্বাস পেয়ে জোরপূর্বক হাসল ইরা। বুক হতে পাথর নামল যেন।

ইরা’র সারাদিন কেটেছে ভীষণ বিষন্নতায়। নিজের পরিবারের শূন্যতা, মিহাদের শূন্যতা ভীষণ রকমের পোড়াচ্ছিল তাকে। সন্ধ্যা নাগাদ বন্ধুরা আসবে দেখে মনটা ফুরফুরে হলো কিঞ্চিৎ। জাদিদের আবদারে সে জাদিদের কিনে দেওয়া গোলাপি রঙের সুন্দর একটি কামিজ পরলো। প্রসাধনী লাগায়নি প্রায় বছর খানিক ধরে৷ মাঝে শুধু মাত্র জাদিদ এবং তার বিয়েতে অন্যরা মিলে সাজিয়েছিল। এরপর আবার আগের মতো সবটা। আজও সাদামাটা মুখশ্রী তার। কিন্তু প্রেগ্ন্যাসির আলাদা এক গ্লো মুখজুড়ে। শরীরেও এসেছে ব্যপক পরিবর্তন। পাঁচ মাস চলছে এখন। পেট দেখা দিচ্ছে। নিজেকে পরিপাটি করে সে বের হলো কামরা থেকে। সম্মুখেই দেখা মিললো জাদিদের৷ যেন ইরা’র কাছেই আসছিলো সে। ইরাকে আগাগোড়া পরখ করে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল সে। তার আবদার রেখেছে দেখে হাসলো প্রফুল্ল চিত্তে। পরপরই এগিয়ে দিল একটি বেলি ফুলের গাজরা।

‘ একটা বাচ্চা বিক্রি করছিলো। বললো যেন প্রেমিকার জন্য নিয়ে যায়। আমার তো প্রেমিকা নেই। একজন বউ নামক বন্ধু আছে। ভাবলাম তার জন্যই নিয়ে আসি। ভালো করেছি না? ‘
মাঝে মাঝে জাদিদের এমন কিশোর সূলভ আচরণ দেখে হাসি পায় ইরা’র। মনে হয় যেন কলেজ পড়ুয়া ছেলে প্রেম করছে নতুন নতুন। ভয়ে ভয়ে প্রেমের কবিতা শুনাচ্ছে প্রেমিকা কে। আজও ঠিক তেমনই। জাদিদের চোখে মুখে দ্বিধা। সে জানে না ইরা আদো এই উপহার টুকু গ্রহণ করবে কি-না। ইরা স্পষ্ট বুঝতে পারল তার মনের অবস্থা। মৃদু হেসে গাজরা টা গ্রহণ করলো সে। গন্ধ শুকে বললো,
‘ থ্যাঙ্কিউ! বেলি ফুল আমার খুব পছন্দের। ‘
এটুকু কথায় জাদিদের চেহারা ঝলমলিয়ে উঠলো। ইরা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ টার এমন বাচ্চা সূলভ আচরণ। ঠোঁট চেপে হাসলো সে।

সন্ধ্যা নাগাদ ইরাদের বাসার নিচে এসে উপস্থিত হয়েছে সাফওয়ানের গাড়ি। শুরুতেই নেমে পড়ল সে। ফ্রন্ট সিট হতে নামল সাফ্রিন৷ ব্যাক সিট খুলে দিতেই লাফিয়ে নামল সামান্তা-সাম্য। সাফওয়ানের হাত জড়িয়ে ধরল সামান্তা। সাফ্রিনের সঙ্গে সাম্য। বেড়াতে আসতে পেরে দারুণ প্রফুল্ল দুজনে। সাফওয়ান পৌঁছেছে সকলের শেষে। বন্ধুরা অনেক আগেই এসে পরেছে। তার দুই রূপবতী বোনের সাজসজ্জা শেষ হতে সময় লেগেছে তিন ঘন্টা। না জানে এত সময় কোথায় লাগায় এরা। সিড়ি বেয়ে উঠে চলেছে চারজনে। সাম্য এবং সাফ্রিন সামনে। কয়েক ধাপ নিচে সাফওয়ানের সঙ্গে সামান্তা। ইরাদের ফ্ল্যাটের সম্মুখে আসতেই খোলা দরজা পেরিয়ে ঢুকে পড়লো সাফ্রিন এবং সাম্য। কিন্তু সাফওয়ানের বাড়ন্ত কদম থমকাল পেছন হতে ভেসে আসা রিনরিনে কন্ঠস্বরে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো সে। ছাদের সিড়ি পেরিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নামছে মিনহা।

ঠিক তার পেছনেই সায়েরী। পরনে তার অফ হোয়াইট এবং গোল্ডেন কম্বিনেশনের আনারকলি ড্রেসটি। যা ঢেকে গিয়েছে তার গোড়ালি অবধি৷ হাতায়, গলায় এবং নিচের দিকে অসম্ভব ভারী কারুকাজ। স্টোন সব চকচক করছে আলোর প্রতিফলনে। কাঁধের একপাশে ছড়িয়ে আছে বড়সড় সুন্দর দোপাট্টা-টি৷ আজ উন্মুক্ত হয়ে আছে তার দীঘল এলোকেশ সব। নিচের দিকে তাকিয়ে নামতে নামতে বাম হাতে কানের পিঠে চুল গুঁজে দিল সে। দেখা মিলল কানের বড়সড় গোল্ডেন ঝুমকাটির। ড্রেসের সঙ্গে ভীষণ মানিয়েছে ঝুমকা দুটো। ইঞ্চি তিনেক উঁচু হিল পায়ে৷ সেই সাথে রিনিঝিনি শব্দ তুলছে পায়েলটি।

ছুটন্ত পায়ে মেয়েটা এসে আচমকা থামল সাফওয়ানের কাছাকাছি। একটুর জন্য ধাক্কা লাগেনি। সাফওয়ান কাছ থেকে দেখল স্নিগ্ধ মুখশ্রী-টি। চিকন করে কাজল লেপ্টানো ডাগরডাগর আঁখিদুটি ফের একবার তার সর্বনাশ ডেকে আনলো বোধহয়। লিকুইড ব্লাশের কিঞ্চিৎ লালছে আভা ছড়ানো ফুলো ফুল গাল জোড়া যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে ছুঁয়ে দেওয়ার আহ্বানে। আর ঠোঁট! এক পলক দেখেই ঢোক গিলল সাফওয়ান। নিউড শেড লিপ গ্লস লাগানো ঠোঁট দুটো এমন আকর্ষণ করছে কেনো!
সাফওয়ান তাকিয়ে রইল হৃদয়ের সবটুকু মুগ্ধতা নিয়ে। তার কল্পনার চেয়েও হাজার গুণে বেশি সম্মোহনী লাগছে সায়েরী কে। সাফওয়ানের বুকের বাম পাশে উদিত হয়েছে সেই চিনচিনে ব্যথাটা। সহসা সেথায় হাত চেপে ধরলো সে। বিড়বিড় করে আওড়াল,

‘ উফ! মেরে ফেলবে আমকে। ‘
সায়েরী দৌঁড়ে আসার কারণে হাঁপিয়ে গিয়েছে। কিন্তু তার শ্বাস আটকেছে সাফওয়ান কে দেখে। অফ হোয়াইট পাঞ্জাবি, পাজামা গায়ে কি চমৎকার দেখতে লাগছে সাফওয়ান কে! কনুই অবধি গুটিয়ে রাখা হাতার নিচের ফর্সা হাত দুটোর ফুলে উঠা রগ গুলো বড্ড আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে। আজ বোধহয় সেট করেছে চুলগুলো। এতেও দুর্দান্ত লাগছে দেখতে। কাছাকাছি থাকার কারণে কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ পাগল করে তুলছে সায়েরীকে। সে সাথে সায়েরীর হাঁসফাঁস লাগছে এমন ঘোরলাগা দৃষ্টির কবলে পড়ে। আশেপাশে সচকিত নজরে পরখ করলো সে। যে কেউ চলে আসতে পারে। এই ছেলের কি ভয়ডর নেই? আবরার ও উপস্থিত আজকে। যদি দেখে ফেলে তবে কি ভাববে?
ভাবনার মাঝেই কানে আসল ইরা’র ডাক। নড়েচড়ে দাঁড়ালো সাফওয়ান। ভাবখানা এমন যেন এতক্ষণ ভ্যাবলার মতন তাকিয়ে থাকা ছেলেটা সে নয়। সায়েরীকে যাওয়ার জন্য পথ করে দিল সে। ভারী জামাটা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে দেখে সাফওয়ান আলগোছে হাতেই মুঠোয় তুলে নিল কিছু অংশ। পেছন পেছন ঘরে প্রবেশ করে কেউ খেয়াল করার আগে ছেড়ে দিল পুণরায়। গিয়ে বসলো বাকিদের সাথে।

সারা সন্ধ্যা বেশ আনন্দ, উল্লাসে কাটিয়েছে সকলে। সঙ্গে ছিল মাহাদী-ও। রাতের খাবারের পূর্বে সকলে মিলে উঠলো ছাদে। ইরা ঘরেই থাকল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন তার। সঙ্গে মিতু রয়েছে। তাছাড়া সাম্য,সামান্তা এবং মিনহা মিলে ছুটাছুটি করছে। এক ছুটে ছাদে যাচ্ছে। পুণরায় ফিরছে ফ্ল্যাটে। তাদের হৈ-হুল্লোড় শুনতেও ভালো লাগছে ইরা’র।

ছাদে মাদুর বিছিয়ে তাতে গোল করে বসেছে সকলে। নীতি,সাফ্রিন,সায়েরী বসেছে আলাদা ভাবে৷ নিজেদের মধ্যেই মেয়েলী আলাপে ব্যস্ত তারা। এভাবে আলো আঁধারের মাঝে আড্ডা চললো দীর্ঘক্ষণ। একপর্যায়ে জাদিদ বললো যেন সকলে ফিরে যায়৷ কথা মতো যার যার মতো হেলেদুলে নামতে লাগলো সকলে। সায়েরী শুরুতে নামতে চাইলেও নীতি অজানা কোনো কারণে বারবার থামিয়ে দিচ্ছে তাকে। একপর্যায়ে সকলে নেমে পড়ল। সায়েরী লক্ষ্য করে দেখল রায়ান-নীতি, সাফওয়ান এবং সে ব্যতীত সকলে নেমে পড়েছে।

সায়েরীকে সেই স্থানে রেখে নীতি চলে গেল রায়ানের সঙ্গে অপর প্রান্তে। সায়েরী বোধহয় বুঝতে পারল এমন আচরণের কারণ। তাই সে ফিরে তাকালো। ভেবেছিল সাফওয়ান পূর্বের স্থানেই দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু না। সে দাঁড়িয়ে ঠিক সায়েরীর পিঠ ঘেঁষে। সায়েরী ফিরতে গিয়ে বাঁধা পরলো। চোখ তুলে চাইল সাফওয়ানের দিকে৷ বাদামি চোখজোড়া তার দিকেই স্থির। চেয়ে রয়েছে মুগ্ধ হয়ে। উৎকন্ঠায় গলা শুকিয়ে আসলো সায়েরীর। নড়তে গেলে তার উদরে চাপ পড়লো সাফওয়ানের শক্তপোক্ত হাতের৷ টেনে নিল বুকের মধ্যিখানে। পরপরই সে নাক ডুবাল প্রেয়সীর খোলা চুলে। লম্বা শ্বাস টেনে, অস্পষ্ট স্বরে আওড়াল,

‘ উউঁহ..চুল বাঁধো, বোকাপাখি! আমার দুর্বল হৃদয়ে এমনিতেই হাজার সংকট। ‘
সায়েরীর তনু,মনে শিহরণ জাগে এই কন্ঠে,এই বাক্যে৷ শ্বাস আটকে আসতে চাইতে নিদারুণ এক উত্তেজনায়। সাফওয়ান বোধহয় টের পেল সেটা। সহসা সামনে ঘুরিয়ে নিল সায়েরীকে। দৃষ্টি সেই আগের মতোই। সায়েরী হাঁসফাঁস করে উঠে। ডানে, বামে দৃষ্টি ফেলে অস্থির কিন্তু ক্ষীণ স্বরে বলে,
‘ এ..এভাবে তাকাবেন না। ‘
সাফওয়ান হাসল পুণরায় পরিচিত বাক্যটি শুনে, লাজুক প্রেয়সীকে দেখে। সায়েরীর চিবুক ছুঁয়ে মুখ উপরে তুলল সে। পূর্বের ঘটনাটির মতো ঘাড় কাত করে তাকিয়ে প্রতিউত্তর করলো,

‘ কীভাবে তাকাচ্ছি? ‘
তীব্র লজ্জায় কান,গাল উষ্ণ হতে শুরু করেছে সায়েরী’র। মনে হচ্ছে এই মুহুর্তে সাফওয়ানের দৃষ্টির কবল হতে না সরলে তার ছোট্ট হার্টটা অক্ষা পাবে লজ্জায়। উপায়ান্তর না পেয়ে শেষমেশ সাফওয়ানের বুকেই মুখ গুঁজল সে। আদুরে হাতে খামচি বসাল পাঞ্জাবির উপর দিয়েই। মিনমিন কন্ঠে শুধালো,
‘ আপনি এত্তো খারাপ কেনো? বুঝতে পারছেন না আমি লজ্জা পাচ্ছি? ‘
তার প্রতিক্রিয়া দেখে হেসে উঠলো সাফওয়ান। হাসির দাপুটে কাঁপল তার শক্তপোক্ত বুকটা৷ সায়েরী বুকে মাথা রেখেই চোখ তুলল৷ মুগ্ধ নয়নে দেখল হাসিমাখা প্রিয় মুখ খানা। এরপর আবার কি যেন ভেবে তড়িঘড়ি করে ছেড়ে দিল সাফওয়ান কে।

‘ ভাইয়াও আছে এখানে। আমাকে না পেয়ে যদি চলে আসে! দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে। ‘
‘ ছাড়ুন! নিচে যাব আমি। এক্ষুনি। ‘
সাফওয়ান ছেড়ে দিল বিনা বাক্যে। কিন্তু সায়েরী কদম বাড়ানোর পূর্বেই ফের কাছে টানল সে। বড়সড় দোপাট্টা-টার এক প্রান্ত তুলে দিলে সায়েরীর মাথার উপর। সেই অবস্থাতেই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল মিনিট খানিক। অতঃপর মাথা নুইয়ে আবেশে, গভীর ভাবে চুমু খেল ললাটের মধ্যভাগে। সায়েরী চোখ বুজে অনুভব করলো সেই স্পর্শ, ভালোবাসা। ছাড় পাওয়া মাত্র সে দুইহাতে ভারী জামাটা আগলে ধরে এগোল কয়েক কদম৷ আবার কি যেন ভেবে থমকে দাঁড়ালো। উল্টো ঘুরে মুখোমুখি হলো সাফওয়ানের। হাত বাড়িয়ে, চোখ পাকিয়ে শুধালো,

‘ আমার সালামি? ‘
সাফওয়ান আয়েস করে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল৷ গম্ভীরমুখে বললো,
‘ সালাম করেছ কখন? ‘
থতমত খেয়ে গেল সয়েরী। উপায়ান্তর না পেয়ে জোরপূর্বক হেসে বলে উঠলো,
‘ আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া!!!! ‘
‘ দিয়েছি। এবার তাড়াতাড়ি সালামি দিন। আমার দেরি হচ্ছে। ‘
এক সালামেই সাফওয়ানের মুডের রফাদফা হয়ে গেল। কুঁচকে গেল কপাল। বিড়বিড় করে কি যেন বললো। তা শুনতে পেল না সায়েরী। সে আবারও বলে উঠলো,

‘ পা ছুঁয়ে সালাম করতে হবে না কি, ভাইয়া?? ‘
সঙ্গে সঙ্গে ধমকে উঠলো সাফওয়ান। গাল চেপে ধরলো বিরক্ত হয়ে,
‘ চুপ থাকো, মাথামোটা। তোমার কাছ থেকে ভালো কিছু এক্সপেক্ট করাটাই ভুল হয়েছে। ‘
সাফওয়ানের হাতের মাঝে চাপ পরা সায়েরীর গালদুটো ফুটে উঠলো হাসির তালে। নিঃশব্দের হাসি। সে বেশ ভালো করে জানে সাফওয়ানের এই রাগ কিসের। কিন্তু আপাতত কথা বাড়াতে চাইল না সে। তাই থমথমে গলায় বলে উঠলো,

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫৯+৬০

‘ বললেই হলো যে সালামি দিবেন না। শুধু শুধু ধমকাচ্ছেন কেনো? লাগবে না আপনার সালামি। আপনার টাকা আপনার কাছেই রাখুন। কিপটে লোক!’
সাফওয়ান হতাশ হলো। কথা বাড়াল না। পকেট থেকে একটি খাম বের করে বাড়িয়ে দিল সায়েরীর দিকে। সঙ্গে সঙ্গে তা লুফে নিল সায়েরী। ধন্যবাদ জানাল উৎফুল্ল কন্ঠে। পরপরই এগিয়ে চললো সিড়ির পথে। পেছনে তার ভারী জামাটার ঘের সব নিজের হাতে তুলে নিয়েছে সাফওয়ান। সায়েরীর পেছন পেছন দায়িত্বশীল প্রেমিকের মতো এগিয়ে চলছে সে।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৩+৬৪