Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৭

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৭

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৭
সাজিয়া জাহান সুবহা

সময়টা ভোর সকাল। নকশা করা চাদরে সম্পূর্ণ দেহ মুড়ে গভীর ঘুরে আচ্ছন্ন ছিল সায়েরী। আচানক জোরালো হাতের তীব্র টানে ছিটকে সরে গেল চাদরটা। শীত শীত অনুভূতিতে গা শিউরে উঠার সময়টুকু পেল না। পূর্বেই শীতল জল আঁচড়ে পড়লো তার মুখশ্রী-তে। মুখ,গলা সহ অধিকাংশ স্থানে ছিটকে পড়লো বিন্দু বিন্দু জলকণা। আকস্মিক আক্রমণে ধরফরিয়ে উঠলো মেয়েটা। ঘুম ভর্তি লালছে চোখ টেনে মেললো। ঝাপসা চোখে দেখল, সম্মুখে দন্ডায়মান এক রণমুর্তি। বার কয়েক পলক ঝাপটাতেই স্পষ্ট হলো নাজরাতের চেহারা। সায়েরী হা করে তাকিয়ে রইল কিয়ৎ ক্ষণ। ঘুম ঘুম মস্তিষ্কে আশ্চর্য কন্ঠে শুধালো,

‘ আরে বউ! একদম হলুদিয়া বউ লাগছে তোকে না..জ! ‘
নাজরাত একথা শুনেও বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখাল না। চোখের ইশারায় বুঝালো পাশে থাকাতে। সায়েরী তাকালো। এবং সঙ্গে সঙ্গে হকচকিয়ে গেল মেহরিন বেগমকে দেখে। গম্ভীর, রাগ্বত দৃষ্টি উনার। হাতে পানির গ্লাস। সায়েরী ক্যাবলাকান্তর মতো হাসে তা দেখে। আমতাআমতা করে বলে,
‘ অ..আম্মু! হোয়াট অ্যা সারপ্রাইজ! তোমরা এত সকাল সকাল? ‘
‘ সকাল সকাল? বিয়ে বাড়ির বেলা সাড়ে দশটা তোর কাছে সকাল মনে হচ্ছে? ‘ চেঁচিয়ে উঠলেন মেহরিন বেগম।
সায়েরী দ্রুত বিছানা ছাড়ে। লক্ষ্য করে তোহাকে। যে ড্রেসিং টেবিলের সম্মুখে দাঁড়িয়ে মিনহাকে সাজাচ্ছে। মেহরিন বেগম ফের বকাঝকা করে উঠলেন,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ বিয়ে বাড়ির এত হৈ হুল্লোড় শুনেও কীভাবে মরার মতো ঘুমায় মানুষ? নাজরাত সেজেগুজে বসে আছে , নিচে সব রেডি আর মহারাণী এখনো আসন ছাড়তে পারলো না.. ‘
বকতে বকতে কক্ষ ত্যাগ করলেন তিনি। সায়েরী লম্বা হাউ তুললো। নাজরাতের উদ্দেশ্যে বললো,
‘ সেজেগুজে বসে আছিস আর আমাকে ডাকলিও না! ‘
‘ ডাকিনি বলছিস! কোন মরার ঘুম ঘুমাস রে তুই? সারাজীবন স্কুল, কলেজের জন্য ডেকে গেলাম। এখন আবার বিয়ের দিন গুলোতেও তোকে ঘুম থেকে ডাকার দ্বায়িত্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারলাম না। তিন ঘন্টা ধরে ডাকছি তোকে। শেষ মেশ মামী মা’র বকুনি শুনার জন্যই ঘুমাচ্ছিলি এত। বেশ হয়েছে। ‘
সায়েরী ফের হাই তোলে। অতঃপর পূর্ণ নজরে দেখে নাজরাতকে। কাঁচা হলুদ রঙের গারারা ড্রেস পরেছে মেয়েটা। লাইট মেকওভার, খোলা ঢেউ খেলানো চুল কাঁধের দুইপাশে ছড়িয়ে রাখা। মাথায় সুন্দর করে সেট করেছে দোপাট্টা। একপাশ ডান কাঁধে রেখেছে অন্যটা পিঠে ছড়িয়ে আছে। তাজা গোলাপ এবং বেলি ফুলের গাজরা হাতে। একই ফুলের টিকলি, কানের দুল। কি চমৎকার লাগছে দেখতে! সায়েরী উচ্ছ্বসিত বদনে জড়িয়ে ধরল নাজরাতকে,

‘ উফফ্‌! না..জ!! কি সুন্দর লাগছে রে তোকে। সাদিফ ভাই তো বিয়ের আগেই হার্ট অ্যাটাক করে বসবে। ‘
নাজরাত হেসে ফেললো এবারে। টিকলি ঠিক করে বলে উঠলো,
‘ হয়েছে। দ্রুত ফ্রেশ হয়ে আয়। সবাই রেডি। তোহা আর তুই রয়ে গিয়েছিস শুধু। ‘
‘ এই দাড়া, দাড়া। দুটো সেলফি নিই, আয়.. ‘
‘ এখন! এভাবে? তোরা রেডি হয়ে.. ‘ নাজরাতের সংকুচিত কন্ঠ।
‘ আরে ছাড় না। আমরা আমরাই তো। দাড়া সুন্দর করে। ‘ সায়েরী তাড়া দিল।
নাজরাত দাঁড়ালো। কিন্তু দেখা গেল মোবাইলে নাজরাতকে ফোকাস করতে গিয়ে সায়েরীর সম্পূর্ণ মুখ ঢাকা পড়ে গেছে। নাজরাত হেসে উঠলো এই কান্ডে। নিজে তুলে নিল মোবাইল। বললো,
‘ তোকে দিয়ে হবে না। আয় পেছনে। বরাবরের মতো আমি-ই সেল্ফি স্টেন্ড। ‘
সায়েরী অগোছালো চুলে হাত চালিয়ে পেছন থেকে দুই হাতে নাজরাতকে জড়িয়ে ধরতেই ঝটপট কয়েকটা ছবি তোলা হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহুর্তে এগিয়ে আসলো তোহা। তিনজনে মিলে গুটি কয়েক ছবি তুলল। সায়েরী উৎফুল্ল চিত্তে ছবিগুলো দেখতে গিয়ে নিজেকে দেখে ভীমড়ি খেয়ে গেল। চোখ, মুখ ফুলে কি একটা অবস্থা! একদম মিষ্টিকুমড়ো লাগছে দেখতে। এই মুখ নিয়ে এখন নিচেও যেতে হবে!
সাফ্রিনকে ছবি পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটা হা হুতাশ শুরু করে দিল। তোহা তাকে ভেংচি কেটে জবাব দিল,
‘ বর পক্ষ আমাদের মাঝে নট এলাউড! ‘

কনে পক্ষের মেয়েরা সাজগোজে ব্যস্ত হলেও বর পক্ষের বাংলো বাড়িতে দেখা মিললো ভিন্নরকম এক দৃশ্য। সাদিফের কক্ষের দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে সাহিল,ইভান, ইফাজ এবং নিশি। বদ্ধ দরজায় ধুপধাপ কড়া নেড়ে ইফাজ বিরক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ এসব কি ন্যাকামি লাগিয়ে দিয়েছিস রে তুই সাদি? বিয়ে কি আমি করিনি? আমাকেও এসব করতে হয়েছে। তোকেও…
তার কথা কেড়ে নিয়ে বদ্ধ রুম হতে ভেসে আসল সাদিফের কন্ঠ,

‘ ন্যাকামি আমি না তোমরা করছো। এসব কি ফালতু রিচুয়্যাল? ইহ জীবনে পড়েছি আমি লুঙ্গি? আমি লুঙ্গি পড়ব। আর ঐ বুড়ো, দামড়ি মহিলারা এসে আমাকে হলুদ লাগিয়ে মাথায় পানি ঢালবে? অসম্ভব! আমি এসব রীতিনীতি মানতে পারবো না। ‘
‘ বুড়ো! দামড়ি! আমাকে দামড়ি মহিলা বলতে পারলো সাদিফ ভাইয়া? ‘ নিশি’র হতবিহ্বল কন্ঠ।
সাহিল,ইভান ফিক করে হেসে ফেললো। ঠিক সেই মুহুর্তে দেখা গেল সাফওয়ানকে। টি-শার্টের হাতা গুটিয়ে বদ্ধ দরজার পানে তাকিয়ে সে প্রশ্ন ছুড়ল,

‘ এখনো বের হয়নি? ‘
‘ না রে। তুই-ই দেখ কি করা যায়। আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। ‘ ইফাজের হতাশ কন্ঠস্বর।
সাফওয়ান কপাজে ভাঁজ ফেলে ধুমধাম বারি মারলো দরজায়। সাদিফকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘ তুমি কি বিয়ে না করার মতলব এটেঁছ? এমন হলে বলে দাও। আমি এক্ষুণি গিয়ে… ‘
মুহুর্তেই সটান খুলে গেল দরজাটা। দেখা মিললো অস্থিরতায় মুড়ানো সাদিফের মুখাবয়ব। তার কন্ঠে রাজ্যের বিরক্তি, উত্তেজনা।
‘ বিয়ে করবো না মানে? তোকে মাঝে এসে বা হাত ঢুকাতে কে বলেছে? তোর উপর নূন্যতম বিশ্বাস নেই আমার। খবরদার যদি নিচে গিয়ে এমন কিছু বলেছিস তো। ‘
সাদিফের উৎকন্ঠিত স্বরের বাক্যগুলো শুনা মাত্র সাফওয়ান ব্যতীত বাকিরা উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো। সাফওয়ান নিজেও হাসলো ভ্রুঁ চুলকে, নিঃশব্দে। নিশি ব্যস্ত পায়ে চলে গেল নিচে। ইফাজ সাদিফের বুকে ধাক্কা মেরে পুণরায় রুমে ঢুকিয়ে দিল তাকে। বললো,

‘ বুঝতে পারছি তোর অবস্থা। বিয়ের জন্য এত উতলা যখন হয়ে আছিস তাহলে যা হচ্ছে চুপচাপ মেনে নে। তোর নানু হুকুম দিয়েছে যেন লুঙ্গি,গেঞ্জি পড়ে বাহিরে আসিস। বিয়েতে এসব স্বাভাবিক। পড়ে নে, ধর। ‘
সাদিফ ভোঁতা মুখে হাতে নিল লুঙ্গি। পাজামার উপরেই কোনোরকমে গিট দিল। তা দেখে হেসে ফেললো ইফাজ। সাদিফ বিরক্ত মুখে বললো,
‘ হাসবে না এতো। এসব লুঙ্গি টুঙ্গির উপর দুই আনার ভরসা নেই। দেখা গেল সবার সামনে… নাউজুবিল্লাহ! এই রিস্ক নেওয়া যাবে না। ‘
কেউ আর কথা বাড়াল না। কিন্তু দেখা গেল বাহিরে বের হওয়ার আগে সাদিফ ফের বেঁকে বসেছে। জেদ চেপেছে তার সঙ্গে বাকিদের কেও এই হুলিয়া’য় বাহিরে যেতে হবে। সাফওয়ান শুনা মাত্র ভ্রুঁ কুঁচকে তাকায়। দায়সারা ভাবে বলে,

‘ আমার আশা ধরে বসে থেকে যদি বিয়ে না করার ইচ্ছে থাকে, তবে বসে থাকতে পারো। ‘
সাদিফ দাঁতে দাঁত চাপে একথা শুনে৷ কিন্তু তার পুরুষালী জেদের কাছে ঠিকই হার মানে বাকি ভাইয়েরা। বাংলোর সম্মুখে অপেক্ষারত মেয়েরা যখন দেখল সদর দরজা গিয়ে একে একে বের হচ্ছে সাদিফ,ইফাজ,সাহিল,ইভান, রূপম, রাহাত এবং সঙ্গে সাদিফের তিনজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সকলের গায়ে সাদা সেন্ডো গেঞ্জি, লুঙ্গি এবং চোখে কালো চশমা। সাম্য – ও বাদ গেলনা। সে সবার আগে, সাদিফের পায়ে পা মিলিয়ে এগিয়ে আসছে। সাফ্রিন, রূপসা, নিশি হা করে তাকিয়ে রইল কিয়ৎক্ষণ৷ অতঃপর উচ্চ স্বরে হেসে ফেললো। কেট্রিং সাইডে দুজন কর্মচারীর সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত সাফওয়ান নিজেও হতবাক সকলের এই হুলিয়া দেখে। ছেলেরা বিশেষ পাত্তা দিল না। বেশ ভাব নিয়ে এগিয়ে আসলো৷ সাদিফ কে নিশি সহ আরও দুজন ভাবি মিলে হলুদ ছোঁয়াল প্রথমে। অতঃপর পানি ঢালল মাথায়। মেয়েরা সরে পড়া মাত্র ছেলেরা সব হুমড়ি খেয়ে পড়লো সেখানে। মোবাইল বের করে ছবি তুলল একাধিক।

কনে পক্ষের বাড়িটির ছাদে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে হাসিতে লুটোপুটি অবস্থা হলো মেয়েদের। সাউন্ড বক্সে ‘কালা চাশমা’ গান লাগিয়ে উরাধুরা নাচ শুরু করেছে ছেলেরা। হলুদ শাড়ি পড়া সাফ্রিন,রূপসা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিডিও করছে। সঙ্গে আছে ভিডিও ম্যান।
কনে পক্ষের ডাক পড়া মাত্র ছাদে উপস্থিত মেয়েরা সতর্ক হয়। সাজগোছ ঠিক করে নেয় নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। নাজরাত দ্রুত হাতে দোপাট্টা ঠিক করে সিড়ি’র দিকে কদম বাড়িয়ে বলে উঠলো,
‘ চল চল.. ‘ কন্ঠে তার তীব্র তাড়া।
তার এহেন কান্ডে তোহা,সায়েরী চোখাচোখি হলো। সায়েরী এক চাপড় মারল নাজরাতের মাথায়। বললো,
‘ দুই দিন আগ অবধি শোকে মুর্ছা যাচ্ছিলি। এখন বর দেখে তোর তো দেখি তর সইছে না। নুহাশ ঠিকই বলে। তুই হলি লেডি মীরজাফর। ‘
নাজরাত থতমত খেয়ে গেল। অপ্রস্তুত কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ ওহ! লজ্জা পেতে হবে না? ভুলে গিয়েছিলাম। আচ্ছা, ধীরে সুস্থে চল। ‘
বাকিরা হেসে ফেললো তার অপ্রস্তুত ভাব দেখে। তোহা সহ আরও দুজন মেয়ে মিলে এগিয়ে চললো। মাঝে নাজরাত। সায়েরী এতক্ষণে খেয়াল করলো সে নামমাত্র শাড়ি টুকু পড়েছে। ফুলের জোড়া কানের দুল, গাজরা এখনো হাতে। তাড়াহুড়ায় তোহা ভীষণ অল্প মেকআপ করিয়েছিল তাকে। সামনের চুলগুলো একপাশে সিঁথি করে একটুখানি পাফ করেছে। কিন্তু পুরোপুরি বাঁধা হলো না এখনো। ব্যস্ত হাতে হাঁটতে হাঁটতে তাজা ফুলের গয়না গুলো পড়ে নিয়ে সদর দরজা পার হলো সে।

এদিকে হলুদে মাখামাখি সাদিফ ক্ষণিক সময়ের মধ্যেই ভেজা দেহ মুছে একটি হলুদ পাঞ্জাবি জড়িয়েছে গায়ে। একটানে লুঙ্গি খুলে ছুড়ে ফেলেছে একদিকে। চোখের পলকে চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে নিজেকে একদম ফিটফাট করে নিয়েছে সে। বউ সুন্দর সেজেগুজে বসে থাকবে আর সে থাকবে এসব ব্যাকডেটেড লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে। তাও আবার হলুদে মাখামাখি অবস্থায়! এ তো মানা যায় না। কমলা রাঙা গাঁদাফুল সমেত সাজানো জায়গাতে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষায় রইল নাজরাতের। এই অনুষ্ঠানে বাড়ির বড়রা কেউ-ই অংশ নেওয়ার জন্য রাজি নন। যুবক-যুবতিদের ছেড়ে দিয়েছে নিজেদের মতো আনন্দ করার জন্য। তবে বারে বারে এসে চোখে বুলিয়ে যাচ্ছেন তারা। ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং বর-কনের বন্ধুগণ ব্যতীত আপাতত তেমন কেউ আসেনি। দুপুর নাগাদ পৌঁছে যাবে অধিকাংশ মেহমান।

নাজরাত প্রথমে নিজ পরিবারের বড়দের সঙ্গে দেখা করলো। সকলে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মায়ের আঁখি ভাড়। সদর দরজা পেরিয়ে লনে পা রাখা মাত্র দক্ষিণ দিকের বাউন্ডারির দেয়াল ঘেঁষে গাঁদাফুল দ্বারা সজ্জিত জায়গাটা দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল তার। হলুদের এই প্রোগ্রাম টুকু বেশ সাদামাটা ভাবে কেবল ভাই,বোন আর বন্ধু বান্ধব রা মিলে উৎযাপন করবে বলে আয়োজন করেছে। কিন্তু সাজসজ্জা দেখে অতটাও সাদামাটা লাগছে না। হলুদ কার্পেট বিছানো হয়েছে লম্বা করে৷ যা সোজা গিয়ে থেমেছে সাদিফ দাঁড়িয়ে থাকা স্থানটাতে। বর, কনে উভয়ের জন্য পাশাপাশি আলাদা ভাবে বসার জায়গা রয়েছে৷ যেথায় হলুদ কাপড় বিছিয়ে রাখা। জমিনে তাজা ফুলের ছড়াছড়ি। চারিদিকে কেবল হলুদ এবং হলুদ।

এরই মাঝে কাঁচা হলুদ শাড়ি এবং রক্ত জবা’র ন্যায় লাল ব্লাউজ পরিহিতা কয়েকজন রমনীর মধ্যমণি হিসেবে দেখা গেল নাজরাত’কে৷ যার গায়েও হলুদ রঙের গারারা ড্রেস৷ প্রসাধনী মাখানো লাজুক মুখশ্রী, ফুল দ্বারা সজ্জিত হলদে বউ রূপে নাজরাত’কে দেখে সাদিফ হা করে তাকিয়ে রইল। নাজরাত দুই দুই বার চোখ তুলে তাকায়। প্রতিবারই সাদিফের এহেন বেশরম চাহনিতে আরক্তিম হয়ে উঠে তার মুখশ্রী। সাদিফের কাছে পৌঁছানোর পূর্বে দেখা হলো সাদিফের পরিবারের সঙ্গে। শ্বশুর, শাশুড়ী থেকে শুরু করে নানী শ্বাশুড়ি অবধি সকলে মিলে তাকে ঘিরে রাখল দীর্ঘক্ষণ। একপর্যায়ে ছাড় দিল, স্পেস দিল নিজেদের মতো আনন্দ করার জন্য। তারা ঢুকে গেল বাড়ির ভেতরে। অবশেষে গন্তব্য ফুরালো নাজরাতের। ধীর কদমে সাদিফের কাছাকাছি পৌঁছাতেই তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল সাদিফ। নাজরাত চোখ তুলে তাকালো। ঠোঁটের কোণে হাসি লেপ্টে হাতে হাত রেখে দাঁড়ালো কাছাকাছি,পাশাপাশি। ঠিক সেই মুহুর্তে দুজনের মাথার উপর হতে ঝরে অসংখ্য গোলাপ এবং গাঁদাফুলের পাপড়ি। সুন্দর এই মুহুর্ত-টি ক্যামেরা বন্দী করলো দুজন যুবক মিলে। বর, কনের উপস্থিতিতে এবার হই হুল্লোড় বেড়ে দ্বিগুণ হলো।

এদিকে বর, কনে উভয় পক্ষের যুবতীরা কাঁচা হলুদ শাড়ি পড়েছে। সঙ্গে রঙ জবা’র ন্যায় লাল ব্লাউজ। হালকা সাজসজ্জা, হলুদ গাঁদাফুল এবং লাল গোলাপের গাজরা দুই হাতে। কানেও তাজা গোলাপের দুল, মাথায় টিকলি৷ একই রকম সাজ সকলের৷ বাদ গেলনা সামান্তা এবং মিনহা। দল বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা ৬-৭ জন রমনীকে বেশ চোখে লাগছে। সায়েরী এসেছে সবার শেষে। এসেই প্রথমত ছেলেদের সঙ্গে উপস্থিত আয়ান, নুহাশের দিকে তাকিয়ে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল সে। মূলত চমকেছে নুহাশকে দেখে। বাড়ন্ত বয়সের হালকা পাতলা দাড়ি-গোঁফ সর্বদা লেপ্টে থাকত নুহাশের গাল জুড়ে। ইহ জীবনে সেভ করতো না সে। আর চুল! সেই ঝাকড়া, কুকড়ানো চুলগুলো আজ কি সুন্দর করে ছাটাই করা। ক্লিন সেভ করা মুখ৷ হলদে পাঞ্জাবি গায়ে।

চেনা মুশকিল যে, এটা সেই অগোছালো, ছন্নছাড়া নুহাশ সিকদার। কি ভদ্র, সভ্য লাগছে দেখতে! নুহাশের দিক হতে চোখ ফিরানো মাত্র আয়ান’কে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রুঁ কুঁচকালো সায়েরী। লক্ষ্য করে দেখল, আয়ান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে তোহার দিকে। সায়েরী হেসে ফেললো এই দৃশ্যে৷ আশেপাশে চোখ ঘুরিয়ে অবচেতন মনে খুঁজে বেড়াল সাফওয়ান’কে। কিন্তু দেখা পেল না। এই এক নিরামিষ জুটেছে তার কপালে। কিছুতেই তার রসকষ জমে না। উদাসীন সে লক্ষ্য-ই করলো না সম্মুখে একজোড়া বিমোহিত দৃষ্টি খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে তাকে। দ্বিতীয় বারের মতো শাড়ি পরিহিতা অবস্থায় তাকে দেখে একজনের দৃষ্টি থমকেছে, হৃদয় মত্ত হয়েছে মায়াময়ী মুখশ্রী’টির প্রাণোচ্ছল হাসিতে।

বর, কনের জন্য আলাদাভাবে আসন রাখা আছে। মাঝে দুরত্ব প্রায় ৪-৫ হাত। দুজন দুই দিকে বসেছে। যখন হলুদ ছোঁয়ানোর পালা এলো, সবার আগে ছুটে গেল সায়েরী। বড় গলায় বললো,
‘ বোন হই আমি। সাথে বেস্ট ফ্রেন্ড-ও। আমার অধিকার আছে সবার আগে আমার বোনকে হলুদ ছোঁয়ানোর। ‘
কিন্তু তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সাদিফকে এগিয়ে আসতে দেখে ভড়কে গেল বেচারি। সাদিফ পাঞ্জাবি হাতা গুটিয়ে সায়েরীর দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলে উঠলো,
‘ বউ হয় আমার। সেই হিসেবে সবার আগে তো আমার অধিকার আছে। তাইনা শা..লী সাহেবা? ‘
এই যুক্তিতে চুপসে গেল সায়েরী। মলিন দৃষ্টিতে তাকালো নিজের হলুদ মাখা হাতখানার দিকে।
তার মুখ দেখে সাদিফ শব্দ করে হেসে ফেললো। থালায় রাখা হলুদের বাটি-টা হতে সে নিজ হাতে হলুদ লেপ্টে নিল। অতঃপর অন্য হাতে সায়েরীর হাত টেনে দুজন একত্রে হলুদ ছোঁয়াল নাজরাতের দুই গালে। সায়েরী একপলকের জন্য চমকে উঠলেও পরমুহূর্তে হেসে ফেললো। নাজরাতের গলা জড়িয়ে, গালে গাল লাগিয়ে বলে উঠলো,

‘ দেখেছিস! ভাইয়া বুঝে গিয়েছে আমার ভ্যালিউ ঠিক কতটুকু। ‘
নাজরাত প্রসন্ন হেসে সাদিফের দিকে তাকায়। সায়েরী উঠে গেল দুজনকে স্পেস দিয়ে। সে যেতেই সাদিফ ঝুঁকে আসলো নাজরাতের কাছাকাছি। দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে বলে উঠলো,
‘ আমাকেও হলুদ ছোঁয়ানোর প্রথম অধিকার টা আমার বউয়ের-ই হওয়া চাই, নাকি? ‘
নাজরাত লাজুক মুখে নিজের দুই হাতে হলুদ মেখে নিল। দুই হাত দিয়েই হলুদ লেপ্টে দিল সাদিফের গাল জোড়ায়। যা দেখামাত্র পেছন থেকে ভেসে আসল বাকিদের উচ্চ কন্ঠ। নাজরাত লজ্জা পেয়ে হাত নামিয়ে ফেললো। সাদিফ গিয়ে বসলো নিজের জন্য বরাদ্দকৃত আসনে। মুহুর্তে দুই দিক থেকে একে একে সকলে এসে হলুদ ছোঁয়াতে লাগল বর, কনে উভয়-কে। ইফাজ-নিশি একত্রে। আয়ান-তোহা একত্রে। সায়েরী একাই গেল। সাদিফকে হলুদ লাগানোর জন্য যখনই সে গালে হাত ছোঁয়াল, ঠিক সেই মুহুর্তে তার পাশাপাশি সাদিফের অন্য গালেও এসে ছুঁয়ে গেল একটি পুরুষালী হাত। নাসারন্ধ্রে ঝংকার তুলল চিরপরিচিত, মেইল পারফিউমের কড়া সুঘ্রাণ। সায়েরী চট করে পাশ ফিরে তাকায়। দেখা মিলে সাফওয়ানের ঘর্মাক্ত, লালছে মুখশ্রী’র। ভেজা কপালে চুল লেপ্টে আছে তার। সাফওয়ান নিজেও ফিরে তাকালো এক সেকেন্ডের জন্য। পরপর আবার হলুদ লাগানো শেষ হতেই দাঁড়িয়ে পড়লো সোজা হয়ে। সাদিফ তাকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন ছুড়ল,

‘ কোথায় ছিলি তুই? সেই কখন ডাক পাঠিয়েছিলাম! ‘
‘ বাজারে ছিলাম। কাজ ছিল। ‘ সাফওয়ানের ভরাট কন্ঠস্বর।
সায়েরী-সাফওয়ান সরে যেতেই এগিয়ে আসে আরেকজন। ফটোশুট চলছে পুরোদমে। ছেলেদের পরণে তখনও লুঙ্গি,গেঞ্জি। সাদিফের বন্ধু গুলো এমন ভাবে একেক এক পোজ মেরে ছবি তুলছে যেন লুঙ্গির চেয়ে ফেমাস ডিজাইনিং আউট-ফিট আর হতেই পারে না। তাদের কান্ড দেখে বাকিরা হেসে কুটিকুটি। এসবের মাঝে ঘটে গেল এক বিরল ঘটনা। সাম্য’র লুঙ্গি নেমে এসেছিলো পায়ের গোড়ালির নিচ অবধি। জমিনে লুটিপুটি খাচ্ছে এমন অবস্থা। এহেন মুহুর্তে আচমকা ছোট্ট মিনহার পা পড়ল তাতে। সঙ্গে সঙ্গে সকলের সম্মুখে লুঙ্গি খুলে পড়ে গেল সাম্য’র। সে লজ্জায়, আশ্চর্যে চিৎকার করে উঠলো। বেচারি মিনহা নিজেও ভড়কে গেল এহেন অপ্রীতিকর দৃশ্যে। সকলে হকচকিয়ে উঠলো একমুহূর্তের জন্য। পরপরই হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়লো একে অপরের উপর। কোমরে লুঙ্গির গোঁজ ধরে সাম্য কটমট চোখে তাকায় মিনহার দিকে। সবার হাসিতে বেচারা পারছে না মাটি ফাঁক করে ঢুকে যেতে। রাগে সে তেড়ে গেল মিনহার দিকে। ভাবখানা এমন যে আমার লুঙ্গি খুলেছিস যখন, আমি তোর শাড়ি খুলবো। তার হাবভাব দেখে মিনহা ভয়ে চিৎকার করে দৌড়ে পালাতে চায়। পূর্বেই এগিয়ে আসে সায়েরী। কাছে টেনে নেয় তাকে। অন্য দিকে সাম্য’কে ঝাপটে ধরে আটকে ফেললো সাফওয়ান। সাম্য দমে গেল না। চেঁচিয়ে উঠেছে তেজি সুরে,

‘ ছাড়ো ভাইয়া! আমি ওর শাড়ি খুলে দিব.. ‘
সাফওয়ান ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকায়। সাম্য’র সম্মুখে বসে লুঙ্গিতে গিট দিতে দিতে কন্ঠে গাম্ভীর্য ঢেলে বলে,
‘ মিনহা ইচ্ছে করে করেনি, সাম্য। তুমি কিছু করবে না ওকে। ছোট হলেও ও মেয়ে মানুষ। এভাবে শাড়ি খুলা ব্যাড ম্যানার্স। মেয়েদের রেসপেক্ট দিতে হয়, বলিনি তোমাকে? ‘
সাম্য খানিকটা চুপসে গেল সাফওয়ানের গম্ভীর কন্ঠ শুনে। কিন্তু ফের বলে উঠলো,
‘ সব সম্মান ওর? আমার নেই নাকি? তোমরা যে দেখে ফেলেছ আমার… ‘ লজ্জায় কথা থেমে গেল বেচারার।
‘ ন..নাহ! না তো, কিচ্ছু দেখিনি আমরা। ‘

কথাটুকু সাফওয়ান বলতে চাইল গম্ভীর কন্ঠে। কিন্তু পারল না। হেসে ফেললো মাথা নুইয়ে। সাম্য গাল ফোলাল তার হাসি দেখে। সে ফের কটমট চোখে চাইল মিনহার দিকে। নেহাৎ সে তার বড় ভাইয়ের সব কথা মেনে চলে বলে, নয়তো এই মেয়েটাকে চড়িয়ে গাল লাল করে ফেলত।
সাফওয়ান সরে যাওয়া মাত্র সাম্য’র পাশে এসে দাঁড়ালো নুহাশ। বাচ্চাটার মাথায় টোকা মেরে, বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বলে উঠলো,

‘ ছোট ভাই! টুনটুনি তো দেখে ফেলেছি। ‘
সাম্য চোখ, মুখ কুঁচকে তাকাল। গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ হ্যাঁ তো? তোমার কাছে নেই বুজি? আজ কি প্রথম দেখছ? ‘
এই কথায় আরেক দফা হাসির রোল পড়ল। নুহশের সকল ইমেজ চুরচুর হয়ে গেল মুহুর্তের মধ্যে। নাজরাত,সায়েরী,সাফ্রিন এবং তোহা পেট চেপে হাসছে। আয়ান উচ্চ স্বরে হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে পানি বের করে ছাড়ল। সকলের সামনে যেচে এসে এমন অপদস্ত হয়ে নুহাশ পারছে না সাম্য’কে কাঁচা গিলে ফেলতে। সে নিচু কন্ঠে ডাকল মিনহাকে। মেয়েটা কাছে আসা মাত্র সে নিম্ন কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ মেহু পাখি! বেশ ভালো কাজ করেছ। আমি গর্ভবতী ফিল করছি খুব। এই মিনি লাটসাহেবের মান সম্মানের পর্দায় আরও একবার পা ফেলো, যাও। এবারে সোজা লুঙ্গি নিয়ে ছুটে পালাবে। সবাই দেখুক এর টুনটুনি। ‘
মিনহা ভাবুক চোখে তাকায়। নয় বছর বয়সী তার মাথার উপর দিয়ে গেল কথাগুলো। সে পিটপিট নজরে তাকিয়ে উচ্চ কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ টুনটুনি কি ভাইয়া? ‘
নুহাশ ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। সবাই গোল গোল চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। নুহাশের পাশে বসা তোহা চোখ গরম করে তাকায়। মিনহাকে টেনে নেয় নিজের দিকে। নুহাশ মাথা চুলকে বিড়বিড় করে,
‘ এক্কেবারে বোনের মতো হইছে। লোকসমাজে আমার মান সম্মান তামা তামা করে ছাড়ল সবাই মিলে। ‘

অনুষ্ঠান চলাকালীন সময়ে সায়েরী ব্যস্ত পায়ে ঢুকলো বাড়ির ভেতরে। মেহরিন বেগম কারণ জানতে চাওয়া মাত্র সে অপ্রস্তুত হেসে জবাব দিল রুমে যাচ্ছে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস নিতে। কেউ আর বিশেষ মাথা ঘামাল না তাকে নিয়ে। সায়েরী সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে সোজা ছাদে উঠে গেল। অনুষ্ঠান চলছে বিধায় বড়-রা ছাড়া অন্য সকলে বাড়ির বাহিরে। দুই বাংলোর ছাদ-ই খালি। কারণ অনুষ্ঠানের সকল আয়োজন করা করেছে লনে। সায়েরী ছাদে পা রাখা মাত্র দেখল পাশের বাংলোর ছাদ হতে রেলিং পেরিয়ে এই ছাদে প্রবেশ করছে সাফওয়ান। বেশ সহজলভ্য ব্যাপার, মাঝে দুরত্ব মাত্র দেড় হাত সমান। ঠিক যেমনটা সায়েরী এবং পিউ’দের বাড়ির ছাদের দুরত্ব। সাফওয়ান এগিয়ে আসলো। তার হাতে একটি শপিং ব্যাগ। সায়েরী সতর্ক চোখে আশেপাশে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সিড়ি ঘরে। কাছাকাছি আসতেই সাফওয়ানের ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত মুখশ্রী দেখে মায়া লাগলো তার। সাফওয়ান কিছু বলতে উদ্যত হয়েছে, এমন মুহুর্তে হঠাৎ সায়েরী নিজ শাড়ির আঁচল তুলে সাফওয়ানের কপাল,গাল মুছে দিল৷ চিন্তিত গলায় শুধালো,

‘ কেন ডেকেছেন এখানে? সবাই নিচে। কেউ খুঁজতে এসে যদি না পায়? আর আপনি ছিলেন কোথায়? এমন ঘেমে গিয়েছেন কেনো? ‘
তার চিন্তিত কন্ঠ-টা শুনে সাফওয়ান জুলুজুলু নজরে তাকিয়ে রয়। সায়েরী প্রশ্নবোধক চাহনি ছুড়ে জবাব না পেয়ে। সাফওয়ানের চাহনি দেখে আশা পুষে তাকে দেখে দুটো মিষ্টি প্রশংসা বাণী শুনাবে। কিন্তু নাহ। কপালে ভাঁজ ফেলে, অত্যন্ত গম্ভীর কন্ঠে সাফওয়ান বলে উঠলো,
‘ এমন ডার্ক লিপস্টিক লাগিয়েছ কেনো? নিষেধ করিনি? ‘
সায়েরীর গাল থিতু হয়ে এমন বেহুদা কথায়। সে আঁচল নামিয়ে বিরক্ত মুখে বলে উঠলো,
‘ আপনার মতো এমন নিরামিষ প্রেমিক পৃথিবীর বুকে আর দুটো দেখিনি। সেজেগুজে আছি, শাড়ি পড়েছি, কোথায় প্রশংসা করবেন তা না। উল্টো ধমকা ধমকি করার কারণ বের করছেন। খোদা জানে কোন কুলক্ষণে দিনে আমি আপনার প্রেমে পড়েছিলাম। আমার জায়গায় অন্য মেয়ে হলে এক সপ্তাহ-ও স্থায়ী হতো না। ফাটা কপাল আমার! ‘

সাফওয়ান একইভাবে ছোট ছোট চোখে তাকিয়ে। আচমকা কদম বাড়িয়ে সে শব্দ করে হাত রাখল সায়েরীর পেছনে দেওয়ালে। মেয়েটা চমকে উঠলো এহেন প্রতিক্রিয়া’য়। সিঁটিয়ে গেল দেয়ালের সঙ্গে। সাফওয়ান ঘাড় কাত করে তার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
‘ এসব কথা পরে শুনবো। এই ডার্ক রেড লিপস্টিকের নড়নচড়ন আমাকে প্রচন্ড ডিসটার্ব করছে। এটা মুছবে, এক্ষুণি। ‘
তার কন্ঠ নিবুনিবু, মাদকতায় ভরা। সায়েরীর বুক ঢিপঢিপ করে কন্ঠ’টা শুনে। চোরা চোখে অবলোকন করে সাফওয়ানের প্রলুব্ধ দৃষ্টি। যা তার অধর যুগলে নিবদ্ধ। সেটা লক্ষ্য করে অপ্রস্তুত হয়ে জিহ্ব দিয়ে ঠোঁট ভিজাল সে। তার থুতনি কাঁপে তিরতির। ‘লিপস্টিকের নড়নচড়ন’ কথাটা কানে প্রতিধ্বনি হচ্ছে। নড়ছে তো ঠোঁট। লিপস্টিক আবার কীভাবে নড়নচড়ন করে? এ কেমন বেক্কলের মতো কথাবার্তা! সে থমকানো কন্ঠে সাফওয়ানের ধ্যান ঘোরানোর প্রচেষ্টায় বলে উঠলো,

‘ এই প্যাকেটে কি আছে? ‘
সাফওয়ান এগিয়ে দিল প্যাকেট-টা। প্রশ্নটির উত্তর না দিলে বলে উঠলো,
‘ যেটা আছে সেটা পরশু পরবে, রিসেপশনে৷ ‘
সায়েরী ভাবুক চিত্তে গ্রহণ করলো প্যাকেট-টা। ভাবল, আবারও মা’কে ভুচুং ভাচুং বোঝাতে হবে!
‘ আপনাকে আমি নিষেধ করেছিলাম। আম্মু দেখলে হাজারটা প্রশ্ন করবে৷ আমি কি… ‘
সাফওয়ানের গম্ভীর চাহনি দেখে কথা আটকে গেল তার৷ উপর দিয়ে শত ফটর ফটর করলেও সত্য এটাই যে সাফওয়ান কে এখনো বেশ ভয় পায়৷ কিন্তু এটা সে প্রকাশ করতে চায় না৷ এখনো চাইল না। সাফওয়ানের গম্ভীর চাহনির বিপরীতে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে বলে উঠলো,

‘ আপনি কি চোখ গরম করে তাকিয়ে আমাকে ভয় দেখাতে চাইছেন? ‘
সাফওয়ান মনে মনে হতাশ হলো। তার এক চাহনিতে কেঁদে ফেলে মেয়েটা এখন উল্টো ঘুরে তার কাছে শাসানো গলায় কৈফিয়ত চাচ্ছে, সে ভয় দেখাচ্ছে কি-না! মনে মনে তার হাসিও পেলো সায়েরীর অভিনয় দেখে। কিন্তু সে হাসল না। পরাজিত প্রেমিকের ন্যায় মাথা নেড়ে, ধীর কন্ঠে জবাব দিল,
‘ একদম না। আপনাকে ভয় দেখানোর সাধ্য তো আমার কোনো কালেই ছিল না। ‘
সায়েরী গর্বের সহিত হাসে। আবার নিচে যাওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে উঠলো,
‘ কেউ আমাকে খুঁজতে গিয়ে এখানে চলে আসলে কেলেঙ্কারি বেজে যাবে। যেতে দিন৷ আর আপনি..আপনাকে ভীষণ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। নিচে গিয়ে শাওয়ার নিয়ে নিন। আমি যা… ‘
কথার মাঝে তার ব্যস্ত ঠোঁটে তর্জনী ঠেকাল সাফওয়ান। গম্ভীর চোখে তাকিয়ে আচমকা একহাতে ফুলো গালজোড়া চেপে টেনে নিল মুখখানা। পকেট থেকে রুমাল বের করে দুই তিন ঘষায় তুলে নিল লিপস্টিক সব। রাশভারি কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ ইট’স রিয়েলি ভেরি অ্যানোয়িং, সুবহা। এই ডিসটার্বিং লিপস্টিপ আর কখনো লাগাবে না। লাগালেও অন্তত আমার সামনে এসো না। ‘
সায়েরী যেন বুঝতে পারল এই অধৈর্য কন্ঠের পেছনের রহস্য। এবং বুঝতে পেরে গাল জোড়া রক্তিম হয়ে উঠলো তার। সে ঠোঁটে ঠোঁট চাপলো। ঠিক সেই মুহুর্তে তার পিঠ জড়িয়ে তাকে বুকে টেনে নিল সাফওয়ান। নিঃশব্দে অধর ছুঁয়ে দিল কপালের মধ্যিখানে। কিছু একটা বলতে চেয়েও গিলে নিল। দূরে সরে গিয়ে ইশারায় বুঝালো চলে যেতে। সায়েরী’র কম্পায়মান পদযুগল এগিয়ে চললো সিড়ি পথে।

প্রায় শ’খানেক ছবি তোলা সম্পন্ন হওয়ার পর নাজরাতকে হলুদ ছোঁয়ানোর জন্য এগিয়ে এসেছে নুহাশ। এসেই বেশ ভাব নিয়ে পাঞ্জাবির হাতা গোটাল সে৷ দুই হাতে ভর্তি করে তুলে নিল হলুদ। তার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে নাজরাত বড় বড় চোখে তাকালো। দ্রুত গলায় বাঁধ সাধল,
‘ ন..নাহ! খবরদার নুহাশ…একদম এমন করবি ন… ‘

তার কথাটুকু সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বে নুহাশ দুইহাত ভর্তি হলুদ ঘষে দিল তার সম্পুর্ন মুখশ্রী তে। এই দৃশ্য দেখে হই হই করে উঠলো সকলে। নাজরাত দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে গেল। নুহাশের ঘাড় চেপে ধরে চোখের পলকে মুখ ডুবিয়ে দিল হলুদের বাটিতে। তাদের দেখাদেখি সাদিফের বন্ধুরা আচানক সাদিফকেও হলুদে মাখামাখি করে ছাড়ল সকলে মিলে। বর-কনে থেকে শুরু করে একে একে সকলেই একে অপরেকে জোর পূর্বক হলুদ ভূত বানিয়ে ছাড়ল। সায়েরীকে নুহাশ এমন ভাবে হলুদ মাখিয়েছে যে তার মুখের মধ্যেও ঢুকে পড়েছে আংশিক। সে থুতু ফেলে বাড়ির ভেতর যাওয়ার জন্য কদম বাড়াতেই দেখা মিলে সাফওয়ানের। সদ্য স্নান সেরে ফিটফাট হয়ে এসেছে সে। সকলের দিকে তাকিয়ে চোখ মুখে বিষ্ময় খেলে গেল তার। তার ঠিক সম্মুখেই সায়েরী। যাকে চিনতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল তার। এবং চিনতে পেরে সে হেসে ফেললো। সায়েরীর গাল টেনে ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ এটা তুমি! ওয়াও! লুকিং সো প্রিটি.. ‘
সায়েরী নাক মুখ কুঁচকে হাত ঝাড় মারে। সাফওয়ান কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে নিজের হাতে থাকা হলুদ সহ মুখশ্রী হতেও বাড়তি হলুদ তুলে নিয়ে চোখের পলকে ঘষে দিল সাফওয়ানের কপালে,গালে,গলায়। সম্পূর্ণ হলুদ ভূত বানিয়ে সে দাঁত কেলিয়ে হেসে পায়ের পাতা উঁচু করে দুই হাতে সাফওয়ানের গাল টেনে বলে উঠলো,
‘ সাফওয়ান ভাই! এটা আপনি? মাই গড! লুকিং সোওও প্রিটি! ‘

সাফওয়ান হতবিহ্বল চিত্তে তাকিয়ে। মাত্র এত ঘষামাজা করে স্নান সেরে এলো কি এই অঘটন ঘটানোর জন্য! সায়েরী ঠোঁট চেপে হাসছে। তাদের পেছন থেকে সামান্তা খিলখিল করে হেসে উঠলো সাফওয়ানকে এমন হলুদে মাখামাখি হয়ে থাকতে দেখে। বাকিদের ধ্যান কেড়ে নিয়ে সে বলে উঠলো,
‘ দেখো, দেখো! ভাইয়াকে ও ভূত বানিয়ে দিয়েছে সায়েরী আপু। ‘
কথাটা শুনামাত্র সকলে থামে। ফিরে তাকায় সাফওয়ান-সায়েরীর দিকে। সাহিল,ইভান, ইফাজ এবং নিশি মহা আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে। সাফওয়ানকে হলুদ মাখিয়েছে! তাও আমার কোনো মেয়ে! তাদের এহেন কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাদিফ সকলের অগোচরে নাজরাতের দেহ ঘেঁষে দাঁড়ালো। সকলের দৃষ্টির আড়ালে নাজরাতের কোমর জড়িয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলো,
‘ মনে হচ্ছে আমাদের বিয়েতে কাউকে না কাউকে হার্ট অ্যাটাক করিয়ে ছাড়বে এরা দুজন মিলে। ‘

দুপুর নাগাদ মেহমান আসা শুরু করেছে৷ দুই বাড়িতে রমরমা অবস্থা। বিকেলের শেষ দিকে মেয়েরা সকলে মিলে চলে গিয়েছে বিউটি পার্লারে। কারণ রাতে মেহেন্দি প্রোগ্রাম। আবরার এসেছে শেষ বিকালে। সকালে আসার কথা থাকলেও সম্ভব হয়নি। কিন্তু সে আসার পর থেকেই একদন্ড ফুরসত পেলনা। পরিবারে বড় ভাই বলতে আছে শুধুমাত্র সে। নাজরাতের ভাই দুটো এখনো নাবালক৷ তাই তো, একমাত্র বড় ভাই হওয়ার দরূণ উপস্থিত হওয়ার পরপরই একাধিক দ্বায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিল সে। মেহেন্দি প্রোগ্রাম বর-কনে দুজনেরই একত্রে হবে বলে স্টেজ করা হয়েছে একটি। বেশ সুন্দর ডিজাইন। আর্টিফিশিয়াল অর্কিড দিয়ে সাজানো। থিম ডিপ গ্রীন এবং হোয়াইট। স্টেজের সম্মুখে বেশ বড়সড় ডান্স ফ্লোর।

কারণ দুই পক্ষ-ই বিশেষ ভাবে ডান্স প্রেকটিস চালিয়েছে দীর্ঘদিন যাবত। স্পট লাইট সহ সকল ধরনের লাইটিং, খাবার, গেস্ট দের বসার স্থান সব কিছু তদারকি করতে দেখা গেল সাফওয়ান, আবরার এবং সাহিলকে। সঙ্গে আছে সাদিফ এবং নাজরাতের বাবা’রা। সৌভাগ্যক্রমে সব কিছুর আয়োজন খুব ভালো ভাবে হয়েছে। কোথাও কোনো কমতি নেই। সন্ধ্যা হতে না হতেই অতিথি এসে ভরে গেল দুই বাড়ি। মেয়েরা তখনও পার্লারে। তাদের রিসিভ করার জন্য তিনটে গাড়ি পাঠানো হয়েছে। এদিকে বর বেশে সাদিফ সম্পূর্ণ তৈরি। তার গায়ে সী-গ্রীন রঙের পাঞ্জাবি, তারউপর গ্রীন এবং হোয়াইট কম্বিনেশনের কটি। একই ডিজাইনের ভিন্ন রঙের কটি এবং পাঞ্জাবি পড়েছে তার বাকি ভাইয়েরা।

সাফওয়ান – সাম্য পড়েছে হোয়াইট পাজামা-পাঞ্জাবি। উপরে মাল্টি কালারের হাফ হাতা কোট। তারা ব্যাতিত বাকি ছয় ভাই পড়েছে ডিপ গ্রীন পাঞ্জাবি এবং হোয়াইট কটি। সবাইকেই বেশ সুন্দর লাগছে দেখতে। সাদিফ পুরোপুরি তৈরি হয়ে বাহিরে আসার কিছু মুহুর্ত পরই গেইটে এসে দাঁড়ালো মেয়েদের গাড়ি। সাদিফ এগিয়ে গেল সেদিকে। প্রথম গাড়িটির কাঁচ নামানো জানলায় নাজরাতের অবয়ব দেখে সে দরজা খুলে দিল। হাত বাড়িয়ে দিল বেরিয়ে আসার জন্য। কৃত্রিম রঙিন আলোয় নাজরাতের অবয়ব তখনো অস্পষ্ট। সে যখনই সাদিফের হাত ধরে বেরিয়ে এসে সম্মুখে দাঁড়াল, সাদিফের হৃদস্পন্দন থমকে গেল তাকে দেখে। এক মুহুর্তের জন্য মনে হলো সময় থেমে গিয়েছে, আশেপাশের সব সাদা কালো। কেবল তার সম্মুখের এই রূপবতী রমনী জ্বলজ্বল করছে তার নজরে। সে বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলে। ধরে রাখা হাতখানা আরও একটু জোর প্রকাশ করে চেপে ধরে বলে উঠে,

‘ উফ্‌!! বুকে ব্যথা লাগছে। তুমি কি সংসার করার আগেই আমাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা রটেছ, বউ? ‘
নাজরাতের চোখ বড় বড় হয়ে গেল এহেন বেফাঁস কথায়। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল নিশি ভাবি সহ সকলে মিটিমিটি হাসছে। সে সাদিফের হাতে চিমটি কাটতেই ঘোর কাটলো সাদিফের। মাথা চুলকে নিজেও আশেপাশে তাকালো। অপ্রস্তুত হেসে নাজরাতের হাত ধরে এগিয়ে গেল ভেতরে। স্টেজের সম্মুখে উপস্থিত সকলে মুগ্ধ চোখে দেখল দুজনকে। নাজরাতের গায়ে সী-গ্রীন এবং গোল্ডেন কম্বিনেশনের একটি গাউন। স্টোনের ভারী কারুকাজ। ফুল স্লিভ হাতার উপর লম্বা নেট। যা প্রায় জমিন ছুঁয়েছে। মুখেও তার লাইট মেকওভার। খোলা চুল হালকা ভাবে কার্ল করে কাঁধের ডান পাশে রাখা। ডান হাতে একটি ব্রেসলেট এবং বাম হাতে একটি চিকন বালা। কানে গোলাকার দুটো টপ। গলায় ছোট একটি নেকলেস। তার সাজসজ্জা দেখে সকলে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। দুজনকে কি সুন্দর মানিয়েছে! বড়দের সঙ্গে দেখা করে তারা গিয়ে বসল স্টেজে। তিনজন মেহেন্দি আর্টিস্ট এসেছে ক্ষণিক পূর্বে। নাজরাত আসা মাত্র তার দুই পাশে আসন পেতে বসলো দুজন। লেগে পড়লো নিজেদের কাজে।

আয়ানের সঙ্গে তোহার মন মালিন্য চলছে সেই বিকেল থেকে। কারণ তোহা দেখেছে আয়ান দুজন মেয়ের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলেছে। কথা কথার কারণ কি তোহা জানে না। জানতেও চাইনা। আয়ান যে হেসে হেসে আলাপ করেছে এতেই সে ক্ষেপেছে। এবারে একদম ফাইনাল ব্রেকাপ বলেছে। সেই সঙ্গে বলেছে নাজরাতের সাথে সাথে সে-ও বিয়ে করে ফেলবে। সাদিফ ভাইয়ের পরিবারে তো ছেলের কমতি নেই। একজন না একজন জুটে যাবে। তাছাড়া সে তো মেয়ে হিসেবে খারাপ না। যথেষ্ট সুন্দরী, গুলুমুলু দেখলে। একবার প্রপোজ করলে যেকোন ছেলে পটে যাবে। এই কথাগুলো উদাস মুখে সায়েরী এবং নুহাশকে শুনাচ্ছে আয়ান। দুজন শুনছে ঠিক। কিন্তু প্রতিক্রিয়া একেবারে স্বাভাবিক। ওইযে নিত্যকার ব্যাপার বলে। আয়ানের বলা কথাটুকু শেষ হওয়া মাত্র সেখান দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা গেল সাহিলকে। সায়েরী মিহি স্বরে ডাকল তাকে,

‘ সাহিল ভাইয়া!! ‘
সাহিল থমকাল। ফিরে তাকায় সায়েরীর দিকে। মেয়েটাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখার পর থেকে মন আকুপাকু করছিলো তার। সেই কখন থেকে আশেপাশে ঘুরঘুর করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল শুধু। ধরা টরা পড়ে গেল না তো! ধুকপুক হৃদয়ে সে জোরপূর্বক হেসে জবাব দিল,
‘ হ..হ্যাঁ, বলো! ‘
সায়েরী তার সম্মুখের চেয়ার-টা ঠেলে দিল৷ সাহিল বসলো নুহাশের পাশে। বসা মাত্র শুনা গেল সায়েরীর অহেতুক এক প্রশ্ন,
‘ আপনার বড় ভাই বিয়ে করে দুই দুই বার অনুষ্ঠান করে ফেলছে৷ আপনি এখনো সিঙ্গেল বসে আছেন কেনো? ‘
সাহিল অবাক হলো। ভেবে পেল না কি উত্তর দিবে। সায়েরী অবশ্য উত্তরের আশায় ছিলই না। সে ফের বলে উঠলো,

‘ আশেপাশে এত সুন্দরী মেয়ে থাকতে আপনি এমন ভোঁতা মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেন বলুন তো? ‘
‘ হুঁ? ভোঁতা মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছি মানে? ‘ সাহিলের আশ্চর্য কন্ঠ।
‘ তা নয়তো কি? আমি আসার পর থেকে দেখছি আপনি কেমন চুপচাপ হয়ে আছেন। আগেরবার তো কথার ফুলঝুরি ছুটত মুখ দিয়ে। এবারে কি হলো? ‘ সায়েরী ভ্রুঁ নাচায়।
সাহিলের বুক কাঁপ দুরুদুরু। কীভাবে বলবে যে, মেয়েটাকে কাছাকাছি দেখতেই সে কথা হারিয়ে ফেলে। নিজের মধ্যে থাকে না। তখন ইচ্ছে করে এই রিনরিনে কন্ঠ-টা কেবল শুনতেই থাকতে।
‘ আচ্ছা, শুনুন। আপনাকে আমি একটা বেস্ট সলিউশন দিচ্ছি। বউয়ের ক্লোজ বান্ধবী নিজের জন্য বর খুঁজছে বুঝেছেন? আমি ভেবে দেখলাম আপনি দেখতেও ঠিকঠাক, ফ্যামিলিও ভালো। বছর দুয়েকের মধ্যে গ্রেজুয়েশন টাও কমপ্লিট হয়ে যাবে। ততদিন নাহয় এনগেজমেন্ট করে থাকা যায়। এরপর জব হলে চট করে বিয়েটা সেরে ফেলা যাবে। মেয়ে তো আপনার চেনা আছে। জানার জন্য কিছুদিনের আলাপ-ই যথেষ্ট। আইডিয়া খারাপ না তাইনা? ‘

সাহিল বিষ্ময়ে হতবিহ্বল। সে ভেবে নিল সায়েরী এসব কথা নিজের জন্য বলেছে। তোহার কথা তার মাথাতেই এলো না। বিনা মেঘে বৃষ্টি পেয়ে যাওয়ার মতো আনন্দে সে বাকহারা হয়ে গেল। এদিকে আয়ান চোখ গরম করে তাকিয়ে সায়েরীকে শাসিয়ে উঠলো,
‘ সায়ু! চুপ কর। ‘
সায়েরী সে কথায় পাত্তা দিল না। সাহিলকে চুপ দেখে সে ফের জানতে চাইল,
‘ কি হলো? আইডিয়া ভালো লাগেনি? না-কি মেয়ে পছন্দ ন.. ‘
‘ না না!! মেয়ে পছন্দ। খুব পছন্দ। ‘ সাহিল প্রতিউত্তর করলো দ্রুত গলায়।
এহেন উত্তরে সায়েরী ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। সে তো মজার ছলে বলছিল একথা। কিন্তু সাহিল যে পূর্ব হতেই তোহাকে পছন্দ করে রেখেছে একথা কে জানত! আড়চোখে তাকিয়ে দেখল আয়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সাহিলের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন চোখ দিয়েই ভস্ম করে দিবে। সায়েরী জোরপূর্বক হাসলো। আমতাআমতা করে বলল,
‘ ঠ..ঠিক আছে ভাইয়া। আমি একটু আসছি হ্যাঁ? ‘

বলতে না বলতেই সে আয়ানের সামনে থেকে দ্রুত কদমে পালিয়ে গেল। আয়ান অবশ্য গম্ভীর কন্ঠে একবার ডেকেছিল তাকে। কিন্তু মেয়েটা না শুনার ভান করে চলে গেল। তার দেখাদেখি সাহিল নিজেও উঠে গেল। আয়ান বসে রইলো ক্রোধ চেপে। নেহাৎ নাজরাতের দেবর বলে বেঁচে গেছে। নয়তো এই ছেলের চোয়াল গুড়িয়ে দিত সে। তার কাঁটা নুনের ছিঁটা দিয়ে নুহাশ ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলে উঠলো,
‘ সাহিল ছেলেটা খারাপ না তাইনা? তোর সঙ্গে না হলে তোহাকে এর সঙ্গে বিয়ে দেওয়ায় যায়। চার বান্ধবী একই বংশের হয়ে যাবে তখন। বেশ ভালো আইডিয়া।
কথাটুকু শেষ হতে না হতেই আয়ান বাহু দিয়ে গলা চেপে তার। নুহাশ চেঁচিয়ে উঠলো বাপ বাপ করে। বাকি তিনজনের রাগ সব নুহাশের উপর ঢেলে তবেই ক্ষান্ত হলো আয়ান।

অনুষ্ঠান বেশ অনেক্ক্ষণ যাবত ঝিমিয়ে আছে। কনে পক্ষ একদিকে, বর পক্ষ অন্য দিকে বসে আড্ডায় মশগুল। এমন সময় ইভান পিঞ্চ করে সায়েরী দের শুনিয়ে বললো তাদের কোন প্রেকটিস নেই নাচ, গানের। তাই তো অনুষ্ঠান এমন ঝিমিয়ে। সায়েরী, তোহা চটে গেল সঙ্গে সঙ্গে। তর্ক বির্তক লেগে গেল মুহুর্তে মধ্যে৷ সাহিল বললো এত দম থাকলে অনুষ্ঠান জমজমাট করে দেখাও। সায়েরী, তোহা, আয়ান, নুহাশ চোখাচোখি হলো। চ্যালেঞ্জ করেছে! বেশ। তবে দেখানোর সময় সময় হয়েছে কনে পক্ষ ঠিক কি জিনিস। আয়ান গেল মিউজিক সেন্টারে, নুহাশ গেল অন্যদিকে। মিনিট খানিকের মধ্যে স্পট লাইট এসে আলোকিত করে তুললো ডান্স ফ্লোর। বেজে উঠলো একটি পরিচিত গানের টিউন।

একে একে অনেকেই উৎসুক নজরে এগিয়ে আসলো দেখার জন্য। সাফওয়ান সেই কবে থেকে বাড়ির ভেতরে ছিল। বাহিরে এসে কোতুহলী হয়ে ডান্স ফ্লোরে চোখ দেওয়া মাত্র স্পট লাইটের স্বচ্ছ আলোয় জ্বলজ্বল করা রমনীটিকে দেখে সে থমকে গেল। স্থির হয়ে গেল দৃষ্টি। ডিপ গ্রীন এবং গোল্ডেন কম্বিনেশন লেহেঙ্গা পড়েছে সায়েরী। সামনের চুলে খানিকটা ডিজাইন করে বেঁধে ঢেউ খেলানো চুলগুলো খোলা ছেড়েছে। লাইট মেকওভার। আই লোক টা কি দারুণ লাগছে ওর ডাগরডোগর চোখজোড়ায়! ফুলোফুলো গালজোড়া’র লালছে আভা লোভ লাগাচ্ছে তাকে। মাতোয়ারা হচ্ছে বাম গালের আবছা ঝাপসা টোল পড়া হাসিতে। আর ঠোঁট.. আবারও সেই ডার্ক ওয়াইন লিপস্টিক! এই মেয়ে কি তার জান নেওয়ার পরিকল্পনা এটেঁছে নাকি? এই যে হৃদস্পন্দনের গতি বেড়েছে। অস্বাভাবিক ভাবে লাফাচ্ছে অসভ্য হৃদযন্ত্র-টা৷ উদ্যত হয়েছে সেই চিনচিনে মিষ্টি, তীক্ষ্ণ ব্যথার। সাফওয়ান হাত চেপে ধরে সেথায়। তার অস্বাভাবিক হৃদযন্ত্রের ধুকপুকানি আরও বেড়ে গেল সায়েরীর পরবর্তী পদক্ষেপে। মুখে আবেদন ময়ী ভাব লেপ্টে তোহা এবং সায়েরী কোমর দুলিয়ে গানের তালে পজিশন নিল। উৎসুক হয়ে তাকিয়ে থাকা সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়ে একই অঙ্গভঙ্গি, বাচনভঙ্গি নিয়ে গানের তালে তালে গেয়ে উঠলো,

Gopiyon sang ghoome Kanhaiya
Raas rachaiya raha na jaaye re
Ab saanwra na bhaaye re….
এটুকুতেই তাদের দুজনের সঙ্গে যোগ হলো আরও চারজন মেয়ে। দুজন তোহাকে ঘিরে গেয়ে উঠলো,
Radha on the dance floor
Radha likes to party
Radha likes to move that sexy Radha body
তারা তিনজন সরে যাওয়া মাত্র এবার অন্য দুই মেয়ে সায়েরীকে ঘিরে গেয়ে উঠলো,
Radha on the dance floor
Radha likes to party
Radha likes to move that sexy Radha body
এবারে সম্মুখে দেখা গেল তোহাকে। সে গানের তালে তালে গেয়ে নাচল,

Panghat pe aake saiyyan
Marode baiyaan
And everybody blames it on Radha
পরবর্তীতে এগিয়ে আসল সায়েরী,
Chhede hai humka daiyaan
Bairi Kanhaiya
And everybody blames it on Radha
আয়নের দিকে তাকিয়ে তোহা মুখ বেঁকিয়ে গেয়ে উঠলো,
Hoga woh lakhon dil ka chor
Humka toh laage bore
Hua hai aaise bawla joh kehta jaaye
এই পর্যায়ে তোহার সঙ্গে আয়ান এবং সায়েরীর সঙ্গে তাল মিলাল নুহাশ।
O Radha teri chunri
O Radha tera challa
O Radha teri natkhat nazariya
O Radha tera jhumka
O Radha tera thumka
O peeche peeche saari nagariya

তাদের প্রতিটি মুভভেন্ট দেখে মুহুর্তেউ রমরমা হয়ে উঠলো পরিবেশ। তোহা আয়ানের মাঝে তখনো মনমালিন্য চলছে। আয়ানের কাছাকাছি হতে তোহা সরে যেতে চাওয়া মাত্র আয়ান হাত ছেড়ে দিল তার। আয়ানের দুই পাশে তখন চারজন রমনী দাঁড়িয়ে। তাদের দিকে ইশারা করে আয়ান তোহাকে উদ্দেশ্য করে গেয়ে উঠলো,
Hey Radha Radha kahe itna guroor bhala
Chhodo bhi nakhre yeh kaisi ada
Tune kya socha ek tu hi mashoor yahan
Lakhon hai gopiyan bhi humpe fida
ফের তোহাকে কাছে টেনে হাতের ইশারায় গোল গোল ঘুরিয়ে গেয়ে উঠলো,
Ho saari hi duniya yeh maani hai
Shuru humse teri kahani hai
তোহা ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল তাকে। ভেংচি কেটে গানের তালে তাল মিলাল,
O rehne de re Kanha
Bhoolega tu sataana
Joh giroongi main banke bijuriaaaaaaa

ঠিক সেই মুহুর্তে সাদিফ-নাজরাত কেও টেনে নিয়ে আসলো দুজন মিলে। আয়ান-তোহা, সায়েরী-নুহাশ, সাদিফ-নাজরাত সহ পেছনে আরও দুই জোড়া জুটি মিলে একত্রে স্টেপ নিল,
O Radha teri chunri
O Radha tera challa
O Radha teri natkhat nazariya
O Radha tera jhumka
O Radha tera thumka
O peeche peeche saari nagariyaaaa!!!
তাদের সকলের নাচ দেখে সকলে উচ্চ স্বরে হইচই জুড়ে দিল। করতালিতে মুখরিত হলো চারিদিক। কনে পক্ষের এমন তাক লাগানো পারফরম্যান্স দেখে সত্যিই মুখে তালা লেগে গেল সাহিল,ইভানের। সায়েরী তোহা তাদের সামনে দিয়ে চুল উড়িয়ে চলে আসলো।

বর পক্ষের বাংলো বাড়িটা প্রায় ফাঁকা পড়ে আছে। সকলেই বাড়ির বাহিরে। সায়েরী দুই হাত ভর্তি শুকিয়ে আসা মেহেন্দি নিয়ে সম্পূর্ণ বাড়ি জুড়ে ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে গেল ছাদে। বাগানের কৃত্রিম আলোর প্রতিফলন এসে পড়েছে ছাদে। যার ফলে বেশ অনেকটা আলোকিত হয়ে আছে জায়গাটা। ছাদে পা রাখা মাত্র সম্মুখে একটি সফেদ অবয়ব দেখে এক মুহুর্তের জন্য ভয় পেয়ে গেল সায়েরী। তার পায়েলের শব্দে পেছন ফিরে তাকালো সাফওয়ান। সায়েরী স্বস্তি পেল তাকে দেখে। ব্যস্ত পায়ে কদম বাড়িয়ে আশেপাশে তাকিয়ে শুধালো,

‘ সাফাকে কোথাও দেখেছেন? বাড়িতে ডেকে কোথায় গায়েব হয়ে গেল মেয়েটা! ‘
‘ উঁহু, দেখিনি। ‘ সাফওয়ানের ক্ষীণ জবাব।
সায়েরী ‘আচ্ছা’ বলেই ফের প্রশ্ন ছুড়ল,
‘ আপনি একা একা এখানে কি করছেন? সবাই তো নিচে। ‘
‘ কিছু না। যাও তুমি। ‘ তার কন্ঠে কেমন এক ক্লান্তি ভাব।
সায়েরীর কপালে ভাঁজ পড়ল। কিন্তু বিশেষ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সে নিজের মেহেন্দি রাঙানো দুই হাত মেলে ধরলো সাফওয়ানের সম্মুখে। বললো,
‘ দেখি তো ঝটপট খুঁজে বের করুন আপনার নাম কোথায় লিখেছি। ‘
সাফওয়ান কপাল কুঁচকে তাকায়। গম্ভীর মুখে বলে,
‘ এসব বাচ্চাদের গেইম আ… ‘
‘ বাচ্চাদের গেইম মানে? বাচ্চারা কি বিয়ে করে? নাকি প্রেম করে যে এসব গেইম ওরা খেলবে? এত অযুহাত না দেখিয়ে চুপচাপ নাম বের করুন। ‘

সায়েরীর তেজী কন্ঠ শুনে সাফওয়ান কথা বাড়াল না। নজর দিল হাতের দিকে। বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেও যখন কিছুই বের করতে পারল না তখন সে বিরক্ত মুখে বলে উঠলো,
‘ কিসব ফালতু গেইম! লিখার হলে সরাসরি, বড় করে লিখবে তা না। ‘
সায়েরী ফুঁসে উঠলো। কোমরে হাত রেখে বলে উঠলো,
‘ আমি জানতাম। জানতাম আপনি এসব কিছুতে কোনো ইন্টারেস্ট দেখাবেন না। আপনাকে আমার হাড়ে হাড়ে চেনা আছে। ঠিক এজন্য, এজন্য আমি মেহেন্দি তে আপনার নামই লিখিনি। ‘
সাফওয়ান বেক্কল বনে গেল এহেন যুক্তি শুনে। বুঝে পেল না হাসবে না রাগ দেখাবে। সায়েরী গাল ফুলিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়েও হঠাৎ থেমে গেল। বড় বড় করে শ্বাস টেনে কিছু একটা শুঁকল। অতঃপর লক্ষ্য করলো সাফওয়ানের এক হাত পিঠের পেছনে রাখা। যেখান থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। সায়েরীর চট করে বুঝে গেল এর কারণ কি। এবং বুঝতে পেরে সে হতবিহ্বল কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ল,

‘ আপ..আপনি সিগারেট খাচ্ছেন? ‘
সাফওয়ান হতাশ! এত চেয়েও লুকাতে পারল না। অগত্যা জ্বলন্ত সিগারেট ধরে রাখা হাতখানা বের করলো সে। একটা টানও দেওয়া হলো না তার আগেই হাজির হয়ে গেছে মেয়েটা। সায়েরী ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরলো। মিনমিন কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ সিগারেট খাওয়া কালো ঠোঁট আমার একদম পছন্দ না। ‘
সাফওয়ানের কানে ঝংকার তুলল এই বাক্যটুকু। সে বিস্মিত দৃষ্টি তুলে তাকালো৷ সিগারেট পিসে ফেলল পায়ের তলায়। এগিয়ে গেল সায়েরীর কাছাকাছি। সায়েরী কয়েক কদম পিছিয়ে গেলেও চিলেকোঠার দরজায় পিঠ ঠেকে যাওয়া মাত্র থেমে গেল। সাফওয়ান একেবারে তার দেহ ছুঁই ছুঁই হয়ে দাঁড়িয়ে একহাত রাখল সায়েরীর মাথার পেছনে দরজায়। মাথা নামিয়ে মুখটা সায়েরীর মুখের কাছাকাছি নিয়ে চোখে মুখে দুষ্টুমি ভাব ফুটিয়ে বলে উঠলো

‘ আমার কালো ঠোঁট দিয়ে তোমার কি কাজ? ‘
সায়েরীর কান গরম হয়ে উঠলো এই প্রতিউত্তর শুনে। এলোমেলো হলো দৃষ্টি। সে সরতে উদ্যত হলো। কিন্তু সাফওয়ানের পোক্ত এক হাত তার কোমর চেপে বাধ্য করলো দাঁড়িয়ে থাকতে। পুরুষোত্তম, দানবীয় হাতটি কেবল কোমর ছুঁয়ে ছেড়ে দিল ন। বরং ছুঁয়ে রাখল বাঁকানো, সরু কোমরটির খাঁজ। তাও বেশ অধিকার নিয়ে। তপ্ত শ্বাস ফেললো নাজুক প্রেয়সীর লাজুক মুখশ্রী-তে। আবছা আলোয় সাফওয়ানের এতটা কাছাকাছি উপস্থিতিতে সায়েরীর তনু মনে কম্পনের সৃষ্টি করেছে। সে ফাঁকা ঢোক গিলল। কম্পিত কণ্ঠে বলতে চাইল,
‘ স..সাফওয়ান ভা… ‘
ঘাড়ের কাছটাতে সাফওয়ানের উত্তপ্ত শ্বাস আঁচড়ে পড়ামাত্র কন্ঠ থেমে গেল তার। শুনা গেল সাফওয়ানের মোহনীয়, আবছা কন্ঠ,

‘ ইট’স সাফওয়ান, অনলি সাফওয়ান ফর ইউ জান৷ ‘
সায়েরীর তনু কাঁপছে ঠকঠক। গলা শুকিয়ে চৌচির। বক্ষস্পন্দনের ধুকপুক ধুকপুক ধ্বনি কানে বাজছে যেনো। দন্ডায়মান ছোট দেহশ্রীর সবকটা লোমকূপ। সাফওয়ানের এমন মাদক কন্ঠ হতে জান,প্রাণ ডাক শুনলে তার নিজের জান যায় যায় অবস্থা হয়। আজও ব্যতিক্রম হলো না। অসম্ভব রকমের ধুকপুক লাগছে বুকে৷ সে কম্পিত হাতে সাফওয়ানের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইল। আটকে আসা কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ অ..আমার কথাটা শুনোন.. ‘
সঙ্গে সঙ্গে সাফওয়ানের হাতের জোর বৃদ্ধি পেল। শক্ত করে চেপে ধরেছে কোমর। কোমল দেহখানা লেপ্টে নিয়েছে নিজের প্রসস্থ বুকের সঙ্গে৷ তার শীতল অধর ডুবে গেল জেসমিন ফুলের সভাস ভেসে আসা মেয়েলী গ্রীবাদেশে। সেথায় অধর ছুঁয়ে রেখে সে গভীর স্বরে প্রতিউত্তর করলো,
‘ উমম!! আ’ম লিসেনিং..সুইটহার্ট! ‘

গ্রীবাদেশের এই টুকরো টুকরো কোমল স্পর্শে সায়েরী কথা হারিয়ে ফেলল। আবেশে বুজে নিল আঁখিদ্বয়। সাফওয়ান তার নাক ঘষল গলা হতে ঘাড় অবধি। এরপর আচানক দন্ত স্পর্শের কঠিন ছাপ বসিয়ে দিল প্রেয়সীর ঘাড়ের লাল,কালো তিল দুটোর চতুর্দিকে। সঙ্গে সঙ্গে অস্পষ্ট স্বরে আর্তনাদ করে উঠল মেয়েটা। খামচে ধরল সাফওয়ানের বাহুদ্বয়। তার ব্যথাটুকু উপলব্ধি করতে পেরে এবারে কোমল হলো সাফওয়ান। দাঁত বসানো স্থানটাতে আলতো আদর দিয়ে তাতে কপাল ঠেকাল সে। শ্বাস নিল একাধিক। অতঃপর দুইহাতে সায়েরীর কোমর জড়িয়ে জমিন হতে কয়েক ইঞ্চি উপরে তুলে নিল তাকে। বিনাবাক্যে প্রেয়সীর কণ্ঠনালী তে মুখ ডুবিয়ে অস্পষ্ট স্বরে আওড়াল,

‘ মেরে ফেলতে চাইছো আমাকে? সাবধান করেছিলাম না? বলেছিলাম এভাবে সেজেগুজে সামনে আসবে না৷ এই লাল রঙে ঠোঁট রাঙাবে না। ‘
অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে নাজুক রমনী নিস্তেজ হয়ে এলো। অবিলম্বে বুজে নিলো আঁখি যুগল। দুর্বল হাত দুটো খামচে ধরে আছে সাফওয়ানের বাহু, ঘাড়ের চুল। সেই অবস্থাতেই সে কৈফিয়ত দিতে চাইল,
‘ অ..আমি নিষেধ করেছিলাম কিন্তু ওরা বল… ‘
‘ চুপ!! এই কন্ঠে কথা বলবে না। ‘
অধৈর্য, অস্থির শুনাল সাফওয়ানের কন্ঠস্বর। সে মাথা তুলে চাইল। তিরতির কাঁপছে সায়েরীর বন্ধ চোখের পাপড়ি, অধর-সহ থুতনি। সাফওয়ানের দেহের রক্তকণিকা যেন আরও তুমুল বেগে টগবগিয়ে উঠল এই দৃশ্যে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে হরতাল লাগিয়ে দিল ভেতরের বেসামাল অনুভূতি টুকু প্রকাশ করার যুদ্ধে। মুখের উপর সাফওয়ানের উত্তপ্ত শ্বাস প্রশ্বাস উপলব্ধি করতে পেরে সায়েরী চোখ মেলে তাকাল৷ ঠিক সেই মুহুর্তে আচমকা অন্ধকারে তলিয়ে গেল সম্পূর্ণ ছাদ। খুব সম্ভবত কোনো সমস্যার কারণে বড় স্পট লাইটগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফেইরি লাইটের ক্ষীণ আলো ছাদ আলোকিত করতে অক্ষম। সায়েরী ভয় পেয়ে গেল এই অন্ধকার দেখে। নিজ থেকেই সে তড়িঘড়ি করে গলা জড়িয়ে ধরল সাফওয়ানের। কন্ঠে ভীতিকর ছাপ ফেলে ডাকতে উদ্যত হলো,

‘ সাফওয়… ‘
কিন্তু পূর্বেই তার কোমল ঘাড়ে চেপে বসল একটি শীতল হাত। টেনে নিল তাকে নিজের দিকে। তার কিঞ্চিৎ ফাঁক হওয়া ওষ্ঠধর পিষ্ট হলো পুরুষালী ওষ্ঠের চাপে। এই অপ্রত্যাশিত, অসংযত স্পর্শে মেয়েটা কেঁপে উঠল দৃশ্যমান রূপে। শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল যেন। শরীরের সবটুকু শক্তি দিতে খামচে ধরল সাফওয়ানের কাঁধ, ঘাড়। একমুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠে সরে যেতে চাওয়া তাকে সাফওয়ান নড়তে দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু বিন্দুমাত্র দুরত্ব কমাইনি। এই অন্ধকার যেন সাফওয়ানের বেসামাল হৃদয়টাকে আশকারা দিয়েছে। যেই আশকারায় সে ভেসে গিয়েছে বিনা বাঁধায়। এতগুলো মাসের সংযম ভেঙ্গে আজ সে বাধাহীন ছুটছে। সায়েরী অনুভব করে তার প্রতিটি স্পর্শের কোমলতা৷ ফলস্বরূপ তার আঁখি বুজে আসে৷ আবেশে অশ্রু গড়ায় এক ফোঁটা। এই অশ্রু টুকু কিসের তা সে নিজেও জানে না।

তার তনু মন ভেসে চলেছে অন্য এক দুনিয়ায়। যার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব একমাত্র সাফওয়ানের। মসৃণ কোমরে পোক্ত হাতের শীতল চাপ, ওষ্ঠপুটের কোমল স্পর্শে সায়েরী’র দেহ ভেঙ্গে আসতে চায়। এতটা আদুরে, এতটা নমনীয় এই স্পর্শ! ঘাড়ে চেপে বসা হাতটার বৃদ্ধ আঙ্গুল ঘনঘন নড়াচড়া করছে তার কন্ঠনালীতে। মাখনের ন্যায় নরম, মেয়েলী অধরে হুটহাট আলতো দাঁত বসিয়ে পরমুহূর্তে আবার গভীর চুম্বনে চুষে নিচ্ছে সবটুকু যন্ত্রণা। এই স্পর্শে সায়েরী শেষ হয়ে গেল, একেবারে শেষ। ঠিক কত সময় পেরিয়ে গেল তাতে কারোরই ধ্যানে নেই। একটা সময় পর আকস্মিক বন্ধ চোখের পাতায় আলোর ঝলকানি এসে লাগল। সেই সঙ্গে লনে উপস্থিত মানুষদের স্বস্তি সূচক আওয়াজ এসে বাজলো কানে। সঙ্গে সঙ্গে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে শব্দ করে দুজনের ওষ্ঠদ্বয় আলাদা করল সাফওয়ান। সায়েরী ধুপ করে নেতিয়ে পড়লো তার বক্ষপটে। যেন সাফওয়ান তার দেহের সবটুকু শক্তি চুষে নিয়েছে। হা মুখ করে অগণিত শ্বাস ফেলছে সে। তার হাল দেখে সাফওয়ান থমকে যায়। বেখেয়ালিতে কোমর ছেড়ে দেওয়া মাত্র মেয়েটা ঢলে পড়তে চাইল। সঙ্গে সঙ্গে সাফওয়ান ফের তাকে আটকে ফেলে নিজ বাহুবন্ধনে । এলোমেলো বেশভূষা, চুল গুছিয়ে দিয়ে দুই হাতে মুখখানা তুলে নিয়ে কম্পিত কণ্ঠে বলে ডেকে উঠে,

‘ সুবহা! ‘ কন্ঠ কাঁপছে তার। ঢিপঢিপ করছে বুক।
সায়েরী ফিরে তাকাচ্ছে না দেখে সে সে জোরপূর্বক মুখ উপরে তুলে। চিন্তিত গলায় জানতে চায়,’ ঠিক আছো? ‘
সায়েরী তখনও মৃদুমন্দ কাঁপছে। শ্বাস ফেলছে অস্বাস্থ্যকর ভাবে। সাফওয়ানের চোখের দিকে তাকাতে পারে না সে। রক্তিম অধর যুগল-ও আকম্পিত তার। সাফওয়ানের হাত ছাড়িয়ে সে মিনমিন কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ অ..আমি ন-নিচে যাব। ‘
বলতে না বলতেই সে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। সাফওয়ান তাকিয়ে রইল ব্যাকুল দৃষ্টিতে। তার দেহ উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। ঘেমে-নেয়ে একাকার অবস্থা। বুক কাঁপছে দুরুদুরু। কি থেকে কি হয়ে গেল! এজন্য, ঠিক এজন্যই সে গত এক ঘন্টা যাবত দূরে দূরে থাকছিল মেয়েটার কাছে থেকে। ছাদে এসেছিল নিকোটিনের ধোঁয়ায় নিজের অস্থিরতা টুকু দূর করার চেষ্টায়। কিন্তু মেয়েটা যেচে এসে… উফফ্‌! আর ভাবা যাচ্ছে না। ক্ষণিক পূর্বের সেই স্বর্গীয় স্বাদ পাওয়ার স্পর্শ টুকু ফের মনে পড়তেই সে অস্থির চিত্তে কটির বোতাম খুলে। এদিকে সেদিক পায়চারি করে নিজেই নিজেকে স্বান্তনার বাণী শুনায়,
‘ কন্ট্রোল, সাফওয়ান! কন্ট্রোল! ‘

আলোকিত সিড়িপথ ধরে ছুটন্ত পায়ে নামছে অষ্টাদশী রমনী। নুপুরের ঝুনঝুন শব্দের সঙ্গে কাচের চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ কর্ণগোচর হচ্ছে স্পষ্ট। তবে সেসবের চেয়েও যেন দ্বিগুণ উচ্চ শব্দে ধ্বনিত হচ্ছে তার হৃদ স্পন্দন। বেজে চলেছে ধুকপুক ধুকপুক নিস্বন। তনু, মন তখনো আকম্পিত তার। অস্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস। মসৃণ ত্বকের প্রতিটি লোমকূপ দন্ডায়মান। কম্পিত পদযুগল সিড়ির শেষ ধাপে এসে থামতেই দ্রুত হাতে নেটের দোপাট্টা-র একাংশ দিয়ে সে ঢেকে ফেলল নিজস্ব ওষ্ঠপুট। না দেখেও অনুমান করা যাচ্ছে, ডার্ক রেড লিপস্টিকের টকটকে লাল স্টেইন লেপ্টে গিয়েছে তার ঠোঁটের চতুর্দিকে। এমতাবস্থায় কারো নজরে আসা মানে ইজ্জতের রফাদফা হওয়া। ভুলক্রমে-ও তা ঘটতে দেওয়া যাবে না। অপ্রস্তুত সে দিকবিদিকশুন্য হয়ে, ফাঁকা মস্তিষ্কে কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইলো কোলাহল বিহীন করিডরে। বুঝে উঠতে পারলো না কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে! এমতাবস্থায় করিডরের নিস্তব্ধতা ভেদ করে সিড়ি পথের পার্শ্ববর্তী বেডরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো খট করে। শব্দ টুকু কর্ণধার হওয়া মাত্র ধ্‌ক করে উঠলো সায়েরীর বক্ষস্থল। নিজেকে লুকানোর প্রচেষ্টায় সে ফের উল্টো পা ফেললো সিড়িপথে। কিন্তু বেডরুম হতে বেরিয়ে আসা মেয়েলী অবয়ব খানা দেখে থমকাল সে। অস্থিরতা, দুঃশ্চিন্তায় ডুবে যাওয়া হৃদয় আশার আলো দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলল। কন্ঠে এক সমুদ্র অসহায়ত্ব ঢেলে ডেকে উঠলো, ‘ সাফা!!! ‘

চকিতে ফিরে তাকালো সাফ্রিন। সায়েরীকে নজরে আসা মাত্র বলতে উদ্যত হলো,
‘ তুই এখানে? সে কখন থেকে তোকে খুঁ…. ‘
দৃষ্টি সীমায় সায়েরীর এলোমেলো বেশভূষা নজরে আসামাত্র সাফ্রিনের কন্ঠ হারিয়ে গেল। ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে সে অবলোকন করলো সায়েরীকে। অগোছালো চুল, কুঁচকানো, এলোমেলো দোপাট্টা। ঢেকে রাখা মুখশ্রীর বড় বড় আঁখি জোড়ায় অস্থিরতা। সাফ্রিন দ্রুত পায়ে কাছ ঘেষল তার। চিন্তিত গলায় শুধালো,
‘ কি হয়েছে তোর? কাপড় চুপড়ের এই হাল কেনো? কোথায় ছিলি এতক্ষণ? ‘
অস্থির চিত্তে একাধিক প্রশ্ন ছুড়ল সাফ্রিন। সায়েরী তখনো মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে। এই পর্যায়ে আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে সে অধৈর্য কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ এত কিছু বলতে পারবো না। তোর রুম কোথায়? রুমে নিয়ে চল আমাকে। ‘
সাফ্রিন ভাবুক চিত্তে কিয়ৎ ক্ষণ পূর্বে বেরিয়ে আসা রুমটার দিকে ইশারা করে প্রতিউত্তর করলো, ‘ এইযে, এটা আমার রুম। ‘

সাফ্রিনের বলতে দেরি। কিন্তু সায়েরীর ব্যস্ত পদচারণ রুমে প্রবেশ করতে দেরি নেই। হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো সে। যখনই দেখল রুমে কারো অস্তিত্ব নেই, সঙ্গে সঙ্গে দেহ হতে এলোমেলো দোপাট্টা খানা ছুড়ে ফেললো বিছানায়। এবং পরমুহূর্তেই ঝড়ের গতিতে ঢুকে গেল ওয়াশরুমে। সায়েরীর পেছন পেছন রুমে প্রবেশ করা সাফ্রিন বেক্কলের মতো দাঁড়িয়ে রইল। বুঝে উঠতে পারলো হলো টা কি! কিন্তু এক পলকের জন্য তার নজরে এসেছিলো সায়েরীর হলদে মুখখানায় ঠোঁটের চতুর্দিকে লেপ্টে থাকা টকটকে লাল রঙ৷ কি ছিল সেটা? লিপস্টিক! কিন্তু এমন বাজে ভাবে ছড়িয়ে গেল কি করে?
প্রশ্নটা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর টুকু ও চেপে বসলো মস্তিষ্কে। মনে পড়লো গত এক ঘন্টা যাবত তার ভাই-ও গায়েব হয়ে আছে কোথাও। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলাতে বিশেষ বেগ পেতে হলো না চতুর মেয়েটাকে। এবং ঘটনা বুঝতে পেরে সে আপন মনেই বিষম খেয়ে গেল। লজ্জাও পেল কিঞ্চিৎ। শত হোক, সে ছোট বোন বলে কথা।

ওয়াশরুমের দরজা খুলে সায়েরী বেরিয়ে আসা মাত্র সাফ্রিন গিয়ে বেডরুমের দরজা লাগিয়ে দিল। তাকিয়ে দেখল সায়েরীকে। ছড়িয়ে যাওয়া লিপস্টিকের দাগ টুকু মুছে এসেছে। ফুলোফুলো গালের অধিকারীনি মেয়েটার পাতলা অধর যুগল অসম্ভব রক্তিম হয়ে আছে। ফুলেও গিয়েছে কিঞ্চিৎ। এলোমেলো চুলগুলো ঢিল ভাবে হাত খোঁপায় আটকানো। জমে আছে কাঁধের একপাশে। বাম ঘাড়ে, কন্ঠনালীতে স্পষ্ট কালসিটে দাগ। লেপ্টে আছে দন্ত স্পর্শের কঠিন ছাপ৷ হলদেটে দেহে চিহ্ন গুলো বেশ ভালো করে ফুটে উঠেছে। স্পষ্ট চোখে লাগছে দূর থেকেও। একসঙ্গে এতকিছু দেখে ভীমড়ি খেয়ে গেল সাফ্রিন। কেশে উঠলো খুকখুক করে। সায়েরীর ঘোর কাটলো এই আওয়াজে। সহসা হাত দিয়ে গলা ঢাকল সে। যা দেখে সাফ্রিন হেসে ফেললো। হেলেদুলে এগিয়ে আসতে আসতে বলে উঠলো,

‘ আপনার এই বেহাল দশার পেছনে কার মহৎ কৃতিত্ব রয়েছে তা কি জানতে পারি? ‘
সায়েরী চোখ ঘুরাল এদিক ওদিক। গাল জোড়ায় আরক্তিম আভা ছেয়ে গেল। প্রতিউত্তর করার ভাষা যেন ফুরিয়েছে সম্পূর্ণ রূপে। তার এহেন প্রতিক্রিয়ায় শব্দ করে হেসে ফেললো সাফ্রিন। সায়েরীকে ঝাপটে ধরে দুষ্টু হেসে বলে উঠলো,
‘ আমি কিন্তু সব বুঝে ফেলেছি সায়ু। লিপস্টিক স্টেইন, লাভ বাইট.. উঁহুম উঁহুম!! ‘
‘ আমার গুরুগম্ভীর ভাইটা যে এত্ত রোমান্টিক তা তো জানতাম না। মাই গড! এতটা ডেস্পারেটলি! না মানে কি হাল করে ছেড়েছে তোর.. ইশ!! ‘
শেষ কথাটা বলতে গিয়ে সায়েরীর গলায় আঙ্গুল ছোঁয়াল সে। রক্তিম হয়ে আছে স্থানটা। খুব সম্ভবত ছিলে গিয়েছে। সাফ্রিনের বেফাঁস কথায় সায়েরী লজ্জায় গুটিয়ে গেল। পরমুহূর্তে আবার মেকি রাগ দেখিয়ে বলে উঠলো,

‘ এতটাও গুরুতর কিছু হয়নি। চুপ থাক তুই। খবরদার যদি কাউকে কিছু বলেছিস তো৷ তোহা..ওই ঠোঁট কাঁটা মেয়েকে তো একেবারেই বলবি না। ‘
সাফ্রিন ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কৌতুকপূর্ণ হাসি হাসে। মাথা নেড়ে জবাব দেয়,
‘ সে নাহয় বললম না। কিন্তু তোর এই অবস্থা দেখে তো একটা বাচ্চাও বুঝে যাবে যে…কিছু-মিছু হয়েছে। ‘
বলার সঙ্গে চোখ টিপ দিল সে। সায়েরী গাল ফুলিয়ে সাফ্রিনের বাহুতে এক চড় মারল। অস্থির চিত্তে শুধালো,
‘ সব তোর ভাইয়ের দোষ। এবার এসব কি করে ঢাকবো আমি? চুল দিয়ে তো কোনোভাবেই সম্ভব না। ‘
সায়েরীর চিন্তিত মুখশ্রী সাফ্রিন হাসি চেপে গেল। ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার হতে নিজের মেকাপ কিট বের করে কনসিলর তুলে নিল হাতে। পুণরায় সায়েরীর কাছে এসে তাকে বিছানায় বসিয়ে বলে উঠলো,
‘ আমার ভাই সিলমোহর লাগিয়ে দিয়েছে, বোন হয়ে আমি তা ঢেকে দেওয়ার দ্বায়িত্ব নিলাম। শোধবোধ! ‘
সাফ্রিনের কৌতুকপূর্ণ কন্ঠ। সায়েরী চুপ করে রইলো আরক্তিম মুখশ্রী নিয়ে। কনসিলরের লিকুইড টুকু ঘাড়ের ক্ষতস্থানে লাগানো মাত্র সায়েরী চোখ খিচে ফেললো। অস্পষ্ট স্বরে আওড়াল, ‘ উঁউহু… জ্বলছে! ‘
বিউটি ব্লেন্ডার দিয়ে লিকুইড টুকু দেহের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে দিতে সাফ্রিন জবাব দিল,

‘ আমার সামনে উঁহ আহ করে কি লাভ? যার সামনে জ্বলছে, পুড়ছে বলার কথা। তার সামনে বললে কি এই হাল হতো? ‘
ফের গাল গরম হয়ে উঠলো সায়েরীর। কানে বেজে উঠলো সাফওয়ানের অস্থির, উত্তেজিত কন্ঠের একটাই বাণী,
‘ চুপ! এই কন্ঠে কথা বলবে না। ‘
পুণরায় কন্ঠ-টা কানে বেজে উঠতেই দেহ শিরশির করে উঠলো তার। সাফ্রিনের কথার রেশ ধরে আপনমনে স্বগোতক্তি করলো, ‘ মুখ খুলতে আর পারলাম কই, যে বাঁধা দিব? ‘

স্টেজের মাঝামাঝি সাজিয়ে রাখা সফেদ সোফায় বসে রয়েছে সাদিফ-নাজরাত। তারা একা নয়৷ দুজনকে ঘিরে রেখেছে বর,কনে উভয় পক্ষের সাত- আটজন রমনী। বর,কনে সহ সকলের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হলো নাজরাতের মেহেন্দি রাঙানো দুই হাত। যা সে মেলে ধরে রেখেছে সাদিফের সম্মুখে। চলছে একটি দুষ্টু, মিষ্টি খেলা। বউয়ের মেহেন্দি রাঙানো দু’হাত হতে নিজের নাম খোঁজার এই খেলায় সাদিফ ফেঁসে আছে আধঘন্টা যাবত। মোটে দুটো নাম খুঁজে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছে তাকে। তন্মধ্যে একত্রে লিখিত “SADIF” নামখানা সে খুঁজতে সফল হয়েছে। এখন চলছে অক্ষর ভাগ করে লিখা নামটুকু খোঁজে নেওয়ার প্রচেষ্টা। এত এত ডিজাইনের মধ্য হতে একটা একটা করে লিখে রাখা অক্ষর খুঁজতে গিয়ে ঘাম ছুটে গেল সাদিফের। কিন্তু বেচারার রেহাই নেই। বউ নামক রমনী নিজেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাক করে রেখেছে।

যার অর্থ “নাম খুঁজে না পেলে বুঝব তুমি আমাকে ভালো-ই বাসো না।” এহেন বেক্কল ধরনের যুক্তি শুনে সাদিফ নিজেই বেক্কল বনে গিয়েছিল। এই নাম খোঁজাখুঁজির সঙ্গে ভালোবাসা-বাসির কি সম্পর্ক? কে বানিয়েছে এই বেহুদা খেলা? তার চেয়েও বড় কথা, হাঁটুর তলায় বুদ্ধি নিয়ে ঘুরা মেয়ে মানুষদেরর মাথায় কে ঢুকিয়ে এসব? স্বামী নামক পুরুষ জাতির উপর এমনিতেই শ’খানেক জুলুম চলে। এদিকে আবার সংসার জীবন শুরু করার আগেই বের করেছে নতুন জুলুম। অর্থাৎ, বিয়ের আগে হোক বা পরে..পুরুষ তোমাকে নির্যাতিত হতেই হবে। ইহা অদৃশ্য ভাবে লিখিত নিয়ম।
অবশেষে দীর্ঘ একঘন্টা পর গিয়ে S A D M A N নামের অক্ষর গুলো খুঁজে পেতে সক্ষম হলো সাদিফ। মুহুর্তেই হই হই করে চিৎকার করে উঠলো মেয়েদের দল। নেচে-কুঁদে নেমে গেল স্টেজ হতে। সাদিফ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। লম্বা শ্বাস ফেলে দেহ এলিয়ে দিল সোফায়। ক্লান্ত গলায় বলে উঠলো,

‘ কি সব বেহুদা, অযৌক্তিক গেইম। কে যে আবিষ্কার করেছে এসব! ‘
কথাটা শুনামাত্র ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল নাজরাত। ছোট ছোট নজরে তাকিয়ে বলে উঠলো,
‘ অযৌক্তিক হতে যাবে কেনো? বউয়ের হাতের মেহেন্দি হতে নিজের নামটাই যদি বের করতে না পারো, তাহলে আর কেমন ভালোবাসো? ‘
‘ আশ্চর্য কথাবার্তা! এখানে ভালোবাসা আসতে যাবে কেন? ‘

‘ অবশ্যই আসবে। প্রথমত আমি মেহেন্দি লাগিয়েছি একমাত্র তোমার জন্য। তুমি দেখবে, একদম গভীর চোখে প্রতিটা কিছুতে নজর দিবে। নজর দেওয়া মাত্র নিজের নামটাও খুঁজে পাবে। যদি খুঁজে না পাও, তাহলে বুঝব তুমি অনিহা করে তাকিয়েছ। মন থেকে, নিজ ইচ্ছায় দেখনি। আর মানুষ অনিহা করে কাদের উপর? যাদের ভালোবাসে না তাদের উপরেই তো। তাহলে লজিক টা কি দাঁড়ালো? ‘
সাদিফ অবাক,হতবাক। বিষ্ময়ে চোয়াল ঝুলে গেল তার। কান ভুঁ ভুঁ করে উঠলো নাজরাতের বিশ্লেষণ শুনে। একেই বলে মেয়ে মানুষ। সব কথা চার লাইন বেশি বোঝা স্বভাব যাদের। ফুঁস করে শ্বাস ফেলে বলতে চাওয়া কথাটুকু গিলে নিল সাদিফ৷ জোরপূর্বক হেসে বলে উঠলো,
‘ ভীষণ সুন্দর লজিক। এত নরমাল সায়েন্স টা আমি বেকুবের মাথাতেই আসেনি। সো ইন্টেলিজেন্ট ইউ আর! ‘
নাজরাত হাসতে চেয়েও বাঁকা চোখে তাকায়। সন্দিহান কন্ঠে বলে,

‘ তুমি কি পিঞ্চ করে একথা বলেছ? ‘
‘ পিঞ্চ করে! তাও বউকে? ইহজগৎ-এ এই সৎ সাহস হয়েছে কোনো বরের? ‘ সাদিফ যেন আৎকে উঠেছে।
নাজরাত মাথা নাড়ল একথা শুনে। দাম্ভিক ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললো,’ তাহলে ঠিক আছে। ‘
সাদিফ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসলো তার অগোচরে। সম্মুখে দৃষ্টি রেখে সোজা হয়ে, নাজরাতের বাহু ঘেঁষে বসলো সে। সকলের দৃষ্টির আড়ালে নিজের পোক্ত হাত দ্বারা চাপ প্রয়োগ করে ছুঁয়ে দিল নাজরাতের কটিদেশ। মেয়েটা শিউরে উঠলো এহেন স্পর্শে। স্থির হয়ে জমে থাকা অবস্থায় মৃদু স্বরে শাসাল, ‘ স..সাদিফ!! ‘
সাদিফ যেন শুনেও শুনল না সেই শাসন। মুখশ্রী অত্যন্ত স্বাভাবিক রেখে, ফিসফিস কন্ঠে নিদারুণ এক দুষ্টু সুর তুলে বলে উঠলো,

‘ এসব ছোট খাটো খেলায় ভালোবাসা প্রমাণ পায় না। প্রমাণ দিব, আগামীকাল রাত্রিতে। কোনো যুক্তি,কোনো অজুহাতের প্রয়োজন পড়বে না। প্রতিটা স্পর্শে অনুভব করতে পারবে, ঠিক কতোটা ভালোবাসি। ‘
অত্যাধিক শীতল, ফিসফিস কন্ঠের এক সতর্কবাণী। যা কর্ণধার হওয়ামাত্র নাজরাতের দেহে শীতলতা বয়ে গেল। কম্পিত হলো তনু,মন। গাল জুডায় ছেয়ে গেল উষ্ণ, রক্তিম আভা। “আগামীকাল রাত্রি” সময়টা যেন তার জীবনের সবচেয়ে দুরূহ সময়ের মধ্যে অন্যতম একটি। যা ভাবতেও বুক ধরফর করে উঠছে তার। ভয়,লজ্জা, যন্ত্রণা এবং সুখ সবকিছুর সংমিশ্রণে এক অনন্য প্রহরীর আগমন ঘটতে চলেছে।

রাত প্রায় দশটা। মেহমানগণ এবং সামাজের সকলে ইতোমধ্যে খেয়ে নিয়েছে। এই শেষ পর্যায়ে বিশেষ ভাবে সাজানো তিনটা তিনটা টেবিল দখল করে বসেছে বর-কনে উভয় পক্ষের সকল কাজিন এবং বন্ধুবান্ধব। তিনটা টেবিল পাশাপাশি লম্বাভাবে সাজানো। দুই দিকে সারি সারি চেয়ারে আসন পেতেছে সকলে। বাদ গেল না সাম্য-সামান্তা এবং মিনহা। তিনজন বাকিদের আগে নেচে-কুঁদে এসে চেয়ার দখল করে নিয়েছে। চেয়ার টানতে গিয়ে সাম্য এবং মিনহা দুজনেই কাকতালীয়ভাবে একই চেয়ারে হাত রাখল। ঘটনা বুঝতে পেরে দুজন চোখাচোখি হওয়া মাত্র সাম্য’র চোখ রাঙানো দেখে বাচ্চা মেয়েটা ভয় পেয়ে গেল। পা পিছিয়ে নিয়ে ঝাপটে ধরলো আবরারের কোমর। আবরার চমকে গেল এই কান্ডে৷ কি হয়েছে জানতে চাওয়া মাত্র মিনহা মিনমিন কন্ঠে শুধালো,

‘ সামা আবার আমার দিকে চোখ লাল করেছে ভাইয়া। ওকে বলো, আমি আর কখনো ওর লুঙ্গি খুলবো না। ‘
আবরার একথার অর্থ বুঝতে পারলো না৷ কিন্তু উপস্থিত বাকিরা হেসে উঠলো উচ্চ শব্দে। সাম্য ফের রেগে গেল। শব্দ করে চেয়ার ঠেলা মেরে মিনহার দিকে আঙ্গুল তুলে শাসাল,
‘ সামা কি হ্যাঁ? আমার নাম সাম্য। সা..ম্য, সুন্দর করে ডাকো। ‘
এই গর্জনে মিনহা আরও চেপে গেল আবরারের সঙ্গে। তার অবস্থা পেরে আবরার একহাতে জড়িয়ে ধরল তাকে। সাফওয়ান, রূপম দুজন এগিয়ে ঠিক সেই মুহুর্তে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে রূপম এক চাটি মারল সাম্য’র মাথায়। বুঝিয়ে শুনিয়ে বসালো নিজের পাশে। অন্যদিকে মিনহা বসেছে বড় ভাইয়ের পাশ ঘেঁষে, ঠিক সাম্য’র বিপরীতে। সাফওয়ান বসতে নিয়েও আশেপাশে নজর দিল। কোথাও দেখা নেই প্রিয় মুখশ্রীটির। গেল কোথায় মেয়েটা? গত দুই ঘন্টা যাবত খুঁজেও দেখা মিলছে না। সে কি রেগে? না জড়তায় ভুগছে? এতগুলো মাস অতিক্রম হওয়া স্বত্তেও কি জড়তা কাটাতে সক্ষম হয়নি সাফওয়ান? এমন দূর দূর থাকার হলে আগ বাড়িয়ে চুমু চেয়েছিল কেন সেদিন? মেয়েটা কি জানে নেশায় বুঁদ হয়ে ঠিক কি কি কান্ড ঘটিয়েছিল সে? নিজে উস্কে দিয়ে এখন এক চুমুতেই গায়েব বনে গিয়েছে। এটা কি ঠিক?

মনে দীর্ঘশ্বাস চেপে বসে পড়লো সে। পার্শ্ববর্তী চেয়ারে বসা সাফ্রিনের কাছে সায়েরীর ব্যাপারে জানতে চাইতে উদ্যত হয়েছে, এমন মুহুর্তে সম্মুখ হতে ভেসে আসল সাহিলের কন্ঠস্বর,
‘ সায়েরী কোথায়? অনেক ক্ষণ হলো দেখছি না। খাবে না নাকি? ‘
অতিশয় স্বাভাবিক এক প্রশ্ন৷ কিন্তু অস্বাভাবিক ঠেকল সাফওয়ানের কাছে। সরল ভ্রুঁ জোড়া কুঁচকে গেল তার। অন্য এক পুরুষের নিকট হতে সায়েরীকে নিয়ে এই সামান্যতম কৌতুহল টুকু ও মেনে নিতে পারলো না তার দাম্ভিক, পজেসিভ সত্তা। মাত্র সেকেন্ড কয়েক পূর্বে যে হৃদয় প্রেয়সীর অনুপস্থিতিতে বিচলিত হয়েছিল, মুহুর্তেই তা খুশি হয়ে গেল এই অনুপস্থিতিতে। ভাবখানা এমন যে মেয়েটা এখানে না এসে ভালো করেছে। দরকার নেই বন্ধুমহলের বাহিরে গিয়ে অন্য কোনো ছেলের সঙ্গে আড্ডা জামানোর,খুশগল্প করার।

মেয়েটা অতিমাত্রায় মিশুক। নিজের সরলতায়, চঞ্চলতায় সবদিক মাতিয়ে রাখার এক অদৃশ্য শক্তি রয়েছে তার। যে চঞ্চলতায় সকলে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য। ঠিক যেমন জড়িয়ে গেল সাফওয়ানের মতো একরোখা, স্বল্পভাষী ছেলেটা। যেখানে তার মতো কঠোর হৃদয়ের ছেলেটা গলে গিয়েছে, সেখানে অন্য কোনো ছেলে বিগলিত হবে না তা ভাবাও বোকামি।

খাবার পরিবেশন করে রাখা প্লেট টা সম্মুখে রেখে চুপচাপ বসে আছে নাজরাত। তার দুহাতের মেহেন্দি এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। কিন্তু দ্বিধায় পড়ে কাউকে কিছু বলতেও পারছে না সে। সকলে ইতোমধ্যে খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। নাজরাত যখন দুই আঙ্গুলের সাহায্যে চামচ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক সেই মুহুর্তে তার সম্মুখ হতে প্লেট টা টেনে নিল সাদিফ। নাজরাতের দিক ঘুরে বসে চামচে খাবার তুলে তা ধরলো নাজরাতের মুখের কাছে। মৃদু কন্ঠে শুধালো, ‘ নাও, হা করো। ‘

অপ্রত্যাশিত এই কান্ডে নাজরাত হতবিহ্বল। বড় বড় চোখ করে একনজর সাদিফের দিকে তাকালো। স্পষ্ট দৃষ্টিতে শাসাচ্ছে যেন। সম্মুখে বড় ভাই ইফাজ এবং ভাবি নিশি বসে আছে। এছাড়াও সাফওয়ান, রূপম, সাহিল,ইভান সকলে নাজরাতের বয়সে বড়। তাদের সামনে এ কোন কান্ড ঘটাচ্ছে সাদিফ! এই ছেলের কি লজ্জা শরম নেই নাকি? নাজরাতের মনোভাব যেন বুঝে ফেলেছে ইফাজ৷ সে হেসে উঠে সাদিফের মতো করেই নিশির মুখে খাবার তুলে দিয়ে বলে উঠলো,
‘ খেয়ে নাও, নাজরাত। এত লজ্জা পেতে হবে না। আমরা দেখতে পাচ্ছি তোমার হাতের মেহেন্দি শুকায়নি এখনো। ‘
নাজরাত ফের লজ্জা পেয়ে গেল। দেখল, নিশির হাতেও মেহেন্দি লাগানো। ইফাজ যত্ন করে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে তাকে। নিশির কোলে বসা ছোট্ট নাহিয়ান বাবা-মায়ের এই দৃশ্যটুকু দেখে খিলখিল করে হাসল। হাত তালি দিয়ে প্রকাশ করলো সরল মনের উচ্ছ্বাস টুকু।

বাংলো বাড়ির পেছন দিকে পুকুর ঘাটের দিকটা আলোকিত। মহিলাদের আসন বসেছে স্থানে স্থানে। বিশেষত মহিলাদের জন্যই খাবারের আয়োজন করা হয়েছে সেদিকের খোলা যায়গায়। খাওয়ার পর্ব শেষ করে খানিকটা দূরে খোশগল্প জমিয়েছে দুই পক্ষের ভদ্র মহিলা গণ। উপস্থিত খান বংশের তিন কর্ত্রী, জাহুরা খান, নাজরাতের মা,চাচি এবং সায়েরীর মা,বড় মা উভয়ই। সকলে যখন কথায় মশগুল, ঠিক সেই সময় আগমন ঘটলো সায়েরীর। এক হাতে খাবারের প্লেট, অন্য হাত দিয়ে আলতো ভাবে লেহেঙ্গার একাংশ সামলাচ্ছে। মেহরিন বেগমের কাছাকাছি এসে সে প্লেটখানা বাড়িয়ে দিল। স্পষ্ট কন্ঠে খাইয়ে দেওয়ার আবদার জানিয়ে পাশেই চেয়ার টেনে বসল। শুকিয়ে যাওয়া মেহেন্দি গুলো এখনো উঠানো হয়নি। রাতভর রেখে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এতে করে গাঢ় রঙ হবে কি-না তাই।

সায়েরী খাওয়ার মাঝে নিজেও শামিল হয়ে গেল বড়দের আলাপে। এক কথা দু’কথায় তার অনবিজ্ঞ মস্তিষ্কের, সরল কথা শুনে তাহুরা খান সহ তার দুই জা হেসে কুল পেলেন না। তবে গম্ভীর দেখাল জাহুরা বেগম কে। বৃদ্ধা নিজের মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে সায়েরীর হাস্যজ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। মেয়েটার এই অতিমাত্রায় চঞ্চলতা বিশেষ পছন্দ হলো তা উনার। মেয়ে মানুষ এত বেশি উড়নচণ্ডী হলে আদোতে মানায়? সিলেট আসার পর থেকেই মেয়েটাকে লক্ষ্য করছেন তিনি। অতিশয় স্বাভাবিক কিছুতেও গন্ডগোল পাকিয়ে বসে মেয়েটা। এই যেমন আজ সকালেও ডালা নিয়ে বর-কনের কাছে যেতে উদ্যত হওয়া মেয়েটা অতিরিক্ত লাফালাফির দরুন জাহুরা খান’র সঙ্গে কি বাজেভাবে ধাক্কা খেয়েছিল! জাহুরা খান বিশেষ ব্যথা পেলেন না ঠিক। কিন্তু উনার হাতে থাকা যত্ন করে সাজানো পানের থালা টা উল্টে পড়েছিল জমিনে। সে কি এক অসহ্যকর ঘটনা ছিল তা!

পুনরায় তা মনে পড়ামাত্র বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে গেল উনার। ঠিক সেই মুহুর্তে দেখা মিললো বউ সাজে নাজরাত’কে। সঙ্গে সঙ্গে জাহুরা খান’র মুখের বিরক্ত ভাব বিলীন হয়ে গেল। হাসি হাসি মুখে তিনি নাজরাতকে ডেকে নিলেন নিজের কাছে। পাশে বসিয়ে জানতে চাইলেন খেয়েছে কি-না, শরীর ক্লান্ত কিনা। নাজরাত হাসিমুখে, শান্তভাবে জবাব দিল একে একে। তার শান্তশিষ্ট স্বভাব দেখে জাহুরা খান মুগ্ধ হন। বাঁকা চোখে তাকিয়ে দেখেন সায়েরীকে। ভাবেন, একই বংশের দুটো মেয়ে৷ অথচ কত তফাৎ দুজনের মধ্যে। বড় জনের সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাব পেয়েছে এই সায়েরী নামক রমনী। জাহুরা খান’র ধারণা, এই মেয়েটার মাঝে নূন্যতম সভ্যতা, ভদ্রতা নেই। মেয়ে মানুষ এত বেশি আহ্লাদী, এমন ননির পুতুল হলে চলে না। মেয়ে হতে হবে ঢেউ বিহীন নদীর মতো শান্ত। সব পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে, মুখ বুঝে সহ্য করার মতো।

রাত বাজে বারোটা৷ অথচ বিয়ে বাড়ির কোলাহল এখনো পূর্বের মতোই। গান বাজনা থামেনি। উচ্চ শব্দের গানের তালে তালে দুই পক্ষের মেয়ে, ছেলেরা অনুষ্ঠান মাতিয়ে রেখেছে। সেই স্থান হতে বাংলোতে ফিরে এসে নিজ রুমের দিকে অগ্রসর হলো সাফওয়ান। হাট করে খোলা দরজা পেরিয়ে রুমে প্রবেশ করামাত্র দেখা মিললো তার মা তাহুরা খান’কে। কাবার্ড হতে কিছু একটা বের করছেন তিনি। সাফওয়ান একপলক তাকিয়ে ড্রেসিং টেবিলের দিকে কদম বাড়িয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,

‘ কি খুঁজছ, আম্মু? ‘
কন্ঠটা শোনামাত্র ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন তাহুরা খান। নিজ কাজ অব্যাহত রেখে জবাব দিলেন,
‘ মেহমান দের জন্য যে চাদর গুলো তুলে রেখেছিলাম, সেগুলো বের করছি। ‘
সাফওয়ান প্রতিউত্তর করলো না এবারে। কিন্তু লক্ষ্য করলো মায়ের হাস্যজ্বল মুখশ্রী। চেহারার হাসি হাসি ভাব স্পষ্ট লক্ষ্যণীয় উনার। যেন কিছু মনে করে নিজে নিজেই হাসছেন। সচরাচর এমনটা দেখা যায় না বলে সাফওয়ানের কৌতূহল হলো। সে সন্দিহান কন্ঠে শুধালো,
‘ নিজে নিজেই হাসছ কেন? কি ব্যাপার? ‘
একথা শুনামাত্র তাহুরা খান খানিক শব্দ করে হেসে ফেললেন। কয়েকটা চাদর বের করে সোফায় রেখে মাথা নেড়ে জবাব দিলেন,

‘ সায়েরীর কথাগুলো ভেবে হাসছি। মেয়েটা এখনো যে এত চঞ্চল রয়ে গেছে আমি জানতামই না। ‘
সাফওয়ান থমকাল৷ এই জবাব টুকু ভীষণ অপ্রত্যাশিত ছিল তার জন্য৷ সে স্থির দাঁড়িয়ে ফের প্রশ্ন ছুড়ল,
‘ কে? কার কথা বললে এখন?’
‘ আবরারের বোন সায়েরী..ওর কথায় বলছি। এতক্ষণ নিচে বসে আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিল। এতো চঞ্চল, আর এতো মিশুক মেয়েটা! বোকা বোকা কথাগুলো মনে পড়লে এখনো হাসি পাচ্ছে৷ ‘
সহজ কন্ঠের সাবলীল স্বীকারোক্তি। চেহারাতে তখনো হাসি হাসি ভাব লক্ষণীয় উনার৷ সাফওয়ান সেকেন্ড কয়েক গভীর চোখে অবলোকন করলো মায়ের এই হাসিটুকু। যখনই মস্তিষ্ক ধারণ করতে পারলো যে প্রিয় মানুষটার মুখশ্রীর এই হাসির কারণ তার ছোট্ট প্রেয়সী। ঠিক তখনই বক্ষ জুড়ে এক ধমকা, শীতল অনুভূতি বয়ে গেল তার৷ অধর কোণে ফুটল এক টুকরো প্রশান্তির, প্রাপ্তির হাসি। গর্বে বুক ফুলে উঠলো যেন। তাহুরা খান’র ডাকে হুশ ফিরল তার৷ কাবার্ডের উপর তাক হতে অবশিষ্ট চাদরগুলো নামিয়ে দেওয়ার নির্দেশ জানাচ্ছেন তিনি। সাফওয়ান বিনা বাক্যে নামিয়ে দিল সেসব। মনের ভেতর খুটখুট করতে থাকা প্রশ্ন টুকু বের হয়ে আসলো বিনা বাঁধায়। দ্বিধান্বিত কন্ঠে শুধালো,

‘ তোমার ভালো লেগেছে তাকে? ‘
একত্রিত চাদর সব গুনতে থাকা তাহুরা খান বিশেষ কিছু ভাবলেন না। সরল মনে প্রতিউত্তর
করলেন,
‘ সায়েরীকে তো ছোট বেলা থেকেই পছন্দ আমার৷ এখন কি মিষ্টি দেখতে হয়েছে! আর কতটা মিশুক স্বভাব ওর! এমন মেয়েকে পছন্দ না করে থাকা যায়? ‘
সাফওয়ান কান খাঁড়া হয়ে অপেক্ষারত ছিল মন মতো জবাব শোনার। এবং এই জবাব টুকু শুনে সে যেন হাওয়ায় ভেসে উঠলো। কি মধুর শোনাল মায়ের কথাগুলো! ওষ্ঠপুটের হাসিটুকু বিস্তৃত হলো তার। আপনমনে বিড়বিড় করতে করতে আচমকা মুখ ফসকে বলে উঠলো,

‘ এত পছন্দ হয়েছে যখন, তবে তোমার ছেলের জন্য রেখে দিলেই পারো। ‘
‘ হুমম..ঠিক আছে। ‘ অবচেতনে সম্মতি জানিয়ে বসলেন তাহুরা খান। কিন্তু পরমুহূর্তেই ছেলের বলা কথাটুকু ফের খেয়াল হতেই তিনি চমকে উঠে পাশ ফিরে তাকালেন। হতবিহ্বল কন্ঠে শুধালেন,
‘ এ্যাঁ? কি? কি বলেছ তুমি এখন? ‘
সাফওয়ান কেশে উঠলো অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে। সে নিজেও বুঝতে পারেনি আচমকা এমন কিছু যে বেরিয়ে যাবে মুখ ফসকে। জোরপূর্বক হেসে সে চাদর সব তাহুরা খান’র হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,

‘ ক..কিছু না। কিছুই বলিনি, আম্মু। তুমি যাও..দেরি হচ্ছে না তোমার! যাও…যাও.. ‘
একপ্রকার সে দরজার দিকে ঠেলে দিল তাহুরা খান’কে। ভদ্রমহিলা ফ্যালফ্যাল নজরে নিজের ছেলেকে অবলোকন করছেন তখনো। এই দৃষ্টির কবলে পড়ে জীবনে প্রথম বারের মতো অতিমাত্রায় অপ্রস্তুত হয়ে গেল সাফওয়ানকে। না চাইতেও সে মায়ের মুখখানা ধরে ফিরিয়ে দিল দরজার দিকে। থমথমে গলায় বলে উঠলো,
‘ মুখ ফসকে মনের কথা বেরিয়ে গিয়েছে, আম্মু। এখানে এভাবে তাকানোর কি আছে? যাও তো তাড়াতাড়ি.. তোমার মেহমান রা অপেক্ষা করছে। ‘

ঠেলেঠুলে মাকে রুম থেকে বের করে দিয়ে দরজা লাগিয়ে তবেই ক্ষান্ত হলো সে৷ শ্বাস ফেললো শব্দ করে৷ নিজের এহেন বোকামি কান্ডে সে নিজেও হতবুদ্ধি। মায়ের সামনে কি বললো এসব! না জানে সহজ,সরল মা তার কি ভাবছে এখন? চিন্তিত মুখে, অস্থির চিত্তে ঘাড় ম্যাসাজ করলো সে। অস্পষ্ট স্বরে আওড়াল,
‘ উফফ্‌ সুবহা… পাগল করে দিবে আমাকে! ‘

দীর্ঘ তিন ঘন্টা যাবত সাফওয়ান ভাইয়ের কাছ থেকে দূর দূর থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে সায়েরী। তীব্র লজ্জায় এখনো সে গুটিয়ে। সম্ভব নয় পুণরায় সাফওয়ানের মুখোমুখি হওয়ার। কিন্তু তার বিচ্চু বান্ধবীদের জন্য সে আর স্থির থাকতে পারলো না। তোহা তাকে জোরপূর্বক টেনে নিয়ে এসেছে স্টেজের কাছটাতে। উপস্থিত কেবল যুবক-যুবতী এবং বাচ্চাদের দল। এই গান বাজনা এবং হইহট্টগোল ছেড়ে বহু আগেই চলে গিয়েছেন মুরুব্বি গণ। ডান্স ফ্লোর এখন সম্পূর্ণ খালি। ছেলে পক্ষ হতে এক বিশেষ নাচের আয়োজন করা হয়েছে। ঠিক নাচ না বলে খেলা বলা চলে। যেখানে জুটি মিলিয়ে দুজন করে একাধিক জুটি অংশগ্রহণ করবে। তবে তা নিজস্ব পার্টনার হওয়া চলবে না৷ খেলার মূল লক্ষ্য হলো বর-কনে৷ অর্থাৎ প্রথম বারে আলাদা ভাবে বর-কনে উভয়ই অন্য এক পার্টনার সঙ্গে করে আরম্ভ করবে খেলা। প্রতি দুই মিনিটের মাথায় পরিবর্তন করা হবে গান। সঙ্গে সঙ্গে ছেলে, মেয়ে উভয়ই ঘুরে যাবে। পরিবর্তিত হবে পার্টনার। যার সম্মুখে যে আসবে সে-ই হবে নতুন জুটি। এভাবে ঠিক ততক্ষণ নাচ অব্যাহত থাকবে, যতক্ষণ না বর-কনে একে অপরের সঙ্গে নিজের জুটি মিলিয়ে নিতে না পারে।

খেলার নিয়ম শুনে সকলে বেশ পুলকিত। ইন্টারেস্টিং গেইম! বেশ আমেজ নিয়েই খেলা যাবে। সায়েরী নিজেও বেশ উচ্ছ্বসিত। আশেপাশে সাফওয়ানের দেখা নেই বলে অনেকটা স্বস্তি নিয়ে সে খেলা আরম্ভ হওয়ার অপেক্ষায় রইল। গান বেজে উঠার সঙ্গে সঙ্গে এলোমেলো জুটি মিলিয়ে মোটে ছয় জোড়া জুটির দেখা মিললো ডান্স ফ্লোরে। তন্মধ্যে অন্যতম হলো সাদিফ-সায়েরী, সাহিল-তোহা, আয়ান-নিলীমা, ইভান-নাজরাত। গানের তালে তালে মৃদুমন্দ দেহ দুলিয়ে নাচে মত্ত হলো সকলে। মিনিট দুই অতিক্রম হতেই বদলে গেল গান। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেদের হাতের ইশারায় ঘুরতে থাকা রমনীগণ সম্পূর্ণ ঘুরে গিয়ে স্থির হলো অন্য আরেক মানবের সম্মুখে। কিন্তু বর-কনে তখনো আলাদা৷ ফের সেই একই নিয়ম।

পরপর দুইবার পার্টনার বদল হওয়ার পর তৃতীয় বারে সাদিফ এবং সাহিল দুই ভাইয়ের পিঠ ঠেকল একে অপরের সঙ্গে। দুজনেই ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে গিয়ে দেখল সাদিফের সঙ্গে সায়েরী এবং সাহিলের সঙ্গে নাজরাত দাঁড়িয়ে। তারা দুজনেই চোখাচোখি হলো। সাহিল নিজের মনোভাব বুঝতে না দিয়ে ইশারায় বুঝালো, ভাইকে হেল্প করবে৷ গান পরিবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাদিফ নিজ হাতের ইশারায় ঘুরিয়ে দিল সায়েরীকে। একই ভঙ্গিতে নাজরাতকেও ঘুরিয়ে দিল সাহিল। পূর্ব হতে প্রস্তুত থাকা সাদিফ মুহুর্তেই নাজরাতের কোমর ছুঁয়ে কাছে টেনে নিল তাকে। অন্যদিকে সাহিল বুক ফুলিয়ে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে। এক্ষুনি মেয়েটা হাতে হাত রাখবে তার। সে হাস্যজ্বল চিত্তে স্থির চাহনি নিয়ে অপেক্ষারত।

কোমল মেয়েলি হাতখানা সবেমাত্র তার পুরুষালি হাত স্পর্শ করতে নিচ্ছিল, এমন মুহুর্তে মেয়েটার হাতের ভাঁজে দেখা মিলল অন্য এক শক্তপোক্ত, পুরুষালি হাতের। যা এক লাহমায় তাকে টেনে নিয়েছে নিজের দিকে। এমন হ্যাঁচকা টানে হকচকিয়ে গেল সায়েরী। তার অপ্রস্তুত বদনখানি আঁচড়ে পড়লো সাফওয়ানের বক্ষপটে। বাদামি চোখজোড়ার গভীর দৃষ্টির কবলে পড়ে রমনীর দেহ,মন শিউরে উঠলো। অন্যদিকে সাহিল শূন্য হাতে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কয়েক সেকেন্ড। এভাবে ছ্যাঁকা খেয়ে যাবে তা ভাবেনি সে। তাছাড়া মাঝপথে সাফওয়ান ভাই কি করছে এই ডান্স ফ্লোরে!

সাদিফ-নাজরাত, আয়ান-তোহা, ইভান-নিলীমা এবং সাফওয়ান-সায়েরী সহ অন্য দুই জোড়া জুটি মিলে গেল। সকলের মাঝে এলাচির মতো দেখাল সাহিল কে। কিন্তু আবছা লাইটের আলোয় কেউই বিশেষ নজর দিল না তার দিকে। উপায়ান্তর না পেয়ে সে নিঃশব্দে সরে আসলো ডান্স ফ্লোর হতে।
করতালিতে মুখরিত পরিবেশ। লাল,নীল হরেক রকমের লাইটের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল চারপাশ। এতকিছুর মাঝে সায়েরী স্থির হয়ে আছে সাফওয়ানের বাহুবন্ধনে। দেহের সঙ্গে দেহের সংস্পর্শ স্পষ্ট।

সাফওয়ানের প্রসস্থ বুকের সঙ্গে লেপ্টে রয়েছে কোমলমতি রমনী। পোক্ত দুহাত মেয়েলি কোমর জড়িয়ে রেখেছে দৃঢ় ভাবে। সায়েরীর একহাত সাফওয়ানের বাহুতে,অন্যটা কাঁধে। ঢিপঢিপ বুকে, সীমাহীন লাজে রাঙা মুখশ্রী তার। উচ্চতা ঠেকেছে সাফওয়ানের বুক বরাবর। ফলস্বরূপ কিঞ্চিৎ মাথা নুইয়ে, নত দৃষ্টিতে লাজুক মুখশ্রীটির দিকে তাকিয়ে রয়েছে সাফওয়ান। তার পাতলা অধর জোড়ায় মৃদু হাসির আভাস। দৃষ্টিতে এক সমুদ্র মুগ্ধতা। সায়েরী লাজুক চাহনিতে চোখ তুলে তাকায়। মৃদু হাসির তালে বাম গালের ঝাপসা টোল স্পষ্ট লক্ষ্যণীয় তার। দুজনের এই সুন্দর দৃষ্টি মিলন মুহুর্ত টুকু দূর থেকে ক্যাপচার করে নিল সাফ্রিন। তার নজরে অদ্ভুত সুন্দর ঠেকল অতি নগন্য দৃশ্য টুকু-ও।

ডান্স ফ্লোরে ছয় জোড়া কপোত-কপোতী দাঁড়িয়ে। স্পট লাইট, কালারফুল লাইট এবং ফেইরি লাইটের আলোয় অসম্ভব ঝকঝকে আলো চারদিকে। মাত্র সেকেন্ড দশেকের দৃষ্টি মিলন ভঙ্গ হলো হইচই কোলাহলে। স্পট লাইট জ্বলে উঠা মাত্র সায়েরী ছিটকে সরে আসলো সাফওয়ানের বাহুবন্ধন হতে। সতর্ক চাহনিতে আশেপাশে তাকিয়ে দেখল। কারোরই বিশেষ প্রতিক্রিয়া নেই তাদের দিকে। কারণ ছয় জোড়া জুটি-ই পারফরম্যান্স এর দরুন কাছাকাছি ছিল। মূলত বর-কনে কে ঘিরে সকলের সবটুকু কৌতুহল, উচ্ছ্বাস। সায়েরী আড়চোখে ফের তাকিয়ে দেখল সাফওয়ান কে। ছেলেটা ঠিক তার বাহু ছুঁই ছুঁই হয়ে দাঁড়িয়ে। অন্যদিকে নাজরাতের বাহু জড়িয়ে হাস্যজ্বল মুখে দাঁড়িয়ে সাদিফ। সকলে ভেবেছিল পারফরম্যান্স শেষ। মেয়েরা নেমে আসতে উদ্যত হলো।

ঠিক এমন মুহুর্তে সাফওয়ান – সাদিফ চোখাচোখি হলো, পরমুহূর্তেই সাফওয়ান ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল অনেকটা দূরে দন্ডায়মান রূপমের দিকে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই রূপম হাত উঁচিয়ে বৃদ্ধ আঙ্গুল দেখিয়ে বুঝালো ‘অল সেট’। সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণ খোলা জায়গাটার সবগুলো স্পট লাইট নিভে গেল। সেই সঙ্গে নিভে গেল গাঢ় রশ্মির কালারফুল লাইট গুলো-ও। আর্টিফিশিয়াল ফুলগুলোর ভাঁজে ভাঁজে পেঁচিয়ে রাখা ফেইরি লাইটের অল্পস্বল্প, ক্ষীণ আলো অবশিষ্ট রইল কেবল। আকস্মিক এই পরিবর্তনে চমকে উঠলো সকলে। চাপা গুঞ্জন সৃষ্টি হলো চারদিকে। ডান্স ফ্লোরে দন্ডায়মান নাজরাত এবং সায়েরী কৌতহলী চিত্তে নেমে আসতে উদ্যত হলো। কিন্তু এক কদম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে নির্দিষ্ট মানবদের দানবীয় হাতের টান পড়লো দুজনের উদরে।

পরমুহূর্তেই মেয়েলি দেহ দুটি স্থান পেল নিজস্ব পুরুষদের প্রসস্থ বক্ষপটে। কর্ণগোচর হলো নতুন উদ্যমে বেজে উঠা একটি রোমান্টিক গানের মিষ্টি ইন্ট্রোমেন্টস। সায়েরী, নাজরাত দুজনেই চমকিত খুব। সায়েরী ঘাড় উঁচিয়ে তাকালো। আবছা আলোয়, কাছ থেকে স্পষ্ট দেখল সাফওয়ানের অধর কোণের রহস্যময় হাসিটুকু। ঠিক একই ভঙ্গিমা সাদিফের ক্ষেত্রেও। মেয়ে দুজনের আশ্চর্য চাহনিতে বিশেষ পাত্তা না দিয়ে গান বেজে উঠার সঙ্গে সঙ্গে কোমর ছুঁয়ে তাদেরকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল ছেলেরা। হতবিহ্বল সায়েরীর কানে আসলো গানের শব্দের সঙ্গে মৃদু ছন্দে ভেসে আসা সাফওয়ানের মোহনীয় কন্ঠস্বর,

Surkh wala ; soze wala
Faiz waalaa love..
নাজরাতের কাঁধে থুতনি রেখে সাদিফ গাইল,
Hota hai jo love se zyaada
Waisey waala love
মেয়েরা গোল গোল ঘুরে গেল ছেলেদের হাতের ইশারায়,
ishq wala love..
তোহার হাত নিজ বুকে ঠেকিয়ে গানের তাল তাল মিলাল আয়ান,
Hua joh dard bhi hamko
aaj kuch zyaada hua
Ishq wala love…
নাজরাতের একহাতে হাত রেখে, অন্যহাত কোমরে রেখে বার কয়েক আগে-পিছে পা নাচিয়ে সাদিফ গাইল,
yeh kya hua hai kya khabar
yahi pataa hai zyaada hua
Ishq wala love!

সাফওয়ানের হাত ছুঁয়ে খানিকটা দূরে গিয়ে ফের হাতে হাত রেখে ঘুরে কাছে আসলো সায়েরী। তার লাজুক দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে গানের তালে তাল মিলাল সাফওয়ান,
Agarr yeh usko bhi hua hai
phirr bhi mujhko zyaada hua
Ishq wala love
তোহার অভিমানী মুখখানা পরখ করে আলতো হাসল আয়ান। বারে বারে দূরে সরে যেতে চাওয়া মেয়েটার কোমর টেনে অন্যহাতে ঘাড় ছুঁয়ে দুষ্টু হেসে গেয়ে উঠলো,
Meri neend jaise pehli baar tooti ho
Aankhen mal ke maine dekhi hai subah
Huee dhoop zyaada le ke teri roshni, din chadaa
ishq wala love…

দীর্ঘক্ষণের জড়তা কাটিয়ে দুহাতে সাফওয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল সায়েরী। আবছা আলোয় প্রেমিক পুরুষের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে গানের তালে নিজেও সুর তুললো,
Jhaanke baadlon ki jaali ke peechhe se
Ghare chaandni yeh mujhko itna
Le ke noor sa woh chaand mera yaheen pe hai chhupa chhupa hua
ishq wala love…
ছয় যুবক একই ছন্দে নিজ নিজ সঙ্গিনীকে খানিক দূরে সরিয়ে দিয়ে পরমুহূর্তেই দু’হাতে কোমর জড়িয়ে জমিন হতে কয়েক ইঞ্চি উপরে তুলে ঘুরিয়ে নিল। নাচের তালে ঢেউ খেলে গেল রমনী-দের লেহেঙ্গার বিশাল ঘের। গানের শেষ লাইনটুকুর সমাপ্তি ঘটালো একে অপরের অনেকটা কাছাকাছি এসে, গভীর দৃষ্টিতে মত্ত হয়ে।
Surkh wala,
soz wala,
faiz wala love..
ishq wala love!!❤️

ডান্স ফ্লোর ঘিরে অবস্থান রত সকল যুবক-যুবতী এক মুহুর্তের জন্য মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ছিল। গান বন্ধ হয়ে বর-কনের উপর স্পট লাইটের ক্ষীণ আলো পড়ামাত্র ঘোর কাটলো সকলের। করতালির শব্দ ভেসে আসল চারপাশ হতে। সাদিফের বাহু জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নাজরাত লজ্জা পেয়ে গেল। বাকি পাঁচ জুটি নেমে এসেছে। উপস্থিত কেবল বর-কনে। স্বচ্ছ ভাবে লাইট সব জ্বালানো হয়নি তখনো। কেবলমাত্র একটা স্বল্প আলোর স্পট লাইট তাক করে আছে বর কনের উপর৷ এছাড়া আশেপাশের বাকি সব আবছা অন্ধকারে তলিয়ে। নাজরাত বুঝে উঠতে পারলো না এসবের অর্থটুকু। নাচ শেষ, তবুও কেন দাঁড়িয়ে আছে তারা? সে অগোচরে সাদিফের হাত টানল। সাদিফ হাত ছেড়ে দিল তার। এবং পরমুহূর্তেই নাজরাতকে অবাক করে দিয়ে সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো মেয়েটার সম্মুখে। নাজরাত বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেল এই দৃশ্যে। প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ টুকু পেল না সে। পূর্বেই সাদিফ নিজ পাঞ্জাবির পকেট হতে বের করলো একটি নীল রাঙা ছোট্ট বক্স। সেটা খোলামাত্র ভেতর হতে আলোর প্রতিফলন দেখা মিলল। নীলছে আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠলো হীরা খচিত রিং-টি। সেদিক তাকিয়ে আরেক দফা অবাক হলো নাজরাত৷ সাদিফ চেয়ে ছিল স্থির চাহনিতে। নাজরাত প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে তাকাতেই মৃদু হাসলো সে। লম্বা শ্বাস টেনে ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ নাজরাত! কাগজে-কলমে আমরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেও আসল অর্থে কিন্তু সংসার এখনো শুরু করিনি। পরস্পরকে পরিপূর্ণ ভাবে জানার, বোঝার সুযোগে টুকু পাইনি। তাই তোমার মনে এখনো আমাকে নিয়ে খানিকটা দ্বিধা, জড়তা কাজ করছে আমি জানি। এজন্য সম্পূর্ণ রূপে নতুন জীবনে পা রাখার আগে আমি তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিতে চাই। সারাজীবন পাশে থাকার,সব পরিস্থিতিতে আগলে রাখার প্রতিশ্রুতি। আমি কিন্তু মোটেও পারফেক্ট নই। অনেক সময় ভুল করবো, হয়তো-বা ঝগড়া হবে, মান-অভিমান চলবে। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে আমি তোমাকে ভালোবেসে যাব। কোনো ঝগড়া, কোন মান-অভিমান দীর্ঘস্থায়ী হতে দিব না। শত ভুল বুঝাবুঝি, রাগারাগি থাকলেও দিন শেষে একে অপরের কাছেই আমাদের ঠাঁই হোক,এটাই চাই। আমি চাই আমাদের সম্পর্কটা শুধু ভালোবাসায় নয়, শ্রদ্ধা, বিশ্বাস আর পারস্পরিক সমঝোতায় গড়ে উঠুক। তোমার সব ভালোলাগা, সুখ, প্রাপ্তি যেমন আমায় ঘিরে থাকবে৷ তেমনই আজন্মকাল আমার সবটুকু ভালোবাসা, মুগ্ধতা স্থায়ী থাকুক তোমায় ঘিরে। ‘

সাদিফের শান্ত, শীতল কন্ঠের সুমধুর প্রতিশ্রুতি। যা শুনে নাজরাত বিমূঢ়, বিবশ। অতি উত্তেজনায়, সুখে সে যেন প্রতিক্রিয়া জানাতেই ভুলে বসেছে। কিন্তু আবেগে টলমল করে উঠেছে দৃষ্টি। বক্ষজুড়ে বয়ে চলেছে এক সুখ সুখ অনুভূতি। দীর্ঘদিন যাবত বুকে জমে থাকা দ্বিধা, ভয়, জড়তা সব কিছু কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেল। অবচেতন মন যেন সাদিফের পক্ষ হতে এমনই এক প্রতিশ্রুতি আশা করেছিল। যা পেয়ে মুহুর্তেই হালকা অনুভব হতে লাগলো নিজেকে। তার টলমল নজরে নজর মিলিয়ে অধর বাঁকিয়ে হাসলো সাদিফ। হাত বাড়িয়ে মৃদু কন্ঠে অনুমতি চাইল, ‘ মে আই? ‘

নাজরাত ছলছল চোখে হাত বাড়ালো। তার অনামিকায় স্থান দখন করে নিল সাদা পাথরের আকর্ষণীয় রিং-টি। যাকে বলা যায় প্রমিস রিং। সেটা পরিয়ে দিয়ে হাতের উল্টো পিঠে আলতো চুমু খেল সাদিফ৷ সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ শব্দে হইহই করে উঠল দুই পক্ষের কাজিন, বন্ধুমহল। কলতালি,সিটি হইচইপূর্ণ পরিবেশ। সকলের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু সাদিফ-নাজরাত একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল প্রসন্ন দৃষ্টিতে।
চারপাশ তখনো অন্ধকারে তলিয়ে। সাদিফ নাজরাতের এই মিষ্টি মুহুর্ত টুকু দেখে সকলে আবেগে আপ্লূত। তোহা যখন মুগ্ধ নয়নে স্থির দৃষ্টিতে দুজনকে দেখে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহুর্তে তার একহাত নিজের দিকে টেনে নিল আয়ান। তোহার ডানহাতের অনামিকায় পরে থাকা রিং-টি সে বের করে নিল বিনা বাক্যে। অতঃপর বাম হাতের অনামিকা আঙ্গুলে পুণরায় পরিয়ে দিতে দিতে ধীর কন্ঠে শুধালো,

‘ এখনো তো সাধ্য হয়নি তোকে ডায়মন্ড কিনে দেওয়ার। কিন্তু প্রতিশ্রুতি তো দিতেই পারি, নাকি? ‘
তোহা জবাব দেওয়ার ভাষা খুঁজে পেলনা। তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যাল করে। আয়ান তার ধরে রাখা হাতখানায় আলতো চুমু খেয়ে নিজ বুকের বা পাশে চেপে ধরলো তা৷ চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আমিও কথা দিলাম, জীবনে যত ঝড় ঝাপ্টা আসুক না কেন, তুই নিজের পাশে সবসময় আমাকে পাবি। এইযে হাত ধরেছি, জীবনের শেষ নিঃশ্বাস অবধি এটা ধরে রাখবো। জানি না আমাদের গন্তব্যে এক হবে কি-না। কিন্তু আমি আমার প্রাণ বাজি রেখে হলেও তোকে হাসিল করবো। ‘
সর্বদা নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে নিয়ে, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ডুবে থাকা মেয়েটা আয়ানের এই দৃঢ় কন্ঠের প্রতিশ্রুতি টুকু শুনে ভীষণ আবেগী হয়ে পড়লো। আনন্দাশ্রু তে ভরে উঠলো দুই চোখ। আপন মনেই সে স্বগোতক্তি করল,
‘ প্রয়োজন হলে প্রাণ দিয়ে দিব, তবুও তুই ব্যতীত অন্য কোনো পুরুষের হবো না, আয়ান! ‘

ডান্স ফ্লোর ঘিরে রাখা গুটি কয়েক যুবক যুবতীর দল হতে অনেকটা দূরে, গাঢ় অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে সায়েরী। সে একা নয়। ঠিক তার পিঠ ঘেঁষে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। একহাতে জড়িয়ে রেখেছে প্রেয়সীর উদর। সাদিফ যেই মুহুর্তে নাজরাতকে আবেগী কন্ঠে প্রতিশ্রুতি জানাচ্ছিলো। ঠিক সেই মুহুর্তে ঘোরে ডুবে থাকা সায়েরী আবেশে দেহের ভর ছেড়ে দিল প্রেমিক পুরুষের প্রসস্থ বুকটাতে। উদর জড়িয়ে রাখা হাতটার উপর হাত রেখে মৃদু স্বরে মনের ভাবটুকু প্রকাশ করে ফেললো, ‘ ইশশ! এত্তো সুন্দর! ‘

তার এই অনুভূতি প্রকাশ কাছে থেকে অবলোকন করলো সাফওয়ান। মেয়েটা কিঞ্চিৎ ঘাড় বাঁকিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে বর-কনে কে। অন্য কোনো কিছুতেই বিন্দুমাত্র ধ্যান নেয় তার৷ সে যখন মুগ্ধ হয়ে সাদিফের বলা কথাগুলো শুনছিলো, ঠিক সেই মুহুর্তে নিজ হাতে শীতল কিছুর স্পর্শে নড়ে উঠলো। কেটে গেল ঘোর। সহসা দৃষ্টি নেমে আসলো উদরের উপর থাকা হাত দুটোর দিকে। দেখল, সাফওয়ানের ডানহাতের মাঝে তার বা হাত ধরে রাখা। অন্য হাতে বেশ যত্ন নিয়ে অনামিকা আঙ্গুলে পরিয়ে দিচ্ছে একটি রিং। ছোট্ট সাইজের সফের পাথর৷ খুবই সিম্পল,তবে ইউনিক ডিজাইন তার। সায়েরী দেখামাত্র চিনে ফেললো সেটি।

নাজরাতের জন্য কিনা ডায়মন্ড রিং-টার পেমেন্ট করার জন্য সেদিন সাফওয়ান জুয়েলারি শপে গিয়েছিল, সেদিন সায়েরীও ছিল সঙ্গে। সাফওয়ান যখন পেমেন্ট কার্যে ব্যস্ত তখন কাঁচের উপর বের করে রাখা বক্স হতে ঠিক এমন ডিজাইনের একটি রিং নিজ হাত পরে দেখেছিল সায়েরী। কিন্তু সেটি ছিল সাইজে বেশ বড়। সায়েরীর বৃদ্ধ আঙ্গুলে অবধি ঠাঁই হয়নি সেটির। অগত্যা সে হাতে নিয়ে কয়েকটা ছবি তুলেই রেখে দিয়েছিল। বিন্দুমাত্র ভাবেনি যে সাফওয়ান ভাই লক্ষ্য করেছিল তাকে। শুধু লক্ষ্য নয়, বরং একই ডিজাইনের রিং-টি তার মাপের বানিয়ে এনেছে! সায়েরী আশ্চর্য হয়ে কুল পেলনা। ঠিক ঠিক তার মাপের রিং-টি। তাও আবার তার বিশেষ পছন্দের। সাফওয়ান ভাই কেন এতটা অবজারভেশনে রাখে তাকে? এই ছেলে আর কতবার, কত রকম ভাবে চমক দিবে তাকে?
ঘাড় উঁচিয়ে তাকালো সায়েরী। আশ্চর্য কন্ঠে বলতে উদ্যত হলো,

‘ এই রিং-টা তো… ‘
সাফওয়ান তার কথা কেড়ে নিল। ঘাড় উঁচিয়ে রাখা মেয়েটার দিকে খানিক ঝুঁকে এসে নাকে নাক ঘষে প্রতিউত্তর করলো,
‘ ইট’স অ্যা প্রমিস রিং। ‘
‘ প্রমিস! কিসের প্রমিস? ‘ ভ্রুঁ কুঁচকালো সায়েরী।
তার বোকাসোকা দৃষ্টি দেখে সাফওয়ান প্রলুব্ধ চোখে তাকালো। সায়েরীকে পুণরায় সামনের দিকে ঘুরিয়ে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল উদর৷ গভীর আবেশে মুখ ডোবাল উন্মুক্ত গ্রীবাদেশে। প্রেয়সীর দেহের মৃদু কম্পন টুকু অগ্রাহ্য করে, মসৃণ ত্বকে অধর ছুঁয়ে রেখে প্রতিউত্তর করলো হাস্কি স্বরে,
‘ এই মাথামোটা কে সারাজীবন ধমকের উপর দমিয়ে রাখার প্রমিস। আদেশের হেরফের হলেই মাথায় তুলে আছাড় মারার প্রমিস। ‘

কথাটুকু শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে শক্তপোক্ত এক কা*মড় পড়লো সায়েরীর কোমল গ্রীবাদেশে। অস্পষ্ট স্বরে শব্দ করে উঠলো মেয়েটা। সাফওয়ান মাথা তুলতেই ঠোঁট উল্টে তাকিয়ে, নাক ফুলিয়ে বলে উঠলো,
‘ আপনি জানেন আপনি কতটা খারাপ? ‘
‘ না জানলেও আমি তোমারই তো। ‘ সাফওয়ানের অকপট স্বীকারোক্তি।
প্রতিউত্তর করার সঙ্গে সঙ্গে কামড় দেওয়া স্থানে আলতো ঠোঁট ছুঁয়ে দিল সে। সায়েরী ফের কেঁপে উঠল। এই ছোট্ট প্রতিউত্তর টুকু তার রাঙা অধরে বিস্তৃত হাসির রেখা টানল। সাফওয়ান গাঢ় চোখে তাকিয়ে পরখ করার চেষ্টা করলো সেই হাসি৷ কিন্তু অন্ধকারে ঠিকঠাক দেখা গেল না। তবুও সে অনুমান করলো হলদে মুখশ্রী’র টোল পড়া হাসিটুকুর আকর্ষণীয়তা। যে হাসিতে প্রতিবার তার হৃদ যন্ত্র নতুন ছন্দে স্পন্দিত হয়। বেড়ে উঠে সহস্র মুগ্ধতা এই এক রমনীকে ঘিরে।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৫+৬৬

ক্ষীণ আলোয় প্রেয়সীর হাসিটুকু অবলোকন করার চেষ্টায় বিভোর সে। ছোট্ট প্রেয়সী লেপ্টে রয়েছে তার প্রসস্থ বক্ষপিঞ্জরায়। এই মায়াময়ী মুখশ্রী’র স্বচ্ছ, প্রাণবন্ত হাসিটা আবছা ভাবে নজরে আসলো সাফওয়ানের৷ সে আনমনে সায়েরীর কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। অবচেতনে স্বগোতক্তি করল, সে যেন আজন্মকাল এই হাসির কারণ হয়ে থাকতে পারে। সায়েরী জুলুজুলু নজরে তাকিয়ে দেখল সাফওয়ানের এই প্রলুব্ধ দৃষ্টি। স্বগোতক্তি টুকু বুঝল কি-না কে জানে। কিন্তু তার কানে বাজলো দূর হতে ভেসে আসা পরিচিত গানের কিছু সুন্দর লাইন,,,,
Kehta hai sunn, yeh dhoop kinara
Tera hua, main saara ka saara
Dekh lena, tere honthon pe hamesha
Main hansta hi rahunga dekh lena..

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৮