অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৮
সাজিয়া জাহান সুবহা
পূর্বাকাশে সূর্যের আগমন দেখা দিতে না দিতেই ফের নতুন উদ্যমে বিয়ে বিয়ে আমেজের হইচই-এ মেতে উঠলো দুই বাংলো বাড়ি। ভোর রাতে ঘুমিয়েছে বলে নাজরাত,সায়েরী এবং তোহা-সহ আর-ও গুটি কয়েক রমনী তখনো তন্দ্রাঘোরে। সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ নাজরাতের ঘুমের ঘোর কাটলো মাথায় কারো কোমল স্পর্শে। ধীর ভঙ্গিতে চুলে, বাহুতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে কেউ। একপর্যায়ে গিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকাল সে। ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখল শিয়রে বসে আছে তার মা। শান্ত, কোমল দৃষ্টি উনার। সঙ্গে বুক ভর্তি বিষাদ-ও বোধহয় লুকিয়ে আছে সেই দৃষ্টিতে। রাতভর বুকের হাহাকার টুকু দমিয়ে রাখা নাজরাতের কোমল মন কেমন যেন করে উঠলো, মায়ের এই বিষাদ মাখা দৃষ্টি দেখে। অপূর্ণ ঘুমের কারণে লালছে হয়ে উঠা চোখজোড়া টলমলিয়ে উঠলো তার। ভাঙ্গা গলায়, ক্ষীণ স্বরে ডাকলো, “আম্মু!!”
সহসা দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন ভদ্রমহিলা। রোধ হয়ে আসা কন্ঠস্বরে স্বাভাবিকতা ঢেলে বলে উঠলেন,
‘ উঠ! মেহমান আসবে, পার্লারে যেতে হবে। দেরি করলে সবেতে দেরি হবে। তাড়াতাড়ি উঠে মুখ হাত ধুয়ে নে..
বলতে বলতে তিনি বিছানা ছাড়তে উদ্যত হলেন। ঠিক তখন-ই নাজরাত নিজ মাথা তুলে দিল মায়ের কোলে। দুই হাতে কোমর জড়িয়ে চোখ বুজে রইলো মিনিট খানিক। গুমোট অনুভূতি-তে ছেয়ে আছে দুজনের হৃদয়। আজকের পর হতে সব কিছু বদলে যাবে। যখন তখন মা’কে কাছে পাওয়া যাবে না। নিজ মায়ের মতো সে বাড়ির কারো কাছে আবদার, আহ্লাদ করা যাবে না। চাইলেই মা’য়ের কাছে বসে দু-দন্ড কথা বলা যাবেনা৷ সবটা বদলে যাবে, সব। ভাবতে ভাবতে আচমকা ফুঁপিয়ে উঠলো নাজরাত। দৃশ্যমান রূপে কাঁপছে তার মেয়েলি তনু। একই সঙ্গে গাল ভিজল তার মায়ের। একটামাত্র মেয়ে, তা-ও আবার প্রথম সন্তান। যার আগমনে মাতৃত্বের সাধ পেয়েছেন, তাকে নিজের কাছ থেকে দূরে পাঠিয়ে দেওয়া কি এতই সহজলভ্য!
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সকাল দশটা নাগাদ কনে বাড়ির মেয়েরা তোরজোর শুরু করলো পার্লারের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার জন্য। তৈরি হয়ে সরাসরি কনভেনশন হলে পৌঁছে যাবে তারা। প্রয়োজনীয় সামগ্রী সব গুছিয়ে নিচ্ছে তোহা,সায়েরী। নাজরাত গোসল করে বের হলো ঠিক তখনই। তার দেখা পেয়ে সায়েরী হাতের কাজ ফেলে বাহিরে গেল। নাজরাত নিজেই সামলে নিল অবশিষ্ট কাজ। কর্মরত অবস্থায় সায়েরী ফিরে আসলো ব্যস্ত পায়ে৷ হাতে ভাতের প্লেট। নাজরাতকে সে টেনে বসালো বিছানায়। প্লেটখানা হাতে ধরিয়ে দিয়ে ব্যস্ত সুরে বলে উঠলো,
‘ ঝটপট খেয়ে নে। পার্লার থেকে ফিরতে ফিরতে অনেক দেরি৷ খেতে বসেও খাওয়া হবে না৷ ফুপি বলেছে পেট ভরে খেয়ে বের হতে৷ ‘
নাজরাতের চোখেমুখে অনিহা ভাব লক্ষণীয়। সে ঠেলে দিল প্লেট,
‘ খিদে নেই। একেবারে দুপুরে খাব.. ‘
সায়েরী চোখ পাকিয়ে তাকায়৷ প্লেট তুলে নিয়ে নাজরাতের সম্মুখে দাঁড়িয়ে চামচে খাবার তুলে গম্ভীরমুখে প্রতিউত্তর করে,
‘ দুপরে সুযোগ মতো খেতে তো পারবি না৷ আর পেলেও নতুন বউ গাপুসগুপুস খাচ্ছে দেখলে লোকে বাজে কথা রটাবে৷ বলবে সারাজীবন বাপ-মা না খাইয়ে রেখেছিল বোধহয়। এর চেয়ে ভালো এখন খেয়ে নে৷ আমি খাইয়ে দিচ্ছি, নে মুখ খোল.. ‘
বলতে না বলতেই চামচ তুলে ধরল সে নাজরাতের সম্মুখে। তার জোড়াজুড়ি তে হার মানলো নাজরাত। সেকেন্ড কয়েক পর সে ধীর স্বরে বলে উঠলো,
‘ ইহ জীবনে আমার উপর এতো দরদ দেখাতে তো দেখলাম না। খাইয়ে দেওয়া তো দূরের কথা। বরং আমি-ই অগণিত বার খাইয়ে দিয়েছি তোকে। ‘
প্লেটে চামচ চালাতে চালাতে আলতো হেসে সায়েরী প্রতিউত্তর করলো,
‘ তা তো করতেই হতো৷ তুই আমার বড় বোন বলে কথা। আর এই শেষ সময়ে ছোট বোন হিসেবে একটু আধটু যত্ন করে নিচ্ছি আরকি৷ পরে যদি আর সুযোগ না পাই! ‘
বলতে বলতে আচমকা কন্ঠস্বর রোধ হয়ে আসলো তার। টলমলিয়ে উঠলো দৃষ্টি। নাজরাত কাছ থেকে দেখল তা। সঙ্গে সঙ্গে তারও দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে উঠলো। সে সায়েরীর হাতের প্লেট বিছানায় রেখে কাছে টেনে নিল তাকে। দুজনে আবদ্ধ হলো এক শক্ত আলিঙ্গনে। পরমুহূর্তেই কাঁধে কাঁধ মিলতেই ফুঁপিয়ে উঠলো দু’বোন। আপন, পর যেমনই হোক৷ বোন-ই তো। একসঙ্গে বেড়ে উঠা, একে অপরের ছায়া হয়ে সবসময় পাশে থাকা। অতঃপর বিয়ে নামক ফরজ কার্য-টির সঙ্গে ঘটে যাচ্ছে বিচ্ছেদ৷ চাওয়া মাত্র বোনের কাছে ছুটে চলে যাওয়া যাবে না৷ যখন তখন ফোন দিয়ে ঘন্টা ধরে আলাপ করা যাবে না। একে অপরের মন খারাপের দিনে শত চেয়েও কাছে আসা যাবে না৷ এ বিচ্ছেদ নয়, তো আর কি!
‘ তুই তো কলেজে আসবি। রোজ দেখা হবে, কথাও হবে। তবুও আমার এত কষ্ট লাগছে কেনো নাজ! মনে হচ্ছে বুকের ভিতর কিছু একটা যেন ছিড়ে যাচ্ছে। ‘
সায়েরীর ক্রন্দনরত সুর৷ কান্নায় তার কন্ঠ আটকে আসছে। অস্পষ্ট স্বরের এই বাক্যগুলো কর্ণগোচর হতেই নাজরাত ফের ডুকরে উঠে। দ্বিগুণ শক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরে সায়েরীকে৷ মিনিট খানিক পর সে নিজেকে খানিকটা সামলে নেয়। ক্রন্দনরত, বোঝানো সুরে প্রতিউত্তর করে,
‘ যতদূরে যাই না কেনো, তোর আর আমার মাঝে কিচ্ছুটি বদলাবে না, সায়ু৷ আমি বদলাতে দেবো না৷ আগে যেমন ছিলাম,তেমনই থাকবো। সবসময়, সারাজীবন। ‘
দুজনের আবেগঘন মুহুর্তে ভেসে আসল তোহার কন্ঠস্বরে। কাঁদতে নিষেধ করছে শাসানো কন্ঠে৷ অথচ তার নিজের কন্ঠ-ও রোধ হয়ে এসেছে। আঁখি টলমল। সায়েরী-নাজরাত ফিরে চাওয়া মাত্র সে এসে একপাশ থেকে ঝাপটে ধরলো নাজরাজকে। নিরব কান্নায় মিনিট দুয়েক অতিক্রম হতে না হতেই দেখা মিললো সাফ্রিনের। কাপড়,জুয়েলারি ব্যাগ হাতে নিয়ে দরজা ঠেলে রুমে প্রবেশ করতেই সে স্তব্ধ হয়ে গেল। ঘটনা বুঝতে বিশেষ সময় লাগলো না তার৷ তিন বান্ধবীর চাপ কান্নার সুর কানে বাজতেই বক্ষস্থলে চিনচিনে ব্যথা উপলব্ধি হলো। জল জমে ঝাপসা হয়ে উঠল দৃষ্টি। সে হাতের ব্যাগ রেখে এগিয়ে গেল বিছানার কাছাকাছি। তোহার অন্যপাশ হতে জড়িয়ে ধরে নাজরাতকে। নিরবে কেবল গাল ভিজছে। কোনো কথা নেই, কোন শব্দ নেই। এই কান্নার শব্দ না থাকলেও বুকের হাহাকার গুলো হলো প্রচন্ড প্রখর।
বিয়ে বাড়ি বলে এমনিতেই মানুষ জনের আনাগোনা বেশি। তন্মধ্যে খান বংশে আত্মীয় স্বজনের কমতি নেই। বেলা ৮টা থেকেই অতিমাত্রায় হইচই বেড়েছে। বাড়ির যুবক ছেলেদের কাঁধেও কম দায়িত্ব নয়। শ্বাস ফেলার ফুরসত টুকুও পাচ্ছে না তারা। আবরারের সঙ্গে সাফওয়ানের যাওয়ার কথা কনভেনশন হলে৷ আগেভাগে গিয়ে সব ঠিকঠাক আছে কিনা খোঁজ নিবে তারা। মেয়ে পক্ষ হতে এসবের দায়িত্বে আবরার রয়েছে। দুই বন্ধু গিয়ে সব দেখেশুনে আসবে এমন পরিকল্পনা ছিল। বের হওয়ার আগ মুহুর্তে হঠাৎ সাফওয়ানের কানে আসলো তার মায়ের অসুস্থতার খবর। আচমকা প্রেশার হাই হয়েছে গিয়েছে তাহুরা খান’র। মাথা ঘুরে পড়তে গিয়েও বেচে গিয়েছেন৷ মেয়ে সাফ্রিন সামলে নিয়েছে তাকে। অনাকাঙ্ক্ষিত খবরটা শুনে সাফওয়ান একমুহূর্ত অপেক্ষা করলো না। ছুটে গেল দ্বিতীয় তলায় মা-বাবার রুমের দিকে৷ করিডরে দেখা মিললো সাফ্রিনের৷ সে ফিরছে মায়ের রুম হতে। মুখখানা থমথমে। কাছাকাছি পোঁছাতেই সাফওয়ান গম্ভীর সুরে জানতে চাইল,
‘ আম্মু কেমন আছে এখন? রুমে কেউ আছে? ‘
‘ ভালো আছে। আরাম করছে। ‘ সাফ্রিনের শান্ত জবাব।
সাফওয়ান কদম বাড়ালো। পরমুহূর্তেই ফের থামলো সাফ্রিনের ডাকে। ফিরে তাকানো মাত্র মেয়েটা ইতস্তত ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
‘ আম্মু তোমাকে আর সায়ুকে একসাথে দেখেছে, ভাই। ‘
অপ্রত্যাশিত এই বাক্যে সাফওয়ান স্তম্ভিত। চোখ জোড়ায় স্পষ্ট বিষ্ময় ভাব লক্ষণীয়। সে আশ্চর্য কন্ঠে শুধালো,
‘ দেখেছে মানে? কবে? কোথায়? ‘
‘ আজ সকালেই, ছাদে। তুমি বোধহয় খেয়াল করোনি। আমি আর আম্মু ছাদেই ছিলাম৷ ট্যাংকের পেছন দিকে… ‘
কথাটা শুনামাত্র চোখ খিচল সাফওয়ান। ডান হাতের তিন আঙ্গুলের সহিত কপাল ঘষে বিড়বিড় করে আওড়াল, ‘ শিট! শিট! শিট! ‘
ভাইয়ের হতাশায় ডোবা মুখখানা দেখে কেন যেন বড্ড হাসি পেয়ে গেল সাফ্রিনের৷ সে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নিরবে প্রস্থান করলো। সাফওয়ান তখনো একই স্থানে দাঁড়িয়ে। সাহস হচ্ছে না মায়ের মুখোমুখি হওয়ার। জড়তা কাজ করছে। তার মনে পড়ে গেল সাত সকালের মুহুর্ত -টুকু। সময় তখন আটটা মাত্র। সায়েরীর জরুরি তলবে সাফওয়ান বাধ্য হয়ে এসেছিলো ছাদে। তাদের বাংলো বাড়ির ছাদে উঠে সে আশেপাশে লক্ষ না করেই সোজা রেলিং টপকে অন্য বাংলো-টির ছাদে পা রেখেছিল৷ সাত সকালে ছাদে কেউ আসবে না এটাই তো স্বাভাবিক। বিয়ে বাড়ির সব কাজ নিচে। বিয়ে সম্পন্ন হবে কনভেনশন হলে। তাহলে ছাদে কারো কীইবা কাজ থাকতে পারে! এই মনোভাব ছিল বলে সে বিশেষ নজর দেইনি আশেপাশে। সে উপস্থিত হওয়ার কিছু মুহুর্ত পরেই ঢিলেঢালা ফতুয়া আর প্লাজু পরিহিতা সায়েরী ছুটে এসেছিল ঝড়ের গতিতে। এলোমেলো খোলা চুল তার৷ দেখে মনে হচ্ছিলো কোনরকম ফ্রেশ হয়েই ছুট লাগিয়েছে। মুখের পানিটুকু-ও ভালোভাবে মুছেনি। ফতুয়ার গলা,হাতা ভেজা। কেমন যুদ্ধ চালিয়েছে আল্লাহ জানে। সাফওয়ান ভ্রুঁ কুঁচকে পরখ করলো তার এই এলোমেলো রূপ৷ মেয়েটা ছুটে এসে সাফওয়ান-কে কিছু বলার সুযোগ অবধি দেইনি। ঝড়ের গতিতে কাছে এসে গতরাতে পড়ানো রিং-টি সম্মুখে তুলে ধরে, হাঁপানো কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়েছিল,
‘ এটা..এই রিংটা ডায়মন্ডের? ‘
সাফওয়ানের কুঁচকানো কপাল আরও কুঁচকে গেল৷ সাত সকালে এমন বেহুদা আলাপের মানে টা কি?
‘ কথা বলছেন না কেনো? আমি জানতে চাইছি এটা ডায়মন্ড রিং কি-না? ‘ সায়েরীর অধৈর্য কন্ঠ।
সাফওয়ান রেলিং হতে সরে দাঁড়ায়। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বিরক্ত মুখে জবাব দেয়,
‘ ডায়মন্ড নয়তো আর কি? এই ইউজলেস কুয়েশ্চন করার জন্য ডেকেছ তুমি আমাকে? তোমার মতো ফ্রি বসে নেই আমি। অনেক কাজ আমার.. ‘
সায়েরীর চোখে মুখে রাজ্যের বিষ্ময়। সে বিমূঢ় দৃষ্টিতে রিংটির দিকে তাকায়। পরমুহূর্তেই হুড়মুড়িয়ে সাফওয়ানের কাছে এসে, হাত টেনে তার হাতে রিংটি ধরিয়ে দিতে দিতে বলে,
‘ আপনাকে কতবার বলেছি আমাকে এত নামীদামী কিছু দিবেন না। সামান্য একটা রিং-য়ের পেছনে এত টাকা খরচ করার মানে আছে? আমি বেকুব কাল রাতে খেয়াল-ই করিনি। এখন যদি নাজরাত না বলতো তাহলে তো বুঝতেই পারতাম না৷ এত দামী জিনিস আমি রাখতে পারবো না। আমার কাছে থাকলে এটা হারিয়ে যাবে। আপনার জিনিস আপনিই রাখু…আহ… ‘
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে রিং-টি সাফওয়ানের হাতে ধরিয়ে ফিরে আসতে চেয়েছিলো সায়েরী। কিন্তু ভাগ্য সহায় হলো না। রিং ধরে রাখা হাত দিয়েই তার ডান হাত টেনে নিল সাফওয়ান। মুছড়ে ধরলো পিঠের পেছনে। সঙ্গে সঙ্গে ব্যথায় চোখ খিচে ফেললো মেয়েটা। তার ব্যথাতুর মুখশ্রী দেখে সাফওয়ান দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো,
‘ বেশি আদর দিয়ে পরিয়েছি বলে হজম হয়নি,তাইনা? ‘
‘ যখন আমি কিছু বুঝাতে চাই, তখন তো এই মোটামাথা কাজ করে না। অথচ বেহুদা সব ঠিকই আগ বাড়িয়ে বুঝতে আসো। এ্যাঁই! তোমাকে আমি বলেছি রিং নিয়ে গবেষণা চালাতে? আমার দেওয়া জিনিস তুমি কোন সাহসে ফিরিয়ে দিতে এসেছো? ‘
রাশভারি কন্ঠের এক একটা চাপা ধমকে নাজুক রমনী কেঁপে কেঁপে উঠছে। আজ প্রায় অনেকগুলো দিন পর এমন গম্ভীর কন্ঠের ধমক শুনছে সে। যেখানে তার কোনো দোষ নেই বলেই ধারণা তার। বিনা দোষে এতগুলো ধমক শুনে কান্না পেয়ে গেল তার। সে দৃষ্টি নামিয়ে রাখল। থুতনি কাঁপছে। নাকের পাটা ফুলেফেঁপে উঠছে। এই দৃশ্য দেখে সাফওয়ানের রাগ বাড়লো। এত বেশি ছেঁদ কাঁদুনে কেনো এই মেয়ে! চোয়াল শক্ত করে একহাতে মেয়েটার ফুলোফুলো গালজোড়া চেপে ধরলো সে। টেনে নিল নিজের মুখোমুখি। অত্যাধিক গম্ভীর কন্ঠে শাসাল,
‘ একফোঁটা চোখের পানি পড়তে দেখলে মাথায় তুলে আছাড় মারবো, ইডিয়ট! কান্না করার মতো কিছু বলেছি আমি তোমাকে? ‘
সায়েরীর অবাধ্য অশ্রু বাধ মানলো না। একফোঁটা গড়িয়ে পড়লো ঠিকই। সাফওয়ান সঙ্গে সঙ্গে দমে গেল। কি এক সম্মোহনী কান্না এই রমনীর! এক নিমেষে কঠোর হৃদয়ের পুরুষটার ক্রোধ ধ্বংস করে হাওয়ায় মিলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে সে। এই মুহুর্তেও হার মেনে নিল সাফওয়ান। শক্তি প্রয়োগ করে চেপে রাখা হাতটা সে ছেড়ে দিল। ফের যত্ন করে তুলে নিল হাতের ভাঁজে। গম্ভীরমুখে রিং-টি অনামিকা আঙ্গুলে পরিয়ে দিতে দিতে রাশভারি কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ শেষ বারের মতো পরাচ্ছি। আবার যদি খুলতে দেখি, তাহলে আঙ্গুল কেটে রেখে দিব। ‘
সায়েরী চমকিত নজর তুলে তাকায়৷ এমন হুমকি দিতে পারলো সাফওয়ান ভাই! সে তো ভালোর
জন্যই বলেছিলো৷ তার মতো খামখেয়ালি মেয়ের কাছে এত দামী জিনিস সুরক্ষিত থাকবে আদৌ! হারিয়ে ফেললে তখন তার নিজেরই মন খারাপ হবে সবচেয়ে বেশি। সাফওয়ান ভাই এই সহজ কথাটুকু বুঝতে চাইছে না কেনো? না বুঝে উল্টো তাকেই শাসাচ্ছে। এ কেমন বিচার!
সাফওয়ান চোখ তুলে তাকায়৷ দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলে। সায়েরীর চোখ দেখেই যেন সে মনের কথা বুঝে ফেলেছে। সে হাত বাড়িয়ে ঘুমঘুম মুখশ্রী-টির উপর লেপ্টে থাকা এলোমেলো চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিল। ভীষণ শান্ত, শীতল গলায় বলে উঠলো,
‘ মন থেকে আগলে রাখতে চাইলে কোনো কিছুই হারায় না, সুবহা। ভালোবেসে আপন করে নাও। দেখবে সারাজীবন যত্নে রাখতে পেরেছ.. (মুখোমুখি হয়ে) আমাকেও.. আর আমার দেওয়ার প্রতিটা উপহার-কেও। ‘
সাফওয়ানের দৃষ্টি গভীর। এই গভীরতায় ডোবতে চেয়েও সহসা দৃষ্টি সরাল সায়েরী৷ ছাড়িয়ে নিল হাত৷ ফিরে যাওয়ার জন্য কদম বাড়াতে গিয়ে ফের একবার টান পড়লো কনুইয়ে৷ সে অভিমানী দৃষ্টিতে ফিরে তাকালো। সাফওয়ান এসে দাঁড়াল ঠিক তার পিঠের পেছনে৷ একহাত সমান দুরত্ব মাত্র। বিনা বাক্যে সে সায়েরীর এলোমেলো খোলা চুল সব তুলে নিল হাতের মুঠোয়। চোখের পলকে পেঁচিয়ে ধরে দক্ষ হাতে হাত খোপায় আটকে ফেললো এলোকেশ সব। দেখে মনে হলো যেন কত কত দিনের অভ্যস্ত সে এই কাজে৷ খোপা করতে করতে সে গম্ভীর সুরে বলেছিল,
‘ কতবার বলেছি এমন এলোমেলো চুলে সামনে না আসতে? কথা শুনো না কেনো? ‘
সায়েরী কানেও নিলনা সেকথা। খোপা করা মাত্র সে নিঃশব্দে প্রস্থান করলো। ফিরেও তাকাল না দ্বিতীয় বার। সাফওয়ান বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেললো তার জেদ দেখে। এই অভিমান ভাঙ্গাতে যদিও তাকে বিশেষ কাঠখড় পোড়াতে হবে না। মেয়েটা এটুকুতেই গলে বুকে মিশে যায়। ছোট ছোট বিষয়ে অভিমান, আবার সামান্য কিছুতেই গলে পানি। কিন্তু এই সামান্যতম অভিমান টুকু সাফওয়ানের সহ্য হয়না। সে জানে এই অভিমান দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তবুও তার অন্তস্তল ব্যাকুল হয়ে থাকে। যতক্ষণ না অভিমানী প্রেয়সীর মান ভেঙ্গে ছোট্ট দেহ-টি তার প্রসস্থ বুকটাতে মিশে না যায়, ততক্ষণ অবধি কমে না এই ব্যাকুলতা।
মায়ের রুমের সম্মুখে দাঁড়িয়ে পায়চারি করতে করতে মুহুর্ত গুলো ফের স্মৃতিচারণ করলো সাফওয়ান। চিন্তা হলো, মা কি দেখেছে? কতটুকু দেখেছে? ছেলের প্রেমিক রূপ দেখেই কি প্রেশার বেড়েছে গিয়েছে উনার? ভাবতেও অস্বস্তিতে গা গুলাচ্ছে সাফওয়ানের। এত বেপরোয়া ছেলেও নয় সে। মা,বাবা গুরুজনদের যথেষ্ট সমীহ করে চলে সে। ড্যাম কেয়ার ভাব-টা কেবল বাইরের লোকেদের জন্য। আপনজনদের কাছে সে পুরোপুরি অন্যরকম। তাই তো, মা তাকে এবং সায়েরী ‘কে একসঙ্গে দেখেছে শুনেই জড়তা ঘিরে ধরেছে তাকে। তবুও নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা চালালো সে। লম্বা দম নিয়ে নক করলো ভিড়িয়ে রাখা দরজায়। ভেতর হতে ভেসে আসলো রূপমের মায়ের কন্ঠস্বর। সাফওয়ান দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলো। তাকে দেখে রূপসার মা বেরিয়ে গেলেন৷ তাহুরা খান বিছানার হেড বোর্ডের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে রয়েছে। ছেলের দেখা পেয়ে তিনি অনুভূতিহীন চোখে তাকিয়ে রইলেন। সাফওয়ান গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের অস্বস্তি ভাব লুকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালালো। বিছানার পাশে থাকা চেয়ারটাতে গিয়ে বসলো সে। মায়ের একহাত নিজ হাতের ভাঁজে টেনে নিয়ে নম্র কন্ঠে জানতে চাইল,
‘ এখন কেমন লাগছে, আম্মু? ‘
তাহুরা খান নিশ্চুপ। সাফওয়ান ফের বলে,
‘ এখনো মাথা ঘুরছে? ডাক্তার ডাকবো? ‘
তাহুরা খান চোখ বুজে মাথা এলিয়ে দিলেন হেড বোর্ডের সঙ্গে। উনার মনে পড়ে গেল ঘন্টা খানিক আগে ছাদের মুহুর্ত টুকু। ছেলের সেই ভিন্ন রূপ দেখে রীতিমতো মাথা ভনভন করে উঠেছিলো উনার। দরদরিয়ে ঘাম ছুটেছিল দেহ বেয়ে। শুরুতে অবাক হয়েছিলেন সাফওয়ানকে এভাবে চোরের মতো এক ছাদ হতে অন্য ছাদে লাফিয়ে যেতে দেখে। এবং পরমুহূর্তেই যা যা ঘটল সব দেখে তিনি হার্ট ফেইল করেননি, এই অনেক। শেষ মুহুর্তে কত সাবলীলভাবে সায়েরীর চুল বেধে দিয়েছিল সাফওয়ান! দেখে মনে হচ্ছিলো বহু মাস যাবত এই কাজে অভ্যস্ত সে। তাহুরা খান সেখানেই স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিলেন। ছেলে গোপনে এত কিছু করে বেড়াচ্ছে, অথচ তিনি ঠের অবধি পাননি!
‘ কথা বলছ না কেনো, আম্মু? ‘ সাফওয়ানের জড়তা ভরা কন্ঠ।
তাহুরা খান চোখ মেলে তাকালেন। কেমন এক শীতল সুরে প্রশ্ন ছুড়লেন,
‘ কতদিনের সম্পর্ক তোমাদের? ‘
সাফওয়ান ঢোক গিলল প্রশ্নটা শুনে। কিন্তু দমে গেল না। দৃঢ় স্বরে জবাব দিল,
‘ আট মাস, অলমোস্ট। ‘
তাহুরা খান শ্বাস ফেললেন শব্দ করে। কয়েক সেকেন্ড নিরবতার পর ফের জানতে চাইলেন,
‘ আবরার জানে? ‘
‘ না। ‘
‘ এসবের কারণে তোমাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরবে না তো? ‘
সাফওয়ানের কানে তীক্ষ্ণ ভাবে বাজলো কথাটুকু। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চাপ প্রয়োগ করে চেপে ধরলো মায়ের হাত। শান্ত সুরে জবাব দিল,
‘ আমার বন্ধুত্বে কোন দাগ আমি বসতে দিব না, আম্মু। তাছাড়া তোমার ছেলের মধ্যে খারাপের কি আছে, বলো? এখনো স্টাবলিশড হয়নি ঠিক। কিন্তু হতে কতদিন? আর দুয়েক মাসের মধ্যেই তো গ্রেজুয়েশন কমপ্লিট হয়ে যাবে। তারপর নাহয় মাস্টার্স এর পাশাপাশি ফ্যামিলি বিজনেস ও সামলে নিব। সুবহাকেও এত তাড়াতাড়ি বিয়ে দিবে না, জানি আমি। সে বড় হতে হতে আমিও নিজেকে পুরোপুরি গড়ে নিতে পারবো। সবটা ঠিকঠাক, তাহলে সমস্যা হবে কেন? ‘
তাহুরা খান এবারেও নিশ্চুপ। মনে মনে আওড়াচ্ছেন, এত দূর অবধি প্লানিং করে রেখেছে ছেলেটা! ফুঁস করে শ্বাস ফেললেন তিনি। তার এহেন নিরবতা বড্ড অস্থির ঠেকল সাফওয়ানের কাছে। সে ফের বলে উঠলো,
‘ চুপ করে আছো কেনো? তোমার কোনো আপত্তি থাকলে আমাকে বলো। আমি মোটেও তোমার অবাধ্য ছেলে নয়, যে তোমার চাওয়া পাওয়া’কে মূল্যায়ন করবো না। ‘
তাহুরা চুপ থাকতে পারলেন না এবারে। কৌতুহলী কন্ঠে জানতে চাইলেন,
‘ তাই বলে সায়েরী-ই কেনো? সে আর তুমি সম্পূর্ণ বিপরীত। আবেগের বশে ভুল করছ না তো? পরে যেন পস্তাতে না হয়.. ‘
সাফওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে৷ মায়ের ধরে রাখা হাতটার উপর অপর হাত রেখে দৃঢ় সুরে প্রতিউত্তর করে,
‘ অন্তত তুমি একথা বলো না, আম্মু। অনেক শুনেছি এসব। আর শুনতে চাইছি না। আবেগে গা ভাসানোর বয়স কি আছে এখন! যা হচ্ছে, সবটা ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ভরসা রাখো, কোনো জটিলতার সম্মুখীন হতে হবে না আমাদের৷ ‘
কথাটুকু মুখে বললেও সে আপনমনে ভাবলো, সব ডাহা মিথ্যে কথা! নিজের অনুভূতি বুঝে সেটা মেনে নিতে গিয়ে পরিস্থিতি এমন বিগড়ে গিয়েছিল যে বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নূন্যতম সুযোগ পায়নি সে। যা হচ্ছে সবটা পরিস্থিতির সঙ্গে হয়ে গেছে ব্যাস! কিন্তু এতেও আফসোস নেই কোনো। বরং মিশে আছে একরাশ ভালোবাসা, মিষ্টি কিছু প্রেমানুভূতি।
তাহুরা খান’কে ফের চিন্তিত দেখে হতাশ হলো সাফওয়ান। সে টোপ ফেলল এবারে৷ বড় অবলীলায় মাথা রাখল মায়ের কোলে৷ ধরে রাখা হাতখানা নিজ গালে চেপে ধরে, বাচ্চা কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ তুমি-ই তো বলেছিলে..আমার সুবহা এত মিষ্টি দেখতে, মিশুক একটা মেয়ে। কেউ পছন্দ না করে থাকাতেই পারবে না। তোমার ছেলেও থাকতে পারেনি। মেনে নাও না..মা! ‘
ছেলের টোপ বুঝে,কথার ধরণে হেসে ফেললেন তাহুরা খান। সাফওয়ানের গালে আলতো চাপড় মেরে বলে উঠলেন,
‘ আমার কথা আবার আমাকেই শুনাচ্ছ! এজন্যই বুঝি এত জিজ্ঞাসাবাদ চলেছিল কাল? আগ পিছ না বলে সরাসরি রেখে দেওয়ার আবদার তবে এজন্য ছিলো! অথচ আমি ভেবেছি ছেলে আমার পছন্দকে নিজের করে নিয়েছে, বাহ! ‘
মায়ের রসিকতায় চোখ বুজে হেসে ফেললো সাফওয়ান। হেলেদুলে মাথা তুলে বসলো। মায়ের হাতের উল্টো পিঠে ঠোঁট ছুঁইয়ে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আমি জানতাম সুবহাকে তোমার অপছন্দ হবে না। সেও তোমার মতোই। একটু বেশিই সহজ, সরল। এজন্যই তো আটকে গিয়েছি। শুধু বাচ্চামো কমেনি। সময়ের সাথে সাথে সেটাও ঘুচে যাবে, দেখো। ‘
‘ তা ঠিক আছে। কিন্তু এই বাচ্চা মেয়েটাকে কাঁদিয়েছ কেনো? সাত সকালে কিসের এত ধমকা-ধমকি? ‘
সাফওয়ান চুপ মেরে গেল এই প্রশ্নে৷ তাহুরা খান বুঝলেন ছেলে জবাব দিবে না৷ তিনিও বিশেষ ঘাটালেন না। তবে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
‘ একদম বাপের মতো হয়েছ। আমার গোটা জীবন শেষ হয়ে গেল ঐ লোকের ধমকা-ধমকি হজম করতে করতে। এখন দেখছি তুমি হয়েছ তেমন। শুনে রাখো, মেয়েদের ভালোবাসা আর যত্ন দিয়ে আগলে রাখতে হয়। তোমরা বাপ ছেলের দেমাগ আর সম্পত্তির জোরে সব মেয়ে বশ মানবে না। জোর জবরদস্তি বাদ দিয়ে, আগলে রাখতে শিখো। ‘
সাফওয়ান বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ে। দুনিয়ায় এই দুই রমনীর কি চমৎকার ক্ষমতা। যাদের প্রতিটা কথা মাথা পেতে নেয় সাফওয়ান তেহজিব খান। বহিরাগত কেউ এই দৃশ্য দেখলে নিশ্চিত হতভম্ব হয়ে পড়বে। সাফওয়ান উঠে দাঁড়ায়। টি-শার্ট টেনেটুনে ঠিক করে বলে,
‘ বাহিরে যাচ্ছি, কাজ আছে। বাড়িতেও দেখি সবাই ব্যস্ত।খারাপ লাগলে আমাকে ফোন করবে। আমি কাউকে পাঠাচ্ছি সাথে থাকার জন্য। ‘
কথাটুকু বলে মাথা নুইয়ে আলতো চুমু খেল মায়ের চুলের ভাঁজে। শান্ত সুরে বললো,
‘ সাবধানে থেকো। ‘
বেলা সাড়ে এগারোটা। কনে পক্ষ হতে বরাদ্দকৃত বিউটি পার্লারে জমজমাট অবস্থা। ইতোমধ্যে কনে ব্যতীত প্রায় সকলে সেজেগুজে তৈরি। অবশিষ্ট কেবল নাজরাত। তাকে সময় নিয়ে, ধীরেসুস্থে তৈরি করছে তিনজন মিলে। এরইমধ্যে নাজরাতের ফোনে কল আসলো। সে না দেখেও আন্দাজ করতে পারল কল-টা তার একমাত্র বরের৷ এই নিয়ে চতুর্থ বারের মতো কল করেছে সাদিফ। তার সরল গলায় ভিডিও কল রিসিভ করার আকুতি। বউকে বাকিদের আগে একঝলক দেখার জন্য বড্ড উতলা হয়ে আছে সে। কিন্তু নাজরাত কানে তুললো না সেকথা। মেকআপ আর্টিস্ট-রা মিটমিটিয়ে হাসছে নাজরাতের দিকে তাকিয়ে। নানান কথায় লজ্জায় ফেলছে মেয়েটাকে। পাশেই উপস্থিত সায়েরী, তোহা এবং সাফ্রিন। সঙ্গে সামান্তা, রূপসা-সহ আরও গুটিকয়েক কাজিন রয়েছে৷ রূপসা এবং অন্য এক কাজিনের সাজগোছ এখনো বাকি৷ পরিপাটি হয়ে থাকা সায়েরী জরুরি কিছু একটা বলতে চাইল নাজরাতকে। কিন্তু মেয়েটা গুনগুন করে কথা বলছে ফোনে৷ সায়েরী বাক কয়েক ডেকেও বিশেষ লাভ করতে পারলো না। নাজরাতের মনযোগ না পেয়ে তেতে উঠলো সে। সাফ্রিন,তোহার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
‘ আজব কান্ড! এই মহিলা আমাকে পাত্তা দিচ্ছে না কেনো? ‘
তোহা হেসে উঠে জবাব দিল,
‘ মহিলার এখন বর আছে, তাই আমাদের চোখে পড়ছে না। এখানে থেকে লাভ নেই। বাহিরে চল। ওকে আস্তে ধীরে রেডি করুক, আমরা একেবারে ফাইনাল লুক দেখব নে। ‘
সায়েরী মাথা দুলিয়ে সায় জানায়। যেতে যেতে নাজরাতের মাথায় এক চাপড় মারে। চাপা সুরে বলে,
‘ বরের সাথে মান-অভিমান চললে তখন আসিস বোনের সাথে দুঃখবিলাস করতে। তখন আমিও পাত্তা দিব না। ‘
নাজরাত মাথা ঢলে ফিরে তাকায়। কান হতে মোবাইল কিছুটা দূরে সরিয়ে নিম্ন কন্ঠে প্রতিউত্তর করে,
‘ আমার বর তোর ভাই প্রেমিকের মতো উঠতে বসতে ধমক ছুড়ে না, যে অভিমান করবো। দুঃখবিলাস তোকেই করতে হয় রোজ রোজ, আমাকে না। ‘
সায়েরী থমকায়৷ আশ্চর্য চোখে তাকায় নাজরাতের দিকে। মেয়েটা বিদ্রুপের হাসি হাসছে নিঃশব্দে। তোহা এবং ও হেসে ফেললো একথা শুনে। মাথা দুলিয়ে সায় জানাল, সহমত! সহমত!
তাদের এহেন প্রতিক্রিয়ায় গাল ফুলিয়ে ধুমধাম পা ফেলে প্রস্থান করলো সায়েরী। বিড়বিড় করে আওড়াল,
” সবকটা মীরজাফরের লেডিস ভার্সন। অসহ্য! ”
তোহা এবং সাফ্রিন ও প্রস্থান করলো তার পিছু পিছু। নাজরাত অল্পস্বল্প কথা বলে কল কাটলো। তার ঠিক পার্শ্ববর্তী চেয়ারে রূপসা বসা। হাতে মোবাইল। সেদিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। খুব সম্ভবত চ্যাটিং চলছে। নাজরাত গত দুদিনে বেশ কয়েকবার লক্ষ্য করেছে এই দৃশ্য। আজ আর নিজেকে দমাতে পারলো না সে। আপাতত দুজনের আশেপাশে কেউ নেই দেখে সে চাপা কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ল, ‘ প্রেম করছো? ‘
চমকিত নজরে ফিরে তাকালো রূপসা। মিলিয়ে গেল মুখশ্রীর লাজুক হাসিটুকু। খানিকটা বিষ্ময়, জড়তা, ভয় ধরা দিল চোখে মুখে। হকচকিয়ে বলে উঠলো,
‘ হ..হুহ! ক..কি? ‘
নাজরাত সরু চোখে লক্ষ্য করে তার প্রতিক্রিয়া। ফের বলে উঠলো,
‘ তোমার হাবভাব কিন্তু সুবিধার ঠেকছে না। দুদিন ধরে লক্ষ্য করছি। মিথ্যে বলবে না, প্রেম করছো তাইনা? ‘
রূপসা ঢোক গিলে একাধিক। ধরা পড়ে গিয়ে মুখখানা চুপসে গেল তার। আশেপাশে তাকিয়ে কাজিনদের অবস্থান পরখ করে সে আচমকা চেপে ধরলো নাজরাতের একহাত৷ আকুতি ভরা কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ প্লিজ কাউকে একথা বলো না, ভাবি। ভাইয়া জানতে পারলে আমার রক্ষা থাকবে না। ‘
নাজরাত বেশ অবাক হলো রূপসার মুখে এই প্রথম ভাবি সম্বোধন শুনে। পূর্বে কখনো তাকে ভাবি বলে ডাকেনি মেয়েটা। বলা বাহুল্য, কোনো রূপ সম্বোধন ছাড়াই কথা বলেছিল। তাও জোরপূর্বক, বাধ্য হয়ে গুটিকয়েক বার কথা বলেছিল মাত্র। তখন তার ব্যবহার দেখেই বোঝা যেত নাজরাতের উপস্থিতিতে কতটা বিরক্ত সে। যা এবারে একবারের জন্যও উপলব্ধি করেনি নাজরাত। এত ঝাক ঝমক ভাবে সাদিফের বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে দেখে মেয়েটার মন খারাপ করার কথা। কিন্তু সে বেশ সাচ্ছন্দ্যে আছে। যেন নিজেকে সামলে নিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়েছে। শুরু করেছে নতুন পথ চলা।
গত দিনগুলোতে নাজরাতের মনে সংশয় থাকলেও আজ রূপসার কথা শুনে সে সিউর হলো এই ব্যাপারে। এবং মন হতে বিরাট এক বোঝা নেমে গেল তার। কোনো মেয়ে-ই চাইবে না তার বরের দিকে অন্য মেয়ে ভালোবাসার নজরে তাকাক, তাকে নিয়ে স্বপ্ন গড়ুক। নাজরাত যে এতগুলো দিন মুখ বুজে সহ্য করেছে এটাই তো অনেক। অনেক চেয়েও রূপসাকে কিছু বলতে পারেনি সে। তাছাড়া সে জানে সাদিফ কেবল তার৷ মানুষটা কেবল তাকে ভালোবাসে। সাদিফের প্রতি অগাধ ভরসা আছে বলেই আগ বাড়িয়ে রূপসার সঙ্গে এই প্রসঙ্গে কথা আগাইনি সে। আজ গিয়ে মনে হলো কথা না বলে ভালোই হয়েছে। শুধু শুধু দুজনের মাঝে জড়তা এসে যেত। রূপসা মুভ করে গেলেও নাজরাতের সঙ্গে কখনো স্বাভাবিক হতে পারতো না। নিজ ভাবনার ইতি টেনে মুখে স্বস্তির হাসি ফোটাল নাজরাত। রূপসার হাতে হাত রেখে আশ্বস্ত করলো,
‘ কাউকে কিছু বলব না। কিন্তু তুমি বলো, ছেলেটা কে? কতদিনের সম্পর্ক? ‘
রূপসা লাজুক হাসে। নিম্ন কন্ঠে প্রতিউত্তর করে,
‘ প্রায় চার মাস হতে চলেছে সম্পর্কের। আব্বুর বিজনেস পার্টনারের ছেলে। সেও ফ্যামিলি বিজনেস জয়েন করেছে এই বছর। অনেক আগে থেকেই আমাকে পছন্দ করে। জানিয়েছিল দুয়েক বার৷ কিছু ব্যক্তিগত কারণ ছিল বলে আমি রাজি হয়নি। কিন্তু.. শেষে গিয়ে বাধ্য হয়েছি ওকে মেনে নিতে। ‘
এটুকু বলে সে চোখমুখ উজ্জ্বল করে হাসলো। খুশি খুশি গলায় ফের বলে উঠলো,
‘ ট্রাস্ট মি, ভাবি.. ও আমার কল্পনার চেয়েও বেশি কেয়ারিং। আমি কখনো ভাবিনি কেউ আমাকে এতটা ভালোবাসবে। ওর এই চার মাসের ভালোবাসায় আমার চার বছরের অনুভূতি ফিকে পড়ে গিয়েছে৷ কেমন বোকা ছিলাম আমি! চোখের সামনে আস্ত এক হীরে রেখে কিনা মরিচীকার পেছনে ছুটছিলাম! ‘
নাজরাতের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল শেষের কথাটুকু শুনে। ‘মরিচীকা’ শব্দটা বেশ বাজে শোনাল। পরমুহূর্তেই তার কানে আসলো মোবাইল নোটিফিকেশনের শব্দ। তাকিয়ে দেখল সাদিফের মেসেজ। সঙ্গে সঙ্গে ফের হাসি ফুটল মুখে। আপন মনে স্বগতোক্তি করলো,
‘ তোমার কাছে যাকে মরিচীকা বলে হচ্ছে, আমার কাছে সে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান ব্যক্তিটি। আমার অর্ধাঙ্গ,আমার অস্তিত্বের একাংশ, অনুভূতির সবটুকু কেবল তাকে ঘিরে। ‘
‘ লাভ বাইট নামক পোকার কামড় কোথা থেকে উদয় হয়েছে সেটা কিন্তু এখনো বলিস নি সায়ু। বান্ধবী হিসেবে আমরা সবকিছু জানার অধিকার রাখি। প্রায় ছয় ফিট উচ্চতার পোকার কামড়ের দাগ মেক আপ দিয়ে ঢেকে ঘুরে বেড়াচ্ছিস। অথচ আক্রমণের ঘটনা শেয়ার-ও করলি না। এ তো ভারী অন্যায়। ‘
ফের একবার তোহার মুখে লাভ বাইট প্রসঙ্গে কথাগুলো শুনে সায়েরীর কান জ্বলে উঠলো। তোহার বলার ধরন শুনে ফিক করে হেসে ফেললো সাফ্রিন। সায়েরী কিড়মিড়িয়ে বলে উঠলো,
‘ তোকে চারচোখ লাগাতে বলেছে টা কে? খোল এটা। এত বেশি বেশি দেখলে চোখ খসে পড়বে। ‘
তোহা চোখের চশমা টা ভালোভাবে নেড়েচেড়ে ফের বলে উঠলো,
‘ পোকার দেওয়া আদরের দাগ কিন্তু খালি চোখে দেখেছি বেবস! একদম সকাল সকাল। যখন তুই তারা মাছের মতো হাত পা ছড়িয়ে ঘুমুচ্ছিলি.. ‘
সায়েরী কিঞ্চিৎ চমকালো একথা শুনে৷ খানিকটা লজ্জাও পেল। কিন্তু মুখ খুলল না এবারে৷ মেয়েটা কেবল কথায় কথা বাড়াবে। এত বেশি বেফাঁস কথাবার্তা বলে যে বাকি তিন বান্ধবীও লজ্জায় গুটিয়ে যায়। কিন্তু তোহা তখনও থাকে নির্বিকার।
তারা দাঁড়িয়ে আছে বিউটি পার্লার-টির গ্রাউন্ড ফ্লোরে। পার্কিং-য়ের পার্শ্ববর্তী স্থানে ছোট্ট লন। লনের শেষ দিকে, খানিকটা গভীরে ফুল দিয়ে সজ্জিত একটি জায়গা। ছবি তোলার জন্য চমৎকার স্পট এটি। সেই সঙ্গে নিরিবিলি-ও বেশ। তিন বান্ধবী মিলে সেখানেই এসেছে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে। এরই মধ্যে তোহার কাছে কল আসলো আয়ানের। সে জানতে চাইল, তারা কোথায় আছে? উত্তর পাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উক্ত স্থানে হাজির হলো নুহাশ এবং আয়ান। দুজনের গায়ে মেরুন রঙের চকচকে নতুন শার্ট। হাতা গুটিয়ে রাখা। কালো বেল্টের সঙ্গে কালো প্যান্ট পরেছে৷ ইন করেছে শার্ট। পায়েও চকচকে কালো সু। সুন্দর করে সেট করা চুল। তাদের দেখে মেয়ে তিনজন গোলগাল চোখে তাকিয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড। সায়েরী অবাক হওয়ার ভান করে বলে উঠলো,
‘ বাহ! আজ দেখি মানুষের মতো লাগছে তোদের। ইম্প্রেসিভ! ‘
আয়ান চুপচাপ থাকলেও সঙ্গে সঙ্গে প্রতিউত্তর করে উঠলো নুহাশ। চুলে বারকয়েক হাত বুলিয়ে ভাব নিয়ে বলে উঠলো,
‘ তোদের মতো আদা ময়দা মেখে রূপের বাহার আমরা করি না। বছরে একবার গোসল করে পরিপাটি হই, তাতেই রূপের আগুনে মাইয়ারা ঠাশ ঠাশ ফিট হয়ে যায়। ব্যাস..কখনো বড়াই করিনি। ‘
তিন রমনী মুখ ভেঙ্গায়। তোহা বিদ্রুপের সুরে বলে,
‘ দেখতেই পাচ্ছি রূপের আগুন। যেই না চেহারা , নাম রেখেছিস পেয়ারা। ‘
‘ তাই তো। বছরে একবার গোসল করলে মেয়েরা তো এমনিতেই পাত্তা দিবে না। যেমন এখনো দিচ্ছে না। এখন যেমন সিঙ্গেল আছিস, আজীবন এভাবেই থাকবি, দেখিস। ‘ সায়েরীর ব্যাঙ্গাত্মক স্বর।
সহসা বুকে হাত চাপলো নুহাশ। তার দুর্বল জায়গায় আঘাত করেছে মেয়েটা! এই অভিশাপ চেয়ে বড় অভিশাপ যেন আর হওয়ার নয়। সে তেতে উঠলো রীতিমতো,
‘ এত বড় অভিশাপ! ইয়া আল্লাহ! এত বড় অভিশাপ তুই ক্যামনে দিলি তিন ফুট,লিলিপুট? তোর মতো লিলিপুটের কপালে যদি ছয় ফুটের রাজপুরুষ জুটতে পারে, তাহলে আমার ভাগ্যেও কোনো না কোনো রিনা, মিনা, জরিনা জুটে যাবে দেখিস। ‘
তার বলতে দেরি, কিন্তু সায়েরীর প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেরি নেই। মেয়েটা চোখের পলকে কাছে এসে আকস্মিক চুল টেনে ধরলো নুহাশের। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলো নুহাশ,
‘ চুল ছাড় সায়ুর বাচ্চা! চুল ছাড়। সারা রাত গুগল ঘেটে মেয়ে পটানোর স্পেশাল হেয়ার স্টাইল শিখেছি। এই স্টাইল যদি নষ্ট হয় তবে আজ তোর রক্ষে থাকবে না কইলাম… ‘
‘ যা ইচ্ছা কর। তার আগে বল কোন আক্কেলে আমাকে লিলিপুট ডাকিস তুই? আমাকে দেখে লিলিপুট লাগে? হাইট কম হলে সেটা আমার ভবিষ্যত জামাইয়ের সমস্যা৷ তুই কেনো বারবার এটা বলে খোঁচা দিবি, হ্যাঁ? ‘
‘ আয়ান্না থামা এরে। আমার বা*ল বাঁকা হইলে কিন্তু খুনাখুনি হয়ে যাবে কয়লাম.. ‘
নুহাশের মতো একই সুরে চেঁচিয়ে উঠলো সায়েরী-ও,
‘ আয়ান! ওরে বল যেন আর কখনো আমার হাইট নিয়ে খোঁচা না দেয়। ‘
দুজনের চেঁচামেচি তে আয়ান সহ বাকি দুই বান্ধবী অতিষ্ঠ। বার কয়েক বলেও থামতে পারলো না। কিন্তু হঠাৎ তাদের তর্কবিতর্ক ছাপিয়ে শুনা গেল গমগমে কন্ঠের এক রাম ধমক,
‘ হচ্ছে টা কি এখানে? পাবলিক প্লেসে এতো চেঁচামেচি কিসের? ‘
কন্ঠ-টা কর্ণগোচর হওয়া মাত্র সায়েরী সহ উপস্থিত সকলে তটস্থ হয়ে উঠল। সায়েরী চট জলদি ছেড়ে দিল নুহাশের চুল। সঙ্গে সঙ্গে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল নুহাশ। তাকিয়ে দেখল সাফওয়ানের অবয়ব। সকালের সেই একই বেশভূষায়, গম্ভীরমুখে দাঁড়িয়ে। কপালের মধ্যভাগে তিন, চারটে ভাঁজ লক্ষনীয় তার। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ সায়েরীতে। যা দেখে ঢোকের পর ঢোক গিলল মেয়েটা। সাফওয়ান মূলত এসেছে সাফ্রিন – সহ বর পক্ষের মেয়েদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। পার্কিং লটে এসে পরিচিত কন্ঠের চেঁচামেচি কানে বাজতেই সে বাধ্য হয়ে এই নিরিবিলি, গোপন স্থানে পা রেখেছে। এবং চেঁচামেচির কারণ উদঘাটন করে সে হতাশ। এই মাথামোটা সব ম্যাচিউর হবে টা কবে?
সাফওয়ানের গম্ভীর মুখ দেখে বন্ধুরা সব একে একে সরিয়ে ফেললো নিজেদের। সায়েরী নিজেও পালাতে চাইল। কিন্তু মূল স্থানেই দাঁড়িয়ে সাফওয়ান ভাই। অন্যরা যতটা অবলীলায় পার হয়ে যেতে পেরেছে, সে পারবে না নিশ্চিত। তবুও সে কদম বাড়ালো। থমথমে করে রাখল মুখশ্রী। ভেতরের ভয়টুকু বুঝতে দিতে চাইল না সাফওয়ান কে। কিন্তু সাফওয়ান অসন্তুষ্ট গলায় বলে উঠলো,
‘ কান্ডজ্ঞান কি এই জীবনে হবে না তোমাদের? পাবলিক প্লেসে কেউ এভাবে চেঁচামেচি করে? তোমরা কি বাচ্চা রয়েছে গেছ এখনো? ‘
সায়েরী ভ্রুঁ কুঁচকালো। থমথমে গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ এটা কোথাকার পাবলিক প্লেস? এদিকে তো কেউ নেই যে শুনবে। ‘
‘ এখানে কারো থাকার প্রয়োজন ও নেই। বিনা স্পিকারে রোড অবধি ডি জে বাজিয়ে দিয়েছ। ইডিয়ট’স! ‘
একথা শুনামাত্র ফোঁসফোঁস করে শ্বাস ছাড়ল সায়েরী। দুই হাতে পরণের ভারী কাপড়টা উঁচু করে ধরে সাফওয়ানের কাছাকাছি এসে থমথমে গলায় বলে উঠলো,
‘ আমাকে শাসাচ্ছেন কেনো? আপনি জানেন ওরা আমাকে কি বলেছে? ‘
লাল,সাদা সংমিশ্রণের চকচকে নতুন জামা পরিহিতা, সেজেগুজে পুতুল হয়ে থাকা বাচ্চা প্রেয়সীকে সাফওয়ানের রাগ গলে গিয়েছে সেই কবেই। চোখের পলকে বদলে গেল তার অভিব্যক্তি। মানুষ জনের আনাগোনা না পেয়ে সুযোগ কাজে লাগালো সে। বড় অনাসয়ে পোক্ত ডান হাতটা প্রেয়সীর পিঠে ছুঁয়ে দিয়ে কাছে ঠেনে নিল তাকে। আদুরে গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ কি বলে ফেলেছে আপনাকে? ‘
এটুকু আশকারা-য়, এটুকু আহ্লাদে ছোট্ট বাচ্চার ন্যায় গলে গেল সায়েরী। ভুলে গেল সকাল হতে জমিয়ে রাখা অভিমান সব। খেলতে গিয়ে সাথীদের কাছে অপদস্ত হলে ছোট বাচ্চারা যেমন মায়ের কাছে নালিশ করে। তেমন করেই সাফওয়ানের কাছে অভিযোগের পুটলি খোলে বসলো সে। বুলি ছুটলো তোতাপাখি’র ন্যায়। তার মেয়েলি অবয়ব মিশে রয়েছে পুরুষালী বক্ষপটের সঙ্গে। সেই অবস্থাতেই হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে অবিরত কথা বলে যাচ্ছে মেয়েটা৷ সাফওয়ান তাকিয়ে রইল অনিমেষ দৃষ্টিতে। ডার্ক ওয়াইন লিপগ্লস লাগানো ওষ্ঠজোড়া থেমে নেই। অনবরত বলে যাচ্ছে তো বলেই যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে অগোচরে শুকনো গলা ভেজাল সাফওয়ান। পুরুষ চিত্ত হাহাকার করছে একটুখানি ওই রঞ্জিত ঠোঁট জোড়া ছুঁয়ে দেওয়ায় আকাঙ্খায়। বাম হাত গলিয়ে দিল সে সায়েরীর কানের নিচে। বৃদ্ধ আঙ্গলের সহিত উঁচু করলো থুতনি। বিন্দুমাত্র সতর্কবার্তা না দিয়ে সহসা পুরু উষ্ঠজোড়া ছুঁয়ে দিল মেয়েলী থুতনি-টা। নিঃশব্দে, শক্ত এক চুমু বসাল সেখান টাই। অবিরত কথা বলতে থাকা মেয়েটা এ যাত্রায় বোবা বনে গেল। তনু,মনে ঝংকার খেলে গেল দৃশ্যমান রূপে। অবচেতনে নখ ডেবে গেল সাফওয়ানের ফর্সা হাতে। তাকে এমন চুপসে যেতে দেখে আলগোছে হেসে মুখ তুললো সাফওয়ান। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই সায়েরী লজ্জা লুকানোর চেষ্টায় হন্তদন্ত করে বলে উঠলো,
‘ আমি কি বলেছি শুনেছেন আপনি? ‘
পুণরায় সায়েরীর কোমর বেষ্টনী ধরে রাখা হাতটা দৃঢ় করলো সাফওয়ান। মেয়েটার মুখের উপরে উঁকিঝুঁকি মারতে থাকা চুলগুলো তর্জনী দ্বারা সরিয়ে দিতে দিতে শুধালো,
‘ নুহাশ তোমার হাইট নিয়ে হাসি তামাশা করেছে। আয়ান শুনেও ওকে বকেনি। নাজরাত বর পেয়ে বোন ভুলে গিয়েছে। আর তোহা, সাফা মিলে আমার দেওয়া লাভ বাইট নিয়ে লজ্জা দিয়েছে…তারপর? ‘
শেষের কথাটা শুনে সায়েরী’র কান উষ্ণ হয়ে উঠল। লাভ বাইট? এই শব্দ দুটো আদতেও উচ্চারণ করেছে সে? লজ্জায় হাঁসফাঁস করতে থাকা তার কোমর চেপে খানিকটা উঁচুতে তুলে নিল সাফওয়ান। লজ্জাবতী পাতার ন্যায় নুইয়ে যাওয়া মুখশ্রী টির অতি সন্নিকটে নিজের মুখ নিয়ে ফের প্রশ্ন করল,
‘ তারপর কি? ‘
সায়েরী ছটফটিয়ে উঠল গুঁইসাপের মতো। জমিনে পা রাখার চেষ্টা করতে করতে আমতাআমতা করে বলে উঠলো,
‘ ক..কিছুনা। নামান আমাকে। ‘
বিনাবাক্য সেকথা মেনে নিল সাফওয়ান। ছাড় পাওয়া মাত্র দুইহাতে পরণের জামাটা খানিকটা উঁচু করে ধরে রীতিমতো ছুটে পালালো সায়েরী। সেই গমন পথের দিকে তাকিয়ে সাফওয়ান নিঃশব্দে হাসলো। মেয়েটার শিরা উপশিরা সম্পর্কে অবগত সে। এই যে সে ইচ্ছে করে লজ্জা দিল। এতে করে আগামী ঘন্টা দুয়েক আর কোনো ঝগড়া,চেঁচামেচি তে লিপ্ত হবে না মেয়েটা। সকলের মাঝে থাকলেও গুটিয়ে থাকবে লজ্জাবতী লতিকা হয়ে। প্রেমিক পুরুষের অধর ছুঁয়ে দেওয়া স্থানটাতেও যে অন্য কোনো স্পর্শ লাগতে দিবে না, এটা সম্পর্কেও বেশ ভালো করে অবগত সাফওয়ান।
বিউটি পার্লারের ওয়েটিং এরিয়ায় উপস্থিত পাঁচ বন্ধু বান্ধব। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মেকআপ রুমের থাই গ্লাসের ধার খুলল অবশেষে। পাঁচ মানব-মানবীর কথা থামলো মুহুর্তেই। দৃষ্টি স্থির হলো পরিচিত রমনীর অপরিচিত রূপ দেখে। মেরুন এবং গোল্ডেন সংমিশ্রণের ভারী লেহেঙ্গা নাজরাতের গায়ে। দোপাট্টা আড়াআড়ি ভাবে ডান কাঁধ হতে বাম কোমরে এসে ঠাঁই পেয়েছে। বউ সাজে এক অনন্য রূপ তার। লাল টুকটুকে রং ধারণ করা মেহেদি রাঙানো হাতজোড়ায় দুই ডজন চুড়ি। মাঝে ঝুলছে ঝুমকা। একই ডিজাইনের ভারী হার গলায়, কানে দুল, মাথায় টিকলি, সীথা পাট্টি। এবং নাকে গোল আকৃতির নথুনি। যা গিয়ে আটকেছে বাম পাশে চুলের ভাঁজে। ঘোমটায় ঢাকা মাথার মধ্যভাগ। পিঠের পেছনে ঝুলছে বর্ধিতাংশ। বউ সাজে সজ্জিত বান্ধবীকে আগাগোড়া দেখে প্রায় কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে ভুলে গেল উপস্থিত পাঁচ বন্ধু-বান্ধব। মুগ্ধতা, ভালোবাসায় টইটম্বুর দৃষ্টি তাদের। একই তালে শুনা গেল পাঁচ-টি অস্পষ্ট কন্ঠের মুগ্ধতা প্রকাশ, ” মাশা আল্লাহ! ”
নাজরাত মৃদু হাসলো তাদের প্রতিক্রিয়া দেখে। চুড়ি ভর্তি দুই হাতের রিনিঝিনি ছন্দ তুলে লেহেঙ্গার দুই ধার কিঞ্চিৎ উঁচিয়ে এগিয়ে আসলো দুই কদম। কন্ঠে কৌতুহল মিশিয়ে শুধালো,
‘ কেমন লাগছে? ‘
উক্ত প্রশ্নের বিপরীতে প্রতিউত্তর করতে অক্ষম বন্ধুরা। মেয়েলি তিন জোড়া চোখে টলমলে অশ্রু জমেছে। অথচ ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। কি বলবে! কীভাবে প্রকাশ করবে অনুভূতি টুকু! আবেগঘন মুহুর্তে সহসা দৃষ্টি নামিয়ে গলা খাঁকারি দিল নুহাশ। স্বভাবসুলভ কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আটা-ময়দা কিছু বাদ রাখছস বাকিদের জন্য? ‘
নাজরাতের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল মুহুর্তেই৷ আয়ান মাথা নুইয়ে হেসে ফেললো। হাসলো মেয়ে তিনজন-ও। নাজরাত চোখ কুঁচকে মুখে বিরক্তিকর শব্দ করে ডাকল, ‘ নুহাশ!! ‘
নুহাশ নিজেও হেসে ফেললো এবারে। স্টাইল করে আছড়ানো চুলে হাত বুলিয়ে বললো,
‘ সুন্দর লাগতেছে রে মা.. চ্যাতে যাচ্ছস কেন? ‘
নাজরাত কে প্রতিউত্তরের সুযোগ দিলনা তিন বান্ধবী। পূর্বেই কাছে এসে তিন দিক থেকে আলতো হাতে জড়িয়ে নিল তাকে। সবার আগে শোনা গেল তোহার আমোদিত কন্ঠস্বর,
‘ ভীষণ ভীষণ সুন্দর লাগছে তোকে। আমাদের কল্পনার চেয়েও বেশি সুন্দর। আমার দেখে মোস্ট প্রিটিয়েস্ট ব্রাইড, এভার। মাশা আল্লাহ ! ‘
একই সুরে তাল মিলালো বাকি দুজন। নাজরাত এটুকুতেই গলে পানি। বউ রূপে তাকে তার বর দেখবে, মুগ্ধ হয়ে কমপ্লিমেন্ট দিবে, এতো ভীষণ স্বাভাবিক। সব বরেরা-ই বউ দেখে মুগ্ধ হয়। কিন্তু এই যে তার বন্ধুরা তাকে দেখে মুগ্ধ হলো, আবেগে আপ্লূত হলো, এটাই তো তার জন্য বড় প্রাপ্তি। এই বন্ধু গুলো তার জীবনের অর্ধেক অংশ জড়িয়ে। দুর্বলতা-ও এরা, আবার সাহস ও এরাই। আবেগে টলমলিয়ে উঠা দৃষ্টি সামাল দিল নাজরাত। চোখ তুলে বাকি দুই বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
‘ তোরা দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? কাছে আয়.. ‘
এটুকু আহ্বানের অপেক্ষায় ছিল যেন বাকি দুজন। বলার প্রায় সঙ্গে তোহার পেছন হতে আলতো হাতে জড়িয়ে ধরলো আয়ান, অপরদিকে সায়েরীর পাশ হতে ধরলো নুহাশ। ঠিক যেমন করে স্কুলে পড়াকালীন সময়ে কোনো চোপা রুস্তমি করে হেসে খেলে গ্রুপ হাগ করা হতো, আজও তেমন করেই একে অপরের সঙ্গে মিলিয়ে গেল ছয়টি দেহ। কতগুলো বছর কেটে গেল একসঙ্গে.. এমন একটা দিন কেবল কল্পনা করেছিলো তারা। যেখানে ছিল সাত-সাতটি অবয়ব। আজ কমতি একজনের। কেউ মুখ ফুটে না বললেও সকলে জানে, ওই একজনের কমতি সকলে অনুভব করছে। কিন্তু কারো কোন অভিযোগ নেই। প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি নিয়েই তো জীবন। এই শুভ ক্ষণে অপ্রাপ্তি টুকু ভুলে.. কেবল প্রাপ্তি নিয়েই নাহয় শুরু হোক নতুন পথচলা।
কনভেনশন হলে কনে পক্ষের সকলে উপস্থিত হয়েছে বেশ অনেক্ষণ হলো। বড়রা ব্যস্ত মেহমান আপ্যায়নে। অন্যদিকে নাজরাতের কাজিন,বন্ধুমহলের সকলে ব্যস্ত নিজেদের পরিকল্পনায়। গেইট আটকানো, জুতা চুরি সব নিয়ে ভীষণ এক্সাইটেড তারা। আকদ্-এর সময়ে বর পক্ষ ছাড় পেয়ে গেলেও এবারে কোনো প্রকার ছাড় দিতে প্রস্তুত নয় কনে পক্ষ। কীভাবে জোর করে টাকা হাতানো যায় এই নিয়ে পরিকল্পনায় মেতেছে সকলে। বর পক্ষের আত্মীয় হওয়ার দরুন অনুপস্থিত সাফ্রিন। সে আসবে বর যত্রীর সঙ্গে। সে ব্যতীত বাকিরা সুন্দর মতো পরিকল্পনা সাজিয়ে ধূর্ত হাসি হাসলো। এবার অপেক্ষা কেবল বরযাত্রীর।
অবশেষে দীর্ঘক্ষণের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কানে আসলো ‘বর এসেছে, বর এসেছে’ ছন্দ। মুহুর্তেই কোলাহল বেড়ে দ্বিগুণ হলো। সায়েরী, তোহা ছুট লাগাল প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হাতে নিয়ে৷ গেইটের কাছে আসতেই নজরে আসলো রাস্তার কিনারে এসে থামানো গাড়িগুলো। হায়েসের সংখ্যা অধিক। মাঝে কালো রঙের একটি টয়োটা কার। যার বনাটের দিকে ফিতে টেনে ফুল দ্বারা সাজিয়ে তুলেছে। গাড়িটির ফ্রন্ট সিট এবং ব্যাক সিট হতে একই সঙ্গে বেরিয়ে আসলো, সাহিল-ইভান। পরপরই ড্রাইভিং সিটের ধার খুলে নামলো সাফওয়ান। প্রথমেই নজরে আসলো জমিন স্পর্শ করা পলিশড ব্ল্যাক শো (shoe)। পরপরই কিঞ্চিৎ বাদামি আভা ছড়ানো ঘন চুলের মস্তক দেখা দেয় দৃশ্যপটে। বেরিয়ে আসে লম্বাটে দেহটি। গায়ে তার কটন ফেব্রিকের ডার্ক ওয়াইন শার্ট। যা বেশ ফরমাল ভঙ্গিমায় ব্ল্যাক স্লিম প্যান্টের ভাঁজে ইন করা৷
কোমরে পেছানো কালো বেল্ট। গুটিয়ে রাখা হাতার নিচ দিকে দৃশ্যমান উজ্জ্বল ফর্সা হাত। লেপ্টে রয়েছে ঘন কালো লোম। ডান হাতের কব্জিতে বরাবরের মতো ব্ল্যাক লেদারের অ্যাপল ওয়াচ-টি। আঁটসাঁট হয়ে দেহের সঙ্গে জড়ানো শার্ট-টির ভাঁজে ফুলেফেঁপে উঠেছে ইস্পাত কঠিন দেহটির আকর্ষণীয় মাংসপেশি, বলিষ্ঠ, পেশিবহুল বাহু। রৌদ্রেরঝাঁজের তীব্র ঝলকানিতে চোখ কুঁচকালো মানব। এমন রোদের তেজে তার সুদর্শন অবয়ব দ্বিগুণ সুদর্শন দেখাচ্ছে। ছোট ছোট চোখ করে সে প্রথমেই দৃষ্টি মেলে তাকাল কনভেনশন হলের গেইটের কাছটাতে। নির্দিষ্ট রমনীর ডাগরডোগর দৃষ্টির সঙ্গে মিলিত হলো দৃষ্টি। মেয়েটা অনিমেষ তাকিয়ে। বিনা পলক ফেলে, কেবলমাত্র ব্যক্তিগত পুরুষটার দিকেই স্থির রেখেছে দৃষ্টি। তার উপহার করা শার্ট-টি গায়ে জড়িয়ে প্রেমিক পুরুষটাকে এতটা নজরকাড়া লাগবে তা কল্পনা করেনি সে।
দৃষ্টি থমকেছে তার। আশেপাশের কারো দিকে ধ্যান নেই যেন। এই দৃশ্যে সাফওয়ান অকস্মাৎ নিজ অধরজোড়া একে অপরের সঙ্গে চেপে প্রসারিত হতে চাওয়া হাসিটুকু গিলে নিল। ফিরিয়ে নিল দৃষ্টি। বুক টান টান করে দাঁড়িয়ে গম্ভীরমুখে সাহিলকে ইশারা করা মাত্র সাহিল এসে খুলে দিল ব্যাক সিটের অপর দরজা। উৎসুক কনে পক্ষের সকলেই অপেক্ষারত ছিল বরকে একঝলক দেখার আশায়। পরিশেষে দেখা মিললো কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটির। সকলের দৃষ্টির মধ্যমনি হয়ে হাস্যজ্বল চিত্তে বেরিয়ে আসলো শাহরিয়ার সাদিফ। ভারী কারুকাজ খচিত গোল্ডেন শেরওয়ানি তার পরনে। যার ভেতরে অন্য একটি গোল্ডেন কুর্তা, একই রঙের পায়জামা। কাঁধের বাম দিকে একটি ভারী চাদর। যার মাঝেও বেশ সুন্দর কারুকাজ করা। বাম কাঁধ হতে পিঠের দিকে ঘুরে ডান হাতের কনুইয়ের ভাঁজে বেশ রাজকীয় ভঙ্গিতে ধরে রেখেছে তা। মাথায় পাগড়ি, যাতে হোয়াইট স্টোনের কালগি লাগানো।
বেশভূষার সঙ্গে মিলিত জুতো সহ আগাগোড়া তাকে দেখে চোখ জোড়ালো সকলে। কনে পক্ষের পুরুষেরা এগিয়ে এসে সাদরে গ্রহণ করলো তাদের কে। ফুলের থালা হাতে দন্ডায়মান মেয়েদের মাঝে অন্যমনস্ক সায়েরীকে খোচা মারলো তোহা। সহসা সম্বিৎ ফিরে পেল মেয়েটা। নিজের বেলাজ দৃষ্টি ঘুরিয়ে ফুল ছুড়ল বরের দিকে। গেইটের কাছাকাছি এসে ইভান-সাহিল বাঁকা হাসলো তোহা এবং সায়েরীর দিকে তাকিয়ে। মেয়েরা দেখেও অগ্রাহ্য করলো তা। এবারেও সেই প্রথম বারের মতোই একই দাবি নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে কনে পক্ষ। নগদ বিশ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া ছাড়া ভেতরে প্রবেশ নিষেধ। ইভান চড়া গলায় তুমুলযুদ্ধ বাধাল তোহার সঙ্গে। থেমে নেই তোহাও। সাহিল এবারে অনেকটাই কোমল আচরণ করছে। ইভানের তালে তাল মিলানো ব্যতীত সায়েরীর জোর গলার বিপরীতে কিছুই বলছে না সে৷ মিনিট কয়েক অতিক্রম হলো। তর্ক-বিতর্কে সাহিল-ইভানের গলা শুকিয়ে এসেছে।
উপায়ান্তর না পেয়ে তারা হাক ডাকল একমাত্র আশা ভরসার সাফওয়ান’কে। রূপম, সাহিল এবং ইভান সরে দাঁড়িয়ে সাফওয়ান’কে এগিয়ে আসতে আহ্বান দিল। ইতোমধ্যে কনে পক্ষের সাইডে এসে হাজির হয়েছে সাফ্রিন। বান্ধবী হওয়ার সুবিধা যাকে বলে। সে চুপচাপ উপভোগ করছে ভাই-বান্ধবীদের ঝগড়া। সাফওয়ান এগিয়ে আসলো। তাকে দেখে সম্পূর্ণ রূপে চুপসে গেল তোহা। সায়েরী-ও চুপ। ইভান কলার উঁচিয়ে হাসলো তা দেখে। ভাবলো, গত বারের মতো সাফওয়ানের বিপরীতে কেউ-ই তর্কে জড়াবে না। কিন্তু তাদের আশ্চর্য করে দিয়ে শোনা গেল সায়েরী’র তেজস্বী স্বর। সাদিফের উদ্দেশ্যে বলছে,
‘ বিশ হাজারের চেয়ে এক টাকাও কম নিবো না, ভাইয়া। এভারে কিপ্টামি করলে কিন্তু বউ ছাড়া ফিরতে হবে। ‘
আড় চোখে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে ফের বলে উঠলো,
‘ কেউ মাতব্বরি করতে আসলে জানিয়ে দিন.. ফলাফল একদম ভালো হবে না। ‘
সুক্ষ্ম ইঙ্গিত টুকু বুঝতে পেরে কপাল কুঁচকে এলো সাফওয়ানের। তবে মুখশ্রী স্বাভাবিক। মেয়েটা যে মান – অভিমানের পাল্লা এখনো মিটাইনি তা বুঝতে পেরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। ফের তর্কাতর্কি তে লিপ্ত হওয়া ইভানের হাত থেকে ছিনিয়ে নিল টাকার খাম। সেটাতে একনজর চোখ বুলিয়ে সায়েরীর হাতে থাকা ফুলের থালায় তা সপে দিতে দিতে ভাইদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,
‘ এই দশ বিশ হাজারের জন্য কেনো আমরা দুই ভাইয়ের না হওয়া সংসার ভেস্তে দিচ্ছিস বলতো? চুপচাপ যা বলছে মেনে নে না.. ‘
টাকা পাওয়া মাত্র উচ্চ স্বরে হইহই করে উঠলো কনে পক্ষ৷ ফিতে কাটার ছোট্ট কাঁচি-টা এগিয়ে দিল সাদিফের দিকে। এদিকে ইভান এবং সাহিল
আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে। যার আশা ভরসায় রাজার মতো ভাব নিচ্ছিলো তারা, সে-ই কিনা এভাবে প্রজার ন্যায় হার মেনে নিল! কেনো? কি কারণ?
বর যাত্রীর সকলে প্রবেশ করলো ভেতরে। স্টেজে বসানো হলো বর-কে। এবার অপেক্ষা কনেকে দেখার৷ সাদিফের মন ভীষণ উতলা হয়ে আছে। বউটা কেমন নিষ্ঠুরতা করেছে তার সঙ্গে৷ অন্তত ছবিতে এক ঝলক দেখলে শান্ত হতো সাদিফের অশান্ত হৃদয়। কিন্তু বউটা তার অস্থিরতা বুঝলে তবেই তো..
বিয়ের অধিকাংশ দায়িত্ব একাই কাঁধে তুলে নেওয়া আবরার নূন্যতম সময় পেলো না আশেপাশে ভালো ভাবে লক্ষ্য করার। এই মুহুর্তেও সে মেহমানরা ঠিকঠাক খেতে পারছে কি-না সেই তদারকিতে ব্যস্ত। সেদিক হতে ঘুরে এসে স্টেজের দিকটাতে এগিয়ে আসছিলো সে। গন্তব্যে পৌঁছে আচমকা তার চঞ্চল পদচারণ থমকালো সম্মুখ হতে এগিয়ে আসা সাফওয়ান কে দেখে। তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যাল করে। নিজের গায়ের ওয়াইন কালার শার্ট খানার দিকে তাকিয়ে, ফের আশ্চর্য হয়ে চাইলো সাফওয়ানের দিকে। দেখল, একই ভঙ্গিতে সাফওয়ান নিজেও নিজের দিকে তাকিয়ে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকিয়ে আছে আবরারের দিকে। দুজন একই সুরে, একই সঙ্গে বলে উঠলো,
‘ এই শার্ট তোকে কে দিয়েছে? ‘
প্রশ্ন করেও দুজন আশ্চর্য। প্রথমেই দৃঢ় স্বরে প্রতিউত্তর করলো আবরার,
‘ সায়ু আমাকে গিফট করেছে। গতমাসে, আমার জন্মদিনে। কিন্তু তুই কোথায় পেলি একই শার্ট? একেবারে একই তো দেখতে.. ‘
‘ আমাকেও তো সু.. ‘
আনমনে প্রতিউত্তর করতে গিয়েও আকস্মিক থমকাল সাফওয়ান৷ গিলে ফেললো বলতে চাওয়া কথাটুকু। আবরার ভ্রুঁ কুঁচকালো। সন্দিহান কন্ঠে শুধালো,
‘ তোকেও কি? থেমে গেলি কেনো? ‘
পকেটে একহাত ঢুকিয়ে ভাব নিয়ে দাঁড়ালো সাফওয়ান। বুঝাতে চাইল, সে ভিষণ নির্বিকার। কিন্তু ভেতরে কিঞ্চিৎ ভড়কেছে। এই বুঝি টুপ করে ধরা পড়ে গেল! কন্ঠস্বর গম্ভীর রেখে সে ফের বলে উঠলো,
‘ সোমবার.. সোমবারে কিনেছি। এটাই বলতে চেয়েছি। ঢাকা শহরে কি শার্টের অভাব পরেছে নাকি? একই রকমের কতশত শার্ট আছে। কোইনসিডেন্স-লি মিলে গেছে আমাদের টা-ও। এটা নিয়ে এতো ভাবার কি আছে? ‘
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে দম ফেললো সে৷ আবরার বুঝ পেয়ে মাথা নেড়ে সায় জানালো৷ ঠিক সেই মুহুর্তে উক্ত স্থানে হাজির হলো সায়েরী। উচ্ছ্বাসিত মুখশ্রী মেয়েটার। কিন্তু ভাই এবং প্রেমিক দুজনকে একই বেশে, একে অপরের সম্মুখে গম্ভীরমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থমকে গেল বেচারি। ভড়কে উঠে আপনমনে বিড়বিড় করলো,
‘ লে হালুয়া! ‘
সাফওয়ান এবং আবরার দুজনেই তার দিকে তাকিয়ে। তাদের স্বাভাবিক নির্লিপ্ততা দেখে মেয়েটা বুঝে উঠতে পারলো না পরিস্থিতি। তার দেওয়া উপহার দুটো এই দুজন কে আজকেই পরতে হলো! ভাই এখন জানতে চাইলে কি বলবে সে? কি বলা দরকার তার? অপ্রস্তুত সে শূন্য মস্তিষ্কে আবরার কিছু বলার পূর্বে, নিজেই হড়বড়িয়ে বলে উঠলো,
‘ আ..আরে বাহ! তোমরাও ম্যাচিং আউট ফিট নিয়েছ দেখি। খুব সুন্দর! হে হে.. ‘
তার কেবলা কান্ত মার্কা হাসির বিপরীতে সন্দিহান নজরে তাকিয়ে আবরার। বললো,
‘ মাথা ঠিক আছে তোর? এটা তো তুই-ই গত মাসে গিফট করেছিলি আমাকে৷ তাও আমার জন্মদিনে। মগজ নড়ে গেছে নাকি? ‘
সায়েরী অধর চাপে নিজের৷ এ কি বেক্কল মার্কা কথা বলে ফেলেছে! সাফওয়ান চোখ বুজে হাতাশায় ভরা শ্বাস ফেলে। বাম হাতের তর্জনী দ্বারা ভ্রুঁ কুঁচকে বিড়বিড় করে, ‘ মাথামোটা! ‘
আড়চোখে সাফওয়ানের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে সায়েরী বুঝে ফেললো এই ছোট্ট অপমান টুকু। নজর ফিরিয়ে নিজের ভাইয়ের দিকে তাকালো সে। ব্যস্ত কন্ঠে সাফাই গাইল,
‘ বিয়ে বাড়ির এত এত কাজ করতে হচ্ছে আমাকে। আমার কি আর মনে আছে মাস, দুইমাস আগের কথা! কতো কতো দ্বায়িত্ব.. উফফ! দেখি সরো, এখনো চুরিও করা হলো না। তোমাদের মতো ফ্রি বসে নেই আমি.. ‘
সাফওয়ান – আবরার আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে। তারা ফ্রি বসে আছে? তারা! দুই দিনে দমটুকু ফেলার ফুরসত পাচ্ছে না। মেয়েগুলো কি সুন্দর সেজেগুজে ঢিংঢিং করে ঘুরছে। আর এখন বলছে কি! দুই বন্ধু মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। নিজেদের জন্য সাফাই গাইতে চেয়েও চুপ মেরে যায়। কিন্তু সায়েরী’র শেষ কথাটার রেশ ধরে দুজন একই সুরে বলে উঠে,
‘ চুরি? কি চুরি করতে যাচ্ছ? ‘
সায়েরী আনমনে উত্তর দিতে গিয়েও চুপ মেরে যায়। পিটপিট নজরে তাকায় সাফওয়ানের দিকে। অতঃপর আবরারকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকে,
‘ এদিকে আসো, ভাইয়া। তোমার বন্ধুকে জানানো যাবে না। শুধু তোমাকে বলবো। ‘
মুহুর্তেই চেহারার রঙ উবে গেলো সাফওয়ানের। তাকে বলা যাবে না মানে? তার সঙ্গে কিসের গোপনীয়তা। এ তো রীতিমতো অপমান!
আবরার মাথা নামায় সায়েরীর কাছাকাছি। তার কানে ফিসফিস কন্ঠে সায়েরী জানালো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা টুকু। বিনিময়ে মুচকি হাসে আবরার। মাথা নেড়ে সায় জানায়। বলে,
‘ সুপার ডুপার আইডিয়া। কিন্তু আমি নেই এসবে, তোরা কর যা করার। ‘
সায়েরী দায়সারা ভাবে জবাব দেয়,
‘ তোমাকে কেউ ডাকছেও না। আচ্ছা সরো, আমাকে যেতে দাও। ‘
কয়েক কদম এগিয়ে ফের বলে উঠে,
‘ খবরদার অন্য কাউকে কিছু বলবে না ভাইয়া। প্ল্যান ভেস্তে গেলে কিন্তু তোমাকে আস্ত রাখবো না বলে দিলাম। ‘
” অন্য কাউকে কিছু বলবে না ” কথাটা যে সাফওয়ানের দিকে সুক্ষ্ম ইঙ্গিত দিয়েছে তা বুঝতে পেরে মুখশ্রী গম্ভীর হয়ে এলো সাফওয়ানের। ছোট থেকে ছোট ঘটনাও তার কাছে অবলীলায় বলে ফেলা মেয়েটা আজ এমন গোপনীয়তা রাখছে তার কাছে? ভাবতেও তরতরিয়ে মেজাজ গরম হচ্ছে। এত স্পর্ধা বেড়েছে! একটা বার সুযোগ মিলুক শুধু, সব গোপনীয়তা চুকিয়ে দেবে।
‘ এত কি ভাবছিস? চল গিয়ে দু’টো ছবি তুলে আসি। এমন টুইনিং করার সৌভাগ্য তো আর রোজ রোজ মিলবে না। আজ কাকতালীয় ভাবে মিলে গেছে। ভালোই হলো.. ‘
গাল ফুলিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো সাফওয়ান। মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে আবরারের সঙ্গে পা বাড়ালো ক্যামেরাম্যান এর কাছে। মনে মনে হাসলো কিছুটা। আবরারের বলা কথাটা ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে বিড়বিড় করলো, ” হুহ! কাকতালীয় ভাবে মিলে গেছে। ”
দীর্ঘ অপেক্ষার পর কনের আগমনী বার্তা এলো কানে। শুনেই বক্ষ জুড়ে শীতলতা বয়ে চলেছে সাদিফের। স্টেজের মাঝামাঝি স্থান হতে ফ্লোর জুড়ে বিছিয়ে রাখা লাল কার্পেট টার শেষ মাথায় দেখা দিলো কাঙ্ক্ষিত রমনীর পদযুগল। সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়লো সাদিফ। দেখল, তাজা ফুল দিয়ে সজ্জিত ঘোমটার নিচে, মধ্যবর্তী স্থানে দাঁড়িয়ে তার বউ। ফুলেল ঘোমটার চার কোণ উঁচু করে ধরে রেখেছে নাজরাতের ভাই সহ আবরার, নুহাশ এবং আয়ান। মাঝে টুকটুকে লাল বউ সজ্জিত নাজরাত। সাদিফ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রয়। একই দৃষ্টিতে একমাত্র বরকে, বর রূপে দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে নাজরাত। সকলের উপস্থিতিতে সে বারে বারে নজর নামাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু বেসামাল দৃষ্টি ঘুরেফিরে ফের স্থির হচ্ছে সাদিফের উপর।
স্টেজের কাছাকাছি পৌঁছাতেই সাদিফ হাত বাড়িয়ে উঠতে সাহায্য করলো তাকে। একহাতে কিঞ্চিৎ উঁচু করে ধরলো লেহেঙ্গার একাংশ। কাছ থেকে, হাত ছুঁয়ে সে প্রলুব্ধ নয়নে অবলোকন করলো বউকে। নাজরাত অনুভব করলো, ধরে রাখা হাতখানার উপর পুরুষালি হাতটার মৃদু কম্পন। আশ্চর্য হলো সে। আড়চোখ সকলের দিকে পরখ করে ফের চোখ তুলে চাইল সাদিফের দিকে। মৃদু স্বরে, সকলের অগোচরে ডাকলো,
‘ সাদিফ!! ‘
সহসা দৃষ্টি নামালো মানব। পাশাপাশি বসেও ছাড়লো না হাত। মিনিট খানিক পর পুণরায় ফিরে তাকালো। বউয়ের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে ক্ষীণ স্বরে স্বগোতক্তি করল,
‘ এই দিনটার জন্য কতগুলো বছর ধরে অপেক্ষায় ছিলাম আমি! অবশেষে.. অবশেষে তোমাকে বউ সাজে দেখছি। আমার বউ! মিসেস শাহরিয়ার সাদিফ! ‘
তার কন্ঠে স্পষ্ট কম্পন, উত্তেজনা। নাজরাত টের পেলো সবই। অনুভব করলো কাছে থেকে। ধরে রাখা হাতখানায় এবার সে নিরবে জোর দিলো। নিরবতায় যেনো বুঝিয়ে দিয়েছে, কিচ্ছুটি স্বপ্ন নয়। সবটা বাস্তব। বহু প্রতীক্ষিত সেই শুভ ক্ষণ আজ..
বর-কনের হাজারো ছবি ক্যামেরাবন্দী করার পর প্রথমেই ছুটে এসেছে নাজরাতের বন্ধুমহল এবং সাদিফের কাজিন সমাবেশ। তাদের সকলের হৈচৈ এর বিপরীতে অন্যরা চুপসে। দুই পক্ষের সকলে ছবি উঠালো একে একে, জুটি মিলিয়ে, বোন-বোন , ভাই-ভাই মিলে। অতঃপর যখনই কনের বন্ধুদের ছবি তোলায় পালা এলো, ঠিক সেই মুহুর্তে দেখা গেল নিজ বিয়ের আসর হতে বরকেই সরে যেতে হয়েছে। বর দিব্যি দাঁড়িয়ে ক্যামেরাম্যানের পাশে। অন্যদিকে কনে-কে ঘিরে পাঁচ বন্ধু-বান্ধব। নাজরাত হতাশ চোখে তাকায় নিজ বরের দিকে। ঠোঁটের ইশারায় বোঝায় ‘ স্যরিই..’ সাদিফ চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করে তাকে। না চাইতেও হেসে ফেলে ওদের কান্ড দেখে। এতোটা প্রাণোচ্ছল সকলে!
ফ্যামিলি ফটো তোলার আগ মুহুর্তে কনভেনশন হলে আগমন হলো নওশাদ খান’র। সঙ্গে সঙ্গে বদল ঘটলো পরিবেশের। বন্ধুক হাতে, একই রকমের পোষাক পরিহিত প্রায় দশেক বডিগার্ড হলের বিভিন্ন যায়গায় কর্তব্য নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বিয়ের আয়োজনের তিন দিন আগে থেকেই পরিবারের সকলে সিলেটে চলে আসলেও, আসেননি নওশাদ খান। আজও তিনি আসবেন কি-না তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন বাকিরা। কিন্তু উনার উপস্থিতি দেখে সকলেই বেশ আনন্দিত।
নওশাদ খান নিজ বউ, ছেলে-মেয়ে নিয়ে বর-কনের সঙ্গের সঙ্গে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালেন স্টেজের দিকে। উনার বাহু জড়িয়ে হাস্যজ্বল মুখে হাঁটছে একমাত্র মেয়ে সাফ্রিন সাফা খান। লাল-সাদা চকচকে জামা পরিহিতা মেয়েটাকে এই আলোকসজ্জায় অপ্সরা লাগছে দেখতে। স্টেজেই দাঁড়িয়ে ছিল সাফওয়ান। প্রথমেই সে হাত বাড়িয়ে বড় যত্নে মা তাহুরা খানকে উঠতে সাহায্য করলো। পরপরই একই রকম ভাবে হাত ধরে, ড্রেসের ঘের সামলে ছোট বোনকেও তুলে নিলো স্টেজে৷ দূর হতে এই দৃশ্য মুগ্ধ নয়নে অবলোকন করলো সায়েরী৷ অবচেতনে ভাবলো, তার ব্যক্তিগত পুরুষটা কেনো একটা যত্নশীল সব দিক দিয়ে? মেয়েটা এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো। কল্পনায় নিজেকেও সাজিয়ে নিলো এই ছোট্ট পরিবারের একজন হিসেবে। এইতো সে দেখতে পারছে নিজেকে.. সাফওয়ান ভাইয়ের বাহু ঘেঁষে, সাফ্রিনের সঙ্গে লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে। সবার মতো হাসি হাসি মুখশ্রী তারও। দেখেই যেনো মনে হচ্ছে, অ্যা পিকচার পার্ফেক্ট ফ্যামিলি!
কনভেনশন হলটির দুটি ফ্লোর ভাড়া করা হয়েছে। মেইন ফ্লোর ব্যতিত অন্যটাতে মানুষ জনের আনাগোনা বিশেষ নেই বললেই চলে। ফাঁকফোকড়ে কেবল গুটি কয়েক মেয়েদের দেখা মিলছে। সবদিকে সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে সিড়ি বেয়ে উঠলো সায়েরী। সঙ্গে নাজরাতের চাচাতো বোন। কাঙ্ক্ষিত ফ্লোরে পা রেখে সে চোখ বুলালো আশেপাশে। এদিকটায় বিশেষ বিশেষ ইভেন্ট অনুযায়ী, বিশেষ রুমের ব্যস্ততা করা হয়েছে। ফ্লোর-টিতে ব্রেকআউট রুম এবং গ্রিন রুম রয়েছে। পশ্চিম দিকের বড়সড় রুমটার দরজায় লিখা রয়েছে স্টোরেজ রুম। দুই রমনী সেদিকেই কদম এগোল। পরে আবার কি যেন ভেবে পা বাড়ালো গ্রিন রুমের দিকে। স্টোরেজ রুমে স্টাফ-দের আনাগোনা বেশি থাকবে আজ। এর চেয়ে বরং গ্রিন রুম সুবিধার আছে। আজ তো কোনো বাড়তি প্রোগ্রাম নেই অন্য কারো, যার কারণে গ্রিন রুমের দিকটা ফাঁকা।
ভেতরেও নিশ্চয় ফাঁকা-ই হবে! কল্পনা জল্পনা শেষে দুজন এগিয়ে গেল সেদিকে। দরজা ঠেলে প্রবেশ করলো নিস্তব্ধ রুমটাতে। দিনের আলোয় ফকফকা চারপাশ। সায়েরী আসবাবপত্র গুলোর দিকে নজর বুলায়। জিনিসপত্র রাখার জন্য দেয়ালের সঙ্গে লাগানো তাক রয়েছে গুটিকয়েক। সএ ভেবে নিল, এখানের মধ্যে একটাতে রাখতে পারলেই হলো। কেউ খুঁজে পাবেনা। কিন্তু উচ্চতা! এগুলো যে তার উচ্চতার চেয়েও অনেক উপরে। নাগাল পাবে কি করে? চিন্তিত মুখে সে সঙ্গে করে আসা রমনীর দিকে চাইল। কিন্তু এই বাচ্চা মেয়েটার হাইট তার চেয়েও কম। উপায়ান্তর না পেয়ে রুমে ঘুরঘুর করে একটি টুলের সন্ধান মিলতেই স্বস্তি পেল তারা। টুল-টা টেনে নিয়ে আসতে গিয়ে শব্দ হলো বেশ। ঠিক সেই মুহুর্তে খট করে খুলে গেল বদ্ধ রুমের দরজা। দুই রমনী চমকে উঠলো। দেখল, দরজার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান এবং রূপম। সাফওয়ান বাম হাতে মোবাইল ধরে রেখেছে কানে। সেই অবস্থাতেই ভ্রুঁ কুঁচকে তাকাল সে। সায়েরীর হতবিহ্বল মুখশ্রী-তে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে প্রশ্ন ছুড়ল,
‘ কি করছো এখানে? ‘
মেয়েটা দ্বিধা নিয়ে তাকিয়ে রইল কিয়ৎ ক্ষণ। ফের কি যেন ভেবে হাতের ডালা-টা দেখিয়ে, বড্ড স্বাভাবিক গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ এটা রাখতে এসেছি। একটু পর লাগবে। নিচে বাচ্চারা নষ্ট করে ফেলবে, তাই ভাবলাম এখানে রাখি.. ‘
মোটামুটি বড়সড় ডালা-টা। তাতে হরেক রকমের ফুল এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে আছে। এটা দিয়ে এই অসময়ে কি কাজ করবে তা ভেবে পেলো না সাফওয়ান। বিশেষ ভাবলো-ও না সে। অতি সংক্ষেপে কথা বলে দ্রুত কল কাটল। সায়েরীর বাড়িয়ে দেওয়া ডালাটা তুলে নিয়ে রেখে দিল তাকের উপর। অতঃপর গম্ভীর কন্ঠে আদেশ ছুড়ল,
‘ নিচে যাও। একা একা এখানে আসার কোন প্রয়োজন নেই। ‘
সায়েরী প্রতিউত্তর করলো সঙ্গে সঙ্গে,
‘ একা কোথায়? আমি তো ওকে সঙ্গে নিয়ে.. ‘
সাফওয়ান নিরব চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে সহসা চুপসে গেল রমনী। বাধ্য বাচ্চার ন্যায় মাথা নেড়ে সায় জানালো, ‘ ঠিক আছে, আসবো না। ‘
পরমুহূর্তেই হাত বাড়িয়ে সঙ্গে নিয়ে আসা মেয়েটার হাত চেপে ধরে দ্রুত পায়ে প্রস্থান করলো।
গোল টেবিলের চতুর্দিক ঘিরে আসর বসেছে বর-কনে উভয় পক্ষের কাজিন,বন্ধুমহলের৷ এইতো, মিনিট বিশেক আগেই স্টেজে বসা বরের পা হতে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে তার জুতা জোড়া। বন্ধুদের সাহায্য করেছে স্বয়ং কনে। ছেলে পক্ষের ভাই-বোনেরা চেয়েও আটকাতে পারেনি। সায়েরী এবং তোহা দুজন দুটো জুতা হাতে নিয়ে কোথায় যে ছুটে পালিয়েছে, তার হদিস পায়নি কেউ৷ এতক্ষণে গিয়ে দেখা মিললো তাদের। স্টেজের আশেপাশে হতে হলরুম সম্পূর্ণ তল্লাশি দিলো সাহিল,ইভান,রাহাত, রূপসা এবং সাম্য-সামান্তা। কিন্তু কোথাও জুতা খুঁজে পেলো না৷ রাহাত হতাশ হয়ে বলে উঠলো,
‘ এটা কিন্তু ঠিক না, সায়েরী। পনেরো হাজার গুনতেও পারবে না তুমি। এত টাকা লুটে নেওয়ার কোনো মানেই হয়না। ‘
সায়েরী প্রতিউত্তর করার আগেই রাহাতের সম্মুখে বসা রূপসা ধমকে উঠলো তাকে,
‘ নাম ধরে ডাকছিস কেনো? আপু বল। ‘
রাহাত ভারী আশ্চর্য হয়ে তাকাল বোনের দিকে। বললো,
‘ নাম ধরে ডাকলে সমস্যা কি? ওরা আমার সম বয়সী-ই। পারলে আমি ওর চেয়ে বছর খানিকের বড় হবো হয়তো। ‘
রূপসা মানতে চাইল না একথা। আদেশের সুরে ফের বলে উঠলো,
‘ সে যা-ই হোক। সম্পর্ক বদলাতে কতদিন? আমি বলছি আপু ডাকতে, মানে আপু-ই ডাকবি। সম্মান দিয়ে কথা বল। ‘
দুই ভাই বোনের তর্কাতর্কি বেকুবের মতো দেখছে সায়েরী। শুরুতে সে বুঝে উঠতে পারলো না রূপসার বলার কারণ-টুকু। কিন্তু সম্পর্কের কথা উল্লেখ করামাত্রই লজ্জা পেয়ে গেল মেয়েটা। ভাবেনি রূপসা এভাবে জেনে যাবে৷ রূপসা ব্যতীত আরও অনেকে যে অবগত, এই ব্যাপারে এখনো জানেই না মেয়েটা।
অন্যদিকে সাহিল-ইভান রূপসার কথায় সন্দিহান নজরে তাকিয়ে। ইভান বললো,
‘ সম্পর্ক বদলাতে পারে মানে? কাকে মিন করে বলছিস বলতো? ‘
রূপসা মিটিমিটি হাসে সায়েরীর দিকে তাকিয়ে। সায়েরীর পাশে বসা বন্ধুরাও নিঃশব্দে হাসছে। রূপসা ফিচেল হেসে প্রতিউত্তর করলো,
‘ মানে হলো এই ছোট্ট, পিচ্ছি মেয়েটা ভবিষ্যতে আমাদের বংশের একজন হয়ে যেতে পারে। যেতে পারে কি..হয়েই যাবে দেখিস। দুই দিকের নিরব আবহাওয়া ও এই সিগনাল-ই দিচ্ছে। ‘
এহেন প্রতিউত্তরে সায়েরী লজ্জায় নতজানু হলো । প্রতিউত্তর টুকু শুনে অবাক হতে গিয়েও হলোনা ইভান। বরং চোরা দৃষ্টি তাক করলো সাহিলের দিকে। সাহিল নিজেও তাকাল ঠিক সেই মুহুর্তে। দুই ভাই বুঝলো, ইঙ্গিত টা বোধহয় সাহিলের দিকেই এসেছে। সাহিলকে টপকে অন্য কারো কথা চিন্তা করলেও সাফওয়ানের নামটা ঘূর্ণাক্ষরেও এলো না মস্তিষ্কে। তাছাড়া সায়েরী গতকাল রাতে নিজেও তো ইঙ্গিত দিয়েছিলো অনেক কিছুর। সব মিলিয়ে সাহিল হাওয়ায় ভেসে যেতে লাগলো। তাকে বাড়তি হাওয়া দিচ্ছে ইভান। সম্মুখে বসা রমনীটির মায়াবী মুখশ্রী’র লজ্জা মিশ্রিত হাসিটুকু তাকে আরও ঘায়েল করলো। এই দুই দিনে প্রতিটা ক্ষণে ক্ষণে প্রেমে ডুবেছে সে। পূর্বের যে অনুভূতি কেবল সাময়িক মোহ ছিলো, এবার তা গাঢ় প্রণয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। যা সে টের পাচ্ছে প্রতি মুহুর্তে। অবচেতন মন উতলা হয়ে আছে অনুভূতি টুকু ব্যক্ত করার তাড়নায়। আজ বাদে কাল পেরুতেই তো বিয়ের সব অনুষ্ঠানের সমাপ্তি। ফের কবে দেখা পাবে কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাইতো সে বড্ড উতলা হয়ে আছে মনের কথাটুকু জানিয়ে দেওয়ার আকাঙ্খায়। সায়েরী নিশ্চয়ই গ্রহণ করে নিবে তাকে! করবেই তো.. মেয়েটা নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছে এমন কিছুর। এবার শুধু শুভ ক্ষণ দেখে অনুভূতি ব্যক্ত করার পালা..
রূপম এবং সাফওয়ান এগিয়ে এসে শামিল হয়েছে বাকিদের সঙ্গে। মুহুর্তেই রূপসা সহ বাকিদের রসিকতা বন্ধ হয়ে গেলো। বড় ভাই হিসেবে সাফওয়ান-কে যথেষ্ট সমীহ করে চলে সকলে। হাসি, তামাশা করার ভাবনা তো দূরের কথা। রূপসা আনমনে ভাইয়ের গম্ভীর মুখখানা দেখে সম্মুখের হাস্যজ্বল রমনী-টির দিকে তাকালো। ভাবলো, এই রগচটা, গুরুগম্ভীর মানুষটার সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কে জড়িয়ে গেল এই চঞ্চল মেয়েটা? কীভবে-ই বা সাচ্ছন্দ্যে থাকে সাফওয়ান ভাইয়ের সম্মুখেও? কোন ভয়,জড়তা, অস্বস্তি’র আভাস-টুকু নেই মেয়েটার মুখে। বরং সাফওয়ান ভাই আশেপাশে থাকলে যেনো এই হাসিমুখ দ্বিগুণ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। তাদের চেনাজানা সাফওয়ান ভাই যে নির্দিষ্ট রমনী-টির কাছে ঠিক কেমন কোমল মানবে রূপান্তরিত হয়ে যায়, তা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত বলে রূপসার মাথা চক্কর দিয়ে উঠে। এত এত ভেবেও কোনো কূল কিনারা মেলে না। মিলবেই বা কীভাবে! সাফওয়ান ভাই নামক মানুষটার ওই কোমল স্বত্তা যে ঢেকে রয়েছে সকলের আড়ালে – অবডালে। যার দর্শন মিলে কেবল সেই এক ভাগ্যবতী রমনীর নিকট। যার সর্বত্র জুড়ে সাফওয়ান ভাইয়ের ভালোবাসার বেড়াজাল আটকে।
জুতার হদিস মিলেনি বলে সাদিফের ভাই – বোনদের অস্থির অবস্থা। এদিকে নাজরাতের কাজিন-বন্ধুরা কেউ টাকা না নিয়ে জুতা ফেরত দিতে প্রস্তুত নয়। উপায়ান্তর না পেয়ে শেষ বারের মতো সাহায্য চাইলো সাহিল। আকুতিভরা কন্ঠে বললো,
‘ ঠিক আছে, একটা লাস্ট হিন্ট দাও। অন্তত আমাকে বলো, সায়েরী! প্লিজ.. ‘
তোহা -সায়েরী চোখাচোখি হলো। তোহা বললো,
‘ ঠিক আছে ভাইয়া। বরের একমাত্র ছোট ভাই হিসেবে আপনার উপর এটুকু রহম আমরা করতেই পারি.. ‘
বর পক্ষের সকলে স্বস্তি পেলো একথায়। আশার আলো দেখলো যেন। তোহা ইশারা দিতেই মৃদু কেশে গলা পরিষ্কার করলো সায়েরী। কাব্যিক সুরে বলে উঠলো,
জুতা জোড়া রেখেছি তুলে
উপরের আরও উপরে..
নাগাল যদি পেতে চাও বাচা ;
খুঁজতে হবে ফুলে ফুলে!
সায়েরী বলামাত্র তার বন্ধুরা করতালি দেওয়া শুরু করলো৷ নুহাশ দুই আঙ্গুল মুখে ঢুকিয়ে সিটি বাজিয়ে বলে উঠলো, ‘ ওয়াহ! কেয়া বাত! ‘
তাদের বেহুদা আশকারায় কাঁধের চুল উড়িয়ে ভাব নিয়ে বসলো সায়েরী। অন্যদিকে বিপক্ষ দল আহাম্মকের মতো তাকিয়ে। যা বলেছে সব মাথায় উপর দিয়ে গেলো যেন।
মোবাইলে মগ্ন সাফওয়ানের কানে ছন্দ-টুকু প্রবেশ করলেও বিশেষ ধ্যান দিলো না সে। তাকে ধ্যানমগ্ন দেখে আশাহত হলো সায়েরী। সকলকে উদ্দেশ্য করে বেশ চড়া গলায় বলে উঠলো,
‘ ওপেন চ্যালেঞ্জ দিলাম আপনাদের সবাইকে। জুতা যদি খুঁজে দিতে পারেন, তবে আমরাই দিবো নগদ পনেরো হাজার। দেখি বরের কোন ভাইয়ের যোগ্যতা কতটুকু। খুঁজে দেখান জুতা.. ‘
মুহুর্তেই ভাইদের জেদ বেড়ে দ্বিগুণ হলো। এ যেনো আত্ম-সম্মানের প্রশ্ন। ভাইয়েরা একে অপরের কাঁধ চাপড়ে লেগে পড়লো “জুতা খোঁজা” মিশনে। কিন্তু সকলে ঘুরেফিরে এই একই হলরুমে তল্লাশি দিচ্ছে৷ উপরে যাওয়ার ভাবনা টুকু কারোরই মস্তিষ্কে এলো না।
পাশের টেবিলের চেয়ার পেতে বসে থাকা রূপম এবং সাফওয়ান তখনো নির্বিকার। মোবাইলে কি যেনো দেখে সিরিয়াস মুখভঙ্গিতে গুণগুণ করে কথা বলছে দুজন। সায়েরী আড়চোখে তাকায় দুজনের দিকে। তার কথায় সাফওয়ানের নূন্যতম ধ্যান নেই দেখে রাগ লাগলো মেয়েটার। টেবিলে হাত চাপড়ে দুজনের ধ্যান কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চালালো সে। এবং সফল-ও হলো। দুজন নিরব দৃষ্টি মেলে, প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল সায়েরীর চাপা স্বর,
‘ আপনারা বসে আছেন কেনো? বরের ভাই তালিকায় কি আপনাদের নাম নেই নাকি? ‘
রূপম ভ্রুঁ কুঁচকে প্রশ্ন করে,
‘ তুমি চাচ্ছো এই নিব্বি গুলোর সঙ্গে আমরাও “জুতা কই, জুতা কই ” বলে হলজুড়ে ঘুরে বেড়ায়? ‘
ঠোঁট চেপে হাসলো সায়েরী। ফের গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ কি করবেন না করবেন আপনাদের ব্যাপার। তবে আমি কিন্তু ওপেন চ্যালেঞ্জ দিয়েছি। সবাইকে মানে আপনাদের স…ব ভাইদের৷ বড় বড় কথা না বলে আপনাদের বর ভাইয়ের জুতা বের করুন। বেচারা এখনো খালি পায়ে বসে আছে। ‘
টেনে টেনে বলা “স..ব ভাই” কথাটা শুনে আচমকা হেসে ফেললো রূপম। এতক্ষণে গিয়ে যেনো বুঝল সায়েরীর এই ছটফটানির কারণ। সে পাশ ফিরে তাকালো সাফওয়ানের দিকে। নিম্ন কন্ঠে বললো,
‘ যাও ব্রো। তোমার তিনি চাচ্ছেন তুমিও যেনো তার খেলায় যোগদান করো। প্লিজ উঠো এখান থেকে। এভাবেই বসে থাকলে মেয়েটা আরও হাজারটা কথা বলে আমার কান ঝালাপালা করে দিবে। ‘
সাফওয়ান গম্ভীর চোখে পাশ ফিরা মাত্র চুপসে গেল রূপম। আমতাআমতা করে বললো,
‘ ন..না মানে এত এত কথা হজম করার সহ্য ক্ষমতা তোমার আছে, আমার তো নেই। তাই আরকি..প্লিজ যাও না! ‘
সাফওয়ান বেশ নির্বিকার ভঙ্গিতে মোবাইল ঢুকালো পকেটে। আগ্রহী কন্ঠে জানতে চাইল,
‘ হিন্ট টা যেনো কি ছিলো? ‘
রূপম চিন্তায় মশগুল হলো। কি ছিল তা সঠিক মনে নেই তার। বিরক্ত মুখে সে জবাব দিল,
‘ উপরে তুলে..ফুলে ফুলে এমন কিছুই ছিলো বোধহয়। আমি তো বুঝিনি কিছু। তুমি দেখো, খোঁজে পাও কি-না। ‘
সায়েরী কান কাড়া করে তাকিয়ে ছিলো দুই ভাইয়ের দিকে। রূপমের কথা শুনে মিটিমিটি হাসছে সে। এদের সবাইকে জব্দ করতে পেরে বেশ মজা লাগছে তার। সাফওয়ান তাকাতেই দৃষ্টি মিললো দুজনের। মেয়েটার এই কৌতুকপূর্ণ হাসি নিরব চোখে কয়েক সেকেন্ড পরখ করলো সাফওয়ান। ছন্দ-টা মনে মনে আওড়াল বেশ কয়েকবার। এরপর আচমকা মস্তিষ্কে কিছু একটা খেলে যেতেই অধর কোণে ধূর্ত হাসি ফুটল তার। সায়েরীর দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে, কিঞ্চিৎ ঘাড় বাঁকিয়ে, আড়াআড়ি ভাবে ভ্রুঁ নাচিয়ে বলে উঠলো,
‘ ওপেন চ্যালেঞ্জ? ‘
মেয়েটা আচমকা এই প্রতিক্রিয়া দেখে ভড়কে গেলো। এমন শয়তানি হাসির মানে কি? তার হতবিহ্বল মুখশ্রী দেখে ফের হাসতে চেয়েও হাসিটুকু গিলে নিল সাফওয়ান। চোখের ইশারায় উপর তলার দিকে ইশারা করে হুট করে চোখ টিপ দিয়ে বলে উঠলো, ” চ্যালেঞ্জ অ্যাকসেপ্টেড “।
বিষ্ময়ে চোয়াল ঝুলে গেল সায়েরীর। সাফওয়ান দাঁড়াতে নিলে সে নিজেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো আগে। চেঁচিয়ে উঠলো চাপা স্বরে,
‘ নাআআআ!!! ‘
মোবাইলে মগ্ন চার বন্ধু-বান্ধব চমকে উঠলো এহেন চিৎকারে। আশ্চর্য হয়ে তাকালো সায়েরীর দিকে। রূপম নিজেও চমকে উঠে চোখ তুলে বোঝার চেষ্টা করলো পরিস্থিতি। সাফওয়ান- সায়েরীর দিকে তাদের মনযোগ পড়া মাত্র অধর কোণের বক্র হাসিটুকু গিলে নিল সাফওয়ান। ভাবখানা এমন যেনো তার চেয়ে ভদ্র-সভ্য পুরুষ ধরনীর বুকে আর দ্বিতীয়-টি নেই। এমনই এক ভাব নিয়ে সে চেয়ার ঠেলে দাঁড়িয়েছে ধীরে সুস্থে। সায়েরী বেচারি মনে মনে নিজেকে হাজারটা গালাগাল দিলো। সে ভাবেনি সাফওয়ান ভাই এভাবে বুঝে ফেলবে সব। সাফওয়ান কে দাঁড়াতে দেখে সে দিকবিদিকশুন্য হয়ে ড্রেস উঁচিয়ে এক ছুট লাগালো সিড়ি পথে। পেছনে তার চার বন্ধু-বান্ধব বেকুবের মতো তাকিয়ে। মেয়েটার আচমকা কি হলো তা কেউ-ই বুঝে উঠতে পারলো না। নুহাশ বিরক্ত মুখে বলে উঠলো,
‘ নির্ঘাত আবার কোনো ঝামেলা পাকিয়েছে এই ঝামেলা-কুইন। বেশ হয়েছে, এবার ঠ্যালা সামলাক। ‘
ছুটন্ত পায়ে সেকেন্ড ফ্লোরের গ্রিন রুমে এসে থামলো সায়েরী। হাঁপিয়ে উঠেছে রীতিমতো। চারদিকে খা খা নিরবতা। বর্তমানে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব চলছে বলে এদিকটায় কেউ-ই নেই। সায়েরী ছুটন্ত পায়ে রুমে ঢুকে দরজা লাগাতে নিলে বাধা পেল হঠাৎ। দরজার মধ্যখানে একটুখানি ফাঁকা জায়গা-টাতে বাধা হয়ে প্রবেশ ঘটেছে একটি পুরুষালি হাতে। যা দেখামাত্র চমকে উঠলো মেয়েটা। শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে ঠেলেও কুল পেলো না। অগত্যা সেভাবেই ছেড়ে দিয়ে ছুটলো ফুলের ডালাটা হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। আধঘন্টা পূর্বে যে টুল এনে রেখেছিলো, সেটাতে উঠে দাঁড়ালো চট করে। কিন্তু বিধিবাম। ডালা-টা হাতের নাগালে আসার পূর্বেই তীব্র ঝাকুনি দিয়ে উঠলো টুল-টা। তাল হারিয়ে মেয়েলি দেহখানা ছিটকে পড়তে চাইল জমিনে। তবে সফল হলো না। সবসময়ের মতো নির্দিষ্ট পুরুষ-টি আজও আগলে নিলো তাকে। খিচে নেওয়া চোখ জোড়া মেলে পিটপিট করে তাকালো সায়েরী। নজরে আসলো সাফওয়ানের দুষ্টু হাসি লেপ্টানো মুখশ্রী-টি। মেয়েটা গাল ফোলাল এই দৃশ্যে। ক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠলো,
‘ নামান আমাকেএএ.. ‘
সাফওয়ান যেনো কতো বাধ্য প্রেমিক। এমন ভঙ্গিমায় মেনে নিলো আদেশটুকু। সায়েরী প্রথমেই ঘাড় ফিরিয়ে পরখ করলো বদ্ধ দরজাটা। ছিটকিনি-ও লাগিয়ে দিয়েছে! বাহ! আশ্চর্য হতে গিয়েও হলো না রমনী। এই ছেলের পক্ষে যে কত কি সম্ভব তা জানতে আর বাকি নেই তার। সে চোখ পাকিয়ে, মাথা তুলে তাকায়। ফের টুলে উঠতে গেলে, পূর্বেই হাত উঁচু করে ডালা-টা নিজ আয়ত্তে নিয়ে ফেলে সাফওয়ান। সায়েরী ফুঁসে ওঠে এই দৃশ্যে। পায়ের পাতা উঁচু করে সাফওয়ানের হাত হতে ডালা-টা ছিনিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে, চড়া গলায় বলে,
‘ আমি আগে এসেছি, এটা আমার ডালা। আপনি নিচ্ছেন কেনো? ‘
ছোটখাটো দেহশ্রীর এই পুতুল পুতুল সাজের রমনী-টিকে এমন ব্যাঙ্গের মতো লাফালাফি করতে দেখে অধর কোণের মিটিমিটি হাসিটুকু প্রসারিত করলো সাফওয়ান। কিঞ্চিৎ ঘাড় বাঁকিয়ে বলে উঠলো,
‘ তুমি আগে এসেছ সেটা তো ফ্যাক্ট না। চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলে জুতা খুঁজে বের করার। আমি করেছি, এবং তোমার আগে হাতেও নিয়ে নিয়েছি। এখন জিত-ও আমার, ডালা-ও আমার.. ‘
এই অতিব চালাক পুরুষটার কাছে যে জেদ দেখিয়ে কখনোই জিততে পারবে না তা বেশ ভালো করে জানা সায়েরী। এজন্য লাফালাফি থামিয়ে দিল সে। সাফওয়ানের প্রতিউত্তর শোনার সঙ্গে সঙ্গে গাল ফুলিয়ে, আহ্লাদী কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ হ্যাঁ তো..আম-আমি ও তো আপনারা-ই। প্লিজ, দিয়ে দিন না.. ‘
সাফওয়ান আশ্চর্য চোখে দেখে মেয়েটার এই অভিনয়। অতঃপর ফাঁকা হাতে তার কোমর ছুঁয়ে কাছে টেনে, মুখের কাছে ঝুঁকে গাল টেনে বলে,
‘ দুর্দান্ত অভিনয়! কিন্তু আমি ইমপ্রেস হচ্ছি না, সোওও স্যরি। ‘
প্রতিউত্তরে ঠোঁট উল্টাল মেয়েটা। মাথা তুলে একটা বার পরখ করলো পুণরায় তাকের উপর রেখে দেওয়া ডালা-টাকে। ফের সাফওয়ানের চোখে চোখ রেখে, কাঁদোকাঁদো স্বরে বললো,
‘ এটা যদি আপনি নিয়ে যান, তাহলে আপনার ভাইয়েরা আমাকে চরম হেনস্তা করবে। পনেরো হাজার টাকা লুটে নিবে। এত বড় গলা করে যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলাম, সেটার মান ইজ্জত কিচ্ছু অবশিষ্ট থাকবে না। প্লিজ আমাকে দিয়ে দিন এটা.. ‘
সাফওয়ান বেশ মনযোগ দিয়ে শুনল সব কথা। কিন্তু বিন্দুমাত্র গললো না। নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
‘ এসব আমাকে চ্যালেঞ্জ দেওয়ার আগে ভাবা উচিত ছিলো না? ‘
রমনীর মুখশ্রীতে থমথমে ভাব দেখা দিল এবারে। চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে, রাগত স্বরে বলে উঠলো,
‘ আপনি আমার কথা মনযোগ দিয়ে শুনলে কি আমি জোর করে এই চ্যালেঞ্জ দিতাম? আমার দিকে তো বিন্দুমাত্র ধ্যান ছিলনা আপনার.. ‘
সাফওয়ানের বুকে দুহাতে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ফের বলে,
‘ অবশ্য মনযোগ থাকবে কেনো? আজ আশেপাশে কত কত সুন্দরী মৌমাছি বিনবিন করছে! মহিলারা আপনারা মায়ের কাছে এসে নিজের মেয়ের গুণগান গাইছে, সাফার কাছে এসে তার সুদর্শন ভাইয়ের খোঁজ নিয়ে যাচ্ছে। আমি যেনো দেখছি না কিছু.. ‘
এত এত অভিযোগ শুনে সাফওয়ান স্তব্ধ হলো কয়েক সেকেন্ডের সঙ্গে। পরমুহূর্তেই প্রেয়সীর রাগত মুখখানা দেখে হেসে ফেললো নিঃশব্দে। পুণরায় দু’হাতে কোমর জড়িয়ে কাছে টেনে নিল মেয়েটাকে। ডান হাতে ফুলোফুলো গাল টেনে দিয়ে বললো,
‘ তোমার এত জ্বলছে কেনো? ‘
এই বিদ্রুপাত্মক হাসি দেখে সায়েরীর রাগ বাড়লো আরও এক ধাপ। চোখের পলকে সাফওয়ানের ইন করা শার্টের বুকের দিকের অংশ খামচে ধরলো সে। তেতে উঠে জবাব দিল,
‘ অবশ্যই আমার জ্বলছে। একশো এক বার জ্বলছে। আমার না জ্বললে আর কার জ্বলবে? আমাকে তো খুব ডায়লগবাজী করে বলেছিলেন, “এমন ডার্ক কালার পড়ে বাইরে আসবে না, রোদে দাঁড়িয়ে হাসবে না,” আরও কত কি। এখন নিজের বেলায় সব নিয়ম গায়েব? আপনাকে কে বলেছিলো এই শার্ট পরতে? এত সেজেগুজে এখানে আসার-ই বা কি দরকার ছিলো? ‘
‘ আমার সঙ্গে কথা বলতে আসলে ধমক ছাড়া তো অন্য কথা বেরই হয়না। অথচ মেয়েগুলোর বাপ,ভাইয়ের সঙ্গে বত্রিশ দাঁত দেখিয়ে হাসছিলেন। নির্লজ্জ মেয়েগুলো ও কেমন তাকিয়ে ছিলো। একজন যে হোচট খাওয়ার বাহানায় ইচ্ছে করে ধাক্কা খেয়েছিলো, সেটা বোধহয় আমি দেখিনি? সব দেখেছি। আপনি যে সব বুঝেও কেমন আশকারা দিয়েছেন সেসবও দেখেছি.. ‘
একনাগাড়ে কথাগুলো উগলে দিয়ে বড় বড় দম নিলো মেয়েটা। সাফওয়ান বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিয়ৎ ক্ষণ। অতঃপর সম্পূর্ণ ঝুঁকে এসে দুইহাতে জড়িয়ে নিল মেয়েলি দেহ-টি। সে ভাবেনি মেয়েটা এতকিছু মনে পুষে রেখেছে। রাগ-অভিমান তবে এসবের! ভেবেই ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসলো সে। ছাড় পাওয়ার তাগিদে ছটফটিয়ে উঠা প্রেয়সীকে আরও জোর দিয়ে জড়িয়ে রাখল বুকে। চুলে হাত বুলিয়ে শান্ত সুরে বলে উঠলো,
‘ কাম ডাউন, সুবহা! কেনো এত রাগছো? ‘
না চাইতেও শান্ত হলো সায়েরী। অভিমানী মন নিয়েও হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরল প্রেমিক পুরুষটার পৃষ্ঠদেশ। কাঁধে মাথা রেখে থমথমে গলায় বলে উঠলো,
‘ আপনার সঙ্গে কোনো কথা নেই। মেয়েগুলোকে আপনি একটু-ও বাঁধা দেন নি। আমি সব দেখেছি। ‘
সাফওয়ান গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। স্বভাব বিরুদ্ধে গিয়ে প্রেয়সীকে কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আমি কীভাবে রাগ দেখাতাম ওদের কে? বিয়ে বাড়ি, এত এত মানুষ আশেপাশে। তাছাড়া ওরা যে আদর্শের মেয়ে! উল্টো কিছু বললেই সিন ক্রিয়েট করে ফেলতো। ভাইয়ের স্পেশাল দিনে আমার জন্য কোনো হাঙ্গামা হোক, তা চাইনি আমি। এজন্যই তো চুপ ছিলাম। কিন্তু আশকারা দিলাম কবে? তুমি দেখেছ আশকারা দিতে? একমাত্র ওরা যেনো নাগাল না পায়, এজন্য রূপমকে সঙ্গে নিয়ে নিয়ে ঘুরেছি। তবুও একথা কেনো বলছো? আমার উপর সন্দেহ জাগছে তোমার? ‘
সায়েরী বেশ শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আরও নিবিড়ভাবে গুটিয়ে গেল উষ্ণ বুকটাতে। সাফওয়ানের কথাটার প্রতিউত্তর না করে বিষন্ন গলায় বলে উঠলো,
‘ মেয়েগুলো কি সুন্দর দেখতে! ‘
তার কন্ঠ-টা শুনে সাফওয়ান ঠোঁট চেপে হাসি আটকায়। মুখোমুখি হয়ে মেয়েটার গাল টেনে প্রতিউত্তর করে,
‘ এই এক মাথামোটা’র উপর নজর রখতে গিয়ে অন্য কোনো দিকে আমার চোখ-ই যায়নি। এজন্য সহমত পোষণ করতে পারলাম না। দুঃখীত! ‘
সায়েরী নিরব চোখে কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে সাফওয়ানের হাসিমুখ। পুরুষালি, চওড়া বুকটার সঙ্গে আঁটসাঁট হয়ে লেপ্টে থাকা শার্ট-টার কুঁচকানো অংশুটুকো-তে হাত বুলিয়ে তা মিলিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালালো সে। মিনমিন কন্ঠে শুধালো,
‘ এই শার্ট-টা আর কক্ষনো পরবেন না। এমন বিয়ে বাড়িতে তো নয়-ই। ‘
‘ শার্ট তো তুমিই গিফট করেছিলে। এখন আমাকে কথা শোনানো হচ্ছে কেনো? ‘
‘ আমি জানতাম নাকি এই শার্ট পড়লে আপনাকে এতো বেশি সুদর্শন দেখাবে? মনে হচ্ছে খাল কেটে কাল নাগিনী নিয়ে এসেছি। অসহ্য! ‘
সাফওয়ান শব্দ করে হেসে উঠলো এবারে। হাসি তালে কাঁপলো তার সুডৌল বক্ষপট। সায়েরী কিঞ্চিত লজ্জা পেলো এমন হাসি দেখে। একই সঙ্গে মুগ্ধ-ও হলো। হাসলে সাফওয়ান ভাইয়ের চোখ দুটো ছোট ছোট হয়ে যায়। দেখতে বেশ লাগে। প্রসস্থ বুকটাতে থুতনি ঠেকিয়ে, মেয়েটা প্রলুব্ধ চোখে দেখতে থাকলো এই মুগ্ধকর দৃশ্য। আনমনে বলে উঠলো,
‘ এমন করে হাসবেন না, খান সাহেব। আপনার বোকাপাখির হৃদকম্পন থমকে যেতে চাচ্ছে। ‘
সহসা দৃষ্টি নামালো সাফওয়ান। সঙ্গে সঙ্গে চোখ বুজে ফেলল মেয়েটা। অদ্ভুত লজ্জায় আরক্তিম হলো মুখশ্রী। অনুভব করলো এইমাত্র হাসির তালে প্রসারিত হওয়া অধর যুগল গভীর ভাবে ছুঁয়ে দিচ্ছে তার কপালের মধ্যিখান৷ কানে এসেছে প্রেমিক পুরুষ-টার গাঢ় স্বর,
‘ খাল কেটে হাজার-টা কাল নাগিন তুলে আনলেও তোমার খান সাহেব তোমারই থাকবে, বোকাপাখি। অন্তত তাকে নিয়ে মনে কোন সংশয় রেখো না। ‘
সায়েরী ‘র অশান্ত হৃদয় মুহুর্তেই শান্ত হয়ে এলো। এটুকু আশ্বাসের অপেক্ষাতেই যেন ছিল সে। যা পেয়ে সব অভিমান হাওয়া হয়ে গিয়েছে। পুণরায় নিজের চঞ্চল স্বত্তায় ফিরা মাত্র সে অধৈর্য কন্ঠে আদেশ ছুড়ল,
‘ ডালা-টা নিয়ে দিন। আর কোন তর্ক করবেন না। হাতে গুনা পনেরো হাজার টাকা না দিলে কিন্তু আপনার ভাইকে বউ দিবনা। ‘
হাত বাড়িয়ে ডালা-টা তুলে নিল সাফওয়ান। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দিয়ে দিলো না। বরং নিজের ধূর্ত পনা অব্যাহত রেখে, চোখে, মুখে নিদারুণ এক দুষ্টুমি ভাব ফুটিয়ে বলে উঠলো,
‘ পনেরো হাজার এক্সট্রা দিলে বউয়ের সঙ্গে বোনকেও নিয়ে আসা যাবে না? আমার ভাই বউ নিয়ে ফিরলে, আমি-ই বা খালি হাতে ফিরবো কেনো? ‘
সায়েরী চরম আশ্চর্য হলো সাফওয়ানের মুখ হতে এমজ রসিকতা শুনে। অতঃপর অসন্তোষ্ট গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ মাত্র পনেরো হাজার? আমাকে আপনার এতো সস্তা মনে হয়? ‘
সাফওয়ান মাথা নাড়ে। পুনরায় বলে,
‘ তাহলে তুমি-ই বলে দাও কত লাগবে? ‘
সায়েরী বিরক্ত হয়ে পায়ের পাতা উঁচু করে ডালা হাতিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালালো। অধৈর্য কন্ঠে শুধালো,
‘ এত কথা বলে বিরক্ত করছেন কেনো? নিচে সবাই খুঁজবে না আমাদের? তাড়াতাড়ি দিন এটা। আমাকে যেতে হবে.. ‘
বার দুয়েক লাফালাফি করেও যখন লাভ বিশেষ করতে পারলো না তখন আচমকা সে গায়ের জোরে টান মারলো সাফওয়ানের কলার। তাল হারিয়ে অনেকটাই ঝুঁকে এলো সাফওয়ান। কিন্তু হাত নামাল না। সায়েরী ওই উঁচু করে রাখা হাতখানার দিকে দৃষ্টি রেখে হুট করে নিজের মাখন নরম ঠোঁট জোড়া দিয়ে ছুঁয়ে দিল সাফওয়ানের খসখসে ডান গাল। মুহুর্তেই অবাক,বিষ্ময়ে বিবশ হয়ে গেল সাফওয়ান। হতবিহ্বল নজরে তাকালো সায়েরী’র দিকে। মেয়েটার ঠোঁটের কোণে মিটিমিটি হাসি। এই রঞ্জিত অধর জোড়া স্ব-ইচ্ছায় তার গাল ছুঁয়েছে ভেবেই হতবিহ্বল হলো সাফওয়ান। আপনাআপনি নামিয়ে নিল দুই হাত। সায়েরী যেন জানত, যে এমনই হবে। তাইতো, সাফওয়ানের হাত নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে সে ছিনিয়ে নিল ডালা-টা। দরজার ছিটকিনি খুলে মুহুর্তেই ছুটে পালালো। তার নুপুরের শব্দ সিড়ির ধাপে ধাপে মিলিয়ে যাওয়ার পরপরই হুশ ফিরলো সাফওয়ানের। সহসা হাত বাড়িয়ে গাল ছুঁয়ে দেখল সে। লিপ গ্লসের লিকুইড টুকু হাতে লাগতেই সেদিক তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেললো।
বেলা সাড়ে তিনটা। বিয়ের সবটুকু আমেজ নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিয়ে ঘনিয়ে এসেছে সেই বিদায় ক্ষণ। কনে বাড়ির সকলেরই অক্ষিপটে দেখা দিল অশ্রুজল। নাজরাতের বাবা-সহ তার চাচা, মামা-রা মিলে মেয়েকে সাদিফের হাতে তুলে দিলেন। মেয়েকে সারাজীবন আগলে রাখার আবদার করতে গিয়ে পুরুষ চিত্তের সবটুকু অহং গুড়িয়ে আচমকা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন নাজরাতের বাবা। চোখ ভিজেছে চাচা, মামাদের-ও। একই সঙ্গে ডুকরে উঠেছে নববধূ। মেয়েটা কথার মাঝপথেই আছড়ে পড়লো বাবার বুকে। ডুকরে কাঁদছে সে। মেয়ের ঘোমটার উপরিভাগ জুবুথুবু হলো বাবার অশ্রুজলে।
তার কান্নার সুরে পরিবেশ বদলে গেল। কারোরই অশ্রু বাধা মানছে না। এভাবে দীর্ঘক্ষণ থাকলে মেয়েটা অসুস্থ হয়ে পড়বে, বিদায় নিতেই পারবে না। একথা ভেবে আবরার গিয়ে ছাড়িয়ে আনলো তাকে। কিন্তু পরপরই নাজরাতের ক্রন্দনরত কন্ঠে আকুতি শুনা গেল, মা’কে কাছে পাওয়ার আকুতি। সকলে এদিক সেদিক তাকিয়ে খুঁজল একটু, তবে খোঁজ মিললো না। সকলে জানে, এই মুহুর্তে মা আসবে না মেয়েকে দেখা দিতে, পারবে না বিদায় দিতে। নাজরাত নিজেও জানতো সেটা। কিন্তু মেয়ের মন মানতে চাইল না। তাকে আটকে রাখা আবরার-কে উদ্দেশ্য করে সে আকুতিভরা কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আম্মুকে একটু আসতে বলো না, ভাইয়া। একটু জড়িয়ে ধরবো শুধু, একটাবার ডেকে দাও না.. ‘
আবরারের চোখ, মুখ লাল হয়ে এসেছে। সে প্রতিউত্তর করতে চেয়ে অনুভব করে, কন্ঠস্বর রোধ হয়ে এসেছে। কথা বের হতে চাইছে না। নাজরাত নিজের ছোট ভাইকে জড়িয়ে ধরে। বোনের কান্নায় কিশোর ছেলেটা নিজ কান্না আটকাতে পারে না। ভাই-বোনদের থেকে শুরু করে বন্ধুদের সংস্পর্শে এসে মেয়েটা আরও বেশি ভেঙ্গে পড়ে। তোহার বাহুডোরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। এরপর আচমকা কি যেন মনে পড়তেই এক পলকের জন্য থমকায়, সিক্ত নয়নে আশেপাশে তাকায়। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটির দেখা না পেয়ে ভাঙ্গা স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে, ” সায়ু কোথায়? ”
বাকিদের-ও টনক নড়ে এবারে। আশেপাশে খুঁজতে গিয়ে অবশেষে দেখা মিলে মেয়েটার। ওইতো, সকলের চেয়ে আড়ালে, অদূরে দাঁড়িয়ে আছে সে। অসম্ভব ফোলা চোখ,মুখ। গাল বেয়ে নামছে নিরব অশ্রুধারা। দুই বোনের ঝাপসা দৃষ্টি একে অপরের সঙ্গে মিলতেই বুকের ভিতরটা ধ্বক করে উঠে তাদের। নাজরাত হাত বাড়ায়, আহবান জানায় কাছে আসায়। তা দেখামাত্র ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেলে সায়েরী। ছুটে এসে ঝাপটে ধরে বধূ ভেসে বোনটিকে। সঙ্গে সঙ্গে ডুকরে কেঁদে উঠে নাজরাত। দুই বোনের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে উঠে। তাদের ছাড়াতে বেশ বেগ হতে হয় আবরার এবং আয়ানকে। অবশেষে ছাড়িয়ে নিলে আবরার বড় দায়িত্বের সহিত সাদিফের হাত তুলে দিল বোনকে। সাদিফ বিষন্ন দৃষ্টিতে দেখে বউয়ের ক্রন্দনরত মুখশ্রী। তাকে গাড়িতে বসিয়ে একে একে নাজরাতের বাবা,চাচা,ভাই সকলের সঙ্গে কোলাকুলি করলো সে। দোয়া নিয়ে, সকলকে আশ্বস্ত করে বসলো গাড়িতে। তাদের গাড়ি দৃষ্টি সীমানা অতিক্রম করতেই আবরার সহ বাকিরা ফিরলো অন্যদের কাছে। দেখল, সায়েরী তখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আবরার হতাশ হলো। সায়েরীর কাছে গিয়ে তার কাঁধ জড়িয়ে বলে উঠলো ,
‘ বিদায় কি তোকে দিয়েছি? তুই এমন মরা কান্না জুড়ে দিয়েছিস কেনো? ‘
হেঁচকি তুলে কান্না থামানোর চেষ্টা চালালো সায়েরী। ভাইয়ের কথা শুনে কান্নার সুরে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আমাদের বিদায় দিও না ভাইয়া। আমি তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাব না, বিয়েও করবো না। ‘
সায়েরীদের চেয়ে মাত্র কয়েক হাত দুরত্বে, গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া সাফওয়ান আচমকা চমকে উঠলো সায়েরীর এমন কথা শুনে। তার পাশে দন্ডায়মান রূপম হেসে ফেললো ফিক করে। সাফওয়ান’কে আরও অবাক করে দিয়ে আবরার বোনের কথায় সায় জানিয়ে তাকে আশ্বস্ত করে বলে উঠলো,
‘ এমনিতেও তোকে বিয়ে শাদি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। তাই কান্নাকাটি বন্ধ কর। তোকে দিয়ে বাসায় খুঁটি গাড়ব, বিয়ে দিব না। চুপ হ এবার.. ‘
মধ্যাহ্নের ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে ফুলে ফুলে সজ্জিত গাড়িটি। গাড়ির ভেতরের নিস্তব্ধতা ভেদ করে থেমে থেমে কর্ণধার হচ্ছে নাজরাতের হেঁচকি তোলার ক্ষীণ শব্দ। ব্যাক সিটের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থানরত সাদিফের চওড়া বুকে মাথা এলিয়ে রেখেছে মেয়েটা। তার দেহের মৃদু মৃদু কম্পন তখনো অনুভব করা যাচ্ছে। সাদিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ঘোমটার উপর দিয়েই ঠোঁট ছোঁয়ায় বউয়ের মাথার উপরিভাগে। কানের কাছে মুখ নামিয়ে অত্যন্ত নিম্ন স্বরে বলে,
‘ আর কতো কাঁদবে? মনে হচ্ছে তোমাকে জোর করে নিয়ে যাচ্ছি আমি। এবার অন্তত থামো, মাথা ব্যথা করবে তো। ‘
নাজরাতের কোনো প্রতিউত্তর শোনা গেল না। ভাবভঙ্গি সব পূর্বের মতোই। সাদিফ তার ভারী ঘোমটাটা খোলে নিল আলগোছে। আরামদায়ক ভঙ্গিতে বুকে টেনে নিয়ে নিম্ন স্বরে বললো,
‘ অনেক লম্বা জার্নি। একটু ঘুমাও, নাহলে শরীর করবে। আজ অন্তত শরীর খারাপ করো না, বউ। বহুত দিয়েছি ধৈর্যের পরীক্ষা। ‘
কথাটার যথার্থ বুঝতে প্রায় ত্রিশ সেকেন্ড লাগলো নাজরাতের। বুঝতে পেরে কান্না ভুলে গেলো মেয়েটা। জ্বালা করতে থাকা চোখজোড়া বুজে নিলো শক্ত করে। দুইহাতে জড়িয়ে ধরল সাদিফের কোমর। আটকে আসা কন্ঠে আবদার করলো,
‘ চুলে হাত বুলিয়ে দাও। ‘
তার কন্ঠের অস্বাভাবিকতা টুকু ধরতে পেরে নিঃশব্দে হাসলো সাদিফ। সতর্ক দৃষ্টিতে পুণরায় পরখ করলো ভিউ মিরর। ঠিকঠাক আছে দেখে, বউকে ভালোভাবে জড়িয়ে ধরল সে। আবদার মতো হাত বুলিয়ে দিল চুলের ভাঁজে ভাঁজে। গতরাতেও নির্ঘুম কাটানো নাজরাত ঘুমিয়ে গেল সহজেই। সাদিফ স্বস্তি পেলো তাকে ঘুমুতে দেখে। এই দীর্ঘ পথে জেগে থেকে কান্নায় ডুবে থাকলে অযথা শরীর খারাপ হয়ে যেত।
দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ ঘন্টার পথ অতিক্রম করে অবশেষে সাদিফের গাড়ি এসে থামলো নিজেদের বাড়ির সম্মুখে। ভাগ্যবশত আজ ট্রাফিক ছিলনা। নয়তো ছয় সাত ঘন্টায়-ও পৌঁছানো সম্ভব হতো না। এখন রাত সাড়ে আট-টার মধ্যেই পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে তারা। বাড়ির কর্ত্রী-রা আরও আগে রওনা দিয়েছিলেন বলে আধঘন্টা পূর্বেই পৌঁছে গেছেন সকলে। নতুন বউকে সাদরে গ্রহণ করলেন সকলে মিলে। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে বিধায় নিচে বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখা হলো না তাকে। যদিও আশেপাশের অনেক প্রতিবেশি এসেছেন বউ দেখতে। তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ পর্ব শেষে নিশি তাকে নিয়ে গেল সাফ্রিন এবং রূপসার জন্য বরাদ্দকৃত রুমটাতে। ভারী লেহেঙ্গা-টা দেহ হতে সরাতেই নাজরাতের মনে হলো নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে সে।
এই লেহেঙ্গা, গহনার ভারে শ্বাস ফেলা দ্বায় হয়ে উঠেছিলো তার। নিশি তার অবস্থা দেখে প্রথমেই খাবার নিয়ে এলো। প্লেট সাফ্রিনকে ধরিয়ে দিয়ে পুণরায় নিজের কাছে ছুটে গেল সে। সাফ্রিন নিজেই খাইয়ে দিল নাজরাতকে। মেয়েটা বেশ স্বস্তিতে আছে বান্ধবী আছে বলে। খিদে পেটে সবটুকু খাবার খেয়ে বেশ ফুরফুরে হয়ে উঠলো নাজরাত। গাড়িতে দীর্ঘক্ষণ ঘুমিয়েছে বলে ঘুমের তাড়া নেই। তবে ক্লান্তিতে দেহ ভেঙ্গে আসতে চাইছে। গাড়িতে সাদিফ বেশ আরামদায়ক ভাবে ঘুমুতে সাহায্য করলেও দেহ পরিপূর্ণ আরাম পায়নি। নরম বিছানায় দেহ এলিয়ে আরাম করতে মন চাচ্ছে তার। রূপসা একবার বলামাত্র সে শুয়ে পড়লো। কিন্তু সেই স্বস্তি টিকলো না বেশিক্ষণ। নিশি,সাফ্রিন,রূপসা তিনজনই একত্রে এসে জোর করে তুলে দিল তাকে। তাদের হাতে কাপড়ের ব্যাগ, মেক-আপ কিট সহ আরও খুটিনাটি বিষয়। নাজরাত বুঝেও বুঝতে চাইলো না এসবের কারণ কি। অদ্ভুত এক অনুভূতিতে দেহ মন শিউরে উঠলো তার। নিশি জোর করে ওয়াশরুমে পাঠাল তাকে। পুণরায় ফ্রেশ হয়ে আসতেই তিনজনে মিলে তিন দিক থেকে সাজাতে ব্যস্ত হলো। নাজরাত কেবল কাটের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে। স্বাভাবিক ভাবেই সে ভীষণ নার্ভাস। তন্মধ্যে উপস্থিত তিন রমনীর বেঁফাস কথাবার্তা শুনে আরও মিইয়ে যেতে লাগলো সে।
পরিচিত কক্ষটির অপরিচিত রূপ চোখের দৃশ্যপটে ধরা দিতেই অন্তপটের ধুকপুকানি তীব্র হলো নাজরাতের। তার পদচারণ থমকে গেল দরজার কাছটাতে। কদম বাড়ানোর ক্ষমতা-টুকু যেন হারিয়ে বসেছে সে। তাকে এমন স্তব্ধ হয়ে যেতে দেখে পেছন থেকে মৃদু ধাক্কা দিলো সাফ্রিন। নাজরাত হুড়মুড়িয়ে প্রবেশ করলো কক্ষে। ঘাড় ফিরিয়ে চাইল সাফ্রিনের দিকে। মেয়েটা দরজার আড়াল হতে মাথা বের করে দাঁত দেখিয়ে হাসছে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিললেই চোখ টিপ দিল সে। চাপা স্বরে বলে উঠলো,
‘ হ্যাভ অ্যা গ্রেএএএএএট নাইট, বেইব! ওইযে দেখ, হোয়াইট বেডশিট টাতে টানা হাতের রেড ফন্ট ইউজ করে Enjoy লেখা হয়েছে। এই স্পেশাল বেডশিট টা কিন্তু তোহা গিফট করেছে। বলেছে যেনো এই চমৎকার রাতে, চমৎকার গিফটটা এখানে দারণ চমৎকার ভাবে সাজিয়ে দিই। আরও বলেছে, Enjoy লেখাটার যেনো তুই মান-সম্মান রাখিস। বুঝেছিস তো কি বললাম? লেখাটার মান রাখবি, কেমন? ‘
নাজরাত দাঁতে দাঁত চেপে তেড়ে গেল তার দিকে। মুহুর্তেই উচ্চ শব্দে হেসে উঠে দরজা লাগিয়ে পালিয়ে গেল সাফ্রিন। নাজরাত থামলো। অনুভব করলো, তার বক্ষস্থল কাঁপছে। গলা শুকিয়ে এসেছে। আড়চোখে সে পুণরায় দেখল রুমটির এই সাজসজ্জা। সফেদ রুমটার চতুর্দিকে তাজা গোলাপের সমাহার। লাল ফুলগুলো বেশ আকর্ষণীয় লাগছে দেখতে। মিষ্টি সুঘ্রাণ টুকু নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করলে, শিরশিরে অনুভূতি ছেয়ে যাচ্ছে সর্বাঙ্গে। অস্থির চিত্তে রুম জুড়ে পায়চারি করলো সে। ফুলে ফুলে সজ্জিত ওই বিছানায় গিয়ে বসার সাহস যেনো তার নেই। বুকের ধুকপুকানি কমছে না কোনো ভাবে। বরং সময়ের সাথে সাথে তা যেনো দ্বিগুণ হচ্ছে। উত্তেজনায় হাঁসফাঁস করতে থাকা রমনী এবারে অস্থির ভঙ্গিতে নিজের ঘাড় ম্যাসাজ করলো। এবং সঙ্গে সঙ্গে কুঁকড়ে উঠলো এক চিনচিনে ব্যথায়। সহসা ড্রেসিংটেবিলের সম্মুখে দাঁড়িয়ে সে পিঠ ঢেকে রাখা আঁচলটুকু ফেলে পরখ করলো ক্ষতস্থান।
গত রাতে গহনা খুলতে গিয়ে তাড়াহুড়ায় ঘষা লেগেছিলো ঘাড়ের কাছটায়। আজ পুণরায় গহনা পরতে হয়েছে বলে একই স্থানে বেশ ভালোভাবে জখম হয়েছে। রক্ত জমে রক্তিম হয়ে আছে যায়গাটা। এখানে অন্তত অল্প খানি অয়েন্টমেন্ট লাগানো জরুরি। নয়তো শুকোতে দেরি হবে। নাজরাত ব্যস্ত হাতে ড্রেসিংটেবিলের ড্রয়ার খুলল। এই রুমের জিনিসপত্র, কোথায় কি আছে তা সম্পর্কে বেশ অনেকটা ধারণা হয়ে গেছে বলে অয়েন্টমেন্ট খুঁজে পেতে বিশেষ সময় লাগলো না তার। আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে সে সবে মাত্র অয়েন্টমেন্ট হাত নিয়েছে, এমন সময় শব্দ হলো দরজায়। সহসা আঁচল দিয়ে পিঠ ঢেকে নিল সে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই নজরে আসলো সাদিফকে। কালো টি-শার্ট, ট্রাউজার পরে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। চোখাচোখি হওয়া মাত্র নজর নামিয়ে নিল নাজরাত। কি অদ্ভুত কান্ড! প্রায় এক বছর হতে চলেছে দুজনের সম্পর্কের। অথচ আজও সে লজ্জায় গুটিয়ে আছে। এই ব্যবহার আদৌও মানা যায়? দরজায় ছিটকিনি লাগানোর শব্দে বক্ষস্পন্দনের কম্পন দ্বিগুণ হলো তার। নিশি ভাবি কি কি যেন শিখিয়ে দিয়েছিলো! সাদিফ আসার পরপরই কিছু বলতে বলা হয়েছিলো। কিন্তু মেয়েটা সবটা ভুলে বসেছে। সীমাহীন লজ্জায় তার দাঁড়িয়ে থাকাও দ্বায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাদিফ কাছ থেকে দেখল বউয়ের এই লজ্জাবতী রূপ। মেয়েটার দেহে জড়ানো আকাশী-নীল রঙের ফিনফিনে পাতলা শাড়িটি চমৎকার লাগছে। ধবধবে সাদা কাপড়ে এক ফোঁটা নীল রঙ মিশিয়ে দিলে যেমন রঙ ধারণ করে, তেমন হালকা নীলছে রঙ শাড়িটির। যেটা পরে এই পাতলা গড়নে রমনীকে, হালকা সাজ-সজ্জায় অসম্ভব আবেদনময়ী লাগছে। রুমের আকর্ষণীয় সজ্জা দেখে পুণরায় বউয়ের দিকে মনযোগ দিলো সে। কদম বাড়িয়ে ফ্লোর হতে তুলে নিলো অয়েন্টমেন্ট-টি। যেটা দরজা খোলার শব্দে হাত ফসকে ফেলে দিয়েছে নাজরাত। অয়েন্টমেন্ট দেখে কিঞ্চিৎ অবাক হলো সাদিফ। কাছে এসে চিন্তিত গলায় জানতে চাইল,
‘ অয়েন্টমেন্ট দিয়ে কি করছ? ব্যথা পেয়েছ কোথাও? ‘
নাজরাত আমতাআমতা করে। জড়তা ভরা কন্ঠে বলতে উদ্যত হয়..
‘ বেশি কিছু না। ওই একটু ঘাড়ে.. ‘
কথার মাঝেই সাদিফ গিয়ে দাঁড়ালো তার পিঠের পেছনে। উদ্বিগ্ন চিত্তে ” কি হয়েছে ঘাড়ে? ” বলতে বলতে কিঞ্চিৎ উন্মুক্ত গ্রীবাদেশে দৃষ্টিপাত করলো সে। নাজরাত তখনো আঁচল ধরে রেখেছে। সাদিফ সামান্য অংশ টুকু দেখেই চিন্তিত হলো বেশ।
‘ এটা কিভাবে হয়েছে? এখানে এসো, বসো বেডে। আমি লাগিয়ে দিচ্ছি.. ‘
বলতে না বলতেই হাত টেনে বিছানায় বসিয়ে দিল নাজরাতকে। নিজেও গিয়ে বসলো তার পেছনে। সামান্য একটু অয়েন্টমেন্ট আঙ্গুলে তুলে নিয়ে যেই না বউয়ের পিঠের আঁচল সরিয়েছে, অমনি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জুড়ে শিহরণ বয়ে গেল তার। থমকাল দৃষ্টি। স্লিভলেস, ব্যাকলেস ব্রাউজ পরেছে মেয়েটা। গলা,ঘাড়, হাত হতে শুধু করে কোমর অবধি খোলা পিঠ দৃশ্যমান হয়ে আছে। নামমাত্র আবরণ রয়েছে কেবল দুটো ফিতের। সাদিফের দেহের রক্তকণিকা টগবগিয়ে উঠেছে। পূর্বে কখনো সে এই দৃশ্য দেখেনি, কখনো না। বার কয়েক ঢোক গিলে শুকনো গলা ভেজাল সে। পুরুষ চিত্তের নড়ে বড়ে ভাবকে পাথর চাপা দিল। কাছে গিয়ে আলতো হাতে ক্ষত স্থানে লাগিয়ে দিল লিকুইড টুকু। সতর্ক কন্ঠে শুধালো,
‘ জ্বলছে? ‘
‘ উঁহু! ‘ নাজরাতের ক্ষীণ জবাব।
সাদিফ স্বাভাবিক থাকতে চায়, কিন্তু পারে না। বেহায়া দৃষ্টি ঘুরেফিরে ওই খোলা পিঠে এসে আটকাচ্ছে। ফলস্বরূপ মনযোগে ব্যাঘাত ঘটা মাত্র ঘাড়ে সঞ্চালন হতে থাকা আঙুলগুলো নেমে আসে পিঠের দিকে। মুহুর্তেই ছটফটিয়ে উঠলো নাজরাত। অবচেতনে খপ করে আটকে ফেললো সাদিফের অবাধ্য হাতটা। চমকে উঠলো মানব। নাজরাত ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো তার দিকে। থেমে থেমে বললো,
‘ হ-হয়েছে, আর প্রয়োজন নেই। এটা রেখে আসো। ‘
সাদিফ দ্রুত উঠে দাঁড়ালো। দম বন্ধ লাগছে তার। দেহ উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। নিজের সঙ্গে যেন নিজেরই নিরব যুদ্ধ চলছে। অয়েন্টমেন্ট টুকু স্ব-স্থানে রেখে সে আড়চোখে তাকালো নাজরাতের দিকে। মেয়েটা তো তারই বউ। দুজন ভালোবাসে দুজনকে। আজ এই কাঙ্ক্ষিত রাতে কাছে আসতে জড়তা কিসের তবে? হঠাৎ করে এমন অচেনা অজানা মানুষের মতো আচরণ করতে হচ্ছেই বা কেনো? আপনমনে কথাগুলো ভেবে চোখের পলকে উষ্ণ দেহটি হতে একটানে টি-শার্ট খুলে নিল সে। ছুড়ে ফেলল ডিভানে। নিজ ভাবনায় মশগুল নাজরাত লক্ষ করলো না স্বামীর এই অশান্ত রূপ। আচমকা কানে এলো সুইচ টিপার শব্দ। মুহুর্তেই আবছা অন্ধকারে তলিয়ে গেল চারপাশ। মোমবাতির ক্ষীণ রশ্মি এই পরিবেশকে আরও মোহনীয় করে তুলেছে। নাজরাত হাত খোপা করার তাগিদে চুলে দুই প্যাঁচ দিয়েছিলো মাত্র, এই পরিবর্তনে তার হাত থামে। পরপরই পুরুষালি একখানা হাত এসে ছাড়িয়ে নেয় চুলগুলো। শাড়ির ফাঁক গলিয়ে বেশ গভীরে হাত ডুবিয়ে জড়িয়ে ধরে মেয়েলি দেহশ্রী-টি। অনুভব করে দেহটির মৃদু কম্পন। কিন্তু তবুও ছাড় দিলো না সে। উন্মুক্ত গ্রীবাদেশে মুখ ডুবিয়ে গভীর চুমু খেলো৷ নাজরাতের দেহের লোমকূপ অবধি কেঁপে উঠলো এই স্পর্শে৷ অস্বাভাবিক হলো শ্বাস-প্রশ্বাস৷ তার অবস্থা টের পেয়ে ঘাড় হতে মুখ তুললো সাদিফ। কাঁধে থুতনি রেখে গাঢ় স্বরে জানতে চাইল,
‘ টায়ার্ড লাগছে? ‘
নাজরাত ঢোক গিলে ঘনঘন। আচানক সাদিফের এই গাঢ় স্পর্শ, গাঢ় স্বরে টালমাটাল অবস্থা তার। কি জবাব দিবে তা ভেবে পায়না সে। আগ পিছ না ভেবে, মুখ ফসকে সত্যটুকু-ই বলে দিল,
‘ একটু তো লাগছেই। ‘
সাদিফের বুকের মাঝে জমতে থাকা অনুভূতির দাবানলে ভাটা পড়ল মুহুর্তেই। চুপসে গেল মুখশ্রী। জড়িয়ে রাখা হাত দুটো ধীরে ধীরে সরিয়ে নিতে নিতে সে বিষন্ন গলায় বলে উঠলো,
‘ ওহ! ঘুমিয়ে যাও তাহলে। রেস্ট দরকার তোমার।’
তার কন্ঠের বিষন্নতা টুকু টের পেয়ে আচমকা ধ্যান ভাঙলো নাজরাতের। চট করে পেছন ফিরল সে। সাদিফের উদাম বুক দেখে লজ্জা পেলেও তা বুঝতে দিলো না। মনের কথাটুকু সরাসরি ব্যক্ত করতে না পেরে প্রতিউত্তরে বললো,
‘ গাড়িতে তো ঘুমিয়েছিলাম। এখন আর ঘুম আসবে না। ‘
‘ রেস্ট নাও তবে। আসো.. ‘
নাজরাত বেশ বিরক্ত হলো সাদিফের এই নির্লিপ্ততায়। কিন্তু মুখ ফুটে কিচ্ছুটি বলতে পারলো না। সে যে মেয়ে মানুষ। কীভাবে-ই বা বলবে? সাদিফের কি উচিত না বউয়ের মন পড়ে নেওয়া? ভাড় মুখে, বিছানার দিকে কদম বাড়ালো সে। মোমের ক্ষীণ আলোয়, বউয়ের উন্মুক্ত দেহশ্রীর বিশেষ আকর্ষনীয় অংশে নজর গাঁথা মাত্র নিজের ভদ্র-সভ্য ব্যক্তিত্বের লাগাম টেনে ফ্লোরে ছুড়ে ফেলল সাদিফ। তার পুরুষ স্বত্তা যেন কানে মাইক নিয়ে বলছে, ‘ অন্তত এই বিশেষ রাতে যত্নশীল না হয়ে বেসামাল স্বামী হওয়া ঢের উত্তম। ‘ নিজ হৃদয়ের এই আশকারা-কে বেশ প্রাধান্য দিল সে। সবে মাত্র বিছানার দিকে দুই কদম বাড়ানো বউয়ের পেছন হতে বলিষ্ঠ হাতের চাপ দিয়ে ধরলো কোমল উদর। চোখের পলকে শূন্যে তুলে নিলো মেয়েলি দেখখানা। মেয়েটা চমকে তাকাল সাদিফের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে তার কোমল ওষ্ঠদ্বয়ে নেমে আসলো সাদিফের পুরু ওষ্ঠদ্বয়। এক শক্ত, উষ্ণ চুম্বনের সমাপ্তি শেষে নাজরাতের মুখের উপর তপ্ত শ্বাস ফেলে সে বলে উঠলো,
‘ ইউ নো হোয়াট, নাজ! এই নয়-দশ মাসে বড বেশি আশকারা দিয়েছি তোমাকে। আমার মন বলছে, তুমি না চাইলেও এবারে অন্তত লাগাম টানা দরকার। পূর্ণ অধিকার খাটিয়ে, আমার হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে। ‘
নাজরাত প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে তখনো। সাদিফ ফের মুখ নামাল, সিক্ত অধরে শব্দ করে চুমু এঁকে পুণরায় বলে উঠলো,
‘ সারাদিনের টায়ার্ডনেস থেকে যাক না শরীরে। সাথে আমি নাহয় আরও একটু আধটু দখল বাড়িয়ে দিলাম। পরে রেস্ট করার জন্য যথেষ্ট সময়ও দিবো, প্রমিস। ‘
আকস্মিক আক্রমণে দিশেহারা নাজরাত প্রতিউত্তর করার ভাষা পেলো না কোন। তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যাল করে। তার প্রতিক্রিয়া না পেয়ে অধৈর্য হলো সাদিফ। বললো,
‘ কি হলো, জবাব দাও? আজ এই বিশেষ রাতটি তোমার বরকে গিফট করতে আপত্তি আছে?
কেমন বেফাঁস আবদার! শুনেই উপচে পড়া লজ্জায় চোখ খিচে নিয়েছে নাজরাত। শ্বাস-প্রশ্বাস গাঢ় হয়ে এসেছে তার। সে প্রতিউত্তর করার তাগিদে কম্পিত কণ্ঠে বলতে উদ্যত হলো,
‘ স-সাদিফ আম.. ‘
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পুরুষালি পুরু ওষ্ঠদ্বয় ফের একবার কেড়ে নিল তার বাক্যগুলো। যেন বুঝাতে চাইছে, বিন্দুমাত্র আপত্তি শুনতেও প্রস্তুত নয় সে। এই চুম্বনের গভীরতায় ডুবে থাকা নাজরাত টের-ও পেলো না, কবে তার কোমল দেহখানা শায়িত হয়েছে ফুলেল বিছানায়। তার মসৃণ ওষ্ঠপুটে ডুবে, কোমল আদরে মত্ত থাকা মানবটা আচানক আলোড়িত হয়ে, নিচ অধরে দন্ত স্পর্শের কঠিন ছাপ বসিয়ে দেওয়া মাত্র কুঁকড়ে উঠলো রমনী। অবিলম্বে খামচে ধরলো উদাম দেহটির পেশিবহুল বাহু, পৃষ্ঠদেশ। তার ছটফটানি অনুভব করে এই যাত্রায় ছেড়ে দিল সাদিফ। তবে বিন্দুমাত্র দুরত্ব কমালো না। বরং ব্যগ্র হলো দেহের সবটুকু উষ্ণতা দিয়ে অর্ধাঙ্গিনীকে ঘায়েল করার আকাঙ্খায়। কিন্তু তার ঘনঘন শ্বাস উঠানামা করা উন্মুক্ত বুকে আচমকা দুইহাত ঠেকিয়ে বাধা প্রয়োগ করলো রমনী। বাধা দেওয়া স্বত্তেও উষ্ণ, অনাবৃত বুকটি ছুঁতেও হাতজোড়া থরথর করে কেঁপে উঠলো তার। আবছা আলোয় বউয়ের ছলছল দুই নয়নে প্রগাঢ় দৃষ্টি রাখলো সাদিফ। না শুনেও যেনো সে বুঝে ফেলেছে অনেক কিছুই। এই চোখ জোড়ার ছলছলে দৃষ্টি, কিঞ্চিৎ ভয় এবং সীমাহীন লজ্জার আভাস দেখে সে একহাত বাড়িয়ে গাল ছুঁয়ে দিল বউয়ের। কপালে গভীর চুমু এঁকে, চোখে চোখ রেখে আশ্বস্ত গলায় বলে উঠলো,
‘ একটু ভরসা রাখো, জান। আমি আছি তো। সব ভয় দূর করে দেব। বি ব্রেইভ, হুহ! ‘
নাজরাতের বদ্ধ চোখের পাতা কাঁপে থিরথির। একই তালে আকম্পিত সিক্ত অধর, মেয়েলি তনু। সেই কম্পন দ্বিগুণ হলো গ্রীবাদেশে বরের দেওয়া টুকরো টুকরো উষ্ণ ছোঁয়ায়। একটু ভয় এবং সীমাহীন লজ্জায় গুটিয়ে যেতে চাইল সে। অবচেতনে ঠেলে সরাতে চাইল, দেহের উপর অধিপত্য জমানো পুরুষালি দেহটি। সহসা গ্রীবাদেশ হতে মুখ তুলল সাদিফ। আবছা আলোয় তার অশান্ত দৃষ্টির সঙ্গে মিলিত হলো বউয়ের দ্বিধান্বিত, লজ্জা মিশ্রিত দৃষ্টি। সাদিফের প্রগাঢ় দৃষ্টির গভীরতার কবলে পড়ে চোখ খিচে নাজরাত। ফিরিয়ে নেয় মুখ। সাদিফ হেসে ফেলে তার এই আকাশ ছোয়াঁ লজ্জা দেখে। কানের কাছে মুখ ছুঁয়ে ফিসফিস কন্ঠে বলে,
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬৭
‘ কে যেন বলেছিলো, লাভ রোমান্সের ক্ষেত্রে তার ব্যাড বয়ে’স বেশি পছন্দ! এতদিন তো সুযোগ পাইনি। আজ পেয়েছি যখন… (ঘাড়ে চুমু এঁকে) প্লিজ লেট মি শো ইউ, হাউ রোমান্টিক ইউর হাসবেন্ড ইজ! ‘
অনাকাঙ্ক্ষিত বাক্যগুলো শুনে তীব্র লজ্জায় কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো নাজরাতের। গরম হয়ে উঠেছে গাল। সে ভাবেনি এতগুলো মাস আগের কথাও মনে রেখেছে সাদিফ। লজ্জা মিশ্রিত চাহনিতে ফিরে তাকালো মেয়েটা। কিছু একটা বলার তাগিদে আলাদা করলো চেপে রাখা অধর যুগল। কিন্তু প্রতিউত্তর করার নূন্যতম সুযোগ টুক পেলো না। কোমল তনু জুড়ে হালাল পুরুষটির উচ্ছৃসিত স্পর্শে তলিয়ে যেতে আরম্ভ করলো। বুকে বাধা দেওয়া দুইহাত পুরুষোত্তম হাতের চাপে মিশে গেল বিছানার সহিত। পরবর্তীতে আর বাধা দেওয়ার কোন প্রচেষ্টা চালালো না মেয়েটা৷ বড় সাবলীলভাবে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিল পুরুষোত্তম, উন্মুক্ত দেহখানা। আপনমনে স্বগোতক্তি করল, সম্পর্কে ভালোবাসার স্বীকারোক্তি পেয়েছে সেই কবেই। এই ক্ষণের মাধ্যমে নাহয় সূচনা হোক পূর্ণতার রাত্রির।সেই অনুভূতির পূর্ণতা, যেই অনুভূতি অর্পিত হয়েছে পরস্পরকে ঘিরে।
