অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১৯
শ্রাবণী ইয়াসমিন
মেয়েটা থমকে যায়। কপাল কুচকে জেভিয়ার এর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, “লাভবার্ডের প্রোপার্টি মানে?”
জেভিয়ার ল্যাপটপ এর দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে আস্তে করে বলে ওঠে, “মাই লাভবার্ড”।
মেয়েটা জেভিয়ার এর দৃষ্টি অনুসরণ করে ল্যাপটপ এর দিকে তাকায়। যেখানে আনায়া এখনো বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। তার চেহারা স্পষ্ট হয়। কারণ সে এখন ক্যামেরার অপরদিকে ফিরে শুয়ে আছে। মেয়েটা আনায়ার দিকে বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে কোনো নড়চড় দেখতে না পেয়ে জেভিয়ার কে উদ্দেশ্য করে বলে,
” হু ইজ শী?”
জেভিয়ার ধীরে জবাব দেয়, “মাই লাভবার্ড”। তখনই আনায়া হালকা নড়েচড়ে ক্যামেরার দিকে মুখ ঘুরায়। মেয়েটি আবার ক্যামেরার দিকে তাকায়। তবে আনায়ার চেহারা দেখে মেয়েটির চোখ বড় বড় হয়ে যায়। সে একবার জেভিয়ার তো একবার আনায়ার দিকে তাকায়। জেভিয়ার নির্বিকার ভাবে তখনও ঠোঁটের ওপর এক আঙুল রেখে আনায়ার দিকেই তাকিয়ে আছে। হঠাৎ মেয়েটা অবাক কণ্ঠে বলে ওঠে,
“এইটা তো মিস আনায়া ম্যারি, তাইনা?” জেভিয়ার চোখ ঘুরিয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ভাবে জবাব দেয়,
“নোপ, শী ইজ নট মিস আনায়া ম্যারি, শী ইজ মিসেস জেভিয়ার ড্রেভেন।”
মেয়েটা দু কদম পিছিয়ে ঝাঝালো কন্ঠে বলে ওঠে, “আর ইউ ম্যাড জেভিয়ার? তুমি আনায়া ম্যারি কে বিয়ে করেছো?”
জেভিয়ার চোয়াল শক্ত করে বলে, “ডোন্ট শাউট ক্যাথলিন। আমার ওপর জোরে কথা বলা আমি পছন্দ করিনা, ইউ নো রাইট?”
ক্যাথলিন চুপসে যাওয়া চেহারায় একবার লাপটপ স্ক্রিন তো একবার জেভিয়ার এর দিকে তাকালো। এরপর ধীর কন্ঠে বলল, “জেভিয়ার তুমি ওকে বিয়ে কেন করলে? তুমি কি জানো না এতে তোমার লাইফও রিস্কে পড়ে গিয়েছে। আর তুমি তো গিয়েছিলে ওকে……”
বাকিটা শেষ করার আগেই জেভিয়ার গর্জন করে উঠলো, “বি কুয়াইট ক্যাথলিন। জাস্ট গো ফ্রম হেয়ার, রাই নাও। ”
ক্যাথলিন আর কিছু বার সাহস করল না। সে চোখ নামিয়ে সেইখান থেকে প্রস্থান করল।
গাড়ির ভেতর এখনো মেয়েটার বুক ধড়ফড় করছে। বাইরের চিৎকার ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলেও তার মনে হচ্ছে কেউ যেন ঠিক পেছনেই আছে। ব্যাকসিটের নিচে কুঁকড়ে বসে আছে সে, চুল মুখে লেগে আছে, ঠোঁট কাঁপছে, বুকের ভেতর ধকধক শব্দ বাজছে।
হঠাৎ গর্জন করে ইঞ্জিন স্টার্ট হলো। চমকে উঠে ঠোঁট চেপে ধরল মেয়েটা। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ি এগোতে লাগল, চাকার কম্পনে শরীর দুলে উঠল।
সেই কাঁপুনিতে ভয়ে গলা শুকিয়ে এল তার। ধীরে ধীরে মাথা তুলল। ফ্রন্ট মিররে চোখ পড়তেই বুকের ভেতর কেমন যেন জমে গেল সবকিছু।
দুটি গভীর ব্রাউন চোখ শান্তভাবে সরাসরি তার চোখে আটকে আছে। অ্যালেক্সের ভ্রু কুঁচকে উঠল, মুহূর্তে গাড়ি রাস্তায় থামিয়ে দিল।
ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই চোখে পড়ল নীলাভ চোখের এক মেয়ে, মুখে আতঙ্কের ছাপ, ঠোঁট শুকিয়ে ফাঁক হয়ে আছে। সে স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে অ্যালেক্সের দিকে, যেন সামান্য নড়লেই তার বিপদ ডেকে আনবে।
অ্যালেক্সের ভ্রু কুঁচকে আছে। গলার স্বর ভারী আর ধমকের মতো “এই মেয়ে, তুমি কে? আমার গাড়িতে কি করছো?”
মেয়েটার ঠোঁট কাঁপছে, বুক ধড়ফড় করছে। কণ্ঠটা কেমন যেন ভাঙা ভাঙা “অ… অ্যাশলি… আমার নাম।”
অ্যালেক্স গলা নামাল না, বরং আরও কঠিন স্বরে বলল,
“আমার গাড়িতে কি করছো তুমি?” অ্যাশলি চোখ নামিয়ে ফেলল। শব্দ বেরোল না মুখ থেকে। অ্যালেক্সের ধৈর্য শেষ হয়ে আসছে, “এই মেয়ে, উত্তর দিচ্ছো না কেন?”
তবুও নীরবতা। অ্যালেক্স বিরক্তিতে স্টিয়ারিং ছেড়ে বলল, “নামো আমার গাড়ি থেকে।”
অ্যাশলি অসহায় চোখে একবার তাকাল তার দিকে শুধু চোখে ছিল ভয়ের ছাপ আর অনুনয়। অ্যালেক্স দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজা খুলে বাইরে নেমে এল। নিজের হাতে মেয়েটাকে টেনে নামাবে, ঠিক করেই ফেলেছে।
সে দরজা খুলতে যেতেই অ্যাশলির চোখ হঠাৎ সিটের এক পাশে পড়ে গেল। সেখানে পড়ে আছে একটা ছোট্ট ছুরি। কি করবে না ভেবে না পেয়ে মুহূর্তেই সেটা হাতে তুলে নিল।
অ্যালেক্স হাত বাড়িয়ে তাকে টানতে যাবে, আর তখনই
ছুরিটা সামনে তুলে ধরল অ্যাশলি, সরাসরি অ্যালেক্সের দিকে তাক করে। অ্যালেক্স থেমে গেল, বিরক্তিতে কপাল আরও কুঁচকে গেল তার। অ্যাশলির হাত কাঁপছে অবিরাম। চোখে একরাশ ভয় আর অনুনয়। সে।কোনোমতে বলল, “প্লিজ… আমাকে একটু… আমার বাড়ি অবধি পৌঁছে দেবেন?”
অ্যালেক্স কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা, তাচ্ছিল্য মেশানো এক বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। “ছুরি বোধহয় প্রথমবার ধরলে, তাই তো এত হাত কাঁপছে… তাই না?”
অ্যাশলি চমকে শুকনো একটা ঢোক গিলল, চোখের পাতা একবার কেঁপে উঠল। অ্যালেক্সের চোখে তখন ঠান্ডা, ধারালো দৃষ্টি। গলা একইরকম গম্ভীর,
“ভয় দেখাতে গেলে নিজে ভয় পেয়ে কাঁপতে হয় না।
শত্রুপক্ষের সামনে দুর্বলতা দেখানো উচিত নয়।”
অ্যাশলির শ্বাস ভারী হয়ে উঠল, ছুরিটা তার হাতে আরও অস্থিরভাবে কাঁপতে লাগল। মেয়েটা ভয়ে ভয়ে আবার অনুনয় করে বলল, “প্লিজ… আমি… অনেক বিপদে পড়েছি। সাহায্য করুন, আমাকে আমার বাড়িতে পৌঁছে দিন।”
অ্যালেক্স চোখ কপালে তুলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার বোধহয় একটু করুনা হলো মেয়েটার প্রতি। সে তারপর বিরক্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “লোকেশন?”
মেয়েটা কাঁপতে কাঁপতে ফটাফট ঠিকানা বলে দিল। অ্যালেক্স আর কথা বাড়াল না। এক হাত দিয়ে ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে বসে পড়ল, গাড়ির ইঞ্জিন নীরবে গর্জন করতে শুরু করল।
কেটে গিয়েছে এক সপ্তাহ ~
আনায়া নিজের রুমে পায়চারী করছে আর হাত কচলাচ্ছে। সে কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারছে না।
আনায়ার মাথায় ঘুরছে এই বাড়ির রহস্য। সে হাজার চেষ্টা করেও এই নাড়ির রহস্য উদঘাটন করতে পারছে না। গত কয়েকদিন ধরে বাড়ির পরিবেশ অস্বাভাবিকভাবে শান্ত যার কারণ আনায়ার কাছে অজানা। সবাই যেন শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির পেছনে লুকিয়ে আছে এক অজানা রহস্য।
এরিক্সও বাড়িতে নেই। সে শুনেছে, কিছুদিন আগে কিভাবে যেন তার মাথা ফেটে গিয়েছিলো, এবং সেই কারণে কিছুদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলো। আনায়া মনে মনে ভাবছে, এই সব ঘটনা কি শুধুই দুর্ঘটনা, নাকি আরও গভীর কোনো গোপন রহস্য আছে যা সে জানে না।
কিন্তু গতকাল রাতে যা দেখলো, তা আবারও তার ঘুম হারাম করে দিয়েছে। এক অদ্ভুত ভয়, এক অজানা আগ্রাসন মনের ভিতরে একরাশ প্রশ্ন জেগে উঠেছে।
কিছুদিন আগে, আনায়া অনেক জোর করে এক সার্ভেন্টের থেকে জানতে পেরেছিলো গ্যারেজের পেছনের জায়গার কথা। সেই জায়গায় কারও যাওয়া নিষিদ্ধ। সার্ভেন্ট তাকে জানিয়েছিলো “ম্যাম সেটি একটি নিষিদ্ধ জায়গা, সেইখানে সবার যাওয়ার অনুমতি নেই। সেইখান থেকে প্রায়ই মানুষের গোঙানির, চিৎকার শোনা যায়।”
আনায়া স্থির হয়ে বসে, মাথায় অসহ্য প্রশ্নের ভার। এই বাড়ি, এই চুপচাপ পরিবেশ, আর সেই গ্যারেজের পেছনের অজানা রহস্য সবকিছুই তাকে ক্রমশ ভেতর থেকে চাবুকের মতো আঘাত করছে।
সেই সার্ভেন্টের মুখে এইসব শোনার পর থেকেই আনায়ার মনে ভয় জন্মেছিলো। কিন্তু সেই ভয় যেন দ্বিগুণ হয়ে বাড়ল গতকালের দৃশ্য দেখে।
ওই ঘটনার পর থেকে সার্ভেন্টটিকে আর দেখেনি আনায়া। ভেবেছিলো, হয়তো ছুটিতে আছে বা অন্য কোথাও কাজে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু কাল রাতে যা ঘটলো, তা তার সমস্ত চিন্তাকে আরও জটিল করে দিল।
গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় আনায়ার জেভিয়ারের মেসেজের শব্দে। জেভিয়ার অন্য শহরে যাওয়ার পর থেকে প্রায়ই হুটহাট, যখন তখন কল দেয়, মেসেজ পাঠায়। এতে আনায়ার বিরক্ত লাগে না, বরং ওর ভালোই লাগে একরকম ভালোলাগার অনুভূতিও হয়।
কিন্তু সেদিন রাতটা অন্যরকম ছিল। বাইরে হালকা গুঁড়ি গুঁড়ি বরফ পড়ছিল। পুরোপুরি স্নোফল নয়, আবার পুরোপুরি থেমেও নেই আকাশ থেকে নীরবে ভেসে আসা ছোট ছোট সাদা কণাগুলো এক অদ্ভুত নীরবতা তৈরি করছিল।
আনায়া মেসেজ রিপ্লাই দিতে গিয়েও থেমে গেল। বাইরে থেকে ভেসে এলো এক মৃদু শব্দ যেন ভারী কিছু টানা হচ্ছে জমাট বরফের ওপর দিয়ে। তার কানে তখনও বাজছে সার্ভেন্টের সেই সতর্কবাণী, “ম্যাম, ওই জায়গায় যাওয়া কখনো ঠিক নয়… রাতে সেখান থেকে চিৎকার শোনা যায়।”
হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল আনায়ার। সে ধীরে ধীরে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল বাহিরে তাকিয়ে আনায়ার নিশ্বাস যেন গলায় আটকে গেল।
গাঢ় শীতের রাত সাদা বরফের ওপর নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে। তার চোখের সামনে জেভিয়ারের বাবা, ভারী কোট গায়ে, ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। আর তাঁর পেছনে
একজন লোক দু’হাতে কিছু টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
প্রথমে আনায়া বুঝতেই পারেনি সেটা কী। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই গলা শুকিয়ে গেল, আঙুলে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল ওটা সেই সার্ভেন্টের নি*থর দেহ। মাথার পাশে গাঢ় র*ক্ত জমাট বেঁধে গেছে, আর বরফের সাদা চাদরের ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে যেতে যেতে একপথ লাল হয়ে উঠছে।
শীতল বাতাসে ভেসে আসছে লোহার গন্ধ, র*ক্তের গন্ধ।
প্রতিটি টানে কুঁচকে যাচ্ছে বরফ, র*ক্ত মিশে যাচ্ছে সাদা কণার ভেতর, আর সেই রঙ যেন চোখ ফেটে ঢুকে যাচ্ছে আনায়ার ভেতরে।
তারা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে গন্তব্য ওই নিষিদ্ধ গ্যারেজের পেছন দিক। আনায়ার হৃদপিণ্ড যেন কান পর্যন্ত উঠে এসেছে, বুকের ভেতর ধপধপ শব্দ যেন বাইরেও শোনা যাচ্ছে। সে জানালার পর্দা আস্তে টেনে দিলেও চোখ সরাতে পারল না।
আনায়ার হাত ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, ঠোঁট অনিচ্ছায় কেঁপে উঠছে। গলার ভেতর জমে থাকা আতঙ্কের ঢোক গিলতে গিয়েও যেন পারল না।
আনায়া হঠাৎ চমকে বর্তমান ভাবনায় ফিরে এলো। গত রাতের দৃশ্য তার চোখে এখনো স্পষ্ট সাদা বরফ, র*ক্তের দাগ, আর সেই নিষিদ্ধ গ্যারেজের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া লাশ।
আজ সে স্থির সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই রহস্যের শেষ পর্যন্ত যাবে। যা হোক না কেন, একবার ওই দিকে যেতেই হবে।
মাথায় পরিকল্পনা ঘুরছিল সকাল থেকেই। এখনো জেভিয়ারের বাবা বাড়িতে ফেরেনি রাত হলে ফিরবে। আর এরিক্স তো কিছুদিন যাবত বাড়িতেই নেই। চারপাশে যেন এক অদ্ভুত নীরবতা, যা আনায়ার কাছে আজ সুযোগের সংকেত মনে হলো।
ধীরে ধীরে রুম থেকে বের হলো সে। দরজার হ্যান্ডেলে হাত রাখতেই চারপাশের নিস্তব্ধতা তার কানে গুমোট হয়ে বাজল। বুকের ভেতর ধুকপুকানি স্পষ্ট, তবুও পা থামাল না।
আলমারি খুলে গায়ে দিল মোটা কালো জ্যাকেট যেন শরীরের কোনো অংশ খোলা না থাকে। হুডিটা মাথায় টেনে মুখটাও ঢেকে নিল ভালোভাবে।
পদক্ষেপ যতটা সম্ভব নীরব রেখে করিডোর পেরোল। ছায়ার মধ্যে মিলিয়ে গিয়ে ধীরে ধীরে নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে। ভেতরের আলো কম, কেবল জানালা দিয়ে ভেসে আসা ফ্যাকাশে শীতের আলো মেঝেতে পড়েছে।
দরজার কাছে এসে একবার চারপাশ দেখল কেউ নেই। আজ সব কিছু যেন তাকে অদ্ভুত ভাবে সুযোগ করে দিচ্ছে। নিঃশব্দে লক খুলে বাইরে বেরিয়ে পড়ল। ঠাণ্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল, শ্বাস থেকে সাদা ধোঁয়া বের হলো।
তার চোখ সরাসরি গন্তব্যে গ্যারেজের পেছনের দিক।
আজ সে জানবেই, ওই নিষিদ্ধ জায়গায় আসলে কী লুকিয়ে আছে।
আনায়ার চেতনা ফিরে এলো ধীরে ধীরে। ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, হাত-পা শক্ত করে বাঁধা, আর মুখ কাপড় দিয়ে চেপে ধরা প্রতিটি শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তার গা ঠাণ্ডা মাটির ওপর লেপ্টে আছে, সারা শরীরে শীতের কামড় যেন হাড় পর্যন্ত ঢুকে গেছে।
হঠাৎ বরফগলা ঠাণ্ডা পানি সরাসরি তার মুখে ছিটকে পড়ল। শীতলতার তীব্র আঘাতে তার সারা শরীর কেঁপে উঠল, দাঁত কটকট করতে লাগল। ঠাণ্ডার শ্বাসরোধী ঝাঁপটায় গলা দিয়ে বেরিয়ে এলো কর্কশ এক শব্দ, যা কাপড়ে চাপা পড়ে মিলিয়ে গেল।
পিটপিট করে চোখ মেলতে চাইল সে, কিন্তু ঠাণ্ডায় চোখের পাতা ভারী হয়ে আছে, প্রতিবার খোলার চেষ্টা করলেই আবার নামতে চাইছে। তবুও অস্পষ্টভাবে চোখ খুলতেই,
ঝাপসা দৃষ্টির ভেতর এক লম্বা অবয়ব ভেসে উঠল।
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অবয়ব নীরবে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
আনায়ার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে এল, হৃদপিণ্ডের প্রতিটি ধাক্কা তার কানে তীক্ষ্ণ শব্দের মতো বাজতে লাগল। ঝাপসা দৃষ্টি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে লাগল। আনায়া সামনে তাকাতেই দেখতে পেল, এরিক্স। সে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে, ঠোঁটে মিষ্টি কিন্তু অদ্ভুতভাবে অস্বস্তিকর এক হাসি, চোখ দুটো সরাসরি আনায়ার ওপর স্থির।
আনায়া ভ্রু কুঁচকালো, ভেতরে প্রশ্নের ঝড় উঠলেও মুখে কিছু বলতে পারল না। কারণ হাত-পা শক্ত করে বাঁধা, মুখেও মোটা কাপড় চেপে রাখা শ্বাস নিতে গেলেই শীতল কাপড়ের গন্ধ নাকে লাগে।
শরীরে কাঁপুনি উঠছে, হাড় পর্যন্ত ঠাণ্ডা ঢুকে যাচ্ছে। উঠে বসতে চাইল, কিন্তু পিঠে ও কাঁধে অদ্ভুত ব্যথা আর বাঁধনের চাপ তাকে নড়তেই দিচ্ছে না।
সে মাটিতে শুয়েই চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকানোর চেষ্টা করল। চারপাশ অন্ধকার, ঠাণ্ডা, আর ভ্যাপসা গন্ধে ভরা। কোথাও কোনো জানালা নেই শুধু অল্প আলো এসে পড়ছে ওপরের দিকের একটি সরু ফাঁক দিয়ে। মনে হচ্ছে যেন এটা কোনো বদ্ধ, স্যাঁতসেঁতে ঘর বা ভূগর্ভস্থ জায়গা।
হঠাৎ তার মনে পড়ল কয়েক ঘণ্টা আগের ঘটনা,
সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যখন এই দিকে আসছিল, জায়গাটা অদ্ভুতভাবে গা শিউরে ওঠার মতো লাগছিলো। প্রতিটি পা ফেলার সাথে সাথে মনে হচ্ছিলো কেউ যেন অন্ধকার থেকে তাকিয়ে আছে।
গ্যারেজের কাছে পৌঁছাতেই হঠাৎ এক জোড়া হাত তার মুখ চেপে ধরল। নাকে তীব্র, কটু গন্ধ ভেসে এলো কাপড় থেকে। শরীর হালকা হয়ে এল, চোখ ভারী হয়ে গেল, আর তারপরে?
আনায়ার ধ্যান ভাঙল হঠাৎ, কণ্ঠ ভেসে এলো অন্ধকারের ভেতর থেকে। “আনায়া ম্যারি, খুব লেইট করে ফেললে এইখানে আসতে।”
দৃষ্টি সরিয়ে দেখল এরিক্স ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে, ঠোঁটে সেই অস্বস্তিকর হাসি। “কতদিন ধরে অপেক্ষায় ছিলাম! তুমি কবে আসবে! কবে আসবে! কবে আসবে…!” প্রতিটি শব্দের মাঝে যেন ইচ্ছাকৃত বিরতি।
এরিক্স মাথা সামান্য কাত করে ধীরে ধীরে বলল, “আর ফাইনালি আজ তুমি এলে। আমার গোডাউন ধন্য হয়ে গেলো তোমার পদধূলিতে।”
আনায়ার বুকের ভেতর ধড়ফড় বেড়ে গেল। কনকনে শীতে ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু তার গলা শুকিয়ে এসেছে কথা বেরোতে চাচ্ছে না। তবুও জোর করে শব্দ করল, গলার ভেতর কাঁপুনি লুকানোর চেষ্টা করে “আমাকে বেঁধে রেখেছেন কেন? ছাড়ুন, আমাকে ছেড়ে দিন।”
এরিক্সের ঠোঁটের কোণে ধীর এক বাঁকা হাসি ফুটল।
“ছেড়ে দেওয়ার জন্য বেঁধেছি নাকি? দীর্ঘ এক বছর পরিশ্রমের পর আজ তোমাকে হাতে পেয়েছি।”
সে ঝুঁকে এল আনায়ার মুখের কাছাকাছি, কণ্ঠে অদ্ভুত ঠাণ্ডা স্বর “এখন জায়গামত সাপ্লাই দিয়ে দিতে পারলেই আমি নিশ্চিন্ত।”
আনায়ার চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল, ভয় আর রাগ মিলেমিশে কণ্ঠে কাঁপন এনে দিল “আমি আপনার ভাইকে বলে দেবো, আপনি আমাকে বেঁধে রেখেছেন।”
এরিক্সের হাসি এবার আরও বড় হয়ে গেল, সেই হাসির ভেতর ভয়ঙ্কর ঠাট্টা মিশে আছে।
সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় হেসে ফেলল “আমার ভাইকে বলবে? তুমি কি সত্যিই জানো আমার ভাই আসলে কে?”
এরিক্সের কথা শুনে আনায়ার বুকের ভেতর হঠাৎ ঠাণ্ডা শূন্যতা নেমে এলো। তার চোখে ভয় স্পষ্ট হয়ে উঠল। গলা শুকিয়ে গেলেও কষ্ট করে শব্দ বের করল “আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ আমাকে কেন বেঁধে রেখেছেন? কারণটা বলুন!”
এরিক্স থামল, কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আনায়ার দিকে। তারপর ঠোঁটে হালকা হাসি খেলল, কিন্তু চোখে কোনো আবেগ নেই। “দুই দিন অপেক্ষা করো… তোমাকে বেশি কষ্ট দেবো না। দুই দিন পর ছেড়ে দেবো এইখান থেকে।”
এই কথা বলেই সে আনায়ার মুখের বাঁধন শক্ত করে উপরে তুলে দিল মুখ আবার শক্ত কাপড়ে চেপে গেল। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগল, ঠোঁটের চারপাশে কাপড়ের খসখসে স্পর্শে ত্বক জ্বালা করছে।
এরিক্স আর একবারও পিছনে তাকাল না। নিঃশব্দে দরজার দিকে এগোল, লোহার দরজা খুলে ভারি শব্দে বন্ধ করল। অন্ধকারে শুধু সেই শব্দের প্রতিধ্বনি থেকে গেল, আর আনায়ার বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন আরও জোরে বাজতে লাগল।
জেভিয়ার কিছুক্ষণ আগেই একটা মিটিং সেরে ফিরেছে।
ঘণ্টাখানেক পর তার আবার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে, কিন্তু মাথার ভেতর হালকা ক্লান্তি জমে আছে।
সে ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে ঠাণ্ডা পানি ছিটিয়ে নিল, হালকা ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো।
টেবিলের ওপর থেকে কফির কাপ হাতে নিয়ে সোফায় বসল। কফির গাঢ় গন্ধ ভেসে আসছে, কিন্তু তার মন অন্য কোথাও। মোবাইল হাতে তুলে আনায়াকে কল করল।
রিং চলতে লাগল কিন্তু কেউ ধরল না। ভ্রু কুঁচকে আবার কল দিল। দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার তবুও কোনো সাড়া নেই। জেভিয়ারের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। গলার পেশী ফুলে উঠল রাগে।
পরের মুহূর্তেই ফোনটা জোরে ছুড়ে মারল বিছানার ওপর, কফির কাপ টেবিলে আছড়ে রাখল।
সে কোনো সময় নষ্ট না করে ল্যাপটপ অন করল।
ক্যামেরার লাইভ ফিড খুলতেই তার চোখে অস্বস্তির ছায়া নেমে এলো রুমে কোথাও আনায়া নেই।
জেভিয়ার ভ্রু কুঁচকে পুরনো ফুটেজ বের করল। একে একে স্ক্রল করতে লাগল দেখা যাচ্ছে সন্ধ্যার পর থেকে আনায়ার কোনো হদিস নেই।
শেষবার তাকে দেখা গেছে করিডোর পেরিয়ে বের হতে তারপর আর কিছুই নেই।
এখন ঘড়িতে রাত ১২টা বাজে। জেভিয়ারের মুখের রঙ মুহূর্তেই পালটে গেল ঠাণ্ডা, ভয়ঙ্কর রাগ তার চোখে ভেসে উঠল। সে দ্রুত ফোন হাতে তুলে ডায়াল করল তার বাবার নাম্বার। প্রথম কয়েকবার রিং হওয়ার পর অবশেষে কল রিসিভ হলো।
কল রিসিভ হতেই জেভিয়ারের কণ্ঠ ঠিকরে বেরিয়ে এলো, “কোথায় তুমি?”
জন ড্রেভেন গাড়িতে মাথা এলিয়ে দিয়ে বলল, “রাস্তায় আছি, বাড়িতে যাচ্ছি। কেন?”
জেভিয়ার কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল। ঠাণ্ডা শ্বাস ফেলে গম্ভীর স্বরে বলল, “অ্যানা কোথায়?
জন ড্রেভেন ভ্রু কুঁচকালো, “বাড়িতেই হবে, আর কোথায় থাকবে?”
জেভিয়ার হঠাৎ গর্জন করে উঠল, “ওই বাড়িতে নেই! আমার কল ধরছে না, ড্যাড! আমি ওকে কোথাও দেখছি না!”
ছেলের হঠাৎ উত্তেজিত আচরণে জন ড্রেভেন কিছুটা অবাক হলেও শান্ত কণ্ঠে বলল, “আচ্ছা, আমি বাড়িতে গিয়ে দেখি। তুমি, শান্ত হও।”
কিন্তু জেভিয়ারের গলা এবার শাসানোর মতো হয়ে উঠল,
” ড্যাড, আমি ওয়ার্নিং করেছিলাম আমার লাভ বার্ডের যাতে কিছু না হয়! তোমার ভরসায় আমি ওকে রেখে এসেছিলাম।”
জন ড্রেভেন এবার কড়া স্বরে বলল,
“ঠাণ্ডা হও, জেভিয়ার। একটু পর তোমার গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে, আমি যদি ভুল না করি তাহলে সেইখানে অনেক বড় বড় বিজনেসম্যান আসবে। সেইটা নিয়ে চিন্তা করো এই দিকটা আমি দেখছি, তুমি যাও।” এই কথা বলেই তিনি ফোন কেটে দিলেন।
জন ড্রেভেন বাড়ির গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। চারপাশে নিস্তব্ধতা। বিশাল বাড়ি, অথচ ফাকা।
তিনি সার্ভেন্টদের ডেকে আনলেন। একে একে সবার কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, আনায়া কোথায় তার খোজ কেউ জানে নাকি? সবাই মাথা নাড়ল যে না।
পুরো বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও আনায়ার কোনও হদিস নেই।
জন ড্রেভেনের মুখের ভাঁজ গভীর হলো। ছেলেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা মনে পড়তেই অস্বস্তি বাড়তে লাগল।
তিনি ফোন বের করলেন, ডায়াল করলেন একটি নম্বর।
কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে কণ্ঠ ভেসে এলো,
“ইয়েস ড্যাড, বলো!”
জন ড্রেভেন সরাসরি বললেন,
“কোথায় আছো, এরিক্স?”
এরিক্স হালকা উদাস স্বরে উত্তর দিল,
“ক্লাবে আছি।”
জন ড্রেভেনের কণ্ঠ কড়া হয়ে উঠল,
“আনায়া কোথায়, এরিক্স?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর এরিক্স ঠাণ্ডা স্বরে বলল,
“আই ডোন্ট নো।”
জন ড্রেভেন রাগে দাতে দাত কিড়মিড় করে বললেন,
“মিথ্যে বলো না! বলো, কোথায় রেখেছো! তোমার ভাই খোঁজ পেয়ে গিয়েছে মেয়েটা বাড়িতে নেই। আমি কোনোরকমে সামাল দিয়েছি।”
এরিক্স হালকা হেসে বলল,
” আমি বুঝছি না তোমার বড় ছেলের মেয়েটার জন্য এত প্রেম আসছে কোথা থেকে। ওর মাঝে তো প্রেম নামের সিস্টেমই ছিলো না”। একটু থেমে আবার বলল,
“যে কাজ ও দুই দিন পর করত, আমি সেই কাজ দুই দিন আগে করে দিচ্ছি। তুমি চাপ নিও না কালকের মধ্যেই একটা ব্যবস্থা করছি আমি।”
এই কথাগুলো বলে এরিক্স ফোন কেটে দিল।
মাটিতে শুয়ে আছে আনায়া। অন্ধকার ঠান্ডা ঘরের কংক্রিটের ওপর শরীরের সবটুকু উষ্ণতা যেন জমে বরফ হয়ে গেছে। গায়ে শুধু এক টুকরো পাতলা সোয়েটার। মোটা জ্যাকেটটা একপাশে পড়ে আছে সে কীভাবে খুলে রেখেছিল মনে করতে পারছে না।
শীতের প্রকোপে ঠোঁট কাঁপছে অনবরত। সাদা হয়ে ফেটে গেছে। ফাটল থেকে ছোট ছোট দাগ কেটে র*ক্ত শুকিয়ে জমে আছে। শরীরের রঙও যেন কেমন ফ্যাকাসে হয়ে উঠেছে। হাত-পা বাঁধা, এতবার মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছে যে কব্জি আর গোড়ালির চামড়া ছিঁ*ড়ে লালচে দাগ বসে গেছে। প্রতিবার দড়ির সঙ্গে চামড়া ঘষা লেগে নতুন করে র*ক্ত ঝরছে।
মুখ শক্ত করে বেঁধে রাখা কাপড়ের কারণে শ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। ঠোঁটের দু’পাশ ছুলে গিয়েছে, চামড়া উঠে গিয়ে লাল হয়ে আছে। প্রতিবার নিশ্বাস নিতে গিয়েও কষ্টে দম আটকে আসছে।
চারপাশে এক ধরনের পচা গন্ধ। শ্বাস নিতে গেলেই মনে হয় পেটের ভেতর সব কিছু উল্টে আসবে। চোখ ঘুরিয়ে দেখল, কোণায় ছিটকে থাকা এক মৃ*তদে*হ। হয়তো কোনো আগের বন্দির লা*শ যেটা পচে গিয়ে নড়বড়ে হয়ে গেছে। চারপাশে অগণিত পোকামাকড় ঘুরছে। সাদা হলদে কৃমির মতো কীটগুলো লা*শের গা থেকে খসে ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়েছে।
আনায়ার বুক ধকধক করতে শুরু করল। কাঁপতে থাকা তার শরীর হঠাৎ আরও শক্ত হয়ে গেল। এক ঝাঁক পোকা ফ্লোর বেয়ে তার পায়ের কাছে চলে এসেছে। পর মুহূর্তেই অনুভব করল, ঠান্ডা আর লেপ্টে থাকা একটা কিছু তার গা বেয়ে উপরে উঠছে।
তার বাঁধা পা ঝাঁকিয়ে সরানোর চেষ্টা করল কিন্তু দড়ির টান আর শীতের অবশতায় পা একচুলও নড়ল না। সেই পোকাগুলো হেঁটে হেঁটে ধীরে ধীরে তার উরু হয়ে কোমরের দিকে এগোতে লাগল। শীত আর আতঙ্কে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। চিৎকার দিতে চাইলো, কিন্তু মুখের বেঁধে রাখা কাপড়ে দম আটকে শুধু গোঁ গোঁ শব্দ বেরোল।
শরীর বাঁকিয়ে বারবার মাটিতে ঠেসে ঠেসে পোকাগুলো সরানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না। কাপড়ের ভেতর থেকে তার দমকৃত কান্নার শব্দ বেরোচ্ছে অসহায়, তীব্র আতঙ্কে ভরা। ঠান্ডায় জমে যাওয়া শরীরের ভেতর এখন কেবল মৃত্যুভয়ের ঝড় বইছে।
আনায়ার চোখে পানি জমে উঠেছে, কিন্তু সেই পানিও ঠান্ডায় শুকিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। চোখ আধখোলা হয়ে পিটপিট করছে দেখা ঝাপসা। শরীর কাঁপছে অজান্তেই। মনে হচ্ছে, প্রতিটি মুহূর্তে যেন জীবনটা ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে।
তার বুকের ভেতর ভয় আর অসহায়তা ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ছে। হাত-পা ছটফট করছে, কিন্তু জানে কোনো লাভ নেই। এই অমানবিক শীতে, এই লোহার দড়ির বাঁধনে সে শুধু ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। তার বুক থেকে চিৎকার বেরিয়ে আসচতে চাইছে।
জেভিয়ারের পায়ের শব্দ করিডরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি তুলছে। টালমাটাল পায়ে সে এগোচ্ছে।শরীরটা এদিকওদিক হেলে পড়ছে বারবার। চোখ লালচে, দৃষ্টি আধো ঘোলা।
তার হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে ইলোরা। বারবার চেষ্টা করছে তাকে সামলাতে “স্টপ, জেভি, তুমি ঠিকমতো হাঁটতেই পারছো না।”
কিন্তু সে শুনছেনা। সে শুধু বিড়বিড় করে যাচ্ছে,
“লাভবার্ড, আমার লাভবার্ড! কোথায় আমার লাভবার্ড! আমার লাভবার্ড।…”
ইলোরা একবার তার বাবার দিকে তাকাল। জন ড্রেভেন গম্ভীর মুখে তাদের দু’জনের পেছনে হাঁটছিলেন। ইলোরা হাতের ইশারায় বুঝালো, জেভিয়ার আর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই।
মিটিংটা মাত্র শেষ হয়েছে, অথচ পুরোটা সময় জেভিয়ার একদম অস্থির ছিল। কাগজের দিকে চোখ ছিল বটে, কিন্তু মনের ভেতরে শুধু আনায়ার অনুপস্থিতি তাড়া করছিল তাকে। শেষে চাপ সামলাতে না পেরে গ্লাসে ড্রিংকস ঢেলে নেয় নিজেকে শান্ত করার জন্য। কিন্তু এভাবে শরীর ভেঙে পড়বে, তা সে নিজেও কল্পনা করেনি।
এখন মনে হচ্ছে, রক্তের ভেতর দিয়ে আগুন ছুটে বেড়াচ্ছে, মাথা ঘুরছে, সবকিছু ঘোলা লাগছে।
ইলোরা ফিসফিস করে বাবাকে বলল, ” ড্যাড এভ্রিথিং ইজ অলরাইট , ওই নিজেকে সামলানোর মত অবস্থায় নেই।
জন ড্রেভেন ভারী কণ্ঠে উত্তর দিলেন ঠোঁট বাকিয়ে বললেন, “অল দ্যা বেস্ট মাই লাভ”।
জেভিয়ার হঠাৎ থেমে গিয়ে দেয়ালে হাত ঠেকাল। কপালে ঘাম জমেছে, শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।
“আমাকে আমার রুমে নিতে হবে না। আমি ঠিক আছি।”
কণ্ঠে ছিল একধরনের অহংকার, কিন্তু শরীর আর তা মানছিল না। ইলোরা কষে তার হাত ধরল, চোখ শক্ত করে বলল,
“না, তুমি ঠিক নেই। একদমই নেই। এখনই রুমে যাচ্ছো।”
জন ড্রেভেন তখন সামনের দিকের হোটেল স্যুটের দরজা খুলে দিলেন। আর কিছু বলার আগেই জেভিয়ার হোঁচট খেয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
হোটেল রুমে ঢুকেই ইলোরা দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করে দিল। নরম আলোয় ঢাকা ঘরটাতে এক অদ্ভুত নীরবতা। জেভিয়ার টালমাটাল ভঙ্গিতে ঢুকলো ভেতরে চোখ দুটো লালচে, মুখটা ঘোলাটে, হাঁটতে গিয়ে বারবার টলছে। শরীরটা যেন নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই।
আসলে এর পেছনে কারণও আছে। ইলোরা জেভিয়ারের গ্লাসে সামান্য কেটামিন মিশিয়ে দিয়েছিল। এই নে*শাজাতীয় পদার্থটুকুই যথেষ্ট ছিলো তাকে নিজের সজ্ঞানহীন করে ফেলার জন্য। জেভিয়ার ভেবেছিল হয়তো ও নিজেই একটু বেশি ড্রিংক করেছে, কিন্তু সত্যিটা অন্য। তার শরীর দুর্বল হয়ে গেছে, চোখ ঝাপসা দেখছে, মস্তিষ্ক আর শরীর সমন্বয় করতে পারছে না।
ইলোরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল তার দিকে। অনেক কষ্টে সে আজ জেভিয়ারকে নিজের করে পাওয়ার একটা ফন্দি এটেছে।
সে হাত বাড়িয়ে জেভিয়ারের কাঁধে ছোঁয়া মাত্রই জেভিয়ার ঝটকা দিয়ে হাত ফেলে দিলো। টলতে টলতে, জড়িয়ে যাওয়া কণ্ঠে বলল,
“হু আর ইউ? আমাকে টাচ করছো কেন? আমার লাভ বার্ড ছাড়া আমাকে টাচ করার অধিকার আর কারও নেই… শুনছো? তোমার হাত কেটে আমি আমার পোষা কুকুরকে খাওয়াবো।”
ইলোরা এক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। চোখ দুটোতে জমে উঠল বিরক্তি আর ক্ষোভ। এতকিছু করল সে ড্রিংকে নেশার ওষুধ মিশালো, পরিস্থিতি তৈরি করলো শুধু জেভিয়ারকে কাছে পাওয়ার জন্য। অথচ জেভিয়ারের মুখে এখনও কেবল এক নাম আনায়া।
ইলোরার বুকটা জ্বলে উঠলো রাগে। ঠোঁট কামড়ে দাঁতে দাঁত চেপে তাকালো জেভিয়ারের দিকে।
“এতকিছু করেও ওই মেয়ের নাম তোর মুখ থেকে মুছতে পারছি না”!
তার চোখে হিংস্র আগুন জ্বলতে লাগলো, অথচ জেভিয়ার ধপ করে সোফায় বসে মাথা ধরে রইলো। চোখ ঘোলা হয়ে যাচ্ছে, মুখে শুধু অস্পষ্ট শব্দ!” আমার লাভ বার্ড।”
রুমের ভেতর হালকা অন্ধকার, শুধু টেবিলে রাখা ফোনের ক্যামেরার লাল আলো টিমটিম করছে।
জেভিয়ার টালমাটাল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে, চোখ দুটো আধো খোলা, কপাল কুঁচকে আছে কিন্তু এখনো ভয়ংকর লাগছে।
ইলোরা ঠোঁটে এক বিকৃত হাসি টেনে এগিয়ে এলো। তার মাথায় তখন একটাই পরিকল্পনা যেভাবেই হোক জেভিয়ারকে নিজের করে নেওয়া।
সে ফিসফিস করে বলল, “জেভিয়ার… আমি তোমার লাভ বার্ড… তোমার ভালোবাসা আমিই… দেখতে পাচ্ছো না?”
জেভিয়ার থমকে দাঁড়িয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল তার দিকে। মাথার ভেতর যেন কুয়াশা, কিছুই পরিষ্কার না। সত্য মিথ্যে গুলিয়ে যাচ্ছে।
ইলোরা আরও কাছে এলো। তার হাত দুটো দিয়ে জেভিয়ারের দু গাল ধরে ফিসফিস করে বলল,
“কাছে টেনে নাও আমাকে। আমি তো তোমার লাভ বার্ড!”
কথা শেষ হতেই ইলোরা হঠাৎ ঠোঁট বসিয়ে দিল জেভিয়ারের ঠোঁটে। তার আঙুলগুলো শার্টের বোতামে খেলা করতে লাগল, একে একে খুলে দিচ্ছে। ফোনের ক্যামেরায় সবকিছু বন্দি হচ্ছে যেন তার পাতা ফাঁদে শিকার আটকে পড়েছে।
কয়েক সেকেন্ড কেটে গেল। জেভিয়ার প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। মাথা ঘুরছে, শরীর দুর্বল, সব যেন থমকে গেছে। কিন্তু হঠাৎই তার র*ক্তে আগুন বইতে লাগল। চোখদুটো রক্তাভ হয়ে উঠল, দাঁত কিঁচিয়ে গর্জে উঠল। সে প্রচণ্ড জোরে ইলোরাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল।
এরপর বজ্রের মতো হাত উঠল। দুই গালে সপাটে চড় বসলো। শব্দটা ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলল। ইলোরা একদিকে লুটিয়ে পড়ল, ঠোঁট ফেটে গেল, গাল লালচে ফুলে উঠল। চোখে পানি চলে এলো ব্যথায় আর অপমানে।
জেভিয়ার হাপাচ্ছে, চোখ লাল, বুক ওঠানামা করছে।
সে দাঁত কিঁচিয়ে বলল
” বলেছি না… আমার লাভ বার্ড শুধু একজন… তার জায়গায় আসতে চাইছিস কোন সাহসে, হাহ? তোর কি মনে হয় আমি লাভ বার্ড এর গায়ের গন্ধ আমি চিনি না?”
রুমে বাতাস হঠাৎই ভারী হয়ে উঠল। জেভিয়ারের চোখ এখন পুরো র*ক্তাভ, শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। মুখে ঘোলা নে*শার ছাপ থাকলেও তার ভেতরের হিংস্র রূপটা দমিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
সে ধীরে ধীরে ইলোরার দিকে এগিয়ে এলো, প্রতিটা পা যেন মাটিকে কাঁপিয়ে তুলছে।
ইলোরা মেঝেতে বসে, গাল ফুলে উঠেছে, ঠোঁট ফাটা, তবুও ক্যামেরার কোণে চোখ ঘুরিয়ে দেখছে সবকিছু রেকর্ড হচ্ছে।
জেভিয়ার ঝুঁকে গিয়ে তার চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরল। ইলোরার মাথা হঠাৎ পেছনে টেনে তুলল।
হিসহিস করে বলল –
“তোর কলিজা আমি টুকরো টুকরো করে কেটে দেখতে চাই আসলে কত বড় তোর কলিজাটা!
চোখে অমানুষিক আগুন। হাতের শক্তিতে ইলোরার ঘাড় ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল। সে টেনে নিয়ে গিয়ে দেয়ালে সজোরে ধাক্কা মারল। দেয়ালে আছড়ে পড়তেই ইলোরার কপাল ফেটে সামান্য রক্ত গড়িয়ে পড়ল।
জেভিয়ার এক হাতে তার গলা চেপে ধরল। শ্বাসরোধ হয়ে আসছে ইলোরার, চোখ উল্টে যাচ্ছে।
কিন্তু সেই অবস্থাতেও ইলোরার ঠোঁটে বিকৃত হাসি ফুটে উঠল। কারণ সে জানে এই প্রতিটা দৃশ্য ক্যামেরায় ধরা পড়ছে, আর তার হাতেই প্রমাণ জমছে।
হঠাৎ করেই নিজের মাথা দুহাত দিয়ে চেপে ধরল জেভিয়ার। চোখ বন্ধ করে হাঁটুতে বসে পড়ল। নেশা আর রক্তে ভরা ক্রোধ একসাথে লড়ছে তার ভেতরে।
আনায়া ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। দরজার ভারী শব্দটা ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো। অন্ধকার ঘরে আলো ঢুকতেই আনায়ার চোখে এক মুহূর্তের জন্য ব্যথার দপদপানি শুরু হলো।
সারা রাত ঘুম নেই, চোখের নিচে কালো দাগ জমে গেছে। ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে র*ক্ত জমে শক্ত হয়ে আছে।
কাল রাত থেকে কিছু খায়নি সে। বুকের ভেতর খালি খালি লাগছে, মাথা ঘুরছে।
এরিক্স ভেতরে ঢুকলো, তার হাতে এক প্লেট খাবার।
সে ধীরে এসে আনায়ার মুখের বাঁধন খুলে দিল।
আনায়া শ্বাস নিয়ে তীব্র ব্যথায় চোখ কুঁচকে ফেলল। মুখের কোণায় র*ক্তের দাগ এখনো শুকায়নি।
এরিক্স এবার তার হাতের দড়িও খুলে দিল। তারপর খাবারটা সামনে ঠেলে দিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“ফাস্ট খাও। বেরোতে হবে।”
আনায়ার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে ধীরে, ক্লান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল “কোথায়… কেন?
এরিক্স সামান্য হেসে, চোখ নামিয়ে বলল,
” ভেবেছিলাম অন্তত দুই দিন থাকবে তুমি এখানে কিন্তু তার সুযোগ নেই। ভাই তোমাকে আজই বিদায় করতে বলেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে মানুষ আসবে তোমাকে নিতে।”
আনায়া হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। ঠোঁট কাঁপছে। “কি…? জেভিয়ার আমাকে বিদায় করতে বলেছে মানে কী?”
এরিক্স এবার গভীর শ্বাস নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“হুম… দেখো, ভাই তোমাকে এখানে এনেছে তার নিজের কাজের জন্য। এই পর্যন্তই। এর চেয়ে বেশি কিছু না। তোমার সাথে একসাথে থেকেছে বলে এটা ভেবো না যে সে তোমাকে ভালোবাসে। ভাইয়ের কাছে লাভ, ব্যবসা আর প্ল্যানই সবকিছু।”
আনায়ার বুকটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল। গলার ভেতর কিছু আটকে গেল। কিন্তু ঠোঁটে কোনো শব্দ বের হলো না শুধু এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল শুকনো গালের ওপর।
আনায়া দাঁতে দাঁত চেপে, রাগ আর ব্যথায় ভরা গলায় বলল, “ফালতু মিথ্যে কথা বলবেন না। আমি বিশ্বাস করি না এইসব।”
এরিক্স ঠোঁট বাঁকিয়ে ফিচেল হাসল। চোখের কোণায় কূটবুদ্ধি ঝিলিক। “বিশ্বাস করো না? কিন্তু এটাই সত্যি। ভাই যদি ভালোবাসে তবে ইলোরাকেই ভালোবাসে। দেখো না একসাথে বিজনেস ট্রিপে আছে। একই জায়গায় থাকছে ওরা।”
আনায়ার বুক হঠাৎই ভারী হয়ে এলো। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে যেন। চোখ ভিজে উঠছে কিন্তু সে মাথা ঝাঁকিয়ে গলায় জোর আনল। “আমি বিশ্বাস করি না। আপনি আমাকে মিথ্যে বলে দূরে সরাতে পারবেন না।”
এরিক্স এবার আরো কাছে ঝুঁকে এসে ধীরে ধীরে বলল, “ভাই সরানোর আগে আমি সরিয়ে দিতে চাচ্ছিলাম তোমাকে। নয়ত পড়ে কষ্ট বেশি পাবে। আমি আবার মানুষকে কষ্টে দেখতে পারি না। বেশি ভালো হতো যদি নিজে থেকেই সরে যেতে।”
আনায়া চোখ মেলে কঠিন দৃষ্টি ছুঁড়ে দিল। গলা কাঁপছে, তবু দৃঢ়ভাবে বলল, “এইসব আমি মানি না। বললাম না জেভিয়ার নিজে এসে বললে আমি বিশ্বাস করব। নয়তো না।”
এরিক্স এবার ভুরু উঁচু করল, ঠোঁটে আবার সেই শয়তানি হাসি। “ওহ, তাহলে প্রমাণ চাই? ওয়েল, একটা জিনিস দেখাই তোমায়।”
এ কথা বলেই সে নিজের ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে কয়েকটা ট্যাপ করল। তারপর ক্যামেরা উল্টে আনায়ার সামনে ধরল।
জেভিয়ার এবং ইলোরার গভীরতম চুম্বনের দৃশ্য পরিষ্কার ভাবে ভেসে উঠছে স্ক্রিনে।
আনায়া ঝাপসা চোখে স্ক্রিনের দিকে পলকহীনভাবে চেয়ে
থাকে। তার চোখ বেয়ে নোনা পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে ফোয়ারার মত। তবুও সে নির্বিকার। কি বলবে সে? তার তো বলার আর কিছুই নেই!
এরিক্স চোখ সরু করে আনায়ার দিকে তাকাল, মুখে সয়তানি এক ঠান্ডা হাসি।
“এইটা কি ফেইক মনে হচ্ছে তোমার কাছে? হুম? তুমি চাইলে আমি ভাইকে একবার কল দিয়ে দেখাই… কাল সারা রাত ভাই কি করেছে।’
আনায়ার বুক ধকধক করছে, টলমল চোখে সে এরিক্সের দিকে তাকিয়ে রইল। ঠোঁট কাঁপছে, অথচ গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। চোখের কোণে পানি জমে ঝাপসা করে দিল চারপাশটা।
এরিক্স ঠোঁটের কোণায় বাঁকা হাসি টেনে, হালকা ঝুঁকে আবার বলল, “দ্রুত বলো, কি করতে চাও তুমি?”
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা। আনায়া চোখ নামিয়ে ফেলল। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। হাড়ভাঙা ব্যথা নিয়ে, ভাঙা গলায় ফিসফিস করে বলল, “কখন আসবে মানুষ, আমাকে নিতে?”
তার কণ্ঠে এমন ভাঙাচোরা হাহাকার ছিল, যেন নিজের ভেতর থেকেই সে ভেঙে পড়ছে।
এরিক্স দাঁত বের করে একরকম হেসেই বলে, “চলে আসবে আধা ঘণ্টার মধ্যে। তুমি খেয়ে নাও। আমি দেখে আসছি, তারা কত দূরে আছে।”
কথা শেষ করেই দরজা লক করে চলে যায়।সে। ভারী লোহার দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দ যেন আঘাত হয়ে বাজল আনায়ার বুকে। ঘরে হঠাৎ আবার ভুতুড়ে নীরবতা নেমে এল।
আনায়া এক দম চুপ করে বসে রইল। চোখের সামনে রাখা খাবারের দিকে একবার তাকাল, তারপর দু’চোখ ভিজে ঝাপসা হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল, মনে হলো কেউ শক্ত করে শেকড়ে বেঁধে টেনে ধরে আছে, তবু শ্বাস নিচ্ছে না। সে মুখটা দুই হাঁটুর ভাঁজে গুঁজে দিল, আর ঠিক তখনই ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। গলা দিয়ে ভাঙাচোরা শব্দ বেরোল, “কেন আমাকে এত কষ্ট দিচ্ছে…. কেন?”
ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, পাশে ছুলে র*ক্ত জমে কালো হয়ে আছে। চোখের পানিতে সেই র*ক্তের দাগগুলো গলে গড়িয়ে পড়ছে গালে। ক্ষুধায় পেট মোচড় দিচ্ছে, কিন্তু ভেতরের ব্যথা তার চেয়ে অনেক বেশি। খাবারের প্লেটটা তার সামনে পড়ে আছে, অথচ সে তাকিয়ে থেকেও হাত তুলতে পারছে না।
ঘরের দেয়াল যেন তার কান্নার আওয়াজ গিলে নিচ্ছে। বাইরে থেকে কোনো আলো আসছে না, শুধু বুকভাঙা হাহাকার ভাসছে।
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল “জেভিয়ার…. আমি কি সত্যিই তোমার কাছে কিছু ছিলাম না?”
একেকটা কান্নার ফোঁটা মেঝেতে পড়ছে, যেন প্রতিটা শব্দের সাথে তার প্রাণটাও গলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
কিছুক্ষণ পর এরিক্স আসলো। খেয়াল করলো, আনায়া খাবারের পাশেই পড়ে আছে কিছু খায়নি। ভ্রু কুচকে ফেললো এরিক্স। কিছু বলার আগেই আনায়া ফিসফিস করে বলল, “আমাকে কি নিতে চলে এসেছে?”
এরিক্স হালকা সুরে বলল, “হুম, তবে তুমি কেন খাওনি?”
“এমনি ইচ্ছা হয়নি,”ভাঙা গলায় উত্তর দিল আনায়া।
এরিক্স ধীরে ধীরে আনায়ার হাত খুললো। ঠিক তখনই তিনজন কালো পোশাকধারী ব্যক্তি প্রবেশ করলো। তাদের মুখ কারওটাই দেখা যাচ্ছে না, পুরোপুরি ঢাকা।
তারা এসে আনায়াকে ধরার চেষ্টা করলো, পেছন থেকে একজন কণ্ঠে হুঁশিয়ারি দিল, “ধরিস না ভুলেও, স্যার মেরেই ফেলবে।”
আনায়ার হাত-পা অচল, দীর্ঘ সময় ধরে বাঁধা থাকার কারণে নিজে দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছে। তবুও ধীরে ধীরে সে এগোলো। বাহিরে পা রাখতেই চোখের সামনে বিশাল গাড়ি অপেক্ষা করছে।
গাড়ির দিকে এগোতে গিয়ে, আনায়া একবার চুপচাপ তার এবং জেভিয়ার-এর রুমের দিকে তাকালো। চোখের কোণ দিয়ে অজান্তেই পানি গড়িয়ে পড়লো।
হালকা কাঁপুনি নিয়েই সে চোখ মুছে নিল এবং গাড়িতে চড়ে বসল।
গাড়ি উঠে যেতেই, এক কালো পোশাকধারী লোক ধীরে ধীরে আনায়ার দিকে এগিয়ে এল। সে আনায়ার হাতে এক কাগজ ধরিয়ে দিল।
“সাইন করুন,” তার কণ্ঠে শুধুই আদেশ।
আনায়া কাঁপতে কাঁপতে কলমটা ধরলো। কাগজে বড় বড় অক্ষরে স্পষ্ট লেখা “আমি, আনায়া ম্যারি, স্বইচ্ছায় নিজেকে ডেভিড মার্সার এর নামে দান করছি।” আরও অনেক লেখা ছিলো যা আনায়ার চোখে পড়েনি এত।
আনায়ার হাত কাপাকাপা হয়ে উঠলো। মনে মনে সে বলল, “আমি আনায়া ম্যারি, স্বইচ্ছায় নিজের দেহ ডেভিড মার্সারের নামে লিখে দিলাম।”
অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১৮
সাইন শেষ হতেই, এক জোড়া পরিচিত হাত হঠাৎ করে আনায়ার কোল থেকে কাগজটা ছিনিয়ে নিল। হাতটি দেখে আনায়ার হৃদয় এক মুহূর্তে থেমে গেল।
পাশ ফিরে তাকাতেই সে চমকে উঠল। সেই হাত… সেই পরিচিত হাত… তার অতীতের কোনো স্মৃতি, যা সে কখনো ভুলতে চেয়েছিল, এবার অচেতনভাবে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে…
