অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৫
শ্রাবণী ইয়াসমিন
রাত নেমে এসেছে নিঃশব্দ আর ভারি নীরবতায়। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, জেগে আছে শুধু শূন্যতা আর নিঃশ্বাসের শব্দ।
আনায়া জেভিয়ারের পাশে পাশে হাঁটছে। ভয় নয়, অস্বস্তি নয়, একটা অজানা বোধ কাজ করছে ওর ভেতর। যেন এক অচেনা মোহে বন্দি সে, যার কোনো যুক্তি নেই, শুধু অনুসরণ করার প্রলাপ।
মাত্র তিন মিনিটের পথ। হালকা জঙ্গলঘেরা গলিপথ পেরিয়ে সামনে জেভিয়ারের বাড়িটা ভেসে উঠল।
দুই তলা বিশাল ভবন, যেন কোনো পুরনো অভিজাত প্রাসাদ। বাড়িটার মূল রঙ গভীর কালো।
অন্ধকারেও যেন আরেকটা অন্ধকার ঢেউ খেলে যাচ্ছে দেয়াল বেয়ে। বাইরের দেয়ালে আধুনিক আর প্রাচীন স্থাপত্যের সংমিশ্রণ। জানালাগুলো লম্বা, খিলান আকৃতির, আর ছাদের কিনারে পাথরের পাখি মূর্তি বসানো। পুরো বাড়িটায় একরকম শীতল অথচ কল্পনাতীত রকম রুচিশীলতা।
ভেতরে যেতেই আনায়া বিস্ময়ে অবাক হয়ে যায়। সামনের হলঘরে বিশাল এক ঝাড়বাতি, যেন ছাদের সঙ্গে ঝুলে থাকা কোনও দামী অলংকার। সোনালি কাঠামোয় হীরা বসানো, আলোতে হালকা নীলচে ঝিলিক।চারপাশের দেয়ালে দামি চিত্রকর্ম, শূন্যতা ভাঙে না কোনো শব্দ শুধু নিঃশ্বাসে মিশে থাকে ঘরের সুগন্ধি আর নিঃস্তব্ধতার শীতলতা।
“চলো, তোমার রুমটা দেখিয়ে দিই।
-নরম কণ্ঠে বলে জেভিয়ার।
দোতলায় উঠে করিডোরের শেষ প্রান্তে নিয়ে গেল ওকে।
দরজাটা খুলতেই হালকা মৃদু সুগন্ধি ভেসে এলো।
ঘরটা সাজানো, নিঃস্তব্ধ, রুচিসম্মত কিন্তু একটা অদ্ভুত চাপা বিষণ্ণতা যেন মিশে আছে দেয়ালের রঙে। বিছানায় গাঢ় নীল রঙের চাদর, জানালায় ঘন, ভারী পর্দা, টেবিলের কোণে ছিমছাম ফুলদানি, আর পাশে একটা বইয়ের তাক পুরনো বইয়ে ভরা।
জেভিয়ার আনায়ার দিকে তাকিয়ে বলে—
“- এই ঘরটা আজ থেকে তোমার। আমি পাশের রুমেই আছি।যেকোনো দরকার হলে একটা শব্দ দিলেই চলে আসব।
আনায়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। তার চোখে তখনো বিস্ময় এক অদ্ভুত মুগ্ধতার টানাপোড়েন।
জেভিয়ার হালকা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করল যেন, তারপর ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হতেই আনায়া গভীর নিশ্বাস ফেলে। লাইট নিভিয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয়।
হঠাৎ রুমের বাইরে থেকে ভেসে আসে একটা তীক্ষ্ণ ঘষা ঘষা শব্দ যেন কেউ ভারী কিছু টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আনায়া চোখ মেলে তাকায়। তার বুক ধুকপুক করছে। দরজার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ আটকে যায় নিচে।
একটা ছায়া। কিছু একটা যেন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল ।
আনায়ার বুকের ভেতর ঠাণ্ডা জমে যায়।
কণ্ঠ শুকিয়ে আসে, গলা কেঁপে ওঠে—
“…জেভিয়ার…”
একটু পরেই দরজা খুলে ভেতরে আসে সে।
“- কি হয়েছে?
— গম্ভীর, কিন্তু চিন্তিত কণ্ঠ।
আনায়া উঠে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে তাকায় ওর দিকে, কণ্ঠ কাঁপছে।
“- আমি আমি এখানে একা থাকতে পারছি না। ক..কে যেন ছিল দরজার বাইরে। আমি ছায়া দেখেছি। আমার খুব ভয় লাগছে জেভিয়ার প্লিজ আমাকে একা রেখে যাবেন না।
জেভিয়ার কিছু না বলে তাকিয়ে থাকে ওর চোখের গভীরে।
তারপর খুব ধীরে বলল—
“চলো, আমার রুমে সেখানে আমি কিছু কাজ করছি।
আনায়া আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। চুপচাপ পা ফেলে তার সঙ্গে হাঁটতে থাকে।
আর জেভিয়ারের মুখের কোণে ফুটে ওঠে নির্লিপ্ত, হালকা এক অদ্ভুত হাসি।
সূর্য অনেকক্ষণ আগেই উঠেছে, কিন্তু ঘরটা এখনো অন্ধকারে ঢাকা।
ঘুম থেকে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে আনায়া। চোখ কচলাতে কচলাতে চারপাশে তাকায়। মুহূর্তখানেকের জন্য তার মনে হয়, সে কোথায় আছে… কোথায় যেন আটকে আছে স্মৃতির ভেতর।
তারপর হঠাৎ মনে পড়ে সে এখন জেভিয়ারের বাড়িতে।
তার রুম নয়, বিছানা নয়, কিছুই নিজের না তবু যেন একরকম শান্তি মিশে আছে দেয়ালের নিঃশব্দতায়।
ঘুমভাঙা শরীরটা একটু নড়তেই হঠাৎ সে নিজেকে দেখে আঁতকে ওঠে। টিশার্টটা তার পেটের অনেক ওপর উঠে গিয়ে তার ফর্সা নাভীমূল অনাবৃত হয়ে পড়েছে।
চোখে লজ্জার ছায়া, দ্রুত উঠে বসে চাদরটা টেনে নেয়। চারপাশে তাকিয়ে দেখে, ঘরে কেউ নেই।
জেভিয়ার কোথাও নেই।
সে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। যেন তার গলার উপর চাপা পড়ে থাকা ভারী কিছু হালকা হয়ে গেল।
কিন্তু স্বস্তিটা টিকলো না বেশিক্ষণ। দরজার পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে ভেসে আসে কিছু টানা শব্দ। হঠাৎ দরজা খুলে যায়। ভেতরে ঢোকে জেভিয়ার।
তার হাতে ধরা একটা খাবারের ট্রলি শুধু ব্রেকফাস্ট নয়, যেন রাজকীয় এক ভোজ নিয়ে এসেছে।
ফ্রেঞ্চ টোস্ট, স্ক্র্যাম্বলড এগ, প্যানকেকস, কেটলি ভর্তি কফি আর পাশে সোনালি রঙের ট্রে-তে ফল আর মধু।
আনায়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে এক কাপ কফি এগিয়ে দেয় সে।
“গুড মর্নিং, মাই…”
জেভিয়ার কণ্ঠটা হঠাৎ থেমে যায়। তার ঠোঁটে হালকা এক অচেনা দৃষ্টির ছায়া। তারপর নিজেকে সামলে নেয়।
“গুড মর্নিং, অ্যানা।”
আনায়া একটু চমকে যায়, আবার মিষ্টি হেসে বলে—
“গুড মর্নিং।”
তার চোখ কফির কাপ থেকে খাবারের ট্রলির দিকে চলে যায়।
“এই সব… তুমি বানিয়েছো?”
জেভিয়ার ঠোঁটের কোণে একটু মুচকি হাসি।
“আমার তো মনে হয় না, আমি ছাড়া এই বাড়িতে আর কেউ আছে। কাজের লোক তো নেই।
দুজনেই হেসে ওঠে। কিছুটা আরাম, কিছুটা অদ্ভুত এক ঘনিষ্ঠতা জমে ওঠে মুহূর্তেই।
আনায়ার চোখ হঠাৎ আটকে যায় জেভিয়ারের দিকে।
আজ তার গায়ে একটা সাদা, শর্টহাতা ম্যাগি কাট গেঞ্জি।
চওড়া বুকের রেখা স্পষ্ট, তার বাহুর মাসল যেন ঠাসা দৃঢ়তায় তৈরি করা।
পেশির প্রতিটা খাঁজ রোদে চকচক করছে। গলা থেকে কাঁধ বেয়ে নিচে নামা শিরাগুলো স্পষ্ট, যেন বুনোট আঁকা ছাপ। কাঁধে হালকা ঘাম জমেছে, কপালে দু এক ফোঁটা ঘামের বিন্দু নেমে এসেছে ভ্রুর কিনারে।
ঘন ভ্রু, শক্ত চোয়াল, হালকা চাপ দাঁড়ি আর অসম্ভব নিখুঁত ঠোঁটের রেখা সব মিলিয়ে জেভিয়ারকে মনে হয় যেন কোনো পেইন্টিং থেকে উঠে আসা বুনো, অথচ শীতল এক পৌরুষ।
আনায়া চোখ ফেরাতে চায়… কিন্তু পারে না।
হলকা আলোয় স্পষ্ট দেখা যায় ওর ঘাড় বেয়ে নামা শিরাগুলো, চাপা দাঁড়িতে ঝাপসা হয়ে থাকা চোয়ালের রেখা, আর তীক্ষ্ণ ঠোঁটের নিখুঁত বাঁক।
আনমনে ওর একটা হাত কপালে জমে থাকা ঘাম মোছে আর তাতে ওর বাহুর মাসল শক্ত হয়ে ওঠে, টানটান, রক্তচাপা রঙের নিচে যেন কাঁচের মতো ঝকঝক করছে শিরা।
সেই দৃশ্য দেখে আনায়ার নিঃশ্বাস আটকে আসে। তার পেটের গভীর থেকে উঠে আসে একধরনের অজানা শিরশিরে অনুভূতি নাভিমূল থেকে বুক পর্যন্ত কাঁপুনি ধরে যায়।
পায়ের আঙুলগুলো অজান্তেই মুঠো হয়ে আসে, ঘাড়ের নিচে হালকা ঘাম জমে, আর বুকের ভেতরে ধুকপুক শব্দটা যেন আরও জোরে বাজে।
ও বুঝতে পারে ওর শরীর ওকে ধোঁকা দিচ্ছে। তার চোখ জ্বলজ্বল করছে, কিন্তু মুখ থমথমে। ভেতরে যেন হিম আর আগুন পাশাপাশি জ্বলছে।
আনায়া নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে, কিন্তু সে জানে এই মুহূর্তে জেভিয়ারের উপস্থিতি ওকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
সে ঠোঁট ভেজায়, চোখ সরিয়ে নিতে চায়, কিন্তু চেয়ে থাকাই যেন সহজতর।
এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হয় এই লোকটা… এই অদ্ভুত, শীতল, অথচ তীব্র পুরুষ যে তাকে গিলে ফেলবে।
জেভিয়ার হালকা একটা মুচকি হাসে, যেন সে সব কিছু বুঝে ফেলেছে।
তার ঠোঁটের কোণে সেই ছায়া হাসিটা… ঠিক যেন শিকারির হাসি, যে জানে শিকার কতটা দূরে।
আনায়া হঠাৎ করে কফির কাপটা নামিয়ে দেয়।
“আমি… একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি।
—স্বরে কাঁপা একটুখানি অস্থিরতা।
জেভিয়ার তাকিয়ে থাকে। কিছু বলে না, শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
আনায়া দ্রুত পা ফেলে চলে যায়। দরজা আটকে, আয়নার সামনে দাঁড়ায়।নিজেকে দেখে তার মনে হয় এই চেহারাটা কি তার নিজের?
চোখে অচেনা ঝলক, মুখের ত্বকে লালচে উত্তাপ, নিঃশ্বাসগুলো এখনও ভারি।
সে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢাকে। নিজেকে বুঝ দেয়।
“এটা কিছু না… কিছু না। এক ধরনের আকর্ষণ। সেটা নিয়ন্ত্রণ করাই ঠিক।
পানি ছিটিয়ে নেয় মুখে। ঠোঁট ভিজিয়ে আবার গভীর করে নিঃশ্বাস নেয়। আস্তে আস্তে নিজেকে গুছিয়ে নেয় সে।
দরজা খুলে বের হতেই আবিষ্কার করে জেভিয়ার আর রুমে নেই। সে কিছুক্ষণ পর ধীরে পা ফেলে নিচে নামে।
নিচতলার কিচেন থেকে হালকা ধোঁয়া, কড়াইয়ের শব্দ আর ঘি ভাজার ঘ্রাণ ভেসে আসে। আনায়া হাঁটতে হাঁটতে রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়।
জেভিয়ার তখন ফ্রাইপ্যানে কিছু নেড়ে দিচ্ছে। তার গায়ে সকালের গেঞ্জিটা আর নেই। এখন পরনে হালকা ধূসর টি-শার্ট, একদম সহজ, কিন্তু তবুও তার শরীরের গঠন স্পষ্ট হয়ে থাকে তাতে।
আনায়া একটু এগিয়ে যায়। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখে।
“তুমি রান্নাও জানো?
-হালকা হেসে প্রশ্ন করে সে।
জেভিয়ার পেছন ফিরে তাকায়। মুখে সেই নির্লিপ্ত শান্ত হাসি।
“তোমার মতো কেউ যে ব্রেকফাস্ট আর দুপুরের ভাত রেঁধে দিতে পারে, সেটা খুব একটা কল্পনায় আসে না।
“আমি যা করি, সেটা পুরো করি। হোক সেইটা খুন বা হোক সেইটা রান্না।
আনায়া চোখ গোল করে তাকায়,এরপর ভাবে হয়ত ঠাট্টা করছে।
তবে মুহূর্তের মধ্যে জেভিয়ার কথা বদলায়।
“আচ্ছা তুমি কাওকে ভালোবাসো?
“আম…নাহ কেউ বিশেষ ভাবে জীবনে আসেনি আমার। আমি আসলে কখনো এইসব নিয়ে ভাবিই নি।তুমি ভালোবাসো কাওকে?
“হুম বাসি তবে সেইটা তার বোধগম্য হয়নি এখনো।
আনায়া যেন জেভিয়ার এর কথার মানে কিছুই বুঝল না। শুধু বোকা বোকা চোখে চেয়ে রইল।
জেভিয়ার হেসে কথা ঘুরিয়ে অন্য কথা বলতে বলতে ফিরে যায় ফ্রাইপ্যানের দিকে। দুজনের মাঝে তখন একধরনের অলিখিত স্বস্তি।
আনায়ার চোখ হঠাৎ গিয়ে থামে—
জেভিয়ার যখন কথা বলে, তখন তার গলায়, সেই অ্যাডামস অ্যাপেলটা ধীরে ধীরে ওঠানামা করে।
ওর মনে হয়—
ওটা কি গলার ভাষা? নাকি ভেতরের কোনো চাপা ঢেউ?
আনমনে সে চোখ সরাতে পারে না। অদ্ভুত এক শখ জন্মায়’ছুঁয়ে দেখি কেমন লাগে’।
আর নিজেকে থামানোর আগেই ওর হাতটা এগিয়ে যায়,আঙুল ছুঁয়ে বসে সেই অ্যাডামস অ্যাপেল এ।
এক মুহূর্তে নীরবতা জমে যায় রান্নাঘরের বাতাসে।
জেভিয়ার স্থির হয়ে যায়।তার কণ্ঠ থেমে যায়।
ওর চোখ এখন কিছুটা বিস্মিত, কিছুটা গভীর… কিন্তু উত্তেজিত নয়।বরং একরকম অদ্ভুত শান্ত।
অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৪
আনায়ার হাত তখনো ছুঁয়ে আছে তার গলার সেই চলমান হাড়টাকে খুব কোমল, হিসেব করে না শুধু অনুভবের জন্য।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সে চমকে নিজের হাত সরিয়ে নেয়। মাথা নিচু করে ফেলে লজ্জায়।ঠোঁট শুকিয়ে গেছে, বুকের ভেতর আবার ধুকপুক।
তখনই জেভিয়ার ধীরে একটু ঝুঁকে আসে আনায়ার দিকে।
তার নিঃশ্বাস ওর কানের ঠিক পাশে এসে লাগে।
“…এই হাত যদি আর একবার আমাকে স্পর্শ করে ,তাহলে তুমি পুরোটা আমার হয়ে যাবে, অ্যানা। পুরোটা।
