অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৪
তোনিমা খান
বছরের শুরুর দিনগুলোতে স্কুলের পরিবেশ কিছুটা আনন্দমুখর, উৎসব প্রবণ থাকে। অনুষ্ঠান, নানা আয়োজনে ক্লাস ঠিকমতো হয় না। এই কারণেই তানশান বছরের শুরুর দু’দিন স্কুলে যায়নি, ঘরে বসে পড়াশুনা করেছে। কিন্তু আজ সে স্কুলে যাচ্ছে।
তানশান তৈরি হয়ে বের হতেই তপোবন তার টাই বেঁধে দিল। ছেলেটা টাই বাঁধতে পারে না। অতঃপর কপালে আঁছড়ে পড়া চুলগুলোকে পেছনে ঠেলে দিতে দিতে বলল,
–“নিচে যাও, পাপা তোমার ব্যাগ গুছিয়ে আসছি।”
–“বেশি বই দিও না। আজও ঠিকমতো ক্লাস হবে না। দুই তিনটা ক্লাস হবে।”
–“আচ্ছা, আমি ফোন করে জেনে নিচ্ছি কি কি ক্লাস হবে। তুমি গিয়ে তাড়াতাড়ি খাবার শেষ করো। পাপার দেরি হয়ে যাচ্ছে, অফিসে যেতে হবে।”
তানশান নিচে যায়। নির্জনা বেগম তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
–“স্কুলে যাচ্ছ আজ? টিফিন নেবে।”
তানশান চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,
–“টিফিন নেবো না দাদুমনি, আজ বেশি ক্লাস হবে না।”
–“আচ্ছা, তবে এখন কী খাবে মাকে বলো।”
যেই জীবনে ‘মা’ ডাকটি অসম্ভব ছিল, সেই জীবনে ইদানীং হরহামেশাই ‘মা’ শব্দটি প্রতিধ্বনিত হয়। শাশুড়ির কথায় রূপকথা, রান্নাঘর থেকে পা চালিয়ে খাবার ঘরে আসে। বলে,
–“আম্মা, কিছু বলেছেন?”
তানশান, নির্জনা বেগম চোখ তুলে তাকায়।
নির্জনা বেগম বললেন,
–“তোমার ছেলে স্কুলে যাচ্ছে, তার নাস্তা কোথায়?”
মৌনতা রান্নাঘর থেকে ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে এসে ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“তানশানের জন্য স্যান্ডউইচ আর টাকোস বানিয়েছি তো, আম্মা।”
নির্জনা বেগম শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় মেজো বউমা এর দিকে। আদেশের সুরে বলে,
–“এরপর যার দায়িত্ব সে পালন করবে। এগুলো রান্না করার পদ্ধতি বড় বউমাকে শিখিয়ে দেবে। আগামীকাল থেকে সে তৈরি করবে।”
মৌনতা মাথা নেড়ে সায় জানায়। রূপকথা নিরুত্তর দাঁড়িয়ে দায়িত্বের ভারগুলো বহন করতে। তানশান কিছু বলে না। নীরবে মেজো মায়ের দেয়া খাবার খেতে লাগল।
বাড়ির সকলে এখনো নাস্তার টেবিলে আসেনি। তপোবন, তানশান আর তকদির সিকদারের তাড়া আছে, তাই তারা নিজেদের ব্রেকফাস্ট আগেই করে নেয়। কিছুক্ষণ বাদ তপোবন আর তকদির সিকদার ও আসে নাস্তার টেবিলে। রূপকথা মৌনতা সকলকে নাস্তা বেড়ে দেয়।
রান্নাঘরে যেতে যেতে রূপকথা একবার ফিরে তাকায় পাশাপাশি বসে নাস্তা করতে থাকা বাবা ছেলের দিকে। অন্তঃস্থল বলে, এটা একটা সুন্দর দৃশ্য। স্কুল ইউনিফর্ম পরিহিত তানশানকে দেখে অন্তঃস্থল মলিন হয়। তার জীবনের গতিবিধি যদি আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো হতো তবে এখন সেও এমন আনন্দের সহিত কলেজে যেতে পারত। আকাঙ্ক্ষা ভরা চাহনিতে পর্যবেক্ষণ করে ছেলের পাশে বসা ভারী গম্ভীর মুখশ্রীটি। বেশ ক’দিন হয়ে গেল মানুষটা তার পড়াশুনার বিষয়ে একটা টু শব্দ করেনি। সে তো বলেছিল পড়াশুনা করতে দেবে! সে কি একবার জিজ্ঞেস করবে? কিন্তু লোকটা তো না বলতেই সব বুঝে যায়, এটাও তো বোঝার কথা। স্কুল কলেজ খুলে গিয়েছে যে!
নিজ ভাবনায় বিভোর, হঠাৎ শাশুড়ির চোখে চোখ পড়তেই রূপকথা মৃদু হকচকায়। দ্রুত কদমে রান্নাঘরে ঢুকে গেল।
তপোবন তানশানকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। ছেলেকে স্কুলে দিয়ে সে অফিসে যাবে।
ঘরের সকলের তখন নাস্তা করা শেষ শুধুমাত্র এরোজ আর ইমরোজ ব্যতীত। নির্জনা বেগম নাস্তা করে ঘরে যেতে যেতে বললেন,
–“জবা, এরোজের ঘর থেকে সব আধোয়া কাপড়গুলো নিয়ে এসে ধুয়ে দে।”
–“জি, চাচি।”, জবা আনত মুখে জবাব দিল। অন্যদিকে চোখেমুখে ঘোর বিরোধ এই আদেশ মানতে। নির্জনা বেগম চলে যেতেই জবা ছুটলো রান্না ঘরে। রূপকথা, মৌনতা আর মাজেদা চাচি দুপুরের রান্নার জোগাড়ে ব্যস্ত। সে তড়িঘড়ি করে ঢুকেই ঘোর বিরোধিতার সাথে বলল,
–“চাচি কইছে ছোড ভাইজানের ঘর থিকা আধোয়া কাপড়গুলো আইনা ধুয়ে দিতে। কিন্তু আমি বাঘের গুহায় ঢুইকা ঐ কাপড় আনিতে পারিব না।”
মৌনতা ভিজিয়ে রাখা মাছ তুলতে তুলতে বলল,
–“তুই না করলে কে করবে? আমি?”
–“আফনেরে কইছি? মাজেদা চাচি খালি আমারে কাপড় গুলা আইনা দেবে, বাকি কাজ আমি করিব।”
মাজেদা চাচি আরো তীব্র প্রতিবাদ করে বলল,
–“আমি পারুম না মাইজ্জা বউ। তুমি ওর কাজ ওরে করতে কও। গত কালকে কি হইছে তা তো তুমি জানো, স্বামীরে পাইয়া উপর থিকা আর নামো নাই।”
মৌনতা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে থমথমে মুখে বলল,
–“কি হয়েছে, চাচি?”
মাজেদা সবজি কাঁটা রেখে উঠে আসে মৌনতা আর রূপকথার কাছে। চাপা স্বরে ফিসফিসিয়ে বলে,
–“কাল রাইতে এরোজ বাবা পুরাই মাতাল হইয়া বাড়ি আইছে দেড়টার সময়। আমি তো ডরে মইরা গেছিলাম অবস্থা দেইখা। খাড়াইতেও পারতেছিল না, হেলতেছিল এদিক-ওদিক। আমি আর জবা ধরতে গেলাম, ধরতেও দেয় না। আমি তো বুঝতেছিলাম না কি করিব, তাই লেবুর শরবত বানাইয়া নিয়াই গেছিলাম। হেই কি করছে জানো? গ্লাসটা ছুড়ে মাইরা ভাঙি ফেলছে। কত বড় মাতাল! হেই শব্দে ভাবি আর ভাইজান ঘুম থেইকা উইঠা গেছে। ভাইজান তো বেজাই রাইগা গেছিল, কিন্তু ভাবি কোনো রকমে সামলাইছে। তারপর ভাবি-ই এরোজ বাবারে ঘরে দিয়া আসছে।”
মৌনতা বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
–“কি একটা অবস্থা চাচি। এমন চলতে থাকলে ঘরের পরিবেশ নষ্ট হবে। নায়েল আর তানশানের উপর কেমন প্রভাব পড়বে ভাবুন তো!”
রূপকথা কৌতুহলী গলায় শুধায়,
–“উনি এমন কেন করে, ভাবি?”
মৌনতা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
–“জানিনা তো! আমি এই বাড়িতে এসেছি থেকেই দেখেছি সে একটু কেমন যেন, আলাদা সবার থেকে। আমার সাথে কখনো একটু তাকিয়ে দু’টো ভালো-মন্দ কথাও বলেনি আজ পর্যন্ত, জানো? দেখলেই এমনভাবে এড়িয়ে যাবে যেন আমি তার কোন শত্রু!”
–“হুদা আফনে না, ভাবিজান। আমগো সবাইরে দেখলেই অমন করে। আমারে দেখলে তো মনে হয় কেটেকুটে খেয়ে নিবে এমন ভাব করে।”
–”এতো কথা বাড়াস না জবা। তাড়াতাড়ি কাপড়গুলো এনে ধুয়ে শুকাতে দে। রোদ তো চলে গেল বলে। তখন ভেজা ভেজা গন্ধ আসবে আর ছোট ভাইজান চেঁচামেচি করবে। তখন কিন্তু তোর রক্ষা নেই।”, মৌনতার কথায় জবা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,
–“এমন কথা ক ইয়েন না, ভাবিজান। একটু বোঝার চেষ্টা করেন। মাজেদা চাচিরে একটু যাইতে কন।”
–“আমায় বয়স হইছে। উপরে উঠতে নামতে জান যায় জবা। ন্যাকামো করিস না, যা।”, মাজেদা চাচি তিরিক্ষি মেজাজে বলল। জবা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
–“হ, এহন কোমড়ে ব্যথা। কোন গোপন কথা শোনার জন্যে তরতরিয়ে উপরে উইঠা যাওয়ার সময় ব্যথা থাকে না, তাই না?”
–“মুখপুরী তোর মুখ বেশি চলে। তুই শুধু আমার সাথে মুখ নাড়াতে পারিস।”
তর্ক বিতর্ক শেষে জবাকেই যেতে হয় এরোজের ঘরে। বুকভরা সাহস নিয়ে দরজায় টোকা দিলে আওয়াজ আসলো না। জবা এবার ধাক্কা দিল। সাথে সাথেই খুলে যায় দরজাটি। জবা তড়িৎ মাথা ঢুকিয়ে উঁকি দিয়ে ঘরের মানুষটির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। পুরো ঘর শূন্য! আহ্! এর চেয়ে বোধহয় খুশির দৃশ্য আর কিছু হতেই পারে না জবার জন্য।
সকল ভয় উড়ে গেল। নিশ্চিত ষাঁড় গরু ভাইজান বাথরুমে। সে কাঠবিড়ালীর মতো লাফাতে লাফাতে ঘরে ঢুকলো নির্ভয়ে। সব আধোয়া বস্ত্র গুলো বাস্কেটে ভরে নিলো। জবার স্বভাব হলো যেখানেই যাক না কেন, সেখান থেকে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা তার মাঝে থাকে। এরোজের ক্ষেত্রে এটা আরেকটু বেশি। সে নাক দিয়ে গন্ধ শুঁকতে লাগলো। নাহ, আজ আর বাজে গন্ধ আসছে না ঘর থেকে। গতকাল যে বাহির থেকেই খেয়ে এসেছে।
কোমড়ে হাত দিয়ে সব পর্যবেক্ষণ করতে করতেই হঠাৎ করেই তার সূক্ষ্ম, তীক্ষ্ণ নজরে বিস্ময় ছুঁয়ে গেল আলতো খুলে রাখা কাবার্ডের ভেতরে তাকালে। সে তড়িঘড়ি ছুটে যায় কাবার্ডের দিকে। আলতো খুলে রাখা কাবার্ডের পাল্লা পুরোটা খুললে সে মৃদু চেঁচিয়ে উঠল কাবার্ড ভরতি নিষিদ্ধ পানীয়ের বোতল দেখে। তার এক কিনারায় রাখা একটি ডায়রি। সে ডায়রিটা খপ করে হাতে তুলে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলো। সে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে, কোনকিছু দেখলেই পড়তে পারে। কিন্তু যুক্তবর্ণ উচ্চারণ করতে গিয়ে তার একটু কষ্ট হয়।
বারান্দার গ্লাসের শাটারের ওপারে উদাম গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা এরোজ, সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে ঘরের দিকে পা বাড়ালে পা থেমে যায়। রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে জবাকে তার মদের বোতল শুঁকে শুঁকে দেখতে দেখে। সে উগ্র হাতে শাটার খুলতেই জবা হকচকিয়ে পিছু ফিরে তাকায়। তৎক্ষণাৎ তার আত্মা যাই যাই করে উঠল। নিশ্চিত গোপন জিনিস দেখে নেয়ার অপরাধে ছোড ভাইজান এখন তাকে মেরে গায়েব করে দেবে। এরোজ দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে,
–“জবার বাচ্চা! তোর সাহস কতো বড় তুই আমার জিনিসে হাত লাগাস?”
এরোজ সিগারেট ছুঁড়ে মেরে তেড়ে আসার আগেই জবা প্রাণ হাতে নিয়ে এক দৌড় লাগায়। সাথে থাকে গগনবিদারী চিৎকার।
–“ও মাইজ্জা ভাবিজান আমারে বাঁচাননননন!”
জবা হাওয়া হয়ে গেলেও এরোজের রাগ তুঙ্গস্পর্শী! সে চেঁচিয়ে উঠল ক্ষিপ্ত কণ্ঠে।
–“আম্মাআআ! আম্মাআআ!”
ছেলের এমন বিকট চিৎকারে নির্জনা বেগম হন্তদন্ত হয়ে বের হয়। তার পিছু পিছু নায়েল ও আসে নিজের রিকশা গাড়ি চালিয়ে। বিকট চিৎকারে মিইয়ে গিয়ে থামে বসার ঘরে। তার চোখেমুখে ভয় দেখাগেল! এমন চিৎকার যে ঘরের কেউ কখনো করেনি। নির্জনা বেগম চিন্তিত কণ্ঠে শুধায়,
–“কি হয়েছে এরোজ, চিৎকার করছ কেন? শরীর খারাপ লাগছে?”
এরোজ চিৎকার করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। বজ্রকণ্ঠে বলে,
–“আম্মা, জবা আমার ঘরে ঢুকেছে কোন সাহসে?”
–“আমি পাঠিয়েছি, এরোজ। তোমার আধোয়া জামা কাপড় আনতে।”
–“ও নিজের কাজ না করে আমার জিনিসপত্রে হাত দেয়, আম্মা। ওকে সাবধান করে দাও। ওর স্বভাব কিন্তু মোটেও ভালো না। আরেকবার যদি এইসব আমার চোখে পড়ে থাপড়ে ওর দাঁত ফেলে দেব।”
–“কিহ? আচ্ছা আমি ওকে দেখে নিচ্ছি তুমি রাগ করো না। আর কখনো এমন করবে না।”
এরোজ ফুঁসতে ফুঁসতে ঘরে চলে যায়। নায়েল রিকশার হ্যান্ডেল আঁকড়ে ধরে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। মাম্মা যে ঠিক বলে, ছোট পাপা সুইট না, রাগি।
জবাকে ইচ্ছেমতো ঝেড়ে দিলো নির্জনা বেগম। বিমর্ষ মুখে জবা রান্নাঘরে ঢুকলে মৌনতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
–“কোন কাজ তুই ঝামেলা ছাড়া করতে পারিস না জবা? তোকে কেউ শুধু শুধু বকে? গিয়েছিস কাপড় আনতে তার জিনিসে হাত দিতে হবে কেন তোর?”
জবা কপাল কুঁচকে থমথমে মুখে বলল,
–“আমি একটা চাঞ্চল্যকর তথ্য পাইছি, ভাবিজান। এই তথ্য উন্মোচন করতে পারলে ছোড ভাইজানের এমন মাতাল, গুন্ডা হইয়া যাওয়ার রহস্য ও উন্মোচন হইয়া যাইবে!”
–“তোকে তো অ্যাওয়ার্ড দেয় লাগে, জবা! তা তার রহস্য উন্মোচন করে তোর আমার লাভ কি বল!”
মৌনতা দাঁতে দাঁত চেপে বলল। মাজেদা তন্মধ্যে হৈ হৈ করে উঠল,
–“মাইজ্জা বউ, একটু শোনো না ও কি কয়। আমারো মনে হয় এরোজ বাবার এমন হইয়া যাওয়ার পেছনে কোনো রহস্য আছে। দেখা যাইবো কোন মাইয়ার হাত আছে। এই জবা ক তো কি তথ্য পাইছিস?”
মৌনতা ডানে বামে মাথা নেড়ে নিজ কর্মে লিপ্ত হয়। জবা সাগ্রহী কণ্ঠে বলল,
–“ছোড ভাইজানের কাবার্ড ভরতি মদের বোতল চাচি। আর একটা ডায়রিও আছে জানেন। হেতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু লেখা আছে। আমি পড়ার সময় পাইনাই তার আগেই দানব আইসা গেছে।”
মাজেদা উৎসুক কণ্ঠে বলল,
–“ডায়রিতে কারোর নাম নাম দেখছো?”
–“দেহার সময় পাইছি? আরেকদিন দেখিবো যেদিন বাড়িতে না থাকবে বুঝলে?”
–“এরোজ বাবায় দরজা তালা মাইরা বাইরে যায়। তুই কেমনে দেখবি?”
–“সে আমি যে করেই হোক, রহস্য উন্মোচন করেই ছাড়ব। তুমি আমার উপর ছাইড়া দাও।”, জবার দৃঢ় কণ্ঠ।
সেই আধোয়া কাপড় আর জবার দ্বারা আনা সম্ভব হয় না। পরে মৌনতাই যায়। নিজের রিকশা গাড়িটি নিয়ে সেই থেকে রান্নাঘরের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে থাকা নায়েল মাকে দেখতেই হাত বাড়িয়ে দিলো।
–“মাম্মা কোলে।”
মৌনতা তাকে কোলে তুলে নেয়। আদুরে গলায় শুধায়,
–“আমার মা কি একা একা বোর হচ্ছে? মা স্যরি, চলো আমরা এখন একসাথে কাজ করব।”
নায়েল সত্যিই বোর হচ্ছিল। আজ বাড়িতে ভাইজান ও নেই, ফুপিও নেই। কে তার সাথে খেলবে?
মৌনতা তাকে কোলে করেই এরোজের ঘরের দরজায় গেল। টোকা দিলে কোন সাড়াশব্দ আসে না। তাই সে চাপিয়ে রাখা দরজা খুলে উঁকি দিয়ে ডাক দেয়,
–“ছোট ভাইজান, আসব?”
এবারেও সাড়াশব্দ আসে না। সে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে দরজা ঠেলে মন্থর গতিতে পা বাড়ায়।
ওমনি তীব্র প্রকট ঝাঁঝালো গন্ধে মা মেয়ে নাকমুখ কুঁচকে ঘৃণ্য শব্দ করে উঠল।
–“ ইউউ ইয়াক!”
মায়ের মতো নায়েল ও ওয়াক ওয়াক করে উঠল। সদ্য বাথরুম থেকে বের হওয়া এরোজের কপাল টানটান হয়ে গেল সেই দৃশ্যে। হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা পাশের ডেস্কে চেপে ধরে গমগমে স্বরে শুধায়,
–“কি হচ্ছে এখানে?”
মৌনতা নাকে কাপড় চাপতে গিয়েও চাপতে পারে না। এরোজকে দেখে তড়িৎ কাপড় সরিয়ে ফেললো মুখের ওপর থেকে।
মৌনতা হড়বড়িয়ে কৈফিয়তের সুরে বলে,
–“ভাইজান, আধোয়া কাপড়গুলো নিতে এসেছি।”
এরোজ আর কোনরূপ বাক্য বিনিময় না করে ঘরের কোনে রাখা লন্ড্রি বাস্কেটটা হাতে তুলে নিয়ে দরজার বাইরে রেখে আসল। অতঃপর দরজার পাশে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে রইল। ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকা মৌনতা বুঝলো তাদের বেরিয়ে যাওয়ার মৌন নির্দেশ ছিল এটি। কি রূঢ় আচরণ! সে কপাল কুঁচকে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। বিগত দু’দিন তানশান ভাইজানের থেকে চকলেট নিলেও আজ আর ভাইজনের কাছে চকলেট ছিল না। তাই নায়েল তড়িঘড়ি করে মাকে চেপে ধরে বলে,
–“মাম্মা, দালাও দালাও!”
পরপরই এরোজকে উচ্চস্বরে ডেকে ওঠে,
–“এই লাগি ছোট পাপা!”
দরজা লাগাতে যাওয়া এরোজের গতিরোধ হয় সেই বিকৃত সম্বোধনে। দু’হাতে দরজার কপাট আঁকড়ে ধরে শুধায়,
–“কি চাই?”
–“আমায় একটা চকলেট দেবে?”, মিনমিনে স্বরে বলা সেই আবদারে এরোজ শান্ত দৃষ্টি ফেললো।
মৌনতা মেয়ের সাহস দেখে যারপরনাই অবাক! সে আড়চোখে অবলোকন করে লালচে চোখ, মুখের উগ্র লোকটিকে। মা মেয়ে ভেবেই নিয়েছিল যে তারা এখন চরম উগ্র আচরণের স্বীকার হবে। কিন্তু তাদের ধারণায় কিঞ্চিৎ বিঘ্ন ঘটিয়ে এরোজ ঘরে চলে যায়। মৌনতা উঁকিঝুঁকি দিয়ে তা দেখতেই চোখ চকচক করে উঠল। তড়িঘড়ি করে নায়েলকে ফিসফিসিয়ে বলল,
–“একা একা খাবে, মা? মায়ের জন্য ও একটা চাও।”
এরোজ মিনিটের মাঝে ফিরে আসে একটা চকলেট হাতে। নায়েল মায়ের কোল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে চকলেটটা নিয়ে গাল ভরে হাসল। চটপটে কণ্ঠে বলল,
–“মাম্মাকেও একটা দাও।”
এরোজের অতি শান্ত গম্ভীর দৃষ্টি মৌনতার উপর পড়তেই সে তৎক্ষণাৎ সৌজন্য হেসে বলল,
–“না না ভাইজান আমার লাগবে না। ও বোঝেনি। আমি কি ছোট নায়েল?”
–“কিন্তু তুমি তো একটু আগেই চকলেট চেয়েছ?”
নায়েলের অবুঝ কণ্ঠে মৌনতার এবার কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে হলো। সে কৃত্রিম হেসে বলল,
–“মা তো দুষ্টুমি করেছি, নায়েল। ভাইজান আসি, আপনি দরজা লাগান।”
মৌনতা দ্রুত মেয়েকে নিয়ে পা বাড়ালে গম্ভীর কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হয়।
–“দাঁড়ান!”
মৌনতা ফিরে তাকায়। এরোজ ঘর থেকে আরেকটি চকলেট এনে বাড়িয়ে দিল। নায়েল গাল ভরে হেসে সেটি খপ করে নিয়ে নিলো। সাথে সাথেই এরোজ শব্দ করে দরজাটি বন্ধ করে দিল। মৌনতা আর নায়েল বেজায় খুশি হয়ে গেল চকলেট পেয়ে। তার খুশিতে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। চকলেটের ভেতরে থাকা স্ট্রবেরি আর মার্শমেলোর ফিলিং তাদের খুব পছন্দের। মৌনতা মেয়েকে নিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে উপর থেকে চেঁচিয়ে বলল,
–“জবা কাপড়চোপড় ঐ দরজার সামনে, নিয়ে তাড়াতাড়ি ধুয়ে দে।”
–“আইতেছি ভাবিজান।”, জবাও চেঁচিয়ে জবাব দেয়।
মৌনতা নিজের ঘরে ঢুকে অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে আলো জ্বালায়। ইমরোজের ঘুমে বিঘ্ন ঘটতেই সে বিরক্তিকর শব্দ করে উঠল। জড়ানো কণ্ঠে উত্তপ্ত মেজাজে বলল,
–“লাইট নিভাও, মৌনতা।”
মৌনতা গায়ে মাখে না সেই বিরক্তি। জানালা খুলতে খুলতে বলে,
–“দুপুর হয়ে গিয়েছে ইমরোজ। উঠে পড়ুন, গোসল করে নাস্তা খেতে আসুন। এতক্ষণ খালি পেটে থাকলে শরীর খারাপ করবে।”
নায়েল মায়ের কোল থেকে নেমে লাফাতে লাফাতে বিছানায় উঠে বাবার পাশ ঘেঁষে শুয়ে পড়ে। চকলেট খেতে খেতে বাবার বদ্ধ নেত্রের চামড়া টেনে ধরে বলল,
–“পাপা ওঠো, ওঠো।”
–“নায়েল বিরক্ত করো না।” , ইমরোজ জড়ানো কন্ঠে বলল। কিন্তু নায়েল তা শোনার মেয়ে নয়। সে ক্রমাগত বাবাকে বিরক্ত করেই যায়। সারারত নির্ঘুম কাটানো ইমরোজ একটা সময় ঘুম পূরণ না হওয়ায় বিক্ষিপ্ত মেজাজে ধমকে উঠল।
–“চুপ! একদম চুপ! কেউ ঘুমালে বিরক্ত করতে হয় না জানো না তুমি?”
দীর্ঘদিনের জমানো কথার ফুলঝুরি খুলে বসা নায়েলের হাসি মিলিয়ে গেল বাবার বিকট ধমকে। তার ছোট্ট দেহ কেঁপে উঠল ভয়ে। চমকালো নিজ কর্মে মগ্ন মৌনতাও। সে ছুটে এসে ভয়ে কেঁপে ওঠা মেয়েকে কোলে তুলে নিলো। সহসা নায়েল ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মৌনতা বিস্মিত হয়। সে অবাকপানে তাকিয়ে মৃদু ক্ষোভের সাথে বলে,
–“এটা কোন ধরনের আচরণ ইমরোজ? এইটুকুন মেয়ের সাথে কেউ এত জোরে চিৎকার দেয়? ও ভয়ে কাঁপছে।”
সন্তানের থেকে ঘুম, প্রশান্তিকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়া ইমরোজের যখন কিছুই মনঃপুত হলো না। সে রাগে গজগজ করে বিছানা ছেড়ে ওঠে। এবার মা মেয়ে উভয়ের উপর চেঁচিয়ে উঠে বলে,
–“আমার মেয়েটাকে দিনে দিনে বেয়াদব তো তুমিই বানাচ্ছ, মৌনতা। কেউ ঘুমালে যে তাকে বিরক্ত করতে হয় না এটা তুমিই তো জানো না, ওকে কি শেখাবে? গতকাল সারাত ঘুমাইনি এটা তুমি জানো না? তবে কেন বেয়াদবের মতো এই সময়ে এসে ঘুমে বিঘ্ন ঘটালে?”
ইমরোজ ধমকে উঠল। মৌনতা ফ্যালফ্যাল করে অত্যধিক রুষ্ট আচরণে। কিন্তু ঝগড়ার প্রেক্ষিতে সর্বদা চুপ থাকার অভ্যাস দৃঢ় হওয়ায় পাল্টা প্রত্যুত্তর করে না। নীরবে গলাধঃকরণ করে সামান্য ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানোর ফলে স্বামীর দুর্ব্যবহার। প্রতিবার কথার পিঠে কথা না বলার অভ্যাসে মৌনতার কাছে ইমরোজের মেজাজ হেরে যায়। মৌনতাকে নিরুত্তর দেখে ইমরোজ তোয়ালে হাতে গটগট করে বাথরুমে চলে যায়। যেতে যেতে বলে যায়,
–“নিজের আচরণ ঠিক করো। আর মেয়েকেও একটু আদব কায়দা শেখাও, মৌনতা।”
মৌনতা টলটলে নেত্রে আরশিতে তাকায় নিজের অবয়বের পানে। আরশিতে দৃশ্যমান এই মেয়েটির সাথে কোন মিল নেই, বিয়ের আগের মেয়েটির সাথে। বিয়ের আগের মৌনতা ছিল দুরন্ত, চঞ্চল, মুখের উপর ফটাফট উচিত জবাব দেয়া একজন প্রাণবন্ত মেয়ে। অথচ বিয়ের পরে সেই মেয়েটি বদলে গেল অচিরেই। সে কথা শুনতে শিখেছে, নীরবে গলাধঃকরণ করতে শিখেছে তবে পাল্টা প্রত্যুত্তর দেয়া ভুলে গিয়েছে। নিজের চাহিদা, ইচ্ছা অনিচ্ছা গুলোকে গলা টিপে মেরে ফেলেছে। বৈবাহিক জীবনে একটু শান্তির খোঁজে গোটা নিজেকেই বদলে ফেলা মেয়েটি আজো কথা শোনে আচরণ বদলানোর জন্য।
গোসল শেষে ইমরোজ ঘর থেকে বের হলে দেখতে পেল নায়েল একা একা খেলছে কড়িডরে। কিয়ৎকাল আগের ঘটনা স্মরণ করে সে এগিয়ে যায় মেয়ের কাছে।
–“নায়েল, পাপার কাছে এসো তো।”
বাবার কণ্ঠে নায়েলের মুখের স্বাভাবিক রঙ মিলিয়ে গেল। চোখমুখে ফুটে উঠল কিয়ৎকাল আগের সেই ভয়ের আভাস। সে আসল না বরং এক পা পিছিয়ে যায়। ইমরোজ পাত্তা দেয় না সেই ভয়কে। বলে,
–“পাপার কোলে আসবে না?”
নায়েল ফুলদানির সাথে এঁটে গিয়ে নত শির মিনমিনে স্বরে বলল,
–“তুমি বকা দিয়েছ, আমি ভয় পেয়েছি।”
ইমরোজ হাঁটু গেড়ে বসে মেয়েকে কোলে তুলে নেয় জোরপূর্বক। গালে চুমু দিয়ে বলে,
–“তুমি দুষ্টুমি করেছ তাই পাপা বকা দিয়েছি। পাপা স্যরি মা, পাপা সারারাত ঘুমাতে পারিনি। তার উপর তুমি কাঁচা ঘুম ভেঙে দিয়েছ, তাই পাপা রেগে গিয়েছিলাম একটু।”
ছোট্ট একটু কৈফিয়ত নিমিষেই উধাও হয়ে গেল নায়েলের সব ভয়। সে আহ্লাদে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
–“ইট’স ওকে! তুমি কি তবে এখন আমায় নিয়ে শপিং এ যাবে? কিছু ডল কিনে দেবে? মাম্মা বলেছিল তুমি আমায় গিফট কিনে দেবে।”
–“আমি কিনে আনব তোমার জন্য ডল, ঠিক আছে?”, ইমরোজ মেয়েকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে বলল।
–“কিন্তু আমি তোমাল সাথে যেতে চাই।”, নায়েলের কণ্ঠ উপেক্ষিত হয় অপরপাশের সিঁড়ি থেকে ছোট ভাইকে নামতে দেখে। ইমরোজ এরোজের পথরোধ করে দাঁড়ায়। আপাদমস্তক দেখে বলে,
–“হঠাৎ দেশে আসলি, কাউকে জানাবি না? কেমন আছিস?”
এরোজ নিজের গতি থামাতে নারাজ। সে চলতে
চলতেই ভারী অনমনীয়, রুক্ষ কণ্ঠে জবাব দেয়,
–“বেঁচে আছি।”
ইমরোজের রেগে গেল এমন জবাবে। সে পেছন থেকে রাগান্বিত স্বরে বলল,
–“আচার আচরণ তো আগের মতোই আছে দেখছি। এত বছর পরে এসে বড় ভাইয়ের সাথে একটু সুন্দর করে কথা বলতে এত কিসের সমস্যা তোর?”
ছেলেদের তর্কে নির্জনা বেগম নম্র দৃষ্টি ফেললেন। ইমরোজকে শান্ত করে বললেন,
–“ওর শরীর ভালো না ইমরোজ, কথা বাড়িও না। তোমরা বড় হয়েছ কেন? যেন ছোটদের বুঝিয়ে শুনিয়ে সঠিক পথে আনতে পারো, তাই না? সেখানে যদি এমন রাগ দেখাও তবে কিভাবে হবে?”
–“তোমার ছেলে কারোর কথা শোনে, আম্মা? এত বছর পর এসেছে জিজ্ঞাসা করেছি, কেমন আছিস? সে বলে, বেঁচে আছে। এটা কোন ধরণের জবাব হলো?”
এরোজ প্রতিক্রিয়াহীন থমথমে মুখে টেবিলে বসলে নির্জনা বেগম এগিয়ে যায়। নিজেই ছেলেদের জন্য খাবার বাড়তে লাগলেন। ইমরোজ ও নায়েলকে নিয়ে বসে। তবে এতটুকু সময়ে ভাইয়ে ভাইয়ে কোন কথা হয় না।
–”ওকে তো টিচাররা আগেই প্রশ্ন বলে দেয়। ওর বাবা এই প্রতিষ্ঠানের কমিটি না? আমরা সব জানি। নয়তো প্রতিবছর কেউ ফার্স্ট হতে পারে? পারে না।”
নিজের ক্লাস ফিলোদের এমন মন্তব্যে বেঞ্চিতে বসা তানশানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল রাগে। নাকের ডগা লাল হয়ে উঠেছে, কানদুটোও লাল হয়ে উঠেছে অচিরেই। তার বেঞ্চের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তার চার পাঁচজন এমন মন্তব্য করছে। সাথে নিন্দা আর উপহাস তো আছেই। তবুও তানশান অনঢ়, নিরুত্তর বসে থাকে। ক্লাসের ঠিক লাস্ট বেঞ্চিতে ঝিমুনি দিয়ে বসা মেয়েটির কর্নদ্বয় হতচকিত হলো এমন মন্তব্যে। সে তড়াক চোখমেলে তাকায় একদম সামনের বেঞ্চের চুপ করে বসে থাকা ছেলেটির দিকে। পরপরই ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্লাস ফিলোদের দিকে। হড়বড়িয়ে বেঞ্চ ছেড়ে ওঠে সে। একপ্রকার তেড়ে যায় নিজের ক্লাস ফিলোদের কাছে। ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,
–”কি বললি? হ্যাঁ? এতো পড়াশুনার পরে কি-না শেষপর্যন্ত এই কথা শুনতে হলো? অবশ্য তোরা তো টুকলি করে কোনমতে পাশ করা ছাত্র। তোরা কি করে জানবি পড়াশুনা করে ফার্স্ট হওয়ার অভিজ্ঞতা। তোদের তো এই যোগ্যতা আর অভিজ্ঞতা একটাও নেই।”
ছেলেগুলো দাঁত কিড়মিড় করে তাকায় চপল তেজি মেয়েটির দিকে। মেয়েটি তাদের ক্লাস ফিলো। তারাও পাল্টা প্রত্যুত্তর করে বলল,
–”আমরা তো তাও কোনমতে পাশ করি তুই কি করিস? তুই তো পাশ করতেও পারিস না। প্রত্যেকবার ফেইল করিস।”
–”এই! আমি পাশ করি না ফেইল করি তাতে তোর কি, হ্যাঁ? তুই কি আমায় খাওয়াস নাকি পড়াস? এখানে কথা হচ্ছে টমাটুকে নিয়ে। আমার আর ওর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকি। সেটাই ভালো হবে তোদের জন্য। আমাকে মাঝে টানলে তুই আজ আর বাড়ি যেতে পারবি না।”
সুনেহরা উচ্চস্বরে খেকিয়ে উঠল। সহসা চুপ করে গেলো ছেলেগুলো। এই মেয়েটি আস্ত এক গুন্ডি। আর তার এই গুন্ডিগিরি আরো জোরদার হয় ওর পালোয়ান ভাইয়ের কারনে। ওর পালোয়ান বড়ো ভাই এই প্রতিষ্ঠানের ই একজন ছাত্র। অনার্সে পড়ে। স্বনামধন্য পরিবারের সন্তান, যেমন তার স্বাস্থ্য তেমন তার মারের ধরন। এর জন্যই মূলত মেয়েটির এতো দাপট। সুনেহরা পুনরায় শুরু করল,
–”কি বলছিলি যেন, টিচাররা ওকে প্রশ্ন আগে থেকেই বলে দেয়, তাই না? যদি দিয়েও থাকে তাতে তোর চুলকানি কোথায়? তুই ও প্রশ্ন নিয়ে ফার্স্ট হয়ে দেখা।”
পরপরই চেঁচিয়ে বলল,
–“এই তুই জানিস ও কি পরিমাণে পড়াশুনা করে? ওর এই পড়াশুনার কারণে আমি আজ এই সায়েন্স নামক ফাঁ”সির দড়ি গলায় নিয়ে ঝুলছি। ওর এই পড়াশুনার কারণে আমি আজও সিঙ্গেল! একটাবার আমার দিকে চোখ তুলে তাকায় না এই বই নামক সতিনের কারণে। সেখানে কি-না তোরা এমন অপবাদ দিতে আসিস? জ্বলে তোদের? আয়, আমি কমিয়ে দেই তোদের জ্বলন?”
সুনেহরার চিবিয়ে চিবিয়ে বলা কথায় ছেলেগুলো কেটে পড়ার প্রয়াসে মগ্ন। তবুও যেতে যেতে হার না মেনে বলল,
–”তোকে কি ও নিজের বডিগার্ড হিসেবে রেখেছে? ও কেমন ছেলে? আদৌ ছেলে নাকি অন্যকিছু,ভীতু!”
–”ওরে, তোদের সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি। তোদের আজ সুস্থ্যসবল, বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে নেই তাই না? আমি ভাইজানকে তোদের নাম বলব?”
–”এই সুনেহরা, আমাদের তোর সাথে কোনো ঝামেলা নেই। তাহলে তুই কেন বারবার আমাদের মাঝে আসিস?”, একটা ছেলে মিইয়ে যাওয়া কন্ঠে বলল।
সুনেহরা কোমড়ে হাত দিয়ে একহাতে তানশানকে দেখিয়ে বলল,
–”ওর ঝামেলা মানেই আমার ঝামেলা— এই কথাটা মাথায় রাখবি। ও কাউকে কিছু বলেনা দেখে তোরা যা ইচ্ছা তাই করবি? এরপর থেকে ওর ধারেকাছেও যেন আমি আর তোদের না দেখি। তাহলে পরেরবার তোদের পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেব।”
ছেলেগুলো সুনেহরার দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চলে যায় সেখান থেকে। সুনেহরা রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকায় তানশানের দিকে। তানশান তখনো নীরবে একগ্রচিত্তে বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সে রাগান্বিত কন্ঠে বললো,
–”এই টমাটু! তুই কোন মাটির তৈরি মানুষ, হ্যাঁ? এঁটেল মাটি না-কি চিনা মাটি? ছেলেগুলো তোকে এভাবে বাজে কথা বলল আর তুই একটা টু শব্দ পর্যন্ত করলি না? তুই কেনো ওদের মিথ্যা কথা মাথাপেতে মেনে নিবি? জোরগলায় কিছু বলতে পারলি না? মানে, ভদ্রসোভ্য হওয়ার একটা লিমিট থাকা দরকার? এত ভদ্র হলে সকলে এবনরমাল বলবে তোকে। অন্তত আমি তো বলব।”
তানশান বই থেকে চোখ তুলে তাকায় সুনেহরার দিকে। তা দেখে সুনেহরা ফোঁস করে লম্বা নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলল,
–”যাক বাবা তুই একটু তাকিয়েছিস তাতেই আমি ধন্য! আমায় দেখাচ্ছে কেমন? এতোদিন আমায় মিস করেছিস নিশ্চয়ই? আমি কিন্তু খুব মিস করেছি। কোথাও বেড়াতে যাই নি। শুধু অপেক্ষা করেছি কখন স্কুল খুলবে আর তোর টমেটোর মতো মুখটি দেখব। আজ দেখে শান্তি লাগছে।”
তানশান শব্দ করে বইটা বন্ধ করল। সুনেহরার চোখে চোখ রেখে বলল,
–”এরপর থেকে তোমাকে যেন আমি আমার আশেপাশে তো দূর, আমার কোন ঝামেলার মাঝেও যেন না দেখি। যদি দেখি তবে আমি টিচারের কাছে তোমার নামে বিচার দিতে বাধ্য হবো।”
বলেই তানশান ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে। সুনেহরা কোমড়ে হাত দিয়ে অবাক কণ্ঠে বলল,
–”যাহ্, বাবা আমার গরু আমাকেই বলে চোর! কার জন্য কি করলাম? যার উপর রাগ দেখানোর তা না দেখিয়ে, আমার উপর রাগ দেখায়। ভেবেছিলাম একটু সুন্দর করে কথা বলবে। অসহ্য! আমার কপালটাই পোড়া। ভালো লাগে না কিছু!”
সুনেহরার ত্যক্ত কণ্ঠ। তার অবুঝ মন ক্লাসের এই টপ বয়ের জন্য বেহায়াপনা করে। তার কোন কথা শোনে না। মনের ওপর কারোর জোর চলেনা, সেও করে না। তাই মনের সাথে সাথে সেও বেহায়াপনা করে। যেই বেহায়াপনা করতে করতে সে আজ সায়েন্স নামক জেলখানায় আটকা পড়েছে। হে আল্লাহ! তার কি হবে? পড়াশুনা আর সে দুঃসম্পর্কের আত্মীয় যে! আকাশপাতাল চিন্তা নিয়ে সুনেহরা মাথা চুলকাতে লাগল। তার বেহায়াপনা খুব ভারী পড়ছে তার উপর।
তানশান যেই প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করে সেটা স্কুল অ্যান্ড কলেজে। তপোবন ঠিক করল রূপকথাকেও এখানেই ভর্তি করাবে। আগামী সপ্তাহের মাঝেই রূপকথার বোর্ড চেইঞ্জ করা হয়ে যাবে। তার কথা বলা শেষ, এখন শুধু কার্যক্রম শেষ হলেই হলো।
আজ ও খুব একটা ক্লাস হলো না তানশানের। সে ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে আসে বাবার গাড়ির কাছে। ক্ষিপ্র হাতেই গাড়ির দরজাটা খুলে সিটে বসে। গাড়ির দরজা স্বশব্দে লাগাতেই তপোবন ফোন থেকে চোখ তুললো। ছেলের হম্বিতম্বি আর লালচে বরন ধারণ করা নাক কান স্পষ্ট ইঙ্গিত করছে ছেলে রেগে আছে। সে ফোন রেখে দিয়ে, সাথে করা আনা জুসের বোতলটি এগিয়ে দেয় তানশানের দিকে। বাবার দিকে না তাকিয়েই তানশান জুসের বোতলটি নেয়। স্ট্রটি মুখে ঢুকিয়ে বাহিরের দিকে তাকিয়ে বসে রইল। তপোবন সেদিকে এক পলক তাকিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে শুধায়,
–”কিছু হয়েছে? রেগে আছো কেন?”
তানশান দৃষ্টি অনঢ় রেখেই থমথমে গলায় জবাব দেয়,
–”কিছু না”
–”পাপার কাছে লুকাচ্ছো? আমি অন্যভাবে হয়তো জানতে পারব কিন্তু সেটা খুব একটা শ্রুতিমধুর হবে না আমার জন্য।”, বাবার গম্ভীর গলায় তানশান স্থবিরতা ভেঙে নড়েচড়ে বসল। থমথমে গলায় রাগ ঝেড়ে বলল,
–”ক্লাসের কয়েকজন ছেলে বলে, আমি না-কি আগে থেকে প্রশ্ন পাই আর তাই প্রত্যেকবার ফার্স্ট হই। আমার বাবা স্কুলের কমিটি দেখে টিচাররা আমায় প্রশ্ন দিয়ে দেয়।”
–”তাতে রাগ করার কি আছে?”, বাবার নির্লিপ্ত, শান্ত কণ্ঠে তানশান অবাক হয়ে গেল। অবাক কণ্ঠে শুধায়,
–”রাগ করার কিছু নেই?”
–”নাহ।”
–”কেন? কেন রাগ করব না?”
–”কেন রাগ করবে, এটা বলো।”
–”তারা আমার নামে মিথ্যা কথা বলছে, আর আমি রাগ করব না?”
–”নাহ, করবে না।”, তপোবন ছেলের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল। তানশান জেদি গলায় বললো,
–”কেন করব না?”
–”তুমি বলো, তুমি কি এমন কিছু করেছ? পাপা কি এমনকিছু করেছি?”
–”না, কখনোই না।” ,তানশানের দৃঢ় কণ্ঠে তপোবন হাসল। গাড়ি ইউটার্ন নিতে নিতে বলল,
–”সেটাই। তুমি যখন জানো তুমি এমন কিছু করোনি। আমি জানি আমি এমন কিছু করিনি। সৃষ্টিকর্তা জানে তুমি কখনো এমনকিছু করোনি। তোমার টিচাররা ও এমনকিছু করেনি। তারা জানে তুমি কতটুকু মেধাবী। আর কি প্রয়োজন? কে কি ভাবলো তাতে কি যায় আসে? যাদের জানার প্রয়োজন তারা জানলেই হবে। এমন অবস্থায় তোমার রাগ হওয়াটা কি বোকামি নয়?”
বাবার কথায় তপোবন নিরুত্তর রইল। তবে তখন আর তার মাঝে রাগের দেখাগেল না। তপোবন মৃদু হেসে শুধায়,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৩
–”তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছ?”
–”না।”, তানশান মাথা নেড়ে বলল। তপোবন মাথা নেড়ে বলল,
–”গুড। শাস্তি দেয়ার মালিক আল্লাহ তায়ালা। যারা খারাপ কাজ করে তারা ফল ও পায়। তাই সব রাগ, কষ্ট তার উপর ছেড়ে দাও। সে সামলে নেবে।”
তানশান মাথা নেড়ে সায় জানায়। স্ট্রটি মুখে ঢুকিয়ে পুনরায় মগ্ন হয়ে নিত্যপরিচিত জায়গা গুলো দেখতে।
