অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৭
তোনিমা খান
– ছয় মাস তোমায় না জানিয়ে কানাডায় থাকা এরপর আবার বিয়ের ডেট এত দেরিতে দেয়া হয়েছে, এক সপ্তাহ পর। তোমার কী মনে হয় না, এটা অন্যায় হচ্ছে তোমার সাথে?
এরোজ গুরুগম্ভীর মুখে বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলল। তার কণ্ঠের সুর ঠিক পাশের বাসার কূটনী আন্টিদের মতো। সম্মুখ চেয়ারে বসা তৃশান গভীর ভাবনায় ডুবে গেল। থমথমে মুখে বলল,
– তা তো হচ্ছে ভাইজান।
সহসা এরোজ বিশ্বজয়ের হাসি হাসল। প্ররোচনায় চার চাঁদ লাগিয়ে দিয়ে বলল,
– এইতো, আমিও এটাই ভাবছিলাম জানো। তোমার সাথে ভয়াবহ অন্যায় করছে রোজ আর আমার পরিবার।
ঠিক পাশের বাড়ির আন্টিদের মতোই খুব সহজেই তৃশান এরোজের প্ররোচনায় এসে গেল। সে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
– জি ভাইজান। কিন্তু কী আর করার! এত বড় একটা ব্যাপার আমি চাইলেই গুরুজনদের মতের উপর আঙুল তুলতে পারি না।
এরোজ বিরোধ করল,
– গুরুজনরা যখন ছোটদের বুঝতে পারে না বা বুঝতে চায় না তখন তাদের নিজ দায়িত্বে বোঝাতে হয়। এটা কোনো অপরাধ নয়, তৃশান।
তৃশান খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি চুলকালো। তারা বর্তমানে নিউমার্কেটের পেছনে টং এর দোকানে বসে আছে। সে চুলকাতে চুলকাতে আঁড়চোখে চেয়ে বলল,
– আপনি কী বলতে চাইছেন ঠিক বুঝতে পারছি না, ভাইজান।
– এটাই যে, তুমি গিয়ে আজ তোমার বাবা মাকে বলবে বিয়ের ডেট আগাতে। তোমাদের বিয়ে এক সপ্তাহ পরে না বরং দু’দিন পরে হবে।
তৃশান চমকালো। বিচলিত কণ্ঠে বলল,
– দু’দিন পর? এটা কীভাবে সম্ভব! আয়োজনের একটা ব্যাপার আছে না?
– আয়োজন তো আমাদের। তোমাদের তো তেমন কিছু না। ওটা আমরা ম্যানেজ করে নেব।
– কিন্তু তপোবন ভাইজান বলছিল, আপনাদের একমাত্র বোনের বিয়েতে আপনারা কোনো কমতি রাখতে চান না। আয়োজন করতে সময় লাগবে।
এরোজ মাছি তাড়ানোর মতো করে নির্বিকার চিত্তে বলল,
– আরে এসব আয়োজনের প্যারা আমার উপর ছেড়ে দাও। আমরা কোনো কমতি হতে দেব না আমাদের বোনের বিয়েতে। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টদের এক বান্ডিলের জায়গায় দুই বান্ডিল দিলেই মামলা ডিসমিস।
তৃশান শঙ্কিত!
– কিন্তু তারপরেও ভাইজান। এত দ্রুত সব…
– তোমার আমার উপর বিশ্বাস আছে?
– তা আছে।
– তবে নির্বিঘ্নে বাসায় গিয়ে কথা বলো।
– আর ইউ শিওর?
– হান্ড্রেড পার্সেন্ট!
তৃশানের মুখে হাসি ফুটে উঠল। অন্তঃস্থলে অজস্র প্রজাপতির আনাগোনা বাড়তেই সে লাজুক হেসে বলল,
– আচ্ছা ঠিক আছে।
এরোজ তার লজ্জা পাওয়া দেখে হেসে উঠল। পিঠ চাপড়ে বলল,
– আরে আমার বোন জামাই বিয়ের কথা শুনেই দেখি লজ্জা পাচ্ছে।
তৃশান হেসে মাথা চুলকালো। এরোজ তাকে সব বুঝিয়ে শুনিয়ে নিজের কাজে লেগে পড়ল। রাত দশটা নাগাদ বাড়ি ফিরতেই দেখল মানুষে গিজগিজ করা বাড়িটি একদম শুনশান হয়ে আছে।
লিভিং রুমে বয়স্কদের আনাগোনা। নিলীমাও আছেন তাদের মাঝে। জীবনের ভয়ঙ্কর সব পরীক্ষায় সাজে বাজেভাবে বিধ্বস্ত এক নারী হলেও প্রতিবার তিনি নিজের মনের জোরে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। এবারেও ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছেন। তবে এবার তার খুঁটি হিসেবে আছে তিন তিনটা প্রাণ। নিঝাম অনেকবার নিহামকে নিতে চাইলেও নিহাম যেতে চাইনি। শেষবার তিনিই যেতে দেননি। আগলে রেখেছেন ছেলেটিকে। এখন তিনি জুড়েই নিহামের সবকিছু। আর ওনার বুক জুড়ে রূপকথা, শুকতারা আর নিহাম।
তপোবন তখনো ফোনে কারোর সাথে সংযত ভাষায় বাকবিতন্ডা করে যাচ্ছে। পাশেই থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে আছেন তকদির সিকদার। এরোজ সোজা গিয়ে মৌনতার সামনে দাঁড়ালো। বুকে গাল চেপে শুয়ে থাকা তাশফিনের থেকে মায়া ভরা দৃষ্টি সরিয়ে মৌনতা চোখ তুলে তাকালো ঘর্মাক্ত শরীরের দিকে। এখানকার আবহাওয়ার সাথে খাপ খাওয়াতে বেগ পেতে হয় এরোজকে। এসেছে থেকে জ্বর, ঠান্ডা লেগে আছে। সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই এরোজ তার কোল থেকে তাশফিনকে নিয়ে নিলো। বাচ্চাটির গালে ফটাফট দু’টো চুমু খেয়ে বিচলিত কণ্ঠে বলল,
– আপনি এখানে গরমের মধ্যে হিজাব পরে বসে আছেন কেন? রুমে গিয়ে এসিতে বসুন। শরীর খারাপ করবে নয়তো।
মৌনতা আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল,
– সমস্যা হচ্ছে না।
– না না, গরমে বেশিক্ষণ থাকলে আপনার শরীর খারাপ করবে। ঘরে চলুন।
কীসব ভ্রান্ত যুক্তি! মৌনতা বিতৃষ্ণা ভরা চাহনি ফেলে বলল,
– এখানে সবার সাথে বসে গল্প করতে ভালো লাগছে। আর এখানে একটু সমস্যা ও হচ্ছে। রোজের শশুড়বাড়ি থেকে বিয়ের ডেট আগানোর জন্য জোর করছে।
এরোজ ভ্রুক্ষেপহীন বলল,
– সেটা আমরা দেখে নেব। আপনার এখানে থেকে শরীরের উপর অত্যাচার করার কোনো প্রয়োজন নেই।
রূপকথা স্মিত হাসল অযত্নে গুমড়ে মরা নারীটিকে যত্নে সুশোভিত হয়ে উঠতে দেখে। জীবন যদি দিনশেষে এতটা সুখ বয়ে আনে তবে সকল দুঃখভরা পথ পাড়ি দেয়াই যায়।
মাসুমা বেগমের বুকভরা দীর্ঘশ্বাস আজ সুখময় অশ্রুতে পরিণত হলো মেয়ের সুখ দেখে। অবশেষে সকলের যত্ন নেয়া মেয়েটির ও কেউ যত্ন নিচ্ছে।
তবে নির্জনা বেগমের খালার এই দৃশ্য ভালো লাগল না মোটেই। বৃদ্ধা মহিলা চোয়াল শক্ত করে বললেন,
– এরোজ, ঘরভর্তি গুরুজন বসা। আর তুমি সকলের সামনে জোরজবরদস্তি করে বউকে ঘরে নিতে চাইছ? নূন্যতম লজ্জা শরম কী আজকালকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে পাওয়া যায় না?
নানুজানের তীক্ষ্ম তেজি কণ্ঠে এরোজ ভ্রু কুঁচকে ফিরে তাকালো। অবুঝ কণ্ঠে বলল,
– কী বললে? লজ্জা? কেন লজ্জা পাব আমি?
নির্জনা বেগমের খালার রাগ আরো তরতর করে বেড়ে গেল এরোজের এহেন প্রশ্নে। তিনি রেগে বললেন,
– আবার আমায় জিজ্ঞেস করছ কেন লজ্জা পাবে?
এরোজ পূর্ণ দৃষ্টিতে ফিরে তাকালো ওনার পানে। নির্জনা বেগম শুকনো ঢোক গিললেন ছেলের লাল হয়ে ওঠা মুখ দেখে। এখানে যে এখন কোনো হট্টগোল বাঁধবে তা নিশ্চিত। সে কিছু বলবে তার আগেই এরোজ থমথমে মুখে বলল,
– আমার তো লজ্জা পাওয়ার কথা না, নানুজান। আমি তো রোম্যান্স করার জন্য বউকে ঘরে নিয়ে যাচ্ছি না। আমার স্ত্রী সদ্য মরণব্যধী রোগ থেকে রেমিশন পেয়েছে। পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত নয়। তাকে স্পেশালে ট্রিটমেন্টে রাখতে হয় আমার। আর সেখানে তুমি বলছ আমার লজ্জা পাওয়া উচিৎ? লজ্জা তো তোমার পাওয়া উচিৎ। একজন মুরুব্বি হয়ে ছোটদের ভালোমন্দ বোঝো না।
নির্জনা বেগম সতর্ক কণ্ঠে বললেন,
– এরোজ? নানুজান ভুল করেছেন। থামো, ঘরভর্তি অতিথি। ঝামেলা করো না।
এরোজ কোনোক্রমেই নিজের সুখ নিয়ে কোনো কটুক্তি সহ্য করতে পারে না। সে গর্জে উঠল মায়ের উপর,
– খবরদার আম্মা, আমায় থামাবে না। তিনি মুরুব্বি হয়ে ঘরভর্তি মানুষের সামনে আমায় নিয়ে কটুক্তি করলেন ঝামেলা হয় না, আর আমি কিছু বললেই ঝামেলা হয়ে যায়, তাই না?
বৃদ্ধা মহিলা পুরোনো চিন্তাধারার এক তেজি মহিলা। তিনিও দমলেন না। তিনিও পাল্টা রাগান্বিত স্বরে বললেন,
– মানলাম তুমি তোমার অসুস্থ স্ত্রী নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু তোমার স্ত্রীর অতীত তো ভুলে যাওনি। নিজের বড় ভাইয়ের স্ত্রীকে বিয়ে করেছ। আবার ঘরভর্তি মানুষের সামনে এত প্রেম না দেখালে তোমার হচ্ছিল না? তুমি চরম বেয়াদব এক ছেলে।
এরোজ শকুনি দৃষ্টিতে তাকালো নানুর দিকে। মৌনতা বিচলিত ভঙ্গিতে তার হাত চেপে ধরল। কিন্তু এরোজ দমবার পাত্র নয়। সে হিসহিসিয়ে বলল,
– না হচ্ছিল না। ঘরভর্তি মানুষ কেন? পুরো পৃথিবীর সামনে আমি আমার প্রেম দেখাতেও আমার একটুও লজ্জা হবে না। তোমাদের আরেক নাতি যখন ঘরে বউ বাচ্চা রেখে অন্য মেয়ের সাথে ফূর্তি করেছে তখন তোমাদের কারোর মুখ থেকে কথা বের হয়নি। তখন তোমাদের লজ্জা লাগেনি তবে আমার কেন লজ্জা লাগবে আমার বিবাহিত স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা দেখাতে? পরকিয়া সহ্য হয় কিন্তু বউয়ের প্রতি ভালোবাসা দেখালে তোমাদের যত্তসব লজ্জা উপচে পড়ে? কিন্তু এইসব সো কল্ড লজ্জা আমার লাগে না। আমার বউ আমার জীবন। তার অতীত তার কষ্ট, আমারো কষ্ট। আর এই কষ্ট দূর করার জন্য পৃথিবীর সব সুখ তার পায়ে ঢেলে দিলেও কম পড়বে। কারণ তোমাদের ছেলে এতটাই জালিম ছিল যে তার বাচ্চার মাকে মারতে চাইতেও সে দ্বিধাবোধ করেনি।
মৌনতা আর নিতে পারে না। সে অস্থির দৃষ্টি ফেলে বলল,
– এরোজ! থামুন, যথেষ্ট হয়েছে। মুরুব্বি মানুষ দুই কথা বলেছেন তাতে কী হয়েছে? তাশফিন ভয় পাচ্ছে।
– কেন, বলবে কেন? মুরুব্বি বলে যা ইচ্ছা তাই বলবে? ক ই যে অপরাধ করেছে তাকে তো কিছু বলছে না। আমার বেলায় সকলে লাজলজ্জা আর দয়ার বানী নিয়ে আসে।
এরোজ তার উপরেও গর্জে উঠল। ছোট্ট তাশফিন এবার ভয়ে ঠোঁট উল্টাতে উল্টাতে মৌনতার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। মৌনতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রুত তাশফিনকে কোলে তুলে নিয়ে এরোজের বাহু ধরে জোরপূর্বক লিভিং রুম থেকে নিয়ে গেল।
রূপকথা, মাসুমা বেগম আর পারমিতার মুখে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। বৃদ্ধা মহিলা এসেছেন থেকে রূপকথাকেও কথা শোনাতে ভোলেননি। টাকার লোভে নাকি মেয়েটি বয়সে দ্বিগুণ লোককে বিয়ে করেছে। রূপকথা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকালো গম্ভীর মুখে এগিয়ে আসা স্বামী আর শ্বশুড়ের পানে।
নির্জনা বেগমের খালা অপমান, রাগে, ক্ষোভে ফেটে পড়ে বললেন,
– তপোবন, তকদির? তোমরা দেখলে এরোজ কী বেয়াদবি করল আমার সাথে? আমি ওর মায়ের খালা। কত মুরুব্বি! ও ওর বউয়ের জন্য আমার সাথে এমন আচরণ করল? আর তোমরা কিচ্ছুটি বলোনি।
তপোবন থমথমে মুখে বলল,
– এরোজ ভুলকিছু তো বলেনি, নানুজান। তবে ওর বলার পদ্ধতিটা হয়তো উগ্র ছিল। যার জন্য আমি দুঃখিত! কিন্তু ওর কথা একটাও ভুল নয়। নিজের স্ত্রীর যত্ন করা, খেয়াল করায় লজ্জা পাওয়া আমার কাছে এক ধরণের কাপুরুষতা।
– কিন্তু তাই বলে মুরুব্বিদের সামনে?
– মৌনতা কতটা গুরুতর অসুস্থতার মধ্যে দিয়ে যায় তা আমাদের থেকে এরোজ বেশি ভালো জানে, নানুজান। সব জায়গায় আদব কায়দা আনাটা উচিৎ নয়। মুরুব্বিদের ও একটু বুঝতে হবে ছোটদের।
বৃদ্ধা মহিলা এই পর্যায়ে ফোঁস ফোঁস করে চুপসে গেলেন। গজগজ করতে করতে বললেন,
– বাড়ি বয়ে এনে ছেলে মেয়েদের দিয়ে অপমান করানোর জন্যই বোধহয় ডেকেছিস, তাই না নির্জনা?
তকদির সিকদার গমগমে স্বরে বললেন,
– খালা, আপনি যেচে ঝামেলা বাড়ালে এখানে আমাদের কী বলার আছে বলুন। আপনারা বাচ্চাদের না বুঝে সব জায়গায় তাদের উপর আদব কায়দা চাপিয়ে দিলে তো তারা বেয়াদবি করবেই। আপনি এরোজ আর মৌনতাকে নিয়ে কোনোরূপ কথা না বললে খুশি হবো। ওরা জীবনে কম কষ্ট করেনি। দয়াকরে ওদের কষ্ট আর বাড়াবেন না।
– আমি একটা কথা বলে তাদের কষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছি? বাহ্, তবে তো আমার এখানে থাকাই উচিৎ নয়। আমি এখুনি আমার ছেলেকে ফোন করছি। ও এসে আমায় নিয়ে যাবে। তোমাদের মেয়ের বিয়েতে আমার থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।
তকদির সিকদার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন,
– আমাদের মেয়ের বিয়েতে আপনি থাকলে আমরা ভীষণ খুশি হবো, খালা। কিন্তু থাকা না থাকার ব্যাপারটা আপনার।
নির্জনা বেগম কঠিন চোখে তাকালেন স্বামীর পানে। তকদির সিকদার বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টি ফেললেন। এই বৃদ্ধা একটু বেশিই খুঁতখুঁতে। অনুষ্ঠান পর্যন্ত থাকলে এমন আরো শ’খানেক ঝামেলা করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি বরাবরই ঝামেলা এড়িয়ে চলা এক মানুষ!যদিও বৃদ্ধা ওনার ঝামেলা না বাড়িয়ে যাবেন না। আর সেটাই হলো। নির্জনা বেগম একটু জোরাজুরি করতেই বৃদ্ধা থেকে গেলেন।রূপকথা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়ের কাছে গেল। হাত বাড়াতেই সে মুখে হাত পুরে হেসে উঠল। আধো আধো কণ্ঠে শব্দ করল,
– মাম…মা…মাম!
রূপকথা হেসে তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে গালে আদর দিল। আদুরে গলায় বলল,
– জি, মাম্মা। আপনি মাকে দেখলেই এখন ডাকতে শুরু করেন? আপনি কী আমাদের ছোট মুরুব্বি?
মা সুরসুরি দিতেই তাথৈ খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। তপোবন স্মিত হেসে দেখল তার দুই মুরুব্বিকে। মেয়েকে ছোট মুরুব্বি নামটি সেই দিয়েছিল। এই যে তারা যতক্ষণ জাগবে, মেয়েও জাগবে। তারা যখন নামাজ পড়তে উঠবে সেও উঠে বসে থাকবে। আবার যদি গম্ভীর মুখে তাকে বলা হয় দুষ্টু না করতে, তবে সে মুখে আঙুল ঢুকিয়ে চুপ করে বসে থাকে। তাদের লক্ষ্মী বাচ্চা!
প্রিয় কোলটিতে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে এরোজ। বুকে জড়িয়ে রেখেছে ছোট্ট তাশফিনকে। ছেলেটা এতটাই শান্তশিষ্ট যে ওভাবেই চুপ করে চাচার বুকে শুয়ে আছে। একটুও বিরক্ত করছে না। মৌনতা তার চুলে হাত গলিয়ে দিয়ে বলল,
– কেউ কটুক্তি করলেই তার জবাব দিতে হবে?
– হবে, যেন দ্বিতীয়বার আর সাহস না পায় কটুক্তি করার।
এরোজের ত্যাড়া কণ্ঠে মৌনতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
– আপনার থেকে তাশফিন ঢের গুণ বুদ্ধিমান। দেখুন, একটু আগে আপনাকে ভয় পেয়েও, এখন আবার আপনার সাথে চুপটি করে লেগে আছে। ও আপনার থেকেও দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।
এরোজ চোখ খুলে তাকায় লালা দিয়ে বুক ভিজিয়ে তোলা ভাতিজার দিকে। মৃদু হেসে মাথা নুইয়ে ঠোঁট বরাবর চুমু দিয়ে বলল,
– ওর তো এই ক্ষমতা থাকবেই, কারণ ওর বাবা মায়ের মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা আকাশসম। ওর বাবা-মা এই এক ক্ষমতার জোরে জীবনে বহুবার ভেঙে পড়েও আবার নিজেদের গড়ে তুলেছে।
– হুম, ভাইজান আর রূপকথার এই একটা গুণ ই বোধহয় তাদের এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে।
– রূপকথা ছোট্ট হলেও বাস্তবতা ওকে অনেক বড় বানিয়ে দিয়েছে।
মৌনতা স্মিত হেসে বলল,
– আমাদের মনে হয় ভাইজান আর রূপকথার থেকে এই গুণটা আয়ত্ত করা উচিৎ।
এরোজ হাসল। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
– সবাই মানিয়ে নিলে, প্রকৃত সুখ কে উপলব্ধি করবে? আমি মানিয়ে নিতে চাই না। আমি আমার ভাগ্যের সুখ পেলে পাব নয়তো ওই সুখের স্বপ্ন নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেব। তবুও জোরপূর্বক জীবনে মানিয়ে চলব না।
– তারমানে, আপনি যদি কোনোভাবে আমাকে না পেতেন তবে এভাবেই একা জীবন কাটিয়ে দিতেন?
– হুম।
মৌনতা ডানে বামে মাথা নাড়ল। প্রসঙ্গ পাল্টে বলল,
– রোজের বিয়ের ডেট নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে বাড়িতে। একটু দেখুন গিয়ে। তারা বলছে, ডেট আগাতে। কিন্তু এত অল্প সময়ে সব কিভাবে সম্ভব?
– সম্ভব, আমি সব ব্যবস্থা করব।
– আপনি কি কিছু জানতেন?
– জানতাম।
বলেই সে উঠে দাঁড়ালো। তাশফিনকে মৌনতার কোলে দিয়ে দ্রুত পোশাক বদলে টিশার্ট ট্রাউজার বদলে পরে নিলো। মৌনতা তার সিরিয়াসনেস দেখে ভ্রু কুঁচকে নিলো। কিছু ধারণা করে বলল,
– এখানে আপনার হাত নেইতো তাড়াতাড়ি দেশ ছাড়ার জন্য?
এরোজ ফিচলে হেসে আয়না থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পিছু ফিরে তাকালো। তার ঠোঁটে দুষ্টু হাসি। সে চোখ টিপে বলল,
– এ কী মৌন? আমি তো আপনাকে শুধু দেহ দিয়েছি। কিন্তু আপনি মন নিয়ে নিলেন কেন?
সহসা মৌনতা হাতের কাছের বালিশটা ছুঁড়ে মারল এরোজের দিকে। তেতে উঠে বলল,
– অভদ্র কথা বলবেন না।
এরোজ গা দুলিয়ে হাসতে হাসতে বালিশ ক্যাচ ধরে ফেলল। এগিয়ে এসে মাথা নুইয়ে ঝটপট নারীটির লালচে গালে দু’টো চুমু দিয়ে বলল,
– আপনি ঠিক ধরেছেন। এই নিন টিকিট।
সে একটা লম্বা খাম এগিয়ে দিল। মৌনতা সেটি নিয়ে অবিশ্বাস্য চাহনিতে চেয়ে রইল। আর চারদিন পর তার ফ্লাইট। সে আর্তনাদ করে বলল,
– এগুলো কী? এমনটা কেন করলেন? আমি আরো কিছুদিন থাকতে চাই এখানে।
এরোজের মুখশ্রী থমথমে হয়ে গেল।
– আমি চাই না।
– এখানে প্রিয়জনদের সাথে থাকতে ভালো লাগছে।
মৌনতা অবসন্ন কণ্ঠে বলল। এরোজ চোয়াল শক্ত করে বলল,
– আমার ভালো লাগছে না। এখানে আমার নিয়ে সুখ নিয়ে সবাই টানাটানি করে শুধু। আমি বহুকষ্টে সুখ পেয়েছি, কোনোক্রমেই এটা আমি হারাতে দেব না।
বলেই সে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। উন্মাদ লোকটির কাজে মৌনতা একের পর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলছে শুধু।
পুরো দুই ঘন্টা লাগল বাড়ির লোকদের মানিয়ে রোজের বিয়ের ডেট আগাতে। নিজের কাজে সফল হতেই এরোজ বুকভরা নিঃশ্বাস ফেলল। সকলের উদ্দেশ্যে দারাজ কণ্ঠে বলল,
– আমি সময়ের মধ্যে সব ব্যবস্থা করলে তো তোমাদের কোনো সমস্যা নেই? বিয়ে তো দেবেই আগে পরে কোনো সমস্যা না।
– কিন্তু আমাদের এত তাড়াহুড়া করার কোনো প্রয়োজন তো নেই, এরোজ।
তপোবনের কথায় এরোজ খেঁকিয়ে উঠে বলল,
– তোমরা বুড়ো হয়ে যাচ্ছো ভাইজান। যুবক যুবতীদের ভালোবাসা তোমরা কী বুঝবে? তৃশান ছেলেটা ভদ্রতার খাতিরে বলতে পারছিল না সে তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চায়। আর তোমরাও বোঝো না।
তপোবন থতমত খেয়ে গেল ভাইয়ের এহেন কথায়। সে এতটাই বুড়ো হয়ে গিয়েছে? সে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে খাবার ঘরের দিকে তাকাতেই দেখল রূপকথা ঠোঁট চেপে হাসছে। তপোবন কঠিন চোখে তাকালো তার দিকে। সহসা রূপকথা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল অদূরে বসে।
তপোবন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– আচ্ছা, তবে তুই ই ভালো করে বোঝ যুবক যুবতীদের ভালোবাসা। আমার কোনো দরকার হলে ডাকিস।
বলেই সে মজলিস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তকদির সিকদার হাল ছেড়ে দিয়েছেন অনেক আগেই। তিনি বললেন,
– যাক, যার ঘরের বউ সে যখন চায় তখনি নিতে পারে। আমরা বলার কে!
এরোজ নিজের কুটকাঁচালিতে সফল হতেই বিশ্ব জয়ের হাসি নিয়ে ঘরে ফিরল। ওমনি কেউ তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল অস্ত্র সস্ত্র নিয়ে। আর সেই অস্ত্র হলো বালিশ, ছ্যাপ, খামচি। হুট করেই ধুপধাপ অতর্কিত হামলা সামলাতে না পেরে এরোজ বিছানায় পড়ে গেল। রোজ বিছানায় উঠে ধুপধাপ ভাইয়ের পিঠে বালিশ দিয়ে মারতে মারতে চেঁচিয়ে বলল,
– তুমি একটা পাষাণ, খারাপ! আমি তোমার গলার কাঁটা? আমায় দূরে পাঠানোর এত তাড়া তোমার? তুমি একটা খচ্চর লোক! আমি তোমার সুখে খুশি হই কিন্তু তুমি আমার সাথে স্বার্থপরতা করো। তোমায় আজ আমি মেরে আধমরা বানিয়ে ফেলব। তুমি কোন সাহসে তৃশানকে ইন্ধন দাও?
এরোজ বাহু দিয়ে মাথা লুকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
– পেত্নি কোথাকার! সর এখান থেকে!
নিশান্ত পাশে দাঁড়িয়ে জোরে কড়তালি দিতে দিতে বলল,
– আরো জোরে দে, পিশাচিনি। আরো জোরে দে।
পিশাচিনি শুনতেই রোজ রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো নিশান্তের দিকে। নিশান্তকে কোনোরূপ সময় না দিয়ে রোজ দূর্বার গতিতে ছ্যাপ ছুঁড়ে মারলো ওর মুখ বরাবর। মৌনতা, নিভা, তানশান হতবাক হয়ে তাকালো নিশান্তের দিকে। নিশান্ত অবিশ্বাস্য বদনে নিজের মুখে হাত বুলিয়ে চোখ খুলে তাকায়। হাতে এক দলা থুতু দেখতেই তার গা ঘৃণায় রি রি করে উঠল। সে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠে বলল,
– রোজের বাচ্চা, ইউ ডার্টি মেয়ে! এটা তুমি কী করলে? ইউ ইয়াক! ওয়াক ওয়াক।
নিশান্তের বমি এসে গেল। সে ছুটে বাথরুমে ঢুকে গেল। রোজ ভাইকে মারতে মারতে এক পর্যায়ে ক্লান্ত জংলি বিল্লির মতো ফুঁসতে লাগল। এরোজ ছাড়া পেয়ে দম ফেলে নিজের মুখে গলায় হাত বুলালো। লালার আভাস পেতেই দাঁতে দাঁত চেপে তাকালো ফুঁসতে থাকা রোজের পানে।
অতঃপর তেড়ে গিয়ে নিজের লালামাখা ওই হাতটি রোজের ঘাড় চেপে মুখে ঘঁষে দিল। হিসহিসিয়ে বলল,
– খচ্চর মেয়ে কোথাকার! তুই থুতু ছোড়া কোত্থেকে শিখেছিস? নে তোর থুতু তুই মাখ। বিয়ের দিন তোকে ফর্সা দেখাবে।
বলেই সে রোজের চুলের মুঠি ধরে তার পুরো মুখে নিজের হাত ঘষে দিলো। তানশান আর মৌনতা ঘৃণায় চোখমুখ কুঁচকে নিলো। তানশান বমি আঁটকে বলল,
– ইয়াক! ছোট মা আমার বমি পাচ্ছে। আমি যাই এখান থেকে। নয়তো বমি করে দেব। ছিঃ!
বলেই সে ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। এরোজ রোজের এক দফা দ্বন্দ্ব থামলো বেশ কিছুক্ষণ পর। রোজ এক পর্যায়ে কেঁদে ফেলল। এরোজ সেই পর্যায়ে নরম হয়। ক্রন্দনরত বোনকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে মাথায় চুমু দিয়ে বলল,
– আমি অনেক কষ্টে আমার সুখদের পেয়েছি রোজ। তুই কী চাস, তোর ছোট ভাইজান আবার তার সব সুখ হারিয়ে ফেলুক? না চাইলে বিয়েটা হাসিমুখে দু’দিন পর করে নে।
রোজ বুঝদার এক মেয়ে। তবে মাঝেমধ্যে তার ভীষণ কষ্ট হয় মৌন বউয়ের থেকে দূরত্বের কথা মনে পড়লেই। কিন্তু এটাও সত্যি, সে তার মৌন বউয়ের আর কোনো কষ্ট সহ্য করতে পারবে না। সে ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলল,
– আচ্ছা।
এরোজ ম্লান হাসল। বোনকে ছেড়ে বলল,
– দেখ, ভাইজান তোর জন্য কী উপহার এনেছি।
এরোজ কানাডা থেকে কিনে আনা একটা হীরের সেট রোজের হাতে দিলো। রোজ নাক টেনে বলল,
– এগুলো আমার চাই না। তুমি শুধু ওই বাড়ির লোকেদের সাথে কথা বলে এতটুকু নিশ্চিত করো যে, আমি প্রতিবছর তিনমাসের জন্য কানাডায় যেতে পারি যেন।
এরোজ তার মাথায় হাত দিয়ে বলল,
– ওই বাড়ির অনুমতি নিতে হবে কেন? আমি নিজেই তোকে আর তৃশানকে প্রতিবছর কানাডায় নিয়ে যাব। কোনো চিন্তা নেই।
-সত্যি?
– তিন সত্যি। এখন মুখে হাসি ফোটা।
রোজ হাসল তবে তাতে দুঃখ ছিল।
এই রুমে হট্টগোল করে সকলে গিয়ে হাজির হলো রূপকথার ঘরে। এরোজ মেয়েকে খুঁজতে খুঁজতে বড় ভাইয়ের ঘরে গিয়ে পৌঁছাল। রাত হয়েছে বেশ। সে ঢুকেই দেখল সেখানে সব ছেলে মেয়ে ভাই বোনদের মেলা বসেছে। তপোবন, রূপকথা মৌনতা, রোজ, জবা তারাও ছিল। সকলের তাদের আনন্দের মূল বিষয়বস্তু বিছানায় ভাইয়ের বুকে চুপটি করে শুয়ে থাকা তাথৈ আর তাশফিন। যাদের পাশে নায়েল চুপটি করে শুয়ে আছে। আর মুগ্ধ হয়ে দেখছে।
এরোজ তার কাছে গেল। মেয়ের গালে চুমু দিয়ে বলল,
– আপনি এত মুগ্ধ হয়ে কী দেখছেন, আম্মা?
নায়েল তড়াক ফিরে তাকালো এরোজের দিকে। ভীষণ উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
– তুমি জানো, বলো মাম্মা আল বলো পাপা তানছান ভাইজানেল জন্য বেবি বোন আল বেবি ভাই এনেছে আল্লাহর কাছ থেকে?
সকলে হেসে উঠল তার কথায়। এরোজ হেসে বলল,
– হুম, জানিতো।
নায়েল চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
– তবে আমাকেও বেবি বোন আল বেবি ভাই এনে দাও।
সহসা ঘরের সকলের মাঝে নিস্তব্ধতা নেমে এলো। এরোজ মৃদু থমকালো। মৌনতার মুখে হাসির বদলে ছুঁয়ে গেল মলিনতারা।
তপোবন পি.সিতে অফিসের কাজ করছিল। ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে আসতেই সে ফিরে তাকালো সকলের পানে। মৃদু হেসে নিরাশায় ভরপুর পরিস্থিতিকে একটুখানি আশার আলো দেখিয়ে বলল,
– আল্লাহ চাইলে একদিন ঠিক তোমার বেবি ভাই-বোন আসবে, মা। তুমি রোজ আল্লাহর কাছে প্রে করবে। তাহলেই আসবে।
উপস্থিত সকলে নড়েচড়ে উঠল। রূপকথা মুগ্ধ চিত্তে তাকালো স্বামীর পানে। নিজেও তাল মিলিয়ে বলল,
– এসো নায়েল, বড় মাম্মা এখন নামাজ পড়ব। আমার সাথে তুমিও নামাজ পড়বে। আর আল্লাহর কাছে বেবি ভাই-বোন চাইবে, ওকে?
নায়েল চমৎকার হেসে বলল,
– ওকে।
তারা দু’জনে তড়িঘড়ি করে নামাজে গেল। তখন প্রায় রাত একটা বাজে। বাড়িতে অনুষ্ঠানের আমেজ আর প্রিয়জন থাকায় রাত জাগা হচ্ছে সবার। আর যখুনি তার রাত জাগা হয় সে একদম তাহাজ্জুদ পড়ে ঘুমায়। এই অভ্যাস তপোবনের থেকে আয়ত্ত করেছে সে। নায়েলকে ওযু করিয়ে সুন্দর একটা হিজাব পড়িয়ে দিলো রূপকথা। এরপর দু’জনে নামাজ পড়ল। নায়েল শুধু বড় মার দেখাদেখি বুকে হাত বাঁধল, রুকু করল, সিজদা করল আর মোনাজাত করল। মোনাজাতে জোরে জোরে চাইল,
– আল্লাহ, আমায় দু’টো বেবি ভাই আর বেবি বোন দেবে? তবে আমি খুব খুশি হবো।
তানশানের ঘরের দরজায় দাঁড়ানো মৌনতা ছলছল চোখে মেয়ের প্রার্থনা শুনল।
তপোবন আর এরোজ লিভিং রুমে এসে বসল বিয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালনা নিয়ে আলোচনা ও হিসাব নিকাশ করতে। বাকিসবাই অন্দরে হৈ হুল্লোড়ে আড্ডায় মশগুল হলো। আগামী দুদিন আর কারোর ঘুম হবে না।
তখুনি ড্রাইভার ইমরোজের হুইলচেয়ার টেনে লিভিং রুমে ঢুকল। তপোবন ফিরে তাকায় তাদের পানে। জিজ্ঞেস করল,
– এত দেরি হলো কেন? কোথায় ছিলি?
ইমরোজ নত শিরে বলল,
– অফিসে ছিলাম।
– এতক্ষণ অফিসে কী করেছিস?
– কাজ করেছি।
বলেই সে ড্রাইভারকে ইশারা করল। ড্রাইভার তাকে এগিয়ে নিয়ে গেল।
ইমরোজ চলে যেতেই তপোবন এরোজের পানে তাকায়। যার মুখ অচিরেই শক্ত হয়ে উঠেছে তপোবন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে নিলো। পিঠ চাপড়ে বলল,
– নিজের ভালোবাসার উপর ভরসা নেই? এত ভয় রাগ কেন? অতীতের ছায়াও তোর জীবনে পড়বে না। ভাইজান পড়তে দেব না। রোজের সাথে যেটা করলি সেটা না করলেও পারতি। আমি তোকে জোর করব না, যেহেতু রোজ নিজেই রাজী হয়েছে।
এরোজ ভাইয়ের কাঁধে মাথা এলিয়ে ছলছল চোখে সব শুনল। তার ভয় হয়, ভীষণ ভয় হয়। সে পালাতে চায় এই দেশ, এই দেশের মানুষ থেকে। এই দেশ যে তার সুখ কেড়ে নেয়। সুখ যে তার জন্য স্বপ্ন ছিল। এই সুখময় স্বপ্নের ঘোর যেন কোনোদিন না ভাঙে।
কথা মাফিক দু’দিন বাদ ঠিক সময়ে সকল নিয়ম নীতি পেরিয়ে রোজের বিয়ে অনুষ্ঠিত হলো। রাত আটটা নাগাদ। নিকাহ্ শেষে নিভা, নিশান্ত, রুশান, তানশান তারা সকলে তৃশানের সামনে ছোট্ট একটি আয়না রাখল। যাতে ভাসতে ঘোমটার আড়ালে থাকা রোজের মোহনীয় বধূরূপ। নিশান্ত চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল,
– দুলাভাই বলো বলো, আয়নাতে কাকে দেখা যাচ্ছে?
ঘোরগ্রস্থ তৃশান হকচকিয়ে উঠল। নারীটির চোখে চোখ পড়তেই ধাতস্থ কণ্ঠে বলল,
– ভালোবাসি না, ভালোবাসি না বলে আমায় অসম্ভব ভালোবাসা আমার বৃদ্ধা বয়সের হাত ধরে হাঁটার সঙ্গীকে।
কনভেনশন হলে হৈচৈ পড়ে গেল তৃশানের জবাব শুনে। নিশান্ত আর রুশান এবার রোজকে বলল,
– এই পেত্নি, বল আয়নাতে কাকে দেখা যাচ্ছে?
তবে রোজ নিশান্ত আর রুশানের সম্বোধনের মতোই একটি বাজে ত্যাঁড়া জবাব দিলো।
– ক’টা হনুমানের দুলাভাইকে।
উপস্থিত সকলে এবার হো হো করে হেসে উঠল। তৃশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল রোজের জবাবে। নিশান্ত, নিভা রেগে গেল। নিশান্ত নিজেকে সামলাতে না পেরে চাটি মেরে দিলো নববধূটিকে। রোজ সেই অবস্থাতেও তেঁতে উঠে নিশান্তকে একটা মাইর দিল। তৃশান হেসে উঠল চঞ্চল, বদমেজাজি স্ত্রীর কান্ডে। হ্যাঁ, মেয়েটি তার স্ত্রী! যার সান্নিধ্যে সে তার ভুলগুলো ভুলে এক স্বর্গীয় সুখ পেতে চায়।
এরপর সকলে ফ্যামিলি ফটো তোলার জন্য স্টেজে উঠে এলো। গোটা সিকদার পরিবার স্টেজে উঠলেও ইমরোজ ছিল হলের এক কোনায় একটি অবহেলিত জড়বস্তুর ন্যায় বসে। এরোজের কোলে চড়া নায়েল চেঁচিয়ে উঠল বাবার পানে চেয়ে।
-আলে পাপা আসেনি তো। এই পাপা, এসো এসো সবাই মিলে ছবি তুলি। তালাতালি এসো।
মৌনতার স্থবির চিত্তে কেঁপে উঠল মেয়ের আদরমাখা কণ্ঠে। তেমনি এরোজের ও বক্ষস্থল কেঁপে উঠল। ‘রক্তের টান’ শব্দ দুটি কী খুব শক্তিশালী?
ফটোগ্রাফার রেডি বলতেই তানশান তাকে থামিয়ে দিলো।
-থামুন, ভাইয়া।
সকলে ভ্রু কুঁচকে তাকালো তানশানের পানে। কিয়ৎকাল বাদ তাদের আরো ভ্রু কুঁচকে গেল যখন তানশান ইমরোজের হুইলচেয়ার টেনে আনলো।
ইমরোজ বিচলিত কণ্ঠে বলল,
-তানশান আব্বু, প্রয়োজন নেই। তোমরা ছবি তোলো।
তবে তানশান কিছু বলল না। আর না পরিবারের কেউ টুঁ শব্দ করল। ইমরোজকে তানশান নিজের বাম পাশে রাখল। ডানপাশে বাবা। বলল,
-হয়েছে। এখন তুলুন।
তপোবন ছেলের থেকে মুগ্ধদৃষ্টি সরিয়ে মৃদু হাসল। অতঃপর কোলে থাকা দুই ছেলেমেয়ের দিকে তাকিয়ে ছেলেকে ইমরোজের কোলে দিয়ে দিল। ইমরোজ মুখ তুলে তাকায় ভাইয়ের দিকে। তপোবন মৃদু হেসে বলল,
-সামনে তাকা।
ইমরোজ ছলছল চোখে চেয়ে শূন্য বুকে তাশফিনকে জড়িয়ে নিলো। অতঃপর একটি পারিবারিক ছবি তোলা হলো। যেটা আদোতে কোনো সাধারণ ছবি ছিল না।
সেই ছবিটিতে ছিল একটি পরিবার। যেই পরিবারটি হাজার বার ভাঙার পরেও হন্য হয়ে সুখের খোঁজে মত্ত ছিল। ওই এক ছবিতে ছিল অসম্ভব শক্তিশালী এক মানিয়ে নেয়ার গল্প, সৎ মা থেকে মা হওয়ার গল্প, সৎ ছেলে থেকে ছেলে হওয়ার গল্প, বিশ্বাসঘাতকতা আর বিচ্ছেদের বিশ্রী গল্প, পাপ থেকে প্রিয়জন হওয়ার গল্প, ছোট পাপা থেকে পাপা হওয়ার গল্প, ভুল থেকে শিক্ষা নেয়ার গল্প, কিশোরি অনুভূতি থেকে স্বামী-স্ত্রী হওয়ার গল্প। এটাই সরোবর নামক সিকদার বাড়ির গল্প। যেখানে অজস্র তিক্ততা, দুঃখ থাকা সত্ত্বেও তারা ভালো থাকতে চায়।
এরপর? এরপর তপোবন, এরোজ সহ পুরো পরিবার তাদের একমাত্র চোখের মণিকে অন্য একজনের হাতে তুলে দিলো। মুহুর্তটি বোধহয় প্রতিটা মেয়ে আর তার পরিবারের জন্য একটি অন্যতম হৃদয়বিদারক মুহূর্ত। প্রিয় মৌনবউয়ের আর পরিবারের থেকে বিদায় শেষে রোজ যাওয়ার পথে ফিরে তাকালো অদূরে হুইলচেয়ারে হলের এক কিনারায় বসে থাকা মেজো ভাইয়ের পানে। বুকভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোজ এগিয়ে গেল ইমরোজের কাছে। সকল রাগ ঘৃণাকে এক মুহুর্তের জন্য দূরে সরিয়ে বলল,
– ভাইজান!
প্রায় দীর্ঘ দুই বছর পর বোনের মুখে ভাই ডাক শুনে ইমরোজের চোখ লাল হয়ে উঠল। রোজ পুনরায় বলল,
-দোয়া করিও, ভাইজান।
ইমরোজ কান্না আটকালো। থমথমে মুখে মাথা নেড়ে বলল,
-সুখী হও।
রোজ মৃদু হেসে নীড় ছাড়ার পথ ধরল এক অতি প্রিয় অজানা মানুষের হাত ধরে। জানা নেই যাত্রাপথটি কেমন হবে। তবে একটা সুন্দর সুখময় জীবনের আশা রাখতে তো দোষ নেই! সে সুখী হবে, এই অজানা মানুষটিকে আঁকড়েই সুখী হবে।
বোনকে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে এরোজ রক্তিম নেত্রে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল হলের গেটের কাছে। মৌনতা তার পাশে এসে দাঁড়াল। হাতের মুঠোয় কারোর হাতের আভাসে এরোজ ফিরে তাকায়। ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বলে,
-মেয়েদের কী অন্যের ঘরে যাওয়া বাধ্যতামূলক? বাবারা তাদের সারাজীবন বুকে আগলে রাখতে পারে না?
মৌনতা ম্লান হেসে না বোধক মাথা নাড়ল। এরোজ অবুঝ কণ্ঠে বলল,
-কেন নেই?
-আপনি কী আপনার স্ত্রীকে সারাজীবনের জন্য বাবার বাড়ি দিয়ে আসবেন?
-একদিনের জন্য ও না।
এরোজ চোখমুখ কুঁচকে বলল। মৌনতা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। বলল,
-জবাব পেয়েছেন?
এরোজ ভ্রুকুটি করে বলল,
-আপনি ভীষণ বাজে লজিক দিয়েছেন, মৌন। আমার নায়েল কোথায়? আমি ওকে বিয়ে দেব না যতদিন বেঁচে আছি।
মৌনতা মৃদু হাসল। কিছু বলল না। এরোজ চারিদিকে মেয়েকে খুঁজতেই দৃষ্টিতে মলিনতা ছুঁয়ে গেল। অদূরে হুইলচেয়ারে বসা বাবার হাঁটুতে কনুই ঠেকিয়ে নায়েল খিলখিলিয়ে হাসছে আর বাবার সাথে কথা বলছে। এরোজের দৃষ্টি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে আসে। বুকটা সংকুচিত হয়ে আসে। সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। এই ভয়ানক দৃশ্য সে দেখতে চায় না। সে পালাতে চায় শুধু। আর একদিন।
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৬
মেয়েকে আদর করতে করতেই ইমরোজ ঘাড় কাত করে কনভেনশন হলের গেটের দিকে তাকায়। হাতে হাত রাখা যুগলকে এক দৃষ্টিতে দেখে শুধু।
সেইদিনের পর এরোজের ভয়গুলো প্রশ্রয় পেল। যতটা প্রশ্রয় পেলে রোজের বৌভাত শেষ হওয়ার সাথে সাথে এরোজ বউ বাচ্চা নিয়ে কানাডায় রওনা হয়। সকল ভয়, রক্তের টান পিছু ফেলে এরোজ উন্মাদের মতো ছোটে সুখ আঁকড়ে ধরার জন্য।
