অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৫
তোনিমা খান
একশত ছিয়াশি দিন পরের গল্পটি একটু অন্যরকম।
সৃষ্টিকর্তা কখনো তার বান্দার প্রত্যাবর্তনকে ফিরিয়ে দেন না। সৃষ্টিকর্তা কখনোই অন্যায়কে জিততে দেন না। সৃষ্টিকর্তা কখনোই মায়ের জন্য করা সন্তানের প্রার্থণা ফিরিয়ে দেন না। সৃষ্টিকর্তা শুধু সঠিক সময়ে সকলের কর্মের ফল দান করেন।
– মৌনতা?
জীবন দ্বিতীয়বার মৌনতাকে পিছু ডাকল। আরো একবার বাঁচতে চাওয়া মেয়েটি জীবনের সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ফিরে তাকালো। ঠিক যেন এক বিধ্বংসী প্রলয় পার করে আসা অবসন্ন নাবিক। তার চোখেমুখে যুদ্ধের শেষ চিহ্ন, এক শান্ত বিধ্বস্ত নীরবতা চাহনিতে।
কাজলটানা স্বচ্ছ নেত্রে মৃদু হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
– ইয়েস ডক্টর!
ডঃ অ্যারন শিমার সহ সহকারী আরো তিনজন ডক্টর এগিয়ে এলেন। প্রত্যেকের চোখেমুখে দীর্ঘ এক লড়াই লড়ার ক্লান্তি।
– তোমার হাজব্যান্ড কোথায়?
– হয়তো জবে।
– আমরা মনে হয়, সে আসার পর তোমার রিপোর্টগুলো নিয়ে আলোচনা করলে ভালো হতো।
বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসা মৌনতার চোখেমুখে দৃঢ় উদ্দীপ্ততা সত্যকে আগলে নেয়ার। সে মৃদু হেসে বলল,
– এনি ব্যাড নিউজ, ডক্টর?
– আমরা কী এমনটা বলেছি?
মৌনতার হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়গুলোকে অবমুক্ত করে দিল। বলল,
– আমি চাইছি না রিপোর্টের রেজাল্ট সে আগে জানুক।
– কিন্তু আমরা তার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য খুবই উদগ্রীব ছিলাম।
– আমি তাকে আরো একবার কষ্টের বিনিময়ে কষ্ট পেতে দেখতে চাই না।
মৌনতা ক্ষীণ স্বরে বলল।
ডঃ অ্যারন স্মিত হেসে বললেন,
– কষ্টের পরে সুখ আসে তা কী তুমি জানো না? তোমায় কে বলল, রিপোর্ট তাকে আবার কষ্ট দেবে?
মৌনতার চোখেমুখে অসহ্য কৌতুহল ছুঁয়ে গেল। সে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে বলল,
– দেবে না?
ডঃ অ্যারন না বোধক মাথা নাড়লেন। হাতের ফাইলটি থেকে কাঙ্খিত রিপোর্টগুলো বের করে বিশ্বজয়ের হাসি নিয়ে বললেন,
– আমরা আমাদের লড়াইয়ে জিতে গিয়েছি। কংগ্রাচুলেশন মৌনতা। ইটস নেগেটিভ!
পরপরই বিস্তারিত ভাবে জানিয়ে বললেন,
– তোমার বোন ম্যারো এবং এমআরডি টেস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী তুমি এখন ‘এমআরডি নেগেটিভ কমপ্লিট রেমিশন’ এ আছো। সহজ করে বললে, তোমার শরীরে এখন আর লিউকেমিয়ার একটা কোষও অবশিষ্ট নেই। আর সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, তোমার শরীরে এখন ‘হান্ড্রেড পার্সেন্ট ডোনার কাইমেরিজম’ দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ দাতার দেওয়া সেই সুস্থ কোষগুলো এখন তোমার শরীরে পুরোপুরিভাবে স্থাপিত হয়ে গিয়েছে। সেখানে নতুন এবং বিশুদ্ধ রক্ত তৈরি হচ্ছে। প্লাটিলেট কাউন্ট আশানুরূপ ভাবে বাড়ছে।
অবশেষে যুদ্ধ শেষ! এবার বুঝি সন্তানের সাথে তার দূরত্ব ঘুচবে। এবার বুঝি কেউ একজন একটু প্রশান্তিভরা ঘুমে আচ্ছন্ন হবে। শ্রান্ত নারীটির চোখের কোল ঘেঁষে এক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো, নাসারন্ধ্র থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল। মৌনতা ফ্যাসফেসে কণ্ঠে বলে উঠল,
– আমি কী এখন চিরতরে ছুটি পাব এখান থেকে?
ডঃ উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেললেন। সাময়িক উল্লাসকে নষ্ট করলেন না। মৃদু হেসে বললেন,
– ছুটি পাবে কিন্তু তোমায় রেগুলার আমাদের চেকআপের মধ্যে থাকতে হবে। একদম স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে তোমায় আরেকটু সময় লাগবে।
– আপাতত যেতে পারি, প্লীজ? আজ দেড় বছরের বেশি কেউ একজন একটারাত শান্তিতে ঘুমাতে পারেনি।
মৌনতা ছলছল নেত্রে চেয়ে বলল।
ডঃ ঘন ঘন মাথা নেড়ে বললেন,
– হ্যাঁ, অবশ্যই।
মৌনতা ঘাড় কাত করে তাকালো সদর দরজার দিকে। ওপারে থাকা কিছু অশ্রুসিক্ত মুখপানে চেয়ে সে মৃদু হাসল। ফিসফিসিয়ে বলল,
– একদিন বলেছিলাম, সৃষ্টিকর্তা যদি এই দরজার ওপারে যাওয়ার অনুমতি না দেয়—তবে আমার প্রতি কোনো আক্ষেপ না রাখতে। কিন্তু সেদিন বলা হয়নি, সৃষ্টিকর্তা যদি দরজার ওপারে যাওয়ার অনুমতি দেয়—তবে আপনাকে আক্ষেপ রাখার কোনো সুযোগ দেব না।
ডঃ অনুমতি দিতেই রোজ ছুটে গিয়ে আঁছড়ে পড়ল রুগ্ন নারীটির বুকে। ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
– তুমি জিতে গিয়েছ মৌনবউ। আমি জানতাম আমার মৌন বউ কখনো হারতে পারে না।
নিশান্ত হনহনিয়ে কেবিনে ঢুকে হস্তক্ষেপ করে বলল,
– হেই সিস্টার ফ্লাওয়ার, ভাবি একা শুধু জিতেনি। আমার ব্রোও জিতেছে।
রোজ কাঁদতে কাঁদতে হেসে ফেলল। মাথা নেড়ে বলল,
– হ্যাঁ আমার ক্ষেপা ষাঁড় ভাইজান জিতে গিয়েছে।
নিশাত চোখের পানি মুছে মৌনতার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
– আমার আম্মা জিতে গিয়েছে। বলেছিলাম না, সৃষ্টিকর্তা কখনোই আমাদের কর্মফল দিতে ভোলে না?
পরপরই আক্ষেপের সুরে বলল,
– এরোজকে কেন এত সুখময় মুহুর্ত থেকে বঞ্চিত করলি? ও এখানে থাকলে পুরো হাসপাতাল মাতিয়ে ফেলত। তোকে দেখলে কত খুশি হতো!
মৌনতা স্মিত হেসে বলল,
– সে যেভাবে আমায় দেখলে খুশি হবে আমি সেভাবেই তার সামনে যাব, খালামনি।
সুইমিং স্যুট পরিহিত নায়েল ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
– আই কান্ট!
এরোজ ম্লান হেসে তার দুগাল আঁকড়ে ধরে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
– ইউ ক্যান, সুইটহার্ট।
নায়েল নাক মুছতে মুছতে বাকি প্রতিযোগীদের দিকে আঙুল তাক করে বলল,
– ওলা সবাই ফিফটি সেকেন্ডের আগে পুল ক্রস কলতে পালে। কিন্তু আমি পালি না। আল ফিফটি সেকেন্ডের আগে পুল ক্রস কলতে না পাললে আমি জিতব না।
– জিততে হবে না। পরের বছর জিতব আমরা। তুমি শুধু এই বছর ভালো করে সাঁতার কাটতে শিখো।
বাবার মন ভুলানো কথায় ভুলল না নায়েল। মাথা নুঁইয়ে নিলো। থুতনি ঠেকল বুকে। ক্রন্দনরত গলায় বলল,
– কিন্তু আমি জিততে চাই।
এরোজ হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে সুইমিং ট্রেইনারের দিকে তাকালো। সে মৃদু হাসল। নায়েল সাঁতার কাটতে এখন বেশ পটু হলেও পঞ্চাশ সেকেন্ডের মাঝে একটা পুল ক্রস করা তার জন্য কষ্টসাধ্য! কিন্তু আগামী সপ্তাহে তার প্রি স্কুলে এমনি একটা সাঁতার কাঁটার প্রতিযোগিতা রয়েছে। যেখানে পঞ্চাশ সেকেন্ডে একটা পুল ক্রস করতে হবে।
ট্রেনিং এর সময় শেষ। স্টুডেন্টস পুল থেকে উঠে চলে গেল। ট্রেইনার ও চলে গেল। এরোজ নিজের জগার্স আর টিশার্টের পানে এক পলক চেয়ে বলল,
– আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি জিতবে।
– ট্রেইনাল চলে গিয়েছে।
নায়েল ব্যর্থতার সুরে বলল। এরোজ মৃদু হেসে বলল,
– তোমার একমাত্র ট্রেইনার আমি। জগতের সবাই তোমায় ছেড়ে চলে গেলেও এই ট্রেইনারের কোনো সাধ্য নেই তোমায় ছেড়ে চলে যাওয়ার। কাম অন, এসো আমরা দু’জনে মিলে প্রাকটিস করব।
নায়েল কান্না থামিয়ে মুখ তুলল। জিজ্ঞেস করল,
– তুমি শেখাবে?
– ইয়াহ! আ’ম কোয়াইট গুড এট সুইমিং।
এরোজ নিশান্তকে ফোন দিতে দিতে বলল। নিশান্ত এলো পনেরো মিনিটের মাথায়। তার হাতে একটা ব্যাগ। এরোজ সেই ব্যাগ থেকে শর্টস বের করতে করতে বলল,
– হাসপাতালে গিয়েছিলি একবার ও?
নিশান্ত আঁড়চোখে তাকালো। বলল,
– বাড়িতে যাবে না ব্রো?
এরোজ পোশাক পরিবর্তন করতে করতে বলল,
– নাহ, আজ তো আর বাড়িতে যাব না। নায়েলকে প্রাকটিস করাব। তা করাতে করাতে আটটা বেজে যাবে। তারপর ওকে তোদের কাছে দিয়ে আমায় একটু অফিসে যেতে হবে। তারপর হাসপাতালে যাব। ওখানেই থাকব।
নিশান্ত মাথা চুলকে নিভন্ত স্বরে বলল,
– ওহ্!
তার পেটের মধ্যে গুড়গুড় করছে। কেউ তাকে কোনো কিছু বলতে নিষেধ করলে, সেই কথাটি বলার জন্য তার মধ্যে অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করে। সে উশখুশ করছিল তখুনি তার ফোনের টোন বেজে উঠল। স্ক্রিন অন করতেই রোজের মেসেজ ভেসে উঠল।
– খবরদার নিশান্তর বাচ্চা, মুখ থেকে একটা কথাও যদি বের হয় তোর ইয়ে কেটে আরো একবার সুন্নতে খাৎনার অনুষ্ঠান খাবো।
কত বড় খচ্চর! নিশান্ত দাঁতে দাঁত চেপে ফোনটা বন্ধ করল। এরোজ তার মুখের ভাবভঙ্গি দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,
– কী হয়েছে?
নিশান্ত বলল,
– তোমার বোনটা চিড়িয়াখানার একটা উদ্ভট প্রজাতির প্রাণী ব্রো। ওর নাম তোমরা কোন জ্ঞানে ফুল রাখলে? তাও আবার গোলাপ?
এরোজ তার মুখের উপর নিজের ঘর্মাক্ত টিশার্টটা ছুঁড়ে মেরে বলল,
– ও আমাদের ফুল। মুখ সামলে কথা বলবি।
– ব্রো, ওটা একটা জংলি বিল্লি! কথায় কথায় বিশ্রী হুমকি দেয়। বাই দ্য ওয়ে, তোমার বডি থেকে এত সুন্দর স্মেল কেন আসে? আমি ছেলে হয়ে সিডিউস হয়ে যাচ্ছি। কী ইউজ করো আমায় একটু বলো না।
এরোজ ঘাড় কাত করে বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টি ফেলল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
– আমায় যেন জুতা ছুড়ে মারতে না হয়, নিশান্ত।
– ব্রো সিরিয়াসলি! তোমার বডি থেকে নেশাধরানো স্মেল আসে। এর জন্যই সেদিন ভাবি তোমার টিশার্ট নাকে ঠেকিয়ে ঘ্রাণ নিচ্ছিল।
এরোজ এবার আড়চোখে তাকালো। সতর্ক কণ্ঠে বলল,
– সত্যি?
– তিন সত্যি। কী ইউজ করো বলোনা?
– তা তোকে কেন বলব? এটা আমার পার্সোনাল সিক্রেট!
– সিক্রেটটা বললে আমার গার্লফ্রেন্ড ও আমার প্রতি সিডিউস হয়ে যেত ব্রো। প্লীজ!
– গোবরের সাথে ন্যাপথালিন মিশিয়ে গায়ে মাখবি রোজ। দেখবি তোর গা থেকেও এমন সুঘ্রাণ আসবে।
বলেই এরোজ উদাম দেহে পুলে নেমে গেল। নিশান্ত রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো তার পানে। দুই ভাই বোন দু’জনেই খচ্চর!
এরোজের ঠোঁটে লেগে আছে মিটিমিটি হাসি। মৌনতা তার ঘ্রাণ পছন্দ করে? এতটুকুই তার মুড বানিয়ে দিল।
তন্মধ্যেই মাথা ডুবিয়ে সাঁতার কাটতে থাকা নায়েলের মাথা ঠেকল এরোজের বুকে। নায়েল পানি থেকে মাথা তুলে খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বলল,
– ওহ পাপাহ্, আই কট ইউ।
এরোজ তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ভেজা মুখটিতে চুমু দিয়ে বলল,
– ইয়েস, ইউ কট মি।
নায়েল বাবার অসমতল খাৃজকাটা বুকে মুখ ডুবিয়ে দিল। লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে মুগ্ধ চিত্তে বলল,
– উমম, কী সুন্দল ঘ্রাঁণ!
এরোজ আর নিশান্ত সহসা হেসে উঠল শব্দ করে। নায়েল স্বভাবতই শুরু থেকে তার গায়ের সুঘ্রাণ পছন্দ করে। কাছে আসলেই এভাবেই বুকে মুখ ডুবিয়ে দিয়ে সুর টেনে বলবে,
– উমম, কী সুন্দর ঘ্রাঁণ!
সে মেয়ের থুতনি চেপে বলল,
– আপনার পছন্দ পাপার গায়ের সুগন্ধ?
– খুব।
নায়েল চঞ্চল কণ্ঠে বলেই আবার সাঁতার কাটতে শুরু করল। নিশান্ত ঝিমুতে ঝিমুতে বলল,
– ব্রো, তাড়াতাড়ি বাড়ি চলো।
– বললাম না আজ বাড়ি যাব না? বারবার এত বাড়ি যাওয়ার কথা বলছিস কেন?
– তোমার বাড়িতে আজ চাঁদ নেমেছে।
– হোয়াট রাবিশ!
এরোজ বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করে নায়েলের দিকে মনোযোগ দিল। দীর্ঘ এক ঘন্টা প্রাকটিস করানোর পর এরোজ পুলের এক্সিট পয়েন্ট দাঁড়াল। হাতের স্টপ ওয়াচটি ধরে স্টার্ট পয়েন্টে থাকা নায়েলকে বলল,
– তোমার টাইম শুরু হচ্ছে এখন।
বলার সাথে সাথে নায়েল মাথা ডুবিয়ে সাঁতার কাটতে শুরু করল। এরোজ খেয়াল করল নায়েলের মাঝে জেতার অদম্য ইচ্ছা। চাইল্ড কেয়ার থেকে এনে নায়েলকে প্রি স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছে শুধু মাত্র তার প্রোগ্রেস দেখে।
সে সবকিছু এতটা মনোযোগ আর ডেডিকেশনের সাথে করে যে সেখানকার কতৃপক্ষরা সাজেস্ট করেন, ওকে স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য। ইংরেজি ভাষাতেও সে এখন অনেক দক্ষ। সবচেয়ে বড় কথা সে এখন কনাডিয়ানদের বলা পঞ্চাশ পার্সেন্ট কথোপকথন ই বুঝতে পারে। আর নিজেও বলতে পারে। তবে নেটিভদের মতো এখনো হয়ে ওঠেনি।
বুকে ছোট্ট মাথাটি ঠেকতেই এরোজ স্টপ ওয়াচ টির দিকে তাকালো। পঞ্চাশ সেকেন্ড দেখতেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। নায়েল চেঁচিয়ে উঠল নিজেকে পঞ্চাশ সেকেন্ডের মধ্যে পুল ক্রস করতে দেখে। এরোজ তার গাল আঁকড়ে ধরে বলল,
– এইতো আমার মা পেরে যাচ্ছে। যাও, এবার টার্গেট থাকবে উনপঞ্চাশ সেকেন্ড, ওকে?
– ওক্কে!
নায়েল দৃঢ় কণ্ঠে বলেই আবার ছুটলো স্টার্ট পয়েন্টে। এবং একদম উনপঞ্চাশ সেকেন্ডে এসেই তার মাথা ঠেকল এরোজের বুকে। এমন করতে করতে বাবা মেয়ে ছেচল্লিশ সেকেন্ড পর্যন্ত এসে থামল। আগামীকাল আবার প্রাকটিস করবে।
নায়েলের উল্লাসের শেষ নেই। এরোজ তাকে পুল থেকে তুলে ছোট্ট একটা বাথরোব পরিয়ে নিয়ে এগিয়ে গেল চেঞ্জিং রুমের দিকে। যেতে যেতে বলল,
– তুমি এখন নিশান্ত চাচুর সাথে বাড়িতে যাবে, ওকে? গিয়ে খাবে। পাপার কিছু কাজ আছে। সেটা করে বাড়ি ফিরতে একদম সকাল হয়ে যাবে।
নায়েল ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
– ওকে।
এখন আর তার কষ্ট হয় না এখানে থাকতে। বরং অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। মাসুমা বেগম বাংলাদেশে চলে গিয়েছেন ভিসার মেয়াদ শেষ হতেই। একবার ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু এবার আর বাড়ায়নি রোজ কানাডায় থাকার কারণে। রোজ নায়েলকে সামলে নিতে পারবে। কিন্তু ওদিকে মৌনতার বাবার খুব প্রয়োজন ছিল তার মায়ের।
কথামতো নায়েলকে পাঠিয়ে দিয়ে এরোজ কাজ শেষে এগারোটা নাগাদ হাসপাতালে পৌঁছাল। হেমাটোলজি ইউনিটে উঠতেই দেখতে পেল লিরাকে কিছু নার্সের সাথে। এরোজকে দেখে লিরা তার পথ অনুসরণ করল। এরোজ পকেটে হাত ঢুকিয়ে চলতে চলতে এক পলক পিছু ফিরে দেখল লিরাকে। বলল,
– তুমি কী জানো, আমি তোমার কাজে খুব কষ্ট পেয়েছি?
লিরা ভ্রু কুঁচকে বলল,
– কোন কাজে?
– তুমি কারোর মন ভেঙে দিয়েছ অথচ সেটা তোমার মনেও নেই। তুমি একটা পাষাণ লিরা। আমার বিয়েতে তুমি কী করে তোমার বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে যেতে পারো? আমার মন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছ তুমি। খুব কষ্ট পেয়েছি।
লিরা চলন্ত পা থামিয়ে বড়সড় নেত্রে তাকালো অত্যন্ত গুরুগম্ভীর মুখপানে। এরোজ ও পা থামিয়ে দিল। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
– কী অবাক হলে কেন? সেদিন যদি আমার বিয়ে না থাকত; তবে আমি তোমার বয়ফ্রেন্ডকে পিটিয়ে হাত পা ভেঙে দিতাম, আমার সুইটহার্টের হাত ধরে হাঁটার অপরাধে।
এরোজের চোখেমুখে তখনো ভরপুর সিরিয়াসনেস দেখে লিরা তেঁতে উঠল তার উপর
নিজের হাতের নাইফটা ওর দিকে তাক করে বলল,
– তোমার পেট ফুটো করে দেব আমি। তুমি গম্ভীর মুখে আমার সাথে মজা করছ?
এরোজ সহসা নিজের মেকি গাম্ভীর্যতা ভেঙে খিক খিক করে হেসে উঠল। চোখ টিপে বলল,
– আমি পাঁচটা বিয়ে করলেও তুমি আমার সুইটহার্ট থাকবে লিরা।
– ক্যারেক্টারলেস!
লিরা বিরক্ত নিয়ে আওড়ালো। এরোজ গা দুলিয়ে হাসতে হাসতে কাঙ্খিত কেবিনের দিকে এগিয়ে গেল। তবে দরজা খুলতেই ভ্রু কুঁচকে গেল। সে পুরো কামরাটিতে চোখ বুলালো। শূন্য কামরাটিতে থাকা যান্ত্রাংশে পরিবর্তন এসেছে কিছুটা।
সে তড়িৎ দরজা আঁটকে লিরার দিকে তাকালো। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
– হেই লিরা, হোয়্যার ইজ মৌন?
লিরা মুচকি হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
– হোয়্যার শি শ্যুড বি।
এরোজ বিভ্রান্ত নিয়ে তাকালো। বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট এর পর থেকে আজ ছয় মাস। মৌনতা একটু একটু করে রিকভারি করছিল। আগামীকাল তার ফাইনাল টেস্ট। তার দেহে একটা সিঙ্গেল ক্যান্সার কোষ অবশিষ্ট আছে কি-না তা পরীক্ষা করা হবে।
সে বলল,
– তুমি কী বলছ? আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
– ডক্টরের সাথে দেখা করো। যা বলার সে বলবে।
এরোজ অপ্রস্তুত ছুটে ডক্টরের কাছে গেল। হন্তদন্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
– ডক্টর, হোয়্যার ইজ মৌন?
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ডক্টর ও একই জবাব দিল।
– হোয়্যার শি শ্যুড বি!
সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলেই মুচকি হেসে একটা ফাইল এগিয়ে দিল। এরোজ অবুঝপানে চেয়ে দ্রুত ফাইলটা খুলল। এবং খুলতেই তার দেহ সর্বশান্ত হয়ে গেল। দৃষ্টি আঁটকে গেল ‘নেগেটিভ ‘ ছোট্ট এই শব্দটিতে। সে জানত ফলাফল এটাই হবে। কিন্তু এটা জানত না এই ছোট্ট শব্দটির মাঝে তার গোটা জীবনের সব সুখ লুকিয়ে ছিল।
ডক্টর বললেন,
– মৌনতা এখন কমপ্লিট রেমিশনে আছে। আমি বলছি না সে একদম সুস্থ হয়ে গিয়েছে আগের মতো। ট্রান্সপ্ল্যান্টের পর প্রথম ১ থেকে ২ বছর ক্যান্সার ফিরে আসার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।যদি মৌনতা আগামী ৫টি বছর কোনো রকম ক্যান্সার কোষ ছাড়াই সফলভাবে পার করে দিতে পারে। তখনি তার নামের পাশ থেকে ‘ক্যান্সার রোগী’ শব্দটা মুছে ফেলা হবে এবং তাকে অফিসিয়ালি সম্পূর্ণ নিরাময়প্রাপ্ত ঘোষণা করা হবে।৫ বছর পার হয়ে গেলে তার এই ক্যান্সার ফিরে আসার সম্ভাবনা, একজন সাধারণ মানুষের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনার সমান হয়ে যাবে। আমি প্রার্থণা করব মৌনতা বিগত দেড় বছরের মতো আগামী পাঁচ বছর ও জিতে যাবে। কারণ তার পাশে তুমি আছো।
ডক্টরের দৃঢ় বিশ্বাসে এরোজ ছলছল নেত্রে স্মিত হাসল। লহু স্বরে বলল,
– আগামী পাঁচ বছর কেন? আগামী ষাট বছর আমার মৌন সফলভাবে বাঁচবে ডক্টর।
– অবশ্যই বাঁচবে।
ডক্টর তার কাঁধ চাপড়ে বলল। এরোজ নির্বাক অনুভূতি দমাতে দমাতে আছড়ে পড়ল ডক্টরের বুকে। ফিসফিসিয়ে বলল,
– থ্যাংক ইউ ডক্টর। থ্যাংক ইউ সো মাচ ফর ওয়ান এন্ড হাফ ইয়ার।
– দ্যাটস মাই ডিউটি, ম্যান।
এরোজ সায় জানিয়ে ডক্টরের থেকে বিদায় নিয়ে ছুটলো এক অতি পরিচিত গন্তব্যে। যেই গন্তব্য তার অতি পরিচিত হলেও দৃশ্যটা হয়তো অপরিচিত হবে। ভীষণ অপরিচিত!
তার ক্ষিপ্র কদম গতি হারালো ঠিক নিজের ঘরের বসার ঘরে এসে। একপাশে সোফা আর এক পাশে কিচেন আর তার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল এরোজ। তন্মধ্যেই কর্নকুহরে আন্দোলিত হলো টুং টাং আওয়াজ। এরোজ হাঁফাতে হাঁফাতে ঘাড় কাত করে তাকায় ঠিক নিজের বাম পাশে থাকা কিচেনের পানে। ওয়ার্ম লাইটের মৃদু আলোয় মেরুন রঙা শাড়ি পরিহিত এক বঁধূ ভীষণ মনোযোগ সহকারে রান্না করছে। অ্যাডামস অ্যাপলটি মৃদু শব্দ তুলে উপর-নিচ হলো। এরোজ ক্ষীণ স্বরে ডাকল,
– হেই?
কারোর ডাকে নিমগ্ন চিত্তে রান্না করা বঁধূটি চোখ তুলে তাকালো। ভীষণ অভ্যস্ততার সাথে মৃদু হেসে বলল,
– হ্যালো! কখন এলেন? খিদে পেয়েছে? খাবার দেব?
এরোজের চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো সেই গিন্নির ন্যায় আদুরে কণ্ঠে। সে বা হাতের বাহুতে চোখ মুছতে মুছতে লম্বা লম্বা কদমে এগিয়ে গিয়ে কিচেনে ঢুকলো। ব্যস্ত নারীটির সকল ব্যস্ততাকে উপেক্ষা করে তাকে টেনে পাশে থাকা টুলে বসালো। টুলে বসে মৌনতা প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে মুখ তুলে তাকালো অশ্রুভেজা মুখপানে। জিজ্ঞেস করলো,
– কী?
এরোজ নির্বাক চোখে চোখ রেখে হাঁটু গেড়ে বসল। কৌতুহলী মৌনতা প্রশ্ন ভুলে হেসে উঠল যখন বলিষ্ঠ দেহের পুরুষটি ঠিক আদুরে এক ছোট্ট পুতুলের ন্যায় তার দিকে নিজের কপাল এগিয়ে দিল। মুখফুটে একটুও বলতে হয় না আবদারগুলো।
সে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয় রুক্ষ দাড়িযুক্ত গালটি। আলতো স্পর্শে নোনাজল গুলো মুছে নিয়ে ললাট বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। ঠিক যেমন আদুরে আবদার ছিল তেমনি আদুরেভাবে মৌনতা সব নীরব আবদারগুলো পূরণ করল। একে একে দুই গাল, দুই চোখের পাতা, নাকের ডগা সহ থুতনি ছুঁয়ে গেল রুক্ষ খরখরে ওষ্ঠদ্বয়।
নীরব আবদার পূরণ করে সরে আসতেই এরোজ তার হাত চেপে ধরল। অশ্রুসিক্ত নয়ন তুলে তাকাতেই মৌনতা ভ্রু নাচালো,
– আর কী চাই?
এরোজ নিরুত্তর আবার তার কপাল এগিয়ে দিল। মৌনতা হতাশার সুরে বলল,
– আরো?
এরোজ এবারেও জবাব দেয় না ষাঁড় গরুর মতো নিজের কপাল ঠেলে দিল নারীটির ওষ্ঠপানে। মৌনতা ফিক করে হেসে উঠল তার কাণ্ডে। দু গাল চেপে ধরে বলল,
– গরুর মতো গুঁতাগুঁতির স্বভাব আপনার কবে যাবে? মুখে বলতে পারেন না?
ত্যাড়া মানুষ! মুখে বললই না। মৌনতাও নীরব আবদার নীরবেই পূরণ করল। বলল,
– হয়েছে না-কি আরো লাগবে?
জবাবে দু’টো হাত মৌনতাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিলো। বুকে একটি মাথা ঠেকতেই মৌনতা ধড়ফড়িয়ে উঠল। কর্নকুহরে আন্দোলিত হয় অদ্ভুত প্রেমময় কিছু শব্দবুনন।
এরোজ ফ্যাসফেসে কণ্ঠে বলল,
– আই উইশ, আপনার ঠোঁট সর্বক্ষণ আমার কপাল ছুঁয়ে থাকত।
মৌনতা ম্লান হেসে নিজেকে সামলে নিয়ে কম্পিত হাতে বুকে জড়িয়ে নেয় মাথাটিকে। কাঁটা কাঁটা চুলে নরম হাতের স্পর্শ পেতেই এরোজ ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকালো। ফিসফিসিয়ে বলল,
– মৌন, আপনি কী জানেন বাস্তবতা স্বপ্নের থেকেও বেশি সুন্দর? আমি কখনো আপনার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে পারব এটাই ভাবতে পারিনি অথচ আজ আপনি আমার স্ত্রী, আমি আপনার বুকে। আমরা জিতে গিয়েছি মৌন। আপনি কী শুনেছেন, আমরা জিতে গিয়েছি? আর কেউ আপনাকে আমার থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। আর কোনোকিছু আপনাকে দুঃখ দিতে পারবে না।
মৌনতা নীরবে দেখতে লাগল তার মতো একটা কঙ্কালসার মানুষকে চিরতরে পেয়ে যাওয়ার আনন্দে ক্রন্দনরত এক পুরুষকে। যেখানে সে শত চেষ্টা আর সৌন্দর্য দিয়েও একজন পুরুষকে আঁটকে রাখতে পারেনি। পুরুষ মানুষে এত ভেদাভেদ রয়েছে জানলে সে এত সহজে কখনো কাউকে ভালোইবাসত না। সারাজীবন মানিয়ে কাটিয়ে দিতো।
এরোজের বিজয় উল্লাসটুকু ওই বুকেই কেটে গেল। মৌনতা দূরে ঠেলে দিল না। দূরে ঠেলে দেয়ার কোনো কারণ, অধিকার পেল না।
– খাবেন না?
মৌনতা মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল। এরোজ চোখ তুলে তাকালো নারীটির মুখপানে। নাকে জ্বলজ্বল করা হিরের নথটি জানান দেয় নারীটি তার নামের সৌন্দর্যে সেজেছে।
মৌনতা তার দৃষ্টি অনুসরণ করে বলল,
– কেমন লাগছে আমায়?
এরোজ অশ্রুসিক্ত নয়নে চমৎকার হেসে বলল,
– একদম মিসেস এরোজ সিকদার এর মতো।
মৌনতা ঠোঁট ছড়িয়ে নীরবে হাসল। দৃষ্টি সরিয়ে বলল,
– খেয়ে নিন।
– আপনি রান্নাঘরে কেন?
মৌনতা আঁচল কাঁধে তুলে নিয়ে দূর্বল দেহ টেনে তুলল টুল থেকে। স্টোভে বসানো খাবার দেখতে দেখতে বলল,
– শুধু দেখতে মিসেস এরোজ সিকদার হলে হবে? কাজেও তো হতে হবে।
এরোজ চোখ মুছতে মুছতে বলল,
– কাজ করা লাগবে না। জীবনের অর্ধেক সময় পরীক্ষা দিতে দিতে আর অর্ধেক সময় যদি কাজ করেই কাটিয়ে দেয়া লাগে— তবে একে অপরকে ভালোবাসব কবে? বাংলাদেশ থেকে এসে হেল্পিং হ্যান্ড রাখব। আর আপনি শুধু আমাদের বাবা মেয়েকে ভালোবাসবেন। আর কোনো কাজ নেই।
মৌনতা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল তার কথায়। এরোজ গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
– আ’ম সিরিয়াস।
– পেটে ইট বেঁধে ভালোবাসব?
– একদম ভোরে উঠে দু’জন রান্নাবান্না করব। আর বাকিদিন চুপ করে বসে থাকব।
– আর আপনার জব?
– সপ্তাহে তিনদিন করব তাতেই জীবন ভেসে যাবে।
মৌনতা নীরবে হাসল বলিষ্ঠ এক সুপুরুষের সিলি সিলি কথায়।
– আমার প্রিন্সেস কোথায়?
– উপরে। নিশান্ত, নাবিলা, নিভা আর রোজের ঝগড়া দেখছে।
– ঝগড়া কেন করছে?
– নিশান্ত আর রোজ ঝগড়া করছে কিছু একটা নিয়ে। আজ ওরা সবাই এখানে থাকবে।
এরোজ লিভিং রুমে গিয়ে গলা উঁচিয়ে হাঁক ছাড়ল,
– এই বাঁদরের ছানাগুলো নিচে নাম। খেতে আয়। আমার অসুস্থ বউকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিজেরা উপরে বসে বিলাসিতা করছিস?
দুই মিনিটের মাথায় পাঁচটা মাথা রেলিং আঁকড়ে ধরে মাথা নিচু করে তাকালো। নিশান্ত চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
– ব্রো সারপ্রাইজ!
– তোর সারপ্রাইজের কাঁথা পুড়ি। এটা আমার সাধনার ফল। আমি জানতাম। নিচে নাম।
পরপরই রোজের উদ্দেশ্যে বলল,
– তুই রান্না করতে পারলি না? আমার বউ হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়েছে মাত্র।
রোজ খেঁকিয়ে উঠে বলল,
– রান্না করার ই বা কী প্রয়োজন? আমি বারণ করেছিলাম মৌনবউকে। কিন্তু সে শোনেনি। সে তার পেয়ারে লাল আর তার স্বামীর জন্য রান্না করবে নিজ হাতে।
মৌনতা আঁড়চোখে কঠিন দৃষ্টি ফেলল রোজের দিকে। এরোজ ও আড়চোখে চেয়ে বলল,
– তা নাহয় বুঝলাম। কিন্তু রান্না করার প্রয়োজন নেই কেন? খাবো কী তোর মাথা?
– কেন? আমি বাহির থেকে খাবার অর্ডার করতাম।
– এটা তুই তোর শশুরবাড়ি গিয়ে বলিস। যেই পথে নেবে সেই পথে আবার ফিরিয়ে দিয়ে যাবে তোকে।
– আমার শাশুড়ি বলেছে আমার রান্না করা লাগবে না।
– রান্না করা একটা আর্ট! সবাই পারে না। তোর মতো গর্ধব তো আরো পারবে না। নিচে নাম এখন। রান্না নাহয় করা লাগে না, কিন্তু খাওয়াও কী লাগে না?
– নামছি। এই নিশান্তকে আমার সাথে কথা বলতে বারণ করো ভাইজান। একে তো ঘটে ব্রেইন নেই উপরন্তু ও গায়ে পড়ে ঝগড়া করে।
ব্যস! এতটুকু শুনতেই নিশান্ত রেগেমেগে গেল রোজের উপর। আরো এক দফা ঝগড়া বাঁধতে দেখে এরোজ বিকট আওয়াজে ধমক দিয়ে বলল,
– সব কটাকে ঘাড় ধরে ঘর থেকে বের করে দেব কিন্তু। এরপর আগামী সাত দিনেও এই দরজা দিয়ে কেউ ঢুকতে পারবি না সেই ব্যবস্থা ও করব।
সেই হুমকিতে সকলে একটু দমলো। এরোজ তাকালো কোমরে হাত দিয়ে থমথমে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ের পানে। হাঁটু গেড়ে বসে জিজ্ঞাসা করল,
– আপনার কী হলো?
– মাম্মা আবাল কবে চলে যাবে হসপিটালে?
এরোজ স্মিত হেসে বলল,
– আর কখনো যাবে না।
নায়েলের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। সে চিৎকার করে বলল,
– সত্যি?
– হুম, আজকে থেকে মাম্মা, তুমি আমি একসাথে থাকব সবসময়।
নায়েল পিটপিট করে চাইল। বলল,
– আমলা একসাথে থাকব?
এরোজ মাথা নেড়ে সায় জানালো। দৃষ্টিতে সতর্কতা, কণ্ঠে মৃদু জড়তা। সে ঠোঁট দিয়ে জিভ ভেজায়। পাঁচ বছরের নায়েল যথেষ্ট বড়— বাবা- মা কে? এতটুকু বোঝার জন্য। সে কী তাকে আর মৌনতাকে একসাথে, একঘরে মেনে নিতে পারবে?
সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
– হুম, এখন থেকে মাম্মা, ছোট পাপা আর তুমি একসাথে থাকব, একসাথে খাবো, একসাথে ঘুরতে যাব, একসাথে তোমার স্কুলে যাব।
– ওহ ওয়াও! আমলা সব একসাথে কলব?
নায়েলের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ হলেও এরোজ চুপসে গেল ছোট পাপা শুনে। নায়েল কালে ভেদ্রে তাকে পাপা, আবার কখনো ছোট পাপা বলে ডাকে। ছোট্ট মেয়েটি যে জানে না তার গোটা জীবন বদলে গিয়েছে। তবুও সে মন খারাপ করে না। একদিন সে অবশ্যই নায়েকের ছোট পাপা থেকে পাপা হয়ে উঠবে। সে মাথা নেড়ে তাকে কোলে তুলে নিয়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। রোজ খাবার পরিবেশন করছে। মৌনতা বলল,
– নায়েল, মাম্মার কাছে এসো। মাম্মা খাইয়ে দেব।
নায়েল হাসিমুখে মায়ের কাছে চলে গেল। দীর্ঘ ছয় মাস পর মেয়ের মুখে খাবার তুলে দেয়ার সামর্থ্য হলো মৌনতার। সে তিরতির করে কেঁপে ওঠা ঠোঁট কামড়ে ধরে। জোরপূর্বক ভুলতে চায় পেছনকার সকল যন্ত্রণা এখন শুধু সুখ আঁকড়ে ধরে বাঁচবে সে।
খাওয়া শেষ হলে রোজ টেবিল গুছিয়ে নিচ্ছে। মৌনতা দেখে মনোযোগ সহকারে কাজ করতে থাকা ননদকে। বলল,
-তুমি যে বরকে ছেড়ে আমার কাছে পড়ে আছো, তাতে সে কিছু বলে না?
-বরের থেকে আমার মৌনবউ আগে আমার জীবনে সুখ হয়ে এসেছে। আমার মৌন বউয়ের জন্য এমন বরকে আমি দিনে তিনবার ভুলতে পারব।
-বরমশাই কখনো ভালোবাসা নিয়ে সন্দেহ করে না?
-আমি সকাল বিকাল রোজ নিয়ম করে তাকে ভালোবাসি না বলি। আর সে এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, সন্দেহ করার কিছু নেই।
রোজ নির্বিকার বলল।
মৌনতা ম্লান হেসে বলল,
-এটা কেমন?
-কেমন মানে কী?
-তুমি তৃশানকে ভালোবাসো না?
রোজের হাতের কাজ থেমে যায়। সে অলস দেহে ঘাড় কাত করে বলল,
-এইসব ভালোবাসায় আমি বিশ্বাস করি না। জীবন আমায় ঠিক তখন প্রাকটিক্যাল হতে বাধ্য করেছে, যখন আমার নিজের ভাই তার স্ত্রীর সাথে প্রতারণা করেছিল। তাই যে আমার সুখ, দুঃখ, যৌবন, বৃদ্ধ বয়স এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার হাত ধরে পাশে থাকবে আমি তাকেই আমার ভালোবাসা হিসেবে ধরে নেব।
-আর এই গোটা জীবন? গোটা জীবন কী ভালোবাসা ব্যতীত কাটিয়ে দেবে?
-উহু, স্রোতের সাথে তাল মিলিয়ে চলব। ভালোবাসার বিনিময়ে ভালোবাসা দেব, দুঃখের বিনিময়ে দুঃখ দেব, ঘৃণার বিনিময়ে ঘৃণা দেব, রাগের বিনিময়ে রাগ দেব।
-কখন এত কঠোর হলে?
মৌনতা আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল।
রোজ স্মিত হেসে বলল,
-যখন তোমায় মৃত্যুর সাথে লড়তে দেখেছি।
-সবাই এক হয়না রোজ।
-আমি জানি। আর জানি বলেই তাকে বিয়ে করার জন্য রাজি হয়েছি।
-সে তোমার ছোটবেলার ভালোবাসা ছিল।
-তার প্রতি ওই অনুভূতিটুকুই আমায় আজ বাধ্য করেছে তাকে বিয়ে করার জন্য।
মৌনতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডানে বামে মাথা নাড়ল। তার ছোট্ট রোজ অচিরেই অনেক বড় হয়ে গিয়েছে।
-হয়েছে আর পরিষ্কার করতে হবে না। ঘুমাতে চলো।
মৌনতা সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই রোজ পিছু ডাকল।
-মৌনবউ?
-হুঁ।
মৌনতা ফিরে তাকালো। চোখে চোখ পড়তেই রোজ মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল,
-তুমি কী ভালোবাসতে পেরেছ ভাইজানকে?
সহজ একটা প্রশ্ন অথচ মৌনতার চোখের পাতার ক্ষীণ পল্লব কেঁপে উঠল। মৌনতার দৃষ্টি চঞ্চল হতে দেখে রোজ ম্লান হাসল। তার থেকে তার মৌনবউকে কে ভালো চিনবে? ছয়টা বছর সে দেখেছে মৌনতা কাউকে কতটা নিষ্ঠার সাথে ভালোবেসেছে। সবটা ভোলা এত সহজ হলে— নারী অনুভূতিতে বলীয়ান বাক্যটি ভীষণ বানোয়াট হতো!
সে পুনশ্চঃ বলল,
-ভালোবাসতে পারোনি?
মৌনতা অস্থির দৃষ্টি ফেলে সিঁড়ির রেলিং আকড়ে ধরল। বলল,
-ভালোবাসতে পারিনি কিন্তু তারমানে এটাও নয় যে আমি সেই মানুষটাকে এখনো ভালোবাসি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, “ভালোবাসা” এত সহজ একটা শব্দ হলে আমার এই পরিণতিই হতো না।
-তবে এগুলো কী?
পুনরায় রোজের প্রশ্নে মৌনতা চোখ তুলে তাকালো। মৃদু হেসে বলল,
-আমি কাউকে জোর করতে পারি না আমার হয়ে থেকে যাওয়ার জন্য। কিন্তু যে আমার হয়ে থাকতে চায় তাকে আগলে নিতে পারি। আর আমি সেটাই করছি।
রোজ টলটলে নেত্রে বলল,
-কিন্তু ছোট ভাইজান এর থেকে বেশি কিছু ডিজার্ভ করে, মৌনবউ।
-সে গোটা আমিটাকেই ডিজার্ভ করে না, রোজ।
মৌনতা আর্তনাদের সুরে বলল।
-কিন্তু তুমি তার সুখ।
-আমি তার সুখ হয়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করছি।
-তুমি সফল হও। জীবনটা ছোট্ট মৌনবউ। যাকে ভালোবাসার তাকে মনপ্রাণ উজার করে ভালোবাসো।
মৌনতা অশ্রুভেজা নয়নে চেয়ে বলল,
-একজনকে তো বেসেছিলাম। কিন্তু বিনিময় বড্ডো ভয়ঙ্কর ছিল, রোজ।
-সেই ভালোবাসা ভুল মানুষকে জুড়ে ছিল। কিন্তু সঠিক মানুষকে ভালোবেসে তুমি বিশ্বাসঘাতকতা পাবে না মৌনবউ। ছোট ভাইজানকে ভালোবাসতে কার্পণ্য করো না।
মৌনতা নত শির মাথা নাড়ল। সে কার্পণ্য করবে না, একটুও করবে না। ভুলগুলো আঁকড়ে ধরে সুখকে পায়ে ঠেলে দেবে না। সে দ্রুত কদমে উপরে উঠে গেল।
রোজ সেদিকে চেয়ে রইল। ফোনের টোন বাজতেই তার ধ্যান ভাঙে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনের দিকে তাকায়। তাকাতেই মুখে হাসি ফুটে উঠল কারোর বাচ্চা বাচ্চা হুমকিতে।
-তুমি কেমন পাষাণ নারী! কী করে এত মাস যাবৎ তুমি আমায় ছেড়ে কানাডায় থাকতে পারো? আমি আগে জানলে, এয়ারপোর্ট থেকে তোমায় কিডন্যাপ করে নিতাম।
এবার বাংলাদেশে পা দেয়ার পরেরদিন আমি তোমায় আমার বাড়িতে তুলে নিয়ে যাব, এই বলে দিলাম। কোনো নিয়মনীতি, বাঁধানিষেধ আমি মানব না।
রোজ গা দুলিয়ে হেসে উঠল। সে তৃশানকে ঘুণাক্ষরেও জানতে দেয়নি যে—সে কানাডায় এত মাসের জন্য যাচ্ছে।
এমনিসময় এরোজ কখনো নিজের ঘরে ঢুকতে একটুও দ্বিধাবোধ করে না। কিন্তু আজ! আজ সে নিজের ঘরে পা দেয়ার ই সাহস পাচ্ছে না। নায়েল কীভাবে নেবে এতটুকুই বুঝতে পারছে না। বহুক্ষণ কড়িডরে হাঁটাহাঁটি করে এরোজ নিজের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। অনেকদিন পর মাকে পাওয়ায় আজ নায়েল মায়ের কাছেই ঘুমাচ্ছে।
সে ভয়ে ভয়ে দরজা ফাঁক করে উঁকি দিলো। সহসা একটা উল্লাসে ভরা চিৎকারে ঠিকরে আসতেই এরোজ ধড়ফড়িয়ে উঠল।নায়েল বিছানায় লাফিয়ে উঠে বলল,
-ওইতো পাপা এসেছে। এই পাপা, এসো এসো। নায়েল তোমাল আল মাম্মাল দোকান ঘলে ঘুমাব।
এরোজ ভড়কে গিয়ে মিনমিনে স্বরে বলল,
-দোকান ঘর?
-ইয়েস, দোকান ঘল। মাম্মা আল তোমাল মাঝে যে ছোট্ট জায়গা থাকবে সেটা দোকান ঘল। সেই দোকান ঘলে নায়েল ঘুমাবে আলাম কলে। এসো তালাতালি এসো।
এরোজ বড়সড় চোখ করে তাকালো। বিছানার একপ্রান্তে শুয়ে শুয়ে মুচকি মুচকি হাসতে থাকা মৌনতার চোখে চোখ পড়তেই এরোজ ভ্রু নাচালো। মৌনতা হাত নেড়ে বলল,
-চলে আসুন। নায়েল মাম্মা পাপার দোকান ঘরে ঘুমাবে।
এরোজ তখনো ভীতসন্ত্রস্ত। সে ভয়ে ভয়ে ঘরে ঢুকে দরজা আঁটকে দিল। বিছানার অপরপ্রান্তে গিয়ে বসতেই নায়েল হাত নেড়ে ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
-এখানে ঘুমাও, এখানে ঘুমাও।
এরোজ ভদ্র ছেলের মতো ঠিক সেই জায়গায় শুয়ে পড়ল। নায়েল কপাল চাপড়ে বলল,
-আআ বোকা ছেলে! আলো কাছে এসো। দোকান ঘল হয়নি তো।
এরোজ কপাল কুঁচকে আরো একটু কাছে এগিয়ে এলো। মৌনতা ঠোঁট চেপে হাসি আটকালো। এই লোক নিজের বাড়িতে, নিজের ঘরেই চোরের মতো আচরণ করছে।
নায়েল এবার বিরক্তি নিয়ে বলল,
-বোকা ছেলে বোঝে না কিছু। আলো কাছে এসো।
নায়েল এবার নিজেই এরোজকে টেনেহিঁচড়ে মাঝখানে নিয়ে আসল। মৌনতার বাহুতে বাহু লাগতেই এরোজ আড়চোখে নায়েলের দিকে তাকালো।
নায়েল হাতে তালি দিল।
-ইয়ে ইয়ে হয়েছে। এখন তোমলা হাত সলাও। আমি দোকান ঘলে ঢুকব।
মৌনতা আর এরোজ বাধ্যগত ছেলে মেয়ের মতো নিজের বাহু সরিয়ে নিতেই ছোট্ট একটু জায়গা উন্মুক্ত হলো। নায়েল এক লাফে সেখানে ধপ করে শুয়ে পড়ল। মৌনতা ঝাঁকি সামলে বলল,
-ওরে বাবাহ! আমার মা দেখি দোকান ঘরে ঝাঁপ দিয়েছে।
নায়েল খিলখিলিয়ে হেসে উঠে দোকান ঘরে ঘুমালো। এরোজ মুগ্ধ হয়ে গেল ছোট্ট মেয়েটির আদুরে ‘দোকান ঘরের’ কাণ্ডে। সে কাত ফিরে আঁকড়ে ধরল ছোট্ট উদর। মৌনতাও কাত ফিরে আঁকড়ে ধরল মেয়ের উদর।
নায়েল অতি কাছে দুটি মুখ দেখে বলল,
-দেখেছ দোকান ঘল কত্ত মজা?
এরোজ মৃদু হেসে বলল,
-তা এই মজার বুদ্ধি আমার মা পেল কোথায়?
-মাম্মা বলেছে। দোকান ঘল খুব সুন্দর! আমি এখন থেকে দোকান ঘলেই ঘুমাব সবসময়।
পরপরই ভীষণ উৎকণ্ঠা নিয়ে এরোজের দিকে তাকালো। আঙুল উঁচিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
-এই তুমি ঘুমাবে তো আমাদেল সাথে? তুমি না আসলে কিন্তু দোকান ঘল হবে না। বলো ঘুমাবে?
এরোজ যেন বিনাকষ্টে আকাশের চাঁদ পেয়ে গেল। সে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
-অবশ্যই ঘুমাব। এরপর আমরা দোকান ঘর বানাব আর তাতে আমার নায়েল ঘুমাবে। কী মজা!
-ইয়েএএ অনেক মজা!
এরোজের সাথে সাথে নায়েল ও চেঁচিয়ে বলল।
পুনরায় বলল,
-তোমলা তাকিয়ে আছো কেন? ঘুমাও ঘুমাও। এই পাপা লাইট নিভিয়ে দাও।
এরোজ হাত বাড়িয়ে লাইট নিভিয়ে দিল। ঘুমবাতির আলোয় স্পষ্ট হয় মা মেয়ের মায়াভরা স্নিগ্ধ মুখটি। এরোজের সকল দুশ্চিন্তা এক মুহুর্তে মিলিয়ে যেতেই সে নায়েলের ছোট্ট কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল।
সন্তানের জন্য বাবা মায়ের উষ্ণতা আর ভরসা হয় জান্নাত স্বরূপ। নায়েল ও আজ এমনি বাবা মায়ের উষ্ণতায় বুকভরা সুখ আর প্রশান্তি নিয়ে এক নিমিষেই ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু দুই জোড়া চোখ তখনো নির্ঘুম তাকিয়ে আছে।
এরোজ ফিসফিসিয়ে বলল,
-এটা কিভাবে সম্ভব হলো?
মৌনতা ঘুম বাতির আলোয় তাকালো ধূসর নেত্রপানে। আঁধারে কেমন জ্বলজ্বল করছে চোখদুটো। বলল,
-আমার মেয়েটা ভালোবাসার পাগল। বাবা মায়ের বাহুতে ঘুমানো তার জন্য স্বর্গীয় সুখের মতো। আগে যেগুলো তার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু কেউ একজন বলেছে, বাস্তবতা স্বপ্নের থেকেও সুন্দর। আমি এটা এখন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। বাস্তবতা অবশ্যই স্বপ্নের থেকেও সুন্দর। তাই আজ আমার মেয়েটা বাবা মায়ের উষ্ণতায় ঘুমাতে পারছে।
এরোজ ম্লান হাসল। আরো জোড়ালোভাবে আঁকড়ে ধরে নায়েলকে বুকে তুলে নিয়ে বলল,
-এখন থেকে সে সবসময় বাবা মায়ের বুকে সাথে তাদের দোকানঘরে ঘুমাবে। সব স্বপ্নগুলো দ্বিগুণ সৌন্দর্য আর সুখ নিয়ে বাস্তবায়িত হবে।
মৌনতা মৃদু হাসল তার দৃঢ় কণ্ঠে। উপহার স্বরূপ নিজেকে তুলে দিল সেই কাঙ্খিত বুকটিতে। যেই বুকটি তার জন্য এত বছর যাবৎ ছটফট করছে।
বুকের একপাশে কেউ গাল দাবিয়ে শুতেই এরোজ হকচকিয়ে দৃষ্টি নামায়। মৌনতা তার বাম কাঁধে গাল দাবিয়ে দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বাবা মেয়েকে। অনতিবিলম্বে এরোজ নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করল।
সে কী বিষ্ময়কর অনুভূতি! এরোজ এক মুহুর্তে ভুলে গেল তার দূর্বিসহ অতীত। অনুধাবন করল, পৃথিবীতে সুখী হওয়ার জন্য এর থেকে অধিক কিছুই লাগে না। ঠোঁটের কোনা ঠিকরে হাসি ফুটে উঠল অথচ চোখের কার্নিশ ভেজা। তার স্ত্রী সন্তান! ভাবতেই মা মেয়েকে আরো দৃঢ়ভাবে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো এরোজ।এবং দীর্ঘ আট বছর পর এরোজ মনে হয় আজ প্রথমবার শান্তিতে প্রাকৃতিক ভাবে দীর্ঘসময় আরামের ঘুম ঘুমালো। মস্তিষ্কে শুধু একটাই ভাবনা, সৃষ্টিকর্তার এই কৃতজ্ঞতা সে প্রকাশ করবে কোন ভাষায়?
তার ঠিক একমাস পরের গল্প। নায়েল মায়ের হাত ধরে এয়ারপোর্ট থেকে নাচতে নাচতে বের হচ্ছে। মৌনতা চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে চিরচেনা মাতৃভূমিকে। মাতৃভূমি চিরচেনা হলেও সম্পর্কগুলো আজ বড্ড ভিন্ন। একদিন এই জায়গাতেই সে দাঁড়িয়ে ছিল এক প্রতারিত মৃত্যু পথযাত্রী হিসেবে। আর আজ সে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে একজন সুখী মানুষ হিসেবে। যার একটা সুখের সংসার রয়েছে, সন্তান রয়েছে, ভালোবাসার মানুষ রয়েছে—যে তাকে চোখে হারায়। যে কি-না পুরো পৃথিবীর বিনিময়ে শুধুই তাকে চাইবে।
এরোজ বাংলাদেশে এসেছে স্ত্রী সন্তান বোন এবং খালামনিকে নিয়ে। নায়েল আর মৌনতার পি আর নিয়ে সকল সমস্যা সে অনেক আগেই মিটিয়েছে। সেই কাজ এখনো চলছে। তবে মৌনতা আর নায়েল বাংলাদেশে যেতে পারবে।
রোজের বিয়ের জন্যই মূলত এই আগমন। তবে তারা সারপ্রাইজ দিচ্ছে বাড়ির সকলকে। বাড়ির সকলকে জানিয়েছে তাদের ফ্লাইট দুদিন পর। নিশান্ত, নিভা, নাবিলা আর নায়েলের উচ্ছ্বাস এর শেষ নেই। বিশেষ করে নায়েল। সে যে তার দাদা দাদু, বড় পাপা, বড় মা, তানশান ভাইজানের সাথে থাকতে পছন্দ করে। আবার নাকি তাদের দু’টো পুঁচকে ভাই বোন ও হয়েছে।
দুপুর বারোটা। হেঁশেল থেকে শাশুড়ির হাতের রান্নার সুস্বাদু খাবারের সুঘ্রাণ ভেসে আসতেই বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা রূপকথার খিদে পেয়ে গেল। আর পড়তে ইচ্ছে হলো না।
তার আর তানশান উভয়ের পরীক্ষা হয়েছে। এমনকি তারা জিপিএ ফাইভ ও পেয়েছে। তবে তানশান বোর্ড স্ট্যান্ড করেছে। কিন্তু রূপকথা একদম টেনেটুনে জিপিএ ফাইভ। এ নিয়ে কারোর কোনো আক্ষেপ নেই বরং সবাই ভীষণ খুশি।
অসুস্থতা, নবজাতক জমজ শিশু নিয়ে সে সাহস করে পরীক্ষা দিতে পেরেছিল এতেই তপোবন সন্তুষ্ট ছিল।
ভর্তি পরীক্ষার জন্য আঁটঘাট বেঁধে প্রস্তুতি নিচ্ছে রূপকথা। দায়িত্ব বেড়েছে পর থেকে পড়াশুনার গুরুত্ব আরো বেড়েছে তার কাছে। ইদানিং সে আর পড়া চুরি করে না। বাচ্চাদের বয়স আজ সাড়ে চার মাস। কিন্তু সে খুব কমই তাদের বাড়ন্ত আচরণ অনুভব করেছে। এমনকি সংসারের দায়িত্ব ও এখন তার কাঁধে দেয়া হয় না। বাচ্চাদের সাথে তার সময় কাটানো হয় ওই দুধ খাওয়ানোর সময়। বাকি সময়টুকু তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দেয়া হয়। তাকে ডাক্তার হতে হবে।
দীর্ঘক্ষণ পড়তে পড়তে কোমরে ব্যথা অনুভব করায় রূপকথা বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়ায়। পরনে ম্যাটার্নিটি ফ্রক। বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ আসতেই সে হেঁটে যায় পাশের ঘরে। ঘরে ঢুকতেই চোখ যায় বারান্দায়। ওখান থেকেই শব্দ আসছে।
সে বারান্দায় উঁকি দিতেই মুখে হাসি ফুটে উঠল। বাবা ছেলে দু’টো পোর্টেবল বাথটাবে তাথৈ আর তাশফিনকে গোসল করাচ্ছে। বাচ্চাদের জন্মের পর থেকে এই বাবা ছেলের দিন কাটে ছোট্ট দুই দুষ্টু ছানার লালন পালনের মধ্য দিয়ে। তাকে খাবার ব্যতীত একটুও বিরক্ত করবে না। তাদের খেলাধুলা, ঘুম, কান্না সবকিছু জুড়ে শুধু তাদের বাবা আর ভাই।
বোনকে গোসল করিয়ে বাথটাব থেকে তুলতেই বোন চিৎকার করে কেঁদে উঠল। সেই বিকট চিৎকারে তানশান হতচকিত আবার বোনকে পানিতে বসিয়ে দিল। সাথে সাথেই তাথৈয়ের কান্নার বেগ থেমে গেল। বারংবার বোনের একই কাণ্ডে তানশান কাঁদো কাঁদো নয়নে বাবার পানে তাকিয়ে বলল,
-পাপা, এই পিচ্চু তো মস্তবড় অভিনেত্রী। দেখো কী করছে।
তানশান আবার বোনকে পানি থেকে তুলে দেখালো বাবাকে। পানি থেকে তুলতেই সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল। আবার পানিতে বসালেই তার কান্না থেমে গেল। তপোবন হো হো করে হেসে উঠল মেয়ের কাণ্ডে। হাসতে হাসতে ছোট ছেলেকে ভাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে বলল,
-দুষ্টু আম্মিজান আমার। ভাইকে নাও, আব্বু। আর ওকে আমার কাছে দাও।
তানশান বোনকে বাবার কোলে দিল। তবে এবার আর কাঁদল না। বাবা তার অতিশয় প্রিয় অবয়ব কি-না! যার অবয়ব আন্দাজ করলেই তার সকল কান্না থেমে যায়। সে রাতভর বাবার কলার চেপে ধরে ঘুমায়। বাবা একটু নড়লেও তার ঘুম ভেঙে যায়।
তানশান ভাইকে কোলে নিয়ে ছোট্ট একটা বাথরোব পরিয়ে দিল। ভাই একদম তার প্রতিরূপ। শান্ত শিষ্ট। কিন্তু তাথৈ একটু চঞ্চল আর দুষ্টু। তবে তাদের চোখের মনি ওই দুষ্টু।
রূপকথা মৃদু হাসল নিজের সন্তানদের ভালোবাসায় সিক্ত হতে দেখে। এই জীবনে সে যা পায়নি তা তার সন্তানেরা পাচ্ছে। এর থেকে সুখময় আর কিছুই হতে পারে না। সে গলা খাঁকারি দিল।
-আপনাদের গোসল কী এখনো হয়নি? বারোটা বেজে গিয়েছে। তাদের ঘুমের সময় হয়ে গিয়েছে।
তানশান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মায়ের পানে। বলল,
-আমরা ঘুম পাড়িয়ে দেব। তোমার কী পড়া শেষ?
-হ্যাঁ।
পরপরই এগিয়ে এসে বলল,
-ওকে আমার কাছে দাও। তুমি গোসল করে নাও এখুনি। আজ কিন্তু বড় মাছ রান্না হয়েছে। তোমার জন্য কী মাছ ভর্তা বানাব? গোসল করে ভাত খেয়ে তারপর নামাজে যাও।
-আচ্ছা।
রূপকথা ছেলেকে নিয়ে উঠতেই তপোবন মেয়েকে টাওয়ালে পেঁচিয়ে উঠে দাঁড়াল। রূপকথার পানে চেয়ে বলল,
-আমি ভর্তা বানাচ্ছি। তুমি ওদের দুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও।
-আচ্ছা।
রূপকথা ছেলেকে নিয়ে নিজের ঘরে গেল। তপোবন পিছু পিছু ঢুকে মেয়েকে রূপকথার পাশে শুইয়ে দিল। যার চোখ ছোট হয়ে আসছে ঘুমে। সে মেয়ের কপাল বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
-আমার আম্মিজানের ঘুম এসেছে খুব?
-রূপকথা ওকে একটু তাড়াতাড়ি খাইয়ে দাও তো। ও এখুনি ঘুমিয়ে পড়বে। আমার ছোট আব্বুকে আমার কাছে দাও।
রূপকথা একসাথে কখনোই দু’জনকে ম্যানেজ করতে পারে না। সে মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে ছেলেকে ঘুম পাড়াতে নিলো।
তপোবন দুই মিনিটে একটা চড়ুই গোসল দিয়ে বের হয়ে পোশাক পড়তে পড়তে বলল,
-তুমি তাড়াতাড়ি গোসল করে নিও। দেরি করলে ঠান্ডা লাগবে।
রূপকথা সায় জানায়। সিজারের পর তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে প্রচুর। একটু কিছু হলেই তা তিল থেকে তাল হয়ে যায়।
তপোবন বেরিয়ে ছেলের জন্য ভর্তা বানালো। ছোট দুই সদস্যের আগমনে ইদানিং বড় ছেলেকে খুব কম সময় দেয়া হয়। অথচ ছেলেটা ব্যক্তিত্ব, চিন্তাধারা, শরীর, উচ্চতার দিক থেকে ক্রমেই তার হাতের নাগাল ছাড়িয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে।
আর কতদিন বাবার আদুরে বাচ্চা হয়ে বাবার বুকে লেগে থাকবে, আবদার করবে কে জানে? তাই সে চায় যেটুকু সময় সন্তানদের আদর করা যায় করা উচিৎ!
তানশানের গোসলে বেশ সময় লাগে। সে ওয়াশরুম থেকে বের হতেই দেখল বাবা ভাত মেখে বসে আছে। সে অপ্রস্তুত হলো। এমন করে খাওয়া হয় না অনেকদিন। তার কণ্ঠে পরিবর্তন এসেছে। সে ভাঙা কণ্ঠে বলল,
-তুমি কেন এনেছে পাপা?
তপোবন স্মিত হেসে বলল,
-এই ভর্তাটা পাপার হাতে মাখা আর পাপার হাতে খাওয়াতেই বেশি মজা বুঝলে? নাও বসে পড়ো।
তানশান তোয়ালে শুকাতে দিয়ে এসে বলল,
-মাম্মার হাতেও এই ভর্তা মজা হয়, আর খেতেও।
-বাহ! তবে পাপার বোধহয় আর প্রয়োজন নেই। পাপা কী এনে অপরাধ করলাম?
তানশান বিরক্ত হলো।
-ওহ পাপা! সিলি আচরণ করো না।
তপোবন হেসে উঠল। ছেলের মুখে ভাত এগিয়ে দিতে দিতে বলল,
-পাপার তোমার সাথে সিলি আচরণ করতে ভালো লাগে। কিন্তু তুমি কখন যে বড় হয়ে গেলে তা আমি বুঝতেই পারলাম না। আমার তো এখনো ইচ্ছে করে তোমায় জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে, নিজের হাতে খাইয়ে দিতে, হাত ধরে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসতে। কিন্তু সবটা কত দ্রুত হাতের নাগালে বাইরে চলে গেল আমি বুঝতেই পারিনি।
বাবার মুখটি আচানক ফ্যাকাশে হয়ে যেতে দেখে তানশান মলিন হলো। মলিন মুখেই বলল,
-আমি বড় হয়ে যাইনি। তুমি চাইলেই আমায় জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পারো, খাইয়ে দিতে পারো এমনকি চাইলে আমায় কলেজেও পৌঁছে দিয়ে আসতে পারো।
তপোবনে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
-সত্যি? তুমি লজ্জা পাবে না তো?
-আমি কী মেয়ে যে কথায় কথায় লজ্জা পাবো?
-মেয়েরা কথায় কথায় লজ্জা পায়?
আচমকা বাবার এমন প্রশ্নে তানশান থতমত খেয়ে গেল। অক্ষীপটে ভেসে উঠল একটি মেয়ের পরিবর্তিত লজ্জালু আচরণ। কাঁচুমাচু করে বলল,
-অনেক মেয়েরাই করে।
-তুমি দেখেছ?
-পথে ঘাটে তো কতই দেখা যায়!
-বাহ! তুমি পথেঘাটে এখন মেয়েদের লজ্জা পাওয়াও দেখো? আমি তো জানতাম আমার আব্বু বই আর কলেজ ছাড়া কিছুই চোখে দেখে না।
তানশানের কান গরম হয়ে উঠল বাবার কথায়। তপোবন মুচকি মুচকি হাসছে ছেলেকে বিপাকে ফেলে। তানশান মিনমিনে স্বরে বলল,
-আমি এগুলো দেখিনা। মাঝেমধ্যে চোখে পড়ে। অন্ধ তো নই আমি।
-হ্যাঁ তা তো ঠিক। আমার আব্বু তো অন্ধ নয়। সে মেয়েদের লজ্জা পাওয়া দেখতেই পারে।
ফের বাবার রসিয়ে রসিয়ে বলা কথায় তানশান বিরক্তি নিয়ে তাকালো। রেগে বলল,
-পাপা! তুমি আমার সাথে মজা করছ?
তপোবন শব্দ করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল,
-মজা করছিলাম!
বাবা ছেলে অনেক দিন পর মনখুলে কথা বলল, সময় কাটালো। তারা রুম থেকে একত্রে বের হতেই অনেকগুলো গাড়ির আওয়াজ শুনতে পেল।
-একি এত গাড়ি ঢোকার আওয়াজ আসল কেন?
তপোবন ভ্রু কুঁচকে বলেই সদর দরজার কাছে গেল। বাকরুদ্ধ হয়ে গেল পরপর তিনটা গাড়ি থেকে বের হওয়া অতি প্রিয় কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত মুখ দেখে।
নায়েল বড় পাপাকে দেখতেই চিৎকার করে ছুটে আসল।
-বড় পাপা সারপ্রাইজজজ!
তপোবন অবাকের রেশ দ্রুত কাটিয়ে আঁছড়ে পড়া দেহটি কোলে তুলে নিলো।
-তপোবন কে এসেছে?
নির্জনা বেগম রান্নাঘর থেকে ধীরস্থির বেরিয়ে আসে। নায়েল চেঁচিয়ে বলল,
-নায়েল এসেছি দাদুমনি।
-নায়েল?
নির্জনা বেগম আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। হতভম্ব তানশান ছুটে গিয়ে আঁছড়ে পড়ল এরোজের বুকে। ছোট্ট তানশানকে নিজের সমান হতে দেখে এরোজ আফসোসে জর্জরিত কণ্ঠে বলল,
-আমার তানশান আমার হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
তানশান তার কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে হন্তদন্ত হয়ে বলল,
-ছোট মা কোথায়?
অতিরিক্ত জার্নিতে অসুস্থ হয়ে পড়া মৌনতা দূর্বল নেত্র খুলে তাকায়। গাড়ি থেকে মাথা বের করে হাসিমুখে বলল,
-আব্বু, এইতো আমি।
তানশান হাঁটু গেড়ে বসে তার হাত আঁকড়ে ধরল।
-তুমি ঠিক আছো ছোট মা?
মৌনতার তার গালে হাত বুলিয়ে বলল,
-ঠিক আছি। একটু ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি আব্বু। রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে।
-আচ্ছা আচ্ছা এসো রেস্ট নেবে।
সে মৌনতার হাত ধরে বের করল। চিরচেনা জমিনে পা দিতেই মৌনতার চোখে ভেসে উঠল গোটা এক বিদঘুটে জীবনবৃত্তান্ত। সেই একই বাড়ি—অথচ আজ গল্পটা কত ভিন্ন!
মুহুর্তেই সিকদার বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল গোটা পরিবারের আগমনে। নিশাত বোনকে জড়িয়ে ধরে হৈ হৈ করে বলল,
-রোজের বিয়েতে এবার অনেক আনন্দ হবে আপা। কোথায় আমার পুঁচকে দাদুভাই আর দাদুমনি কোথায়? তাদের কোলে নেয়ার জন্য আমি তৃষ্ণার্ত হয়ে বসে আছি।
ঘুমন্ত তাথৈ আর তাশফিনকে জোরপূর্বক তুলে সকলে আদর করা শুরু করল। রূপকথা সকলের সাথে দেখা করে মৌনতাকে খুঁজল। তানশান জানালো ছোট পাপা তাকে বিশ্রাম করতে নিয়ে গিয়েছে।
এরোজ মৌনতাকে নিজের ঘরে শুইয়ে দিয়ে বলল,
-বের হবেন না। শুয়ে থাকুন। ধীরে সুস্থে সবার সাথে দেখা করা যাবে।
মৌনতা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেও তার অন্তঃস্থল উদগ্রীব হয়ে আছে রূপকথার বাচ্চাদের দেখার জন্য। লোকে বলে হারিয়ে যাওয়ার পর অনুভব হয় জিনিসটি কতটা মূল্যবান। কিন্তু সে তো আজীবন অনুভব করে এসেছে, সন্তান কতটা মূল্যবান। তবে তার থেকে কেন এই ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হলো?
সে পানি খেয়ে ধীরস্থির দরজা খুলে বের হলো। বের হতেই চোখদুটো আপনাআপনি স্থির হয় ঠিক অপরপাশে থাকা বদ্ধ দরজাটির দিকে। যেন বদ্ধ ঘরটির সাথে দাফন করা রয়েছে বিদঘুটে কিছু স্মৃতি। যার দিকে তাকালেও বুকের ভেতর অসহনীয় যন্ত্রণা হয়।
সে ধীর কদমে এগিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে। কিন্তু যতই ওই ঘরটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ততই মনে হচ্ছে পুরোনো বিদঘুটে সব স্মৃতি তাকে আঁকড়ে ধরছে। সে নিজেকে সামলায়। নেই, কিচ্ছু নেই ওই ঘরজুড়ে। সবটা ঘৃণ্য স্মৃতি। সে মাথা ঝেড়ে দ্রুত কদমে ঘরটা পার হতে গেলেই আকস্মিক তার দৃষ্টি সহ পুরো দেহ থমকে গেল। রুগ্ন দেহটি কেঁপে উঠল সদ্য দরজা খুলে বেরিয়ে আসা হুইলচেয়ারটি দেখে।
হুইলচেয়ার টেনে সদ্য ঘর থেকে বের হওয়া ইমরোজের হাত থেমে যায় সম্মুখে দণ্ডায়মান নারী মূর্তির দিকে চোখ পড়তেই। দেহ সর্বশান্ত হয়ে যায় অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপতে থাকা অতি কাঙ্খিত নারীটিকে নিজের ছোট ভাইয়ের বধূরূপে দেখে। অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৪ (২)
-মৌন?
মৌন? এতটুকু শুনতেই মৌনতা তার চোখের সামনে অন্ধকার দেখতে লাগল। সে ভেবেছিল এটা তার ভ্রম! যন্ত্রণাগুলো এভাবে স্বশরীরে উপস্থিত হতেই পারে না।
কিন্তু সবটা ভুল প্রমাণিত হতেই সে আচমকা উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়ে নিচে নেমে গেল। ইমরোজ চেঁচিয়ে উঠল পেছন থেকে,
-মৌনতা?
