Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৪ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৪ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৪ (২)
তোনিমা খান

তপোবনের জীবনটা যেন এক অদ্ভুত অম্ল-মধুর কাব্য। সে যতবার জীবনে মুখ থুবড়ে পড়েছে ততবারই সৃষ্টিকর্তা তাকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বিস্ময়কর কিছু কারণ দিয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই তার থেকে তা নিদারুণ যন্ত্রণার বিনিময়ে কেড়েও নেয়া হয়েছে। এই জন্য সুখকে খুব ভয় পেতো তপোবন।
আজ যখন সে নিজেকে আরো একবার সুখী হিসেবে খুঁজে পেতে যাচ্ছিল ঠিক তখুনি তাতে আবার অসুখের ছোঁয়া লেগে গেল।
মা বাবার উপর রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ ঝাড়তে ঝাড়তে একটা সময় তপোবন নিস্তেজ হয়ে পড়ল। অনুভূতি শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে নিস্তেজ কণ্ঠে বলল,

– আম্মা, আপনি তো জানেন আমার কপালে সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আমি তো আপনাদের ভরসাতেই ওদের রেখে যাই। ভেবেছি, আপনারা যেকোনো মূল্যে ওদের দেখে রাখবেন। অথচ আপনারা আমার আমানতের খেয়াল রাখলেন না।
অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে থাকা নির্জনা বেগম মাথা নুইয়ে নিলেন। অনুতাপে জর্জরিত কৈফিয়ত দিতে গিয়েও কণ্ঠরোধ হয়ে আসল। মনে হলো, ছেলেটির এই পরিণতির কাছে সকল কৈফিয়ত গুরুত্বহীন। তকদির সিকদার ও লজ্জিত হলেন নিজের বিবেকহীনতায়।
রোজ কানাডায়। তারা সবাই এক সপ্তাহের জন্য কানাডাতে গেলেও রোজ গিয়েছিল দীর্ঘ সময়ের জন্য। এটা অনেক আগে থেকে নেয়া এক সিদ্ধান্ত ছিল। সে কিছুতেই তার মৌন বউকে ছেড়ে আসবে না।

স্টিলের বেঞ্চির এক কোনায় বসে থাকা নিলীমা নিস্তেজ, নির্বাক। তার মাঝে কোনো অভিযোগ নেই, আক্ষেপ নেই শুধু আছে সৃষ্টিকর্তার প্রতি অঢেল ভরসা। এখন আর দুঃখ তাকে ছুঁতে পারে না। বরং দেখতে চায় সৃষ্টিকর্তা তাকে ঠিক কতটা দুঃখ দিতে পারেন! সে নিশ্চিত সৃষ্টিকর্তা তাকে সেই দুঃখ সহ্য করার সহনশীলতাও দেবেন।
তপোবন নিস্তেজ দেহে স্টিলের বেঞ্চিতে বসে পড়ল। দুই হাঁটুতে কনুই ঠেকিয়ে চোখমুখ আঁকড়ে ধরে নুইয়ে পড়ল। সহসা তার চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো। তিনদিন আগেও সে তার স্ত্রী সন্তানদের ছুঁতে পারছিল অথচ আজ তারা কতটা অস্পর্শী! তার চোখের সামনে ভেসে উঠল তিনদিন আগের একটি স্নিগ্ধ মুহূর্ত।
রোজকার অভ্যাস অনুযায়ী তপোবন সেদিন ও রূপকথার স্ফিত উদরে অলিভ অয়েল মালিশ করছিল। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো তপোবন যখুনি রূপকথার উদরে হাত রাখল তখুনি একটা ছোট্ট পা ধুপ করে লাথি দিয়ে নিজের অস্তিত্বের জানান দিলো। ছোট্ট একটা পায়ের আকৃতি দেখতেই তপোবন বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। সে চকিতে ছুঁতে গেল পায়ের আকৃতিটিকে কিন্তু সাথে সাথেই মিলিয়ে গেল সেই পায়ের আকৃতিটি।
তপোবন বিস্ময়কর অনুভূতি সামলে হেসে ফেলল। এতদিন লাথি দিলেও এতটা স্পষ্টভাবে দেখা যেত না পায়ের আকৃতি।
সে চকচকে দৃষ্টিতে তাকালো মৃদু ব্যথায় কুঁচকে যাওয়া রূপকথার মুখপানে। উৎকণ্ঠা নিয়ে স্নেহভরা কণ্ঠে বলল,

– তুমি কী দেখেছো ছোট্ট একটা পা? এটা কত ছোট ছিল!
রূপকথা ব্যথা ভুলে স্মিত হেসে বলল,
– আমি আগেও একদিন দেখেছি। আপনি দেখেননি?
-নাহ, আগে তো এত স্পষ্ট দেখা যেতো না।
বলতে বলতেই তপোবন আবার তেল হাতে নিয়ে পেটে মালিশ করতে লাগল। কিন্তু আশ্চর্য কাণ্ড!
তারা অবাক হয়ে গেল তপোবন উদরে হাত দেয়ার সাথে সাথেই বেবিরা আরো একটা লাথি দিলো। রূপকথা পুনরায় আর্তনাদ করে উঠল পেট আঁকড়ে ধরে। তপোবন চকিতে মেয়েটিকে বুকে আগলে নিলো। হতবাক হয়ে বলল,
– একি আমি হাত দিলেই ওরা লাথি মারছে কেন?
পুরুষালী বুকে কপাল ঠেকিয়ে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলল রূপকথা। ধাতস্থ কণ্ঠে বলল,
– তারা তাদের বাবার স্পর্শকে চিনে ফেলেছে। তাই আপনার স্পর্শের রেসপন্স করছে।
এটা নিতান্তই রূপকথার মনগড়া রূপকথার কাহিনী। তবে সেটা ছিল ভীষণ স্নিগ্ধ! তপোবন ছলছল নেত্রে বলল,
– সত্যি? তারা বাবাকে চিনে ফেলেছে?
সেই রূপকথার কাহিনী যেন তপোবনের প্রিয় গল্প হয়ে উঠল। সে ছলছল নেত্রে রূপকথার উদর ছুঁয়ে বলল,

– এই ছানারা, আপনারা কী বাবার স্পর্শ চিনে ফেলেছেন? বাবাকে অনুভব করতে পারছেন?
তাকে অবাক করে দিয়ে বাচ্চারা মায়ের মনগড়া রূপকথার গল্পকে সত্যিতে পরিণত করে দিল পর পর আরো দুটি লাথি মেরে। হতভম্ব তপোবন চেঁচিয়ে উঠল,
– আরে আরে ওরা তো সত্যি আমায় চিনে ফেলেছে, রূপকথা।
উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেই তপোবন দ্বিগুণ আনন্দে পুনশ্চ তার উদরে হাত বুলিয়ে আলতো চুম্বন করল এবং সাথে সাথেই বাচ্চারা রেসপন্স করল আরো একটা লাথি দিয়ে। অন্যদিকে একের পর এক লাথিতে রূপকথার শোচনীয় অবস্থা! সে তেতে উঠে বলল,
– এখান থেকে সরুন তানশানের পাপা। অনেক হয়েছে। আমি ব্যথা পাচ্ছি।
বাচ্চাদের অনুভব করার আনন্দে তপোবন ভুলেই গিয়েছিল মেয়েটি ব্যথা পাচ্ছে। তপোবন থতমত খেয়ে গেল। হড়বড়িয়ে অনুতপ্ত স্বরে বলল,

– দুঃখিত দুঃখিত, আমার জান। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। আ’ম এক্সট্রিমলি স্যরি।
বলেই তপোবন রূপকথার ব্যথা কমানোর প্রয়াসে ঠিক তার উদরের মাঝ বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। কিন্তু তপোবন অনুভব করল সে আবার বোকামি করেছে। তপোবনের চেহারা কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল। চুমু দেয়ার সাথে সাথেই বাচ্চারা আবার লাথি মারল।
সে কোনা চোখে রূপকথার দিকে তাকাতেই দেখল মেয়েটি রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে বোকাসোকা হেসে স্যারেন্ডার এর ন্যায় দুইহাত জাগিয়ে দূরে সরে গেল। যেতে যেতে হড়বড়িয়ে বলল,
– স্যরি, স্যরি, আর ছোঁব না। আই প্রমিজ!
তপোবন আর ছুঁল না। আশ্চর্যের বিষয় হলো বাচ্চারাও আর লাথি মারল না। তপোবন পেছনে হাত বেঁধে ঘরময় হাঁটতে হাঁটতে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
– এ কেমন বাবাভক্ত ছানা বলোতো —যারা মাকেই ছুঁতে দেয় না।
রূপকথা শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিল। সে বই টপকে এক চোখ বের করে তাকালো বিচলিত মুখপানে। তীর্যক কণ্ঠে বলল,
– ছোঁয়ার কী প্রয়োজন?
তপোবন আশ্চর্য হলো। সে পায়চারি থামিয়ে বলল,

– আশ্চর্য! আমার বউ আমি ছুঁতে পারব না?
– আপনার বউ এখন ছানাদের মা হয়ে গিয়েছে।
– কিন্তু ছানাদের মা হওয়ার আগে সে আমার স্ত্রী।
রূপকথা ফিক করে হেসে উঠল তার বিচলন দেখে। সে রাতে ভয়তেই তপোবন আর রূপকথার কাছে যেতে পারল না। তবে ওই স্ফিত উদর ছোঁয়া আর বাচ্চাদের অনুভব করা তার দীর্ঘ আটমাসের অভ্যাস ছিল। সে অস্থিরতা দমাতেই পারছিল না।
তানশানের ঘর থেকে নিজের ঘরে আসতেই দেখল দুইপাশে অজস্র বালিশের মাঝে রূপকথা পুতুলের ন্যায় বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। এক সন্তানকে আদর করে এসে স্বভাবের তীব্রতা তপোবনকে আরো দু’জন সন্তানকে আদর করতে প্রলুব্ধ করল। নিজেকে কোনোভাবেই দমাতে না পেরে তপোবন ভয়ে ভয়ে মেয়েটির উদরে হাত বুলিয়ে দিয়ে ঠিক অবর্তবিশেষে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
আদর করেই সে সতর্ক চাহনি ফেলল। এক পল নীরবে কেটে যেতেই সে হাঁফ ছাড়ল। বাচ্চারা রেসপন্স করেনি—এই ধারণা নিয়ে তপোবন যখনি উঠতে যাবে তখুনি রূপকথা আচমকা ঘুমের মাঝে আর্তনাদ করে উঠল।
তপোবন হকচকিয়ে ফিরে তাকাতেই দেখল রূপকথা পেট আঁকড়ে ধরে ব্যথাতুর নিঃশ্বাস ফেলছে। তপোবনের ইচ্ছে হলো দেয়ালে মাথা ঠুকতে!
রূপকথা ঘুম জড়ানো রাগান্বিত কণ্ঠে বলল,

– তানশানের পাপা, আপনি আবার আমায় ছুঁয়েছেন?
তপোবনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মনে মনে আর্তনাদ করে উঠল,
– এ কেমন বাবাভক্তি?
সেই অপার্থিব সুখময় মুহূর্তগুলো আজ অচিরেই স্মৃতির পাতায় উঠে গিয়েছে। আজ পরিস্থিতি সবটা তার হাতের বাইরে। অঝোরে নীরব অশ্রু গড়াতে লাগল গাল বেয়ে। রূপকথা পা পিছলে পড়ে যাওয়ায় তলপেটে জোরে আঘাত লাগে। ফলশ্রুতিতে জরায়ুর থলি ফেটে গিয়ে ডায়ালেশন শুরু হয়। আর রক্তপাত ও হয়। যার কারণে বাচ্চাদের অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা যায়।
আধা ঘন্টার মধ্যে যদি সি সেকশন না করা হয় তবে বাচ্চারা এবং মা তিনজনের প্রাণের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। কিন্তু সৌভাগ্যের বিষয় হলো তানশান গোল্ডেন আওয়ারেই রূপকথাকে হাসপাতালে এনেছে।
কিন্তু আধা ঘন্টা, এক ঘন্টার জায়গায় এখন দুই ঘন্টার বেশি হতে চলল অথচ ও.টি থেকে কোনো খবর আসেনি। মাঝখানে দুইজন ডোনার দ্বারা চার ব্যাগ রক্ত নেয়া হয়েছে।
নীরবতা ভেঙে কেউ নাক টেনে উঠতেই তপোবন নড়েচড়ে উঠল। সে চোখের পানি গুলো আড়াল করে নিয়ে পাশে তাকাতেই দেখল এতক্ষণ যাবৎ শক্ত মুখে বসে থাকা তার ছেলেটি ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তপোবন গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। এগিয়ে গিয়ে ছেলেকে বুকে টেনে নিতেই তানশান আর্তনাদ ভরা কণ্ঠে কেঁদে উঠে বলল,

– পাপা দুই ঘন্টার বেশিহয়ে গিয়েছে ডক্টর কিছু বলছে না কেন? তুমি তো বলেছিলে সি সেকশনে এত সময় লাগে না। তবে তারা মাম্মা আর ভাই বোনের কোনো খবর দিচ্ছে না কেন? তারা কী ঠিক নেই পাপা? আমি কী তাদের বাঁচাতে পারিনি? মাম্মা আবার আমায় ছেড়ে চলে যাবে?
তানশান অসহায়ত্ব ভরা কণ্ঠে কাঁদতে কাঁদতে আর্তনাদ করে উঠল। সে কোনোভাবেই হারাতে চায় না তার ভাই বোনকে আর মাম্মাকে। এতমাস সে কত কত স্বপ্ন বুনেছে ভাই বোনকে নিয়ে। কত নাম ঠিক করে রেখেছে।
তপোবন অশ্রুসজল নয়নে ছেলেকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। ফিসফিসিয়ে বলল,
– বেবিরা একদম ঠিক আছে, আব্বু। মাম্মার ও কিচ্ছু হবে না। বেবিদের ভাইজান তাদের পাশে থাকতে তাদের কিছুই হতে পারে না। তুমি একটুও চিন্তা করো না। বেবি আর মাম্মা সবাই সুস্থ হয়ে আমাদের কাছে ফিরে আসবে।
তানশান ঘন ঘন মাথা নেড়ে সায় জানালো। অথচ তপোবনের বুক ভেঙে কান্না আসছে। কারণ সে নিজেই ভীত! ডঃ সুস্মিতা একটু আগে ভেতরে গিয়েছে। কিন্তু সেও এখনো কিছু জানায়নি।
কিন্তু এই বাবা ছেলের একাকী জীবনে রূপকথা ছিল অপরাহ্নে আঁছড়ে পড়া একছটা উজ্জ্বল আলোকরশ্মির ন্যায়। যেই আলো তপোবন আর তানশানকে ছুঁয়ে যাওয়ার পর থেকে দুঃখ কখনোই তাদের জীবনে অন্ধকার নামাতে পারেনি। আজ ও রূপকথা নামক শক্তিশালী নারীটির সাথে দুঃখ জিততে পারল না।
বাবা ছেলে যখন সুখ হারিয়ে ফেলার ভয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরছিল তখুনি ও.টি রুমের দরজাটি খুলে গেল। তপোবন তানশান চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। মুখে একগাল হাসি নিয়ে সুস্মিতা উঁকি দিয়ে তাকালো বাবা ছেলের দিকে। তপোবন দমবন্ধ হয়ে যাওয়া অনুভূতি নিয়ে বলল,

– রূপকথা আর বাচ্চারা ঠিক আছে সুস্মিতা?
– এই কারা এসেছে দেখুন তো ভাইজান।
দরজার আড়াল থেকে সাদা তোয়ালেতে মোড়া দুটি ছোট্ট দেহ দৃশ্যমান হতেই তপোবন তানশান থমকে গেল। উপস্থিত সকলের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ বের হওয়ার শোনা গেল।
এতক্ষণ পর মাথা নুইয়ে বসে থাকা নিলীমার কঠিন অবয়ব ভেঙেচুরে আসল। চোখের কার্নিশ বেয়ে অঝোরে নীরব অশ্রু গড়াতে লাগল তার ছোট্ট রূপকথাকে জীবনের সাথে লড়াইয়ে জিততে দেখে। সে দুঃখের কাছে হেরে যাওয়া একজন নারী হলেও, তার মেয়েকে সে শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তুলেছে। আজ সে সফল একজন মা। তার রূপকথা দুঃখ আর জীবনের কঠিন লড়াই সবকিছুর সাথে জিতে গিয়েছে। যেটা সে পারেনি। সে এখন নিশ্চিন্ত! কারণ সে জানে এই জীবনে আর কোনো দুঃখই রূপকথাকে কখনো ভাঙতে পারবে না।
নির্জনা বেগম হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে বললেন,

– রূপকথা আর দাদুভাইয়েরা সুস্থ সবল আছে তো, সুস্মিতা?
জবা আর মাজেদা হৈ হৈ করে উঠে বলল,
– ইয়া আল্লাহ্! আলহামদুলিল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ। আমগো চোখের মনিরা সুস্থ সবল আইসা পড়ছে। মাবুদ, তোমার দরবারে লাখ লাখ শুকরিয়া তুমি ওদের সুস্থ সবল রাখছ।
সুস্মিতা ছোট্ট দেহটিকে নিয়ে এগিয়ে আসল।‌ বলল,
– মা আর বাচ্চারা সবাই সুস্থ আছে, নির্জনা আন্টি। তবে আরেকটু দেরি হলে হয়তো বিপদ হয়ে যেতো। তানশান একটা সাহসী বাচ্চা, ভাইজান। ও যদি সাহস করে রূপকথাকে হাসপাতালে না আনত কিংবা আর দশ মিনিট দেরি করত রূপকথার জীবন সংকটে পড়ে যেতো। তানশান, ব্রাভো বাচ্চা!
পরপরই বলল,

– বাচ্চাদের অক্সিজেনের ঘাটতি পড়েছিল আন্টি। ওদের আধা ঘন্টা অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছে। এখন ঠিক আছে। এইযে আপনার মেয়ে আর ছেলে ভাইজান। ছেলে এক মিনিট আগে হয়েছে আর মেয়ে এক মিনিট পরে।
সুস্মিতা লাল টুকটুকে মুখের ছোট্ট দুটি দেহ তপোবনের দিকে এগিয়ে দিতেই তপোবন শুকনো ঢোক গিলল। বাচ্চাদের এক পলক দেখে সে পাশে থমকে বসে থাকা ছেলের পানে তাকালো। মিহি স্বরে বলল,
– ওদের আগে তাদের ভাইজানের কোলে দাও, সুস্মিতা। তারা যদি আজ সুস্থ সবল পৃথিবীতে এসেছে সেটা শুধুমাত্র তাদের ভাইজানের কারণে। আমার কোনো কৃতিত্ব নেই। তাই তাদের ভাইজান তাদের সবার আগে কোলে নেয়ার অধিকার রাখে।
সুস্মিতা চমৎকার হেসে বলল,
– একদম ঠিক কথা বলেছেন, ভাইজান। এই নাও তানশান, তোমার বোনু আর ভাই।
তানশান নিজের রক্তমাখা সাদা টিশার্ট থেকে দৃষ্টি সরিয়ে চোখ তুলে তাকায় সবার দিকে আর এক পলক তাকায় ঠিক মখমলের ন্যায় ত্বকের বাচ্চা দুটোর দিকে।
বোকার ন্যায় বলল,
– তোমরা দেখছ না ভাই-বোন কত ছোট্ট আর সুন্দর। আমার গায়ে অনেক ময়লা আর রক্ত। ভাই-বোনকে কোলে নেয়া যাবে না। জার্মস লেগে যাবে গায়ে। আপনি পাপার কাছে দিন।
জবা খলবলিয়ে উঠে বলল,

– আরে কিছু হইব না তানশান। নাও নাও ভাই বইনরে কোলে নাও।
– নাহ, ওদের জার্মস লেগে যাবে।
তানশানের একরোখা কণ্ঠ।
তপোবন অবাক হলো ছেলের কাজে। এই ছেলে দুই মিনিট আগেও ভাই বোনের চিন্তায় কুপোকাত অথচ এখন সুযোগ পেয়েও তাকে ছুতে চাইছে না শুধুমাত্র জার্মসের ভয়ে। এইতো তপোবনের আর কোনো চিন্তা রইল না। তার ছেলে মেয়েরা পুরো দুনিয়ার বুকে এখন নিরাপদ। কারণ, তাদের একজন বড় ভাই আছে। যে কোনোদিন তাদের কোনো ক্ষতি হতে দেবে না।
সুস্মিতা হেসে উঠল তার কথায়। বলল,
– আপনার ছেলে এত বুদ্ধি কোথায় রাখে ভাইজান? এইটুকুন ছেলে অথচ তার সবদিকে কত খেয়াল।
– বড় ভাই যে। বোনের খেয়াল তো তাকেই রাখতে হবে। তাই এখন থেকেই সে শুরু করে দিয়েছে।
তকদির সিকদার ছলছল নেত্রে বলে উঠলেন।
সুস্মিতা বলল,

– আচ্ছা, আমি তোমার হাত স্যানিটাইজ করে দিচ্ছি।
সুস্মিতা তার হাত স্যানিটাইজ করে দিতেই তানশান কাঁপা কাঁপা হাতে বিড়াল ছানার ন্যায় ছোট্ট দেহ দুটি দুই হাতের আজলায় নিলো। ছোট্ট নাক, ছোট্ট ঠোঁট, ফোলা ফোলা লালচে গাল যেই আদলে স্পষ্ট ফুটে উঠছে তার‌ নিজের আদল। তানশান অবাকচোখে দু’জনকে দেখছে। দু’জনকে একদম তার মতো দেখাচ্ছে। অস্ফুট স্বরে আওড়ালো,
– বোনু আর ভাই।
পরপরই ভ্রু কুঁচকে বলল,
– এই তোমরা ভাইজানকে কপি করেছ কেন?
ভাইয়ের এহেন অদ্ভুত প্রশ্নে বাচ্চাদের জবাব আসল না।
সবাই মুগ্ধ চিত্তে সম্পর্কের অদ্ভুত সমীকরণ দেখছে। ছোট্ট এই জীবনে যদি আমরা একটু সহজ, সুন্দর আর পবিত্র দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি তবে জগতে সৎ আপন বলে কোনো ভেদাভেদ থাকত না। কিন্তু তপোবন! তার সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল সে তার ছেলেকে মুক্তমনা, সুন্দর সহজ, পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি আর পবিত্র চিন্তাধারার মাঝে বড় করতে সক্ষম হয়েছে। তারা দ্বারা সৎ, আপন সবাই নিরাপদ।
পুনশ্চ কানে আসে প্রচন্ড উদ্বেগ নিয়ে বলা তানশানের আদুরে কণ্ঠ,

– তোমরা কী ঠিক আছো? একটু আগে কী খুব ব্যথা পেয়েছিলে? ভাইজান স্যরি। আমি অনেক দেরিতে এসেছি তাই তোমাদের কষ্ট পেতে হয়েছে।‌ এবার আর কোনো ভয় নেই। ভাইজান তোমাদের সবসময় নিজের কাছে রাখব। কখনো কোনো ব্যথা পেতে দেব না।
ভাইয়ের অবুঝের ন্যায় প্রশ্নে অবুঝ বাচ্চা দুটি কী বুঝল কে জানে তারাও অবুঝের ন্যায় কিছু শব্দ করে উঠল। তানশানের মুখে হাসি ফুটে উঠল। বাবার পানে চেয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
– ভাই-বোন ঠিক আছে, পাপা। দেখো তারা শব্দ করে বলছে, তারা ঠিক আছে।
তপোবন ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
– হুম, ভাই-বোন ঠিক আছে। ভাইজান থাকতে তাদের কিছু হতেই পারে না।
তানশান হেসে বাবার দিকে বোনকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
– নাও নাও কোলে নাও বোনুকে। দাদুমনি ভাইকে দেখো। কত ছোট্ট! একদম বিড়াল ছানার মতো।
তানশান বাচ্চা মেয়েটিকে তপোবনের হাতে রাখতেই তার হাতটি ঈষৎ কেঁপে উঠল। তপোবন পিটপিট করে চাইল ঘুমন্ত লালচে মুখপানে। তার মেয়ে! ভাবতেই তার ঠোঁটের কোনা ঠিকরে এক ফালি হাসি বেরিয়ে আসল কিন্তু চোখে টলটল করছে অজস্র অশ্রু। একটু প্রস্রয় পেলেই বোধহয় তারা বারিধারার ন্যায় ঝড়বে।
তপোবন ঠোঁট কামড়ে কান্না আঁটকায়। ঝাঁপসা দৃষ্টিতে ভেসে উঠল এগারো বছর আগের এমনি এক সুখময় অনুভূতির বিদঘুটে এক সমাপ্তি। তার আরো একটি মেয়ে ছিল। কিন্তু সে বাবার কোলে আসার আগেই চলে গিয়েছে। সে চোখের পানি লুকিয়ে নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে মেয়ের ললাট বরাবর আলতো ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। বাবার দেয়া প্রথম স্পর্শটা দীর্ঘ ছিল।
কিন্তু অবাধ্য নোনাজল তপোবনের বাঁধ মানল না। ছোট্ট বাচ্চাটির গালে টুপ করে এক ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ল।
সহসা বাচ্চাটি কেঁদে উঠল শব্দ করে। তপোবন সচকিত হয়। তড়িৎ মেয়ের গালটি নিজের গালের সাথে লাগিয়ে হড়বড়িয়ে বলল,

– পাপা স্যরি, আম্মিজান। পাপা আপনাকে বিরক্ত করে ফেলেছি? আপনি বিরক্ত হয়েছেন? আরেকটু ঘুমাবেন? পাপাকে একটু দেখবেন না? দেখুন আপনি কোথায় এসেছেন?
আদুরে আবদারটি বিফলে যেতে দিল না ছোট্ট নবজাতকটি। সে মোচড়ামুচড়ি করতে করতে নিভু নিভু চোখ মেলে তাকালো। মেয়ে চোখ মেলতেই তপোবন বিস্ময়কর উল্লাসে ফেটে পড়ল। নীলাভ ধূসর চোখদুটি ঠিক তানশানের অবিকল। তার, এরোজ, রোজ, নায়েল সকলের চোখ ধূসর হলেও তানশানের চোখটি একটু ব্যতিক্রম। তার চোখে নীলাভ আভা রয়েছে। সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
– আব্বু, আম্মা দেখুন বাবুর চোখ একদম তানশানের মতো হয়েছে।
তকদির সিকদার হতাশার সুরে বলল,

– এদের চোখ ও ধূসর?
তার বাবার আর তার চোখ ধূসর। যার কারণে বাড়ির সবার চোখ এমন ধূসর হবে? কী অদ্ভুত! এরমধ্যে ইমরোজ-ই শুধু ব্যতিক্রম। তার চোখ একদম তার মায়ের মতো কালো। দূর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ইমরোজ আদ্যোপান্ত তার মায়ের মতো। এমনটা না হলেও পারত! তকদির সিকদার চাপা নিঃশ্বাস ফেললেন।
তানশান ছুটে আসল বাবার কাছে।
– বোনু, চোখ মেলেছে পাপা? কই দেখি দেখি?
হ্যাঁ, একদম তার অবিকল চোখের মনি। তানশান উদগ্রীব কণ্ঠে বলল,
– আরে এই দু’জন তো পুরো আমায় কপি করেছে পাপা। কপিবাজ ভাই-বোন আমার!
তপোবন সহ সকলে হেসে উঠল। চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
– চলো, দেখি তো ভাইয়ের চোখ কেমন।
তারা ঘুমন্ত ছেলেকেও জাগালো। সকলে হেসে উঠল ছেলের চোখ ও একদম ধূসর দেখে। নির্জনা বেগম নাতিকে কোলে নিয়ে বললেন,

– তারা কী মায়ের মতো কিছুই পায়নি? পুরো ভাইজান আর বাবাকে কপি করেছে?
তপোবন স্মিত হাসল মায়ের কথায়। দৃষ্টির গভীরতা বদলায়। বাচ্চাদের দেখতে দেখতে ধিমি কণ্ঠে বলল,
– কে বলেছে মায়ের কিছু পায়নি! তাদের নাক মায়ের মতো সরু, ঠোঁট মায়ের মতো পাতলা চিকন, হাতের আঙুল ও মায়ের মতো লম্বা লম্বা। আর চুল ও মায়ের মতো ঘন আর কালো।
নির্জনা বেগমের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে নাতিকে দোল দিতে দিতে বিদ্রুপ করে বললেন,
– দেখছ তোমার বাবা তোমার মাকে কত নিখুঁতভাবে চেনে? আমরা কেউ মিল খুঁজে পেলাম না কিন্তু সে ঠিকই মিল খুঁজে পেয়েছে।
জবা ফোড়ন কেটে বলল,

– এইর জন্যই তো ভাইজান তার স্বামী।
তপোবন আচানক বেশ বিব্রত হলো। বিব্রত কদমেই সে ছেলে মেয়েকে নিয়ে অদূরে বসে অশ্রু বিসর্জন দেয়া শাশুড়ির কাছে গেল।
– আম্মা?
নিলীমা চোখ তুলে তাকালো। অশ্রুসিক্ত চোখ অথচ ঠোঁটে প্রগাঢ় হাসি। তপোবন স্মিত হেসে বাচ্চাদের নিলীমার কোলে এগিয়ে দিয়ে বলল,
– আপনার নাতি নাতনি।
নিলীমার কোল ভরে উঠল মেয়ের আমানতের দ্বারা। ফ্যাসফেসে কণ্ঠে বলল,
– তারা একদম তাদের বাবার অবিকল হয়েছে।
তপোবন স্মিত হাসল। নিলীমা ছোট ছোট অবয়বগুলো দেখতে লাগল। এই ছোট্ট অবয়বের মাঝে সৃষ্টিকর্তা কত ক্ষমতা দিয়েছে—যে তাদের মতো দুঃখি মানুষদের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জোগায় তারা। সে নাতি নাতনির ছোট ছোট হাতগুলো আঁকড়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,

– তোমরা তোমাদের মায়ের শক্তি হবে, ঠিক আছে?
নিলীমা কী জানে, তারা ছোট্ট একটি ভ্রুণ থাকাকালীন অবস্থা থেকেই তাদের মায়ের শক্তি হয়ে আসছে? দীর্ঘ নয় মাসের শারীরিক অসুস্থতার সাথে লড়াই, সংসার, পড়াশুনা, সন্তানকে আগলে রাখা, নিজের লক্ষ্যকে ধরে রাখা সবটা করেছে রূপকথা। কিন্তু তবুও তার মাতৃত্বে একটুও আঁচ লাগতে দেয়নি।
তাকদির সিকদার বললেন,
– দাদুভাইদের কানে আজান দাও তপোবন আর তানশান দাদুভাই।
তানশান বোনকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে দেখতে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল,
– আমি?
– হ্যাঁ, তুমি। কেন আজান পারো না?
– পারি। কিন্তু তুমি দাও।
তকদির সিকদার বললেন,

– আমি আজ আছি কাল নেই। এখন থেকে এই ভাই-বোন তোমার আর তোমার পাপার ই দায়িত্ব। এই মুহূর্ত থেকে তাদের সারাজীবনের দায়িত্ব তোমাদের। তাই শুরুটাও তোমাদের দ্বারাই হোক। দাও দাও আজান দাও ভাইয়ের কানে।
তপোবন মেয়ের কানে আজান দিল আর তানশান ভাইয়ের কানে। এরপর তারা প্রহর গুণতে লাগল কখন তাদের প্রিয় সুখের দেখা পাবে।
রূপকথার জ্ঞান ফিরতে পুরো একদিন লাগল। তার শারীরিক অবস্থা এতটাই নাজুক ছিল যে সে কথা পর্যন্ত বলতে পারছিল না। তবে শরীর সায় না দিলেও মাতৃত্বের হাহাকার ঠিকই বেরিয়ে আসে কণ্ঠ থেকে।
জ্ঞান ফিরতেই রূপকথা উদ্ভ্রান্তের মতো নিজের নুইয়ে পড়া উদর ছুঁয়ে দেখল। অস্থির দৃষ্টিতে এদিক ওদিক চেয়ে আর্তনাদ ভরা কণ্ঠে বলল,
– আমার ছানারা কোথায়? ওরা কী সুস্থ আছে?
পাশেই ছিল একজন নার্স যে কি-না ক্যানুলা দিয়ে দেহের ভেতরে যাওয়া রক্তের ফ্লো ঠিক করছিল। সে ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ে বলল,

– এত বিচলিত হবেন না।
সে পরবর্তী কথা বলতে পারল না তার আগেই কেবিনের দরজা খুলে প্রবেশ করল তপোবন। রূপকথা চকিতে সেদিকে তাকাতেই তার সকল বিচলন স্তিমিত হয়ে আসল বাবার দুই বাহুডোরে আরামে ঘুমিয়ে থাকা দুটি অবয়ব দেখে। তপোবন ধীর কদমে এসে রূপকথার দুই পাশে দু’জনকে শুইয়ে দিতেই রূপকথা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। অস্থির চিত্তে বাচ্চাদের মুখ ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলল,
– তোমরা ঠিক আছো?
পরপরই তপোবনের পানে চেয়ে ক্রন্দনরত গলায় বলে,
– ওরা ঠিক আছে তো তানশানের পাপা?
নার্স বেরিয়ে গেলেন। তপোবন ক্রন্দনরত মেয়েটিকে বুকে টেনে নিলো। মাথায় চুমু দিয়ে বলল,

– একদম ঠিক আছে। তাদের মা আর ভাইজান তাদের কিছু হতেই দেয়নি।
রূপকথা ফুঁপিয়ে কাঁদছে সেই দুর্বিষহ ভয়ঙ্কর মুহুর্তেগুলো মনে করে। আর্তনাদের সুরে বলল,
– আমি অনেক ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম তানশানের পাপা। ভেবেছিলাম ওদের হারিয়ে ফেলব।
আমি জিতে গিয়েছি তানশানের পাপা। আমি আমার তিনটা সন্তানকেই আজ নিজের করে পেয়ে গিয়েছি। তানশান আমায় মা বলে ডেকেছে।
তপোবন অশ্রুসজল নয়নে সত্যিকার অর্থে ছোট্ট মেয়েটিকে জিততে দেখল। মেয়েটির ললাট বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,

– এটা তোমার দৃঢ় মাতৃত্বের হক ছিল। আজ না হোক কাল পেতেই। এটা তোমার প্রাপ্য।
রূপকথা বদ্ধ নেত্রে অনুভব স্পর্শটুকু। সন্তান জন্মদানের ফলে দেহের ভেতরের সকল কষ্টগুলো যেন ওই স্পর্শটুকু শুষে নিয়েছে। সৃষ্টিকর্তা আমাদের প্রত্যেককে লড়াই করার জন্য একটা কারণ উপহার দেয়। সেখানে রূপকথার জীবনের সাথে লড়াই করার জন্য একটা নয় বরং অজস্র কারণ রয়েছে।
– তার স্বামী, তার সন্তানরা, তার মা, তার বোন—তার গোটা পরিবার যারা তাকে ভালোবাসে। তারা সবাই রূপকথার শক্তি। জীবন যতবার তার পরীক্ষা নেবে সে লড়াই করবে এই মানুষগুলোর জন্য।
নিজের দুই গালের সাথে বাচ্চাদের ছোট ছোট মসৃণ মখমলের ন্যায় গাল দুটো মিশিয়ে রেখেছে রূপকথা। তপোবন স্ত্রীর কালচে চোখের নিচ, ভাঙা চোয়াল, ভঙ্গুর দেহপানে মায়াভরা নয়নে তাকিয়ে আছে। কতটা ধকল গিয়েছে সে ধারণা করতে পারছে না। কীভাবে এই ধকল কমাবে তাও বুঝতে পারছে না।‌ মনে হচ্ছে জগতের কোনোকিছুই এই কষ্টের সুরাহা করতে পারবে না। সে বলল,

-এই বছর পরীক্ষা দেয়া লাগবে না। আগামী বছর দিও।
বদ্ধ নেত্রে নিজের অস্তিত্ব অনুভব করতে করতেই রূপকথা দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
-আমার বাচ্চারা কখনোই আমার পিছুটান ছিল না। তারা আমার শক্তি। আমি পরীক্ষা দেব। সারা বছর যা পড়েছি তাই লিখে আসব। তাতে যা রেজাল্ট আসবে আমি সন্তুষ্ট!
মেয়েটির দৃঢ় কণ্ঠে তপোবন আর কিছু বলার মতো খুঁজে পেল না। মেনে নিলো।
রূপকথা জিজ্ঞাসা করল,
– ওদের নাম রেখেছেন?
– উঁহু, তুমি রাখবে।
– কেন আপনার কোনো পছন্দ নেই?
– তোমার পছন্দই আমার পছন্দ।
রূপকথা মৃদু হাসল। তারা জানত না তাদের বাচ্চাদের জেন্ডার। বলল,
– তানশান কোথায়?
– বাইরে বসে আছে। তোমার সাথে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছে।
– ডাকুন ওকে।
তানশানকে ডাকল। কেবিনে ঢুকতেই মায়ের চোখে চোখ পড়তেই সে গাম্ভীর্যতা ভেঙে মৃদু হাসল। রূপকথা তার হাত আঁকড়ে ধরে বলল,

– চোখ মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। কান্নাকাটি করেছ?
তানশান না বোধক মাথা নাড়ল। রূপকথা কপাল কুঁচকে বলল,
– কী মিথ্যা কথা! আল্লাহ নারাজ হয় মিথ্যা বললে।
তানশান গলা খাঁকারি দিল। ভুলটা সংশোধন অরে মিনমিনে স্বরে বলল,
– আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
– হ্যাঁ, তাহলে সোজাসাপ্টা বলো যে তুমি কেঁদেছিলে।
তানশান ভ্রু কুঁচকে নিলো অসুস্থ অবস্থায় ও কেমন নাছোড়বান্দার মতো তার পিছে লেগে আছে। সে বলল,
– আমার বলা না বলায় কী যায় আসে?
রূপকথা গাল ভরে হেসে বলল,
– আমার জন্য তোমায় কাঁদতে দেখলে আমার বুকের ভেতর শান্তি লাগে।
– হাউ সিলি!
তানশান অস্ফুট স্বরে কপাল কুঁচকে বিড়বিড় করল।
রূপকথা তার কথায় পাত্তা না দিয়ে বলল,
– ওদের নাম কী রেখেছ?
– আমি রাখিনি।
– কেন?
– তুমি রাখবে বলে।
রূপকথার কর্নদ্বয় শীতল হয় তুমি সম্বোধনটুকু শুনতেই। সে বাঁকা চোখে চেয়ে বলল,

– তবে কী আমি নাম রাখব?
তানশান নীরবে মাথা নেড়ে সায় জানালো। তপোবন বুকে হাত গুঁজে মা ছেলের কর্মকাণ্ড দেখছে। রূপকথা মিটিমিটি হেসে বাচ্চাদের দেখতে দেখতে বলল,
– বোনুর নাম তবে ‘তাথৈ’ রাখা যাক। আর ভাইয়ের নাম…..উমম ওর নাম তবে ‘তাশফিন’ রাখা যাক, কী বলো?
সহসা গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা তানশানের দৃষ্টি সরু হয়ে আসল। ভ্রু কুঁচকে একাকার হয়ে গেল রূপকথাকে মিটিমিটি হাসতে দেখে।
সেকেন্ড সময়ের ব্যবধানে তানশান নিজের আশ্চর্যের রেশ কাটিয়ে তেতে উঠল মায়ের উপর,
– দিস ইজ নট ফেয়ার, মাম্মা। তুমি আমার ব্যক্তিগত ডাইরি চেক করতে পারো না। কারোর অনুমতি ব্যতীত তার ব্যক্তিগত জিনিস দেখা অপরাধ।
রূপকথা মিটিমিটি হাসি ছেড়ে এবার খিলখিলিয়ে হেসে উঠল তানশানকে রেগে যেতে দেখে। তপোবন তখনো অবুঝপানে তাকিয়ে আছে। অবুঝ কণ্ঠেই বলে উঠল,

– তোমরা কি বলছ আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
তানশান ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
– পাপা, এই নাম দুটো আমি ঠিক করে রেখেছিলাম ভাই-বোনের জন্য। আমার ডাইরিতে এই নাম দু’টো লেখা ছিল। আর সে আমার অনুমতি ছাড়া আমার ডাইরি পড়েছে।
রূপকথা ফোড়ন কেটে বলল,
-আমি পড়ব না তো কে পড়বে, টমাটু?
‘টমাটু’ শুনতেই তানশান একদম চুপসে গেল। কঠিন চোখে তাকালো মায়ের দিকে। ছেলেকে একটা শব্দে চুপ করাতে পেরে রূপকথা বিশ্বজয়ের হাসি হাসল। দুজনের নীরব দ্বন্দ্ব দেখে তপোবন না চাইতেও হেসে ফেলল। ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল,
-তোমারা দু’জন ইশারায় ইঙ্গিতে কিসের এত বোঝাপড়া করো আমি বুঝিনা। কিন্তু নাম দু’টো খারাপ না বরং ভীষণ আদুরে।
রূপকথা খলবলিয়ে উঠে বলল,

-হ্যাঁ হ্যাঁ আমার ও খুব পছন্দ হয়েছে।
-আচ্ছা, তবে আমার ছানাদের নাম হলো তানশান সিকদার, তাশফিন সিকদার আর তাথৈ সিকদার।
তপোবন হাস্যোজ্জ্বল মুখে এগিয়ে এসে ছেলে মেয়েকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বলল। তানশানের মুখেও হাসি ফুটে উঠল। সে বিগত মাসগুলোতে এই নামগুলো ঠিক করেছিল। ভাই বোন, কিংবা বোন-বোন, ভাই-ভাই যাই হোক না কেন সব নাম তার কাছে ঠিক করা ছিল। কিন্তু কখনো কাউকে বলেনি কারণ সবার নিজস্ব পছন্দ রয়েছে। কিন্তু কখনো ভাবেনি বাবা-মা তার একার পছন্দকে এতটা গুরুত্ব দেবে।
তানশান হয়তো এখনো মনস্তাত্ত্বিক ভাবে বুঝে উঠতে পারেনি, তার বাবা মা তার‌ জন্য যেকোনো পর্যায়ে নিজের খুইয়ে দিতেও কুন্ঠাবোধ করবে না। সেখানে ঠুনকো নাম কি-ই বা এমন বড় বিষয়! তানশানের আনন্দের ইয়ত্তা রইল না ভাই-বোন জুড়ে সবজায়গায় নিজের বিচরণ দেখে। তার ভাই-বোন! এতটুকুই ইদানিং তার সকল প্রশান্তির কারণ।
একে একে পরিবারের সকলে ভীড় জমালো হাসপাতালের কক্ষটিতে। সুখটুকু দেশ বিদেশের সকল প্রিয়জনদের মাঝে বেঁটে নেয়ার আনন্দে মেতে উঠল।

চিরচেনা সেই ইমরোজ সিকদার ইদানিং হারিয়ে গিয়েছে। ইদানিং নয় যেদিন থেকে ইমরোজ—মৌনতা আর নায়েল নামক সুখময় জীবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্য কারোর হতে দেখেছে সেদিন থেকে। সেদিনের পর থেকে ইমরোজ আর তরপায় না, অভিযোগ করে না, সুখের জন্য হাহাকার করে না। শুধু অস্বাভাবিক ভাবে সর্বশান্ত হয়ে গিয়েছে বুকের ভেতরে বয়ে চলা দুঃখের অতলে।
জীবন যখন শেষ আশাটুকু হারিয়ে ফেলে তখন মানুষ কেবল নিঃশ্বাসের উপর বেঁচে থাকে। ওই বেঁচে থাকায় কোনো ভালোবাসা, সুখ, আনন্দ, চাওয়া পাওয়া, চাহিদা, অনুভূতি কিছুই থাকে না। ইমরোজ ইদানিং এমনি এক অনুভুতিহীন জড়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। যার মধ্যে কোনো চাওয়া পাওয়া কিংবা বাঁচার তাগিদ নেই। দুঃখের ভার যে এতটা বিদঘুটে তা কখনোই ভাবেনি ইমরোজ। কিন্তু যখন বুঝল, তখন সব শেষ!
হোটেলের কালো কুচকুচে কাঠের বেঞ্চিতে বসে‌ থাকা ইমরোজ ধ্যানচ্যূত হলো হ্যাংলা পাতলা ছেলেটা দু’টো পরোটা আর ভাজি সামনে রাখতেই। খাবারগুলো দেখতেই গলায় তীক্ত স্বাদ জন্মালো। এগুলো সে খেতে পারে না। কিন্তু তবুও তাকে খেতে হয়। ঠিক যেমনটা এই বিদঘুটে জীবন সে বয়ে চলতে পারছে না, তবুও তাকে বয়ে চলতে হয়।
ভীষণ অনীহা সত্তেও ইমরোজ খাবার মুখে নেয়। তন্মধ্যেই ফোনের টোন বাজলো। সাথে সাথেই তার বুকটা কেঁপে উঠল। ইদানিং ফোনটি জানান দেয় সে পৃথিবীতে কত একা! জগতে সবাই কত সুখী অথচ তার সব থেকেও নেই।
সে বড্ড সাহস করে ফোনটা অন করল। বড় ভাইজানের জমজ সন্তান হয়েছে। পরিবারের সকলে অভিনন্দন জানাচ্ছে, একসাথে গ্রুপ কলে আড্ডা দিচ্ছে তার ছবিও সেখানে রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে সে কোথায়?
এই এক প্রশ্ন মনে জাগতেই আর খাবার গিলতে পারল না ইমরোজ। গলায় দলা পাকিয়ে যাওয়া দুঃখদের নীল ব্যথা বাড়তেই সে হাত মুছে খাবারটা দূরে ঠেলে দিল।
ইমরোজকে খাবার না খেয়ে বেরিয়ে যেতে দেখে হ্যাংলা পাতলা ছেলেটা ভ্রু কুঁচকে বলল,

-খাওন খাইবেন না, ভাইজান?
-নাহ, খিদে মরে গিয়েছে। এই নাও টাকা।
সে বিল শোধ করে অলস দেহে বেরিয়ে আসে হাইওয়েতে। দৃষ্টি গন্তব্যহীন। তার যাওয়ার জায়গা নেই। তাকে ভালোবেসে আগলে নেয়ার মানুষ নেই। সে বেঁচে আছে কি-না এতটুকু জিজ্ঞেস করার ও মানুষ নেই এই সুবিশাল পৃথিবীতে। তাই সে এমন এক গন্তব্য বেছে নিলো যেখানে জীবনের হিসাব নিকাশ শেষে সবাইকে যেতেই হবে।
হোটেলের হ্যাংলা পাতলা ছেলেটা বড় চাকতিতে ব্যস্ত হাতে পরোটা ভাঁজছিল। ভাঁজতে ভাঁজতেই আনমনে রাস্তার দিকে তাকালে তার ভ্রু কুঁচকে গেল একটা ইজি বাইক আর দ্রুতগামী প্রাইভেট কারের অস্বাভাবিক সংঘর্ষে। সেকেন্ড সময়ের ব্যবধানেই তার চোখদুটো বড় বড় হয়ে গেল প্রাইভেট কারের নিচে একটা লোককে পড়তে দেখে। ছেলেটি হাতের পরোটা ছুঁড়ে মেরে চেঁচিয়ে উঠল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৪

-আরে এই ভাইজান!
বলেই ছেলেটি উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে লাগল রাস্তার দিকে। লোকটা তো বলেছিল, তার খাওয়ার ইচ্ছা মরে গিয়েছে। কিন্তু বাঁচার ইচ্ছাও যে মরে গিয়েছে— তা তো বলেনি।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here