Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৪ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৪ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৪ (২)
তোনিমা খান

নিলীমা টলমলে পায়ে ছুটে আসে। উদভ্রান্তের মতো ওয়াহেদের গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে সে। অস্ফুট স্বরে বলে,
—”আ… আপনি ঠিক আছেন? কী হয়েছিল আপনার? কোথায় ছিলেন এতগুলো বছর? সেই যে সকালে কাজে গেলেন, আর তো ফিরলেন না। সেই রাতের পর থেকে কতগুলো বছর আমি আপনার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে আছি, জানেন? আপনার শরীর ঠিক আছে তো? আপনার সঙ্গে নিশ্চয়ই খুব খারাপ কিছু ঘটেছিল? দেখি, কোথায় আঘাত পেয়েছেন? খুব কষ্ট হয়েছে, তাই না?”
নিলীমা উন্মাদের মতো ওয়াহেদের গাল আর গলা ছুঁয়ে দেখছে, কোথাও কোনো ক্ষতের চিহ্ন আছে কি না! চোখেমুখে বছরের পর বছর জমে থাকা তৃষ্ণা। কিন্তু যতোই ছুঁয়ে দেখুক, তার অস্থিরতা যেন কিছুতেই মিটছে না।
ওয়াহেদ শুকনো ঢোক গিলল। কাঁপা হাতে নিলীমার অস্থির হাত দুটো নিজের মুঠোয় পুরে নিল। ক্ষীণ স্বরে বলল,

—”আমি ঠিক আছি…”
ওয়াহেদ কথাটি শেষ করতে পারল না। দালান থেকে ফ্রক পরা ছোট্ট একটি মেয়ে ছুটে আসতেই সে থমকে গেল। মেয়েটি এসে নিলীমাকে আগলে ধরে বলে উঠল,
—”আম্মা, কী হয়েছে তোমার? এমন করছ কেন?”
মেয়েটিকে আপাদমস্তক দেখে ওয়াহেদের বুকটা কেঁপে উঠল। চোখের সামনে ভেসে উঠল এক বছর বয়সে ফেলে যাওয়া সেই ছোট্ট মুখটি। সময়ের নিষ্ঠুরতায় সেই আদল আজ বদলে গেছে। অনুতাপ আর অসহায়ত্বের আর্তনাদে ওয়াহেদের চোখ জোড়া লাল হয়ে এল, কিন্তু তা প্রকাশ করার কোনো অধিকার তার নেই। কী নিদারুণ অসহায়ত্ব!
নিলীমা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে তাকায় মেয়ের পানে। অস্থির কণ্ঠে বলে ওঠে,
–“তারা? এই দেখ আল্লাহ ম্যাজিকের মতো তোর বাবাকে পাঠিয়ে দিয়েছে। তুই এমন ম্যাজিকের অপেক্ষা করতি না? এই দেখ তোর বাবা ফিরে এসেছে। আমি জানতাম তোর বাবা জীবিত থাকলে ফিরবেই।”
শুকতারা অবাকপানে তাকায় মায়ের তাক করা তর্জনীর দিকে। আঁখিদ্বয়ে উল্লাস ছুঁয়ে যায় সর্বদা ঝাঁপসা একটা ছবিতে দেখা মানুষটাকে সামনাসামনি দেখে।
ছোট্ট শুকতারা তখন এক বছরের দুধের শিশু যখন বাবা নামক ছায়া সরে যায় তার মাথার উপর থেকে। সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,

–“উনিই আমাদের আব্বু, আম্মা?”
–“হুঁ, তোর আব্বু। আয় কাছে আয়।” নিলীমা অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে বলেই মেয়েকে বাবার কাছে টেনে নিলো। ওয়াহেদের চোখ বেয়ে টপটপিয়ে কয়েক ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ল জীবনের নিষ্ঠুরতায় যে সে মূল্যবান কিছু মুহুর্ত আর অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছে।
সে নিলীমার পানে চেয়ে খানিক বিস্ময় নিয়ে বলল,
–“শুকতারা?”
নিলীমা ঘন ঘন মাথা নেড়ে হাসিমুখে বলল,
–“হুঁ, আপনার সেই ছোট্ট রসগোল্লা!”
ওয়াহেদ কাঁপা হাত বাড়িয়ে শুকতারার গাল ছুঁয়ে দিল। জন্মের পর মেয়েটি এত স্বাস্থ্যবান ছিল যে, সে আদর করে ‘রসগোল্লা’ ডাকত। সে বিড়বিড় করে বলল,
—”শুকতারা? আমার সেই ছোট্ট শুকতারা?”

বলতে বলতেই ওয়াহেদ শব্দ করে কেঁদে ফেলল এবং মেয়েটিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। ধরা গলায় বলল,
—”নিলীমা… ও কত বড় হয়ে গেছে! আমার সেই ছোট্ট মেয়েটা… আমি কত কিছু হারিয়ে ফেললাম, নিলীমা!”
নিলীমা তখনো একহাতে ওয়াহেদের শার্ট আঁকড়ে ধরে আছে, যেন হাত ছাড়লেই সে আবার অদৃশ্য হয়ে যাবে। সে চোখ মুছছে ঠিকই, কিন্তু আনন্দের এই প্লাবন যেন বাঁধ মানছে না। সে বলল,
—”সব হারাক, তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। আপনি ফিরে এসেছেন, তাতেই হবে। আমার মেয়েটা রোজ জাদুর প্রার্থনা করত, জানেন? আব্বু আসলেই তাদের সব দুঃখ দূর হয়ে যাবে। আজ আল্লাহ তার প্রার্থণা কবুল করে নিয়েছে। আপ…আপনি ফিরে এসেছেন সহিসালামত। ওয়াহেদ চলুন ভেতরে চলুন। এই তারা বাবাকে ঘরে নিয়ে চল। কোন অবস্থা থেকে ফিরেছে কে জানে! ঘরে গিয়ে সব শুনব আমরা।”
নিলীমা একপ্রকার টেনে ওয়াহেদকে ঘরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেন পুরো পৃথিবী থেকে তাকে লুকিয়ে ফেলার তাড়া। বাবার বুকে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শুকতারা এবার সরে দাঁড়াল। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে যার জন্য এত স্বপ্ন বুনেছে, সেই বাবা যখন সামনে এল, তখন এক অদ্ভুত জড়তা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। ‘বাবা’ যেই ডাকটির মাঝে এক সমুদ্র ভালোবাসা থাকে, শুকতারা তা অনুভব করতে পারছে না। দীর্ঘ বিচ্ছেদে সেই অনুভূতির সুতোটা যে ছিঁড়ে গেছে।

ওয়াহেদ একদৃষ্টিতে এই অস্থির নারীটিকে দেখছে। তার ফেলে যাওয়া সেই সজীব নিলীমা আর নেই। জীবনের কঠিন যুদ্ধে লড়ে যাওয়া এক বিধ্বস্ত ও ভঙ্গুর প্রতিচ্ছবি যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে।
ঘরে ঢুকেই নিলীমা হুড়মুড় করে দরজা-জানালার খিল তুলে দিল। তারপর হন্তদন্ত হয়ে ওয়াহেদের কাছে ফিরে এল। প্রবল উত্তেজনা নিয়ে বলল,
—”কথার আব্বু, আপনি একটু বসুন তো। আমি কথাকে ফোন করে জানাই। ও তো খুশিতে পাগল হয়ে যাবে! হয়তো এই রাতেই ছুটে আসবে।”
বলেই নিলীমা হঠাৎ থামল। সে পা থামিয়ে ফিরে তাকায় ওয়াহেদের অনুভূতি শূন্য মুখপানে। আবার ছুটে গেল তার কাছে। মিহি স্বরে বলল,
–“আপনাকে তো বলাই হলোনা, আমি কথার বিয়ে দিয়েছি। একা মেয়ে মানুষ পেয়ে চারিদিকের সবাই খুবলে খেতে চাচ্ছিল আমার মেয়েটাকে। আমি মা হয়ে চোখের সামনে এসব দেখতে পারি বলুন? তাই বিয়ে দিয়ে দিয়েছি জোর করে। আপনার মেয়ে খুব অভিমান করেছিল কিন্তু এখন সে খুব সুখী জানেন। আপনার মেয়েটা খুব বুঝদার। মায়ের থেকেও বেশি মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা তার। আমি ঠিক করেছি না বলুন?”
জবাবের অপেক্ষা না করেই সে আবার ফোনের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু ওয়াহেদ তার হাত ধরে ফেলল। নিলীমার শীর্ণ হাতটি মুঠোয় নিয়ে সে আলতো করে ডাকল,

–”নিলীমা?”
–”জি, বলুন।”
–”একটু বসো আমার কাছে। কথাকে পরে বলো। আমি আর কোথাও হারিয়ে যাচ্ছি না।”
ওয়াহেদের কথায় নিলীমার চোখেমুখে প্রশান্তির আভা ফুটে উঠল। সে ধরা গলায় বলল,
—”আমি জানতাম আপনি আর হারাবেন না। আমি আপনাকে আর হারাতে দেবই না। একটু বসুন, আমি ওকে জানিয়ে আসি। মেয়েটা আপনার জন্য কত ছটফট করেছে!”
ওয়াহেদ শুকনো ঢোক গিলল। এই মায়াবী মুহূর্তটা সে নষ্ট করতে চায় না, কিন্তু নিলীমাকে আর অন্ধকারে রাখা সম্ভব নয়। সে শান্ত গলায় বলল,
–”কথা জানে।”
নিলীমা অবাক হয়ে থমকে দাঁড়াল।
–”কথা জানে মানে?”
ওয়াহেদ মাথা নেড়ে বলল,
–”হুঁ। আমি রূপকথার সাথে দেখা করেছি।”
–”সত্যি? কী বলল কথা? নিশ্চয়ই আপনাকে দেখে পাগলের মতো করেছে তাই না?”
পরক্ষণেই নিলীমার মনে সংশয় জাগল। সে কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল,

–”কিন্তু কথার সাথে আপনার দেখা হলে ও আমায় কিছু জানায়নি কেন?”
শুকতারা ঘরের এক কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাবাকে ঘিরে মনের ভেতর এক দুর্ভেদ্য দেয়াল থাকলেও, সে অপলক দৃষ্টিতে মায়ের আনন্দ দেখছে। মাকে সে কখনো এতটা খুশি হতে দেখেনি; নিলীমা যেন ছোট বাচ্চাদের মতো ছটফট করছে।
ওয়াহেদ কোনো উত্তর দিল না। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–”এখানে বসো নিলীমা। শুকতারা? আম্মা, বাবার কাছে আসবে না?”
নিলীমা পাশে গিয়ে বসল। শুকতারাও মন্থর পায়ে বাবার পাশে এসে বসল। ওয়াহেদ অনেক সাহস সঞ্চয় করে মেয়েটিকে আবারও বুকে টেনে নিল। নিলীমা ঠোঁট কামড়ে উপচে পড়া কান্না আটকানোর চেষ্টা করছে। দশ বছর যাবৎ যেই স্বপ্নগুলো দেখতো আজ সেগুলো বাস্তব। তার মেয়েটা বাবার আদর পাচ্ছে। আর কোনো ভয় নেই, এবার তার মেয়েটাও আগের মতো বাবার ছায়াতলে বড় হবে। কেউ তাকে ‘বিধবা’ বলে সম্বোধন করবে না। কেউ তার মেয়েদের বাপ ছাড়া মেয়ে বলবে না।
ওয়াহেদ ঘরটি খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে শুধাল,

–”তোমরা এখানে কবে থেকে থাকো?”
–”কথার বিয়ের পর থেকেই।”
নিলীমা দুহাতে চোখ মুছতে মুছতে বলল,
–”কথার আব্বু, আপনি নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত? একটু শুয়ে নিন। আর বলুন, আপনার জন্য কী রাঁধব? কী খেতে ইচ্ছে করছে আপনার?”
ওয়াহেদ ক্লান্ত চোখে তাকাল। মিহি স্বরে বলল,
–”কিছু খাব না, আমি ক্লান্ত নই। তুমি বসো নিলীমা, কিছু কথা আছে।”
নিলীমা হাসিমুখে বলল,
–”কথা তো হবেই, সময় কি আর ফুরিয়ে যাচ্ছে? আগে বলুন কী খাবেন। আপনার জামাইয়ের সাথে কি দেখা হয়েছে? মানুষটা ভীষণ ভালো!”
ওয়াহেদ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
–”দেখা হয়েছে। কিন্তু নিলীমা, আমার রূপকথার কি এমন জীবন প্রাপ্য ছিল? তুমি এমন একজনের সাথে মেয়েটার বিয়ে দিলে, যার নিজেরই চৌদ্দ বছরের একটা ছেলে আছে!”
নিলীমার মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে অসহায় কণ্ঠে বলল,

–“বাবা ছাড়া হতদরিদ্র এক মায়ের মেয়েকে বিয়ে করার জন্য তৎক্ষণাৎ একটা সম্ভ্রান্ত পরিবারের ভালো ছেলে পাওয়া আমার জন্য মুশকিল ছিল, কথার আব্বু। অথচ চারপাশে সবাই ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ওঁত পেতে বসেছিল আমার মেয়েটার সর্বস্ব শেষ করার জন্য। ভয় আর অসহায়ত্বে আমি রাজী হয়ে যাই তাদের প্রস্তাবে।”
ওয়াহেদের মাথাটা লজ্জায় নুয়ে পড়ল। কথা বলার নূন্যতম শক্তিটুকুও যেন সে হারিয়ে ফেলল। নিজের কাপুরুষতার কথা ভেবে শরীরটা অবশ হয়ে আসছে। তার মনে হলো, এই ত্যাগী, শক্তিশালী নারীটির সামনে দাঁড়িয়ে থাকার যোগ্যতাও তার নেই।
নিলীমা তাকে বিমর্ষ দেখে প্রবোধ দিয়ে বলল,

–“আপনি একটুও মন খারাপ করবেন না। আপনার মেয়ে এই খুঁত যুক্ত জীবনেই খুব সুখে আছে, কথার আব্বু। তপোবন সিকদার মাটির মানুষ, সবসময় আমার কথাকে আগলে রাখে। শুধু কথাকেই না আপনার এই ছোট মেয়েকেও আগলে রাখে। ওর জন্য ঘর ভরিয়ে দেয় খাবার আর অপ্রয়োজনীয় জিনিসে। প্রতিদিন ফোন দেবে, খোঁজ নেবে। কিছু করতে না করলেও শুনবে না, বলবে আমাদের ভাই বোনের মাঝে আসবেন না।
আর তার ছেলেটা, আপনার নাতি সে সারাদিন তার মিমির পাছে পাছে ঘোরে। মিমিকে ছাড়া তার দিন চলে না। চিন্তা করবেন না রূপকথা ভালো আছে। হয়তো এটাই ওর জন্য মঙ্গলজনক ছিল।”
ওয়াহেদ শুকনো গলায় বিড়বিড় করল,
–”হয়তো।”
নিলীমা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই বাইরে থেকে কারো ডাক শোনা গেল।
–”স্যার? ওয়াহেদ স্যার?”
নিলীমা চমকে বন্ধ দরজার দিকে তাকাল। শুধাল,

–”কে ডাকছে আপনাকে?”
–”হয়তো ড্রাইভার। তোমরা বসো, আমি আসছি।”
ওয়াহেদ দরজা খুলে বের হয়। পেছনে নিলীমাও এল। দালানের সামনে একটি বিলাসবহুল গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ওয়াহেদ গাড়ির কাছে যেতেই মালেক বলল,
–”স্যার, গাড়িটা কোথায় রাখব?”
–”ডান পাশে জায়গা আছে, ওখানে রাখো।”
–“কেউ যদি কিছু বলে?”
–“কিছু বলবে না, তুমি রাখো।”
রাজ্যের কৌতূহল নিয়ে নিলীমা পাশে এসে দাঁড়াল। গাড়িটি দেখে কাঁপা গলায় শুধাল,
–”এটা কার গাড়ি, কথার আব্বু?”
ওয়াহেদ মৃদু চমকে পাশে ফিরে তাকায়। খানিক সময় আর সাহস নিয়ে বলল,
–“আমার।”
নিলীমা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল।

—”আপনার? এত দামি গাড়ি আপনার?”
ওয়াহেদ তাকায় হঠাৎ শুকনো হয়ে যাওয়া উচ্ছ্বসিত মুখপানে। উচ্ছ্বাস ধীরস্থির মিলিয়ে যাচ্ছে। বলল,
–“ঘরে চলো সব বলছি।”
নিলীমা গাড়িটি দেখতে দেখতে যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো ঘরে ফিরল। ওয়াহেদের বিবর্ণ মুখ দেখে তার বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল। সে গলা মুছে শুধাল,
–”বললেন না তো আপনি কোথায় ছিলেন? কী হয়েছিল আপনার সাথে?”
প্রশ্নবিদ্ধ মুখপানে একদৃষ্টিতে চেয়ে ওয়াহেদ ক্ষীণ স্বরে বলে উঠল,
–“আমি হারিয়ে যাইনি, নিলীমা। আমায় হারাতে বাধ্য করা হয়েছিল।”
–”কে বাধ্য করেছিল? আপনার তো কোনো শত্রু ছিল না!”, ঘেমে ওঠা গাল গলা মুছতে মুছতে শুধায় নিলীমা।
–”অপারেশনের জন্য অফিসের বসের কাছ থেকে নেওয়া সেই ছয় লাখ টাকাই আমার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।”
নিলীমা অস্থির হয়ে বলল,

–”আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। পরিষ্কার করে বলুন।”
মায়াভরা মুখপানে একদৃষ্টিতে চেয়ে ওয়াহেদ বুকভরা সাহস সঞ্চার করে। হয়তো কিয়ৎকাল বাদ এই মুখটিতে এই মায়া আর ভালোবাসা থাকবে না। তবুও সে বলতে শুরু করল দশ বছর আগের সেই দিনটির কথা। যেই দিনটির পর থেকে স্বামীর আকস্মিক হারিয়ে যাওয়ায় একটু একটু করে নিলীমার জীবন বদলে যেতে থাকে।
দীর্ঘ বিশ মিনিট! দীর্ঘ বিশ মিনিটের কঠিন কঠিন শব্দের বুনন গুলো শুনে নলীমা দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল। চোখের সামনে হঠাৎ সবটা ঝাঁপসা হয়ে আসতেই নিলীমা ঢলে পড়তে নিলো। ওয়াহেদ দ্রুত আগলে নিলো তাকে।
অপ্রস্তুত ভারসাম্যহীন হয়ে পড়লেও নিলীমা এক ঝটকায় নিজেকে ওয়াহেদের বাহুডোর থেকে সরিয়ে আনে। সহসা তাল হারিয়ে মেঝেতে পড়ে যায়।
ওয়াহেদ অশ্রুসিক্ত নয়নে মৃদু আর্তনাদ করে উঠল,

–“নিলীমা।”
নিজেকে সামলে নিয়ে নিলীমা দ্রুত হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিল। ঘৃণামিশ্রিত কণ্ঠে আর্তনাদের সাথে বলে উঠল,
–“ছোঁবেন না, ছোঁবেন না। আপনার গায়ে অন্য নারীর স্পর্শ! দূরে সরুন, দূরে সরুন।”
ওয়াহেদের দেহ স্তিমিত হয়ে এলো। এগিয়ে যাওয়া হাত দুটো ভীষণ লজ্জার সাথে গুটিয়ে গেল। নিলীমার ধাতস্থ হতে অনেক সময় লাগল, অনেকটা সময়। নিজের সবটুকু দিয়ে কাউকে ভালোবাসার পর যখন বিদঘুটে এক সত্য সামনে আসল তখন সেটা তার অন্তঃস্থল মানতে নারাজ!
দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকা ঘামে জবুথবু নিলীমা চোখ খুলে তাকায় সম্মুখে দণ্ডায়মান নিজের অর্ধাঙ্গের দিকে।
একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। নিগুঢ় চোখে আপাদমস্তক দেখতে দেখতে বলে ওঠে,
–“কথার আব্বু….না না ভুল হয়ে গেল। কী বলে সম্বোধন করব আপনাকে? বুঝতে পারছি না। আমি বরং আপনাকে মিঃ ওয়াহেদ বলে ডাকি। হ্যাঁ হ্যাঁ এটা ভালো শোনাচ্ছে, আপনার সাথে মানাচ্ছে।”
ওয়াহেদ অসহায় স্বরে বলল,

—”নিলীমা, আমার পরিস্থিতিটা একটু বোঝার চেষ্টা করো…”
নিলীমা তার কথার কোনো ভ্রুক্ষেপ করল না। সর্বহারা দৃষ্টিতে চেয়ে শুধায়,
–“মিঃ ওয়াহেদ, বিয়ে করেছেন?”
ওয়াহেদ নিশ্চুপ। নিলীমা এবার কঠোর স্বরে আবারও শুধাল,
–”বিয়ে করেছেন?”
–”আমি বাধ্য হয়েছিলাম নিলীমা…”
কী অদ্ভুত জবাব! নিলীমা গা দুলিয়ে হেসে উঠল। চোখ দিয়ে অনবরত নোনাজল গড়িয়ে পড়ছে অথচ ঠোঁটের কোনে বিদ্রুপের হাসি। শুধায়,
–“সন্তান ও আছে?”
–“হুঁ।”
–“বয়স কত?”
ওয়াহেদ নিরুত্তর। নিলীমা চিৎকার করে উঠল,
–”বয়স কত?”
–”দশ বছরে পড়েছে,” ওয়াহেদ মাথা নিচু করে জবাব দিল।
–”দশ বছর! বাহ, মোটেও সময় নষ্ট করেননি। নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে একটা উত্তরাধিকারী তো দরকার ছিলই,” নিলীমা বিড়বিড় করল।
পরক্ষণেই তীব্র ঘৃণা নিয়ে বলল,

–”নিঝাম তো খুব সুন্দরী। আর অনেক বিত্তবানও বটে। আপনি এখন সেই কোম্পানির মালিক, তাই না? যেখানে পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের কর্মচারী ছিলেন, সেখানে আজ লাখ লাখ টাকা আয় করেন। সুখের তো কমতি নেই আপনার তাই না?”
ওয়াহেদের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
–”নিলীমা?”
নিলীমা চোখ তুলে তাকায়। অবোধ শিশুর ন্যায় তোতলাতে তোতলাতে বলে,
–”আ…আমার নাম ধরে ডাকবেন না! আপনার মুখে নিজের নাম শুনতে কেমন যেন গা ঘিন ঘিন করছে। আমি আপনাকে কোনো দোষ দিচ্ছি না। বিপদে পড়ে যদি এমন রাজত্ব আর সুন্দরী স্ত্রী পাওয়া যায়, তবে হয়তো আমিও এমন কোনো ফালতু অযুহাত দিয়ে দশ বছর কেন চিরকাল লুকিয়ে থাকতাম। আপনি একদম ঠিক করেছেন। কিন্তু আজ এই দশ বছর পর অট্টালিকা ছেড়ে আমাদের মতো কাঙালের ঘরে কেন ফিরে এলেন?”
ওয়াহেদ হাঁটু গেড়ে বসল সেই বিধ্বস্ত নারীটির সামনে। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে নারীটি আনন্দে ডানা মেলছিল, এখন সে এক জীবন্ত লাশ। পুরুষ মানুষ কত অবলীলায় কারো সবটুকু কেড়ে নিতে পারে!
ওয়াহেদ ক্ষীণ স্বরে বলল,

–”আমার টাকার লোভ কোনোদিন ছিল না। আমার অবস্থাটা একটু বোঝার চেষ্টা করো, প্লিজ।”
নিলীমা উন্মাদের মতো মাথা নেড়ে বলল,
–”আমি আপনার পরিস্থিতি বুঝতে পারছি তো, মিঃ ওয়াহেদ। বিপদে পড়ে আপনি এক রাজ্যের রাজা হয়ে গেলেন, তখন আর এই প্রজার কথা মনে পড়েনি। সব বুঝেছি আমি!”
–”তুমি ভুল বুঝছ নিলীমা।”
–”ভুল বুঝছি? আপনিই বলুন, পৃথিবীতে এমন কোনো বাবা আছে যে সামান্য হুমকির ভয়ে তার এক বছরের দুধের শিশুর খোঁজ নেয় না দশটা বছর? সে তো নিজের প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে হলেও সন্তানের ছায়া হতে চাইত। অথচ আপনি স্রেফ হুমকির ভয়ে নিজের সাজানো সংসার ভুলে থাকলেন? আমার হাসি পাচ্ছে আপনার অযুহাতে শুনে। আর কান্না পাচ্ছে আমি দশ বছর যাবৎ আমার মূল্যবান সময়গুলো সবটা আপনার নামে সপে বেঁচেছিলাম। আমার প্রতিটা মোনাজাতে আপনি ছিলেন। কী হতো বলুন তো, যদি দশ বছর আগেই সাহস করে বলতেন যে এই অভাবের জীবন আপনি আর চান না? আমি হাসিমুখে আপনাকে মুক্তি দিতাম। কিন্তু আমার এই দশটা বছর কেন এভাবে নষ্ট করলেন আপনি? উত্তর দিন!”

নিলীমা পুনরায় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমায় কখনো মানুষ মনে করেছিলেন? পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে আমার ছোট মেয়েটা বুকের দুধ পেত না। বাইরের দুধ কেনার সামর্থ্য ছিল না আমার। এক বছরের মেয়েটাকে ভাতের মাড় খাইয়ে বড় করেছি আমি। আমার রূপকথা টানা দুই বছর শুধু মরিচ আর পানি দিয়ে ভাত খেয়েছে। ওই দিনগুলোতে মানসিকভাবে আমি এতটাই বিধ্বস্ত ছিলাম যে, কাজ করার শক্তিটুকুও অবশিষ্ট ছিল না। রাস্তাঘাটে বের হতে পারতাম না; সুযোগ পেলেই লোকে লালসার দৃষ্টিতে তাকাত। কাজ চাইলে শরীর বিক্রি করার প্রস্তাব দিত। আমি সেলাইয়ের কাজ করে মেয়েদের জন্য দু-মুঠো ভাত আর সবজি জোগাড় করতাম। মাসের পর মাস মাংস তো দূরের কথা মাছ ও ওদের পাতে দিতে পারতাম না। সারা বছর দু’টো জামা পরে কাটিয়ে দিয়েছে। ঈদে নতুন জামা পাওয়া স্বপ্ন ছিল। আর আপনি বলছেন, আপনি একটা মেয়ে মানুষের হুমকির ভয়ে আমাদের খোঁজ নেননি? আপনি তো একটা কাপুরুষ! আমার থু থু দিতে ইচ্ছে করছে আপনার উপর। দয়াকরে আমার সামনে থেকে সরুন‌। আমি আপনার পায়ে পড়ি, আমি আপনার মুখ দেখতে পারছি না। চলে যান।”
নিলীমা গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করছে। ওয়াহেদ অশ্রুসিক্ত চোখে করুণ স্বরে ডাকল, –”নিলীমা…”

–”ডাকবেন না আমায়! বের হন আমার বাড়ি থেকে। সরুন আমার চোখের সামনে থেকে!” নিলীমা মেঝে চাপড়ে চিৎকার করে উঠল।
ওয়াহেদ কাঁপা কণ্ঠে অনুনয় করল,
– “আমার কথাটা একটু শোনো, নিলীমা। নিঝাম একটা বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ। ও রাগ করলে নিজের ছেলেকে খুন করতেও দ্বিধা করে না।”
–”আমার বুকটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে ওয়াহেদ। আমার স্বামী অন্য কাউকে ছুঁয়েছে… তাকে নিয়ে ঘর করেছে… আমায় ভুলে দশটি বছর অবলীলায় অন্য একজনের সাথে কাটিয়ে দিয়েছে! আমি এগুলো মেনে নিতে পারছি না। আমি দরিদ্র হতে পারি, কিন্তু প্রিয় মানুষকে অন্য কারো সাথে ভাগ করে নেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। চেয়েছিলাম আমার স্বামী একান্তই আমার হয়ে থাকবে। কিন্তু সব শেষ! কেন ফিরলেন আপনি? সারা জীবন আড়ালেই থাকতেন; অন্তত আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাটা তো অটল থাকত! এখন আমি বাকি জীবনটা কী নিয়ে বাঁচব? আমার ছোট্ট মেয়েটাকে বড় করতে হবে, অথচ মনে হচ্ছে আমি এখনই দম বন্ধ হয়ে মরে যাব।”
ওয়াহেদ আকুতি জানিয়ে বলল,

– “এমন বলো না নিলীমা। আমরা দুজনে মিলে শুকতারাকে বড় করব। আমি ভুল করেছি, আমি অপরাধী। তুমি যে শাস্তি দেবে আমি মাথা পেতে নেব, কিন্তু এভাবে ঘৃণা করো না। প্লিজ, আমায় ক্ষমা করে দাও।”
কিন্তু নিলীমা ধীরস্থির মস্তিষ্কের সহনশীলতা হারিয়ে ফেলে। মাথার চুল খামচে ধরে লম্বা লম্বা শ্বাস নেয়। ক্ষীণ স্বরে বলে,
–“আপনি আমার ঘর থেকে বের হবেন কি-না?”
–”নিলীমা…”
ওয়াহেদ কথা শেষ করার আগেই নিলীমা রণমূর্তি ধারণ করে। চিৎকার করে বরর,
–”বের হন আমার ঘর থেকে! আপনাকে আমি চিনি না।”
–”আমি কোথাও যাচ্ছি না, নিলীমা,” ওয়াহেদ দৃঢ় কণ্ঠে বলল।
নিলীমা এবার উদ্ভ্রান্তের ন্যায় এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে ছুটে যায় রান্নাঘরে। কিন্তু যখন ফিরলো তখন ওয়াহেদ স্তব্ধ হয়ে গেল নিলীমার হাতে বঁটি দেখে।

শুকতারা তখনো অন্য ঘরের কপাট আকড়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। জীবন আর বাস্তবতা তাকে এতটুকু বড় করেছে যে সে এখন বুঝতে পারে এই বিষয়গুলো। বাবা নামক মানুষটা অন্য কাউকে বিয়ে করেছে, তার একটা সন্তান ও আছে, অনেক বড়লোক বাবা। কিন্তু এতদিন ইচ্ছাকৃতভাবে ফেলে যাওয়া তাদের মা মেয়েদের খবর নেয়নি‌। চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সে তো জানত, বাবারা অনেক শক্তিশালী আর ভালোবাসাময় হয়। পুরো পৃথিবীর উর্ধ্বে গিয়ে সন্তানদের আগলে রাখে, তাদের সুখে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু তার বাবা এমন নয়।
বঁটি হাতে নিলীমা বজ্রকণ্ঠে বলল,

–“আপনি যাবেন না-কি আমি আঘাত করব?”
ওয়াহেদ অবাকপানে চেয়ে বলল,
–“তুমি আমায় আঘাত করতে পারবে?”
–“”আমি ওয়াহেদের স্ত্রী হলে পারতাম না এমনটা করতে। কিন্তু আজ আমি একজন বিধ্বস্ত নারী, যে তার স্বামীর কাপুরুষতা আর বিশ্বাসঘাতকতার শিকার। এই নারী অবশ্যই পারবে।”
–”আমায় কি ক্ষমা করা যায় না, নিলীমা?”
–”আপনি যাবেন কি না?”
–”ক্ষমা করে দাও না…”
–“আমার মেয়েদের শৈশব ফিরিয়ে দিন, আমার মেয়েদের শৈশবের সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে দিন, দশ বছর আগের ফেলে যাওয়া আমার বৈবাহিক জীবন আর আমার একান্ত ব্যক্তিগত স্বামীকে ফিরিয়ে দিন— আমি ক্ষমা করে দেব আপনাকে।
আর যদি তা না পারেন, তবে বিন্দুমাত্র মনুষ্যত্ববোধ থাকলে এখান থেকে চলে যান। দ্বিতীয়বার আর নিজের মুখ দেখাবেন না।”

ওয়াহেদ অপলক তাকিয়ে রইল সেই দৃঢ়চেতা নারীটির দিকে। একদা এমনি ছোট্ট ঘরে সে ফিরলে সুখ উপচে পড়ত, আর আজ সেখানে কেবল তীব্র ঘৃণা। শেষবারের মতো সে ডাকল, –”নিলীমা! একটা সুযোগ দাও না।”
–”এখনই না বের হলে আমি সত্যি বঁটি চালিয়ে দেব। বের হন! বহু বছর পর আমার এই ঘরে সুখ এসেছে, আমার মেয়েরা এখন পেটভরে খেতে পায়। আমার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। আপনার মতো কাপুরুষকে আমি এই সুখে বিষ ঢালতে দেব না। আমার স্বামী নেই, সে দশ বছর আগেই হারিয়ে গেছে। আপনি বের হন!”
বলেই নিলীমা দরজা খুলে দিল। পথ দেখিয়ে বলল,
– “বের হন, জলদি বের হন!”
ওয়াহেদ ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার পাশে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে তাকাল। আলতো স্বরে ডাকল, ”
–“আম্মা, মাকে একটু বোঝা না।”

সেই স্নেহমাখা ডাক শুকতারাকে স্পর্শ করল না। আজীবন বাবার স্বপ্ন বোনা শুকতারা নীরবে দরজার কপাট ছেড়ে অন্য ঘরে চলে গেল। ওয়াহেদ নির্বাক হয়ে গেল নিজের ছোট্ট মেয়েটির চোখে ভরপুর ঘৃণা দেখে। আর একটুও সাহস পেল না সেখানে দাঁড়ানোর। নত শির বেরিয়ে যায় দরজা থেকে। নিলীমা সাথে সাথেই স্বশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল।
বদ্ধ দরজার দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল ওয়াহেদ। জীবন কখন এতটা বিদঘুটে হয়ে গেল যে শ্বাস নিতেও এখন কষ্ট হচ্ছে। এই বিদঘুটে জীবনের ভার সে কতদিন বইতে পারবে? চারিদিকে এত ঘৃণা! প্রিয় মানুষগুলোর ঘৃণা যে বড্ড অসহনীয়!
দরজাটি বন্ধ হতেই নিলীমার হাতটি থরথরিয়ে কেঁপে উঠল। স্বশব্দে বঁটিটা মেঝেতে পড়ে যেতেই নিলীমাও ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে। পড়ে থাকা বঁটিটির দিকে চেয়ে আচমকাই সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে আর্তনাদের সুরে বলে ওঠে,

–“আ…আমার স্বামী আর আমার নেই। সে ফিরে আসল কিন্তু অন্য একজনের স্বামী হয়ে, অন্য একজনের বাবা হয়ে। হে খোদা! এত কঠিন শাস্তির জন্য তুমি আমাকেই বেছে নিলে? আমার যে দমবন্ধ হয়ে আসছে। এত অপেক্ষা, এত দোয়া সবটা এক মুহুর্তে এমন ঘৃণায় পরিণত হয়ে গেল?”
দুঃখের ভার সইতে না পারা নিলীমা গলা কাঁটা মুরগীর মতো ছটফট করছে আর কান্না করছে। শুকতারা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে মেঝেতে বসা মাকে পাগলের মতো কাঁদতে। সাহস হয় না এগিয়ে যাওয়ার। তবুও কিয়ৎকাল বাদ সাহস জোগায়, এগিয়ে যায় মায়ের কাছে। দীর্ঘ একটা সময় পর নিলীমা মেঝেতে লাশের ন্যায় পড়ে আছে তখন।
শুকতারা মন্থর গতিতে পা টিপে টিপে এগিয়ে যায়। ভয়ে ভয়ে ফিসফিসিয়ে ডেকে ওঠে মাকে।
–“আম্মা?”

মেয়ের ডাকে এক দৃষ্টিতে শূন্য দেয়ালের পানে চেয়ে থাকা নিলীমার চোখের পলক পড়ে। ফলস্বরূপ অক্ষীকোটরে জমে থাকা নোনাজল গুলো গড়িয়ে পড়ল। ক্ষীণ স্বরে বলে উঠল,
–“ভয় পাসনা, মা। মা তোর মাথার উপর সবসময় আছি, থাকব। তোর বাবার কাপুরুষতার কাছে তার পিতৃত্ব হেরে যেতে পারে। কিন্তু তোর মা অনেক শক্তিশালী। সে মরে যাবে তবুও তার মাতৃত্ব কেউ ক্ষুণ্ন করতে পারবে না। জীবন যখন সব সুখ কেড়ে নিয়েছিল তখনি ভেঙে পড়িনি, সেখানে এখন তো সুখের কমতি নেই। আমি ভেঙে পড়ব না, একটুও না। শুধু মাকে একটু সময় দে মা। কত কত স্মৃতি মুছতে হবে। একটু যন্ত্রনা হবে তবে আমি ঠিক মুছে ফেলব দেখিস! মাকে একটু সময় দে।”
বিড়বিড় করতে করতেই নিলীমার চোখদুটো বুজে গেল। একটু বিশ্রামের প্রয়োজন। জীবন এত বিদঘুটে খেলা খেলল যে দেহ মন আজ ভীষণ ক্লান্ত।

এরপর জীবন আর দ্বৈত দ্বন্দে প্রহরগুলো হুড়মুড়িয়ে কেটে গেল। গড়ায় কয়েক সপ্তাহ। এই কয়েক সপ্তাহে কেউ সব ভুলে নতুন করে বাঁচতে শিখেছে, কেউ কারোর অপেক্ষায় কাতর হয়ে আছে, তো কেউ শরীরের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে একটু নিজের সন্তানকে ছুঁয়ে দেখার জন্য। যেই মাতৃত্বের জন্য এত লড়াই, এত ধৈর্য্য সেই মাতৃত্বই আজ সন্তান হারা দুঃস্থ পথিকের ন্যায় হাহাকার করছে।
দীর্ঘ চব্বিশ দিনের এক অদ্ভুত অস্থির ‘টাইম লুপ’! টরন্টোর আকাশ আজ যেন এক ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। ধূসর গগন ছেয়ে গেছে কৃত্রিম আর্বান গ্লো-তে। ল্যাম্পপোস্টের নিওন আলো নিচু মেঘে বাধা পেয়ে আকাশে সৃষ্টি করেছে ম্লান এই বেগুনি আর গোলাপি আভা। ধরিত্রীর সভ্য ও সুশীল রজনী আজ নিস্তব্ধতাকে আঁকড়ে ধরে গুমরে মরছে। যেন এক প্রলয়ংকরী ঝড় আসার পূর্বাভাস!
ঝড় আসবে কী? ভ্রান্ত ধারণাকে সঠিক প্রমাণ করে দিয়ে এলেক্সা নামক ইলেকট্রনিক যন্ত্রটি যান্ত্রিক কণ্ঠে বলে উঠল,
“A heavy snowstorm is expected to begin in Toronto at 2:30 AM. Visibility will be near zero.”

বিলাসবহুল ভিক্টোরিয়া ডিজাইনের বাড়িটির একটি কক্ষের পর্দা খোলা। তুলোর ন্যায় তুষার ছুঁয়ে থাকা ঝাঁপসা গ্লাস ভেদ করে ওয়ার্ম লাইটের আলো তখনো সুদৃশ্যমান। সেই মৃদু আলোয় ঠিক নূরের ন্যায় চমকাচ্ছে সাদা পাঞ্জাবিতে আবৃত ইবাদতরত একটি অবয়ব।
মোনাজাতরত এরোজের নিমগ্ন চিত্ত সচকিত হয় এলেক্সার ওয়েদার আপডেট শুনে। সে দ্রুত মোনাজাত শেষ করে উঠেই ঘড়ির দিকে তাকায়। একটা ত্রিশ বাজে। দুইটা ত্রিশে তুষার ঝড়ের আভাস সেটাও বিপদজ্জনক!
ঘুমন্ত নায়েলের নিষ্পাপ মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে এরোজ দ্রুত পোশাক বদলে নিল। ঠিক তখনই নায়েল ঘুমের ঘোরেই মৃদু কেঁদে অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠল,
–“পা..পাআ…মাম..মা।”
এরোজ দ্রুত ছোট্ট দেহটির পাশে গিয়ে তাকে আলগোছে বুকে জড়িয়ে ধরল। কপালে হাত রেখে বলল,
–“এইতো মা, আমি আছি। ভয় নেই, তুমি ঘুমাও।”
নায়েলের তন্দ্রা পুরোপুরি কাটেনি। আধোবোজা চোখে তাকিয়ে বলল,
–“স্টোলি।”

এরোজ চিন্তিত মুখে জোরপূর্বক হাসি ফুটিয়ে তুলল। তাকে যে বের হতে হবে। তুষার ঝড় যদি শুরু হয়ে যায় তার বের হওয়া মুশকিল হয়ে যাবে। কিন্তু এই ছোট্ট সত্তাটির আবদার যে পূরণ করতেই হবে।
সে কানে ইয়ার ফোন গুঁজে ভীষণ ধীর কণ্ঠে গল্প বলতে শুরু করল। এই বুকের উষ্ণতা ইদানিং নায়েলের সবকিছুতে পরিণত হয়েছে। বাবা-মায়ের আদর, সুখ-দুঃখ, মন খারাপ সব কিছুর একমাত্র উপশম এই একটা বুক। যেন অচেনা অজানা এই পৃথিবীতে নায়েলের একান্তই নিজস্ব একটা পৃথিবী এই বুকটা। যেখানে থাকলে পৃথিবীর কোনো বিরূপ প্রভাব তাকে ছুঁতে পারবে না।
নায়েলের ঘুম গাঢ় হতে প্রায় বিশ মিনিট সময় লাগল। গল্প বলতে বলতে ক্লান্ত এরোজও একসময় তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু মিনিট দুয়েকের মাথায় হঠাৎ তার তন্দ্রাচ্ছেদ ঘটলো। সে ধড়ফড়িয়ে উঠেই ইয়ারফোনটা কানে চেপে ধরল। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো, শ্রবণেন্দ্রিয় সচকিত হয়। এটা সেই কণ্ঠ যেই কণ্ঠ শোনার জন্য তার কর্নদ্বয় তরপায়।
ইয়ারফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এল,

–“নায়েলের চাচু! নায়েলের চাচুকে নিয়ে আসো তো পান্ডা।”
এরোজের ঠোঁটের কোনে বিশ্বজয়ের হাসি ফুটে উঠল। যেই মুখপানে তাকানোর অধিকার সৃষ্টিকর্তা ছিনিয়ে নিয়েছিল আজ সেই মানুষটা নিজ থেকেই তাকে ডাকে। সে ছলছল নেত্রে শুকরিয়া করে সৃষ্টিকর্তার। যে হালেই পাক না কেন, পেয়েছে তো! এতটুকুর জন্য হলেও সে নিজেকে সারাজীবন সৃষ্টিকর্তার পদার্পণে সপে দেবে।
সে চোখ নামিয়ে দৃষ্টি রাখে বুকে গাল দাবিয়ে শুয়ে থাকা শুভ্র বাচ্চাটির দিকে। একমাস চার দিনেই বিদেশের আবহাওয়ার প্রভাব স্পষ্ট মুখ জুড়ে। ঠিক যেন স্নোহোয়াইট!
সে প্রাণোচ্ছ্বল হেসে গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। দ্রুত কদমে গিয়ে শীতের পোশাকগুলো বের করে পড়তে লাগল।
এখানকার শীত এমনই হাড়কাঁপানো যে, কয়েক স্তর কাপড় আর রুম হিটার ছাড়া টিকে থাকা অসম্ভব।
চাপিয়ে রাখা দরজার কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা মাসুমা ধ্যানচ্যূত হয় এরোজ উঠতেই। সে আলতো দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। এরোজ ফিরে তাকায় কারোর শব্দে।

–“আন্টি, এখনো ঘুমাননি? রাত অনেক হয়েছে তো।”
মাসুমা মৃদু হেসে বলল,
–“তোমার আঙ্কেলের সাথে কথা বলছিলাম। তাই দেরি হয়ে গেল। ভাবলাম একবার নায়েলকে দেখে যাই।”
এরোজ দ্রুত মোজা পড়তে পড়তে বলল,
–“ওহ্, আঙ্কেল কেমন আছেন?”
–“আল্লাহ রেখেছেন। তুমি কী কোথাও যাচ্ছো?
–“জি আন্টি, হসপিটালে যাচ্ছি।”
মাসুমার ভাবনা সঠিক হয়, দৃষ্টি গভীর হয়। দীর্ঘ একমাস চার দিনের অভিজ্ঞতা বলে সম্মুখের ছেলেটি প্রকাশ্যে এক সত্ত্বা নিয়ে ঘোরে, কিন্তু আড়ালে অন্য একটা সত্ত্বা রয়েছে। যেই সত্তা জুড়েই শুধুমাত্র তার মেয়ে আর নাতনির বসবাস। কিন্তু সে চায় না তার এই ধারণা সত্যি হোক! সে টু শব্দটি করল না।
ক্ষীণ স্বরে শুধায়,
–“তুমি কখনো রাতে ঘুমাও না?”
এরোজ চোখ তুলে তাকায়। অপ্রস্তুত হেসে বলল,
–“ঘুমাব না কেন!”
–“এখানে এসেছি পর থেকে কখনো তোমায় দুই ঘন্টা ঠিকমতো ঘুমাতে দেখিনি।”
মাসুমার সোজাসাপ্টা কথায় এরোজ কথা ঘোরানোর সুযোগ পেল না। লহু স্বরে বলল,
–“ন্যাচারালি কখনো লং টাইম ঘুম হয় না আমার, আন্টি। লং টাইম ঘুমাতে হলে ওষুধ খেতে হয়। আর এখন ওষুধ খেলে আর উঠতে পারব না সকালে। এছাড়া হসপিটালে যতক্ষণ থাকি ততক্ষণ তো ঘুমিয়েই কাটে। খুব একটা সমস্যা হয় না।”
মাসুমা থমথমে মুখে বলল

–“তোমার চোখমুখের বেহাল দশা। কখনো চেয়ে দেখেছো? বিশ্রাম নাও এখন হসপিটালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ওখানে তো আর ঢুকতে পারবে না।”
এরোজ হাত মোজা পড়তে পড়তে উদাসীন চিত্তে মৃদু হাসল। কী করে বলবে, দূর থেকে হোক কিংবা কাছে থেকে। ওই মানুষটাকে দেখতে পারলেই তার দেহ মনের সকল ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। জীবনটা সম্পূর্ণ মনে হয়!
সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“সকাল থেকে তো একবার ও যাওয়া হলো না। একবার গিয়ে দেখে আসি কোনো প্রবলেম হলো কিনা!”
–“আমি আর তোমার খালামনি গিয়ে দেখে এসেছি বিকালে। সব ঠিক আছে। আর রাত থেকে খবরে বলেছে আজ মারাত্মক তুষারপাত হবে আর ঝড় ও হবে। এভাবে যাওয়াটা বিপদজনক!”
এরোজ ওবার কোর্ট পড়ে মাস্ক পড়ে নেয়। কার্ডের ব্যাগ আর গাড়ির চাবি নিয়ে বলল,
–“পনেরো মিনিটের পথ তো। আমি গাড়িতে করে চলে যাব। চিন্তা করবেন না আন্টি। আপনি নাহয় এখানেই ঘুমান। নায়েল উঠলে কাউকে না পেলে ভয় পাবে।”
মাসুমা কিছু বলল না। এরোজ ব্যস্ত কদমে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
রাত তখন সোয়া দুটো। বাইরে বাতাসের বেগ উন্মত্ত পশুর মতো গর্জন করছে। এরোজ ছুটে বের হতেই দেখল জগ হাতে নিশাত খাবার ঘরে। এরোজকে বের হতে দেখেই সে চেঁচামেচি শুরু করে দিল।
– “সারারাত ধরে খবরে সবাইকে সাবধান করেছে, এরোজ। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিজিবিলিটি জিরোতে চলে আসবে। হাউ কুড ইউ ডু দিস? রাতে খাওনি এখন পর্যন্ত, ঘুমাও না ঠিকমতো। এখন কোথাও যেতে পারবি নাহ ঘরে যা।”

এরোজের মন মস্তিষ্কে শুধু একটাই ডাক প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সে জুতা পড়তে পড়তে ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“আমায় যেতেই হবে খালামনি। সে আমায় ডাকছে।”
দরজা খুলতেই হাড়কাঁপানো শীতল বাতাস তাকে অভ্যর্থনা জানাল। এরোজ তাকায় আকাশের পানে। অনবরত আপততিত তুষার যেন টুকরো টুকরো শিমুল তুলো। কিন্তু প্রতি সেকেন্ডে তার বেগ আর ক্ষিপ্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরোজ দ্রুত গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে হিটার অন করে দেয়। পনেরো মিনিটের পথটুকু খুব একটা কঠিন লাগল না তার কাছে। তবে তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো যখন মিনিটের মাঝেই ফ্রন্ট গ্লাস পুরোটা সেকেন্ডের মাঝে সাদা হয়ে যাচ্ছে। বাতাসের শো শো শব্দ যেন হিংস্র পশুর গর্জন।
এরোজ যতটা সম্ভব গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তবুও যেন তার পথ ফুরাচ্ছে না। ভেতরের তীব্র অস্থিরতা কতটা ক্ষিপ্র তার থেকেও ক্ষিপ্রতার সাথে প্রকৃতি তীব্রতা তাকে রোধ করে দিল। গাড়ির চাকা কোনোকিছুর সাথে বাঁধাপ্রাপ্ত হতেই এরোজ কপাল কুঁচকে নিলো। গাড়ি কোনোভাবেই আগাচ্ছে না। বাইরে তাকিয়ে দেখল রাস্তা ততক্ষণে কয়েক ইঞ্চি বরফের স্তরে ঢেকে গেছে। নিরুপায় হয়ে সে গাড়ি থেকে নামল। এই জিরো ভিজিবিলিটিতে বরফ পেরিয়ে ছোটা যেন শক্তিশালী প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো বোকামি ককরা।
চোখের পাপড়িতেও তুষার জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে, তবুও সে হাল ছাড়ল না। গাড়ি লক করে সে বরফের উপর দিয়েই হাঁটতে শুরু করল।

চোখে তখন সাফেদ সমীরণের ঝড় ব্যতীত কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এরোজ অন্ধের মতো ছুটতেই লাগল। ছুটতে ছুটতে একসময় বিশাল এক ম্যাপল গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে সে বরফের ওপর ছিটকে পড়ল। তীব্র ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল এরোজ তবুও থেমে থাকল না। সে ধাতস্থ হয়ে বরফ পেরিয়ে ফের ছুটতে লাগল। কিন্তু একটাসময় দেহে অসম্ভব অবসাদ ছুঁয়ে গেল। পা দু’টো আর নড়ছে না বরফে জমে গিয়েছে যেন।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাতাসের ঝাপটা ছাপিয়ে তার কানে এল পুলিশের সাইরেন, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর বরফ কাটার মেশিনের শব্দ। তারমানে হাসপাতালের কাছাকাছি চলে এসেছে।
গলার সবটুকু জোর দিয়ে সে চিৎকার করে বলল, –“হেল্প প্লিজ!”
কিন্তু ঝড়ের প্রকোপে তা শোনাই গেল না। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। মিনিটের মাঝেই দেখল পুলিশ এদিকে লাইট মারছে আর এগিয়ে আসছে। সাথে বরফ কাটার মেশিন স্নো প্লো ও এদিকেই আসছে।
তারা সন্দেহজনক কিছু দেখে দ্রুত এগিয়ে আসে। এরোজকে আঁটকে থাকতে দেখে তারা এক দফা রাগারাগী করল আর সেখান থেকে উদ্বার করল। কিন্তু ‘হাইওয়ে ক্লোজড’ঘোষণা করার পরেও গাড়ি নিয়ে বের হওয়ায় পঁচাত্তর ডলার জরিমানা করল।
এরোজ বিনীত ভঙ্গিতে বলল,

–“আই ডোন্ট হ্যাভ এনি ক্যাশ, স্যার। আ’ম রিয়্যালি ভেরি স্যরি। মাই ওয়াইফ ইজ আ ক্যান্সার পেশেন্ট। শি নিডস মি। প্লিজ লেট মি গো! শি ইজ ওয়েটিং ফর মি।”
এরোজের বিধ্বস্ত দশা আর আকুলতা দেখে পুলিশের মন নরম হলো। তারা অনতিবিলম্বে মেনে নিলো। জরিমানা মওকুফ করে দিল। বলল,
–“ইওর ফোরহেড ইজ ব্লিডিং। লেটস গো, উই উইল ড্রপ ইউ।”
কাঁপতে থাকা এরোজের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে যে ব্যথা পেয়েছে তা তার মাথাতেই নেই। পুলিশ নিজ দায়িত্বে তাকে পৌঁছে দিল হাসপাতালে।
কাঙ্খিত ফ্লোরে উঠতেই এরোজকে পুরো পোশাক খুলে ফেলতে হলো। এগুলো পরে সে আইসোলেশন রুমের সামনেও যেতে পারবে না। একজন নার্স তাকে সর্বোচ্চ জীবাণুমুক্ত করে যাওয়ার অনুমতি দিল। হিটারের উষ্ণতায় সে একটু নিঃশ্বাস নিতে পারল।
কাঙ্খিত দরজার সামনে পৌঁছাতেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। চব্বিশ দিনেই মৌনতার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটা ফিরছে। এখন সে কথা বলতে পারে, একটু আধটু হাঁটার ও শক্তি পায়।
এরোজ কিউবিক আকৃতির গ্লাসটির সামনে দাঁড়াতেই মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। মাথায় স্ক্যাল্প কুলিং ক্যাপ পড়া একটা কঙ্কালের ন্যায় মুখ দৃশ্যমান হয়। নেই কোন সৌন্দর্য, নেই কোন উজ্জ্বলতা, এমনকি কয়েকটুকরো মাংস ও হয়তো ওই মুখে পাওয়া যাবে না। শুধু হাঁড়ের উপর চামড়ার প্রলেপ।
এরোজ বুকভরা সাহস নিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুললো। ভেতরে থাকা নার্স মৌনতাকে ফোন এগিয়ে দিতেই মৌনতা নিস্তেজ চোখ খুলে তাকায়। ক্ষীণ স্বরে শুধায়,

–“হু?”
নার্স বলল,
–“ইয়োর হাজব্যান্ড!”
মৌনতা কপাল কুঁচকে নিলো। এই হাজব্যান্ড কাকে বলেছে বুঝতে তার অসুবিধা হয় না। তার দেখাশোনা করা সব নার্সরা জানে এরোজ তার আত্মীয় কিন্তু শুধু ইনিই বুঝতে চায় না। সে বরাবরের ন্যায় গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“হি ইজ নট মাই হাজব্যান্ড! হি ইজ মাই রিলেটিভ।”
নার্স বিরক্তিতে চোখ ঘোরালেন। রোগী তো দেখে না তারা ওই লোকটার কত উন্মাদনা সহ্য করে। রোগী যতই বলুক, সে এসব কথা বিশ্বাস করে না।
মৌনতার প্রতিক্ষীত চোখ জোড়ায় উজ্জ্বলতা ছুঁয়ে গেল। অনতিবিলম্বে পান্ডাটি আরো প্রিয় হয়ে উঠল।
কানে ফোন ঠেকাতেই ভেসে আসল পুরুষালী শ্রান্ত কণ্ঠ।
–“হাই!”
মৌনতা ম্লান হেসে বলল,
–“হ্যালো! আপনি এখানে কেন?”
এরোজ মৃদু হাসল। অবলীলায় ঝড়ের বিভীষিকার কথা লুকিয়ে গিয়ে বলল,
–“ঘুম আসছিল না তাই ভাবলাম একটু ঘুরে যাই।”
মৌনতার যেন এহেন জবাবই আশা করেছিল। সে প্রচন্ড উত্তেজনা নিয়ে বলল,
–“আপনি কী জানেন, আমি কিছুক্ষণ আগেই পান্ডাটির কাছে আপনার কথা বলেছিলাম। আর দেখুন আপনি এসে গিয়েছেন।”
এরোজ ম্লান হাসল। মৃত্যুর সাথে লড়ছে অথচ চোখেমুখে ছোট্ট একটা বিষয় নিয়ে কত হাসি! সে বলল,

–“সত্যি? কেন ডেকেছিলেন?”
মোনতা উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“সারাদিনে তো আসেননি। আপনি একটু ডাক্তারকে বলুন না আমায় রিলিজ করে দিতে। আমি এখন পুরোপুরি সুস্থ, কথা বলতে পারছি, হাঁটতে পারছি সব করতে পারছি।”
এরোজ নির্নিমেষ চেয়ে বলল,
–“আপনার বাইরে চলাচল করার জন্য এখনো আরেকটু ফিট হতে হবে। নয়তো সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর তো মাত্র চারদিন। এতদিন যখন অপেক্ষা করেছেন আর একটু অপেক্ষা করুন।”
মৌনতা অসন্তোষের নিঃশ্বাস ফেলল। চোখ দু’টো শারীরিক অসুস্থতা আর একাকিত্বে ছলছল করে উঠল। ক্ষীণ স্বরে বলল,

–“নায়েল!”
–“আর চারদিন। দেখবেন চোখের পলকে কেটে যাবে আর নায়েল আপনার কোলে থাকবে।”
মৌনতা অসহায়ত্ব কবুল করে নিলো। গ্লাসের পানে নিগুঢ় চোখে তাকালো। এরোজ কপালে হাত ঠেকায়। লাল রক্ত কনিকা আঙুলে দেখতেই সে ব্যথাতুর নিঃশ্বাস ফেলল।
তন্মধ্যেই কর্নকুহরে আন্দোলিত হয় প্রিয় কণ্ঠটি।
–“মাথায় আঘাত পেলেন কী করে?”
এরোজ চোখ তুলে তাকায়। বলল,
–“কিছুনা, একটু ধাক্কা খেয়েছি।”
–“একটু ধাক্কা খেলে রক্ত বের হয়?”
এরোজ শান্ত দৃষ্টি ফেলল। বলল,
–“আপনি এতদূর থেকে এটা খেয়াল করেছেন?”
–“আমি তো এটাও খেয়াল করেছি—যে আপনাকে স্নোম্যান এর মতো দেখাচ্ছে। ফর্সা মুখ ধূসর চোখ আর চেরির মতো লাল টুকটুকে নাক ঠিক যেন পুতুল।”

বলেই নারীটি খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। সেই হাসি সংক্রমিত হয় পুরুষালী ওষ্ঠকোনেও। খিলখিলিয়ে সেই হাসির শব্দে বুকের মাঝে ধক ধক করতে থাকা হৃদয়টি শীতল হয়। ক্ষীণ স্বরে বলে,
–“ওহ্! ইট ফিল’স স্পেশাল দ্যাট ইউ নোটিসড মি।”
মৌনতা কপাল কুঁচকে নিলো। অবোধ কণ্ঠে শুধাল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৪

–“কেন?”
–“বিকজ আই হ্যাভ নো ওয়ান টু নোটিস।”
বড্ড দুঃস্থ শোনালো পুরুষালী কণ্ঠটি। মৌনতা বিষন্ন হয়! এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল পুরুষালী মুখপানে। বড্ড অনাদরে বা হাতে কপালের রক্তগুলো মুছতে ব্যস্ত পুরুষটি।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here