Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬২

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬২

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬২
তোনিমা খান

দখিনা দমকা হাওয়ার বেগ আজ বড্ড ক্ষিপ্র আর ভারী। অপরাধবোধের ভার এতটাই ভারী যে এটা কাউকে মৃত্যুর দুয়ার অব্দি অনায়াসে পৌঁছে দিতে পারে।
তপোবনের কাঁপতে থাকা হাতটি শিথিল হয়ে আসল, ঠিক যেমন দশ বছর পূর্বে তার পুরো দেহ শিথিল হয়ে গিয়েছিল বাহুডোরে থাকা নারীটির শেষ নিঃশ্বাসের শব্দে।
ডক্টর আনত মস্তকে ভীষণ স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
– আ’ম স্যরি! হি ইজ নো মোর। এটা হার্ট এ্যাটাক ছিল। আমি ধারণা করছি তিনি বহুদিন যাবৎ হার্টের রোগী ছিলেন।
বলেই ডক্টর বিছানায় নিস্তেজ প্রাণহীন দেহটি থেকে পিছিয়ে এলেন। অবিশ্বাস্য চাহনিতে চেয়ে থাকা নিঝাম বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। চেঁচিয়ে উঠল সর্বহারা নারীটি,

– এই ডক্টর আপনি কী বলছেন? আমার ওয়াহেদ নেই মানে? ও কী করে মরতে পারে আমায় রেখে? ও ঠিক আছে, একদম ঠিক আছে। ও আগেও এমন অনেকবার অসুস্থ হয়েছে কিন্তু প্রতিবার ও সুস্থ হয়ে গিয়েছে। আপনি ঠিক করে চেকআপ করুন, তাড়াতাড়ি চেকআপ করুন নয়তো দেরি হয়ে যাবে।
কোথাও একটা শুনেছিলাম, মানুষ মারা গেলে তার প্রিয়জন তাকে হারিয়ে ফেলার জন্য কাঁদে না। বরং তাকে একা ফেলে চলে যাওয়ার দুঃখে কাঁদে ! সে একা থাকবে কী করে? তাকে ভালোবাসবে কে? স্বার্থপর শোনাচ্ছে নিশ্চয়ই! কিন্তু আমরা যে একে অপরের সাথে থাকিই ভালোবাসা, সঙ্গ আর মানসিক শান্তির জন্য। তা কেউ কখনো স্বীকার করে না।
কিন্তু নিঝাম এটা স্বীকার করা এক চমৎকার স্বার্থান্বেষী নারী। তার বাঁচতে হলে ওয়াহেদকে চাই।
ডক্টর উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেললেন এহেন বিলাপে। নিরুত্তর কামড়া থেকে বের হতে হতে বললেন,

– মিঃ তপোবন সিকদার আমার সাথে আসুন।
তপোবন নড়েচড়ে উঠল। ফাঁকা একটা ঢোক গিলে ডক্টরের পথ অনুসরণ করে বাইরে আসতেই ডক্টর বললেন,
– উনি মানসিকভাবে প্রচন্ড বিধ্বস্ত আর ক্লান্ত ছিলেন। এতটাই বিধ্বস্ত ছিলেন যে ওনার শরীর ধীরে ধীরে ওনার সঙ্গ ছেড়ে দিয়েছে। হার্ট অ্যাটাক হওয়ার আগে অনেক সিম্পটম দেখা যায়। আ’ম শিওর ওনার ও দেখা গিয়েছিল কিন্তু উনি উপেক্ষা করেছেন কিংবা লুকিয়ে গিয়েছেন।
স্বাভাবিক মৃত্যু না-কি স্বেচ্ছামৃত্যু! আরো একটি শঙ্কা তপোবনকে স্তব্ধ করে দিল। এই মৃত্যুর জন্য তবে কে দায়ী? প্রশ্নটি জাগতেই তার বুক কেঁপে উঠল। কন্ঠনালী আঁটকে গেল। হয়তো এই কণ্ঠ দিয়ে আর কখনোই এই শঙ্কা আর নিঃসৃত হবে না।
সমীরণ একটু একটু করে ভারী হতে লাগল অপরাধবোধ আর প্রিয়জনের বিলাপে। নিঝাম উদ্ভ্রান্তের মতো শুধু হাত পা ছুঁড়ছে। ক্ষমতা আর অঢেল টাকা থাকতেও সে আজ তার ওয়াহেদকে নিজের কাছে আঁটকে রাখতে পারছে না সেই শোকে বিলাপ করছে।
ডেথ সার্টিফিকেট সহ ভোর পাঁচটায় লাশ হস্তান্তর করা হলো পরিবারের লোকদের কাছে। ভোরের আলো ফোঁটার আগে নিঝামের অহংকার, জৌলুসে গড়া দোতালা ডুপ্লেক্স বাড়িটি শোকের মাতম আর পরিবার, প্রিয়জন, শুভাকাঙ্ক্ষীতে আড়ম্বরপূর্ণ হয়ে উঠল।
জানাজা সম্পন্ন করার জন্য ছোটাছুটি করতে থাকা তপোবনের গতিরোধ হলো সদ্য ঘুম থেকে ওঠা নিহামের নিষ্পাপ ঘুম জড়ানো মুখটি দেখে। নাইট স্যূট পরে কাজের লোকের সাথে অবোধশিশুর ন্যায় নিচে নেমে আসল নিহাম। ঘরজুড়ে হঠাৎ এত মানুষের সমাগম দেখে সে তপোবনকে জিজ্ঞেস করল,

– বাড়িতে এত মানুষ কেন ভাইজান? মাম্মা, পাপা কোথায়?
তপোবনের মাঝে শক্তি আর সাহস একটাও ছিল না ওই ছোট্ট শিশুকে এটা বলতে —যে তার প্রিয় এবং সুরক্ষিত আশ্রয়স্থল তার পাপা আর নেই। সে নিহামের হাত ধরে উঠোনে আঙিনায় এসে দাঁড়াল। ঠিক যেখানে ওয়াহেদের খাটিয়া রাখা।
নিহাম সহসা অবাকপানে ঘাড় ঘুরিয়ে চাইল তপোবনের দিকে। আধুনিকতা আর সকল রকমের ফ্যাসিলিটির সাথে বড় হওয়া দশ বছরের ছেলেটি জানত এই দৃশ্য কারোর জীবনের শেষ অধ্যায়। তবুও সে বিশ্বাস করতে পারল না। এটা নিশ্চয়ই মজা না! তবে কেন সবাই বাবাকে এভাবে খাটে শুইয়ে রেখেছে সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে?
সে অস্ফুট স্বরে বলল,
– ভাইজান, পাপা এভাবে শুয়ে আছে কেন? তাকে এভাবে সাদা কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে কেন?
অদূরেই নিঝামকে চার পাঁচজন আঁকড়ে ধরে আছে। সে কিছুক্ষণ পর পর অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। তপোবন রক্তিম নেত্রে হাঁটু গেড়ে বসল নিহামের সামনে। কঠিন হলেও তাকে বলতে হলো,

– তোমার পাপা রাতে হার্ট অ্যাটাক করেছে, নিহাম। সে আর নেই আমাদের মাঝে।
তপোবন দম ফেলল। আবার বলল,
– তোমার পাপা মারা গিয়েছেন।
– পাপা মারা গিয়েছে?
নিজ মনেই প্রশ্ন করে বসল নিহাম। কিন্তু প্রশ্নটির জবাবে চোখের সামনে ভেসে উঠল অবিশ্বাস্য এক কঠিন দৃশ্য। বাবাকে মাটির নিচে রেখে সে একা ছাতাহীন দাঁড়িয়ে আছে ঘন বর্ষার মাঝে। একা, একদম একা। কাঁধে বাবার হাত নেই, মাথার উপর বাবার ছায়া নেই অথচ সম্মুখে ধেয়ে আসছে অজস্র বিপদ। কিন্তু বাবা‌ নেই, কোথাও নেই। মাকে ভয় পেলে সে কার বুকে লুকাবে?
নিহাম বাবার খাটিয়া ধরে বসল। কিয়ৎকাল একদৃষ্টিতে দেখল বদ্ধ নেত্রে শুয়ে থাকা প্রিয় মুখটি। দেখতে দেখতেই সে হঠাৎ করেই শব্দ করে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেল। অবুঝের ন্যায় ডাকল,

– পাপা? পাপা সবাই কী বলছে? তুমি নাকি মারা গিয়েছ? এটা কী করে হতে পারে পাপা? তুমি তো বলেছিলে তুমি সবসময় আমায় মায়ের আঘাত থেকে বাঁচাবে। কখনো মায়ের কাছে একা ফেলে কোথাও যাবে না তবে আমায় একা ফেলে চলে যাচ্ছ কেন? পাপা প্লীজ বলো তুমি ঠিক আছো। পাপা? পাপা?
নিহাম হাউমাউ করে কাঁদছে আর সবার দিকে তাকাচ্ছে। অনুনয় করে মানুষদেরকে বলছে,
– আঙ্কেল, আন্টি পাপাকে একটু বলুন না উঠতে। আমি পাপাকে ছাড়া থাকতে পারি না। আমার খুব ভয় করে।
নির্জনা বেগম বোনকে ছেড়ে চোখ মুছতে মুছতে এসে নিহামকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। রোজ ও তাকে আগলে নিলো। কিন্তু এই সবের মাঝে তপোবন একটিবারের জন্যও নিজের ছেলে আর স্ত্রীকে দেখতে পেল না। তপোবনের টনক নড়ে। জানাজা অনুষ্ঠিত হবে যোহর নামাজের পর।
সে আচানক সব ছেড়েছুড়ে ছুটে বেরিয়ে গেল গেট থেকে। পনেরো মিনিটের ড্রাইভিং শেষে সে হন্তদন্ত হয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো। থমকালো ঘরের এক কোনায় মেঝেতে হাত পা ছেড়ে চুপটি করে বসে থাকা মেয়েটিকে দেখে। তানশান চোখ তুলে তাকায়। বাবাকে দেখতেই তার চোখেমুখে প্রাণ ফিরল। সে হাঁসফাঁস করে বলল,

– পাপা, মিমি অদ্ভুত আচরণ করছে সেই থেকে। না কথা বলছে, না নড়াচড়া করছে।
তপোবন দ্রুত এগিয়ে গেল মেয়েটির কাছে। যেতে যেতে ছেলেকে বলল,
-আব্বু তৈরি হয়ে নাও ওই বাড়িতে যেতে হবে তোমায়।
-কিন্তু মিমি?
-আমি দেখছি, তুমি তৈরি হয়ে নাও।
তানশান নীরবে ঘরে চলে গেল।
তপোবন হাঁটু গেড়ে বসে মেয়েটির সামনে। গালে হাত রেখে নম্র স্বরে ডাকল,
– রূপকথা?
চোখের পানি শুকিয়ে গেলেও ঘন পল্লব একে অপরের সাথে মিশে থেকে জানান দিচ্ছে নোনাজলের উপস্থিতি। রূপকথা চোখ তুলে তাকায়। চোখের সাদা অংশে লালচে আভা। অতি ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করল,
– আমরা কী খুনী তানশানের পাপা?
তপোবন ভীষণভাবে মেজাজ হারালো। থমথমে মুখে বলল,
– তুমি কোনোভাবেই এই ধরণের কথা বলে নিজেকে আর নিজের মাঝে থাকা প্রাণদের কষ্ট দিতে পারো না, রূপকথা। যেখানে তুমি জানো এখানে তোমার কিংবা তোমার পরিবারের কোনো দোষ নেই। তবে কোন জ্ঞানে এই কথাটা বললে?
রূপকথার চেপে রাখা মুখশ্রী ঠিকরে আর্তনাদ বেরিয়ে আসল।

-আমি ওনার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি তানশানের পাপা। অনেক ঘৃণা করেছি।
– সেটা তার‌ কর্মফলের প্রতিক্রিয়া ছিল। যে কেউ অমন প্রতিক্রিয়া দেখাতো এমনকি আমিও দেখিয়েছি, যে শুনেছে সেই এমন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তারমানে কী তারা সবাই খুনী? বোকামি ছাড়ো, আর নিজেকে মানসিক চাপ না দিয়ে আমার সাথে চলো।
রূপকথা কাঁদতে কাঁদতে না বোধক মাথা নাড়ল,
– আমি যাব না। আমি কোন মুখে তার সামনে দাঁড়াব?
তপোবন ক্রন্দনরত মেয়েটিকে বুকে আগলে নিলো। নম্র স্বরে বলল,
– যা হয়েছে তা হয়ে গিয়েছে রূপকথা। এটা একটা সাধারণ মৃত্যু ছিল। তাকে কোনো দাবি ছাড়া পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে দাও।
তপোবন রূপকথাকে সেভাবেই শুধু একটা বড় শাল জড়িয়ে বাইরে নিয়ে আসল। তখুনি মনে পড়ল গতকাল ওয়াহেদের দিয়ে যাওয়া সেই আমানতের কথা। সে রূপকথাকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে আবার ঘরে গেল।
কৌতুহলী হয়ে খামটা খুলতেই তার বদন মিইয়ে গেল। একটা দলিল। যেখানে ওয়াহেদের নিজের ইনকামে কেনা কিছু জায়গা যেটা রূপকথা, শুকতারা আর নিলীমার নামে করে দেয়া হয়েছে। বারবার কৈফিয়ত দেয়া হয়েছে ওটা সম্পূর্ণ সে নিজে কষ্ট করে আয় করেছে, সেই টাকায় কেনা।
সেখানে আরো চারটা চিঠি আর তিনটা সোনার চেইন ছিল। সহসা টুপ করে এক ফোঁটা জল পড়ল ছোট্ট কাগজটির উপর।

– আমার অনাগত নানুভাইদের জন্য আর তানশানের জন্য। জানা নেই তাদের কখনো কোনোকিছু দেয়ার সুযোগ সৃষ্টিকর্তা আমায় দেবেন কি-না! কিন্তু নানুভাইয়ের দোয়া আর ভালোবাসা সবসময় তাদের জন্য থাকবে।
তপোবন এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে উপচেপড়া আবেগকে সামলায়। কিন্তু অশ্রু আর অপরাধবোধ আজ দুটোই ছন্নছাড়া!
নিলীমা রোজকার ন্যায় দরজা খুলতেই আজ আর ঘৃণ্য মুখটি দেখতে পেল না। স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসল অন্তঃস্থল থেকে। কিন্তু কোথাও অন্তঃস্থল বিচলিত ছিল। গতকাল লোকটা একটু বেশিই নরম ছিল।
অনবরত ফোনের আওয়াজ শুনে সে রিসিভার তুলে কানে ঠেকালো। অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে আসল ভারী এক কণ্ঠ।
-আম্মা?
-ওহ তপোবন আপনি? নাম্বার চিনিনি আমি।
-এটা অন্য নাম্বার আম্মা।
পরপরই বলল,
– আম্মা, পাঁচ মিনিট পর আমার গাড়ি যাবে আপনার কাছে। জরুরী ভিত্তিতে একটু খুলনায় চলে আসুন শুকতারাকে নিয়ে।
নিলীমা হকচকালো তার কথার ধরণে। বিচলিত কণ্ঠে বলল,

– কী হয়েছে তপোবন? আপনার কণ্ঠ এমন শোনাচ্ছে কেন? রূপকথা ঠিক আছে তো? নানুভাইয়েরা ঠিক আছে?
চিঠিগুলো হাতে তপোবন উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলল। ভূমিকা না করে বলল,
– রূপকথা ঠিক আছে আম্মা। কিন্তু ওয়াহেদ খালুজান… তিনি রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ হার্ট অ্যাটাক করেন। দূর্ভাগ্যবশত ডক্টর কিছুই করতে পারেনি।
নিলীমা থমকে গেল। কর্নকুহরে প্রবেশ করা কথাটির অর্থ মস্তিষ্ক ধারণ-ই করতে পারল না। তিনি হতবাক হয়ে বললেন,
– আপনি কী বলছেন তপোবন? ডক্টর কিছু করতে পারেনি মানে?
– খালুজান আর নেই, আম্মা।
নিলীমার পায়ের তলার জমিন খিচে গেল। তিনি ওই মানুষটিকে ঘৃণা করেন কিন্তু ওই মানুষটির কোনো প্রকার করুণ পরিণতি আজো মানতে পারেন না।
অপরপ্রান্ত একদম নিঃশব্দ, নিস্তেজ হয়ে যেতেই তপোবন ডাকল।
– আম্মা? আম্মা শুনতে পাচ্ছেন?
চোখের সামনে সবটা কেমন ধূসর হয়ে আসল। নিলীমা দরজার খুঁটি আঁকড়ে ধরে নিজেকে সামলান। খালি পেট উগড়ে আসতেই সে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লেন। বহুকষ্টে উচ্চারণ করলেন,

– শুনছি।
– যোহরের নামাজ বাদ জানাজা অনুষ্ঠিত হবে আম্মা। আপনি চলে আসুন।
চোখেমুখে ফুটে ওঠা রক্তিম আভা, ফুলেফেঁপে ওঠা পেশি দাঁতে দাঁত চেপে আঁকড়ে ধরে নিলীমা বলল,
– আমি কোন মুখে যাব ওখানে?
– আপনি একজন লড়াকু মা। এটাই আপনার একমাত্র পরিচয়। আপনি সেই মুখেই আসবেন। আসতেই হবে, নয়তো কোনো একদিন আফসোস আপনাকেও শেষ করে দেবে আম্মা। চলে আসুন শিঘ্রই।
তপোবন ফোন রেখে দিল। কিন্তু নিলীমা তখনো রিসিভার কানে ঠেকিয়ে বসে রইলেন। যেন আরেকটা ফোন আসবে আর কেউ বলবে এইসব মিথ্যা। ওই লোকটা তার স্ত্রী সন্তান নিয়ে ভালো আছে, সুস্থ আছে। কেউ একটু তাকে চিমটি কাটুক আর বলুক, এখনো রাত কাটেনি, সকাল হয়নি, এটা দুঃস্বপ্ন ছিল।
কিন্তু কোনো প্রত্যুত্তর আসল না। নিলীমার দুঃস্বপ্ন ও ভাঙল না। সে আচমকাই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। কেন কাঁদলেন তিনি জানেন না। ওই লোকটাকে ঘৃণা করেন তবুও কেন তার মৃত্যু কেন মানতে পারছেন না?
চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল সেই এক একটা মুহূর্ত যেগুলো ওই মানুষটার সান্নিধ্যে কাটিয়েছিলেন আর সৃষ্টিকর্তার শুকরিয়া করেছিলেন। অথচ আজ সেই সুখগুলো কতটা যন্ত্রণাই না ফেরত দিচ্ছে!
নিজের পোশাক খামচে ধরে নিলীমা কাঁদতে কাঁদতে একটাসময় নিলীমা নিস্তেজ হয়ে গেলেন। যেন কোনো শ্মশানের শবযাত্রী। অতি ক্ষীণ স্বরে বলে উঠলেন,

– আপনি আজ মারা গিয়েছেন। কিন্তু আমি তো সেই দশ বছর আগেই মরে গিয়েছিলাম। আপনি সবসময় শুধু স্বার্থপরতা করে গেলেন। দশ বছর আগেও আর দশ বছর পরেও। নিজেকে তো কাঁধ থেকে সব দুঃখের দ্বায়ভার ঝেড়ে পালিয়ে গেলেন। কিন্তু আমি? জীবন্ত আমিটা আর কতবার মরব এই অসহনীয় দুঃখ বইতে বইতে?
ঠিক বারোটা দশ মিনিটে নিঝামের গেটে একটি গাড়ি থামল। গাড়ি থেকে নেমে দুটো মানুষ ঠিক ওয়াহেদের খাটিয়া বরাবর এসে দাঁড়াতেই সকলের উৎসুক দৃষ্টি পড়ল তাদের উপর।
নিঝামের কান্না আচমকা থেমে যায় তার থেকেও বিধ্বস্ত এক নারী অবয়ব দেখতেই। চিনতে এক মুহুর্ত ও বিলম্ব করল না নারীটি কে! সে আচমকাই উন্মত্ত ষাঁড়ের মতো ছুটে এসে নিলীমাকে ধাক্কা দিয়ে দুই হাত দূরে ফেলে দিল। বজ্রকণ্ঠে চেঁচিয়ে বলল,
– তুই, তুই আমার স্বামীকে খুন করেছিস। তুই আমার স্বামীর খুনী। তোকে আমি মেরে ফেলব। তুই আমার সুখ ছিনিয়ে নিয়েছিস।
নিঝাম আবারো নিলীমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গেলেই তপোবন ছুটে এসে তাকে দূরে সরিয়ে দিল। বজ্রকণ্ঠে বলল,

– দূরে সরো খালামনি।
তপোবন দ্রুত গিয়ে নিলীমাকে তুললো। তকদির সিকদার আর দু’জন লোক নিঝামকে আঁটকে রাখল। তার মাঝে যেন চারজনের শক্তি ভর করেছে এতটাই ফুঁসছে সে।
কিন্তু নিলীমার মাঝে একটুও উদ্বেগ দেখাগেল না। তিনি চুপটি করে আবার এগিয়ে গেলেন খাটিয়ার দিকে। হাত বাড়িয়ে মুখের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে দিলেন। অতঃপর খাটিয়া আঁকড়ে ধরে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন ওই সুন্দর মুখপানে। একদম নির্বাক, অভিযোগহীন। রূপকথা ভীড় ঠেলে ভারী দেহ নিয়ে একটু একটু করে এগিয়ে এলো মায়ের কাছে। বোনের হাত ধরে মায়ের পাশে বসতেই নিলীমা চোখ তুলে তাকায়। স্মিত হেসে বলল,
– তোর আব্বু, আবারো স্বার্থপরতা করেছে কথা। সবসময় আমাদের দুঃখে রেখে সে শান্তির খোঁজে পালিয়ে গিয়েছে। দেখ, কী শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। আর আমি আজ দশটা বছর যাবৎ একটুও ঘুমাতে পারি না। মানুষ এত স্বার্থপর কেন হয় কথা?
রূপকথা তিরতির করে কেঁপে ওঠা ঠোঁট চেপে ধরে মায়ের বুকে আছড়ে পড়ল। কিন্তু শুকতারা একটুও কাঁদল না। শুধু দেখেই গেল। ছোট্ট মনটিতে বাবার জন্য অভিযোগ ছিল নাকি দুঃখ বোঝা গেল না।
শেষকৃত্যের সময় হয়ে এলো চোখের পলকে। নিঝাম ওই মৃতদেহটি আঁকড়ে ধরেই সারাজীবন থাকবে। সে ওয়াহেদকে নিতে দেবে না। কিন্তু জাগতিক নিয়মের কাছে যে তার ভালোবাসার অহংকার, উন্মাদনা হেরে গেল!
জাগতিক সকল দাবি, অভিযোগ, ভালোবাসা ছিন্ন করে মৃত দেহটিকে জানাজার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো। দশ বছর বয়সের নিহাম ঠিক তখন চোখের পলকে বড় হয়ে গেল, যখন তার হাতেই তার বাবার কবরের শেষ মাটি দেওয়ানো হলো এবং তপোবন তার হাতে একটি চিঠি দিল।
বাবার নাম লেখা সেই চিঠিটি খুলতেই ভেসে উঠল বাবার আদরমাখা সেই চিরচেনা কণ্ঠে বলা ‘আব্বু’ ডাকটি।

“আব্বু, বাবাকে ছাড়া বড় হতে হবে তোমায়। নিজেকে মায়ের থেকে রক্ষা করতে হবে। কখনোই মায়ের মতো হিংস্র হিংসাত্মক মনোভাব রাখবে না আব্বু। জীবনে কখনো যদি তোমায় পুরো দুনিয়ার সাথে লড়াই করে হলেও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হয়, আর সেটি যদি সঠিক হয় তবে সাথে সাথে সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবে। একজন সাহসী সুপুরুষ হবে। বাবার মতো কাপুরুষ হবে না।
বাবার একটা শেষ ইচ্ছা আছে নিহাম। রাখবে? বাবার রেখে যাওয়া তিনটি আমানত আছে নিহাম। যাদের সাথে বাবা অনেক অন্যায় করেছি। তোমার আরেক মা আর দুই বোন। রূপকথা আর শুকতারা তোমার দুই বোন। আর নিলীমা তোমার আরেক মা। তুমি তাদের সাথে সম্পর্ক রাখবে, খোঁজ রাখবে, ঢাল হবে, নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাদের খেয়াল রাখবে আর সাথে থাকবে। আমি জানি তারা আমায় ঘৃণা করলেও তোমায় কখনোই ঘৃণা করবে না। নিলীমা তোমায় আগলে রাখবে নিঝামের থেকে। তুমি তার কাছে যেও আব্বু। বাবার শেষ আবদারটা রেখো প্লীজ।”
নোনাজলে ভিজে ওঠা চিঠিটি পড়ে নিহাম পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। তপোবন হাত বাড়িয়ে দিল তার দিকে। সে নিরুত্তর তার হাত ধরে এগিয়ে গেল। যেতে যেতে একবার পিছু ফিরে চাইল মাটির নিচে রেখে যাওয়া বাবার দিকে। ওই তো মানুষের শেষ পরিণতি। তবে কিসের এত অহংকার? কিসের এত বড় বড় স্বপ্ন? কিসের এত ক্ষমতা আর টাকার লোভ? কিসের এত দ্বন্দ্ব?
বাবার মৃত্যু নিহামকে জীবনের সঠিক মানে বোঝালো নাকি তাকে অনেকটা বড় করে তুললো কেউ বুঝতে পারল না।
কিন্তু কিছু মিনিট গড়াতেই সকলে বুঝল, বাবার মৃত্যু নিহামকে জীবনের সঠিক মানে বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছে।
নিলীমা রূপকথা আর শুকতারাকে নিয়ে নিঝামের গেট থেকে বের হতে গেলেই তাকে ডেকে উঠল,

– শুনছেন?
কারোর ডাকে নিলীমা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। দৃষ্টিতে আটকালো সাদা পায়জামা পাঞ্জাবী পড়া একটি ছোট্ট অবয়ব। নিহাম এগিয়ে আসল নিলীমার কাছে‌। কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়া আবদার করে বলল,
– আমায় আপনাদের সাথে নেবেন? আমার মাম্মা আমায় অনেক মারে। আমি খুব ভয় পাই তাকে। আমায় একা পেলে আবারো মারবে। প্লীজ আমায় আপনাদের সাথে নিয়ে যান।
তপোবন হতভম্ব হয়ে গেল তার কথায়। সে চিঠিটা খোলেনি শুধু উপরে নাম দেখেই নিহামের হাতে দিয়ে বলেছিল সামলে রাখতে।
স্তব্ধ নিলীমা অস্ফুট স্বরে বলল,
– তুমি কেন আমাদের সাথে যাবে?
নিহাম আবার বলল,
– আমায় মাম্মা আঘাত করে। পাপা থাকলে পাপা আমায় সেইফ করত। কিন্তু এখন পাপা নেই। আমায় সেইফ করার মতো আপনি ছাড়া কেউ নেই।
নিলীমা আরেকদফা চমকালো।
– তোমায় কে বলেছে আমি তোমায় সেইফ করব?
– পাপা বলেছে। সে বলেছে, আপনি আমায় কখনো ঘৃণা করবেন না। সবসময় আমায় রক্ষা করবেন। প্লীজ আমায় সেইফ করুন।
ওয়াহেদ সত্যিই জানত নিলীমাকে। সে বিশ্বাস করত, নিলীমা মাতৃত্বে বলীয়ান এক নারী। আর যেতে যেতেও সে ঠিক ওই ক্ষমতার অপব্যবহার করল। সে জানত, নিলীমা কখনোই তার মাতৃত্বকে ছোট হতে দেবে না। রূপকথা আর শুকতারাকে অবাক করে দিয়ে নিলীমা হাত বাড়িয়ে দিল নিহামের দিকে। বলল,

– আসতে পারো। কিন্তু আমি এক দরিদ্র মা। আমি তোমায় পুরো পৃথিবী থেকে রক্ষা করতে পারলেও, পুরো পৃথিবীর বিলাসীতা তোমায় দিতে পারব না। পুরো পৃথিবীর সুস্বাদু খাবার জোগাড় করে দেয়ার সামর্থ্য আমার নেই। এটা বুঝেই তারপর এই হাত ধরবে।
কিন্তু নিহাম কোনো বোঝাবুঝিতে গেল না বরং সাথে সাথে নিলীমার হাত আঁকড়ে ধরল। যেন সে বাবার শেষ ইচ্ছাকে আগলে ধরেছে। সে হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,
– আমি আপনার সাথে যাব।
সেই অবিশ্বাস্য দৃশ্যে নির্জনা বেগম, তকদির সিকদার সহ সকলে থমকে গেল। নির্জনা বেগম বলেই উঠলেন,
– এসব কী বলছ নিহাম? নিঝাম তোমায় কিছু করবে না। তুমি আমাদের সাথে থাকবে নাহয়।
নিহাম না বোধক মাথা নাড়ল।
– আমি ওনার সাথে থাকব।
– কিন্তু তুমি ওদের জীবনযাপনে অভ্যস্ত নও নিহাম। আর নিঝাম এটা কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা তুমি এখন অনেক ছোট। এসব পাকনামো ছাড়ো। তোমায় আমরা দেখে রাখব।
নিহাম তবুও না বোধক মাথা নাড়ল। দশ বছরের বাচ্চাটি আশ্চর্য রকমের দৃঢ়তা নিয়ে বলল,

– আমি সেখানেই থাকব যেখানে বাবা আমায় থাকতে বলেছে।
-ওয়াহেদ?
– হুম।
তপোবন এতক্ষণে নিহামের চিঠিটা পড়ে নিয়েছিল
সে মাকে বলল,
– তারা আমার পরিবার আম্মা। আমি তাদের সেভাবেই আগলে রাখব যেভাবে তারা পৃথিবীর সর্বোচ্চ সুখ পাবে। নিহাম যদি ওনাদের সাথে থাকতে চায় তবে থাকবে। আমি সব ব্যবস্থা করব।
নির্জনা বেগম আশ্চর্য হয়ে গেলেন। রাগ ঝেড়ে বললেন,
– যা ইচ্ছা করো। নিঝামকে আমি সামলাতে পারব না।
তপোবন তাদের সকলকে নিয়ে বাড়িতে চলে এলো। নির্জনা বেগম আর তকদির সিকদার আজ নিঝামের কাছে থাকবেন।

দীর্ঘ এক চিঠিতে শুধু অপরাধবোধ আর ক্ষমার প্রার্থণা ছিল। নিলীমার চোখ আঁটকে গেল শেষ লাইন গুলোতে।
“নিলা, আমি জানি তুমি আমায় স্বার্থপর ভাববে। কিন্তু নিহাম আমার অপরাধের ফল হলেও সে নিষ্পাপ। তার কোনো দোষ নেই নিলা। কিন্তু ও এক নিকৃষ্ট মা পেয়েছে। ওর মা ওর গলায় ছুড়ি ধরতেও দুবার ভাবে না। আমার শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো না। যদি আমার কিছু হয়ে যায় তুমি ওকে আগলে নিও। আমি তোমাদের জীবন সহজ করার জন্য সম্পূর্ণ নিজের পরিশ্রমে কিছু রেখে গিয়েছি। তা তোমার জীবন সহজ করে দেবে। কিন্তু প্লীজ ওকে আগলে নিও। নয়তো ওর মা ওকে কোনোদিন মেরে ফেলবে।”
খুব আদুরে মুহুর্তেই ওয়াহেদ তাকে নিলা বলে ডাকত। নিলীমা চিঠি থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে বারান্দা থেকে অদূরে গেট সংলগ্ন বাগানবিলাস গাছটির পানে তাকালেন। জীবন ততই রঙহীন যতটা রঙিন ওই বাগানবিলাস ফুল গাছটি।
রূপকথার শরীরের উপর অনেক চাপ পড়ায় সে বিছানায় পিঠ এলিয়ে দিয়েছে। কোলে শুয়ে আছে ছোট্ট শুকতারা। দু’জনের চোখ আঁটকে আছে হাতে থাকা চিঠি দুটোতে থাকা ‘আম্মা’ ডাকটিতে।
শুকতারা চোখ বন্ধ করে নিলো। বোনের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে রূপকথাও চোখ বুজে নিলো। সহসা কার্নিশ সিক্ত হতে লাগল আপনমনে। প্রশ্ন জাগে, জীবন কেন এত জটিল?
নিলীমা তাদের থেকে চোখ সরিয়ে দরজা চাপিয়ে বেরিয়ে আসে। তপোবনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল,

– নিহাম?
না চাইতেও তপোবনের মুখে ম্লান হাসি ফুটে উঠল তার প্রশ্নে। যেন সদ্য সঁপে যাওয়া দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট এক দায়িত্ববান মা তার কর্তব্য পালন করছে।
সে বলল,
– তানশানের সাথে ঘুমাচ্ছে।
– ও কিসে পড়ে?
– ফাইভে।
– কোন স্কুলে?
– তানশানের স্কুলেই।
– ইংলিশ মিডিয়াম?
– হুম।
– ওহ।
নিলীমা গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। পরপরই উৎসুক কণ্ঠে বলল,
– খরচ কত হয়?
তপোবন তাকে সোফা দেখিয়ে বলল,
– আসুন এখানে বসে কথা বলি।
নিলীমা বসল। তপোবন তার ঠিক অপরপ্রান্তে বসে বলল,
– যত খরচ ই হোক না কেন সেটা আপনার চিন্তা করতে হবে না।
নিলীমা বলল,

– ও এখন আমার দায়িত্ব।
– খালুজান ওর নামে মোটা অংকের টাকা ফিক্সড করে রেখে গিয়েছে। আমার কাছে সব কাগজপত্র আছে। ওর খরচের চিন্তা করতে হবে না আপনাকে। আপনি শুধু বাগেরহাট থেকে এখানে আসুন। শুকতারার জন্য ও এটা খুব ভালো একটা সুযোগ হবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য।
– শহরে থাকা মুখের কথা নয়।
– আমি আপনার সাথে আছি তো। আমি সবকিছুই করি আমার পরিবারের জন্য। আর আপনারা আমার পরিবার। নিজেদের কেন আপনারা দূরে সরিয়ে রাখেন? যেখানে ছোট্ট জীবনে আমাদের সবার উচিৎ একসাথে মিলেমিশে হাসিখুশি কাটানো।
তপোবন থামলো। পুনরায় বলল,

– আম্মা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে শিখুন। নয়তো একবার জীবন পিছু ছুটে গেলে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। আফসোসের দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে সন্তানদের জীবন ও শেষ হয়ে যাবে। তার চেয়ে একটু খোলস থেকে বেরিয়ে আসুন। দুঃখ থেকে চোখ সরিয়ে দুনিয়াটাকে দেখুন। আপনার কারণে শুকতারার জীবনটাও ওই গ্রামে আর ওই দুঃখের মাঝেই আঁটকে আছে।
নিলীমা ছলছল চোখে তাকালেন। চোখেমুখে ভীষণ ক্লান্তি দুঃখ সইতে সইতে। কেটে গেল দীর্ঘ একটি বিদঘুটে দিন। দীর্ঘ দুঃখময় জীবনের অবসান ঘটিয়ে সকলে নিজ নিজ সুখের পথ বেছে নিলো।
আর নিলীমা বেছে নিলেন সন্তানদের সুখের পথ। তিনি শহরে আসতে রাজি হলেন।
ইমরোজের জ্বর ছিল। তবে এতটাও নয় যে এক ঘুমে টানা চৌদ্দ ঘন্টা ঘুমাবে।

দীর্ঘ চৌদ্দ ঘন্টা বাদে উঠে ইমরোজ বিছানায় মাথা নিচু করে বসেছিল। হাতের মুঠোর এক পাতা ঘুমের ওষুধ। যেটা রান্নাঘর থেকে পেয়েছে। মনে পড়ল, ঘুমানোর আগে সৃজা তাকে খুব যত্ন করে ভাত খাইয়ে দিয়েছিল। ঘুমের রহস্য তবে এটাই। কিন্তু রহস্যটা এত তীক্ত যন্ত্রণাময় হবে জানলে সে কখনোই এই রহস্যের উদঘাটন করত না।
বুকটা ভীষণ ব্যথা করছে। কতদিন হলো কারোর হাতে আদরমাখা ভাত খাওয়া হয় না। সামান্য কাশি হলেও কেউ দশ মিনিট পর পর আদা চা নিয়ে আসে না, কতদিন হলো কেউ তার খুশিতে খুশি হয় না। কতদিন হলো মৌনতার মতো করে তাকে কেউ ভালোবাসে না।
নিজের করা আফসোসে ইমরোজ নিজেই চমকে উঠল। সে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে তড়িৎ নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। যেন সে মৌনতা জড়িত সুখময় স্মৃতিদের থেকে পালাতে চাইছে। আফসোস থেকে পালাতে চাইছে।
সে গাড়ির চাবি নিয়ে বের হলো। চোখেমুখে চাপা যন্ত্রণার আভাস। সৃজাকে খুঁজতে হবে। কী এমন বাধ্যবাধকতা পড়ল যে তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে বের হতে হয়েছে তাকে!
সন্ধ্যা তখন। সে সদর দরজা থেকে বের হতেই দেখল সৃজা বাড়িতে ঢুকছে। তাকে দেখেই হকচকিয়ে গেল সে। ইমরোজ তীক্ষ্ণ নজরে তার আপাদমস্তক পরখ করল। কোনো প্রকার ভূমিকা ছাড়া বলল,

– কোথায় গিয়েছিলে তুমি? কার কাছে গিয়েছ যে তোমার আমাকে ঘুমের ওষুধ খাওয়াতে হয়েছে? আই সোয়্যার সৃজা, আগে তোমায় মারব তারপর তাকে মারব। আমি তোমার জন্য দুনিয়া ছেড়েছি এইটুকু তোমায় মাথায় রাখতে হবে।
সৃজার মুখ থেকে রঙ উড়ে যায়। তবে বুক থেকে সাহস নয়। ইমরোজের রাগান্বিত চাহনি উপেক্ষা করে সে এগিয়ে এসে তার গলা জড়িয়ে ধরল। ইমরোজ ভ্রু কুঁচকে নিলো। সৃজা হেসে তার ঠোঁটে আলতো চুম্বন করে বলল,
– যেখানে আমার ইমরোজের অস্তিত্ব আছে, আমি সেখানেই যাই।
– মানে? হেয়ালি করবে না সৃজা।
সৃজা তাকে আরো নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে ভীষণ আফসোসের সুরে বলল,
– ইমরোজ, টানা আড়াই বছর আমি পুরো দুনিয়া উপেক্ষা করে তোমায় ভালোবেসেছি এই দিন দেখার জন্য? তোমার কেন মনে হলো আমি অন্য কারোর কাছে যাব? যেখানে আমি বিগত তিনমাস মরিয়া হয়ে ঘুরছিলাম তোমার অস্তিত্ব নিজের মাঝে ধারণ করার জন্য।

– প্লীজ সৃজা এত হেয়ালি করো না। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
ইমরোজ অধৈর্য হয়ে বলল। সৃজা হেসে তার হাত ধরে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে গেল।
-আর বলব না কিছু। এসো, এখন আমি তোমায় নিজের চোখেই সবটা দেখাব।
সে ইমরোজকে কোট প্যান্ট পরিয়ে একদম সাজিয়ে গুছিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। রাত আটটা নাগাদ একটা বিলাসবহুল রেস্তোরাঁয় পৌঁছালো। যেখানে যেতেই ইমরোজ চমকে উঠল। পরিচিত বন্ধুবান্ধব আরো অনেকে সেখানে উপস্থিত। সে অবুঝ কণ্ঠে বলল,
– এসব হচ্ছে কী সৃজা?
সৃজার পড়নে ব্যাকলেস ব্লাউজের সাথে শিফনের শাড়ি ছিল। সে ইমরোজের কনুই জড়িয়ে ধরে বলল,
– হ্যাপি বার্থডে ইমরোজ এন্ড কংগ্রাচুলেশন।
ইমরোজ অবাক হলো নিজের জন্মদিনের কথা শুনে। তার মনেই ছিল না। অবশ্য তার জীবনের গতিবিধি ততটা শিথিল ছিল ও না। কিন্তু মুহুর্তেই তার মনের ভেতরের সকল দুশ্চিন্তা ভয় মিলিয়ে গিয়ে সুখ আছড়ে পড়ল। সৃজার এই সারপ্রাইজে সে কতটা খুশি তা চোখেমুখেই স্পষ্ট। সে সৃজার পানে চেয়ে বলল,

– থ্যাংক ইউ সো মাচ, জান। কিন্তু কংগ্রাচুলেশন কেন?
সৃজার চোখেমুখে মৃদু লাজ ফুটে উঠল জবাবটি দিতে। সে ভীষণ উল্লাসের সাথে বলল,
– ফর বিকামিং আ ফাদার।
উপস্থিত সকলে হৈ হৈ করে উঠল। ইমরোজ স্তব্ধ!
-সত্যি সৃজা? তুমি প্রেগন্যান্ট? ওহ মাই গড সৃজা! তুমি আমায় এতবড় সারপ্রাইজ দেবে আমি কল্পনাও করিনি সৃজা। আ..আমি কীভাবে অনুভূতি প্রকাশ করব বুঝতেই পারছি না।
ইমরোজ রীতিমতো উল্লাসে কাঁপছে। যেন তার দুঃখের অন্তের সময় এসে গিয়েছে। সৃজা হাসতে হাসতে তার হাত ধরে বলল,
-আমি তোমার জন্য এই সারপ্রাইজ প্লান করছিলাম বলেই তোমায় ঘুমের ওষুধ খাইয়েছিলাম।‌ আশাকরি তুমি আমার উপর রাগ করোনি।
-আ’ম এক্সট্রিমলি স্যরি, জান। আমি তোমার উপর শুধু শুধু সন্দেহ করেছি। আসলে আমি অনেকদিন ধরে খুবই ডিস্টার্ব ছিলাম। সৃজা বলল,
– নো প্রবলেম। আমি বুঝি তোমায়। আর তুমি আমার বাড়িতে গিয়ে যা দেখেছিলে ওগুলো সুপ্তির উপহার ছিল যা সানি ওকে দিয়েছিল।
ইমরোজ অবাক হলো।

-তুমি কীভাবে জানলে যে আমি ওই গিফট গুলো দেখে তোমায় সন্দেহ করেছি।
সৃজা বাঁকা হেসে বলল,
-কারণ আমি তোমায় তোমার থেকেও বেশি চিনি।
-আই নো মাই সুইটহার্ট! দ্যটস হোয়াই আই লাভ ইউ সো মাচ।
সে সৃজাকে আলতো আলিঙ্গন করে অতিথিদের যোগদান করল। সুপ্তির ভাসুর ও সেখানে ছিল। সানাফ ইমরোজকে দেখতেই এসে হ্যান্ড শেইক করল। আর বলল,
-শুভ জন্মদিন আর শুভকামনা ইমরোজ সাহেব।
-ধন্যবাদ সানাফ। তোমায় দেখে খুব খুশি হলাম। তোমার না কানাডায় যাওয়ার কথা ছিল গতমাসে?
-জি, টাইমটা পিছিয়েছি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে তাই।
-ওহ আচ্ছা। ইনজয় প্লীজ।
বলেই ইমরোজ অন্যদিকে চলে গেল। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল তার থেকে সুখী ব্যক্তি এই জগতে আর কেউ নেই। সানাফ মাথা চুলকে বিড়বিড় করে আওড়ালো,

-এক ভাই চিতা আর এক ভাই গরু। কী জবরদস্ত কম্বিনেশন মাই গড!
তাদের এডাল্ট পার্টি চলল লেইট নাইট পর্যন্ত। রাত দুইটা নাগাদ সৃজা আর সানাফ নেশাগ্রস্ত ইমরোজকে নিয়ে বহুকষ্টে বাড়িতে ঢুকল।
ইমরোজকে বিছানায় শুইয়ে দিতেই ইমরোজ পিছলে যাওয়া কণ্ঠে সানাফকে বলল,
-সানাফ থ্যাংক ইউ সো মাচ…তুমি অনেক ভালো। আই লাইক ইউ ভেরি মাচ, সো মাচ, ঠু মাচ!
সানাফ দাঁতে দাঁত চেপে তাকালো সৃজার দিকে। সৃজা তাকে আশ্বস্ত করে ফিসফিসিয়ে বলল,
-ওর মাথা পুরাই গিয়েছে। তুমি এখন যাও বাকিটা আমি করে নিতে পারব।
-আর ইউ শিওর?

-হুম।
-ওকে।
সানাফ বেরিয়ে গেল। সৃজা অন্য ঘর থেকে একটা ফাইল এনে ইমরোজের কাছে গেল। ঠোঁটে চুমু দিয়ে আদুরে স্বরে বলল,
-জান, আমার একটা কাগজে তোমার সাইন লাগবে। একটু করে দেবে?
নেশাগ্রস্ত ইমরোজ টলতে টলতে তড়িঘড়ি করে মাথা জাগিয়ে বলল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬১ (২)

-হ্যাঁ হ্যাঁ করব তো জান। তুমি আমায় আজ কতবড় সারপ্রাইজ দিলে তা তুমি জানো না‌। আমি বাবা হবো। আমাদের ঘরটা আর একা একা লাগবে না। দাও দাও কোথায় সাইন করব?
সে বোকার মতো আরো রাজ্যের কথা বলতে বলতে খুব সানন্দেই ফাইলটাতে সাইন করে দিলো আর দুটো টিপ সই ও দিল।
দীর্ঘ আঠারো ঘন্টার প্লানে সফল সৃজা বড়সড় একটা হাঁফ ছেড়ে বিছানায় পিঠ এলিয়ে দিল। সে ক্লান্ত, ভীষণ ক্লান্ত! এখন তার ছুটি চাই। ভাবতেই তার মুখে বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠল।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬২ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here