অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৩
রিদিতা চৌধুরী
ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা মেসেজটা দেখে রিদির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। আননোন নাম্বার। তার ওপর ‘ম্যাডাম’ সম্বোধন! এখানে আসার পর থেকেই এই নাম্বারটা থেকে অদ্ভুত সব মেসেজ আসছিল। কখনো শুধু একটা ডট, কখনো একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন। গুরুত্ব দেয়নি রিদি, আগন্তুকের পাগলামি ভেবে এড়িয়ে গেছে। কিন্তু আজ হঠাৎ এমন সম্বোধন! রিদির মনের ভেতরটা কেমন জানি শিরশির করে উঠল। কৌতূহল আর অস্বস্তির দোলাচলে সে দ্রুত টাইপ করল,
কে আপনি?’
ফোনটা হাতে নিয়েই অপেক্ষা করছিল রিদি। কিন্তু প্রতিউত্তরে নীরবতা। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। দীর্ঘ অপেক্ষার পর যখন রিদি হতাশ হয়ে ফোনটা বালিশের পাশে রেখে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই—টুং! স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল।
’হলাম ধরেন, কেউ একজন ম্যাডাম!’
মেসেজটা পড়ার পর রিদি স্থবির হয়ে বসে রইল। শব্দগুলোর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে পরিচিত কারো সাথে মেলাতে চাইল। কিন্তু মনের হাজারো গলি খুঁজেও সে তার সাথেই খাপ খাওয়াতে পারল না। রিদির আঙুলগুলো আবারও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিবোর্ডে টাইপিং করল, ‘
সে ‘কেউ একজন’টা কে, সেটা জানতে চাচ্ছি? বলবেন প্লিজ?’
অপেক্ষা, আর অপেক্ষা। ঘড়ির কাঁটার শব্দ ছাড়া ঘরের নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। কিন্তু ওপাশ থেকে আর কোনো উত্তর এল না। রিদির ভেতরটা এবার বিরক্তিতে ভরে গেল। তীব্র ইচ্ছে হলো নাম্বারটা ব্লক করে দেওয়ার। কিন্তু একটা অদৃশ্য টান যেন তাকে আটকে রাখল। কে জানে, হয়তো অবচেতন মনে সে পরিচিত কারো ছায়া খুঁজছে, যদিও জানে এমনটা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফোনটা বালিশের পাশে ছুঁড়ে দিল সে। রহস্যের চাদরে ঢাকা এই অজানাকে সঙ্গী করেই একসময় ঘুমের অতলে তলিয়ে গেল রিদি।
সকালের পাখির কিচির মিচির শব্দে ঘুম ভাঙ্গল রিদির। পিটপিট করে চোখ মেলল সে। অভ্যাসবশতই হাতটা চলে গেল বালিশের পাশে রাখা ফোনটার দিকে। ঘড়ির কাঁটায় ছয়টা ত্রিশ। প্রতিদিনের রুটিন অনুযায়ী, ঘুম থেকে উঠে ওযু সেরে রিদি নামাজ পড়ে নিল। খানিকটা সময় বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাগানটা দেখল সে। তারপর কিছুক্ষণ বই নিয়ে বসল , এত দিন সৌহার্দ্যর মিস করা ক্লাসের নোট গুলো সুমির থেকে কালেক্ট করছে, কিন্তু অনেকটাই
শেষ করা বাকি!
এ বাড়িতে আসার পর থেকে রান্নাঘরের চৌকাঠ মাড়ানো তো দূরের কথা, খুব সাধারণ কাজগুলোও তাকে করতে দেওয়া হয় না। আরিফা খান তো বটেই, এমনকি শাহবীরেরও কড়া নির্দেশ—রিদি যেন সংসারের কোনো কাজেই হাত না দেয়। কিন্তু যে মেয়েটি এতদিন নিজের হাতে সংসার সামলেছে, তার পক্ষে হাত-পা গুটিয়ে অলস বসে থাকাটা বড্ড যন্ত্রণার। মাঝে মাঝে তার হাতের আঙুলগুলো যেন কাজ করার জন্য ছটফট করে।
রিদি ঘন্টা খানেক পড়ে, সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে দেখলো যুথি আর সাহান বরাবরের মতোই টম অ্যান্ড জেরির মতো লেগে আছে। ঝগড়াটা তুঙ্গে। রিদি কিছুটা এগিয়ে গিয়ে মৃদু হেসে বলল, “কী শুরু করলি তোরা? সকাল হতে না হতেই এই অশান্তি?”
রিদিকে দেখেই যুথি যেন নালিশ করার একটা সুযোগ পেল। চোখ মুখ ফুলিয়ে কেঁদে ফেলে বলল, “দেখো না রিদি আপু, তোমার এই খচ্চর ভাইটা আমার প্রিয় হেয়ার ক্লিপটা ভেঙে ফেলল! এটা বীর ভাইয়া আমেরিকা থেকে আমার জন্য এনেছিল, আমার অনেক পছন্দের ছিল এটা!”
যুথির অভিমানী মুখটা দেখে রিদির মায়া হলো। সে সাহানকে ধমক দিয়ে যুথিকে শান্ত করে যুথির মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহের স্বরে বলল, “আরে, এটা নিয়ে মন খারাপ করতে হবে না তো। বীর ভাইয়া আমার জন্যও একদম একই রকম একটা ক্লিপ এনেছে। আমি তো এসব ক্লিপ সেভাবে ব্যবহারই করি না, সেটা তুই নিয়ে নিস, কেমন?”
রিদির কথায় মুহূর্তেই যুথির কান্নার বদলে মুখে চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে চোখ টিপে দুষ্টুমি করে বলল, “না আপু, তোমারটা লাগবে না। এই খচ্চরটাকেই আবার আমেরিকা যেতে হবে, আমাকে আবার নতুন একটা এনে দেওয়ার জন্য!”
যুথির এমন অদ্ভুত আব্দার শুনে সাহান বোকা বনে গেল। সে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল, ‘এই বলদ মেয়ে বলে কি? একটা ক্লিপের জন্য আমাকে আবার আমেরিকা পাঠাবে?’
সাহান কিছু একটা বলে প্রতিবাদ করার আগেই রিদি তার পিঠে আলতো করে একটা চাপড় দিয়ে তাকে থামিয়ে দিল। তারপর হাসিমুখে যুথির হাত ধরে খাবারের টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল।
খাবারের টেবিলে তখন এলাহি আয়োজন, সুস্বাদু খাবারের সুগন্ধে চারপাশটা যেন ভরে উঠেছে। সবাই খেতে ব্যস্ত, কিন্তু পুরো টেবিলে অদ্ভুত এক নীরবতা। কারণ, শাহাবীরের সেই গম্ভীর মুখটা আজ যেন আরও বেশি নিস্প্রভ, পাথরের মতো স্থির। রিদির চোখ বারবার সেদিকেই চলে যাচ্ছে।
রিদি মনে মনে বলল, ‘ ওই বাড়িতে ছিলো অসভ্য ডাক্তার যে মুখটাকে ভাল্লুকের মত করে রাখতো, এখন দেখছি এই বাড়িতে একটা পেঁচার মত করে রাখে। কিন্তু এই পেঁচাটাকে দেখলে কেমন জানি আপন আপন লাগে। মনে হয় আমার খুব কাছের কেউ। এমন কেন মনে হয়? সাহানকে দেখে তো কখনো এমন মনে হয় না, ও তো আমার ফুফাতো ভাই!’
রিদির ভাবনার এই গভীরতায় ছেদ পড়ল হঠাৎ। শাহাবীর ওর মাথায় আলতো একটা টোকা দিয়ে বলল, “খেতে বসে কি আকাশ কুসুম ভাবছিস? কলেজে যাবি না?”
রিদি মৃদু হেসে শুধু মাথা নাড়ল, যার অর্থ সে যাবে।
শাহাবীর এবার রিদির থেকে চোখ ফিরিয়ে যুথির দিকে তাকাল। গম্ভীর গলায় বলল, “আর এই যে পাকা বুড়ি আপনার কি স্কুল নেই? সামনে তো এসএসসি এক্সাম এভাবে বসে বসে এই গাঁদাটার সাথে ঝগড়া করবেন?” সাহানের দিকে ইশারা করল সে।
সাহান সাথে সাথেই প্রতিবাদ করে বলল, “ভাইয়া আমি কিন্তু একদম গাঁদা নই!”
শাহাবীর ঠান্ডা গলায় বলল, “হইছে কথা কম বলে খেয়ে নে!”
রিদির খাওয়া শেষ হতেই শাহাবীর ওকে নিয়ে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। কলেজ গেটের সামনে গাড়ি থামিয়ে রিদির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল সে। পকেট থেকে একটা চকলেট আর কিছু টাকা বের করে দিয়ে বলল, “এই নে কিছু লাগলে নিয়ে নিস, আর কোন সমস্যা হলে ফোন দিবি কেমন?”
রিদি একটু হেসে সায় জানাল। কোনো এক অজানা মায়ার টানে তার মনটা কেমন শান্ত হয়ে গেল। সে বিদায় নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকে পড়ল। রিদি চলে যেতেই শাহাবীর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
কলেজ গেইটে পা রাখতেই রিদির সাথে বন্ধুদের দেখা হয়ে গেল। কিন্তু খুশির আমেজটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। সুমি বেশ চিন্তিত মুখে রিদির দিকে তাকিয়ে বলল, “রিদি, আজ কিন্তু তোকে সৌহার্দ্য স্যারের ক্লাসটা করতেই হবে!”
রিদি সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। কিছুটা ঝাঁঝালো স্বরেই বলল, “কেন? আমি ওনার ক্লাস করব না!”
পৃথা এতক্ষণ চুপচাপ দেখছিল, এবার সন্দেহের দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা, সত্যি করে বল তো, তোর সমস্যাটা আসলে কী? স্যার তোর সাথে এমন কী করেছেন যে তুই ওনার ক্লাসটা এড়িয়ে যাস?”
বন্ধুদের এমন হঠাৎ প্রশ্নে রিদি মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সৌহার্দ্যর সাথে তার সম্পর্কের কথা এখনো ওদের বলা হয়নি, তা বন্ধুদের কাছে এখনো গোপন। সে নিজের অস্বস্তি লুকাতে নাক-মুখ কুঁচকে অস্ফুট স্বরে বলল, “কী আর হবে! ক্লাসে আমার সাথে উনি কেমন আচরণ করেন, তা তো দেখিসই। অসভ্য একটা মানুষ!”
সুমি একটু হতাশ হয়ে বলল , “সে যাই হোক, আজ তোকে ক্লাস করতেই হবে। আজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ক্লাস আছে। সৌহার্দ্য স্যার স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, যে আজ ক্লাসে থাকবে না, তাকে সেমিস্টার ফাইনালে বসতে দেবেন না!”
সুমি পৃথার কথার পিঠে রিদি ক্ষোভের সাথে বলল, “সবই কি ওনার কথায় হবে? নাকি পুরো পরীক্ষার অথরিটি উনি কিনে নিয়েছেন?”
সুমি এবার একটু নরম গলায় কিন্তু বাস্তবতার সুরে বলল, “বাদ দে তো এসব রিদি। চল ক্লাসে যাই। উনি এত বড় একজন প্রফেসর ও ডাক্তার, ওনার সাথে আমাদের মতো ছাত্রীদের জেদ করে পেরে ওঠা সম্ভব নয়। ব্যাপারটা একটু বোঝার চেষ্টা কর।”
বন্ধুর কথায় রিদি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে নিজেও বুঝল, ব্যক্তিগত সম্পর্কের রেশ ধরে নিজের পড়াশোনার ক্ষতি করাটা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। আর কতদিন এভাবে পালিয়ে বেড়াবে? কেনই বা পালাবে? সৌহার্দ্যকে ছাড়াও যে সে ভালো থাকতে পারে, সেটা তাকে প্রমাণ করে দিতেই হবে—মাথা উঁচু করেই।
নিজের অস্থির মনটাকে কোনোমতে সামলে নিল রিদি। এরপর সুমির হাত ধরে নীরব পদক্ষেপে ক্লাসের দিকে এগিয়ে গেল সে।
ক্লাসরুমের দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই সৌহার্দ্যের গম্ভীর গলার আওয়াজ কানে এল। সে অলরেডি ক্লাস শুরু করে দিয়েছে। আজ তাকে বরাবরের চেয়ে একটু অন্যরকম লাগছে। প্রতিদিনের কালো বা সাদা শার্টের বদলে তার পরনে আজ ছাই রঙের একটা শার্ট, হাতা গুটানো—যা তার ব্যক্তিত্বকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। মুখে হালকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি, যা তার কঠোর চাহনিকে যেন রহস্যময় করে তুলেছে। প্রজেক্টরের আলোয় তার ছায়া দেয়ালে কাঁপছে, আর সে হাত নেড়ে অত্যন্ত কৌশলে লেকচার বুঝিয়ে যাচ্ছে।
সায়েম একটু কাঁপা গলায় নিচু স্বরে বলল, “উই ক্যান কাম, স্যার?”
রিদি মনে মনে ভাবল, নিশ্চয়ই কোনো আজব তেড়ামি দেখাবে সে। এটাই তো তার স্বভাব। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে সৌহার্দ্য শুধু একবার তাদের দিকে তাকাল। তার তীক্ষ্ণ চোখে মুহূর্তের স্থবিরতা, তারপর নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, “ইয়েস।”
ক্লাস চলছে। হঠাৎ সৌহার্দ্যের নজর গিয়ে পড়ল সায়েমের ওপর। তার গমগমে কণ্ঠস্বর পুরো ক্লাসে প্রতিধ্বনি তুলল, “ইউ, চার চোখ! কাম হিয়ার।”
সায়েমের বুকটা কেঁপে উঠল। মনে মনে ভাবল, ‘এই খাটাসটা আজ আবার কী শুরু করল!’ কোনো প্রশ্ন না করেই সে অপরাধীর মতো এগিয়ে গেল।
সৌহার্দ্য তাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসল, “গান পারো?”
এমন অদ্ভুত প্রশ্নে সায়েম বোকা বনে গেল। আমতা আমতা করে বলল, “ম-মোটামুটি পারি, স্যার।”
সৌহার্দ্য একটু ভেবে নিয়ে বলল, “চলবে। ক্যারি অন। ওই যে গানটা আছে না—‘চলে গেছ কি?’… ওটা গাও।”
সায়েম কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। সৌহার্দ্য মোবাইল বের করে গানটা সার্চ দিয়ে সায়েমের সামনে ধরল। গানের লিরিক্স দেখে সায়েমের মনে মনে বলল, খাটাশ টার কি ব্রেকআপ হয়েছে? না হলে হঠাৎ ক্লাসে গান কেন শুনতে চাচ্ছে তাও আবার এমন?
সায়েমকে চুপ করে থাকতে দেখে সৌহার্দ্য বিরক্তির স্বরে তাগিদ দিয়ে বলল, “হোয়াট হ্যাপেন্ড? হারি আপ!”
সায়েম একটু গলা ঝেড়ে গাইতে শুরু করল:
“চলে গেছ তাতে কি? নতুন একটা পেয়েছি?
তোমার থেকে আরও বেশি সুন্দরী!”
গান শেষ হতেই সৌহার্দ্য ভ্রু কুঁচকে বলল, “এভাবে না! জোরে গাও। লাস্ট বেঞ্চ পর্যন্ত শোনা যেতে হবে। সবাই একটু এনজয় করুক!”
সায়েম মনে মনে বলল, ‘ডাক্তার হতে এসেছি নাকি সার্কাস করতে? আল্লাহই জানে!’ সে দাঁতে দাঁত চেপে আরও জোরে চিৎকার করে গাইল। গান শেষ হতেই সৌহার্দ্য হাত নেড়ে বলল, “বাজে হয়েছে। ইউ গো!”
সায়েম ফেরার সময় মনে মনে বিড়বিড় করল, “এই জন্যই তোর গার্লফ্রেন্ড তোকে ছেড়ে পালিয়েছে, খাটাস!”
রিদি এতক্ষণ একদৃষ্টিতে সব দেখছিল। তার মনে হলো, সৌহার্দ্য জেনেশুনেই তাকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য এসব করছে। রাগে রিদির শরীর রি রি করছিল। সে ফিসফিস করে বলল, “অসভ্য লোক! তোর কাজই তো একটা ধরা আর একটা ছাড়া। লুচ্চা ডাক্তার কোথাকার!”
ঠিক সেই মুহূর্তেই সৌহার্দ্যের তীক্ষ্ণ কণ্ঠ ভেসে এল, “বোঁচা নাক! স্ট্যান্ড আপ!”
রিদি রাগে গজগজ করতে করতে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু সৌহার্দ্যের দিকে তাকাল না। সৌহার্দ্য তার সামনে এসে গমগমে স্বরে প্রশ্ন করে বলল, “এক্সপ্লেইন, হোয়াই ইউ মিসড দ্য ক্লাস!”
রিদির রাগ তখন চরম সীমায়। রাগের মাথায় আর হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সে বলেই ফেলল, “আমার জামাই মরে গেছে স্যার! মুরুব্বীরা বলছে চল্লিশ দিন ঘরের বাইরে বের না হতে।” বলেই সে সরাসরি সৌহার্দ্যের চোখের দিকে কটমট করে তাকাল।
কথাটা শুনেই সৌহার্দ্য খুকখুক করে কেশে উঠল। পরক্ষণেই রাগান্বিত স্বরে বলল, “স্টুপিড! ক্লাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকো।”
পুরো এক ঘণ্টা রিদি দাঁড়িয়ে রইল। পায়ের ব্যথায় টনটন করছে, ইচ্ছে করছে লোকটার মাথা ফাটিয়ে দিতে। সে ভাবল, ক্লাস শেষ হলেই হয়তো সৌহার্দ্য চলে যাবে। কিন্তু সৌহার্দ্য সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঘোষণা দিল, “ক্লাস টেস্ট হবে।” গত সপ্তাহে ওটি থাকায় নিতে পারেনি, তাই আজই বকেয়া পরীক্ষা। প্রশ্নপত্র বিলি করে রিদির দিকে তাকিয়ে সে বিদ্রুপের স্বরে বলল, “ইউ, বিধবা! তুমি ওভাবেই লেখো।”
বিধবা’ শব্দটা যেন তীরের মতো রিদির বুকে বিঁধল। নিজের রাগের ওপর ঘৃণা হলো তার, তখন রাগের মাথায় হুশ হারিয়ে বলে দিছে,। শরীরটা নিস্তেজ হয়ে আসছে। মনে মনে আল্লাহর কাছে তওবা করে, মনে মনে সৌহার্দ্যকে অকথ্য ভাষায় গালি দিতে দিতে সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই লেখা শুরু করল।
দীর্ঘ আধা ঘণ্টা পর লেখা শেষ হলো। রিদি পেপার জমা দিয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে সৌহার্দ্যের দিকে তাকাল। সৌহার্দ্য খাতাগুলো নিজের হাতে গুছিয়ে নিতে নিতে রিদির সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে তখনো সেই আগের শীতল কঠোরতা। রিদির চোখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে নিচু স্বরে বলল, “সিট ডাউন। এন্ড মেক সিওর ইউ ডোন্ট মিস এনি ক্লাসেস নেক্সট টাইম।”—কথাটা বলে সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না, গম্ভীর পদক্ষেপে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল।
সৌহার্দ্য বেরিয়ে যেতেই রিদির দীর্ঘক্ষণের দম বন্ধ করা অস্বস্তি যেন এক লহমায় বেরিয়ে এল। সে ধপ করে সিটে বসে পড়ল। পায়ের পাতায় রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যেন অবশ হয়ে আছে, তীব্র ব্যথায় সারা শরীর শিনশিন করছে। রাগে, অপমানে আর অভিমানে রিদির চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল, “অসভ্য ডাক্তার! তোর এমন মেজাজ! নিশ্চিত থাক, নতুন যেটা পেয়েছিস তার হাতে দিনে-রাতে ঝাড়ুপেটা খাবি তুই!”
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১২
ক্লাসে শেষ করে সৌহার্দ্য দ্রুত পায়ে কলেজ গেইটের দিকে এগিয়ে গেল। সামনেই তার গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। সে দরজা খুলতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে ভেসে এল এক পরিচিত অথচ অপ্রত্যাশিত কণ্ঠস্বর,
“ডাঃ চৌধুরী, লং টাইম নো সি!”
